প্রিন্সেস ও ট্র্যাডিশনাল ডে
গতকাল মনটা খুবই ভারী ছিল বুঝলেন। মানে দুঃখ-বেদনায়-আতঙ্কে-আশঙ্কায় সে একেবারে নাভিশ্বাস কাণ্ড একেবারে।
হয়েছিল কী, পরশু অফিস থেকে বেরোনোর সময় বস খুবই গম্ভীর গলায় মনে করিয়ে দিলেন যে, রাতে দুটো পিপিটি বানিয়ে পাঠানোর কথা আছে, আর তার সঙ্গে পাঠানোর কথা খানদশেক মেইল। আমিও বেশ সজোরে মাথা-টাথা নেড়ে। “হোয়াই ফিয়ার, হোয়েন আই অ্যাম দেয়ার!” টাইপের বাণীবিতরণ করে তো বেরিয়ে পড়লুম। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাড়ি ঢুকব ঢুকব করছি, আর আমার বাড়ির রাস্তাটা একেবারে সুরজ বারের সামনে দিয়েই যায় (কী অন্যায় বলুন তো), আর কী কারণে মনটা খুব নরম হয়েছিল, আর চেনা ওয়েটার তাজউদ্দীন কেমন করে যেন ডাকলো, কোথায় যেন রেডিওতে “হুজুর ইস কদর ভি না ইতরাকে চলিয়ে” বাজছিল, তারপর টপ করে মনে পড়ে গেল যে, এদের বাদাম মাখাটা দারুণ করে, বাঁদিকের কানটা একটু কটকট করছিল, সামান্য মশাও কামড়াচ্ছিল… মোটমাট মনে হল সামান্য বসে গেলে খুব একটা খারাপ দেখাবে না।
রাত দশটায় যখন বেরোচ্ছি, শুধু মনে আছে তাজুল চারটে গালে চারটে করে চুমু খেয়ে “আই লাভ ইউ” বা “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” টাইপের কী একটা বলে টিলটিল করে বাড়ির রাস্তা ধরেছি।
আজ প্রায় অশৌচের মতই থোবড়া বানিয়ে অফিসে এসেছিলুম, একটা চোখ ছলছল করুণ গল্পও তৈরি ছিল… কিন্তু অফিসে গিয়েই দেখি, ইয়াল্লা,
বস নেই!
মনটা আনন্দে চলকে উঠল বটে, তবে কী না এই নশ্বর জীবনের যাবতীয় আনন্দমুহূর্তই যে আসলে নলিনীদলগতজলমতিতরলং সে কে না জানে? ফলে বসের সেক্রেটারিকে অত্যন্ত গম্ভীর মুখ করে “বস কব আয়েঙ্গে?” জিজ্ঞাসা করায় যখন উত্তর পেলুম, “এক হপ্তা তক নেহি আয়েঙ্গে, সর্দি জুখাম হুয়া হ্যায়”… কী বলব দাদা, বাথরুমে গিয়ে আনন্দে দু-ফোঁটা চোখের জলই ফেলে এলুম। আহা, শুরুর ভাষাতেই বলি, বেঁচে থাকুক সর্দি-কাশি চিরজীবী হয়ে। বসের প্রিয় “বসগতপ্রাণাং, তন্নামশ্রবণপ্রিয়াং” চামচাটি অবিশ্যি সদ্যবিধবার টাইপের মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তার ওপর তার কানের কাছে গিয়ে খুব দরদ ভরে “তোমার ভুবনে মাগো এত চাপ” গাইতে সে কটমট করে যে দৃষ্টিতে আমাকে ভস্ম করে ফেলার চেষ্টা করল, টাটা স্টীলের বয়লারের টেম্পারেচার তার থেকে বেশ কিছু ডিগ্রি কমই থাকে, তুতের দিব্যি!
যাই হোক, সেই ফুরফুরে মেজাজের সঙ্গে নেহাত অনুপান হিসেবেই বিকেলের দিকে আমার প্রাণপ্রিয় অফিসঘাটির সঙ্গে কফি খেতে খেতে গূঢ় আলোচনায় মগ্ন, ডিমনি না অ্যাকাউন্টসের নবাগত মামুনিকে নিয়ে ঠিক মনে নেই, এমন সময়ে মোবাইল বেজে উঠতে তুলে দেখি বউয়ের ফোন।
তা ফোন রিসিভ করে গলাটা গাঢ় করে বলেছি, “ইয়েস ডার্লিং?”, তিনি নিরসক্ত কণ্ঠে আমাকে বললেন, বাড়ি আসার সময় যেন চারটে রসগোল্লা কিনে নিয়ে যাই।
কী বলব দাদা, পয়গম্বর মুজতবা আলির কসম, মনে হল লাস ভেগাসে লাখ ডলারের জ্যাকপট জিতেছি! উনিশশো একচল্লিশ সালে আমার সামান্য কোলেস্টেরল ধরা পড়েছিল, দু’শো তিরিশ মতন। তারপর থেকে মিষ্টি, ঘি, মাখন, ডিমের কুসুম, তেলেভাজা, বিরিয়ানি— মানে দুনিয়ার যাবতীয় সুখাদ্য সবই বন্ধ। গতমাসেই চেক করেছি, এখন একশো একুশ। ইনফ্যাক্ট গত দুই শতাব্দী ধরেই দেড়শোর নিচে, তাও, “যদি ফের হয়? বাঙালদের বিশ্বাস নেই…” যুক্তিতে আমার মিষ্টির দোকানের দিকে তাকানো অবধি বারণ। সেখানে আমার তৃষা হৃদিস্থিতে তিনি নিজেই বলছেন চারটে রসগোল্লা কিনে নিয়ে যেতে, বাড়িতে আড়াইটে লোক, অন্তত একটা কি এ পোড়া কপালে জুটবে না?
গলাটা যতটা সম্ভব মধুর করে, মানে এই হেঁড়ে গলা যতটা মধুর করা যায় আর কী… যেই সেই সন্ন্যাসীরাজার মতন বৈরাগ্য এনে বলেছি, “তুমি আমাকে মিষ্টি খেতে বলছ? কিন্তু আমি যে মিষ্টি খেতে চাইনি!”, তিনি শুকনো গলায় বললেন, “তোমার জন্যে না। মেয়ের স্কুলে ট্র্যাডিশনাল ডে আছে। বাঙালি ফুড নিয়ে যেতে হবে। ভাবছি লুচি আর রসগোল্লা দেব…”
সাধ নাও মিটতে পারে, আশাও না পুরোতে পারে, তা বলে সকলি তো ফুরোতে দেওয়া যায় না! আর তাছাড়া মুম্বইতে ভালো বাঙালি মিষ্টি পাওয়াও বড় দুষ্কর। দু-এক জায়গায় ‘বাঙালি রসগোল্লা কা দোকান’ দেখা যায় বটে, তবে সেই রসগোল্লা খাওয়ার বদলে গরম ফলিডলে চুবিয়ে ন্যাপথলিন খাওয়া বেটার!
যাই হোক, শেষে পাওয়াই-এর সুইট বেঙ্গল থেকে (নাম শুনেই মনে পড়ে গেল, সেদিন মুম্বইয়ের মেট্রোতে দেখি একখানা আস্ত ট্রেন ‘ভিজিট বেঙ্গল’ বলে ব্র্যান্ডিং করেছে, মানে পুরোটাই বাংলা ও বাংলার বিভিন্ন ঘুরতে যাওয়ার জায়গার ছবিতে ছয়লাপ। ক্যাচলাইন দেখলাম, ‘সুইটেস্ট পার্ট অফ ইন্ডিয়া’। আমার পাপী কানে স্লাইট অশ্লীল লাগল বটে তবুও, নট ব্যাড, অ্যাঁ?) চারটে রসগোল্লা কিনে বাড়িতে এসে পৌঁছেছি কি পৌঁছাইনি, আমার গিন্নি ছোঁ মেরে প্যাকেটটা আমার হাত থেকে কেড়েই নিলেন। আমি স্রেফ আঙুল চাটতে চাটতে জুলজুল করে চেয়ে রইলাম।
সকালে উঠেছি আজ ইউজ্যুয়াল মেয়েকে স্কুল বাসে তুলে দিয়ে আসবো বলে। উঠে দেখি দক্ষযজ্ঞ! তাকে তার মা একটা কচি সাইজের ঘাগরা চোলি বার করে দিয়েছেন, এবং তিনি জেদ ধরে আছেন যে, তিনি শাড়ি পরেই আজ স্কুল যাবেন, “শাড়িই তো আমাদের বেঙ্গলিদের ট্র্যাডিশনাল ড্রেস, তাই না বাবা?” সে প্রায় গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি মশাই! এসব ক্ষেত্রে বাবাদেরই রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিরক্ষাবাহিনীর ভূমিকা পালন করতে হয়। তেনাকে টেনে নিয়ে কানে কানে বললাম— শাড়ি কিন্তু ম্যানেজ করা খুব মুশকিল। স্কুলে খুলে টুলে গেলে সামলাতে পারবি তো?
তিনি একগাল হেসে— ইল্, না না, একদম না, তাহলে থাক… বলে হাসিমুখে ঘাঘরা চোলি পরে স্কুলে গেলেন।
তা সারাদিন পর বাড়ি এসে দু’দণ্ড একটু সুস্থির হয়ে বসেছি কী বসিনি, তিনি বেশ গম্ভীরভাবে আমার সামনে এসে বসলেন, “তোমার সঙ্গে কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কথা ছিল।”
ভাবছিলাম দেবদত্ত পট্টনায়কের “অলিম্পাস”টা আজ শুরু করব, তা আর হল না বোধহয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করলুম, “কী হয়েছে মা?”
“নিয়তি কি মালয়ালী?”
সে কী রে? হঠাৎ এরকম দার্শনিক প্রশ্ন? আমাদের ভাগ্যনিয়ন্তা ভদ্রমহিলা মালয়ালী কেন হতে যাবেন? মানে তোরা জায়গাটাকে গডস্ ওন কান্ট্রি বলে দাবি করছিস বুঝলাম। তাই বলে সমস্ত দেব-দেবীদের মালয়ালী বলে আত্মসাৎ করাটা…
—ইয়ে না মা, নিয়তি তো, ইয়ে গডেস, আর গডরা তো সব্বার হন…
—আরে নিয়তি, নিয়তিইইইই, ডি ব্লকে থাকে… মহিলা পারলে আঙুলটা আমার চোখেই ঢুকিয়ে দেন আর কী!
ও আচ্ছা, সেই চশমাপরা মেয়েটা? তাই বল। কিন্তু সে মালয়ালী না ইন্দোনেশীয়, আমি কী করে জানব? ওহ, ওয়েট ওর বাবাকে তো চিনি…
—কেন মা?
—নিয়তি আজকে আমার মতই ঘাগরা চোলি পরে গেছিল, আর টিফিনে নিয়ে গেছিল ধোসা। জিজ্ঞেস করলাম ‘আর ইউ পিপল ফ্রম সাউথ ইণ্ডিয়া?’ তখন ও বলল যে, ইয়েস উই আর মালয়ালী…
ওর বাবা তো ডক্টর মেহরা। যদ্দুর জানি, মেহরা তো পাঞ্জাবি, মালয়ালী তো নয়!
মনের মধ্যে একটা কুটিল সন্দেহ পাকিয়ে ওঠে। মিসেস মেহরা ‘আলু কা পরাঠা’ বানানোর বদলে একদিনের জন্যে মালয়ালী হওয়াটাই শ্রেয় মনে করলেন নাকি, অ্যাঁ?
—আর শিন কেন একটা শার্ট-প্যান্ট পরে একটা টাই ঝুলিয়ে চলে গেল? ও কেন ট্র্যাডিশনাল ড্রেস পরল না?
শিন? এ আবার কারও নাম নাকি? গিন্নির শরণাপন্ন হতে হয়, “ওগো, শিনটা কে গো? ওরা কোথাকার লোক?”
গিন্নি গম্ভীর গলায় বললেন— পাশের সোসাইটিতে থাকে। ওরা গোয়ানিজ ক্রিশ্চান।
অ। তা গোয়ার ছেলে যখন, একটা গ্রাফিক চকরাবকরা টি শার্ট, শর্টস অ্যান্ড টুপি পরেই গেলে মানানসই হত সন্দেহ নেই। কিন্তু স্কুলে কি ঢুকতে দিত? চিন্তিত হয়ে পড়ি।
—তবে জানো বাবা, জ্যোতি আর শ্বেতা খুব কিউট সেজেছিল, কিন্তু একটু ফানিও সেজেছিল।
একই অঙ্গে এত রূপ? কিউট এবং ফানি? কীরকম একটু বুঝিয়ে বল দিকি!
“মাথার পেছনে খোঁপা করেছে, তাতে গারল্যান্ড লাগিয়েছে, বড়-বড় হার পরেছে, দু’কানে দুল, নাকেও একটা বড় মতো কী পরেছে, চোখে কাজল, গালে রুজ, হাতে অনেকগুলো চুড়ি…” মানে মোটামুটি কুমারসম্ভবে পার্বতীর রূপবর্ণনা একটু তরল করে নিলে এদের নামে স্বচ্ছন্দে চালিয়ে দেওয়া যায় আর কী… কিন্তু এতে ফানি কী হল?
“কিন্তু জানো, ওপরে শাড়ির মতো করে ব্লাউজ পরেছে, নিচে শাড়িটা প্যান্টের মতন করে পরেছে। এটা কী হল? এটা কি ফানি নয়?”
রহস্যটা পরিষ্কার হল, “না মা, ওরা বোধহয় মারাঠি। মারাঠিরা ওরকম করেই শাড়ি পরে মা, ধুতির মতন করে। যাদের যেরকম স্টাইল।”
—আচ্ছা বাবা, জারা’রা মুসলিম, তাই না?
এই রে! হঠাৎ এরকম সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন? হিন্দু-মুসলিম অবধি তুই পৌঁছলি কী করে?
—কে বলেছে মা?
—বাহ রে, জারাই তো বলল!
সে তো বুঝলাম, কিন্তু আলোচনাটা অ্যাদ্দূর গড়ালো কী করে?
—জারা তো সালোয়ার কামিজ পরেছিল, আর মাথা-টাথা ঢেকে একটা ব্ল্যাক রুমাল পরে এসেছিল। তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘হোয়াই আর ইউ ওয়্যারিং দিস?’ বলল, ‘উই আর তো মুসলিমস। তাই ওদের মেয়েদের পরতে হয়।’ তাই বাবা?
তাই বলো। যাকগে, তেমন সিরিয়াস ইস্যু না, “হ্যাঁ মা। অনেক জায়গায় মুসলিম মেয়েরা পরে।”
“মুসলিমদের ট্র্যাডিশনাল ড্রেস কী বাবা?”
সেরেছে! আমতা আমতা করে জবাব দিই, “যে যেখানকার মানুষ সে সেখানকার ড্রেস পরেন মা। অনেকে পোশাকের ওপর বোরখা পরেন। আমাদের বেঙ্গলে ভিলেজে যেমন অনেকে শাড়ি পরেন, অনেকে শালোয়ার কামিজ পরেন, অনেকে… তা জারাদের আসল বাড়ি কোন স্টেটে?”
“ইউএসএ।”
অ্যাঁ? আমি কি ঠিক শুনলাম? “ইউএসএ? নাকি ইউ পি বলেছে? তুই ভুল শুনেছিস?”
“না না, ইউএসএ থেকেই। আমি ঠিকই বলছি। আচ্ছা বাবা, শায়রাও তো মুসলিম, কই ও তো মাথায় ওরকম ব্ল্যাক স্কার্ফ পরেনি?”
মর যন্ত্রণা! সে আমি কী করে জবাব দেব?
“শায়রাও কি ইউএসএ থেকে এসেছে?”
—না। পাঞ্জাব থেকে। বলো না বাবা!
—ধ্যাত্তেরিকা। আমি কী করে বলব? তুই ওদের জিজ্ঞাসা করিসনি কেন?
—করলাম তো।
—তারপর?
—ওরা কিছু বলল না। কাড়াকাড়ি করে আমার টিফিনের রসগোল্লা দুটো খেয়ে নিল…
এবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি, “সে কী রে? সারাদিন না খেয়ে ছিলিস নাকি?”
“না না…” এইবার একটু শয়তানিমার্কা লাজুক হাসিটা বেরোয়, “ওদের টিফিনে কয়েকটা রাইস দিয়ে বানানো রুটি আর সবজি ছিল, আমিও ওদের থেকে কেড়ে খেয়ে নিয়েছি।”
অলিম্পাসটা টেনে নিয়ে উপুড় হয়ে শুই। থাক, নিজেদের মধ্যে এইরকম কাড়াকাড়ি করেই থাক।
যদ্দিন না ওদের ‘ঈশ্বর’ ভগবান আর আল্লাহয় ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছেন।
