বেতারে হেমন্ত

বেতারে হেমন্ত

১৯৩৫ সালে তাঁর ১৫ বছর বয়সে প্রথম বেতারে গান করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। বাল্যবন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের (পরবর্তীকালের বিখ্যাত কবি) অনুপ্রেরণায় এবং তাঁরই লেখা — ‘আমার গানেতে এলে নবরূপে চিরন্তনী/বাণীময় নীলিমায় শুনি তব চরণধ্বনি…’ গানটি নিজের সুরে রেডিও—তে গেয়েছিলেন হেমন্ত। আর একটি গান ছিল প্রচলিত ভাটিয়ালি লোকসঙ্গীত। এর পরে অজস্র গান পরিবেশন, সুরারোপ ও অন্যান্য নানা ভূমিকায় তিনি বেতারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা—

—১৯৪০ সালে চিরকালের জনপ্রিয় বেতার—গীতিআলেখ্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে প্রথম অংশ নেওয়ার সুযোগ ঘটে হেমন্তর। সমবেত গানে অংশ নেওয়া ছাড়াও একককন্ঠে ‘জাগো দুর্গা…’ গানটিও গেয়েছিলেন তিনি। বাণীকুমারের আহ্বানে হেমন্তর এই সুযোগ মেলে। পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গীতরচনা, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর স্তোত্র পাঠ ও বাণীকুমারের রচনা সমৃদ্ধ এই গীতিআলেখ্যটিতে সে বছর হেমন্ত ছাড়াও অন্য যারা সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা হলেন— পঙ্কজকুমার মল্লিক, অনিল দাস, শৈল দেবী, ইলা ঘোষ, সুপ্রভা ঘোষ (পরে ‘সরকার’), কল্পনা হাজরা। সম্প্রচারের দিন ও ক্ষণ ছিল ১ অক্টোবর (মহালয়া) ১৯৪০, ভোর সাড়ে ৫টা। যন্ত্রসঙ্গীতের আয়োজনে ছিলেন সুরেন্দ্রলাল দাস ও মুন্সী আহমদ হোসেন নির্দেশিত ‘যন্ত্রীসংঘ’ (‘বেতার জগৎ’ ১ অক্টোবর — ১৫ অক্টোবর ১৯৪০)।

প্রসঙ্গত ১৯৪০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৫১ সালে মুম্বই চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত একটানা সম্ভবত ১৯৫০ সাল অবধি প্রতিবছর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। এর পর থেকে ‘জাগো দুর্গা…’ গানটি গাইতে শুরু করেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়।

—হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড করেন ১৯৪৪ সালে। কিন্তু এর আগেই বেতারে বেশ কয়েকবার রবীন্দ্রনাথের গান তিনি গেয়েছিলেন। ১৯৪২ সালের কিছু নমুনা—

১/১১/১৯৪২ সকাল ৭—৪০ মিনিট ‘জীবন মরণের সীমানা’

‘যো এক নীড় হ্যায়’ (ভজন)।

৯/১১/১৯৪২ সকাল ৮—৪০ মিনিট ‘আমার আর হবে না দেরি’ (রবীন্দ্রনাথ)

*’আমার প্রাণের মাঝে’ (আধুনিক)।

৯/১১/১৯৪২ রাত ৮—১৫ মিনিট ‘হার মানালে গো’ (রবীন্দ্রসঙ্গীত)

‘মনো মন্দিরমে আও’ (ভজন)।

(‘বেতার জগৎ’ ১ নভেম্বর — ১৫ নভেম্বর ১৯৪২)

*এই গানটি রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়তো?

—১৯৪২ সালে ‘ছোটোদের আসর’—এ আসর—পরিচালক নির্মলভাই (যিনি প্রথম দিন থেকে এই আসরের পরিচালক ছিলেন সেই প্রয়াত ‘গল্পদাদা’ যোগেশচন্দ্র বসুর পুত্র নির্মলকুমার বসু)—এর প্রযোজনা অজয় ভট্টাচার্য রচিত ও শৈলেশ দত্তগুপ্ত সঙ্গীতপরিচালিত (১) ‘পিসিমার কথা’ ও (২) ‘তাই তাই তাই’ ফিচার দুটিতে মুখ্যভূমিকায় ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও ইলা ঘোষ। সম্প্রচারের দিন ও সময় ছিল ২৫ ডিসেম্বর ১৯৪২, বিকেল ৫টা। (‘বেতার জগৎ’ ১৬ ডিসেম্বর — ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪২)।

—১৯৪৪ সালে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’—র সম্প্রচারের সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতান্তরের ফলে এই গীতিআলেখ্যটির সঙ্গীতপরিচালক পঙ্কজ মল্লিক অনুপস্থিত হওয়ার কারণে সঙ্গীতপরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন ২৪ বছর বয়সি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অনুরোধটি এসেছিল বাণীকুমারের কাছ থেকে।

—১৯৭৬ সালে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কলকাতা বেতারে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র জায়গায় সম্প্রচারিত হয় ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম’ দেবী দুর্গার আবাহনমূলক গীতিআলেখ্যটি। এর সঙ্গীতপরিচালক ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। যাঁরা এর নির্মাণে ছিলেন—

রচনাকার—ধ্যাণেশনারায়ণ চক্রবর্তী

চণ্ডীপাঠ—গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়

ভাষ্যপাঠ—উত্তমকুমার, বসন্ত চৌধুরি, পার্থ ঘোষ, ছন্দা সেন প্রমুখ।

গীতিকার—শ্যামল গুপ্ত।

সঙ্গীত পরিচালনা—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

গানে— লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মান্না দে, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ একঝাঁক তারকা।

সম্প্রচার—২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬, ভোর ৪টে।

প্রসঙ্গত অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতারা এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শ্রোতাদের দাবী অনুযায়ী এর পরের বছর (১৯৭৭) থেকেই মহালয়ার ভোরে পুনরায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র আবির্ভাব ঘটে। ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম’ চলে যায় মহাষষ্ঠীর ভোরে।

বেতারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া কিছু ‘রম্যগীতি’ ও ‘এ মাসের গান’

১। ‘মাগো ভাবনা কেন’/ ‘এ দেশের মাটির পরে’

কথা: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার সুর: হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯৬১)

২। ‘বুদ্ধ গান্ধী বিবেকানন্দ’

কথা: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার সুর: হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯৭১)

৩। ‘কাশ্মীর সিন্ধু পাঞ্জাব’

কথা: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার সুর: হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯৭১)

৪। ‘তাল সুপারি তাল সুপারি’

কথা: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সুর: অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৭২)

৫। ‘মাঝে মাঝে মনের আকাশ’

কথা: ও সুর: অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৭২)

৬। ‘আমায় একটু একা থাকতে দাও’

কথা ও সুর: দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় (১৯৭৮)

৭। ‘প্রভু সবার ভাল কর’

কথা ও সুর: দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় (১৯৭৮)

৮। ‘বন্ধু কেমন আছ’

কথা: শ্যামল গুপ্ত সুর: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

৯। ‘যখন ঘুম আসে দুটি চোখে’

কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় সুর: অসীমা ভট্টাচার্য (১৯৮৪)

১০। ‘তুমি যাবেই চলে আমি জানতাম’

কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় সুর: অসীমা ভট্টাচার্য (১৯৮৪)

১১। ‘আমার একান্ত প্রাঙ্গণে বর্ষা এলো’

কথা: বিশ্বনাথ দাস সুর: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

১২। ‘একটাই শুধু প্রশ্ন আমার’

কথা: লক্ষ্মীকান্ত রায় সুর: দীপেন মুখার্জী (১৯৮৯)

১৩। ‘মাথার উপরে আকাশ’

কথা: লক্ষ্মীকান্ত রায় সুর: দীপেন মুখার্জী (১৯৮৯)

১৪। ‘ঐ মূর্তিটা তৈরী’

কথা: লক্ষ্মীকান্ত রায় সুর: দীপেন মুখার্জী (১৯৮৯)

১৫। ‘চাঁদ ওঠা ফুল ফোটা’

কথা, সুর ও সাল পাওয়া যায়নি।

বেতারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত যেগুলি গ্রামোফোন রেকর্ডে প্রকাশিত হয়নি—

১। মনমোহন গহন

২। তিমিরদুয়ার খোলা

৩। যদি হয় জীবনপূরণ

৪। নিশিদিন ভরসা রাখিস

৫। আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

৬। তোমার গীতি জাগালো স্মৃতি

বেতারে গাওয়া হিন্দী গান :

ক্রঃ নং গান গীতিকার সুরকার

১. ভারত মাতা কি জয় হো/ ১৯৫২ প্রেম ধাওয়ান প্রেম ধাওয়ান

(বোম্বে ইয়ুথ কয়্যারের সঙ্গে)

২. ধরতি কে লাল /১৯৫২ ঐ কানু ঘোষ

(বোম্বে ইয়ুথ কয়্যারের সঙ্গে)

৩. আহিস্তা চলো সবেরা হোনে /১৯৫৫ লালাচাঁদ বিসমিল অমরনাথ

৪. জীবন পথ পর কহাঁ চলে /১৯৫৭ মজরু সুলতানপুরী গুলাম মহম্মদ

৫. পয়গম হামারা য়ে পয়গম /৬২ শেওয়ান রিজভি দক্ষিণামোহন ঠাকুর

৬. জলতে দীপক কি লৌ সে /৬৩ পন্ডিত মধুর সুশান্ত ব্যনার্জী

৭. সারে জহাঁ সে অচ্ছা /৬২ ইকবাল পন্ডিত রবিশংকর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *