কিন্তু আমার সম্বন্ধে ওদের ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। আমি যত বড়োই সংগীত পরিচালক হই না কেন, যখন প্লে—ব্যাক করবো তখন আমার আলাদা রূপ। আমাকে যেমনভাবে সংগীত পরিচালক গাইতে বলবেন, সেইভাবেই গাইবো। তাদের দেওয়া সুরের ওপর কখনওই মাতব্বরি করবো না। তবে আমার গলার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার জন্যে সুরটাকে একটু অদলবদল করবার অনুরোধ করতে পারি। সেও তাদেরই ভালোর জন্যে। কারণ আমি দেখেছি, সুরে বেশি কাজ থাকলে আমার গলায় তেমন মানায় না। সহজ সরল সুরই আমার গলায় প্রাণ পায় বেশি। সেইসব ক্ষেত্রে সুরকারকে আমার মতামত জানাতে পারি। কিন্তু খুদে মিউজিক ডাইরেক্টর বলে প্লে—ব্যাক শিল্পী হিসেবে আমি তাদের কখনওই অসম্মান করবো না। কখনও করিওনি।
সেইসময় শচীনদা আমাকে ওঁর ছবিতে প্লে—ব্যাক দিতেন। তখন দেবানন্দ তখন অনেকগুলো ছবির নায়ক। ওরই মুখে আমার গান খুব ভালো খাপ খেতো। শচীনদার সুরে আমার গাওয়া গানগুলো হিট হতোই।
শচীনদাকে দেখতাম কাজ বেশি নিতেন না। গুনে গুনে ছবি নিতেন। তাই ওঁর পক্ষে মন দিয়ে কাজ করতে বেশি অসুবিধে হতো না। একগাদা ছবি নিয়ে মনের ভারসাম্যকে কখনওই নষ্ট করতেন না। আজও তাই তিনি ছবির জগতে সবথেকে প্রবীণ সুরকার হয়েও, নিজের আসন অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
ওদিকে আমাকে তখন ঝড়ের মতো কাজ করতে হচ্ছে। হাতে অনেকগুলো ছবি। প্রায় বত্রিশখানা। মনে একরাশ আতঙ্ক। তড়িঘড়ি সুর করতে হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে করতে হচ্ছে রেকর্ড। অথচ দায়সারা কাজতো করতে পারি না। একটা ছবির পেছনে কত লক্ষ টাকা ঢেলেছেন প্রোডিউসার। সেই টাকা যাতে না নষ্ট হয় সেদিকেতো আমাকে দেখতে হবে। তাই মন দিয়ে সুর তো করতামই, সেই সঙ্গে মনে মনে বলতাম, ঠাকুর, এঁদের পয়সা দিও। অনেক আশা নিয়ে এঁরা টাকা ঢেলেছেন। সে টাকা যেন সুদে আসলে উঠে আসে।
কিন্তু আমার প্রার্থনা মঞ্জুর হয়নি। আমার সুর দেওয়া বত্রিশখানা ছবির মধ্যে মাত্র চার—পাঁচখানা শ্রোতাদের কাছে কিছু মর্যাদা পেয়েছিল। বাকি ছবিগুলো দর্শকদের মনে স্থান পায়নি। অকালেই বিদায় নিয়েছিল হাউস থেকে।
এইসব ছবির জন্যে রাতের পর রাত জেগে যা সৃষ্টি করেছিলাম, সবই ব্যর্থ হয়েছিল। আমার শ্রমের মূল্য, শ্রমের মর্যাদা কিছুই পাইনি। আমার এত খাটুনি বৃথাই গিয়েছিল।
অবশ্য বেশি খাটলেই যে বেশি দাম পাওয়া যায় এমন কথা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারেন না। তাই যদি, তাহলে রাজকাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’—এর কপাল পুড়তো না। এই ছবিটার পেছনে দশ বছর খেটেছে রাজকাপুর। ছবির জগতে যাতে তার নাম চিরস্থায়ী হয়ে থাকে—এই ছিল রাজকাপুরের মনের বাসনা। কিন্তু হয়নি। শ্রমের মূল্য পায়নি রাজকাপুর। কিন্তু এই ছবি তৈরি করে সবদিক খুঁটিয়ে বিচার করে তবে তো রাজকাপুর বাজারে ছেড়েছে। তবে কি ছবির ভালমন্দ বিচার করবার ক্ষমতা ছিল না রাজকাপুরের? ছিল। কিন্তু ছবির ভালমন্দ বিচারের ক্ষমতা আমাদের হাতে থাকলেও সেটাকে দর্শকদের ওপর আরোপ করবার অধিকার নেই। দর্শকরাতো কারো প্রজা নয় যে হুকুমনামা মেনে চলবে। তাদের মতামত স্বাধীন। তাদের মতামতই চূড়ান্ত। এইসব দর্শকদের রায় বড় কড়া। এরা বড়ো নিষ্ঠুর। কারুর মন রেখে এরা মতামত দেয় না। এরা পুরোনো ইতিহাস ঘেঁটে দেখে না। কবে তুমি ভালো ছবি করেছিলে তারজন্যে ওদের খারাপ লাগা ছবিটাকে পাস করিয়ে দেবে, এইসব ন্যায়নীতির ধার ধারে না এইসব জনসাধারণ। যখন ভালো ছবি করেছিলে তখন তোমাকে মাথায় করে নেচেছি। আজ পড়ে গেছো, এবার পথ দেখো। হটে যাও লাইন থেকে। শিল্পীর জীবনে এই ভয়, এই আশঙ্কা চিরকাল থাকবে।
যাইহোক, তখন আমি মন দিয়ে কাজ করে চলেছি। ছবি চলছেনা বলেতো ভেঙে পড়লে চলবে না। যাতে ছবি চলে তার জন্যে চেষ্টা করে যেতে হবে। সেই চেষ্টাই করে চলেছি তখনও।
রবি তখনও আমার সহকারী হয়ে কাজ করছিল। কিন্তু এবার ওকে ছাড়তে হল। মিঃ গোয়েল একটা ছবিতে রবিকে চান্স দিলেন। রবিতো প্রথমে কিছুতেই নিতে চায়না কাজটা। ও বললে, ‘দাদা, আপনাকে ছেড়ে আমি আলাদা কাজ করতে পারব না।’
আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম, ‘জীবনে উন্নতি করতে হলে তোমাকেতো একলা কাজ করতেই হবে। কতদিন আর আমার সঙ্গে সহকারী হয়ে কাজ করবে? আমি বলছি, তুমি এবার থেকে স্বাধীনভাবে সংগীত পরিচালনার ভার নাও। তাতে তোমার ভালোই হবে।’
তবু কি রবি যেতে চায়! শেষ পর্যন্ত ওকে জোর করে আমার কাছছাড়া করলাম।
রবি চলে গেল। এবার আমি একা। তখন অবশ্য ছবির কাজও অনেক কমে এসেছে। তাই একাই সব করছি। লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল এই সময় আমার সহকারী হয়ে কাজ করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। সহকারী ছাড়াই আমি মিউজিক করছিলাম। ছবি কম, তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যেই দায়িত্বটা বাড়িয়ে নিয়েছিলাম।
ওদিকে তখন রবি মিউজিক ডাইরেক্টর হয়ে গেল। পর পর বেশ কয়েকখানা ছবি তখন ওর হাতে এসে গেছে। মনে মনে খুব খুশি হলাম। আমার সহকারী, মিউজিক ডাইরেক্টর হয়েছে। কল্যাণজী—আনন্দজীও একদিন সংগীত পরিচালক হয়ে গেল। এই কল্যাণজী আমার ‘নাগিন’ ছবিতে বীণ বাজিয়েছিল। তারপর থেকে আমার সব ছবিতেই থাকতো। এরা সবাই উন্নতি করছে দেখে মনে মনে গর্ব অনুভব করলাম।
তখন অবশ্য বম্বের কাজ আমার আরও কমেছে। কিন্তু কলকাতার কাজ ক্রমশ বাড়ছে। বাংলা ছবির সুরকার হিসেবে তখন আমার নাম বেশ চড়া। তাই কাজ আসছে অঢেল। নিয়েও নিচ্ছি কাজগুলো। নিজেকে ব্যস্ত তো রাখতে হবে।
এইসময় একটা ছবির মিউজিক করাবার জন্য গুরু দত্ত১১১ এল। গুরু দত্ত হল কোঙ্কনি সম্প্রদায়ের লোক। একজন সত্যিকারের শিল্পী। লোক হিসেবে ওর তুলনা হয়না। ওর সঙ্গ যেকোনো মানুষকে মোহিত করবেই। সেই লোকের সংস্পর্শে এলাম আমি।
তবে কাজের ব্যাপারে ও ভীষণ কড়া। সেখানে কোনো দয়ামায়া নেই গুরুর। কাজের জন্যে কত লোককে নিয়েছে, কিন্তু পছন্দ না হলেই বিনা দ্বিধায় বাতিল করে দিয়েছে সেইসব লোকদের। এমনিতে খুব আড্ডাবাজ ছিল গুরু। কিন্তু যখন কাজ করতো তখন একেবারে অন্য মানুষ। ভীষণ নিষ্ঠা তখন কাজে।
বম্বেতে তখন আমার নাম পড়ে এসেছে। এই পড়তি সময়ে গুরু কাজ নিয়ে এলো। বললে, ‘আমার ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ছবিতে তুমি মিউজিক দেবে।’
আমি বললাম, ‘আদর করে তো ডাকছো, কিন্তু তোমাকে যে বিশ্বাস হয় না। দু’একখানা গানের সুর করাবে, খুঁতখুঁতে মন নিয়ে যাচাই করবে দিনকয়েক, তারপরই দেবে বরখাস্ত করে।’
গুরু বললে, ‘না না, তা করতে যাবো কেন। আরে এ হল বাংলা ছবির গল্প। তোমার হাতে সুর খুলবে ভালো।’
অতএব ছবিটা নিলাম। এ ছবির সংগীত পরিচালনা আমিই করেছিলাম। অনেক খেটে ছবিটা শেষ করেছিল গুরু। কিন্তু এরপর গুরুই একদিন নিজেকে নিজে শেষ করলো। এভাবে যে গুরু নিজেকে সংহার করবে কেউ ভাবতে পারেনি।
পৃথিবীতে মানুষের আসা যাওয়ার সময়ের তো কোনো ঠিক নেই। কে কবে আসবে তার যেমন তারিখ জানা নেই, কে কবে যাবে তারও দিনক্ষণ আগে থেকে জানবার উপায় নেই। এইভাবেই এগিয়ে চলেছি আমরা।
আমি যাদের জন্যে করেছি তাদের কাছ থেকে আমি কোনো বাহবা চাইনি। চেয়েছি শুধু স্নেহ, প্রীতি, ভালোবাসা। কিন্তু অনেকের কাছে এর উলটোটাই পেয়েছি। কাজ হাসিল হবার পর এঁরা আমার বিরুদ্ধে নানা কথা বলে বেড়িয়েছেন। ঝুড়ি ঝুড়ি নিন্দে কুড়িয়েছি এঁদের কাছ থেকে।
ভূপেন হাজারিকা একবার বম্বে এলো। কিছু অসমীয়া গান করাবে একটি ফিল্মের জন্য। লতাকে ঠিক করে দিতে হবে। অবশ্য আমারও গান নিলো। ছবিটার নাম ‘এরা বটর সুর’। সংগীতবহুল ছবি। লতার গানের জন্য সবাই প্রায়ই কলকাতা থেকে আমার কাছে আসতো। আমি কাউকেই নিরাশ করতাম না। কিন্তু সব থেকে মজার কথা হচ্ছে, আমার সাহায্যে লতার গান রেকর্ড করতো, আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ আমারই বিরুদ্ধে কিছু কিছু কথা বলতো। সেসব আমি জানতে পারতাম লতার কাছ থেকে। লতা আজ পর্যন্ত আমার কোনো অনুরোধ নাকচ করেনি। পরে লতা আমাকে বলতো, ‘দাদা, এদের জন্য আমায় আর গাইতে বোলোনা। তুমি এর মধ্যে থেকোনা। যারাই কলকাতা থেকে আসুক সোজা আমার কাছে পাঠিয়ে দিও।’
লতা আমাকে খুবই ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। আমার প্রোডাকসনের প্রায় এগারোখানা ছবিতে ও যতো গান গেয়েছে, তারজন্য কখনো একটা পয়সা নেয়নি। জোর করে দিতে গিয়েছি, তাতে রেগে গিয়েছে। বলেছে, ‘আমার নিজের দাদা হলে তুমি আমায় পয়সা দিয়ে অপমান করতে পারতে?’ এই হচ্ছে লতা! কলকাতার সুরকাররা যখন রেকর্ড—এর পরে দু’চারবার মেলামেশা করার সুযোগ পেতো তখনই কৌশলে দু’ চারটে কথা আমার বিরুদ্ধে বলতো, যেটা লতার খুব খারাপ লাগতো।
যাইহোক, যা বলছিলাম। ভূপেনের অসমীয়া গান সব রেকর্ড হয়ে গেল। গানগুলো প্রিন্ট করে নিয়ে যাবে বলে কয়েকদিন বম্বেতে থাকতে হল। সেইসময় কথায় কথায় ভূপেন একটা গল্প শোনালো। হিন্দা লেখিকা মহাদেবী বর্মার গল্প। কতকটা ‘কাবুলীওয়ালা’১১২ ধাঁচের। কিন্তু আমার মনে হল এটার মধ্যে নতুনত্বের আভাষ আছে। গল্পের নায়ক চীনা ফেরিওয়ালা, আর নায়িকা কংগ্রেস—কর্মী। বৃটিশ আমলে লেখা। গল্পের নাম ‘নীল আকাশের নীচে’। কলকাতায় এসে স্ক্রিপ্ট শোনাবার ব্যবস্থা হল। শান্তুকে কথাটা বললাম। কারণ কলকাতায় যা কিছু কাজ শান্তু ছাড়া সম্ভব নয়। একে তো পরম বন্ধু, তার ওপর ও যদি কোনো কাজের ভার নেয় তো সে বিষয়ে আর কোনো চিন্তা করতে হয় না। সালটা বোধহয় ১৯৫৬ কিংবা ১৯৫৭। মৃণাল সেন স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। তখন মৃণাল মাত্র একটা ছবিরই পরিচালনা করেছে। তেমন সুবিধার হয়নি। স্ক্রিপ্ট শুনলাম। স্ক্রিপ্টের বেশিরভাগ ঘটনা চায়নাতে, আর মনে হল কতকটা যেন রেডিও—স্ক্রিপ্টের মত। মৃণালবাবুকে বললাম। উনি বললেন, ‘ভূপেন আমাকে যেভাবে স্ক্রিপট করতে বলেছেন, আমি সেইভাবে স্ক্রিপ্ট করেছি। আপনি যেভাবে গল্প সাজাতে চান সেভাবে বললে আমি করে দেবো।’ আমি স্ক্রিপ্টটা রেখে দিলাম। ওঁকে বললাম, ‘ভেবে দেখবো।’ তখন চিত্রনাট্য রচয়িতা হিসেবে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের১১৩ নাম সব থেকে বেশি। আমরা ঠিক করলাম নৃপেনদাকে দিয়ে চিত্রনাট্য করানো হবে। সব ঠিক হয়ে গেল। নৃপেনদা শান্তুর বাড়িতে বসে স্ক্রিপ্ট লিখতে শুরু করলেন। নায়ক—নায়িকা ঠিক হল—উত্তম এবং অরুন্ধতী১১৪। আর ডাইরেক্টর ভূপেন হাজারিকা। শান্তুর হাতে সব ভার দিয়ে আমি বম্বে চলে এলাম, কারণ বম্বেতে তখনো আমার হাতে অনেক ছবি। কয়েকদিনপর টেলিগ্রাম এলো। শান্তু বলল, ‘স্ক্রিপ্ট মনোমতো হচ্ছে না। উত্তম চীনে মেক—আপের জন্য একঘণ্টা সময়ও দিতে পারছে না।’ আমি কলকাতায় গিয়ে সব দেখেশুনে ছবিটা করা বন্ধ করলাম। আরো একমাস পরে হঠাৎ শান্তু বলল যে, ‘আমি মৃণালবাবুর স্ক্রিপ্ট পড়েছি। আমার মনে হয় উনি এ গল্পটা যতোটা ভেবেছেন তা আর কেউ ভাবেনি। তুমি স্ক্রিপ্টটা পড়ে দেখো।’ পড়লাম। মনে হল ক্ষমতা আছে। শান্তু এবং আমি বসে গল্পটার একটা ছক তৈরি করলাম। মৃণালবাবুকে ডেকে পাঠালাম। ওঁকে বললাম, ‘আমরা এই গল্পের একটা কাঠামো তৈরি করেছি, আপনি যদি এই কাঠামো ধরে স্ক্রিপ্টটা সাতদিনের মধ্যে করতে পারেন তো ছবিটা করতে পারি। আমি আপনাকে বম্বে নিয়ে যাবো এবং ওখানে বসে আপনি স্ক্রিপ্ট করবেন।’ উনি রাজি হলেন। বম্বে এসে সাতদিনের মধ্যে যে স্ক্রিপ্ট শোনালেন তাতে চমকে গেলাম। বুঝলাম অসাধারণ গুণ আছে। আরো চার পাঁচদিন ধরে গল্পটা আরো সুন্দর সাজালেন। তখন আমরা ঠিক করলাম মৃণালবাবুকেই পরিচালনার ভার দেওয়া উচিত। তাই ঠিক হল। এইবার নায়ক নিয়ে সমস্যা। মৃণালবাবু বললেন, ‘পিকিং থেকে একটা অভিনেতা আনা যায় না?’ তখন ভারতের সঙ্গে চায়নার সম্পর্ক ভালো। ছুটলাম চীনা কনসোলেট, বম্বেতে। ওরা বলল, ‘পিকিং থেকে অভিনেতা আনার অনেক অসুবিধা আছে। তার থেকে কলকাতায় অনেক চীনে থিয়েটার হয়, সেখান থেকে খুঁজে নাও।’
এইসব দেখেশুনে মৃণালবাবু কালী ব্যানার্জীর১১৫ নাম প্রস্তাব করলেন। মঞ্জু দেকেও১১৬ নায়িকা ঠিক করা হল। ধাপার চীনা এলাকা থেকে একটা চীনে মেয়ে এবং ছেলে যোগাড় করা হল। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ালো চীনে মেক—আপ নিয়ে। শান্তু এবং মৃণালবাবু প্লাস্টার দিয়ে মেক—আপ পরীক্ষা চালাতে লাগলেন, কিন্তু তা সফল হল না। শক্তি১১৭ ছিল মেক—আপ ম্যান। আমি তখুনি স্থির করে ফেললাম কী করতে হবে। মাদ্রাজের হরিবাবুকে আমি জানতাম। মাদ্রাজে ওঁর বাড়িতে মেক—আপ রুম। উনি কোনো স্টুডিওতে গিয়ে মেক—আপ করেন না। সব বড়ো বড়ো নায়ক—নায়িকা ওঁর বাড়ি থেকে মেক—আপ করে যায়। হরিবাবুর মাদ্রাজে অসাধারণ নাম এবং খুবই সম্মানীয় ব্যক্তি। ওঁর ছেলে নানু চন্দ্র আমাদের খুব বন্ধু। আমার ছোটো ভায়ের মত। আমি কালী ব্যানার্জী এবং শক্তিকে নিয়ে রাতের প্লেনে মাদ্রাজ পৌঁছোলাম। হরিবাবুকে সব বললাম। উনি সব শুনে বললেন, ‘ছবিতে একটা দুটো দৃশ্য হলে, প্লাস্টার মেক—আপ চলে, কিন্তু ছবির নায়ক, যাকে মুখের সমস্ত পেশী সঞ্চালনের সঙ্গে অভিনয় করতে হবে, সেক্ষেত্রে প্লাস্টার লাগালে মুখের তো কোনো ভাবই ফুটবে না। সে হাসবে—কাঁদবে কি করে?’ উনি বললেন, ‘কয়েকটা তুলির টানে যতটা চীনে মুখ হওয়া সম্ভব তাই করতে হবে এবং তাই করে দিচ্ছি। অন্য কিছু করতে গেলে অভিনয় করতে পারবে না।’ আমার হাতে মাত্র একটা দিন সময়। আমায় পরের দিন ফিরে যেতে হবে। হরিবাবু মাদ্রাজের কয়েকটি নায়িকাকে এবং নায়ককে একটু অপেক্ষা করতে বলে কালীবাবুকে আধঘণ্টার মধ্যে মেক—আপ করে দিলেন। আমি তখুনি স্টিল ছবি নিয়ে নিলাম। হরিবাবুকে পারিশ্রমিকের কথা বলতে উনি তেড়ে মারতে এলেন। বললেন, ‘ও সব কথা ভাবতে হবে না। আজ রাত্তিরে সবাই এখানে খেয়ে তারপর যাবেন।’ হরিবাবুর কাছে আমরা সবাই কৃতজ্ঞ। আজ উনি বেঁচে নেই। আমাদের দেশ থেকে এইরকম উদার মনের লোক আস্তে আস্তে কমে আসছে।
তারপর পুরোদমে শ্যুটিং চলল ‘নীল আকাশের নীচে’র। শান্তুই সব দেখাশুনা করতো, তাই আমার কোনো চিন্তা ছিল না। ছবি শেষ হল। ঐ সময় আমার মাসতুতো বোন মুকুল ব্যানার্জীর (এখন এম. পি.) মারফত পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, রাধাকৃষ্ণণ, ইন্দিরা গান্ধী, সুচেতা কৃপালনী১১৮ এবং আরো অনেককে ছবিটা দেখাবার ব্যবস্থা হল দিল্লীর রাজভবনে। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকেই ছবিটা দেখাবার আসল উদ্দেশ্য।
মৃণালবাবু এবং আমি গেলাম। শুনলাম পণ্ডিতজী পুরো ছবি দেখেন না, খানিকপরে চলে যান। সেদিন কিন্তু উনি এবং আর সবাই পুরো ছবি দেখলেন। শুধু ইন্দিরাজী একবার বিশেষ একটা কাজে কুড়ি মিনিটের জন্য ঘুরে এসে আবার ছবি দেখতে বসলেন। সবাই একবাক্যে ছবিটির প্রচুর প্রশংসা করলেন। তারপর মুকুল আমায় চুপি চুপি বলল, ‘খুব তো হিন্দি—চীনি ভাই ভাই দেখালেন কিন্তু চীনেদের সঙ্গে বর্তমানে আমাদের সম্পর্ক খুব খারাপ হতে চলেছে। যে কোনো দিন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
সর্বনাশ! তাই যদি হয় তো জনতা পর্দা ছিঁড়ে ফেলবে। আমি তারপরেই পরিবেশকের সঙ্গে পরামর্শ করে তখুনি রিলিজের ব্যবস্থা করলাম। সব থেকে মজার ঘটনা হচ্ছে, আমি বম্বেতে চীনা কনসুলেটে ছবিটা দেখালাম। তারা ভাবলো, আমি কলকাতা থেকে কোনো চীনে আর্টিস্ট নিয়েছি। যখন বললাম, ইনি বাঙালি, তারা খুবই অবাক হল এবং যথেষ্ট প্রশংসা করলো। ‘নীল আকাশের নীচে’ হিট করলো।
এরপর মৃণাল সেনের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ওঁর কাছে তখন প্রোডিউসারের আনাগোনা বেড়েছে। উনি এরপর করলেন ‘বাইশে শ্রাবণ’। তারপর আরও কয়েকটা ছবি উনি করলেন।
ওঁর ছবি হতো খুব উন্নত ধরনের। কিন্তু সব ছবি পয়সা পেতো না। আমি ওঁকে বলেছিলাম, ‘এমন ছবি করুন যাতে কিছু বাণিজ্য হয়।’
উনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘ছবি যখন করি তখন আমি ওসব কথা ভাবি না। ছবি ভালো হচ্ছে কিনা এটাই দেখি। তাতে পয়সা উঠবে কিনা সে বিদ্যে আমার জানা নেই।’
এই এক চরিত্রের লোক মৃণাল সেন। উনি টাকাপয়সার পরোয়া করেন না। করলে অনেক টাকাই পেতেন। কিন্তু টাকার জন্যে নিজের আদর্শকে বলি দিতে উনি রাজি নন। উনি যেটা ভালো বোঝেন সেটাই করেন। এ ব্যাপারে কারুর কথা শোনেন না। কারুর পরামর্শ নেন না। সত্যিই মৃণাল সেন একটা চরিত্র। আদর্শ চরিত্র। ছবির ব্যাপারে আমার সঙ্গে ওঁর সবসময় মতের মিল হোক আর নাই হোক।
বাংলা ছবি তখন পর পর করে চলেছি। সেইসময় অসিত সেনের১১৯ ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতে সুর দিলাম। এই ছবির একটা গান নিয়ে ভারী মজার এক ব্যাপার হল। গানটা হল—’এই রাত তোমার আমার’। এ—ছবির গানগুলো তো হিট হয়েছিল। কিন্তু সে ব্যাপার নয়। সে এক ভারী মজার ব্যাপার। হাসির ব্যাপারও বটে।
অবশ্য যখন এই মজার ব্যাপারটা এখানে হচ্ছে তখন আমি বিদেশে বেড়াতে গেছি। বাইরে যাবার তখন একটা প্রোগ্রাম করেছিলাম। প্রথমে যাবো ইস্ট আফ্রিকা, সেখান থেকে রোম। তারপর আরও কয়েকটা জায়গায় যাবো। ঠিক হয়েছিল গৌরীপ্রসন্ন আর ওর স্ত্রী সোজা চলে যাবে রোমে। আমরা আফ্রিকা হয়ে রোমে যাব। তাই হল।
আমাদের এই যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে তখন কলকাতায় খুব কানাকানি শুরু হয়ে গেছে। আমি নাকি ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবির ‘এই রাত তোমার আমার’ গানের সুরটা চুরি করেছি কোনো এক বিদেশি গান থেকে। তাই লন্ডনে কেস হয়েছে। গানটা লিখেছে গৌরী। তাই তারও ওখানে ডাক পড়েছে। তাই গেছে আমার সঙ্গে।
ভারী মজার ব্যাপার। ভারী হাসির ব্যাপারও বটে। কার সুর চুরি করলাম? কোন গানের সুর চুরি করলাম। নাম কী সেই ইংরেজ সুরকারের। কিছুই জানি না। অথচ এই নিয়ে বেশ একটা আলোড়ন চলেছে কলকাতায়। ফাঁসি হবে, না জেল হবে, এই নিয়েও হয়তো অনেকে বাজি ধরে ফেলেছে।
যাইহোক, আমিতো অক্টোবর মাসে ফিরে এলাম কলকাতায়। কলকাতায় ফিরে আমি তখন খোঁজ করে বেড়াচ্ছি সেই লোকটার, যে লোকটা প্রথম এই রসালো খবরটাকে ছড়িয়েছে। সত্যিই ভদ্রলোকের অসীম ক্ষমতা। কেমন সাজিয়ে গুছিয়ে খবরটাকে খাড়া করেছে। একটা কল্পনাকে কীভাবে লোককে বিশ্বাস করিয়ে ছেড়েছে। এ লোককে আমি পেলেতো এখুনি আমার ছবির পাবলিসিটি অফিসার করে নিই। তাই খোঁজ করেছিলাম ভদ্রলোকের।
এরপর গৌরী একটা ফাংশানের বন্দোবস্ত করলো। সেই ফাংশানে আমাকে এই মজার ব্যাপারটার কথা সবাইকে জানাতে হল। অবশ্য এইধরনের অনেক মজার খবর প্রায়ই রটে। কিন্তু ক’জনকেই বা সেকথা জানানো যায়। সব থেকে আশ্চর্য এই পত্রিকাগুলো। তারা এইসব রটনাগুলোকে দিব্যি রসিয়ে রসিয়ে লিখে কাগজের বিক্রি বাড়ায়। হায়রে দেশের সাংবাদিক! তোমরা মানুষকে আলো দেখাবে কোথায়, তা নয়, নিয়ে যাচ্ছো অন্ধকারের পথে!
১৯৫৯ সালের শেষের দিকে আমার হিন্দি ছবির কাজ খুবই কম। আর বসে থাকতে পারছি না। ছোটোখাটো ছবি পাচ্ছি কয়েকটা। সেগুলোকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবার চেষ্টা করছি। কিন্তু মন ভরছে না। ১৯৬০ সালের প্রথমদিকে একবার মনে হল, ফিরে যাবো নাকি কলকাতায়। সেই ভালো। ওখানে আমার অনেক কাজ। থাকলে আরও বেশি কাজ পাবো। কিন্তু আমার বাড়ির কেউ ফিরে যেতে চায় না কলকাতায়। আমার ছেলেমেয়ে, আমার সংসারের আর সবাই বম্বেতে থাকতে চায়। এখানে তাদের মন বসে গেছে। অতএব আমার একার ফিরে যাবার ইচ্ছেটা সকলের ওপর খাটাতে চাইলাম না।
এইসময় আর্ট ডিরেক্টর বীরেন নাগের১২০ সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হল খুব। খুব ভালো লাগতো ভদ্রলোককে। তখন প্রায়ই যেতাম ওঁর বাড়িতে। বসে বসে গল্প করতাম। সুন্দর কথা বলতে পারতেন বীরেন নাগ। আর ওঁর মাথায় ছিল কিছু নতুন নতুন পরিকল্পনা। সুন্দর গল্প সাজাতে পারতেন।
হঠাৎ মনে হল, এঁকে দিয়ে একটা ছবি করালে কেমন হয়। উনিও সেইসময় এই কথাই ভাবছিলেন। একজনের সঙ্গে কথাও নাকি হয়েছিল এই ব্যাপারে। আমি কথাটা পাড়তে উনি খুব উৎসাহ দেখালেন।
আমার তখন হাতে কিছু টাকা জমেছিল। অবশ্য লোকে ভাবতো টাকার পাহাড় জমে গেছে। সেটা তাদের ভুল ধারণা। কোত্থেকে অত টাকা জমবে? রোজগার যা করি সবই তো খেয়ে নেয় ইনকাম ট্যাক্স। দু’লাখ রোজগার করলে আমি হাতে পাই মাত্র কুড়ি হাজার। আমার রোজগারের টাকা যদি কেউ জমিয়ে থাকে তো সে জমিয়েছে ইনকাম ট্যাক্স তহবিল। আমার নিজস্ব যা কিছু টাকা জমেছিল সে আমারস্ত্রী বেলার জন্যে। আমি চিরকাল বেহিসেবি লোক। রোজগার করতে জানি, কিন্তু জমাতে শিখিনি। বেলা এ—ব্যাপারে খুব হিসেবি। ও, টাকা অপব্যয় করার একদম পক্ষপাতী নয়। তাই আমাকে লুকিয়ে টাকা জমাতো। বেলার জমানো সেই টাকা নিয়ে আমি ছবি করতে নামলাম।
গল্প ঠিক হয়ে গেল। ‘জিঘাংসা’ ছবির গল্প। হিন্দি নাম দিলাম ‘বিশ সাল বাদ’। কিন্তু ছবির নায়ক কাকে করা হবে। বড়ো কোনো স্টার না নিয়ে নতুন একজনকে নিলে কেমন হয়। কথাটা ভাবলাম মনে মনে।
বিশ্বজিৎ১২১—এর নামটাই মনে হল প্রথমে। রঙমহলে ‘এক পেয়ালা কফি’—তে দেখেছিলাম বিশ্বজিৎকে। নায়কের রোল করেছিল এই নাটকে। তখন থেকেই ওকে চিনি। ঠিক করলাম ওকেই আমার ‘বিশ সাল বাদ’—এর হিরো করবো। প্রস্তাবটা পেশ করলাম বীরেনবাবুর কাছে। উনি শুনে বললেন, ‘ঠিক আছে। তবে হিরোইন একটু নামকরা নিতে হবে।’
সেকথা ঠিক। দুজন নতুন হলে খুব বেশিরকমের ঝক্কি নেওয়া হয়। তাই শেষপর্যন্ত হিরোইন ঠিক হল ওয়াহিদা রহমান।
সবই ঠিক হয়ে গেল। আমি যখন যেটা ঠিক করি সেটা না করে ছাড়ি না। আমি জানি এতে ঝুঁকি অনেক। তবু জেদ যখন চেপেছে, তখন তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে উপায় নেই। প্রশ্রয় হয়তো দিতাম না, যদি হাতে কাজ থাকতো। কিন্তু সে সময় আমার তো হাত খালি। অবশ্য এইসময় গুরু দত্ত একটা কাজে লাগিয়েছে। তার ছবি ‘সাহেব বিবি গোলাম’ করছি। সেটাও ‘বিশ সাল বাদ’ শুরু করার পর, পেয়েছি। গুরু যদি আর দুদিন আগে ছবিটা শুরু করতো, তাহলে হয়তো আমি নিজে ছবি করতে নামতাম না। কারণ এই হিন্দি ছবি করতে গিয়ে আমার ক্ষতি হয়েছে প্রচুর। লাভ করেছি কিছু প্রথমে, পরে লোকসানের অঙ্ক যে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তার হিসেব করলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। অতএব সে কথা এখন থাক।
‘বিশ সাল বাদ’ ছবির শ্যুটিং—এর তখন তোড়জোড় চলছে। ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে শ্যুটিং আরম্ভ। হঠাৎ ২রা ফেব্রুয়ারী ১৯৬০ সালের সকাল আটটায় এক মর্মান্তিক খবর এল ট্রাঙ্ককলে—আমার মা হঠাৎ আজ সকালে মারা গেছেন। প্রথমে মাথায় কিছু ঢুকলো না। তারপর ভাবতে লাগলাম, কী করে সময়মতো কলকাতায় পৌঁছোবো। সকালের প্লেন চলে গেছে। ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী বলে এয়ার ইন্ডিয়ার এক পাইলট আমার বন্ধু। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম কোনো ছোটো প্লেন চার্টার করে যাওয়া যায় কি না। তখনকার সময়ে আন্তর্জাতিক বিমানে স্থানীয় যাত্রী নেওয়া যেতো না। নেওয়া নিষেধ ছিল। ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী জানিনা কীভাবে টোকিও—গামী একটা বিমানে আমার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমিও বেলা দশটায় সেই বিমানে রওনা হলাম এবং বারোটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে গেলাম। ঈশ্বরের কী অপার দয়া আমার উপর। অত তাড়াতাড়ি পৌঁছোবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।
মার অন্তিম সময়ে আমি কাছে থাকতে পারিনি। থাকব কি করে। মা তো হঠাৎই মারা গেলেন। অসুখবিসুখ কিছুই হয়নি। রোজকার মতো ভোরবেলা উঠেছেন। বাবা দধিবামনের ভোগ রাঁধবার আগে চান করতে যাচ্ছিলেন। চান করতে আর যাওয়া হল না। তার আগেই বুকের যন্ত্রণা শুরু হল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কোথাও কিছু নেই, হঠাৎই এইসব উপসর্গ এসে দেখা দিলো। দু’ঘণ্টার মধ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন মা। সবই শুনলাম কলকাতায় পৌঁছে।
বিনা নোটিশে মার মৃত্যুটা আমাকে মুষড়ে ফেললো খুব। মা যে আমার জীবনের কতখানি জুড়ে ছিলেন সেটা আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতাম। সব স্নেহ, ভালোবাসা আমাকেই উজাড় করে দিয়েছিলেন মা। আমার জন্যে মার ছিল সারাক্ষণের চিন্তা। মার সঙ্গে সঙ্গে সব চলে গেল। আর সবাই আছে। তবু সেদিন নিজেকে বড়ো একা, বড়ো নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল।
মা মারা গেলেন ৫৯ বছর বয়সে। খুব ধর্মপরায়ণা ছিলেন আমার মা। ঠাকুর দেবতার সেবাতেই ওঁর দিনের অর্ধেকটা চলে যেতো। মারা যাবার বয়স তো ঠিক হয়নি। আরও কিছু বছর বাঁচতেও তো পারতেন। কিন্তু তা হবার নয়, সেটা জানা গেল মায়ের কুষ্ঠি দেখে। বেনারস থেকে আমার দাদামশাই মায়ের যে কুষ্ঠি করেছিলেন, তাতে ৫৯ বছরের পর আর আয়ু কষা নেই।
এদিকে আমার তখন দারুণ সমস্যা। বম্বেতে তখন আমার অনেকগুলো দায়িত্ব। এক তো নিজের ছবি ‘বিশ সাল বাদ’। আর আছে গুরু দত্তর ছবি ‘সাহেব বিবি আউর গুলাম’। তখন একদিনেরও অবসর নেই আমার। এক নাগাড়ে যদি দশ—বারো দিন থাকতে হয় কলকাতায়, তাহলে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। ব্যাপারটা তাই খুলে বললাম বাবাকে। আমার অবস্থাটা বুঝলেন বাবা। তাই ঠিক হল, এখন চলে গিয়ে শ্রাদ্ধের আগের দিন আবার ফিরে আসবো কলকাতায়। মা মারা যাবার তৃতীয় দিনে আমি চলে গেলাম বম্বে। বম্বেতে গিয়ে চার—পাঁচদিন ছবির কাজ করলাম। তারপর শ্রাদ্ধের দু’দিন আগে আবার ফিরে এলাম কলকাতায়। আবার শ্রাদ্ধ—শান্তি চোকার পর ফিরে গেলাম বম্বে। সেইসময় ভাঙা মন নিয়ে আমাকে যেভাবে সচল থাকতে হয়েছে সেকথা মনে হলে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাই।
নতুন অভিজ্ঞতা তখন সঞ্চয় করছি প্রোডাকশান আরম্ভ করে। এসব ব্যাপার তো কিছুই জানতাম না। নিজে ছবি করতে গিয়ে টের পেলাম। কতরকমের ঝক্কি, কতরকমের ঝামেলা। একটার পর একটা সমস্যা। সবই তখন নিজেকে সমাধান করতে হয়েছে। নতুন নায়ক, নতুন ডাইরেক্টর নিয়ে ছবি করছি। পাঁচজনে পাঁচ কথা বলছে। বেশিরভাগ লোকই শোনাচ্ছে হতাশার বাণী। অথচ নতুনদের মধ্যে প্রতিভা আছে কিনা জানতে হলে তাদের তো সুযোগ দিতে হবে। নইলে নতুন প্রতিভার জন্ম হবে কি করে। কিন্তু এটাও ঠিক, নতুনদের মধ্যে প্রতিভার যাচাই করা খুব শক্ত কাজ। পরীক্ষা করে কিছুই বোঝা যাবে না। তাদের কাজ দেখেও অনুমান করতে পারবেনা কেউ। আমার ছবিতে নতুন নায়কের এবং ডিরেক্টরের কাজ দেখেতো তখন অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিও বিরুদ্ধ মন্তব্য করে বেড়িয়েছেন। তবু আমি তাঁদের মন্তব্যকে আমল দিইনি। পিছিয়ে যাইনি তাঁদের কথা শুনে।
বীরেনবাবুকে পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার দিয়েছিলাম। ছবির চিত্রনাট্য করেছিল ধ্রুব চ্যাটার্জী। তবে সে চিত্রনাট্যকে, অনেক ঘষেমেজে নিতে হয়েছিল। কারণ সেইসময় ধ্রুব চ্যাটার্জী অন্য অনেক কাজে ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে পারেনি। গল্পের সংলাপ লিখেছিল দেবকিষণ, ভদ্রলোক এ—লাইনে নতুন। তবু একে সুযোগ দিয়েছিলাম। এইরকম আরও নতুন কয়েকজনকে আমার এই ছবিটাতে ইচ্ছে করেই নিয়েছিলাম।
ছবিতে অনেকেই নতুন। তাই ডিস্ট্রিবিউটার খুব অল্প টাকায় রফা করলেন। পরিচালক নতুন, নায়ক নতুন। বীরেন নাগ এই প্রথম ডিরেকসান দিচ্ছেন। হিন্দি ছবিতে এই প্রথম নায়ক হয়ে নামছে বিশ্বজিৎ। অতএব ডিস্ট্রিবিউটার কিসের ভরসায় বেশি টাকা ঢালবেন।
এইসময় আমার মনের জোর খুব বাড়াতে হয়েছিল। কারণ তখন কারুর কাছ থেকে এতটুকু উৎসাহ পাচ্ছি না। যাঁদেরই ছবি দেখাচ্ছি তাঁরাই হতাশ করছেন। তাঁদের মতে এ—ছবির সব খারাপ। কিচ্ছু হয়নি।
এদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম, যেহেতু আমার ছবিতে নতুনদের ভিড় বেশি, তাই ওঁদের খারাপ লেগেছে। ছবিটাকে খুঁটিয়ে বিচার করে মতামত দেবার ক্ষমতা এঁদের নেই। নইলে ছবিটা কেন খারাপ সে সমালোচনা কেউ করছেননা কেন।
তবু এঁদের কথা শুনে মনের ভয় কিছুটা বাড়লো। হাজার হোক এতগুলো টাকা এই ছবিটার পেছনে খরচ করেছি। আমার যথাসর্বস্ব বলতে গেলে ঢেলেছি। ছবি যদি মার খায় তো আমি একেবারে ডুবে যাবো।
তাই অনেক ভয়, অনেক আশঙ্কা মনে নিয়ে ছবিটাকে রিলিজ করলাম। ছবিটা এতদিন গুণী—জ্ঞানীদের মতামতের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিল, এইবার গিয়ে পড়লো পাবলিকের হাতে। এখন এই পাবলিকের হাতে ‘বিশ সাল বাদ’ এর কী দশা হয় কে জানে।
কিন্তু না, আমার ‘বিশ সাল বাদ’ পাবলিকের খুঁটির জোরে জ্ঞানীগুণীদের কোণঠাসা করে ফেললো। তাদের সব মতামতকে হারিয়ে দিয়ে আমার ছবি সগৌরবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জনসাধারণের কাছ থেকে আদায় করে নিলো। সে কী তখন নাচানাচি ‘বিশ সাল বাদ’ নিয়ে। সবাই বলতে শুরু করলো, দারুণ হয়েছে। ভিড় বাড়তে লাগল হাউসে। আর সেইসঙ্গে টাকা আসতে শুরু করলো। অনেক টাকা।
এ—ছবি যদিও পুরো আমার টাকায় তৈরি, তবু আমি দু’জনকে পার্টনার করে নিয়েছিলুম। আমি ছাড়া এ—ছবির পার্টনার ছিল মান্না লাডিয়া আর বীরেন নাগ। লাভের টাকা আমি সমান অংশে ভাগ করেছিলাম তিনজনের মধ্যে।
এ ছবির জন্যে ডিস্ট্রিবিউটার পাবলিসিটি তেমন করেননি। তখন অনেকে আমাকে বলেছিলেন, বিনা পাবলিসিটিতে কি কোনো কাজ হয়? ভালো করে পাবলিসিটি করুন। কিন্তু পাবলিসিটি করে ছবি হিট করানো যায় না। তা যদি হতো তো সবাই তাই করতো। ঢাক বাজিয়ে লোক জড়ো করা যায়, কিন্তু লোকদের আটকে রাখা যায় না। কিন্তু ভালো জিনিসের খবর লোকের কানে কানেই ছড়িয়ে যায়। তারজন্যে ঢাক পেটাতে হয়না।
‘বিশ সাল বাদ’—এর গানগুলোও খুব সুনাম কুড়িয়েছিল। এ ছবির গীতিকার ছিলেন শাকিল বাদাউনি১৪৬। উনি আগে নওশাদের ছবিতেই বেশি গান লিখতেন।
‘বিশ সাল বাদ’ ছবি করার সময় নিজের দিকে তাকাতে পারিনি। সেই সময় থেকেই আমার কোমরে ব্যথা হতে শুরু করে। নামমাত্র ওষুধ খেয়ে চালিয়ে নিচ্ছিলাম। অসহ্য যন্ত্রণা হতো মাঝে মাঝে, কিন্তু ওদিকে মন দেবার অবসর পেতামনা। কাজের ঠেলায় ব্যথাটা চাপা পড়েছিল এতদিন। কিন্তু এবার আর ব্যথাটাকে পাশ কাটানো গেল না। তখন ছবি হিট হয়েছে। মুখে হাসি দেখা দিয়েছে। মনে এসেছে নিশ্চিন্ততা। আর সেই সঙ্গে কোমরের ব্যথাটাও চাড়া দিয়ে উঠেছে। যন্ত্রণাটাও তখন বেড়েছে খুব।
এবার তাই ডাক্তার দেখাতে হল। ভালোভাবে চিকিৎসা করা দরকার।
ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা করে বললেন, ‘এভাবে ঘোরাফেরা করলেতো চিকিৎসা করা যাবে না। প্লাস্টার করিয়ে শুয়ে থাকতে হবে তিনমাস।’
আমি শুনে বললাম, ‘তিন মাস শুয়ে থাকা আমার পক্ষে খুবই লোকসানের ব্যাপার। তা বেশ, তাই করবো। তবে একটা কথা, প্লাস্টার করে শুয়ে থাকলে আপনি গ্যারান্টি দিচ্ছেন তো সেরে যাবে?’
গ্যারান্টির কথা শুনে পিছিয়ে পড়লেন ডাক্তারসাহেব। অতএব আমি আর ওপথে গেলাম না। কিন্তু তবু চিকিৎসা ছাড়িনি। অনেক বড়ো বড়ো ডাক্তার দেখিয়েছি। ভেলোরেও গিয়েছি। অনেক চেষ্টা করেছেন ওঁরা। কিন্তু কেউ ভালো করতে পারেননি।
.
১১১। গুরু দত্ত :— মুম্বই চিত্রজগতের এক কিংবদন্তী চিত্রপ্রযোজক ও পরিচালক। ছোটোবেলা কেটেছে কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে। জন্মসূত্রে ছিলেন কোঙ্কনি। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। ১৯৪১ সালে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের আলমোড়া সেন্টারে ভর্তি হয়ে নৃত্যশিক্ষা নেন। ১৯৪৫ সালে পুণার প্রভাত স্টুডিওতে বিষ্ণুরাম বেডেকারের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রথম ছবি প্রযোজনা করেন ‘বাজী’। ‘জাল’, ‘আরপার’, ‘সি.আই.ডি’, ‘পিয়াসা’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘সাহেব বিবি ঔর গোলাম’ ইত্যাদি গুরু দত্ত নির্মিত কিছু উল্লেখযোগ্য ছবি। প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী গীতা দত্তকে বিয়ে করেন। এক মর্মান্তিক আত্মহননের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় এই মহান চলচ্চিচত্রব্যক্তিত্বের জীবন।
১১২। ‘কাবুলিওয়ালা’ :— কাবুলিওয়ালা রহমত ও ছোট্ট মেয়ে মিনির মধ্যে এক মিষ্টি সম্পর্কনির্ভর এক অসামান্য গল্প। রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রসঙ্গত, এই কাহিনিনির্ভর এক উৎকৃষ্টমানের ছবি তৈরি করেছিলেন চিত্রপরিচালক তপন সিংহ। রহমত ও মিনির চরিত্রে অভিনয় করেন যথাক্রমে, ছবি বিশ্বাস ও টিঙ্কু ঠাকুর।
১১৩। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১৯০৫ — ১৯৬৩) :— বহুমুখী এই প্রতিভাধর মানুষটি জন্মেছিলেন বর্তমান দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ফুটিগোদা গ্রামে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সবকিছুই লিখেছেন। বিচরণ ছিল বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম নানা বিষয়ে। শিশু সাহিত্যে এনার অবদান চিরস্মরণীয়। ছোটোদের জন্য বিশ্বের ক্লাসিক কাহিনির অসাধারণ বঙ্গানুবাদ করেছিলেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ। অনেকগুলি বাংলা চলচ্চিচত্রের অসামান্য চিত্রনাট্য রচনা ছাড়াও, অনেকগুলির কাহিনি, সংলাপ এমনকি গীতিকার হিসেবে পাওয়া গেছে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়কে। কলকাতা বেতারের আদিযুগে যুক্ত থেকে ‘বিদ্যার্থীমণ্ডল’, ‘পল্লীমঙ্গল আসর’, ‘গল্পদাদুর আসর’ (‘দাদামণি’ নামে) ইত্যাদি নানা আসরে নিজের অবদান রেখেছেন। ১৯৩৯ সালে পুরী থেকে সরাসরি রথযাত্রার বেতার—ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। ‘গল্পভারতী’ মাসিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠা—সম্পাদক ছিলেন। ‘মহীয়সী মহিলা’, ‘সান ইয়াৎ সেন’, ‘মা’ (অনুবাদ), ‘সেক্সপীয়ারের কমেডি’, ‘সেক্সপীয়ারের ট্রাজেডি’, ‘নানাকথা’ ইত্যাদি বইয়ের লেখক। এছাড়া, ‘গীতগোবিন্দ’—র গদ্যানুবাদ করেছিলেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ।
১১৪। অরূন্ধতী দেবী :— বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালে প্রখ্যাত গুহঠাকুরতা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, এই অসামান্য সুদর্শনা শিক্ষিতা অভিনেত্রী। শান্তিনিকেতনে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং গুরু ব্রজবাসী ও বালকৃষ্ণ মেননের কাছে নাচ শেখেন। মাত্র ৬ বছর বয়সে ‘ডাকঘর’—এ অভিনয় করেন। রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ‘মায়ার খেলা’ গীতিনাট্যে অংশ নেন। এম.এ পাশ করে সাংবাদিক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, ঘটনাচক্রে ১৯৫২ সালে নিউথিয়েটার্সের ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ ছবিতে নায়িকা নির্বাচিত হয়ে যান। ‘মা’, ‘নবজন্ম’, ‘চলাচল’, ‘পঞ্চতপা’ ইত্যাদি ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করেন। ১৯৫১ সালে ভারতীয় সংস্কৃতি মিশনের সদস্য হিসেবে আমেরিকা, ১৯৫৭ সালে বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও পরে কার্লোভিভ্যারী ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিলেন অরূন্ধতী দেবী। প্রথমে চিত্রপরিচালক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ও পরে চিত্রপরিচালক তপন সিংহের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন অরূন্ধতী দেবী।
১১৫। কালী বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯২১—১৯৯৪) :— অসামান্য এই চরিত্রাভিনেতার জন্ম কলকাতার কালীঘাটে। বাবা মনীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অ্যাডভোকেট। ইস্কুলে থাকাকালীন ছোটোখাটো অভিনয় করতেন। রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) পড়াকালীন ‘কেদার রায়’ নাটকে ‘কার্ভালো’ চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর, এয়ারফোর্সে যোগ দেন এবং একবছরের মধ্যে ফিরে আসেন। ১৯৪৫ সালে ‘শ্রীরঙ্গম’—এ একরাত্তিরের জন্যে ‘তাইতো’ নাটকে অভিনয় করেন। এরপর, মহেন্দ্র গুপ্ত—র পরিচালনায় স্টারে অভিনয় করেন ‘শতবর্ষ আগে’ ও ‘টিপু সুলতান’ নাটকে। পাড়ার পাঁচুবাবুর মারফত যোগাযোগের সূত্রে হিরন্ময় সেনের ‘বর্মার পথে’ (১৯৪৭) ছবিতে প্রথম অভিনয় করলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর, ‘তথাপি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘বরযাত্রী’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘অযান্ত্রিক’, ‘পরশপাথর’, ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’, ‘লৌহকপাট’, ‘বাদশা’, ‘ডাকহরকরা’, ‘গুরুদক্ষিণা’ ইত্যাদি অজস্র ছবিতে কয়েকদশক জুড়ে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন এই অভিনেতা। ‘বাবুর্চি’ ও ‘সবসে বড়া সুখ’ নামে দুটি হিন্দি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (I.P.T.A) একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। এখানে থাকাকালীন অভিনয় করেন ‘বিসর্জন’ নাটকে। পেশাদার মঞ্চে ‘ক্ষুধা’, ‘পরস্ত্রী’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘সমাধান’, ‘আলিবাবা’ ইত্যাদি আরো নাটকে নিয়মিত দেখা গেছে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ‘সুরের আগুন’ নামে একটি ছবি প্রযোজনাও করেছেন এই অসামান্য চরিত্রাভিনেতা।
১১৬। মঞ্জু দে (১৯২৬—১৯৮৯) :— চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট এই নায়িকা ও চরিত্রাভিনেত্রীর জন্ম বহরমপুরে। আশুতোষ কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। সমাজসেবার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পরিচালক সুশীল মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে প্রথম অভিনয় করলেন, হিন্দি ছবি ‘সিপাহী কা স্বপ্না’—য়। হেমেন গুপ্ত—র ‘৪২’ ছবিতেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান মঞ্জু দে। এরপর, ‘জিঘাংসা’, ‘কার পাপে’, ‘কল্যাণী’, ‘পরেশ’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘স্বর্গ হতে বিদায়’, ‘অভিশপ্ত চম্বল’, ‘সজারুর কাঁটা’ ইত্যাদি ছবিতে উল্লেখযোগ্য অভিনয় করেন মঞ্জু দে। ‘চৌরঙ্গী’, ‘ব্যাভিচার’ ইত্যাদি মঞ্চনাটকেও মঞ্জু দে—কে দেখা গেছে। পরিচালনা করেছেন ‘অভিশপ্ত চম্বল’, ‘সজারুর কাঁটা’ ছবি দুটি। তপন সিংহ—র সঙ্গে যৌথভাবে প্রযোজনা করেছেন ‘অঙ্কুষ’, ‘টনশিল’ ইত্যাদি ছবি। মোটর রেসিং—এ অসম্ভব পারদর্শী ছিলেন মঞ্জু দে। কমনওয়েলথ মোটরিং কনফারেন্সের প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশে যান। শেষ দিকে যাত্রাও করেন। ‘বিশ্ববিন্দতা ইন্দিরা’ পালায় নামভূমিকায় মঞ্জু দে—র অভিনয় অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়।
১১৭। শক্তি :— প্রখ্যাত রূপসজ্জাশিল্পী। পুরো নাম শক্তি সেন (১৯৩২—২০০৩)। মূলত মঞ্চেই কাজ করেছেন। থিয়েটারের মেক—আপম্যান হিসেবে অসামান্য হয়ে উঠেছিলেন। চলচ্চিচত্রেও কাজ করেছেন বেশকিছু ছবিতে। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’—র রূপসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন শক্তি সেন। এছাড়া, ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিতে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে যেভাবে চীনা মানুষ সাজিয়েছিলেন শক্তিবাবু, তা বিস্ময়কর।
১১৮। সুচেতা কৃপালনী (১৯০৮—১৯৭৮) :— পাঞ্জাবে জন্ম এই রাজনীতিবিদের। পাঞ্জাবের প্রবাসী বাঙালি ডাক্তার সুরেন্দ্রনাথ মজুমদারের মেয়ে ছিলেন সুচেতা মজুমদার। ১৯৩১ সালে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। ১৯৩১—১৯৩৯ বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৩৬ সালে কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতা ও বেশকয়েকবারের সভাপতি আচার্য জে.বি.কৃপালনীর সঙ্গে এনার বিয়ে হয়। এরপর সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন সুচেতা কৃপালনী। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের বৈদেশিক বিষয়ক সম্পাদক, ১৯৪১—এ অখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির মহিলা দপ্তরের সম্পাদক, ১৯৪৫—এ ‘কস্তুরবা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’—এর সংগঠন সম্পাদক ও উত্তরপ্রদেশ থেকে ভারতীয় গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ অবধি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৫৮ সালে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ উত্তরপ্রদেশের শ্রমমন্ত্রী এবং ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ অবধি ঐ রাজ্যেরই মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৫২, ১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে কংগ্রেসের হয়ে লোকসভায় নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে কংগ্রেস ছেড়ে কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টির জাতীয় পরিষদের সদস্য হন। একবছর পরে পুনরায় কংগ্রেসে ফেরেন। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গাবিধ্বস্ত নোয়াখালিতে মহাত্মা গান্ধীর অন্যতম সঙ্গী ছিলেন সুচেতা কৃপালনী। প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালের ১৪ অগস্ট রাত ১২টার সময় প্রথম স্বাধীনতার দিনে সদ্য হওয়া প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বিখ্যাত ভাষণের পর, ‘বন্দোমাতরম’ গানটি গেয়েছিলেন সুচেতা কৃপালনী।
১১৯। অসিত সেন (১৯২২—২০০১) :— এক অসামান্য চিত্রপরিচালক। বাংলা ও হিন্দি দুই দুনিয়াতেই, উপহার দিয়েছেন মনে রাখার মতো ছবি। প্রথম দুটি ছবি যথাক্রমে ‘চলাচল’ (১৯৫৬) ও ‘পঞ্চতপা’ (১৯৫৭) নির্মাণ করেই আলোড়ন ফেলে দেন। বাংলা ছবির মধ্যে ‘দীপ জ্বেলে যাই’ (১৯৫৯), ‘জীবনতৃষ্ণা’ (১৯৫৭), ‘উত্তর ফাল্গুনী’ (১৯৬৩), ‘আগুন’ (১৯৬২) ইত্যাদি বাংলা ছবি এবং ‘মমতা’ (১৯৬৬), ‘খামোশী’ (১৯৬৯), ‘সফর’ (১৯৭০), ‘আনাড়ী’ (১৯৭৫), ‘বৈরাগ’ (১৯৭৬) ইত্যাদি হিন্দি ছবিগুলি অসিত সেন পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবির উদাহরণ।
১২০। বীরেন নাগ :— বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রযোজিত ‘বিশ সাল বাদ’ (১৯৬২), ‘কোহরা’ (১৯৬৪) ইত্যাদি ছবির সফল পরিচালক। ১৯৬৪ সালে অত্যধিক মানসিক চাপের ফলে আকস্মিকভাবে প্রয়াত হন বীরেন নাগ।
১২১। বিশ্বজিৎ :— ১৯৩৭ সালে জন্ম বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের। বাংলা ও হিন্দি ছবির জগতের একজন জনপ্রিয় নায়ক। বাবা রণজিৎ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ডাক্তার। ছোটো থেকেই অভিনয় ও গানের নেশা ছিল। প্রথম অভিনয় সরোজ দে—র ‘ডাকহরকরা’ ছবিতে। চিত্ত বসু পরিচালিত সুপার হিট ছবি ‘মায়ামৃগ’—র নায়ক বিশ্বজিৎ অচিরেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান। প্রথম হিন্দি ছবি ‘বিশ সাল বাদ’। বাংলা ও হিন্দি জগতে অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করে দীর্ঘদিন জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিলেন। ‘দাদাঠাকুর’, ‘দুই ভাই’, ‘গোধূলীবেলায়’, ‘চৈতালী’, ‘শেষ পর্যন্ত’, ‘কুহেলি’, ‘বাবা তারকনাথ’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘দো শিকারী’ (হিন্দি), ‘মেহমান’ (হিন্দি), ‘দো আঁখে’ (হিন্দি), ‘কহতে হ্যায় মুঝকো রাজা’ (হিন্দি) ইত্যাদি জনপ্রিয় ছবির নায়ক ছিলেন বিশ্বজিৎ। ‘মায়ামৃগ’, ‘এক পেয়ালা কফি’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ইত্যাদি মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। একসময় নিয়মিতভাবে রেকর্ডে গান গেয়েছেন। ‘যায় যায় দিন…’, ‘তোমার চোখের কাজলে…’ ইত্যাদি আরো কিছু জনপ্রিয় বাংলা গানের গায়ক ছিলেন বিশ্বজিৎ।
