প্রিন্সেস ও সান্টা
“বাব্বা”
“হুঁ”
“তুমি কি খুব বিজি?”
—উম্ম, মানে এই বইটা পড়ছি মা।
—তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল, খুব ইম্পর্ট্যান্ট কথা কিন্তু। বই পড়লে চলবে না।
এর পরে শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবের তত্ত্বদর্শনের কচকচি মাথায় ঢোকে সাধ্য কী? বইটা বন্ধ করে এই সচল জিজ্ঞাসাচিহ্নটির সম্মুখীন হই।
—বলো মা। কী কথা?
—আচ্ছা আজ তো টুয়েন্টি ফোর্থ। আজই তো সান্টা গিফট নিয়ে আসবে, তাই না?
—সে রকমই তো কথা হয়ে আছে।
—গতবারে সান্টা ক্লজ কী দিয়েছিল সেসব মনে আছে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলি। এই বয়সে নাকি বাচ্চারা বাবাদের হিরো ভাবে। তা সত্ত্বেও হিরোদের স্মৃতিশক্তির ওপর এতটা ভরসা রাখা কি ঠিক?
—ইয়ে, একটা রেড কালারের ড্রেস ছিল না?
—ধুর, তোমার কিছু মনে থাকে না। মা তাই শুধু তোমাকে বকে।
এত বড় কঠিন সত্যকে হজম করতে কিঞ্চিৎ কষ্ট হয়, ‘সে কখনও করে না বঞ্চনা’র দোহাই দিয়েও। তেনার বাক্যস্রোত যদিওবা তরতরিয়ে চলতেই থাকে,
—সান্টা দিয়েছিল একটা কিডস পিয়ানো আর একটা ম্যাজিক পেন্সিল সেট।
হবেওবা। কিন্তু ওদিকে শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব…
—এবারে কী দেবে?
—কেন? যা চেয়েছো! বার্বি শ্যাম্পু, বার্বি লিপ বাম, বার্বি হ্যান্ড স্যানিটাইজার, বার্বি সোপ… যতটা মনে ছিল গড়গড় করে বলে যাই।
—তোমার কি মনে হয়, এগুলো সান্টা নিয়ে আসবে?
—আসবেই তো। কাল তুমি রাত্তিরে প্রেয়ার করলে আর চিঠি লিখলে না? সান্টা তো নিয়ে আসবেই।
—বাব্বা, সান্টা বলে কেউ সত্যি আছে?
জানি না কেন, কথাটা ধক করে বুকে এসে লাগে। সত্যিটা কেউ বলে দিল নাকি? নিশ্চয়ই ওর মা, বিয়ের পর থেকেই দেখছি, ভদ্রমহিলার মধ্যে অন্যায় রকমের গান্ধীবাদী একটা ইয়ে আছে।
—ইয়ে, হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন মা?
—আমাদের ক্লাসের ফারহা আছে না, যার বার্থডেতে সেই গেলাম? কাল আমাকে আর আরুষকে বলেছে সান্টা ক্লজ বলে কিছু নেই। আমাদের পেরেন্টসরাই সান্টার নাম করে গিফট কিনে রাখে, আর বলে সান্টা দিয়েছে। ফারহার দিদি আছে না জোহরা, ফিফথ স্ট্যান্ডার্ডে পড়ে, সেই বলেছে ওকে।
এতক্ষণে অরিন্দম বুঝিলা বিষাদে, জানিনু কেমনে সন্দেহসর্প পশিল এই ইনোসেন্স যজ্ঞাগারে। হায় ফারহা, উচিত কি তব এই কাজ?
এরপর সেই সংশয়বাষ্পাকুলা ক্ষুদ্র মহিলাটিকে কোলে টেনে নিতেই হয়, “সান্টা আছে তো মা। তুমি যদি খুব করে ভাবো সান্টা আছে, তাহলে সান্টা নিশ্চয়ই আছে। এই যে আমি তোমাকে এত ভালোবাসি, তুমি কি দেখতে পাও?”
—নাতা, তা পাই না, কিন্তু ফিল তো করি!
—অ্যায়, ওই ফিলিংটাই সান্টা ক্লজ মা। দিদা তোমাকে সেই গানটা শিখিয়েছিলেন না? মেঘের কোলে রোদ হেসেছে? রোদ কি কখনও হাসে?
—হি হি, রোদ কি হিউম্যান যে হাসবে?
—কিন্তু এখানে টানা কয়েকদিন রেইন হবার পর যখন রোদ ওঠে তখন তুমি হাসো না?
—আমি কোথায় হাসি? মা হাসে তো, জামা-কাপড় বাইরে শুকোতে দেওয়া যাবে বলে।
—ওই তোমার মায়ের হাসিটাই রোদের হাসি, বুঝলে? ওই যে হ্যাপিনেসটা, তুমি কি দেখতে পাও?
—না, কিন্তু বুঝতে পারি।
—ওই হ্যাপিনেসটাই সান্টা ক্লজ, মা।
কিছুক্ষণের নৈঃশব্দ্য। আমিও গুটিগুটি শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবে মনোনিবেশ করি। কিন্তু এ জিজ্ঞাসা জলতরঙ্গ রোধিবে কে রে?
“কিন্তু বাবা, হ্যাপিনেস কি দোকানে গিয়ে জিনিস কিনতে পারে? দোকানের আঙ্কল ভয় পেয়ে যাবে না? আর না কিনলে আমাকে দেবে কী করে?” ভদ্রমহিলাকে রীতিমতো চিন্তান্বিত দেখায়।
কিন্তু কচিবাঙালি যদি অকস্মাৎ তার্কিক বা নৈয়ায়িক হয়ে ওঠে তবে সে বাঙালির ধেড়ে বাবাকেও তাইই হতে হয়।
“আহ্, হ্যাপিনেস কিনতে যাবে কেন, সে তো ইচ্ছে করলেই পেতে পারে। এই যে ধরো কালারফুল রেইনবো, কী স্যুইট একটা স্বপ্ন বা কাঠবিড়ালি, এগুলো কি দোকানে কেনা যায়?”
“যায় না, না?” ছোট-ছোট চোখগুলো উজ্জ্বল আর বড়-বড় হয়ে ওঠে, “ফারহা ভুল’ই বলেছে, না? সান্টাকে যারা লাভ করে তাদেরই একমাত্র সান্টা গিফট দেয়, তাই না বাবা?”
অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে থাকি। এই তো ক’টা বছর। এরপর সত্যিই বুঝে যাবে যে সান্টা বলে কেউ নেই, পরী বলে কিছু হয় না, বাবা সব কিছু পারে না, ডোরেমন আসলে একটা অলীক স্বপ্ন, পৃথিবীটা যতটা রঙিন দেখায় ততটা রঙিন নয়। আস্তে আস্তে রন্ধ্রেপ্রক্রোদেমাত্সর্বে ওর পৃথিবীটা ওর কাছে ওর মতো করে ধরা দেবে। একদিন আমি যেমন হঠাৎ করে জেনেছিলাম, দুনিয়ায় সবাই আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসে না, আর টাকা খুব মস্ত জিনিস!
তদ্দিন পর্যন্ত আমার এই অপাপবিদ্ধ ছোট্ট ছানাটার চোখে রূপকথার পবিত্র ভালোবাসাটুকুই লেগে থাক না? যতদিন বুকের কোটরে আগলে রাখা যায়?
তা বোধহয় সেই কোটর থেকেই তিনি লাজুক স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “সান্টা কি এখনও রিকোয়েস্ট নিচ্ছে বাবা?”
গলাটা বোধহয় ধরে এসেছিল, ঝাঁকড়ে নিয়ে বল্লুম, “কেন মা?”
—তাহলে সান্টাকে বোলোতো, আগে যা যা বলেছি তার সঙ্গে একটা বার্বি ডিও নিয়ে আসতে আমার জন্যে, আর একটা বডি মিস্টও।
সেই কোটরগুলোর দিকে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকি। মানে? আমাকে আবার এখন বাজারে যেতে হবে এই দুটোর জন্যে? এই রাত আটটায়?
