দাঁত
দেখলাম নিজেকেই নিজে বাঁশ দিয়ে বসে আছি।
এতটা পড়ামাত্র অনেক মহাত্মাই যে খুব আগ্রহ সহকারে, ভারি হাসি-হাসি মুখ করে এগিয়ে এসেছেন আমার সেই হেনস্তার ইতিবৃত্ত জানার জন্যে, এ আমি আমার মানস-চক্ষে ‘স্পষ্ট’ দেখতে পাচ্ছি। সেই হাস্যোজ্জ্বল চোখ, অধরে বঙ্কিম হাসি, সেই হাসির মধ্যে “বেশ হয়েছে, উচিত শাস্তি” মার্কা হাবভাব দেখে গা’টা কেমন চড়বিড় করে উঠলেও, নেহাত সত্যের খাতিরে গল্পটা আমাকে বলে ফেলতেই হচ্ছে।
শনিবারে আমাদের ধর্মত ন্যায্যত ছুটি থাকে। কিন্তু এই শনিবার কোনো এক অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় ট্রেনিং-এর জন্যে লোনাভালাতে আমাদের, মানে কচি ও তত-কচি-নয় ম্যানেজারদের ডেরাডাণ্ডা বাঁধতে হয়েছিল।
লোনাভালা-খাণ্ডালা বর্ষার মরসুমে অতি চমৎকার জায়গা। স্থানমাহাত্ম্যে কলকাতা শহরের সঙ্গে বকখালি প্লাস দীঘার যা সম্পর্ক, মুম্বাইয়ের সঙ্গে লোনাভালা-খাণ্ডালার সম্পর্ক তার চেয়েও গভীর। মুম্বাই এয়ারপোর্ট থেকে তিন ঘণ্টা ড্রাইভ দূরে, পশ্চিমঘাটের ওপর এক ঘাঁটিস্থিত এই সর্বজনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পটটি বর্ষার সময় বিভিন্ন কর্পোরেট পক্ষী ও তত-বিবাহিত-নয় গোছের দম্পতিদের ভিড়ে ভিড়াক্কার থাকে।
বর্ষার লোনাভালার অপার্থিব সৌন্দর্যরূপ বর্ণনা করে হিংসুটেদের মনোবেদনার কারণ হতে চাই না। উঁচু-নিচু রাস্তার পাশ দিয়ে উঠে গেছে সবুজ কালো পাহাড়, ছলাচ্ছল শব্দে নেমে আসছে শত ঝর্ণার জল, গড়িয়ে নামছে ধোঁয়ার মতন মেঘেদের দল, গাঢ় সবুজ ঘাসের মধ্যে উঁকি দিয়ে মাথা দোলাচ্ছে লাল-গোলাপী-হলুদ রঙের ছোট-ছোট ফুল— আহা সে এক রূপকথার রাজ্য।
তা সেখান থেকে ট্রেনিং শেষে খুবই শিক্ষিত-দীক্ষিত হয়ে রোববার সন্ধে নাগাদ বাড়ি ফিরে, ব্যাগ-ট্যাগ রেখে হ্যা হ্যা করতে করতে জিরোচ্ছি, এমন সময়ে অব্যর্থভাবে তিনি…
এসেই দু’কান এঁটো করা হাসি উপহার দিয়ে বললেন, “বাব্বাআআআআ”
আমিও দাঁত কেলিয়ে বললুম, “কীইইই?”
তিনি আরো চওড়া হাসি হেসে বললেন, “বাব্বাআআআআআআআআ…”
আমিও আরো দাঁত কেলিয়ে বললুম, “কীইইইইই হয়েছে…”
তিনি আরোও চওড়াতম হেসে মাড়ি-ফাড়ি বার করে বললেন— ঝাব্বা আ আ আ আ আ আ আ আ আ আ আ…
আমিও আরোও বীভৎসভাবে দাঁত, চোয়াল, মাড়ি বার করে প্রায় গরিলা হাসি উপহার দিয়ে বললুম— কীইইইইইইইইইইইইই হয়েছে মা?
এ খেলা কতক্ষণ চলতো জানি না, বা চললে কী হত বলা মুশকিল। অন্তত মানবখোবড়ার ইলাস্টিসিটির একটা নয়া বিশ্বরেকর্ড স্থাপিত হতই। কিন্তু ব্যাপারটা ততদূর পৌঁছবার আগেই ভদ্রমহোদয়ার মাতৃদেবী গম্ভীর মুখে নিঃস্পৃহভাবে বললেন, “অত দাঁত খিঁচোবার কিছু হয়নি। ওর একটা দাঁত পড়েছে, সেটাই দেখাচ্ছে…”
আরিত্তারা… তাই তো, আমি তো এতক্ষণ খেয়ালই করিনি একেবারে! উপরের ডানদিকের মাড়িতে একটা ছোট্ট ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে যে! ফিকফিক হাসির শব্দটা যে ওখান থেকেই আসছিল, সেটা এতক্ষণে হৃদয়ঙ্গম হল। যাই হোক, খানিকক্ষণ চটকাচটকির পর তিনি দৌড়ে গিয়ে একটা ছোট কৌটো নিয়ে এসে আমাকে ভারি সমারোহে সেই সাত রাজার ধন এক মাণিকটি দেখালেন। আমি তো হেসেই খুন, “এ কী রে, ভাঙা দাঁতটা রেখে দিয়েছিস কেন? ফেলে দে!” তিনি জ্বলজ্বলে চোখে বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও, অমনি অমনি ফেলে দেব নাকি, বা রে? আমার ভালো দাঁতটা কী করে গজাবে, কী করে শুনি?”
কে যেন একটা সাতরঙা আলোর দীর্ঘ ফুলঝুরি বর্শার মতই বুকে বিঁধে দিল। সাদা-কালো সিনেমার মতন একটা ছেঁড়া-খোঁড়া দৃশ্য মনের পর্দায় ভেসে উঠল। একটা বছর আটেকের ছেলে হাতে একটা সদ্য উৎপাটিত দাঁত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠাকুমার সামনে, উৎপাটনের চিহ্নস্বরূপ হালকা কিছু রক্ত লেগে আছে দাঁতের গায়ে। স্নেহময়ী ঠাকুমা হেসে বলছেন, “অ মনু, কান্দো ক্যান? এয়া না হইলে বড় হইবা কী কইর্যা? সাহাগো পুহোইরে যাইয়্যা দাতখান ফালাইয়া দিয়া কইবা, ‘মাছ মাছ, তোমার দাতটা আমারে দাও, আমারটা ব্যাবাক লইয়া যাও’, কই বোঝলা কি না কথাডা?”
অন্তঃকরণে কি শুধুই রক্তপাত হয়? স্মৃতিসুধা ধারাস্নান হয়ে ঝরে পড়ে না সুপর্ণা?
যাই হোক, রোববারের সন্ধে। ঘরে একটা রেড লেবেল পড়ে ছিল। তার খানিকটা সদ্ব্যবহার করে, ডিনারাস্তে ঢুলুঢুলু চোখে শোওয়ার ঘরে এসে দেখি, কুরুক্ষেত্র…
শুধু কুরুক্ষেত্র বলা ভুল। কুরুক্ষেত্র, হাইদাসপিস, বুড়িবালাম, থার্মোপাইলি, রাম রাবণ, স্তালিনগ্রাদ সব ঘেঁটে ঘ… মা-মেয়েতে সে কী তুমুল বাওয়াল। তার আদ্দেক মেহনতে পুরো পাকিস্তান ঠান্ডা করা সম্ভব, অলিম্পিকে সব ক’টা সোনা হেঁটে হেঁটে ঘরে আসে, সুইস ব্যাঙ্কের ম্যানেজাররা হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে যাবতীয় কালো টাকা ফেরত দিয়ে যায়।
শেষে বহু কষ্টে দুই পক্ষকে থামিয়ে (বাঙালি বাবারা নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যে আবেদন জানাতে চাইলে কোথায় যোগাযোগ করতে হয় জানেন কিছু?), জানতে চাইলুম কেসটা কী? রাত-বিরেতে দুজনের’ই এমন প্রলয়ঙ্করী মূর্তি ধারণের কারণটা কী?
জানা গেল কন্যারত্নটির দাবি, শোওয়ার ঘরের জানালা খুলে রাখতে হবে, কারণ হ্যাজ। আর তার মাতৃদেবীর ডাঁটো বক্তব্য, কভি নেহি, জানালা আজিকে রহিবে বন্ধ, মত্ত আঁধারে স্তব্ধ!
গিন্নির জানালা বন্ধ রাখার কেসটা জলবত্তরণং। উনি কুকুর, ছুঁচো, আমি, আরশোলা ইত্যাদি পশুপাণীর সামনে দিব্যি ‘আমি কি ডরাই সখী ভিখারি রাঘবে!’ স্টাইলে ঝাঁসীর রাণীবৎ খাড়ায়া থাকতে পারেন। কিন্তু যদি সেই তাকে দেখেছেন কী… কী হয় বা কী হয় না— বলে বোঝানো দুষ্কর!
খুলেই বলি, টিকটিকি নামক ইয়েটিকে উনি যমরাজ প্লাস ডাইনোসর টাইপের ভয় করেন, ‘পঞ্চাশ পঞ্চাশ কোস দূর তক’ কাছে ঘেঁষেন না। টিকটিকি দেখলেই উনি যে রেটে চেল্লাতে থাকেন, বাড়িতে ডাকাত পড়লেও লোকে অমন চ্যাঁচায় না। যদি বাড়ির কোনো কোণায় টিকটিকির ল্যাজের ডগাটুকুও দেখা যায়, উনি আমাকে ঝাঁটা-লাঠি ধরিয়ে দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকেন। শেষে আমার যাবতীয় আস্ফালন দেখে সেই লিজার্ড মশাই খুবই বিরক্তি সহকারে ‘ধ্যাতেরিকা’ বলে গৃহত্যাগ করলে, উনি সতর্ক পায়ে ডিঙি মেরে ঘরে ঢোকেন, চট করে দেখলে মনে হয় মাইনশোভিত যুদ্ধক্ষেত্রে হেঁটে বেড়াচ্ছেন! একবার তো ঠাকুরঘরে অন্ধকারে একটা মিষ্টি দেখতে নধর কালো মতো টিকটিকির গায়ে হাত লেগে গেছিল বলে উনি তৎক্ষণাৎ দাঁত ছরকুটে অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। আমি তো মশাই হাঁ, কেসটা ফোর নাইন্টি এইটে যাবে কি না বুঝেই উঠতে পারছি না! আমাদের বাড়িতে টিকটিকি বলা বারণ, শোনা বারণ, ভাবা বারণ, এমন কী এহ বাহ্য, আমাদের বাড়ির সমস্ত ওয়াল ক্লক অবধি সাইলেন্ট, যাতে টিক টিক শুনে টিকটিকির কথা মনে না পড়ে…
অতএব এমতাবস্থায় রাত্তিরে বাড়ির জানালা যে বন্ধই থাকবে, এ কথা বলাই বাহুল্য। উনি সোঁদরবনের বাঘ অবধি একহাতে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু টিকটিকি? নৈব নৈব চ!
এখন নেগোশিয়েশনের রুলবুক অনুযায়ী একপক্ষ নিজের দাবিতে অনড় থাকলে অন্যপক্ষের ফ্লেক্সিবিলিটিটা টক করে জেনে রাখতে হয়। ফলে সেই তেনাকে যেই খুব নরম করে জিজ্ঞেস করেছি, “কী হয়েছে মা, জানালা খোলা রাখতে বলছ কেন?” উনি চট করে কোলে উঠে গলা জড়িয়ে ছলছল চোখে বললেন— জানালা খোলা না থাকলে টুথ ফেয়ারি আসবে কী করে শুনি? আর আমার নতুন দাঁতই-বা হবে কোত্থেকে, আর কয়েনই-বা কে দেবে হ্যাঁ? বলো, তুমিই বলো একবার?
টুথ ফেয়ারি? সে কী বা কে এবং কেন? আর কীসের কয়েন, অ্যাঁ?
অশেষ ধৈর্য ধরে নানাবিধ নিবিড় তাত্ত্বিক আলোচনার পর জানা গেল যে, টুথ ফেয়ারি একটি অত্যন্ত মিষ্টি গোছের পরীবিশেষ। ওঁর একমাত্র কর্তব্যকর্ম হল, তাবৎ শিশুকুলের দন্তরুচিকৌমুদীর খবরাখবর রাখা। তেনার ভাষায়, “কিড্সদের দাঁত পড়ে গেলে, ভাঙা দাঁতটা বালিশের নিচে রেখে ঘুমুতে যেতে হয়, বুঝলে? টুথ ফেয়ারি সেই দাঁতটা নিয়ে যায়, আর একটা করে কয়েন দিয়ে যায়, তুমি জানতে না? হ্যাঁ বাবা? জানতে না?” এর পরে আর না জেনে উপায় কী? সেই কয়েন দিয়ে দন্তবিরহী শিশুকুঞ্জে যে কিণ্ডারজয়, জেমস, ক্যান্ডিফ্লস আদি উত্তেজক ‘নশিলী’ পদার্থের সাপ্লাই অক্ষয় রাখা হয়, সে নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকার কথাও না!
প্রথমে বেশ হিংসে হল, বুঝিলেন? আমাদের সময়ে তো কই এসব কয়েন-টয়েন বিলোনো পরীরা ছিল না যে? আমাদের তো পুকুরের মাছের সঙ্গেই ‘দাঁতের বদলে দাঁত’ টাইপের বোঝাপড়া করে নিতে হত। তারপর কয়েকদিন ‘ফোগলা’ অপবাদ মাথায় বয়ে ওয়ান ফাইন মর্নিং সেই নতুন দাঁত গজানোর শিরশিরানি অনুভূতি। আহা, সেই অমলিন শৈশব, সেই সোনাবুরি-রঙের আনন্দঝর্ণা!
এতটা ভাববার পরেই ঠোঁট ফুলিয়ে তেনার দ্বিতীয় বক্তব্য, “লাস্ট উইকে তনিসীর দাঁত পড়ে গেছিল, তুমি কি জানো, টুথ ফেয়ারি এসে ওর বালিশের নিচে কত কয়েন রেখে গেছিল?”
—কত রে?
খুব সন্তর্পণে প্রশ্নটা পেশ করি।
—ফাআআআাইভ ল্যাথস কয়েন্স, বুঝলে?
শুনেই যুগপৎ চমকিত ও ভাবিত হয়ে পড়ি। দাঁতের বাজার তো খুবই তেজি যাচ্ছে দেখি, অ্যাঁ? শিশুদের দুধের দাঁত যদি ফাইভ ল্যাখস হয়, আমার এই পাকা-পোক্ত চিকেনের ঠ্যাং চিবোনো দাঁতের রেট কি অন্তত কুড়ি অবধি উঠবে না? গিন্নিকে হাতুড়িটা আনতে দেব কি না ভাবতে ভাবতে আনমনে জিজ্ঞাসা করলুম— কে বলল তোকে যে, ফাইভ ল্যাখস কয়েন্স রেখে গেছে টুথ ফেয়ারি?
—বাহ, আন্টি বলল তো! আন্টি কি মিথ্যে বলবে বাবা, হ্যাঁ? মিথ্যে বলবে কি আন্টি? তুমি যে বলো বড়রা মিথ্যে বলে না, তাহলে?
বিশ্বাস করবেন না দাদা, প্রথমে মনে হল দৌড়ে ওদের ফ্ল্যাটে গিয়ে ভদ্রমহিলার মাথাটা দুম করে দেওয়ালে ঠুকে দিই। এত্ত বড় পেজোমিটা আমার মেয়ের সঙ্গে না করলেই চলছিল না, অ্যাঁ? বলি সেদিন যে বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় করে তোর জন্যে যে পোস্তবাটা আর ভাপা ইলিশ দিয়ে এলুম, কৃতজ্ঞতা ব্যাপারটা কি পাওয়াই লেকে ডুবা ডুবাকে মারা হ্যায় নাকি রে রাক্ষুসী!
সে যাই হোক। অতঃপর ভীষণ ভাবগর্ভ আলোচনাতে, ‘মিনিমাম কমন এজেন্ডা’ টাইপ মতৈক্যে পৌঁছানোর পর, দুইজনের অনুমত্যানুসারে স্কেল মেপে এক ইঞ্চির চুয়াত্তর ভাগের পঞ্চান্ন ভাগ মতন জানালা খোলা রাখা স্থির হল। কী পরিশ্রম সাধ্য আয়াসে এ অসম্ভব সম্ভব হয় সে নিয়ে সিরিয়াস গবেষণা করলে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি যে নেক্সট দশ বছরের ‘শান্তির জন্যে নোবেল’ এই গলাতেই ঝোলাতেন, সে নিয়ে আর সন্দেহ কি?
তা অতঃপর তিনি তো সেই ক্ষুদ্র ছিন্নদন্তটি বালিশের নিচে রেখে ঘুমোতে গেলেন। আমিও সেই শিশু ভোলেমাইয়ার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবলুম অতঃ কিম? কয়েন তো প্রচুর আছে বাড়িতে। তারই একটা রেখে দিই বালিশের নিচে? কিন্তু, আর কিছু চমক, উঁ উঁ উঁ, যাতে তনিসীর মায়ের মুখে বেশ কড়া করে ঝামা ঘষে দেওয়া যায়, এমন আর কি কি… উঁ উঁ উঁ…
পেয়েছি! বিদ্যুৎচমকের মতই মনে পড়ে গেল যে, বেশ কিছু বছর আগে, আমার তৎকালীন কর্মক্ষেত্র থেকে কোনো এক ছোট-খাটো ইন্সেন্টিভ স্কিমে একটা পাঁচ গ্রামের গোল্ড কয়েন দিয়েছিল বটেক। বাকি সব গয়নাগাটি কলকাতার লকারে থাকলেও, এইটি আমি সদাসর্বদা নিজের সঙ্গে রাখি। হি হি হি। সকালে উঠে কেমন চমকে যাবে না আমার ঘুঞ্চুকলিটা? হি হি হি। হাসতে হাসতেই আমি উঠে আলমারি খুলে ফাঁকা লকার থেকে কয়েনটা বার করে আনলাম। তারপর বালিশের নিচে হাত ঢুকিয়ে দাঁতের বদলে কয়েন রাখতে আর কতক্ষণ? গিন্নি দেখলাম, সরু চোখে পুরো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করে গম্ভীর মুখে অন্য দিকে পাশ ফিরে ঘুমোতে গেলেন।
সেদিন রাত্রে ঘুমটা হয়েছিল চমৎকার, সে কথা স্বীকার করতে আমি বাধ্য। সেসব চিত্তাকর্ষক শিক্ষামূলক স্বপ্নের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে সুধী পাঠকবৃন্দের ঈর্ষার কারণ হতে আমি চাই না। ভোরবেলার দিকের স্বপ্নটা তো মশাই…
তা সকালবেলা ঘুম ভাঙলো একটা মিষ্টি হামি, আর চিল চিৎকারের সঙ্গে, “ঝাব্বা, দেখো, টুথ ফেয়ারি কী দিয়ে গেছে, একটা গোল্ড কয়েন। এটা গোল্ড কয়েন না, হ্যাঁ বাবা? মা বলল যে, এটা গোল্ড কয়েন? ভালো না বাবা, হ্যাঁ বাবা, গোল্ড কয়েন ভালো, না?”
কী বলব মশাই। মেয়ের আনন্দ দেখে আমার চোখে তখন অটোমেটিক্যালি জল। আহা, এই কি বাৎসল্যসুখ? এর থেকে বেশি আনন্দ আর জীবনে কিছুতে হয় নাকি কত্তা? এইভাবেই তো ওরা আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠবে, জীবনের সমস্ত ভালো কিছু যেন ওদের নাগালের মধ্যে আসে। দুঃখ-শোক-বেদনা থেকে যেন ওরা অনেক দূরে থাকে, যেন পাখির মতন লঘুপক্ষ হয়, আকাশের মতন উদার হয়, পাহাড়ের মতন বিশাল হয়… সেই যে কবি বলেছিলেন, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”… আহা ওরা যেন দুধে-ভাতে-রাবড়িতে-বিরিয়ানিতে…
ভেসেই যাচ্ছিলাম, বুঝলেন। গিন্নি তখন তেনাকে স্কুলে যাবার জন্যে রেডি করছিলেন। আমার প্রশান্ত ভাব-ছলছল মুখ-চোখ দেখে শুধু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে একবার বললেন, “এইটে কিন্তু ওর জাস্ট সেকেন্ড দাঁত, কথাটা খেয়াল আছে তো?”
আমি তখন কথাটা ঠিক শুনিনি, বা শুনলেও তার অন্তর্নিহিত মর্মার্থ প্রণিধান করিনি। আবেগে তখনো গলার কাছটা ধরে আছে, চোখ দুটো ভিজে। তিনি ড্রেসট্রেস পরে তৈরি, নিচে স্কুলবাস এসে হর্ণ দিচ্ছে, বেরোবার আগে তিনি ছুটে এসে একটা কিস করে হাসিমুখে বললেন, “এরপর একটা করে দাঁত পড়লেই টুথ ফেয়ারি এসে একটা করে গোল্ড কয়েন দিয়ে যাবে, তাই না বাবা? হ্যাঁ বাবা, তাই না? টুথ ফেয়ারিটা কি ভালো না বাবা? তনিসীর থেকে আমার টুথ ফেয়ারিটা বেশি ভালো না বাবা?”
এইবার বক্তব্যটি পূর্ণরূপে কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল, এবং বোঝা মাত্রই হৃদয়ঙ্গম করিলাম, কী সর্বনাশটি ঘটাইয়াছি! মানে এরপর প্রত্যেকবার ইঁয়ার দাঁত পড়িলেই (যে ঘটনা আরো বেশ কয়েকবার ঘটিবেই), একটি করিয়া পাঁচ গ্রামের গোল্ড কয়েন সাপ্লাই করিতে হইবেক, পনেরো হাজারের কাছাকাছি যার বাজার দর। এইবারেরটা না হয় আমার কাছে ছিল, এর পরেরগুলো? যদি আর ছ’টা দাঁতও পড়ে, তার মানে ছয় পনেরোং নব্বই, প্রায় লাখ টাকার কাছাকাছি একটি বংশদণ্ড!
হে দয়ার্দ্র পাঠক, এই মুহূর্তে যে লোকটিকে আপনি বালিশ-চাদর-মশারি ইত্যাদি পরিবৃত হয়ে ইতোনষ্ট-ততোভ্রষ্ট অবস্থায় থম মেরে বসে থাকতে দেখছেন, তাঁকে এড়িয়ে চলুন। সহানুভূতি নয়, টিটকিরিও নয়, হাসি-ঠাট্টা তো নয়ই, উনি কিন্তু কামড়ে দিতে পারেন, ওঁর মাথার ঠিক নেই।
কী? কী জিজ্ঞেস করলেন? এই মুহূর্তে উনি নিজের মুখের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে কী খুঁজছেন?
উনি এখন দাঁত খুঁজছেন দাদা, নিজেরই আক্কেলদাঁত…
