প্রিন্সেসের বায়না – অভীক সরকার

প্রিন্সেসের বায়না

শিশুর যে কী ভালো লাগে আর ভালো লাগে না, সে বলা ভারী মুশকিল। আমাদের দুনিয়াদারির লোভী চোখে যে জিনিসটা দেখতে পেলে মন আঁকুপাঁকু করে ওঠে, (“আহা, ওটা হাতে পেলে কী ভালোই না লাগতো”), সেই একই জিনিস হাতে দিয়ে দেখুন, কোনও লক্ষ্মীছানা গোলাপী ঠোঁট উল্টে বলেই ফেলবে, “ধ্যুৎ, এইটা বাজে, পচা, বিচ্ছিরি।” আর যে তৃণাদপি তুচ্ছ বস্তুটি দেখে আমরা হয়তো ফিরেও তাকাবো না, “অ্যা মা ছিছি” বলে এড়িয়ে যাব, দেখুন সেই পেয়েই হয়তো ডাগর চোখে উপচে পড়ছে একপুকুর খুশি। যে কোনো শিশুর কার্যকলাপ লক্ষ্য করলেই ব্যাপারটা জলবত্তরং হবে। এই হয়তো পুরোনো নারকেল তেলের কৌটো আর দুটো আঁটি নিয়ে সে ভারী উল্লাসে ডগোমগো, নতুন খেলনাতে তার বিলকুল মন নেই। আবার এই দেখলেন, বায়না ধরে নতুন কেনা জামা-জুতোর দিকে সে দৃকপাত অবধি করছে না, অথচ সেই জুতোর বাক্স দিয়ে পাখির ‘নিউ হোম’ বানাতে তার বিপুল উৎসাহ ফেটে পড়ছে প্রায়।

তবে এরও রকমফের আছে। আমার আশৈশব অভিজ্ঞতা বলে যে, শিশুছেলেদের তুলনায় শিশু নারীরা চিরকালই একটু বেশি বুঝদার, একটু বেশি পাকা হয়। যেখানে সমবয়সী ছেলেটি হয়তো চোপসানো ফুটবল নিয়েই খেলাধুলো করে নেচেকুঁদে একশা, সেখানে দেখবেন বাচ্চা মেয়েটি প্রায় তার মাতামহীতুল্য অটল গাম্ভীর্য সহকারে পুতুলের পরিচর্যায় ব্যস্ত।

নারীবাদীরা এক্ষুণি হইহই করে উঠবেন এই বলে যে, কেন বাপু, মেয়েদের সবসময় পুতুলই দেওয়া কেন? এতে করে শিশুবয়স থেকেই এদের চিত্তে জেন্ডার বায়াসনেসের বিষচারাটিকে পুঁতে দেওয়া হচ্ছে না কি? কিন্তু বিশ্বাস করুন মা জননীরা, আমি আমার কন্যারত্নটিকে ছোটবেলা থেকেই পুতুলের সঙ্গেই বন্দুক, ফুটবল ইত্যাদি দিয়ে দেখেছি, উনি চিরকাল যাবতীয় পুরুষালি স্পোর্টসদ্রব্যে যৎপরোনাস্তি নাক সিঁটকেছেন, পরিবর্তে সযত্নে বুকে তুলে নিয়েছেন এলসা বা অ্যানার পুতলি। স্পাইডারম্যান আর হি-ম্যানের পুতুল কিনে এনে দেখেছি মেয়ে তাদের মনে-প্রাণে তার মায়ের ওড়না নিয়ে শাড়ি করে পরানোর চেষ্টায় রত! এসব দেখে চিত্তে প্রভূত দুঃখ যে পেয়েছি সে কথা বলাই বাহুল্য। অমন কৈশোরচিত্তজয়ী বাহুবলী হি ম্যানের কোমরে ঘাঘরা আর ঠোঁটে লিপিস্টিক দেখে কোন বাপের প্রাণের ব্যথা চাগাড় দিয়ে ওঠে না বলুন? এর বাহ্য, আরও শুনুন। মেয়ের ব্যথা লাগবে বলে কান বেঁধাতে বারণ করে দিয়েছিলাম। আহা, অমন নরমসরম মেয়ে আমার। একটু চোখ পাকিয়ে তাকালেই কেমন ছোট্ট-ছোট্ট গোলাপী ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমান করতে বসে, বলি কান বেঁধাতে ওর ব্যথা লাগবেনি? ফলে আমি তো মশাই ফরমান জারি করে অফিসকাছারি করে বেড়াচ্ছি। ও মা, তারই মধ্যে একদিন বাড়ি এসে দেখি তিনি দিব্যি দু’কানে দুটি ছোট-ছোট সোনার দুল পরে আলোঝলমল মুখে বসে আছেন। আমি তো হাঁ! ওনার মাতৃদেবীকে রাগে গরগর করতে করতে মিষ্টি করে শুধোলুম, “হ্যাঁ গা ভালোমানুষের মেয্যা, আমি যে মানা করলুম মেয়ের কান বেঁধাতে…”, কথা শেষ হওয়ার আগেই ভদ্রমহোদয়ার বদলে ক্ষুদ্রমহোদয়াই ঠোঁট ফুলিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন, “বা রে, আমার বুঝি সাজতে ইচ্ছে করে না?”

আমার কোনো দোষ নাই!

মাঝেমধ্যে এসব বায়না বড় বিপজ্জনক রূপ নেয়। রোববার সকালে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছি, এমন সময় তেনার প্রবেশ, অত্যন্ত সিরিয়াস মুখে আমাকে প্রশ্ন, “বাবা, জাপান এখান থেকে কত দূর?”

কাপে চা প্রায় চলকে উঠছিল। আক্রমণটা কোনদিক থেকে আসতে চলেছে ভেবে মনে মনে প্রমাদ গুণি, তারপর গলা খাঁকরে বলি, “ইয়ে বেশ খানিকটা দূর, ফ্লাইটে করে যেতে হয়। কেন মা!”

মেয়ে উত্তর শুনে ‘ভারী নিশ্চিত হলুম’ টাইপের মুখ করে বললেন, “বেশ বেশ, কাল সকালে চলো তো, একটু জাপান ঘুরে আসি, পরশুই ফিরব কিন্তু, কেমন?”

রান্নাঘর থেকে একটা খুক খুক কাশির শব্দ ভেসে আসতে বুঝলাম গৃহিণী হাসি চাপার চেষ্টা করছেন প্রবলভাবে। আমি খানিকক্ষণ হাঁ হয়ে থেকে কাতরস্বরে বললুম, “কাছাকাছি কোথাও হত না?”

—উম্ম, তাহলে চিড়িয়াখানা চলো।

জাপানের সঙ্গে চিড়িয়াখানার এমত সরল সমীকরণ শুনলে জাপানীরা যে দলে দলে ‘নিপ্পন আকিহিতো বনসাই টেকোমতো’ বলে আর্তনাদ করে দলে দলে হারাকিরি করত, এ বিষয়ে আমার মনে কোনো’ই সন্দেহ নাই।

এর বাহ্য, সেদিনের কথা শুনলে তো আপনি তাজ্জব হয়ে যাবেন মশাই? অফিস থেকে ফিরে চাট্টি অনাথ বাদামছানা দিয়ে শুকনো মুড়ি চিবোচ্ছি, গিন্নি পাশে বসে কানের কাছে সামান্য প্রেমালাপ করছেন, যথা, “একটু বাজার যাও, বুঝলে। চাল বাড়ন্ত, ভালো দেখে তিন কিলো চাল আনবে। গতবারেরটা আনবে না, সিদ্ধ হতে সময় নেয়। এক কিলো আলু আনবে, মাঝারি সাইজের জ্যোতি আলু, বেশি বড়-বড় আনবে না, একশো হলুদ গুঁড়ো আনবে, তিনটে কাঁঠালিকলা, যেন কালো না হয়। খবরদার চারটে আনবে না, ফর্সা দেখে চারটে হাঁসের ডিম…”

“ফর্সা দেখে হাঁসের ডিম মানে? আমি কি এখন হাঁসের কমপ্লেক্সন দেখে ডিম কিনতে বেরোব নাকি? ই কী আব্দার প্রিয়ে?”

“আহ্, ডিমটা যেন পরিষ্কার হয়, মানে গায়ে ইয়ে না লেগে থাকে।”

এরকম খুবই আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝখানে হঠাৎ রঙ্গমঞ্চে তিনি। এবং একা আসেননি, হাতে নিয়ে এসেছেন তাঁর মাতৃদেবীর একটি হুতকুৎসিত রঙচটা ম্যাক্সি, যেটা আমি অনেক রাগারাগি করার পর ভদ্রমহিলা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, (“পরে যা আরাম না, তুমি কী বুঝবে?” ইত্যাদি)। আমরা তো যথারীতি অবাক।

“ও কী রে, ওটা নিয়ে এসেছিস কেন?”

“মা…” কণ্ঠস্বরে সে কী নির্মল আকুতি।

“কী?”

“তুমি কি আমার বিয়েতে আমাকে এইটা দেবে?”

আমরা চমকিত, বিস্মিত, স্তম্ভিত, বাকরহিত, বিচলিত… মানে যা যা হওয়া সম্ভব!

“এ কী কথা সোনাই! ওইটে কেউ কাউকে দেয়? ওটা কি একটা দেওয়ার জিনিস? তুমি আর চাইবার জিনিস পেলে না?”

অত্যন্ত কঠিন ও গম্ভীর মুখে তিনি প্রস্থান করেন বটে, কিন্তু খানিকক্ষণ বাদেই খুকিবিবির প্রত্যাবর্তন, হাতে আমারই একখানা বহু পুরনো, ছেঁড়া-ফাটা জিন্স। গিন্নি এগুলো জমিয়ে রাখেন বাসনওয়ালার কাছ থেকে এর বিনিময়ে চিল্লাচিল্লি করে খানকয়েক হাঁড়িকুড়ি কিনবেন বলে। সেখান থেকে ইনি এটি উদ্ধার করেছেন…

“ও কী, আবার এইটা কেন?”

“বাবা” কন্ঠস্বরে সেই একই আকুতি শুনেই সন্দেহ হতে থাকে। কড়া গলায় জিজ্ঞেস করি, “কী হয়েছে?”

“আমার বিয়েতে…”

“একদম না। তোমার বিয়েতে এসব কিছুই দেওয়া হবে না।” বিরক্তই লাগতে থাকে। কষ্ট করে টাকা জমাচ্ছি গুছিয়ে লেখাপড়া শেখাব বলে, এই পাঁচ কী ছয় বছর বয়সেই তোর এত বিয়ে বিয়ে বাই কীসের, খুইলা কও দেহি মাইয়া!

এতটা ভেবেছি কী ভাবিনি, বিশ্বাস করবেন না মাইরি, তিনি মেঝেতে শুয়ে পড়ে হাত-পা ছুঁড়ে-ছুঁড়ে তারস্বরে শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে লাগলেন, “ভ্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁ অ্যাঁ, তোমরা কি আমার বিয়েতে আমাকে কিছুই দেবে না?”

আমরা তো হতভম্ব, হতচকিত, হতবুদ্ধি!

তবে সেদিন তিনি যে বায়নাটি জুড়েছিলেন তার তুলনা ভূ-ভারতে নেই। শুনুন তবে সে কাহিনী।

প্রিন্সেসের আদি বাড়ি, মানে এই অধম যে বাড়িতে থেকে খেয়ে-পরে এত বড়টি হয়েছেন, সেটি ভেঙে অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি হইতেছে। ফলে প্রিন্সেসের ঠাম্মি আর দাদু আপাতত ঠাঁইনাড়া, তেনারা নিকটবর্তী অন্য একটি বহুতল ফ্ল্যাটে আশ্রয় নিয়েছেন। এইয়্যা রেইয়ানেরই কাহিনী।

ভাইফোঁটার আগেরদিনের গল্প। বিকেল হয়েছে, হাওয়ায় অল্প শীত-শীত ভাব। দাদু গেছেন বাজারে, পরের দিন বাড়িতে বিশাল হই হই হবে, তারই প্রস্তুতি নিতে। ঠাম্মি ঠাকুরঘরে বসে পুজো করছেন। চারিদিকে প্রসন্ন ভাব, পরিষ্কার আকাশ, হাসিখুশি বাতাস, কাকেরা উড়ে উড়ে মিষ্টি করে কা কা ডেকে বেড়াচ্ছে, গোয়ালা রামভজন সাইকেলের দু’পাশে দুধের বড় ডিব্বা ঝুলিয়ে করপোরেশনের কল থেকে বোতলে জল ভরছে, পাশের বাড়ির বিড়াল বিধুমুখী কাকে দেখে যেন লেজ তুলে পাঁচিল থেকে নেমে রওনা দিল, সকালের কচি রোদ এসে বারান্দায় লুটিয়ে পড়ছে, সবকিছুই বড় মনোরম। এমন সময়… এ কী? কীসের… কাদের হাত ওটা?

ওরা কারা?

পাঠক, এইবারে সোজা হয়ে বসুন, শুরু হতে চলেছে এক রোমহর্ষক দিনেদুপুরে ডাকাতিয়া কাহিনী।

দাদু-ঠাম্মির ফ্ল্যাটের বারান্দার সেই রোদে ফুটে উঠল তিনটে অশুভ ছায়া। উফ, কী দীর্ঘ দেহ তাদের। পাশের বাড়ির কার্নিশ বেয়েই যেন নেমে এল তিনজন জলজ্যান্ত দস্যু! সেই তিন মূর্তিমান, একজন সাইজে বড়, সেই দলের পাণ্ডা, আর দুজন ছোট সাইজের দুর্ধর্ষ দুশমন কুঁজো হয়ে বসল বারান্দাতে। চোখে তাদের ভয়ানক ক্রূর দৃষ্টি, লোমশ কালো হাত, তাদের দিকে তাকালেই ভয় লাগে। তারা এদিক-ওদিক দেখল, তারপর তাদের খেয়াল হল যে, বারান্দা আর ঘরের দরজা খোলা। তাদের ভাবভঙ্গিতে ফুটে উঠল চাপা হিংস্র উল্লাস। ধীরে, অতি ধীরে, অভ্যস্ত হাতে পাল্লাটা ঠেলে সরালো তারা, তারপর পা টিপে টিপে পুরো ঘর পেরিয়ে তারা ঘুরল ডানদিক। আর ঘুরেই দেখল যে, ঘরের অন্যদিকে এক অরক্ষিত দুর্বল প্রতিরোধহীন প্রৌঢ়া ঠাকুরপুজোয় মগ্ন।

এদিকে দাদু তখন বাজারপত্র করে ফিরেই আসছিলেন। তিনি গলির মোড় ঘুরেই দেখলেন যে, তিন মূর্তিমান খোলা দরজা দিয়ে স্রেফ বাড়িতে ঢুকে গেল।

ব্যস, আর যায় কোথা! তিনি ভারী ব্যাগ সেখানেই নামিয়ে রেখে দুমদাড় করে বাড়ির দিকে ছুটে আসতে লাগলেন, (আহা, ঠাম্মিকে তিনি বড় ভালোবাসেন কি না!) আর চেঁচাতে লাগলেন,

“হনুমান, হনুমান। ও গো শুনছ, ঘরে হনুমান ঢুকেছে… শিগগিরি দরজা বন্ধ করো…” এই শুনে তো আশেপাশের লোকজন হুড়মুড়ুম করে বেরিয়ে এসেছে, ‘কই হনুমান’, ‘কীসের হনুমান’, ‘কেন হনুমান’ ইত্যাদি শোরগোল করে বেহদ্দ নৌটঙ্কি জমিয়ে তুলেছে, এমন সময় ঠাম্মি কী করছেন?

ঠাম্মির চোখে মাইনাস আট পাওয়ারের চশমা, এই চশমা ছাড়া তিনি অন্ধ। রোজই তিনি পুজোর শেষে চশমা খুলে ভারীই ভক্তিভরে “গুরুদেবওওও দয়া করো দীনজনে” গেয়ে থাকেন। চশমা খোলার কারণ হচ্ছে এই যে, এই সময় ঠাম্মি কিঞ্চিৎ কেঁদে থাকে, যাতে চশমায় চোখের জল লেগে না যায় তাই চশমা খুলে রাখা। কান্নাকাটি অবশ্য ঠাম্মির হ্যাবিট, ফেভারিট পাস টাইম বললেও চলে। যে কোনো অকেশনে উনি সামান্য ফোঁৎ ফোঁৎ করে কেঁদে নেন। সে যাই হোক, আজকেও ঠাম্মি দু’হাতে খঞ্জনী বাজিয়ে গান গাইছিলেন, ফলে এসব হুল্লাগুল্লা স্বাভাবিক কারণেই ওঁর কানে যায়নি। তিনি গানটান শেষ করে অত্যন্ত প্রসন্ন মনে পেছন দিকে ঘুরেছেন, শাঁখ না কী একটা নেবেন বলে, এমন সময় দেখেন দরজার পাশে কারা যেন তিনজন ভারী ভব্যসভ্য ভাবে বসে আছে।

তিনজনেই ছোট-খাটো সাইজের, কালো-কালো দেখতে। তিনি ভাবলেন, হয়তো পাশের বস্তির তাপসীর তিন ছেলে-মেয়ে এসেছে। ঠাম্মি পাশের বস্তির অনেক বাচ্চাকে পড়ান, তারাও দিদিমণিকে ভারী ভালোবাসে। তিনি হাসিমুখে বললেন, “এসেছিস? বাহ বাহ, ভালো। কালকের অঙ্কগুলো করে এনেছিস তো? খাতা খুলে বস দেখি বাবা। নারকেল নাড়ু আছে, খাবি?”

জবাবে তাপসীর তিন ছেলে বলল, “হুপ।”

ঠাম্মি কানেও একটু কম শোনেন, তিনি ভাবলেন এদের বোধহয় খুব খিদে পেয়েছে। বললেন, “খিদে পেয়েছে বাবা? তাপসী আজ তোদের না খাইয়ে কাজে বেরিয়ে গেছে, না রে? আহারে, মুখগুলো শুকিয়ে গেছে বাছাদের। মুড়ি খাবি বাবা? আলুসিদ্ধ আর বাদাম দিয়ে?”

তাপসীর বড় ছেলে আহ্লাদী গলায় বলল, “হাপ।”

ঠাম্মি ভারী খুশি হলেন, কাউকে খাইয়ে তিনি খুবই আনন্দ পেয়ে থাকেন। তিনি বার বার, “খাবি বাবা? দাঁড়া দেখছি কী কী আছে। নারকেলের ছাঁচ খাবি বাবা? মুড়কিও আছে… চশমাটা কোথায় রাখলাম… দাঁড়া বাবা… দেখি…” করতে করতে যখন হাতড়ে হাতড়ে চশমাটা হাতে পেলেন, ততক্ষণে দাদুর হুড়ুমদুড়ুম করে ওপরে এসে পৌঁছেছেন, তাঁর হাতে একটা মোটা তেলচুকচুকে বাঁশের লাঠি!

ঠিক সেইক্ষণে ঠাম্মি চশমা চোখে তুললেন, আর তুলেই দেখলেন তাঁর ঠাকুরঘরের ঠিক বাইরে, যাকে ভালো বাংলায় ‘অনতিদূরে’ বলে, সেইরকম দূরে তিনটে প্রমাণ সাইজের হনুমান হাসি-হাসিমুখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে, আর তাদের পিছনেই ডাণ্ডা হাতে দাদু দাঁড়িয়ে।

ব্যাস, আর যায় কোথায়? ঠাম্মি তো, “ও গো, এই কেঁদো হনুমানগুলো কোত্থেকে এল গো!” বলে হাত-পা ছড়িয়ে দাঁত ছরকুটে ভারী ভব্যসভ্যভাবে তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

সে বেচারি হনুমানগুলো আর কী করে! বেচারিরা এতক্ষণ মুড়ি, আলুরসেদ্ধ, নারকেল ছাঁচ আরও কীসব সুখাদ্যের আশায় ভক্তিভরে বসেছিল। এখন দেখে সে আশা তো আর নেইই, উল্টোদিকে একটা বুড়ো মতো মুশকো লোক একটা বিচ্ছিরি দেখতে খেটো বাঁশ নিয়ে এসে “তেড়েমেড়ে ডাণ্ডা, করে দিই ঠাণ্ডা” টাইপের হিংস্র মুখভঙ্গি করে নেচে বেড়াচ্ছে।

এত অপমান প্রাণে সয়?

ফলে নেহাৎ বাধ্য হয়েই তারা, যাকে বলে গ্লোরিয়াস রিট্রিট করে দুই লাফে সেই বারান্দায় এসে উপস্থিত হয়, এবং সেখান থেকেই বিচিত্র সব অপমানজনক মুখভঙ্গি করে দাদুকে ভেঙাতে থাকে। এখন দাদুর বয়েস সত্তর হলে কী হবে, এখনও এনফিল্ড চালিয়ে ঘুরে বেড়ান, যৌবন বয়েসে একবার এক বিশালদেহী পাঠানকে পিটিয়ে পাটপাট করে দিয়েছিলেন। হাওড়া জেলা স্কুল লেভেলে শটপাট ছোঁড়ার রেকর্ড পঞ্চান্ন বছর ধরে তাঁর দখলে, তিনি এসব ছল্লিবল্লি মোটে সহ্য করেন না। তিনি লাঠিটা নিয়ে তেড়েই যাচ্ছিলেন, ততক্ষণে ঠাম্মি ধাতস্থ হয়ে উঠে বসেছেন। তিনিই “আহা করো কী, করো কী!” বলে দাদুকে আটকালেন। তারপর একছড়া কলা আর দুটো আপেল দাদুর হাতে দিয়ে বললেন, “আহা কেষ্টর জীব, এতক্ষণ ধরে পুজো দেখল। কিছু প্রসাদ পাবে না?”

দাদু তো অবাক।

তারপর আর কী! তারা তো প্রসাদ পেয়ে মহা খুশি। একজন তো ‘হুপহাপ হুতুম, প্রণাম দিলুম’ বলে বিজয়ার প্রণাম আর কোলাকুলি করতে এগিয়ে আসছিল, পরে দাদুর রক্তচক্ষু দেখে রণে ভঙ্গ দেয়। তারপর তারা তিনজন চকিতে পাশের বাড়ির ছাদে উঠে একটা আধখাওয়া বিস্কুটের প্যাকেট উঠিয়ে উধাও হয়ে যায়।

গল্পটা শ্রীময়ী আরাত্রিকা শোনেন পরের দিন, ঠাম্মির কোলে বসে। এই মনোহর কাহিনি যে তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছে, সেটা বোঝা গেল যখন তিনি সারাদিন ধরে বিন্দুমাত্র মায়ের আঁচল ধরে ঘ্যানঘ্যান করলেন না, দিব্যি সোনামুখ করে চেটেপুটে সব খাবার খেয়ে নিলেন, এমন কী ওষুধ খাওয়ার সময় ঘুঁ ঘুঁ অবধি করলেন না।

তারপরে রাত্রিবেলা ঘুমোনোর সময়, মশারি টাঙানোর পর, লাইট নেভানোর শেষে তিনি বাবার ভুঁড়ির ওপর উঠে এলেন। অতঃপর পিতা ও পুত্রীর মধ্যে নিম্নরূপ কথোপকথন হইল,

“বাব্বাআআআআআআ…”

“কী মা?”

“আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবে?”

“আচ্ছা, শুনি কী রিকোয়েস্ট?”

“আমাকে আমার বিয়েতে একটা হনুমান এনে দেবে?”

বাবা ফিক করে হেসে ফেলেন। আর তারপরেই গম্ভীর হয়ে যান। এই তো আর বছর কুড়ি মাত্র। তারপরেই তো একটা লেখাপড়া জানা, শান্তশিষ্ট, ভদ্রঘরের ভালো দেখে একটা হনুমান ধরে আনতেই হবে।

ততদিন এই হনুমতীটা আমার, শুধুমাত্র আমার। এইটা ভেবে কপালে ঢকাস করে একটা চুমু খেয়ে প্রিন্সেসকে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান এক দরিদ্র রাজামশাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *