কালপেঁচার ডাক
১
প্রায় এক ঘণ্টা সময় স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান মঞ্চে নানা ধরনের শব্দ, পশুপাখির ডাক নকল করে শোনানোর পর চিন্ময়বাবু শেষ যে ডাকটা ডাকলেন, তা গ্রামাঞ্চলে অতি পরিচিত প্রাণী শিয়ালের ডাক। এবং তাঁর এই ‘হুক্কাহুয়া’ ডাক এত নিখুঁত হল যে তাঁর এই ডাকের পরমুহূর্তেই স্কুলবাড়ির পিছনের জঙ্গল থেকে দিনের আলো থাকা সত্ত্বেও সত্যিকারের শিয়ালের দল প্রত্যুত্তর দিল, ‘হুয়া, হুয়া’! হাততালির ঝড় উঠল মঞ্চর সামনে। একজন গ্রামবাসী চিন্ময়বাবুর শব্দর খেলায় খুশি হয়ে একটা একশো টাকার নোট নিয়ে সেটা তুলে ধরল তাঁকে দেওয়ার জন্য। তা দেখে লোকটির উদ্দেশে চিন্ময় বললেন, ‘না না, টাকা দেবেন না। এই হরবোলার খেলা আমার পেশা নয়, নেশা। আমি একটা সরকারি চাকরি করি। ওই যে আপনাদের বিডিও সাহেব পরিতোষবাবু রয়েছেন, তিনি আমার বন্ধু, তাঁর আমন্ত্রণেই আমি এখানে এসেছি। আমার হরবোলা কণ্ঠস্বরের খেলা যে আপনাদের ভালো লেগেছে, সেটাই আমার পুরস্কার।’
এক কথাগুলি বলে মঞ্চ থেকে নেমে পড়লেন চিন্ময়বাবু। পরিতোষবাবুর সঙ্গে তাঁর বাসস্থানে যাবেন। কাছেই। আজ সকালের ট্রেনে কলকাতা থেকে বর্ধমানের এই গ্রামে এসে সেখানেই উঠেছেন তিনি। রাতেও সেখানে তিনি থাকবেন। দুই বাল্যবন্ধু মিলে সারারাত গল্প হবে। তারপর আগামীকাল সকালের ট্রেনে চিন্ময়বাবুর কলকাতা ফেরার কথা।
চিন্ময়বাবু স্টেজ থেকে নামতেই তাকে ঘিরে ধরল একদল ছোট ছেলে। তাদের বিস্ময়ের সীমা নেই হরবোলা শুনে। একটা উৎসাহী ছেলে শিশুসুলভভাবে চিন্ময়বাবুর উদ্দেশে বলল, “আমি একটা পাখির ডাক জানি। কাকের ডাক।” এই বলে সে ‘কা কা’ করে ডেকে উঠল। অন্য ছেলেরাও ‘কা কা’ করে ডাকতে লাগল। যদিও চিন্ময়বাবু বেশ মজা পেলেন ব্যাপারটায়, কিন্তু তিনি বিব্রত হচ্ছেন ভেবে হেড মাস্টারমশাই ছুটে এলেন। আর তা দেখে ছাত্রদের দল সরে গেল। পরিতোষবাবু কাছেই অতিথি আসনে বসেছিলেন। তিনিও এবার উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কুল কর্তৃপক্ষর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাঁরা দু’জন স্কুলের মাঠ পেরিয়ে রওনা হলেন রাস্তার দিকে। সেখানে পরিতোষের সরকারি গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। বিকাল পাঁচটা বাজে। শীতের দিন। আর কিছু সময়ের মধ্যেই সূর্য ডুবে ধীরে ধীরে অন্ধকার নামতে শুরু করবে। হাঁটতে হাঁটতে পরিতোষ তার বাল্যবন্ধুকে বললেন, “দারুণ অনুষ্ঠান করলি তুই। ভাগ্যিস ছেলেবেলার অভ্যাসটা ধরে রেখেছিলি। সবাই খুব তারিফ করলেন। আচ্ছা, সেইবার কলকাতায় তোর বাড়িতে গিয়ে বেশ কয়েকটি পেঁচার মূর্তি দেখেছিলাম। তুই কালপেঁচার ডাক জানিস? শুনেছিস কখনও? এখানে পাওয়া যায়। ও ডাক গ্রামের লোকরা খুব ভয় পায়।”
চিন্ময় বললেন, “না, কালপেঁচার নাম শুনেছি বটে। ওর একটা মূর্তিও আমার সংগ্রহ করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু সত্যিকারের কালপেঁচা আমি চোখে দেখিনি বা তার ডাকও শুনিনি।”
চিন্ময়বাবুর কথার জবাবে পরিতোষবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পরিতোষবাবুর মোবাইল বেজে ওঠাতে এ আলোচনা থেমে গেল। ফোন কলটা রিসিভ করে কয়েকটি কথা বলে নিয়ে পরিতোষ আক্ষেপের স্বরে চিন্ময়বাবুর উদ্দেশে বলেন, “এ চাকরি আমার আর ভালো লাগছে না। জীবনে কোনো স্বাধীনতা নেই। ডিএম সাহেব ফোন করে সদরে ডেকে পাঠালেন। আমাকে এখনই একবার বর্ধমান শহরে যেতে হবে। ফিরতে ফিরতে হয়তো রাত বারোটা বেজে যাবে। আমাকে ক্ষমা কর ভাই। ভেবেছিলাম সন্ধ্যা থেকে গল্প করতে বসব। তা আর হল না!”
চিন্ময়বাবু বন্ধুর কথা শুনে আপসেট হলেও একজন সরকারি কর্মী হিসেবে তিনি জানেন যে পরিতোষদের প্রশাসনিক চাকরিটা এমনই, যখন তখন ওপরমহল থেকে ডাক আসে। তাই তিনি বন্ধুর উদ্দেশে বললেন, “না, না, ক্ষমার কথা কেন বলছিস! এমন তো হতেই পারে। তুই শুধু আমাকে সাজেশন দে সন্ধেটা কীভাবে কাটানো যেতে পারে?”
পরিতোষ একটু ভেবে নিয়ে সামনের রাস্তার একদিক দেখিয়ে চিন্ময়বাবুকে বললেন, “আজ তো পূর্ণিমা। এই রাস্তার শেষ মাথায় প্রতি পূর্ণিমাতে একটা মেলা বা হাট বসে। গ্রামীণ মেলা। দুপুর থেকে শুরু হয়ে রাত আটটা পর্যন্ত চলে। রিকশায় যেতে পনেরো মিনিট মতো লাগে। তুই ঘুরে আসতে পারিস। মন্দ লাগবে না। আর মেলাতে যেতে না চাইলে আমার বাড়ি ফিরে টেলিভিশন দেখতে পারিস কিংবা বই পড়তে পারিস। কেয়ারটেকার তো বাড়িতেই আছে, কোনো অসুবিধা হবে না।”
পরিতোষের কথা শুনে চিন্ময় বললেন, “আমি তবে মেলাটা ঘুরে নিয়ে তোর বাড়ি ফিরছি।”
পরিতোষ বললেন, “হ্যাঁ, মেলাটাই দেখে আয়। এ জায়গার পরিবেশে খুব শান্ত। রাতেও বিপদের আশঙ্কা নেই। আমি যথাসম্ভব দ্রুত ফিরে আসার চেষ্টা করছি।”
কথা বলতে বলতেই পরিতোষের গাড়ির কাছে পৌঁছে গেলেন তাঁরা। চিন্ময়বাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পরিতোষ নিজের গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন জেলা সদরের দিকে।
২
পরিতোষ চলে যাওয়ার মিনিট তিনেকের মধ্যে চিন্ময়বাবু একটা পথ চলতি রিকশা পেয়ে তাতে চড়ে বসলেন। সূর্য ঢলার সঙ্গে সঙ্গেই ঠান্ডা নামতে শুরু করেছে। নিজের গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিলেন তিনি। রিকশা তাঁকে নিয়ে চলল মেলার মাঠের দিকে। স্কুলবাড়িকে পিছনে ফেলে একটু এগোতেই রাস্তা বেশ ফাঁকা হয়ে গেল।
দু’পাশ দেখতে দেখতে চললেন তিনি। তাঁর যাত্রাপথের দু’পাশে বড় বড় গাছ, আর সামান্য কিছু ঘরবাড়ি। কখনও বা তাদের ফাঁক গলে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ দেখা যাচ্ছে। ফসল কেটে নেওয়ার পর জনশূন্য মাঠ। কিছুটা পথ এগোনোর পর যাত্রাপথের একপাশে পুরনোদিনের বেশ বড় একটা বাড়ি চোখে পড়ল চিন্ময়বাবুর। বাড়িটার চারপাশে বড় বড় গাছের জঙ্গল। তাদের ডালপালার ফাঁক দিয়ে আসা দিনশেষের সূর্যালোকে বাড়িটাকে কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। সারাদিন এখানে-ওখানে খাবারের সন্ধানে ঘুরে ফিরে আসার পর বড় একটা কাকের দল জটলা করছে গাছগুলোর মাথায়। গাছগুলোর মাথাতেই সম্ভবত ওদের বাসা। চিন্ময়বাবু বাড়িটা দেখে কৌতূহলী হয়ে রিকশাচালক ছেলেটার কাছে জানতে চাইলেন, “এটা কার বাড়ি?”
ছেলেটা জবাব দিল, “তা জানি না বাবু। তবে লোকে এ বাড়িটাকে ‘পেঁচাবাড়ি’ বলে ডাকে। ওই দেখুন বাড়িটার মাথায় একটা পেঁচা বসানো আছে।”
চিন্ময়বাবু ছেলেটার কথা শুনে তাকিয়ে দেখলেন, সত্যিই বাড়িটার মাথার উপরের কার্নিশে একটা বেশ বড় পেঁচা বসানো আছে। এ ব্যাপারটা অবশ্য আশ্চর্যর কিছু নয়। পেঁচা হল মা লক্ষ্মীর বাহন। বর্ধমানে ধানের জেলা। ধান-মা লক্ষ্মী-পেঁচা এরা সব একসূত্রে গাঁথা। ফসল বা সমৃদ্ধি কামনাতে কেউ লক্ষ্মীদেবীর বাহনকে স্থান দিতেই পারেন নিজের বাড়ির মাথায়। রিকশা তারপর আগের মতোই চলতে লাগল। কিছু সময়ের মধ্যেই রাস্তায় লোকজনের সংখ্যা বাড়তে লাগল, চিন্ময়বাবুর কানে আসতে লাগল মেলার হই-হট্টগোলের শব্দ।
রিকশা থেকে চিন্ময়বাবু যখন মেলার মাঠে নামলেন, ঠিক তখনই সম্ভবত সূর্য ডুবল। একসঙ্গে অনেকগুলো জেনারেটর ঘটঘট শব্দ করে চলতে শুরু করল আর সঙ্গে সঙ্গে চট অথবা প্লাস্টিকের ত্রিপল দিয়ে তৈরি মেলার অস্থায়ী দোকানগুলিতে আলো জ্বলে উঠতে লাগল। বিশাল একটা মাঠ, তার মধ্যে বড় বড় গাছও আছে। আর তার মধ্যেই মেলাটা বসেছে। স্থানীয় মানুষরা এই মেলাকে ডাকেন ‘পূর্ণিমার হাট’ নামে। এ কথাটা মাইকে মেলার ঘোষকদের কথায় জানতে পারলেন চিন্ময়বাবু। ভরা সন্ধ্যায় জমজমাট পূর্ণিমার হাটে প্রবেশ করলেন তিনি। ব্যস্ত দোকান চারপাশে। মাটির হাঁড়ি-কড়াই থেকে শুরু করে সস্তার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান, জামাকাপড় থেকে শাকসবজি, ধানের বস্তা, এমনকী ছাগল-হাঁস-মুরগিও বিক্রি হচ্ছে মেলাতে। আর আছে অগুনতি খাবারের দোকান। গরম জিলিপি, শিঙাড়া বিক্রি হচ্ছে সেসব দোকানে। এক ঠোঙা জিলিপি কিনে খেতে খেতে দোকানগুলিতে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন তিনি। সময় এগিয়ে চলল। অন্ধকার নামল মাঠের বাইরে। বিরাট মাঠে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে বেড়ালেও তার কেনার মতো তেমন কিছু পেলেন না তিনি। মাঠের মধ্যে এক জায়গায় মাদারির খেলা দেখাচ্ছে। বাঁশের মাথায় দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা, ছোটখাটো ভোজবাজির খেলা। সেসব দেখতে লাগলেন চিন্ময়বাবু। প্রায় ঘণ্টাখানেক সে খেলা দেখলেন তিনি। খেলা দেখা যখন শেষ হল তখন চিন্ময়বাবু খেয়াল করলেন, ভিড় যেন এবার পাতলা হতে শুরু করেছে। রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে চিন্ময়বাবু বেশ অবাকই হলেন। মেলায় ঘুরতে ঘুরতে আর মাদারির খেলা দেখতে দেখতে কখন যেন ঘণ্টা দু-আড়াই সময় কেটে গিয়েছে। অবশ্য চিন্ময়বাবুর ফেরার তাড়া তেমন কিছু নেই। পরিতোষ তো আর বারোটার আগে ফিরবে না। চিন্ময়বাবু যদি পায়ে হেঁটেও ফেরেন তবে এ জায়গা থেকে পরিতোষবাবুর বাড়ি পৌঁছোতে তাঁর আধঘণ্টা লাগবে। তবে মেলা ভাঙার আগে বাকি দোকানগুলো একবার দেখে নেওয়ার জন্য হাঁটতে লাগলেন তিনি। একসময় তিনি মেলার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলেন। এ জায়গাতে ভিড় বেশি নেই। তার ওপর আবার মেলা তখন ভাঙতে শুরু করেছে। এক জায়গায় একটা লোক খাঁচাতে সাদা ইঁদুর, খরগোশ, গিনিপিগ এসব বিক্রি করছে। সে দোকানটা দেখার পর ফেরার জন্য পা বাড়াতে গিয়েও কিছুটা তফাতে একটা বড় গাছের নীচে মাটিতে বসা দোকানের দিকে হঠাৎই তাঁর চোখ আটকে গেল। সার সার কাঠের পেঁচা সাজানো রয়েছে একটা প্লাস্টিকের ওপর। তবে দোকানদার তার পসরা এবার গোটাতে শুরু করেছে। পেঁচাগুলোকে একটা একটা করে সে ব্যাগে ভরতে শুরু করেছে। লোকে যেমন গণেশ মূর্তি সংগ্রহ করে তেমনই পেঁচার মূর্তি সংগ্রহ করার শখ আছে চিন্ময়বাবুর, তাই তিনি এগিয়ে গিয়ে গাছের নীচে দোকানটার সামনে দাঁড়ালেন। একটা বড় কুপি জ্বলছে। তার আলোয় সাজানো আছে কাঠের তৈরি রং করা পেঁচার মূর্তি। এই কাঠের পেঁচা এই বর্ধমান জেলারই ‘নতুন গ্রাম’ নামের এক গ্রামে তৈরি হয়। সারা দেশে প্রসিদ্ধ এই কাঠের পেঁচা। অনেকেই এই পেঁচা দিয়ে ঘর সাজায়। চিন্ময়বাবুর নিজের সংগ্রহতেও এমন একটা পেঁচা আছে। সেটা অবশ্য কলকাতা থেকেই কেনা। তিনি পসরার দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। নতুন ধরনের কোনো পেঁচা আছে কি না! না তেমন কিছু চোখে পড়ল না তাঁর। দোকানি পেঁচাগুলো ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল, “আপনি পেঁচা নেবেন? ভাঙা হাটে শেষবেলায় অর্ধেক দামে দেব।”
দোকানদারের কথার সময়ই হঠাৎ চিন্ময়বাবুর পরিতোষের বলা কালপেঁচার কথা মনে পড়ে গেল। তিনি লোকটাকে বললেন, “তোমাদের এখানে নাকি ‘কালপেঁচা’ পাওয়া যায়? কালপেঁচার মূর্তি আছে তোমার কাছে?”
প্রশ্নটা শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল লোকটা। তারপর গম্ভীরভাবে জবাব দিল “কালপেঁচা খুব অশুভ। ও পেঁচা দেখলে লোকে মারা যায়। ডাক শুনলেও ক্ষতি হয়। কালপেঁচার মূর্তি কেউ বানায় না।”
লোকটা হয়তো এরপর ভাবল, এই বাবু মশকরা করছে তার সঙ্গে। পেঁচা কেনার খদ্দের বাবু নন। তাই সে এরপর চটপট পেঁচাগুলো ব্যাগে ভরে কুপি নিভিয়ে তার মালপত্র নিয়ে উঠে পড়ল। মেলার মাঠ এবার প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছে, একে একে আলোগুলো নিভতে শুরু করেছে। চিন্ময়বাবুও এবার ফেরার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু একটা কণ্ঠস্বর কানে গেল তাঁর—“আপনি কালপেঁচা দেখেছেন কখনও? তার ডাক শুনেছেন?”
চিন্ময়বাবু পিছনে তাকিয়ে দেখলেন একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর পিছনে। গাছের নীচে আবছা আলোতে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে লোকটাকে যুবকই মনে হয়। পরনে প্যান্ট-শার্টের ওপর সোয়েটার। মাথায়-কানে মাফলার জড়ানো। হাতে একটা বড় চটের ব্যাগ। নিশ্চয়ই লোকটা দোকানদারের সঙ্গে চিন্ময়বাবুর কথোপকথন শুনেছেন, তাই এই প্রশ্ন। চিন্ময় লোকটার প্রশ্নর জবাবে বললেন, “না, কালপেঁচার কথা শুনলেও তা আমি চোখে দেখিনি বা তার ডাক শুনিনি। আসলে আমি পেঁচার মূর্তি সংগ্রহ করি, তাই দোকানদারের কাছে জিজ্ঞেস করছিলাম।”
কথাটা শুনে লোকটা বললেন, “আমি কিন্তু আপনাকে কালপেঁচা দেখাতে পারি, ডাক শোনাতে পারি। আপনি যে পথে ফিরবেন সেই পথেই।”
চিন্ময় মৃদু বিস্মিতভাবে বললেন, “আমি কোন পথে ফিরব তা আপনি জানলেন কীভাবে?”
লোকটা যেন মৃদু হাসলেন। তারপর জবাব দিলেন, “আপনি আজ স্কুলে হরবোলার খেলা দেখিয়েছেন তো? বিডিও সাহেবের বাড়িতে এসে উঠেছেন। সেখানেই নিশ্চয়ই ফিরবেন? এখান থেকে একটাই তো পথ। আসলে গ্রামে বাইরে থেকে মানুষ এলে তার সম্বন্ধে কিছুক্ষণের মধ্যেই সারা গ্রাম জেনে যায়।”
লোকটার কথার জবাবে চিন্ময় হেসে বললেন, “হ্যাঁ, আমি সেই লোক। এখন সেখানেই ফিরব।”
লোকটা বললেন, “চলুন তবে এগোই আমরা। যেতে যেতে কথা হবে। আমার বাসস্থানও ওই পথেই।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই মেলার মাঠের বাইরে এসে উপস্থিত হলেন তাঁরা। মেলা ভেঙে গিয়েছে। বাইরেটাও বেশ ফাঁকা ফাঁকা হয়ে এসেছে। লোকটা চিন্ময়বাবুকে বললেন, “সামান্য তো রাস্তা। দেখছেন তো কী সুন্দর চাঁদের আলো ফুটেছে! হেঁটে যেতে নিশ্চই আপনার অসুবিধা হবে না? বেশ গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।”
সত্যিই মাথার ওপরের ফটফটে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। সম্ভবত একেই বলে ‘কাক জ্যোৎস্না’। পথ চলতে কোনো অসুবিধা হবে না চিন্ময়বাবুর। তাছাড়া হয়তো কালপেঁচা দেখানোর জন্য তাঁকে পায়ে হেঁটেই নিয়ে যেতে চাইছেন লোকটা। চিন্ময়বাবু বললেন, “চলুন, আমার হেঁটে যেতে আপত্তি নেই। কিন্তু আপনার নামটা আমার এখনও জানা হয়নি।”
লোকটা জবাব দিলেন, “আমার নাম সুবল সূত্রধর। আমি কিন্তু আসলে শহরের মানুষ। সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা একজন শিল্পী। এখন এখানেই থাকি। আমি যে বাড়িতে থাকি সেখানে অনেক পেঁচার মূর্তি আছে। বাড়ির ল্যান্ডলেডির একসময় আপনার মতো নানা ধরনের পেঁচার মূর্তি সংগ্রহের বাতিক ছিল। আমার নিজের তৈরি একটা কালপেঁচার মূর্তিও আছে সেখানে।”
সুবল সূত্রধরের কথা শুনে বেশ উৎসাহিত বোধ করে তার সঙ্গে ফেরার পথ ধরলেন চিন্ময়বাবু।
৩
জ্যোৎস্না রাতে পথ চলতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না চিন্ময়বাবুর। আগে আগে চলছেন লোকটা, তার দু’পা পিছনে চিন্ময়বাবু। পথ চলতে চলতে চিন্ময় লোকটার উদ্দেশে বললেন, “পেঁচা হল মা লক্ষ্মীর বাহন। অথচ, কালপেঁচার ব্যাপারটা নিয়ে এখানকার মানুষদের মনে যে কুসংস্কার আছে, তা ওই পেঁচা বিক্রেতার কথাতে বুঝলাম।”
চিন্ময়বাবুর কথার জবাবে সুবল বললেন, “লক্ষ্মীদেবীর মূর্তির সঙ্গে প্রথম পেঁচার মূর্তির দেখা মেলে কুষাণ যুগে। সে পেঁচা হল শ্বেতপেঁচা। লোকে বলে লক্ষ্মীপেঁচা। আর কালপেঁচার রং কালো হয়। কালো রং এমনিতেই অশুভর প্রতীক। এই গ্রাম কেন, নানা দেশে, নানা জায়গায় পেঁচা নিয়ে নানা কুসংস্কার আছে। যেমন উত্তর ভারতের অনেক জায়গায় লোকের বিশ্বাস, পেঁচা হল মৃত্যুর প্রতীক। তারা মৃত্যুর বার্তা বহন করে আনে। তা সে যে রঙের পেঁচাই হোক না কেন! দক্ষিণ ভারতের কিছু মানুষের বিশ্বাস, বাড়ির দাওয়াতে পেঁচা বসলে শিশুমৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। দেশ-বিদেশের বহু জায়গায় তো পেঁচাকে ‘প্রেতাত্মা’ বলেই মনে করা হয়।”
সুবল সূত্রধরের কথা শুনে চিন্ময়বাবুর মনে হল, এ লোকটা সত্যিই শিক্ষিত। নইলে কুষাণ যুগের পেঁচার ব্যাপারটা সে বলতে পারত না। চিন্ময়বাবু নিজেই জানতেন না ব্যাপারটা। পেঁচা নিয়ে টুকটাক নানা কথা বলতে বলতে হাঁটতে থাকলেন তাঁরা। সুবল সূত্রধরের বড় ব্যাগটার ভিতর থেকে মাঝে মাঝে কেমন যেন একটা খচমচ শব্দ আসছে। তা শুনে চিন্ময়বাবুর কেন জানি মনে হল, ছোটখাটো কোনো জীবন্ত প্রাণী আছে ওর মধ্যে। হয়তো-বা মেলা থেকে কেনা হাঁস-মুরগি হবে।
হাঁটতে হাঁটতে এক সময় রাস্তার পাশে সেই গাছে ঘেরা পুরানো বাড়িটার সামনে পৌঁছে গেলেন তাঁরা। চাঁদের আলোয় বাড়ির মাথায় পেঁচার মুর্তিটি স্পষ্ট জেগে আছে। বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে থামলেন লোকটা। তারপর চিন্ময়বাবুর উদ্দেশে বললেন, “আসুন। এই আমার বাসস্থান। বাড়ির মালকিনও খুশি হবেন আপনাকে দেখলে। কালপেঁচা দেখাব আপনাকে। তার ডাক শোনাব আপনাকে।” এই বলে লোকটা এগোলেন বাড়িটার দিকে।
ঘড়ি দেখলেন চিন্ময়বাবু। রাত সাড়ে আটটা বাজে। এ জায়গা থেকে স্কুলবাড়ি, পরিতোষের বাসস্থান খুব বেশি দূর নয়। তাঁর হাতে সময়ও আছে। তবুও এত রাতে হঠাৎ অপরিচিত কোনো ভদ্রমহিলার বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে কি না তা বুঝতে না পেরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন চিন্ময়বাবু। তাঁর পায়ের শব্দ থেমে যাওয়াতে লোকটা ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, “আসুন আসুন, সংকোচ করবেন না। দেখবেন, মালকিনের কত পেঁচার সংগ্রহ আছে। আসুন!”
লোকটার ঘাড় ফেরানোর মধ্যে কেমন যেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে বলে মনে হল চিন্ময়বাবুর। কিন্তু সেটা যে কী তিনি তা সেই মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারলেন না!
যাই হোক দ্বিধা কাটিয়ে এরপর তিনি এগোলেন সে বাড়ির দিকে। বড় গাছে ঘেরা বাড়িটার সামনে একফালি ফাঁকা জমি। তারপর পলেস্তরা খসা থামওলা বারান্দায় উঠতে হয়। বাড়ির ভিতর থেকে কোনো শব্দ বা আলো আসছে না। সুবল সূত্রধরের সঙ্গে চিন্ময়বাবু উঠে এলেন সেই বারান্দাতে। তার একপাশে সার সার বন্ধ ঘর। আধো অন্ধকার বারান্দা দিয়ে চিন্ময়বাবুকে নিয়ে এগোতে এগোতে লোকটা বললেন, “মালকিনের বাবা একসময় এ অঞ্চলের ছোটখাটো জমিদার ছিলেন। প্রচুর ধানজমি ছিল তাঁর। লক্ষ্মীরূপে অষ্টধাতুর পেঁচা মূর্তি পুজো হত সিংহাসনে। তখন লোকজন আর ঠাকুর-চাকরে এ বাড়ি গম গম করত।” এ কথা বলতে বলতে চিন্ময়বাবুকে নিয়ে দরজা টেনে একটা ঘরে প্রবেশ করলেন।
বৈঠকখানা ধরনের বেশ বড় একটা ঘর। চক মেলানো পাথরের। মাথার ওপর কড়ি-বরগার ছাদ থেকে একটা ঝুলন্ত আলো নেমে এসেছে। কাচের আধারে পলতেওলা তেলের বাতি। তার ঠিক নীচে বসার জন্য কয়েকটা চেয়ার রাখা। দেখেই বোঝা যায় পুরোনো আমলের জিনিস। এছাড়াও সাবেককালের একটু নিচু ধরনের গদি আটা বেশ বড় সিংহাসনের মতো আস ও রয়েছে দেওয়ালের একপাশে। তবে এ ঘরের যে জিনিসগুলো সবথেকে বেশি চিন্ময়বাবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করল তা হল চারপাশের দেওয়ালের গায়ে বসানো কাঠের তাক। বুক সমান উঁচু থেকে প্রায় ছাদ পর্যন্ত বসানো তাকগুলোয় রাখা আছে নানা আকারের, নানা ধরনের পেঁচার মূর্তি। তারা যেন চেয়ে আছে চিন্ময়বাবুর দিকে। চিন্ময়বাবুর বাড়িতে পেঁচার যে সংগ্রহ আছে তা এ সংগ্রহের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। সুবল সূত্রধর, চিন্ময়বাবুকে বললেন, “এইসব নানা জায়গা থেকে আমার মালকিন সংগ্রহ করে এনেছিলেন।”
চিন্ময়বাবু বললেন, “এ তো দেখছি অবিশ্বাস্য সংগ্রহ! এমন সংগ্রহ আমি আগে কখনও দেখিনি!”
সুবল সূত্রধরের সঙ্গে তিনি এগিয়ে গেলেন দেওয়ালের কাছে। সুবল তাঁকে বললেন, “এ দেওয়ালের সব পেঁচা এই বাংলার। আর অন্য পাশের দেওয়ালে অন্য নানা জায়গার পেঁচা।” লোকটা প্রথমে যে দেওয়ালের পেঁচাগুলো দেখাতে লাগলেন, বর্ধমানের কাঠের পেঁচা তো আছেই, তার সঙ্গে আছে বীরভূমের সিউড়ির গালার পেঁচা, বাঁকুড়ার ডোকরা পেঁচা, মুর্শিদাবাদের শোলার পেঁচা, কৃষ্ণনগরের মাটির, মেদিনীপুরের মোষের শিংয়ের, ঝাড়গ্রামের রেশমের, অযোধ্য পাহাড়ের পাথরের নানা ধরনের পেঁচা। প্রথম দেওয়ালটা দেখা শেষ হওয়ার পর যে পাশের দেওয়ালের গায়ে সিংহাসনটা রাখা আছে সেদিকের দেওয়ালের র্যাকগুলো দেখতে লাগলেন চিন্ময়বাবু। সে র্যাকের পেঁচাগুলোও তাকে চিনিয়ে দিতে লাগল লোকটা। এর কোনোটা নেপালের, কোনোটা বর্মার, কোনোটা থাইল্যান্ডের, এমনকী সুদূর আফ্রিকা থেকে আনানো একটা পেঁচা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন তিনি। একসময় তিনি লোকটাকে বললেন, “অবিশ্বাস্য সংগ্রহ আপনার মালকিনের। কিন্তু কালপেঁচা কোথায়?”
প্রশ্ন শুনে সুবল সূত্রধর নামের লোকটা বললেন, “আপনি এ ঘরে একটু অপেক্ষা করুন। আমি সেটা এ ঘরে নিয়ে আসছি।”
সেই সিংহাসনটা যেখানে আছে তার কিছুটা তফাতেই দেওয়ালের গায়ে একটা দরজা আছে। লোকটা তার হাতের ব্যাগটা প্রথমে ঘরের মেঝেতে নামিয়ে রাখল। তারপর চিন্ময়বাবুকে সে ঘরে একলা রেখে অন্তর্হিত হলেন সেই দরজা দিয়ে। চিন্ময়বাবু সে ঘরে ঘুরে ঘুরে দেওয়ালের গায়ে রাখা পেঁচার মূর্তিগুলো দেখতে লাগলেন।
কিছু সময়ের মধ্যেই সে ঘরে প্রবেশ করলেন সুবল। তিনি দু’হাতে জাপটে ধরে এনেছেন একটা বেশ বড় পেঁচার মূর্তি। ঘরে ঢুকে তিনি সাবধানে মূর্তিটাকে সেই সিংহাসনের পাশে নামিয়ে রেখে বললেন, “এই হল আমার তৈরি কালপেঁচা।”
চিন্ময়বাবু গিয়ে দাঁড়ালেন সেই মূর্তির সামনে। কাঠের তৈরি কালো রঙের পেঁচার মূর্তিটার উচ্চতা সাড়ে তিন ফুট হবে। মূর্তিটা প্রস্থের দিকে যেন একটু বেশি ছড়ানো, কাত করা পিপের মতো। পেঁচাটার ঠোঁট আরও ধারালো, নখরযুক্ত পা দুটো অত্যন্ত বলিষ্ঠ সাধারণ পেঁচাদের থেকে। তার কাঠের শরীরে বাটালি দিয়ে যে পালকগুলো আঁকা হয়েছে তাও যেন কেমন শক্ত রুক্ষ ধরনের। লক্ষ্মীপেঁচার মতো কোনো শান্ত-স্নিগ্ধ-লালিমা নেই সে মূর্তিতে, বরং যেন একটু ভীতির সঞ্চার হয় ও মূর্তি দেখলে। ওই বাঁকানো ঠোট, পায়ের নখগুলো জীবন্ত হয়ে উঠলে তা যে কোনো মানুষকে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। তবে মূর্তিটার চোখের জায়গা দুটো শূন্য। মুখোশের যেমন ছিদ্র থাকে তেমনই দুটো ছিদ্র রয়েছে পেঁচার চোখদুটোতে। চিন্ময়বাবু বেশ কিছুক্ষণ মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর মন্তব্য করলেন, “পেঁচার মূর্তিটা সুন্দর তবে ভয়ংকর।”
সুবল সূত্রধর মন্তব্য করলেন, “এ বাড়িতে এই মূর্তিটা বানানোর জন্যই মালকিন আমাকে এনেছিলেন। তবে এ মূর্তি কিন্তু পেঁচার নয়, পেচকীর। অর্থাৎ স্ত্রী পেঁচা। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে স্ত্রী পেঁচা, পুরুষ পেঁচার থেকে আকারে বড় হয়?”
চিন্ময়বাবু বললেন, “হ্যাঁ, তা শুনেছি। তবে এত বড় আর ভয়ংকর পেঁচার মূর্তি আর আমি দেখিনি!”
সুবল সূত্রধর হেসে বললেন, “এরপর আপনি কালপেঁচার ডাকও শুনতে পাবেন। আর সামান্য একটু সময় অপেক্ষা করুন।”
চিন্ময়বাবু জানতে চাইলেন, “আপনার গৃহকর্ত্রী কোথায়?”
সুবল সূত্রধর হেসে বললেন, “তিনিও কিছু সময়ের মধ্যেই এসে পড়বেন। আপনি চেয়ারে বসে একটু অপেক্ষা করুন।”
আবারও ঘড়ি দেখলেন চিন্ময়বাবু। এবার রাত ন-টা বাজে। তবে তিনি যখন এখানে এসেই পড়েছেন তখন আর একটু সময় থেকে গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আর কালপেঁচার ডাক শুনে ফিরবেন বলে মনস্থির করলেন। চিন্ময়বাবু ঘরের মাঝে রাখা একটা চেয়ারে বসলেন। তার কিছুটা তফাতে একটা চেয়ারে বসল সুবল। দীর্ঘক্ষণ ধরে ঘুরে বেড়ানোর ফলেই সম্ভবত চেয়ারে বসার পর একটু ক্লান্তিভাব অনুভব করলেন চিন্ময়বাবু। তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন মালকিনের আগমন আর কালপেঁচার ডাক শুনে ফেরার জন্য।
সত্যিই মনে হয় ক্লান্তি নেমে এসেছিল। চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন চোখের পাতা বুজে এসেছিল তাঁর। কিন্তু, হঠাৎই একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ণ শব্দ শুনলেন তিনি।
“হি-স্-স্, টর টর!”
শব্দটা শুনে চমকে উঠে চোখ মেললেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যেই আবারও যেন সেই শব্দটা হল, “হিস্ টর টর!”
চিন্ময়বাবু সোজা হয়ে বসে তাকালেন সুবল সূত্রধরের দিকে। লোকটা উঠে দাঁড়িয়েছেন। চিন্ময়বাবু তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি হেসে বলল, “এই হল কালপেঁচার ডাক। আর ওই যে আমার গৃহকর্ত্রীও এসে গিয়েছেন।”
এ কথা বলে তিনি আঙুল নির্দেশ করল ঘরের একপাশে কালপেঁচার মূর্তির পাশে রাখা সেই সিংহাসনের দিকে।
সেদিকে তাকিয়ে চিন্ময়বাবু দেখলেন এক ভদ্রমহিলা সেই সিংহাসনে বসে তাঁর দিকে চেয়ে আছেন। তাঁর গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণের। থলথলে পৃথুলা শরীর। গোলাকার হাঁড়ির মতো মুখমণ্ডলে ড্যাবডেবে চোখ, মাথার কেশদাম যেন ফোলানো পালকের মতো। তবে তিনি স্বর্ণালঙ্কার শোভিত। তাঁর দিকে তাকিয়েই চিন্ময়বাবুর মনে হল, মহিলার শরীরে কোথায় যেন একটা অসঙ্গতি আছে। চিন্ময়বাবু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন তার উদ্দেশে। তা দেখে ভদ্রমহিলা একটু নড়ে উঠে মাথা নাড়লেন। এবার তাঁর শরীরের অসঙ্গতিটা ধরা পড়ল চিন্ময়বাবুর চোখে। যে সিংহাসনে তিনি বসে আছেন তা বেশি উঁচু নয়। কিন্তু মহিলার পা দুটো মাটি স্পর্শ করছে না। তাঁর হাত-পা বেশ মোটাসোটা হলেও খর্বাকৃতির। অর্থাৎ ভদ্রমহিলা একজন বামন।
চিন্ময়বাবু তাঁকে নমস্কার করার পর মহিলা তাঁর উদ্দেশে ফ্যাসফেসে গলায় প্রশ্ন করলেন, “আমার পেঁচাদের কেমন দেখছেন?”
চিন্ময়বাবু জবাব দিলেন, “খুব ভালো। এমন সংগ্রহ আমি অন্য কারও বাড়িতে দেখিনি।”
তিনি যেন খুশি হলেন চিন্ময়বাবুর জবাব শুনে। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “পেঁচাদের দেখতে সুন্দর লাগে আপনার?”
চিন্ময়বাবু উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ। ভালো লাগে। লক্ষ্মীপেঁচা দেখতে তো অত্যন্ত সুন্দর। তুলোর বলের মতো কী ধবধবে সাদা রঙ!”
তার জবাব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভদ্রমহিলা তৃতীয় প্রশ্ন করলেন, “আর কালপেঁচা কেমন লাগে?”
চিন্ময়বাবু এবার একটু চুপ করে থেকে জবাব দিলেন, “কালপেঁচা তো আমি চোখে দেখিনি। তবে আপনার পাশে দাঁড়ানো এই কালপেঁচার মূর্তিটা বেশ ভয়ংকর।”
কথাটা শুনে যেন হাসলেন গৃহকর্ত্রী। কেমন যেন একটা অদ্ভুত হিস হিস ফ্যাসফেসে হাসি৷
তারপর তিনি সুবল সূত্রধরকে বললেন, “খাবার এনেছ খাবার? উনি আমাদের অতিথি। ওঁকে খাবার দাও। আর আমাদেরও দাও।”
গৃহকর্ত্রীর কথা শুনে চিন্ময়বাবু ভদ্রতা দেখিয়ে বললেন, “না, না আমার কোনো খাবারের দরকার নেই। আপনারা ব্যস্ত হবেন না।”
কিন্তু ভদ্রমহিলার কথা শোনার পর সুবল সূত্রধর এগিয়ে গেলেন সিংহাসনের কাছে সেখানে তাঁর থলে বা ব্যাগটা রাখা ছিল। যেটা তিনি মেলা থেকে সঙ্গে করে এনেছে। লোকটা ব্যাগ থেকে বার করলেন একটা খাঁচা। তার মধ্যে গাদাগাদি করে আটকানো আছে বেশ কিছু সাদা ইঁদুর। অমন ইঁদুর আজ মেলার একটা দোকানে বিক্রি হতে দেখেছেন চিন্ময়বাবু। তিনি অনুমান করলেন লোকটা সম্ভবত সে দোকান থেকেই ইঁদুরগুলো কিনেছেন। ইঁদুরসমেত খাঁচা দেখেই গৃহকর্ত্রীর চোখ দুটো কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি তাঁর লোককে বললেন, “দাও আমাদের অতিথিকে একটা ইঁদুর দাও।”
চিন্ময়বাবু কথাটা শুনে অবাক হয়ে বললেন, “ইঁদুর নিয়ে আমি কী করব!”
গৃহকর্ত্রী হেসে বললেন, “কী করবেন, দেখুন”–এই বলে তিনি ইশারা করলেন সুবল সূত্রধরকে। তাঁর ইঙ্গিত বুঝতে পেরে সুবল সূত্রধর খাঁচা থেকে একটা ইঁদুর বের করে ছুড়ে ফেললেন ইঁদুরটাকে। বেচারা ইঁদুরটা অকস্মাৎ মুক্তি পেয়ে ঘরের মেঝেতে ছোটাছুটি শুরু করল। আর তারপরই চিন্ময়বাবু তাঁর মাথার ওপরে একটা বাতাসের ঝাপটা অনুভব করলেন। একটা পেঁচা নেমে এল মেঝেতে। ক্ষিপ্রগতিতে নখ দিয়ে সে চেপে ধরল তার শিকার সেই সাদা ইঁদুরটাকে।
সুবল সূত্রধর এরপর দ্বিতীয় একটা ইঁদুর ছুড়লেন মাটিতে। চিন্ময়বাবু এবার স্পষ্ট দেখলেন, র্যাকে রাখা কৃষ্ণনগরের মাটির পেঁচাটা প্রথমে একবার কেঁপে উঠল। তারপর মেঝেতে নেমে ছোঁ মেরে তুলে নিলে ইঁদুরটাকে! সুবল সূত্রধর এরপর একইভাবে মেঝেতে ছুঁড়তে লাগলেন একটার পর একটা ইঁদুর। আর বিস্মিত চিন্ময়বাবু দেখলেন দেওয়ালের গা থেকে জীবন্ত হয়ে মাটিতে শিকার করতে নেমে আসছে একের পর এক পেঁচা—গালার পেঁচা, শোলার পেঁচা, আফ্রিকার পেঁচা। নিরীহ ইঁদুরগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে মুখে পুরছে তারা। আর সে দৃশ্য যেন মহা আনন্দে চারপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে নিষ্ঠুর আনন্দে প্রত্যক্ষ করছে সিংহাসনে বসা গৃহকর্ত্রী আর সুবল সূত্রধর। তাদের দু’জনের ঘাড় ফেরানো দেখে এবার আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন চিন্ময়বাবু। তাঁরা দু’জন কোনো কোনো সময় একদম তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘাড় ফেরাচ্ছেন, ঠিক যেমন পেঁচারা ঘাড় ফেরায়! চিন্ময়বাবু বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি কোনো স্বপ্ন দেখছেন কি না! নইলে এমন দৃশ্য কীভাবে সম্ভব! এক সময় খাঁচার শেষ ইঁদুরটাকেও ছেড়ে দিলেন লোকটা। তাক থেকে সব পেঁচাই তখন মেঝেতে নেমে এসেছে। শেষ ইঁদুরটাকে নিয়ে কয়েকটা পেঁচার মধ্যে টানাটানি শুরু হল। এতগুলো পেঁচার তুলনায় ইঁদুরের সংখ্যা নগণ্যই ছিল।
গৃহকর্ত্রী এবার তা দেখে বলে উঠলেন, “সব ইঁদুর শেষ হয়ে গেল! কিন্তু ওদের তো খিদে মিটল না। আর আমিই বা কী খাব?”
সুবল সুত্রধর খাঁচাটা মাটিতে নামিয়ে নব্বই ডিগ্রি ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকালেন চিন্ময়বাবুর দিকে। তারপর তাঁর মালকিনের উদ্দেশে বললেন, “খাবার তো আমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে। এত বড় একটা ইঁদুর আমাদের সবারই খিদে মেটাতে পারবে।”
ইঁদুর কাকে বলছেন লোকটা? তিনি ঘুমিয়ে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছেন কি না তা বোঝার জন্য চাদরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে সামনে তাকিয়ে, সুবল সূত্রধরকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সুবল সুত্রধর কই! তার জায়গায় বসে আছে একটা পেঁচা। অন্য পেঁচাগুলোও ঘরের নানা প্রান্ত থেকে ঘাড় ফিরিয়ে চিন্ময়বাবুর দিকে তাকিয়ে। যেন কোনো সংকেতের জন্য প্রতীক্ষা করছে তারা। আর এরপরই ঘর কাঁপিয়ে একটা তীব্র শব্দ হল। হি-স-স-টর্-টর্। কালপেঁচার ডাক। সিংহাসন থেকে নামলেন গৃহকর্ত্রী—বিশাল আকৃতির একটা পেঁচা। কালপেঁচা! ঘোর কৃষ্ণবর্ণ পালকে ঢাকা তার শরীর। বিরাট বাঁকানো ঠোটে যেন জেগে আছে আদিম জিঘাংসা। তার চোখ দুটো যেন আগুনের মতো জ্বলছে। তার পা দুটো খর্বাকৃতির হলেও সবল নখরযুক্ত। যা দিয়ে সে শিকার ধরে। তাকে থাবা বলাই ভালো।
সেই নখরযুক্ত পায়ের আঘাতে মেঝেতে খটখট শব্দ তুলে সেই বিশাল কালপেঁচা এবার হেলেদুলে এগোতে শুরু করল চিন্ময়বাবুর দিকে। ঘরের অন্য পেঁচাগুলিও তাকে অনুসরণ করল। আতঙ্কিত চিন্ময়বাবু এবার বুঝতে পারলেন তিনি যা দেখছেন, তা সত্যি হোক বা মিথ্যা হোক, এখানে আর তাঁর থাকা চলবে না। তিনি দ্রুত পিছন ফিরে ছুটলেন দরজার দিকে। তিনি বারান্দায় বেরিয়ে এলেন ঠিকই, কিন্তু পেঁচার দল এবার তার পিছনে উড়ে আসতে শুরু করল। তিনি যখন বারান্দা থেকে বাড়ির সামনের চন্দ্রালোকিত জমিতে নামলেন তখন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল পেঁচার দল। চিন্ময়বাবু যেদিকেই পা বাড়াতে যান তারা এসে ডানার ঝাপট মারে। একটা পেঁচার নখের আঘাতে ছিঁড়ে গেল চিন্ময়বাবুর গায়ের চাদরটা। কিছুতেই যেন তারা ফিরে যেতে দেবে না তাঁকে। তিনি শুনতে পেলেন ঘর ছেড়ে বারান্দা বেয়ে এবার এগিয়ে আসছে সেই খটখট শব্দ! কালপেঁচার নখরযুক্ত পায়ের শব্দ! চারপাশে তাকিয়ে চিন্ময়বাবু বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন তাঁকে বাঁচানোর জন্য চারপাশে কেউ আছে কি না? না, কোনো লোক নেই। বড় বড় গাছ শুধু নিঝুম দাঁড়িয়ে আছে চারপাশে।
বারান্দা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল সেই কালপেঁচা বা পেচকী। উড়ে এসে চিন্ময়বাবুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে ফাঁদে পড়া শিকারকে দেখে সে শেষবারের জন্য উল্লাসধ্বনি করে উঠল, ‘টর-টর-টর হিসস!”
ঠিক সেই মুহূর্তে গাছগুলির দিকে তাকিয়ে বাঁচার জন্য একটা বুদ্ধি খেলে গেল চিন্ময়বাবুর মাথায়। গাছগুলির মাথার দিকে তাকিয়ে হরবোলা জানা চিন্ময়বাবু ডাকতে শুরু করলেন ‘কা কা’ বলে। তাঁর কণ্ঠ থেকে বেরোতে লাগল কাকের ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর। আর সেই শব্দ শুনে ডানা মেলতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কালপেঁচা। চিন্ময়বাবু বারকয়েক ডাক দেওয়ার পর কাকের দলও ঘুম ভেঙে উঠে প্রথমে ডাকতে শুরু করল। তারপর গাছ ছেড়ে ওড়াউড়ি শুরু করল চন্দ্রালোকিত আকাশে। স্বচ্ছ জ্যোৎস্নার আলোতে কাক আর পেঁচারা দেখতে পেল নিজেদের চিরশত্রুদের। কাকের দল নীচে নামতে শুরু করল। চিন্ময়বাবু ডেকে চলেছেন “কা কা” স্বরে। মুহূর্তের মধ্যেই এরপর যেন খেলা ঘুরে গেল অন্য দিকে। চিন্ময়বাবুকে ঘিরে রাখা পেঁচার দল তাঁকে ছেড়ে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাকেদের ওপর। চিন্ময়বাবুর চারপাশে উড়তে লাগল কাক আর পেঁচার পালক। আর এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েই চিন্ময়বাবু ছুটতে শুরু করলেন রাস্তার দিকে। শেষবারের জন্য তাঁর কানে এল কালপেঁচার হিংস্র ভয়ংকর ডাক—“হিস্-টর-টর!” কিছুটা ছুটে চলার পরই একটা গাড়ির হেডলাইটের আলো এগিয়ে আসতে দেখলেন তিনি। গাড়ি এসে থামল তার সামনে। বিডিও সাহেবের গাড়ি। পরিতোষ একটু আগেই ফিরে এসেছেন তাঁর কাজ আগে মিটে যাওয়ায়। চিন্ময়বাবু বাড়িতে না ফেরায় তিনি খুঁজতে বেরিয়েছেন তাকে।
পরদিন আলো ঝলমল ভোরে পরিতোষের বাসা থেকে তাঁর গাড়িতে রেলস্টেশন যাবেন বলে বাইরে বেরোলেন তাঁরা দু’জন। তবে রেলস্টেশন যাওয়ার আগে তাঁরা দু’জন গত রাতের বাড়িটায় যাবেন বলে ঠিক করেছেন। চিন্ময়বাবু ফেরার আগে সে বাড়িতে গিয়ে একবার দেখে যেতে চান যে, সে বাড়িতে সত্যিই কিছু আছে, না কি পুরো ব্যাপারটাই হ্যালুসিনেশন ছিল? তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম ছিল! চিন্ময়বাবু গত রাতে বন্ধুর বাসায় ফেরার পর ঘটনাটা পরিতোষকে জানিয়েছেন। পরিতোষবাবু ইতিপূর্বে শুনেছেন যে এখানে রাতে নাকি কালপেঁচার ডাক শোনা যায় ও গ্রামের মানুষ সে ডাককে অশুভ মনে করে। ভয় পায় ৷ তবে এসব অশুভ ব্যাপারে বা ভূত-প্রেত-আত্মার ব্যাপারে কোনো বিশ্বাস নেই তাঁর। চিন্ময়বাবুর বলা ঘটনা শুনে তিনিও বেশ আশ্চর্য বোধ করেছেন।
বাড়িটা দেখার জন্য তাঁরও বেশ আগ্রহ বোধ হচ্ছে। দুই বন্ধুকে নিয়ে পরিতোষবাবুর ড্রাইভার এগিয়ে চলল বাড়িটার দিকে।
সে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছোতেই আকাশে অনেক কাকের ওড়াউড়ি দেখতে পেলেন তাঁরা। বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে তাঁরা তিনজন যখন নামলেন তখন কাকের চিৎকারে তাঁদের কান ফেটে যাবার উপক্রম হল। গাছগুলির মাথায়, বাড়িটার কার্নিসে ডেকে চলেছে কাকের দল। যেন এ অঞ্চলের সব কাক এসে আজ জড়ো হয়েছে এখানে। এর কারণ অবশ্য বাড়িটার বারান্দার সামনে সেই একচিলতে ফাঁকা জমির সামনে গিয়েই বুঝতে পারলেন চিন্ময়বাবু। চারপাশে ছড়িয়ে আছে কাকের পালক আর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া কাকদের দেহ। রাত্রিবেলা নখরযুক্ত পেচকবাহিনীর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনি কাকের দল। কাকও মানুষের মতোই সমাজবদ্ধ জীব। ভোরের আলো ফুটলে ব্যাপারটা কাকসমাজে ছড়িয়ে পড়তেই সারা রাজ্যের কাক এসে জড়ো হয়েছে এখানে। চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে এই হত্যাকাণ্ডের।
চিন্ময়বাবুরা উঠে পড়লেন বারান্দাতে। ধুলোমাখা বারান্দা পেরিয়ে গিয়ে তাঁরা প্রবেশ করলেন গতকালের ঘরটাতে। ধুলো ধূসরিত ঘর। ভাঙাচোরা চেয়ার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ঘরের মেঝেতে। দেওয়ালের গায়ে বসানো র্যাকগুলিও খসে পড়েছে। অথবা খসে পড়ার অপেক্ষাতে দেওয়ালের গায়ে লম্বাভাবে ঝুলছে। আর তাদের নীচে মেঝেতে পড়ে আছে টুকরো টুকরো হয়ে ভাঙা নানা ধরনের পেঁচার মুর্তি। সেই সিংহাসনটাকেও একই জায়গাতে দেখতে পেলেন চিন্ময়বাবু। তবে কাঠের তৈরি সেই কালপেঁচার মূর্তিটা এখন পাশে নয়, সিংহাসনের ওপরই হেলে পড়ে আছে। সবই ধুলোময়। মাকড়সা জাল বুনেছে সেই সিংহাসন আর মূর্তিটাকে ঘিরে।
গাড়ির ড্রাইভার স্থানীয় মানুষ। দিনের আলোয় ঘরটা ভালো করে দেখার পর পরিতোষবাবু সে লোকটাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এ বাড়ির ব্যাপারে কিছু জানো?”
লোকটা বলল, “গ্রামের লোকেদের মুখে এ বাড়ি সম্পর্কে একটা গল্প ঘুরে বেড়ায়। তবে তার কতটা সত্যি তা জানি না। গ্রামের লোকরা এড়িয়ে চলে এ বাড়িটাকে।”
চিন্ময়বাবু প্রশ্ন করলেন, “কী গল্প?”
লোকটা বলতে শুরু করল, “বহু বছর আগে এ বাড়িতে বাস করতেন এক ধনী লোক। প্রচুর জমিজিরাত ছিল তার। লোকটার একটা মেয়ে ছিল সে খুব কুরূপা। অনেকটা কালো পেঁচার মতো দেখতে। বামন ছিল সে। তার ছিল পেঁচার মূর্তি জমানোর শখ। বাবা মারা যাবার পর এ বাড়িতে একাই থাকত মেয়েটা। মেয়েটার সঙ্গে গ্রামবাসীরা মিশত না। হয়তো-বা মাঝবয়সি মেয়েটার কুরূপের জন্যই। তাছাড়া পেঁচা নিয়ে নানা সংস্কার আছে গ্রামের মানুষের মধ্যে। এ বাড়ি ভর্তি ছিল পেঁচার মূর্তিতে। একদিন একজন লোক এসে উপস্থিত হল এ বাড়িতে। শোনা যায় মেয়েটাই নাকি এ বাড়িতে তাকে ডেকে এনেছিল ‘কালপেঁচার’ মূর্তি বানানোর জন্য। যাই হোক সে লোক এ বাড়িতে আসার কিছুদিনের মধ্যেই এ বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় লোকটার মৃতদেহ। এ বাড়িতে একটা দামি অষ্টধাতুর পেঁচার মূর্তি ছিল। কেউ কেউ মনে করে, ওই অষ্টধাতুর পেঁচার মূর্তির লোভেই কেউ বা কারা মেয়েটা আর লোকটাকে খুন করে যায়। তবে সেই মেয়েটার দেহ কিন্তু এ বাড়িতে পাওয়া যায়নি। হয়তো তার মৃতদেহ লোপাট করে ফেলেছিল খুনির দল। আবার কেউ কেউ বলে যে ওই মেয়েটা নাকি কালপেঁচা হয়ে গিয়েছে অথবা নিজেই কালপেঁচা ছিল, তার মূর্তি বানানোর পর সে নিজেই না কি খুন করে মূর্তি তৈরি করা লোকটাকে। তার মৃতদেহের গায়ে যে ক্ষতচিহ্নগুলো ছিল তা নাকি আসলে কালপেঁচার ঠোঁট আর নখের আঘাত। এ বাড়ি থেকে রাতে না কি এক অদ্ভুত ডাক শোনা যায়। লোকে বলে কালপেঁচার ডাক। সে ডাক শুনলে ক্ষতি হয়।” একটানা কথা বলে থামল লোকটা। পরিতোষবাবু তাকে বললেন, “হ্যাঁ আমি শুনেছি এ গ্রামে কালপেঁচার ডাক শোনা যায়, লোকে সে ডাকে ভয় পায়। আমার এই বন্ধুকে সে কথা আমি বলেওছিলাম।”
ড্রাইভার লোকটা যা বলল, তার সঙ্গে গত রাতে শোনা ও দেখার মধ্যে অনেকটাই যোগসূত্র খুঁজে পেলেন চিন্ময়বাবু। ঘর ছেড়ে বেরোনোর আগে সেই কালপেঁচার মূর্তিটাকে শেষ একবার ভালো করে দেখার জন্য সেই সিংহাসনের দিকে এগোলেন চিন্ময়বাবু। কাল রাতে যাই ঘটুক না কেন দিনের আলোতে আর ভয় লাগল না তাঁর। বন্ধু পরিতোষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন মূর্তিটার সামনে। সিংহাসনের ওপর কাত হয়ে যেন বসে আছে ধুলোমাখা ভয়ংকর মূর্তিটা। এরপর হঠাৎই যেন মূর্তির ভিতর থেকে কীসের একটা শব্দ শুনতে পেলেন তাঁরা। একটা খচমচ শব্দ। চিন্ময়বাবু সাহসে ভর করে মাটিতে পড়ে থাকা একটা আসবাব ভাঙা কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে একটু জোরেই আঘাত করলেন মূর্তিটার গায়ে। সেই আঘাতে পচে যাওয়া পুরোনো কাঠের মূর্তিটা লম্বালম্বিভাবে ভেঙে গেল। আর চিন্ময়বাবুদের চমকে দিয়ে সেই ফাঁপা কাঠের মূর্তির ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে মেঝেতে লাফিয়ে নামল কালো রঙের একটা পেঁচা। চিন্ময়বাবুর গত রাতের দেখা পেঁচাটার মতো বিশাল না হলেও এ পেঁচার আকারও কম নয়। এত বড় জীবন্ত পেঁচা এর আগে তাঁরা কেউ দেখেননি।
ঘরের মেঝেতে বসে পেঁচাটা চারদিকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল। দিনের আলোতে পেঁচা তেমন চোখে দেখে না। চিন্ময়বাবুর মনে হল, এ পেঁচাটাও যেন এখন ভালো দেখতে পাচ্ছে না। পেঁচাটার দিকে তাকিয়ে পরিতোষবাবু বন্ধুকে প্রশ্ন করলেন, “তুই কাল রাতে এই পেঁচাটাকেই দেখিসনি তো?” কাছ থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়ায় এবার ভয় পেয়ে গেল পেঁচাটা। চিন্ময়বাবু কিছু জবাব দেওয়ার আগেই পেঁচাটা অন্ধর মতো উড়তে শুরু করল। তারপর এ দেওয়াল ও দেওয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে হঠাৎই দরজা দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। আর এরপরই চিন্ময়বাবুদের কানে বাইরে থেকে ভেসে এল কাকদের সম্মিলিত চিৎকার।
তাঁরা তিনজনও সে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। বাইরের বারান্দা দিয়ে একটু এগোতেই তাঁরা দেখলেন সামনের সেই এক চিলতে জমিতে দিনের আলোতে সেই অন্ধ পেঁচাটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে অগুনতি কাকের দল। রাতের অন্ধকারে সঙ্গীদের হত্যাকাণ্ডের বদলা এবার দিনের আলোয় নেবে তারা। কাকদের আক্রমণে কালপেঁচার কালো পালক উড়ছে বাতাসে।
কাকদের আক্রমণ এড়াতে কোনোরকমে সে জায়গার পাশ কাটিয়ে তাঁরা তিন জন ছুটে গিয়ে উঠলেন গাড়িটাতে।
তারপর সে জায়গা ছেড়ে রওনা হওয়ার আগে কাকদের কোলাহলমুখর বাড়িটার দিকে শেষবারের জন্য পিছন ফিরে তাকালেন চিন্ময়বাবু। আর ওমনি তাঁর চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল সেই দৃশ্য—সিংহাসন ছেড়ে তাঁর দিকে হেলতে দুলতে এগিয়ে আসছে সেই কদাকার মহিলা। একটা বিরাট বড় হিংস্র কালপেঁচা।
