ভরসা – অভীক সরকার

ভরসা

তিনি এসেছেন।

হ্যাঁ, তিনিই। যাঁর দু’দিনের অদর্শনে আমার হৃদয়ে বৈরাগ্য উৎপন্ন হয়, যাঁর সঙ্গে দু’ঘণ্টা অন্তর একবার কথা না বললে জীবনে অনাসক্তি আসে, যাঁকে বুকে জড়িয়ে দিনে অন্তত দুইবার না চটকালে এ নশ্বর পৃথিবী সাহারার মরুভূমিসম শূন্য লাগে, দীর্ঘ দু’সপ্তাহ কলকাতায় ছুটি কাটিয়ে তিনি আজ এই অধমের ঘর আলো করে ফিরে এসেছেন।

এসেই খানিকক্ষণ খুঁ খুঁ হল। উনি কবে “অ্যাকদম ফাইনালি, সবকিছু নিয়ে” কলকাতা ফিরে যাবেন তার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হল। যায় আমি কেন কলকাতায় চাকরি পাচ্ছি না, এবং কী কী করলে আমি চাকরি পেতে পারি সে নিয়ে একটা দীর্ঘ উচ্চস্তরীয় আলোচনাচক্রও হয়ে গেল ট্যাক্সি করে বাড়ি আসতে আসতে। এর আক্ষেপ মেহমতে ভারতবর্ষের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা তোয়ের হয়েও কিছু বেঁচে থাকে।

তা বাড়িতে ফিরে সেসব সুগম্ভীর আলোচনা সমাপ্তে তিনি আমার কোল ঘেঁষে প্রথমে বললেন, “জানো, এবারে আমি মামাবাড়ি গিয়ে কী শিখেছি?”

—কী শিখেছ মা?

—কিচেন নাইফ দিয়ে বাটার কাটতে শিখেছি। শ্রেয়াদিদির সঙ্গে শুধু খেলছি দেখে মা বলল, শুধু খেললে হবে? কিছু সোমসারের কাজ শেখ। দিমা তাই শুনে আমাকে বাটার কাটতে শিখিয়েছে। গুড জব, না বাবা?

দ্রুত একমত হতে বাধ্য হলাম, না হয়ে উপায় কী? যদিও “মাখনের মধ্যে দিয়ে ছুরি চালানোর মতোই সহজ” বলে কোনো উপমার কথা মনে পড়ল বটে, খুব সম্ভবত বাংলা ভাষাতেই, কিন্তু সেসব স্রেফ কুচক্রী প্রতিক্রিয়াশীলদের ষড়যন্ত্র বলে এড়িয়ে গেলাম।

—আচ্ছা। আর কী কী গিফট পেলি এবার?”

মনে হল উজ্জ্বল চোখদুটোতে হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠল, “দেখবে কী পেয়েছি? দাঁড়াও আনছি, তুমি অবাক হয়ে যাবে, জানো!

এরপর তিনি একেরপর এক “স্বাভাবিকভাবেই-প্রাপ্য-গিফট-কারণ-আমি-ছোট”গুলি বার করে আনতে থাকেন এবং আমি অবাক হতে হতে ক্রমশ বোধশক্তি হারিয়ে ফেলি…

তিনটে মেক আপ সেট, বাচ্চাদের গলার হারের সেট, আইলাইনার, আই শ্যাডো, লিপস্টিক, রুজ, ফাউন্ডেশন, নেলআর্ট সেট, নেলপলিশ রিমুভার ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি! চকচকে টিপের পাতা’ই তিনটে।

দেখে গা’টা চিড়বিড় করে জ্বলতে থাকে। বলি কলকাতার মানুষগুলোর কি বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে, অ্যাঁ? সাত বছরের শিশুকে এই ধরণের সাজুত্তি করে তোলার কি হিংস্র প্রয়াস? বলি কয়েকটা বই দিতে পারলেন না? সাজগোজ করে আমার সাত বছরের মেয়ে কি বিশ্বসুন্দরী হবে, অ্যাঁ? এই বয়সে কোনটা প্রায়োরিটি হওয়া উচিত?

মনের রাগ মনেই চেপে জিজ্ঞেস করি, “এসব কে দিয়েছে রে?” (ফোন করে শালা যা খিস্তাব না!)

অচঞ্চল উত্তর আসে, “ঠাম্মি আর দাদু” অর্থাৎ আমারই একমেবাদ্বিতীয়ং পিতা এবং মাতাশ্রী!

ইচ্ছে করে দৌড়ে গিয়ে নিজের বাড়িতেই বোম মেরে আসি! শালা এই বুড়োবুড়ির আমার মেয়েকে সাজুনি করার বর্বর ইচ্ছেটা জন্মের মতন ঘুচে যাক। নেহাত নিজের অনাথ হয়ে পড়ার সম্ভাবনাটার কথা মাথায় রেখে ক্রোধ সংবরণ করতে হয়।

তিনি বোধহয় আমার মনের কথা পড়তে পেরেছিলেন, ঝটিতি অ্যাড করেন, “তবে কী না মা বলেছে সাজগোজের লিমিট আছে, পড়াশোনার কোনো লিমিট নেই।” এতটা বলেই দৌড়ে এসে গলা জড়িয়ে, “তাই না বাব্বা?”

এরপরও যে লেগে থাকে সে হয় পাষণ্ড বা সন্ত্রাসবাদী।

খানিকক্ষণ চটকাচটকির পর,

“বুড়ি, আই লাভ ইউ”

“আই লাভ ইউ টু বাবা”

“আই ওয়াজ মিসিং ইউ”

“কেন বাবা?”

“আমার তোকে ছাড়া একা শুতে ভালো লাগে নাকি? খালি খালি লাগে না? আর তাছাড়া আমার একা একা শুতে খুব ভয় করত।”

“কেন বাবা?”

“একা একা শুলে ভয় করে না? ভূতের ভয় লাগে না?”

ভদ্রমহিলা এতক্ষণ চুমু খাচ্ছিলেন। এই বার হঠাৎ করে স্থির হয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন, চোখে স্পষ্টতই অবাক হওয়ার ভাব ও বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা,

“সে কী? আর আমি যে তোমার ভরসায় তোমার পাশে ঘুমোতাম!”

এই দুনিয়ায় কে যে কার ভরসায় থাকে…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *