নীলিমা সান্যালের৩৬ মামাতোভাই অমিয় বাগচী৩৭ ভালো গান লিখতো। নীলিমা—ই অমিয় বাগচীর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেই পরিচয় পরে অন্তরঙ্গতার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল। ভারী ভালমানুষ ছিল অমিয়। গানও লিখতো সুন্দর। ওর লেখা ‘কথা কোয়োনাকো শুধু শোনো’৩৮ গানটা রেকর্ড করলাম। আমারই সুর। বাজারে লেগে গেল গানটা। তখন সকলের মুখে মুখে এ গানের কলি ফিরতো। এরপর করলাম ‘এসো কুঞ্জে গো মধু জ্যোছনায়’। এটাও শ্রোতাদের কান মজালো। অমিয় বাগচীর অনেকগুলো গান আমি রেকর্ড করেছিলাম তারপর।
এইসময় আমার গান অনেক শ্রোতাদের কানে পৌঁছে গেছে। আমার গান অনেকেরই তখন ভালো লাগছে। সেই সময় আলাপের সুযোগ পেলাম আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় কমল দাশগুপ্ত—র সঙ্গে। বিরাট প্রতিভাবান পুরুষ এই কমলদা। আমার গান শুনে সুর দিতে রাজি হলেন। ওঁরই ট্রেনিং—এ হল আমার প্রথম হিন্দি রেকর্ড। সালটা ১৯৪০।
কমলদার সুরের চাহিদা তখন প্রচুর। উনি তখন গ্রামাফোন কোম্পানির সিংহ—সুরকার। সুরের রাজা। ওঁর সুরে যূথিকা রায়ের রেকর্ড তখন একচেটিয়া। হু—হু করে বিক্রি। ওঁর সুরের রেকর্ডে, কোম্পানি সেই যুগে কম করে এককোটি টাকা লাভ করেছে।
কিন্তু হায়, শিল্পীর জীবন! এ জীবন বড়ো অস্থায়ী। আজ শিল্পী আছে, কাল শ্রোতারা একটু নাড়া দিলো অমনি আসন টলোমলো। এবার লাইন থেকে বেরিয়ে যাও। যাও যেখানে খুশি। আমাদের তা দেখবার দরকার নেই।
আজ তাই ভাবি, কমলদার মতো এতো বড়ো বিরাট প্রতিভাকে কীভাবে ধীরে ধীরে গানের লাইন থেকে সরে যেতে হয়েছিল। আমরা শুধু দেখেছিলাম। দেখেছিলাম, শিল্পীর অপমৃত্যু।
এই সেদিন কমলদা চিরবিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে। তখন উনি পাকাপাকিভাবে ঢাকায় বসবাস করছিলেন। আমরা খবরটা শুধু শুনলাম। একটা শোকসভার আয়োজন করেছিলাম আমি এবং বিমান৩৯ গ্রামাফোন কোম্পানিতে। সভার শেষে, গ্রামাফোন কোম্পানির বিমান ঘোষকে বলেছিলাম, ‘দেখছো তো বিমান, এই হল শিল্পীর জীবন। যতক্ষণ তোমার নাম ততক্ষণ তুমি আমার মাথায়। তারপর তোমার নাম গেল তো তুমি হয়ে গেলে কলার খোসা। কলাটা খাওয়া হয়ে গেছে, এবার খোসা ফেলে দাও। পা পিছলে মরুক। নাম চলে গেলে শিল্পীর কথা কেউ ভাবে না। জানি না, আমাদের জীবনে কী আছে।’
বলার শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল আমার। তাই দেখে বিমান ওপর দিকে হাত তুলে বলেছিল, ‘সবই ওপরওলার ইচ্ছে। তুমি, আমি কে! শুধু এগিয়ে চলো।’
আজও আমি এগিয়েই চলেছি, সে ভালোই হোক আর মন্দই হোক। থামলে চলবে না। কোনোদিনই আমি থামিনি। মনে আছে, সেই সময় ‘ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েট্রিকাল অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করল কমিউনিস্ট পার্টি। যাকে এককথায় বলে, আই. পি. টি. এ.৪০। এখানে গাইবার জন্যে আমার ডাক পড়লো। সানন্দে যোগ দিলাম এদের সঙ্গে। তখন আই. পি. টি. এ.র বম্বে অফিসের প্রধান ছিলেন পণ্ডিত রবিশংকর। আই. পি. টি. এ.র কাজ ছিল এখানে ওখানে অনুষ্ঠান করা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে আমি গান গাইতাম। থিয়েটারও হতো। তখন বিজন ভট্টাচার্যের৪১ লেখা ‘নবান্ন’ নাটক নিয়ে হৈ—হৈ পড়ে গেছে। এদের সঙ্গে তখন ঘুরেছি গ্রামে গ্রামে। এই আই.পি.টি. এ.র মাধ্যমেই আলাপ হল বিনয় রায়৪২, সলিল চৌধুরীর৪৩ সঙ্গে।
এদিকে তখন আবার ‘আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশান’ গড়া হল। আর্টিস্টদের একটা সংস্থার তখন খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। যারা গান গায়, যাদের নিয়ে জলসা হয়, তারা কিছু পায়না। তারা তখন বিনা পয়সায় গেয়ে আসে। হাস্যকৌতুক—শিল্পী স্টেজে উঠে লোককে হাসায়, কিন্তু শুধু—হাতে ফিরে আসতে হয়। লোককে হাসিয়ে নিজের মুখ শুকনো। অতএব একটা মজুরির দাবি তোলা দরকার। আর এসব দাবি জানাতে গেলে একটা অ্যাসোসিয়েশানের বিশেষ প্রয়োজন। তাই হল ‘আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশান৪৪।’ অ্যাসোসিয়েশানের প্রেসিডেণ্ট হলেন নির্মলচন্দ্র চন্দ্র৪৫। ওঁরই বৌবাজারের বাড়িতে হল অ্যাসোসিয়েশানের আপিস। আমাদের দাবির কথা পেশ করা হল জলসার কর্তৃপক্ষদের কাছে।
এতে কাজ হল। মনে আছে, আমি প্রথম টাকার ফাংশান পেয়ে গেলাম খুব তাড়াতাড়ি। গিরীন্দ্র সিংহ৪৬ একটা ফাংশানের আয়োজন করলো। আর্টিস্ট তিনজন। আমি, পঙ্কজদা আর অজিত চ্যাটার্জী। একশো টাকায় রফা হল। অজিত আর আমি পেলাম পঁচিশ টাকা করে, আর পঙ্কজদা পঞ্চাশ। তা তখন ওই টাকাই অনেক। অনেক তার দাম। তার ওপর আবার ফাংশানে গান করে টাকা পাওয়া। যেটা আগে কেউ পেতেন না। পেলেন আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশানের দৌলতে।
এই সময় আলাপ হল দ্বিজেন চৌধুরীর৪৭ সঙ্গে। আমাদের কানুদা। তখন রবীন্দ্রসংগীতে খুব নাম। সুপ্রভা সরকারের৪৮ সঙ্গে এবং উৎপলা ঘোষের সঙ্গে (এখন উৎপলা সেন৪৯) পরিচয় হল। সুপ্রভা সরকারকে আমি বড়দি বলতাম। অনেকেই বড়দি বলতো। তখন বড়দির একচেটিয়া নাম। প্রত্যেক নায়িকার গলায় তখন বড়দির প্লে—ব্যাক। উৎপলাও নিউ থিয়েটার্সের প্লে—ব্যাক আর্টিস্ট।
আমারও এবার প্লে—ব্যাকের সুযোগ এলো। একদিন কবি অজয় ভট্টাচার্য৫০ বললেন, তুমি ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম কোম্পানিতে আমার সঙ্গে দেখা করো। আমাদের একটা ছবি হচ্ছে। ‘নিমাই সন্ন্যাস’৫১। হরিপ্রসন্ন দাসের৫২ সুর। ছবি বিশ্বাস৫৩— ‘নিমাই’। তোমাকে দিয়ে নিমাই—এর গান করানোর কথা হচ্ছে।
কাজটা পেয়ে গেলাম। ফিল্মে আমার একক গানের প্লে—ব্যাক ‘নিমাই সন্ন্যাস’—এই প্রথম। এর আগে কোরাসে গেয়েছি। এ একেবারে নায়কের মুখের গান। গানগুলো তখন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। আর এই প্লে—ব্যাক করেই হরিপ্রসন্নদার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল। খুব স্নেহের চোখে দেখতে লাগলেন আমাকে। আর তারপরই আমাকে ওঁর গানের সহকারী পরিচালক করে নিলেন। হরিপ্রসন্নদার কাছেই আমার ফিল্মের সুরকার হিসেবে হাতেখড়ি।
এইসময় থেকেই আমি আমার গানের স্টাইলের সম্বন্ধে সচেতন হলাম। গোড়াতে আমি পঙ্কজদাকে অনুকরণ করে গান গাইতাম। সেই ছাপটাই আমাকে এতোদিন এগিয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু আর তো পরের পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানো চলে না। নিজের পোশাক না হলে চিনবে কী করে লোক? তাই নিজস্ব একটা ভঙ্গির দিকে নজর দিলাম। প্রথমে নজর দিলাম গানের উচ্চচারণের দিকে। খুব স্পষ্ট হওয়া চাই, সেই সঙ্গে থাকা চাই মিষ্টত্ব। যা মানুষকে আকৃষ্ট করবে। এসব আস্তে আস্তে রপ্ত করলাম। উচ্চচারণের ব্যাপারে অবশ্য গোড়া থেকেই আমি খুব সজাগ। উচ্চচারণটা যেমন সঠিক হওয়া উচিত, ঠিক সেইসঙ্গে দেখতে হবে স্বাভাবিকতা না হ্রাস পায়। এইসব দিকে তখন খুব নজর দিতে লাগলাম। আর এই করতে করতে নিজের একটা স্টাইল এসে গেল। সম্পূর্ণ নিজস্ব স্টাইল, হেমন্ত—কণ্ঠের সূচনা হল তখন থেকে।
এই বৈশিষ্ট্যই আমাকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকলো। তখন আর অপরের পথে মেপে মেপে হাঁটা নয়। নিজের তৈরি পথেই নিজে হাঁটছি। নিজের প্রতি নিজের আস্থা বাড়লো। সেই সঙ্গে বাড়লো কদর।
ওস্তাদ আমীর খাঁর৫৪ সঙ্গে এই নিয়ে একদিন কথা হচ্ছিল। উনি তখন আমাকে স্বনামে চেনেন। ওঁদের গানের কাছে আমরা তো হরিজন। সে কথাই ওঁকে বললাম। উনি শুনে বললেন, ‘না না, একথা বলবে না। গান গানই। এর মধ্যে আবার জাত টানছো কেন। আমি তো কোনো গানকে সে চোখে দেখি না! জাতভায়ের মত দেখি।’
গানের ব্যাপারে ভীষণ উদার ছিলেন আমীর খাঁ সাহেব। মনে আছে, সেবার দিল্লীতে একটি ফাংশানে গান করছি। গান শেষ করে উঠে দেখি ওস্তাদ আমীর খাঁ। আমাকে দেখে উনি বললেন, ‘তোমার গান শুনছিলাম এতক্ষণ।’
ওস্তাদ আমীর খাঁ আমার গান শুনলেন! এ যেন ভাবতে পারছি না! আনন্দে গদগদ হয়ে বললাম, ‘আজ আমি ধন্য, আমার গান ধন্য।’
আমি তখন সব দিক দিয়েই ধন্য। একটা রোগা লম্বা ছেলে একদিন কোনো কিছু সম্বল না করে গানের দিকে ঝুঁকেছিল। ভবিষ্যতের কথা সেদিন ভাবেনি একটুও। অভাবের সংসারে মানুষ হয়ে এতবড়ো ঝুঁকি কী করে নিতে পেরেছিল সেদিন, সে—ই জানে। ভরাডুবি হলে আর বাঁচবার রাস্তা নেই। শেষপর্যন্ত তা হল না। জিতে গেল সেই ছেলেটি।
জেতার মুখে সব ঘুঁটিই দেখেছি দান ওঠায়। তখন যাঁদেরই সান্নিধ্যে আসি তাঁরাই এগিয়ে নিয়ে যান। অনাদি দস্তিদারকে৫৫ কাছে পেলাম। উনি সঙ্গে সঙ্গে দুটো গানের ব্যবস্থা করে দিলেন। ওঁর ট্রেনিং—এ রেকর্ড করলাম দুটো রবীন্দ্রসংগীত। ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’ আর ‘আমার আর হবে না দেরী’।
এরপরই পেলাম নিউ থিয়েটার্সের ছবি ‘প্রিয়—বান্ধবী’—তে রবীন্দ্রসংগীতের প্লে—ব্যাক— ‘পথের শেষ কোথায়, কী আছে শেষে’। নায়ক দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়৫৬, নায়িকা চন্দ্রাবতী দেবী৫৭। ছবি হিট, আর আমার গান সুপার হিট।
‘প্রিয়—বান্ধবী’র৫৮ পরিচালক ছিলেন সৌমেন মুখোপাধ্যায়৫৯—লেখক সৌরেন মুখোপাধ্যায়ের৬০ ছেলে। ঐ সময় ওঁদের বাড়িতে খুব আমার যাতায়াত ছিল। সুচিত্রা মিত্র সৌরেনবাবুর মেয়ে। ওদের বাড়িতে রবীন্দ্রসংগীতের খুবই চর্চা হতো। সুচিত্রা৬১ তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্রী।
সৌমেনবাবুই ঐ গানটির জন্য আমায় মনোনীত করেছিলেন। ‘পথের শেষ কোথায়’ হিট হবার পর আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটলো। রবিদা অর্থাৎ সংগীত পরিচালক রবীন চট্টোপাধ্যায়ের৬২ তখন খুব নাম। উনি আমাকে ‘সাত নম্বর বাড়ি’র৬৩ দু’খানা গানের জন্য রিহার্সালে ডাকলেন। তখনকার দিনে একটা গান রেকর্ড করার আগে অন্তত সাত—আট দিন রিহার্সাল দেওয়া হতো। প্রথম দু—তিনদিন শুধু শিল্পীর রিহার্সাল হতো, তারপর তিন—চারদিন অর্কেস্ট্রার সঙ্গে গায়কের রিহার্সাল হতো। তারপর রেকর্ডিং হতো। আর নিউ থিয়েটার্সের তো আরো নবাবি ব্যাপার। দশ—পনেরো দিন রিহার্সাল তো হতোই, আবার কোনো কোনো গান সাত—আট দিন ধরে রেকর্ডিং হতো।
সালটা ছিল ১৯৪০ বোধহয়। সেদিন সকাল এগোরোটায় নিউ থিয়েটার্সের পঙ্কজদা কোরাস রিহার্সাল নিলেন। সেই রিহার্সাল শেষ করে দুপুর দুটোয় রবিদার রিহার্সালে গেলাম কালী ফিলম স্টুডিওতে (এখন যেটা টেকনিশিয়ান স্টুডিও)। একটা গান তুললাম। রবিদা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হেমন্ত, অন্যটাও একবারে শিখবে নাকি?’
আমি সম্মতি জানালাম। দুটো গান শেখা হয়ে গেল বেলা তিনটের মধ্যে অর্থাৎ এক ঘণ্টার মধ্যে। তারপর রবিদা বললেন, ‘এইবার পর পর দুটো গান শোনাও তো দেখি কেমন মনে আছে?’ আমি পর পর দুটো গান গেয়ে শুনিয়ে দিলাম। গান শোনার পর হঠাৎ রবিদা বললেন, ‘আচ্ছা, আমি যদি আজই এবং এক্ষুণি রেকর্ড করি, তুমি গাইতে পারবে?’ আমি বললাম, ‘নিশ্চয় পারবো।’ অর্কেস্ট্রা বাজাবার জন্যে সবাই উপস্থিত হল। সুতরাং রবিদা চলে গেলেন ডিরেক্টরের কাছে। সুকুমার দাশগুপ্ত৬৪ ‘সাত নম্বর বাড়ি’র শুটিং করছিলেন। রবিদা গান রেকর্ড করবো বলতেই উনি শুটিং বন্ধ করলেন। তখনকারকালে আর্টিস্টের ডেট নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। সুতরাং দু ঘণ্টা আগে শুটিং বন্ধ করতে কোনো অসুবিধাই হল না। আমার রেকর্ডিং আরম্ভ হল। পর পর দুটো গান তিন ঘণ্টার মধ্যে রেকর্ডিং হয়ে গেল।
‘সাত নম্বর বাড়ি’ ছবি মুক্তি পেলো। ছবি হিট হল। বিশেষ করে আমার গাওয়া দুটি গান ‘ফেলে আসা দিনগুলি মোর’ এবং ‘তোমারে ভুলিয়া আপনারে ছিনু ভুলে’ অসম্ভব জনপ্রিয় হল। আর রিহার্সাল দিতে এসে গান রেকর্ড করার গল্পটি মুখে মুখে স্টুডিওমহলে ছড়িয়ে পড়লো। একটা নয় দু’ দুটো গান। সকলেরই মুখে চোখে বিস্ময়!
আমাদের লাইনে কতগুলো মজা আছে। যেমন ধরুন, কোনো ছবি রিলিজ হল—যাদের ছবি তারা ছাড়া প্রথম দিনেই সবাই ফ্লপ করিয়ে দিলো। আবার সেই ছবি যখন ভালো চলতে আরম্ভ করলো তখন যাঁরা প্রথম দিনেই ছবিটি ফ্লপ বলেছিলেন, তাঁরাই আবার বলতে আরম্ভ করলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তো প্রথম দিনেই বলেছিলুম ছবি চলবে।’ এ বিষয়ে বিনয়দা অর্থাৎ বিনয় চ্যাটার্জী, যিনি নিউ থিয়েটার্সের জন্যে বহু গল্প এবং চিত্রনাট্য রচনা করেছেন এবং যাঁর বহু ছবি হয়েছে—তিনি বলেন, ‘ফিল্ম লাইনে সব থেকে আনন্দ পাওয়া যায় কিসে বলতো?’ আমি বললাম, ‘নিজের ছবি জনপ্রিয় হলে।’ বিনয়দা বললেন, ‘মোটেই না। নিজের ছবি হিট করার থেকেও অপরের ছবি ফ্লপ করলে অনেক বেশি আনন্দ!’
রবিদা আমাকে দিয়ে অনেক দুঃসাহসিক কাজ করিয়ে নিতেন। মনে আছে আমি তখন বম্বেতে খুব ব্যস্ত ‘নাগিন’৬৫ ছবির পরে। আমি, সেদিন রাত্রের ফ্লাইটে বম্বে আসব। ‘চন্দ্রনাথ’ ছবির মিউজিক করছেন রবিদা। দুটো গান আমাকে দিয়ে গাওয়াবেনই। একে তো তখন কলকাতাতেও প্রচুর কাজ, তার ওপর সেদিন গলাটা ভেঙেছে। রবিদা কিছুতেই শুনলেন না। বললেন, ‘ঐ ভাঙা গলায় আমি আওয়াজ বার করে নেব।’ রেকর্ডিং ফেললেন বিকেল পাঁচটায় আর আমায় এয়ারপোর্টে পৌঁছোতে হবে রাত্রি আটটায় অর্থাৎ দু’ঘণ্টার মধ্যে দুটো গান রেকর্ড করতেই হবে। আমি দেখেছি মানুষের মন একটা অদ্ভুত জিনিস। যখন স্থির হল করতেই হবে, তখন সমস্ত মনের জোর নিয়ে গান গাইতে আরম্ভ করলাম। আস্তে আস্তে গলা খুলতে লাগল। রেকর্ডিং করার মত গলা খুললো—দুটো গান রেকর্ড হয়ে গেল—”রাজার দুলালী সীতা”, আর একটি কথকতা। যেই দুটো গান রেকর্ড হয়ে গেল এবং রবিদা বললেন O. K., ঠিক সেই মুহূর্তে গলা একদম বন্ধ হয়ে গেল অর্থাৎ কথা বলতে গেলে শুধু ফ্যাস ফ্যাস আওয়াজ বেরুচ্ছে। অর্থাৎ মনের জোরে গলা খুললো এবং যেই মন বুঝলো আর দরকার নেই তখুনি গলা বন্ধ হয়ে গেল। আমার এই বেপরোয়া চরিত্রের জন্য অনেক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেছি।
ধরুন যদি ঐ দুটো গান যদি না চলতো তবে সবাই হাসতো আর বলতো, ‘হে হে এতোই সোজা? একদিনেই রিহার্সাল আর রেকর্ডিং? রবির বড়ো বাড় বেড়েছে, আর হেমন্ত ফিল্মে একটা গান হিট করিয়ে ভাবলে আমি কী হনু।’ ঈশ্বরের দয়ায় আমাদের দুজনেরই মানরক্ষা হল।
তখন নায়ক—গায়কদের মধ্যে সায়গল৬৬ আর পাহাড়ী সান্যাল৬৭। এঁরা নিউ থিয়েটার্সের বাঁধা আর্টিস্ট। ভাবনা—চিন্তা নেই, মাসে মাসে মাইনে। নিউ থিয়েটার্সে যাতায়াত করতে করতে এঁদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। খুব কাছে এসে গেলাম এঁদের। আর একজন তখন ফিল্ম জগতের সম্রাজ্ঞী হয়ে পর পর ছবিতে নায়িকার ভূমিকা দখল করে নিয়েছেন। তিনি হলেন নায়িকা—গায়িকা শ্রীমতি কানন দেবী৬৮। এঁরও সঙ্গে আলাপের সৌভাগ্য হল।
বেলা মুখোপাধ্যায়৬৯ তখন ‘কাশীনাথ’৭০ ছবিতে গান করে খুব নাম করেছে। ‘ও বনের পাখি’৭১ গানটা তখন লোকের মুখে মুখে। বেলার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল আগেই। তখন ও আর ওর বোন আভা রেডিওতে নিয়মিত গান গাইতো। ওদের বাড়িতে নিয়ে যেতো আমাকে। ওর মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। বলতেন, ‘মাথার ওপর কেউ নেই। তুমি একটু দেখাশোনা কোরো। ছেলেমানুষ, এখনও বুদ্ধিশুদ্ধি হয়নি। দরকার হলে এদের শাসন কোরো।’
আমাকে একরকম অভিভাবক করে দিলেন ওদের। বেলার বাবা হঠাৎ মারা যাওয়াতেই এই অবস্থা। মা ছাড়া এদের চালনা করার কেউ নেই। বড়ো বড়ো আত্মীয়স্বজন আছেন, কিন্তু নাগালের বাইরে। বেলারা চার বোন, দু’ভাই। বেলা বড়ো। ওরই ওপর বলতে গেলে সব দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালন করবার জন্যে ওর চেষ্টার অন্ত নেই। ভাইবোনদের প্রতি ওর অসীম ভালোবাসা ওকে যে কতো কর্তব্যপরায়ণ করে তুললো, তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না।
সেইসময় বেলার ডাক এলো বম্বেতে। তখনকার দিনের শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ৭২ বেলাকে দিয়ে ওঁর ছবিতে প্লে—ব্যাক করাতে চান। তখনতো বেলার ভীষণ নাম।
বম্বে তো যাবে কিন্তু সঙ্গে যাবে কে। বেলার মা বললেন, ‘মেয়েকে পাঠাতে পারি যদি তুমি সঙ্গে যাও।’
রাজি হয়ে গেলাম। না রাজি হয়ে উপায়ও ছিল না। এতবড়ো একটা সুযোগ তাহলে হাতছাড়া হয়ে যাবে বেলার। সালটা হল ১৯৪৪।
বেলাকে নিয়েতো বম্বে এলাম। তখন বড়ুয়া সাহেব৭৩ বম্বেতে এসেছেন একটা ছবি করবার জন্যে। ওঁর বাংলা ছবি ‘শেষ উত্তর’—এর হিন্দি ‘জবাব’ মুক্তি পেয়েছে। বাজার সরগরম। সবাই বলছে, ‘জবাব’—এর জবাব নেই দাদা। বড়ুয়া সাহেব আমাকে বললেন, ‘কলকাতায় আমার সঙ্গে দেখা করো। একটা ছবি করব ভাবছি। তাতে তুমি আর আমি দুজনে মিলে সুর করে ফেলবো। সুরকার হিসেবে নাম থাকবে দুজনের।’
কী আনন্দ! বড়ুয়া সাহেবের ছবিতে কাজ করবো! এ যে আশাতীত ব্যাপার!
চলে এলাম কলকাতায়। বেলা থেকে গেল। বম্বেতে তখন ওর এক আত্মীয় থাকতেন, তাদের ওপর ওর ভার দিয়ে আমি চলে এলাম। বেলা তখন বম্বের আরো অন্যান্য ছবিতে প্লে—ব্যাক করছে। মাসতিনেক পরে বেলাও ফিরে এলো কলকাতায়। কারণ তখন ওর মা—এর হঠাৎ খুব অসুখ করল।
কিন্তু যে আশায় আমি তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম কলকাতায় সেটা হল না। কী একটা কারণে শেষপর্যন্ত বড়ুয়া সাহেব ওঁর ছবিতে আমাকে নিতে পারলেন না। একটু কষ্ট হল। সেটা অবশ্য সাময়িক। কারণ এসব ব্যাপার আমার মনকে আঘাত করতে পারে, কিন্তু সেই আঘাত দাগ বসাতে পারেনা। মনকে মন দিয়েই মুছে ফেলবার কায়দা আমি গোড়া থেকেই রপ্ত করতে শিখেছি যে।
ওদিকে তখন আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশানের জোর অধিবেশন বসছে। একসময় এই অ্যাসোসিয়েশানের সেক্রেটারী ছিলাম আমি। জগন্ময়ও সেক্রেটারী হয়েছিল একবার। তা সেই সময় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে আর্টিস্টরা স্ট্রাইক কবলো। কেউ রেডিও প্রোগ্রাম করবে না। অ্যাসোসিয়েশানের নির্দেশ। সে নির্দেশ আমরা সবাই পালন করেছিলাম। তারপর ওদের সঙ্গে মিটমাট হয়ে যাবার পর আমরা প্রোগ্রাম করতে শুরু করলাম।
অমিয় বাগচীর বাড়িতে তখন আমাদের জোর আড্ডা চলত। আমি, অমিয় বাগচী, নীলিমা সান্যাল, বিকাশ রায়৭৪, কমল বোস (বি. বি. সি.) এই ক’জন মিলে জমিয়ে গল্প করতাম। আড্ডা দিতে দিতে অনেক রাত হয়ে যেতো। বাইরে বেরিয়ে তখন আর বাস পাওয়া যেতো না। কতদিন ওদের কেশব সেন স্ট্রীটের বাড়ি থেকে হেঁটে আসতে হয়েছে। কোনোদিন আবার ফিটন গাড়ি পেয়ে যেতাম। সেই ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ে বাড়ি ফিরেছি। সেসব দিনগুলো আজও ভোলা যায় না।
বেলাদের বাড়িতে তখন আমি নিয়মিত যাতায়াত করছি। ওর মার তখন খুব অসুখ। ডাক্তার দেখছেন, কিন্তু কিছু করতে পারছেন না। অজিতের চেষ্টায় ডাঃ বিধান রায়কে দিয়েও ওর মার চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্তু তবু শেষরক্ষা হল না। মা মারা গেলেন।
একমাত্র ভরসা মা, তিনিও চলে গেলেন। সে কী কান্না বেলার! ভাইবোনেরাও কাঁদছে। কিন্তু তারা তো কাঁদছে শুধু মায়ের শোকে। বেলার কান্নাতো শুধু শোকের কান্না নয়, ওর কান্না যে সকলকে জড়িয়ে। মাতো চলে গেলেন, কিন্তু সকলের ভার যে তারই ওপর চাপিয়ে গেলেন। এদের কে দেখবে।
অতএব আমাকেই দেখতে হবে। ওর মার সেইরকমই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমারও তো বাড়িতে বাবা—মা আছেন। আমি তো আমার নিজের মতে চলতে পারি না। তাই কথাটা পাড়লাম মার কাছে। বুঝিয়ে বললাম, ‘ওদের দেখাশোনা করতে গেলে বেলাকে বিয়ে করতে হয়। এখন তো ওর মা বেঁচে নেই। পাঁচজনে পাঁচকথা বলবে। বিয়ে করলে আর কেউ কিছু বলতে পারবে না।’
এদিক দিয়ে আমার বাবা—মা ভীষণ উদার। মত দিয়ে দিলেন। মনে মনে ওঁদের হয়তো একটু কষ্ট হয়েছিল। হওয়াটা স্বাভাবিক। নিজেরা দেখেশুনে বিয়ে দিতে সব বাপ—মা—ই চান। ছেলেকে এতো বড়োটা করলেন তিলেতিলে ভালোবাসা দিয়ে। নিজের ইচ্ছেয় ছেলে বিয়ে করলে তাঁদের মনে হবে, ছেলের ওপর জোর চলে গেছে।
বেলার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল। ৭ই ডিসেম্বর ১৯৪৫ সাল। শুরু হল আমার জীবনের নতুন অধ্যায়।
আমার জীবনটা যেন একটা নৌকো। নৌকোর নিজের কোনো বাঁধা জায়গা নেই। আজ এখানে কাল ওখানে। কিন্তু নৌকোটাকে অনেকে ঘরবাড়ি করে ফেলে। আমার অবস্থাটা অনেকটা সেইরকম।
বিয়ের পর আমাকে একটা বাড়িভাড়া করতে হল। আমি তো বেলাকে বিয়ে করেছি। সাতপাকে বেঁধেছি। কিন্তু বেলা যে এদিকে ভাইবোনের ভালোবাসায় সাতাত্তরপাকে বাঁধা। ও শ্বশুরঘর করলে ওদের দেখবে কে। আভা, ঘুণ্টু, মনু, গোপাল, খোকন। সবাই ছোটে ছোটো। দিদি ছাড়া আর কাউকে চেনে না। আর তারপরই যাকে চেনে সে হলাম আমি। অতএব ঠিক করলাম, এদের সকলকে নিয়ে বাঁধতে হবে আমাকে নতুন সংসার।
মাকে কথাটা বললাম। মা শুনে প্রথমে চুপ করে থাকলেন। কিছু বললেন না। আমি তখন বুঝিয়ে বললাম, ‘কাছেই বাড়ি নিচ্ছি। এই ভবানীপুরের মধ্যেই, ইন্দ্র রায় রোডে। যখনতখন আসবো যাবো। খাওয়া—দাওয়া সবই করবো এখানেই। শুধু রাত্তিরটুকু ইন্দ্র রায় রোডের বাড়িতে থাকবো।
আমার প্রস্তাবে মা রাজি হলেন। না হয়ে উপায়ও ছিল না। নাবালক ভাইবোনেদের কার হাতে ছেড়ে দিয়ে আসবে বেলা। বেলাকে আলাদা থাকতেই হবে। অতএব আমাকে সেই টানাপোড়েনের হাত থেকে রেহাই দিলেন মা। শুধু আমার কষ্টের কথা ভেবে নিজের দখল ছেড়ে দিলেন। মনে মনে আহত হয়েছিলেন, কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করেননি কোনোদিন।
অবশ্য আমি মার মনের কষ্ট অনেকটা পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করতাম। যেখানেই যাই, দুপুরে খেতে আসতাম মার কাছে। মা খুব খুশি হতেন। নিজে সামনে বসে খাওয়াতেন। খাওয়ার পর ওখানেই একটু শুয়ে শুয়ে জিরিয়ে নিতাম। তারপর আবার নিজের কাজে বেরিয়ে যেতাম। এই নিয়মটা আমি বরাবর বজায় রেখে গিয়েছি।
মা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন, ‘হ্যাঁরে, তোর কষ্ট হয় না তো এই ভরদুপুরে আসতে?’
আমি হেসে বলতাম, ‘না না, কষ্ট হবে কেন। যেদিন আসতে পারি না কাজের চাপে, সেদিন বরং কষ্ট হয়।’
কথাটা কিছুই নয়, তবু এতেই মা খুশি হয়েছেন। মাকে খুশি করতে পেরে আমিও কম খুশি হই নি।
অনেকদিন ভেবেছি আমাদের পারিবারিক সমস্যার কথা। আমার এই বাড়ি ছেড়ে আলাদা থাকাটা কত সহজে সমাধান হয়ে গেল। এটা হল শুধু ভালোবাসার জোরে। মানুষ অন্যায় করে, সে অন্যায়কে ক্ষমাও করা যায়। কিন্তু তার জন্যে চাই স্নেহ, প্রীতি, ভালোবাসা। জীবনে আমিও অনেককে এইভাবে ক্ষমা করেছি। শুধু ক্ষমা নয়, তাদের ভালোবেসেছি। ভেবেছি, যদি এই ভালোবাসার জোরে এদের স্বভাব শোধরায়। অনেকের শুধরেছেও।
ইন্দ্র রায় রোডের বাড়িতে তখন আমার নতুন সংসার। অনেকেই তখন আমার নতুন সংসার দেখতে আসেন। বেলা অনেককে আসতে বলে। সলিল চৌধুরীকে বেলা ও আমি বললাম, ‘আসুন না একদিন আমাদের বাড়িতে।’
সলিল এলো। সলিলও তখন আই. পি. টি. এ.—এর সঙ্গে যুক্ত। নতুন নতুন সুর করে। সেই সুরের গান আই. পি. টি. এ.—র ফাংশান স্কোয়ার্ড এখানে ওখানে গেয়ে বেড়ায়। গ্রামাফোন কোম্পানিতে তখনও চান্স পাচ্ছিল না সলিল।
আমাদের বাড়িতে এসে অনেকগুলো গান শোনালো সলিল। সবই প্রোগ্রেসিভ গান। কোরাস ভালো হয়। কিন্তু সোলো রেকর্ড করা মুশকিল। চলবে না। সলিলকে সেই কথাই বললাম।
সলিল শুনে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর উঠে পড়লো। বললে, ‘তাহলে আজ আসি।’
দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এলো সলিল। বললে, ‘হেমন্তদা, একটা অন্য ধরনের গানেরও সুর করেছি। আমারই লেখা। অবশ্য এখনও পুরোটা লেখা হয়নি। তা যেটুকু হয়েছে শোনাবো?’
বললাম, ‘হ্যাঁ, শোনাও।’
সলিল শোনালো—’কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো, রূপকথা নয় সে নয়।’
শুনলাম। ভালোও লাগল। বললাম, এটা হতে পারে। তবে এ—গানটাকে আরও বাড়াতে হবে। কাহিনি—সংগীত যখন, ‘রেকর্ডের দুপিঠের মতো কথা বাড়াও। তাহলে খুব ভালো হবে।’
আমার কথায় উৎসাহ পেলো সলিল। বাড়িয়ে ফেললো গানটাকে। দু’দিন পরে এসে আবার শোনালো। মন দিয়ে শুনলাম। শুনে বললাম, ‘হয়েছে। খুব ভালো হয়েছে। আমি রেকর্ড করবো।’
তখন গ্রামাফোন কোম্পানিতে আমি একজন উদীয়মান শিল্পী। আমার রেকর্ডের ক্রেতা ক্রমশ বাড়ছে। তখন যে রেকর্ডই করি শ্রোতাদের পছন্দ হয়ে যায়। মনে আছে, সেই সময় রেকর্ড করেছিলাম একটা হালকা গানের। গানের প্রথম লাইন ‘কথা ছিল তোমার মালা করবে আমায় দান’। কলেজের ছেলেমেয়েরা এ ওকে শুনিয়ে শুনিয়ে গানটা গাইতো। আর ওদিকে হু—হু করে রেকর্ড বিক্রি হতো।
সলিলের গানটা গ্রামাফোন কোম্পানির কাছে পেশ করলাম। ওরা তো এককথায় রাজি। অতএব ‘গাঁয়ের বধূ’ রেকর্ড হয়ে গেল।
রেকর্ড বাজারে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে গেল। আশাতীত সাফল্য। আমার তো তখন নাম আছেই। আরও সুনাম হল। আর সলিল পেলো পরিচিতি। আমার সঙ্গে সঙ্গে সলিলের নামটাও পৌঁছে গেল ঘরে ঘরে। রাতারাতি সলিল চৌধুরী সংগীতজগতে হয়ে গেল একটা পরিচিত নাম। প্রতিভা কখনও চাপা থাকে না। একটু পথ পেলেই ফুঁড়ে বেরোবে। সলিলের ব্যাপারেও হল তাই।
তখন সলিলের সুরে বেশ কয়েকটা গান রেকর্ড করলাম। সুকান্তর৭৫ ‘অবাক পৃথিবী’ শুনে শ্রোতারা মুগ্ধ হল। এই এক প্রতিভাবান কবি সুকান্ত। বড্ড কম সময়ের জন্যে এসেছিল পৃথিবীতে। তাই তাকে খুব অল্প বয়সেই নামতে হয়েছিল কাজে। এই বয়সেই কবিতায় হাত দিয়ে করেছিল এক অপূর্ব সৃষ্টি। তার সেই কবিতা সলিল চৌধুরীর মতো দক্ষ সুরকারের হাতে পড়ে সুরের পরশ পেলো। হয়ে উঠল প্রাণবন্ত। সুকান্তর ‘রাণার’ এতদিন বই—এর পাতায় ছুটছিল। এবার সুর পেয়ে আমার গলায় চড়ে ছুটতে লাগল। ‘রাণার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে, রাণার ছুটেছে খবরের বোঝা হাতে’। এই গানটা গাইতে গাইতে আমার মনে হতো আমিও যেন রাণার—এর মতো ছুটে চলেছি। অবশ্য গানের বাজারে। তখন আমিও ছুটছি আমার গানও ছুটছে। অনেকেই এসে ধরছে তাদের সুরে গান করবার জন্যে।
আমি যদিও তখন নিজের সুরে অনেক গান করেছি, কিন্তু অন্য অনেক সুরকারেরও গান করেছি। নামকরা সংগীত পরিচালকদের তো বটেই। কিন্তু যখনই আমার কাছে নতুন সুরকার ভালো গান নিয়ে এসেছে, আমি তার গান করেছি। কেউ কেউ এসে বলতো, ‘হেমন্তদা, আপনি আমার দু’খানা গান রেকর্ড করলে একটু দাঁড়াতে পারি। তাও করেছি। এমনকি প্রতিমা (প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়৭৬—গায়িকা) একদিন বলল, ‘হেমন্তদা, আমি আপনার জন্য দু’খানা গান করেছি, গাইতে হবে কিন্তু।’ তাও করেছি। তখন সুবিধা ছিল কী, বছরে কখনো কখনো আট—দশ খানা ফিল্ম—ছাড়া গান করা যেতো। কিন্তু এখন সে সুযোগ নেই। বছরে মাত্র পূজার সময় একটা রেকর্ড হয়, আর হয় কয়েকটা রবীন্দ্রসংগীত।
শুধু গানের সুরকার ছাড়া আমি নতুন লেখকের অনেক গান করেছি। প্রথম জীবনে অমিয় বাগচীর লেখা অনেক গান গেয়েছি, তারপর অলকা উকিলের৭৭ লেখা অনেক গান করেছি।
.
৩৬। নীলিমা সান্যাল :— বেতারের সংবাদপাঠিকা হিসেবে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। দিল্লি কেন্দ্র থেকে, ‘খবর পড়ছি নীলিমা সান্যাল’ কথাটি বহু বাঙালির কানে আজও বাজে। ১৯৫০—এর দশকে কলকাতা বেতারে যোগ দিয়ে, সঙ্গীত—নাটকসহ আরো কিছু বিভাগে বিভিন্ন সময়ে নীলিমা সান্যাল অংশগ্রহণ করতেন। অবশেষে, পাকাপাকিভাবে সংবাদবিভাগের কর্মী হন এবং পরে দিল্লিতে বদলি হয়ে, সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। শেষ জীবনে নিঃসঙ্গতায় ভুগতেন। ১৯৮৫ সালে, কিছুটা অকালেই প্রয়াত হন নীলিমা সান্যাল।
৩৭। অমিয় বাগচী :— ১৯৪০—এর দশকের বাংলা গানের জগতের বিশিষ্ট গীতিকার। সংবাদপাঠিকা নীলিমা সান্যালের মামাতো ভাই। নিজের সুরে এই গীতিকারের লেখা কয়েকটি গান ৪০—এর দশকে রেকর্ড করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। যার মধ্যে, ‘কথা কোয়োনাকো শুধু শোনো…’ ‘মাধবীর স্বপনে এসেছে ফাগুন…’, ‘তোমার বিরহ চোখে আনে জল…’ ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয় হয়। এছাড়াও, অমিয় বাগচীর লেখা, ‘ কেন চম্পক জাগিল না…’ ‘সে কোন ভাদরে…’ এবং ‘মাধবী জাগো…’, ‘হারিয়ে গেলেম..’ গানগুলি রেকর্ডে হেমন্ত—র সুরে গেয়েছিলেন, যথাক্রমে, সমরেশ রায় ও বেলা মুখোপাধ্যায়। এছাড়া, অন্যান্য শিল্পীর কন্ঠেও অল্প কিছু সংখ্যক অমিয় বাগচীর লেখা গান শোনা গেছে।
৩৮। এই গানটি ১৯৪৪ সালে (নন ফিল্ম) নিজের সুরে রেকর্ডে গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অসম্ভব জনপ্রিয় হয় গানটি। অপর পিঠে ছিল, ‘আজ কোনো কথা নয়…’ ( রেকর্ড নং—GE 2684)। দুটি গানেরই গীতিকার অমিয় বাগচী।
৩৯। বিমান ঘোষ :— একজন সম্মানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠক। প্রথমে কলকাতা বেতারের ‘মিউজিক’ বিভাগ ও পরে গ্রামোফোন কোম্পানিতে সুনামের সঙ্গে প্রযোজকের ভূমিকা পালন করেছেন। এনারই উদ্যোগে ১৯৭৮ সালে রেডিও—র ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ গ্রামোফোন রেকর্ডে প্রকাশিত হয়। কিছু গানের সুরকার ছিলেন। বিমান ঘোষের সুরে উৎপলা সেনের গাওয়া ‘শুকতারা গো নিওনা বিদায়…’ (গীতিকার—অনিল ভট্টাচার্য) গানখানি খুবই জনপ্রিয় হয়।
৪০। আই. পি. টি. এ :— পুরো কথাটি ‘ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’। ৪০—এর দশকের অশান্ত সময়ে মূলত বামপন্থী ভাবধারাকে আশ্রয় করে, তৈরি হয় ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ (১৯৪২) এবং অব্যবহিত পরে ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ (১৯৪৩)। ‘শিল্প—সাহিত্য—সংস্কৃতি’ জগতের একঝাঁক তরুণ প্রতিভাবানদের উন্মেষ ঘটেছিল এই আই. পি. টি. এ—কে ঘিরে। প্রবীন সৃষ্টিশীল মানুষরাও যোগ দিয়েছিলেন এই সংগঠনে। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, রবিশঙ্কর, শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরি, ঋত্বিক ঘটক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, চিন্মোহন সেহানবীশ, বিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র, গোপাল হালদার, গুরুদাস পাল ইত্যাদি নানা জগতের ও স্তরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা ৪৬নং ধর্মতলা স্ট্রীটের বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন এই সংঘ। গ্রাম—গ্রামাঞ্চলে, ঘুরে ঘুরে গান—নাটক—ভাষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বার্তা ছড়িয়ে দিতেন এনারা। ১৯৪৮ সালের পর থেকে অবশ্য, এই সংগঠনের উজ্জ্বল প্রতিভাবানরা সংগঠন ছেড়ে নিজের ক্ষেত্র বেছে নেন।
৪১। বিজন ভট্টাচার্য (১৯১৫—১৯৭৮) :— বিশিষ্ট নাট্যকার। তাছাড়া, নাটক পরিচালনা ও নিয়মিত অভিনয়ও করেছেন। তাঁর লেখা ‘নবান্ন’ (১৯৪৪) নাটক থেকেই ‘গ্রুপ থিয়েটার’ ঘরাণার শুরু হিসেবে ধরা হয়। আই. পি. টি. এ—তে থাকাকালীন ‘নবান্ন’ মঞ্চস্থ হয় বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্রর—র যৌথ পরিচালনায়। এছাড়া, ‘দেবীগর্জন’, ‘মরাচাঁদ’, ‘জীয়নকন্যা’, ‘গর্ভবতী জননী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য নাটকের নাট্যকার ছিলেন বিজনবাবু। ‘মেঘে ঢাকা তারা ‘সহ কয়েকটি চলচ্চিচত্রেও বিজন ভট্টাচার্য অভিনয় করেছেন।
৪২। বিনয় রায় (১৯১৮—১৯৭৫) :— বিনয় রায়ের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের রংপুরে হলেও, আদিবাড়ি ছিল পাবনায়। দেশভাগের পর কলকাতায় এসে বসবাস। ছোটো থেকেই সুন্দর গান গাইতে পারতেন। কিশোরাবস্থায় ‘যুগান্তর’ দলে ছিলেন। কলকাতায় এসে ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে বেলেঘাটায় চটকল শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করেন। অবশেষে ১৯৪২—৪৩ সাল থেকে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম সারির সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। বিনয় রায়ের উদাত্ত কন্ঠ সভা—সমিতি—মাঠ—ময়দানের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী ছিল। মালাবারের কায়ুর কমরেডদের হত্যার প্রতিবাদে বিনয় রায়ের লেখা গান ‘ফিরাইয়া দে মোর কায়ুর বন্ধুরে…’ ভোলা যায় না। এছাড়া, ইনি কে. এ. আব্বাসের— ‘ধরতি কে লাল’ ও ঋত্বিক ঘটকের ‘আমার লেনিন’ প্রভৃতি চলচ্চিচত্রের জন্যও গান লেখেন।
৪৩। সলিল চৌধুরি (১৯২২—১৯৯৫) :— অবিস্মরণীয় এই প্রতিভাবান সঙ্গীত পরিচালক বাংলা গানের এক যুগস্রষ্টা। উত্থান আই. পি.টি. এ—কে কেন্দ্র করে। সোনারপুরে থাকতেই দাদা নিখিল চৌধুরির নিজস্ব অর্কেস্ট্রা ‘মিলন—পরিষদ’—এর সঙ্গে যুক্ত হন। ছোটো থেকেই বাঁশি ও একটু বড় হয়ে পিয়ানেতে দক্ষ হয়ে উঠলেন। ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দিয়ে অবিস্মরণীয় গণসঙ্গীত উপহার দিয়েছেন। পরে, বাংলা আধুনিক, ছায়াছবি, হিন্দি ছবির জগতে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো বিচরণ করেছেন। বাংলা গানের জগতে হেমন্ত—লতা—মান্না—শ্যামল—সন্ধ্যা থেকে শুরু করে হিন্দি জগতের কিশোর—রফি—গীতা—মুকেশ—লতা—তালাত সহ সমস্ত ছোটোবড়ো শিল্পীর গলায় সঙ্গীতরূপে বিকশিত সলিলসঙ্গীত। কবিতা—ছড়া—গল্পও লিখেছেন। সলিল চৌধুরির গল্প ‘রিক্সাওয়ালা’ অবলম্বনেই বিমল রায় তৈরি করেন বিখ্যাত ‘দো বিঘা জমিন’। যাতে অবিস্মরণীয় সঙ্গীত পরিচালনার নজির রেখেছিলেন সলিল চৌধুরি। সুরকারের পাশাপাশি কম্পোজার বলতে কী বোঝায়, তা বাংলা গানের জগতে প্রথম যথাযথভাবে মূর্ত করেন সলিল চৌধুরি।
৪৪। আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন :— ১৯৪৬ সালে তৈরি হয় এই সংগঠন। তখনকার হেন শিল্পী ছিলেন না, যাঁরা এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হননি। কৃষ্ণচন্দ্র দে, পঙ্কজকুমার মল্লিক, কমল দাশগুপ্ত প্রমুখদের সঙ্গে জগন্ময় মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্তাোষ সেনগুপ্ত সহ সমস্ত শিল্পীর সমাবেশ ঘটেছিল এই অ্যাসোসিয়েশনে। দীর্ঘদিন ধরে নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ জানাতে পথে নেমেছিলেন শিল্পীকুল। মূল অভিযোগ ছিল কলকাতা বেতার সংস্থার প্রতি। তাছাড়া, রেকর্ড কোম্পানিগুলির ব্যাপারেও ছিল তাঁদের ক্ষোভ। এই সংস্থার যুগ্ম—সম্পাদক হয়েছিলেন, জগন্ময় মিত্র ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সংগঠন—সম্পাদক ছিলেন সুধী প্রধান। এই অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, শ্রদ্ধেয় কংগ্রেস নেতা নির্মলচন্দ্র চন্দ্র। কয়েকদফা দাবীতে কলকাতা বেতারকেন্দ্রের (১, গারস্টিন প্লেস) সামনে ১৯৪৬ সালের ১১ অগস্ট থেকে ১৪ অগস্ট রাত দুটো পর্যন্ত পিকেটিং করেছিলেন শিল্পীরা।
৪৫। নির্মলচন্দ্র চন্দ্র (১৮৮৮—১৯৫৩):— প্রখ্যাত কংগ্রেস, নেতা। স্বাধীনতা সংগ্রামী। আইনজীবি হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দলের অন্যতম প্রধান হিসেবে নেতৃত্বে ছিলেন। ডাককর্মী, ট্রামশ্রমিক, চা—বাগান শ্রমিক ইত্যাদি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কলকাতার পৌর প্রতিনিধি (১৯১৫), বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি, কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য (১৯২৬—৩০), কলকাতার মেয়র (১৯৫৩) ইত্যাদি বিভিন্ন সম্মানীয় দায়িত্বে ছিলেন নির্মলচন্দ্র। এছাড়া, ‘ফরোয়ার্ড’, ‘বৈতালিক’, ‘রূপ ও রঙ্গ’ ইত্যাদি পত্রিকার সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। শিল্পীদের ‘আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’—এর বিষয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে, সর্বতোভাবে সাহায্য করেন। আইনজীবি, শিক্ষাবিদ ও একসময়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র ছিলেন নির্মলচন্দ্রের সুযোগ্য সন্তান। নির্মলচন্দ্রের পিতামহ গণেশচন্দ্র ও পিতা রাজচন্দ্র দুজনেই কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার ছিলেন।
৪৬। গিরীন্দ্র সিংহ :— চিত্রজগতের একজন সম্মনীয় ব্যক্তি ও পৃষ্ঠপোষক। চিত্রসাংবাদিকতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষর রেখেছিলেন ‘উল্টোরথ’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর বন্ধু প্রসাদ সিংহ চলচ্চিচত্রমোদীদের মধ্যে আলোড়ন তোলেন। ‘বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোয়িয়েশন’ (বি. এফ. জে.—এ)—এর উচ্চচপদে আসীন ছিলেন এই ব্যক্তি এবং এই সংগঠন প্রতি বছর চলচ্চিচত্রের সব বিভাগের জন্য পুরস্কারও চালু করেছিলেন।
৪৭। দ্বিজেন চৌধুরী (১৯১২—১৯৮৪) :— এ বছর এই সঙ্গীতগুণীর জন্মশতবর্ষ। বাবা সুরেশচন্দ্র ও মা জ্যোতির্ময়ী দেবীর কাছে প্রাথমিক সঙ্গীতশিক্ষা। কলকাতার সাউথ সুবার্বন স্কুল ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে শিক্ষা নেন। সবরকম সঙ্গীতে পারদর্শিতা থাকলেও, দ্বিজেনবাবু হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের একজন উচ্চচমানের শিক্ষক। ছাত্রাবস্থায় ১৯২৬ সালে ‘অল ইন্ডিয়া মিউজিক কম্পিটিশন’—এ তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগে প্রথম হয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে কলকাতা বেতারের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪১ সালে শুভ গুহঠাকুরতা প্রমুখ সঙ্গীতব্যক্তিত্বের সঙ্গে গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতনের বাইরে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতশিক্ষাকেন্দ্র—’গীতবিতান’। পরে, ১৯৪৬ সালে দ্বিজেনবাবু ও সুচিত্রা মিত্রের যৌথ উদ্যোগে জন্ম নেয় ‘রবিতীর্থ।’ ১৯৫৩ সালে, মুক্তিপ্রাপ্ত নরেশ মিত্র পরিচালিত ‘বউ—ঠাকুরাণীর হাট’ ছবিতে লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ান, এ ছবির সঙ্গীত পরিচালক দ্বিজেন চৌধুরী। তাছাড়া, এই ছবিতে প্রবাদপ্রতিম নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্র—র লিপে, তিনটি অসাধারণ রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
৪৮। সুপ্রভা সরকার (১৯১৯—১৯৮৯):— বাংলা গানের জগতের এক চিরস্মরণীয় কন্ঠশিল্পী। মায়ের কাছে প্রথম সঙ্গীতশিক্ষা। এরপর, ধ্রুপদিয়া শিশির গুহ ও সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তীর কাছে তালিম নেন। নীতিন বসু পরিচালিত ও রাইচাঁদ বড়াল সুরারোপিত ‘ভাগ্যচক্র’ ছবিতে প্রথম সার্থকভাবে প্লে—ব্যাক পদ্ধতিতে যে গানটি ব্যবহৃত হয়; সমবেত কন্ঠের সেই ‘মোরা পুলক যাচি…’ গানটিতে অন্যতম কন্ঠটি ছিল এই শিল্পীর। প্রথমদিকে আধুনিক ও ছায়াছবিতে অনেক জনপ্রিয় গানের শিল্পী হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন। পরে, শুধুমাত্র নজরুলগীতিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ করেন ও এ জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গায়িকা হয়ে ওঠেন।
৪৯। উৎপলা সেন :— ১৯২৬ সালে ঢাকায় জন্ম। ঢাকা রেডিওতে গান শুরু। ঢাকা রেডিও—র ট্রেনার হিসেবে প্রখ্যাত শিল্পী সুধীরলাল চক্রবর্তীর আগমনের ফলে, তাঁর সান্নিধংলাভ। এরপর ১৯৪৪ সালে কলকাতায় এসে পড়াশুনা ও সুধীরলালের কাছে সঙ্গীতশিক্ষার শুরু। অচিরেই আকাশবাণীর শিল্পী। সেই ৪০—এর দশক থেকে ৭০—দশক পর্যন্ত বেশকিছু চিরকালীন বাংলা গানের গায়িকা উৎপলা সেন। ‘জজ সাহেবের নাতনি’ ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক। এরপর, অনেক ছবিতে গেয়েছেন। নিউ থিয়েটার্সের ‘মাই সিস্টার’ থেকে শুরু করে, কিছু হিন্দি ছবিতেও উৎপলার কন্ঠ শোনা যায়। পরবর্তীজীবনে প্রখ্যাত শিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে বিবাহ করেন উৎপলা সেন। বর্তমানে প্রয়াত।
৫০। অজয় ভট্টাচার্য (১৯০৬—১৯৪৩):— বিখ্যাত কবি ও গীতিকার। ‘আধুনিক বাংলা গানে’র শুরুর সময় সেই ৩০—এর দশকের গীতিকার। হিমাংশু দত্ত, শচীনদেব বর্মন সহ অনেক সুরকারের সুরে ও বিভিন্ন শিল্পীর কন্ঠে, এই গীতিকারের লেখা বেশকিছু গান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। যেমন—’তুমি যে গিয়াছো’, ‘যদি মনে পড়ে সেদিনের কথা…’, ‘ছিল চাঁদ মেঘের পারে…’ ইত্যাদি। এছাড়া, চলচ্চিচত্রেও তাঁর লেখা বেশকিছু গান ভোলা যায় না—’চৈত্র দিনের ঝরপাতার পথে…’ (ডাক্তার), ‘বন্দর ছাড়ো যাত্রীরা সব…’ (ছদ্মবেশী), ‘বাংলার বধূ বুকে তার মধু…’ (শাপমুক্তি)’, ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া…’ (অধিকার) ইত্যাদি আরো অনেক। ‘রাতের রূপকথা’, ‘ঈগল ও অন্যান্য কবিতা’ সহ খানকতক কাব্যগ্রন্থও ছিল এই গীতিকবির। এছাড়া, হাফিজের ‘রুবাইয়াৎ—ই ওমর খৈয়াম’ ও জার্মান লেখক এরিখ মারিয়া রেমার্ক রচিত ‘রোডব্যাক’ বাংলায় অনুবাদ করেন অজয়বাবু। ‘আজি আমারি কথা,’ মিলন বিরহ গীতি’ ইত্যাদি অজয় ভট্টাচার্যের গীতিসংগ্রহের কিছু বইও আছে।
৫১। ‘নিমাই সন্ন্যাস’ :— ফণী বর্মা পরিচালিত ১৯৪০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটিতেই প্রথম নেপথ্যগায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটে। ছবিটির নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ছবি বিশ্বাস। তাঁরই লিপে সম্ভবত দু’টি গান করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ছবিটির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন হরিপ্রসন্ন দাস।
৫২। হরিপ্রসন্ন দাস :— বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক। অল্পকিছু কাজেই তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। বেতারেও তাঁর সুরারোপিত গান সম্প্রচারিত হয়েছে। কিছু চলচ্চিচত্র—যেমন, ‘রাজকুমারীর নির্বাসন’ (শচীনদেব বর্মনের সঙ্গে যুগ্মভাবে), ‘অপরাধ’, ‘নিমাই সন্ন্যাস’ ইত্যাদি ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন হরিপ্রসন্ন দাস। তিনিই ‘নিমাই সন্ন্যাস’ ছবিতে প্রথম নেপথ্যগায়ক হিসেবে সুযোগ দেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে। ‘কালিদাস’ (বাংলা), ‘হাম ভি ইনসান হ্যায়’ (৪০—এর দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ছবি) ছবি দুটির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন হরিপ্রসন্ন দাস। এই দুটি ছবিতে তাঁর সঙ্গে সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন যথাক্রমে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মান্না দে।
৫৩। ছবি বিশ্বাস (১৯০০—১৯৬২) :— আসল নাম শচীন্দ্রনাথ দে বিশ্বাস। ছবির মতো সুন্দর দেখতে বলে, মা ডাকতেন ‘ছবি’ বলে। সেই নামেই বাংলা চলচ্চিচত্র ও নাট্যজগতে হয়ে উঠলেন এক কিংবদন্তী অভিনেতা। ‘হাওড়া নাট্যসমাজ’, ‘কাঁকুড়গাছি নাট্যসমাজ’ ইত্যাদি সংগঠনের সদস্য হয়ে অপেশাদার অভিনেতা হিসেবে নাট্যাভিনয়ের শুরু। এরপর, ১৯৩৬ সালে প্রথম ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ ছবিতে অবতরণ। তারপর পেশাদারী নাট্যমঞ্চ ও চলচ্চিচত্রজগতে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। সীমা—পরিসীমাহীন ক্ষমতাসম্পন্ন অভিনেতা। সিকদারবাগান নাট্যসমাজের হয়ে ‘নদীয়া বিনোদ’ নাটক দিয়ে মঞ্চাভিনয়ের শুরু। এরপর, ‘মীরকাশেম’, ‘দুই—পুরুষ’, ‘ধাত্রীপান্না’ হয়ে শেষ মঞ্চে নামেন ‘ শ্রেয়সী’ নাটকে। ‘ছদ্মবেশী’, ‘মিলন’, ‘শুভদা’য়, ‘জলসাঘর’, ‘কাঞ্চনজঙ্খা’, ‘সপ্তপদী’, ‘সবার উপরে’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘দাদাঠাকুর’, ‘একদিন রাত্রে’ ইত্যাদি অজস্র ছবিতে অবিস্মরণীয় অভিনয়ের সাক্ষ্য রেখেছেন। ‘যার যেথা ঘর’ ও প্রতিকার’ নামে দুটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে ‘সঙ্গীত—নাটক—অ্যাকাডেমি’ পুরস্কারসহ আরও অনেক সম্মানলাভ করেন। ১৯৬২ সালে এক মর্মান্তিক মোটর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এই প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা।
৫৪। উস্তাদ আমীর খাঁ :— ১৯১২ সালে জন্মানোর সুবাদে এবছর এই কিংবদন্তী কন্ঠশিল্পীর জন্মশতবর্ষ। ভারতীয় উচ্চচাঙ্গ—সঙ্গীতের জগতে এক যুগপ্রবর্তক। মন্দ্রসপ্তকে বিচরণকারী অসামান্য কন্ঠপ্রয়োগের মাধ্যমে এক নতুন গায়নভঙ্গির সূচনা হয়েছিল উস্তাদ আমীর খাঁ—এর মাধ্যমে। অসম্ভব ভক্ত ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের। এমনকি, নিজে গেয়েওছেন। মেলোডিনির্ভর স্বর্ণকন্ঠের জন্য হেমন্ত—র গানের একজন অনুরাগী ছিলেন এই প্রবাদপ্রতিম কন্ঠশিল্পী।
৫৫। অনাদি দস্তিদার (১৯০৩—১৯৭৪) :— অনাদিকুমার দস্তিদার ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের এক প্রণম্য শিক্ষক। ১২ বছর বয়সে ছাত্র হিসেবে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমে আসেন। রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ, ভীমরাও শাস্ত্রী, নকুলেশ্বর গোস্বামী, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী প্রমুখ গুণীজনদের কাছে সঙ্গীতশিক্ষা নেন। ‘সঙ্গীত সম্মিলনী’, ‘বাসন্তী বিদ্যাবীথি’, ‘গীতবিতান’ প্রমুখ সঙ্গীতশিক্ষাকেন্দ্রের সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। বেতার—গ্রামোফোন রেকর্ড—চলচ্চিচত্র মাধ্যমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অনাদিবাবুকে ‘নিউ থিয়েটার্স’—এ নিয়ে যান রাইচাঁদ বড়াল। বম্বে টকিজের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। থিয়েটার জগতে অনাদি দস্তিদারকে নিয়ে আসেন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ি। শিশিরবাবুর ‘চিরকুমার সভা’ ও ‘শেষরক্ষা’ নাটকে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। অনাদিবাবু ভালো বীণা বাজাতে পারতেন। উদয়শঙ্করের দলে কিছুদিন বীণাও বাজিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী ‘স্বরলিপি সমিতি’ গঠন করলে, অনাদিকুমার দস্তিদার তার সম্পাদক হন।
৫৬। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৮৬—১৯৪৩) :— বাংলা অভিনয় জগতের প্রথম ‘স্টার’ অভিনেতা। সোনারপুর জমিদার বংশে জন্ম। বাড়ি থেকে পালিয়ে ‘গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুল’ থেকে আঁকা শিখে থিয়েটারের সিন আঁকার কাজে যোগদান। এইভাবেই ‘স্টার’ থিয়েটারে অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘কর্ণার্জুন’ নাটকে ‘বিকর্ণ’—র চরিত্রে প্রথম মঞ্চাবতরণ। এরপর, একের পর এক নাটকে মঞ্চে নেমে, অচিরেই মঞ্চ থেকে ‘স্টার’ হয়ে ওঠেন। শেষ অভিনীত নাটক শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত—র ‘কাঁটা ও কমল’। বেশকিছু মঞ্চ ও রেকর্ড —নাটক পরিচালনা করেন। এছাড়া, বেশ কিছু বেতার নাটকেও অংশ নেন দুর্গাদাস। ১৯২২ সানে নির্বাক ছবি ‘আঁধারে আলো’ ছবিতে একটি ছোটো দৃশ্যে প্রথম ছবিতে নামেন। এরপর, বেশ কয়েকটি নির্বাক ছবিতে অভিনয়ের পর, ১৯৩১ সালে ‘নিউ থিয়েটার্স —এর প্রথম সবাক ছবি ‘দেনা—পাওনা’—য় নায়ক হন। ‘দেশের মাটি’, ‘দিদি’ ইত্যাদি কয়েকটি সবাক ছবিতে অভিনয় করে অসম্ভব জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ অভিনীত ছবি ‘প্রিয় বান্ধবী’ (১৯৪৩)—তে প্রথম একক কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
৫৭। চন্দ্রাবতী দেবী (১৯০৯—১৯৯৪) :— এক ডাকসাইটে অভিনেত্রী। নায়িকা হিসাবে শুরু করে, পরে চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য। ‘হীরাবাঈ’, ‘তাসের ঘর’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘দেবদাস’, ‘দিদি,’ ‘দেশের মাটি’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘জয়জয়ন্তী’, ইত্যাদি চন্দ্রাবতী দেবী অভিনীত কিছু উল্লেখযোগ্য ছবি। চন্দ্রাবতীর দিদি কঙ্কাবতী দেবীও ছিলেন এক বিশিষ্ট অভিনেত্রী। মঞ্চের অভিনয়ে শিশির ভাদুড়ির সঙ্গে নিজের অভিনয় প্রতিভার পরিচয় রাখেন কঙ্কাবতী। চন্দ্রাবতী দেবী ও তাঁর দিদি তখনকার দিনে ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিধারী ছিলেন।
৫৮। ‘প্রিয় বান্ধবী’ :— প্রবোধকুমার সান্যালের কাহিনি অবলম্বনে দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও চন্দ্রাবতী দেবী অভিনীত এই ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৪৩ সালে। পরিচালক ছিলেন সৌম্যেন মুখোপাধ্যায়। ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন প্রণব দে (কৃষ্ণচন্দ্র দে—র ভাইপো ও মান্না দে—র বড়দা)। এই ছবিতেই প্রথম একক কন্ঠে ‘পথের শেষ কোথায়’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, যা ছবিতে রেডিও মারফত ভেসে এসেছিল।
৫৯। সৌম্যেন মুখোপাধ্যায় :— বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক। ‘নিউথিয়েটার্স’—এর ব্যানারে নির্মিত ‘শোধবোধ’, ‘প্রিয়বান্ধবী’, ‘অনির্বাণ’, ‘দত্তা’, ‘কীর্তিগড়’ ইত্যাদি ছবির পরিচালক। একটি শিশু—চলচ্চিচত্র সহ আরো কিছু ছবির পরিচালক ছিলেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় ছিলেন এনার পিতা।
৬০। সৌরেন মুখোপাধ্যায় (১৮৮৪—১৯৬৬) :— বিখ্যাত সাহিত্যিক, নাট্যকার ও গীতিকার। পেশায় ছিলেন আইনজীবি। পুরো নাম সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়। ‘চালিয়াত চন্দর’, ‘পরলোক বিচিত্রা’ ইত্যাদির রচনাকার। ‘অনর্গল রায়,’ ‘অপ্রকাশ গুপ্ত’, ‘বৈকুন্ঠ শর্মা’, ‘সত্যব্রত শর্মা’ ইত্যাদি ছদ্মনামে বিভিন্ন জায়গায় লিখেছেন। ‘ফিরে চল আপন ঘরে…,’ ‘ও কেন গেল চলে’.., ‘আমারে ভালোবেসে’… ইত্যাদি বেশকিছু জনপ্রিয় বাংলা গানের গীতিকার ছিলেন। বেতার, নাট্যমঞ্চ ইত্যাদি মাধ্যমেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘স্বয়ম্বরা’ সহ বেশকিছু জনপ্রিয় নাটকের নাট্যকার ছিলেন সৌরীন্দ্র মুখোপাধ্যায়। এনারই এক পুত্র ও কন্যা হলেন যথাক্রমে চিত্রপরিচালক সৌম্যেন মুখোপাধ্যায় ও প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্র।
৬১। সুচিত্রা মিত্র (১৯২৪—২০১১) :— প্রবাদপ্রতিম রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। অন্যান্য গানও রেকর্ডে গেয়েছেন। ১৯৫০ সালে সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে ‘সেই মেয়ে’ অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। রবীন্দ্রনাথের গানে এক নতুন ধারার জন্ম দেন। শান্তিনিকেতেনে সঙ্গীত শিক্ষা। মূলত, শান্তিদেব ঘোষের হাতে গড়ে ওঠেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’ বিষয় হিসেবে চালু করেন। দ্বিজেন চৌধুরীর সঙ্গে ১৯৪৬ সালে গড়ে তোলেন ‘রবিতীর্থ’। গান ছাড়াও সাহিত্যরচনা, ছবি আঁকা, নৃত্য পরিবেশন, চলচ্চিচত্র ও নাটকে অভিনয়, আবৃত্তি ইত্যাদি বিষযের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন সুচিত্রা মিত্র। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম দুটি রবীন্দ্রগানের রেকর্ড প্রকাশ পায়। বাবা সৌরীন্দ্রমোহনের লেখা, ‘তোমায় আমায় ক্ষণেক দেখা…’ ও ‘ফিরে তুমি আসবে না…’ গানদুটি আব্দুল আহাদের সুরে রেকর্ডে (১৯৪৬) গেয়েছিলেন সুচিত্রা। ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি…’ সুচিত্রা মিত্রের কন্ঠে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
৬২। রবীন চট্টোপাধ্যায় (১৯১৪—১৯৭৬) :— বাংলা গানের জগতে এক অসাধারণ সঙ্গীত পরিচালক। পণ্ডিত ঢেকনের কাছে সঙ্গীতশিক্ষা। ১৯৩৬ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘অধিকার’ ছবিতে সমবেতভাবে কন্ঠ দেন রবীন চট্টোপাধ্যায়। ১৯৪০ সালে ‘শাপমুক্তি’ ছবিতে অনুপম ঘটকের সহকারী হিসেবে সঙ্গীত পরিচালনা দিয়ে শুরু করেন। ‘অভয়ের বিয়ে’, ছবিতে প্রথম এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ‘বিদ্যাসাগর’, ‘লালুভুলু’, ‘সবার উপরে’, ‘সাগরিকা’, ‘পথে হল দেরী’, ‘কমললতা’, ‘সমাপিকা’, ‘স্বপ্ন ও সাধনা’, ‘বাবলা’, ‘নায়িকার ভূমিকায়’ ইত্যাদি প্রায় শতাধিক ছবিতে তাঁর অসামান্য সঙ্গীত পরিচালনার সাক্ষ্য রাখেন রবীনবাবু। তাঁর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সহ প্রায় প্রত্যেক প্রথিতযশা শিল্পী চিরকালীন কিছু নন ফিল্ম গানও রেকর্ডে গেয়েছেন।
৬৩। ‘সাত নম্বর বাড়ী’ :— ১৯৪৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এম. পি. প্রোডাকসন্সের সুকুমার দাশগুপ্ত পরিচালিত এই ছবিতে প্রণব রায়ের কথায় ও রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে, ‘তোমারে ভুলিয়া আপনারে ছিনু ভুলি…’ এবং ‘ফেলে আসা দিনগুলি মোর…’ গানদুটি গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এ ছবিতে কমল মিত্রের লিপে ছিল গানদুটি।
৬৪। সুকুমার দাশগুপ্ত :— সবাক চলচ্চিচত্রের প্রায় শুরুর দিক থেকেই নিজেকে একজন বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক হিসেবে মেলে ধরেন। ‘রাজকুমারের নির্বাসন’, ‘এপার ওপার’, ‘পাষাণ দেবতা’, ‘নন্দিতা’, ‘সাত নম্বর কয়েদী’, ‘ওরা থাকে ওধারে’, ‘সদানন্দের মেলা’, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’, ‘সাথীহারা’ ইত্যাদি ছবির পরিচালক ছিলেন সুকুমার দাশগুপ্ত।
৬৫। ‘নাগীন’ :— ১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ফিল্মিস্তান’ প্রযোজিত প্রদীপকুমার—বৈজয়ন্তীমালা অভিনীত এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ‘হেমন্তকুমার’ তথা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গানে গানে ভরা ছিল সারা ছবিটি। জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁয়েছিল গানগুলি। হেমন্ত ও লতার গলায় এই ছবির বেশীরভাগ গান কালজয়ী হয়েছে। এই ছবি থেকে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে মুম্বইতে হেমন্তের পায়ের তলার জমি শক্ত হয়। ছবিটিরপরিচালক ছিলেন নন্দলাল যশোবন্তলাল।
৬৬। সায়গল (১৯০৪—১৯৪৭) :— অবিস্মরণীয় কন্ঠশিল্পী। পুরো নাম কুন্দনলাল সায়গল। পাঞ্জাবের অধিবাসী। ১৯৩৩ সালে কলকাতায় আসেন এবং নিউ থিয়েটার্সের ‘পুরাণভগত’ (হিন্দি) ছবিতে প্রথম পর্দায় আবির্ভূত হন। ১৯৩২—এ হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানির শুরুর বছরে সায়গলের গানের রেকর্ড, ‘হরি হে ব্রজরাজ দুলারে…’ সেখান থেকে প্রকাশিত হয়। নিজে অভিনয় করে গানে গানে মাতালেন নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত ‘জীবনমরণ’, ‘দেবদাস’, ‘দিদি’, ‘পরিচয়’, ‘দেশের মাটি’, ‘দুশমন’ (হিন্দি), ‘ধূপছাঁও’ (হিন্দি), ‘প্রেসিডেন্ট’ (হিন্দি), ‘মাই সিস্টার’ (হিন্দি) প্রভৃতি আরো কিছু ছবিতে। পঙ্কজ মল্লিক সুরারোপিত ‘জীবনমরণ’ ছবিতে প্রথম দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলেন। এর মধ্যে ‘আমি তোমায় যত…’ কালজয়ী হয়। মুম্বাই গিয়ে ‘ওমর খৈয়াম’, ‘তানসেন’, ‘সাজাহান’ , ‘পরোয়ানা’ ইত্যাদি ছবিতে অভিনয়সহ গান গেয়ে সারা ভারত মাতিয়ে দিয়ে এক কিংবদন্তী শিল্পীতে পরিণত হন। প্রণব রায়ের কথায় সুবল দাশগুপ্ত—র সুরে কে. এল. সায়গলের গাওয়া ‘নাইবা ঘুমালে প্রিয়…’ ও ‘এখনই উঠিবে চাঁদ…’ একমাত্র ননফিল্ম বেসিক রেকর্ডের গান দুটি আজও জনপ্রিয়।
৬৭। পাহাড়ী সান্যাল (১৯০৭—১৯৭৪) :— বাংলা চলচ্চিচত্রজগতের অসামান্য অভিনেতা। আসল নাম নগেন্দ্রনাথ। দার্জিলিঙে জন্মেছিলেন বলে ডাকনাম হয় ‘পাহাড়ী’। সেই নামেই বিখ্যাত। লক্ষ্নৌ—এ থাকাকালীন সেখানকার মরিস কলেজে ক্ল্যাসিক্যাল গানের তালিম নেন এবং লক্ষ্নৌবাসী অতুলপ্রসাদ সেনের দীর্ঘসান্নিধ্য লাভ করেন। প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘রূপলেখা’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ এসেও হাতছাড়া হবার পর দেবকী বসু পরিচালিত ‘মীরাবাঈ’ (১৯৩৩) ছবিতে প্রথম চিত্রাবতরণের সুযোগ পেলেন। ‘বিদ্যাপতি’, ‘ভাগ্যচক্র’, ‘বড়দিদি’, ‘বিদ্যাসাগর’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নির্জন সৈকতে’ ইত্যাদি অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করেন পাহাড়ী সান্যাল। ‘আসামী হাজির’ নাটকে সম্ভবত একবার পেশাদার নাটকে অভিনয় করেন। অনেক ছবিতে পাহাড়ী সান্যালের নিজ কন্ঠের গানও আছে। বেতার—নাটকও করেছেন।
৬৮। কানন দেবী (১৯১৬—১৯৯২) :— বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও অসামান্য কন্ঠশিল্পী। অসম্ভব সৌন্দর্য্যের অধিকারী এই নায়িকা—গায়িকা জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে ১০ বছর বয়সে নির্বাক ছবি ‘জয়দেব’—এ চিত্রাবতরণ। ক্রমে ‘মুক্তি’, ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘সাপুড়ে’, ‘সাথী’, ‘যোগাযোগ’, ‘শেষ উত্তর’, ‘সপেরা’, ‘বিদ্যাপতি’ (হিন্দী), ‘জবাব’ (হিন্দী), ‘মেজদিদি’, ‘দেবত্র’ ইত্যাদি অজস্র ছবিতে অভিনয় ও গানে মাতিয়ে দিয়েছেন কানন দেবী। ‘আমি বনফুল গো…’, ‘লাগুক দোলা…’, ‘ওগো সুন্দর, মনের গহনে তোমার মুরতিখানি…’ প্রভৃতি অসংখ্য কালজয়ী গান অমর হয়ে আছে কানন দেবীর কন্ঠে। স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্যের সঙ্গে যৌথভাবে শুরু করেছিলেন ‘শ্রীমতী পিকচার্স’ নামে চিত্র প্রযোজক সংস্থা। প্রথম দিকে মেগাফোন কোম্পানী থেকে কানন দেবীর গাওয়া কিছু বেসিক (নন —ফিল্ম) গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। কানন দেবীর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম ‘সবারে আমি নমি’।
৬৯। বেলা মুখোপাধ্যায় :— বহরমপুরে জন্মান এই বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী। মায়ের কাছে প্রথম সঙ্গীত শিক্ষা। ছোটোবেলায় কৃষ্ণকমল দাশগুপ্তের কাছে ক্ল্যাসিকাল গান শেখেন। বোন আভা মুখোপাধ্যায়ও গান গাইতেন। খুব ছোটো বয়সেই দুই বোন কলকাতা—বেতার কেন্দ্রের ‘ছোটোদের আসর’—এ গান করেন। এ ব্যাপারে অজিত চট্টোপাধ্যায়, নির্মলভাই (বসু), বাণীকুমার প্রমুখের সহায়তা পান। আধুনিক, গীত, ভজন, সবরকম গানই গাইতেন। ১৯৪৩ সালে পঙ্কজ মল্লিকের সুরে ‘কাশীনাথ’ ছবিতে বেলা মুখোপাধ্যায়ের গান জনপ্রিয়তা পায়। এ ছবির নায়ক—গায়ক অসিতবরণের সঙ্গে দ্বৈতকন্ঠেও তাঁর গান ছিল। এরপর, সুরকার ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ তাঁকে মুম্বাই নিয়ে যান। সেখানে ‘কৃষ্ণার্জুন’ সহ তিন—চারখানি ছবিতে প্লেব্যাক করেন। ১৯৪৫—এ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় বেলার। বিয়ের পরেও হেমন্তবাবু সুরারোপিত ‘সাথীহারা’, ‘প্রতিনিধি’, ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’, ‘বালিকা বধূ’ প্রভৃতি কয়েকটি ছবিতে তাঁর কন্ঠ শোনা যায়। ক্রমে নিজেকে গানের জগত থেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেন বেলা মুখোপাধ্যায়।
৭০। ১৯৪৩ সালে নীতিন বসুর পরিচালনায় নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত ‘কাশীনাথ’ ছবিটি মুক্তি পায়। কাহিনিকার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ছবিটিতে অভিনয় করেন অসিতবরণ, ভারতী দেবী, সুনন্দা দেবী, অমর মল্লিক, উৎপলা সেন, শৈলেন চৌধুরী, রাধারানী দেবী প্রমুখ। সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক।
৭১। ১৯৪৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নিউ থিয়েটার্সের ‘কাশীনাথ’ ছবিতে পঙ্কজ মল্লিকের সুরে, ‘ও বনের পাখী…’ গানটি গেয়েছিলেন বেলা মুখোপাধ্যায়। গানখানি অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। এই গানটিতে ইন্দ্রানী রায়েরও কন্ঠ ছিল। এই ছবির নায়ক—গায়ক অসিতবরণের সঙ্গে দ্বৈতকন্ঠে বেলা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া, ‘এলো রে এলো রে…’ গানখানিও জনপ্রিয় হয়। গানগুলির গীতিকার ছিলেন প্রণব রায়। ছবিটির পরিচালক ছিলেন নীতিন বসু।
৭২। ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ :— রাজস্থানের জয়পুরে জন্ম। বাবা পণ্ডিত গোবর্ধনপ্রসাদ জয়পুর রাজদরবারের সভাগায়ক ছিলেন। এনার কাছেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেন ক্ষেমচাঁদ। এ বাদে কত্থক নৃত্যও শেখেন। বিকানির রাজদরবারের গায়ক হন, তারপর নেপাল দরবারে। এরপরই কলকাতায় আসেন এবং এখানকার বেতার কেন্দ্রে গান করেন। নিউ থিয়েটার্সে তিমিরবরণের অধীনে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করেন। ‘দেবদাস’, ‘স্ট্রীট সিঙ্গার’ ইত্যাদি ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। মুম্বই গিয়ে ১৯৩৯ সালে ‘গাজি সালাউদ্দিন’ ছবিতে সহকারী এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করেন। এরপর, ‘হোলি’, ‘পাগল’, ‘তানসেন’, ‘পরদেশি’, ‘জিদ্দি’, ‘মহল’, ইত্যাদি ছবিতে যে সুরের মাতন তোলেন ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ, তার ফলে, হিন্দি ছবির সুরকারজগতে চিরস্মরণীয় হয়ে যান। ‘মহল’ ছবিতে ‘আয়েগা আনেওয়ালা…’ গান লতা মঙ্গেশকরকে পায়ের তলায় শক্ত জমি দিয়েছেন মুম্বইয়ে। ১৯৪৯ সালে প্রয়াত হন সুরকার ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ।
৭৩। বড়ুয়া সাহেব (১৯০৩—১৯৫১) :— ইনি হচ্ছেন কিংবদন্তি চলচ্চিচত্র— ব্যক্তিত্ব প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া। গৌরীপুরের (অসম) রাজপরিবারের সন্তান। প্রমথেশ ১৯২৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের বিজ্ঞানের স্নাতক। ১৯২৯—এ ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মস লিমিটেডের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের সদস্য এবং এই প্রতিষ্ঠান নির্মিত ‘পঞ্চশর’ ছবিতে একটি ছোটো চরিত্রে প্রথম চিত্রাবতরণ। ১৯৩০—এ প্যারিসে গিয়ে চলচ্চিচত্র বিষয়ে শিক্ষালাভ। দেশে ফিরে ১৯৩১—এ ‘বড়ুয়া ফিল্ম’ তৈরী করে ‘অপরাধী’ ছবি পরিচালনা ও নায়ক হিসাবে অবতরণ। ১৯৩৩ সালে নিউ থিয়েটার্সে—এ যোগ দিয়ে পরিচালনা ও অভিনয় সহযোগে ‘মুক্তি’, ‘দেবদাস’, ‘গৃহদাহ’, ‘জিন্দেগী’, ‘অধিকার’, ইত্যাদি বেশকিছু অসামান্য ছবি উপহার দেন প্রমথেশচন্দ্র। অচিরেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘স্টার’। কৃষিণ মুভিটোন—এর ব্যানারে প্রমথেশ পরিচালনা করেন ‘শাপমুক্তি’, যেখানে তিনি আবিষ্কার করেন নায়ক—গায়ক রবীন মজুমদারকে। মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়ের এম.পি. প্রোডাকসন্সে যোগ দিয়ে প্রমথেশ বড়ুয়া উপহার দেন, ‘শেষ উত্তর’, ‘মায়ের প্রাণ’ ইত্যাদির মতো জনপ্রিয় ও ভালোমানের ছবি। বিয়ে করেছিলেন চিত্রাভিনেত্রী যমুনা বড়ুয়াকে।
৭৪। বিকাশ রায় (১৯১৬—১৯৮৭) :— অবিস্মরণীয় অভিনেতা। কলকাতায় জন্ম। শখের থিয়েটার দিয়ে অভিনয়ের শুরু। কলকাতা বেতারকেন্দ্রে চাকরিতে যোগ দেন। ওখানেই চলচ্চিচত্রজগতের জ্যোতির্ময় রায়ের সংস্পর্শে এসে ‘অভিনেত্রী’ ছবিতে প্রথম অভিনয়। এরপর ‘ভুলি নাই,’ এবং তারপর ‘৪২’ ছবিতে অত্যাচারী পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অসামান্য অভিনয়ের মাধ্যমে বিকাশ রায় ছবির দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান। ‘বিকাশ রায় প্রোডাকশন’ এবং ‘ছায়াচিত্র পরিষদ’ নামের প্রতিষ্ঠান গঠন করে ‘সাজঘর’, ‘জিঘাংসা’, ‘অর্ধাঙ্গিনী’ (পরিচালক), ‘সূর্যমুখী’,’বসন্তবাহার’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ প্রভৃতি চলচ্চিচত্র, কোনোটি প্রযোজনার সঙ্গে পরিচালনা আবার কোনোটি শুধু প্রযোজনা করেছিলেন। ‘চৌরঙ্গী’, আসামী হাজির’, ‘নহবত’, ইত্যাদি কিছু মঞ্চনাটকেও বিকাশ রায়কে দেখা গেছে। আজীবন অভিনেতা হিসেবে কাজ করে গেছেন বেতার নাটকে।
৭৫। সুকান্ত :— কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬—১৯৪৭) ছিলেন একজন স্বল্পায়ু এবং একই সঙ্গে অসম্ভব প্রতিভাবান। তাঁকে ‘কিশোর কবি’ বলা হতো। বামপন্থীদের অধুনালুপ্ত ‘স্বাধীনতা’ কাগজের কিশোরসভা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। ‘ছাড়পত্র’, ‘ঘুম নেই’, ‘পূর্বাভাস’, ‘মিঠেকড়া’, ‘অভিমান’, ‘গীতিগুচ্ছ’, ইত্যাদির রচয়িতা ছিলেন। ফ্যাসী বিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘের পক্ষে ‘আকাল’ কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। সলিল চৌধুরীর সুরে সুকান্ত—র লেখা ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘ঠিকানা’, ইত্যাদি গান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় অমর হয়ে আছে। মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই প্রতিভাধর কবি।
৭৬। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় :— বাংলা গানের কন্ঠশিল্পী জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাঁশির মতো তীক্ষ্ন ও মিষ্টি সুর নির্গত হতো প্রতিমার কন্ঠ থেকে। ১৯৩৫ সালে বাংলাদেশে জন্ম। মাত্র চার বছর বয়সে গুণী সঙ্গীতজ্ঞ প্রকাশকালী ঘোষালের কাছে উচ্চচাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম। ঢাকা রেডিওতে গানের শুরু। এরপর, কলকাতা বেতারে। প্রথম রেকর্ডে গাইলেন ৪০—এর দশকে সুকৃতি সেনের সঙ্গে দ্বৈত সঙ্গীত, যা বেরোয় সেনোলা রেকর্ড কোম্পানী থেকে। এরপর, সমবেতভাবে ‘বন্দেমাতরম’ গান করেন। প্রখ্যাত সুরকার ও কন্ঠশিল্পী সুধীরলাল চক্রবর্ত্তী ‘সুনন্দার বিয়ে’ ছবিতে প্রথম গান গাওয়ান প্রতিমাকে দিয়ে। এরপর, কয়েকদশক জুড়ে ‘যদুভট্ট’, ‘ঢুলি’, ‘শাপমোচন’, ‘ছুটি’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘পরিণীতা’, ‘দাদাঠাকুর’, ইত্যাদি অজস্র ছবি ভরে আছে প্রতিমার গানে। অন্যদিকে, আধুনিক গানের মধ্যেও তাঁর গাওয়া ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর…’, ‘একটা গান লিখো…’, ইত্যাদি অজস্র গান কালজয়ী আখ্যা পেয়েছে। হেমন্ত—র সুরে অনেক গান—তো গেয়েইছেন, এমনকি প্রতিমার সুরেও দুটি গান রেকর্ড করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
৭৭। অলকা উকিল (১৯১৫—১৯৮০) :— রায় গুণাকর ভারতচন্দ্রের উত্তর পুরুষ গুণানন্দের বংশধর দেবজীবন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে হলেন বাংলা গানের এই গীতিকার। খুব অল্পই গান লিখেছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর নিজের সুরে এই গীতিকারের লেখা কয়েকটি গান রেকর্ড করেছিলেন। বহুমুখী প্রতিভা ছিল অলকা উকিলের। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী এবং খেলাধুলোতেও অত্যন্ত পটু। W.S.F—এর সম্পাদক হয়েছিলেন। মেয়েদের ক্রিকেট খেলার ব্যাপারে প্রধান উদ্যোগী ছিলেন। ভারত—সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাত্রী হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে রাশিয়া, জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালি সহ বহু দেশ ভ্রমণ করেন। অলকা উকিলের লেখা প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম— ‘মায়া কাজল’।
