বসু-বাড়ি – ১৫

১৫

১৯৩৩-এর ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ইউরোপ যাত্রা করবার আগে দাদাভাই, মাজননীর সঙ্গে রাঙাকাকাবাবুর দেখা হল না। মা যখন দিল্লিতে ইংরেজি হোম মেম্বারের সঙ্গে এ-বিষয়ে কথা বলছিলেন, তখনই বোঝা গিয়েছিল যে, সরকারের মনোভাব খুবই কঠোর। যাত্রার আগে কিছুদিনের জন্য কেবল তারা রাঙাকাকাবাবুকে বাবার কাছে জব্বলপুর সেন্ট্রাল জেলে এনে রাখতে রাজি হল। তাঁকে দেখতে দল বেঁধে আমরা জব্বলপুর গিয়েছিলাম আগেই বলেছি। 

বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে জেলে দেখা করবার সময় আমাদের নানারকম অভিজ্ঞতা হত। প্রথমত, দুজনেই রাজবন্দীদের অধিকার সম্বন্ধে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। যাঁরা তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে আসছেন, সরকারি বা জেলের কর্মচারীরা তাঁদের সঙ্গে যথোচিত ব্যবহার করছেন কী না! না করলে তুমুল গোলমাল শুরু হত। যেমন হয়তো পরিবারবর্গের ‘বডি-সার্চ’ করার আদেশ হল। এরকম ক্ষেত্রে বিশেষ করে মহিলাদের বেলায়, বাবা ও রাঙাকাকাবাবু তো দেখা করতেই অস্বীকার করতেন। এমন ঘটনা আমাদের ক্ষেত্রে পরে ঘটেছে। কিন্তু জেলের নিয়ম অনুযায়ী দেখা করবার সময় পুলিসের লোকও উপস্থিত থাকবেই। সব কথা তো তাদের সামনে বলা সম্ভব নয়। তাদের চোখে ধুলো দেবার নানারকম উপায় বাবা ও রাঙাকাকাবাবু বের করতেন। যেমন, জব্বলপুর জেলে তাঁদের ব্যারাকের মধ্যে পার্টিশন দিয়ে পুজোর ঘর করেছিলেন। তাঁরা আমাদের, বিশেষ করে মা বা বাড়ির মহিলাদের, পুজোর ঘর দেখাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তেন এবং চাইতেন আমরা যেন ইন্টারভিউ শেষ হবার আগে অতি অবশ্য পুজোর ঘর দর্শন করে যাই। ঠাকুরের আসনের নীচে গোপনীয় কাগজপত্র লুকনো থাকত। মা বা বাড়ির অন্য কোনও মহিলা সেগুলি সংগ্রহ করে লুকিয়ে বাইরে নিয়ে আসতেন। 

রাঙাকাকাবাবু আবার আমাদের মতো ‘অতিথিদের জন্য নানারকম জলখাবারের আয়োজন করতেন। জেল-কর্তৃপক্ষের কাছে এর জন্য অতিরিক্ত রেশন দাবি করতেন। তাঁদের সঙ্গে যে-সব সাধারণ কয়েদি থাকত, তাদের মধ্যে দু-একজনের উপর রান্নার ভার দেওয়া হত এবং তারা রাঙাকাকাবাবুর নির্দেশমতো নানারকম খাদ্যদ্রব্য তৈরি করত। তবে আর যাই হোক, আমার মনে হয়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু রান্নার ব্যাপারে বিশেষ পটু ছিলেন না। চপের মাংস প্রায়ই আধসিদ্ধ থেকে যেত, সন্দেশ বলে যা আমাদের পরিবেশন করতেন তা প্রায় হত পাথরের মতো শক্ত। 

রাঙাকাকাবাবুর জন্য জব্বলপুর জেলের মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে ইউরোপের উপযোগী গরম জামা-কাপড়, টুপি, জুতো ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হল। পুলিস-পাহারায় দর্জি ও জুতো বানাবার লোককে হাজির করা হল। ইউরোপ গিয়ে রাঙাকাকারাবু কী ধরনের পোশাক ব্যবহার করবেন, সে বিষয়ে তাঁর নির্দিষ্ট মতামত ছিল। কোনো সরকারি বা বেসরকারি অনুষ্ঠানে বা কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করবার সময় ভারতীয় পোশাক পরাটাই তিনি উচিত মনে করতেন। আমার মনে হয়, তিনি এইভাবে একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও সর্বভারতীয় পোশাক উদ্ভাবনের চেষ্টায় ছিলেন। লম্বা আচকান, কাশ্মীরি টুপির সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় প্যান্ট ও ফিতে-বাঁধা জুতো মিলিয়ে পরতেন—এই পোশাকে তাঁর বহু ছবিও আছে। একটা কথা তাঁকে ইউরোপ থেকে ঘুরে আসার পরে বলতে শুনেছি। ইউরোপে চুড়িদার পায়জামা পরা সম্বন্ধে তাঁর আপত্তি ছিল। কারণ, ঐ ধরনের পায়জামা ইউরোপে ‘আণ্ডারওয়েয়ার’এর পর্যায়ে পড়ে এবং তিনি শুনেছেন সেখানকার সমাজে চুড়িদার পায়জামাপরা কোনো-কোনো ভারতীয়কে অসুবিধাজনক অবস্থায় পড়তে হয়েছে। অবশ্য রাঙাকাকাবাবু পরে কোনো-কোনো ক্ষেত্রে পুরোপুরি ইউরোপীয় পোশাক আনুষ্ঠানিকভাবেও পরেছেন। তবে, পোশাক যাই হোক না কেন, বিদেশে গিয়ে ব্যক্তিগত আচার-ব্যবহারে যাতে কোনোরকম খুঁত না থাকে সে-বিষয়ে তিনি খুব সজাগ থাকতেন। তিনি বলতেন, বিদেশে গেলেই পোশাক -আশাক, আচার-ব্যবহার খুবই রুচিসম্মত হওয়া চাই। কারণ, সব সময়েই মনে রাখতে হবে যে, আমরা অন্য দেশে কোনো না কোনো ভাবে আমাদের মহান দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমরা ব্যক্তিগতভাবে কী রকম আচার-ব্যবহার করি তার উপর আমাদের দেশের সুনাম নির্ভর করছে। 

জব্বলপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে কড়া পুলিস পাহারায় অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে সরকারি কর্মচারীরা রাঙাকাকাবাবুকে স্টেশনে নিয়ে গেল এবং স্ট্রেচারে করে বোম্বাই মেলে তাঁর নির্দিষ্ট কামরায় তুলে দিল। খবরটি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় স্টেশনে বেশ ভিড় হয়েছিল। বাড়ির যারা জব্বলপুর গিয়েছিলাম, প্রায় সকলেই তাঁকে বিদায় জানাবার জন্য স্টেশনে উপস্থিত ছিলাম। 

তাঁর জাহাজ বোম্বাই ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মুক্তি দেয়নি। জব্বলপুর জেলে বাবা একলা পড়ে গেলেন। তাঁর স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়তে লাগল। বাবার স্বাস্থ্য ও পারিবারিক সমস্যা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথাবার্তা ও লেখালেখি আরম্ভ হল। আমাদের পরিবারের দুই বন্ধু প্রভাসচন্দ্র বসু ও নৃপেন্দ্রচন্দ্র মিত্র এবং মামা অজিতকুমার দে উঠে পড়ে লাগলেন। বাবার গ্রেপ্তারের পর দিল্লির সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে বিরোধীপক্ষ থেকে মাঝে মাঝে নানারকম প্রশ্ন তোলা হত। ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে একবার হোম মেম্বার চক্ষু রক্তবর্ণ করে বলে বসলেন, “গভর্নমেন্ট হ্যাভ রিসনস টু বিলিভ দ্যাট হি ইজ ডিলি ইনভল্ভড্ ইন দি টেররিস্ট মুভমেন্ট।” (সরকারের বিশ্বাস করার কারণ আছে যে, তিনি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।) সুতরাং সরকার বাবাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনবার প্রস্তাব বিবেচনা করতে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। অনেক চেষ্টার পর, বাবার স্বাস্থ্য যখন সত্যিই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন তারা বাবার কার্শিয়ঙের বাড়িতে তাঁকে বন্দী করে রাখতে রাজি হল। 

নিজের বাড়িতে পাহারাওয়ালা-বেষ্টিত হয়ে বন্দী হয়ে থাকাটা একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। বাবা পথ দেখালেন। পরে ১৯৩৬-এ রাঙাকাকাবাবুও একই ভাবে কার্শিয়ঙে আমাদের বাড়িতে বন্দীজীবন যাপন করেন। 

রাঙাকাকাবাবু ইউরোপ চলে যাবার পরে ও বাবা কার্শিয়ঙে স্থানান্তরিত হবার পরে মা আমাকে নিয়ে পুরীতে দাদাভাই ও মাজননীর সঙ্গে দেখা করতে যান। মায়ের উদ্দেশ্য ছিল দাদাভাইকে অবস্থাটা পুরোপুরি বুঝিয়ে বলা। মা যে দিল্লিতে নিজে দরবার করেও ইউরোপ যাবার আগে রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে দাদাভাই ও মাজননীর দেখা করার ব্যবস্থা করতে পারেননি, সেজন্য মায়ের গভীর দুঃখ ছিল। ফলে দাদাভাইয়ের সঙ্গে রাঙাকাকাবাবুর আর জীবনে দেখা হয়নি। মাকে সান্ত্বনা দিয়ে দাদাভাই সেই সময় বলেছিলেন, “তোমাকে তো আমি আমার ‘মাজননী’ বলেই এতদিন জানতাম, দুঃখ কোরো না, তুমি তো আজ আমার ছেলের কাজ করলে।”

পুরী থেকে ফিরে মায়ের সঙ্গে আমরা সকলে ছুটির সময় সরকারের অনুমতি নিয়ে বাবার কাছে আমাদের গিধাপাহাড়ের বাড়িতে থাকতে গেলাম। বাড়িটি কার্শিয়াং শহর থেকে বেশ কিছু দূরে এবং মোটরের রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা ওপরে। দিনরাত রাইফেলধারী ডবল-ডবল সিপাই বাড়িটি পাহারা দিত। তা ছাড়া আমাদের সন্দেহ হত যে, আরও জনাকয়েক স্থানীয় বাসিন্দাকেও কিছু পারিশ্রমিক দিয়ে পুলিস তাদের কাজে লাগাত। কার্শিয়াং থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার সব সময় কড়া নজর রাখতেন। দার্জিলিংয়ের ইংরেজ ডেপুটি কমিশনারও নিয়মিত এসে সব ব্যবস্থা দেখে যেতেন। বাবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিযুক্ত হয়েছিলেন সিভিল সার্জন মেজর এস বি মুখার্জি। মেজর মুখার্জির মতো নিষ্ঠাবান ভদ্রলোক কমই দেখেছি। সরকারি কাজ করতে এসে বাবার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা বহুদিন অব্যাহত ছিল। পরে মেজর মুখার্জির অকস্মাৎ মৃত্যুতে বাবা ভ্রাতৃবিয়োগের ব্যথা পেয়েছিলেন এবং তাঁর পরিবারের কষ্ট লাঘব করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। 

স্বাস্থ্যের কারণে সরকার বাবাকে পুলিস পাহারায় বিকেলে হিলকার্ট রোডে ওপরের দিকে এক মাইল ও নীচের দিকে এক মাইল বেড়াতে দিত। আমরাও বাবার সঙ্গে বেড়াতাম। মাঝে মাঝে বেড়াবার সময় রাস্তায় অঘটন ঘটে যাবার উপক্রম হত। যাঁরা দার্জিলিং বা ঐ অঞ্চলে বেড়াতে যেতেন, তাঁদের ঐ রাস্তা দিয়েই যেতে হত। বাবাকে দেখতে পেয়ে অনেকে উত্তেজিত হয়ে গাড়ি থামিয়ে কিছু বলবার চেষ্টা করতেন। পেছনেই তো পুলিস। বাবা মুখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন কথা বলা বারণ। 

গ্রেপ্তার, খানাতল্লাশি, নির্বাসন সম্বন্ধে তো কত কথা বললাম। একটা কথা এই সূত্রে না বলে পারছি না। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এসপ্ল্যানেডে যে মাঝে মাঝে গ্রেপ্তার গ্রেপ্তার খেলা দেখে, এখানে-ওখানে রিলে-অনশন, চব্বিশ ঘণ্টার অনশনের গল্প শোনে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমরা কিন্তু এ ধরনের ফাঁকি দিয়ে দেশ উদ্ধারের প্রহসনের সাক্ষী ছিলাম না। গ্রেপ্তার বা খানাতল্লাশি বা অনশন ছিল অতি গুরুতর ও সর্বনাশা ব্যাপার। ব্যক্তির পক্ষে তো বটেই, বহু পরিবারের ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু ও বাংলার বিপ্লবীরা সংগ্রামের এসব হাতিয়ার কখনও ফাঁকা লোক-দেখানো তামাশার মতো ব্যবহার করতেন না। যখন পুরনো দিনের কথা লিখি, তখন ভাবি, কবে আবার অকৃত্রিম দেশপ্রেম ও আদর্শবাদের ঢেউ বাংলা তথা ভারতবর্ষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। 

১৬

কার্শিয়ঙে গিধাপাহাড়ে আমাদের বাড়ি ও নীচে আঁকাবাঁকা হিলকার্ট রোডের সঙ্গে বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর স্মৃতি আমার মনে মিশে আছে। কারণ ঐ বাড়িতে দু’জনকে খুব কাছ থেকে দেখেছি এবং দু’জনের সঙ্গেই হিলকার্ট রোডে যে কত বেড়িয়েছি তার হিসেব নেই। লেখাপড়ার ব্যাপারে বা জীবনের ছোট বড় মূল প্রশ্ন নিয়েই. অনেক শিক্ষা সেখানেই পেয়েছি। এখনও প্রায়ই মনে পড়ে, গিধাপাহাড়ের বাড়ির বসবার ঘরে বাবা বিবেকানন্দের বক্তৃতা তাঁর দরাজ গলায় শোনাচ্ছেন। রাঙাকাকাবাবু আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথা সহজ করে বোঝাচ্ছেন, বা তাঁদের সঙ্গে হিলকার্ট রোডে বেড়াচ্ছি, কথা বলছি, আর মধ্যে মধ্যে খুব আওয়াজ করে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের খেলনার মতো রেলগাড়ি নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে। 

বাবা যখন কার্শিয়ঙে বাড়িতে বন্দীজীবন যাপন করছেন, আমি তখন ইস্কুলের মাধ্যমিক স্তরে প্রবেশ করেছি। দেখা যায় বিপর্যয়ের মধ্যেও অনেক সময় কিছু কল্যাণ হয়। বাবা কার্শিয়ঙে বন্দী থাকার সময় ইস্কুলে ছুটি হলেই আমরা মা’র সঙ্গে সকলে মিলে তাঁর কাছে গিয়ে থাকতাম। সরকারের এই অনুগ্রহে আমার বিশেষ একটা লাভ হয়েছিল। বাবার কাছে কিছু লেখাপড়া করবার সুযোগ পেয়েছিলাম। প্রথমত, বাবার বোধহয় মনে হয়েছিল যে, আমার ইংরেজি ভাষার জ্ঞান যথেষ্ট নয়। সেজন্য যখন কাছে থাকতাম না তখন আমাকে ইংরেজিতে চিঠি লিখতে বলতেন। চিঠিগুলির ভুলত্রুটি দাগ দিয়ে সংশোধন করে ফেরত পাঠিয়ে দিতেন। কাছে থাকলে কী কী বাবা পড়াতেন বা পড়তে বলতেন সে সম্বন্ধে কিছু বলি। 

আমার মনে হয় বাবার বিশ্বাস ছিল যে, ভাষা ও সাহিত্যেই আমাদের শিক্ষার বুনিয়াদ। আমরা যা কিছু পরে শিখি সবই ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে আমাদের গভীরে প্রবেশ করে—সেটা আদর্শগত ব্যাপারই হোক বা বিজ্ঞান-ইতিহাস-রাজনীতি যাই হোক না কেন। আর একটা কথা বাবা খুব জোর দিয়ে বলতেন, ভাষা ভাল করে শিখতে হলে মুখস্থ করা চাই। অনেকেই জানেন যে, বাবা ইংরেজ কবি মিলটনের কাব্য ‘প্যারাডাইস লস্ট’ অনর্গল মুখস্থ বলে যেতে পারতেন। কলেজে ঢোকার পর সেই কাব্যের অংশবিশেষ মুখস্থ করতে আমরা তো হিমশিম খেতাম। 

.

বাঙলা ভাষার ক্ষেত্রে বাবা প্রথমেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনা পড়তে বলেন। শুধু পড়াই নয়, বঙ্কিম গ্রন্থাবলী থেকে কতকগুলি লম্বা লম্বা রচনা মুখস্থ করতে হত। মনে আছে আমার দিদি মীরাকে ও আমাকে কমলাকান্তের ‘আমার দুর্গোৎসব’ পুরোটা মুখস্থ করে বাবাকে শোনাতে হয়েছিল। প্রাণ যায় আর কী। কেবল মুখস্থ হলেই চলবে না, উচ্চারণ ও পড়ার কায়দা ঠিক হওয়া চাই। কয়েকটা অংশ এখনও ঠিক মুখস্থ আছে : 

“সপ্তমী পূজার দিন কে আমাকে এত আফিঙ্গ চড়াইতে বলিল। আমি কেন আফিঙ্গ খাইলাম। আমি কেন প্রতিমা দেখিতে গেলাম।” 

“আমি এই কালসমুদ্রে মাতৃ-সন্ধানে আসিয়াছি। কোথা মা? কই আমার মা? কোথায় কমলাকান্ত-প্রসূতি বঙ্গভূমি?” 

“এস ভাই সকল! আমরা কালস্রোতে ঝাঁপ দিই! এস আমরা দ্বাদশ কোটি ভুজে প্রতিমা তুলিয়া মাথায় বহিয়া, ঘরে আনি…ভয় কী? না হয় ডুবি, মাতৃহীনের জীবনে কাজ কী?…” 

ইংরেজি শেখাতে বাবা একদিকে বাইবেল, অন্যদিকে বিবেকানন্দের গ্রন্থাবলী পড়াতেন। তিনি নিজে কোরানও পড়তেন। বাবা বলতেন ভাল ইংরেজি শিখবার প্রথম পদক্ষেপ মন দিয়ে বাইবেল পড়া। বাইবেলের অনেক অংশও আমাকে মুখস্থ করতে হত। ইংরেজিতে বিবেকানন্দের সম্পূর্ণ গ্রন্থাবলী বাবার কাছে ছিল। পরিচ্ছেদ বেছে বেছে পড়তে দিতেন। শিকাগোর পার্লামেন্ট অব রিলিজনস-এ বিবেকানন্দের ইংরেজি বক্তৃতা মুখস্থ করতে হয়েছিল। এখনও বেশ খানিকটা মুখস্থ আছে। বাবা বলতেন,বিবেকানন্দের মতো ইংরেজি লেখা তিনি খুব কমই পড়েছেন। আর ভাষার মধ্য দিয়ে তাঁর বাণী যদি নিতে পারা যায় তাহলে তো কথাই নেই। এখনও বাবার গলায় শুনতে পাই বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা থেকে কয়েকটি লাইন : 

May the bell that tolled this morning in honour of this convention be the death knell of all fanaticism, of all persecution with the sword or with the pen and of all uncharitable feelings between persons wending their way to the same goal. 

ইংরেজি কবিতাও মুখস্থ করে শোনাতে হত। শেলির ‘দি স্কাইলার্ক’ পুরোটা কণ্ঠস্থ করে বাবার কাছে পরীক্ষা দিতে হয়েছিল—আরও ছিল কোলরিজের ‘দি এনসিয়েন্ট মেরিনার’।

বাবা ‘গল্পগুচ্ছ’ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ পড়া আরম্ভ করতে বলেছিলেন। বিদেশী গল্পের ক্ষেত্রে রাশিয়ান লেখকরা ছিলেন বাবার খুব প্রিয়, বিশেষ করে লিও টলস্টয়। টলস্টয়ের ‘টোয়েন্টিথ্রী টেলস’ আমাকে প্রথম পড়তে দিয়েছিলেন। পরে টলস্টয়ের কিছু-কিছু প্রবন্ধও পড়িয়েছিলেন। বাবা বলতেন যে, গান্ধীজি অনেক ব্যাপারেই টলস্টয়পন্থী ছিলেন। পরে বড় হয়ে বাবার সংগ্রহ থেকে টলস্টয়ের ও টুর্গেনিভের বড় বড় উপন্যাস পড়েছি। 

কার্শিয়ঙে গিয়ে বাবার শরীরের কিছু উন্নতি হল। যদিও রন্দী হয়ে থাকার যে অশান্তি, সে তো যাবার নয়। অন্যদিকে ইউরোপ-প্রবাসী রাঙাকাকাবাবুকে নিয়ে বাবা-মার খুব চিন্তা। মাঝে মাঝে বিভিন্ন ডাক্তারের মতামত রাঙাকাকাবাবু জানাচ্ছেন, কোনোটা আশাপ্ৰদ, আবার কোনোটা নয়। নানা রকমের চিকিৎসা তিনি করাচ্ছিলেন। বেশ কিছুদিন তো ভিয়েনা ছেড়ে চেকোস্লোভাকিয়ার কার্লসবাদ স্বাস্থ্যনিবাসে গিয়ে সেখানকার প্রাকৃতিক উষ্ণ, জল অনেক খেলেন। কিন্তু তাঁর ‘গল-ব্লাডার’ বা পিত্তকোষের অসুখ কিছুতেই বাগ মানছিল না। শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করাতেই হয়, সেকথা পরে বলব। 

ইউরোপে চিকিৎসা তো হবে, কিন্তু খরচ? সেটাও একটা বড় চিন্তা। বাবা জেলে যাওয়ার পর কটকের সংসার চালাবার জন্য দাদাভাই জানকীনাথকে আবার কোর্টে বেরোতে হয়। আমাদের জন্য শেষ পর্যন্ত দিল্লির সরকার যে ভাতা মঞ্জুর করেন তার পরিমাণ বাবার মাসিক আয়ের তিরিশ ভাগের একভাগ হবে! বাবার যা কিছু জীবনবীমার পলিসি ছিল সে তো সব ভেস্তে গেল। এই অবস্থায় আমার মাকে রাঙাকাকাবাবুর জন্য অন্য পথ খুঁজে বের করতে হল। ঐ সূত্রে দুজনের কথা বিশেষ করে বলছি। একজন ছিলেন নাড়াজোলের কুমার দেবেন্দ্রলাল খান, মেদিনীপুরের বিপ্লবীদের পিতৃতুল্য রাজা নরেন্দ্রলাল খানের ছেলে। দেবেন্দ্রলাল খান এগিয়ে এলেন রাঙাকাকাবাবুর জন্য অর্থ-সাহায্য নিয়ে। মাকে বললেন, এ সাহায্য গ্রহণ করতে যেন কোনো দ্বিধা না করেন, কারণ তিনি কেবল একটি জাতীয় কর্তব্য করছেন। সেই থেকে দেবেন্দ্রলালও আমাদের আর এক কাকাবাবু হয়ে গেলেন, এবং দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমে খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। বাবা দেবেন্দ্রলালের কোনো সামাজিক আমন্ত্রণও কখনও এড়িয়ে যেতে পারতেন না। বলতেন, ওখানেও চিরকালের জন্য আমরা বাঁধা পড়ে আছি। 

ব্যারিস্টারিতে বাবার ‘গুরুজী’ ছিলেন স্যার নৃপেন্দ্রনাথ সরকার। রাজনীতিতে তাঁদের মতামত ছিল সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুজনের মধ্যে ছিল গভীর প্রীতির সম্পর্ক। বাবার কাছে শুনেছি, দেশবন্ধু প্রায়ই বলতেন, লাইফ ইজ লারজার দ্যান পলিটিকস। বাবা ও নৃপেন্দ্রনাথের সম্পর্কটা ছিল এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখন তো দেখছি উলটো কথা শেখানো হয়। বোধহয় অনেকে আজও জানেন না কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জেনারেল ও পরে ভারত সরকারের ল মেম্বার স্যার নৃপেন্দ্ৰনাথ সরকার সুভাষচন্দ্র বসুর ইউরোপে চিকিৎসার জন্য গোপনে মাকে অর্থ সাহায্য করতেন। সরকার সাহেবের সঙ্গে এই সূত্রে দেখা করতে মা বেশ কয়েকবার আমাকে সঙ্গে করে তাঁর এলগিন রোডের বাড়িতে নিয়ে গেছেন। সরকার-সাহেব গভীর স্নেহের সুরে বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর খবর নিতেন এবং অতি নম্রভাবে একটি খাম মা’র দিকে এগিয়ে দিতেন। 

বাবার কাছে লেখাপড়ার কথা বললাম। বাড়ির ছেলেমেয়েদের আরও একটা বিধান ছিল—সন্ধ্যাবেলা একসঙ্গে বসে স্তোত্র পাঠ। এটা বোধহয় রাঙাকাকাবাবুই আরম্ভ করে দিয়েছিলেন, কারণ বড় ভাইবোনেদের কাছে শুনেছি ছেলেবেলায় তাঁদেরও এলগিন রোডের বাড়িতে এটা করতে হত। আমাদের স্কুলজীবনে উডবার্ন পার্কেও ঐ নির্দেশ জারি ছিল, কিন্তু কার্শিয়ঙে গেলে স্তোত্রপাঠের অধিবেশন প্রতি সন্ধ্যায় বসবেই। আমাদের প্রত্যেকের নিজের নিজের স্তবের খাতা ছিল এবং স্তবগুলি মুখস্থ করতে হত। দুটি স্তবের কয়েকটি মনে আছে। একটি ভবানী-স্তোত্র : 

ন তাতো ন মাতা ন বন্ধুনদাতা 
ন পুত্রো ন পুত্রী ন ভৃত্যো ন ভর্তা
ন জায়া ন বিদ্যা ন বৃত্তি মমৈব
গতিস্তং গতিস্তং ত্বমেকা ভবানী। 

অন্যটি ছিল শিবস্তো 

প্রভুমীশমনীশমশেষগুণম্‌
গুণহীনমহীশ গরলাভরণ,
রণনির্জিতদুর্জয়দৈত্যপুরম্
প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্। 

১৭

ব্রিটিশ সরকার ইউরোপ যাওয়ার ব্যাপারে রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে একটা চাতুরি করেছিল। ১৯৭১ সালে লণ্ডনের ইণ্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে পুরনো নথিপত্র দেখতে গিয়ে আমি এটা বুঝতে পারি। একদিকে তো লণ্ডন থেকে ইণ্ডিয়া অফিস (মানে সেকালকার আমাদের দেশশাসনের হর্তাকর্তারা) ইউরোপের নানা দেশে ইংরেজ সরকারের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, অতি বিপজ্জনক এক ব্যক্তি ইউরোপে এসেছেন, তাঁর উপর যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা হয়। অন্যদিকে তাঁদের জানাচ্ছেন যে, সুভাষচন্দ্র বসুর পাসপোর্টে গন্তব্যস্থান হিসাবে ইটালি ও অস্ট্রিয়া এই দুটি দেশের নাম লেখা আছে। এতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, অন্য কোনো দেশে, যেমন ইংল্যাণ্ড, যাবার ছাড়পত্র তাঁর নেই। আসলে কিন্তু তারা গোপনে স্বীকার করছে যে, ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষের যে-কোনো অধিবাসীর (যার ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান পাসপোর্ট আছে) ইংল্যাণ্ডে যাবার অধিকার আছে। আবার বলছে যে, সুভাষচন্দ্র বসুর একটা ধারণা হয়েছে যে, তাঁর ইংল্যাণ্ডে যাবার ছাড়পত্র নেই, এই ভুল ধারণাটা যেন ব্রিটিশ কূটনীতিকেরা ভেঙে না দেন! কারণ, দুটি জায়গা থেকে তাঁকে দূরে রাখা বিশেষ দরকার-লণ্ডন ও বার্লিন। ঐ দুটি জায়গায় অনেক ভারতীয় ছাত্র আছে। ইংরেজ সরকারের ভয়, সুভাষচন্দ্রের প্রভাব তাদের উপর পড়লে সমূহ বিপদ। যাই হোক, তিরিশের দশকে এই চাতুরি কাজ করলেও, চল্লিশের দশকে বিশ্বযুদ্ধর মধ্যে রাঙাকাকাবাবু ব্রিটিশ সরকারকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে তাদের ছাড়পত্র বিনাই তিনি পৃথিবীর যে-কোনো দেশে ইচ্ছামতো বিচরণ করতে পারেন। 

১৯৩৪-এর মাঝামাঝি, রাঙাকাকাবাবু যখন ইউরোপে ও বাবা কার্শিয়ঙে অন্তরীণ, দাদাভাই জানকীনাথ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে শেষ পর্যন্ত কটক থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হল। প্রায় মাস তিনেক ধরে যমে-মানুষে লড়াই চলল। 

১৯৩১ সালে আমাদের কাকাবাবু শৈলেশচন্দ্রের বিয়ে ছিল দাদাভাইয়ের জীবনের শেষ আনন্দোৎসব। ছোটকাকা সন্তোষচন্দ্র আগেই মারা গিয়েছিলেন, ফলে কাকাবাবুই সেই সময় বাড়ির সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর বিয়েতে বসু-বাড়ির যে যেখানে আছেন, কলকাতায় এসে মিলিত হন। বিয়ের পর ১নং উডবার্ন পার্কের মাঠে বৃহত্তর বসু-পরিবারের একটা গ্রুপ ফোটোগ্রাফ তোলা হয়। শ’খানেক লোক—বসু-বাড়ির চার পুরুষ একসঙ্গে। ছবিটা তুলতে ফোটোগ্রাফারকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল, কারণ ক্যামেরার পরিধির মধ্যে সকলকে ধরানোই যাচ্ছিল না। আমাদের সৌভাগ্য, রাঙাকাকাবাবু বিয়ের সময় জেলের বাইরে ছিলেন এবং সব অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। 

১৯৩১ সালের পর থেকে নানারকম পারিবারিক বিপর্যয়—বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর গ্রেফতার এবং একের পর এক নিকট-আত্মীয় ও কনিষ্ঠদের মৃত্যু—দাদাভাইয়ের শরীর ও মন ভেঙে দিয়েছিল। এলগিন রোডের বাড়িতে তাঁর জীবনের শেষ দু-তিন মাসের স্মৃতি আমাদের সকলের মনেই খুব বেদনার উদ্রেক করে। বেশ কিছুদিন তিনি একেবারেই শয্যাগত ছিলেন। তাঁর চিকিৎসার সব ব্যবস্থা নতুনকাকাবাবু করেছিলেন, বাড়িতে বড়-বড় ডাক্তার-কবিরাজের ক্রমাগতই আনাগোনা। আত্মীয়স্বজন বন্ধুরা প্রায় সব সময়েই ভিড় করে থাকতেন। বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে তিল ধারণের জায়গা থাকত না। এখন তো গুরুতর অসুস্থ রোগীর ঘরে ডাক্তাররা কাউকে ঢুকতেই দেন না। আর আজকাল বেশি অসুখ করলে তো হাসপাতালে দেওয়াই রেওয়াজ। দাদাভাইয়ের ঘর—যেটা এখন নেতাজীর ঘর বলে সকলে জানে—প্রায়ই ভরে থাকত। আমি আজ ডাক্তার ও মানুষ হিসাবে প্রায়ই ভাবি, কোনটা ঠিক—অসুস্থ অবস্থায় আত্মীয়স্বজন-বন্ধু-পরিবৃত হয়ে বাড়িতে থাকা, না হাসপাতাল বা নার্সিং হোমের এক নির্জন ঘরে একলা একলা দিন গোনা। যাই হোক, ছেলেবেলায় কিন্তু আমার কখনো-কখনো মনে হয়েছে যে, দাদাভাইয়ের ঘরে বড্ড বেশি লোক ভিড় করে থাকে, সকলেই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চায় এবং অতিরিক্ত গোলমাল হয়। তা ছাড়া প্রায়ই হঠাৎ-হঠাৎ যখন দাদাভাইয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক হত তখন চারিদিকে খবর পাঠানো হত ও বাড়িতে লোক ভেঙে পড়ত। মৃত্যুপথযাত্রী এক বৃদ্ধের কানের কাছে সমবেত কণ্ঠে ও সরবে নামকীর্তন শুনে আমি তো বেশ হকচকিয়ে যেতাম। 

ডাক্তাররা যখন বুঝলেন যে, সে-যাত্রায় দাদাভাইয়ের রক্ষা পাবার আশা কম, তখন বাবাকে গৃহবন্দী অবস্থায় কলকাতায় এনে রাখবার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হল। অনুসন্ধান করে সরকার যখন আশ্বস্ত হলেন যে, দাদাভাইয়ের জীবনসংশয় সম্বন্ধে কোনো সংশয় নেই, তখন তাঁরা বাবাকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করলেন। বাবা উডবার্ন পার্কের বাড়তেই গৃহবন্দী হলেন, তবে তাঁকে এলগিন রোডের বাড়িতে যাওয়া-আসা করার অনুমতি দেওয়া হল। দিনের বেশির ভাগটাই বাবা এলগিন রোডের বাড়িতে দাদাভাইয়ের কাছে কাছে থাকতেন। দুই বাড়ির মধ্যে ব্যবধান তো খুবই কম, যাওয়া-আসা হেঁটেই করতেন। সেই সময় গোয়েন্দাদের কড়া পাহারা খুব নজরে পড়ত। মনে আছে, বাবা বা রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে যখনই আমরা হেঁটে এবাড়ি-ওবাড়ি করতাম, তাঁরা আমাদের রাস্তায় পুলিসের চর বা “টিকটিকি”দের চিনিয়ে দিতেন। তাদের হাবভাব ও আচরণে এমন একটা বিশেষত্ব ছিল যে, ভাল করে নজর করলেই আন্দাজ করা যেত তারা কী জাতের লোক। পরে “টিকটিকি” চিনে নেবার ক্ষমতা নিজের জীবনে বেশ কাজ দিয়েছিল। 

দাদাভাই মাঝে-মাঝে যখন খানিকটা সুস্থ বোধ করতেন, বাবাকে কাছে ডেকে তাঁর মাথায় হাত দিয়ে অনেক মনের কথা বলতেন। একদিন খুব আবেগের সঙ্গে বাবাকে বলেছিলেন, “তুমিই বসু-বাড়ির মধ্যমণি এবং আমার বিশ্বাস, বংশের মর্যাদা তোমার হাতে অক্ষুণ্ণ থাকবে।” দাদাভাইয়ের মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে বাবাকে একটা মর্মান্তিক কাজ করতে হয়েছিল। ডাক্তাররা যখন জবাব দিয়ে গেছেন এবং সকলেই দাদাভাইয়ের শেষ দিনের অপেক্ষায় রয়েছেন, বাবা এলগিন রোডের বাড়িতে শান্তভাবে বসে সরকারকে একটি চিঠি লিখলেন। লিখলেন যে, তাঁর বাবার জীবন তিলে তিলে শেষ হয়ে আসছে, সরকার যেন আগে থেকেই তাঁকে পিতার শেষকৃত্য করবার জন্য এবং তাঁর শেষ-যাত্রায় অংশ গ্রহণ করবার অনুমতি দিয়ে রাখেন। কারণ, কখন কী হয় তা বলা যায় না। রাজবন্দীদের সম্বন্ধে যে-কোনো সরকারি সিদ্ধান্তই সময়সাপেক্ষ। কী জানি কেন, বাবা ঐ চিঠির খানিকটা আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। 

একেবারে শেষের দিকে ঠিক হল যে, দাদাভাইকে শেষ দেখার জন্য রাঙাকাকাবাবুকে ইউরোপ থেকে এরোপ্লেনে আনানো হবে। আমার মনে হয়, এটাই ছিল রাঙাকাকাবাবুর প্রথম এরোপ্লেন-যাত্রা। সেকালে রাত্রে এরোপ্লেন চলত না। গতিও ছিল আজকের তুলনায় খুবই মন্থর। ইউরোপ থেকে ভারতে আসতে দিন তিনেক লেগে যেত। অনেক চেষ্টা করেও রাঙাকাকাবাবু ঠিক সময়ে কলকাতায় পৌঁছতে পারলেন না—দেড় দিন দেরি হয়ে গেল। 

এদিকে ইংরেজ সরকার তাদের পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলেছে। আমরা দল বেঁধেই দমদম বিমানবন্দরে গিয়েছি। বিমানবন্দরটি তখন ছিল নেহাতই ছোট। এরোপ্লেনের হ্যাঙ্গার ছাড়া ঘরবাড়ি কিছু ছিল না। কিন্তু বন্দরের এলাকাটা বেশ বড়ই ছিল। আমরা সেখানে পৌঁছে দেখলাম, পুলিস চারিদিক থেকে বিমানবন্দরটি ঘিরে ফেলেছে, কারুর ঢোকবার বা বেরোবার অনুমতি নেই। বেশ কিছুক্ষণ পুলিসের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা চলল, কিন্তু কোনো রকমেই বিমানের কাছাকাছি আমরা যেতে পারলাম না। বিমান থেকে নামতেই রাঙাকাকাবাবুর উপর একটা কড়া আদেশ জারি হল। তাঁকে এলগিন রোডের বাড়িতে অন্তরীণ হয়ে থাকতে হবে, সেই অবস্থাতেই তাঁকে স্বর্গত পিতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে হবে এবং তারপর আবার ইউরোপ পাড়ি দিতে হবে। পুলিসের গাড়িতে পাহারা সমেত তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল। 

এলগিন রোডের বাড়ির গাড়িবারান্দায় বাবার সঙ্গে রাঙাকাকাবাবুর আবেগরুদ্ধ পুনর্মিলনের দৃশ্য আমার বেশ মনে আছে। 

১৮

বড় একটা পরিবারের মাথার উপরে যিনি থাকেন, তাঁর ব্যক্তিত্ব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সকলকে কেমন একসূত্রে বেঁধে রাখে, তার একটা জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ছিলেন আমাদের দাদাভাই জানকীনাথ। সব বড়-বড় পরিবারের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধারা থাকে, বসু-বাড়িতেও ছিল। যেমন একদিকে এক বৈপ্লবিক ধারা ও ত্যাগধর্মী মানুষ, তেমনই অন্যদিকে গোঁড়া সংস্কারের ধারা ও পুরোপুরি সংসারধর্মী বিষয়ী মানুষ। এই দুই বিপরীত ধারার মধ্যে আবার বেশ কিছু পাঁচমেশালি লোক। যা একটা বড় পরিবারের বেলায় খাটে, দেশ ও জাতির ক্ষেত্রেও বোধহয় সেটা সত্য। দাদাভাই ছিলেন নানা রঙের ও নানা ধর্মের এই বসু-বাড়ির সমন্বয়ের প্রতীক। দেশ ও জাতিকে এক করে রাখার জন্যও এই ধরনের প্রতীকের প্রয়োজন হয়। 

দাদাভাইয়ের মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গে বসু-বাড়ির ইতিহাসের একট যুগ শেষ হয়ে গেল। যে-সব বাড়ির বড় ঐতিহ্য আছে, একটা জেনারেশনের অবলুপ্তির পর সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার কে বহন করবে এটা একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই এ-রকম ঘটনার পর বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপারটাকেই বড় করে দেখেন। বসু-বাড়িতেও স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু, সুখের বিষয়, ব্যাপারটার সুষ্ঠুভাবে এবং সর্বসম্মতিক্রমে সমাধান হয়ে গিয়েছিল। আদর্শগত ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার স্বাভাবিকভাবেই বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর উপর পড়ল, কারণ বসু-বাড়িতে তাঁরা দু’জনই দেশের ও দশের কাজে ব্রতী ছিলেন। 

দাদাভাইয়ের তিন ভাইয়ের মধ্যে আমরা কেবল আর-একজনকেই দেখেছিলাম। দাদাভাই ছিলেন সবচেয়ে ছোট, তাঁর উপরেই ছিলেন সেজ-দাদাভাই দেবেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন পণ্ডিত লোক। সারা জীবন শিক্ষকতা করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। অবসর নেওয়ার পর উত্তর কলকাতার বাদুড়বাগানে থাকতেন। মা’র সঙ্গে অনেকবার তাঁর বাড়ি গিয়েছি। তিনি দাদাভাইয়ের মতোই অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন এবং তাঁকে দেখলেই শ্রদ্ধার ভাব জাগত। শিক্ষক হিসাবে তাঁর নিজের পরিবারেও তিনি বেশ কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। নিজের স্ত্রী ও কন্যাকে একেবারে প্রথম পাঠ থেকে শুরু করে ইংরেজি সাহিত্যের উঁচু স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। মা’র কাছে শুনেছি, আমাদের সেজ-দিদিমণি মাত্র অক্ষর-পরিচয় নিয়ে বাড়ির বউ হয়ে এসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে শেকসপীয়র মিলটন আলোচনা করতেন। দেবেন্দ্রনাথ দাদাভাইয়ের মৃত্যুর বছর চারেক আগেই মারা যান। 

আমাদের ছয় পিসির মধ্যে একজনকে তো আমি দেখিনি। ন-পিসিমা অল্পবয়সেই মারা যান। কিন্তু ন-পিসেমশাই সরোজেন্দ্রকুমার দত্ত ও তাঁর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বসু-বাড়ির ঘনিষ্ঠতা চিরকাল বজায় ছিল। বড়-পিসিমা প্রমীলা অল্পবয়সেই বিধবা হন। বাবা প্রায়ই তাঁকে উডবার্ন পার্কের বাড়িতে এনে রাখতেন। সেই সময় আমি প্রায়ই রাত্রে বড়পিসিমার হেফাজতে থাকতাম। রাত্রে তাঁর ভাল ঘুম হত না, অনেকক্ষণ বই পড়তেন—বেশির ভাগই কিন্তু ইংরেজি বই। কথা বলবার জন্য নানা অজুহাতে আমাকে জাগিয়ে রাখবার চেষ্টা করতেন। তাঁর ইংরেজির জ্ঞান ও উচ্চারণ খুব ভাল ছিল এবং অনেক সময়ে ভাইপো-ভাইঝিদের ইংরেজি উচ্চারণ শুধরে দিতেন। বড়-পিসিমার হাতের নিরামিষ রান্না ছিল উৎকৃষ্ট, আমরা তো তাঁর হাতের রান্না খাবার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকতাম। পরে অনেক সময় ভেবেছি, এরকম সর্বগুণসম্পন্না মহিলাদের জীবন অকাল-বৈধব্যের ফলে আমাদের সমাজে কেমন যেন বিস্বাদ ও বিফল হয়ে যায়। পিসিমাদের সম্বন্ধে সাধারণভাবে বলতে পারি, তাঁদের স্বভাবের মাধুর্যই আমার মনে গেঁথে রয়েছে। সেজ-পিসিমা তরুবালা ও নতুন-পিসিমা প্রতিভা তো খুবই কোমল স্বভাবের ছিলেন। ওরই মধ্যে মেজ-পিসিমা সরলা ও ছোট-পিসিমা কনকলতা ছিলেন একটু মেজাজি। 

গভীর শোকের মধ্যে হলেও ১৯৩৪-এর শেষে বাবা ও রাঙাকাকাবাবু নিজেদের মধ্যে পরামর্শ ও আলোচনার বেশ একটা ভাল সুযোগ পেয়েছিলেন। রাঙাকাকাবাবু প্রায় দু বছর ইউরোপ প্রবাসের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বাবাকে ওয়াকিবহাল করতে পেরেছিলেন। আমার মনে হয়, দুই ভাই তাঁদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনার অনেকটাই সেই সময় ছকে ফেলেছিলেন। আমার বেশ মনে আছে, বাবা ও রাঙাকাকাবাবু এলগিন রেডের বাড়ির তিনতলার উত্তরের একটি ঘরে মেঝেতে মুখোমুখি বসে দীর্ঘ আলোচনা করছেন। তারই ফাঁকে রাঙাকাকাবাবু একদিন আমাকে উপরে ডেকে নিয়ে গিয়ে ম্যাট্রিক পাশ করার পর আমি কী করব জানতে চেয়েছিলেন। আমি কেবল এইটুকুই বলতে পেরেছিলাম যে, আর্টস না পড়ে সায়ান্স পড়াটাই আমি মোটামুটিভাবে ঠিক করেছি। সিদ্ধান্তটা ঠিক হয়েছিল বলে আমি আজ মনে করি না। সেই সময় সাহস করে রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি বিশদ আলোচনা করতে পারতাম তাহলে খুব ভাল হত। 

দাদাভাই যেদিন রাত্রে মারা গেলেন, তার পরের দিনই ছিল আমার বার্ষিক পরীক্ষার দুটি পেপার। বাবা জিজ্ঞাসা করলেন পরীক্ষা না দিলে বিশেষ কোন অসুবিধায় গড়ব কি না। দুটো পেপারে না বসেও আমি অপ্রত্যাশিতভাবে পরীক্ষায় বেশ ভাল করে ফেললাম। 

দাদাভাইয়ের মৃত্যুর পর বসু-বাড়িতে পুরো এক মাস অশৌচ পালন করা হয়েছিল। আগেই বলেছি আমাদের বাড়িতে গোঁড়ামির একটা ধারা ছিল। আচার-অনুষ্ঠানের শেষ ছিল না। অনেকেই তথাকথিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে বেশ বাড়াবাড়িই করতেন। এটা তো সকলেরই জানা যে, বাবা ও রাঙাকাকাবাবু দুজনেই, আপাতদৃষ্টিতে নয়, অন্তরের গভীরে ধার্মিক ছিলেন। অনেক অর্থহীন আচার সম্বন্ধেও তাঁরা একটা উদার মনোভাব দেখাতেন। আমার মনে হয়, তাঁরা কারও বিশ্বাসে বা শ্রদ্ধায় অযথা আঘাত দিতে চাইতেন না। দাদাভাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান বেশ বড় করেই হয়েছিল। সাত ছেলের দানসামগ্রীর সাতটা সেট দেখে আমি তো বেশ হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। গো-দানের জন্য গোরু-বাছুরও প্যাণ্ডেলের বাইরে হাজির ছিল। তবে যখন কানাঘুষো শুনলাম যে, শ্রাদ্ধের কাজ আরম্ভ হওয়ার আগেই গেটের বাইরে দানসামগ্রী নিয়ে পুরোহিতদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের চুক্তি হয়ে গেছে, তখন ঐ ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জোর ঘা খেল। গোরু-বাছুরের অধিকারী তো মূল্য আদায় করে তার পোষ্য নিয়ে বাড়ি গেল। 

ব্রাহ্মণ-ভোজনের এক দৃশ্য আমি কোনদিন ভুলিনি। একদল ব্রাহ্মণ এসেছেন বসু-বাড়ির দায় উদ্ধার করতে। খেতে বসেছেন ছাদে। খাবার পরিবেশনকারীরা হিমসিম খাচ্ছেন—এত তাড়াতাড়ি সব উধাও হচ্ছে। দেখি বেশ কয়েকজন ব্রাহ্মণের পাঞ্জাবির ভিতরে বেশ বড় গোছের ঝোলা। খানিকটা খাচ্ছেন, আর বেশ খানিকটা ঝোলাতে ফেলছেন। 

অন্যদিকে বাবা ও রাঙাকাকাবাবু অন্য ধরনের ব্রাহ্মণ-ভোজনের ব্যবস্থা করেছিলেন। কয়েকজন পণ্ডিত ও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণ বন্ধু এসেছেন খেতে। তাঁদের জন্য ব্যবস্থা আলাদা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কথা-সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আমার বোন গীতার অটোগ্রাফের খাতায় তিনি ঐ উপলক্ষে দু লাইন লিখে রেখে গেলেন। 

১৯

বাবা জব্বলপুরে বন্দী থাকার সময় একবার মা আমাদের মামার বাড়িতে রেখে মামাবাবুকে সঙ্গে নিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আমরা তো বয়সে তখন খুবই ছোট, বাবাকে দেখতে যেতে না পারলে আমাদের মন বেশ খারাপ হত। কথাটা শুনে বাবা সেন্সরের চোখ এড়িয়ে আমাদের নামে একখানা সুন্দর চিঠি মার হাত দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। চিঠিটির কথা আমার বেশ মনে আছে—ইংরেজিতে লেখা, শুরু করেছিলেন ‘মাই চিলড্রেন’ দিয়ে। চিঠিটি ছিল আবেগে ভরা। আমাদের মন প্রফুল্ল রাখতে বলে তিনি লিখেছিলেন যে, বিধির নিয়ম সব সময়ে আমাদের পক্ষে বোঝা সহজ নয়, কোনো মহৎ উদ্দেশ্যসাধনের জন্য বিধাতা তাঁকে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছেন। এই সূত্রে বলি, বাবা ও রাঙাকাকাবাবু দুজনেই বিধাতাকে মাতৃরূপে দেখতেন। বাবার চিঠিপত্রে সেজন্য পদে-পদে ‘ডিভাইন মাদার’-এর উল্লেখ থাকত। ঐ চিঠিতে বাবা আরও বলেছিলেন যে, তাঁদের ব্যক্তিগত নির্যাতনভোগের মধ্যে নিশ্চয়ই দেশ ও দেশবাসীর কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যেদিন তাঁদের কৃচ্ছ্রসাধন সম্পূর্ণ হবে, সেদিন তিনি আবার আমাদের মধ্যে ফিরে আসবেন। আমরা তখন জানতাম না যে তিরিশের দশকের প্রথম জেলবাসের চেয়ে আরও কঠিন পরীক্ষা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ ভারতে বাবার সুদীর্ঘ বন্দী-দশা তাঁর মন ভাঙতে না পারলেও স্বাস্থ্য সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছিল। 

রাঙাকাকাবাবুর জেল-জীবনের নানারকম অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে তো আগে কিছু লিখেছি। বাবা বন্দী-জীবন কেমন কাটাতেন তার একটা ধারণা দেবার জন্য জব্বলপুর জেল থেকে মা’র কাছে লেখা একখানা চিঠি থেকে খানিকটা পড়ে শোনাই। 

“…তুমি আমার জন্য কিছুমাত্র চিন্তিত হইও না। আমি একলা আছি বটে, কিন্তু সত্য বলছি মন ভাঙেনি এবং আশা করি ভগবানের কৃপায় মন ভাঙিবে না। অবশ্য সুভাষ যখন ছিল তখন নানা বিষয়ে আলোচনা করিয়া সময় কাটিত; এখন সে সুযোগ নাই। তবে পড়াশুনা করিয়া সময় একরকম কাটিয়া যাইতেছে; এবং সেই জন্য আরও কিছু বইয়ের জন্য তোমাকে লিখেছি। কতক বই সুভাষ লইয়া গিয়াছে। সে বেচারার আরও কষ্ট হইবে, বিশেষত যখন শরীর অসুস্থ। তবে ভগবান তাহাকে বাল্যাবস্থা থেকে সন্ন্যাসী করিয়াছেন এবং বন্দীজীবনে সে একরকম অভ্যস্ত। সুভাষ ফিরে আসতে বোধহয় আরও তিন সপ্তাহ; ততদিন পড়াশুনা লইয়া সময় কাটাইয়া দিব। মনে যে নানারকম চিন্তা আসে না একথা বলা মিথ্যা হবে; কিন্তু তোমরা যদি সুস্থ শরীরে থাক ও মনের জোর করিয়া থাক তাহলে আমিও কতকটা নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিতে পারিব। আমি শরীরের প্রতি খুব যত্ন করি এবং রান্নার সম্বন্ধে নিজে ব্যবস্থা করি এবং কী রকম করে রাঁধতে হবে তাহাও মাঝে মাঝে বলিয়া দি। দেখছ ত দরকার হলে এসবও করিতে পারি। যখন পড়াশুনা করিতে ভাল লাগে না, তখন কয়েদিদের সঙ্গে তাহাদের চুরি-ডাকাতির গল্প জুড়িয়া দি!…” 

১৯৩৫ সালের মাঝামাঝি বাবা মুক্তি পান। রাঙাকাকাবাবু তখন ইউরোপে। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি ইউরোপের নানা দেশে যে কাজ করেছিলেন তার যথার্থ মূল্যায়ন এখনও হয়নি। মা’র কাছে ও বাড়ির বন্ধুবান্ধবদের কাছে রাঙাকাকাবাবু নিয়মিত চিঠি লিখতেন, তাছাড়া দেশের খবরের কাগজে যতটা সম্ভব তাঁর কাজকর্ম সম্বন্ধে খবর ছাপাবার চেষ্টা করা হত। অন্য দেশের পত্রপত্রিকায় তাঁর সম্বন্ধে যা বেরোত, তিনি প্রায়ই বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। আমরা সকলেই এই সব সূত্রে তাঁর খবর পাবার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকতাম। তাছাড়া তিরিশের দশকে ইউরোপ প্রবাসের সময় তিনি তাঁর বই ‘দি ইণ্ডিয়ান স্ট্রাগল ১৯২০–৩৪’ লেখেন। বইটি সহজ ও স্বচ্ছ ইংরেজিতে লেখা। সেজন্য স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও বইটি পড়তে পারে। বই লেখবার জন্য নানারকম তথ্য ও উপাদান রাঙাকাকাবাবু চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। যতটা সম্ভব সংগ্রহ করে সেগুলি তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রবাসে যথেষ্ট বই বা কাগজপত্র তিনি পাননি, সেজন্য বেশির ভাগটাই তাঁকে মন থেকে লিখতে হয়েছিল। দাদাভাইকে শেষ দেখা দেখতে দেশে আসার সময় তিনি তাঁর বইয়ের পাণ্ডুলিপির একটা কপি সঙ্গে নিয়ে আসছিলেন, কিন্তু দেশের মাটিতে পা দেওয়া মাত্র করাচিতে পুলিস সেটা বাজেয়াপ্ত করে নেয়। বইটি পরের বছরের গোড়ায় লণ্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। কিন্তু কালক্ষেপ না করে ব্রিটিশ সরকার সেটা ভারতে নিষিদ্ধ করে দেয়। এই বই লেখার সূত্রেই রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে পরবর্তীকালে আমাদের কাকিমা শ্রীমতী. এমিলি শেঙ্কেলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। তাছাড়া ভিয়েনা ও ইউরোপের অন্যত্র বেশ কয়েকটি সম্ভ্রান্ত, বিদগ্ধ ও ভারতপ্রেমী পরিবারের সঙ্গে রাঙাকাকাবাবুর গভীর বন্ধুত্ব হয়। তাঁরা সকলেই শেষ পর্যন্ত বসু-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ডাক্তার ও শ্রীমতী ফেতার, রেনি ও হেডি ফুলপমিলার, আলেকজাণ্ডার ও কিটি কুরতি ও আয়াল্যাণ্ডের শ্রীমতী উত্স।এদেশ থেকে কেউ কিছু দেবার আগেই শ্রীমতী ফেতার ও. শ্রীমতী ফুলপ-মিলার বহু চিঠি, কাগজপত্র ও ছবি নেতাজী রিসার্চ ব্যুরোতে পাঠিয়েছিলেন। শ্রীমতী কুরতি তো নেতাজী সম্বন্ধে একটি ছোট কিন্তু মূল্যবান বই-ই লিখেছেন। 

বহুদিন ধরে পরাধীন থাকবার একটা বড় কুফল হচ্ছে যে, দাসত্বের মানসিকতা জাতিকে পেয়ে বসে। আমরা ছিলাম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি উপনিবেশ। ইংরেজের চোখ দিয়ে সারা জগৎকে দেখতে আমাদের শেখানো হয়েছিল। আর বাইরের জগৎ বলতে আমরা বুঝতাম ইংল্যাণ্ড। প্রথম সারির জাতীয়তাবাদী নেতাদের মধ্যে রাঙাকাকাবাবুই প্রথম ইংল্যাণ্ডকে বাদ দিয়ে নিজের চোখ দিয়ে ও মুক্ত মনে জগৎকে বিচার করতে শুরু করেন এবং ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামীদের পক্ষে ইউরোপের নানা দেশে সরাসরি প্রচার আরম্ভ করেন। ইংল্যাণ্ড যে ইউরোপ নয়, এবং মধ্য ইউরোপের সঙ্গে যে আমাদের একটা ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে, সেটা রাঙাকাকাবাবুই প্রথম আমাদের বোঝাতে আরম্ভ করেন। এখন দেখছি, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা বরং সহজ, কিন্তু ব্যক্তি ও জাতি হিসাবে মানসিক স্বাধীনতা অর্জন করা শক্ত ও সময়-সাপেক্ষ। আজও দাস-সুলভ মনোভাব আমাদের কাটেনি, কোন্ বিদেশী ও বিজাতীয় মতাদর্শ আমাদের পক্ষে ভাল, এই নিয়ে আমরা প্রতিযোগিতায় নামি। তিরিশের দশকেই ইউরোপ থেকে রাঙাকাকাবাবু বলেছিলেন যে, বিংশ শতাব্দীতে মানবসাজ পুনর্গঠনের নতুন ভাব, নতুন আদর্শ ও নতুন পরিকল্পনা ভারতের মাটিতেই জন্ম নেবে। 

বছর দুয়েক নানারকম চিকিৎসার পর শেষ পর্যন্ত ভিয়েনার ডাক্তাররা রাঙাকাকাবাবুর উপর অস্ত্রোপচারের সিধান্ত নিলেন। পিত্তকোষ বা গলব্লাডার বিকল হয়ে যাওয়াই তাঁর সব অসুখের মূল কারণ বলে সাব্যস্ত হল। ভিয়েনার বিখ্যাত সার্জেন প্রোফেসর ডেমেল অপারেশন করেন। পরে রাঙাকাকাবাবুর কাছে শুনেছি তাঁর এক অদ্ভুত শখের কথা। তিনি বলে বসলেন যে, তিনি নিজের অপারেশন দেখবেন। সুতরাং লোকাল অ্যানেথিসিয়া দিয়ে যেন কাটাকুটি করা হয়। কিন্তু অপারেশন শুরু করবার পর এত অসহ্য ব্যথা হতে থাকে যে, ডাক্তাররা তাঁকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করতে বাধ্য হন। 

সেকালে অজ্ঞান করে বড় অপারেশন করা আজকালকার মতো নিরাপদ ছিল না। সেজন্য, যদি কোনো বিভ্রাট হয় এই মনে করে রোগীকে বলা হত, শেষ ইচ্ছা বা উইলের আকারে কিছু লিখে রাখতে। রাঙাকাকাবাবু প্রোফেসর ডেমেলের হাতে এক টুকরা কাগজ দিয়ে বলেন, তিনি যেন সেটা তাঁর ভারপ্রাপ্ত এটর্নি নৃপেন্দ্রচন্দ্র মিত্রের কাছে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। রাঙাকাকাবাবু ইংরেজিতে দু লাইন লিখেছিলেন যার মর্মার্থ হল : 

“আমার যা কিছু সম্পদ তা রইল আমার দেশবাসীর জন্য; আমার যা কিছু দায় আছে, আমি আমার মেজ দাদাকে দিয়ে গেলাম।”

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *