বসু-বাড়ি – ১০

১০

বর্মায় রাজবন্দী থাকতেই রাঙাকাকাবাবু বাংলার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সভ্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, উত্তর কলকাতা কেন্দ্র থেকে। নির্বাচনের সময় খুব উত্তেজনা, সেই উত্তেজনার কিছু আঁচ আমাদের মতো শিশুদের গায়েও লেগেছিল। একটা পোস্টার এখনও মনে আছে—রাঙাকাকাবাবুর ছবির সামনে জেলের গরাদ আঁকা। মা ছোটদেরও দু-একটা নির্বাচনকেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের ‘উইলিস নাইট’ গাড়ি সামনে ও পেছনে রাঙাকাকাবাবুর জেলবন্দী মার্কা ছবি নিয়ে ঘুরছে, এখনও বেশ মনে পড়ে। রাঙাকাকাবাবুর বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন একজন নরমপন্থী কিন্তু বেশ প্রভাবশালী ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ্ যতীন্দ্রনাথ বসু। রাঙাকাকাবাবুর বেশ বড় রকমেরই জিত হল। ফল ঘোষণার রাত্রে কলকাতায় আতশবাজি পুড়িয়ে বিজয়োৎসব হল, আকাশে বিশেষভাবে তৈরি হাউই উঠল—আলোর অক্ষরে লেখা “সুভাষচন্দ্রের জয়”। 

আগেই তো বলেছি মুক্তিলাভের কিছুদিন পরে রাঙাকাকাবাবুকে শিলং নিয়ে যাওয়া হল স্বাস্থ্য ভাল করার জন্য। কিন্তু দেশে বিদেশে যেখানেই থাকুক না কেন, এবং স্বাস্থ্য যত খারাপই হোক না কেন, রাঙাকাকাবাবু কখনই মানসিক বিশ্রাম নিতেন বলে মনে হয় না। শিলঙের ‘কেলসাল লজ’-এ তাঁর শোবার ঘরে অনেক রাত পর্যন্ত আলো জ্বলে, এটা অনেকের নজরে পড়ল, বিশেষ করে মাজননীর। বই পড়া, চিঠি লেখা ছাড়াও বিধানসভার জন্য নানা রকম প্রশ্ন তৈরি করা ইত্যাদি অনেক কাজ। তাঁকে বলা হল, স্বাস্থ্য ভাল করতে এসে এত রাত জাগা চলবে না। সুতরাং রাঙাকাকাবাবুকে একটা উপায় বের করতে হল। রাত্রে অন্য ঘরগুলির লাগোয়া সব দরজার ফাঁকগুলি কাপড় গুঁজে বন্ধ করে রাখতেন, যাতে তাঁর ঘরের আলো কেউ দেখতে না পায়। 

রাঙাকাকাবাবু যে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করেন সেটা সকলেই জানত। পুলিসও জানত। ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর গোপন গৃহত্যাগের রাত্রে আমরা ব্যাপারটিকে কাজে লাগিয়েছিলাম পুলিসকে ধোঁকা দেবার জন্য। রাঙাকাকাবাবু আমাদের বোন ইলাকে বলে গিয়েছিলেন যে, আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর পর্যন্ত যেন তাঁর ঘরের আলো জ্বলে। তাহলে যদি পুলিসের চরেরা তাঁর ঘর নজর করে, তারা মনে করবে যে, সুভাষবাবু তাঁর নিয়মমতো বেশি রাত পর্যন্ত কাজ করছেন। 

আলো অন্ধকার নিয়ে আর একটা গল্প এখানে বলতে পারি। রাঙাকাকাবাবুর অন্তর্ধানের পর প্রায়ই কাজের শেষে এবং বেশ রাতে বাবা আমাকে তাঁর দোতলার শোবার ঘরে ডাকতেন। আমি শুতাম তিনতলায় রাস্তার দিকের ঘরে। শীতের রাতে মশারির ভিতরে বসে বাবা আমার সঙ্গে অনেক কথাবার্তা বলতেন। বিশেষ গোপনীয় কোনো কথা যখন দু-চারজন লোককে মনের মধ্যে আগলে রাখতে হয়, তখন নিজেদের মধ্যে খবর আদান-প্রদান ও আলোচনা করলে মনটা খানিকটা হাল্কা হয়। কথাবার্তা শেষ হলে বাবা আমাকে বলতেন আমি যেন তিনতলার কোনো আলো না জ্বালিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ি। তিনি চাইতেন না যে, রাস্তায় যে পুলিসের চরেরা টহল দেয়, তাদের সন্দেহ হয় যে, আমি বেশি রাত পর্যন্ত কোনো কাজে লিপ্ত আছি। 

বড় কাজ হাতে নিয়ে আমরা কেমন আলো-আঁধারের নানারকম খেলা খেলতাম! 

রাঙাকাকাবাবু কলকাতা ফেরার কিছু আগেই মা আমাদের নিয়ে শিলঙ থেকে চলে এলেন। ১৯২৭-এর শেষের দিকে। জেলে থাকতে তো রাঙাকাকাবাবু অন্য রকমের সংসার পেতে বসতেন—একদিকে থাকত কয়েদীরা তাদের সুখ-দুঃখ নিয়ে, অন্যদিকে থাকত পশুপাখির দল। যখন জেলের বাইরে থাকতেন, তখন তিনি সব সময়েই চাইতেন যে, বাড়ির ছেলেমেয়েরা তাঁকে ঘিরে থাকে। শুনেছি আমি জন্মাবার আগে এলগিন রোডের বাড়িতে তিনি ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে লুকোচুরি খেলতেন। এও শুনেছি, তিনি প্রায়ই চিলের ছাদে উঠে লুকিয়ে বসে থাকতেন। শিলঙে রুগ্ন শরীর নিয়েও আমাদের সঙ্গে খেলতে খেলতে তিনি যেভাবে পাকদণ্ডি দিয়ে ওঠানামা করতেন, তাতে আমাদেরও ভয় করত। 

মা আমাদের ‘নিয়ে আগে কলকাতায় ফিরে আসায় রাঙাকাকাবাবুর বেশ মন খারাপ হয়েছিল। মাকে শিলঙ থেকে লিখলেন, “আপনারা সকলে হঠাং চলে যাওয়াতে—একটু মুশকিলে পড়েছিলুম। খালি বাড়িটা খাঁ-খাঁ করতে লাগল—মনটা কেমন করে উঠল—দৈনন্দিন জীবনের খেইগুলো যেন কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেল—একটু কষ্ট হয়েছিল বললে অত্যুক্তি হবে না।” যাই হোক, মা’র তখন অনেক কাজ। উডবার্ন পার্কে বাবার নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। সময়মতো পুরো সংসারটা গোছগাছ করে তুলতে হবে। আর নতুন জায়গায় সাজিয়ে বসাতে হবে। ধাপে-ধাপে নতুন কোনো জিনিস তৈরি হওয়া, যেমন বাড়ি তৈরি, দেখতে বেশ একটা মজা আছে। আমরা তো অবাক হয়ে দেখতাম। ১৯২৮ সালে বাবার বাড়ি সম্পূর্ণ হল। সেকালের অনেক বড়-বড় বাড়ির তুলনায় সব দিক দিয়ে ১ নং উডবার্ন পার্কের একটা নতুনত্ব ছিল। বাবা বাড়ির পরিকল্পনা আধুনিক ঢঙে করেছিলেন, উঁচু দরের মালমশলাও ব্যবহার করা হয়েছিল। তুলনায় এলগিন রোডের পুরনো বাড়িটা ছিল নেহাতই সেকেলে। ঘটা করে গৃহপ্রবেশ হল। রাঙাকাকাবাবু আমাদের সঙ্গে ৩৮/১ এলগিন রোড থেকে উডবার্ন পার্কের বাড়িতে উঠে এলেন। তিনতলার পূর্বদিকের ঘরটা তাঁকে দেওয়া হল শোবার জন্য, একতলার পশ্চিমের ঘর তাঁর অফিস। খাওয়া-দাওয়া হত দোতলার দক্ষিণের বারান্দায়। একতলার বেশির ভাগটাই বাবার কাজের জন্য লাগত। ১ নং উডবার্ন পার্কের মতো বাড়িতে বাস করার ফলে আমাদের চাল বিগড়ে যেতে পারে বলে অনেকেরই আশঙ্কা হয়েছিল! ১৯৪৪ সালে আমি যখন লাহোর দুর্গের নির্জন সেলে বন্দী, ফোর্টের ভারপ্রাপ্ত অফিসার ঠাট্টার সুরে একদিন বললেন, “তুমি তো উডবার্ন পার্কের সেই ‘প্যালেসে’ থাকো, না? তোমার তো দেখছি তাহলে এখানে পোষাবে না! পালাবার জন্য সুড়ঙ্গ কাটতে আরম্ভ করো না কেন? তবে বলে রাখি, পালাতে পারলে বেঁচে গেলে, ধরা পড়ে গেলে কিন্তু গুলি করে দেবার হুকুম আছে।” 

বসু-বাড়ির অনেক কথা বেশ কয়েকটি বাড়িতে ছড়িয়ে আছে। বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর কর্মজীবন ৩৮/২ এলগিন রোড (আজকের নেতাজী-ভবন) ও ১ নং উডবার্ন পার্ক জুড়ে রয়েছে। শরৎ-সুভাষের জীবন যেমন একে অন্যটির পরিপূরক, এই দুটি বাড়িও ঠিক তাই। তাছাড়া রয়েছে কার্শিয়ঙে গিধাপাহাড়ে বাবার ছোট্ট বাড়িটি। যার ইতিহাসও খুবই সমৃদ্ধ। অনেক পরে বাবা রিষড়ায় একটা সুন্দর বাগানবাড়ি করেছিলেন। তার ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। যদি আরও পুরনো দিনে চলে যাই; তাহলে কটকের জানকীনাথ-ভবন ও দাদাভাইয়ের পুরীর বাড়ি জগন্নাথ ধামের কথা ভুললে চলবে না। 

১ নং উডবার্ন পার্কের প্রতিষ্ঠা একটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যেন যুক্ত হয়ে আছে। ঐ বাড়িতে প্রবেশ করার পর থেকেই বাবা ও রাঙাকাকাবাবু ১৯২৮ সালের কলকাতা-কংগ্রেসের অধিবেশনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রাঙাকাকাবাবু ঐ কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবকদের জেনারেল অফিসার কম্যাণ্ডিং রূপে আমাদের জাতীয় জীবনে ও মুক্তি আন্দোলনে এক নতুন নজির সৃষ্টি করেন। বাবা ছিলেন অভ্যর্থনা সমিতির কোষাধ্যক্ষ। মা তো সব সময়েই বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর সব কাজের সাথী। বাড়ির যে-সব ছেলেমেয়ে গান গাইতে পারত, তারা গানের দলে যোগ দিয়েছিল। গানের দলের ভার নিয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরানী। মনে আছে, সেই উপলক্ষেই তিনি নিয়মিত উডবার্ন পার্কে যাওয়া-আসা আরম্ভ করেন। মহিলা স্বেচ্ছাসেবিকাদের অধিনায়িকা লতিকা ঘোষও প্রায়ই আসতেন। সব কিছু মিলে আমাদের উডবার্ন পার্কের নতুন বাড়ির প্রথম বছরটা যেন ছিল—’দি ইয়ার অব দি ক্যালকাটা কংগ্রেস’। 

রাঙাকাকাবাবু স্বেচ্ছাসেবকদের কী কঠোর ও কঠিন শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, তখন তা বুঝতে না পারলেও পরে জেনেছি। যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা আজও বলেন যে, কলকাতা কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবকদের শৃঙ্খলা ও কর্মকুশলতা আজও তুলনাহীন। পুরোপুরি সামরিক কায়দায় শিক্ষিত ঐ দল ভিন্ন-ভিন্ন বিভাগে সংগঠিত হয়েছিল, যেমন অশ্বারোহী, সাইকেল-আরোহী, পদাতিক ইত্যাদি। কংগ্রেসের সভাপতি পণ্ডিত মতিলাল নেহরুকে নিয়ে যে শোভাযাত্রা হয়, সেটা আমরা ছোটরা ওয়েলিংটন স্ট্রীটে আমাদের লালদাদাবাবুর বাড়ির ছাদ থেকে দেখেছিলাম। স্বাধীনতার আগে এ-ধরনের সামরিক বা আধা-সামরিক শোভাযাত্রা আর হয়নি। রাঙাকাকাবাবু সামরিক পোশাকে একটি মোটরগাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে বেটন হাতে শোভাযাত্রা পরিচালনা করেছিলেন। সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। 

পার্ক সার্কার্স ময়দানে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। পাশেই একটা বড় ধরনের একজিবিশন ছিল। এখনও মনে আছে, প্রদর্শনীতে আমাদের জাতীয় জীবনের নানা ঘটনার চলমান মডেল দেখাবার ব্যবস্থা হয়েছিল। 

প্রায়ই আমাদের কংগ্রেস-প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হত। সভা-মণ্ডপে বা প্রদর্শনীতে। ফলে ভবিষ্যতের ও স্বপ্নের স্বাধীন ভারতের কিছু স্বাদ ও স্পর্শ যেন তখন থেকেই আমরা পেতে আরম্ভ করেছিলাম। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে, রাঙাকাকাবাবুই ঐ কংগ্রেসে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন, গান্ধীজির ঔপনিবেশিক স্বায়ত্ত শাসনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ভারতের নবজাগ্রত যুবশক্তির বত্রিশ বছরের নেতার প্রস্তাব অল্প ভোটেই অগ্রাহ্য হয়ে যায়। 

১১

আমি জীবনে কখনও বাবার কাছে বকুনি খাইনি। ছেলেমেয়েদের শাসনের ভারটা ছিল মা’র উপর এবং শাসনও ছিল বেশ কড়া। এর মানে এই নয় যে, বাবা আমাদের উপর নজর রাখতেন না। তাঁর কর্তৃত্বের ধরনটা ছিল আলাদা। কিছুই তাঁর চোখ এড়াত না। কোর্ট থেকে ফিরে স্নান সেরে দোতলার দক্ষিণের বারান্দায় বাবা খানিকটা বিশ্রাম নিতেন। কাজে নীচে নেমে যাবার আগে প্রায়ই আমাদের পড়ার ঘরের দরজাটা একটু ঠেলে মুচকি হেসে ছেলেমেয়েদের উপর চোখ বুলিয়ে নিতেন। এটাই ছিল যথেষ্ট। দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিন্তু মা’র হুকুমই ছিল শেষ কথা। দশ-বারো বছর বয়স পর্যন্ত মাকে বেশ ভয় করতাম, তার পর সম্পর্কটা বদলে গেল। তিরিশের দশকে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় বাবা জেলে যাওয়াতে আমরা যেন একটু তাড়াতাড়িই সাবালক হয়ে উঠলাম, কম বয়সেই বাড়ির নানা রকম দায়িত্ব আমাদের উপর এসে পড়ল। মাও সেটা স্বচ্ছন্দে মেনে নিলেন। 

উডবার্ন পার্কের বাড়ির সব কিছুই খুব নিয়ম ও শৃঙ্খলায় চলত। বাবা খাপছাড়া ও অগোছালো অভ্যাস পছন্দ করতেন না। মাও দেখতেন যাতে কোনো দিক দিয়েই কোনো ঢিলেমি না হয়। সবকিছুই যন্ত্রের মতো চলত, কোনো কিছু বিগড়োলে তৎক্ষণাৎ সেটা শুধরে নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এলগিন রোডের সাবেক বাড়ির তুলনায় উডবার্ন পার্কের বাড়ি, কেবল চেহারায় নয়, জীবনযাত্রার সব দিক থেকে অনেক আধুনিক ও প্রগতিশীল ছিল। ঐতিহ্য ও প্রগতি মিশিয়ে মা ও বাবা সংসারে বেশ একটা স্বাচ্ছন্দ্য এনেছিলেন। রাঙাকাকাবাবু ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১-এর জানুয়ারি পর্যন্ত এলগিন রোডের বাড়িতে ছিলেন। সেই সময়েও তাঁর যখন কোনো বিশেষ অতিথি বা বিশেষ কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন হত, তখন তিনি উডবার্ন পার্কে ব্যবস্থা করতে বলতেন। অতিথিসৎকারের ব্যাপারে তিনি খুঁটিনাটি নিজেই দেখতেন ও জানতে চাইতেন। মনে আছে একবার কোনো বিশেষ বিদেশী অতিথিকে তিনি উডবার্ন পার্কের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছেন। আমাকে বললেন মাকে জানিয়ে আমি যেন ব্যবস্থার ভার নিই। সব ঠিক আছে— রিপোর্ট দিতে আমি যখন তাঁর কাছে হাজির হলাম, তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন কটা ও কী কী পদ রান্না হচ্ছে। আমি উত্তর দিতে না পারায় তিনি দমে গেলেন। 

উডবার্ন পার্কের বাড়িতে উঠে আসবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কিণ্ডারগার্টেন ছেড়ে আমার বড় স্কুলে যাওয়ার সময় হল। তখন সচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলেরা বেশির ভাগই বিদেশী মিশনারি স্কুলে পড়ত। বিশেষ করে বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার-ডাক্তারদের ছেলেরা তো বটেই। আমরা ছিলাম ব্যতিক্রম। আমি আমার দাদাদের মতো সাউথ সুবাবান স্কুলে ভর্তি হলাম। ডায়োসিশান স্কুলের অন্তরঙ্গ পরিবেশ থেকে সাউথ সুবাবান স্কুলের সমুদ্রে পড়ে আমি তো বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। স্কুলে যেতে বেশ ভয়-ভয় করত। আজ বলতে বাধা নেই যে, সাউথ সুবাবানে প্রথম কয়েক বছর মনে মনে আমি বেশ অসুখী ছিলাম। আসল কথা, নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে ঠিক মানিয়ে নিতে পারিনি। যাই হোক, সমাজের সব স্তরের ছেলেদের সঙ্গে মেশবার ও একসঙ্গে লেখাপড়া করবার এই অভিজ্ঞতাটা .আমাদের প্রয়োজন ছিল। অবশ্য বসুবাড়ির ছেলে বলে মাস্টার মশাইরা ও সতীর্থরা আমাদের একটু বিশেষ চোখে দেখতেন। উপরের ক্লাসে ওঠার পর ধীরে-ধীরে আমার মনের জড়তা অনেকটা কেটে গেল। তাছাড়া উপরের ক্লাসের মাস্টার মশাইরা বেশ দক্ষ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন এবং লেখাপড়ায় বেশ একটা নতুন স্বাদ এনে দিয়েছিলেন। আমাদের বাড়ির মাস্টার মশাই ফণীন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত আমার সব ভাইবোনেদের একে একে পড়িয়েছিলেন। শক্ত শক্ত অঙ্ক ফণীবাবু এত সহজে কষে ফেলতেন যে, আমি অবাক হয়ে যেতাম। আমি স্কুলে ফল মোটামুটি ভালই করতাম। কিন্তু ফণীবাবুর আশা ঠিক পূর্ণ করতে পারতাম বলে মনে হয় না। পরীক্ষার ফল বেরোলে মা সেই রিপোর্ট সই করাতে বাবার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। বাবা রিপোর্ট ভাল করেই দেখতেন। তবে বিশেষ কোনো মন্তব্য না করে সই করে দিতেন। 

আজকালকার ছেলেমেয়েরা বোধহয় শুনে আশ্চর্য হবে যে, আমরা বাবা ও মা দুজনকেই ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতাম। জ্যাঠা, কাকা, জ্যাঠাইমা, কাকিমাদের বেলায়ও তাই। বয়সের ফারাকটা বেশি হলে বাবাদের জেনারেশনে ছোটরা বড় ভাইবোনেদেরও ‘আপনি’ বলত, আমরাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলতাম। রাঙাকাকাবাবু বাবার সঙ্গে ‘তুমি’ বলেই কথা বলতেন। মাকে ‘আপনি’। সম্বোধনের ধরনটা আজকালকার মতো না হলেও অন্তরঙ্গতা কমত না। বরং আমার বিশ্বাস পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভাব বেশি বই কম ছিল না। 

খেলাধুলোর ব্যাপারে আমরা উৎসাহ পেতাম কম। বিশেষ করে ময়দানের প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলো নিয়ে হুজুগ বাধা বেশ অপছন্দ করতেন। তিনি প্রায়ই ঠাট্টা করে বলতেন, কোর্ট থেকে ফেরার পথে প্রায়ই দেখি বাইশ জন লোক একটা বল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে, আর কয়েক হাজার লোক তাই নিয়ে উত্তেজিত হয়ে লাফালাফি করছে, এর আবার মানে কী! তবে রাঙাকাকাবাবুর উদ্যোগে আমাদের শারীরিক ব্যায়াম ও খেলাধুলোর অন্য রকম ব্যবস্থা পাকাপাকিভাবে বাড়ির ছাদে হয়েছিল। সাধারণ ব্যায়াম, লাঠি ও ছোরা খেলা, যুযুৎসু ইত্যাদি শেখবার জন্য একজন শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর নাম দিগেন্দ্রচন্দ্র দেব। পূর্ববঙ্গের মানুষ, শরীরে অসম্ভব শক্তি। তাঁর ওয়েট লিফটিং দেখে আমরা তাজ্জব বনে যেতাম। রাঙাকাকাবাবু এই ধরনের শিক্ষা দেশের কাজে প্রস্তুতি হিসাবে আমাদের নিতে বলতেন। দিগেনবাবুর সাহায্যে রাঙাকাকাবাবু আরও কয়েকটি জায়গায় ছেলেমেয়েদের সংঘ বা ক্লাব গড়ে তোলেন এবং আত্মরক্ষার নানা রকম শিক্ষার প্রসারের সাহায্য করেন। আমরাও মাঝে মাঝে নানা অনুষ্ঠানে যেতাম এবং লাঠি ও ছোরাখেলার প্রতিযোগিতায় যোগ দিতাম। আমাদের বাড়ির ছাদেও বার্ষিক অনুষ্ঠান হত। মনে পড়ে লাঠির দুধারে আগুন লাগিয়ে আমাকে লাঠি ঘোরাতে হত। অনুষ্ঠানের শেষে দিগেনবাবু ফ্রী ফাইটে চ্যালেঞ্জ করে আমাকে বেশ নাস্তানাবুদ করতেন। 

দিগেনবাবু ছিলেন কট্টর জাতীয়তাবাদী। মনে আছে, দেশ ভাগ হওয়ার আগে একবার আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বলেছিলেন তিনি পৈতৃক ভিটে ছাড়বেন না! আরও বলেছিলেন, দেশ ভাগ করছ করো, আমাদের জলে ফেলে দিচ্ছ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কালাপাহাড় হয়ে ফিরে এসে তোমাদের শায়েস্তা করব! 

বাড়ির কয়েকটি পার্শ্বচরিত্র সম্বন্ধে না বললে গল্পটা জমে না। একজনের কথা প্রথমে বলি, যিনি আমাদের সঙ্গেই উডবার্ন পার্কে বেশ কয়েক বছর ছিলেন। তিনি হলেন বাবার এক মামা, আমাদের রাঙাদাদাবাবু বীরেন্দ্রনাথ দত্ত। রাঙাকাকাবাবু থাকতেন তিনতলায় পূবের ঘরে, আর রাঙাদাদাবাবু থাকতেন তিনতলার পশ্চিমের ঘরে। খুব মজাদার লোক, পুরোপুরি সাহেব ও খুব শৌখিন। তাঁর কর্মকুশলতার জন্য তাঁকে দেশবন্ধু-প্রতিষ্ঠিত ফরওয়ার্ড পত্রিকার ম্যানেজার করা হয়েছিল। কাজকর্ম তিনি ভালই করতেন এবং বাড়ির যে-কোনো বড় কাজকর্মে তিনি ম্যানেজারি করতে ভালবাসতেন। সাহেবি পোশাক তাঁর যে কেবল প্রিয় ছিল তাই নয়, ছিল পুরোপুরি কেতাদুরস্ত। বাবা যে কোর্টেও খদ্দরের স্যুট পরতেন, সেটা ছিল রাঙাদাদাবাবুর মতে সম্পূর্ণ অচল। আমাদের বাড়িতে একটা কথা খুব চলত, এবং অনেকের নামের সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হত—বি এন জি এস। মানে ‘বিলেত না গিয়ে সাহেব। রাঙাদাদাবাবু একজন প্রকৃত বি এন জি এস ছিলেন। স্বদেশিয়ানার তিনি ধার ধারতেন না। ‘দত্ত-সাহেব’ খেতে বসতেন একটা বড় গোছের ‘বিব’ পরে, যাতে দেশী ঢঙে খেতে গিয়ে তাঁর সাহেবি পোশাক নষ্ট না হয়। তিনি অফিস থেকে ফিরে ভাল সিল্কের জামাকাপড় পরে যখন নীচে নামতেন, তখন উৎকৃষ্ট বিলিতি সেন্টের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ত। ছোটদের সঙ্গে তাঁর বনত ভাল, কারণ ভাল চকোলেট, বিস্কুট, কেক ইত্যাদি তিনি আমাদের মাঝেমাঝেই সরবরাহ করতেন। সার্কাস দেখতে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানাভাবে তিনি আমাদের মন ভিজিয়ে রাখতেন। রাঙাদাদাবাবু অসুখ করলে কিন্তু ধৈর্য হারাতেন। একবার তো মাঝরাতে পেটে ব্যথা হওয়াতে মহা শোরগোল আরম্ভ করলেন। ডাক্তারকাকা সুনীলচন্দ্র এলগিন রোডের বাড়িতে থাকেন। রাঙাকাকাবাবু তো বাধ্য হয়ে মাঝরাতে বেরোলেন। কিন্তু এলগিন রোডের বাড়ির গেট বন্ধ, অনেক হাঁকডাক করেও কিছু হল না। তখন সুভাষচন্দ্র বসু পাঁচিল টপকে বাড়িতে ঢুকলেন, পেছনের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে ডাক্তারভাইকে তুললেন। বললেন,”শিগগির চলো, সতী (তাঁদের অসুস্থ ছোট ভাই সন্তোষচন্দ্র) তো বাড়ি কাঁপায়, রাঙামামাবাবু পাড়া কাঁপাচ্ছেন।” 

স্বরাজ সম্বন্ধে রাঙাদাদাবাবুর নিজস্ব একটা ধারণা ছিল এবং আমাদের জন্য একটা বাণী ছিল। তিনি আমাদের প্রায়ই বলতেন, “দেখ, তোদের ঐ স্বরাজ হবার দু-একদিন আগে আমাকে খবর দিস যাতে আমি ঠিক সময়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশত্যাগ করতে পারি।” 

১২

উডবার্ন পার্কে উঠে আসার পর থেকেই বোঝা গেল রাঙাকাকাবাবু মাকে দেশের কাজে ধীরে-ধীরে টেনে আনছেন। বাড়ির সামনেই বড় মাঠ ছিল। মা’কে দিয়ে মাঠে রাঙাকাকাবাবু মহিলা-সভার আয়োজন করাতে লাগলেন। সভায় নানারকম দেশাত্মবোধক বক্তৃতা হত। মনে আছে জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগী ম্যাজিক লণ্ঠনের সাহায্যে রঙিন ছবি দেখিয়ে উদ্দীপনাময় বক্তৃতা করছেন। নীল-বিদ্রোহের সময় ইংরাজদের অত্যাচারের ছবি পরদায় ফেলা হচ্ছে, এখনও মনে গেঁথে আছে। সভার শেষে দেশাত্মবোধক গান কোরাসে গাওয়া হত। দেশবন্ধুর বাড়ির মহিলারা তাতে যোগ দিতেন। তাছাড়া হাতের সুতোয় তৈরি খদ্দরের কাপড় মা বিক্রি করতে বেরোতেন, জাতীয় তহবিলের জন্য চাঁদা তুলতে। পরে গান্ধীজির লবণ সত্যাগ্রহ আরম্ভ হবার পর ‘কন্ট্রাব্যাণ্ড সল্ট’ বা ‘বেআইনী লবণ’ মা বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে দিতেন। মা’র আলমারিতে ছোট-বড় শিশিতে ঐ লবণ সাজানো থাকত দেখেছি। ঐ বস্তুটিই ছিল তখন আমাদের ইংরাজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের একটি প্রতীক। 

বাবার মতো রাঙাকাকাবাবুরও সময় ছিল কম। দেশের ও কংগ্রেসের কাজে তিনি দিনরাত ডুবে থাকতেন। সকালের দিকে তাঁকে বড়-একটা দেখতাম না, বেশি রাত পর্যন্ত খাটা-খাটুনির পর সকালে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমোতেন। দাড়ি কামানোটা ঘুমের মধ্যেই হত। কাজটা করত আমাদের বাড়ির জমকালো নাপিত-মহাশয় হরিচরণ দাস। দক্ষিণ কলকাতার অনেকগুলি সম্ভ্রান্ত বাড়িতে প্রতিদিন ভোরে সাইকেল চেপে সে রাউণ্ড দিত। সে বেশ গর্বের সঙ্গে বলত কত বড় ও নামজাদা মানুষের দাড়ির দায়িত্ব তার হাতে। তার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘দি রয়াল বারবার’। বর্ষার দিনে কলকাতা ভেসে গেলেও হরি-নাপিতের সাইকেল ঠিক চালু থাকত। এতগুলো দামি দাড়ি তো আর ফেলে রাখা যায় না। 

রাঙাকাকাবাবু খেতে আসতেন অনেক বেলায়। তাঁর খাবার সময় দক্ষিণের বারান্দার পাথরের টেবিলে তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিলেন আমার মা। রাত্রের খাওয়ার ব্যবস্থা একই রকম। তিনি নিয়মিত অনিয়ম করতেন। খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে যখন তিনি বিকেলে পাথরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতেন, আমরা প্রায়ই তাঁকে দেখতে পেতাম। গায়ে ধোপদুরস্ত খদ্দরের কোঁচানো ধুতি ও পাঞ্জাবি, কাঁধে কোঁচানো খদ্দরের চাদর। পোশাক অনাড়ম্বর, কিন্তু পরিপাটি ও খুবই মানানসই। অনেকদিন পর্যন্ত তিনি নিয়মিত নাগরা পরতেন, পরে সাধারণ চটি বা কাবলি ধরনের জুতো পরতে আরম্ভ করেন। কখনও কখনও বা তিনি খুবই গম্ভীর বা গুনগুন করে গান গাইতে-গাইতে নামতেন বা উঠতেন। বাথরুমে তাঁর গান কিন্তু খুবই শোনা যেত। যেমন ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’, ‘তাতল সৈকতে বারিবিন্দুসম’, ‘শিকল পরা ছল’ ইত্যাদি। রাজনৈতিক আবহাওয়াটা কেমন, তার উপরই বোধ করি তাঁর ‘মুড’ নির্ভর করত। তাঁর ‘মুড’-এর কথা বলতে গিয়ে অনেক কথা মনে পড়ে। বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যখন হাসিঠাট্টা করতেন তখন তিনি একেবারেই ছেলেমানুষ। হয়তো বললেন, এসো, তোমাদের ভাল একটা গল্প শোনাই, কথামালার গল্প। গম্ভীর ভাবে বলতে আরম্ভ করলেন ‘একদা এক হাড়ের গলায় বাঘ ফুটিয়াছিল….’। ছোট ছোট ভাইপো-ভাইঝিরা যতই প্রতিবাদ করে, ততই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে থাকেন, না, তিনি ঠিকই বলছেন। কখনও হয়তো আমাদের একজনের মাথা দু’হাতে ধরে ঝাঁকাতে-ঝাঁকাতে মুখে কলসীতে জল নাড়ার মতো আওয়াজ করে প্রমাণ করতে চাইতেন যে, আমাদের মাথা জলে ভরা। কতরকম হাল্কা ঠাট্টা যে তিনি আমাদের জন্য আবিষ্কার করতেন তার ঠিক নেই। আর হাসির তো কোন বাঁধ ছিল না, ছোটদের সঙ্গে গড়াগড়ি দিয়ে হাসতেন। 

রাঙাকাকাবাবুর রাগের ‘মুড’ও কিন্তু দেখবার মতো ছিল। সারা মুখ টকটকে লাল হয়ে যেত, কথা বেশি নয়, কিন্তু চাপা ভারী গলায় যে-কয়েকটি কথা বলতেন, তাতেই বুক কেঁপে উঠত। তবে তাঁর ধৈর্য ছিল অসীম, সেজন্য ব্যক্তিগত রাগারাগি খুব কমই ঘটত। 

দেশাত্মবোধক বা ভক্তিমূলক গান শুনতে-শুনতে যখন তিনি বিভোর হয়ে যেতেন, তখন তাঁর চেহারা দেখবার মতো হত। তাঁর বাল্যবন্ধু দিলীপকুমার রায় ১৯৩৭-৩৮ সালে প্রায়ই উডবার্ন পার্কের বাড়িতে জমিয়ে গানের আসর বসাতেন। দুই ভাই—বাবা ও রাঙাকাকাবাবু— পাশাপাশি বসে গান শুনতেন। দুজনেই একেবারে অভিভূত হয়ে যেতেন, তাঁদের মুখে এক অপূর্ব জ্যোতি ফুটে উঠত, দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। 

অনেক ব্যাপারে রাঙাকাকাবাবু এমনই সরল ও অবুঝ ছিলেন যে, তাঁর আচরণ ও কথাবার্তা অন্যদের হাসির খোরাক জোগাত। একসময় মা কলকাতার বাইরে গেছেন। ঠাকুমা বাসন্তী দেবীর কাছে গিয়ে রাঙাকাকাবাবু নালিশ জানালেন, “দেখুন, মেজবৌদিদি বাড়িতে না-থাকলেই ধোপাটা খুব দুষ্টুমি করে, আমার পাঞ্জাবির সব বোতামগুলি ছিঁড়ে ফেরত দেয়, মেজবৌদিদি থাকলে তো এমন করতে সাহস পায় না!” ঠাকুমা খুব খানিকটা হেসে তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন যে, সংসারের খুঁটিনাটি কী ভাবে চলে। 

একেবারে অন্য ধরনের এক ‘মুড’ ও আচরণের কথা মনে পড়ল। যদিও আমি তখন খুবই ছোট, যা দেখেছিলাম তা ভোলবার নয়। রাঙা কাকাবাবু ধীরে-ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলার ভিতরের দালানে দাঁড়িয়ে আছেন। যেন একটি পাথরের মূর্তি—নিশ্চল ও গম্ভীর। মা বেরিয়ে এলেন। রাঙাকাকাবাবু আস্তে-আস্তে একটি কাগজের মোড়ক এগিয়ে দিয়ে থমথমে গলায় বললেন, “যতীন দাসের অস্থি, যত্ন করে রেখে দেবেন।” সকালে মা’র সঙ্গে আমরা শহিদ যতীন দাসের শোকযাত্রা দেখে এসেছি। শেষ কাজ সব সেরে শ্মশান থেকে ফিরতে রাঙাকাকাবাবুর সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। 

বাড়ির বাইরেও নানা সভা ও অনুষ্ঠানে আমরা মা’র সঙ্গে যেতাম। সবগুলিই রাঙাকাকাবাবুর উদ্যোগে। বিভিন্ন এলাকায় মহিলাদের সভায় তিনি বক্তৃতা করে বেড়াতেন। তাঁর সব কথাবার্তা বুঝতে পারতাম না, এবং বক্তৃতা বেশি লম্বা হলে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়তাম। তবে স্বদেশী যাত্রা মুকুন্দ দাসের গান, শরীর-চর্চা, লাঠি ও ছোরা খেলা ইত্যাদির অনুষ্ঠানে বেশ উৎসাহ পাওয়া যেত। উত্তর কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে বাঙলাদেশের সবচেয়ে বড় কুস্তিগির গোবরবাবুর কুস্তি দেখেছি মনে আছে। দেশের কাজে টাকা তোলার জন্যও গান-বাজনার অনুষ্ঠানও রাঙাকাকাবাবু করতেন। খুবই ছেলেবেলার একটি ছবি মনে আঁকা রয়েছে। ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলে এক বিরাট অনুষ্ঠান হচ্ছে। মঞ্চের উপর অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন সুভাষচন্দ্র বসু, কাজি নজরুল ইসলাম ও দিলীপকুমার রায়। নজরুল নিজেই গাইলেন “দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার,” ঘণ্টা বাজিয়ে তাল মিলিয়ে। দিলীপবাবু গাইলেন তাঁর মন-মাতানো “রাঙা জবা কে দিল তোর পায়”। 

মা’র সঙ্গে পারিবারিক নানা অনুষ্ঠানেও তো যেতাম। লাল জামা গায়ে বিয়েবাড়িও কত গিয়েছি। কিন্তু স্বীকার করতে বাধা নেই যে, গতানুগতিক পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান মনে ততটা দাগ কাটত না যতটা কাটত জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নানারকম অনুষ্ঠান ও সমাবেশ। 

সকলেরই এ-কথা জানা যে, জেলে যাওয়া-আসা রাঙাকাকাবাবুর জীবনের অনেকটাই জুড়ে ছিল। তাঁর গ্রেফতারের বা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর আমরা প্রায়ই বড় হরফে খবরের কাগজে পড়তাম। এ ধরনের খবর তো সুখের হতে পারে না, তবে শৈশবে ও মনে-মনে দেশের জন্য রাঙাকাকাবাবুর লাঞ্ছনাভোগে গৌরব অনুভব করতাম, এবং স্বপ্ন দেখতাম কবে আমিও ঐ গৌরবের ভাগ পাব। আজকালকার ছেলেমেয়েরা হয়তো শুনে আশ্চর্য হবে যে, আমরা খবরের কাগজ প্রথম পাতা থেকেই পড়তে আরম্ভ করতাম। সব না বুঝলেও দেশ-বিদেশের রাজনীতির খবর নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম। খেলাধুলোর খবরের পাতা সে-সময় আমাদের কাছে বড় আকর্ষণ ছিল না। তাছাড়া জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র ছাড়া অন্য পত্র-পত্রিকা উডবার্ন পার্কের বাড়িতে ঢুকত না। 

উডবার্ন পার্কের বাড়ির একতলায় বেশ বিচিত্র রকমের ভিড় লেগে থাকত। প্রথমত, বাবার পেশার সঙ্গে যুক্ত উকিল ব্যারিস্টার ও মক্কেলদের ভিড়। দ্বিতীয়ত, রাজনীতির লোকদের বা কংগ্রেসীদের ভিড়—প্রধানত রাঙাকাকাবাবুর জন্য। আর, তৃতীয়ত, নানা ধরনের সাহায্য-প্রার্থীদের সমাবেশ। কে বোস-সাহেবের কাছে এসেছে ও কে সুভাষবাবুকে চায়, সেটা সামনের দালানেই ঠিক হয়ে যেত। বাবার নাগাল পাওয়া অপেক্ষাকৃত শক্ত ছিল, কারণ কোর্টের কাজে তিনি সকাল-সন্ধ্যা খুবই ব্যস্ত থাকতেন। তারই ফাঁকে-ফাঁকে তিনি ফরওয়ার্ড কাগজ, করপোরেশন বা কংগ্রেসের জরুরি কাজ সারতেন। এই সূত্রে আর একটি পার্শ্বচরিত্রের কথা বলি—আমাদের খুড়ো-দাদাবাবু শৈলেন্দ্রনাথ বসু। বসুবাড়ির এই দূর সম্পর্কের আত্মীয়টি ছিলেন বাবাদের জেনারেশনের সর্বজনীন ‘খুড়ো’। তিনি বাবার হাইকোর্টের ‘বাবু’র কাজ করতেন। কোর্টের সময়টুকু ছাড়া তিনি সারা দিনটাই আমাদের বাড়িতে কাটাতেন এবং বাড়ির নানা কাজে সাহায্য করতেন। মোটা-মোটা বাঁধানো খাতায় তিনি বাবার পেশাগত হিসাব-পত্র রাখতেন। তিনি কিন্তু প্রায়ই বাবার স্বভাবসিদ্ধ গোছানো ও নিয়মমাফিক কাজকর্মের সঙ্গে তাল রাখতে পারতেন না এবং পিছিয়ে পড়তেন। “এই যা, ভুলে গেছি” কথাটা তাঁর মুখে প্রায়ই শোনা যেত। আর বাবা তাঁকে বলতেন, “খুড়ো, মেমারি পিল খাও, মেমারি পিল খাও।” যাই হোক, খুড়ো-দাদাবাবু ছিলেন এক অতি প্রাণখোলা ও পরোপকারী লোক। বাড়ির ছেলেবুড়ো সকলেই ছিল তাঁর বন্ধু। বাবা যতই রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়তে লাগলেন, পেশাগত কাজ ক্রমেই তাঁকে কমিয়ে দিতে হত। বাবা অন্য কাজের জন্য যখন.’ব্রীফ’ ফেরত দিতে বাধ্য হতেন, খুড়ো-দাদাবাবু বড়ই দুঃখ পেতেন। বলতেন, “খুড়ো (মানে আমার বাবা) এমন করে ঐশ্বর্য পায়ে ঠেলছেন।” যেদিন কংগ্রেসের বড় মিটিং বাড়িতে বসত, খুড়ো-দাদাবাবু অবাঞ্ছিতের মতো ক্ষুণ্ণমনে উপরে চলে আসতেন আর আফসোস করতেন। বলতেন, “আজ তো নীচে মোহনবাগানের ম্যাচ, ‘ভূতের’ রাজত্ব, আমার কিছু করবার নেই।” শেষ পর্যন্ত বাবা যখন জেলে গেলেন খুড়ো-দাদাবাবু খুবই মুষড়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আমাদের তিনি ছাড়েননি। 

১৩

ষাট দশকের মাঝামাঝি হবে। সন্ধ্যায় আমি উডবার্ন পার্কের বাড়িতে একতলায় আমার চেম্বারে বসে আছি। এক ভদ্রলোক তাঁর কার্ড পাঠালেন, বড় একটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় অফিসার। 

ভিতরে এসে বললেন, তিনি রুগী দেখাতে আসেননি। প্রায় রোজই তিনি অফিস থেকে বাড়ি যান আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে এবং রোজই বাড়িটাকে বাইরে থেকে নমস্কার করে যান। সেদিন কী মনে করে ঢুকে পড়েছেন। 

তাঁর কথা শুনে আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তিনি তখন বললেন, “দেখুন, আমি যে আজ জীবনে প্রতিষ্ঠালাভ করেছি সে-সবই আপনার বাবার জন্য। আমি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে ছিলাম, আপনার বাবার সাহায্যেই আমি লেখাপড়া করি। সেজন্য ১ নং উডবার্ন পার্কের এই বাড়ি আমার কাছে এক পবিত্র স্থান। কিছু মনে করবেন না, বিরক্ত করে গেলাম। “ 

দাদাভাই জানকীনাথ খুব কষ্টের মধ্যে লেখাপড়া শিখেছিলেন। মায়ের কাছে শুনেছি যে, তিনি বাবাকে বলেছিলেন, যখন সামর্থ্য হবে তখন বাবা যেন গরিব কিন্তু যোগ্য কিছু ছাত্রকে লেখাপড়া করতে সাহায্য করেন। দাদাভাইয়ের কথামতো বাবা নিজে আইন-ব্যবসায় প্রতিষ্ঠালাভের পরে একদল দুঃস্থ কিন্তু মেধাবী ছাত্রকে নিয়মিত পড়াশোনার খরচ দিতেন। আমরা কৌতূহলী হয়ে ভাবতুম, মাসের প্রথমে নীচের তলায় ছেলে-ছোকরাদের এত ভিড় হয় কেন? খুড়োদাদাবাবুকে (শৈলেন্দ্রনাথ বসু) এ ব্যাপারে সব খাতাপত্র রাখতে হত। তিনি প্রায়ই হিসাবপত্র গোলমাল করে ফেলতেন। 

বাবা চেপে ধরলে বলতেন, “বেশী কিছু না, আমি তো কেবল এক মাস পিছিয়ে আছি।” যখনই পারতেন বাবা ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের পরীক্ষার ফলাফল নিয়মিত বাবাকে দেখাতে হত। 

বাবা জেলে যাবার পর ঐ সব ছাত্ররা খুবই অসুবিধায় পড়েছিল। অনেকেরই হয়তো লেখাপড়াই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এদেরই মধ্যে দুজন ভদ্রলোক যাঁরা তাঁদের ছাত্রাবস্থায় বাবার সমর্থন ও সাহায্য পেয়েছিলেন, আমাদের দুঃসময়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। দুজনকেই আমরা দাদা বলতাম এবং এখনও বলি। মায়ের আর্থিক অনটনের কথা ভেবে তাঁরা ছেলেমেয়েদের কাপড়জামা ইত্যাদি উপহার দেবার অছিলায় আমাদের সাহায্য করতেন। অসুখে-বিসুখে আমাদের কাছে কাছে থাকতেন। আমাদের প্রফুল্ল রাখবার জন্য নানা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতেন। 

রাঙাকাকাবাবু তো সবসময়ই রাজনৈতিক কাজ নিয়ে মেতে আছেন, রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে তাঁর তো দিনরাত মেলামেশা। গুপ্ত বিপ্লবী দলের ছেলেমেয়েদের প্রেরণাও অনেকক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্র। বাবার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিশেষ করে বিপ্লবী ছেলেমেয়েদের সম্পর্ক ছিল একটু ভিন্ন রকমের, কিন্তু খুবই গভীর। সেটা সাধারণ লোকের চোখে পড়ত না। দেশের কাজে সহকর্মীরা জেলে গেলে তাঁদের পরিবারবর্গের দেখাশোনা, বিপ্লবী ছেলেমেয়েদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা ইত্যাদি করতেন। এই কাজেও দুই ভাই ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। বাবা ১৯৩২ সালে গ্রেপ্তার হবার পর তাঁর পক্ষ সমর্থন করে পরিবারের এক শুভার্থী এক বড় ইংরেজ অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে যান। ইংরেজ অফিসারটি বললেন, “দেখ, শরৎ বসু তো অনেক টাকা উপার্জন করেন। ইনকাম-ট্যাক্সও তো অনেক দেন। তবে আমরা দেখছি যে, এখন ব্যাঙ্কে তাঁর টাকা নেই বললেই চলে। আমরা জানি, শরৎ বসুর কোনও বাজে বিলাসিতা শখ বা অভ্যাস নেই, তবে টাকাগুলো যায় কোথায়? নিশ্চয়ই তিনি গোপনে কংগ্রেসের কাজে ও বিপ্লবীদের টাকা দেন।” 

এই যে বিপ্লবী ছেলেমেয়েদের কথা বললাম, তাঁরাও অজান্তে আমাদের বেশ প্রভাবিত করতেন। খবরের কাগজে তাঁদের সম্বন্ধে দু’রকম খবর বেরোত। এক, অত্যাচারী ইংরেজ অফিসারদের ওপর আক্রমণের কাহিনী বা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের মতো দুঃসাহসিক অভিযান। দুই, এইসব বিপ্লবীদের বিচারের বিবরণ অথবা তাদের নির্বাসন বা ফাঁসির খবর। এইসব খবর আমাদের মনের মধ্যে তোলপাড় করত। বাংলার তরুণ বীরদের আত্মত্যাগে আমরা যেমন অভিভূত হতাম, তেমনি গর্বিতও হতাম। বাবা ও বাড়ির অন্যরা এই ধরনের খবরে যে বেশ বিচলিত বোধ করতেন, সেটা আমাদের মতো ছোটরাও বুঝতে পারত। বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে এই সব ছেলেমেয়েদের যেন একটা নাড়ির টান ছিল। কোনও ফাঁসির খবর এলে সারা বাড়িতে একটা থমথমে ভাব বিরাজ করত। আরও একটু বড় হবার পরে বাবার মুখে একটা কথা বেশ কয়েকবার শুনেছি। 

বাবা রুদ্ধ আবেগের সঙ্গে বলতেন, “দেখ, এই সব ছেলেমেয়ের অনেককেই আমি কাছ থেকে দেখেছি ও জেনেছি। এরা সব ‘স্টার্লিং গোল্ড’, খাঁটি সোনা।” 

অনেক পরে বিপ্লবী বন্ধুদের কাছে শুনেছি, বাবা বিনয় বসুর প্রাণ বাঁচাবার জন্য তাঁকে লুকিয়ে বিদেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন এবং তার জন্য যত টাকা লাগে নিজেই দিতে রাজি ছিলেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযানের বিপ্লবীদের যখন বিচার শুরু হল, আদালতে তাঁদের পক্ষ সমর্থনের জন্য বাবা চট্টগ্রামে যাওয়া-আসা করতে লাগলেন। সেই সময় অনন্ত সিংহের বোন ইন্দুমতী আমাদের উডবার্ন পার্কের বাড়িতে এসে বেশ কিছুদিন ছিলেন। ইন্দুমতীর সঙ্গে আমরা ছোটরাও বেশ ভাব জমিয়েছিলাম। 

রাঙাকাকাবাবুর জীবন ছিল একমুখী—দেশ আর দেশ। বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর জীবনযাত্রায় খানিকটা তফাত থাকা স্বাভাবিক। বাবার আইন ব্যবসা আছে, আছে দেশের কাজ, আরও আছে নিজের সংসারের দায়িত্ব। নেহাত কাজের কথা ছাড়া কথাবার্তা বলার অবকাশ কম। বসে গল্পগুজব বা তুচ্ছ সামাজিকতা করার কথাই ওঠে না। এই কারণে অনেকেই বাবার নাগাল পেত না। ভাবত, তিনি বোধহয় পাত্তাই দিচ্ছেন না। ফলে, কখনও-কখনও ভুল বোঝাবুঝি হত। 

বাড়িতে তো অসুখ-বিসুখ করেই। এ ব্যাপারে আমি ছিলাম ফার্স্ট। আমার এত অসুখ করত যে কী বলব! কত রকমের অসুখ। বাবা বাড়িতে অসুখবিসুখের সময় একেবারে শান্ত ও অবিচলিত থাকতেন। আমাদের নতুন কাকাবাবু ডাক্তার সুনীল বসুর উপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল। তাঁর হাতে ছেলেমেয়েদের বা মায়ের চিকিৎসার ভার ছেড়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত থাকতেন। যখন বিশেষ কারণে অন্য ডাক্তার ডাকতে হত, নতুন কাকাবাবুর মতামতই বাবা গ্রহণ করতেন। ছোটবেলায় বুঝিনি, পরে বুঝেছি বিপদের সময় শান্ত ও অবিচলিত থাকার মূলে ছিল বাবার গভীর ভগবৎ বিশ্বাস। 

বাবার দুটি দীর্ঘ-মেয়াদী কারাবাসের সময় বাড়িতে ছেলেমেয়েদের, মায়ের, দাদাভাই, মাজননীর ও অন্য অনেকের গুরুতর অসুখ-বিসুখ, অপারেশন ইত্যাদি হয়েছিল। প্রথমবার কারাবাসের সময় তিনি হারিয়েছিলেন দাদাভাইকে, দ্বিতীয়বার মাজননীকে। সব বিপর্যয়ই বাবা অসীম ধৈর্যের সঙ্গে মেনে নিয়েছিলেন নিয়তির অমোঘ সত্য হিসাবে। 

এই সূত্রে নতুন কাকাবাবুর কথা কিছু বলি। সুনীলচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন, চোখেমুখে বুদ্ধির দীপ্তি, এবং কথাবার্তায় খুব সপ্রতিভ। তিনি বিলেত থেকে বিশেষজ্ঞ হয়ে ফেরার পরে কিছুদিন হ্যারিংটন স্ট্রীটের এক ফ্ল্যাট-বাড়িতে ডাক্তারি শুরু করেন। দরকার পড়লেই মা তাঁকে খবর দিতেন। এমন হাঁকডাক করতে করতে তিনি আসতেন যে, বাড়িতে বেশ একটা চাঞ্চল্য দেখা দিত। চিকিৎসা তো করতেনই। সঙ্গে সঙ্গে জমিয়ে গল্প জুড়ে দিতেন, নানা রকম রসালো গল্প। তিনি পুরোপুরি সাহেব ছিলেন পোশাক-আশাকে, আদব-কায়দায় এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। মাঝে মাঝে তিনি তাঁর ফ্ল্যাটে আমাদের নিয়ে যেতেন। বিলিতি কেক, বিস্কুট, চকোলেট উডবার্ন পার্কের বাড়িতে ঢুকত না। নতুন কাকাবাবুর কল্যাণে আমরা তার কিছু স্বাদ পেতাম। 

তাঁর রাজনৈতিক মতামত অন্য ধরনের ছিল। তিনি বেশ খানিকটা ইংরেজ-ঘেঁষা ছিলেন বলা চলে। কিন্তু তার জন্য ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনও তারতম্য ঘটত না। 

তোমরা হয়তো ভাবছ, যে পরিবারে সুভাষচন্দ্র জন্মেছিলেন, সেই পরিবারে অন্য মতের লোক কী ভাবে আসে! কিন্তু সেটাই স্বাভাবিক। কেবল রাজনৈতিক মতামতের জন্য ব্যক্তিগত সম্পর্কের তিক্ততা আসাটাই অস্বাভাবিক। ডাক পড়লেই নতুন কাকাবাবু আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর রাজনৈতিক এমন কী বিপ্লবী বন্ধুদেরও মনপ্রাণ দিয়ে সেবা করতেন। 

নতুন কাকাবাবুর কথা বলতে গিয়ে আর একজনকার কথা মনে পড়ে গেল। সেই সময়—তিরিশ দশকের প্রথমে নতুন কাকাবাবুর সঙ্গে তাঁদের ছোটমামা, আমাদের ছোটদাদাবাবু, রণেন্দ্রনাথ দত্ত থাকতেন। ছোটদাদাবাবুর চেহারা ছিল সাহেবের মতো। আচার-ব্যবহারেও তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর সাহেব। দেশী কায়দায় খাবার দিলে তিনি আমাদের দেশী শাক-সব্জি সম্বন্ধে মজার মজার মন্তব্য করতেন। যেমন “আবার তোদের সেই লক্ষ্মীছাড়া বেগুন, আর হতচ্ছাড়া পটল!” 

কয়েকটি ব্যতিক্রম থাকলেও বাবাদের জেনারেশনে মামা-ভাগ্নের মধ্যে একটা বিষয়ে বেশ সাদৃশ্য ছিল। সেটা হল খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে। তাঁরা সকলেই ভোজনরসিক ছিলেন। বাবা ও রাঙাকাকাবাবুও এই দলে পড়তেন। পরিমাণেও তাঁরা বেশি খেতেন। 

আমাদের জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারত না বলে তাঁরা আমাদের খানিকটা কৃপার চোখে দেখতেন। ছোটদাদাবাবু রণেন্দ্রনাথ ও লালদাদাবাবু সত্যেন্দ্রনাথের ডিমের ওমলেটের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল। শুনেছি ছোটদাদাবাবু রাতের খাওয়া শেষ করে মুখ ধুয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে অন্যদের বলতেন, ওমলেটের টুকরো তাঁর মুখে ফেলে দিতে, যাতে তিনি ওমলেটের স্বাদ—যেটা তাঁর কাছে ছিল অমৃতসমান—মুখে নিয়ে ঘুমোতে পারেন। লালদাদাবাবু সারা জীবন আমাদের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গেছেন। যখনই তিনি আসতেন তখনই তাঁকে বড় মাপের একটা ওমলেট দেওয়া হত। 

পিসিমাদের কাছে শোনা আর একটা পুরনো গল্প বলি। এলগিন রোডের বাড়িতে তো অনেক লোক। লালদাদাবাবু, তখন তাঁর বয়স অবশ্য কম, বাজি রাখলেন যে, বাড়িতে সকলের জন্য যতটা ভাত রান্না হয় সবটা তিনি একলাই খাবেন। প্রায় বাজিমাত করে এনেছিলেন। শেষ গ্রাস নেওয়ার সময় আর পারলেন না, সবটাই উঠে গেল। 

১৪

১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। বাবা পেশাগত কাজ নিয়ে ধানবাদ অঞ্চলে গেছেন। ভোরে একদিন দেখা গেল পুলিস আমাদের উডবার্ন পার্কের বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। দরজা খুলতেই পুলিস-অফিসারদের একটি বড় দল বাড়িতে ঢুকল। হাতে খানাতল্লাশির পরোয়ানা। খানাতল্লাশির সময় বাড়ি থেকে কেউ বেরোতে পারবে না। ইতিমধ্যে মা অবশ্য অন্য উপায়ে খবর পাঠিয়ে দু-চারজন আত্মীয়-বন্ধু আনিয়ে নিলেন। এধরনের ব্যাপার তো কাছ থেকে আগে দেখিনি। সার্চের রকম-সকম দেখেও অবাক হয়ে গেলাম। বাবার অফিস ঘর ছাড়াও আরও দুটি ঘরে বই ঠাসা ছিল; একদিকে আইনের অনেক বই, অন্যদিকে রাজনীতি, ইতিহাস, সাহিত্য ইত্যাদি নানা ধরনের বই। বাবার অফিসের কাগজপত্র ও পুলিসে তছনছ করে ফেলল। প্রত্যেকটি চিঠি খুলে পরীক্ষা করল। তাক ও আলমারি থেকে বইগুলি নামিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাতা উল্টে উল্টে দেখল, কোনো বইয়ের ভিতরে লুকনো কিছু আছে কি না! তারপর বাকি বাড়িটা তো আছেই। খানাতল্লাশি শেষ করতে সারা দিন লেগে গেল। বেশ কিছু বই ও কাগজপত্র, যেগুলি তাদের রাজদ্রোহাত্মক বলে মনে হল, তারা আলাদা করে তালিকাভুক্ত করল এবং যাবার সময় নিয়ে চলে গেল। তালিকাটি পরে হারিয়ে গিয়েছিল এবং দেশ স্বাধীন হবার পরেও আমরা কিছু ফেরত পাইনি। এইভাবে বাবার লাইব্রেরির বেশ একটা অংশ আমরা হারাই। পরে রাঙাকাকাবাবুর একটি মূল্যবান সংগ্রহের একই অবস্থা হয়েছিল। ১৯৩৬ সালে রাঙাকাকাবাবু যখন দেশে ফেরেন, অনেক বই কাঠের বাক্সে বোঝাই করে তিনি মালবাহী জাহাজে দেশে পাঠিয়েছিলেন। নিজে তো বোম্বাই পৌঁছোতেই গ্রেপ্তার হন। তাঁর বইগুলির বড় অংশই বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। 

কলকাতায় যখন বাড়ি তল্লাশি চলছে, সরকার বাহাদুর সেই সন্ধ্যায় ঝরিয়ায় বাবাকে গ্রেপ্তার করার সব ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছেন। পরে বাবার কাছে শুনেছি, সারাদিন কাজের পর রাত্রের খাওয়াদাওয়া সেরে বাবা ও তাঁর সঙ্গীরা তাঁদের বাংলোয় যখন একটু আরাম করে গল্পগুজব করছেন, তখন দেখা গেল চারিদিকের অন্ধকার ভেদ করে দুটি মোটরগাড়ির জোরালো আলো তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে। বাবা আন্দাজ করেছিলেন কী হতে যাচ্ছে। গ্রেপ্তারের পর সরকার বাবাকে কলকাতায় নিয়ে আসেনি। সুদূর মধ্যপ্রদেশে জব্বলপুরের বেশ কিছু দূরে সিউনি বলে এক পাণ্ডববর্জিত জায়গায় তাঁকে নিয়ে গেল। বাবা সেখানে পৌঁছে দেখলেন ভাই সুভাষচন্দ্র তাঁকে অভ্যর্থনা করবার জন্য ইতিমধ্যেইসেখানে পৌঁছে গেছেন। মাসখানেক আগে গান্ধীজির সঙ্গে বোম্বাইয়ে দেখা করে কলকাতা ফেরবার পথে রাঙাকাকাবাবুকে কল্যাণ স্টেশনে গ্রেপ্তার করে পরে সিউনি সাব-জেলে বন্দী করেছিল। 

১৯৩০ সাল থেকেই বাবা স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ছিলেন। রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে আলোচনার পর বাবা ১৯৩০-এর মাঝামাঝি দাদাভাইকে একটা চিঠি লিখে জানান যে, তিনি কংগ্রেসের কাজে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করবার জন্য কিছুদিনের জন্য আইনব্যবসা বন্ধ রাখছেন। ঐতিহাসিক ঐ চিঠিটি সম্প্রতি নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো প্রকাশ করেছে। সেই যে বাবা এক বন্ধুর পথে পা বাড়ালেন, তারপর আর ফিরে তাকাননি, রাঙাকাকাবাবুর সংগ্রামের সাথী হয়ে সব বিপদ-আপদ অগ্রাহ্য করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কেবল এগিয়েই গিয়েছেন। 

বিহারের কয়লাখনি অঞ্চলটি বসুবাড়ির দিক থেকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ জায়গা। এখনই তো বললাম বাবা প্রথমবার ঐ অঞ্চল থেকেই গ্রেপ্তার হন। সেই থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সেখানে ঘটেছে। আমার নিজের ঐ অঞ্চলে যাওয়া-আসা অবশ্য আরও আগে থেকে—যখন আমি খুবই ছোট। তার অনেক সুন্দর স্মৃতিও আমার মনে ধরা আছে। আমাদের ন’কাকাবাবু সুধীরচন্দ্র বসু ঐ অঞ্চলে কাজ করতেন। তিনি কয়লা সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ন’কাকিমা শান্তিলতা দেবী আমার শিশু বয়স থেকেই আমাকে নিজের ছেলের মতো স্নেহ করতেন। জীবনের প্রথম বছরেই আমার অসুখ করতে আরম্ভ করে। সেই সময় আমার মা নিজের অসুস্থতার জন্য ন’কাকিমার হাতে আমার দেখাশুনোর ভার ছেড়ে দেন। সেই থেকে ন’কাকিমার সঙ্গে আমার এক বিশেষ মমতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি অনেকদিন পর্যন্ত তাঁকে শান্তিমা বলে ডাকতাম। তাঁর নিজের ছেলে ছিল না। বড় মেয়ে ছায়া আমার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট ছিল। সে অসাধারণ সুন্দরী ছিল এবং তার স্বভাবটি ছিল খুবই কোমল। ছায়া ও আমার মধ্যে ছিল আপন ভাই-বোনের সম্পর্ক। আমার স্কুলের ছুটির সময় ন’কাকাবাবু ন’কাকিমা বেশ কয়েকবার তাঁদের কাছে আমাকে নিয়ে গেছেন এবং খুব সুখে ও আনন্দে আমি তাঁদের কাছে থেকেছি। কলকাতা থেকে গিয়ে বিহারের শুকনো, অনুর্বর, উঁচুনিচু খনি-অঞ্চল বেশ নতুন রকম ঠেকত। ন’কাকাবাবু গাড়িতে চাপিয়ে প্রায় রোজই আমাদের নিয়ে বেড়াতে বেরোতেন। ফলে ছেলেবেলা থেকেই ঐ অঞ্চলটির সিজুয়া, জামাডোবা, কাতরাস ইত্যাদি জায়গার সঙ্গে আমার বেশ একটা পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। ন’কাকাবাবুর মতো প্রাণখোলা স্নেহপ্রবণ লোক আমি কমই দেখেছি। বসুবাড়ির অন্য অনেকের মতো খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে তাঁরও বেশ দুর্বলতা ছিল। তাঁর মতে জ্বর হলে পথ্য হওয়া উচিত লুচি আর মাংস। সত্যিই তিনি নিজে জ্বরে পড়লে ঐ পথ্য করতেন। আমার স্বাস্থ্যের গোলমাল হলে ন’কাকিমা যখন খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ধরাকাট করতেন, ন’কাকাবাবু তাতে ঘোর আপত্তি জানাতেন। পরে ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসের পর রাঙাকাকাবাবু স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য বেশ কিছুদিন ন’কাকাবাবুর জামাডোবার, বাড়িতে ছিলেন। গান্ধীজিকে তাঁর অনেক ঐতিহাসিক চিঠি জামাডোবা থেকে লেখা। কংগ্রেসের মধ্যে বাদ-বিসংবাদ নিয়ে রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে আলাপ করতে জওহরলাল সেই সময় জামাডোবায় এসেছিলেন। তাছাড়া এটা তো এখন সকলেরই জানা যে, ১৯৪১-এ রাঙাকাকাবাবুর ঐতিহাসিক অন্তর্ধানের ব্যাপারে ঐ অঞ্চলটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি ছিল। ধানবাদের কাছাকাছি বারারিতে তিনি একদিন আত্মগোপন করেছিলেন, এবং গোমো থেকে পেশোয়ারের পথে রওনা হন। এ বিষয়ে আমি “মহানিষ্ক্রমণ”-এ লিখেছি। পরে আরও কিছু বলব। 

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে যে, দুঃসময়ের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু। এর যথার্থতা আমরা বাবার দুই দীর্ঘ কারাবাসের সময় বেশ উপলব্ধি করেছিলাম। প্রথমবার—১৯৩২-১৯৩৫–-মা খুবই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। প্রথমত নিজের সংসার চালাতে হবে। বাবার জমানো পুঁজি ছিল না—ব্যাঙ্কে টাকা জমানোর অভ্যাস বা অবকাশ তাঁর কোনোদিনই ছিল না। দ্বিতীয়ত বাবা গ্রেপ্তার হবার বছর খানেক পরেই রাঙাকাকাবাবুকে স্বাস্থ্যের কারণে ইউরোপ পাঠাবার ব্যবস্থা হয়। রাঙাকাকাবাবুর ইউরোপের খরচ চালাবে কে? বাবা তো নিজেই জেলে। সুতরাং এই ভারটাও মার উপর পড়ল। সেই সময় পরিবারের কয়েকজন অকৃত্রিম বন্ধু মাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন, যাঁদের কথা আমরা আজও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। এই সূত্রে দুজন বন্ধু ও তাঁদের পরিবারের কথা আগে বলি। একজন প্রভাসচন্দ্র বসু, অন্যজন নৃপেন্দ্রচন্দ্র মিত্র। দুজনকেই আমরা চিরকাল কাকাবাবু ডেকে এসেছি। বাবা গ্রেপ্তারের একবছর আগে আমার বড় দাদাকে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন। বাবা গ্রেপ্তার হওয়া মাত্র প্রভাসচন্দ্রবাবু এসে মাকে বললেন যে, বাবা যতদিন জেলে থাকবেন, দাদার জার্মানির খরচের ভার তাঁর। বাবা ফিরে শোধ দেবেন। প্রভাসচন্দ্র ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা অবশ্য তার অনেকদিন আগে থেকেই শুরু হয়েছে। বাবা-মা’র সঙ্গে ছুটিতে আমরা যখন পাহাড়ে বেড়াতে যেতাম প্রায়ই কাকাবাবু প্রভাস বসু, কাকিমা ও তাঁদের ছেলেমেয়েরা আমাদের সাথী হতেন। নৃপেনবাবু তো বাবার জেলবাসের সময় নিজেই আমাদের পাহারা দেওয়ার ভার নিয়ে ফেললেন। প্রায় রোজই সন্ধ্যায় তিনি আমাদের দেখতে আসতেন। বলতে পারি সেই সময় আমাদের প্রধান অবলম্বন ছিলেন তিনজন, মামাবাবু অজিতকুমার দে, প্রভাসচন্দ্র বসু ও নৃপেন্দ্রচন্দ্র মিত্র। বাবার সঙ্গে সৌহার্দ্যের ফলে রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গেও শেষোক্ত দুজনের বিশেষ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।’ নৃপেনবাবুকে রাঙাকাকাবাবু নিজের ব্যক্তিগত এটর্নি নিযুক্ত করেন, যাতে আইনানুসারে নৃপেনবাবু তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। আজ তাঁর বয়স নব্বুই ছাড়ালেও নৃপেনবাবু সাধ্যমতো নেতাজী ভবনের কাজে অংশ গ্রহণ করেন। তিনিই বর্তমানে নেতাজী রিসার্চ ব্যুরোর চেয়ারম্যান। 

সিউনি সাব-জেলে বন্দী হবার পর থেকেই বাবা ও রাঙাকাকাবাবুর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসার সূত্রে ব্রিটিশ সরকার রাঙাকাকাবাবুকে নিয়ে দেশের নানা জায়গায় ঘোরাতে থাকে, মাদ্রাজ, ভাওয়ালি, লখনৌ, জব্বলপুর। বাবাকে জব্বলপুরেই রাখে। রাঙাকাকাবাবুর স্বাস্থ্যের অবস্থা শেষ পর্যন্ত এতই খারাপ হয় যে, ভারত সরকারের সঙ্গে বসু-পরিবারের পক্ষ থেকে কথাবার্তা শুরু করা স্থির হয়। ভারত সরকারের কট্টর হোম মেম্বারের সঙ্গে এ-বিষয়ে কথা বলার ভারও পড়ে আমার মা’র উপর। লখনৌয়ের বলরামপুর হাসপাতালে রাঙাকাকাবাবুর সঙ্গে প্রথমে আলোচনা করে মা দিল্লি যান হোম মেম্বার হ্যাটে সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে। ইংরেজ সরকারের সঙ্গে চুক্তি হল যে, চিকিৎসার জন্য রাঙাকাকাবাবুকে তারা ইউরোপ যেতে দেবে, তবে ভারতের মাটি ছাড়ার পরই তিনি মুক্ত হবেন। ১৯৩৩-এর ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি রওনা হয়ে গেলেন ভিয়েনার পথে। 

ইউরোপ থেকে রু অবস্থায় রাঙাকাকাবাবুর একটি ছবি মা’র কাছে পাঠান। আমার আর্টের মাস্টারমশাই হরেনবাবু আমাকে সেটা আঁকতে দিয়েছিলেন। শৈশবে আঁকা সেই ছবিটি এখনও আমার কাছে আছে। 

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *