আনন্দধারা – ২

কলকাতায় আসার দিন ঠিক হয়ে গেল। বাবা বললেন, ‘একটা লরি ঠিক করেছি। কিছু জিনিসপত্তর আর বাড়ির সবাই লরিতেই চলে যাবে। আর বাকি মালপত্তর আসবে গরুর গাড়িতে।’

সেই ব্যবস্থা হল। আমরা কলকাতায় এলাম বাবার তৈরি দু—খানা ঘরের বাড়িতে। একফালি রান্নাঘর। ঘরের সামনে একটা রোগা বারান্দা।

নতুন জায়গা। রাস্তাঘাট চেনা নেই। এদিক—ওদিক ঘুরতে গিয়ে পাছে হারিয়ে যাই, তাই বাবা আমাদের বাড়ির নম্বর মুখস্থ করালেন। বললেন, ‘হারিয়ে গেলে লোককে জিজ্ঞাসা করবি, রূপনারায়ণ নন্দন লেনটা কোথায়। আর বাড়ির নম্বর হল ছাব্বিশের দু—এর এ। নে বসে বসে মুখস্থ কর সারাদিন।’

আমাদের বাড়ির কাছেই একটা হাইস্কুল ছিল। নাসিরুদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুল। আমাকে ওখানেই ভর্তি করে দিলেন। আর দাদা ভর্তি হল সাউথ সুবার্বন স্কুলে। দাদা মেধাবী ছাত্র, উঁচু ক্লাসে পড়ে।

স্কুলটার তখন খুব নামডাক। ওই স্কুলে আমার বাবার খুড়তুতো ভাই মণিমোহন ভট্টাচার্য ছিলেন মাস্টারমশাই। উনি বললেন, ‘শক্তি ভালো ছেলে, ওকে আমাদের স্কুলে দিন। আর হেমন্ত এখন ছোটো ও নাসিরুদ্দিনেই পড়ুক।’

সেই নাসিরুদ্দিন স্কুলে কয়েক বছর পড়েছিলাম। তারপর গিয়ে ভর্তি হলাম মিত্র ইনস্টিটিউশনে। ওই স্কুলটা তখন আমাদের মতো গেরস্থদের জন্যে ছিল না। ওটা ছিল বড়োলোকদের স্কুল। কিন্তু আমার বন্ধু জগদীশ পড়তো ওই স্কুলে। বাবা তখন জগদীশের গৃহশিক্ষক। চাকরি ছাড়া উপরি কিছু রোজগারের জন্যে বাবাকে দু একটা ছেলে পড়াতে হতো। জগদীশ আর আমি এক ক্লাসে পড়ি। তাই ওকে পড়াবার সময় আমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। যাতে এক পড়ানোতে দু’জনের হয়ে যায়। সেইভাবেই আমার সঙ্গে জগদীশের ঘনিষ্ঠতা হয়। আর তারপরই একই স্কুলে পড়ার কথা ওঠে।

মিত্র স্কুলে মাইনে বেশি। বাবার সেরকম অবস্থা নয়। তবু আমার আগ্রহ দেখে বাবা আমার ইচ্ছেটা রাখলেন। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন—নিবেদন করে আমাকে হাফ ফ্রী করিয়ে নিয়েছিলেন বাবা।

জগদীশ তো আমার বন্ধু ছিল আগেই। এখানে ভর্তি হয়ে আমি আমার সহপাঠীদের মধ্যে আরও কয়েকজন বন্ধুকে পেলাম। পেলাম সমরেশ রায়২, পরিমল সেন, রমাকৃষ্ণ মৈত্র৩ আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে৪। সুভাষ এখন এ—যুগের বিখ্যাত কবি। দেশের দশের কাছে সুপরিচিত। আর রমাকৃষ্ণ, যে সুভাষ আর আমার মাঝখানে সবসময় থাকত, সেও গল্প লিখতো খুব। এখন সব ছেড়েছুড়ে দিয়েছে। লেখা ছাড়লেও সুভাষকে ছাড়েনি রমা। এখনও ওদের দুজনকে প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যায়।

আমার আর এক সহপাঠীর সঙ্গে খুব অন্তরঙ্গতা হয়েছিল। সে হল শ্যামসুন্দর। শ্যামের সঙ্গে মাখামাখিটা একটু বেশি—ই ছিল। প্রায়ই যেতাম ওদের বাড়িতে। ওদের বাড়িতে হারমোনিয়াম, তবলা, গ্রামোফোন—রেকর্ড সবই ছিল। রেকর্ডের গান শুনতাম বসে বসে। খুব ভালো লাগত। গান শুনে ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের মনেই গুনগুন করতে করতে চলতাম। এইভাবে কখন যে বাড়ি পৌঁছে যেতাম বুঝতেই পারতাম না।

কলকাতায় এসে গ্রাম ছেড়ে আসার শোকটা মাঝে মাঝে মনটাকে মিইয়ে দিত। কিন্তু সেটা পুষিয়ে যেত অন্যদিক দিয়ে। যাত্রাগান প্রায়ই লেগে থাকত এখানে ওখানে। সে সব দেখার কিছু কিছু সুযোগ পেতাম। মীরাবাঈ পালা দেখে আমিতো অভিভূত। মীরার ভজন শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম। শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল, কী করে এত সুন্দর গান গায়! গানের কলিগুলো সুর করে কতবার আউড়েছিলাম তখন।

একটা জিনিস তখন লক্ষ্য করতাম, গান শুনলেই সুরটা ঠিক চুম্বকের মত আমার গলায় চলে আসত। প্রথমটা অতটা বুঝতে পারি নি। পরে একদিন একটা গান শুনে পুরো গানটা গেয়ে ফেললাম। কথাটা মুখস্থ হয় নি তাই শুধু সুরটা আউড়ে গেলাম।

সেই সময় শ্যামের সঙ্গে বন্ধুত্বটা আমার খুব কাজে লেগে গিয়েছিল। ওদের বাড়িতে ছিল হারমোনিয়াম। হারমোনিয়ামে গান তোলার ব্যবস্থাটা ওই করে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘সময় পেলেই চলে আসিস। এন্তার গান বসে বসে গা, কেউ কিছু বলবে না।’

তাই করতাম আমি। নতুন গান শুনলেই হারমোনিয়ামে তোলবার জন্যে চলে আসতাম শ্যামের বাড়ি। ওখানে বসেই প্র্যাকটিশ করতাম। গান গাইতে গাইতে মনটা আনন্দে ভরে উঠত। ভাবতাম, ছোটখাটো কোনো আসরে গান শোনাতে পারলে মন্দ হতো না। কিন্তু সে সুযোগ তখনও পাই নি।

আমাদের স্কুলে প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের দিন একটা উৎসব মতো হতো। এই উৎসবে গান বাজনা হতো। কিন্তু আমাকে কোনো উৎসবেই গান গাইতে দিতেন না কর্তৃপক্ষ। সমরেশকে গান গাইবার সুযোগ দিতেন কর্তৃপক্ষ। আমি বসে শুনতাম সমরেশের গান। বেশ গাইত তখন সমরেশ।

সুভাষ এ সব দেখে ক্ষেপে উঠত। বলত, ‘এ যে দেখছি পুরো জমিদারি ব্যাপার। যা খুশি তাই করবে! তুই এতো ভালো গাস আর তোকেই কিনা বাদ দেয় সব ফাংশানে। এ সব চলবে না।’

আমি সুভাষকে বলতাম, ‘কে বললে আমি ভালো গাই। ভালো গাইলে কি আমাকে বাদ দিতো। নিশ্চয় আমার থেকে ওরা ভালো গায়। তাই ওরা চান্স পাচ্ছে।’

এর উত্তরে সেদিন সুভাষ বলেছিল, ‘চান্স পাচ্ছে বলেই ভালো গাইয়ে? তুই হাসালি হেমন্ত। চেষ্টা করলে চান্স পাওয়া যায়, কিন্তু চান্স পেলেই বড়ো গাইয়ে হওয়া যায় না। এ তো আর মামার আপিস নয় যে কাজে ঢুকেই ভাগ্নের চড় চড় করে প্রমোশন। শিল্পীদের যে অনেক মনিব। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের মন জয় করা কি এতই সোজা?’

এইরকম অনেক কথাই সেদিন বলেছিল সুভাষ। তখন আমরা সেকেন্ড ক্লাসের ছাত্র। সেকেন্ড ক্লাস মানে এখনকার ক্লাস নাইন। সেই বয়েসেই সুভাষের কবিতার হাত বেশ পাকা। ওর চিন্তাধারাও ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ।

এরপরই একদিন সুভাষ বললে, ‘তোকে আর ইস্কুলের ছেঁদো ফাংশানে গাইতে হবে না। ওরা ভালো গাইয়েদের নিয়ে ফাংশান করুক। তুই চল আমার সঙ্গে, রেডিও স্টেশনে। অডিশানের ব্যবস্থা পাকা করে এসেছি।’

তখন অল ইন্ডিয়া রেডিও—র নাম ছিল ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন৫। সেই সময় স্টেশন ডিরেক্টর ছিলেন স্টেপেলটন সাহেব৬। ঠিকানা— ১নং গার্স্টিন প্লেস৭।

সুভাষ আমাকে একদিন ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনে নিয়ে এসে হাজির। আমাকে অডিশান দিতে হবে। সুভাষ জিজ্ঞাসা করল, ‘কী রে ভয় পাচ্ছিস না তো।’

বললাম, ‘না, ভয় পাবো কেন। এ ব্যাপারে আমার নার্ভ খুব বাধ্য। পোষা কুকুরের মতো সব কাজে ল্যাজ নাড়তে ওস্তাদ।’

মনে আছে সেদিন আমার গানের অডিশান নিয়েছিলেন মিঃ বি. কে. নন্দী৮। কি গান মিঃ নন্দীকে শুনিয়েছিলাম তাও মনে আছে। গানের লাইনটা হল ‘আজও পড়ে গো মনে’৯। সন্তাোষদার অর্থাৎ সন্তাোষ সেনগুপ্তর১০ গাওয়া গান।

গান শেষ করে বেরিয়ে দেখি সুভাষ অডিশান রুমের বাইরে বসে আমাকে দেখে বললে, ‘কী রে কেমন হল?’

আমি বললাম, ‘কেমন হল তা আমি বলব কি করে। গাইলাম তো দরদ দিয়ে। এখন কর্তার মর্জি।’

সুভাষ বললে, ‘ও ঠিক আছে। ভালো যখন গেয়েছিস তখন ঠিক লেগে যাবে। চল, আর দাঁড়িয়ে কি হবে।’

রেডিও স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে অডিশানের ব্যাপারটাকে আর তেমন আমল দিলাম না। সব ব্যাপারে এটাই আমি করে থাকি। কোনো কিছুর জন্যে এগিয়ে যাই ঠিকই, দরকার মতো কাজও করি, কিন্তু তার ফল কী হবে সে নিয়ে আর মাথা ঘামাই না। হলে ভালো, নইলে মন খারাপ করে লাভ নেই। এটাই আমার বরাবরের স্বভাব। আর এই স্বভাবটার জন্যেই অযথা হাহুতাশের আক্রমণ থেকে মন আমার চিরমুক্ত।

রেডিওতে অডিশান দেবার তিন মাস পরে একটা চিঠি পেলাম। প্রোগ্রাম পেয়েছি। ভীষণ আনন্দ হল। এদিকে মনে মনে ভয়। বাবাকে কথাটা কী করে বলব। বাবা তো এসব ব্যাপারে ভীষণ গোঁড়া। ছেলে গান গেয়ে বেড়াবে এ তিনি ভাবতেই পারতেন না। আর তখনকার দিনকালও ছিল সেইরকম। গান গাওয়াটা ভালো চোখে দেখতেন না কেউ। ওটা একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তখন। সেই যুগে রেডিওতে গাইতে যাবে ছেলে। তাও আবার স্কুলের ছাত্র! এখন অবশ্য দিন পালটেছে, কাল পালটেছে। এখন ছেলেমেয়েরা গান গাইলে বাবা—মা গর্ববোধ করেন। তার জন্যে কত তদ্বির, কত তদারক করেন। এসব আমাদের সময় ছিল না। তাছাড়া আমাদের মতো নিম্নমধ্যবিত্তদের ঘরে তো নয়ই!

শেষ পর্যন্ত কথাটা মাকে বললাম। মা শুনে বললেন, ‘উনি তো আবার গান গাওয়া—টাওয়া পছন্দ করেন না। বুঝিয়ে বলে দেখ।’

বাবা শুনে তো খুব রেগে উঠলেন, ‘না না, ওসবরেডিওতে গান গাওয়া টাওয়া চলবে না। এখন পড়ালেখার সময়, তাই করো মন দিয়ে।’

তখন বাবা আপিস যাচ্ছিলেন। তাই আর দাঁড়ালেন না। হনহন করে বেরিয়ে গেলেন।

খুব মুষড়ে পড়লাম। গেলাম সুভাষের বাড়ি। সুভাষ, পরিমল আরও দু’ একজন বন্ধুবান্ধব ছিল সেখানে। সুভাষ বললে, ‘রেডিওতে তোকে গাইতেই হবে। চল, আমরা সবাই মিলে তোর বাবাকে বুঝিয়ে বলি।’

অবশ্য তার আর দরকার হল না। সন্ধেবেলা মা বুঝিয়ে বললেন, ‘এত কষ্ট করে প্রোগ্রাম পেয়েছে, তা একবার করুক না গান রেডিওতে। আর রেডিও এমন কিছু খারাপ জায়গা নয়। কত ভালো লোক সেখানে যান।’

মার কথায় বাবা রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, ‘তা একবার করুক গান রেডিওতে।’

বাবার অনুমতি পেয়েই আবার ছুটলাম সুভাষের বাড়ি। সুভাষকে বললাম, ‘বাবা রাজী হয়েছেন। এখন গান ঠিক করতে হবে। দশ মিনিটের প্রোগ্রাম। তার মানে দু’খানা গান গাইতে হবে। কী করব বল?’

সুভাষ শুনে তো আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বললে, ‘গান ঠিক করে ফেল।’

তখন কমল দাশগুপ্তর১১ সুরে নতুন একটা রেকর্ড বেরিয়েছে বাজারে। গেয়েছেন যূথিকা রায়১২। সেই সুরটা আমার খুব মনে ধরে গিয়েছিল। গানের প্রথম লাইনটা হল ‘তোমার হাসিতে জাগে’১৩। সুভাষকে বললাম, ‘সুরটা এই থাক, তুই ওই গানটার কথা পালটে নতুন একটা গান লিখে দে।’

সুভাষ বললে, ‘আমি কি গান লিখব? না না, ও আমার ঠিক হবে না।’

আমি বললাম, ‘হবে না কেন? তুই তো লিখিস। তাহলে পারবি না কেন? ও ঠিকই পারবি। বসে যা লিখতে।’

সেদিন সারাদুপুর ধরে গান লেখার পর্ব চলল। একসময় গান লেখা শেষ হল সুভাষের। আমি পড়ে বললাম, ‘বাঃ, খাসা!’

গানটার পুরো কথাটা আমার মনে নেই। তবে প্রথম লাইনটা মনে আছে—’আমার গানেতে এলে নবরূপে চিরন্তনী,

বাণীময় নীলিমায় শুনি তব চরণধ্বনি।’

একটা গান তো হল, কিন্তু আর একটা? আর একটা গান কী করা যায়?

তখন শচীনদেব বর্মনের১৪ ভাটিয়ালি গানের খুব কদর। আর আমি তো শচীনদেব বর্মনের অন্ধ ভক্ত। ঠিক করলাম ভাটিয়ালি গান যোগাড় করতে হবে।

আমাদের পাড়ার নিরাপদ চক্রবর্তী ভাটিয়ালি গান করতেন। ওঁকে গিয়ে ধরলাম। কাজ হল। উনি আমাকে একখানা ভাটিয়ালি গান শিখিয়ে দিলেন। অতএব দু’খানা গানের ব্যবস্থা হয়ে গেল।

মনে আছে রেডিও প্রোগ্রামের দিন আমি আর সুভাষ চলেছি রেডিও স্টেশনে ট্রামে চড়ে। সুভাষ একসময় বললে, ‘কী রে, ভয়টয় করছে না তো?’

আমি বললাম, ‘দূর ভয় করবে কেন? যাচ্ছি তো গান গাইতে। যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না তো। তাহলে ভয় করবে কেন?’

আগেও বলেছি, এই ভয় বস্তুটিকে আমি আমার ধারেকাছে ঘেঁষতে দিই না। এ ব্যাপারে আমার নার্ভ খুব সবল। আর এই নার্ভকে দুর্বল হতে না দেওয়ার একটাই মন্ত্র মনে মনে জপ করতাম আমি। সেটা হল, ফলের আশা না করে, শুধু মুখ বুজে কাজ করে যাও। দেখবে ঠিক উতরে গেছ। আর তা না করে যদি একবার ‘কী হবে কী হবে’ চিন্তাটাকে প্রশ্রয় দাও, তো তুমি গেলে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যাবে স্নায়ুর কাঁপুনি। কম্বল চাপা দিয়েও তখন তাকে থামানো যাবে না।

রেডিওতে গান করলাম। ওই দু’খানা গান। বেরিয়ে আসতেই সুভাষ জিজ্ঞাসা করল, ‘গান কেমন হল?’

আমি বললাম, ‘গান তো গাইলাম। কেমন হয়েছে তোরা বলবি।’

বাড়িতে এলাম খুব হাসিখুশি হয়ে। সবাই শুনেছে গান। প্রথম গানটা নাকি অনেকটা পঙ্কজ মল্লিকের১৫ ঢঙে গেয়েছি। কেউ কেউ হাসতে হাসতে বললেন, ‘ছোটো পঙ্কজ।’

তখন কেউ কেউ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমার গান শুনতো। আমিও খুশিমনে যেতাম গাইতে। এইভাবেই তখন গানের রেওয়াজ চালিয়ে যাচ্ছি। আর তাছাড়া তখন উপায়ই বা কি! বাড়িতে একটা হারমোনিয়াম নেই যে গাইবো। নেই গুরুজনদের খোলা অনুমতি। তাই বাড়ির লোকের কানের বাইরে চলছে টুকটাক সাধনা।

তখন আমরা এক বছর দেড় বছর অন্তর কাশীতে যেতাম। আমার মামার বাড়িতে। দিল্লি থেকে আমার বড়মাসিমাও আসতেন। সঙ্গে আসত আমার মাসতুতো ভাইবোনেরা। আমার মাসতুতো বোন লীলাদি, মাস্টারের কাছে গান শিখত। মাস্টার চলে গেলে আমি ধরতাম লীলাদিকে। বলতাম, যে গানটা মাস্টারমশাই শেখালেন ওটা আমাকেও তুলে দাও।

লীলাদি তখন আমার মাস্টার হয়ে গেল। ও যা শেখে আমাকে তাই শিখিয়ে দেয়। মনে তখন কী আনন্দ! একটা করে গান শিখি আর গানের স্টক বাড়াই। ঠিক ব্যাঙ্কে টাকা জমানোর মতোই ব্যাপারটা।

গান শিখে তখন গাইবার জায়গা খুঁজে বেড়াই। তখন আর আমাকে কে গাইতে বলবে! সেই সময় কারুর বিয়ে হলে বাসরঘরে গাইবার একটা সুযোগ পেয়ে যাই। মনে আছে আমার মার মামাতো বোন মায়া—মাসিমার বাসরে গান গাইবার কথাটা। বিয়ের লগ্ন ছিল একটু বেশী রাত্তিরে। আমি তো নেমন্তন্ন খেয়ে বসে আছি। আমার সমবয়সীরা অনেকে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কে অতক্ষণ জেগে থাকে? কিন্তু আমি তখন সময় গুনছি। কখন বাসরঘর বসবে। বিয়ে হয়ে যখন বাসরঘর বসলো তখন গভীর রাত্তির। সবাই প্রায় ঘুমে ঢলে পড়েছে। আমার দিকে চোখ পড়তে একজন বললেন, ‘ওমা, দেখেছ, হেমো এখনও জেগে আছে!’

আমি যে কেন জেগে আছি সবাই বুঝতে পারলেন। তারপরই আমাকে হারমোনিয়াম দিয়ে বসিয়ে দিলেন গাইতে। গাইলাম। একটার পর একটা অনেকগুলো গান। গাইবার পর মন শান্ত হল, শীতল হল।

তা সত্যি, তখন আমি একরকম গানের পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। যেখানে গান সেই জায়গাটা যেন আমায় টানে। আমি আর পরিমল তখন একটা কোচিং ক্লাসে পড়তে যেতাম। পথে পড়ত শচীনদেব বর্মনের বাড়ি। ক্লাস করে ফেরবার পথে শচীনদার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলতাম, ‘এই পরিমল, একটু দাঁড়িয়ে যা না। শচীনদার গান শোনা যাবে।’

এইভাবে কতদিন শচীনদার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ওই একটু গান শোনার জন্যে।

তখন আরও একটা ব্যাপারে আমি হাত দিয়েছিলাম। সেটা হল সাহিত্যচর্চা। আমি, সুভাষ, রমাকৃষ্ণ মৈত্র এবং আরও অনেকে মিলে চালাতাম সাহিত্যচর্চা। আমাদের পাড়ার কাছে ছিল ‘কল্যাণ সঙ্ঘ লাইব্রেরী’। সেখানেই বসত আমাদের সভা।

আমার মামাতোভাই রবিদা ছিলেন সাহিত্যের ব্যাপারে খুব উৎসাহী। লেখাপড়ায় খুব ভালো। এম. এ. পাস। সাহিত্যের ব্যাপারে উনিই তখন ছিলেন আমাদের মাথার ওপর। আমি, রমা গল্প লিখতাম, সুভাষ কবিতা লিখত। পড়া হত সভায়। আলোচনা হতো। সমালোচনা হতো।

এর মধ্যে একদিন সুভাষ বললে, ‘সাহিত্য নিয়ে তো খুব মাতামাতি হচ্ছে, কিন্তু গানটা তো ছাড়লে চলবে না। রেডিওতে তো গান হয়েছে। এবার রেকর্ডের জন্যে চেষ্টা করতে হবে।’

সুভাষ আমাকে নিয়ে গেল একে একে সব রেকর্ড কোম্পানিতে। সেনোলা, পাইওনিয়ার, মেগাফোন, এইচ. এম. ভি.। কেউ নিলে না। সবাই ফিরিয়ে দিলো।

এত চেষ্টা করেও রেকর্ড হল না। তা কী আর করা যাবে! রেকর্ড হল না বলে তো আর গান থেমে থাকবে না! গান গাওয়া যেমন চলছিল চলল। আর সেই সঙ্গে শুরু হয়ে গেল পুরোদমে সাহিত্যচর্চা। সাহিত্যের মাধ্যমে যাঁদের কাছে পেলাম তাঁরা হলেন, সুধাংশু সেনগুপ্ত, সন্তাোষ ঘোষ১৬, জগৎ দাস, সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়১৭, নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সবাইকে নিয়ে বেশ একটা বড় দল হল সাহিত্যের। গল্প লেখার জোর আরও বাড়ল। সেই সময় আমার কয়েকটা গল্প ছাপা হল দু’একটা পত্রিকায়। ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হল আমার একটা গল্প। সে গল্পটার নাম ‘একটি ঘটনা’। বন্ধুবান্ধবদের কাছে বাহবা পেলাম। সাহিত্যসভায় পড়তে লাগলাম নতুন লেখা গল্প।

সেই বছরই আমি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে যাদবপুর ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছি। বাবার খুব ইচ্ছে আমি ইঞ্জিনীয়ার হই। তখন যাদবপুরে যাবার বাস ছিল না। ট্রেন ছিল। তা ট্রেনে যেতে হলে আমাকে ভবানীপুর থেকে যেতে হবে বালিগঞ্জ স্টেশনে। সেও অনেকটা পথ। তাই ঠিক হল আমি সাইকেলে করে কলেজ যাবো। দাদার একটা সাইকেল ছিল। সেটাতে করে দাদা আলিপুর কোর্টে যেত। অতএব আমার জন্যে আর একটা সাইকেল এলো।

যাদবপুরে পড়ার সময় গানের রেওয়াজটা আবার বাড়ল। নতুন নতুন বন্ধু হল। গানে তাদের খুব উৎসাহ। কলেজের ফাংশানে তো তখন আমি বাঁধা আর্টিস্ট।

সেই সময় বাবা একদিন বললেন, ‘কী রে, রেকর্ড করবি?’

আমি তো বাবার কথা শুনে অবাক। বাবা আমার রেকর্ডের কথা বলছেন! আমার উত্তর শোনার আগেই বাবা বললেন, ‘আমাদের আপিসের শান্তি বোস কলম্বিয়া কোম্পানিতে চেলো বাজায়। ও বললে, কালীদা, তোমার ছেলে তো শুনছি খুব গেয়ে বেড়াচ্ছে। তা ওকে একবার পাঠিয়ে দিও তো আমার কাছে। তেমন বুঝলে রেকর্ড করিয়ে দেব।’

এরপর বাবাই সব ব্যবস্থা করে দিলেন। বাবার বন্ধু শান্তি বসু আমাকে নিয়ে গেলেন শৈলেশ দত্তগুপ্তর১৮ কাছে। শৈলেশ দত্তগুপ্ত তখন কলম্বিয়া আর এইচ. এম. ভি.র নামকরা সুরকার। ওঁর সুরে তখন ছোটো বড়ো সবাই রেকর্ড করছে। ওঁরই সামনে আমাকে একদিন হাজির করিয়ে শান্তিদা বললেন, ‘শৈলেশবাবু, দেখুন তো ছেলেটাকে টেস্ট করে। গায় ভালো।’

শৈলেশ দত্তগুপ্তমশাই আমাকে বললেন, ‘কী গান করো? আধুনিক? তা বেশ গাও একটা।’

হারমোনিয়ামটা টেনে নিয়ে গাইতে বসলাম। যে গানটা সেদিন গেয়েছিলাম তার প্রথম লাইনটা আজও মনে আছে। সন্তাোষ সেনগুপ্তর গাওয়া একটা রেকর্ডের গান। প্রথম লাইনটা হল—’যদিও দূরে থাক, তবু যে ভুলি নাকো।’১৯

গানের অর্ধেকটা গেয়েছি, শৈলেশবাবু হাত তুলে থামতে বললেন। বুঝলাম, পরীক্ষায় ফেল। মিনিটকয়েক বসে থাকার পর উঠতে যাবো এমন সময় শৈলেশবাবু বললেন, ‘উঠছ কোথায়? একটু বোসো, আজই একটা গান তুলে নাও। কাল আর একটা শিখিয়ে দেব। আরে হাঁ করে দেখছ কী। দশদিনের মধ্যে রেকর্ড করতে হবে।’

নিজের কানকেই যে বিশ্বাস করতে পারছি না। এসব উনি বলছেন কী! এই রেকর্ডের জন্যে সুভাষ আমাকে নিয়ে কত জায়গায় ঘুরেছে। সবাই ফিরিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘না, রেকর্ডের গলা নয়।’ আর ইনি পুরো গান না শুনেই রায় দিয়ে দিলেন। আমাকে ভালোবেসে না আমার গলাকে ভালোবেসে সেদিন বুঝতে পারিনি। বুঝেছিলাম অনেক পরে। কিন্তু সেই প্রথম দিন থেকেই উনি হয়ে গেলেন আমার ‘শৈলেশদা’। এর অনেক পরে একদিন আমাকে শৈলেশদা বলেছিলেন, ‘মানুষকে বুঝতে যদিও বা আমার ভুল হয়, মানুষের প্রতিভা বুঝতে আমার কখনও ভুল হয় না।’

যাইহোক, রেকর্ডের জন্যে দুটো গান আমাকে শিখিয়ে দিলেন শৈলেশদা। একটা গান হল—’বল গো বল মোরে।’ আর অন্যটা হল—’জানিতে যদি গো তুমি।’ দুটো গানই নরেশ্বর ভট্টাচার্যের২০ লেখা।

ঠিক দশদিনের মাথায় রেকর্ড হয়ে গেল। আমার জীবনের প্রথম রেকর্ড। এতদিন গেয়েছি, অপরে শুনেছে। এবার নিজের গান নিজে শুনতে পাবো।

আরও অবাক কাণ্ড। পনেরো দিনের মধ্যে আমার প্রথম রেকর্ড বেরিয়ে গেল বাজারে। এ যেন ঠিক পোঁতার সঙ্গে সঙ্গে গাছে ফুল। সে বড় আনন্দের, সে বড় উল্লাসের দিনগুলো! সালটা মনে আছে। ১৯৩৭, ডিসেম্বরের শেষ। এই সব ফেলে আসা দিনগুলোর জন্যে মন কেমন করে এখনও।

এই সময়ের কত ঘটনা এখনও মনের চারপাশে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু এ সব তো আর ফিরে পাবার নয়। শুধু মনে মনে উপভোগ করা। তাই করি মাঝে মাঝে।

কাশী আমার জন্মস্থান। ছেলেবেলায় প্রায়ই ওখানে যেতাম। মামার বাড়ি। আমার এক মাসতুতো দাদাও তখন প্রায়ই আসতেন কাশীতে। উনি আমাকে নিয়ে কাশী শহর চষে বেড়াতেন। তবে বেশিরভাগই যেতেন গঙ্গার দিকে। খুব নৌকো চড়ে বেড়ানোর শখ। উনি পরে নৌ—বিভাগের এক দায়িত্বপূর্ণ পদে বহাল হয়েছিলেন। কমান্ডার কে. কে. মুখার্জী—কালীকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়।

তা সেই সময় কাশীতে খুব স্বদেশি আন্দোলন চলছে। লাল নীল কাগজে বিদ্রোহের কবিতা ছেপে বিলোচ্ছে আন্দোলনকারীরা। আমার হাতেও ওইরকম লাল নীল কাগজ এসে পড়েছে কয়েকখানা। আমি করতাম কী, ওই সব বিদ্রোহের কবিতাগুলোতে সুর দিয়ে গাইতাম। আমার মাসতুতো দাদা জিজ্ঞাসা করতো, ‘এ সব গান কোথায় শিখলি?’

উত্তরে বলতাম, ‘এ সব গান নয়, কবিতা। আমি সুর দিয়ে গাইছি।’

মাসতুতো দাদা উৎসাহ দিয়ে বলতেন, ‘নিজে সুর দিয়ে গাইছিস। তাহলে তো আর গানের জন্যে তোর ভাবনা নেই।’

এরপর উনিও লাল নীল কাগজ যোগাড় করে আমার হাতে দিয়ে বলতেন, ‘নে, ভালো সুর দে। তারপর আমাকে শোনাস।’

এইভাবেই তখন আমি গানটাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছি। কথা পেলেই তাকে সুরে নিয়ে যাওয়া। এটা তখন আমাকে খেলার মতো পেয়ে বসেছে। যদিও সেসব সুর এমন কিছু নয়, নিছক একটা খেয়াল। অনেকটা মাছ ধরবার মতো। রুই কাতলা ধরবার তো ক্ষমতা নেই, তাই বাঁশের কঞ্চিতে সুতো বেঁধে ভাতের টোপ দিয়ে পুঁটিমাছ ধরা। তখন বড়ো টোপ পাবো কোথায় যে রুই—কাতলা ধরবো। ভরসা বলতে তখন একমাত্র শৈলেশদা। উনি সেই গোড়ার দিন থেকেই আমাকে ভালোবেসে ফেলেছেন।

সেই সময় শৈলেশদা ভবানীপুর ছেড়ে চলে গেলেন টালিগঞ্জে। আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূর হয়ে গেল। ওঁর কাছে তখন আমাকে প্রায় রোজই যেতে হতো। একটা রেকর্ড বেরিয়েছে। আবার নতুন রেকর্ডের ব্যবস্থা করছেন শৈলেশদা। একদিন শৈলেশদা বললেন, ‘তোমার আজকাল এত দেরি হয় কেন আসতে। একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারো না। আগে তো আসতে।’

আমি বললাম, ‘আগে তো কাছে ছিলেন। একটুখানি পথ। এখন এই লম্বা রাস্তাটা হেঁটে আসতে বেশ সময় লাগে।’

শৈলেশদা উত্তরে বললেন, ‘তা হেঁটে আসবার দরকার কী। ট্রামে করে এলেই পারো।’

জবাবে সেদিন আমি শৈলেশদাকে আমাদের অসচ্ছল সংসারের গোটা চেহারাটাই জানিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, ‘আমার বাবা তো ম্যাকিনন ম্যাকেনজির সাধারণ কেরানি। খুব অল্প আয়। তার ওপর কিছু ধার—দেনা হয়ে গেছে। দেনার দায়ে বাড়িটাও চলে যেতো, মামা পাওনাদারের দেনা মিটিয়ে বাড়িটা বাঁচিয়েছেন। আমার মামা খুব ভালো। অনেক সাহায্য করেন আমাদের। আমাদের নতুন জামাকাপড় কেনবার পর্যন্ত টাকা থাকে না। সব আসে মামার বাড়ি থেকে। আমার মাসতুতো ভাইবোনদের পুরোনো জামাকাপড় পরে আমরা মানুষ হচ্ছি। তা বাবা আর কি করবেন বলুন? উনি তো ঠাকুরদার কিছু পাননি। ঠাকুরদার কিছু ঋণ মাথায় নিয়ে সংসারে নেমেছেন। একটা লোকের আয়ে সংসার চলছে। আমরা চার ভাই এক বোন। সব মিলিয়ে খরচ তো কম নয়। তবু বাবা আপিসের পরে দুটো টিউশানি করেন। তা সে আর কতো।’

আরও হয়তো অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, শৈলেশদা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ব্যাস, ব্যাস, বুঝেছি। তুই কাল থেকে আমার কাছ থেকে ট্রাম ভাড়া নিয়ে নিস। এতোটা পথ রোজ রোজ হেঁটে আসা যায়?’

এরপর থেকে শৈলেশদা আমাকে ট্রাম ভাড়া দিয়ে দিতেন। হেঁটে আসার কষ্ট দেখেই উনি আমাকে ট্রাম ভাড়া দিতেন। কিন্তু কষ্ট বলে কোনো জিনিস আমার তখন জানা ছিল না। আজও নেই। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে আমি। অভাবের সংসার। দুবেলা যে দুটো খেতে পাই এটাই যথেষ্ট। অনেকে তো তাও পায় না। সেই আমি হেঁটে আসাটাকে কষ্ট কি করে ভাববো? তবে সময় বাঁচাবার জন্যে আমাকে ট্রামে আসতে হতো। কারণ তখন আমার সময়ের বেশ টানাটানি। ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ করতে হচ্ছে, তার একটা পড়াশোনা আছে। সাহিত্যটা তখনও টুকটাক চলছে। আর বাকি সময়টা গানের পেছনে দিচ্ছি। অতএব তখন থেকেই আমাকে ঘড়ি ধরে কাজ করতে হচ্ছে।

বাড়িতে তখনও হারমোনিয়াম নেই। টাকা কোথায় যে হারমোনিয়াম কিনব? প্রথম রেকর্ড করে পেলাম মাত্র কুড়ি টাকা। তা সে টাকা দিয়ে তো হারমোনিয়াম হবে না।

এর দু’মাস পরেই অবশ্য বেরোল আমার দ্বিতীয় রেকর্ড। গানের প্রথম লাইনটা হল—’তোমারে চাহিয়া প্রিয় বুঝিনু বিফল চাওয়া।’২১

এবার ঠাকুর মুখ তুলে চাইলেন যেন। তখন আমি যা চাইছিলাম তা বিফল হল না। চাইছিলাম একটা হারমোনিয়াম। আগের কুড়ি আর এখনকার কুড়ি মিলিয়ে হল চল্লিশ টাকা। সেই টাকা দিয়ে বাবা আমাকে একটা হারমোনিয়াম কিনে দিলেন। সে হারমোনিয়াম আজও আমাদের ভবানীপুরের বাড়িতে আছে। জার্মান রিড। এখনও ভালো বাজে।

এইবার আমার খুব সুবিধে। আর হারমোনিয়ামের জন্যে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হবে না। এখন নিজের বাড়িতে বসেই চালাতে পারবো সংগীতচর্চা।

এইসেময় শৈলেশদা একদিন বললেন, ‘তুই তো কেবল আধুনিক গান করছিস, রবীন্দ্রসংগীতটাও শুরু কর। অফুরন্ত ভাণ্ডার। গেয়ে কূলকিনারা পাবি না।’

বললাম, ‘শিখতে তো চাই। কিন্তু শিখবো কার কাছে?’

উনি বললেন, ‘কারুর কাছে শিখতে হবে না। স্বরলিপির বই দেখে দেখে গান তুলবি।’

আমি বললাম, ‘আমি তো স্বরলিপি দেখে গান তুলতে জানি না।’

শৈলেশদা রবীন্দ্রসংগীতের একটা স্বরলিপির বই আমাকে দিলেন। আকারমাত্রিক২২ স্বরলিপি। স্বরলিপির নিয়মকানুনও বুঝিয়ে দিলেন জলের মতন।

আমি তো আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। গান তোলার এত সুবিধে? কাউকে ধরতে হবে না গানের জন্যে। নিজেই শিখে নিতে পারবো বই দেখে। স্বরলিপির বইটা মাথায় ঠেকিয়ে সেদিন মনে মনে বলেছিলাম, গুরুদেব, আজ থেকে তুমি আমার গানের গুরু।

প্রথম যে রবীন্দ্রসংগীতটা আমি তুলেছিলাম সেটা আমার আজও মনে আছে। আমার প্রথম শেখা গানটা হল—’আমার মল্লিকা বনে, যখন প্রথম ধরেছে কলি।’

তখন আমার মনেও গানের কলি সবে ধরেছে। গান নিয়ে কত ছেলেমানুষি করেছি। প্রথম রেকর্ডটা বেরোবার পর ওটাকে একটা কাগজে মুড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতাম। যাঁদের বাড়িতে যেতাম তাঁরা জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তোমার হাতে ওটা কী?’

লজ্জা পেয়ে বলতাম, ‘ও কিছু নয়, ও এমনি একটা।’

তাঁরা জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কী এমনি বলোই না।’

তখন বলতাম, ‘একটা রেকর্ড। আমার রেকর্ড।’

আমাকে সবাই খুব ভালোবাসতেন। তাই আগ্রহ দেখিয়ে ওঁরা বলতেন, ‘তোমার রেকর্ড, আর তুমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছো! দাও শুনি।’

এইভাবে আমি তখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমার রেকর্ড শোনাতাম। এইসব ছেলেমানুষির কথা মনে পড়লে এখন হাসি পায়। কিন্তু তবু সেসব দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মন এখনও কাঁদে। কত মধুর সেসব দিনগুলো ছিল। আমাকে এগিয়ে দিয়ে সেইসব দিনগুলো কোথায় সরে গেছে!

সেইসময় আমার উচ্চচাঙ্গসংগীতের প্রতি ঝোঁক হয়েছে খুব। কোথাও উচ্চচাঙ্গসংগীতের জলসা হচ্ছে শুনলে পরিমলকে বলতাম, ‘চল, গান শুনে আসি।’

তখন এমন কতদিন হয়েছে সারারাত ধরে গান শুনেছি। বাড়িতে ফিরেছি ভোরে।

এমন সময় আলাপ হল পাঁচুগোপাল বোসের সঙ্গে। উনি তখন খেয়াল গাইতেন। ওঁকে ধরলাম, ‘পাঁচুদা, আপনার কাছে গান শিখব।’

উনি তো এককথায় রাজি। বললেন, ‘বেশ তাই হবে।’

মাসখানেক ওঁর কাছে উচ্চচাঙ্গসংগীত শিখেছিলাম আমি।

যাইহোক, এদিকে তো গানের রেকর্ড হচ্ছে। কিন্তু রেডিও প্রোগ্রাম বন্ধ। দু’বার মাত্র গেয়েছিলাম তখন রেডিওতে। সেই একবার ক্লাস নাইন—এ যখন পড়ি, আর একবার ক্লাস টেন—এ উঠে। শৈলেশদা বললেন, ‘চল, একবার রেডিওতে গিয়ে দেখি।’

ওঁর সঙ্গে গেলাম রেডিও স্টেশনে। উনি আলাপ করিয়ে দিলেন বাণীকুমারের২৩ সঙ্গে। বাণীকুমার আমার গান শুনলেন। তারপর উনি আমাকে একটা ওঁর ফিচারে প্রোগ্রাম দিলেন। ফিচার প্রোগ্রামের দক্ষিণা ছিল তখন মাত্র পাঁচ টাকা। একটা ফিচারে নয়, পাঁচটা ফিচারে প্রোগ্রাম করলে তবে পাঁচ টাকা পাওয়া যেতো। তার মানে প্রথমটায় পাঁচ টাকা আর বাকি চারটে ফ্রী। এইরকম তখন নিয়ম ছিল রেডিওর। তা তখন পাঁচ টাকাই অনেক।

গানটা তখন আমাকে বেশ চারপাশ থেকে আঁকড়ে ধরেছে। আমিও গানটাকে বেশ সাপটে নিয়েছি। তাই ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ার দিকে আর মন নেই আমার। ১৯৩৮ সালের শেষের দিকে পড়াটাই ছেড়ে দিতে হল। আর পারলাম না সবদিক সামলাতে।

বাবা একটু ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন ঠিকই। কত আশা ছিল ছেলে ইঞ্জিনীয়ার হবে। দাদা তখন আলিপুর কোর্টে চাকরি করছে। মেজোছেলেও পাশ করে চাকরি করবে। সংসারের তাতে একটু সাশ্রয় হবে। সব ভেস্তে দিলাম আমি।

পড়াটা ছাড়ার পর, গান থেকে রোজগারের দিকে নজর দিতে হল। এরপর তো আর বাড়ি থেকে হাতখরচা চাওয়া যায় না। তাই দুটো গানের টিউশানি যোগাড় করলাম। দুটো ছোটো ছোটো মেয়েকে গান শেখাতে যেতাম। দু’জায়গা থেকে পাঁচ টাকা করে পেতাম। একটি মেয়ের নাম বুলবুল, আর একজন ঝর্ণা। আমার ঝর্ণা বলে ছাত্রীটি মারা গেছে। আমার প্রথম জীবনের ছাত্রী এরা। তাই এদের কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে।

নতুন নতুন গানের টিউশানি তখন দু’একটা করে বাড়ছে। বাজারে তখন আমার চারখানা রেকর্ড বেরিয়েছে। রেকর্ড যাঁরা শোনেন তাঁদের কাছে আমার নামটা একটু একটু করে পরিচিত হচ্ছে। চেনা—জানার সংখ্যাও বাড়ছে গানের রেকর্ডের দৌলতে।

কিন্তু শিল্পের পথে তো ফুলের থেকে কাঁটাই বেশি। প্রতি পদে বাধা। পরপর বেশ রেকর্ড হচ্ছিল, হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল চারখানা রেকর্ডের পর। কলম্বিয়া কোম্পানিতে গণ্ডগোল চলছে। কোম্পানির পুরোনো প্রতিনিধি মিঃ সরকারের জায়গায় নতুন একজন বহাল হয়েছে। অতএব অনেকের সঙ্গে আমার রেকর্ড করাও বন্ধ।

অতএব এখন হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা। রেকর্ডের ব্যাপারে তাই, তবে গানের ব্যাপারে আমার উদ্যম তাতে একটুও কমেনি। সমান উৎসাহে গান গেয়ে বেড়াচ্ছি। রেকর্ডটা ওদের হাতে, কিন্তু গলাটা তো আমার। এর মনিব আমি নিজে। একে যেমন চালাবো তেমনি চলবে।

এর কয়েকমাস পরে আবার একদিন ডাক পড়ল কোম্পানিতে। গেলাম। গিয়ে শুনলাম কোম্পানি রাজি হয়েছে রেকর্ড করতে। তবে এবার আর কলম্বিয়ার ছাপ থাকবে না রেকর্ডে। এই কোম্পানিরই নতুন একটা শাখা হয়েছে। তার নাম ওডিআন২৪। সেই ছাপেই এবার থেকে আমার রেকর্ড বেরোবে।

তাই সই। ছাপ যারই থাক গানতো সেই আমারই। লোকে তো আর ছাপ দেখবে না, গান শুনবে। গান ভালো হলে কিনবে, নইলে কিনবে না। গরদের কাপড় পরে যে মন্ত্র উচ্চচারণ করবে পুরুত, কোঁচার খুঁট গায়ে দিয়ে তাকে একই মন্ত্র পড়তে হবে। ফল একই।

ওডিআন লেবেলে আমার নতুন রেকর্ড বেরোলো বাজারে। গানটা হল—’পরদেশী কোথা যাও, থামো গো হেথা।’২৫

নতুন রেকর্ড যেদিন বেরোলো সেদিন মনটা খুব খুশিখুশি। পরিমলকে বললাম, ‘চল, আজ একটা সিনেমা দেখে আসি।’

তখন সিনেমা বলতে নিউ থিয়েটার্সেরই২৬ ছবি। আর দু’একটা কোম্পানি যা ছিল, তারা মাঝেমধ্যে এক আধখানা বাংলা ছবি তুলতো। তখন ইংরেজি ছবির চল ছিল খুব। আমার মনে আছে, আমি প্রথম যে সিনেমাটা দেখি সেটা একটা ইংরেজি ছবি। নাম ‘ডেভিলস ব্রাদার্স’। আর একটা ছবি সেই সময় দেখেছিলাম বেনারসে। ছবিটার নাম ‘যমুনা পুলিনে’। আমাদের ছেলেবেলায় সিনেমা দেখা বারণ ছিল। আমার দাদা ম্যাট্রিক পাস করে প্রথম সিনেমা দেখেছিল। আমি অবশ্য ম্যাট্রিকের আগেই দু’চারটে ছবি দেখেছি।

এরপর কত ছবি দেখেছি। আজও দেখছি। কিন্তু ভুলতে পারিনি নিউ থিয়েটার্সের তোলা ছবিগুলো। আজ বম্বেতে হিন্দি ছবি উঠছে গাদাগাদা। আর সেই যুগে একমাত্র নিউ থিয়েটার্সই বাংলা, হিন্দি ছবি করতো। তখন নিউ থিয়েটার্সের কী নামডাক! সবাই বসে বসে দিন গুনতো, কবে ‘হাতি’ মার্কা ছবি আসবে। ওই হাতিটাই ছিল নিউ থিয়েটার্সের চিহ্ন। ছবি শুরু হতো ওই হাতি দিয়ে। একটা হাতি শুঁড়টাকে টেনে ওপরে তুলত। আর তখন পরদায় ভেসে উঠত তিনটি শব্দ—’জীবতাং জ্যোতিরেতু ছায়াম।’ মানে, ‘ছায়াছবি দীর্ঘজীবী হোক।’

ছায়াছবি দীর্ঘায়ু পেয়েছে। যে শিশুকে একদিন নিউ থিয়েটার্স সযত্নে লালনপালন করে সাবালকত্ব দান করেছিল তারই বংশধরেরা আজ কাতারে কাতারে ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিভিন্ন শহরে। তখন কোথায় ছিল বম্বে আর কোথায় ছিল মাদ্রাজ? ভাবলে দুঃখ হয় সেই ছবির জননী নিউ থিয়েটার্স সব ক্ষমতা খুইয়ে এখন অশীতিপর অথর্ব বৃদ্ধার মতো পুতপুত করে তাকিয়ে দেখছে।

এই নিউ থিয়েটার্সে আমি কোরাস গান করতে যেতাম। তখন আমার তেমন নাম হয় নি। তখন আমার থেকে বেশি নামকরা শিল্পী গানের জগতে জায়গা করে নিয়েছে। তাদের মধ্যে ছিল জগন্ময় মিত্র২৭, বেচু দত্ত২৮, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য২৯ ও আরও অনেকে ছিলেন। তাই আমাকে যখন রাইচাঁদ বড়াল৩০, আমাদের রাইদা এবং পঙ্কজদা ফিল্মে কোরাস গাইবার জন্যে নিউ থিয়েটার্সে ডেকে পাঠাতেন তখন বর্তে যেতাম। নিউ থিয়েটার্সে ঢুকতে পাওয়া এক সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাও আবার আর্টিস্ট হয়ে। বি. এন. সরকারের৩১ নিউ থিয়েটার্স তখন শিল্পীদের কাছে ‘মা জননী’। বছরে বছরে যিনি কেবল সুসন্তানই প্রসব করেন। সেখানেই আমার ফিল্মে গান গাওয়ার হাতেখড়ি।

এই সময় উচ্চচাঙ্গসংগীত শেখার একটা সুযোগ এসে গেল। সুযোগটা করে দিলো পরিমল। পরিমল একদিন বললে, ‘কী রে ক্লাসিক্যাল শিখবি? একজন ভালো গুরু পাওয়া গেছে।’

আমি তো শুনে গদগদ। গান শিখব উস্তাদের কাছে। এ যে আমার অনেকদিনের ইচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কে শেখাবেন? নাম কী?’

পরিমল বললে, ‘উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর৩২ ছাত্র ফণীভূষণ ব্যানার্জী। সবাই ফন্তুদা বলে। একেবারে এক নম্বর গুরু।’

সব ব্যবস্থা পরিমলই করে দিলো। উচ্চচাঙ্গসংগীতশিল্পী শ্রীশৈলেন ব্যানার্জীর বাড়িতে বসে গান শেখাতেন আমাকে ফন্তুদা। আমার সঙ্গে আরও দু’একজন ফন্তুদার কাছে গান শিখতে আসত। তারা হল সত্য চৌধুরী, রথীন চৌধুরী। এরাও আমার বন্ধু।

ফন্তুদার কাছে বছর দুয়েক গান শিখেছিলাম। আরও শিখতাম। হয়তো সারাজীবন ধরেই শিখতাম। কিন্তু ফন্তুদা হঠাৎ মারা গেলেন। বড়ো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল ওঁর জীবন।

অন্য ওস্তাদের কাছে কয়েকবার দরবার করেছিলাম। কিন্তু তাঁদের শর্ত বড়ো কড়া। তাঁরা স্পষ্টই জানালেন, ‘শেখাতে পারি কিন্তু আধুনিক গান তোমাকে ছাড়তে হবে। ওসব গাওয়া একদম চলবে না।’

কিন্তু এ প্রস্তাবে আমি রাজি হতে পারিনি। আধুনিক গান গেয়ে যে ক’টা টাকা আয় হচ্ছিল তা বন্ধ হলে আমার চলবে কী করে। আমাদের যে তখন অভাবের সংসার। বড়ো টানাটানি। তাই ভেবেছিলাম লঘুসংগীত দিয়ে রোজগারটা বজায় রাখতে পারলে উচ্চচাঙ্গসংগীত শেখার অসুবিধে হবে না। কিন্তু এদের যে অনেক বিধিনিষেধ। নইলে পেটের দায়ে ফেরিওলাগিরি করে কি বি. এ., এম. এ. পাস করা যায়? অতএব উচ্চচাঙ্গসংগীত শেখার এখানেই আমার ইতি।

তাই এবার রবীন্দ্রসংগীতের দিকে বেশি নজর দিলাম। শৈলেশদার চেষ্টায় রবীন্দ্রসংগীতে আমার সাফল্য বেশ দ্রুত হল এবং ওঁরই সুপারিশে রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ডও করলাম কয়েকটা।

ওদিকে তখন রেডিওতে আমার যাতায়াত বেড়েছে। প্রোগ্রাম পাচ্ছি। গান না থাকলেও তখন প্রায়ই ওখানে বেড়াতে যাই। রেডিওর পরিবেশই তখন ছিল অন্যরকম। মনে হতো যেন নিজেদের ঘরবাড়ি।

তখন গানের বাজারে পঙ্কজকুমার মল্লিক, মানে আমাদের পঙ্কজদা খুব জনপ্রিয় শিল্পী। উনি তখন আবার নিউ থিয়েটার্সের বাঁধা সংগীত পরিচালক। গানের জলসায় ওঁর আসন প্রথম সারিতে।

আমি তখন পঙ্কজদার ঢঙে গান গাইছি। আমাকে দেখে অনেকে বলে জুনিয়ার পঙ্কজ। খুব বাহবা দেয়।

তখনও আমার সঙ্গে পঙ্কজদার আলাপ পরিচয় নেই। খুব ইচ্ছে হল একদিন আলাপ করবার। কিন্তু উনি তো সব সময় ব্যস্ত। ওঁর হাতে একটুও বাড়তি সময় নেই। তবু একদিন সাহসে ভর করে গেলাম ওঁর সেবক বৈদ্য স্ট্রীটের বাড়িতে।

বাড়িতে পেলাম ওঁকে। খুব সঙ্কোচের সঙ্গে নিজের পরিচয় দিলাম। উনি শুনে বললেন, ‘ও, তুমিই হেমন্ত? বাঃ বেশ। বেশ ভালো গান করো। আচ্ছা, আচ্ছা।’

হাতে ওঁর একদম সময় ছিল না। এখুনি ওঁকে বেরোতে হবে। ওই ক’টা কথা বলে উনি বেরিয়ে গেলেন। গাড়ি ছাড়বার আগে মুখ বাড়িয়ে আমাকে বললেন, ‘আমি নিউ থিয়েটার্স যাচ্ছি। তুমি কোথায় যাবে?’

আমি বললাম, ‘আমার বাড়ি ভবানীপুরে।’

উনি একাই চলে গেলেন টালিগঞ্জের দিকে।

পঙ্কজদার বাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছি। মনটা খুব খুশিখুশি। পঙ্কজদার সঙ্গে কথা বলেছি। কতবড় শিল্পী। কত ব্যস্ত। কত কাজ। মনে মনে একসময় ভাবলাম, যদি আমিও এইরকম গান নিয়ে ব্যস্ত হতে পারি কোনোদিন! সেকি হবে?

এইসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লাম একটা কমার্শিয়াল কলেজের সামনে। সামনের ঘরটায় ছেলেরা টাইপ শিখছে। মনে পড়ে গেল বছর দুয়েক আগের ঘটনা! তখন আমিও ঠিক এদের মতো টাইপ শিখতাম। শর্টহ্যান্ড ক্লাসও করতাম। দাদা তখন কোর্টের স্টেনোগ্রাফার। আমাকে একদিন বললে, তুইও স্টেনোগ্রাফিটা শিখে রাখ। চাকরি পেয়ে যাবি। বাবাও সায় দিয়েছিলেন দাদার কথায়। তাই ঢুকতে হয়েছিল কমার্শিয়াল কলেজে। কিন্তু ধাতে সইল না! তিনমাস না যেতেই দিলাম ছেড়ে। ওটা শিখে ফেললেই তো চাকরি হয়ে যাবে। কিন্তু গান শিখলে তো আর চাকরি হবে না। তাই চাকরির পাশ কাটাতে গানটা নিয়ে খুব মেতে রইলাম।

তখন খুব ঘনঘন যেতে লাগলাম রেডিও স্টেশনে। কাজ চাই। একদিন এখানেই আলাপ হল অজিত চ্যাটার্জীর৩৩ সঙ্গে। হাস্যকৌতুক শিল্পী অজিত চ্যাটার্জী। রেডিওর বাঁধা আর্টিস্ট। খুব জমিয়ে নিয়েছে। সেই অজিত আমার বন্ধু হয়ে গেল। ভীষণ বন্ধুত্ব। দিনে দিনে সেই বন্ধুত্ব বেড়েছে। এখন তো কানায় কানায়। পরিমল, সমরেশ, অজিত আর আমি এখনও যখন গল্প করতে বসি তখন ভুলে যাই আমাদের বয়স। চলে যাই সেই ছেলেবেলাকার আড্ডার দিনগুলোতে। তখন আর একজন ছিল আমাদের আড্ডায়। সে হল সুশীল। সুশীল চক্রবর্তী। ভালো গান গাইত। রেকর্ডও ছিল। গান ছেড়ে দিয়েছে অনেকদিন। আমাদের আড্ডাতেও আসতে পারে না আজকাল। নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত। তবে কোনোদিন আড্ডায় এসে পড়লে আবার জমে যায়।

রেডিওতে তখন তো খুব যাতায়াত শুরু করেছি। একদিন বাণীকুমার ডেকে বললেন, ‘ফিচারে তো গান গাইছিস। তা গানের সুর দিতে পারবি? তাহলে তোকে একটা ফিচার দিয়ে দেখতে পারি।’

আমি তো ওঁর প্রস্তাবটা লুফে নিলাম। বললাম, ‘কেন পারব না বাণীদা। দিয়েই দেখুন না। ঠিক সুর করে দেবো।’

উনি সঙ্গে সঙ্গে একটা ফিচার প্রোগ্রাম আমাকে দিলেন। এবার আর গাইয়ে নয় শুধু, সুরকার। সেদিন থেকে রেডিওর ফিচারে মিউজিক ডাইরেক্টর হয়ে গেলাম।

আমার প্রথম দেওয়া সুর পছন্দ হয়েছিল বাণীকুমারের। যদিও সুর দেবার আগে বেশ ভয়ভয় করছিল। এই তো প্রথম। তবে ভরসা ছিল শুধু রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রসংগীত গাইতাম আর ভাবতাম, কত কথা, কত সুর। কোন বাণীর কী সুর হওয়া উচিত সেটা পেয়েছিলাম ওই রবীন্দ্রনাথের গান থেকে।

রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য শুনেছি বিভোর হয়ে। গেয়েছি প্রাণ ঢেলে। সুরের কম্পোজিসান দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি। আর তখন ভেবেছি কী প্রচণ্ড শক্তিমান সুরকার এই রবীন্দ্রনাথ।

এখনকার সুরকাররা আগে সুর করে তারপর গানের কথা লিখিয়ে নেন। এ কৌশল রবীন্দ্রনাথ অনেক আগেই করে দেখিয়ে দিয়েছেন। আগে পুরো রাগের ওপর গানের সুর করতেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর সেটাকে ভেঙে মিশ্র রাগে সুরকে নামিয়ে আনলেন। সারা পৃথিবীর গানের সুরকে আয়ত্ত করে নতুন সুর সৃষ্টি করলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সুরের আলপনাকে বাংলা গানে ছিটিয়ে দিলেন। হয়ে গেল এক অপূর্ব সৃষ্টি। সর্বযুগের, সর্বকালের সৃষ্টি। এতবড়ো সুরকার আজও জন্মাননি কোনো দেশে। এই বুড়ো পৃথিবীটাকে ইচ্ছে হয় জিজ্ঞাসা করি, বয়েস তো অনেক হল। রবীন্দ্রনাথের মতো এমন সর্বতোমুখী প্রতিভা আর দেখেছে একটা।

আজও যখন রবীন্দ্রনাথের গান করি, কোনো ফাংশানে, তখন শ্রোতাদের কতোটা আনন্দ দিতে পারি জানি না, তবে গেয়ে নিজে অসম্ভব তৃপ্তি পাই।

এই ফাংশানের কথায় নিজের প্রথম জীবনের একটা ফাংশানের কথা মনে পড়ে গেল। তখন আমার গানের লাইনে সবে শৈশব শুরু হয়েছে। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছি। সেই সময় আমার এক বন্ধু এক বড়ো জলসায় গান গাইবার বন্দোবস্ত করে দিলো। বললে, ‘ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে’৩৪ ফাংশান। ছ’টায় শুরু। সোজা চলে আসিস। গান গাইবি।’

তখন সব ফাংশানই ওই ইউনিভার্সিটি ইনসিটটিউট হলে হতো। ছ’টায় শুরু হতো আর দশটার মধ্যে শেষ। একেবারে বাঁধাধরা সময়।

তা ফাংশান পেয়ে আমি তো সকলের আগে গিয়ে হাজির। ছ’টায় ফাংশান, আমি পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে গেছি হলে। তখন প্রায় কেউই আসেন নি। তারপর তো একে একে আর্টিস্টরা আসতে শুরু করলেন। জগন্ময় এলো, ধনঞ্জয় এলো। আরও কতো আর্টিস্ট এলো। সবাই একে একে গান করলেন। কিন্তু আমার আর ডাক পড়ে না। আটটা বাজলো, ন’টা বাজলো, কিন্তু কেউ আর আমার দিকে ফিরে চায় না! আমি আর তখন থাকতে না পেরে কর্মকর্তাদের একজনকে বললাম, ‘দাদা, এইবার আমাকে যদি গাইতে বসান তো ভালো হয়।’

কর্মকর্তা ছেলেটি বললে, ‘হ্যাঁ, দেখছি। এই গানটা হয়ে গেলে আপনাকে ডাকবো।’

কিন্তু আমার ডাক আসার আগেই ঘটে গেল অন্য ব্যাপার। এতক্ষণ যার অপেক্ষায় শ্রোতারা ধৈর্য ধরে ছিল, তিনি এসে উপস্থিত। শ্রোতাদের মধ্যে কলরব শুরু হয়ে গেল, ‘পঙ্কজ মল্লিক এসে গেছেন, পঙ্কজ মল্লিক এসে গেছেন।’

সে এক তুমুল উৎসাহ শ্রোতাদের। যিনি তখন গাইছিলেন তাকে তো এখুনি তুলে দিতে পারলে বাঁচে। লোকের গোলমালে তাঁর গান আর শোনাও যাচ্ছিল না। আরও দু’একটা গাইতেন বোধহয় সেই আর্টিস্ট ভদ্রলোক, কিন্তু বেগতিক দেখে তিনি হারমোনিয়াম মুড়ে ডায়াস থেকে নেমে এলেন।

আমি বুঝলাম আমার দফা গয়া। তবু মরিয়া হয়ে একবার শেষ চেষ্টা করলাম। কর্মকর্তাদের সেই ভদ্রলোককে ডেকে বললাম, ‘দাদা, এইবার আমাকে বসিয়ে দিন। নইলে আর আমার গাওয়া হবে না।’

শুনে সেই ভদ্রলোক আমার দিকে তাচ্ছিল্যের হাসি ছিটিয়ে বললেন, ‘দূর মশাই, আপনার গান এখন কে শুনবে! দেখছেন পঙ্কজ মল্লিক এসে গেছেন। বরং ওঁর গান শুনে বাড়ি যান।’

অগত্যা তাই করতে হল। তবে পঙ্কজ মল্লিককে দেখে আমারও কম আনন্দ হয় নি। আমি ওঁর ভীষণ ভক্ত তখন। ওঁরই অনুকরণে গান করি। আমাকে অনেকে ‘ছোটো পঙ্কজ’ বলে ডাকে। তাই সেই মানুষের গান শুনব সামনে বসে, এ কম সৌভাগ্যের কথা!

পঙ্কজ মল্লিক গান শুরু করলেন। একটা করে গান করেন আর রুমাল দিয়ে মুখ মোছেন। এটা ওঁর বরাবরের অভ্যেস। মুখ মোছার পর রুমালটা পকেটে না রেখে কাঁধে রাখেন। এ সব দেখতেও খুব ভালো লাগছিল। জলসাতে বসে শুধু তো গান শোনা নয়, শিল্পীর সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা। অনেকগুলো গান করলেন পঙ্কজ মল্লিক। ওঁর গান শেষ হল রাত দশটায়। ফাংশানও শেষ। সে ফাংশানে আমার আর গাওয়া হল না। গুটিগুটি ফিরে এলাম বাড়িতে।

বাড়ি ফেরার সময় মনে একটু কষ্ট হচ্ছিল। কত আশা নিয়ে গান গাইতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বসতেই দিলো না। মনের কষ্টটাকে খুব একটা আমল দিলাম না। নিজেকেই নিজে বোঝালাম, শুরুতে সকলেরই এরকম হয়ে থাকে। হয়তো পঙ্কজদার জীবনেও হয়েছে। তার জন্যে পেছিয়ে থাকলে তো চলবে না। এগিয়ে যেতে হবে। নিজের সাধনায় এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই একদিন সিদ্ধিলাভ।

আর তখন তো আমার সাধনার একটা জায়গা নয়। অনেক জায়গায় ঘোরাফেরা করছি। যেখানে গান সেখানে আমি।

সেবার বাণীকুমার আমাকে বললেন, ‘এবার তোকে মহালয়ার প্রোগ্রামে নিচ্ছি। খুব ভালো করে গাইবি কিন্তু!

মহালয়ার প্রোগ্রাম বলে কথা! ভালো করে না গাইলে চলবে কেন? সারাবছর মানুষ অপেক্ষা করে এই মহালয়ার প্রোগ্রাম শুনবে বলে। তখন এই মহালয়ার প্রোগ্রামটা অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই প্রোগ্রাম শুনবে বলে কতো লোক রেডিও কিনে ফেলতো। ভোর হবার আগেই শুরু হতো প্রোগ্রাম।

এখনকার মতো তখন টেপ—এ রেকর্ড করে এলে চলত না। এসব ছিলই না তখন। তখন সশরীরে হাজির হয়ে গাইতে হতো ঠিক সময়ে। আমাদের তো যেতে হতো রাত্তির তিনটের সময়। সে রাত্তিরে আমি আর শুতাম না। যদি ঘুমটা গাঢ় হয়ে যায়, তাহলেই তো গেল। রেডিওর গাড়ি আসতো আমাদের নিয়ে যেতে। পঙ্কজদাকে আগে তুলে, তারপর গাড়িটা আসতো আমাদের বাড়িতে। পঙ্কজদা ওঁর গুরুগম্ভীর গলায় গাড়িতে বসেই ডাকতেন, ‘হেমন্ত।’

আমি তো তৈরি হয়েই বসে আছি। শুধু ওঁর ডাকের অপেক্ষা। সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসতাম দোতলা থেকে। আমাকে তুলে তখন গাড়ি আবার চলতে শুরু করতো।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র৩৫ ছিলেন এই মহালয়া প্রোগ্রামের প্রাণ। এটাকে উনি প্রোগ্রাম বলে মনে করতেন না। মনে করতেন যেন সত্যিই দেবীর বন্দনায় বসে গেছেন। রাত্তিরে গঙ্গাস্নান করে গরদের কাপড় পরে বসতেন বীরেনদা। কণ্ঠে তাঁর কতো দরদ! বাণীকুমারের বাণী, পঙ্কজ মল্লিকের সুর, আর বীরেনদার দেবীবন্দনা। এরই ফাঁকে ফাঁকে আমাদের গান। কয়েকখানা গান গাইতাম আমি এই প্রোগ্রামে। বড়ো ভালো লাগতো গাইতে।

প্রোগ্রামের পর সকলে মিলে বসে জিলিপি, সিঙাড়া খেতাম। একেবারে ঘরোয়া পরিবেশ। এ দিনগুলোকে আর ফিরে পাবো না কোনোদিন।

তখন বেশ কয়েকটা গান শৈলেশদার সুরে রেকর্ড করেছি। গানের বাজারে নামটা তখন লোকের কাছে একটু চেনাচেনা হয়েছে। সেইসময় নিজের সুরে রেকর্ড করার সুযোগ দিলো আমাকে গ্রামাফোন কোম্পানি।

.

২। সমরেশ রায় :— আজীবন অকৃত্রিম বন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আড়ালে নিজেকে রেখে গেলেন এই অত্যন্ত গুণী সঙ্গীতব্যক্তিত্ব। নিয়মিত বেতারশিল্পী ছিলেন। ১৯৪৫ সালে প্রথম রেকর্ড। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে গরীবের মেয়ে ছবিতে সমরেশ রায়ের গাওয়া ‘প্রেম মুরলী বাজে বৃন্দাবনে’ জনপ্রিয় হয়। ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন’ ছবিতেও গেয়েছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত, উচ্চচাঙ্গসঙ্গীত ইত্যাদি ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাঙ্গীতিক গভীরতা ছিল সমরেশবাবুর। ৮০—এর দশকে লং—প্লেইং রেকর্ডে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলি সমরেশ রায়ের প্রশিক্ষণে গেয়েছিলেন কিশোরকুমার। এটিই ছিল কিশোরকুমারের জীবনের শেষ রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড।

৩। রমাকৃষ্ণ মৈত্র :— বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অভিন্নহৃদয় বন্ধু।

৪। সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯—২০০৩) :— এক অসাধারণ কবি। বাংলা কবিতায় এক নতুন যুগের সূচনাকারী। কৃষ্ণনগরে জন্ম। পরে কলকাতায় বাস। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতশিল্পী হয়ে ওঠার একেবারে শুরুতে, মূল অনুপ্রেরণা ও উদ্যোগ ছিল সুভাষবাবুর। বিশিষ্ট কবি—প্রাবন্ধিক বন্ধু সমর সেনের কাছে মার্কসবাদে দীক্ষা। ‘পদাতিক’, ‘একটু পা চালিয়ে ভাই’, ‘যতদূরেই যাই’ ইত্যাদি সহ বেশকিছু পরিচিত কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও, ‘চে গুয়েভারার ডায়রি’ (অনুবাদ), ‘ঢোলগোবিন্দর মনে ছিল এই’, ‘হাংরাস’, ‘আমার বাংলা’ সহ কিছু মনে রাখার মতো গদ্যগ্রন্থের লেখক সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১৯৮১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করেন।

৫। ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন’ :— ১৯২৭ সালের ২৬ অগস্ট কলকাতা বেতারের উদবোধন হয় তখন এর নাম ছিল ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি’। ১৯৩০ সালের ১ এপ্রিল ভারত সরকার অধিগ্রহণ করার পর নাম বদলে হয় ‘ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস’। ১৯৩৬ সালে ৮ জুন থেকে নাম বদলে হয় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’ (AIR)। ১৯৫৭ সালের ১ এপ্রিল অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর অন্যতম নাম রাখা হয় ‘আকাশবাণী’।

৬। স্টেপেলটন সাহেব :— কলকাতা বেতার প্রতিষ্ঠানের আদিযুগে ১৯৩০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত প্রায় একযুগ ধরে STATlON DlRECTOR-এর দায়িত্ব সামলান। বেশকিছু গুণী বাঙালি ব্যক্তিত্বদের নিয়ে তিনি বেতারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, এক প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন। স্টেপেলটন সাহেবের আমলেই কলকাতা বেতার শক্ত ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড়ায়। প্রতিমাসে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বেতারের ভালোমন্দ নিয়ে বেতারে বক্তব্য পেশ করতেন স্টেপেলটন সাহেব।

৭। ১ নং গারস্টিন প্লেস :— ১৯২৭ সালের ২৬ অগস্ট, ব্যাঙ্কশাল কোর্টের (তখন বলা হতো ‘ছোটো আদালত’) উল্টোদিকের রাস্তার শেষের দিকের এই বাড়ীতেই কলকাতা বেতার—সম্প্রচারের কাজ শুরু হয়। পরে, ১৯৫৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইডেন গার্ডেন্সের নিজস্ব ‘আকাশবাণী ভবন’—এ উঠে যায় বেতার—প্রতিষ্ঠানের অফিস।

৮। মি. বি. কে. নন্দী:— সেই সময়ে কলকাতা বেতারের মিউজিক বিভাগের প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ ছিলেন। পরে, STATlON DlRECTOR হন।

৯। গানটি ১৯৩৫ সালে সন্তাোষ সেনগুপ্তর গাওয়া সেনোলা কোম্পানির রেকর্ডে গাওয়া গান। প্রথমলাইনটি ছিল—, ‘আজও পড়ে গো মনে, দুটি কাজল আঁখি / মোরে হেরি তো শুধু লাজে লুকায়ে থাকি …’। লিখেছিলেন নরেশ্বর ভট্টাচার্য ও সুর দিয়েছিলেন শৈলেশ দত্তগুপ্ত। রেকর্ডের অপর পিঠের গানটি ছিল, ‘আজি শাওন ঝরে…’।

১০। সন্তাোষ সেনগুপ্ত (১৯০৯—১৯৮৪) :— বিশিষ্ট সঙ্গীতব্যক্তিত্ব। প্রথম জীবনে আধুনিক, নজরুলগীতি ইত্যাদি গাইলেও, পরে, পুরোপুরিভাবে হয়ে যান রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতের মানুষ। রবীন্দ্রনাথের প্রায় সবকটি গীতিনাট্য সন্তাোষবাবুর পরিচালনায় বিভিন্ন শিল্পীসহযোগে রেকর্ডস্থ হয়। প্রথম, রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডে গাওয়া একটি গান ‘কেন বাজাও কাঁকন…’। সন্তাোষ সেনগুপ্তর গাওয়া ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা…’ গানটি, জনপ্রিয়তার দিক থেকে সর্বকালের অন্যতম সেরা আধুনিক গান বলা যেতে পারে।

১১। কমল দাশগুপ্ত (১৯১২—১৯৭৪) :— এবছর জন্মশতবর্ষে উপনীত হওয়া, সর্বকালের অন্যতম সেরা সুরকার। আধুনিক বাংলা গানের সহজ—সরল মেলোডি—প্রধান চলনের বিষয়ে অন্যতম প্রধান অবদান কমল দাশগুপ্তর। যূথিকা রায়, জগন্ময় মিত্র, সত্য চৌধুরী প্রমুখ আরো শিল্পীর কণ্ঠে কালজয়ী হয়ে আছে, কমলবাবু সুরারোপিত অজস্র গান। ‘শেষ উত্তর’, ‘গরমিল’, ‘যোগাযোগ’, ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’ ইত্যাদি ছাড়াও অনেক ছবি সুরময় হয়ে উঠেছিল কমল দাশগুপ্ত—র সুরস্পর্শে। ছবির জগতে কমল দাশগুপ্ত—র সুরে কানন দেবী, রবীন মজুমদার সহ বেশকিছু শিল্পীর গান অমর হয়ে আছে।

১২। যূথিকা রায় (১৯২০) :— ১৯৩৪ সালে প্রণব রায়ের কথায় ও কমল দাশগুপ্ত—র সুরে ‘আমি ভোরের যূথিকা …’ এবং ‘সাঁঝের তারকা আমি …’ গেয়ে আধুনিক বাংলা গানের নবধারার সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন যূথিকা রায়। সারা ভারত মাতিয়েছিলেন ভজন গান গেয়ে। ‘ঢুলী’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের লিপে গেয়েছিলেন রাজেন সরকারের সুরে, ‘এই যমুনারি তীরে…’ (কথা—প্রণব রায়) ও ‘প্রভুজী জীবন জ্যোত জাগাও …’ (কথা—পন্ডিত ভূষণ)। অজস্র কালজয়ী আধুনিক বাংলা গান কমল দাশগুপ্ত—র সুরে অমর হয়ে আছে যূথিকা রায়ের কণ্ঠে। প্রবাদপ্রতিম এই শিল্পী আজও আমাদের মধ্যে আছেন।

১৩। এই গানটি প্রণব রায়ের কথায় নিজের সুরে ১৯৩৬ সালে রেকর্ডে গেয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত। যূথিকা রায়ের গাওয়া গান এটি নয়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সম্ভবত ঠিক বলেন নি এই বইতে।

১৪। শচীন দেববর্মন (১৯০৬—১৯৭৫) :— অসাধারণ কন্ঠশিল্পী ও অবিস্মরণীয় সুরকার। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান। উস্তাদ বাদল খাঁ, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণচন্দ্র দে, উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, উস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ প্রমুখ দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞদের কাছে বিভিন্ন সময়ে তালিম নেন। নানা প্রথিতযশা সুরকার ও নিজের সুরে অনেক বাংলা গান রেকর্ড করেন। কলকাতায় ও পরে মুম্বই থাকাকালীন বেশকিছু চলচ্চিচত্রে সুরারোপ করেন। শচীন দেবর্বমনের সঙ্গীত পরিচালনার উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটে ১৯৪৪ সালে পাকাপাকিভাবে মুম্বই গিয়ে হিন্দি ছবির জগতে প্রবেশের পর। প্রায় ৮০টি হিন্দি ছবিতে তাঁর করা সুর, তাঁকে এক সম্মানীয় আসন দিয়েছে। লোকসঙ্গীতে অগাধ জ্ঞান ছিল তাঁর। ‘শচীন কর্তা’ নামে বিখ্যাত। এনার পুত্র হলেন প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেববর্মন।

১৫। পঙ্কজ মল্লিক (১৯০৫—১৯৭৮) :— অসামান্য সঙ্গীতব্যক্তিত্ব। বেতার, চলচ্চিত্র জগৎ, আধুনিক গান, সমস্ত ক্ষেত্রে কন্ঠশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন সফলতার সঙ্গে বিচরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের গানকে জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে, মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষ খেয়া’ কবিতা ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে…’ তে সুরারোপ করে কবির অনুমোদন লাভ করেন। বেতারে মহালয়ার ভোরে সম্প্রচারিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’—তে পঙ্কজবাবুর সুরারোপ ও তাঁর পরিচালনায় দীর্ঘদিন সম্প্রচারিত ‘সঙ্গীত শিক্ষার আসর’ ইতিহাস হয়ে আছে।

১৬। সন্তাোষ ঘোষ (১৯২০—১৯৮৫) :— প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক বন্ধু। সংবাদপত্র রিপোর্টিং—এ এক যুগান্তর আনেন। ১৯৪২ সালে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সাব—এডিটর হিসেবে শুরু। এরপর, ১৯৫৮ সালে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’—য় বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে বাংলা সাংবাদিকতায় নূতনত্ব দেন। প্রথম উপন্যাস ‘নানা রঙের দিন’। এছাড়া, ‘কিনু গোয়ালার গলি’, ‘জল দাও’, ‘সময় আমার সময়’ ইত্যাদি উপন্যাস ছাড়াও অনেক ভালো গল্পের রচয়িতা। ১৯৭৩ সালে তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘শেষ নমস্কার—শ্রীচরণেষু মাকে’ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পায়।

১৭। সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় (১৯২১—১৯৯০) : — বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। বি.বি.সি সহ বিদেশে অনেক জায়গায় কাজ করেছেন ও শিখেছেন। জাঁ পল সার্ত্রসহ কয়েকজন প্রখ্যাত বিদেশী সাহিত্যিকের সান্নিধ্যলাভ করেছেন। উপন্যাস—গল্প—প্রবন্ধ লিখেছেন। ‘উদয়শঙ্কর’ নামে এই প্রবাদপ্রতীম নৃত্যশিল্পীকে নিয়ে এনার একটি অসাধারণ বই আছে।

১৮। শৈলেশ দত্তগুপ্ত (১৯০৫—১৯৬৩) :— বিশিষ্ট সুরকার। প্রথম জীবনে মূলত বেতারকে কেন্দ্র করে, কন্ঠশিল্পী হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন। জহুরির চোখে হেমন্ত—র মধ্যে জহর খুঁজে পেয়েছিলেন। এনারই সাহচর্যে ও শিক্ষায় সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। নরেশ্বর ভট্টাচার্যর কথায় শৈলেশবাবুরই সুরে ১৯৩৭ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। অন্যান্য অনেক শিল্পীর বেশকিছু কালজয়ী গানের সঙ্গীত পরিচালক। নজরুল—ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং কয়েকটি কাজী নজরুলের রচনায় অসামান্য সুরারোপ করেছিলেন শৈলেশ দত্তগুপ্ত। যেমন—’আমায় নহে গো …’। ‘মানে না মানা’, ‘দ্বন্দ্ব’ ইত্যাদি সহ কয়েকটি চলচ্চিচত্রেও সুরপ্রদান করেন। রবীন্দ্রনাথের গানেও তাঁর যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি ছিল।

১৯। এই গানটি (‘যদিও দূরে থাকো …’) সন্তাোষ সেনগুপ্ত—র গাওয়া একসময়ের জনপ্রিয় গান। সম্ভবত, শৈলেশ দত্তগুপ্ত—র সুর ছিল গানটি।

২০। নরেশ্বর ভট্টাচার্য :— একসময়ের বিশিষ্ট গীতিকার। ১৯০৮ সালে জন্ম। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রথম রেকর্ডের গানদুটি ছিল এনারই লেখা। এছাড়া, শৈলেশ দত্তগুপ্ত—র গাওয়া, ‘আমার ভাঙা তরী বেয়ে …’ সুপ্রীতি ঘোষের ‘আজো কি যমুনা তীরে …’, শৈল দেবীর, ‘আজিও বুঝিলে না…’ ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া আরো বেশকিছু গানের গীতিকার ছিলেন নরেশ্বর ভট্টাচার্য।

২১। এই গানখানি শৈলেশ দত্তগুপ্ত—র সুরে অজয় ভট্টাচার্যের কথায় গেয়েছিলেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এটি তাঁর দ্বিতীয় রেকর্ড। প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে। অপর পিঠের গানটি ছিল, ‘দেবতা ফিরিয়া চাও …’।

২২। দন্ডমাত্রিক স্বরলিপির পর তুলনামূলকভাবে সহজবোধ্য স্বরলিপি—পদ্ধতি হিসেবে সৃষ্টি হয়েছিল ‘আকার—মাত্রিক’ স্বরলিপি। রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম এইধরনের স্বরলিপি—পদ্ধতির প্রাথমিক খসড়ার কথা ভাবেন। কিন্তু, সদর্থে ‘আকার—মাত্রিক স্বরলিপি’—র আবিস্কর্তা ও যথাযথ রূপদাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘স্বরলিপি—গীতিমালা’ গ্রন্থে এই পদ্ধতিতে শতাধিক গানের স্বরলিপিকরণ করেছিলেন তিনি। আজকে যে প্রচলিত স্বরলিপি দেখা যায়, তা এই আকার—মাত্রিক স্বরলিপি।

২৩। বাণীকুমার (১৯০৭—১৯৭৪) :— আসল নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। বাংলা ও সংস্কৃতে সুপন্ডিত বাণীকুমার বহু অবিস্মরণীয় স্ক্রিপ্ট রচনা, গান লেখায় বিশেষ ক্ষমতার ছাপ রেখেছেন। শ্রীপঞ্চানন তর্করত্ন—র সংস্কৃত অহীমন্ডল থেকে তিনি ‘কাব্যশাস্ত্রী’ উপাধি পান। ‘সংস্কৃত সাধনা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ‘ভারতবর্ষ’ কাগজে লিখতেন। বেতারের মেরুদন্ডস্বরূপ ছিলেন। ‘মহিষাসুরমর্দিনীসহ’ বেতারে সম্প্রচারিত বেশকিছু গীতিনাট্যের রচয়িতা। অনেক গান লিখেছেন এবং ‘গীতিবল্লকী’, ‘স্বরলিপিকা’ (১ম ও ২য়) ইত্যাদি আরো কিছু গ্রন্থের রচয়িতা। এছাড়া, ‘সারনাথ’, ‘বিস্মৃত বৈশালী’ ইত্যাদি বাণীকুমার রচিত আরো কিছু বই।

২৪। যথার্থ উচ্চচারণটি হবে ‘ওডেয়ন’। অস্ট্রেলিয়ার এই কোম্পানীটি এদেশে তাদের শাখা অফিস খুলেছিল।

২৫। এই গানটি প্রণব রায়ের কথায় ও শৈলেশ দত্তগুপ্ত—র সুরে ১৯৪৩ সালে রেকর্ডে গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অপর পিঠে ছিল, ‘আকাশে দুটি তারা…’।

২৬। নিউ থিয়েটার্স :— বীরেন্দ্রনাথ সরকার প্রতিষ্ঠিত বাংলার সর্ববৃহৎ ফিল্ম নির্মাতা সংস্থা। চলচ্চিচত্রজগত ও সঙ্গীতদুনিয়ার তৎকালীন প্রায় সমস্ত দিকপালরা জড়ো হয়েছিলেন এই প্রতিষ্ঠানে। বিদেশ থেকে সিভিল ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে, দেশে এসে ফিল্ম—প্রতিষ্ঠানটি খুললেন বীরেন সরকার। সময়টা ১৯৩০ সাল। ‘চোরকাঁটা’ ও ‘চাষার মেয়ে’ নামে দুটি নির্বাক ছবির পর ১৯৩১ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুক্তি পায় নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত প্রথম সবাক বাংলা ছবি ‘দেনা পাওনা।’ এরপর, কয়েকদশকজুড়ে, বাংলা—হিন্দি ছবির জগতে ‘হাতী’ মার্কা চিহ্নের নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত ছবি অবিভক্ত ভারতে রাজত্ব করতো।

২৭। জগন্ময় মিত্র (১৯১৮—২০০৩) :— সুধাকন্ঠ শিল্পী। আধুনিক বাংলা গান, গীত, গজল, ভজন সর্বত্র অবাধ বিচরণ। কেশব মুখোপাধ্যায়, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, দিলীপকুমার রায় প্রমুখ গুণীজনের কাছে সঙ্গীতশিক্ষা করেন। ভীষ্মদেবের সুরে হিন্দি ছবি ‘গরীবী’ তে প্রথম নেপথ্য কন্ঠদান। এরপর, বাংলা গানের জগতে যুগের প্রতীক হয়ে ওঠেন। কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্তসহ আরো কিছু সঙ্গীত পরিচালকের সুরে কালজয়ী গান গেয়েছেন। ‘চিঠি’, ‘সাতটি বছর আগে ও পরে’, ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়…’, ‘তুমি কি এখন দেখিছ…’ ইত্যাদি সহ অজস্র জনপ্রিয় গানের শিল্পী জগন্ময় মিত্র। ‘জগমোহন’ নামে হিন্দি গান গাইতেন।

২৮। বেচু দত্ত (১৯১৫—১৯৯১) :— একসময়ের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী। কলকাতায় জন্ম। বাবার অকস্মাৎ মৃত্যুর জন্য ঠাকুমার বাপের বাড়ি বাঁকুড়ার সোনামুখী গিয়ে থাকতে হয়। সেখানে বিষ্ণুপুর ঘরাণার সুরেন্দ্রনাথ চেলের কাছে সঙ্গীতশিক্ষা নেন। এরপর, যাত্রার দল হয়ে স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে যান বেচু দত্ত। কলকাতায় এসে সঙ্গীতাচার্য গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী, যামিনী গঙ্গোপাধ্যায়, বাদল খাঁ ইত্যাদি প্রণম্য সঙ্গীত গুরুর কাছে বিভিন্ন সময়ে তালিম নেন। শৈলেন রায়ের কথায় ও শৈলেশ দত্তগুপ্ত—র সুরে ১৯৩৭ সালে, ‘আমারে রেখেছ সোনার স্বপনে …’ ও ‘উদাসী পথিক শুনেছি তোমার ব্যাকুল বাঁশির কামনা…’ গানদুটি গেয়ে বেচু দত্ত—র রেকর্ড জগতে প্রবেশ। এরপর, বেতার—রেকর্ড—চলচ্চিচত্র মিলিয়ে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গানের গায়ক ছিলেন এই শিল্পী। নজরুলের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁরও বেশকিছু গান রেকর্ড করেন বেচু দত্ত।

২৯। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য (১৯২২—১৯৯২) :— বাংলা গানের জগতে এক যুগের ধারক এই কন্ঠশিল্পী। হাওড়া জেলার বালিতে জন্ম। মা অন্নপূর্ণা দেবী সুন্দর গান গাইতেন। গোকুল নাগ, সত্যেন ঘোষালের কাছে তালিম নেন ধনঞ্জয়। ১৯৪০ সালে, প্রণব রায়ের কথায় ও সুবল দাশগুপ্ত—র সুরে রেকর্ডে গাওয়া তাঁর প্রথম গান ‘যদি ভুলে যাও মোরে..’ অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। এরপর, আধুনিক, ছায়াছবি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেন। ভক্তিগীতির জগতে বিশেষ করে, শ্যামাসঙ্গীতে এক অসাধারণ কন্ঠশিল্পী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন ধনঞ্জয়বাবু। কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ও করেন। প্রবাদপ্রতিম শ্যামাসঙ্গীত শিল্পী অকালপ্রয়াত পান্নালাল ভট্টাচার্য ছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য—র ছোটো ভাই।

৩০। রাইচাঁদ বড়াল (১৯০৩—১৯৮১) :— প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক। তবলা, পিয়ানো ইত্যাদি বাদনে অসম্ভব পারদর্শী ছিলেন। প্রখ্যাত উস্তাদ—শিল্পী লালচাঁদ বড়াল ছিলেন পিতা। তাঁর কাছেই প্রাথমিকভাবে সঙ্গীতশিক্ষা। বিশ্বনাথ রাও, রাধিকা গোস্বামী, মিয়া রমজান খাঁ—দের মতো গুণী সঙ্গীতশিল্পীরা বাড়িতে এসে যখন গাইতেন, তা হৃদয়ে গাঁথা হয়ে যেতো রাইচাঁদবাবুর। পরে, তালিম নেন মজিদ খাঁ (তবলা), মুস্তাক হোসেন খাঁ (গান) ও হাফেজ আলী খাঁ (সরোদ) প্রমুখ দিকপালদের কাছে। জন্মবছর (১৯২৭) থেকেই কলকাতা বেতারে যুক্ত হন। ১৯৩০ সালে নির্বাক ছবি ‘চাষার মেয়ে’তে প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা করেন। এরপর, সবাকযুগের এক অসামান্য সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন। ‘পরিচয়’, ‘সাথী’, ‘সাপুড়ে’ ইত্যাদি রাইচাঁদ সুরারোপিত ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

৩১। বি. এন. সরকার (১৯০১—১৯৮০) :— পুরো নাম বীরেন্দ্রনাথ সরকার। অভিজাত পরিবারের সদস্য। বাবা স্যার নৃপেন্দ্রনাথ সরকার ছিলেন ব্রিটিশ আমলের অবিভক্ত বাংলার অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং পরে ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত ছিলেন ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের ল’ বোর্ডের মেম্বার। বীরেন্দ্রনাথের পিতামহ ছিলেন ‘FlRST Book’—এর রচয়িতা প্রখ্যাত প্যারীচরণ সরকার। প্রেসিডেন্সি থেকে বি. এস. সি ও লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করেন বীরেন্দ্রনাথ। এরপর, দু’ বছর মার্টিন কোম্পানির সঙ্গে সিভিল ইঞ্জিনীয়ার হিসেবে সিনেমা হাউসের নির্মাণের কাজ করতে করতে, নিজে ‘হাউস’ করার স্বপ্ন দেখেন। ১৯৩০ সালে, ‘চিত্রা’ (বর্তমানে ‘মিত্রা’) ও ‘নিউ সিনেমা’ (বর্তমানে অবলুপ্ত) নামে দুটি সিনেমা হাউস এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্র্যাফট’ নামে চিত্র প্রযোজক সংস্থা তৈরি করেন। ১৯৩১ সালে বিখ্যাত ‘নিউ থিয়েটার্স’ স্টুডিয়ো তৈরি করলেন। অচিরেই, এই ‘নিউ থিয়েটার্স’ বাংলা ও হিন্দি ছবি নির্মাণ জগতে সারা ভারতে আলোড়ন তুললো। ‘দেবদাস’, ‘চন্ডীদাস’, ‘মুক্তি’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘উদয়ের পথে’ সহ বেশকিছু কালজয়ী ছবি (বাংলা—হিন্দি) প্রযোজিত হয়, এই সংস্থা থেকে। প্রায় ১৫০টি ছবি উপহার দেয় ‘নিউ থিয়েটার্স’। ১৯৭২ সালে ‘দাদসাহেব ফালকে’ ও ‘পদ্মভূষণ’ লাভ করেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার।

৩২। উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ (১৮৮১—১৯৫০) :— ভারতীয় উচ্চচাঙ্গসংগীতজগতের এক জ্যোতিষ্কস্বরূপ কণ্ঠশিল্পী। লক্ষ্নৌ ঘরানার এই গুণী খেয়াল—সম্রাটকে মহীশূরের মহারাজা, ‘আফতাব—এ—মৌসিকী’ (‘সঙ্গীতের ভাস্কর’) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তৎকালীন বাংলার অনেক গুণী উচ্চচাঙ্গসংগীতশিল্পী এনার শিষ্য ছিলেন। শ্রদ্ধেয় অমিয়নাথ সান্যাল এনার সম্বন্ধে লিখেছিলেন, ‘খেয়ালের অপূর্ব ভঙ্গীর মধ্যে তিনি মাত্র লীলাচ্ছলে যে ঠোক আর লঢ়ীর তানের বিচিত্র সিলসিলা (শৃঙ্খল) দিয়ে রাগকে কবলিত করে নিয়ে আমাদের সামনে পরিবেশন করে গিয়েছেন, সে কথা ভুলতে পারিনে।’ রেকর্ডেও বেশকিছু গান গেয়েছিলেন উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ।

৩৩। অজিত চ্যাটার্জী (১৯২১—১৯৯৩) :— অসামান্য হাস্যকৌতুকাভিনেতা। প্রতিভা অনুযায়ী এই অভিনেতার যথাযথ মূল্যায়ণ হয়নি। অজিত চট্ট্যোপাধ্যায়, জহর রায় ও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কৌতুক অভিনয়ে এক নতুন ধারা এনেছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অভিন্নহৃদয় বন্ধু। কখনও দুজনে কাছ ছাড়া হননি। ‘প্রিয়তমা’, ‘চাটুজ্যে—বাঁড়ুজ্যে’, ‘মিস. প্রিয়ংবদা’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘লুকোচুরি’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘হংসরাজ’ সহ অজস্র ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। ১৯৫৪ সালের ২ অক্টোবর ‘উল্কা’ নাটকে ‘লিংফু’—র ভূমিকায় প্রথম মঞ্চাবতরণ। এরপর, ‘শতবর্ষ আগে’, ‘কবি’, ‘মায়ামৃগ’, ‘এক পেয়ালা কফি’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ ইত্যাদি আরো অনেক নাটকে দেখা গেছে অজিতবাবুকে। শেষ মঞ্চাভিনয় ‘জয় মা কালী বোর্ডিং’ নাটকে। বেতারের আদিযুগে সেই ৩০—এর দশকেই ‘মাস্টার অজিত’ নামে কিশোর অবস্থায় অনুষ্ঠান শুরু করেন। কিন্তু, মতান্তরের কারণে, কোনোদিন দূরদর্শনের কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেন নি অজিত চট্টোপাধ্যায়।

৩৪। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট :— শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রেক্ষাগৃহটি গোলদিঘি তথা কলেজ স্কোয়ারের পাশে বর্তমান বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রীট—এর উপর দন্ডায়মান। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ, শিশিরকুমার থেকে শুরু করে, শিল্প—সাহিত্য—সংস্কৃতিজগতের হেন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব নেই, যার পদার্পণ এই প্রেক্ষাগৃহে পড়েনি। মাঝে ৭০—এর দশকে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে সাংঘাতিক ক্ষতিগ্রস্ত হবার পর, আবার নতুন ভাবে নির্মিত হয় এই ইনসিটিউটের অনেকখানি।

৩৫। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (১৯০৫—১৯৯১):— এক বহুমুখী প্রতিভা। নাটক—সঙ্গীত—আবৃত্তি—কৌতুকরস— সাহিত্য—সর্বত্র অনায়াসে বিচরণ করেছেন। কলকাতা বেতারের আদিযুগে যুক্ত হয়ে, একে তিলে তিলে গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান কারিগর। মহালয়ার ভোরে রেডিও মারফত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’—তে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ—র কন্ঠনির্গত চন্ডীপাঠ ছাড়া ‘বাঙালির দুর্গাপূজা’ সম্পূর্ণ হয় না। ‘বিরূপাক্ষ’ ছদ্মনামে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের রসসাহিত্য ও গ্রামোফোন রেকর্ড ও বেতারে দমফাটা হাসির হাস্যকৌতুক ভোলবার নয়। বেতারের নাট্যবিভাগকে নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। ১৯৩৪ সালে মাঠ থেকে সরাসরি ফুটবলের বাংলা ধারাবিবরণী প্রথমবার দিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *