প্রিন্সেস ও যবন হরিদাস
দোলযাত্রার আগের দিনের এক মনোরম বিকেল। এখানে, মানে মুম্বাইতে অবশ্য উত্তরভারতীয় স্টাইলে হোলিই বলে। আমি আবার দোলযাত্রা নামটাই পছন্দ করি, বিদেশে-বিভুঁইয়ে এই ছোট-ছোট আঁকড়ে থাকাগুলোই মায়ের আঁচল মনে করিয়ে দেয় কী না! তার ওপর দাদু-ঠাকুমা ছিলেন ঘোর বৈষ্ণব, এককালে এইদিন বাড়িতে পুজো আর এলাহি ভোজের বন্দোবস্ত থাকত। এখনও চোখ বুজলেই সেই খিচুড়ি আর পায়েসের গন্ধ পাই। কী জানি, সেই আঘ্রাণে হয়তো স্মৃতির মায়াও মিশে থাকে অনেকটা।
এদিকে অবশ্য ওসব ব্যাপার-স্যাপার নেই। মুম্বাইয়ে এমনিতেও এখন চিড়বিড়ানি গরম। লোকে বলে, এখানে দুটোই ঋতু—গ্রীষ্মকাল আর ভয়াবহ গ্রীষ্মকাল! খুবই আবেগ দিয়ে ‘বসন্ত এসে গেছে’ গাইতে শুরু করার আগেই বসন্তবা বায়ু আরব সাগরের হাওয়ায় সওয়ার হয়ে পগারপার। কোনো এক মনোরম বিকেলে হয়তো ছিটেফোঁটা বসন্ত বসন্ত ভাব পেলেন, ওই দিয়েই বছর চালাতে হয় আর কী!
তা সেইরকমই এক প্রায়বসন্তমার্কা অলস রবিবাসরীয় দ্বিপ্রহরে বসে বসে ভাবছি, হাতি যদি উড়তে পারত তবে তার ডানার সাইজ কত হত, বা আমি যদি জেমস বণ্ড হতাম তো কার কার লাশ ফেলতাম… এমন সময় মনে পড়ল, ওই যাহ… শ্রীচৈতন্যদেবের পার্ষদদের নিয়ে একটা লেখা লিখব ভাবছিলুম যে! আমার আবার ভারী ভুলোমন, লোকে বলে উচ্ছিঙড়ের মেমোরি! লেখাটা আজ শুরু না করলেই নয়!
চট করে দু-চারটে বই নামিয়ে ট্যাবটা পাশে অন করে ভারী সুখ অনুভব করলাম। বইয়ের তুলনা নেই বটে, কিন্তু চট করে একটা তথ্য খুঁজে দিতে বাবা নেটচন্দ্রই ভরসা। যদ্দিন উইকিপিডিয়া আছে, বা গুগল ডট কম— বদর বদর করে প্রবন্ধসমুদ্রে তরী ভাসাইতে ভয় পায় কোন হুমুন্দির পো?
কিন্তু ম্যান প্রোপোজেস অ্যান্ড ফ্যামিলি ডিজপোজেস বলে সব শাস্ত্রেই একটা খুব দামি কথা আছে, না মানলে ঠাকুর পাপ দেন। সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম যখন, ঠিক তক্ষুণি আমার তিনি প্রায় একদঙ্গল সখী-সহ মার্চ করে আমার ঘরে এসে ঢুকলেন। এবং শুধু ঢুকলেন না, সে আগমন আবির্ভাবের থেকে কম কিছু নয়। এসে চেপে বসলেন আমার সামনেই।
বলা বাহুল্য, বইপত্তরটর সব গুছিয়ে পাশে সরিয়ে রাখলাম। প্রমীলাবাহিনী যেরকম চিন্তিত মুখ করে ঢুকলেন, দেখে টেনশনে আমারই বুক দুরুদুরু করতে লাগল।
তবে আজকালকার বাচ্চারা অনেক প্রফেশনাল, বাজে কথায় এঁরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না, “বাবা, উইল ইউ বি আওয়ার প্রেসিডেন্ট?”
অমন চমৎকার পদোন্নতির খবরে খুশি হয়ে ওঠারই কথা, তবুও ভাবলাম একবার দেখেশুনে নিই, চাকরির এমনিতেই যা বাজার!
“প্রেসিডেন্ট অফ হোয়াট?”
এবার রতিশা হাল ধরে, “হামলোগ না, হোলি কে দিন হোলি”খেলেঙ্গে অওর পার্টি করেঙ্গে। উসকে লিয়ে হামলোেগ না এক কমিটি বানায়েঁ হ্যায়। উই আর লুকিং ফর আ প্রেসিডেন্ট অফ আওয়ার কমিটি।”
চমৎকৃত হওয়ার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাই। রিক্রুটিং প্রেসিডেন্ট! আহা আহ্লাদে মরে যাই আর কী! জানি যে শহরটার নাম মুম্বাই, ভাবলে এই বয়স থেকেই অমন স্টার্ট আপ অন্ত্রেপ্রেনর মার্কা হাবভাব কি ঠিক হচ্ছে? ভাবলাম একবার জিগিয়ে দেখি, তোরা মাইনেপত্তর কী দিবি শুনি? তার আগেই ভাবিত মনে জিজ্ঞেস করে ফেলি, “আচ্ছা, আওর কওন কওন হ্যায় আপলোঁগোঁ কমিটি মে?”
হাত-পা নেড়ে উজ্জ্বল চোখে যে মেয়েটি এগিয়ে আসে তাকে আমি খুব ভালো করে চিনি, অমন পগেয়া পাজির পা-ঝাড়া মেয়ে এই চত্বরে কমই আছে। এর নাম জুলি কোল্যাসো, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বড় হয়ে এই গোয়ান কন্যাটি বিশিষ্ট ডন হয়ে মুম্বাইয়ের মুখোজ্জ্বল করবেন। তিনি আঙুলের কড় গুনে হিসেব দিতে থাকেন, “ম্যায় হুঁ, আরাত্রিকা হ্যায়, রতিশা হ্যায়, এশা হ্যায়…” মানে সদস্যরা সবাই কমিটিতে আছেন আর কী! জানি না কেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য কমিটির কথা মনে গেল।
হয়তো একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, যখন আমার সম্ভাব্য এমপ্লয়ারের লিস্টে ফের মন দিলাম ততক্ষণে সেই নাতিদীর্ঘ তালিকা শেষ হয়ে এসেছে প্রায়, শুধু শেষ নামটা কানে ঢুকল, “অওর ইয়ে হ্যায় মেরিনা, মেরিনা আবদুল্লাহ।”
নিজের অজান্তেই সচকিতে সোজা হয়ে বসলাম। মেরিনা? মেরিনা?
প্রায় বিশ বছর আগেকার এমনই এক বসন্ত বিকেলের কথা মনে পড়ে গেল। আজ এক মেরিনা নিজে এসেছে হোলিতে অংশগ্রহণ করতে, সেদিন আরেক মেরিনাকে নিয়ে আমার পরিবারেই এক মজার কাণ্ড ঘটে গেছিল। মনে পড়তে নিজেই ফিক করে হেসে ফেললাম।
কী ঘটনা? শুনবেন বলছেন? আচ্ছা, তাহলে গোল হয়ে বসুন।
অ্যায় অ্যায়, বেশ চমৎকার হয়েছে। শুরু করি তাহলে?
শুনুন…
আপনাদের আগেই আমার ঠাকুরদার কথা বলেছি, না? সেই ব্যবসাঅন্তপ্রাণ, সামান্য নাস্তিক, রুক্ষভাষী এবং শিরদাঁড়া উঁচু রাখা সোজা-সাপটা সুতীব্র মানুষটির কথা? এবার আমার ঠাকুমার কথা বলি, কেমন? হাতে ধান-দুব্বো নিয়ে বসুন, হৃদয়ে একটা প্রশান্তির ভাব আনুন। এনেছেন? এইবার ভক্তিভরে আবৃত্তি করুন দেখি—
অতঃপর মন দিয়া শুন সর্বজন, গ্র্যাণ্ডমাতার কথা এবে করিব বর্ণন। আমার ঠাকুরদা ছিলেন পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বা, দোহারা চেহারার মানুষ। ধবধবে ফর্সা এবং টিকোলো নাক, চোখে সদাসর্বদা একটা ‘তুই কে বে’ টাইপের খরশাণ দৃষ্টি নিয়ে ঘুরতেন। উল্টোদিকে আমার ঠাকুমা ছিলেন পাঁচ ফুট জিরো ইঞ্চি হাইটের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মহিলা। উঁচু কপাল, মুখে জর্দা পান ও মিষ্টি হাসি এবং এককথায় বলতে গেলে অসম্ভব জটিল চরিত্রের লোক। ঠাকুমার মতন বর্ণময় চরিত্রের কাহিনী নিয়ে কথা বলতে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে। ঠাকুরদাকে আমরা ভয় পেতাম ও শ্রদ্ধা করতাম। ঠাকুমা তাঁর বালগোপালের পুজোআচ্চা, শীতের পিঠপুলি, লক্ষ্মীপুজোর নারকেল ছাঁচের সন্দেশ, গরমে বেলের পানা, জর্দার গন্ধ, মনসা পুজোর ব্রতকথা, প্রতি সোমবারের ভাগবতপাঠ, বৃহস্পতিবারের পঞ্চপ্রদীপ— এই নিয়ে বড় কাছের মানুষ ছিলেন। এই মানুষটিই আবার যাবতীয় পাড়াপলিটিক্সের খবর রাখা, কূটকচাল এদিক-ওদিক করা, পাড়ার সমস্ত ঝামেলা আরও ঘুলিয়ে তুলতে অতিদক্ষ শকুনির ভূমিকায় সিদ্ধহস্ত ও সিদ্ধজিহ্বা ছিলেন। প্রাচীনপন্থী এবং অত্যধিক গোঁড়া এই কত্রীর দৃঢ়তম বিশ্বাস ছিল যে, সমস্ত ভালো খাবার, ভালো পরনের জামাকাপড় এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষা কেবলমাত্র পরিবারের পুরুষ-সদস্যদের জন্যেই সংরক্ষিত থাকা উচিত এবং এই নিয়মে উনি বটবৃক্ষবৎ অনড় ছিলেন। পুরুষ-সন্তানদের মধ্যে আবার জ্যেষ্ঠ সন্তানরা ছিল যাকে বলে ফার্স্ট অ্যামং দ্য ইকোয়ালস! আমি আর আমার জ্যেষ্ঠতুতো বড়দা যে এই অসাম্যসূচক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কী বহুল পরিমাণে নাজায়েজ ফায়দা উঠিয়েছি সে আর কহতব্য নয়! মাছের মুড়ো থেকে শুরু করে দুধের সর, সরকার পরিবারের আদ্দেক স্নেহসম্পদ এই দুই পেটেই…
বাদ দিন সেসব অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ… কে হায় হৃদয় খুঁড়ে লুকোনো সরভাজা জাগাতে ভালোবাসে?
ঠাকুরমার ব্যাপারে একটা গল্প আমাদের পরিবারে সমধিক প্রসিদ্ধ ছিল। পাশের বাড়ির ঠিকে ঝিকে ভাঙিয়ে আমাদের বাড়িতে কাজ করাতে প্রলুব্ধ করার সময় তিনি হিসেবে হাত নেড়ে এক অলোকসামান্য ফ্রিঞ্জ বেনিফিটসের বর্ণনা দিয়েছিলেন, “অগো বাড়িতে সেইইই সকালে আর হেইইই বিকালে খাস? আমাগো বাড়ি এই সকালেও খাবি এই বিকালেও খাবি।”
মুসলিমদের সম্পর্কে আমার ঠাকুরমার মনোভাব ছিল সেইযুগের কোনও ধার্মিক বৃদ্ধার মতই রক্ষণশীল। তবুও তারই মধ্যে নাতি-নাতনিদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রাথমিক পাঠ দেওয়ার চেষ্টা করতেন খুবই। মুশকিল হচ্ছে অন্তর্নিহিত কনভিকশন বা বিশ্বাসের অভাবে সেই পাঠ আর প্রাথমিকের গণ্ডী পেরিয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক অবধি এগোয়নি। দু-একটা উদাহরণ দিলে ভালো বুঝবেন। এই হয়তো আমার হাত ধরে তাঁর গঙ্গাজলী সই এর বাড়িতে যাচ্ছেন, রাস্তাটা শেখ পাড়ার মধ্যে দিয়ে। মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গম্ভীর গলায় বললেন, “এয়া হইলো গিয়া অগো মন্দির, বুঝলা? নমো করো…” সেই তিনিই আবার বাবার বুজুম ফ্রেন্ড মতিনকাকু বাড়িতে এলে তিনি চলে যাওয়ার পর জায়গাটা আবার মুছে রাখতেন।
ঈদের দিন বাড়িতে ঘুরতে আসা, শুভ্রজ্যোৎস্না পুলকিত যামিনীবৎ হাসি-খুশি সাহেদাদিদিকে দেখে এই হয়তো বললেন, “মাইয়াজ বড়ই সোন্দর, ওরাও হইলো গিয়া আমাগো মতই…” আর এদিকে দাঁতে মিসিমাখা ডিমউলি আমিনা মাসিকে ছুঁতেন না, ছুঁলে স্নান করতে যেতেন!
বলা বাহুল্য, এসব আমার মা এবং বাবা খুবই অপছন্দ করতেন। আমি এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ নিঃস্পৃহ থাকলেও এ লাইনে সম্পূর্ণভাবে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হয়ে পড়ে আমার সহোদরা ভগ্নী। যদিও আমাদের এই সম্মিলিত বিরোধিতা সত্ত্বেও এতদিনের কুসংস্কার ভদ্রমহোদয়া সম্পূর্ণ ছাড়তে পারেননি।
আগেই বলেছি যে, আমাদের ফ্যামিলি হল গিয়ে গোঁড়া বৈষ্ণব। যখনকার কথা বলছি, তখন আমি ক্লাস ইলেভেনে পড়ি, নাইনটি সেভেনের কথা। ঠাকুমা তখন প্রায় পঁয়ষট্টি বা ছেষট্টি, ব্লাড প্রেশার আর কিডনির প্রবলেমে একেবারে শয্যাশায়ী। আমাদের মতন পোলাপানদের ওপর চ্যাঁচামেচি করা ছাড়া আর রাতদিন “হরি হরায়ে নমো কৃষ্ণ যাদবায় নমো” গাওয়া ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ নেই। এমন সময় হঠাৎ অযাচিতভাবে ঠাকুমার সামনে তাঁর ভাগবত পাঠের আসরের সঙ্গী অন্যান্য বৃদ্ধাদের সঙ্গে শ্রীজগন্নাথ দর্শনের সুযোগ এসে উপস্থিত! ভদ্রমহোদয়া তো শোনামাত্র ‘হরি হে দীনবন্ধু’ বলে একেবারে লাফিয়ে উঠলেন। বাবা-মা যথারীতি ‘না না না’ করতে লাগলেন, এমনিতে এই শরীর নিয়ে এক বৃদ্ধাকে বাড়ির বাইরে বেরোতে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের আপত্তি খুবই যুক্তিযুক্ত, কিন্তু আপত্তি থাকলেই-বা কী? শোনে কে? শ্রীক্ষেত্র দর্শনের নামে ভদ্রমহিলা একদম চাঙ্গা! “এইব্যালা দেইখ্যা আসি গিয়া… বাইচ্যা থাকতে…” তারপর এর সঙ্গে সঙ্গত করার জন্যে উপযুক্ত ফোঁৎ ফোঁৎ সহ কয়েক ফোঁটা কান্না। এরপর পুণ্যাভিলাষী তীর্থযাত্রীকে আটকে রাখাটা যে ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্সের আওতায় পড়ে সেটা কি আর আলাদা করে বলে দিতে হবে, অ্যাঁ?
কিন্তু ভদ্রমহিলার এই মুক্ত বিহঙ্গবৎ তীর্থযাত্রার প্রস্তাবে শেষ শর্তটা রাখলেন আমার বাবা, মানে বৃদ্ধার মধ্যম সন্তানটি। যাবতীয় আলোচনাস্তে তিনি শর্ত দিলেন, “যাচ্ছ যাও, কিন্তু দেখভাল করার জন্যে সঙ্গে ওকে দিচ্ছি…” বলে ঘরের কোণায় খুবই নিরীহভাবে ‘দাদাকে-না-খামচানো-পাপ’ মার্কা নখগুলোতে নেলপালিশরত আমার সহোদরাকে নির্দিষ্ট করে দিয়ে বাক্যের বাকিটা শেষ করলেন, “নইলে তোমাকে এক পা-ও বেরোতে দেব না, মনে থাকে যেন”, বলে শখের বুলেট ইয়েজদি স্টার্ট করে কাজে বেরিয়ে পড়লেন।
বোন তখন ক্লাস নাইনে পড়ে, এই বোঝা ঘাড়ের ওপর এসে পড়বে বেচারি ভাবতেই পারেনি। অবশ্য খানিকটা ভেবেই সে দিব্যি চনমনে হয়ে ওঠে। এমনিতেও ঘুরতে যেতে তার বিন্দুমাত্র আপত্তি ছিল না, মা-বাবার শাসন আর দাদার গাঁট্টা থেকে মুক্ত এই দেদার মজারু সুযোগ ছাড়ে কোন আহাম্মকে? কাজ বলতে এক টাইমে-টাইমে ঠাকুমাকে ওষুধ এগিয়ে দেওয়া, ও আর অমন কী কাজ?
কিন্তু যে শর্ত সে রাখল, তাতে ঠাকুমার যাওয়া ভেস্তে যায় আর কী!
এইখানে কিছু বাগবিস্তারের প্রয়োজন হ্যাজ।
আমার সহোদরা পড়তেন হাওড়ার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে, বেশ নামি ও দামি স্কুল। সে যুগেই তার প্রতিমাসের টিউশন ফী’জ ছিল হাজার টাকা। সচরাচর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বাঙালি ও অবাঙালি ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় তুল্যমূল্য থাকে। তেনার স্কুলে এই বাঙালি-অবাঙালি রেশিও ছিল প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ, এবং সেই হিন্দিভাষীদের মধ্যে প্রায় সবাই’ই ধর্মে ছিল ইসলামের অনুসারী। ছাড়াও তামিল, পাঞ্জাবী, আসামিজ মিলিয়ে সে এক মিনি ভারতবর্ষ বললেই চলে।
এবং সেই মিনিইন্ডিয়ার মধ্যেই যে বাঙালি মেয়েটা ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস টেন অবধি টানা, অপ্রতিহতভাবে প্রথম স্থান দখলে রেখেছিল, তার নামও ছিল মেরিনা, মেরিনা আরিফ।
মেরিনার মতন প্রতিভাময়ী মেয়ে আমি দেখিনি বললেই চলে, এবং এই কথাটা বলার যথেষ্ট কারণ আছে। মেরিনার মা লোকের বাড়ি বাসন মাজতেন, বাবা কাজ করতেন রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে হিসেবে। কাজীপাডাতে ওদের বাড়িতে একবার কী দু’বার গেছি। কাজীপাডা হচ্ছে হাওড়ার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, পুরো এলাকাটাতেই অসহনীয় দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। তাদের মধ্যেও, সেই দরিদ্র বস্তি অঞ্চলের মধ্যেও, মেরিনারা ছিল দরিদ্রতম, পুওরেস্ট অ্যামং দ্য পুওর ওয়ানস। এক কামরার একটা ভাঙাচোরা ঘর, তারমধ্যেই তিনজনের সংসার। সেই দারিদ্র্যের সংসারের তিনদিকে দরমার বেড়া, মাথায় পলিথিনের ছাদ। পাশের এজমালি খাটা পায়খানায় প্রাতঃকৃত্যাদির আয়োজন। বাকি রান্নাবান্না, অশনবসন, ভালোবাসায় মোড়া সংসারযাপন সবই ওই পলিথিন দরমার আড়ালে।
এই পরিবারের মেয়েকে কে যে জেদ করে অমন দামি স্কুলে ভর্তি করে, তা জানা হয়নি। তবে তাতে মেরিনার পড়াশোনায় বিশেষ অসুবিধা হয়নি, ক্লাস ওয়ান থেকে একাদিক্রমে ক্লাস টেন অবধি হেলায় ফার্স্ট হলে কারও কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বলা বাহুল্য, মেয়েটির জন্যে স্কুলে সবই ফ্রি ছিল। এই দরিদ্র এবং মেধাবী ছাত্রীটিকে সহপাঠীরা সম্ভ্রম এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা অসম্ভব স্নেহ করতেন।
কার্যগতিকে মেয়েটি আমার বোনের ঘনিষ্ঠতম বান্ধবী হয়ে পড়ে। বাড়ির সমস্ত উৎসবে (বিয়েবাড়ি, শ্রাদ্ধ, লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, মায় মনসাপুজোতে অবধি!) তার অবাধ আমন্ত্রণ ছিল। প্রতিটি উৎসবে সে আসত, ভক্তিভরে প্রসাদ খেত, মা কিঞ্চিৎ আদর করে দিতেন, তারপর সে তার বাবার সাইকেলে চড়ে বাড়ি চলে যেত। ছোট-খাটো চেহারার, অপুষ্টিতে ভোগা কালো মতো মেয়েটিকে আমার দিব্যি মনে আছে। বলতে শরম লাগে, সেই সময়ে আমিও পড়াশোনায় কিঞ্চিৎ ভালো ছিলাম বলে সে আমাকে ‘দাদা’ ডাকত ও যারপরনাই ভক্তি-শ্রদ্ধা করত।
যাই হোক, পূর্বকথনে ফিরে আসি। পিতৃআজ্ঞায় আমার সহোদরা তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন বটে, কিন্তু একটি অতি সরল প্রতিশর্ত রাখলেন, যদি সখীশ্রেষ্ঠা মেরিনাকে তার সঙ্গে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তবেই উনি ঠাকুমার সঙ্গে যাবেন, নচেৎ নয়! নইলে রহিলো তোমার এ ঘর-দুয়ার ইত্যাদি প্রভৃতি…
খুব স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে এই নিয়ে একটা ভজকট ঝামেলা পাকিয়ে ওঠে। ওঠারই কথা, বিধর্মী মেয়ে সঙ্গে নিয়ে শ্রীক্ষেত্র দর্শনে যাওয়ার কথা ভাবে কোন ধার্মিক হিন্দু? তার ওপর সেই মেয়ে যদি মন্দিরে ঢোকে তো করুণাসিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপতি শ্রীজগন্নাথ অপবিত্র হয়ে যাবেন না? “এয়্যা ক্যামনে করুম”, স্মৃতিশাস্ত্রের এত বড় নিদান হিন্দু সধবা হয়ে তিনি কী করে অগ্রাহ্য করেন? তার ওপর “তারা কি আমাগো মক্কায় যাইতে দ্যায়? হারাম হারাম কইর্যা খ্যাদাইয়া দ্যায় না?”, টাইপের জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ দাখিল করলে সদাসর্বদা “কুকুরের কাজ কুকুরে করেছে” মার্কা যুক্তি দেওয়াও ঠিক দেখায় না। এদিকে মুশকিল এই যে, আমার বোনও ভদ্রলোক, তারও এক কথা। মেরিনা যায়েগি তো হাম চলেঙ্গে, নইলে তুমি একা যাও।
সে মশাই এক বিশাল হুলুস্থুল বাড়িতে।
শেষে স্মার্ত রঘুনন্দন আর ত্রয়োদশী কিশোরীর জেদের সেই লড়াইতে পণ্ডিতমশাই হারতে বাধ্য হলেন। অনেক বাকবিতণ্ডার শেষে মেরিনার শ্রীক্ষেত্রযাত্রার অধিকার মেনে নেওয়া হল বটে, তবে তা দুটি শর্তসাপেক্ষে,
১. মেরিনা ঠাকুমার আশেপাশে ঘেঁষবে না। ২. মন্দিরের মধ্যে যেন না ঢোকে।
চাঁদ সদাগর পিছন ফিরে বাঁ হাত দিয়ে ফুল ছুঁড়ে মঙ্গলসাহিত্যে অত বড় একটা স্মরণীয় একটা চরিত্র হয়ে রইলেন, আর তিনি কি এইটুকু পারবেন না? এই ভেবে ভগ্নীমহোদয়া মুচকি হেসে এক পুণ্যপ্রভাতে সেই বিশাল গ্যাং-এর সঙ্গে তো দুগ্গা-দুগ্গা করে রওনা দিল। আমার মা যথাসাধ্য চোখ-টোখ রাঙিয়ে “সময় করে ওষুধ খাবে কিন্তু, আমার মাথার দিব্যি” ইত্যাদি প্রভৃতি ভয়াবহ সমস্ত দিব্যি দিলেসা দিয়ে হাপুস নয়নে কেঁদেকেটে হাওড়া স্টেশনে সাংঘাতিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে আমার সঙ্গে বাড়ি ফিরে এলেন।
তখনও মোবাইলের জমানা আসেনি, ফলে চাইলেই রাত দেড়টায় কাউকে ডেকে তুলে, “হাই বন্ধু, তুমি কি ঘুমাচ্ছো?” টাইপের ছ্যাবলামো করার চান্স বড়ই কম ছিল। যোগাযোগের রাস্তা বলতে ঢাউস ল্যান্ডলাইন, তাও টেলিফোন দপ্তরের সৌজন্যে অর্ধেক সময় বাবাজি ভাবসমাধিতে থাকতেন। তিনি কর্মক্ষম থাকলে আমরা সেটাকে বিরলের মধ্যে বিরলতম সৌভাগ্য বলেই গণ্য করতাম। এমনই এক সৌভাগ্যের ভাসভাসি দিনে বহু কষ্টে আমার বাবা হোটেলের ফোন লাগালেন, তেনার মায়ের খবরাখবর জানতে। যথাবিধি কুশল বিনিময় হল, সিনিয়র সরকার টাইমে ওষুধ খাচ্ছেন কি না, হোটেলের লোকজনের ওপর হম্বিতম্বি করছেন কি না ইত্যাদি সালতামামির পর ভদ্রলোক খুবই সতর্কতার সঙ্গে আসল প্রসঙ্গে এলেন, “আর কোনো ঝামেলা হয়নি তো? মেরিনা কই?”
বোনের উদাসী উত্তর, “ঠাকুরমারা তো মন্দিরের ভেতরে। আমি আর মেরিনা এক্ষুনি মন্দির দেখে ফিরে এলাম!”
ভদ্রলোকের হাত থেকে ঠকাস করে টেলিফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। নেহাত এখন মূর্ছা যাওয়াটা ভালো দেখায় না, তার ওপর একটু পরে বাজার যেতে হবে এইসব নানাবিধ বিবেচনায় তিনি খাড়া রইলেন, তারপর গলাটা খাঁকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মানে?”
মানে আর কী? তখন বোরখা ব্রিগেড এত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি, মেরিনাকে চিরকালই সালোয়ার কামিজ পরতে দেখেছি, মেরিনার মা, মানে কাকিমাও সাধারণভাবে বাঙালি শাড়িই পরতেন। প্রলেতারিয়েতের খুব সম্ভবত পেটের ভাত ছাড়া আর কোনোদিকেই মনোযোগ দেওয়ার মতন অবস্থা থাকে না। অশনবসন নিয়ে বাঁদরামিটা মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তদের মধ্যেই বেশি! যাই হোক, যা বলছিলাম, মেরিনাকে দেখে খুব স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ আর কয়েকটি হিন্দু মেয়ের থেকে আলাদা করা সম্ভব ছিল না।
ফলে ঠাকুমা অ্যান্ড সম্প্রদায় সাশ্রুনয়নে “হা গোবিন্দ” বলে ঢুকে পড়ার মিনিট দশেক বাদে মেরিনার হস্ত দৃঢ়মুষ্ঠিতে ধরে আমার সহোদরার মন্দিরপ্রাঙ্গণে প্রবেশ। এবং তারপর আধঘণ্টার ঝটিকা সফর শেষে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। ভেতরে পুণ্যলোভাতুর মোক্ষদাদের দল তখনও চৈতন্যপদরেণু কপালে মাথায় মাখতে ব্যস্ত!
সব শেষে তৃপ্ত তীর্থযাত্রীর দল এক পুণ্যপ্রভাতে বাড়িতে ল্যাণ্ড করলেন। আবার একপ্রস্ত কান্নাকাটি, (এত কান্নাকাটি কেন হত খোদায় মালুম! তবে সেকালে লোকে একটু কম প্যাঁচালো ছিল বলেই আমার ধারণা)। লোকজনকে ‘মহাপ্রসাদ’ দিয়ে-থুয়ে, কাকাতুয়ার গজা বিলিয়ে-টিলিয়ে, পবিত্র মনে গরদের শাড়ি পরে, মুখে একগাল হাসি ও দোক্তাপানসহ ভদ্রমহিলা ঘরে এলেন।
আমার ঠাকুরদা হাঁপানির রোগী ছিলেন, বিশেষ বাইরে বেরোতেন না। আগেই বলেছি ভদ্রলোকের ধর্মাচরণে বিশেষ মতি ছিল না। ঠাকুমা এসে স্নান-টান করে হাসিমুখে ঠাকুরদার পাশে বসেছেন, আমি পাশে বসে আনন্দবাজার পড়ছি, সেই অসামান্য দাম্পত্য রসালাপ আমার কানে পৌঁছলো,
“ঘুরলা কেমন?” “খুব ভালো ঘুরসি। এত্ত ভালো ঘুরসি যে কওন যায় না। এক্কেবারে সামনের থেইক্যা দর্শন কইর্যা…” এরপর অত্যন্ত নিরাসক্ত গলায় সিনিয়র সরকার জিজ্ঞেস করলেন, “মাইয়াডা যাইব শুইন্যা চিক্কৈর ফাড়তাসিলা ক্যানে?”
অকাট্য যুক্তি, পবিত্র তীর্থযাত্রায় বিধর্মী মেয়ে সঙ্গী “হওনের লইগ্যা একটা না একটা অঘটন ঘটবোই” এই নিয়ে ঠাকুমা কম চেল্লাচিল্লি করেননি। এখন দাদুর প্রশ্নবাণে কিঞ্চিৎ বিমর্ষ হয়ে পড়তে বাধ্য হলেন। নিজমুখে স্বীকার গেছেন যে অসামান্য ভালো তীর্থকৃত্য করে এসেছেন। এখন নিজেই নিজের কথা অপ্রমাণ করেন কী করে?
কিন্তু তিনি কি ডরান সখী ভিখারি রাঘবে? বাঙাল রক্ত তেনার বডিতেও যে পদ্মা-ধলেশ্বরী হয়ে খেলা করছে সেটা বোঝা গেল যখন তিনি ক্ষণিকের মধ্যে মধুর হাস্যে ভুবন ভরিয়ে উত্তর দিলেন, “মুসলমান হইলে কী হইবো, ও হইলো গিয়া যবন হরিদাস!” পষ্টভাষী ঠাকুরদা স্তম্ভিতভাবে সহধর্মিণীর দিকে চেয়ে রইলেন! তাঁর মুখে আর কথা জোগালো না।
সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটিকে কোলে টেনে নিলাম। যাক, সমস্ত ক্ষুদ্র সংকীর্ণ গণ্ডী এদের কলহাস্যরোলে ভেসেই যাক। যিনি সব দেখেন, সব শোনেন, সেই সর্বমঙ্গলময়ের আনন্দযজ্ঞে তিনি কোনও ভেদ রাখেন না, যবন হরিদাস আর কাফের রঘুনন্দন, ঈদের শুভ্র কুর্তা আর দোলযাত্রার রঙিন পাঞ্জাবি, তাঁর কাছে সব সমান।
মেলাবেন তিনি মেলাবেন, এদের দিকে তাকিয়ে আশায় ফের একবার বুক বাঁধলাম, একদিন তিনি এদের নিশ্চয়ই মেলাবেন।
