ওঝাকে যখন ভূতে ধরে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ওঝাকে যখন ভূতে ধরে

১

অনিকেতের অফিসটা কলকাতা শহর থেকে দূরে বীরভূমের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কলকাতা থেকে কোনোভাবেই প্রত্যহ অফিসে আসা সম্ভব নয় বলে অফিসের কাছেই একটা ভাড়া বাড়িতে তাঁর বাসস্থান। সরকারের সমাজকল্যাণ দপ্তরের কনিষ্ঠতম অফিসার অনিকেত। অফিসটা তার দায়িত্বেই চলে। কিন্তু অনিকেতের অধীনস্থ কর্মী বলতে মাত্র একজন লোক, তপন মণ্ডল নামের অল্পবয়সি একজন স্থানীয় ছেলে। আর একজন কর্মী অবশ্য ছিলেন, কিন্তু তিনি রিটায়ার করার পর সরকার থেকে এখনও নতুন লোক এসে পৌঁছোয়নি অফিসে। কাজেই একজন লোককে নিয়েই অনিকেতকে কাজ চালাতে হয়। অবশ্য কাজ খুব একটা যে বেশি কিছু তা নয়। অনিকেতকে মাঝে মাঝে যেতে হয় স্থানীয় গ্রামগুলোতে নানান সামাজিক কর্মসূচী প্রচারের কাজে। কখনও বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা এসব ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রচারের কাজে আবার কখনও-বা যেতে হয় নারী শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা থেকে শুরু করে নানা সামাজিক ক্রিয়াকলাপে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য। তবে সপ্তাহে এসব কাজ দু-তিনদিনের বেশি থাকে না। বাকি দিনগুলোতে অনিকেত অফিসে বসেই কাটায়। আর কখনও সখনও সদরে সরকারি মিটিং-এ ডাক পড়লে সেখানে যেতে হয় তাকে।

অনিকেত এদিন বিকালে ফাঁকা অফিসে বসে গল্প করছিল তার সহকর্মী তপনের সঙ্গে। অনিকেত একলা থাকে বলে তার বাসাতে ফেরার তাড়া থাকে না। এমন সময় একজন বুড়ি এসে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল অনিকেতের ঘরে। তার পোশাক দেখেই মনে হয় যে সে গ্রামের গরিব মানুষ। হাঁফাচ্ছে বুড়িটা। যেন সে ছুটতে ছুটতে আসছে!

অনিকেত মৃদু বিস্মিতভাবে তাকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

বুড়িটা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “মেয়েটাকে বাঁচান স্যার। নইলে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ওকে মেরে ফেলবে।”

বুড়িটার কথা শুনে অনিকেত প্রাথমিকভাবে মনে করল যে ঘটনাটা গার্হস্থ্য অশান্তির ব্যাপার বা হয়তো পণের দাবিতে অত্যাচারের ব্যাপার। এসব ক্ষেত্রে পুলিশের কাছেই অভিযোগ করা প্রয়োজন, তার কাছে নয়, তাই সে বুড়িটাকে বলল, “তোমার মেয়ে? তার ওপর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা অত্যাচার করলে, মারধোর করলে এখনই থানায় চলে যাও। কোথা থেকে আসছ তুমি?”

বুড়িটা বলল “চণ্ডীপুর থেকে, অজয়ের চরে গ্রাম। মেয়েটা আমার নয় তবে আমারও ওই বয়সের একটা মেয়ে ছিল। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মেয়েটাকে মারধোর করেনি তবে তারা ভৈরব ওঝাকে ডেকে পাঠিয়েছে তারাপীঠ থেকে। সে চলে এসে মেয়েটাকে কিছু করার আগে তাকে বাঁচাতে হবে।”

বুড়িটার কথা শুনে অনিকেত তাকে বলল, “তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না। ব্যাপারটা ভালো করে খুলে বলো?”

বুড়িটা বলল, “আমাদের গ্রামের নিত্যানন্দ মণ্ডলের বাড়ির বউ পূর্ণিমা। দু-দিন ধরে তার জ্বর আর ভুল বকা শুরু হয়েছে। তাকে ভূতে ধরেছে বলে মনে করে নিত্যানন্দের বাড়ির আর গ্রামের লোকেরা মিলে ভৈরব ওঝাকে ডেকে পাঠিয়েছে। ও এলেই প্রচণ্ড মারধোর করবে মেয়েটাকে। তারপর হয়তো ওর অবস্থাও আমার মেয়ের মতো হবে।”—এই বলে থামল বুড়িটা।

অনিকেত জানতে চাইল “তোমার মেয়ের কী হয়েছিল?”

বুড়িটা আঁচলের খুট দিয়ে চোখ মুছে বলল, “ওই গ্রামেই আমার মেয়েও তখন আমার সঙ্গে থাকত। একদিন আমার মেয়েরও জ্বর হয়েছিল। সেও এমনই ভুলভাল বকতে শুরু করেছিল। আমাদের গ্রামের একদম পাশেই অজয়ের পাড়ে একটা শ্মশান আছে। গ্রামের লোকজন বলল; আমার মেয়ে যখন ছাগল চরিয়ে সন্ধ্যাবেলা খোলা চুলে শ্মশানের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরছিল তখন তাকে কোনো ভূতে ধরেছে। গ্রামের লোকেরা এরপর ডেকে আনল ওই ভৈরব ওঝাকে। সে এসে ভূত তাড়াবার জন্য আমার মেয়েটাকে এমন মারল যে পরদিনই মারা গেল। আপনার পায়ে পড়ি বাবু। আপনি এই মেয়েটাকে গিয়ে বাঁচান। এ জন্যই আমি ছুটতে ছুটতে এখানে হাজির হয়েছি। আপনি অনেকদিন আগে আমাদের গ্রামেও গেছিলেন।”

বুড়িটার কথা শুনে এবার অনিকেত সোজা হয়ে বসল। এসব ভূত-প্রেত, তান্ত্রিক ওঝা, কোনোটাই বিশ্বাস করে না অনিকেত। বিভিন্ন গ্রামে তারা এসব সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার চালায় অনিকেতদের দপ্তর। সাপের ওঝা, অসুস্থ হলে সারাবার জন্য তান্ত্রিক ওঝা এদের বিরুদ্ধেও অনিকেতরা প্রচার চালায়। যাতে সাধারণ মানুষ এসব বুজরুকিতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সঠিক চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হতে পারে সেজন্য। বুড়িটার কথা যদি সত্যি হয় তবে বউটার পরিবারকে বুঝিয়ে তাকে হাসপাতালে পাঠানো দরকার। চণ্ডীপুর গ্রামটায় যেতে আধঘণ্টা মতো সময় লাগবে মোটর সাইকেলে। বুড়ির কথার গুরুত্ব উপলব্ধি করে অনিকেত তার অধীনস্থ কর্মী তপনকে বলল, “চলো তো ঘটনাটা কী তা একবার দেখে আসি। বউটা অসুস্থ থাকলে তার বাড়ির লোককে বুঝিয়ে তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে হবে।”

অনিকেতের কথা শুনে বুড়িটার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে বলল; “আমি এখানে এসেছি জানলে গ্রামের লোকেরা আর আমাকে গ্রামে থাকতে দেবে না। তবুও আমি ছুটে এসেছি মেয়েটাকে বাঁচাবার জন্য।”

অনিকেত তার কথা শুনে তাকে বলল, “তুমি নিশ্চিন্তে থাকো তোমার নাম কেউ জানবে না। আমরা তোমার আগেই গ্রামে পৌঁছে যাব। তুমি পিছনে এসো।”

২

অফিসের নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই। তপনের মোটর সাইকেলটাই অফিসের কাজে যাবার জন্য অনিকেতের একমাত্র ভরসা। তবে অফিস থেকেই তপনের বাইকে করে কোথাও গেলে অফিস থেকেই তার তেলের খরচ মিটিয়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকাল পাঁচটা নাগাদ অনিকেত তপনের মোটর সাইকেলের পিছনে চেপে রওনা হয়ে গেল গন্তব্যের দিকে। চেনা রাস্তা, তাই চণ্ডীপুর গ্রামে পৌঁছোতে অসুবিধা হল না তাদের। গ্রামটা একদম অজয় নদের কিনারে। নদীতট এক হয়েছে গ্রামের কোল ঘেঁষেই। নদীতটের কিনারা বরাবর গোটা তিরিশেক ঘরবাড়ি নিয়ে গ্রামটা গড়ে উঠেছে। তারা যখন গ্রামে গিয়ে পৌঁছোল তখন সূর্য ঢলতে শুরু করেছে অজয় নদের অপর পারে।

ঘটনাটা যে বাড়ির সে বাড়িটা চিনতে অসুবিধা হল না অনিকেতদের। দূর থেকেই একটা বাড়ির সামনে তারা অনেক ভিড় দেখতে পেল। অনিকেতরা সোজা গিয়ে হাজির হল সেই বাড়িটার সামনে। ছেলে বুড়ো থেকে শুরু করে বাড়ির বউ বাচ্চা কাচ্চা, সার গ্রাম যেন ভেঙে পড়েছে সেই একতলা বাড়িটার উঠোনে। উত্তেজিতভাবে তারা কথাবার্তা বলছে। অনিকেতরা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বেশ কিছু লোকজন তাদের দিকে ফিরে তাকাল। অনিকেত একজন লোককে প্রশ্ন করল, “এখানে কী হয়েছে?”

একসঙ্গে অনেকে তার প্রশ্নের জবাবে বলল, “নিত্যানন্দ মণ্ডলের বাড়ির বৌমাকে ভূতে ধরেছে।”

অনিকেত, তপনকে সঙ্গে নিয়ে ভিড় ঠেলে বাড়ির উঠোনে গিয়ে উপস্থিত হল। সেখানে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে বাইশ-চব্বিশ বছরের একটা বউ বা মেয়েকে৷ যে ছটফট করছে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছে! সম্ভবত জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে সে অথবা তার অন্য কোনো অসুখ হয়েছে। মেয়েটাকে কিছুক্ষণ দেখার পর অনিকেত জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল, “ওর বাড়ির লোক কারা আছেন?”

কাছেই দাঁড়ানো একজন বৃদ্ধ লোক জবাব দিল, “আমি নিত্যানন্দ মণ্ডল। এটা আমার বাড়ি, আর এ হল আমার বউমা পূর্ণিমা, আর এ হল আমার ছেলে নিতাই, পূর্ণিমার বর।” —একথা বলে বুড়োটা পাশে দাঁড়ানো তার ছেলেকে দেখাল৷

এরপর বৃদ্ধ প্রশ্ন করল, “আপনারা কারা? কোথা থেকে এসেছেন?”

অনিকেত বলল, “আমরা সরকারের সমাজকল্যাণ দপ্তরের লোক। সেই অফিস থেকেই এসেছি তা আপনার বউমাকে তো দেখে মনে হচ্ছে অসুস্থ। ওকে ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে এভাবে এখানে ফেলে রেখেছেন কেন?”

বুড়ো বলল, “ও এমনি অসুস্থ হয়নি। ওকে ভূতে ধরেছে। তাই এমনভাবে এখানে ফেলে রাখা হয়েছে। ভৈরব ওঝাকে খবর পাঠানো হয়েছে ভূত ছাড়ানোর জন্য। সে এখনই এসে পড়ল বলে।”

অনিকেত বলল, “কীভাবে বুঝলেন ওকে ভূতে ধরেছে?”

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন মাতব্বর গোছের লোক সামনে এসে বলল, “দেখছেন না ও বিড়বিড় করে কেমন কথা বলছে। গত রাত্রে যখন হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল তখন ও ছাগলগুলো ঘরে তোলার জন্য বাইরে বেরিয়েছিল। তারপর সকাল থেকেই ওর এমন অবস্থা রাতে যখন ও বৃষ্টির মধ্যে বাইরে বেরিয়েছিল তখনই ওকে ভূতে ধরে।”

অনিকেত বলল, “এমনও তো হতে পারে যে বৃষ্টিতে ভিজে ও জ্বরে পড়েছে। প্রবল জ্বরে ও ভুলভাল বকছে?”

অনিকেতের একথা শুনে সেই মুরুব্বিগোছের লোকটা বলল, “আমাদের মেয়ে-বউরা কেউ ঘরে বসে থাকে না। সবাই রোদে জলে কাজ করে। ওইটুকু বৃষ্টিতে ভেজার কারণে ওর কিছুতেই জ্বর আসতে পারে না। ওকে ভূতেই ধরেছে।”

তার একথা সমর্থন করে আরও বেশ কয়েকজন নারী পুরুষ বলে উঠল; “হ্যাঁ হ্যাঁ পূর্ণিমাকে ভূতেই ধরেছে।”

অনিকেত এরপর পূর্ণিমার স্বামী আর শ্বশুরের উদ্দেশে বলল; “আমার কিন্তু স্পষ্ট মনে হচ্ছে কোনো কারণে ও অসুস্থ হয়ে পড়ে ভুল বকছে। এখানে ফেলে রাখলে ও আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে পাঠাচ্ছি। আপনারা ওকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যান।”

মেয়েটার শ্বশুর নিত্যানন্দ বলল, “বৌমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কোনো লাভ হবে না। আপনাকে তো বললাম, ভৈরব ওঝাকে ডাকা হয়েছে। সে এলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে।”

তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে দাঁড়ানো লোকজনরা বলে উঠল, “হ্যাঁ হ্যাঁ ভৈরব ওঝাই পারবে ওকে ঠিক করতে।”

এই সব প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ওঝার ঝাড় ফুঁক দেখা একটা মনোরঞ্জনের বিষয়ও বটে। আশেপাশের লোকজনের হাবভাব কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারল তারা মনোরঞ্জনের সে সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ।

অনিকেত এবার বাধ্য হয়ে বলল, “আপনারা ওকে হাসপাতালে না নিয়ে গেলে আমিই সরকারি লোক ডেকে মেয়েটাকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করছি।”

এ কথা শুনে সেই মাতব্বর গোছের লোকটা ক্ষিপ্তভাবে বলল, “আমরা এতজন লোক মিলে বলছি বউটাকে ভূতে ধরেছে, এ কথাটা আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। হাসপাতালে নিয়ে যাবার পথে বা হাসপাতালে ওর যদি আরও খারাপ কিছু ঘটে তাহলে ওর দায়িত্ব আপনারা নেবেন তো?”

মেয়েটার বরও বলল, ‘হ্যাঁ আমার বউ যদি মারা যায় তার দায়িত্ব আপনারা নেবেন তো? তাহলে কাগজে সে কথাটা লিখে দিয়ে ওকে নিয়ে চলে যান।” আশপাশের লোকজনও বলে উঠল, “হ্যাঁ ওকে নিয়ে যেতে গেলে কাগজে লিখে দিতে হবে ওর কিছু হলে সব দায়িত্ব আপনার।”

মেয়েটার বরের কথা শুনে আর গ্রামের লোকজনের মনোভাব দেখে এরপর থমকে গেল অনিকেত। যেকোনো অসুস্থ মানুষের যেকোনো সময় প্রাণহানির সম্ভাবনা হতে পারে। ওভাবে কিছু লেখা যায় না কি? শেষে কিছু হলে অনিকেত ফেঁসে যাবে।

অনিকেতের কী করা উচিত তা সে ঠিক বুঝে উঠতে না পেরে তপনকে সঙ্গে করে ভিড় থেকে কিছুটা তফাতে এসে দাঁড়াল। তারপর সে তপনকে বলল, “অবস্থা তো দেখছ। কী করা যায় বলো তো?”

তপন বুদ্ধিমান ছেলে। সে বলল, “স্যার জোর করে কিছু করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। এমনকী গ্রামের লোক ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের আক্রমণও করতে পারে।”

অনিকেত বলল, “কিন্তু বউটাকে তো বাঁচানো দরকার।”

তপন মণ্ডল বলল, “তাহলে একটা কাজ করা যাক স্যার। আমরা এখানে অপেক্ষা করি। দেখি ওঝা এসে মেয়েটাকে নিয়ে কী করে। মেয়েটার প্রাণ সংশয় ঘটতে পারে এমন কিছু দেখলে তখন না হয় আমরা থানায় ফোন করব।”

অনিকেতের কথাটা মনে ধরল। সে বলল, “ঠিক আছে তবে তাই করি।”

বাড়ির দাওয়া ছেড়ে লোকজনদের থেকে কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে ওঝা আসার প্রতীক্ষা করতে লাগল অনিকেতও। এক সময় ধীরে ধীরে সূর্য ডুবে গেল অজয়ের বুকে। অন্ধকার নামতে শুরু করল চারপাশে। গ্রামের লোকেরা অবশ্য প্রস্তুত হয়েই ছিল। অন্ধকার নামতেই বেশ কয়েকটা লণ্ঠন জ্বালিয়ে ফেলল বাড়িটার উঠোনে। অধীর আগ্রহে উত্তেজনার সঙ্গে তারা প্রতীক্ষা করতে লাগল কখন ভৈরব ওঝা এসে হাজির হয় সে জন্য। আর অল্পবয়সি বউটা একইভাবে পড়ে রইল মাটিতে।

৩

বেশ কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হবার পর আবার চাঁদ উঠতে শুরু করল আকাশে। আর তারপরই একটা মোটর ভ্যানের শব্দ দূর থেকে কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। আর সেই শব্দ শুনেই উত্তেজিত হয়ে উঠল উপস্থিত জনতা। কয়েকজন আবার লণ্ঠন হাতে ভিড় থেকে বেরিয়ে এল যে আসছে তাকে স্বাগত জানাবার জন্য। ফটফট শব্দ করতে করতে মোটর ভ্যানটা এসে দাঁড়াল বাড়িটার সামনে। তা থেকে নামল বেশ কয়েকজন লোক। কয়েকজন স্থানীয় গ্রামবাসী আর রক্তাম্বর পরিহিত ঘোর কৃষ্ণবর্ণের একটা লোক। তার কাঁধে একটা ঝোলাও আছে। মাথায় বাবরি চুল, শক্তপোক্ত চেহারার মাঝবয়সি লোকটাকে দেখেই জনতার মধ্যে হর্ষধ্বনি উঠল— “এসে গেছে। ভৈরব ওঝা এসে গেছে বলে।”

তাড়াতাড়ি রাস্তা ছেড়ে দেওয়া হল ভৈরব ওঝার জন্য। ভৈরব ওঝা গিয়ে দাঁড়াল বাড়ির উঠোনে যেখানে বউটা পড়ে আছে সেখানে। উৎসুক জনতা ভিড় করে উঠোন ঘিরে দাঁড়াল ভৈরব ওঝা কী বলে আর কী করে তা দেখার জন্য। অনিকেত আর তপন ও নিজেদের জায়গা ছেড়ে সেই ভিড়ের মধ্যে মিশে দাঁড়ালো। তখন আর তাদের দিকে কারও খেয়াল নেই। সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ভৈরব ওঝার দিকে। নিত্যানন্দ মণ্ডল এগিয়ে এসে হাতজোড় করে নিজের পরিচয় ব্যক্ত করল ভৈরব ওঝার কাছে। যারা ওঝাকে সঙ্গে করে আনল তারা সম্ভবত বউটার সম্পর্কে ইতিমধ্যে কিছু তথ্য দিয়েছিল। মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ভৈরব ওঝা জানতে চাইল, “ও কি এঁটো বাসন মাজে?”

গ্রামের ঘরের বউ এঁটো বাসন মাজবে এটাই তো স্বাভাবিক। মেয়ে বা বউটার স্বামী, শ্বশুর মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ মাজে।”

ভৈরব ওঝা বলল, “আমি ঠিকই ধরেছি। ওর শাড়িতে এঁটো লেগেছিল। সে জন্যই ও ঝড়জলের মধ্যে বাইরে বেরোতেই কেউ ওর ঘাড়ে চেপে বসেছে। তবে আমি যখন এসে গেছি তখন কোনো চিন্তা নেই।”

নিত্যানন্দ বলল, “হ্যাঁ আপনার ভরসাতেই তো আছি বাবা।”

ভৈরব ওঝা এরপর মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, “আমি ভৈরব ওঝা। কি রে তুই যাবি? না কি আমি অন্য ব্যবস্থা করব?”

বউটা ভৈরব ওঝার কথায় কী বুঝল কে জানে? সে মাথাটা দু-পাশে নাড়াল। তা দেখে ভৈরব ওঝা বলল, “ও তুই বউটাকে ছাড়বি না? দেখি তুই কেমনভাবে ওর দেহের মধ্যে থাকিস?”

এ কথা বলে ভৈরব ওঝা নিত্যানন্দর উদ্দেশে বলল, “কুড়ি কেজি চাল, তিনটে নতুন গামছা অথবা তা কেনার পয়সা, একটা কাঁসার থালা আর নগদ পাঁচশো টাকা লাগবে। কি রাজি তো?”

নিত্যানন্দ বলল; “হ্যাঁ বাবা, যা লাগবে দেব।”

গ্রামের লোকেরাও বলল, “ওসব নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, দরকার হলে আমরা চাঁদা তুলে আপনার টাকা দেব।”

ভৈরব ওঝা বলল; “ঠিক আছে তবে কাজ শুরু করি। আমাকে একটা নতুন শলার ঝাঁটা আর কিছু শুকনো লঙ্কা এনে দে।”—একথা বলে ওঝা তার কাঁধের থলে থেকে নানারকম জিনিস বার করে মেঝেতে সাজিয়ে রাখতে লাগল। একটা বেশ বড় মানুষের হান, ধুনুচি, ধুলো, নানানরকম জিনিসের গুঁড়ো। লোকজন হাঁ করে দেখতে লাগল ওঝার কাণ্ড।

ঝাঁটা লঙ্কা সব এসে গেল। প্রথমে ধুনো জ্বালানো হল। তারপর তাতে শুকনো লঙ্কা ফেলতেই উৎকট ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে উঠল চারপাশ। এক হাতে সেই ধুনুচি আর অন্য হাতে শলার ঝাঁটা নিয়ে উদ্ভট মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে মেয়েটার চারপাশে বেশ কয়েকবার প্রদক্ষিণ করল ওঝা। তারপর একসময় সপাং করে বউটার শরীরে ঝাঁটার বাড়ি বসিয়ে দিল। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল মেয়েটা। ভৈরব ওঝা চিৎকার করে মেয়েটার উদ্দেশে বলল; “এবার দেখি তুই যাস কি না? আমাকে দেখলে ব্রহ্মদৈত্য পর্যন্ত পালায়, তুই কোন ছাড়!”

এ কথাগুলোর পর ভৈরব ওঝা মেয়েটাকে প্রদক্ষিণ করতে করতে ঝাঁটার বাড়ি মারতে শুরু করল বউটার সর্বাঙ্গে। সপাং সপাং শব্দের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল মেয়েটা। আর ভৈরব ওঝা বলতে লাগল, “তুই যাবি কি না বল? যাবি কি না বল?”

অনিকেত এ দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছিল না। অথচ গ্রামের মেয়ে বউরা এমনকী ছোটছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত গো-গ্রাসে দেখছে এই দৃশ্য। অনিকেত চাপাস্বরে তপনকে বলল, “এভাবে মেয়েটাকে মারতে থাকলে তো মেয়েটা মরে যাবে। এবার কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। অনিকেত তপনকে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে বেরিয়ে এল। স্থানীয় থানার ওসি ভদ্রলোক কর্মসূত্রে পরিচিত। অনিকেত ফোন করল তাকে। পুলিশ অফিসার তার মুখ থেকে ঘটনাটা জেনে নিয়ে বললেন, “আপনি ওদের বাধা দিতে যাবেন না। তাতে বিপদ হতে পারে। আমি ফোর্স আর অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাচ্ছি। তবে পৌঁছোতে আধঘণ্টা সময় লাগবে।”

ওসিকে খবরটা জানাবার পর অনিকেত আবারও ভিড়ের মধ্যে এসে দাঁড়ালো। ওঝা এবার লঙ্কা পোড়া দিতে শুরু করেছে মেয়েটার নাকে। খকখক করে কাশতে শুরু করেছে বউটা। হাপরের মতো উঠতে নামতে শুরু করেছে তার বুক। দেখে মনে হচ্ছে এই বুঝি তার প্রাণপাখি বেরিয়ে যাবে। অনিকেতের মনে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে একটা ঘুষি কষিয়ে দেয় ওঝার মুখে। কিন্তু এত লোকের মাঝে তার কিছু করার নেই। অসহায়ের মতো সে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল ঘটনাটা।

বাড়ির উঠোনে বউটার ওপর ভূত তাড়ানোর নামে অত্যাচার করার পর ভৈরব ওঝা বলল, “শয়তানিটাকে বশে এনে ফেলেছি। দেখছ না, বিড় বিড় করে কথা বলা বন্ধ করে ও এখন কেমন গোঙাচ্ছে। একটু পরেই ও বউটাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। তার জন্য শেষ কাজটা করতে হবে। মেয়েটাকে নদীর চরে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। তবে সেখানে অন্য কোনো মহিলা থাকলে চলবে না। কারণ পেত্নিটা ওর শরীর থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো মেয়ে বউ-এর ঘাড়ে চেপে বসতে পারে। আর আমাকে একটা হাঁড়ি আর কিছু কাঠ কয়লা জোগাড় করে দাও, আঁচ জ্বালাব।”

৪

ওঝার কথা শুনে উপস্থিত মেয়ে বউ-এর দল বিবশভাবে যে যার ঘরের দিকে পা বাড়াল।

যেন কোনো স্বর্গীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা থেকে বঞ্চিত হল তারা। এমনই তাদের মুখের ভাব। ওঝার নির্দেশমতো একটা হাঁড়িতে কাঠকয়লা ঢালা হল। তারপর মেয়েটাকে কয়েকজন পুরুষ মিলে ধরাধরি করে উঠিয়ে এগোল সামনেই অজয় নদের পাড়ের দিকে। ইতিমধ্যে আকাশে চাঁদ উঠে গেছে। ওঝার নির্দেশমতো নদের বালুচরে এক জায়গাতে শোয়ানো হল বউটাকে। ভৈরব ওঝা একবার বউটার স্বামীকে বলল; ওর শাড়ি কাপড় খুলে ফেলতে হবে। একটা সুতোও যেন ওর গায়ে না থাকে।

আশ্চর্যের ব্যাপার তার স্বামী এ ব্যাপারটার কোনো প্রতিবাদ না করে গ্রামের অন্য পুরুষদের চোখের সামনে নিজের বউয়ের শরীর থেকে খুলতে লাগল তার কাপড়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যুবতী একদম নগ্ন হয়ে গেল। চাঁদের আলোতে উন্মুক্ত তার শরীর। অনিকেত সে দিকে তাকিয়ে লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নিলেও অন্য পুরুষদের চোখ যেন গিলতে লাগল সেই নগ্ন শরীরটাকে।

অনিকেত হাতঘড়ি দেখতে লাগল। ফোন করার পর ইতিমধ্যে পনেরো মিনিট কেটে গেছে। ভৈরব ওঝা এরপর হাঁড়ির কাঠকয়লাতে আগুন দিয়ে তার ঝোলার মধ্যে থেকে একটা বাঁশের নল বের করে তাতে ফুঁ দিতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই লাল গনগনে হয়ে উঠল কাঠ কয়লার আঁচ। বারবার ঘড়ি দেখতে লাগল অনিকেত। তারাও যে গ্রামের অন্য পুরুষদের সঙ্গে এ জায়গাতে এসে দাঁড়িয়েছে সে ব্যাপারে ভ্রূক্ষেপ নেই কারও।

আগুনটা লাল হয়ে ওঠার পর ওঝা তার ঝোলা থেকে যে জিনিসটা বার করল তা দেখে চমকে উঠল অনিকেত। সাইকেলের স্পোকের মতো দেখতে এক গোছা লোহার শলাকা। তাদের গোড়াটা ঝাঁটার মতো করে বাঁধা। ওঝা সেই শলাকাগুচ্ছ গুঁজে দিল কাঠকয়লার আঁচে। লোকটা এরপর সেই শলাকা গুচ্ছ দিয়ে কী করবে তা অনুমান করে কেঁপে উঠল অনিকেতের শরীর। তার অনুমানই সত্যি হল, কিছুক্ষণের মধ্যেই শলাকাগুলো লাল টকটকে হয়ে উঠল। ভৈরব ওঝা সেই শলাকা গুচ্ছ নিয়ে এগোল মেয়েটার দিকে। মাটিতে পড়ে থাকা বউটার সামনে দাঁড়িয়ে একটু ঝুঁকে পড়ে ভৈরবতান্ত্রিক অট্টহাস্য করে বলে উঠল, “দেখি এবার তুই শরীর ছেড়ে যাস কি না? .

ঘড়ি দেখল অনিকেত। আধঘণ্টা সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তবে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিল যে পুলিশ আসার জন্য আর অপেক্ষা করলে চলবে না। যাই হোক না কেন ওঝার হাতের ওই স্পোকের মতো লাল শলাকাগুলো থেকে রক্ষা করার জন্য। অনিকেত ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এগোল ওঝা আর মেয়েটার দিকে।

ভৈরব ওঝাও এরপর সেই তপ্ত লৌহ শলাকার ঝাঁটার বাড়ি মারতে যাচ্ছিল মেয়েটার গায়ে। ঠিক এই মুহূর্তে সবাইকে চমকে দিয়ে একটা ঘটনা ঘটল। ওঝা তার হাতের ঝাঁটাটাকে মেয়েটার গায়ে নামিয়ে আনার আগেই হঠাৎ বউটা স্প্রিং-এর মতো উঠে দাঁড়িয়ে চেপে ধরল ভৈরব ওঝার সেই ডান হাতটা। ভৈরব ওঝাও ব্যাপারটা আশা করেনি। মুহূর্তের জন্য সেও চমকে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পর মুহূর্তেই সে হাতটা ছাড়িয়ে নেবার জন্য বলল, “ভালো হবে না বলছি, হাত ছাড়।”

মেয়েটা কিন্তু হাত ছাড়ল না। ওঝা একটা ঝটকা দিল, কিন্তু হাত ছাড়াতে পারল না। একটা অদ্ভুত হাসি এবার ফুটে উঠল মেয়েটার মুখে। সে ওঝার উদ্দেশে বলল, —“তুই নাকি ভূত তাড়াতে পারিস? তবে ছাড়া তোর হাত।”

আবারও হাত ছাড়াবার চেষ্টা করল ভৈরব ওঝা। কিন্তু কোনো লোহার হাত যেন চেপে ধরেছে তার কবজি।

মেয়েটা এরপর ভৈরব ওঝাকে বলল, “তুই কোনোদিন ভূত দেখেছিস? তুই তো ভূত তাড়াতে পারিস না। তবে এভাবে ভূত তাড়াবার নাম করে মানুষকে মিথ্যা যন্ত্রণা দিস কেন?”

এ কথা বলে মেয়েটা সম্ভবত ওঝার কবজিতে চাপ দিল। আর সে চাপে ওঝার হাত থেকে গনগনে সেই শলাকাগুলো মাটিতে খসে পড়ল। অনিকেত দেখল ভৈরব ওঝার মুখ চোখে এবার বিস্ময় ফুটে উঠেছে। ঠিক এই সময় ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার বর বলে উঠল; “এ কার গলা? এ তো পূর্ণিমার গলা নয়।”

ভৈরব ওঝা এবার কাঁপা কাঁপা গলাতে বলল, “আমি সেই মালতী। যে জ্বরের ঘোরে ভুল বকছিল। গ্রামের লোকেরা আমাকে ভূতে ধরেছে বলে তোকে ডেকে আনল। আমার মা কত বারণ করল, কিন্তু কেউ শুনল না। ভূত তাড়াবার জন্য তুই আমাকে এমন মারলি যে আমি মরেই গেলাম।”

ভৈরব ওঝার মুখমণ্ডলে এবার স্পষ্ট আতঙ্ক ফুটে উঠল। সে বলল; “তুমি ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও আমাকে।”

প্রত্যুত্তরে মেয়েটা বলল, “তুই আগে বল তুই ভূত তাড়াতে পারিস কি না? কথাটা এবার বল।”

ভৈরব ওঝা বলল, “না, না আমি ভূত তাড়াতে পারি না। সবার সামনে স্বীকার করছি এ কথা। এবার আমাকে ছেড়ে দাও।”

এবার একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল মেয়েটার মুখে। সে বলল; “হ্যাঁ ছাড়ব। তার আগে তুই যাতে কারও গায়ে হাত তুলতে না পারিস সে ব্যবস্থা করে ছাড়ব।”

অনিকেত তাদের দুজনের বেশ কাছে পৌঁছেই দাঁড়িয়েছিল। আর এরপরই সে মট করে একটা শব্দ শুনতে পেল! আঙুলের প্রচণ্ড চাপে মেয়েটা গুড়িয়ে দিল ভৈরব ওঝার কবজি। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে ভয়ংকর আর্তনাদ করে উঠল ভৈরব ওঝা। তার এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে উপস্থিত সকলে পিছু ফিরে ছুটতে শুরু করল। মেয়েটা এরপর ওঝার বাম হাতটা ধরল আবারও মট করে শব্দ হল। ভৈরব ওঝার দুটো হাত ভেঙে দিয়ে এক ধাক্কায় তাকে বেশ কয়েক হাত দূরে ছিটকে ফেলে দিল। ভৈরব ওঝা আর উঠল না। প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর আতঙ্কে সে জ্ঞান হারাল। মেয়ে বা বউটাও এরপর ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল তারপর শুয়ে পড়ল। তাদের দু’জনের চারপাশে তখন অনিকেত আর তপন ছাড়া কেউ নেই। সবাই পালিয়েছে। আর এরপরই অনিকেত দেখতে পেল পুলিশের গাড়ির হেডলাইটের আলো এগিয়ে আসছে।

৫

পরদিন বেলা বারোটা নাগাদ অনিকেত নিজের অফিসে বসেছিল। গত রাত্রেই বউটা আর ভৈরব ওঝাকে অজয়ের চর থেকে তুলে এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তারা কেমন আছে তা জানার জন্য কিছুক্ষণ আগে পুলিশকে ফোন করেছিল অনিকেত। পুলিশ তাকে জানিয়েছে মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে। প্রচণ্ড জ্বরের কারণেই না কি ভুল বকছিল মেয়েটা। কয়েকদিনের মধ্যেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে। আর পুলিশের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে থাকা ভৈরব ওঝার সম্পর্কে ডাক্তাররা না কি পুলিশকে জানিয়েছে ভৈরব ওঝার কবজি দুটোর হাড় না কি একদম গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। তা আর কোনোদিন ঠিক হবে না। বাকি জীবনটা তাকে নুলো হয়েই কাটাতে হবে। ভৈরব ওঝা না কি তখনও আতঙ্কে প্রলাপ বকছে; “আমি ভূত তাড়াতে জানি না, আমাকে ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও” বলে।

অফিসে বসে অনিকেত ভাবছিল গত সন্ধে রাতের অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা। ভূত-প্রেতে সে বিশ্বাস করে না, কিন্তু কাছে দাঁড়ানোর কারণে সে স্পষ্ট শুনেছে বউটার কথা। আর অত বড় জোয়ান মানুষের হাত গুঁড়ো করে দেবার মতো শক্তি মেয়েটা পেলই বা কী করে? ঠিক এমন সময় দরজার বাইরে থেকে উঁকি দিল বুড়িটা। অনিকেতকে দেখে ঘরে প্রবেশ করল সে। তারপর বুড়িটা অনিকেতকে বলল, “মেয়েটা এখন কেমন আছে তা খোঁজ নিতে এলাম। আপনারা না গেলে আর একটু হলেই মেয়েটাকে মেরে ফেলত ভৈরব ওঝা। ঠিক যেমন মেরেছিল আমার মেয়েটাকে।

অনিকেত জবাব দিল, “থানায় খবর নিয়েছিলাম বউটা ভালো আছে।”

অনিকেত এরপর বুড়িটাকে প্রশ্ন করল; “তোমার মেয়ের নাম কী ছিল?”

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বুড়িটা আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে বলল, “মেয়েটার নাম ছিল মালতী।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *