এইসময় তরুণ মজুমদারের১২২ সঙ্গে আলাপ হল।
সালটা বোধহয় ১৯৬২—তরুণ মজুমদার আমার কাছে এলেন ‘পলাতক’ ছবির মিউজিক করবার জন্য। আমি গল্প শুনে বললাম যে, ‘এ তো সবই লোকসংগীত, আমি এ বিষয়ে একটু মাটো আছি।’ উনি কোনো কথা শুনলেন না, বললেন, ‘মাটো কিনা সেটা আমি বুঝব, আপনাকে দিয়ে এ ছবির মিউজিক করাবোই।’ আমি শুধু একটা কথা জিজ্ঞাসা করলাম যে, ‘নতুন গীতিকার নিতে আপত্তি আছে?’ উনি বললেন, ‘একেবারেই না, বরং আমি খুশি হবো।’ বম্বেতে মুকুল দত্ত তখন আমার কাছে প্রায় রোজই আসতো। ওর লেখা গান আমার ভালো লেগেছিল। মুকুলকে দিয়ে গান লেখালাম। তরুণবাবু বম্বে এলেন। সব গান তৈরি হয়ে গেল। ওঁর খুব পছন্দ হল, আর রাজকমল স্টুডিওতে সব গান রেকর্ড হল। শান্তারাম ছিলেন ‘পলাতক’ এর প্রযোজক। সেই ১৯৬২ থেকে তরুণ মজুমদারের সঙ্গে কাজ করছি। এত দীর্ঘদিন বোধহয় কোনো পরিচালক এবং সংগীত পরিচালকের জুটি থাকেনি। তরুণ মজুমদারকে সবাই তনুবাবু বলে। তনুবাবুর মত মানুষ খুব কম দেখেছি। এত নিষ্ঠা, আশ্চর্য লাগে। আর তনুবাবু মিউজিক খুব ভালো বোঝেন। উনি গাইতেও পারেন। কতবার উনি কত গানের সুরের নমুনা দিয়েছেন। আমি সেই সুর ধরে পুরো গানের সুর করেছি। একে বলে টীম—ওয়ার্ক। তাছাড়া আমি বিশ্বাস করি ডাইরেক্টর, যাঁর হাতে নৌকোর হাল, তাঁর মনোমতো গান না দিলে উনি ছবিতে প্রাণ আনবেন কি করে? আমি কখনও ডাইরেক্টরের অবাধ্য হইনি—সে ছোটোই হোক আর বড়োই হোক। ‘পলাতক’ ছবি অসাধারণ জনপ্রিয় হয়েছিল, আর গানও সবাইয়ের ভালো লেগেছিল।
‘বিশ সাল বাদ’ ছবি হিট হওয়াতে বীরেন নাগের খুব নাম হয়ে গেল। যে ছবি দেখে সেই বাহবা দেয় বীরেনবাবুকে। অনেক প্রোডিউসার ঘোরাঘুরি করতে লাগল ওঁর কাছে। ওঁকে দিয়ে অনেকেই তখন ছবি করাতে চাইছে। কিন্তু উনি বাইরের কাজ নিচ্ছেন না, নিলে অনেক টাকা সেইসময় করে নিতে পারতেন। তা না করে উনি নিজেদের প্রোডাকসানের গণ্ডির মধ্যেই পুরোপুরি থাকতে চাইলেন।
তখনও আমাদের প্রোডাকসানের জন্যে নতুন ছবি হয়নি। দেখাশোনা চলছে। আর আমারতো তখন শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। কোমরের ব্যথা আরও বেড়েছে। চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কোনো সুফল পাচ্ছি না। বাইরের ছবিতে মিউজিক দিচ্ছি অনেক কষ্টে। ‘আগুন’ ছবির পুরো কাজটাই তো একরকম শুয়ে শুয়ে করতে হচ্ছে। মনের তখন এমন অবস্থা যে একটু লাগাম আলগা দিলেই বসে পড়তে হবে। কিন্তু তা হতে দিইনি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েও দৌড়েছি।
নিজেদের প্রোডাকসানের কাজ এবার শুরু করতে হবে। গল্প ঠিক হয়ে গেছে। ‘জেন আয়ার’ গল্পটাকেই চিত্ররূপ দেওয়া হবে। বীরেনবাবু বললেন, ‘এবার উত্তমকুমারকে এ ছবির হিরো করুন।’
তাই ঠিক হল। উত্তম রাজি। নায়িকার ভূমিকায় থাকবে ওয়াহিদা।
ওদিকে বিশ্বজিতের তখন বরাত খুলে গেছে। ‘বিশ সাল বাদ’ এর সাফল্য ওকে পর পর ছবি পাইয়ে দিচ্ছে। একটার পর একটা ছবিতে সই করে চলেছে বিশ্বজিৎ।
আমাদেরও শুটিং—এর দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। ছবির নাম দেওয়া হয়েছে ‘শর্মিলী’। প্রথম শ্যুটিং হবে আসানসোলে কয়লার খনিতে। সব বন্দোবস্ত হয়ে গেছে আগেই। উত্তমও শ্যুটিং—এর তারিখ দিয়ে দিয়েছে। এবার কাজ শুরু করলেই হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত উত্তম পিছিয়ে গেল। ‘শর্মিলী’ ছবিতে কাজ করবে না। কারণটা ঠিক স্পষ্ট হল না। হয়তো গল্প কিংবা চিত্রনাট্য পছন্দ হয়নি। তাই বোধহয় করলো না। সবই অনুমানের ওপর ধরে নিতে হল আমাদের।
সেইসময় ওর আচরণে খুবই আঘাত পেয়েছিলাম মনে। কিন্তু আজ ভাবি, আমরা উত্তমের দিকটা একবারও ভেবে দেখিনি। তখন আমাদের স্বার্থের কথাটাই বেশি ভেবেছি। উত্তমের বিচারে চিত্রনাট্য ভালো হয়নি বলেই ও আপত্তি জানিয়েছিল। এটা ঠিকই, নিজের বিচারবুদ্ধিতে ও চলে। লতার সম্বন্ধেও যেমন আগে বলেছি, একটু গলা খারাপ থাকলেই ও রেকর্ডিং বাতিল করে। তার কারণ একটা গান খারাপ বেরোলেই শ্রোতারা বিরূপ মন্তব্য করতে শুরু করবে। উত্তমও ঠিক সেইভাবেই সবকিছু খুঁটিয়ে বিচার করে। একটা ছবিই বা কেন খারাপ হবে। যে উত্তম আজও উত্তম। আমার মতে উত্তম এখন জগতের শ্রেষ্ঠ চিত্রতারকাদের মধ্যে একজন।
কিন্তু আমাদের হল মুশকিল। শেষ মুহূর্তে এইভাবে নায়কের মত পরিবর্তন হলে প্রযোজকের যে কী অবস্থা হয় সে বলে বোঝাবার নয়। এখন কাকে নায়ক করা যায়। অথচ চটপট সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে না পারলে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলবে। একটা প্রোডাকসনের প্রতিদিনের খরচাতো কম নয়। বীরেনবাবু অন্য গল্প ঠিক করলেন—নাম ‘কোহরা’।
শেষ পর্যন্ত আবার গিয়ে ধরতে হল বিশ্বজিৎকে। ওকে বুঝিয়ে বললাম সব। বিশ্বজিৎ আমার অবস্থা দেখে রাজি হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
এ ব্যাপারে বিশ্বজিৎ বেঁকে দাঁড়াতে পারতো। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ও ছিল ‘বিশ সাল বাদ’ ছবির নায়ক। যে ছবি পয়সা দিয়েছে প্রচুর। পরের ছবিতে ওকে বাদ দিয়ে আমরা নিচ্ছিলাম উত্তমকুমারকে।
এখন দায়ে পড়ে ওকে নেওয়াতে ওর মনে করবার অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু ও কিছু মনে করেনি। বড়ো ভালো ছেলে এই বিশ্বজিৎ। আমার সম্মান রক্ষা সেদিন এক কথায় করেছিল বিশ্বজিৎ। আজও করে।
বিশ্বজিৎ—এর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে সেইসময় আমি অনেককে ওর মহৎ গুণের কথা শুনিয়েছি। সেকথা শুনে অনেকে মন্তব্য করেছেন, তা এটুকু আপনার জন্যে করবে না কেন মশাই! আপনিই তো ওকে হিন্দি ছবিতে প্রথম চান্স দিয়েছেন।
এর জবাবে আমি যদি বলি, চান্স তো আমি অনেককেই দিয়েছি। ক’জন মনে রেখেছে সেকথা। ভুলেই গেছে কবে। কিন্তু বিশ্বজিৎ সত্যিই ভোলেনি।
যাইহোক, বিশ্বজিৎকে নিয়ে তো ‘কোহরা’ ছবির কাজ শুরু করে দেওয়া হল। বীরেন নাগ ছবিটাকে উচ্চচমানের করবার জন্যে উঠে পড়ে লাগলেন। তখন বীরেনবাবু ছবিটাকে নিয়ে বিভোর হয়ে আছেন। ভীষণ পরিশ্রম করে চলেছেন।
আমারও সমান উদ্যম রয়েছে মনে। আমিও পরিশ্রম করছি। কিন্তু শরীরটা আমার সঙ্গে বেইমানি করে চলেছে। কিছুতেই আর সোজা হতে দিচ্ছে না।
সেইসময় ডাক্তার ঘোষ আমার চিকিৎসার ভার নিলেন। উনি থাকতেন কোডাইকানালে। বম্বেতে বছরে তিন—চারবার আসতেন ‘নর্থ কোর্ট নার্সিং হোমে’ কিছু রোগীর চিকিৎসা করতে। আমাকে ডাঃ ঘোষ ভর্তি করলেন চিকিৎসার জন্যে। তিন সপ্তাহ রেখে ট্রাকশান এবং ম্যাসাজ করে তখনকার মতো ভালো করলেন আমাকে। কিছুদিন বিশ্রাম নেবার উপদেশ আমাকে দিয়েছিলেন ডাক্তার ঘোষ। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। একে তো আমি বিশ্রাম নেওয়ার পক্ষপাতী নই মোটেই। তার ওপর মাথার ওপর তখন নতুন ছবির দায়িত্ব। ‘কোহরা’ ছবির কাজ তখন এগিয়ে চলেছে। সবাই খুব উৎসাহ নিয়ে খাটছে। আর আমিও সমানে খেটে চলেছি এদের সঙ্গে।
‘কোহরা’ আমাদের প্রোডাকসানের দ্বিতীয় ছবি। প্রথম ছবি হিট হয়েছে। অতএব পুরোনো লোকরাই কাজ করছে এ ছবিতে। আর এইসব পুরোনো লোকরা ‘কোহরা’তে কাজ করছে খুব মাতব্বরি মেজাজ নিয়ে।
এই মাতব্বরি মেজাজটা হয়েছে আগের ছবিটা হিট হয়েছে বলে। এ লাইনের এই নিয়ম। একটা ছবি হিট হলে ইউনিটের প্রত্যেকে ভাবে, তারজন্যেই হিট হয়েছে। অতএব তার কদর সবার থেকে বেশি। কেউ এ কথাটা বলে না, আমাদের সকলের জন্যে ছবিটার সাফল্য হয়েছে। এসব কথা ভাবতে বয়ে গেছে তাদের। তারা নিজেকে নিয়েই মত্ত।
ইউনিটের বয়—বেয়ারাদেরও তখন মাটিতে পা পড়ছে না। খাবার আনতে যাবে দোকান থেকে, তাও ট্যাক্সি করে। ছবি হিট হয়েছে, অতএব হাঁটবে কোন বোকা? এদিকে প্রোডিউসারের পয়সা উড়ে যাচ্ছে, সেদিকে কারুর নজর নেই। যাচ্ছে যাক, আবার পয়সা আসবে।
আরও একটা মজার ব্যাপার তখন ঘটছে স্টডিওতে। বীরেনবাবু যা করছেন তাতেই সবাই বাহবা দিচ্ছে। ওঁর কাজ দেখে আর বেসুরো গাইছে না। অথচ যখন ‘বিশ সাল বাদ’ ছবি তুলছিলেন, তখন সবাই টিপ্পনি কাটছিলো হামেশাই। নিজেদের বিদ্যে জাহির করবার জন্যে সকলেই তখন ভুল ধরছিলেন বীরেনবাবুর। এমন কথাও তখন অনেকেই বলেছিলেন, ‘বীরেনবাবু ছবি করছেন না জলছবি করছেন তা ঠিক বুঝতে পারছি না।’ সেই লোকরাই আবার ‘কোহরা’র কাজ দেখে বীরেনবাবুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
যাইহোক, শেষপর্যন্ত ‘কোহরা’ ছবি শেষ করলেন বীরেনবাবু। হিসেব কষে দেখি আমিও শেষ। ভীষণ খরচ হয়ে গেছে ছবিটার পেছনে। এখন ভরসা—যদি ছবিটা চলে। তখন যাকে দেখাই সেই ‘ভালো’ বলে। কেউ আর তখন খুঁত খুঁজে পায় না ছবিটার। পাবে কি করে? যে লোকের হাতে ‘বিশ সাল বাদ’ সুনাম কিনেছে তার ছবিকে খারাপ বলবে কি করে পাঁচজনে? তাই সিনেমা লাইনের লোকের কাছে ফুলমার্ক পেল ‘কোহরা’। কিন্তু আমার মনে তবু সংশয়। ছবিটার সব ভালো কিন্তু তবু একটা বিরাট ক্রটি রয়ে গেছে গল্প বলার কায়দায়। একটা ধোঁয়াটে ভাব রেখে দিয়েছেন পরিচালক। সেই ধোঁয়াটে ভাবটা কাটানো দরকার। তাই আমি বীরেনবাবুকে বললাম, ‘সবই ঠিক আছে, কিন্তু প্রেতাত্মার ব্যাপারটাকে দর্শকদের কাছে অস্পষ্ট রাখছেন কেন। স্পষ্ট বলে দিন না ওটা প্রেতাত্মা। তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। দেখবেন তাতে ঝরঝরে ছবি হবে।’
কিন্তু বীরেনবাবু আমার কথা মানলেন না। রাজি হলেন না এতোটুকু বদলাতে। উনি যা করেছেন তাই ঠিক মনে করলেন। মনে করবার কারণও ছিল অনেক। ওঁর সহকারীরা উঠতে বসতে সায় দিচ্ছে ওঁর কাজে। বীরেনবাবু যা করছেন তাতেই ওরা বলছে, ‘ওরে বাপরে, কী কাণ্ড করছেন ডাইরেক্টর সাহেব। জবাব নেই।’ এইসব দিনরাত কানের কাছে শুনলে কার না মন পালোয়ান হয়ে ওঠে। সেই অবস্থাই হয়েছিল বীরেনবাবুর। নইলে আমার এই ছোটো অথচ যুক্তিপূর্ণ মতামতটা নিতেন।
ছবি বাজারে বেরোলো। ‘কোহরা’র জন্যে দর্শকরা এতদিন বসে বসে দিন গুনছিল। সেই দিনগোনা শেষ হল। কিন্তু ছবিটা খুশি করতে পারল না দর্শকদের। অথচ বিচার করে দেখলে ছবিটা অপূর্ব। কিন্তু গল্প বলার ত্রুটিটাই ডুবিয়ে দিলো ছবিটাকে।
ছবি উন্নতমানের হয়েছিল সেকথা অবশ্য জ্ঞানী—গুণীরা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তবু দর্শকদেরটানতে পারলো না ‘কোহরা’। এরজন্যে সাধারণ দর্শকদের দোষ দেওয়া যায়না। কারণ এইসব দর্শকরা তো বুদ্ধি দিয়ে ছবির বিচার করেন না। হৃদয় দিয়ে বিচার করেন। এঁদের হৃদয়কে জয় করতে পারলেই, ছবি হিট। ‘কোহরা’ হৃদয়কে জয় করতে পারেনি। তাই মার খেয়ে গেল। আরও একটা বিষয় আমাদের সবসময় মনে রাখতে হয়। সেটা হল আমাদের ভাগ্য। সময় খারাপ হলে ভালো জিনিসও মন্দ হয়ে যায়। যে ‘কোহরা’ সেইসময় দর্শকদের নিরাশ করেছে সেই ‘কোহরা’ এখন যখন কোনো হাউসে দেখানো হয়, তখন ‘হাউস ফুল’ যায়।
‘কোহরা’র পরিণতি দেখে মনে ভীষণ আঘাত পেলেন বীরেন নাগ। এমন যে হবে উনি ভাবতেও পারেন নি। ‘বিশ সাল বাদ’ এর স্রষ্টার দৃঢ় ধারণা ছিল যে, পরের ছবিটাও সমান সমাদর পাবে। কিন্তু তার ধারেকাছেও গেল না।
খুব ভেঙে পড়লেন বীরেনবাবু। আমারও কষ্ট কম হয়নি। আমি এ ছবির প্রযোজক। চিন্তা, ভাবনা, দায়িত্ব সব আমার। এ ছবি মার খাওয়াতে আমি ধনে—প্রাণে মরলুম।
কিন্তু আমার জীবনদর্শন অন্যরকমের। গুদামে আগুন লেগেছে, সব পুড়ে ছাই। তাই বলে বসে বসে কাঁদবো? কাঁদলে আমার গুদাম ভর্তি হবে? যাতে আবার নতুন করে গুদামে মাল ভরা যায় তার চেষ্টা করতে হবে।
আমি জানি জীবনে সুখও যেমন আছে, দুঃখও তেমনি আছে। সুখ দিব্যি এগিয়ে চলেছে, হঠাৎ দুঃখ এসে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এই সুখ—দুঃখ দুটি ভায়ের দাপাদাপি আমাদের ওপর দিয়ে সবসময় বয়ে চলেছে। দুটোকেই ডাইনে বাঁয়ে রেখে আমাদের এগিয়ে চলতে হবে।
মনটাকে ঠিক করবার জন্যে আমি তাই বিদেশ ভ্রমণের একটা খসড়া করে ফেললাম। যাই, ঘুরে আসি কিছুদিন বাইরে থেকে। নুয়েপড়া মনটাকে একটু সোজা করে নিয়ে আসি। বীরেনবাবুকেও বললাম, ‘চলুন না আমাদের সঙ্গে। বাইরে থেকে ঘুরে এলে মনটা হালকা হবে।’
কিন্তু উনি কিছুতেই রাজি হলেন না। শয্যাশায়ী মনটা ওঁকে যেতে দিলো না। বুঝলাম, হেরে যাওয়ার ব্যথাটা ওঁকে মনে—প্রাণে পঙ্গু করে দিয়েছে।
আমি বেরিয়ে পড়লাম। চলে গেলাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
সেখানে কী খাতির! ভাবতেই পারিনি, একজন সামান্য সংগীতশিল্পীর এতো কদর হতে পারে! বিদেশে এমন সমাদর প্রধানমন্ত্রীজাতীয় ব্যক্তিদের বরাতেই জুটে থাকে। সেই সমাদর পেলাম আমি।
বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই শুরু হল আদর—আপ্যায়ন। গাড়ি করে যাচ্ছি, তার ধারাবিবরণী রিলে করে শোনানো হচ্ছে রেডিও শ্রোতাদের। আমার গাড়িকে অনুসরণ করছে প্রায় একশোখানা গাড়ি। সে কী সম্মান! যেন কোনো দেশের রাজা মহারাজা এসেছে। কিন্তু আমিতো রাজা নই। তবে কি এরা সংগীতকে এত ভালোবাসে! আমাকে কি এরা সুরের রাজা বানিয়ে ফেলেছে! তাই হয়তো হবে। নইলে কোথাও তো এ ধরনের সম্মান এর আগে পাইনি। তার অবশ্য একটা কারণ ছিল, কারণ আমিই প্রথম শিল্পী, ভারতবর্ষ থেকে এখানে এলাম।
এতো পেয়ে মন তখন আমার ভরে গেছে। ভুলে গেছি সব। ভুলে গেছি ‘কোহরা’ ছবির শোচনীয় পরিণতির কথা। মনের ক্ষতটাও অনেকখানি ভরাট হয়ে গেছে। ফিরে পেয়েছি আবার সেই খুশি ঝলমলে মনটাকে।
কিন্তু আনন্দকে কি বেশিদিন একলা থাকতে দেয় ওর নিরানন্দ বলে ভাইটা। ও ঠিক ঘুরঘুর করবেই। একটু ফাঁক পেলেই গলা জড়িয়ে ধরবে আনন্দ ভাইয়ের।
তখন আমি হংকং—এ। ওখানেই খবর পেলাম বীরেনবাবুর অসুস্থতার কথা। সেই খবর পেয়েই ফিরে এলাম তাড়াতাড়ি।
কলকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেন বীরেনবাবু। পেটের অপারেশন হবে। অসহ্য যন্ত্রণা। অপারেশন না করে উপায় নেই।
সেই দিনগুলো বড় উৎকণ্ঠায় কেটেছে আমার। এমনিতেই বীরেনবাবুর স্বাস্থ্য বরাবরই খারাপ। নড়বড়ে শরীর। ‘কোহরা’র শোকেও ভেঙে পড়েছেন খুব। তার ওপর আবার নতুন ব্যাধির উৎপাত। সময়টা বড়ো খারাপ।
শেষরক্ষা হল না। মারা গেলেন বীরেনবাবু। রোগের চাপ, ‘কোহরা’র শোক, সব মিলিয়ে শেষ হয়ে গেলেন বীরেনবাবু। ১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসে।
বীরেনবাবুর আকস্মিক মৃত্যু আমার মনের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানলো। বীরেনবাবুর মৃত্যু আমার কাছে যে কতটা মর্মান্তিক তা তিলেতিলে অনুভব করলাম। বড় খাঁটি মানুষ ছিলেন এই বীরেনবাবু। বড়ো ভালো লোক ছিলেন। এমন মানুষকে হারিয়ে নিজেকে বড়ো নিঃসঙ্গ মনে হল। বসে বসে ভাবতাম ওঁরই কথা। এতদিন একসঙ্গে কাজ করছিলাম। এখন একা। কী করব এখন। এইসব চিন্তাই মনকে আচ্ছন্ন করে রাখতো।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের নাম এখন প্রায় সবাই জানে। ক্রিকেট খেলার জন্যে ওরা আজ সারা পৃথিবীর লোকের কাছে পরিচিত। কিন্তু একদিন তা ছিল না। কেউ চিনতনা ওদের। কি করে চিনবে? এখান থেকে প্রায় বারো হাজার মাইল দূরে। ক্যারেবিয়ান সমুদ্রের আশেপাশে কয়েকটা দ্বীপ জুড়ে একটা দেশ। এইসব দ্বীপগুলোর নাম হল, জামাইকা, ত্রিনিদাদ, সুরিনাম ইত্যাদি। এই দ্বীপের অধিবাসীদের পূর্বপুরুষ, ভারতবর্ষ এবং আফ্রিকা থেকেই গিয়েছিল। তারা অবশ্য নিজেরা যায়নি। ওদের ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশরা। সেই সময় বিহারে ১৮৬৪ সালে একটা কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে ভারতবর্ষের কিছু মানুষকে জাহাজে তুলে বলেছিল, মাত্র তিন চারদিনের পথ। খুব ভালো জায়গায় তোমাদের নিয়ে যাচ্ছি। তোফা আরামে থাকবে।
ওদের তো তিনচারদিন বলে তুললো জাহাজে। সেই জাহাজ প্রায় এক বছর ঘুরে এই দ্বীপে এসে পৌঁছোলো। সেইসব মানুষই এই দ্বীপগুলোর প্রথম অধিবাসী। ভারতবর্ষের এবং আফ্রিকার মানুষ। এরা ইংরেজীতে কথা বলে। সুরিনাম—এ ডাচ ভাষাতে কথা বলে। হিন্দিও বলতে পারে অনেকে। এইসব জায়গাগুলো খুব ভালো লেগেছিল আমার। আমার ধুতি—শার্ট ওদের খুব ভালো লেগেছিল। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা আমার কাছে এসে বলতো, ‘তোমাকে একটু ছোঁবো।’
আমি বলতাম, ‘হ্যাঁ, ছোঁও না।’ তারপরই জিজ্ঞাসা করতাম, ‘আমাকে ছুঁতে চাইছ কেন?’
ওরা বলতো, ‘শুনেছি, ভারতবর্ষ আমাদের দেশ। কিন্তু ওখানে তো কোনোদিন যেতে পারবো না। তাই তোমাকে ছুঁলে আমাদের ভারতবর্ষকে ছোঁয়া হবে।’
ভারী ভালো লেগেছিল এদের। কত সরল এদের কথাবার্তা। অল্প সময়ে কত আপন করে নিয়েছিল আমাকে। আজও এদের ভুলতে পারিনি তাই। যে সম্মান, যে আদর—আপ্যায়ন এদের কাছ থেকে পেয়েছি তা ভুলতেও পারবো না কোনোদিন। আমার পরে এখানে আরও অনেক শিল্পী এসেছিলেন। কিন্তু আমার মতো খাতিরযত্ন এঁরা বোধহয় পাননি। ওটা বোধহয় শুধু আমার জন্যেই এরা তুলে রেখেছিল। এ ব্যাপারে সত্যিই আমি অসম্ভব ভাগ্যবান।
নতুন ছবি আর করবই না ঠিক করেছিলাম মনে মনে। হয়তো তাই হতো। কিন্তু ইনকাম ট্যাকসের ঠেলায় আবার ও পথে যেতে হল। ছবি করে তো লাভ হয়েছে একটাই। ঘাড়ে চেপেছে ইনকাম ট্যাকসের বোঝা। সেই বোঝা নামাতে গেলে প্রোডাকশান চালিয়ে যেতে হবে। নইলে রেহাই পাবার আর কোনো রাস্তা নেই।
ইনকাম ট্যাকসের কথা যখন ভাবি তখন মনটা সত্যিই বিষিয়ে ওঠে। লাভের তো চোদ্দো পনেরো আনা টেনে নেয় ইনকাম ট্যাকস। সেই টাকা জমা হয় সরকারি তহবিলে। কিন্তু এইসব টাকা কিসের জন্যে নেয় সরকার! এত টাকা আমাদের কাছ থেকে নেয় আমাদেরই দেশের অভাবী মানুষদের কল্যাণের জন্যে। কিন্তু অভাবী মানুষদের অবস্থা দেখে চোখ ফেটে জল এসে যায়। তারা আজও খেতে পায়না। অথচ আমাদের খাটুনির পয়সাগুলো এদেরই নাম করে, আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
থাক এসব কথা। আবার ছবি শুরু করলাম। এবার তুললাম ‘ফারার’। এ ছবিও তেমন চলল না। কিন্তু এখন আর থামলে চলবে না। তখন জেদও চেপে গেছে আমার। তাই পর পর ছবি করতে লাগলাম। তুললাম ‘বিবি আউর মাকান’, ‘মাজলিদিদি’, ‘খামোশী’। কোনো ছবিই তেমন সুবিধে করতে পারল না। তবে এরমধ্যে ‘খামোশী’ মোটামুটি চলেছিল। ‘খামোশী’র নায়ক ছিল রাজেশ খান্না। ওয়াহিদা নায়িকা। রাজেশ নায়ক হচ্ছে শুনে ওয়াহিদা তখন একটু বেঁকে দাঁড়িয়েছিল। রাজেশ তখন লাইনে একেবারে নতুন। ওয়াহিদার স্থান তখন অনেক ওপরে। তাই ঠিক রাজেশের সঙ্গে অভিনয় করতে চাইছিল না ওয়াহিদা। শেষপর্যন্ত অবশ্য ওয়াহিদাকে রাজি করিয়েছিলাম। আর তারপর সেই রাজেশই কত উঁচুতে উঠে গিয়েছিল। যে ওয়াহিদা একদিন রাজেশের সঙ্গে অভিনয় করতে রাজি হয়নি, তাকে তলায় ফেলে ওপরে উঠে গিয়েছিল রাজেশ। প্রোডিউসারমহলে তখন রাজেশকে নিয়ে কাড়াকাড়ি। এই হয়। কখন কে যে কাকে ফেলে ওপরে উঠে যায়, কেউ বলতে পারেনা।
এবার ঠিক করলাম, আর ছবি করব না। বার বার দৌড়ে জিততে না পারলে শুধু শুধু হাঁপিয়ে কি লাভ। আর টাকার দিক থেকেও লোকসানের অঙ্ক বাড়তে বাড়তে, আমায় প্রায় মাঝদরিয়ায় এনে ফেলেছে। আর এগোলে নির্ঘাৎ ভরাডুবি! তাই কিছুদিনের জন্যে হাত গুটিয়ে বসলাম।
কিন্তু আমার স্বভাব যাবে কোথায়? চুপচাপ তো বসে থাকতে দেবে না। নতুন কাজে নামার জন্যে কেবল খোঁচা মারবে পেছন থেকে। তাই হল।
এবার বাংলা ছবি তোলবার ইচ্ছে হল। ইচ্ছেটা হলো আশাপূর্ণা দেবীর১২৩ একটা গল্প পড়ে। বেশ লাগল। এটাকে ছবি করলে কেমন হয়। মৌসুমীকে১২৪ নায়িকা করলে ভালো মানাবে। সেইসময় মৌসুমী আমাদের বাড়িতে খুব যাতায়াত করছে। তাই ঠিক করলাম সুযোগটা নিয়েই দেখা যাক না।
‘অনিন্দিতা’ ছবি শুরু করলাম। পরিচালক স্বয়ং আমি। সংগীতের দায়িত্ব তো আছেই। দেখাই যাক না চেষ্টা করে। এতদিন প্রযোজক হিসেবে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেটাই এই ছবির পেছনে না হয় উজাড় করে দেবো। তাই করলাম।
এ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’১২৫ গানটা দিয়েছিলাম। গেয়েছিলাম আমি নিজে। রবীন্দ্রনাথের গান হলেও সুর দিয়েছিলেন পঙ্কজদা। উনি এক কথায় অনুমতি দিয়েছিলেন।
পঙ্কজদা ভাগ্যবান লোক। ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ গানের সুর করে রবীন্দ্রনাথকে শুনিয়েছিলেন পঙ্কজদা। রবীন্দ্রনাথের খুব ভালো লেগেছিল সুরটা। তাই ওঁর অনুমোদন অনায়াসেই পেয়েছিলেন পঙ্কজদা। সুখ্যাতিও পেয়েছিলেন। সত্যিকথা বলতে কী, রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার শুরু হয়েছিল পঙ্কজদার মাধ্যমেই। উনিই প্রথম সাধারণ শ্রোতাদের কাছে রবীন্দ্রনাথের গান পৌঁছে দেন রেকর্ড, ফাংশানের মাধ্যমে। আর তারপরই রবীন্দ্রসংগীত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
‘অনিন্দিতা’ ছবি হয়ে গেল। বাজারে ছাড়লাম। কিন্তু মোটামুটি চললেও খুব একটা সুবিধে হল না। তবে আমার প্রথম পরিচালনা হিসেবে দর্শকদের কাছ থেকে প্রশংসা মন্দ পাইনি।
এরপর আবার একটা হিন্দি ছবি করলাম। এ ছবির নাম ‘বিশ সাল পহলে’। এটাও ভালো চলল না।
বুঝলাম, আমার কপালে ছবির সাফল্য নেই। তাই ঠিক করলাম, আর ওপথে নয়। অনেক হয়েছে। এবার থামা দরকার।
এ ব্যাপারে আমার বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি প্রোডাকসানে এসেছিলে কেন?’
কেন এসেছিলাম সে আমিই জানি। নিজেকে সচল রাখবার জন্যে আমাকে নামতে হয়েছিল প্রোডাকসানে। বম্বেতে যখন আমার কাজ কমে গেল, তখনই আমাকে এ পথে পা বাড়াতে হল। তদ্বির করলে কাজ নিশ্চয়ই পেতাম। আমি নিজে গিয়ে চাইলে কেউ আমাকে ফেরাতো না। কাজ দিতোই। কিন্তু তা আমি পারিনি। কেমন কুণ্ঠা হয়েছে। তাই নিজের প্রোডাকসান খুলে গানটাকে বজায় রেখেছিলাম। নইলে যে, আমি লোকের কাছ থেকে দূরে সরে যাবো। দর্শক, শ্রোতাদের সামনে না থাকলে এরা ভুলে যাবে আমাকে। আর একবার ভুলে গেলে আর ফিরে আসা যাবেনা এদের সামনে। তখন চিনতেই পারবে না আমাকে। চিনলেও স্বীকৃতি দেবে না। এ ব্যাপারে দর্শক, শ্রোতারা বড় নির্মম।
কিন্তু প্রোডাকসান করতে গিয়ে আমার আর্থিক অবস্থা যে কতটা নামলো তা বলে বোঝাবার নয়। একেবারে তলানি অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ালো। হয়তো আবার ছবি করে আমার অবস্থা ফিরিয়ে ফেলতে পারতাম। আমি যদি নাম করা নায়ক—নায়িকাদের নিয়ে আবার নতুন করে ছবি শুরু করতাম, তাহলেই আমার অবস্থা ফিরে যেতো এবং সেটাই করে থাকে সাধারণ প্রযোজকরা। তাই একবার তারা মার খেলে পরের ছবিতে টাকাটা তুলে নেয়।
কিন্তু আমার ছবি করার উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকমের। নতুনদের নিয়ে ছবি করব। তাদের নিয়ে আসব দর্শকদের সামনে। নতুন ছবিরও সৃষ্টি হবে। আর সেইসঙ্গে অনেক নতুন শিল্পী জন্ম নেবে। আমারও কাজ হবে, আর সেইসঙ্গে শিল্প আর শিল্পী দুইই সৃষ্টি হবে।
প্রোডাকসান করে আমার লোকসান হয়েছে প্রচুর। কিন্তু লাভও কম হয়নি। টাকা আমার গেছে কিন্তু শ্রম আমার বৃথা যায়নি। যাদের আমি এ লাইনে এনেছিলাম তারা এগিয়ে যেতে পেরেছে। এর মূল্য তো কম নয়। প্রোডাকসান খুলে আমি পিছিয়ে পড়েছি, কিন্তু এগিয়ে দিয়েছি অনেককে। এদের মধ্যে অনেকে উঠে গেছে বেশ ওপরে। এটাই আমার একমাত্র সান্ত্বনা, একমাত্র আনন্দ, একমাত্র গর্ব।
ছবি করে আমি হেরে যাইনি। এটাই আমি ভাবি সবসময়। আর তাই আমি আজও থেমে নেই। এখনও আমি কাজ করে চলেছি। এখনও গান আর সংগীত পরিচালনা নাগাড়ে করে চলেছি। অনেকগুলো রোগ একসঙ্গে আমাকে আক্রমণ করেছে, তবু এদের আমি আমল দিইনি। ডায়বেটিস, অ্যালার্জি, কোমরে ব্যথা সবই আছে। তবু এদের পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে আমি কাজ করে চলেছি। আমার সাধনা আমাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এটাই আমার ওপর ভগবানের পরম আশীর্বাদ।
আজ পর্যন্ত আমি দশখানা ছবির প্রযোজনা করেছি। শেষ ছবি ‘বিশ সাল পহলে’। আগের সব ভালো ভালো ছবিগুলো যখন চলল না, তখন কতকটা রেগে গিয়ে সব নতুনদের নিয়ে এই ছবিটা করলাম এবং এটা আমার প্রথম রঙিন ছবি। সেটাও যখন কিছু হল না, তখন বুঝলাম প্রযোজক হিসেবে সফল হওয়া আমার কপালে নেই। তাই আপাতত প্রোডাকসান বন্ধ করে দিলাম। আমাকে অনেকে বলে, তুমি হিন্দি ছবিতে মিউজিক দিচ্ছো না কেন? কাউকে বোঝাতে পারিনা, কেন দিচ্ছি না। একসময় আমার পেছনে মিউজিক দেবার জন্য লাইন লেগেছিল এবং আমি তখন শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ছিলাম। সুতরাং ওপরতলা দেখা হয়ে গেছে। তারপর, ওপর থেকে নামতে নামতে নীচের তলাও দেখা হয়ে গেছে। হয়তো চেষ্টা করলে কয়েকটা ছবির মিউজিক ডিরেকশন পেতে পারি, কিন্তু মন সায় দেয়না। কারুর দরজায় গিয়ে ধরনা দিতে আর ইচ্ছে করে না। তাছাড়া আমি যত পেয়েছি তার থেকে বেশি আর কি পাবো? যশ, সম্মান এবং সকলের থেকে বড়ো পাওয়া ভালোবাসা— সবাইয়ের ভালোবাসা। আরো যদি কয়েকটা ছবি পাই তাতে কি হবে? হয়তো তারমধ্যে দু’ একটা হিট হবে। জীবনে আট দশটা হিট—এর সঙ্গে আরো দুটো সংখ্যা যোগ হবে, এই তো? নাহয় দুটো সংখ্যা কমই হল? তাতে দুঃখ পাবার কি আছে? সব কিছুরই তো শেষ আছে?
আরো কিছু কথা ভাববার আছে অন্যের ছবিতে মিউজিক দেবার। বক্স অফিস না থাকলে সে ভালো কাজ করলেও কেউ বুঝতে চাইবে না। এ অভিজ্ঞতা আমার বহুবার হয়েছে। দিনকাল পালটে গেছে। এখন সব গ্রুপ সিস্টেম হয়েছে। তাদের সঙ্গে পার্টি করো, তাদের পার্টি দাও অর্থাৎ সবসময় তাদের সঙ্গে লেপটে থাকো। যা আমার পক্ষে একেবারে অসম্ভব। তাছাড়া ভগবানের দয়ায় এবং সকলের আশীর্বাদে যখন আজ পর্যন্ত কখনও কোথাও ধরনা দিতে হয়নি, তখন এই শেষ বয়সে তা করি কেন? ধরনা দিতে হয়নি কেন তা বলি। আগেই বলেছি যে আমি নিজেকে সবসময় অনেকের থেকে কম গুণী ভাবি। আমি কখনই জীবনে ভাবিনি, এটা আমার চাই অথবা আমি বা কম কিসে যে, সব কাজ পাবো না? কিন্তু আমার জীবনে যখনই যে সুযোগ এসেছে তার তখুনি সদ্ব্যবহার করেছি। কাজ সুন্দর করবার, ভালো করবার, আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। সেখানে কোনো ফাঁকি দিইনি।
প্রোডাকসান বন্ধ করবার পর আরেকটা মিউজিক ডাইরেকশনের সুযোগ এলো। হিন্দি ছবি নয়, ইংরেজি ছবি। নাম ‘সিদ্ধার্থ’। প্রোডিউসার—ডিরেক্টর কনরাড রুকস। আমেরিকান প্রোডিউসার। এঁর আগের ছবি ‘চাপাকোয়া’তে রবিশঙ্কর মিউজিক দিয়েছিলেন। এই ছবিটা কীভাবে আমার কাছে এলো তাই বলি। কনরাড রুকস বম্বের সব নামকরা সংগীত—পরিচালকদের সঙ্গে তখন যোগাযোগ করছেন। সিমি এই ছবির নায়িকা মনোনীত হয়েছে। আগেই বলেছি, সিমি আমার গানের খুব ভক্ত। ওর কাছে আমার বহু রেকর্ড আছে। কনরাড যখন ঠিক করতে পারছেনা কাকে মিউজিক ডিরেক্টর নেবেন, তখন সিমি আমার কয়েকটা গান শোনালো কনরাডকে। ‘আনন্দমঠ’ ছবির—’প্রলয় পয়ধি জলে…’। যে গানটা আমি গীতার সঙ্গে গেয়েছিলাম। সেই কম্পোজিশন শুনে তখুনি সিমিকে ফাইনাল বলে দিলো—’একেই আমার চাই।’ ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে কনরাডের সঙ্গে কথা হল এবং এপ্রিল মাসে লন্ডনে গিয়ে রেকর্ডিং করতে হবে ঠিক হয়ে গেল। নতুনত্বের পেছনে আমি সবসময় ছুটি। নতুন অভিজ্ঞতার জন্য নতুন উৎসাহে কাজ শুরু করলাম। অনেকে ভুল করবেন, ‘সিদ্ধার্থ’ গৌতম বুদ্ধের জীবনী। তা কিন্তু নয়। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জার্মান লেখক হেরম্যান হেস—এর লেখা একটা গল্প। গল্পের নায়কের নাম সিদ্ধার্থ। বিষয়বস্তু অবশ্যই হিন্দু দর্শনের ওপর। শান্তি কী? কোথায় শান্তি?
আমি বরাবরই পরিচালক যা চান তাই দেবার চেষ্টা করি। কিন্তু কনরাডকে নিয়ে মহা বিপদে পড়লাম। কনরাড সকালে যেটাকে বলল, ‘ওয়ান্ডারফুল’। আবার বিকেলে সেইটাকেই বলল, ‘রাবিশ’। এসব আমি এডিটিং রুমে বসে এডিটর উইলির সঙ্গে কাজ করতে করতেই লক্ষ্য করলাম। মিউজিক কম্পোজিশন তখনো শুরু করিনি। লন্ডনে ডি লেন লী সাউন্ড স্টুডিওতে আমাদের কাজ হচ্ছিল। ডাবিং যখন হচ্ছে তখন একদিন আর্টিস্ট পাওয়া যায়নি বলে কিছুক্ষণ সময় ছিল। কনরাড আমাকে দিয়ে ওর জন্য একটা হারমোনিয়াম কিনিয়েছিল। হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘এই সিচুয়েশনে তুমি কোনো ইন্ডিয়ান সঙ শোনাতে পারো?’ আমি তখুনি ওকে ‘ও নদীরে’ গানটা শোনালাম, যার ভাবার্থ ওর সিচুয়েশনে খাপ খায়। ও কথার কিছুই মানে জানে না। আশ্চর্য, শুধু সুরটা শুনে বলল, ‘এই গানটাই আমার চাই এবং এটাকেই আমি থিম সঙ করব।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু ভাষাতো কেউ বুঝবে না।’ কনরাড বলল, ‘তাতে কি? আমরা ইংরেজি ছবিতে অনেক সময় পোলিশ, স্প্যানিশ, ইটালিয়ান কত ভাষার গান ব্যবহার করি, তা যখন লোকে শোনে তো এ গানই বা শুনবে না কেন?’ তারপর যখন গানের অর্থটা বললাম তখনতো ও লাফিয়ে উঠল, একদম সিচুয়েশনের সঙ্গে অদ্ভুত মিলে গেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, কাল কী বলে দেখি। হয়তো কাল আবার শুনে বলবে, ‘হোপলেস।’ তা কিন্তু হয়নি। পরের দিনই খালি হারমোনিয়াম এবং একটা গিটারের সঙ্গে গানটা রেকর্ড করা হল। ওখানে দোতারা আর কোথায় পাবো, সেইজন্য গিটারকে দোতারার মতো ব্যবহার করলাম। ওর ছবিতে আরো দুখানা ইংরেজি গান ছিল, তাছাড়া ‘জয় জগদীশ হরে’ ডুয়েট গানটাও ছবিতে রাখবেই বলে ঠিক করেছিল। দুখানা ইংরাজি গান লন্ডনের এক উদীয়মান শিল্পী র্যালফ ম্যাকজেল গেয়েছিল।
লন্ডনে যে ক’জন ভারতীয় যন্ত্রশিল্পী ছিল তাদের নিয়ে কাজ শুরু করলাম। আমি কনরাডকে বুঝেছিলাম, তাই প্রত্যেকটি পিস ছবির সঙ্গে রিহার্সাল করেই এডিটিং ঘর থেকে ওকে ডেকে আনতাম। শেষকালে কনরাড বিরক্ত হয়ে গেল। বলল, ‘আমায় এতো ডিসটার্ব করছ কেন? তুমি মিউজিক ডিরেক্টর ভালোমন্দ বিচার তোমার। তবে হ্যাঁ, আমি মিউজিক—এর থেকেও তোমার গলা বেশি চাই। তোমার গলা দিয়ে যত বেশি পিস করবে, আমি ততো খুশি হব।’ তা কনরাড করেছিল। আমার গলার আওয়াজ সমস্ত ছবিতে প্রায় ব্যবহার করেছে। এপ্রিল মাসে তিন সপ্তাহ ওখানে থেকে মিউজিক শেষ করে বম্বে ফিরলাম।
হঠাৎ দু’মাস পরে সিমির ফোন—’তোমায় আবার যেতে হবে। নিউইয়র্কের একজন খুব বড় ক্রিটিক ছবিটা দেখেছে এবং পরামর্শ দিয়েছে, যে তুমি দুটো ইংরেজি গান বাদ দাও এবং হেমন্তর গলায় আরো দুটো ইন্ডিয়ান গান দাও।’ আবার গেলাম জুলাই মাসে। ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’ গানটা একটা সিচুয়েশনে ফিট হল, কিন্তু অন্য একটা সিচুয়েশনে কনরাড ‘জয় জগদীশ হরে’ গানটা ঢোকাবেই। আমি অনেক বুঝিয়ে ওকে নিরস্ত করলাম। বললাম, ‘এ সিচুয়েশনে ”জয় জগদীশ হরে” গানটা দিলে ইন্ডিয়াতে তোমায় তো পাবেনা, কিন্তু আমায় জুতোপেটা করবে।’ কনরাড আমায় খুব ভালোবেসে ফেলেছিল তাই কথাটা মেনে নিলো। ছবিটা জগতের প্রায় সব জায়গায় রিলিজ হয়ে গেছে। খুবই সমাদর লাভ করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারতে বোধহয় কোনোদিনই রিলিজ হবেনা। তার কারণ সেনসর—এর বেড়া। অবশ্য সম্প্রতি দিল্লি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল—এ প্রথম ছবি দেখানো হয় ‘সিদ্ধার্থ’।
সিদ্ধার্থ তো শেষ হল। এবার কী করি? ভাবলাম এখন কিছুই করব না, শুধু গান গাইব আর দু’ একখানা বাংলা ছবি যা আসে, তারই কাজ করব। তরুণ মজুমদারের ছবিতো আছেই। তাই আবার ‘ফুলেশ্বরী’ ছবির মিউজিক শুরু করলাম। ফুলেশ্বরীর মিউজিক এবং ছবি খুবই জনপ্রিয় হল।
জানিনা ভবিষ্যতে আরো কী করব। তবে বলা যায় না, হঠাৎ হয়তো একটা হিন্দি ছবি আরম্ভ করতে পারি, শুধু মিউজিকের জন্য। আমার ছেলে যখন প্রোডাকসান আরম্ভ করল তখন ও ভেবেছিল আমিই মিউজিক করব। কিন্তু আমি বেঁকে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘প্রথমত আমার হিন্দি বক্স অফিস নেই। অতএব মিউজিকের জন্য ডিস্ট্রিবিউটারের কাছ থেকে ভালো দাম পাবেনা। দ্বিতীয়ত ভগবান না করুন, যদি ছবি না চলে তো সমস্ত দোষটা আমার ঘাড়ে আসবে। সুতরাং আমি মিউজিক করবনা।’
নিজেই গেলাম পঞ্চমের১২৫ (আর. ডি. বর্মণ) কাছে এবং সব খোলাখুলি বলে ওকে ঠিক করে দিলাম। আমি সুর এখনো ভালো করতে পারি কিন্তু হিন্দি ফিল্ম জগতে আমার বক্স অফিস—এর কী মূল্য তা আমার মতো আর কেউ জানে না। এ ব্যাপারে আমি খুবই বাস্তববাদী। মিথ্যা মোহের আবরণে আচ্ছন্ন থাকা আমার চিন্তাধারার বাইরে।
এবার কয়েকটা অন্য কথা বলি। আজ কুড়ি—পঁচিশ বছর ধরে বহু ছেলেমেয়ে আমার কাছে আসে। কেউ ছবিতে নামতে চায়, কেউ গাইয়ে হতে চায়। যে কেউ আসুক, তাদের গান আমি শুনি। তারা একটাই কথা বলে, আপনি ইচ্ছে করলে সবই পারেন। আমি তাদের বোঝাই, কেউ কারুর জন্য কিছু করতে পারেনা। প্রতিভা নিয়ে যারা জন্মায় তাদের ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন হয়, তো তারা নিজের পথ নিজেই করে নিয়ে এগিয়ে যায়। আমার যদি এতোই ক্ষমতা থাকত তো আমার ভাই, বোন, স্ত্রী সবাই এক—একটা বিরাট গাইয়ে হয়ে যেতো। আরেকটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি এবং সবাইকে বলি—দ্যাখো, যারা প্রথম থেকেই ঠিক করে ফেলেছে আমি যেমন করেই হোক বড় গাইয়ে হব, কিংবা বড় নায়ক—নায়িকা হব, তারা বোধহয় কেউ কিছুই হয়নি। তার কারণ আমার যা মনে হয়, বছরের পর বছর চেষ্টা করেও যখন কিছু হল না, তখন তার বয়স অনেক এগিয়ে গেছে। ভালো চাকরি পাবার আশা গেছে, দারুণ অর্থকষ্টে পড়েছে, ফ্রাস্টেইটেড হয়ে গেছে। আর ফ্রাস্টেশন একবার এলে, মস্তিষ্ক কাজ করে না। সুতরাং এগোবার পথ বন্ধ। যদি সময়মতো অন্য কাজকর্মের সঙ্গে শিল্পী হবার চেষ্টা করতো, তো হয়তো একদিন না একদিন তার সুযোগ আসত। সকলের ক্ষেত্রেই একই কথা খাটে। ব্যর্থতা এবং দারিদ্র্য বড় নিদারুণ। তখন বাঁচার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। আমি বড়ো বড়ো মিউজিক ডিরেক্টরদের দেখেছি। এককালে যাদের ভারতজোড়া নাম ছিল, তারা আজকাল যা সুর করেন তা ছেলেমানুষের মতন। আমার মনে হয় নতুনরা এসে যখন তাদের আসনগুলো ছিনিয়ে নিলো, তখন বোধহয় তারা শুধু আসন নিয়েই দিনরাত চিন্তা করছেন, এটা কী করে সম্ভব হল! আমার আসন কতগুলো বাচ্চচা ছেলে কেড়ে নিলো? তখন কিন্তু তাঁরা সুরের কথা চিন্তা করতে ভুলে গিয়েছিলেন। আর তারই ফল ফ্রাস্ট্রেশন। সেইজন্য আমি ঈশ্বরকে সহস্রবার ধন্যবাদ দিই। যখন ‘নাগিন’ ছবির মিউজিক দেশ—বিদেশকে নাড়া দিয়েছিল, তখন আমি বুঝতে পারিনি আমি সর্বশ্রেষ্ঠ মিউজিক ডাইরেক্টর। আমার কতটা নাম হয়েছে। তখন যদি সব বুঝে ফেলতাম এবং তারপর একে একে আমার ছবিগুলো ফ্লপ হতো তাহলে হয়তো আমিও ফ্রাস্ট্রেইটেড হয়ে যেতাম। আমার নিজের ওপর এখনও যথেষ্ট বিশ্বাস আছে। আমি জানি আমি এখনও ভালো সুর করতে পারি, কিন্তু চলা না চলা কতকটা ভাগ্যের হাত। আর আমিতো সারাজীবন ভাগ্যের নৌকার হাল ধরেই আছি।
যখন সাফল্য আসে তখনো ভাগ্যকে মানি, আবার যখন অসাফল্য আসে তখনও ভাগ্যকে মানি। তা বলে কোথাও হাত দেখিয়ে ভবিষ্যৎ জানতে চাইও না, যাইও না। যদি ভবিষ্যৎ জানা যায়, তো জীবনে কোনো আনন্দ নেই, কাজে কোনো উৎসাহ নেই। অজানা বলেই সৃষ্টির আনন্দ। জানা হয়ে গেলে তো শিল্পীর মৃত্যু।
ভাগ্য মানুষের সব কিছু। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সেটা ১৯৩৯ কি ১৯৪০ সাল। জগন্ময় মিত্রের তখন আমার থেকে অনেক বেশি নাম। পাটনা থেকে ডাক এলো আমার আর জগন্ময়ের, একটা ফাংশানে গাইবার জন্য। দুজনে একসঙ্গে ‘পাঞ্জাব মেলে’ যাবো ঠিক হল, আর পরিমলও যাবে। ও তখন আমার সঙ্গে সব জায়গায় তবলা বাজায়। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে, আমার আগেররাত্রে রেডিও প্রোগ্রাম আছে। পাটনা থেকে দুটি ছেলে আমাদের নিতে এসেছিল। তারা তো সমস্যায় পড়ে গেল। আমি সমস্যার সমাধান করে দিলাম। তাদের বললাম যে, ‘আপনারা তো ফার্স্ট ক্লাসের ভাড়া দেবেন, আমি তার ওপর আমার টাকা দিয়ে প্লেনে পরের দিন অর্থাৎ ফাংশানের দিন সকালে পৌঁছে যাবো। আপনারা জগন্ময় এবং পরিমলকে নিয়ে পাঞ্জাব মেলে চলে যান। পাটনায় যাবার ওটাই সব থেকে সুবিধার গাড়ি।’ অজিত গিয়েছিল ওদের স্টেশনে পৌঁছে দিতে। কারণ আগে থেকে রিজার্ভ করা হয়নি। তাই অজিত মুরুব্বির জোরে ওদের ফার্স্ট ক্লাস পাইয়ে দেবে।
আমি গেলাম রেডিওতে গাইতে। অজিত ওদের ছেড়ে দিয়ে অনেক দেরিতে এলো। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সব ঠিক গেছে তো?’ অজিত যা বলল, আমি তো শুনে থ! অনেক চেষ্টা করেও পাঞ্জাব মেলে একখানা ফার্স্ট ক্লাসও ব্যবস্থা করতে পারেনি। পাটনার ছেলে তো কেঁদে ফেলবার অবস্থা। তারপরে অবশ্য আর একটা ট্রেন আছে, যেটা দুপুরের মধ্যে পাটনায় পৌঁছবে। সেটা হল জনতা এক্সপ্রেস। সব থার্ড ক্লাস। ছেলেরা হাতেপায়ে ধরে জগন্ময়কে থার্ড ক্লাস—এ যেতে রাজি করিয়েছে। জগন্ময় খুব রেগে গেছে। প্রায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল।
পরের দিন ভোরে আমি মাকে নিয়ে পাটনা রওনা দিলাম। মা কখনও প্লেনে চড়েননি, এই সুযোগে মাকেও সঙ্গে নিলাম। দু’ঘণ্টার ফ্লাইট—’ডাকোটা প্লেন’। প্লেন পাটনা এয়ারপোর্টে নামল। প্লেন থেকে নেমে দেখি বহু লোক এয়ারপোর্টে এসেছে। মনে মনে ভাবলাম, আমার জন্য কত লোক! তাহলে আমি এখন খুব জনপ্রিয় হয়ে গেছি?
কারণ জগন্ময় যে ট্রেনে আসছে তা পাটনার লোক জানে। প্লেন থেকে নেমে ভেতরে যেতেই ভুল ভেঙে গেল। সবাই জিজ্ঞেস করল, ‘জগন্ময়রা কোন ট্রেনে আসছে?’ সবারই চোখে মুখে অসম্ভব উৎকণ্ঠা! আমি বললাম, ‘জনতায় আসছে।’ আবার সবাই জিজ্ঞেস করল একসঙ্গে, ‘ঠিক জানেন জনতায় আসছে?’ আমি বললাম, ‘ঠিক জানি, ওরা জনতায় আসছে।’
আমার কথা শুনে সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার?’ ওরা বললে, ‘মধুপুরের কাছে পাঞ্জাব মেলের ভয়ংকর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। বহু লোক মারা গেছে।’
এখন বলুন ভাগ্যকে না বিশ্বাস করে পারা যায়? অত শৌখিন, খুঁতখুঁতে জগন্ময় থার্ড ক্লাসে চড়তে নাহলে রাজি হয়?
জগন্ময়রা এসে পৌঁছোলো সন্ধ্যার পর। ভগবানে বিশ্বাস নিয়ে মাকেও একবার এই কথা শুনিয়েছিলাম। আমি যখন প্রায়ই প্লেনে বম্বে—কলকাতা করছি তখন শুনলাম, প্লেন যে সময়ে বম্বে থেকে ওড়ে তখন মা ঠাকুরঘরে ঢোকেন আর ল্যান্ডিং—এর খবর জানা হলে ঠাকুরঘর থেকে বেরোন অর্থাৎ চার—পাঁচ ঘণ্টা ঠাকুরের কাছে আমার নিরাপদে পৌঁছোনোর প্রার্থনা করেন। আমি যেই শুনলাম মাকে বললাম, যে ‘আপনি রোজ পুজো করেও তো ঠাকুরকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। আমার ছেলে আসছে, তাকে দেখো, ব্যাস ফুরিয়ে গেল। আর আমাদের বাবা দধিবামন তো বাড়ির ঠাকুর, জাগ্রত দেবতা। ওঁকে অত খোসামোদ করা কেন? উনিতো নিজের দায়িত্বে আমাদের সব দেখবেন। আর মৃত্যু! সেতো যেদিন আসবার সেদিন আসবেই। মানুষ জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গে তো মৃত্যুর দিন ঠিক হয়ে গেছে। সেটা যেদিন এবং যখন আসবার আসবেই। এক সেকেন্ড পরেও নয়, এক সেকেন্ড আগেও নয়। জগন্ময়দের পাটনা যাওয়ার ঘটনা একবার মনে করুন!
এখনকার মতো আমার কথাটা ফুরোলো। আর কয়েকটি কথা বলে লেখা শেষ করবো।
আমি আগেই বলেছি যে, আমি সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরবিশ্বাসী। আমার কোনো কুসংস্কার নেই। জ্ঞানত কখনও কাউকে দুঃখ দিইনি। হয়তো কখনও কখনও কিছু খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি! সেটা পরিস্থিতির জন্য। যেমন ধরুন আমি হয়তো একটা বিশেষ কাজে যাচ্ছি এবং সব কাজ সময়মতো করা আমার অভ্যাস। সেইসময় কেউ এলেন। ওঁদের ফাংশানে যেতেই হবে। অথবা আমার গান এখনই শুনুন, একটা চান্স করে দিতেই হবে। হয়তো গানের সুর করতে বসেছি এমনসময় তাঁদের সব আবদার নিয়ে এলেন। এইসব ক্ষেত্রে, হয়তো কখনও কখনও রূঢ় হয়েছি। তাঁদের সবাইয়ের কাছে আজ আমি ক্ষমা চাইছি।
মানুষ জন্মালেই একদিন তাকে মরতেই হবে। আগে যেমন বলেছি যে, এই আজও পর্যন্ত প্রায় অর্থাৎ সাঁইত্রিশ বছর ভয়ে ভয়ে কেটেছে। মানুষের মৃত্যুর দিন বিধাতা ঠিক করে রাখেন। সুতরাং আমিও এখন ভাবছি হঠাৎ চলে যেতে হতে পারে। আমি আমার সমস্ত দেশবাসীর কাছ থেকে বিশেষ করে বাংলাদেশের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। সবাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ। এই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমি ধন্য। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি ভালোবাসাই একমাত্র ওষুধ যা মানুষকে আনন্দ দিতে পারে, সুস্থ রাখতে পারে। আমি আমার ছেলেমেয়েকে শাসন করেছি শুধু ভালোবাসা দিয়ে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনোর সঙ্গে নতুনের সংঘর্ষ চিরকালের। আমি নতুনদের মেনে নিয়েছি। মেনে নিতেই হবে।
আমাকে অনেক পত্রিকা থেকে বহুবার প্রশ্ন করা হয়েছে—’আজকালকার সংগীত সম্বন্ধে অর্থাৎ ফিল্মে যে বিদেশি সংগীত পরিবেশন করা হচ্ছে তাতে আপনার কী মত?’ আমি হেসে বলি, ‘আমিও তো আজকের। নাকি পুরোনো বলে ফেলে দিয়েছেন?’ লজ্জিত হয় সব সাংবাদিক। বলে, ‘না না, তা বলছি না।’ আমি বলি, ‘নতুনদের সঙ্গে পুরোনোদের তো সবসময় বিবাদ। আমরা যখন প্রথম সংগীত শুরু করি তখনতো কেবল এই ভাবতে হয়েছে নতুন কিছু দিতে, তা না পারলে পেছিয়ে যাবো আর পেছোতে পেছোতে, হারিয়ে যাবো।
আমি সাংবাদিকদের বা যাঁরা এই প্রশ্ন করেন তাঁদের জিজ্ঞাসা করি, যে সব ছবি বা গানের কথা, বলছেন, সেগুলো সব আপনারা দেখেছেন এবং বহুবার গান শুনেছেন নিশ্চয়। তা নাহলে এত কথা কী করে বলছেন? সেসব চরিত্রগুলোকে যখন বর্জন করতে পারেননি, তার মানে কোথাও কিছু আপনাদের ভালো লেগেছে। তাছাড়া লক্ষ লক্ষ লোক যখন পছন্দ করেছে, নিশ্চয় তার মধ্যে কিছু আনন্দ পেয়েছে। সংগীতের কাজ তো আনন্দ দেওয়া। তা যখন হয়েছে, সে সংগীত সার্থক। আমি নিজেও তাই মনে করি। এ বিষয়ে স্বর্গত ওস্তাদ আমীর খাঁর কথা বার বার মনে পড়ে। উনি আমার গান শুনতে খুব ভালোবাসতেন। ওঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘খাঁ সাহেব, আপনি এইসব আধুনিক গান ভালোবাসেন?’ উনি বলতেন, ‘আধুনিক—ফাধুনিক বুঝিনা। যে সুর লাগাতে জানে, যে গান সুরে ভরিয়ে দেয়, আনন্দ দেয় সেইতো প্রকৃত সংগীত। তুমি দু’ঘণ্টা ধরে কালোয়াতি করলে অথচ সুর লাগল না, হৃদয়কে নাড়া দিলো না, আনন্দ দিলো না, তাকে সংগীত বলি কি করে?’ উনি বম্বেতে থাকতেন সেইজন্য প্রায়ই দেখা হতো! ওঁর সঙ্গে আলাপ হবার পর কেবল ভেবেছি পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর আগে যদি এঁকে পেতাম তো কিছু উচ্চচাঙ্গ সংগীত শেখা যেতো—যার কিছুই আমি শিখতে পারিনি। তার কারণ আগেই বলেছি, সব ওস্তাদরা আগেই শর্ত করতেন, আধুনিক গান ছাড়তে হবে।
নকশাল আন্দোলনের সময় অদ্ভুত জিনিস দেখেছি। আমি সে সময়েও কোথাও গান গাইতে যেতে ভয় পাইনি। তাছাড়া আমি সেইসময় অনেক কিছু শুনতাম। যেমন—ওরা নাকি জোর করে টাকা আদায় করছে, ভয় দেখাচ্ছে। আমার কিন্তু কখনো কারুর সঙ্গে কিছু হয়নি। বরং উলটো হয়েছে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, মনে হল বড্ড ফাঁকা। দিনের বেলা। একটা ছেলে হঠাৎ ঝড়ের মতো এলো। বলল, ‘হেমন্তদা, এখনই চলে যান, আর দাঁড়াবেন না। এখনই শুরু হবে।’ কত নিষ্ঠুর খেলা সেইসময় দেখেছি, আর রাত্রে শুয়ে শুয়ে পাগলের মত ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছি—হে ঈশ্বর, আমার গানে এমন ক্ষমতা দাও যে, এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ হয়ে যাক—এ আর সহ্য করতে পারছিনা। জানি সম্পূর্ণ পাগলামি, তবুও প্রার্থনা করেছি।
আরো অবাক হতাম, যখন এরাই আমায় গানের জলসায় ডাকত এবং সামনে বসে, ‘ওই গানটা’, ‘ওই গানটা’ বলে তাদের প্রিয় গান শুনতে চাইতো। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতাম। এরা এতো গানপাগল অথচ এতো নিষ্ঠুরতা এদের মধ্যে কোথা থেকে আসে? কাদের দোষে আমাদের সোনার ছেলেরা পাথর হচ্ছে? কোনো জবাব খুঁজে পাইনি। সেইজন্য একা একা বসে পাগলের মত ভাবতাম, যদি বিধাতা আমায় এমন ক্ষমতা দেন যে, সংগীতের জোরে এদেরআবার সোনা করা যায়!
আমি আর কতদিন—এ পৃথিবীতে থাকব জানিনা। যদি আরো কয়েক বছর থাকি, তো আরো একটা বই লেখার ইচ্ছা রইল। আমি কখনও কাউকে দুঃখ বা কষ্ট দিতে চাইনি। আমার কোনো সংস্কার নেই। মৃত্যুর পর খাটে করে নিয়ে যাওয়া কষ্টকর। গাড়িতে অনেক সুবিধে। আমার মা মারা যাবার সময় মাথা কামিয়েছিলাম, কিন্তু বাবার সময় কামাতে পারিনি। তার কারণ অ্যালার্জির জন্য সমস্ত মাথা ঘায়ে ভরে গিয়েছিল। কিন্তু তারজন্য বহু লোকের কাছে অনেক বিদ্রূপ এবং কুৎসিত মন্তব্য শুনতে হয়েছিল। আমার মৃত্যুর পর এইসব সংস্কার মানার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। সে যুগে যা সম্ভব ছিল এ যুগে তা সম্ভব নয়। এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কোথায়? আজকে মানুষের দু’বেলা দুমুঠো অন্ন জোটাতে সর্বক্ষণ প্রাণপাত করতে হচ্ছে।
এবার শেষ। আজ সুযোগ পেয়েছি সকলকে কৃতজ্ঞতা জানাবার। যে স্নেহ, যে ভালোবাসা আমি দিয়েছি, সেই স্নেহ—ভালোবাসা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এসেছে আমার কাছে। তারজন্যে আমি তাঁদের সকলের কাছে চিরঋণী। অকপটে স্বীকার করছি, কারুর প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। সারাজীবন দু’ হাতে শুধু আনন্দ কুড়িয়েছি। যদি অজান্তে কারুর প্রতি কোনো অন্যায় করে থাকি, তাদের সকলের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করছি।
এত লিখেও মনে হচ্ছে, আরও কত কী লেখার ছিল। মনে হচ্ছে শেষ হয়েও যেন শেষ হয়নি।
… … … …
‘পুরানো সেইদিনের কথা ভুলবি কিরে হায়—
ও সেই চোখের দেখা প্রাণের কথা সেকি ভোলা যায়।’
—সমাপ্ত—
.
১২২। তরুণ মজুমদার :— বাংলা ছবির জগতে এক প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক। দিলীপ মুখোপাধ্যায়, শচীন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গড়ে তোলেন ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর প্রথম ও শেষ পরিচালিত ছবি যথাক্রমে ‘চাওয়া পাওয়া’ (১৯৫৯) এবং ‘পলাতক’ (১৯৬৩)। এরপর, ‘আলোর পিপাসা’ (১৯৬৫) ছবি থেকে এককভাবে চিত্রপরিচালনা শুরু করেন তরুণ মজুমদার। ‘বালিকা বধূ’ (১৯৬৭), ‘নিমন্ত্রণ’ (১৯৭১), ‘ফুলেশ্বরী’ (১৯৭৪), ‘গণদেবতা’ (১৯৭৯), ‘দাদার কীর্তি’ (১৯৮০) ইত্যাদি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছবির পরিচালক ছিলেন। ‘কুহেলি’ ছবিটি ‘অভিমন্যু’ নামে পরিচালনা করেন। ‘বালিকা বধূ’ (হিন্দি—১৯৭৬), ‘রাহগীর’ (হিন্দি—১৯৬৯), ‘আকুয়া কথা’ (ওড়িয়া—১৯৯৪) ইত্যাদি অন্য ভাষার ছবিসহ দুটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেন তরুণ মজুমদার। ‘পলাতক’ থেকে ‘আগমন’ (১৯৮৮) পরপর ২০টি তরুণ মজুমদার পরিচালিত ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
১২৩। আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯—১৯৯৫) :— বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহিলা—সাহিত্যিক। কোনোদিন ইস্কুল কলেজে পড়েননি। প্রায় আড়াইশো বই লিখেছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডি—লিট। ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘বকুলকথা’ — এই অসামান্য ট্রিলজি উপন্যাস আশাপূর্ণা দেবীকে বাংলা সাহিত্যের এক উচ্চচ আসনে বসিয়ে দিয়েছে। বেশিরভাগ উপন্যাস ও বাদবাকি ছোটোগল্প ও শিশুসাহিত্য লিখেছেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায় কবিতা ও গল্প লেখেন। ১৩৪৩ (১৯৩৬) সালের ‘শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা’—য় আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম বড়োদের জন্য লেখা গল্প প্রকাশিত হয়।
১২৪। মৌসুমী :— প্রখ্যাত চলচ্চিচত্রাভিনেত্রী মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। জন্ম ১৯৫৪ সালে। আসল নাম ইন্দিরা। ১৯৬৭ সালে তরুণ মজুমদারের ‘বালিকা বধূ’ ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় নেমেই বাজিমাত করেন। এরপর, ‘পরিণীতা’, ‘মা ও মেয়ে’, ‘প্রতিবাদ’, ‘অনিন্দিতা’, ‘আনন্দ আশ্রম’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ ইত্যাদি বেশকিছু বাংলা এবং ‘বিবি গুলাম বাদশা’, ‘অনুরাগ’, ‘হামসকল’, ‘কচ্চেচ ধাগে’, ‘মঞ্জিল’ ইত্যাদি অনেক হিন্দি ছবিতে নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। এখনও অভিনয় করে চলেছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পুত্র জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় মৌসুমীর। প্রসঙ্গত মহানায়ক উত্তমকুমার অভিনীত শেষ ছবি ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির অন্যতম মুখ্য অভিনেত্রী ছিলেন মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়।
১২৫। ‘দিনের শেষে ঘুমের শেষে…’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থের ‘শেষ খেয়া’ কবিতার প্রথম লাইন। পুরো কবিতাটিতে অসাধারণ সুরারোপ করেন পঙ্কজকুমার মল্লিক, যা রবীন্দ্রনাথ অনুমোদন করেন। প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ (১৯৩৮) ছবিতে অভিনয়সহ গানটি গেয়েছিলেন পঙ্কজবাবু। পরে রেকর্ডেও গান। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর পরিচালিত ‘অনিন্দিতা’ ছবিতে নিজকণ্ঠে গেয়েছিলেন এই গানটি। প্রসঙ্গত গানটির সুর অনুমোদনের সময় রবীন্দ্রনাথ কবিতায় থাকা ‘ফুলের বার, নাইকো যার, ফসল যার ফললো না/চোখের জল ফেলতে হাসি পায়…’ লাইন দুটি গানের উপযোগী হিসেবে পালটে, ”ফুলের বাহার, নাইকো যাহার, ফসল যাহার ফললো না/অশ্রু যাহার ফেলতে হাসি পায়…’ করে দিয়েছিলেন।
১২৬। পঞ্চম :— কিংবদন্তী সঙ্গীত পরিচালক রাহুলদেব বর্মনের (১৯৩৯—১৯৯৪) ডাক নাম। হিন্দি ফিল্মি দুনিয়ার সঙ্গীত পরিচালনায় এক নবযুগের সূচনাকারী। বাবা ছিলেন আরেক কিংবদন্তী শচীনদেব বর্মন। রাহুলের সঙ্গীত শিক্ষা হয় ব্রজেন বিশ্বাস (তবলা), উস্তাদ আলী আকবর খান (সরোদ), বাবা শচীনদেব বর্মন (লোকসঙ্গীত ও অন্যান্য) প্রমুখ বরেণ্যদের কাছে। রাহুলদেব বর্মন সুরারোপিত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘ছোটে নবাব’ (১৯৬১)। এরপর কয়েকদশক জুড়ে ‘পড়শন’, ‘অমর প্রেম’, ‘কটি পতঙ্গ’, ‘আপ কি কসম’, ‘কুদরত’, ‘অনামিকা’, ‘মেহবুবা’ ইত্যাদি থেকে শুরু করে ৯০ দশকের ‘1942—এ লাভ স্টোরি’, ‘অন্যায় হি অন্যায়’ পর্যন্ত হিন্দি ছবির জগতে সঙ্গীত পরিচালনায় এক নবধারা এনে সারা ভারত মাতিয়ে দেন। ‘রাজকুমারী’, ‘অনুসন্ধান’, ‘ত্রয়ী’, ‘একান্ত আপন’ ইত্যাদি বেশকিছু বাংলা ছবিতেও সফলতার সঙ্গে সুরারোপ করেছেন রাহুলদেব বর্মন।
