বাক্যরচনা – অভীক সরকার

বাক্যরচনা

রবিবারের দুপুর। গণেশ চতুর্থী উপলক্ষ্যে তিনদিনের টানা ছুটি। সেই সুযোগে গল্পের ওপর অন্ধের মতো একটা প্রবন্ধ লিখছি, থেকে থেকেই রান্নাঘর থেকে একটা ইলিশ রান্নার মনকাড়া সুবাস এসে মনটা উদাস করে দিচ্ছে, এমন সময় পিঠে একটা খুব সন্তর্পণে খোঁচা খেয়ে দেখি, আর কেউ নয়, স্বয়ং তিনি।

চোখ ছলছল, মুখ ভার।

উঠে বসতেই হয়, “কী হয়েছে মা?”

—আমি তোমার কাছে স্টাডি করব।

বুঝলাম, মা-মেয়ের সকালের কুরুক্ষেত্রের জের। কিন্তু এদিকে লেখা জমা দেওয়ার সময় এগিয়ে আসছে, শিয়রে সংক্রান্তি। এখন পড়াতে বসলে…

গলাটা ভারী মিষ্টি করে বললাম, “রতিশার সঙ্গে খেলতে যাবি? চল দিয়ে আসি।”

—রতিশা নেই, লখনো গেছে।

—অ, তাহলে চল তনিসীকেই ডেকে দিচ্ছি।

—ওরা ঘুরতে গেছে, গোয়া।

ভাবলাম, এখনই ফোন করে তনিসীর বাবাকে দুটো বাছাবাছা দিই। এদিকে আমার লেখা জমা দেওয়ার টাইম চলে যাচ্ছে, আর আপনি গোয়াতে গিয়ে… বলি পরের সুবিধা-অসুবিধাটাও তো দেখতে লাগে মশাই…

—ইরা? সৃষ্টি?

—মামাবাড়ি গেছে।

—আইশরইয়া? (ঐশ্বর্যের এমন চমৎকার প্রাণকাড়া উচ্চারণ খুব সম্ভবত রাই বিনোদিনী ফেমাস হবার পর থেকেই!)

—উফফ। তুমি পড়াবে কি পড়াবে না বলে দাও তো!

সেই রোষকষায়িত লোচনের সামনে উঠে পড়তেই হয়। নোটসের ডায়েরি আর ট্যাবটা সরিয়ে রাখি।

“কী পড়বি বল! ম্যাথস?” (কয়েকটা শক্ত শক্ত সামেশন আর সাবস্ট্রাকশন দিয়ে যদি আধঘণ্টা ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখা যায় আর কী!)

“না, ইংলিশ পড়ব। হাউ টু কনস্ট্রাক্ট এ সেন্টেন্স।”

ছোটবেলার বাক্যরচনার ক্লাসের কথা মনে ভেসে এল, বিস্মৃতির অতল থেকেইবা… রীণাদির হাতের কানমলা আর ক্লাসের বাইরে রোদ-ছায়ার কাটাকুটি খেলা দেখতে দেখতে দুলে দুলে বাক্যরচনা মুখস্থ করা। সেই জিয়নকাঠির মতো স্মৃতি, অলৌকিক সব মায়াঘোর দিন।

“দশটা সিম্পল ওয়ার্ডস দিচ্ছি, বুঝলি, দশটা সেনটেন্স বানিয়ে লেখ দেখি। সবকটা ঠিক হলে বিকেলে ক্যাডবেরি, ওক্কে?”

“হুঁ হুঁ হুঁ ক্যাডবেরি না, কিন্ডার জয়, হুঁ হুঁ হুঁ…”

যথাবিধি প্রতিশ্রুতি দান করে খাতাটা টেনে নিই, আর দশটা সিম্পল শব্দ ভাবতে থাকি।

মিনিট খানেক পর খেয়াল হল যে, একটাও সিম্পল শব্দ মাথায় আসছে না। অডিট, রিকনসিলিয়েশন, রিগ্রেসন অ্যানালিসিস, অলেফ্যাক্টরি সেন্সিবিলিটি, প্রাইস ইলাস্টিসিটি— ইত্যাদি দিয়ে ক্লাস টুয়ের একটা শিশুকে বাক্যরচনা করতে দেওয়াটা নেহাত বাজে ধরণের অত্যাচার হবে বলেই একটা কুটিল সন্দেহ হতে লাগল।

শেষে অনেক কষ্টেসৃষ্টে দশটা শব্দ খুঁজে-পেতে বার করে তেনার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি তেনার মায়ের একটা ওড়না মাথায় জড়িয়ে, জামার ফিতে চিবোতে-চিবোতে জুলজুল করে আমার দিকে চেয়ে আছেন, আমি তাকাতেই সলজ্জ ভঙ্গিতে বললেন, “আমাকে কেমন দেখতে লাগছে বলো তো?”

টেনে হাতে খাতা-পেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে বললাম, “টেন মিনিটস-এর মধ্যে দশটা সেন্টেন্স চাই, বুঝেছিস? নইলে বিকেলে কিণ্ডারজয় তো ভুলেই যা, আরো দশটা সাম করতে দেব।”

তিনিও লক্ষ্মী মেয়ের মতন খাতা-পেন্সিল নিয়ে বসে গেলেন। আমিও ট্যাব নিয়ে কাজকর্মে লেগে পড়লুম।

মিনিট পনেরো বাদে, যখন লেখার মধ্যে বেশ মন বসে গেছে, ঠকাস করে কোলের ওপর সেই খাতা এসে পড়ল।

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, খাতা দেখতে লাগলুম।

প্রথম শব্দতেই চমক, সার্থক ঔপন্যাসিকের মতই। শব্দ দিয়েছিলাম ‘বিল্ড’, তিনি লিখেছে, ‘বিল্ডার্স বিল্ড বিল্ডিংস’। খাঁটি সত্যবচন। ফলে রাইট দিয়ে পরের শব্দ, ‘ম্যান’।

‘মাই ফাদার ইজ অ্যা ম্যান’।

আনন্দে গর্বে গা-টা ছমছম করে উঠল। স্যারেরা যে বলতেন, “তোর মতো গাধা পিটিয়ে মানুষ করা আমাদের কম্ম নয়” — সে নিয্যস বাজে কথা তাহলে? বা সেদিনকেই যে ফোনে মাতৃদেবী বললেন, “তুই আর মানুষ হলি না”, সেটাকেও নেহাত খরচের খাতাতেই ফেলতে হচ্ছে দেখছি! আনন্দাশ্রু মুছে পরের শব্দের দিকে, ‘শাউট’।

‘মাই মাদার অলওয়েজ শাউটস অ্যাট মি’।

এবার ভাবিত হতেই হল। সত্য যে কঠিন, কিন্তু উদ্দিষ্ট ভদ্রমহিলাটি কি ‘সে কখনো করে না বঞ্চনা’ বলে এমন কঠোর সত্যকে জাপ্টে ধরতে রাজি হবেন? উঁহু, মনে তো হয় না! যাগগে যাক, পরের শব্দ, ‘হোম’।

‘আই হেট মাই হোম ওয়ার্ক।’ এইবারে খুবই সতর্ক হতে হল। এতটা কঠিন-কঠোর সত্য কি দেশ-জাতি-সমাজ, সর্বোপরি এনার মা সহ্য করে উঠতে পারবেন? নাহ… আচ্ছা বাকিগুলো দেখি…

বাকি সব মনিমুক্তো ছড়ানো অতি উচ্চমার্গের সাহিত্য স্রোত সাঁতরে-টাতরে পাড়ে উঠে দেখি শেষ শব্দ, ‘গড’।

এবং ফাঁকা! তিনি কিছুই লেখেননি!

চোখে জল এল, হৃদয়ে ভক্তিরঙ্গমালা। এ মেয়ে আমার নির্ঘাত ক্ষণজন্মা। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, “ব্রহ্ম এঁটো হয়নি”, অসাথ্য ঈশ্বর কী, তা মুখে বলা যায় না। আহা, সাধিকা মেয়ে আমার, এক্ষেত্রে সেইটেই প্রকাশ করেছে গো।

কিন্তু শিক্ষাদায় বড় দায়! ফলে গলাটা কড়া করে বলতেই হল, “এইটে লিখিসনি যে? নে লেখ!”

তিনিও ব্যাজার মুখে পেন্সিল চিবোতে চিবোতে খুঁ খুঁ করতে করতে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলেন।

বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশে মেঘ। থমথম করছে। এবারে একটু বেশিই বৃষ্টি হচ্ছে মুম্বাইতে। গত দু’বছরের ঘাটতি এবছরেই মেরে দেওয়ার তাল আর কী! আজকেও বৃষ্টি এল বলে। একটা পাতাও নড়ছে না, চারিদিক চুপচাপ, নিচে বাচ্চাদের খেলার আওয়াজ নেই। বেশ একটা গম্ভীর টেনশনের আবহাওয়া…

এমন সময়ে ফের থপাত করে কোলের ওপর খাতা এসে পড়ল। তারপর তিনি নাচতে নাচতে ডোরেমন দেখতে চললেন।

খাতা উলটে দেখি, পাঁচ মিনিটের পরিশ্রমের ফসল সেই বিশাল বাক্যবন্ধটি, “গড ইজ নাইস।” ফিক করে হেসে ফেললাম। বাইরে তাকিয়ে দেখি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, মৃদুমধুর হাওয়াতে খুশি-খুশি মাথা দোলাচ্ছে বাগানের গাছগুলো। গুমোট ভাবটা আর নেই, জানালা খুলতেই ঠান্ডা মিষ্টি হাওয়া হু হু করে ছুটে এল বুকে।

ভাবলাম, ঈশ্বরও বুঝি এতক্ষণ দমবন্ধ করে সিঁটিয়ে ভাবছিলেন, মেয়ে কি লেখে গডের ব্যাপারে! তারপর ‘নাইস’ হবার এত বড় সার্টিফিকেটটা পেয়ে ভদ্রলোকের খুশি আর ধরছে না।

জানালা খুলে বৃষ্টির ছাঁটে ভিজতে ভিজতে এক ম্যানলি ফাদার আর এক নাইস গড হাসতেই থাকল, হাসতেই থাকল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *