আমার বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন সবাই অভিযোগ করে, তুমি এত ফাংশান কেন করো? শরীর যে নষ্ট হবে? আমি বলি, দ্যাখো, যেসব শ্রোতা আমার গান ভালোবাসে অর্থাৎ আমাকে ভালোবাসে তাদের জন্যই এত কষ্ট করেও সব জায়গায় যাই। তাদের যে কী আগ্রহ, অধীর অপেক্ষা, আমার গান সামনে বসে শুনবে বলে, তা তোমাদের বলে বোঝাতে পারবো না। আমি নিজের চোখে এমন এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি যে, আনন্দে আমার চোখে জল এসে গেছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বধূরা, মেয়েরা, বহু জায়গায় আমায় বলেছে যে, আপনি যদি না আসতেন তো আমাদের বহু বছরের স্বপ্ন—হেমন্তকে সামনে দেখব, গান শুনব—সে স্বপ্নই থেকে যেতো। কখনো কোনো বৃদ্ধা এসে বলেছেন—’বাবা, আমার বহু বছরের সাধ তোমায় দেখব। আজ চক্ষু সার্থক হল।’ হয়তো তিনি যৌবন বয়স থেকে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে ছিলেন। সেদিন এক জায়গায় গান গাইতে গেছি। একটি ছেলে বোধহয় তিন চার বছরের হবে, তার মার সঙ্গে এসেছে, কেবল এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াচ্ছে আর বলছে, ‘হেমন্ত কোথায়? হেমন্ত কোথায়?’ সুতরাং এইসব দেখেশুনে আমার ফাংশানে যেতে কষ্ট হয় না। একবার এক রাত্রে পাঁচটি ফাংশান ছিল। প্রায় ষাট—সত্তর মাইল ঘোরা। শেষ ফাংশানটাতে যখন গান গাইছি যাদবপুরে, তখন ভোর পাঁচটা। চোখ খুলতে পারছি না। সমস্ত শরীর অবশ। তখনই ভাবলাম যে, এই যে শ্রোতারা সন্ধ্যা ছ’টা থেকে এই শীতের রাত্রে এত কষ্ট করে আমার জন্য অপেক্ষা করছে তাদের কষ্টের কাছে আমার এমন কি কষ্ট? মনে বল পেলাম? গাইলাম ঠিক।
এই প্রসঙ্গে আমার বন্ধু মধুসূদন মজুমদারের কথা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মধুসূদন মজুমদার দৃষ্টিহীন। সাহিত্যে এই নামেই উনি পাঠকদের কাছে সুপরিচিত। কী অসাধারণ কাজ করার ক্ষমতা মধূসূদনবাবুর। দেব সাহিত্য কুটীরের উনিই কর্ণধার। ওঁর বাড়িতে বহুবার গিয়েছি। নিজের চোখে দেখেছি কত দিক সামলাচ্ছেন উনি। ওঁর চালচলন চলাফেরায় কোথাও এতটুকু আড়ষ্টতা নেই। বাইরের দৃষ্টি হেরে গেছে ওঁর অন্তরের দৃষ্টির কাছে। ওঁর বাড়ি থেকে ফেরবার সময় উনি বরাবরই নিজে সিঁড়ির শেষ ধাপ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছেন আমাকে।
প্রেসের যাবতীয় কাজ ওঁকেই সামলাতে হয়। ভীষণ গান ভালোবাসেন। এককালে নিজেও গাইতেন। এখন সাহিত্যের বেড়াজালে পড়ে গলা খোলার সময় পাননা। এত কাজের মধ্যেও এখনও সময় পেলেই আমার খোঁজখবর নিতে আসেন।
তাই ভাবি নিষ্ঠা একাগ্রতা থাকলে মানুষ কী না পারে। ওঁর চার ইন্দ্রিয়ের অতুলনীয় প্রতিভা দেখে আমি বিস্মিত, আমি মুগ্ধ। আমার জীবনে মধুসূদনবাবু এক জ্বলন্ত প্রেরণা।
আরও একজনের কথা মনে পড়ছে এ ব্যাপারে। সে হল রিজবার্ট। রিজবার্ট আর ইহজগতে নেই। ‘নাগিন’ ছবিতে ও ছিল মিউজিকের অ্যারেঞ্জার। খুব খাটতে পারতো ছেলেটা।
অনেক মিউজিক ডাইরেক্টর, অ্যারেঞ্জারদের দিয়ে মিউজিক করিয়ে নিতেন। আমি কিন্তু তা করতাম না কখনও। আমি নিজে নোটেশান করে দিতাম। অ্যারেঞ্জার সেই নোটেশান অনুযায়ী মিউজিক হ্যান্ডসদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতো। এই ছিল আমার নিয়ম।
বম্বেতে দেখতাম একগাদা মিউজিক হ্যান্ডস ব্যবহার করতো, সংগীত পরিচালকদের মধ্যে অনেকেই। একটা গানের সঙ্গে অনেকগুলো যন্ত্রসংগীতের রেওয়াজটা কেউ কেউ চালু করেছিলেন। ওদের দেখাদেখি আমিও ঠিক করলাম, এবার ‘নাগিন’ ছবিতে আমিও তাই করবো। সেইভাবে একটা লম্বা লিস্ট করে ফেললাম। একটা গানের সঙ্গে জুড়ে দিলাম একগাদা বাজনা। লিস্টটা তৈরি করে মিঃ মুখার্জীকে দেখাতে গেলাম। ভাবলাম, এবার উনি আমার ওপর খুব খুশি হবেন। বুঝবেন, বম্বের কায়দা আমি শিখে ফেলেছি।
কিন্তু ফল হল উলটো। উনি তো লিস্টের ওপর চোখ বুলিয়ে একরকম খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘এ কী করেছ। এতগুলো মিউজিক হ্যান্ডস। তুমি কি রাতারাতি নওশাদ১০০ হতে চাও।’
বলেই উনি লিস্টের নামগুলো কেটে উড়িয়ে দিলেন। রেখে দিলেন মাত্র কয়েকটা নাম। বললেন, ‘এই ক’জনকে দিয়ে মিউজিক টেক করো। এর বেশি হ্যান্ডস দেওয়া হবে না। বুঝলে?’
কি আর করবো। হাত বাড়িয়ে কাটাছাঁটা লিস্টটা নিলাম। বললাম, ‘ঠিক আছে।’
এদিকে ছবির পরিচালক নন্দলালজী সাপুড়ের বীণের সুর শুনে বললেন, ‘ইয়ে কেয়া কিয়া! খালি প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ।’
মিঃ মুখার্জীও ওই একই কথা বললেন, ‘বড্ড একঘেয়ে লাগছে। সারা ছবিতে বীণের এই এক সুর কি ভালো লাগবে? না না, এ চলবে না।’
এবার কিন্তু আমি মেনে নিলাম না ওঁর কথা। ওঁকে বুঝিয়ে বললাম, ‘সাপুড়েদের বাঁশি কিন্তু একটা সুরেই বাজে। যারা দাঁড়িয়ে শোনে তাদের তো একঘেয়ে লাগে না। সেইসব ভেবেই আমি এই সুরটা করেছি। আর বিশ্বাস করুন, এই সুরটা আমি যতবার শুনছি আমার ভেতরে কেমন একটা শিহরণ হচ্ছে, রোমাঞ্চ জাগছে। আমার এই একটা আবদার আপনাকে রাখতে হবে। গানের ব্যাপারটা আপনার ওপর সম্পূর্ণ ছেড়ে দিচ্ছি। আপনি যতখুশি গান লেখান। একটা গানের বাইশখানা সুর করান। সব আমি হাসিমুখে করবো। কিন্তু এই বীণের সুরটাকে এইভাবে থাকতে দিন। সারা ছবিতে এই সুরটা ছড়িয়ে থাক। দেখবেন, সমস্ত দর্শক এই বীণের মধ্যে সারাক্ষণ মজে থাকবে।’
আমার অনুরোধে শেষপর্যন্ত মিঃ মুখার্জী ওঁর আপত্তিটা তুলে নিলেন। রেখে দিলেন বীণের সেই প্যাঁ প্যাঁ সুরটা। আর আমিও প্যাঁ প্যাঁ সুরটাকে ছড়িয়ে দিলাম সারা ছবিটার মধ্যে।
উনিশশো চুয়ান্ন সালের কথা আমি ভুলব না কোনোদিন। এই সালটা আমাকে দিয়েছে অনেক। বম্বে ছেড়ে চলে আসবো বলে যখন আমি মনে মনে প্রস্তুত, তখন এই উনিশশো চুয়ান্ন আমার পথ আটকে দাঁড়ালো। কানে কানে যেন বললে, আর একটু সবুর করো না। ফিরে যাবে ভাবছো। তোমাকে আর যেতে দিচ্ছে এরা।
এই সালে ‘নাগিন’ রিলিজ হল। ছবি সুপারহিট। আর গান! গান বাদ দিলে এ—ছবি তো একেবারে নেড়া বেলগাছ। সকলের কান ধরে ফেলেছে গানগুলো। আর সেই বীণের সুর, যাকে নন্দলালজী প্যাঁ প্যাঁ বলেছিলেন, সেটা তো হয়ে গেছে পি. সি. সরকারের ‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া।’ জাদুকর পি. সি. সরকার মশাই প্রত্যেক খেলার শেষে যতবার জাগটাকে উলটে ধরেন ততবারই জল পড়ে। ‘নাগিন’ ছবিতেও সাপুড়ের বাঁশি ঠিক সেইভাবেই মধু ছিটিয়েছে সারা বইটাতে।
এ—ছবির গানের রেকর্ড এত বিক্রি হয়েছিল, যা গত বিশ বছরে আর কোনো ছবির বরাতে হয়নি। শুধু এই সেদিন ‘ববি’র১০১ গান ‘নাগিনে’র গানের বিক্রির রেকর্ড বোধহয় ভাঙলো।
‘নাগিন’ আর ‘আনারকলি’র কাজ একইসঙ্গে শুরু হয়েছিল। ‘আনারকলি’তে আমি কয়েকটা গান গেয়েছিলাম। ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন সি. রামচন্দ্র। এই ‘আনারকলি’ ছবি যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে সেই সময় এক ঘটনা ঘটল। সি. রামচন্দ্রের সঙ্গে ফিল্মিস্তানের বাধল গোলমাল। সি. রামচন্দ্র রেগেমেগে চলে গেল। তখনও দু’তিনখানা গানের সুর বাকি।
সি. রামচন্দ্র তো চলে গেল, কিন্তু মুশকিলে পড়লাম আমি। আমাকে ডেকে মিঃ মুখার্জী বললেন, ‘হেমন্ত, বাকি গানগুলোর তুমি সুর করে ফেলো।’
আমার কাছে এ এক অসম্ভব প্রস্তাব। সি. রামচন্দ্রের তখন খুব নাম। ‘আনারকলি’র সব সুর ও—ই করেছে। গানগুলো হয়েওছে অপূর্ব।
আমি মহা সমস্যায় পড়লাম। মিঃ মুখার্জীকে আর কিছু বললাম না। ‘আনারকলি’র একখানা গানের সুর করলাম—’অ্যায় বাদে সভা সাহিস্তা চল’—টাইটেল সঙ। একটা পাঞ্জাবী ফোক আমার জানা ছিল, যার ওপর অনুপমদা১০২ আমার একটা গান করেছিলেন—’শুকনো শাখার পাতা ঝরে যায়’। সেই সুরে ঐ গানটি তৈরি করলাম, আর, সি রামচন্দ্রের খোঁজ করতে লাগলাম। উনি তখন পুণায়। টেলিফোনের নাম্বার নিয়ে ওঁর সঙ্গে কথা বললাম। চলে আসতে অনুরোধ করলাম। উনি বম্বে এলেন। আমি ওঁকে হাতজোড় করে অনুরোধ করলাম, ‘এ বিপদে আমাকে ফেলবেন না। রাগারাগি ভুলে গিয়ে আসুন, আপনার কাজ আপনিই শেষ করুন।’ উনি রাজি হলেন। যেদিন উনি ফিল্মিস্তানে ফিরে এলেন সেইদিনই গানটি রেকর্ড হওয়া দরকার। কারণ রিলিজ ডেট ঠিক হয়ে গেছে।
সি. রামচন্দ্রের মধ্যে খুব স্পোর্টিং স্পিরিট ছিল। উনি চুপি চুপি আমায় মিউজিক রুমে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘শোনাও তো গানটার কী সুর করেছ।’
আমি শোনালাম।
বললেন, ‘চলো, টেক করি। ঐ সুরই থাকবে। সুর একেবারে নিখুঁত হয়েছে—টাইটেল গানের জন্যে।’
গান রেকর্ড হল। সবাই খুব খুশি। মিঃ মুখার্জী আরেকটা গান বাড়ালেন ‘আনারকলি’তে—’জিন্দগী পেয়ারকি দো চার ঘড়ি হোতি হ্যয়।’ ওটাও সি. রামচন্দ্র সুর করে দু’দিনের মধ্যে আমাকে দিয়ে গাওয়ালেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
আমার তো তখন মনের মধ্যে খুশির জোয়ার বইছে। অসম্ভবকে সম্ভব করেছি যেন। সি. রামচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে তখন মনে হচ্ছে ওর মনের ব্ল্যাকবোর্ডে এতদিন যে নালিশগুলো লেখা ছিল ফিল্মিস্তানের বিরুদ্ধে সব যেন মুছে গেল ডাস্টার বোলাতেই। মনে হল, সত্যিকারের শিল্পীদের মনগুলোই বোধহয় এইরকম। এদের নালিশ খড়ি দিয়ে লেখা হয় বলে সামান্য ডাস্টারেই মুছে যায়। প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষদের নালিশগুলো আলকাতরা দিয়ে লেখা হয় বলে, কোনোদিনই তা মোছা যায় না।
সেই ‘আনারকলি’ যখন বাজারে বেরোলো তখন সে কী হৈ হৈ। সুপারহিট। ধন্য ধন্য পড়ে গেল চারদিকে। আমার এই ছবিতে গাওয়া ‘জাগ দর্দে ইস্ক জাগ’ গানটা যথেষ্ট সম্মান কুড়োলো। স্বীকৃতি, সম্মান দুইই পেলাম আমি। ‘আনারকলি’র জন্মলগ্নে ছিল অর্থপ্রাপ্তি যোগ। সেই অর্থই দু’হাত দিয়ে কুড়োতে লাগল ফিল্মিস্তান।
আজ ভাবি, সেদিনের সেই সি. রামচন্দ্রর স্থান আজ কোথায়! কী ক্ষমতাই না এককালে ছিল এই সংগীত পরিচালকের। কী মিষ্টি সুর করতো। মাত্র পাঁচমিনিটে সৃষ্টি করতো অপূর্ব সংগীত। তার সেই সুর আজ হারিয়ে গেছে। নিজের মনেই ভাবি, এরা কেন এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল?
ভাবি, শচীনদার কথা। উনি তো আজও নিজের আসনকে ঠিক জিইয়ে রেখেছেন। এতটুকু টলতে দেননি। উনি কম ছবি নিতেন। বলতেনও উনি, ‘সৃষ্টিতো এত সস্তার জিনিস নয়। এরজন্যে ক্ষমতার দরকার। সেই ক্ষমতা বেশি ব্যয় করলে ফুরিয়ে তো যেতেই হবে। এখন থেকে ক্ষমতা সঞ্চয় করতে শেখো। তাহলে অনেকদিন চালাতে পারবে।’
এসব শুনেও কিন্তু আমি ঠিক সেইভাবে চলতে পারিনি। কাজ পেলেই নিয়েছি। ক্ষমতা সঞ্চয়ের ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। কারণ আমিতো সবসময় নিজেকে খুব ছোটো ভাবতাম। আমি ভাবতাম, আমিতো একজন সাধারণ সংগীতশিল্পী। ওসব নিয়মকানুন বড়োদের জন্যে।
যাইহোক, এদিকে তো তখন ‘নাগিনে’র কাজ শেষ। ছবি দেখলেন মিঃ মুখার্জী। দেখেই মতামত দিয়ে দিলেন। আমাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার মিউজিক নওশাদকে ছাড়িয়ে গেছে।’
নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না। মিঃ মুখার্জী এই কথা বলছেন।
আমি তো গদগদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। উনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘তবে ছবিটা এখনও ঠিক দাঁড়ায়নি। আরও একটু বাড়াতে হবে ছবিটাকে। আরও খানচারেক গানও ঢোকাতে হবে।’
তাই হল। আরও খানচারেক গানের সুর করলাম। গল্পটা যেখানে শেষ হয়েছে, তারপরেও আরও কিছুটা টানলেন। আর সেই শেষের অংশটা উনি রঙিন ছবি করলেন। তখনও রঙিন ছবির চল হয়নি বম্বেতে। তাই জিনিসটা একটু উঁচুমানের হল।
এইভাবেই তো শেষ হল ‘নাগিন’ এর কাজ। এবার ছবির মুক্তি।
ছবিটা মুক্তি পেল লিবার্টি সিনেমায়। কত আশা মনে। আমার মিউজিকের সুখ্যাতি করেছেন স্বয়ং মিঃ মুখার্জী। কিন্তু আশাভঙ্গ হল কয়েকটা শো চলার পর। ভিড় নেই হাউসে।
আমার তো মাথায় হাত। তবে কি এ—ছবিও গেল। সেইসময় কয়েকজন জ্ঞানীগুণী লোক ছবির পরিচালককে বলতে শুরু করলো, ‘নন্দলালজী, আপনার ছবিতো খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু ডুবিয়ে দিয়েছে মিউজিক।’
অবশ্য জ্ঞানীগুণী লোকদের মতামতের ওপর আমার কোনোদিনই আস্থা ছিল না, আজও নেই। নিজেদের মতামত দেবার ক্ষমতা এদের একজনেরও নেই। জনসাধারণের মতামতের ওপরই এরা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। জনসাধারণ ছবি নিলো তো অমনি ছবি ভালো হয়ে গেল। জনসাধারণের চোখে ছবি ধরলোনা, তো ছবি খারাপ। এইতো হল জ্ঞানীগুণীদের বিদ্যে।
ছবির সম্বন্ধে সুস্থ মতামত দিতে হলে নিজেকে নিরপেক্ষ হতে হয়। সেখানে ছবির পরিচালক বা সংগীত পরিচালকের পরিচয়টা বড়ো কথা নয়। ভালো কি মন্দ বিচার করতে হবে ছবির গুণাগুণ দেখে।
এ ব্যাপারে অনুশীলন করে আমি কিছুটা ফল পেয়েছি। ছবি দেখে দেখে নিজস্ব একটা মতামত গড়ে তোলবার চেষ্টা করেছি। আর সেই মতামত খোলাখুলি ব্যক্ত করতেও দ্বিধা করিনি।
আমার মনে আছে লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল১০৩ ওদের ছবি দেখাতে নিয়ে গেল আমাকে। পরিচালক সত্যেন বোস১০৪। ছবির নাম ‘দোস্ত’। নতুন সংগীত পরিচালক। বয়সেও নবীন। লক্ষ্মীকান্ত আগে আমার ছবিতে ম্যান্ডোলিন বাজাতো। খুব ভালোবাসে আমাকে। আড়ালে আমার কত সুখ্যাতিই যে করে এরা, তা বলবার নয়। এদের চোখে আমি নাকি দেবতা।
তা সে দেবতাই হই আর দানবই হই, ছবি দেখে সঠিক মতামত দিতে হবে আমাকে। এদের ভালোবাসায় ভুললে চলবে না। আবার আমার ছবিতে এককালে ম্যান্ডোলিন বাজাতো বলে এদের তুচ্ছ করাও চলবে না।
‘দোস্ত’ ছবি দেখলাম। খুব ভালো লাগল। সুরসৃষ্টি অপূর্ব। ভীষণ খুশি হলাম ওদের কাজ দেখে। বললাম, ‘এ ছবি ভালো লাগতেই হবে লোকের। তোমাদের নাম ঠেকায় কে।’
আমার কথা মিথ্যে হয়নি। খুব নাম কিনেছিল ছবিটা। আর এই ছবি—ই লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলালকে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠা।
হ্যাঁ, যেকথা বলছিলাম। আমার ‘নাগিন’ ছবির কথা। ‘নাগিন’ চলছেনা। দর্শকদের ভিড় নেই। মনটা খারাপ হবার কথা। বাড়িতে বসেই মনখারাপ করছি। আমি হাউসের ধারেকাছে যাচ্ছিনা। অবশ্য আমি নিজের ছবির রিপোর্ট জানতে হাউসের সামনে ঘোরাঘুরি কোনোদিনই করি না। জানি ভালো হলে সব রিপোর্টই কানে আসবে।
কিন্তু আমার সহকারী রবি রোজ ধরনা দিচ্ছে সিনেমা হাউসের সামনে। সারাদিনই প্রায় কাটাচ্ছে ওখানে। তারপর রাত্তিরে ফিরে আমাকে শুকনো মুখে বলছে, ‘পাবলিক কিন্তু মিউজিকের প্রশংসা করছে দাদা।’
উত্তরে আমি বলছি, ‘মিউজিকের প্রশংসা শুনে আর কি হবে। ছবিতে ভিড় তো হচ্ছে না। এই করে আর ক’দিন চলবে ছবি।’
তবু রবি হাউসে যাওয়া ছাড়ে নি। নিয়ম করে ওখানে দাঁড়িয়ে থেকেছে। দর্শকদের মন্তব্য শুনবে বলে তাদের পেছন পেছন এগিয়েছে। আর শেষ শো ভাঙার পর ক্লান্ত পায়ে ফিরে এসেছে। তখন ওর ভোঁতামুখের দিকে তাকাতে কষ্ট হয়েছে আমার।
এইভাবে তিন সপ্তাহ পার হল। তখনও ভিড় নেই হাউসে। কিন্তু চার সপ্তাহে পা দিতেই হঠাৎই যেন মোড় ঘুরে গেল ছবির।
রবি একদিন এসে বললে, দাদা, ‘ছবি লেগে গেছে। খুব ভিড় হচ্ছে। সবাই খুব প্রশংসা করছে। আর গানের সম্বন্ধে কী বলছে জানো? বলছে, একেবারে কামাল করে দিয়েছে। এরকম সুর এর আগে আর হয়নি।’
রবি ছেলেমানুষের মতো নাচানাচি শুরু করে দিলো। আমি অবশ্য ওর সঙ্গে নাচলাম না। কিন্তু বুঝতে পারলাম, ভেতরে ভেতরে মন আমার আনন্দে নাচছে। মনে পড়ে গেল মিঃ মুখার্জীর মন্তব্য। উনি বলেছিলেন, তোমার ‘নাগিন’ এর মিউজিক নওশাদকেও ছাড়িয়ে গেছে।
রাতারাতি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলাম। চারিদিকে সে কী উল্লাস! সবার মুখেই তখন ‘নাগিন’ ছবির কথা, ‘নাগিন’ ছবির গান।
সে কী খাতির তখন আমার! সবাই আসছেন অভিনন্দন জানাতে। এদের মধ্যে প্রোডিউসারদের সংখ্যাই বেশি। তাঁরা এসে আমাকে ধরছেন তাঁদের ছবিতে সুর দেবার জন্যে। আমিও রাজি হয়ে যাচ্ছি ওঁদের কথায়। পর পর অনেকগুলো ছবির সংগীতপরিচালনার ভার নিয়ে নিলাম। হাতে অনেক কাজ, অনেক টাকা।
কিন্তু তখন তো আমি জানতাম না, আমার বাজার—দর কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। পরে জেনেছিলাম। ‘নাগিন’ ছবির পর আমার কদর হয়েছিল নাকি সবার ওপরে। তার মানে, তখন আমিই নাকি শ্রেষ্ঠ সংগীতপরিচালক। সেই হিসেবে আমার প্রতিটি ছবির জন্যে সংগীত পরিচালনার পারিশ্রমিক হওয়া উচিত ছিল এক লক্ষ টাকা! এ—টাকা চাইলেই আমি পেতাম। কিন্তু আমি তো এসব বুঝতে পারিনি। তাই যখন আমার বাজার মূল্য এক লক্ষ টাকা তখন আমি দশ হাজার, বারো হাজারে ছবি করেছি। তখন আমি ভাবতেই পারিনি একটা ছবির কাজের জন্যে এক লক্ষ টাকা চাওয়া যায়। এত মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক চাওয়াটা আমার কাছে তখন লজ্জার ব্যাপারই মনে হতো। কী এমন আমার প্রতিভা যে এত টাকা চেয়ে বসবো! নিজের সম্বন্ধে আমার ধারণাটা বরাবরই এইরকম। আজও তাই।
এই ব্যাপারে ঈশ্বর আমাকে যে কীভাবে বাঁচিয়েছেন তা আজ বুঝতে পারি। সেই সময় যদি নিজের সম্বন্ধে আমার ধারণা সীমা ছাড়িয়ে যেতো তাহলে তো আমি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতাম। নিজেকে একটা কেউকেটা মনে করে যা খুশি করে বেড়াতাম। ব্যবহার হয়ে উঠতো ঝাঁঝালো। আমি হারিয়ে ফেলতাম আমার শিল্পগুণ। এত মানুষের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতাম। তারপর একদিন আমি নির্বাসিত হতাম আমার ভালোবাসার মানুষদের হাতে।
আমি তখন ভাবছি অন্য কথা। আমি ভাবছি আমার এই প্রতিষ্ঠা আমার একার নয়। এতে আমার পরিবারের সকলের অংশ আছে। সব থেকে খুশি হয়েছেন মা। বম্বেতে বসে মায়ের হাসিখুশি মুখটা যেন দেখতে পাচ্ছি। সকলকে বলে বলে বেড়াচ্ছেন আমার কথা। আমার বাবা, আমার ভাইবোন, সবাই উচ্ছ্বসিত আমার সাফল্যে। আর বেলার কথা আলাদা করে কি বলব। ওতো আমার পাশেই রয়েছে। কিন্তু যারা পাশে নেই তাদের কথাই তখন বেশি করে মনে পড়ছে। তারা কলকাতায় আর আমি সুদূর বম্বেতে। আলাদা থাকার জন্যেই বোধহয় আমার বাবা, মা, ভাইবোনদের ওপর টানটা বড্ড বেশি বেড়ে গেছে।
আমার ছেলে বাবু১০৫ তখন বছর সাতেকের। ওকে একটা ভালো জায়গায় পড়াতে হবে। ঠিক করলাম, ওকে দার্জিলিং কনভেন্টে পড়াবো। তাই করলাম। ওকে ভর্তি করে দিলাম সেখানে। কিন্তু আমাকে ছেড়েতো ও কোনোদিন থাকে নি। কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। বারবার চিঠি লিখতে লাগলো বম্বেতে ফিরে আসবার জন্যে। আমি সময় পেলেই নিজে গিয়ে দেখে আসতাম বাবুকে। কিন্তু তাতে ওর মন ভরতো না। সবসময় আমাকে কাছে চায়। অতএব শেষপর্যন্ত ওকে ফিরিয়ে আনতে হল। বম্বেরই একটা স্কুলে ভর্তি করে দিলাম ওকে।
এ যেন ভালোই হল। কারণ বরাবরই আমি ছেলেদের বোর্ডিং—এ রাখার বিপক্ষে। ছেলেবেলায় বাবা—মার সান্নিধ্য সম্পর্ককে মধুর করে তোলে। এই বয়সেই ছেলেমেয়েদের মনে বাবা—মার সম্বন্ধে মনে যে রেখাপাত করে, সেটাই থেকে যায় চিরকাল। তারপর বড়ো হয়ে সে যেখানেই থাক, বাবা—মার প্রতি তার ভালোবাসা অটুটই থেকে যায়। আমার মতে সাবালক সংসারী ছেলেকে আলাদা থাকতে দেওয়াই বু%ঝি—মানের কাজ। তাতে বাবা—মার সঙ্গে ছেলেদের সম্পর্ক বাড়ে বই কমে না। ছেলেবেলায় বাবা—মার কাছে ছেলে আবদার করে নানারকমের। ভালো আবদারগুলো রাখা হয়, আর অন্যায় আবদারগুলোকে নাকচ করা হয়। ছেলেকে বাবা তখন আদরও যেমন করেন, শাসনও করেন সেই অনুপাতে। কিন্তু সাবালক ছেলেতো আবদার করে না, করে দাবি। সে দাবি না মেটাতে পারলেই সংঘাত শুরু হবে। কারণ তখন শাসনের বয়স পেরিয়ে গিয়েছে ছেলে। তাই তখন তার সংসার—সাম্রাজ্যে, তাকেই শাসনকর্তা করে, সরে আসা উচিত বাবার। এ মত আমার বরাবরের। এখনও তাই।
একটা কথা বলতে ভুলে গেছি—যখন ‘সম্রাট’ ছবির মিউজিক করছি অর্থাৎ ১৯৫২ সালে, তখন হঠাৎ একটা ছোটো বাড়ি কেনার সুযোগ এসে গেল। এটি মজার ঘটনা বলেই লিখছি। খারে ফোর্টিন্থ ‘এ’ রোডে যে বাড়িতে আমরা ভাড়া থাকতাম তার পাশে একটি মাদ্রাজি পরিবার থাকতো। ভদ্রলোকের নাম নারায়ণ স্বামী। উনি নিজে ইঞ্জিনীয়ার এবং ওঁর বাড়িটা নিজেই তৈরি করেছিলেন। একদিন শুনলাম উনি বাড়ি বেচে দিয়ে দেশে চলে যাচ্ছেন। রোজ সকালে ওঠা আমার অভ্যাস এবং সেদিন সকালে বাড়ির সামনের ছোটো খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, দেখলাম নারায়ণ স্বামী ওঁর বাগানে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি নাকি চলে যাচ্ছেন?’
উনি বললেন, ‘হ্যাঁ যাচ্ছি’। কারণ এইবার রিটায়ার করে দেশেই থাকবো ঠিক করেছি। হঠাৎ উনি বললেন, ‘দেখো, আমি বাড়িটা বিক্রি করবো ঠিক করেছি এবং তুমি যদি কিনে নাও, তো আমি আর কারুর সঙ্গে কথা বলব না।’
হঠাৎ এইরকম প্রস্তাব শুনে ঘাবড়ে গেলাম, কারণ এরজন্য একদম প্রস্তুত ছিলামনা। উনি আরো অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আমি আটাশ হাজারে—এ—টাকাই খরচ হয়েছিল বাড়িটা বানাতে, তোমায় দিয়ে দেব।’
আমি বললাম, ‘এতো টাকা একসঙ্গে দেবার মতো আমার অবস্থা নয় এখন। কলকাতায় যে বাড়িটা কিনে এখানে চলে এসেছি তার দেনা এখনো শোধ হয়নি।’
উনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কতো এখন দিতে পারো?’
আমি বললাম, ‘চোদ্দো হাজার যোগাড় করতে পারি।’
উনি তাতেই রাজি। আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি এত সুবিধা আমায় দিচ্ছেন কেন?’
উনি বললেন, ‘এ বাড়িটা আমার নিজের হাতের তৈরি, যারতার হাতে দিতে মন সরছে না। তুমি নিলে ভাববো, আমার এক প্রিয়জন বাড়িতে রইলো, মনে হবে বাড়ি আমারই রইলো।’
কী আশ্চর্য মানুষ! এইরকম চরিত্রের লোক পৃথিবীতে আছে? শুধু পাশাপাশি থেকে এতো ভালোবাসা? আমি দু’দিন সময় নিলাম। সেই দু’দিন সম্ভবত চারজন লোক এসে আমাকে বলেছেন, আমরা ছত্রিশ হাজার দিতে চাইছি। কিন্তু মিঃ নারায়ণ স্বামী বলছেন হেমন্তকুমার না বললে তবে আপনাদের কথা ভাববো।
বাড়ি আমার কেনা হল। শুধু তাই নয়, বাড়ির দলিলে উনি দেখালেন পুরো আটাশ হাজার এবং আলাদা হ্যান্ডনোটে চোদ্দ হাজার টাকায় বন্ধক রাখলেন বাড়িটা। সব উনিই করে দিলেন উকিল মারফৎ। বললেন, ‘এসব তুমি বোঝো না। বাড়ির দলিল নিখুঁত রাখা ভালো।’
বাড়ির বাকি টাকা অবশ্য আমি পরের বছরই শোধ করলাম ‘নাগিন’ হিট হবার পর। প্রায়ই নারায়ণ স্বামীর কথা মনে হয়, কী আশ্চর্য ভালো লোক।
মিঃ নারায়ণ স্বামীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক আগের মতোই আছে। এখনও উনি মাঝে মাঝে আমার কাছে আসেন দেখা করতে। তাকিয়ে দেখেন বাড়িটাকে। ওঁর শিশু—একতলাটা মাথাচাড়া দিয়ে তিনতলা হয়েছে দেখে মনে মনে খুশিও হন নিশ্চয়।
আমার নতুন কেনা বাড়িটায় এসে উঠেছিলাম ১৯৫৪ সালে। সেই বছরই আমার মেয়ে রাণু১০৬ হল। রাণু যেদিন হল সেদিনটার কথা আমার বেশ মনে আছে। সেদিন ছিল আমার একটা রেকর্ডিং। রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড। ডুয়েট গান। লতার সঙ্গে। সেইসময় তো লতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। প্রায় ঘরের লোকেরমতো। ওর ইচ্ছেতেই ডুয়েটটা হয়েছিল। গান দুটো, ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’ আর ‘মধু গন্ধে ভরা’।
রেকর্ডিং তো হয়ে গেল দুপুরে। লতা বাড়ি চলে গেল। আমি আর বাড়ি গেলাম না। ওখান থেকে সোজা চলে গেলাম ফিল্মিস্তানে। চাকরিতে তো হাজিরা দিতে হবে একবার। ফিল্মিস্তানে পৌঁছে খবর পেলাম বেলা নার্সিংহোমে চলে গেছে। লেবার পেন। রাণু তখন সাতমাস পেটে।
সেদিনই রাণু হল। তারিখটা হল ৪ঠা জুন।
আমার তখন হাতে অনেকগুলো ছবির কাজ এসেছে। করছিও একে একে। ‘নাগিন’ এর অভাবনীয় সাফল্যই এনে দিয়েছে নতুন ছবির কাজ।
কাজ করছি কিন্তু এও মনে মনে বুঝছি, গানগুলো তেমন মনের মতো হবে না কারুর। হবে কি করে। তখনও যে ‘নাগিন’ এর সুর মানুষের মনকে অক্টোপাশের মতো আঁকড়ে ধরে আছে। যত ভালো সুরই করি তবু লোকে বলে, ‘ইয়ে নাগিন নাহি হুয়া।’
লোককে কি করে বোঝাবো, ‘নাগিন’ একটাই হয়, পাঁচটা হয় না। তা সে কথা তখন কে আর শুনছে।
অবশ্য আমি এটা আঁচ করে নিয়েছিলাম আগেই। ‘নাগিন’ যখন সুপারহিট হল, তখন আনন্দিত হয়েছিলাম যতোটা, আতঙ্কিতও হয়েছিলাম ততোটা। গানে জোয়ার এসেছে, ভাঁটাও আসবে। এই নিয়ম। বিরাট কিছু সৃষ্টি একবারই হয়। বারবার হয় না। তাই আমার নতুন ছবির সুরগুলো ভালো হলেও লোকের মনে ধরছিল না।
এসব ব্যাপারে আমি কিন্তু খুব সজাগ। আমার নিজের অবস্থাটা কখন কী রকম সেটা ভগবান আমাকে চোখে আঙুল দিয়েই যেন দেখিয়ে দেন। আরও একটা কাজ করেন তিনি। একদিকে ঝুলে পড়লে অন্যদিকে টেনে তোলার ব্যবস্থা করেন।
এইরকম অবস্থায় পরিচালক সুধীর মুখোপাধ্যায়১০৭ এসে ধরলেন ওঁর ছবিতে সুর দিতে হবে। ছবির নাম ‘শাপমোচন’ আমিও তখন বম্বেতে মোটা টাকার কন্ট্র্যাক্ট পাচ্ছি। কিন্তু বাংলা ছবিতেতো আর অত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় রফা হল। তাতেই আমি রাজি।
খানচারেক গান ছিল ‘শাপমোচন’ ছবিতে। কাজ আরম্ভ করে দিলাম। মজাটা হল এই, যে সুরই করি সবাই খুব বাহবা দেয়। বলে, আহা, কী সুন্দর! অথচ সুরগুলো যে আমি খুব খেটে করেছি তাও নয়। যেমন ভালো লাগছে তেমন করছি। কিন্তু এই বাহবা দেবার কারণটা তো বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না আমার। আমার যে তখন খুব নাম হয়েছে। একবার নাম হয়ে গেলে তখন তার সব ভালো। কিন্তু নাম না হলে হাজার ভালো কাজেও সুখ্যাতি নেই। এই হল এ—লাইনের নিয়ম। সব লাইনেরই অবশ্য এই একই নিয়ম।
টেকনিশিয়ান স্টুডিওর সত্যেন১০৮ ‘শাপমোচন’ ছবির গান রেকর্ড করল। এই সময় আলাপ হল সুচিত্রা সেনের সঙ্গে। তখন সুচিত্রার খুব নাম। মস্ত হিরোইন। ‘শাপমোচন’ এর নায়িকা। ছবির নায়ক উত্তমকুমার। আমার গানগুলোতে ঠোঁট মেলাবে উত্তমকুমার। উত্তমের গলায় আমার গাওয়া গান খুব নিখুঁত হয়। মনে হয় উত্তম যেন নিজেই গাইছে। স্বরে সুরে একাকার হয়ে যায়।
ছবি শেষ হল। এইবার ব্যাকগ্রাউন্ড। এই ব্যাকগ্রাউন্ডের সময় আমায় কিছুটা মুশকিলে পড়তে হল। তখন আমার ভীষণ কাজ পড়েছে। বম্বের ছবিতো আছেই, তার ওপর কয়েকটা কাজ নিয়েছি মাদ্রাজে। বারবার সেখানে ছুটতে হচ্ছে। তারই এক ফাঁকে কলকাতায় এসে ‘শাপমোচন’ এর ব্যাকগ্রাউন্ড সেরে যেতে হবে।
তখন আমি যে ছবিতেই কাজ করি আমার সঙ্গে থাকে রবি আর রিজবার্ট। ওদের নিয়ে মাদ্রাজে যাই আবার ফিরি একসঙ্গে। তখন রোজই কাজ। বাড়তি সময় বলতে একটা দিনও আমার হাতে নেই। অথচ ‘শাপমোচন’ এর জন্যে অন্তত একটা দিন বার করতে হবে। অনেক হিসেব করে শেষপর্যন্ত একটা দিন পাওয়া গেল। আমি, রবি আর রিজবার্ট বিমানে উড়ে এলাম কলকাতায়।
রাত্তিরে কলকাতায় পৌঁছে আগে ছবিটা দেখে নিলাম। আসছে—কাল সন্ধ্যা থেকে শুরু করতে হবে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। তারই ব্যবস্থা মোটামুটি হয়ে গেল রাত্তিরে।
ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তো শুরু হল সন্ধ্যা থেকেই। যন্ত্রসংগীতশিল্পী সবই এখানকার। শুধু এদের সঙ্গে রিজবার্ট বাজাচ্ছিল স্যাকসোফোন আর রবি ছিল রিদিম—এ।
যতই তাড়াহুড়ো করি না কেন পুরো ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড করতে অন্তত দুটো দিন দরকার। কিন্তু আমারতো হাতে মাত্র এই একটাই রাত।
আমি তো দিনরাত খাটতে রাজি, কিন্তু এখানকার যন্ত্রশিল্পীরা রাত্তিরে কাজ করতে রাজি হল না। রাত্তিরে কাজ করলে উপরি টাকা পাবে, তবুও তারা আপত্তি জানালো। স্পষ্টই বললে, ‘আমরা রাত্তিরে কাজ করতে পারবো না।’
এখন উপায় কী। এ কাজতো আজ সারারাত খেটে শেষ করতে হবে। মনে মনে উপায়টা ভেবে নিলাম। তারপর তাদের বললাম, ‘ঠিক আছে, আপনারা যান।’
ওরা চলে যাবার পর রইলাম আমরা চারজন। আমি, রবি, রিজবার্ট আর নবীন সুর। রিজবার্ট স্যাকসোফোন বাজাবে, আর নবীন সুর পিয়ানো, আমি নিজে হারমোনিয়াম ধরবো। আর রবি বললে, আমি যখন যেটা পারবো বাজাবো।
সে কী উৎসাহ তখন আমাদের! অথচ ঠিক উলটোটাই হবার কথা। অতগুলো মিউজিকহ্যান্ড চলে যাওয়ায় কোথায় দমে যাবো, তা নয়, আরও যেন উদ্যম বেড়ে গেল। আমরা চারজনে মিলে ব্যাকগ্রাউন্ড করতে লাগলাম। মনে আছে, রবিকে শেষপর্যন্ত টেবিল বাজাতে হয়েছিল ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্যে।
এই ‘শাপমোচন’ ছবি যখন হাউসে মুক্তি পেলো তখন আর একবার দেখলাম দর্শকদের উল্লাস। খুব হৈ হৈ। গানগুলোই এ—ছবির প্রাণ। তাছাড়া গানের ভিতের ওপরইতো এ ছবির গল্প। সেই গানগুলোই মন মাতিয়ে দিয়েছে সকলের। বম্বেতে ‘নাগিন’ এর জন্যে যে সম্মান পেয়েছিলাম এখানেও সমান অভিনন্দন পেলাম ‘শাপমোচন’ ছবির জন্যে। নাগিন আর শাপমোচন, দুদিকে দুটো ডানা তখন আমায় যেন উড়িয়ে নিয়ে চলেছে।
১৯৫৪—৫৫—৫৬, এই সালগুলো কী জ্বলজ্বলে হয়ে উঠেছিল সেইসময়। মনে হতো যেন সোনার প্রজাপতি। ডানা নাড়ছে আর ঝরঝর করে সোনা ঝরছে।
‘শাপমোচন’ এর পর থেকে কলকাতার কাজ বেড়ে গেল খুব। সবাই আমাকে দিয়ে ছবির সুর করাতে চান। টাকার অঙ্ক বাড়াতে লাগলেন আমার জন্যে। আর আমিও তখন থেকেই ঠিক করে ফেলেছি আমার পরবর্তী কর্মসূচী। বম্বেতে যেমন চলছে চলুক, কিন্তু কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগটা বাড়াতে হবে। বম্বের ছবিতে সুর করি শ্রোতাদের মেজাজ দেখে। যাকে বলা যায় গোলামি সুর। আর বাংলাদেশের হৃদয়ে যে সুর ছড়াই, সেগুলো হল আমার অন্তরের জিনিস। সেখানে আমি গোলাম নই, মুক্ত সুরকার।
আমিতো জানি, ওইসব সুরের আয়ু কতটুকু। ওইসব সুরের আয়ু যেমন কম, ওইসব সুরের গায়কের আসনও ক্ষণস্থায়ী। তাই আমার কাছে সব থেকে প্রিয় গান রবীন্দ্রসংগীত। এটা আমার প্রাণের জিনিস। রবীন্দ্রসংগীত গাইতে আমার যত ভালো লাগে আর কোনো গান আমার ততো ভালো লাগে না। এই রবীন্দ্রসংগীতের দিকে তাকিয়ে আমি বেঁচে আছি। আমিতো জানি, সব চলে যাবে, একে একে বিদায় নেবে আমার গলা থেকে, কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না।
যাইহোক, ওদিকে তো তখনও ‘নাগিন’ এর জের চলেছে। ‘নাগিন’এর জন্যে পেলাম ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কার। এই ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ছিল ভীষণ কদরের। আমাকে ও. পি. নায়ার১০৯ বলেছিল, ‘তুমি এবার একটু পাবলিসিটি করতে শুরু করো। টাকা ছাড়ো, দেখবে পুরস্কার এসে যাচ্ছে। এইভাবেই তো পাবলিসিটি করতে হয়।’
আমি কিন্তু রাজি হইনি ওর কথায়। টাকা দিয়ে পুরস্কার কিনলে পাবলিসিটি হয় জানি, কিন্তু ওটাতো একটা চমক। সেই চমকের মেয়াদ কতটুকু! পাবলিসিটি হল চোখের চমক, মানুষের হৃদয়ে এর কোনো স্থান নেই। যেখানে হৃদয়ের সম্পর্ক নেই, সে রাস্তায় আমি কোনোদিন হাঁটিনি।
টাকা ছাড়াই আমি ‘নাগিন’এর জন্যে ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কার পেলাম। হয়তো আমাকে বাদ দিতো, কিন্তু ভরসা পায়নি কর্তৃপক্ষ। কারণ তখন ‘নাগিন’ এর গানের জোয়ারে সবাই ভাসছে। তখন ‘নাগিন’কে বাদ দিলে সেই জোয়ারে ফিল্মফেয়ার কর্মকর্তাদের ভেসে যাবার ভয় ছিল। তাই আমাকে ‘নাগিন’ এর সুরের জন্যে দিলো ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড। আর কলকাতায় ‘সিনে অ্যাডভান্স পুরস্কার’ পেলাম ‘শাপমোচন’ এর জন্য। সোনার মেডেল। সেবার সত্যজিৎবাবু ‘পথের পাঁচালী’র জন্যে সোনার মেডেল পেলেন।
‘নাগিন’ এর পর বম্বেতে বেশ কয়েকটা ছবিতে সুর দিলাম। কয়েকটা ছবির গান বেশ ভালোই হল। শ্রোতারা পছন্দ করলেন গানগুলো। কিন্তু এইসব ছবিগুলোর একটাও দাঁড়াল না। আসলে ছবি খারাপ হলে গান আর কতটুকু টানতে পারে? গাড়ির চাকা ভেঙে পড়লে ঘোড়াও খোঁড়া। সে ছুটলেও গাড়ি তো আর চলবে না। তা আমার বরাতে সেইসময় এইসব ছবিই জুটতে লাগল।
অথচ এইসব ছবির সুর আমি কত দরদ দিয়ে তৈরি করতাম। আমিতো জানতাম কত টাকা খরচ করে একটা ছবি তোলেন প্রোডিউসার। ছবিটা যাতে চলে সেদিকে আমার দেখা দরকার। আমার ওপর গানের দায়িত্ব। অতএব সেই দিকটাই আমি দেখতাম আমার সাধ্যমতো। তাছাড়া যে প্রোডিউসারদের জন্যে আমরা কাজ পাচ্ছি তাকে দেখা আমাদের কর্তব্য। আমি তাই আমার কর্তব্য, নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গেছি। একটুও কষ্ট দিইনি প্রোডিউসারকে। কিন্তু আমার শ্রম সার্থক হয়নি। ‘নাগিন’ এর পর আমার সুর দেওয়া ছবিগুলো একটার পর একটা মার খেয়েছে। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছি। কষ্ট হয়েছে খুব। বিশেষ করে, কষ্ট হয়েছে আমার সুর দেওয়া এইসব ছবির গানগুলোর জন্যে। হাউস থেকে ছবি বিতাড়িত হওয়ার পর যখন গানগুলো রেডিও আর গ্রামাফোনে শুনেছি, তখন সত্যিই মায়া হয়েছে। মনে হয়েছে আমার এই গানগুলো অনাথ ছেলেমেয়েদের মতো এখানে ওখানে বিলাপ করে বেড়াচ্ছে।
এসব দুঃখও সামলেছি অন্যভাবে। গানটাকে তখন মনে মনে ভেবে নিয়েছি ছবির আত্মা হিসেবে। আত্মার তো মৃত্যু নেই। তাই ছবির মৃত্যু হলেও তার আত্মা এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখনও আমার সেই অতীতে সুর দেওয়া গানটা কানে আসে। ‘না ইয়ে চাঁদ হোগা, না তারে রহেঙ্গে/ ম্যগর হাম হামেসা, তুমহারে রহেঙ্গে।’ তখন নিজের মনে বলতে ইচ্ছে করে, হাঁ বেটি, তুই চিরদিনই আমারই থাকবি।
এদিকে কলকাতায় তখন আমার সুখ্যাতি খুব বাড়ছে। যে ছবিতেই সুর দিচ্ছি সবই লেগে যাচ্ছে। শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কারগুলো পর পর পেয়ে যাচ্ছি। নেপথ্য গায়কের প্রাইজগুলোও পাচ্ছি নিয়মমতো।
গানের সুরের ব্যাপারে একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি, অনেক খেটে করা সুরও আমাকে ঠকিয়েছে, আবার মাত্র দশ মিনিটে তৈরি সুর বাহবা পেয়েছে প্রচুর। তখনই বুঝেছি, কুস্তি করে ভালো সুর বের করা যায় না। প্রথমে যে সুর স্বাভাবিকভাবে গলায় আসে সেটাই ভালো হয়।
এই প্রসঙ্গে ‘হারানো সুর’ এর কথাই বেশি করে মনে পড়ছে। ‘হারানো সুর’ এর সংগীত পরিচালনার ভার নিয়েছি। সেই সময় গৌরীপ্রসন্নই১১০ আমার সব বাংলা ছবির গান লিখতো। এদিকে হাতে সময় একদম নেই। দু’দিন একদিনের জন্যে কলকাতায় আসি, আবার চলে যাই বম্বে। এর ফাঁকে ফাঁকে সুর করে রেকর্ড করে যেতে হয়।
গান লেখানোর ব্যাপারে আমার একটা পদ্ধতি আছে। সেটা হল বেশিরভাগ গানের প্রথম লাইনটা আমি লিখে দিই, তারপর বাকিটা লেখেন গীতিকার। ‘হারানো সুর’এর জন্যে একটা গানের সুর করলাম। আধঘণ্টার বেশি সময় লাগলো না সুরটা করতে। গানটা হল ‘তুমি যে আমার’। সুর করে বম্বে চলে গেলাম। তারপর আবার যখন কলকাতায় এলাম তখন আর একটা গানের সুর করলাম। সেটাও লাগলো মাত্র পনেরো মিনিট। গানটা হল ‘আজ দুজনার দু’টি পথ’। দুটো গানেরই রেকর্ড হয়ে গেল।
সেইসময় আমার কানে কয়েকটা কথা এসেছিল এ—ছবির গানের সুরের সম্বন্ধে। এত তাড়াহুড়ো করে কি ভালো সুর হয়! কোনোরকমে দায়সারা কাজ করেছি নাকি আমি। এসব কথা তখন ছবির কর্তাব্যক্তিরা বলে বেড়িয়েছিলেন। অথচ সেই ‘হারানো সুর’ যখন মুক্তি পেলো, তখন তো এই গান দুটোই সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে। লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এ—গানের কথা আর সুর, এবং ‘হারানো সুর’ এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অসাধারণ, বলেছে সবাই।
তাই আবার বলছি, ঘণ্টার হিসেব কষে সুরকে উৎকৃষ্ট করা যায় না। সুর ভালো হবার হলে পাঁচ মিনিটেও হয়, আবার সারাদিন রগড়ালেও একটা ভালো সুর বের করা যায় না। এটা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
আমি সুর যখন করি তখন সময় বেশি দিইনা। যেটা স্বাভাবিকভাবে আসে তাকেই গ্রহণ করি। কিন্তু তারপর একটা কাজ করি। সেটা হল সুরটা করে, দিন ৭—৮ ফেলে রেখে দিই। তারপর আবার ৭—৮ দিন পর সেটা শুনে দেখি। যদি দেখি ভালো লাগছে শুনতে, তখন সেটা অনুমোদন করি। নইলে সে সুরকে বাতিল করে দিই। এই পদ্ধতিতেই আমি সুরের যাচাই করে এসেছি। আজও তাই করি।
বম্বেতে তখন আমার হাতে অনেকগুলো ছবি এসে গেছে। একটা একটা করে প্রায় ত্রিশ বত্রিশখানা ছবির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। রোজই তখন আমার বাড়িতে প্রোডিউসাররা আসাযাওয়া করছেন। সে কী খাতির তখন আমার। মিউজিক ডাইরেক্টরদের যে এতো কদর তা বুঝতে পারিনি আগে। তখন আরও একটা জিনিস বুঝতে পারিনি। বম্বের ডিস্ট্রিবিউটাররা প্রতি ছবির জন্যে আমার নামে এক লক্ষ টাকা দিয়েছেন প্রোডিউসারকে, আর আমি পেয়েছি মাত্র দশ হাজার, বারো হাজার। বিশ হাজার যে ছবিতে পেয়েছি, মনে করেছি অঢেল টাকা। এতো টাকা একটা ছবিতে সুর দিয়ে পাওয়া যায়! ও বাবা এ যে অনেক টাকা! কিন্তু ছবির বাজারে আমার মূল্য যে তখন লক্ষ—য় গিয়ে পৌঁছেছে, সে খবর বুঝেও বোঝেনি আমার মন। কারণ আমার সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ পরিস্থিতি বদলেছে, বদলায়নি শুধু আমার মধ্যবিত্ত মনোভাব।
অথচ অতগুলো ছবি একসঙ্গে নিয়ে কী অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে আমাকে। তখন আমি, রবি আর রিজবার্ট রোজ রাত্তির দুটো তিনটে পর্যন্ত কাজ করেছি। ছোটো বাড়ি, জায়গা কম। ওরই একধারে বসে সুর সৃষ্টি করতে হয়েছে।
সেইসময় টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দিয়ে কম কাজ হাতে নিলে আমাকে এতোটা মুশকিলে পড়তে হতো না। তখন গাদা গাদা গানের সুর করতে হচ্ছে। সুরটা করে ৭—৮দিন ফেলে রেখে ভালোমন্দ যাচাই করবো, সে সময়ও পাচ্ছিনা। পর পর রেকর্ডিং—এর তারিখ ফেলছেন প্রোডিউসাররা।
আরও একটা ব্যাপারে আমি পিছিয়ে ছিলাম। সেটা হল ভাষা। হিন্দি গানের সুর করছি অথচ ভাষাটা পুরোপুরি রপ্ত হয়নি তখনও। গানের ভাষা অন্তরের গভীরে প্রবেশ না করলে অপূর্ব সুর সৃষ্টি হবে কি করে? বাংলা আমার মাতৃভাষা। এ ভাষার রস আমার ধমনীতে বইছে। এ ভাষার ওপর আমার পুরোপুরি দখল। তাই এ ভাষার শ্রেণি—গোত্র বিচার করে যোগ্য সুরের হাতে এদের সম্প্রদান করতে আমার এতোটুকু ভুল হয়না। কিন্তু যে ভাষা আমার দখলে নেই সেখানে কথা ও সুরের মিলন ঘটাতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু এ মিলনে বেশিরভাগ সৃষ্টিই হয়েছে অসবর্ণ। আর কেউ একথা ভেবে দেখেছে কিনা জানি না। কিন্তু আমার বারবার মনে হয়েছে এই একটা কথা। ভাষাটা ঠিকমত শিখতে পারলে, এতোটা ক্ষতি হতে পারত না।
আজ এতোদিন পর নিজের সম্বন্ধে কত চুলচেরা বিচার করতে পারছি। কিন্তু সেদিন পারিনি। সেদিন পারা সম্ভবও ছিল না। কারণ তখন আমি একের পর এক ছবির দায়িত্ব নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। বম্বেতে কাজ করতে করতে ছুটছি মাদ্রাজে, আবার ফিরে এসেই ধরতে হচ্ছে কলকাতার প্লেন। কলকাতায় তখন ছবি নিয়েছি অনেক। তার ওপর আছে প্লে—ব্যাক। বাংলা ছবিতে তখন নেপথ্য গায়ক হিসেবে আমার নাম একচেটিয়া বলা যেতে পারে। সে সময় প্রায় প্রতিটি ছবিতে আমার গান থাকবেই।
কিন্তু বম্বেতে সেইসময় আমার প্লে—ব্যাক অনেক কমে গেছে। আগে যারা নিতো তারা আর নিতে চাইছে না। তারা আমাকে নিতে সংকোচবোধ করছে। কারণ মিউজিক ডাইরেক্টর হিসেবে আমার কদর তখন সকলকে ছাড়িয়ে গেছে। ওখানকার সুরকাররা ভাবছে, আমাকে দিয়ে ওদের ছবিতে প্লে—ব্যাক করালে আমি হয়তো ওদের সুরের ওপর কাঁচি চালাবো। সেই ভয়েই আমাকে কেউ ডাকতে সাহস করছে না।
ওদের অবশ্য এ ব্যাপারে দোষ দেওয়া যায় না। এইরকম ধারণা হওয়া ওখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ বম্বের ছবিতে মিউজিক ডাইরেক্টরের স্থান ভীষণ ঊর্ধে। সময় বিশেষে ছবির পরিচালকের থেকেও ওখানে সংগীত পরিচালকের কদর বেশি। কারণ ওখানকার বেশিরভাগ ছবির লাগাম ধরিয়ে দেওয়া হয় মিউজিক ডাইরেক্টরের হাতে। ওরা জানে গল্পের চাকা চলতে চলতে খানায় পড়লেও গান ঠিক টেনে নিয়ে যাবে ছবিটাকে। এইজন্যেই ওরা এতো খাতির করে সংগীত পরিচালককে।
.
১০০। নওসাদ (১৯১৯—২০০৬) :— হিন্দি ছবির জগতে এক কিংবদন্তী সঙ্গীত পরিচালক। লক্ষ্নৌ—এ জন্ম। ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ, ঝন্ডে খান প্রমুখের সঙ্গে সহকারীর কাজ দিয়ে শুরু। ১৯৪১ সালে প্রথম ‘প্রেমনগর’ ছবিতে সুরারোপ করেন। নওসাদ সঙ্গীত পরিচালিত ছবির মধ্যে ‘জাদু’, ‘দিল্লাগী’, ‘দস্তান’, ‘মালা’, ‘বাবুল’, ‘বৈজু বাওরা, ‘কোহিনুর’, ‘উড়ান খাটোলা’, ‘শবাব’, ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এম.এন.সানির সঙ্গে একযোগে ‘উড়ান খাটোলা’ ছবিটি প্রযোজনা করেন নওসাদ।
১০১। ‘ববি’ :— রাজকাপুর প্রযোজিত ও পরিচালিত ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সুপারহিট হিন্দি ছবি। ঋষি কাপুর—ডিম্পল কাপাডিয়া অভিনীত এই ছবিতে লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল—এর সুরে গানগুলি আজও জনপ্রিয়।
১০২। অনুপমদা (১৯১১—১৯৫৬) :— বাংলা গানের এক কিংবদন্তী সঙ্গীত পরিচালক। পুরো নাম অনুপম ঘটক। সুরারোপে এক নিজস্ব ঘরানা নিয়ে এসেছিলেন। অজস্র আধুনিক গান, এনার সুরে আজও অমর। হীরেন বসুর সহায়তায় পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন। হীরেনবাবুর কথায় হেমন্তকে দিয়ে পাঞ্জাবী ‘হির’ লোকগানের ছায়ায় রেকর্ডে গাওয়ান, ‘শুকনো শাখার পাতা ঝরে যায়…’ ও ‘প্রিয়ার প্রেমের লিপি…’—১৯৪৯ সালে। ১৯৩৪ সালে হীরেন বসুর সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে প্রথম ‘মহুয়া’ ছবিতে শুরু করে, এককভাবে ১৯৩৫ সালে ‘পায়ের ধুলো’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করলেন অনুপম ঘটক। এরপর, মুম্বই গিয়ে ‘সাধনা’, ‘লেডিজ ওনলি’, ‘উসকি তামান্না’ ইত্যাদি ছবিতে কাজ করলেন। কলকাতায় এসে ‘শাপমুক্তি’, ‘পাষাণ দেবতা’, ‘মায়ের প্রাণ’ ইত্যাদি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করে, আবার মুম্বই ও লাহোর গিয়ে বেশকিছু হিন্দি ও উর্দু ছবিতে কাজ করলেন অনুপমবাবু। পাকাপাকিভাবে কলকাতায় এসে ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শঙ্করনারায়ণ ব্যাঙ্ক’, ‘শ্রীতুলসীদাস’, ‘সঞ্জীবনী’, ‘অনুপমা’, ‘পরেশ’, ‘একটি রাত’ ইত্যাদি অনেক ছবিতে অসামান্য সঙ্গীত রচনা করেন। ‘একতারা’ তাঁর শেষ সুরারোপিত ছবি। প্রসঙ্গত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবির ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু…’ গানের সুরে তখনকার দিনে অসামান্যভাবে ‘ডিমিনিসিং কর্ড’—এর ব্যবহার অনুপম ঘটকের জাত চেনায়।
১০৩। লক্ষ্মীকান্ত—প্যারেলাল :— মুম্বই ফিল্মি দুনিয়ার এক অসাধারণ সঙ্গীত পরিচালকের জুটি। এই দুজনে মিলে প্রায় পাঁচ দশকজুড়ে হিন্দি ছবির জগতে রাজত্ব করেছেন। প্রথমে লক্ষ্মীকান্ত ও পরে প্যারেলাল, কল্যাণজী— আনন্দজী—র সহযোগী হিসেবে ‘মাদারী’, ‘ছলিয়া’ ইত্যাদি ছবিতে কাজ করেন। ১৯৬৩ সালে প্রথম একটি ভোজপুরী ছবিতে লক্ষ্মীকান্ত—প্যারেলাল হিসেবে সঙ্গীত পরিচালনা করে, একই বছরে হিন্দি ‘পরশমণি’ ছবিতে প্রথম কাজ করেন। এরপর, ‘আয়া তুফান’, ‘মিস্টার এক্স ইন বম্বে’, ‘মিলন’, ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’, ‘ড্রিমগার্ল’, ‘অমর আকবর অ্যান্টনী’, ‘ববি’, ‘তেজাব’, ‘হাতি মেরে সাথী’, ‘রামলখন’ ইত্যাদি অজস্র ছবিতে এই জুটি সঙ্গীত পরিচালনা করেন।
১০৪। সত্যেন বসু :— প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক। বাংলা—হিন্দি দুই জগতেই কাজ করেছেন। ‘পরিবর্তন’, ‘বরযাত্রী’ ইত্যাদি জনপ্রিয় বাংলা ছবি পরিচালনা করেছেন। ‘দোস্ত’, ‘বন্দিশ’, ‘জাগৃতি’ ইত্যাদি অনেক সফল হিন্দি ছবির পরিচালক। প্রসঙ্গত, ‘পরিবর্তন’ ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন সত্যেন বসু।
১০৫। বাবু :— হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পুত্র জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়ের ডাকনাম। ১৯৪৭ সালে জন্ম। বর্তমানে মুম্বই—প্রবাসী। ১৯৭২ সালে হেমন্তকুমারের প্রযোজনায় ও প্রবীর রায়ের পরিচালনায় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বিশ সাল পহেলে’ ছবিতে ‘রীতেশকুমার’ নামে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়। নায়িকা ছিলেন ‘অনুপমা’। পরবর্তীকালে, নিজে প্রযোজক সংস্থা তৈরি করে হিন্দি ছবি প্রযোজনা করেছিলেন জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়। প্রখ্যাত চিত্রাভিনেত্রী মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন জয়ন্তবাবু।
১০৬। রাণু :— হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্যা রাণু মুখোপাধ্যায়। ১৯৫৪ সালে জন্ম। ১৯৬৩ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে অসাধারণ গান করেন হেমন্তবাবু সুরারোপিত ‘বাদশা’ ছবিতে। সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে পরবর্তীকালে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠা পান। বেশকিছু ছবিতে ও নন—ফিল্ম আধুনিক বাংলা গান হিসেবে রাণু মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া অনেক গান জনপ্রিয় হয়। সলিল চৌধুরীর সুরে ‘আকাশকুসুম…’ বা ভি.বালসারার সুরে ‘বুসিবল বুসিবল…’ এইরকমই কিছু রাণু মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া জনপ্রিয় গানের উদাহরণ। বর্তমানে, মুম্বই—প্রবাসী এই শিল্পী, অনেকদিনই সঙ্গীতজগত থেকে দূরে আছেন।
১০৭। সুধীর মুখোপাধ্যায় :— এক বিশিষ্ট চলচ্চিচত্র—পরিচালক ও প্রযোজক। তৎকালীন ২৪ পরগণা জেলায় জন্ম। প্রোডাকসন্স সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে ‘মহিলামহল’, ‘পাশের বাড়ি’, ‘আজ সন্ধ্যায়’, ‘শাপমোচন’ ইত্যাদি ছবি পরিচালনা করেন সুধীর মুখোপাধ্যায়।
১০৮। সত্যেন :— বাংলা চলচ্চিচত্রজগতের প্রখ্যাত শব্দযন্ত্রী সত্যেন চট্টোপাধ্যায়। বর্তমান বাংলাদেশের যশোহর জেলায় ১৯২০ সালে জন্ম। প্রথম শব্দযন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন গুণময় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘বিশ বছর আগে’ ছবিতে। সত্যেন চট্টোপাধ্যায়ের শব্দসংযোজিত ছবিগুলির মধ্যে ‘রামী’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘দেবত্র’, ‘শাপমোচন’, ‘সন্দীপন পাঠশালা’, ‘দৃষ্টি’, ‘অর্ধাঙ্গিনী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে, অনেকদিন পর্যন্ত বিভিন্ন ছবিতে কাজ করেছেন এই বিশিষ্ট শব্দযন্ত্রী।
১০৯। ও.পি.নাইয়ার :— হিন্দি ছবির জগতে প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক। তৎকালীন যুগে ‘রিদম’—এর এক অভিনব ব্যবহারের নজীর রেখেছিলেন। পুরো নাম ওঙ্কারপ্রসাদ নাইয়ার। জন্মেছিলেন বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে। ও.পি.নাইয়ার তাঁর ১৭—১৮ বছর বয়সে প্রথম দুটি গান সুর করেন, যা রেকর্ডে গেয়েছিলেন তাঁরই বন্ধু পরবর্তীকালের প্রখ্যাত গায়ক সি.এইচ আত্মা। ১৯৫২ সালে প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা করেন ‘আসমান’ ছবিতে। ‘নয়া দৌড়’, ‘তুমসা নহী দেখা’, ‘হাওড়া ব্রিজ’, ‘আরপার’, ‘মি. এন্ড মিসেস ৫৫’, ‘সি.আই.ডি’, ‘কাশ্মীর কি কলি’ ইত্যাদি অনেক ছবিতে অসামান্য সুরারোপ করেছেন ও.পি.নাইয়ার।
১১০। গৌরীপ্রসন্ন (১৯২৪—১৯৮৬) :— বাংলা গানের জগতে সর্বকালের অন্যতম সেরা এই গীতিকারের পুরো নাম গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ শেষ করেন। বাংলা ও ইংরেজি—তে এম.এ। কবিতা ও গান লেখার শুরু অনেকদিন। ইংরেজি কবিতাও লিখেছেন প্রচুর। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সাজাহান’ নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। কলেজে পড়াকালীন গৌরীপ্রসন্ন—র লেখা ‘আমি বুঝতে পারিনা…’ ও ‘শুধু পত্র ঝরায়…’ দুটি গান, ঐ ৪০—এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিজের সুরে রেকর্ডে গাইলেন বিমলভূষণ। এরপর, ১৯৪৭ সালে সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে অপরেশ লাহিড়ীর রেকর্ডে গাওয়া ‘ভালোবাসা যদি অপরাধ হয়…’ গানটি গীতিকার হিসেবে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। এরপর, কয়েকদশকজুড়ে নন—ফিল্ম ও ফিল্মি বাংলা গানের জগতে উজ্জ্বলরূপে বিরাজ করেছেন এই গীতিকার। ১৯৪৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পূর্বরাগ’ ছবিতে প্রথম চলচ্চিচত্রের জন্য গান লিখলেন গৌরীপ্রসন্ন। প্রসঙ্গত, এটি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়েরও প্রথম ছবি। এরপর, অজস্র ছবিতে বহু কালজয়ী গান লিখলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ—র প্রেক্ষিতে ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে…’ গানটি লিখে ইতিহাস প্রসিদ্ধ হয়ে যান গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। এটির একটি ইংরেজি অনুবাদও লেখেন। দিনেন্দ্র চৌধুরির সঙ্গীত পরিচালনায় ও নিজের সুরে রেকর্ডে গানটি গেয়েছিলেন অংশুমান রায়। গৌরীপ্রসন্ন—র লেখা কাহিনিনির্ভর কয়েকটি চলচ্চিচত্রও নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ছায়াসঙ্গিনী’, ‘সূর্যতোরণ’ ইত্যাদি।
