আনন্দধারা – ১

এখন হাসি পায়।

কিন্তু সেদিন। সেদিন কান্না পেয়েছিল। কিন্তু তবু কাঁদিনি। চোখের কোলে হাত বুলিয়ে দেখেছিলাম। না, একফোঁটা জল নেই। অথচ বুঝতে পারছিলাম ভেতরটা আমার ভিজে ভিজে যাচ্ছে। সমস্ত চোখের জলটা আমার স্নায়ুর গা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার অতি যত্নে পোষা কোমল মনটাকে।

ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। এর পরেই প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে কলেজে ঢোকার বছর। সেটা ছিল আমাদের অফ পিরিয়ড, অর্থাৎ যাকে বলে বিরতি—ঘণ্টা। সবাই হৈ চৈ করছে—কেউ কেউ গান করছে কোরাসে। আমিও গাইছিলাম। হঠাৎ রুদ্রমূর্তি নিয়ে ক্লাশে ঢুকলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই। সেদিন হেডমাস্টারমশাই আসেননি। সমস্ত ক্লাস স্তব্ধ হয়ে গেল। উনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কারা গান করছিল’? খানিকক্ষণ সব চুপ। আমি ধীরে ধীরে দাঁড়ালাম, বললাম, ‘আমি স্যার’! এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম আর কেউ দাঁড়াচ্ছে কিনা। না আর সব চুপ, শান্ত হয়ে বসে আছে। উনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে অফিসে এসো।’

গেলাম অফিসে। উনি রেজিস্টার খাতা বার করলেন। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না উনি কী করতে চান। তারপর লাল কালি দিয়ে দুটো কি তিনটে রেজিস্টার খাতায় আমার নামগুলো কাটলেন। বললেন, ‘যাও, এবার গান গেয়ে বেড়াও। স্কুল থেকে তোমায় তাড়িয়ে দেওয়া হল।’

আমি অফিস থেকে বাইরে এলাম। ক্লাসের বন্ধুরা সব বাইরে দাঁড়িয়ে। সবাই শুনে অবাক। সবাই রাগে গজগজ করছে। আমাদের ক্লাসের দেবকুমার রায় একটু বেপরোয়া ধরনের ছেলে ছিল, (এখন দেবকুমার খুব বড় পুলিস অফিসার) সে সোজা চলে গেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাইয়ের কাছে। দেবকুমার বলল, ‘স্যার, অন্যায় আমরা সবাই করেছি, তাহলে আমাদের সবাইকে তাড়ান। শুধু ওকে শাস্তি দিচ্ছেন কেন?’

উনি বললেন, ‘গেট আউট।’

তারপর বই—খাতা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। সঙ্গে রমা, সুভাষ, শ্যাম সব বন্ধুরা বাড়ি পর্যন্ত এলো। রাস্তায় কারুর সঙ্গে কথা বলতে পারলাম না। শুধু ভাবলাম, যে কথা সবাই বলে তা যে এতো সত্যি তা আগে বুঝতে পারি নি। বলে—মিত্র স্কুল বড়োলোকদের স্কুল, তাদের সব মাপ। আমরা তখন ভীষণ গরিব। হাফ ফি—তে পড়ি। বাবা সাধারণ কেরানি। সত্যিকথা বলায় এত বড়ো শাস্তি! একটা ছেলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিলেন! এ কেমন বিচার? যত বাড়ির কাছে আসতে লাগলাম ততই ভয় এবং কান্না ঠেলে আসতে লাগল। বাড়িতে ঢুকে চুপ করে বসে রইলাম। মা বললেন, ‘কিরে কী হয়েছে? মুখখানা অমন শুকনো কেন?’ মা স্নেহময় হাত পিঠে রাখতেই আর চোখেরজল আটকানো গেল না।

বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্কুল থেকে নাম কাটা গেল কেন?’

সেদিন কোনো কথা লুকোইনি বাবার কাছে। সব বললাম। বাবা শুনে বললেন, ‘মাস্টারমশাই ছিলেন না বলে ক্লাসে বসে গান গাইবে? অন্যায় করেছ। কিন্তু তাই বলে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই এতবড়ো শাস্তি দিলেন! ম্যাট্রিক পরীক্ষার আর মাত্র তিনমাস বাকি।’

আর দাঁড়াননি বাবা। আপিসের কাপড় আর ছাড়া হল না। বেরিয়ে গেলেন।

বাবা গিয়েছিলেন হেডমাস্টারমশাই—এর কাছে। ওঁকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘জানেনই তো আমার অবস্থা। সামান্য মাইনের কেরানি। একটা বছর নষ্ট হলে আমি মারা পড়ব। এ তো ছেলেকে শাস্তি দেওয়া নয় তার বাপের জরিমানা। এবারটা ওকে মাপ করে দিন।’

হেডমাস্টারমশাই সব শুনে সহানু)ভূতি দেখিয়েছিলেন। কিন্তু নিজে কিছু করতে পারেননি। বলেছিলেন, ‘শাস্তিটা তো আমি দিইনি। দিয়েছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই। ওঁকেই বুঝিয়ে বলুন।’

অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই শেষপর্যন্ত শাস্তিটা নাকচ করেছিলেন। কিন্তু তার জন্যে বাবাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছিল। একরকম হাতে পায়ে ধরতে হয়েছিল, তবে ছেড়েছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই। বড় রুক্ষ, বড় কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই। ছেলেদের যদি ছুতোয়নাতায় একটু নাকানিচোবানি না খাওয়ালেন, তো কিসের মাস্টারিগিরি।

বাবা বাড়ি ফিরে যখন মাকে কথাটা জানালেন তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন মা। ঠিক সেই সময় আমার কান্না পাচ্ছিল। তবু কাঁদিনি—কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল ভেতর ভেতর চোখের জলটা যেন গড়িয়ে গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার সারা মনটাকে। মনে হচ্ছিল কেন বাবা আমাকে মারলেন না। নিদেনপক্ষে একটা কড়া ধমক। আমারই জন্যে তো বাবাকে এত ছোটাছুটি করতে হল আপিস থেকে বাড়ি ফিরেই! আমারই জন্যেই তো বাবাকে এত অপমান সইতে হল। অথচ বাবা আমাকে কিচ্ছু বললেন না।

বাবার মনের কাঠামোটাই ছিল অন্য এক ধাঁচের। যে ধাঁচ আর পাঁচজনের সঙ্গে মিলত না। ভয় দেখিয়ে, শাসন করে, লড়াই—এর মাধ্যমে জেতার মানুষ ছিলেন না বাবা। বাবাকে দেখে মনে হতো যেন নৌকোর মাঝি। নদীতে বয়ে চলেছে তাঁর সংসার—নৌকো। উনি একাই হাল ধরছেন, দাঁড় টানছেন, দরকার হলে লগি ঠেলছেন। মাঝে মাঝে গুণও টানতে হচ্ছে। সব একা। ঢেউ—এ, ঝড়ে নৌকো দুলছে। এই বুঝি ডুবে যায় সব। বাবা নির্বিকার। নিজের কাজ করে চলেছেন। বাবা জানতেন ঝড় এক সময় থামবে, ঢেউ মিলিয়ে যাবে। তীরে একদিন তরী গিয়ে পৌঁছবেই। তাই হাল ছাড়লে চলবে না। গ্রামের মানুষ বাবা, তাই কোনো কষ্টকেই আমল দিতেন না কখনও।

আমারও সেই গ্রামে খুব ছোটোবেলাটা কেটেছে। আমাদের গ্রাম হল বড়ুতে। শুদ্ধ ভাষায় বহড়ু। জয়নগর—মজিলপুর—এর পাশের গ্রাম। আমাদের চোদ্দোপুরুষের ভিটে। সেই ভিটেমাটি এখন চাটি হয়ে গেছে। ওখানেই এককালে আমার ঠাকুরদা বাস করতেন। দু—পাশে বাঁশবাগান, মাঝখানে আমাদের বাড়ি।

ঠাকুরদার বাবা ছিলেন টোলের পণ্ডিত। বিদ্যাবাগীশ। বিদ্যাবাগীশ মহামহোপাধ্যায় হরিহর মুখোপাধ্যায়। তাঁর দুই ছেলে হারাধন আর বিশ্বেশ্বর। হারাধন বড়ো। উনিই ছিলেন আমার ঠাকুরদা। খুব দয়া—মায়ার শরীর ছিল আমার ঠাকুরদার। নিজের তেমন কিছু ছিল না তবু তারই মধ্যে পরের বিপদের পারানি যোগাতেন নিজের ঘটিবাটি বেচেও। তাঁরই একমাত্র পুত্র কালিদাস মুখোপাধ্যায়। আমার বাবা। পিতার ঋণ মাথায় নিয়ে সংসার সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বাবা। একা নয়, সঙ্গে আমরা ছিলাম। আমরা বলতে আমরা চার ভাই আর এক বোন। আর যে খুঁটিকে ভরসা করে এগোতে পেরেছিলেন, তিনি হলেন আমার মা। খুব শক্ত খুঁটি। খুঁটি নড়েছে চড়েছে, কিন্তু উপড়ে যায় নি। সে শুধু আমার মা কিরণবালা দেবীর দৃঢ়তায়। সব অবস্থাতেই অটল। কোথা থেকে এ জোর পেতেন মা! বই পড়ে, কবিতা পড়ে? হ্যাঁ, খুব কবিতা পড়তেন মা। লিখতেও পারতেন। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের১ অসংখ্য কবিতা মুখস্থ ছিল মায়ের। সেই সব কবিতা সুর করে বলতে বলতে ঘুম পাড়াতেন আমাদের।

সেইসব কবিতার অনেকগুলো আমারও মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। মার মতো সুর করে বলতাম। খুব ভালো লাগত। এখন মনে হয় আমার গলায় সুরের জন্ম বোধহয় তখন থেকেই। মা যেন শিশুকে ঝিনুকে করে দুধ খাওয়াবার মতো সুর ঢেলে দিয়েছিলেন আমার গলায়।

মায়ের ছিল ঠাকুর দেবতার প্রতি অসীম ভক্তি। আমাদের গৃহদেবতা হলেন বাবা দধিবামন। সেই ঠাকুরঘরটাই যেন মাকে টেনে রাখত সব সময়। মা বলতেন, ‘ভারী জাগ্রত এই বাবা দধিবামন।’

একদিন মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা মা, আপনি যে প্রায়ই বলেন আমার বাবা দধিবামন খুব জাগ্রত, এর কোনো প্রমাণ পেয়েছেন?’

মা বললেন, ‘পেয়েছি বৈকি!’

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী প্রমাণ পেয়েছেন?’

মা প্রমাণ দাখিল করলেন। বললেন, ‘একদিন তোমার ঠাকুরদা হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠে চেঁচিয়ে ডাকলেন আমাকে, ”ও বউমা, বউমা।” আমি ছুটে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ”বাবা আমায় ডাকছেন?”

উনি বললেন, ”হ্যাঁ, এই দ্যাখো দিকিনি, কেমন বিছানা করেছ আজ। আমার সারা গা কুটকুট করছে।”

আমি বললাম, ”আমি তো ভালো করে বিছানা ঝেড়েছি। আর এই তো দেখাই যাচ্ছে বিছানা পরিষ্কার। ও আপনার মনের ভুল। আপনি শুয়ে পড়ুন বাবা।”

উনি বললেন, ”হুঁ, আমার মনের ভুল। এই নিয়ে আমি তিনবার উঠলাম আর শুলাম।” তারপরই হঠাৎ উনি বললেন, ”আচ্ছা, ঠাকুরঘরটা একবার দ্যাখো তো। এই একটু আগে আমি স্বপ্ন দেখছিলুম, বাবা দধিবামন যেন বলছেন, আমি কচুবনে পড়ে আছি। আমার বড্ড গা কুটকুট করছে। তা আমি ভাবলুম আমার গা কুটকুট করছে বলেই বোধহয় দধিবামনের কথা মনে হল। তা তুমি একবার ঠাকুরঘরটা দ্যাখো তো।”

আমি ওঁর কথা শুনে ঠাকুরঘরে গিয়ে দেখি দধিবামন নেই। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল। ছুটলাম আবার ওঁর ঘরে। বললাম, ”বাবা, সর্বনাশ হয়ে গেছে। সিংহাসনে দধিবামন নেই।”

তোমার ঠাকুরদা সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লেন। বললেন, ”চলো, দেখি কচুবনে।”

সেখানেই পাওয়া গেল দধিবামনকে। উনি দধিবামনকে কচুবন থেকে তুলে নিয়ে বললেন, ”চোর বেটা দধিবামনের সোনার পৈতেটা খুলে নিয়ে পালিয়েছে। আর আমার ঠাকুরকে ফেলে দিয়ে গেছে এই কচুবনে। গুখেকোর বেটা পৈতেটা নিলি নিলি, তা ঠাকুরকে ছুঁড়ে ফেলে দিলি বনে? একটু ভয়ডর নেই তোদের?” নিজের মনে গজগজ করতে লাগলেন তোমার ঠাকুরদা।’

এবার আমি মাকে প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা মা, ঠাকুর যদি এতোই জাগ্রত তাহলে সেই ছিঁচকে চোরের এত সাহস হল কী করে? তখনই তো চোরের হাত মুচকে ভেঙে দিতে পারতেন। তা করলেন না কেন বাবা দধিবামন?’

এর উত্তরে মা একটু হেসে বললেন, ‘ঠাকুর দয়াময়। তাঁর লীলা আমরা কি বুঝব! যাকে আমরা চোর ভাবছি সে তো আসলে পেশাদার চোর নয়। অভাবী মানুষ। ঠাকুর নিজের সোনার পৈতেটা দিয়ে ওকে সাহায্য করলেন।’

জবাবে আমি আর কিছু বলতে পারি নি। মা ছিলেন খুব বুদ্ধিমতী। সহজ সরল উদাহরণ দিয়ে কত কথা বুঝিয়ে দিতেন। আর এই বাবা দধিবামন ছিলেন ওঁর প্রাণ।

সেই বাবা দধিবামনকে আমিও ভক্তি করি। এখনও কলকাতায় এলেই ঠাকুরঘরে গিয়ে ওঁকে প্রণাম করে আসি। উনি সত্যিই জাগ্রত এটা আমারও বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস জন্মেছিল আমার ঠাকুমার মৃত্যুদিনে।

মনে আছে সেই দিনটা ছিল রবিবার। বাবা কলকাতা থেকে গ্রামে এসেছেন। আমরা থাকতুম গ্রামে আর বাবার কর্মস্থল কলকাতায়। মাসে একবার করে বাড়ি আসতেন বাবা। তা সেই রবিবার বাড়ি এসেছিলেন বাবা। সেদিনই ঠাকুমার চান্দ্রায়ণের ব্যবস্থা হয়েছিল। চান্দ্রায়ণ মানে বেঁচে থেকে শ্রাদ্ধ। তখনকার দিনে এরকম কেউ কেউ করতেন। বয়স হলে, একটু অসুস্থ হয়ে পড়লে অনেকে এই চান্দ্রায়ণের ইচ্ছেটা পূরণ করে নিতেন। ঠাকুমাও তাই করেছিলেন। ওঁর শরীরটা তখন খুব ভালো যাচ্ছিল না। পরে শুনেছিলাম ঠাকুমার নাকি ক্যানসার হয়েছিল।

শ্রাদ্ধের মতো চান্দ্রায়ণে লোকও খাওয়াতে হয়। সে ব্যবস্থাও করেছিলেন বাবা। চান্দ্রায়ণ শেষ হয়েছে, লোকেদেরও খাওয়া চুকেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। এমন সময় ঠাকুমা বাবাকে বললেন, ‘কালিদাস আমাকে গঙ্গায় নিয়ে চল।’

বাবা তো শুনে মুষড়ে পড়লেন। বললেন, ‘সে কী মা! গঙ্গায় কেন? শরীরটা কি খুব খারাপ লাগছে?’

ঠাকুমা উত্তরে বললেন, ‘গঙ্গায় না নিয়ে গেলে আমার সজ্ঞানে গঙ্গালাভ হবে কি করে? তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা কর।’

বাবা তো জানেন গঙ্গায় নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কতটা। ওখানে একবার নিয়ে গেলে আর তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা যাবে না। মা যদি আবার সুস্থ হয়ে ওঠেন তো গঙ্গার ধারেই একটা চালা তুলে জীবনের বাকী দিনগুলো কাটিয়ে দিতে হবে। এটাই ছিল নিয়ম। চান্দ্রায়ণের ব্যাপারটাও অনেকটা এইরকম। তবে তাতে বারো বছর সময় পাওয়া যায়। চান্দ্রায়ণের পর বারো বছর ঘরে থাকতে পারবেন। কিন্তু বারো বছর বেঁচে থাকলে জীবনের শেষদিনগুলো গঙ্গার ধারেই কাটাতে হবে।

বাবা কবিরাজমশাইকে ডেকে আনলেন। তখনকার দিনে কবিরাজদের নাড়িজ্ঞান ছিল অসাধারণ। ঠাকুমার নাড়ি টিপে বসে রইলেন কবিরাজমশাই প্রায় মিনিট পাঁচেক। তারপর বাবার দিকে মুখ তুলে করুণভাবে চাইলেন। এরপর ঠাকুমার হাতটা ছেড়ে সেই হাতটা বাবার কাঁধের ওপর রেখে বললেন, ‘তোমার মা ঠিকই ধরেছেন। ওঁকে গঙ্গায় নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করো।’

কথাটা শুনে বাবা একবার ফুঁপিয়ে উঠলেন। বাবার কান্না দেখে ঠাকুমা শুয়ে শুয়ে বাবাকে একটা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কাঁদিসনি বাবা। এ সময় কাঁদতে নেই। আমি যে স্বর্গে যাচ্ছি।’

তখন আর নষ্ট করবার মতো সময় নেই হাতে। এখুনি গঙ্গায় নিয়ে যেতে হবে ঠাকুমাকে। ঠাকুমা তাড়া মারছেন ক্রমাগত। যেন দেরি হলে ট্রেন ফেল করবেন। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবার জন্যে সেকী আকুলিবিকুলি ঠাকুমার!

সজ্ঞানে গঙ্গার দিকে চলেছেন ঠাকুমা। খাটে শুয়ে আছেন তিনি। আর সেই খাটের চারকোণ ধরে ওঁকে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গঙ্গার দিকে। পেছনে আত্মীয়স্বজন, গ্রামের অনেক মানুষজন। কারুর মুখে কথা নেই। সবাই চুপচাপ এগিয়ে চলেছে।

হঠাৎ ঠাকুমার ডাকে সম্বিৎ ফিরল বোবা মিছিলটার। উনি বললেন, ‘এই এই থাম থাম। বাবাঠাকুরতলা পেরিয়ে এলি। শেষ প্রণামটা সারা হল না যে! চল আবার ফিরে।’

আবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হল ঠাকুমাকে বাবাঠাকুরতলায়। শুয়ে শুয়ে শেষ প্রণামটা সারলেন ঠাকুমা। তারপর সবাইকে বললেন, ‘নে, এইবার চল।’

গঙ্গায় পৌঁছে আমাদের সকলকে একে একে কাছে ডাকলেন ঠাকুমা। শেষ ডাক পড়ল বাবার। বাবা তখন কাঁদছেন আর হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছছেন। ঠাকুমার ডাকে খাটের সামনে এসে মাটিতে বসে পড়লেন বাবা। ঠাকুমা বাবার মাথাটা দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু খেলেন।

এবার অন্তর্জলি। অন্তর্জলি মানে আদ্দেকটা শরীর গঙ্গায় আর বাকিটা ডাঙ্গায়। তাই করা হল। ঠাকুমা গঙ্গার জল স্পর্শ করলেন। মাত্র কয়েক মুহূর্ত। তারপরই সব শেষ। ঠাকুমা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কোথায় গেলেন ঠাকুমা? স্বর্গে? তাই তো যাবার আগে বলে গেলেন।

শ্মশানে ঠাকুমার সৎকার করে সবাই বাড়ি ফিরে এলো। আমাদের আগেই বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই শিশু বয়সে প্রথম মৃত্যু দেখলাম। মাকে জিজ্ঞসা করলাম, ‘মা, ঠাকুমা কোথায় গেল?’

—’স্বর্গে।’

—’স্বর্গ কি?’

—’অনেক পুণ্য করলে, ভালো কাজ করলে মানুষ মৃত্যুর পর স্বর্গে যায়।’

—’ভালো কাজ কী মা?’

—’জীবে দয়া, কাউকে দুঃখ না দেওয়া, সৎপথে চলা।’

আরো অনেক কিছু প্রশ্ন মনে এসেছিল। বিশেষ করে স্বর্গ কী, এবং কোথায় তা তখন বুঝতে পারিনি। কিন্তু পরে আমি নিজের বুদ্ধি দিয়ে এইটুকু বুঝেছিলাম যে, এই পৃথিবীই স্বর্গ, আবার এই পৃথিবীই নরক। যে যেমন কাজ করবে তারফল এইখানেই পেতে হবে। মন দিয়ে এইটেই ভেবেছি এবং ফলাফলও দেখেছি। বড়ো হয়ে টলস্টয়ের একটা গল্প পড়েছিলাম—একজন স্বপ্ন দেখলো যীশু বলছেন আগামীকাল আমি তোমার বাড়ি আসব। সে ভোরে উঠে ঘরদোর সাজিয়ে অপেক্ষা করছে কখন ভগবান যীশু আসবেন। এমন সময় একজন বৃদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে এলো—বলল, ‘আমায় একটু জায়গা দেবে? আমার কম্বল পর্যন্ত নেই।’ সে আদর করে তাকে ঘরে বসালো, আগুন জ্বালালো, একটা কম্বলও দিলো। বৃদ্ধ একটু পরে চলে গেল। তারপর একটা শিশু এলো, কয়েকদিন অনাহারে আছে। তাকে খেতে দিলো। শিশুটা চলে গেল। এইভাবে সারাদিন অনেক গরিব দুঃখী এলো গেল কিন্তু যীশু এলেন না। হতাশ হয়ে রাত্রে সে বিছানায় শুলো। কখন ঘুমিয়ে পড়লো জানে না। সেই রাত্রে আবার স্বপ্ন দেখলো, যীশু বলছেন, ‘ওরে পাগল, আজ সারাদিনে তোর কাছে যারা এলো গেল সে তো আমিই।’

সেদিন বাড়ি ফিরে অনেক রাত্তিরে আমার কান্না পাচ্ছিল। আমি কেঁদেছিলাম। ঠাকুমা বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন ঈশ্বর আছেন।

ঠাকুমা যেদিন মারা গেলেন সেদিন বিরাট একটা ছন্দপতন ঘটল আমাদের সংসারে। কিন্তু ঠাকুমা তো সেটা বুঝতে দিলেন না কাউকে। কত সহজ সরলভাবে শেষ করলেন তাঁর জীবনের পর্ব। সুর, তাল, লয় ঠিক রেখে। ঠিক যেন সংগীতের মতো। তাহলে চেষ্টা করলে এই জীবনকেও সুরে বাঁধা যায়। এই কথাটাই আমার মনে বারবার ঘোরাফেরা করেছে, সব জিনিসের মধ্যে একটা সুর আছে। সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, হতাশা এর কোনোটাই সুরের আওতার বাইরে নয়। প্রচণ্ড আনন্দ প্রকাশটা ঠিক সুরে না হলে সেটা মিষ্টি না লেগে তেতো লাগবে। তেমনি দুঃখের কান্নাটাও বীভৎস ঠেকবে যদি না বিলাপটা সুরে সুরেবেরিয়ে আসে। এই সুরকেই সেদিন বোধহয় আমি আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলুম। আজও সেই সুরের সন্ধানে এগিয়ে চলেছি।

ঠাকুমা মারা যাবার পর সংসারের সব দায়দায়িত্ব পড়ল মার ওপর। কতই বা বয়েস তখন মায়ের। সেই বয়েসেই সংসারের খুঁটিনাটি থেকে বিরাট সমস্যারও সমাধান করতে হবে নিজেকেই। অজ পাড়া—গাঁ। সন্ধে হলেই ঝিঁঝিঁর ডাক। আর সারারাত ধরে বাঁশবনের মড়মড় আওয়াজ। তখন এসব অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে মায়ের।

কাশীতে ছিল আমার মামারবাড়ি। ছেলেপিলে হবার সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে লম্বা ছুটি পেতেন মা। প্রায় ছ’মাস আটমাস। ওখানেই আমরা সব ভাইবোন হয়েছি। আমরা চার ভাই আর এক বোন সবাই জন্মেছি কাশীতে। আমি মেজো। আমার দাদা শক্তিদাস, আমার সেজভাই তারাজ্যোতি, আর সবার ছোটো হল অমল। বোন নীলিমা। নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভগ্নীপতির নাম সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

আমার দাদামশাই মানে মায়ের বাবা ছিলেন মস্তবড়ো ডাক্তার। খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন দাদামশায়। শুনেছি উনি নাকি এম. বি. পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। আমার দাদামশাই—এর তিন ভাই—ই ছিলেন কৃতী ছাত্র। আমার দাদামশাই ছিলেন ভাইদের মধ্যে মেজো। ওঁর বড়োভাই কৃষ্ণচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় রুরকী ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ থেকে কারিগরী বিদ্যায় প্রথম স্থান পেয়েছিলেন। এঁদের ছোটোভাই গিরীন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ও ক্যালকাটা কর্পোরেশনে খুব বড়ো কাজ করতেন। এঁদের আদি বাড়ি ছিল ঢাকা—বিক্রমপুর।

আমার দাদামশাই গোবিন্দচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সিভিলসার্জেন। বেনারসে একটা হাসপাতালের ডাক্তার। তা ছাড়া ছিল প্রাইভেট প্র্যাকটিশ। সারাদিন কেবল রুগি দেখে বেড়ান। তখন তো হাতে গোনা ডাক্তার। সারা বেনারস শহরে হয়তো পাশকরা ডাক্তার বলতে, দাদামশাই একা।

আমার দাদামশাই ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী। তখনকার দিনে যানবাহন বলতে হয় ঘোড়ার গাড়ি, নয় ঘোড়া। বেনারসের আশপাশের গ্রামে রুগী দেখতে যেতে হতো ওঁকে, ঘোড়া ছুটিয়ে। সে দিনেই হোক আর রাত্তিরেই হোক উনি সবসময় তৈরি। গভীর রাত্তিরে খাঁ খাঁ করছে রাস্তা। দু’পাশে জঙ্গল। দাদামশাই চলেছেন রুগি দেখতে এক দেহাতি গ্রামে। ভীষণ সাহস।

অথচ এই দাদামশাই—ই একবার সাহসের ব্যাপারে দেউলে হয়ে গিয়েছিলেন। মাত্র একবার, মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্যে। তার জন্যে ওঁর আপশোশের সীমা ছিল না। প্রায়ই বলতেন সে কথা।

এ গল্প আমি শুনেছি আমার মার কাছে। সেদিনের সেই ঘটনাটাকে হয়তো অনেকে বলবেন ভৌতিক। আমিও তাই বলব। তবে যা সত্যি তাকে ভৌতিক বা অলৌকিক আখ্যা দিলেও, ওজন একই থেকে যায়।

ঘটনার দিন দাদামশাই তাঁর রোজকার রুগি দেখা শেষ করে একটা ইজিচেয়ারে বসে বিশ্রাম করছিলেন। তখন রাত এমন কিছু নয়। এই আটটা কি ন’টা। তবে তখনকার দিনে ন’টা রাতই অনেক। ঠিক সেই সময় একটি চোদ্দো—পনেরো বছরের মেয়ে এসে বললে, ‘ডাক্তারবাবু, আমার মার খুব বাড়াবাড়ি অসুখ। আপনি শীগগির একবার চলুন। নইলে মাকে বাঁচানো যাবে না।’

তখন চতুর্দিকে কলেরা হচ্ছিল। দাদামশাই বুঝলেন এ নির্ঘাৎ কলেরা কেস। তাই চটপট তৈরি হয়ে নিলেন দাদামশাই।

বাড়িটা কেমন অন্ধকার অন্ধকার। মেয়েটি বললে, ‘আসুন ডাক্তারবাবু। মা ওপরে।’

সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলেন দাদামশাই। মেয়েটি গেল কোথায়। ঠিক তখুনি সামনের ঘর থেকে এক বৃদ্ধা ডাকলেন, ‘ডাক্তারবাবু, আমাকে দেখুন। আমি মরে যাচ্ছি।’

এ ঘরেও আলো নেই। একটা মোমবাতি শুধু জ্বলছে। রুগির দিকে এগিয়ে গেলেন দাদামশাই। বৃদ্ধা বললেন, ‘ভগবান আপনাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমাকে বাঁচান ডাক্তারবাবু। মুখে এক ফোঁটা জল দেবার লোক নেই বাড়িতে। আমার সাত সাতটা মেয়ে মরে গেছে কলেরায়। পাশের ঘরে পড়ে আছে তাদের লাশ।’

দাদামশাই বললেন, ‘তবে যে একটু আগে আমাকে একটা মেয়ে গিয়ে ডেকে নিয়ে এলো। বললে, আমার মায়ের খুব অসুখ।’

বৃদ্ধা করুণ আর্তনাদ করে বললেন, ‘কোথায় আমার মেয়ে! সব মরে পড়ে আছে পাশের ঘরে। সৎকার করবার লোক নেই। আমাকে বাঁচান ডাক্তারবাবু।’

দাদামশাই বৃদ্ধার কথা ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না। ভাবলেন বোধহয় অসুখের ঘোরে ভুল বকছেন। তাই পাশের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন দাদামশাই। আর সেখানে পৌঁছেই মাথা ঘুরে গেল ওঁর। দেখলেন সাতটা মেয়ের লাশ পড়ে আছে। তার মধ্যে সেই মেয়েটিও রয়েছে, যে তাঁকে একটু আগে গিয়ে ডেকে নিয়ে এলো।

তবে কি এর অশরীরী আত্মা গিয়েছিল! ভাবতেই মাথাটা ঘুরে গেল দাদামশাই—এর। নির্ভীক দাদামশাই—এর ঘাড়ে হঠাৎই যেন একরাশ ভয় এসে জড়ো হল। আর দাঁড়ালেন না দাদামশাই। একরকম ছুটে ছুটে নামতে লাগলেন অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে। বৃদ্ধার করুণ চিৎকার কানে এলো। ক্ষীণকণ্ঠে চেঁচাচ্ছে, ‘ডাক্তারবাবু, যাবেন না। আমি মরে যাবো। আমাকে বাঁচান ডাক্তারবাবু।’

তবু পালিয়ে এলেন দাদামশাই। বাইরে এসে দেখেন ঘোড়ার গাড়ির সহিস অজ্ঞান হয়ে গেছে। তাকে তাড়াতাড়ি গাড়ির মধ্যে শুইয়ে নিজেই ঘোড়ার লাগাম ধরে গাড়ি হাঁকালেন। আর বাড়িতে পৌঁছে দাদামশাই নিজেই প্রায় অজ্ঞান হয়ে শুয়ে পড়লেন বিছানায়।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে কী আফসোস দাদামশাই—এর। বারবার বলতে লাগলেন, ‘আমার ভুলের জন্যে একটা মানুষের প্রাণ চলে গেল। আমি যদি না ভয় পেয়ে পালিয়ে আসতুম তাহলে ওকে বাঁচানো যেত। আমি ডাক্তার হয়ে এ কী করলাম! এ যে খুনেরই সামিল।’

আজকে যখন চিকিৎসাজগতের দিকে তাকিয়ে দেখি তখন বারবার মনে পড়ে যায় দাদামশাই—এর কথা। একটা রুগির জন্যে তিনি চিরকাল আপশোশ করে গেলেন। আর আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত উন্নতি সত্ত্বেও হাজার হাজার রুগি কত অসহায়।

মা আমাদের এ গল্প শুনিয়েছিলেন দেশের বাড়িতে বসে। ভূতের ব্যাপারটায় একটু ভয়—ভয় করেছিল শোনবার সময়। কিন্তু সেই ভয়কে জয় করে ফেলেছিলাম সঙ্গে সঙ্গে। ভয় পেলে তো আমিও দাদামশাই—এর মতো কোথাও না কোথাও ভুল করে ফেলব। তাহলে তো আমি এগোতে পারব না জীবনে। তাই আমি আজও কোনো ব্যাপারে ভয় পাই না। এক এক সময় তৃতীয় ব্যক্তির মতো আমি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি। ভাবি, এত সাহস এ পায় কোথা থেকে? কে একে ভরসা দেয়?

নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিই, আমার ভরসা আমি নিজেই।

ঠাকুমা মারা যাবার পর ঠিক হল আমরা সবাই কলকাতায় গিয়ে থাকব। গিন্নি বলতে তখন বাড়িতে মা একা। ছোটো ছোটো ভাইবোন আমরা ক’জন। আর বুড়ো ঠাকুরদা। তাই বাবা ঠিক করলেন আমাদের কলকাতায় নিয়ে যাবেন।

কলকাতায় এক কাঠা জমিতে দু’খানা ঘরের একটা বাড়ি তৈরি করেছিলেন বাবা। জমিটা পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে পেয়েছিলেন। ওটুকুই। আসল বাড়ির ভাগ পেয়েছিল বাবার অন্য শরিক। তাই বাবাকে টাকা ধার করে অনেক কষ্টে তৈরি করতে হয়েছিল বাড়িটা।

কলকাতায় যাবো শুনে মনে মনে খুব আনন্দ হল প্রথমে। কিন্তু তারপরই মনটা খারাপ হয়ে গেল। এই গ্রামের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে মনে। রোজ ভোরে উঠে দাদা আর আমি ঠাকুরের জন্যে ফুল তুলতে যেতাম। গুরুমশাই—এর পাঠশালায় পড়তে যেতাম দু’জনে। কঞ্চির কলমে ভুষোর কালি দিয়ে তালপাতার ওপর লিখতাম। পাঠশালার পড়া শেষ করে গ্রামের হাইস্কুলে ভর্তি হলুম যখন, তখন সে কী উৎসাহ! এখানকার প্রতিটি গাছপালা, নদীনালা, মাঠঘাট মনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। ভোরের বাতাস, পাখির ডাক, রাতের জোনাকি যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। সব ছেড়ে চলে যেতে হবে।

সেই সময় আমাদের গ্রামে বাস এলো। সেই প্রথম বাস দেখলুম। ট্রেন তখনও আসে নি। সবে রেললাইন পাতা হয়েছে। দু’টো ট্রলি লাইনের ওপর ঘোরাফেরা করছে। সেই ট্রলিতে আমিও একদিন চড়েছি। কিন্তু বরাত খারাপ। ট্রলি থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেলাম লাইনের ওপর। পা ভাঙল।

মনে আছে সুনীলদা সেদিন আমাকে কোলে করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। তখন আমার খুব যন্ত্রণা হচ্ছে পায়ে। ব্যথায় শরীর কুঁকড়ে যাচ্ছে। তাই দেখে সুনীলদা মাকে বললেন, ‘মনে হচ্ছে ফ্র্যাকচার হয়েছে। বাড়িতে তো চিকিৎসা করা যাবে না। একে বরং হাসপাতালে নিয়ে যাই খুড়িমা।’

ঠাকুরদা তখন সন্ধ্যাআহ্নিক সেরে ঠাকুরঘর থেকে বেরোচ্ছেন। হাসপাতালের কথা কানে যেতে বললেন, ‘কোথাও নিয়ে যেতে হবে না। ও আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি।’

এই বলে ঠাকুরদা নিয়ে এলেন হাড়ভাঙা গাছের পাতা। সেই পাতা থেঁতো করে, হুঁকোর জল মিশিয়ে লেপে দিলেন ব্যথার জায়গাটায়। বললেন, ‘এ একেবারে মোক্ষম ওষুধ। আর কিছু করতে হবে না।’

সত্যিই তাই। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি তো অবাক। কোথায় ব্যথা! সব মিলিয়ে গেছে ঠাকুরদার ওষুধে।

.

১। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮—১৯০৩) :— হুগলী জেলার গুলিটা গ্রামে জন্ম। প্রখ্যাত কবি। ১৮৫৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ, ১৮৬১ সালে এল. এল ডিগ্রি ও ১৮৬৬ সালে বি.এল পাশ করেন। ১৮৯০ সালে সরকারী উকিল হন। হেমচন্দ্র ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক কবি। দুই খণ্ডে তাঁর বিখ্যাত কাব্যধর্মী রচনা ‘বৃত্রসংহার’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৫ থেকে ১৮৭৭ জুড়ে। ভূদেব মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘এডুকেশন গেজেট’ পত্রিকায় হেমচন্দ্র—র ‘ভারত সঙ্গীত’ প্রকাশিত হলে, ব্রিটিশ সরকার অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়। ‘ভারতবিলাপ’, ‘কালচক্র’, ‘রিপন উৎসব’, ‘ভারতের নিদ্রাভঙ্গ’, ‘গঙ্গা’, ‘জন্মভূমি’ ইত্যাদি আরো বেশকিছু রচনার মাধ্যমে স্বদেশ প্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দেন হেমচন্দ্র। বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহরোধ আন্দোলনের স্বপক্ষে ‘কুলীন মহিলা বিলাপ’ নামে কবিতা লেখেন হেমচন্দ্র। শেষজীবনে প্রায় দৃষ্টিহীন অবস্থায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাতে হয় এই কবিকে। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরো কিছু রচনার মধ্যে, ‘চিন্তাতরঙ্গিনী’, ‘আশাকানন’, ‘ছায়াময়ী’ (দান্তের ‘দি ডিভাইন কমেডি’—র অনুসরণে রচিত), ‘দশমহাবিদ্যা’, ‘কবিতাবলী’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *