আনন্দধারা – ৪

সালটা ১৯৪৫ এর প্রথম দিক।

সেইসময় অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়৭৮ একদিন ডেকে বললেন, ‘একটা ছবি করছি, তোকে মিউজিক ডাইরেক্টর করব। কী রে, পারবি তো?’

নির্ভয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, কেন পারবো না।’

যদিও তখন আমি সংগীত পরিচালকের সব কাজ জানি না। সহকারী হিসেবে যেটুকু শিখেছি। তবে আমার তো ওই এক সুবিধে। ভয় আমি কোনো ব্যাপারে পাইনা। না জানি, শিখে নেবো। দায়িত্ব পড়লে না শিখে উপায় আছে!

সময়টা তখন আমার ভালোই বলতে হবে। কারণ আবার একটা সংগীত পরিচালক হবার সুযোগ এসে গেল। বিকাশ রায় তখন আমার খুব বন্ধু। বিকাশ এসে বললে, ‘জ্যোতির্ময় রায়৭৯ একটা নতুন ছবি করছেন। তোমার কথা বলছিলেন। একদিন গিয়ে দেখা করো।’

দেখা করলাম। জ্যোতির্ময় রায় বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনাকে সংগীতের ভারটা দিচ্ছি। হেমেন গুপ্ত৮০ পরিচালক। ছবির নাম ‘অভিযাত্রী’।’

কাজটা পেয়ে গেলাম। ওদিকে তখন অর্ধেন্দুবাবুর ‘পূর্বরাগ’ও শুরু হয়েছে। দুটো ছবিরই কাজ চলছে। দুটোর সংগীত পরিচালকই আমি। জ্যোতির্ময়বাবুর ছবিই শেষ হল আগে। তবু আমার প্রথম ছবি হিসেবে অর্ধেন্দুবাবুর ‘পূর্বরাগ’—ই সকলকে বলি। কারণ জ্যোতির্ময়বাবুর ছবির কাজ আগে শুরু হলেও অর্ধেন্দুবাবু কথা দিয়েছিলেন তাঁরও আগে। যাইহোক, সহকারী সংগীত পরিচালক থেকে এবার আমি সংগীত পরিচালকের আসনে এসে বসলাম। খুলে গেল আর একটা নতুন পথ।

তখনকার দিনে অবশ্য গানের বিভিন্ন পথে রোজগার না হলে সংসার চলতো না শিল্পীর। আজতো অনেক শিল্পী শুধু ফাংশানে গান করেই গাড়ি—বাড়ি করছে। আমাদের সময় তা সম্ভব ছিল না। তখন আর ক’টা ফাংশান হতো। আর টাকা যা পেতাম সেতো কিছুই নয়। এছাড়া কবে একটা প্লে—ব্যাক পাবো, কবে একটা সংগীত পরিচালনা করবো। একেবারে যাকে বলে অনিশ্চিত রোজগার। মাস মাইনের রোজগারের মধ্যে ছিল গানেরট্যুশানি। অনেক শিল্পী আবার ট্যুশানি করা পছন্দ করতেন না। কিন্তু আমি করতাম। তখন ট্যুশানি না করলে খাবো কি।

এইসময় আমি গ্রামাফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুমে গানের ক্লাস নিতাম। এ সুযোগটা কোম্পানিই আমাকে দিয়েছিল। অনেক ছাত্রছাত্রী পেলাম। একটা বাঁধা রোজগারের ব্যবস্থাও হল।

এদিকে বাড়িতে গিয়ে গান শেখানোটাও চালিয়ে যাচ্ছি। ঘড়ি ধরে কাজ করতে হচ্ছে। সারা কলকাতা জুড়ে আমার কাজ। অথচ এইসব কাজ বজায় রাখতে হচ্ছে ট্রামে বাসে চড়ে। নিজের একটা গাড়ি থাকলে এর থেকে আরও বেশি কাজ করতে পারি তখন। তাই ঠিক করলাম একটা গাড়ি কিনতে হবে। এসব ব্যাপারে আমি তো বরাবর বেপরোয়া। ভরসা করে কিনে ফেললাম একটা ‘মরিস এইট’। আর তারপরই রোজগার বাড়াবার জন্যে দ্বিগুণ উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়লাম কাজে।

সেই সময় আমি কয়েকটা ছবিতে সংগীত পরিচালকের কাজ পেলাম। ‘ভুলি নাই’, ‘সন্দীপন পাঠশালা’ এইরকম আরও দু’একটা ছবি। প্লে—ব্যাকের কাজও তখন পাচ্ছি বেশ। অনেক মিউজিক—ডাইরেক্টর আমাকে দিয়ে গান গাওয়াচ্ছেন। সময় করে সব কাজই আমি করতে পারছি। কারণ তখন আমার নিজের গাড়ি হয়েছে। ট্রামে বাসে এতদিন সময়ের যা অপচয় হচ্ছিল, তা সুদে—আসলে তুলে দিচ্ছে ছোটো মরিসটা।

ভি শান্তারাম৮১ তখন বম্বের একজন সেরা পরিচালক। ভীষণ নাম তখন শান্তারামজীর। সেই উনি এবার আমাকে ওঁর ছবিতে সংগীত দেবার জন্যে ডাকলেন। ছবির নাম ‘শিবশক্তি’। মানসাটা ফিল্মের সুখেন্দুবাবুই সুপারিশ করেছিলেন আমাকে নেবার জন্যে। গেলাম বম্বে। সঙ্গে গেলেন গীতিকার সুবোধ পুরকায়স্থ৮২।

শান্তারামজীর সঙ্গে ছবির বিষয় নিয়ে অনেকক্ষণ আলাপ—আলোচনা হল। উনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি পারবেন তো?’

আমি বললাম, ‘কিচ্ছু ভাববেন না শান্তারামজী। আমার গানের গুরু হলেন রবীন্দ্রনাথ। যে কোনো বিষয়েই ছবি করুন না, সব পাওয়া যাবে রবীন্দ্রকোষ থেকে। অফুরন্ত ভাণ্ডার ওঁর। সব আছে। আপনাকে আমি রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামা’ শোনাচ্ছি, তাহলেই বুঝতে পারবেন। আমি আপনাকে ব্যাখ্যা করে সব বুঝিয়ে দেবো।’

শান্তারামজী প্রথমে আমার কথায় তেমন গুরুত্ব দেন নি। কিন্তু পরে ওঁকে ‘শ্যামা’ শুনিয়ে মোহিত করেছিলাম। উনি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিলেন। আর আমি ধন্য হয়েছিলাম। ধন্য হয়েছিলাম এইজন্যে যে শান্তারামজীর মত একজন শ্রেষ্ঠ পরিচালককে সোনার খনির সন্ধান দিতে পেরেছি বলে। সবই হয়েছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত ছবিটা হয় নি। তাই দু—তিন মাস বম্বেতে থাকার পর আবার ফিরে এসেছিলাম কলকাতায়।

কিন্তু বম্বে থেকে ফিরে এসে শুনলাম আমার নামে একটা অপবাদ রটেছে। আমি যখন বম্বেতে, তখন আর্টিস্টরা অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ধর্মঘট করে। ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশান। আমি আবার তখন আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশানের সেক্রেটারী। আমি নাকি দায়িত্ব এড়াতে বম্বেতে পালিয়েছি। এইসব কথাই আমার শিল্পী—বন্ধুরা রটিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমি যে একটা ছবির কাজ নিয়ে বম্বে গিয়েছিলাম সেকথা একবারও ভেবে দেখেনি কেউ।

কলকাতায় ফিরে যখন এই মিথ্যে অপবাদটা আমার কানে এলো তখন মনে মনে আহত হলাম খুবই। কারণ আমি যেমন কোনো ব্যাপারে ভয় পাইনা, তেমনি অসৎ কাজকেও আমি ঘেন্না করি। পাঁচজনের চোখে ধুলো দিয়ে আমি লুকিয়ে বেড়াবো, এমন স্বভাবকে আমি কোনোদিনই প্রশ্রয় দিই নি। লুকোচুরি আমার ধাতে সয় না। আমি যা করি তা সকলকে জানিয়েই করি। অন্যায় যারা করে তারাই পাঁচজনকে লুকোয়।

আমার মনে আছে, যখন আমি ইন্দুবালার৮৩ বাড়িতে যেতাম তখন অনেক বারবণিতার সঙ্গে আমাকে আলাপ করতে হয়েছে। তারা আমার গানের ভক্ত। যেচে এসে আলাপ করেছে। গান নিয়ে আলোচনা করেছে। এদের সঙ্গে যখন রাস্তায় দেখা হয়েছে তখন আমি এদের এড়িয়ে যাইনি। পরিচয়টাকে অগ্রাহ্য না করে সমান আগ্রহে পাঁচচোখের সামনে এদের সঙ্গে কথা বলেছি। এদের মর্যাদা দিয়েছি আর পাঁচজনকে যেমন দিয়ে থাকি। এদের ব্যক্তিগত পেশার কথা ভেবে লজ্জা পেয়ে পালিয়ে যাইনি।

বম্বে থেকে ফিরে এসে আবার দু’একটা ছবিতে সুর দিলাম। পশুপতি চ্যাটার্জীর৮৪ ছবি, হেমেনদার ‘বিয়াল্লিশ’। সেই সময় দেশের চতুর্দিকে গোলমাল। দুর্ভিক্ষে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতে কত লোকের প্রাণ গেল। কত মা সন্তানহারা হল, কত স্ত্রীর চোখের সামনে স্বামী খুন হল। কত বাপ পুত্রশোকে পঙ্গু হয়ে গেল। কিছু শুনলাম, কিছু দেখলাম। তারপর এলো স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীন হলাম। সারা ভারতের লোক স্বাধীন হল। সাদা শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কালাআদমিরা হাত বাড়িয়ে নিলো স্বাধীনতার সইকরা কাগজ। শাসনযন্ত্রকে জোরদার করবার জন্যে নতুন পুরোনো মিলিয়ে জড়ো হল অনেক মগজ। পুরোনোরা টাই—প্যাণ্ট ছেড়ে খদ্দর পরলেন। দেশ ভাগ হয়ে পেলাম স্বাধীনতা। দু’দেশ স্বাধীনতা ভাগ করে নিলাম। সেইসঙ্গে দেশের লোকের সৌভাগ্যও ভাগাভাগি হয়ে গেল অনেকখানি। আজও সেই ভাগাভাগিই চলছে।

স্বাধীনতা উৎসবে আমি তখন গান গেয়ে বেড়াচ্ছি। রেডিওতে গাইছি ‘দেশ হামারা হিন্দুস্থান, সবসে সুন্দর হিন্দুস্থান’। এইসব করছি তখন।

এবার একটা বাড়ি কেনবার ইচ্ছে হল। কিন্তু টাকা কোথায়? টাকা যোগাড়ের আগেই গাড়ির সন্ধান পাওয়া গেল। টালিগঞ্জের আজাদগড়ে একতলা তৈরি বাড়ি। সামনে বাগান। সব মিলিয়ে সাত কাঠা জমি। পছন্দ হয়ে গেল। বেলারও পছন্দ হয়ে গেল খুব। ও বললে, ‘কিনে তো ফেলো তারপর দেখা যাবে।’

তাই হল। ধার করে বাড়িটা কিনে ফেললাম।

ভাড়াবাড়ি ছেড়ে নিজের বাড়িতে উঠে এলাম। খুব খুশি। সবাই খুশি। কিন্তু এ বাড়িতে আমি দু’মাসের বেশি থাকতে পারলাম না। বম্বে চলে যেতে হল।

প্রথমে আমার একদম ইচ্ছে ছিল না। হেমেনদা বম্বেতে ছবি করতে যাচ্ছেন। ফিল্মিস্তান৮৫ ‘আনন্দমঠ’ তুলছে। পরিচালক হেমেন গুপ্ত। হেমেনদা আমাকে বললেন, ‘তুমিও চলো।’ ‘আনন্দমঠে’র মিউজিক। লোভনীয় প্রস্তাব। কিন্তু কলকাতা ছেড়ে থাকবো কী করে! তাই প্রস্তাবটা গ্রহণ করবার জন্যে মনের সায় পেলাম না।

বেলা বললে, ‘কলকাতা ছাড়তে হবে তো কি হয়েছে! এমন চান্স ছাড়তে আছে! না, তুমি রাজি হয়ে যাও। চলো বম্বে।’

অগত্যা রাজি হলাম। হেমেনদাকে বললাম, ‘যাবো, তবে একটা ছবির কাজ যে কিছুটা বাকি রয়ে গেল। অজয় করের৮৬ ‘জিঘাংসা’ ছবির মিউজিক দিচ্ছি। গানগুলো হয়ে গেছে। বাকি আছে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।’

হেমেনদা বললেন, ‘ছবি তো এখনও শেষ হয়নি। ছবি শেষ হোক, তখন একফাঁকে এসে ব্যাকগ্রাউন্ড করে দিয়ে যেও। এখন চলো তো বম্বে।’

উনিশশো একান্ন সালের মার্চ মাসে বম্বে গেলাম। তুলারাম জালানের ফিল্মিস্তান দেখলাম। জালান নামেই মালিক। ফিল্মিস্তানের আসল জ্বালানি হলেন শশধর৮৭ মুখার্জী। উনিই সর্বময় কর্তা। উনি যা করবেন তাই হবে। ওঁর মতামতই চূড়ান্ত সব ব্যাপারে। দেখলাম, সবাই ওঁকে বাঘের মতো ভয় করে। ভীষণ ব্যক্তিত্ব। ওঁকে দেখলেই কুঁকড়ে যায় সবাই। আমি অবশ্য কুঁকড়ে যাই নি। কাজ করতে এসেছি ওঁদের ডাকেই। না হলে ফিরে যাবো। আর আমার তো তখন কলকাতার বাজার বেশ ভালোই। কিছু খোয়া যাবার আশঙ্কাই তো মানুষকে ভীতু করে দেয়। জীবনকে হারাতে চায় না বলেই তো মানুষ মৃত্যুকে এত ভয় করে চলে। নইলে তার কিসের ভয়? কাকেই বা ভয়?

শশধর মুখার্জী বললেন, ‘তুমি তো ভাড়াখাটা মিউজিক ডাইরেক্টর। ফুরনের কাজ করে এসেছ। কিন্তু ফিল্মিস্তানের নিয়ম একটু অন্যরকম। আমরা বাঁধা লোক রাখি। বাঁধা মিউজিক ডাইরেক্টর হিসেবে কাজ করবে। প্লেব্যাক করবে। তার জন্যে মাসে মাসে মাইনে পাবে। হাজিরাও দিতে হবে আপিসের মতন। এগারোটা থেকে পাঁচটা। তারপর ছুটি।’

চাকরি তো এর আগে কখনও করিনি। তাই একটু নতুন নতুন ঠেকলো। তবু ভাবলাম, হোক একটা নতুন অভিজ্ঞতা। দেখাই যাক না, কেমন লাগে। অতএব রাজি হয়ে গেলাম শশধর মুখার্জীর প্রস্তাবে।

কলকাতা ছেড়ে আসবার সময় আমার গানের ক্লাসটা তুলে দিইনি। ক্লাসটা বেশ জমে উঠেছিল। রোজগারও হচ্ছিল ভালো। তাই ক্লাসটা চালাবার ভার দিয়ে এলাম শচীন গুপ্তকে৮৮। সঙ্গে সমরেশও রইল। গানের ট্যুশানিগুলো বেলা চালিয়ে নিতো। কারণ প্রথম যখন বম্বে আসি তখন বেলা আর ওর ভাইবোনকে নিয়ে আসিনি। তখনও আমার বম্বেতে থাকার জায়গা ঠিক হয় নি। একা এসে উঠলাম হেমেনদার বাড়িতে। মনে মনে তখনও ইচ্ছে ‘আনন্দমঠ’ ছবি করে আবার ফিরে যাবো কলকাতায়।

বম্বেতে তো কাজ শুরু করে দিয়েছি। আপিসের মত রোজই স্টুডিওতে যাই। কিন্তু এদিকে অজয় করের কড়া তাগাদা পাচ্ছি কলকাতা থেকে। ‘জিঘাংসা’ ছবি শেষ। ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্যে শীগগির যেতে হবে।

মিঃ মুখার্জীকে বললাম কথাটা। উনি শুনে বললেন, ‘কাজ শুরু করতে না করতেই ছুটি চাইছো। ভুলে যেওনা এটা আপিস। এক বছর কাজ হোক তারপর ছুটি পাবে।’

আমি বললাম, ‘কিন্তু ওদের যে খুব ক্ষতি হবে তাতে। ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্যে ছবিটা শেষ হয়েও পড়ে থাকবে। ঠিক সময়ে রিলিজ হবে না। অনেক টাকা আটকে থাকবে প্রোডিউসারের। বাংলা ছবির আর্থিক অবস্থা তো আপনি জানেনই।’

ছুটি মঞ্জুর হল। কিন্তু মাত্র তিনদিনের। এই তিনদিনের মধ্যে আমাকে কলকাতায় গিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করে আসতে হবে। মনে মনে ভাবলাম, এ কি সম্ভব! কিন্তু সব ব্যাপারে আমার সাহস তো ভীষণ। মনে জোর আনলাম। চলে এলাম কলকাতায়।

কলকাতায় এসেই কাজে বসে পড়লাম। ঝটপট নোটেশান করে ফেললাম। মিউজিক হ্যান্ডসদের নিয়ে রিহার্সাল দিলাম। তারপরই রেকর্ডিং। সারাদিন সারারাত কাজ করলাম।

অজয় কর মনে মনে খুবই অসন্তুষ্ট হল। বললে, ‘এত তাড়াহুড়ো করে কী ব্যাকগ্রাউন্ড হল?’

এর জবাবে আমি আর কী বলব। কেন যে এত তাড়াহুড়ো করতে হল তা আর বুঝবে কে? ছুটি যে মাত্র তিনদিনের। কিন্তু এটাও ঠিক, তাড়াহুড়ো করলেও মিউজিকে জোড়াতালি দিইনি। পরে সেকথা স্বীকার করেছিল সবাই। ‘জিঘাংসার’ ব্যাকগ্রাউন্ড সত্যি ভালো হয়েছিল।

অনেকের ধারণা খুব দীর্ঘ সময় নিয়ে গানের সুর করলে বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করলে দারুণ একটা কিছু হবে। কিন্তু ধারণাটা ঠিক নয়। আমারও অবশ্য একসময় এইরকম মনে হতো। কিন্তু পরে মত পালটাতে হয়েছে। আমি দেখেছি, সারাদিন ধরে চেষ্টা করেও আমি একটা ভালো সুর করতে পারিনি। আবার এমনও হয়েছে মাত্র আধঘণ্টায় একটা অপূর্ব সুর হয়ে গেছে। যে কোনো শিল্পের ব্যাপারেই কথাটা খাটে। শিল্প তো আর অঙ্ক নয় যে নির্দিষ্ট সময়ের একটু বেশি পাওয়া গেলে নির্ভুল উত্তর সহজে পাওয়া যায়। অঙ্কে দুই আর দুই—এ চার হয়। কিন্তু শিল্পসৃষ্টিতে দুই আর দুই—এ চার হলে চলবে না। এমন হলে লোকে বলবে ফরমুলা হয়ে গেছে। নতুন কিছু সৃষ্টি হয়নি। অতএব সেটা শিল্পই নয়! তাই শিল্পসৃষ্টির ব্যাপারে সময়টা কিছু নয়। প্রয়োজন শুধু নিষ্ঠার, একাগ্রতার। এটা না থাকলে কোনোদিনই কোনো সৃষ্টি সার্থক হতে পারেনা। ‘জিঘাংসা’র ব্যাকগ্রাউন্ডে সময় দিয়েছিলাম কম, কিন্তু পুরো কাজটা প্রায় ধ্যানস্থ হয়ে করতে হয়েছিল।

যাইহোক, ‘জিঘাংসা’র কাজ শেষ করে আবার ফিরে এলাম বম্বেতে। আবার সেই নিয়মিত ফিল্মিস্তানে হাজিরা দিই। বসে বসে গানের সুর করি।

ছুটির পর একা একা ভালো লাগে না। কলকাতায় কত কাজ ছিল, আর এখানে শুধু ফিল্মিস্তানের চাকরি। এখানে বন্ধু বলতে তখন প্রদীপ বটব্যাল৮৯ আর মান্না লাডিয়া৯০। এদেরই সঙ্গে বসে আড্ডা দিই।

মনে মনে ঠিক করলাম, এবার বেলাকে নিয়ে আসতে হবে বম্বেতে। অতএব একটা বাড়ির দরকার। কিন্তু এখানে তো বাড়িভাড়া ভীষণ চড়া। রোজগার বলতে তখন শুধু দেড়হাজার টাকা। বাঁধা মাইনে। কলকাতায় খাটুনি ছিল বেশি কিন্তু আয় তখনও এর দ্বিগুণ।

একটা বাড়ির সন্ধান পেলাম। ছেলেটি আমার পরিচিত। নাম নীহার। বললে, ‘আমার একটা বাড়িভাড়া নেওয়া আছে। অনেক আগে নেওয়া বলে ভাড়াটা একটু কম। আমার দখলে তিনখানা ঘর। আপনাকে দুটো ঘর দিতে পারি। তবে আরও দু—ঘর ভাড়াটে আছে ওই ফ্ল্যাটে। এই তিনঘর ভাড়াটের একটা মাত্র বাথরুম। কমন—বাথরুমে যদি আপনার আপত্তি না থাকে তো আপনাকে দুটো ঘর সাবলেট করতে পারি।’

বেলা ইতিমধ্যে ওর ভাইবোনদের নিয়ে চলে এসেছে। ভাইবোন বলতে আভা, ঘুণ্টু, মনু আর খোকন। গোপাল শুধু থেকে গেছে কলকাতায়। সামনেই ওর পরীক্ষা। পরে আসবে।

বেলা শুনে বললে, ‘এ—বাড়িটাই নেওয়া যাক। কম ভাড়া। একটু অসুবিধে তো হবেই। সে আমরা চালিয়ে নেবো।’

আমিও রাজি। রাজি না হয়ে উপায় কি। তখন আমার আর্থিক দিকটা বেশ দুর্বল। মাইনে পনেরোশো। ট্যাক্স বাদ দিয়ে হাতে পাই চোদ্দোশো পঞ্চাশ। কলকাতার বাড়ির দেনা মাসে মাসে শোধ করতে হয়। মাকে প্রতি মাসে টাকা পাঠাই। এইসব মিটিয়ে আমার সংসার চালাবার জন্যে থাকে মাত্র তিনশো টাকা।

এই তিনশো টাকাতে তখন কী করে যে সংসার চালাতো বেলা, ওই জানে। একবেলা ভাত আর একবেলা রুটি। রাত্তিরে শুকনো রুটি আর তারসঙ্গে একটা আলুর তরকারি। ডিম যেদিন হতো সেদিন ভাগে আধখানার বেশি পেতোনা কেউ। তবু সেদিন কিন্তু আমাদের সকলের মুখে হাসি ছিল। এত কষ্ট করে থেকেও মনে হতো যেন খুব সুখে আছি। কত শান্তিতে আছি। আমি অভাবের সংসারে মানুষ হয়েছি। তাই আমার কাছে অভাবটা অচেনা—অজানা নয়। অভাবের গলা জড়িয়েই তো আমাকে এগোতে হয়েছে।

যাইহোক, এবার ‘আনন্দমঠ’ ছবির কাজ শুরু হল। ‘বন্দেমাতরম’ গানের সুর করতে হবে। গান কে গাইবে? লতাকে দিয়ে গাওয়াতে হবে। কথাটা বললাম শশধর মুখার্জীকে।

তিনি বললেন, ‘লতা ফিল্মিস্তানে আসবে না। ও অনেক ব্যাপার। এদিকে সি. রামচন্দ্র৯১ও ফিল্মিস্তান ছেড়ে দিয়েছে। ও তুমি অন্য কাউকে দিয়ে গান গাওয়াও।’

মহাচিন্তায় পড়ে গেলাম। এ গান লতাকে দিয়ে না গাওয়াতে পারলেতো সব মাটি। একে আমি নতুন, তার ওপর লতা ছাড়া আর কাউকে দিয়ে গাওয়ালে কী দাঁড়াবে কে জানে! মনে মনে একটা প্ল্যান ঠিক করে ফেললাম। প্ল্যান ঠিক করার পর আবার ধরলাম মিঃ মুখার্জীকে। বললাম, ‘আপনি বলছেন লতা আসবে না! কিন্তু আমি যদি ওকে আনতে পারি তাহলে আপনাদের কোনো আপত্তি আছে কী?’

উনি শুনে বললেন, ‘না, আমাদের তরফ থেকে কোনো আপত্তি নেই। বরং ও এলেই ভালো হয়। কিন্তু আমি, তোমায় বলছি ও আসবে না।’

সব ব্যাপারেই আমি নিজে এগিয়ে গেছি। অতএব এ—ব্যাপারেও আমি কারোর সাহায্য ছাড়াই এগোলাম। একদিন গিয়ে দেখা করলাম লতার সঙ্গে।

তখন লতা ‘নানাচকে’ একটা একতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতো। সোজা চলে গেলাম লতার কাছে। খুব আদর আপ্যায়ন করল। ছোট্ট এইটুকু একটা মেয়ে, কী অসাধারণ নাম করেছে! মুগ্ধ হলাম। আরও মুগ্ধ হলাম ওর ব্যবহারে। প্রথম আলাপেই খুবই অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলাম। তারপর আমার প্রস্তাব পেশ করলাম।

লতা শুনে বললে, ‘যদিও ফিল্মিস্তানের সঙ্গে আমার ঝগড়া, আমি ওখানে গাইবোনা ঠিক করেছি, কিন্তু শুধু আপনার জন্যে গাইবো।’

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘টাকা কত বলবো?’

ও বলল, ‘শুধু আপনার জন্যে গাইছি। পয়সার জন্যে নয়। সুতরাং ফিল্মিস্তানের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কথা বলার দরকার নেই।’

তারপর রিহার্সাল শুরু হল ‘বন্দেমাতরম’ গানের। লতা আমার বাড়িতে এসে রিহার্সাল দিলো তিনদিন। যা ও সচরাচর করে না। সেই ১৯৫১ সালের বোধহয় মে মাস থেকে ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল এবং এখনও সেই সম্পর্ক একইরকম রয়েছে। লতার সম্বন্ধে অনেকে অনেককিছুই বলে। কারণ সবাই নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে। অন্যদিকে লতার কী অসুবিধে তা চিন্তা করেনা কেউ। অবশ্য জগতের নিয়মই এই।

‘বন্দেমাতরম’—এর গানের যেদিন টেক সেদিনতো আমার আবার দুশ্চিন্তা শুরু হল। গানতো পছন্দ হয়েছে কিন্তু এবার মিঃ মুখার্জীকে টেক পছন্দ করাতে পারলেই কাজ হাসিল।

কিন্তু এবার বাদ সাধলেন হেমেনদা। ছবির পরিচালক হেমেন গুপ্ত। অতএব ওঁর মতামতই চূড়ান্ত। গান টেক হচ্ছে। খুব ভালো গাইছে লতা। খুব দরদ দিয়ে গাইছে। গেয়ে খুশিও হচ্ছে লতা। কিন্তু একটুও খুশি হচ্ছেন না হেমেনদা। প্রতিটি টেক হচ্ছে আর উনি বিরক্ত হয়ে বলছেন, ‘প্রাণ পাচ্ছি না।’

লতা নিজের গান নিজেই যাচাই করে ভালোমন্দ রায় দেয়। মিউজিক ডাইরেক্টররা লতার গানের ব্যাপারে কোনো কথা বলেন না। ছবির পরিচালকরাও লতাকেই বিচারকের আসনে বসিয়ে ওর রায় শোনার জন্যে কান খাড়া করে থাকেন। আর সেই লতাকে কিনা নস্যাৎ করে দিচ্ছেন হেমেনদা! পর পর আটটা টেক হল, কিন্তু একটাও পছন্দ হল না পরিচালক হেমেন গুপ্তর।

আমি তো তখন অন্য আশঙ্কা করছি। এত সেধে লতাকে নিয়ে এলাম ফিল্মিস্তানে। হেমেনদার ব্যবহারে এখন যদি রেগেমেগে চলে যায়, তাহলে সব শ্রম পণ্ড।

লতা খুব বুদ্ধিমতী। আমার অবস্থাটা বুঝলো। বলল, ‘দাদা, তোমার কোনো ভয় নেই। তোমার গান টেক করে আমি যাবো। যতক্ষণ না ওঁর পছন্দ হয় আমি গান করে যাবো।’

মনে আছে, সেদিন লতার গান পছন্দ করাতে কম করে কুড়ি একুশটা টেক করতে হয়েছিল। আমার সুরে প্রথম রেকর্ড হল ফিল্মিস্তানে। আর লতার জীবনেও কুড়ি একুশটা টেক বোধহয় এই প্রথম।

‘আনন্দমঠ’—এর গীতিকার শৈলেন্দ্র—এর সঙ্গে তখন বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। একটা গান তো লতা করলো। এবার নতুন যে গানটা লিখলো সেটা তালাত৯২কে দিয়ে গাওয়ানো হল। তারপর যে গানটা লিখলো সেটার সুর করলাম একটু নতুন কায়দায়। এ গানটা গাইবে দু’জনে। একটা পুরুষকণ্ঠ আর একটা স্ত্রীকণ্ঠ। গীতা দত্ত৯৩ আর আমি দু’জনে মিলে গাইবো। হেমেনদা গানের সিচুয়েশানটা বুঝিয়ে দিলেন। আমিও সেই সিচুয়েশন অনুযায়ী সুর সৃষ্টি করলাম।

এবার রেকর্ড করতে হবে। রেকর্ডিস্ট মিঃ মিস্ত্রী এ—লাইনে পাকা লোক। ওঁকে বুঝিয়ে বললাম গানের কায়দাটা। সংস্কৃত শ্লোক সুর করে গাইবো আমি—’জয় জগদীশ হরে।’ এটা হবে খাদে। আর গীতা গাইবে খুব মিহি আর চড়ায়। দূর থেকে ভেসে আসছে যেন—’কেশব…।’ আর এই দুদিক থেকে দুটো সুরেলা স্বর, একটা বজ্রগম্ভীর আর একটা কোমল মিহি, মিশছে এসে একজায়গায়। সুরে সুরে সঙ্গম যাকে বলে।

একটু ভেবে নিলেন মিঃ মিস্ত্রী। সুরে সুরে মালাবদলের মতোই প্রায় ব্যাপারটা। একটু কায়দা করতে হবে। শেষে উনি বললেন, ‘ঠিক আছে, হয়ে যাবে।’

সেই গান রেকর্ড হল। খুব ভালো ভাবে উতরে গেল। সবাই খুশি হলেন। আর আমি তো খুশি হবোই। এই ধরনের সুর করাটাই ছিল তখন আমার নিজস্ব স্টাইল। কিন্তু এই স্টাইলকে ধরে রাখতে পারলাম না। কালের হাওয়ায় কোথায় হারিয়ে গেল। পরে অবশ্য এই স্টাইলকে আবার ফিরিয়ে এনেছিলাম কয়েকটা গানে। কিন্তু ‘মিনি’ চোখের সামনে ঘুরলে ‘ম্যাকসির’ দিকে নজর দেয় কেউ?

যাইহোক, আমার সেই ‘আনন্দমঠ’—এর ‘জয় জগদীশ হরে’ গানটাকে সবাই ভালোবেসে ফেলল। আজও এ গানটা রেডিওতে বাজে। শুনে তারিফও করে এখনও অনেকে। সেই অনেকের মধ্যে একজন হল সিমি৯৪। ও আমার গানের খুব ভক্ত। ভক্তের কাজই হল স্বদেশে বিদেশে নামগানের প্রচার। আর সেই ভক্ত যদি একটু হোমরা’চোমরা হয় তাহলে তো কথাই নেই। এই সিমিই আমাকে সাগরপারের সংগীত পরিচালক হবার সুযোগ করে দিয়েছিল ‘জয় জগদীশ হরে’ গানটার মাধ্যমে। সেকথা পরে বলছি।

এইভাবে শেষ হল ‘আনন্দমঠ’। আমি তো তখন মনে মনে ঠিক করছি, এইবার সরে পড়তে হবে। আবার ফিরে যাবো কলকাতায়। এখানে পড়ে থেকে কি হবে! টাকাও যা পাই তাতে সংসার চলে না। বান্দ্রাতে একটা বাড়িভাড়া নিয়েছি তখন। সে একেবারে মাঠের মাঝখানে। বৃষ্টির দিনে একহাঁটু জল জমে যায় বাড়ির চারপাশে। মনে আছে ‘আনন্দমঠ’—এর ব্যাকগ্রাউন্ড করে একদিন রাত্তির দুটোর সময় বাড়ির সামনে এসে কী বিপদেই না পড়েছিলাম! সে কী বৃষ্টি সেদিন!

অত রাত্তিরে আমি একা ফিরছি। বাড়ির কাছাকাছি এসে আমি তো থ’। সারা মাঠ জলে থৈ—থৈ করছে, আর তারই মাঝখানে আমাদের বাড়িটাকে দেখাচ্ছে যেন ভূতের মতন। একে রাতদুপুর, তার ওপর সারাদিন খাটুনি হয়েছে প্রচুর। সেই অবস্থায় আমাকে জল ভেঙে এগোতে হবে। সেদিন সেই এক পা এক পা করে এক কোমর জল ঠেলে ঠেলে বাড়ির চৌকাঠ ছুঁতে বেশ কসরৎ করতে হয়েছিল। কিন্তু ঘরে পা দিয়েই জয়ের হাসি। পেরেছি। এই পারাটাই হল সব, এ কথা বুঝেছি বাধার সামনে পড়ে।

মানুষের জীবনে বাধা আসবেই। সেই বাধাকে ভেদ করে এগিয়ে না গেলে লক্ষ্যে পৌঁছোনো যায় না। যাঁরা এই বাধার পাশ কাটিয়ে এগোতে চান তাঁরা কিন্তু সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারেন না।

সেটা বুঝলাম নিজেকে দিয়েই। আমিও তো তখন পাশ কাটাবার চেষ্টা করছি। পাততাড়ি গুটিয়ে ফিরে আসতে চাইছি কলকাতায়। কিন্তু যাঁর পাশ কাটাবো তিনিতো পাহাড়ের মতো রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে। মিঃ মুখার্জী তখন আমাকে সিধে করবার জন্যে যাতা বলছেন। দেখা পেলেই বলছেন, ‘এখানে এইভাবে চললে চলবে না। ওসব ধুতিটুতি ছেড়ে প্যান্ট পরো। স্মার্টলি চলাফেরা করো। ঘোরো এখানে সেখানে। দরকার হলে দু’চারটে মেয়ের সঙ্গে প্রেম করো। এইসব না করলে সুরের মধ্যে লাইফ আনবে কি করে?’

এইসব বলতেন উনি। কিন্তু আমার তো পোশাক, ধুতি আর হাত গোটানো শার্ট। এটা ছাড়া তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মনের সায়ও নেই। তাই ওঁর কথাগুলো শুনলেও কাজে লাগাতাম না। কাজে লাগাতাম ওঁর একটা কথাই—ভালো সুর করতে হবে। কোন সুরই ওঁর পছন্দ হয় না। ওঁকে ঘায়েল করতে হলে সুরের বাণ মারতে হবে।

‘আনন্দমঠ’—এর পর আবার একটা ছবিতে লাগিয়ে দিলেন আমাকে। আবার সেই কড়া ধমক, ‘নাও, মন দিয়ে সুর করো।’

মিঃ মুখার্জী স্টুডিওতে যাতা বলেন। অবাক্য কুবাক্য কিছুই আটকায় না ওঁর মুখে। কিন্তু এই মিঃ মুখার্জী বাড়িতে একেবারে অন্য মানুষ। আপিসের সেই ঝাঁঝালো কথা কোথায় উবে গেছে। হাসি—ঠাট্টা, গল্পগুজব। তখন এক অন্য মেজাজ মিঃ মুখার্জীর। দেখে মনে হতো যেন অভিনয় দেখছি। উনি আমার মুখের ভাব দেখে বুঝতে পারতেন। বলতেন, ‘খুব আশ্চর্য হচ্ছো তো? আরে ওটা হল আপিস। ওখানে কি নরম হলে চলে। আপিসের ডিসিপ্লিন বজায় রাখতে না পারলে কাউকে দিয়ে কাজ করানো যাবে? কিন্তু বাড়িতে তুমি আমার বন্ধু।’

সে—কথা একশোবার। ওঁর বাড়িতে গেলে মনে হয়েছে যেন এক পরমাত্মীয়ের বাড়িতে এসেছি। শুধু উনি একা নন, ওঁর স্ত্রী, ছেলে—মেয়েরা সবাই হয়ে উঠেছে আপনজনের মতো। আজও সেই সম্পর্ক আছে ওঁর বাড়ির সঙ্গে। চিরকাল থাকবেও।

এবার যে ছবিটা পেলাম তার নাম ‘শর্ত’। পরিচালক বিভূতি মিত্র। ভীষণ মেজাজ। কড়াকড়া কথা। আমাকে নেবার ইচ্ছে ছিল না ওঁর। মিঃ মুখার্জী জোর করে লাগিয়ে দিয়েছেন। ওঁর ইচ্ছে ছিল মদনমোহনকে৯৫ দিয়ে মিউজিক করাবেন। তা সেকথা জোর দিয়ে বলতে পারছেন না মিঃ মুখার্জীকে। সেই ঝালটা ঝাড়ছেন আমার ওপর।

‘শর্ত’ ছবির গানের কাজ শুরু হল। বিভূতি মিত্র ডাইরেক্টর এবং তখন ওঁর খুব নাম। অবশ্য গানের ব্যাপারে মিঃ মুখার্জীর মতামতই চূড়ান্ত। ‘শর্ত’—এর প্রথম গান রেকর্ড হল। গান লিখেছিল শৈলেন্দ্র। গানটি ভালোই ছিল, কিন্তু রেকর্ডিং ভালো হয়নি। অর্কেস্ট্রা বেশি হওয়াতে গানটি অস্পষ্ট হয়েছে। বিভূতিবাবু সেটা বুঝলেন না। খুব রেগে গেলেন এবং আমাকে যথেষ্ট অপমানকর কথা বললেন। আমি দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে রইলাম, কিছু বললাম না কারণ আমি জানি যে, যতক্ষণ আমার মিউজিক ডাইরেক্টর হিসেবে নাম না হচ্ছে ততক্ষণ আমার মতামতের কোন মূল্য নেই। এ ব্যাপারটি এতই অদ্ভুত যে ভাবলে হাসি পায়। আমি কিন্তু ভালো এবং মন্দের বিচার করবার সবসময় চেষ্টা করেছি। আমার জীবনে বহু সুরকার যাদের তেমন প্রতিষ্ঠা নেই, তাঁদের গান মন দিয়ে শুনেছি এবং যে গান ভালো লেগেছে, সে গান করেছি। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, যখনি কেউ নাম করলো তখন সে যা করছে তাইতে সবাই বাহবা দিচ্ছে। কত খারাপ সুরকে শ্রেষ্ঠ সুর বলে সবাই হৈ—চৈ করছে—তাও দেখেছি। আমি তখন নতুন, সুতরাং জানি এই সব দুর্গম পাঁচিল পার হতে পারলে তবেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব।

‘শর্ত’—এর প্রথম গানটি যখন ভালো হল না, তখন মিঃ মুখার্জী একজন শায়র অর্থাৎ গীতিকার ঠিক করলেন যে সারাদিন আমার সঙ্গে থাকবে। তার নাম এস. এইচ. বেহারী। বেহারীকে নিয়ে কাজ শুরু করলাম। ওকে নিয়ে আরেকটা সুবিধা হল, ও বাংলা জানে। তাছাড়া অনেক সময় দিতে পারবে—যেটা আমার খুবই দরকার। এক একটি সিচুয়েশনে অনেকগুলো করে গান তৈরি করলাম। আর মাস্টারমশাইকে পড়ার পরীক্ষা দেবার মতো প্রতিদিন মিঃ মুখার্জীকে শোনাতে লাগলাম গান। মনে আছে, একটি সিচুয়েশনে একুশখানা গানের মুখড়া করেছিলাম এবং তার মধ্যে থেকে মিঃ মুখার্জী ঠিক খাঁটি সোনাটি বেছে নিলেন—সে গানটি হচ্ছে ‘না ইয়ে চাঁদ হোগা’ আজও অমর হয়ে আছে। মিঃ মুখার্জীর মিউজিক সম্বন্ধে রায় প্রায়ই ঠিক হতো। উনি বলতেন, ‘আমি মিউজিক কিছুই জানি না বলেই প্রায় ঠিক ধরতে পারি কোনটা ভালো? মিউজিক জানলে বলা শক্ত হতো এবং ভুলই হতো।’

এই ভাবে ‘শর্ত’—এর বোধহয় আটখানা গান হল। ছবি রিলিজ—এর আগে কয়েকটি গান রেডিওতে বাজানোর জন্য খুব সমাদর লাভ করলো।

ওদিকে তখন ‘আনন্দমঠ’ রিলিজ হয়েছে। আমার প্রথম ছবি। অনেক পরিশ্রমের ফল। কিন্তু হলে কি হবে, ধানেই যে পোকা ধরলো! বই না চললে আর গান শুনবে কে? পাত্র ফেটে চৌচির হয়ে গেলে, তাতে অমৃত ছিল, না বিষ ছিল সে আর যাচাই করে দেখবে কি করে লোকে?

আমি তো বুঝলাম আমার এখানেই শেষ। এবার সোজা পাড়ি দিতে হবে কলকাতায়। নিজের জায়গায় আবার ফিরে যাবো। এই বেশ ভালো।

কিন্তু যাবো কোথায়! মিঃ মুখার্জী একদিন ধরলেন আমাকে। বললেন, ‘বেলার মুখে শুনলুম তুমি নাকি চলে যাবে?’

আমি আমতা আমতা করছি। উনি তার আগেই আবার শুরু করলেন, ‘দেখো হেমন্ত, আমি তোমাকে এখানে এনেছি। হেমেনবাবু তোমাকে আনলেও আমি না নিলে তো তুমি ঢুকতে পারতে না ফিল্মিস্তানে। আর সেটা তোমার মুখ দেখে করিনি। তোমার গলা ভালো, তুমি গান গাও ভালো। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে। সেই বিশ্বাসকে তুমি ভেঙে দিও না। তুমি চলে গেলে তুমি তো হারবে না, হেরে যাবো আমি। সে আমি হতে দিতে চাই না। একটা ছবি ‘হিট’ দিয়ে তুমি যেখানে খুশি চলে যাও, আমি বাধা দেবো না। তার আগে তোমাকে আমি এক পা নড়তে দেবো না।’

এই হলেন মিঃ এস. মুখার্জী। ওঁর চরিত্রই এইরকম। উনি একবার যাকে ভালোবাসবেন তাকে শুধু মুখের ভালোবাসা দেখিয়ে ছেড়ে দেবেন না। উনি কেন তাকে ভালোবেসেছেন সেটা পাঁচজনকে দেখিয়ে তবে তার ছুটি। গাছ উনি পুঁতবেন, কিন্তু সেই গাছের ফল পাঁচজনে খেয়ে তারিফ করলে তবে ওঁর শান্তি।

মিঃ মুখার্জীকে কে কীভাবে নিয়েছে জানি না। ওঁকে অনেকে ভুল বুঝেছে, কিন্তু আমিতো জানি, উনি কতবড় শিল্পীগড়ার কারিগর। কত শিল্পী আজ গুছিয়ে বসেছে ওঁরই সহায়তায়। সকলের জন্যে উনি করেছেন। শচীনদেব বর্মনকে তো উনিই এনেছিলেন প্রথমে ফিল্মিস্তানে। এইরকম অনেককেই।

বড় উঁচু হৃদয়ের মানুষ! ভেতরটা বড় সূক্ষ্ম তাই বাইরের উগ্রতাটা বেশি চোখে পড়ে। ওঁর বাড়ির সবাই খুব ভালো। মিসেস মুখার্জী, ছেলেমেয়েরা। আজ আর মিসেস মুখার্জী আমাদের মধ্যে নেই। ওঁর মৃত্যু আমাদের কাছে পরমাত্মীয়ের বিয়োগব্যথার মতো বুকে বেজেছে।

আজও তাই মিঃ মুখার্জীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক গোড়ার দিনের মতোই আছে। ওঁর ভালোবাসার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারিনি। পারবোও না কোনোদিন।

‘আনন্দমঠ’—এর পর ‘শর্ত’ রিলিজ হল। এরও কপাল পুড়লো। পর পর দুটো ছবিতেই লোকসান খেল ফিল্মিস্তান। অতএব আমি বুঝলাম এবার আমার চাকরি খতম।

এ লাইনটাই এইরকম। পর পর ছবি হিট হচ্ছে, তোমার খাতির দেখে কে। এইভাবে দশখানা ছবি হিট হবার পর একখানা গেল তো অমনি প্রোডিউসারের মুখে মেঘ। তারপর যদি আবার একখানা ছবি মার খায় তো শিল্পীর দফা শেষ। তখন কেউ একবার খুঁটিয়ে হিসেব করবে না যে, এই শিল্পীই একদিন কোটি টাকা পাইয়ে দিয়েছে। সব ভুলে যাবে নিমেষে। আমরা তো নামেই শিল্পী। আসলে আমাদের আসন দেহপসারিণীদের এক ইঞ্চিও ওপরে নয়। ওদের থেকে বরং আরও খারাপ। ওদের তবু যতদিন দেহের বাহার ততদিন বাজার। আর আমাদের অনেককে গলা থাকতে থাকতেও গলাধাক্কা খেতে হয় সময় বিশেষে।

এই তো আমাদের লাইন। তাই পর পর দুটো ছবি মার খাওয়াতে বেশ ভয়ে ভয়ে কাটতে লাগলো দিন। অবশ্য এই ভয়ে ভয়ে দিন কাটানোটা শিল্পীজীবনের গোড়া থেকেই শুরু হয়েছে আমার। আজও সমান ভয়েই দিন কাটাচ্ছি। আজ আমার গান শুনে লোকের ভালো লাগছে। কিন্তু কাল! কাল হয়তো সেই আমার গানকেই তুলে আছাড়। অবশ্য এসব কথা মনে হলেও আমাকে এই ধরনের চিন্তাগুলো গ্রাস করতে পারে না। তার একটা কারণ হল, আমি চিন্তা করবার জন্যে ফাঁকা সময় হাতে রাখি না। কাজ দিয়ে সময়টাকে সবসময় ভরাট করে রাখি। প্রতিটি প্রাণীর আয়ুর মতন আমি ঘড়ির কাঁটার মিনিটগুলোকে দেখি। যে মিনিটগুলো বৃথা ব্যয় হয়, তাদের জন্যে আমার দুঃখ হয়। বেচারা মিনিটগুলো ঘড়ির কাঁটায় মরলো, কিছু পেলোনা আমার কাছ থেকে।

এই ব্যাপারে আমার একটা কথা মনে হয়, কাজকে যে ভালোবাসে তার কাছে কাজও এসে যায়। দুটো ছবি করার পর তখন আমার হাতে কাজ নেই বলতে গেলে। সেই সময় শচীনদেব বর্মন ডেকে পাঠালেন। দেখা করলাম শচীনদার সঙ্গে। শচীনদা বললেন, ‘আমার ”সাজা” ছবিতে তোকে গান গাওয়াবো’।

আমি তো তখন একপায়ে দাঁড়িয়ে। আনন্দে গদগদ।

‘সাজা’ ছবিতে প্লে—ব্যাক করলাম। ছবি বেরোলো, কিন্তু সুবিধে হল না।

এরপর উনি আমাকে ‘জাল’ ছবিতে চান্স দিলেন। ‘জাল’ ছবিতে যে গানটা গেয়েছিলাম সেটা হল ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী ফির কাঁহা’। বই হিট, গানও হিট। বম্বে আসার পর খুঁড়িয়ে—চলা দিনগুলো এই গানটা শুনে সোজা হয়ে হাঁটার ভরসা পেলো এতদিনে।

দুটো ছবি ফ্লপ করার পরও আমার চাকরি তখনও আছে ফিল্মিস্তানে। এবার আর একটা ছবিতে চান্স দিলেন মিঃ মুখার্জী। ছবির নাম ‘সম্রাট’।

আবার কাজ শুরু করলাম। আবার গানের সুর তৈরি হল। এইসময় আমার আলাপ হল লতার বোন আশার সঙ্গে। আশার সঙ্গে তখন লতার ঝগড়া। আশা বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। ওর দিদির এই বিয়েতে মতো ছিল না। সেই নিয়েই একটু মনোমালিন্য। তা আমার নতুন ছবিতে এবার আশাকে দিয়ে গাওয়ালাম।

এই নতুন ছবির কাজের সময় মিঃ মুখার্জী একদিন বললেন, ‘তুমি একাই সব করছো! অ্যারেঞ্জর নাওনি কেন? মিউজিক—এর ব্যাপারে ওরাইতো সব যোগাড়যন্ত্র করে দেয়। তুমিও একজন অ্যারেঞ্জার নিয়ে নাও।’

তাই নিলাম। তখন সি. রামচন্দ্র ফিল্মিস্তান ছেড়ে দিয়েছেন। ওঁর যে অ্যারেঞ্জার ছিল তাকেই আমার সঙ্গে লাগিয়ে দিলেন মিঃ মুখার্জী।

এইসময় আরও একজনকে পেলাম। সে হল রবি৯৬। রবি এখন নামকরা মিউজিক ডাইরেক্টর। আমার কাছে যখন এসেছিল তখন অবশ্য ওর খুবই দুঃসময়। এসেছিল কোরাস গান গাইবে বলে। আমি দেখলাম ছেলেটা ভালো তবলা বাজায়। ওর তবলা বাজানোটা ছিল একটু অন্যরকমের। বাঁয়াটাই দু’হাতে বাজাতো। আমার গানের সঙ্গে সঙ্গে ও বাঁয়া দিয়ে সঙ্গত করে যেতো। দিনরাত তখন সুর করছি আর রবি আমার ডাইনে বসে বাঁয়া বাজিয়ে চলেছে।

‘সম্রাট’ ছবির গান লেখবার জন্যে এলেন রাজেন্দ্রকিষণ।৯৭ এই এক মজার মানুষ। ভীষণ আড্ডাবাজ। ওদিকে নেশার ব্যাপারেও হারিয়ে দিতো সবাইকে। বলতো, ‘এই সরাবই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে দাদা।’

রাজেন্দ্রকিষণ তো গান লিখবে, কিন্তু ওকে দিয়ে লেখানো কি সোজা ব্যাপার! সকালে এসেই পেটে হাত বুলোতে বুলোতে বলবে, ‘বড্ড গ্যাস হয়েছে দাদা।’

ভীষণ খেতে ভালোবাসতো রাজেন্দ্রকিষণ! এক—একদিন এসে বলতো, ‘জুহুতে ভালো মাছভাজা পাওয়া যায়। চলো খেয়ে আসি।’

এইভাবে রোজই একটা না একটা খাওয়ার কথা তুলে ছুটতো সেখানে। আমি জিজ্ঞাসা করতাম, ‘গানের কী হল। লেখা হয়েছে?’

একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলতো, ‘এই যে সবে শুরু হয়েছে।’

শুরু মানে কাগজের মাথায় একটা ‘ওঁ’ লেখা আর তার তলায় মাত্র দুটো লাইন। এইটেই লিখে, ফেলে রেখে দিয়েছে সাতদিন। কিন্তু এইভাবে সাতদিন দশদিন ফেলে রেখে, গান যেদিন লিখতে বসতো সেদিন মিনিট পাঁচেকও লাগতো না। বসতো আর লিখে ফেলতো। ‘সম্রাটে’র গানগুলো এইভাবেই আমাকে লিখে দিয়েছিল। সম্রাটের গানগুলো গেয়েছিলাম আমরা চারজন। আমি, লতা, আশা আর গীতা। এ ছবিও শেষপর্যন্ত ডুবল। চললো না।

আমি তখন বাইরে দু’চারটে প্লে—ব্যাক পাচ্ছি। কিন্তু যাদের কাছ থেকে মাসে মাসে মাইনে পাচ্ছি তাদের তো দিতে পারছিনা কিছু। বারবার হেরেই ফিরতে হচ্ছে। এরপর আর কিসের আশায় আমাকে পুষবে ফিল্মিস্তান? এইসব কথাই তখন ভাবছি।

ঠিক সেইসময় ফিল্মিস্তান দুটো ছবি শুরু করলো। একটা ‘আনারকলি’৯৮ আর একটা ‘নাগিন’। একথাও কানে এলো ‘আনারকলি’ ছবির সংগীত পরিচালক হবেন সি. রামচন্দ্র, আর আমাকে দেওয়া হবে নাকি ‘নাগিন’ ছবিটা। শুনে তো আমি অবাক। এরপরও আমাকে চান্স দেবে ফিল্মিস্তান! কোথায় আমাকে তাড়িয়ে দেবে, না আবার ডেকে কাজ দিচ্ছে। বুঝলাম সব। মিঃ মুখার্জীর গোঁ এখনও যায়নি। উনি এখনও ওঁর পোঁতা গাছের গোড়ায় জল ঢেলে যাচ্ছেন। ফল ফলাতেই হবে।

‘নাগিন’ এর কাজ শুরু করলাম। রবি তখন আমার ডানহাত হয়ে গেছে। ডাইনে বসে ওর বাঁয়াটা বাজিয়ে চলেছে। রবি আবার খুব ভালো হারমোনিয়াম বাজাতে পারে। একটা সুর ফেলে দিলে সারাদিন ধরে সেই সুরটাকে হারমোনিয়ামে বাজিয়ে বাজিয়ে চকচকে করে তোলে। আমি ওকে কখন কাজ দিয়ে চলে গেছি। বাড়ি ফিরে দেখি তখনও বসে বসে সুরে শান দিচ্ছে। সত্যিই এক অসাধারণ নিষ্ঠা দেখেছি এই রবির!

‘নাগিন’ ছবির মিউজিকের মধ্যে সাপের বাঁশিটাই হল প্রধান। সাপুড়েদের ব্যাপার নিয়ে গল্প। অতএব ‘বীণ’ তো উঠতে বসতে বাজাতে হবে। অথচ এই ‘বীণ’ তো সাপুড়ে ছাড়া আর কেউ বাজায় না। এদের দিয়ে তো আর কাজ করানো যাবে না।

ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। একটু খোঁজ নিয়ে জানলাম, ‘নাগপঞ্চমী’ বলে একটা ছবি হয়েছে। তাতে সাপের বাঁশি বাজিয়েছে কল্যাণজী৯৯। কল্যাণজী আগে হারমোনিয়াম বাজাতো। এখন ক্ল্যাভিওলাইন বলে একটা নতুন যন্ত্র বাজাচ্ছে।

এই যন্ত্রটার আওয়াজের সঙ্গে বীণের আওয়াজ মেলে, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে একটা ব্যাপার নিয়ে। এই যন্ত্রটায় একটানা সুর বাজে না। একটা রিড থেকে আর একটায় যাবার মাঝখানে সুরের ফাঁক থেকে যায়। আমি করলাম কী এই যন্ত্রটার সঙ্গে হারমোনিয়ামও বাজিয়ে যেতে থাকলাম। তাতে হল কী, ওই ফাঁকগুলো হারমোনিয়াম পূরণ করে দিতে থাকলো।

ইতিমধ্যে ‘নাগিন’ ছবির একটা গানের সুর করে রেকর্ড করে ফেললাম। প্রদীপ নায়ক। ওরই গলার গান। গাইলাম আমি।

খুব জোর কদমে কাজ হচ্ছে। আমার সঙ্গে কাজ করছে রবি—আমার প্রধান সহকারী। আলফানসো বলে আর একজনও আছে আমার সঙ্গে। আলফানসো খুব কাজপাগলা লোক। সবসময় ছুটোছুটি করে কাজ করতে পারে। তখনও দেখেছি, আজও দেখছি সেই একভাবে কাজ করে চলেছে। এখন ওর অনেক বয়স। প্রায় পঁচাত্তর বছর। তবু কাজের ব্যাপারে এখনও সমান উদ্যম। মাঝেমাঝে ভাবি, এই এত বয়েসে এই উদ্যম পায় কোথা থেকে আলফানসো! নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে বের করি। সংগীতের থেকে বড় টনিক আর কিছু আছে নাকি জগতে? এ টনিকের স্বাদ যদি কেউ ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে তাহলে তার মনের পুষ্টি যে কতটা হতে পারে তা মেপে বার করা যায় না। আর মন সতেজ থাকলে হেলেপড়া দেহকেও ঠিক টেনে তুলবে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই একথা আমি বলছি। এইতো সেদিনের কথা। একটা ফাংশানে গান করে ডায়াস থেকে নামবার সময় পড়ে গিয়ে পা ভাঙলো। হাসপাতালে নিয়ে গেল আমাকে। ফ্র্যাকচার যখন, তখন প্লাস্টার করতেই হবে। তাই করলো। সে রাত্তিরটা হাসপাতালে কাটিয়ে সকালে বাড়ি ফিরে এলাম। ভীষণ যন্ত্রণা। কিন্তু সেদিন রাত্তিরে আবার বিশ্বরূপায় একটা গানের ফাংশান আছে। আমি না গেলে কর্তৃপক্ষ বিপদে পড়বেন।

অতএব আমাকে যেতে হল। ক্রাচের ওপর বগলের ভর দিয়ে হাজির হলাম ফাংশানে। উঠলাম সেইভাবে ডায়াসে। তারপর গান গাইতে বসলাম।

গান গেয়ে বাড়ি ফিরে এসে আমার সেদিন এই কথাটাই মনে হয়েছিল, এত জোর পেলাম কোথায়! কোথায় আবার পাবো! আমার শ্রোতাদের কাছে।

.

৭৮। অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায় :— ১৯০৮ সালে বিহারের ভাগলপুরে জন্ম। প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক। থিয়েটারে অভিনয় ও পরিচালনার কাজও অনেক করেছেন। প্রথম চিত্রপরিচালনা করেন ‘সংগ্রাম’ ছবিতে। ‘পদ্মা প্রমত্তা নদী’, ‘সন্দীপন পাঠশালা’, ‘ইন্দিরা’, ‘সংকেত’, ইত্যাদি মিলিয়ে অনেকগুলি ছবি পরিচালনা করেন। এনারই এক সম্পর্কের ভাই হলেন বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক পিনাকী মুখোপাধ্যায়। অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘পূর্বরাগ’ ছবিতেই প্রথম সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ পান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

৭৯। জ্যোতির্ময় রায় :— বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিত্রপরিচালক। বিমল রায় পরিচালিত নিউ থিয়েটার্স—এর ‘উদয়ের পথে’ (১৯৪৪)—র মতো বিখ্যাত ছবির কাহিনিকার ছিলেন জ্যোতির্ময় রায়। এ ছবির সংলাপও লিখেছিলেন এবং এর জন্য সর্বভারতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন। এ ছবির নায়িকা বিনতা রায় (আগে ‘বসু’) ছিলেন জ্যোতির্ময়বাবুর স্ত্রী। এরপর, হেমেন গুপ্ত পরিচালিত ‘অভিযাত্রী’—র কাহিনিও লিখেছিলেন। এছাড়া, রচনার সঙ্গে পরিচালনাও করেন ‘দিনের পর দিন’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘শঙ্খবাণী’ প্রভৃতি ছবি। ১৯৬১ সালে জ্যোতির্ময় রায় প্রয়াত হন।

৮০। হেমেন গুপ্ত :— বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক। ‘৪২’, ‘ভুলি নাই’, ‘অভিযাত্রী’ ইত্যাদি আরো কিছু জনপ্রিয় বাংলা ছবি পরিচালনা করেন। ‘অভিযাত্রী’ ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় অপর একটি ছবির সঙ্গে একই বছরে প্রথম ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ পান। বিশিষ্ট নায়ক প্রদীপকুমারকে প্রতিষ্ঠা দেন এই পরিচালক। ১৯৪৯ সালে মুম্বই গিয়ে ‘ঝাঁসি কি রাণী’, ‘আনন্দমঠ’ ইত্যাদি অনেকগুলি জনপ্রিয় হিন্দি ছবি পরিচালনা করেন। ১৯৫১ সালে হেমন্তকে মুম্বই নিয়ে গিয়ে ‘আনন্দমঠ’—এ সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ দিয়ে, তাঁকে মুম্বইয়ের ছবির জগতে প্রবেশ করতে সাহায্য করেন হেমেন গুপ্ত।

৮১। ভি. শান্তারাম :— ১৯০১ সালে জন্ম। মুম্বই ফিল্ম জগতের প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক। ১৯২৬ সালে প্রথম নির্বাক চিত্র নেতাজী পলাকরের প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। সবাক যুগে তাঁর প্রথম ছবি — ‘অমরজ্যোতি’। এরপর, ‘দুনিয়া না মানে’, ‘দহেজ’, ‘ডাঃ কোটনীশ’, ‘শকুন্তলা’, ‘অমর ভূপালি’, ‘সুবহ কা তারা’, ‘নবরঙ’, ‘তিন বাত্তি চার রাস্তা’, ‘ঝনক ঝনক পায়েল বাজে’ ইত্যাদি অনেক জনপ্রিয় ছবি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। ‘রাজকমল স্টুডিও ও পিকচার্স’—এর মালিক ছিলেন ভি. শান্তারাম। বর্তমানে প্রয়াত।

৮২। সুবোধ পুরকায়স্থ (১৯০৭—১৯৮৪) :— বাংলা গানের একজন বিশিষ্ট গীতিকার। কুমিল্লা (বর্তমান বাংলাদেশে)—য় থাকাকালীন ইস্কুল জীবন থেকেই গান লিখতে শুরু করেন। তাঁর প্রথম যুগের গান, ‘পড়ে গেছ তুমি ধরা’, ‘মিলনে সে ছিল দূরে’ ইত্যাদি। কুমিল্লার সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ‘সবুজ সংঘ’—র সদস্য ছিলেন। প্রথম যুগের লেখা ‘খুঁজে দেখা পাইনি যাহার’ গানটির সুর করেন ছোটোবেলার বন্ধু হিমাংশু দত্ত এবং হিমাংশুবাবুই ‘বিচিত্রা’ (শ্রাবণ ১৩৩৭) পত্রিকায় গানটির স্বরলিপি প্রকাশ করেন। পরে এই গানটি বেতারে গান হরিপদ রায় এবং তিনিই পরে রেকর্ড করেন। এরপর, সুরসাগর হিমাংশু দত্ত—র সুরারোপিত অনেক গান লেখেন সুবোধ পুরকায়স্থ। যেমন — ‘চাঁদ কহে চামেলী গো…’, ‘আজি উতলা মাধবী রাতি’, ‘আজ ফাগুনের প্রথম দিনে’ ইত্যাদি। কমল দাশগুপ্ত—র সুরে হেমন্ত—র গাওয়া জনপ্রিয় গান, ‘সেদিন নিশীথে বরিষণ শেষে…’ বা একই সুরকারের সুরে ‘চন্দ্রশেখর’ ছবিতে অশোককুমার ও কানন দেবী সহ অন্য শিল্পীদের গাওয়া প্রত্যেকটি গানের গীতরচনা করেন। বিশিষ্ট সুরকার শৈলেশ দত্তগুপ্ত, অনিল বাগচী প্রমুখদের সুরারোপিত বেশকিছু গানের গীতিকার ছিলেন সুবোধবাবু। HMV—র বিরুদ্ধে গীতিকারদের সম্মিলিত আন্দোলনে সামিল হন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মোটা টাকার বিনিময়ে আন্দোলন তুলে নিতে বলায় সুবোধবাবু রাজি হন না। রেকর্ড কোম্পানি সুবোধ পুরকায়স্থকে বয়কট করে। এর ফলে, বীতশ্রদ্ধ হয়ে সুবোধবাবু ১৯৫০—৫১ সালে গান লেখা ছেড়ে দিয়ে, কেরানীর জীবন গ্রহণ করেন।

৮৩। ইন্দুবালা দেবী (১৮৯৮—১৯৮৪) :— অসামান্য কণ্ঠশিল্পী। অভিনয় ও নাচেও ছিলেন পারদর্শী। বাবা মতিলাল ছিলেন কবি মনমোহন বসুর দ্বিতীয় পুত্র। বাবার, ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’—এ মা রাজবালা খেলা দেখাতেন। পরে রাজবালা সার্কাসের মেয়েদের নিয়ে তৈরী করেন ‘রামবাগান ফিমেল কালী থিয়েটার’। এখানে ইন্দুবালার অভিনয়—জীবন শুরু। বহু উস্তাদের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা নেন। কাজী নজরুলের কাছে দীর্ঘদিন তালিম নিয়েছিলেন এবং কাজীসাহেবের গানে এক অসামান্য শিল্পী হন। ১৮ বছর বয়সে প্রথম রেকর্ড করেন (‘ওরে মাঝি তরী হেথা…’ এবং ‘তুমি এসো হে…’। বিভিন্ন জমিদারবাড়িতে নিয়মিত গাইতেন। শিশির ভাদুড়ির সঙ্গে ‘প্রফুল্ল’ ও দানীবাবুর (সুরেন্দ্রনাথ ঘোষ) সঙ্গে ‘নসীরাম’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। ‘যমুনা পুলিনে’ (১৯৩৩) ছবিতে অভিনয় দিয়ে প্রথম চলচ্চিচত্রজগতে প্রবেশ। বাংলা ও হিন্দি ছাড়াও তামিল, তেলুগু ও উর্দু ভাষার ছবিতেও অভিনয় করেন। ‘সমাজ উপেক্ষিতা পতিতা নারীদের সম্মেলন’ নামে, ১৯৫৬ সালে বারবণিতাদের একটা সম্মেলনের আয়োজনের প্রয়াস করেছিলেন ইন্দুবালা দেবী। ১৯৭৫ সালে ‘সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি’ পুরস্কার পান।

৮৪। পশুপতি চট্টোপাধ্যায় (১৯০৬—১৯৯০) :— বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক। থিয়েটারেও যুক্ত ছিলেন। রসরাজ অমৃতলাল বসুর ব্যক্তিগত কলমচি ছিলেন। ‘নাচঘর’ পত্রিকার সহ সম্পাদনার কাজ করেন। চলচ্চিচত্রজগতে যুক্ত হয়ে, ‘পরিণীতা’, ‘নিস্কৃতি’, ‘প্রিয়তমা’, ‘ষোড়শী’ ইত্যাদি আরো কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিচত্র নির্মাণ করেন। অমর মল্লিক পরিচালিত ‘বড়দিদি’ ছবির অন্যতম গীতিকার ছিলেন। কিছুদিন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন পশুপতি চট্টোপাধ্যায়।

৮৫। ফিল্মিস্তান :— ৪০—এর দশকের শেষের দিকে শশধর মুখার্জি, চুণীলাল ও অভিনেতা অশোককুমার মিলে মুম্বইয়ের গোরেগাঁও—এ চলচ্চিচত্র প্রযোজক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘ফিল্মিস্তান’ গড়ে তোলেন। ‘চলরে চল নওজোয়ান’ ছবি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাজ শুরু। এরপর, ‘আনারকলি’, ‘নাগিন’, ‘জাগৃতি’, ‘মুনিমজী’, ‘পেয়িং গেস্ট’ ইত্যাদি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছবি উপহার দেয় এই সংস্থা। শচীন দেববর্মন, হেমন্তকুমার (মুখোপাধ্যায়), প্রদীপকুমার, আই.এস.জোহর, শীলা রমানি, দিলীপকুমার প্রমুখ তারকারা প্রতিষ্ঠা পান এই সংস্থা থেকে।

৮৬। অজয় কর (১৯১৪—১৯৮৫) :— এক অসামান্য ক্যামেরাম্যান ও চিত্রপরিচালক। ১৯৩৩ সালে প্রথম চিত্রজগতে প্রবেশ করে, ১৯৩৮ সালে চিত্রগ্রহণের কাজ করেন। ১৯৪৮ সালে প্রথম চিত্রপরিচালনা করেন। ১৯৫০ সালে ‘জিঘাংসা’ ছবিটি প্রযোজনা—পরিচালনা—চিত্রগ্রহণ করেন অজয় কর। ক্যামেরাম্যান হিসেবে উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে, ‘রাঙামাটি’, ‘ভুলি নাই’, ‘পরিবর্তন’ উল্লেখযোগ্য। চিত্রগ্রাহক ও পরিচালকরূপে অজয় কর উপহার দেন ‘মেজদিদি’, ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘সাত পাকে বাঁধা’ ইত্যাদি আরো বেশকিছু জনপ্রিয় ছবি।

৮৭। শশধর মুখার্জি :— এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে মুম্বই যান শশধর মুখার্জি। ‘বম্বে টকিজ’ তখন চিত্রপ্রযোজক সংস্থা হিসেবে মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি শাসন করছে। এই সংস্থার কর্ণধার হিমাংশু রায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শশধর মুখার্জি যোগ দিলেন বম্বে টকিজ—এ। একই সঙ্গে যোগ দিলেন, ফ্রাঞ্জ অস্টেন, সাবাক ভাবা, চুণীলাল, জ্ঞান মুখার্জী, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (সাহিত্যিক), অশোককুমার প্রমুখ অসামান্য প্রতিভাবানেরা। এর ফলে, এই সংস্থা জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠে, যার পেছনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা ছিল শশধর মুখার্জীর। হিমাংশু রায় প্রয়াত হলে, কয়েকজন মিলে শশধরবাবুরা গড়ে তুললেন ‘ফিল্মিস্তান’ (৮৪ নং টীকা দ্রষ্টব্য)। এরপর, শশধরবাবু নিজস্ব সংস্থা ‘ফিল্মালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার প্রথম প্রযোজিত ছবি ‘দিল থেকে দেখো’ সুপার—হিট হয়। এ ছবিতে সুর করেন ১৮ বছর বয়সি নবাগতা তরুণী উষা খান্না। এই সংস্থার অপর ছবি ‘লাভ ইন সিমলা’—য় নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন শশধর মুখার্জির বড়ো ছেলে জয় মুখার্জি। শশধরবাবুর অপর দুই ভাই যথাক্রমে সুবোধ ও প্রবোধ মুখার্জিও চিত্রপরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অশোককুমার—কিশোরকুমার—অনুপকুমার ছিলেন শশধর মুখার্জির আপন শ্যালক।

৮৮। শচীন গুপ্ত (১৯২৩—১৯৬২) :— বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী। কণ্ঠস্বরটি ছিল অত্যন্ত মনোগ্রাহী। অনেকটাই মিল ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠপ্রকৃতির সঙ্গে। উত্তর কলকাতায় জন্ম। বাবা ও কাকা (বিমলকৃষ্ণ গুপ্ত) ছিলেন উচ্চচাঙ্গ সঙ্গীতে পারদর্শী — প্রখ্যাত ছোটে খাঁ—র কাছে তালিমপ্রাপ্ত। বাবা বিজয়কৃষ্ণ—র কাছে সঙ্গীতশিক্ষার শুরু। এরপর, বাবা—কাকার গুরু ছোটে খাঁ—র কাছে তালিম নেন শচীন গুপ্ত। ১৯৪১ সালে ক্লাশ টেন—এ পড়ার সময় থেকে বেতারে ‘নবাগতর আসর’—এ গান গাইতে সুযোগ পেলেন। এরপর আমৃত্যু বেতার—শিল্পী ছিলেন। মাঝখানে অবশ্য কিছুদিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতান্তরের কারণে, কয়েকবছর বেতারে গান করেননি শচীনবাবু। ১৯৪৬ সালে কিশোরী গাঙ্গুলির কথায় ও বীরেন ভট্টাচার্য—র সুরে, ‘শুধু দুদিনের দেখা…’ এবং ‘বিরহে যে ব্যথা দিয়ে গেলে…’ গানদুটি দিয়ে প্রথম রেকর্ডজগতে প্রবেশ শচীন গুপ্ত—র। এরপর, ‘বনহরিণীর চকিত চপল আঁখি…’ ‘তুমি নেই শুধু এই…’, ‘জ্যোছনা বিছানো আঙিনায়…’, ‘সারারাত জ্বলে সন্ধ্যাপ্রদীপ…’ ইত্যাদি বেশকিছু জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। জীবনের শেষ রেকর্ডে সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে দুটি গান করেছিলেন শচীনবাবু, যার মধ্যে একটি ছিল, ‘এবার আমি আমার থেকে…’ গানটি। এটি অনেক বছর পরে রেকর্ড করেন লতা মঙ্গেশকর। ‘পরভৃর্তিকা (১৯৪৭) ছবিতে প্রথম প্লে—ব্যাক করেন। এরপর, ‘শৃঙ্খল’, ‘বাঁকালেখা’, ‘শ্রীতুলসীদাস’, ‘ওরে যাত্রী’, ‘যুগদেবতা’, ‘জলজলা’ (হিন্দি), ‘শাদি কে বাদ’ (হিন্দি), ‘মালা’ (হিন্দি), ‘বসু পরিবার’ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি ছবিতে নেপথ্যে শচীন গুপ্ত—র গান শোনা গেছে। মেগাফোন কোম্পানির সঙ্কটকালে শেষের দিকে কোম্পানির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘কলম্বিয়া’ ছেড়ে এখানে রেকর্ড করেন শচীন গুপ্ত। অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনকভাবে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই শিল্পী। প্রসঙ্গত, প্রখ্যাত চলচ্চিচত্রাভিনেতা বিপিন গুপ্ত সম্পর্কে শচীন গুপ্ত—র কাকা।

৮৯। প্রদীপ বটব্যাল :— প্রখ্যাত চলচ্চিচত্রাভিনেতা— ‘প্রদীপকুমার’। আসল নাম শীতল। ১৯২৫ সালে জন্ম। সরোজ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘অলকানন্দা’ (১৯৪৭) ছবি দিয়ে শুরু। এরপর, ‘ভুলি নাই’, ‘৪২’, ‘স্পর্শমণি’, ‘দস্যু মোহন’, ‘গৃহদাহ’, ‘অভিশপ্ত চম্বল’ ইত্যাদি অনেক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৪৯ সালে পরিচালক হেমেন গুপ্ত—র ডাকে ফিল্মিস্তানের ‘ঝাঁসি কি রানী’ ছবিতে মুম্বই গিয়ে প্রথম অভিনয় করেন প্রদীপকুমার। এরপর, ‘আনন্দমঠ’, ‘আনারকলি’, ‘নাগিন’, ‘তাজমহল’, ‘এক ঝলক’ ইত্যাদি বহু জনপ্রিয় হিন্দি ছবিতে নায়ক হিসেবে রাজত্ব করেছেন এই অভিনেতা। প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বেশ কিছুদিন প্রয়াত হয়েছেন এই কন্দর্পকান্তি অভিনেতা।

৯০। মান্না লাডিয়া :— প্রখ্যাত শব্দযন্ত্রী। পুরো নাম মান্নালাল লাডিয়া। ১৯১৮ সালে জন্ম। প্রথম শব্দযন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন ‘জোয়ার ভাটা’ চিত্রে। ‘ভুলি নাই’, ‘প্রিয়তমা’, ‘ইন্দ্রজাল’, ‘যুগদেবতা’, ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ ইত্যাদি অনেক ছবির শব্দযন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন মান্না লাডিয়া। চার্লস ক্রীডের সঙ্গে যৌথভাবে ‘পরশমণি’, ‘ঠিকাদার’ ইত্যাদি ছবিতে শব্দ প্রক্ষেপনের কাজ করেছেন মান্নালাল লাডিয়া।

৯১। সি. রামচন্দ্র :— হিন্দি ছবির জগতে এক প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক। আসল নাম—আর. চিতলকর। ১৯১০ সালে জন্ম। ১৯৩৪ সালে কোলাপুর স্টুডিওতে ইনি প্রথম অভিনেতা হিসেবে যোগ দেন। জন্মগত প্রতিভা ছিল সঙ্গীতে। ‘সানাই’ ছবিতে প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা করেন। অন্যান্য ছবির মধ্যে ‘দিন কি বাত’, ‘নদীয়া কি পার’, ‘সাজন’, ‘আলবেলা’, ‘খাজানা’, ‘সাকী’, ‘খুবসুরত’, ‘ইনসানিয়াৎ’, ‘পহেলী ঝলক’ ইত্যাদি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনায় মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সি. রামচন্দ্র। ‘আনারকলি’, ‘সমাধি’ ছবিদুটির গান সি. রামচন্দ্র—র সঙ্গীত পরিচালনায় অমর হয়ে আছে।

৯২। তালাত :— প্রখ্যাত এই কণ্ঠশিল্পীর পুরো নাম তালাত মাহমুদ। ‘তপনকুমার’ নামে বাংলা গান গাইতেন। অজস্র অসামান্য জনপ্রিয় বাংলা গান সেই ৪০—এর দশক থেকে ৭০ দশক অবধি গেয়েছেন। ১৯৪৪ সালে প্রণব রায়ের কথায় ও কমল দাশগুপ্ত—র সুরে ‘যবে এসেছিলে তুমি প্রিয়…’ এবং ‘শোনো গো সোনার মেয়ে…’ প্রথম দুটি বাংলা গান রেকর্ডে গান তপনকুমার। এরপর, ‘দুটি পাখি দুটি তীরে…’, ‘ঘুমের ছায়া…’, ‘যদি জীবনে কেবলই ক্ষতি…’, ‘এ যদি আকাশ হয়…’, ‘যেথা রামধনু ওঠে হেসে…’, ‘আধোরাতে যদি …’, ‘যে মালা শুকায়…’, ‘তুমি এসো, ফিরে এসো…’ ইত্যাদি বেশকিছু কালজয়ী বাংলা গান তপনকুমারের কণ্ঠে অমর হয়ে আছে। তালাত মাহমুদ ছিলেন মুম্বই হিন্দি ছবির জগতে প্রথম সারির কণ্ঠশিল্পী। ‘সুজাতা’, ‘ছায়া’ ইত্যাদি অজস্র ছবিতে তালাত মাহমুদ বহু জনপ্রিয় হিন্দি গান গেয়েছেন। ‘এক গাঁও কি কহানি’ ছবিতে নায়ক—গায়ক ছিলেন তালাত মাহমুদ।

৯৩। গীতা দত্ত (১৯৩১—১৯৭২) :— এক অবিস্মরণীয় কণ্ঠশিল্পী। গীতা দত্ত—র মাদকতা ভরা কণ্ঠের একটি ব্যতিক্রমী মাধুর্য ছিল। ফরিদপুরের (বর্তমান বাংলাদেশে) বেনজিসা গ্রামে জন্ম গীতা রায়ের। জন্মগত সাঙ্গীতিক প্রতিভা ছিল। হরেন নন্দীর কাছে সঙ্গীতের তালিম। ১২ বছর বয়সে মুম্বই চলে যান, বাবার চাকরিসূত্রে। ১৯৪৬ সালে ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’ ছবিতে প্রথম সমবেত কণ্ঠে গান করেন গীতা। ঐ একই বছরে ‘কাশ্মীর কি কলি’ ছবিতে প্রথম একক কণ্ঠে গান করেন। এরপর, কয়েক দশক জুড়ে ‘আরপার’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফিফটি ফাইভ’, ‘সি.আই.ডি’, ‘বাহার’, ‘সাহেব বিবি ঔর গোলাম’, ‘হাওড়া ব্রিজ’ ইত্যাদি অজস্র ছবি গানে গানে ভরিয়ে দিয়েছেন। প্রখ্যাত অভিনেতা—পরিচালক গুরু দত্তকে বিয়ে করে পরিচিত হন ‘গীতা দত্ত’ নামে। বেশকিছু চিরকালীন বাংলা আধুনিক গান গেয়েছেন। ‘ইন্দ্রানী’, ‘পৃথিবী আমারে চায়’, ‘হারানো সুর’, ‘সাথীহারা’ ইত্যাদি অনেক বাংলা ছবিতে নেপথ্যগায়িকা হিসেবে আমরা পাই গীতা দত্তকে। ‘ঐ সুরভরা দূর নীলিমায়…’, ‘একটু চাওয়া একটু পাওয়া…’, ‘কত গান হারালাম…’, ‘তুমি যে আমার…’ (হারানো সুর), ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ…’ (পৃথিবী আমারে চায়) ইত্যাদি গীতা দত্ত—র গাওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য গান।

৯৪। সিমি :— মুম্বই চিত্রজগতের নামকরা অভিনেত্রী। অনেক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিতে অভিনয় করেন। কনরাড রুকস পরিচালিত ‘সিদ্ধার্থ’ ছবির নায়িকা ছিলেন।

৯৫। মদনমোহন :— ১৯২৪ সালে জন্ম হিন্দি ছবির জগতের এই মহান সঙ্গীত পরিচালকের। বাবা চুণীলাল ‘বম্বে টকিজ’—এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লক্ষ্নৌ রেডিয়োতে যোগদানের সুবাদে উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ, গজলসম্রাজ্ঞী বেগম আখতার প্রমুখ জ্যোতিষ্কদের সান্নিধ্য মদনমোহনের সাঙ্গীতিক সত্তার স্ফূরণ ঘটাতে অসম্ভব সাহায্য করে। প্রথম একটি ভাই বোনের সিকোয়েন্সে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে ‘শহীদ’ ছবিতে গান গেয়ে ফিল্মজগতে প্রবেশ ঘটে। এরপর থেকে লতার সঙ্গে আপন ভাই বোনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মদনমোহন—লতা সমন্বয়ে পরবর্তীকালে অনেক অসাধারণ হিন্দি ফিল্ম গানের জন্ম হয়। মদনমোহন প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা করেন ‘আঁখে’ ছবিতে (১৯৫০)। এরপর থেকে, অজস্র ছবিতে সুরে সুরে ভরিয়ে দিয়েছেন এই সঙ্গীত পরিচালক। যেমন— ‘আসিয়ানা’, ‘অনজাম’, ‘পকেটমার’, ‘ভাই ভাই’, ‘মেরা সায়া’, ‘উও কোন থী’, ‘চিরাগ’, ‘মৌসম’, ‘লায়লা মজনু’, ‘চালবাজ’ (মৃত্যুর পরে মুক্তিপ্রাপ্ত) ইত্যাদি ১১২টি ছবি সঙ্গীতে ভরে উঠেছে মদনমোহনের সঙ্গীত পরিচালনায়।

৯৬। রবি :— মুম্বইয়ের হিন্দি ছবির জগতের প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক। পুরো নাম রবিশঙ্কর শর্মা। পেশায় ছিলেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। ২০—এর দশকে জন্ম। ৩০ বছর বয়সে পেশা পালটে সঙ্গীত পরিচালনার জগতে চলে এলেন। নাম নিলেন ‘রবি’। প্রথমে হেমন্তকুমারের (মুখোপাধ্যায়) সহকারী হিসেবে ‘আনন্দমঠ’, ‘শর্ত’, ‘নাগিন’ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি ছবির সঙ্গীত পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৫ সালে ‘বচন’ ছবিতে প্রথম স্বাধীনভাবে সঙ্গীত পরিচালনার শুরু। ‘দিল্লি কা ঠগ’, ‘ঘুঙ্ঘট’, ‘ঘরানা’, ‘চায়না টাউন’, ‘ফুল ঔর পত্থর’, ‘এক ফুল দো মালী’, ‘চৌধবী কা চাঁদ’, ‘গুমরাহ’ ইত্যাদি ছবিতে অসাধারণ সঙ্গীত পরিচালনার সাক্ষ্য রেখেছেন রবি।

৯৭। রাজেন্দ্রকৃষ্ণ :— হিন্দি ছবির জগতে এই বিশিষ্ট গীতিকারের জন্ম পাঞ্জাবে ১৯১৯ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষ করে, রাজেন্দ্রকৃষ্ণ গীতিকার হিসেবে প্রথম ‘আজ কী রাত’ ছবির গান লেখেন। ‘প্যার কী জিত’, ‘বড়ী বহিন’, ‘পতঙ্গ’, ‘সাগাই’, ‘লড়কি’, ‘আনারকলি’, ‘বাহার’, ‘পহেলি ঝলক’, ‘আজাদ’, ‘নাগিন’, ‘বৈজু বাওরা’, ‘ভাই ভাই’, ‘ইনসানিয়াৎ’, ‘পকেটমার’ ইত্যাদি আরো অনেক জনপ্রিয় ছবির গানের গীতিকার ছিলেন রাজেন্দ্রকৃষ্ণ।

৯৮। ‘আনারকলি’ :— ১৯৫৩ সালে মুক্তি পায় প্রদীপকুমার, বীণা রয়, মুবারক প্রমুখ অভিনীত ফিল্মিস্তানের ‘আনারকলি’ ছবিটি। ‘সেলিম’ তথা ‘জাহাঙ্গীর’ ও ‘আনারকলি’—র ব্যর্থ প্রেমনির্ভর এই ছবিটি সুপারহিট হয়। সি.রামচন্দ্রের সঙ্গীত পরিচালনায় এই ছবির বেশিরভাগ গান জনপ্রিয় হয়। বিশেষ করে, লতা মঙ্গেশকরের, ‘ইয়ে জিন্দগী উসিকি হ্যায়…’ ও হেমন্ত—র ‘জিন্দেগী প্যার কি দো চার ঘড়ি…’ গানদুটি সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় গান। বিশেষ কারণে, এই ছবির ‘টাইটেল সঙ’টি সুর করেছিলেন হেমন্তকুমার।

৯৯। কল্যাণজী :— যন্ত্রশিল্পী হিসেবে শুরু করে, পরবর্তীকালে এক প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক হয়ে ওঠেন। ‘আনন্দজী’—র সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘কল্যাণজী—আনন্দজী’ নামে বহু ছবিতে অবিস্মরণীয় সঙ্গীত উপহার দেন। ‘কোরা কাগজ’, ‘সফর’, ‘ডন’, ‘মুকাদ্দার কা সিকান্দার’ ইত্যাদি অনেক ছবির গান এই যুগলের সঙ্গীত রচনায় আজও সকলের মনে গেঁথে আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *