মড়ি
১
রেঞ্জারসাহেব ফাইল খুলে নীলেশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হতাশভাবে বললেন, “আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলাম ওকে বাঁচাবার। ছ’মাস ঠেকিয়েও রেখেছিলাম ব্যাপারটা ডিপার্টমেন্টের বড় কর্তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে। কিন্তু গ্রামবাসীরা আদালতে চলে গেল। সরকার চাপে পড়ে গেল। ইতিমধ্যে আরও দু’জন মারা পড়ল। বাধ্য হয়ে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন। ওর মৃত্যুর পরোয়ানা ঘোষণা করে দিলেন। এর মধ্যে ওই কাগজসহ ওকে নিয়ে বিবাদ সংক্রান্ত সব কাগজই আছে। আপনি একবার দেখে নিতে পারেন।”
ফাইলটা হাতে নিয়ে একবার আলগোছে সরকারি কাগজগুলোতে চোখ বোলালেন নীলেশ। নতুন কিছু তেমন জানার নেই কাগজগুলো থেকে। এর মধ্যে বেশ কিছু কাগজ নীলেশকে সরকারের তরফে পাঠানো হয়েছে তাঁর নিয়োগপত্রের সঙ্গে। গত এক বছরে নয়জন নারী-পুরুষকে মেরেছে বুড়ো চিতাবাঘটা। অতঃপর স্থানীয় মানুষদের দাবি মেনে প্রাণীটাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন সরকার। আর যা কার্যকর করার দায়িত্ব এসে বর্তেছে নীলেশের ওপর। অর্থাৎ বাঘটাকে শিকার করতে হবে তাকে।
রেঞ্জারসাহেব এরপর স্বগতোক্তির স্বরে বললেন, “জানেন, প্রাণীটার ওপর আমার বড্ড মায়া পড়ে গিয়েছিল। জঙ্গলে কত দিন, কত বার দিনে-রাতে ওকে দেখেছি। কখনও শীতের সকালে ফাঁকা জমিতে শুয়ে রোদ পোহাতে, আবার কখনও বা চাঁদনি রাতে নদীর পাড়ে জল খেতে। এত বড় লেপার্ড সচরাচর দেখা যায় না। আর চামড়ার কী জেল্লা! সূর্যের আলো হোক বা চাঁদের আলো, সব যেন পিছলে পড়ত ওর গা বেয়ে! পাহাড় থেকে নেমে ও নদী পেরিয়ে এদিকে আসত। হরিণ, বুনো শূকর এসব শিকার করে আবার ফিরে যেত। ও এদিকে যখন দুটো মানুষ মারল তখনই আমি চেষ্টা করেছিলাম প্রাণীটাকে নদীর ওপারে খেদিয়ে দেওয়ার। কিন্তু সে চেষ্টা শুরু করতে না করতেই বর্ষা নেমে গেল, ফুলে ফেঁপে উঠল পাহাড়ি নদী। ওর আর ফেরা হল না। আর তারপর থেকে এখানেই রয়ে গেল ও। জল নামার পর আর ওপারে ফিরল না। হয়তো এটাই নিয়তি ছিল ওর!”
প্রৌঢ় রেঞ্জারসাহেবের কথা শুনে নীলেশ বুঝতে পারলেন, ব্যাপারটাতে বেশ মুষড়ে পড়েছেন ভদ্রলোক। এমনটাই তাঁর পক্ষে হওয়া স্বাভাবিক। যাঁরা কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন জঙ্গলে থাকেন তাঁদের সঙ্গে বন্যপ্রাণীদের একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যাঁরা শহর থেকে দু’দিনের জন্য জঙ্গলে বেড়াতে যান, তাঁদের পক্ষে এ ব্যাপারটা ঠিক উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। নীলেশ যে কাজটা করতে এসেছেন সেটা যে তিনি খুব আনন্দের সঙ্গে করতে এসেছেন এমনটা নয়। কিন্তু সরকারি কাজের দায়িত্ব। তাই তাঁকে তা পালন করার চেষ্টা করতে হবে।
ফাইলটা ফিরিয়ে দেওয়ার পর নীলেশ বললেন, “যখনই আমার ওপর এ কাজের দায়িত্ব বর্তায় তখনই করবেটসাহেবের বলা একটা কথা আমার মনে পড়ে। রুদ্রপ্রয়াগের শতাধিক মানুষ মারা চিতাবাঘটাকে শিকার করার পর তিনি তাঁর বইতে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন—ওকে মরতে হল জঙ্গলের নিয়ম ভঙ্গ করার জন্য নয়, মানুষের নিয়ম ভঙ্গ করার জন্য। আমরা মানুষরাই বন্যপ্রাণীর বাঁচার অধিকার কতটা হবে তা ঠিক করে দিই। কারণ, আমরাই প্রাণীকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব! কিন্তু কী আর করা যাবে বলুন? আদালত আর সরকারের নির্দেশ আমাকে আপনাকে পালন করতেই হবে।”
রেঞ্জারসাহেব বললেন, “ঠিক তাই। এ বাঘটাও জঙ্গলের আইন ভাঙেনি। বাঘ জঙ্গলে শিকার ধরবে এটাই তো স্বাভাবিক। আর মানুষ মারার ব্যাপারে প্রাণীটাকে দোষও দেওয়া যায় না। নরখাদকও এমনি হয়নি। প্রথম যে লোকটাকে ও মেরে খেয়েছিল সে ছিল চোরাশিকারি। বনে ফাঁদ পেতে হরিণ, শজারু এসব শিকার করত। হঠাৎই বনের মধ্যে কীভাবে যেন মুখোমুখি হয়ে গিয়েছিল বাঘটা চোরাশিকারি আর তার সঙ্গীর সঙ্গে। তাকে দেখেই বল্লম ছোঁড়ে সেই শিকারি। সেটা গিয়ে আঘাত হানে বাঘটার পিছনের ডান পায়ে। বাঘও খেপে গিয়ে আক্রমণ করে বসে শিকারিকে। এক কামড়েই শিকারির ধড়-মুণ্ডু আলাদা করে দেয়। এর ফলে দুটো ঘটনা ঘটে। পায়ে আঘাত লাগার ফলে চিতা বাঘটা ওর স্বাভাবিক দৌড়ের ক্ষমতা হারায়, হরিণ-শূকরের পিছু ধাওয়া করে তার শিকারের ক্ষমতা লোপ পায়। আর চোরাশিকারিকে হত্যা করার সময় ও মানুষের রক্তর স্বাদ পেয়ে যায়। আর এ দুইয়ে মিলে ও বাঘটা নরখাদক হয়ে ওঠে।”—এ কথাগুলো একটানা বলার পর তিনি জানতে চাইলেন, “বাঘটাকে মারার ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা ভেবেছেন? একটা ছাগল কিনে এনে রাখা হয়েছে যদি আপনি সেটাকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করেন সেজন্য।”
প্রশ্ন শুনে নীলেশ বললেন, “না, তেমন কিছু ভাবিনি এখনও। আচ্ছা, বরাইক এখনও এখানে থাকত? ইচ্ছা আছে ওর সঙ্গে একবার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করার। জঙ্গলটা ও হাতের তালুর মতো চেনে। এর আগে যখন ভুটানঘাট থেকে নেমে আসা দাঁতালটাকে মারতে এসেছিলাম তখন ও আমাকে অনেক সাহায্য করেছিল।”
রেঞ্জারসাহেব বললেন, “ফুলচাঁদ বরাইক তো। কোথায় আর সে যাবে। অধিকাংশ সময় সে হাড়িয়া খেয়ে নেশা করে ঘরে পড়ে থাকে। তিনদিন আগেই দেখা হয়েছিল ওর সঙ্গে। আপনি বললে ডাকিয়ে আনতে পারি?”
নীলেশ বললেন, “ডাকিয়ে আনার দরকার নেই। আমি ওর ঘর চিনি। নিজেই একবার ঘুরে আসি। তাতে ও বুঝবে আমি ওকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমার কাজের সুবিধা হবে তাতে।”
কথাটা শুনে রেঞ্জারসাহেব হেসে বললেন, “আপনার যা ভালো মনে হয় করুন।”
ট্রেন থেকে নেমে গাড়িতে এখানে আসার পরেই দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়েছিলেন নীলেশ। জঙ্গলের গায়ের এই ফরেস্ট অফিসে তাঁর জন্য ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে ব্যাগ ইত্যাদি রেখে শুধু রাইফেলটা নিয়ে রেঞ্জারসাহেবের সঙ্গে প্রাথমিক বাক্যালাপ করতে এসেছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে আপাতত কথাবার্তা মিটে গেল। রাইফেলটা কাঁধে তুলে নিয়ে রেঞ্জারসাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন নীলেশ।
২
ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অফিস বাড়ি-ঘরগুলোর চৌহদ্দি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন নীলেশ। রাস্তার ওপাশেই জঙ্গল। তার মাথার ওপর দিয়ে আকাশের বুকে জেগে আছে ভুটানঘাট পাহাড়। জঙ্গল আর পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে বিস্তীর্ণ নদীতটের কিছু অংশহএ জায়গা থেকে দেখা যাচ্ছে। এখন শীতকাল, নদীখাত শুষ্ক। মাঝে মাঝে শুধু অগভীর সংকীর্ণ নালার মতো জলধারা প্রবাহিত হয় নদীখাতে। মানুষ জীবজন্তু এ সময় হেঁটেই পেরিয়ে যেতে পারে। এ জায়গায় ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার নানান কাজে এসেছেন নীলেশ। তাই জায়গাটা তাঁর চেনা। ফরেস্ট অফিসের যেদিকে অবস্থান সে দিকেই কিছুটা তফাতে স্থানীয় অধিবাসীদের গ্রাম। রাস্তা পেরিয়ে তারা ওপাশের বনে ঢোকে শুকনো কাঠ, ঘাস ইত্যাদি সংগ্রহের জন্য। কেউ কেউ চোরাশিকারের জন্যও ঢোকে। তবে ফুলচাদের ঘরটা গ্রামের মধ্যে নয়, রাস্তার ওপাশে ফরেস্ট অফিস থেকে বেশ খানিকটা তফাতে জঙ্গলের গা ঘেঁষে। সেখানেই ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার নীলেশ গিয়েছেন। চেনা রাস্তা তাঁর। রাস্তা পেরিয়ে বন্দুক কাঁধে নীলেশ রওনা হলেন সেদিকে। বিকাল হয়ে গেছে। রাস্তার পাশে জঙ্গলের ভিতর থেকে ভেসে আসছে নানান ধরনের পাখির ডাক। ফিঙে, ধনেশ, বুলবুলি, ম্যাগপাই নানান ধরনের পাখির ডাক। নীলেশ এ সব শব্দ চেনেন। শীতের বিকাল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সন্ধ্যা নামবে। তার আগে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি শুরু করেছ পাখির দল। সে জন্যই ডাকছে তারা। তবে বাঘটা কাছাকাছি নেই। থাকলে এমন সাবলীলভাবে ওরা ডাকত না। বনের ভাষা নীলেশ পাঠ করতে পারেন। প্রকৃতির শোভা উপভোগ করতে করতে আর বাঘটাকে মারার সম্ভাব্য পন্থার কথা ভাবতে ভাবতে মিনিট পনেরো হাঁটার পর নীলেশ পৌঁছে গেলেন ফুলচাঁদের ঘরের কাছে।
মাটির তৈরি একটা ঘর। কাঠের দরজা, মাথার ওপর ঘাসের ছাউনি। ঘরটার ঠিক পিছন থেকে কিছুটা তফাতেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। শাল, শিমুল বড় বড় সব গাছ বছর কয়েক আগে সেই খ্যাপা দাঁতালটাকে মারতে এসে মাঝবয়সি ফুলচাঁদের ঘরে এক রাত্রি কাটিয়েও ছিলেন নীলেশ। কিন্তু ঘরটার কাছে পৌঁছে নীলেশ দেখলেন, বাইরে থেকে ঘরে শিকল টানা। অর্থাৎ ফুলচাঁদ ঘরে নেই। ঘরের সামনে নীলেশ দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু মিনিট পাঁচেক সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর তাঁর মনে হল, ফিরে যাওয়াই ভালো। লোকটা নেশা করে। হয়তো সে এখন নেশা করে হাড়িয়া খানায় পড়ে আছে। কখন ফিরবে কে জানে? তার চেয়ে বরং তিনি পরদিন ভোরে আসবেন ফুলচাদের খোঁজে।
একথা ভেবে তিনি ফেরার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সে সময় ঘরের পিছনের জঙ্গল থেকে একসঙ্গে বেশ কিছু পাখি ডেকে উঠল! যেন তারা কিছু দেখেছে! নীলেশ সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে তাকালেন। হ্যাঁ, তাঁর অনুমানই ঠিক। তিনি দেখলেন জঙ্গল যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেখানে একটা শিমুল গাছের নীচে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ঘরটার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে গায়ে চাদর দেওয়া একজন লোক! সম্ভবত সে জঙ্গল থেকেই বেরিয়ে এসেছে। লোকটা পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার অবয়ব ও পরনের খাঁকি হাফ প্যান্ট দেখে তাকে চিনে ফেললেন তিনি। আরে ওই তো ফুলচাদ ওখানে! নীলেশ এগলেন সেদিকে।
নীলেশ তার কয়েক হাত তফাতে পৌঁছতেই তাঁর পায়ের শব্দ শুনে মৃদু চমকে উঠে তাঁর দিকে ফিরে দাঁড়াল ফুলচাঁদ বরাইক। নীলেশ তার উদ্দেশে হেসে বললেন, “আবার চলে এলাম, তুমি কেমন আছ?”
নীলেশের প্রশ্ন শুনে ফুলচাদ বলল, “বাঘ মারতে এসেছেন তো বাবু! আমি একটু আগেই আপনার কথাই ভাবছিলাম।”
নীলেশ জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, বাঘ মারতে সরকার থেকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আজই এলাম। তা তুমি আমার কথা হঠাৎ ভাবছিলে কেন?”
এ প্রশ্নের জবাবে নীলেশকে চমকে দিয়ে বলল, “আজই যে বাঘটা একটা লোককে মারল। আর তারপরই আপনার কথা মনে পড়ল।”
নীলেশ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, “কোথায়? কখন? রেঞ্জার কিছু বললেন না তো?”
ফুলচাঁদ বলল, “এখনও কেউ জানে না। একটা মদ্দা লোককে মেরেছে। এখান থেকে কিছু দূরে নদীর পাড়ে। মড়িটা এখনও সেখানে পড়ে আছে।”
‘মড়ি’ শব্দের অর্থ হল, বাঘের হাতে নিহত মানুষের দেহ বা বাঘে খাওয়া দেহ। যার আকর্ষণে বাঘ আবার সেখানে ফিরে আসে। শিকারির কাছে মড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। ফুলচাঁদ এরপর বলল, “বাবু যাবেন নাকি সেখানে। চলুন আমি পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি। লোকটার কোমর থেকে নীচের অংশটা বাঘটা ইতিমধ্যে খেয়েছে। অন্ধকার নামলে নিশ্চয়ই বাকিটা খাবার জন্য আসবে।”
এ অনেকটা আকস্মিকভাবে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপার। চিতাবাঘ এমনিতেই ধূর্ত প্রাণী। তার ওপর আবার নরখাদক হলে সে আরও ধূর্ত হয়ে ওঠে। সহজে ছাগলের টোপের কাছে সে আসতে চায় না। বুঝতে পারে ওটা ওর জন্য ফাঁদ পাতা হয়েছে।
তবে মড়ির অমোঘ টান সে এড়াতে পারে না। যতক্ষণ না খাবারটা শেষ হচ্ছে ততক্ষণ সেটা খাবার জন্য ফিরে আসে। তাই নীলেশ বললেন, “হ্যাঁ, সেখানে যাব। তবে যাওয়ার আগে রেঞ্জারসাহেবকে ব্যাপারটা জানিয়ে আসি? তাছাড়া বন্দুক থাকলেও টর্চ আনিনি। সেটাও নিয়ে আসব।”
ফুলচাদ বলল, “বাঘটাকে যদি মারতে হয় তবে ও কাজ করতে যাবেন না বাবু। গ্রামের কয়েকজন লোক ফরেস্ট অফিসে কাজ করে। কথাটা তারা জানতে পারলেই সে খবর তারা এখনই গ্রামের লোকদের জানিয়ে দেবে। যে গেছে সে তো আর বেঁচে ফিরবে না। কিন্তু গ্রামে খবরটা পৌঁছলেই সঙ্গে সঙ্গে লোকজন সব দল বেঁধে মড়িটাকে উদ্ধারের জন্য রওনা হবে। “বাঘটাকে আর আপনি এত সহজে মারতে পারবেন না। আর টর্চের দরকার নেই। দু-দিন আগেই পূর্ণিমা গেছে। আকাশে ফুটফুটে চাঁদের আলো আছে।”
ফুলচাঁদের কথা শুনে নীলেশের মনে হল তার কথার যুক্তি আছে। যে লোকটা নিহত হয়ছে তার পরিজনরা নিশ্চয়ই খবর পেয়ে ছুটবে দেহ উদ্ধারের জন্য। কোনো যুক্তি তারা মানবে না। তাছাড়া স্বয়ং রেঞ্জারসাহেবেরও নরখাদকটার প্রতি এত মায়া যে তার প্রাণরক্ষার জন্য তিনি নিজেও গ্রামবাসীদের কাছে কৌশলে খবরটা পৌঁছে দিতে পারেন। গ্রামবাসীরা তার চালাকি ধরতে পারবে না। এ সব কথা কয়েক মিনিট ভেবে নিয়ে নীলেশ শেষ পর্যন্ত বললেন, “আচ্ছা, চল তবে যাওয়া যাক।”
বন্দুকটা কাঁধ থেকে খুলে নিয়ে ফুলচাঁদের পিছন পিছন জঙ্গলে প্রবেশ করলেন নীলেশ। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল তারা। বেলা দ্রুত পড়ে আসছে। বেশ কিছুক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলার পর নদীর পাড়ে এসে পৌঁছল তারা দু’জন। তারপর নদীখাতের পাড় বরাবর একপাশে জঙ্গলকে রেখে হাঁটতে শুরু করল তারা। চলতে চলতে নীলেশ তাকে প্রশ্ন করল, “তুমি মড়িটার খোঁজ পেলে কীভাবে?”
ফুলচাঁদ জবাব দিল, “ওখানে লকড়ি নিতে গেছিলাম। তখনই দেখতে পেলাম মড়িটা ওখানে পড়ে আছে। ও লোকটাও লকড়ি নিতেই গেছিল। তারপর নালায় নেমেছিল মনে হয় মুখ-হাত ধোওয়ার জন্য। তখনই মনে হয় বাঘটা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পিছন থেকে ওকে ধরে।”
নদীখাতের পাড় বরাবর কিছুটা চলার পরই নীলেশ বুঝতে পারলেন জঙ্গলের ভিতর থেকে পাখির ডাক ক্রমশ কমে আসছে। এটা বাঘ থাকার ইঙ্গিত। জঙ্গলের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলতে লাগলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তিনি পৌঁছে গেলেন অকুস্থলে। জঙ্গল আর নদীখাতের মাঝখানে বেশ কিছু বড় বড় পাথরের চাঁই পড়ে আছে। হাত দশেক চওড়া একটা নালাও আছে সেখানে। গোড়ালি সমান জল তিরতির করে বইছে নালাটাতে। সেখানেই এক জায়গায় নীলেশকে এনে দাঁড় করাল ফুলচাঁদ। তারপর বলল, “এটাই সেই জায়গা। এই দেখুন নুড়ির ওপর রক্ত পড়ে আছে।”
ফুলচাঁদের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের জমির দিকে তাকাতেই নীলেশ দেখতে পেলেন সাদা নুড়ি পাথরের ওপর বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে জমাট বাঁধা কালচে রক্ত পড়ে আছে। কিন্তু তার চারপাশে তাকিয়ে তিনি মড়িটা দেখতে না পেয়ে বললেন, “মড়িটা কোথায় গেল?”
ফুলচাঁদও চারপাশে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, তাই তো! মড়িটা কোথায় গেল? ঠিক এখানেই পড়ে ছিল আধ খাওয়া দেহটা!”
আবারও ভালো করে চারপাশে তাকালেন নীলেশ। না, মড়িটা চোখে পড়ল না তাঁর। তবে ফুলচাঁদ যে মিথ্যা বলেনি তার প্রমাণ পাথরের ওপর পড়ে থাকা রক্ত চিহ্নগুলো। বাঘ শিকার ধরার পর অনেক সময় শিকারের দেহটাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায় ঠিকই। কিন্তু কোনো স্থানে বসে একবার শিকারের মাংস খাওয়া শুরু করলে সেই অর্ধভুক্ত দেহটা সে স্থান থেকে অন্য কোনো স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায় না। এ কথাটা ভেবে নিয়ে নীলেশ বললেন, “তবে মড়িটা কোথায় গেল বলো তো?”
ফুলচাঁদ তার চাদরের আড়াল থেকে একটা বোতল বার করল। তারপর নীলেশকে বাধা দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই সেটা ঢকঢক করে নিজের গলায় ঢেলে দিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই এটা শিয়ালদের দলের কাণ্ড। এমনকী ভল্লুকেরও হাতে পারে, তারা অনেক সময় মড়া খায়। তারাই মড়িটাকে কোথাও টেনে নিয়ে গেছে।”
তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে গেল। নীলেশ একটু হতাশভাবে বললেন, “তাহলে আর এখন কী করা যাবে। কাল ভোরবেলা এসে খুঁজে দেখব যদি মড়িটা কোথাও পাওয়া যায়? সন্ধ্যা নামবে এবার, চলে ফিরি।”
ফুলচাঁদ বলল, “না, বাবু ফেরার দরকার নেই। বাঘটা নিশ্চয়ই মড়ির খোঁজে এখানে আসবে। তখন আপনি ওকে গুলি করার সুযোগ পাবেন।”—এ কথা বলতে বলতে সে এগিয়ে গিয়ে একটা পাথরের ওপর চড়ে বসল।
নীলেশ তার উদ্দেশ্যে বললেন, “না, চলো ফিরি। মড়িটা যখন নেই তখন বাঘ আর এখানে আসবে কি না সেটা অনিশ্চিত। মড়ির গন্ধ ওরা দূর থেকেই টের পায়। আর সেটা যখন পাবে না…।”
নীলেশকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে ফুলচাদ ঈষৎ জড়ানো গলায় বলল, “আমার মন বলছে বাঘটা এখানে আসবে। তবে আপনার যদি যাওয়ার ইচ্ছে হয় তবে চলে যান। আমি এখানেই থাকব।”
নীলেশ এবার মৃদু ধমকের স্বরে বললেন, “তুমি এখানে থাকবে মানে! নেমে এসো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখনই সন্ধ্যা নামবে।”
তাঁর কথা শুনে ফুলচাঁদ আবারও জড়ানো গলায় বেশ দৃঢ়ভাবে বলল, “বললাম তো, আমি যাব না। আপনি যান। তবে এর জন্য পরে আপনাকে আফশোস করতে হবে।”
নীলেশ এরপর নরমে-গরমে বেশ কয়েকবার ফুলচাঁদকে নীচে নামার জন্য বললেন, কিন্তু সে তার জায়গা ছেড়ে নড়ল না। নীলেশ অনুমান করলেন ফুলচাদের নেশা হয়ে গেছে। তাই সে অমন আচরণ করছে। মুশকিলে পড়ে গেলেন নীলেশ। এবার সত্যি সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। ফিরলে তাঁকে এখনই ফিরতে হবে। কিন্তু এ লোকটাকে তো এভাবে এখানে একা ফেলে রাখা যায় না। বাঘটা যদি সত্যিই আবার মড়ির খোঁজে ফিরে আসে তবে ফুলচাদও মড়ি হয়ে যেতে পারে। নরখাদক বাঘ বলে কথা! এরপরও ফুলচাঁদকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একবার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন তিনি। তারপর একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ঠিক আছে আমিও এখানে থাকব। কিন্তু বসার জন্য তো একটা জুৎসই জায়গা খুঁজতে হবে। বাঘটা জঙ্গল থেকে বাইরে বেরলে যেখান থেকে গুলি চালানো যাবে।”
কথাটা কানে যেতেই ফুলচাদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে লাফ দিয়ে পাথরের ওপর থেকে নীচে নেমে পড়ল।
৩
জায়গাটা নির্বাচন করা হল মড়ির রক্ত যেখানে পড়েছিল তার থেকে হাত পঞ্চাশেক তফাতে এক মানুষ সমান একটা পাথরের আড়ালে, পাথরটার মাঝ বরাবর একটা ফাটল আছে। পাথরটার আড়ালে বসে ফাটল দিয়ে জঙ্গলটা, মড়ি যেখানে পড়েছিল সে জায়গা দেখা যায়। প্রয়োজনে সেই ফাটল দিয়ে গুলিও চালানো যাবে। তার আড়ালেই বসল তারা দু’জন। দ্রুত অন্ধকার নামতে শুরু করল চারপাশে।
প্রথমে নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল পিছনের–নদীখাত, সামনের নালা, জঙ্গল সবকিছু। অবশ্য সে অন্ধকার বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। জঙ্গলের মাথার উপর চাঁদ উঠতে শুরু করল। আবার ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করল সব কিছু। পূর্ণিমার চাঁদ না হলেও বেশ বড় চাঁদ। তার আলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। জঙ্গলের মধ্যেও বিন্দু বিন্দু আলো ফুটে উঠতে লাগল। জোনাকির আলো। অপূর্ব দৃশ্য। কেউ যেন বিন্দু বিন্দু হীরক কুচি ছুঁড়ে দিচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে। সেদিকে তাকিয়ে বন্দুক বাগিয়ে বসে রইলেন নীলেশ। তবে তাঁর পাশে বসে থাকা ফুলচাঁদের মুখ থেকে দেশি মদের কড়া গন্ধ যেন বড্ড বেশি করে নীলেশের নাকে এসে লাগল। চাদর মুড়ি দিয়ে নির্বিকার চিত্তে বসে আছে সে।
সময় এগিয়ে চলল। শিকারিদের কাছে অবশ্য এভাবে বসে থাকা নতুন কিছু নয়। অনেক সময় একটানা প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাও ওঁত পেতে বসে থাকতে হয় তাদের। তাই নীলেশেরও তেমন কোনো অসুবিধা হল না। রাত বেড়ে চলল। রাত সাতটা-আটটান’টা-দশটা…। রাত বারোটা নাগাদ বেশ ঠান্ডা অনুভূত হতে লাগল নীলেশের। গায়ে জ্যাকেট, মাথায় টুপি থাকলেও হাতের আঙুলগুলো যেন জমে যাচ্ছে। তিনি ফুলচাঁদের উদ্দেশ্যে বললেন, “রাত তো অনেক হল! তোমার বাঘ তো এল না!”
ফুলচাঁদ তাঁর কথার কোনো জবাব দিল না।
আরও এগিয়ে চলল সময়। আর তার সঙ্গে বেড়ে চলল ঠান্ডা। আর সেই ঠান্ডার কারণেই এরপর নীলেশের মনটা ফুলচাদের ওপর ক্ষিপ্ত হতে শুরু করল। তাঁর মনে হত লাগল এই মাতালের পাল্লায় পড়ে তিনি ভুলই করেছেন। কিন্তু ফুলচাঁদ নির্বিকার। চাদর মুড়ি দিয়ে সে জেগে আছে নাকি ঘুমাচ্ছে তাও বুঝতে পারছেন না নীলেশ। একসময় তিনি অসহিষ্ণুভাবে বলে উঠলেন, “মড়িও নেই, বাঘও নেই! আছে শুধু ঠান্ডা! কেন যে এই মাতালটার জন্য এখানে রয়ে গেলাম কে জানে!”
এবার তাঁর কথা শুনে ফুলচাঁদ নড়ে উঠে বলল, “আসবে। বাঘ আসবে। আমি যখন এখানে আছি তখন সে আসবে।”
নীলেশ বললেন, “ঘোড়ার ডিম আসবে। তুমি কি মড়ি নাকি? নেশা এখনও কাটেনি দেখছি!”
ফুলচাঁদ বলল, “তবে আমি মড়ি হই। ঠিক যেভাবে মড়িটা পড়েছিল সেভাবে পড়ে থাকি।” এ কথা বলে উঠে দাঁড়াল ফুলচাঁদ। তারপর পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে নীলিশকে অবাক করে দিয়ে মড়িটা যেখানে পড়েছিল সেখানে মাটির উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। নীলেশ তার উদ্দেশে হাঁক দিলেন, “ফুলচাঁদ কী করছ। উঠে এসো।”
কিন্তু ফুলচাঁদ কোনো সাড়া দিল না। নীলেশ অনুমান করলেন, কড়া মদ আর ঠান্ডাতে ফুলচাঁদ পুরো মাতাল হয়ে গেছে। সম্ভবত ভোরের আলো না ফুটলে তার নেশা কাটবে না। নিজের জায়গাতেই বসে নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য নিজেকেই দুষতে থাকলেন নীলেশ।
কিছুক্ষণের মধ্যে হঠাৎই একটা পচা গন্ধ এসে লাগল নীলেশের নাকে। প্রথমে হালকাভাবে তারপর স্পষ্টভাবে। নীলেশ ভাবলেন তবে কি মড়িটা কাছেই আছে? পাশে বসে থাকা ফুলচাঁদের গায়ের মদের গন্ধ আর বাতাস অন্যদিক থেকে প্রবাহিত হওয়ায় তা এতক্ষণ টের পাননি তিনি! এ ধারণাই নীলেশের মনে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল গন্ধর তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। আর তার সঙ্গে নীলেশের মনে হল বাঘটা তো এদিকে তবে আসতেই পারে! রাত তো এখনও শেষ হয়নি। আর এ কথাটা মনে হওয়া সঙ্গে সঙ্গে ফুলচাঁদের ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়লেন তিনি। খোলা আকাশের নীচে পড়ে আছে লোকটা। বাঘ জঙ্গল থেকে বেরলেই তো দেখতে পেয়ে যাবে ফুলচাদকে। একলাফে পৌঁছে যাবে তার কাছে। নীলেশ চাপা স্বরে হাঁক দিলেন ‘ফুলচাদ’ বলে। কিন্তু ফুলচাঁদ আর উঠল না!
গন্ধটা আরও তীব্র হতে শুরু করল। যেন খুব কাছেই কোথাও আছে মড়িটা! আর ও গন্ধের টানে যে কোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে বাঘটা! না, এখানে আর ফুলচাদকে ফেলে রাখা ঠিক হবে না। তাকে তুলে আনার জন্য উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
নীলেশ পাথরের আড়াল থেকে বেরতে যাচ্ছেন ঠিক সেই সময় জঙ্গলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল আর একজন! বিশাল একটা চিতাবাঘ! তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন নীলেশ। বাঘটাও জঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। চাঁদের আলো যেন চুঁইয়ে পড়ছে তার গা বেয়ে। জ্বল জ্বল করছে চোখ দুটো। তার চোখের দৃষ্টি মাটিতে পড়ে থাকা ফুলচাদের দিকে নিবদ্ধ। নীলেশের উপস্থিতি তার চোখ পড়ছে না।
বাঘটা এরপর গুঁড়ি মেরে এগোতে শুরু করল ফুলচাঁদের দিকে। হাঁটার ভঙ্গিটা একটু খোঁড়ানো। আর তা দেখে নীলেশ বুঝতে পারলেন এই সেই নরখাদক! আর দেরি করা যাবে না। বন্দুকটা উঁচিয়ে ধরে তিনি বাঘটার মাথা লক্ষ করে তাক করলেন! বাঘটা তখন ফুলচাঁদের বেশ কাছে চলে এসেছে, ট্রিগার টেনে দিলেন নীলেশ। কান ফাটানো শব্দে কেঁপে উঠল নদীর চর-বনভূমি। অব্যর্থ লক্ষ। গুলির আঘাতে বাঘটা আকাশের দিকে লাফিয়ে উঠল প্রথমে, তারপর মাটিতে পড়ে গড়াতে গড়াতে গিয়ে স্থির হল ফুলচাঁদের থেকে বেশ খানিকটা দূরে। বাঘটার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য প্রাণীটার দেহ লক্ষ করে আবারও একটা গুলি চালালেন নীলেশ। অভিজ্ঞ শিকারির গুলির আঘাতে আবারও কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল বাঘটার শরীর। কিছুক্ষণ বাঘটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর নীলেশ বুঝতে পারলেন ও বাঘ আর কোনোদিন জেগে উঠবে না। নিশ্চিন্ত হলেন নীলেশ। ফুলচাদের হুঁশ না ফিরলেও এবার আর কোনো সমস্যা নেই। নিজের জায়গাতেই বসে পড়লেন তিনি। এরপর কুয়াশা নামতে শুরু করল। নীলেশের চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল বাঘের মৃতদেহ আর ফুলচাদ। নীলেশ প্রতীক্ষা করতে লাগলেন ভোরের আলো ফোটার। তবে মড়ির গন্ধটা রয়েই গেল।
প্রকৃতির নিয়মেই ভোরের আলো ফুটল একসময়। যদিও কুয়াশা তখনও সম্পূর্ণ কাটেনি। আলো একটু বাড়তেই উঠে দাঁড়ালেন নীলেশ তারপর তিনি প্রথমে এগলেন বাঘটার দিকে। বাঘটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। অব্যর্থ লক্ষ তাঁর। তিনি দেখলেন দুটো গুলির একটা লেগেছে বাঘটার ঠিক কপালে, আর অন্যটা তার পাঁজর ভেঙে দিয়েছে। বাঘটাকে কিছুক্ষণ দেখার পর কুয়াশার আবরণ ঠেলে তিনি ফুলচাদের দিকে এগোলেন। সফলতার আনন্দে এখন ফুলচাঁদের ওপর নীলেশের কোনো ক্ষোভ নেই। লোকটা মাতাল হলেও তার কথা সত্যিই প্রমাণিত হয়েছে।
নীলেশ গিয়ে দাঁড়ালেন ফুলচাঁদ যেখানে সেখানে। আর তারপরই চমকে উঠলেন তিনি। আরে এ যে বাঘে খাওয়া একটা বাসি মড়ি। আর এরপর মড়িটার মুখের দিকে ভালো করে তাকাতেই নীলেশের হাত থেকে রাইফেল খসে পড়ার উপক্রম হল।
কুয়াশার আবরণ ভেদ করে ভোরের আলো এসে পড়েছে বাঘে খাওয়া লোকটার মুখের ওপর। ফুলচাদের মুখ! তার ঠোটের কোণে যেন একটা হাসি জেগে আছে। সে যেন নীলেশের উদ্দেশে বলছে—“কী বাবু, বলেছিলাম না আমি যখন এখানে আছি তখন বাঘটা আসবে।”
