৫
১৫ই ডিসেম্বর, রবিবার, কালিন্দী, দক্ষিণ দমদম, রাত সাড়ে বারোটা সুখেন্দুশেখর ভৌমিক কলকাতা পুলিশের রিটায়ার্ড অফিসার। চাকরি জীবনের প্রথম বছর পনেরো রাজ্য পুলিশের হয়ে কাজ করলেও বাকি চাকরিজীবন পুরোটাই কলকাতায় কাটিয়েছেন তিনি। সফলভাবে চাকরি শেষ করে অবসর নিয়েছেন বছর তিনেক আগে। এখন তাঁর হাতে অফুরন্ত অবসর।
সারাটা জীবন ধরে পুলিশের চাকরিতে পরিবারকে সময় দিতে পারেননি এক ফোঁটা। স্ত্রী সুমনার সেই নিয়ে অভিযোগ কম ছিল না। ভেবেছিলেন অবসরের পর পুরো সময়টা সুমনাকে দেবেন তিনি। ছেলেরা দুজনেই প্রতিষ্ঠিত। বড়োজন দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বড়ো চাকুরে, ছোটোজন সেই সুদূর মার্কিন দেশে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। সুতরাং মিয়াবিবি মিলে বাকি জীবনটা দিব্যি কেটে যাবে বলেই ভেবেছিলেন। কে জানত, প্রথম যৌবনের শখ আবার নতুন করে এই বয়সে এসে মাথাচাড়া দেবে!
প্রস্তাবটা এসেছিল অযাচিতভাবেই। বছর দশেক আগে ছোটো ছেলে একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল। কিন্তু ওই খোলা অবধিই। পুলিশের চাকরির ঝক্কি সামলে সোশ্যাল মিডিয়ার মনোযোগ দেওয়ার সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই তখন সুখেন্দুবাবুর ছিল না। রিটায়ারমেন্টের পর এক সকালে নেহাতই হেলায় সেই অ্যাকাউন্ট খুলে পেয়ে গেলেন এক প্যান্ডোরার বাক্স। সে এক আশ্চর্য দুনিয়া। চল্লিশ বছর আগে হারিয়ে ফেলা বন্ধুদের খুঁজে পেয়ে বেশ কিছুদিন তাদের নিয়ে মেতে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে ফেসবুকের দুনিয়ায় যত ভেতরে ঢুকতে লাগলেন, অবাক হয়ে দেখলেন কতরকম গ্রুপ! সেখানে কতজন কত কিছু করছে! কেউ গাইছে, কেউ ছবি আঁকছে, কেউ রান্না করছে। এমনকি গৃহবধূরা শাড়ি, নাইটি, হাতে বানানো গয়না, কেক-বিস্কুট বাড়িতে বসে অনলাইনে বিক্রি করে টাকা উপার্জন করছে।
যত দেখেন, তত অবাক হন সুখেন্দু। কতজন কতরকম পোস্ট করে। কেউ কবিতা লেখেন, কেউ লেখেন গল্প। সুখেন্দুবাবু ভাবেন, স্কুল-কলেজে থাকাকালীন লেখালেখির চর্চা ছিল। বাংলা টাইপ করতে জানলে তিনিও লিখতে পারতেন।
সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এল ছোটো পুত্রবধূ। কথাচ্ছলে তাকে বলায় সেই ফোন করে বুঝিয়ে দিল কীভাবে বাংলায় টাইপ করতে হয়। তার কথামতো অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে নিলেন সুখেন্দুবাবু। খুব বেশি অসুবিধে হল না। দিন দশেকের চেষ্টায় বাংলা লিখতে শিখে গেলেন তিনি।
কিন্তু কী লিখবেন! ভাবতে ভাবতে মনে হল, তার দীর্ঘ চাকরি জীবনে কত চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তো কতবারই হয়েছেন তিনি। এছাড়াও কত কেস, কত রহস্য, সহকর্মীদের কেসের ডিটেলস, কত গল্পই তো আছে তাঁর ভাঁড়ারে সেসব নিয়ে লিখলে কেমন হয়?
যেমন ভাবনা, তেমনি কাজ। লিখতে শুরু করলেন তিনি। এ তো আর বানানো গল্প নয়, হাতে গরম অভিজ্ঞতা। লাইক, কমেন্টের বান ডাকল। হু-হু করে বন্যার স্রোতের মতো বাড়তে লাগল তাঁর ফলোয়ারের সংখ্যা। সুখেন্দুবাবুও ডুবে গেলেন তাঁর নতুন নেশায়।
এরপর একদিন হঠাৎই একটা মেসেজ ঢুকেছিল তাঁর মেসেঞ্জারে। তারপর এল ফোন। প্রস্তাবটা চমকপ্রদ। কলেজ স্ট্রিটের এক বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা তাঁর অভিজ্ঞতাগুলিকে গ্রন্থিত করতে চায়। সুখেন্দুবাবুর তখন একগাল মাছি। লেখক হওয়ার স্বপ্ন জীবনেও দেখেননি তিনি। নেহাতই শখে, সময় কাটানোর জন্য লিখতে শুরু করেছিলেন। সুমনাকে জানালেন সবটা। সেও শুনে অবাক। পরবর্তী আধ ঘন্টার মধ্যে দুই ছেলে, তাদের পরিবার, তাদের শ্বশুরবাড়ি, সুখেন্দুবাবুর শ্বশুরবাড়ি সহ তাবৎ আত্মীয়কূল জেনে গেল সুখেন্দুবাবুর বই আসতে চলেছে। অভিনন্দনের বন্যা বয়ে গেল।
সেই শুরু। গত দুই বছরের একটু বেশি সময়ে পাঁচখানা বই বাজারে এসেছে তার। সবগুলোরই দারুন বিক্রি। ছেপে আসার আগেই হটকেকের মতো বিকিয়ে যায়। বইমেলায় পাঠককুল পরিবেষ্ঠিত হয়ে হাসিমুখে সেলফি তোলেন তিনি। সই বিলি করেন অকাতরে।
আজকাল সুখেন্দুবাবুর ব্যস্ততা বেড়েছে। প্রায়ই নানান সাহিত্য সম্মেলন, বই উদ্বোধন, সভাসমিতিতে ডাক পড়ে তাঁর। সবসময় যে যেতে ইচ্ছে করে তা নয়। তবে মোটের উপর এই বয়সে এসে অযাচিত খ্যাতি তিনি উপভোগই করেন।
আজ নৈহাটিতে একটি পত্রিকার উদ্বোধনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন তিনি। মোক্ষম দিনেই গাড়িটা বিগড়েছে। অনুষ্ঠানের কর্মকর্তারা অবশ্য গাড়ি পাঠিয়েছিলেন। আপাতত সেই গাড়িতেই কলকাতা ফিরছেন। কবজি উলটে ঘড়ি দেখলেন সুখেন্দুবাবু। অনেকটা রাত হয়ে গেল। ড্রাইভারও খুব ধীরে চালাচ্ছে। হাত পরিষ্কার নয়।
‘অনেক দেরি হয়ে গেল,’ হাই তুলে স্বগতোক্তি করলেন সুখেন্দুবাবু।
ড্রাইভার উত্তর না দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল। চোখটা টেনে এসেছিল, এমন সময় গাড়ি থেমে যেতে ঘুমটাও চটকা ভেঙে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন সুখেন্দুশেখর। বাড়ি এসে গেল নাকি? না, এখানে তাঁর বাড়ি নয়। জায়গাটাও চেনা লাগছে না। বেশ অন্ধকার ও নির্জন।
‘একটু নামতে হবে স্যার। চাকাটা গেল। টায়ার বদলাতে হবে।’ বলল ড্রাইভার।
সুখেন্দুশেখর মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে দরজা খুলে নেমে এলেন। সামনে এগিয়ে চাকাটা দেখতে গেলেন তিনি। কিন্তু কই? চাকা তো বসেনি। ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ তাঁকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে দ্রুত হাতে তার দুই হাত শরীরের পেছনে রুদ্ধ হল হাতকড়ায়। ঠোঁটের উপর অভ্যস্ত হাতে দ্রুত লাগিয়ে দেওয়া হল চওড়া টেপ।
ঠিক সেই মুহূর্তে গলার কাছে তীব্র একটা যন্ত্রণা অনুভব করলেন তিনি। কেউ যেন ভোঁতা কিছু দিয়ে সময় নিয়ে কাটছে সুখেন্দুবাবুর কণ্ঠনালী। ছটফট করতে করতে মাটিতে পড়ে গেলেন।
এখনও জ্ঞান হারাননি সুখেন্দুশেখর। তবে হাত-পা সহ সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। সামনে তাঁর গাড়ির ড্রাইভার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে আছে তারই দিকে। সুখেন্দুশেখর বদ্ধ হাত বাড়াতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। শরীরটা বেশ কবার ঝাঁকুনি দিয়ে স্থির হয়ে গেল, যদিও সুখেন্দুবাবু জানেন তিনি এখনও বেঁচে আছেন। খোলা চোখের তারায় ড্রাইভারের প্রতিবিম্ব পড়ছে এখনও। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, লোকটা উবু হয়ে তার মুখের পাশে এসে বসল। সুখেন্দুবাবুর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ। ধীরে ধীরে চারপাশে কুয়াশার মতো অন্ধকার ঘনিয়ে উঠতে লাগল। সামনে বসা লোকটা তৃপ্তমুখে তারিয়ে তারিয়ে মৃত্যুদৃশ্য উপভোগ করছে। ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল তার। সুখেন্দুশেখরবাবুর চোখের সামনে থেকে আলোর শেষ বিন্দুটুকু মুছে গিয়ে একটা কালো পর্দা পড়ে গেল ঝুপ করে।
৬
সকাল পাঁচটার একটু আগে ফোনটা এল। ঘুমের মধ্যে বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়েই ধড়মড় করে উঠে বসল অর্জুন। এত সকালে ডিসিডিডি স্যারের ফোন!
‘হ্যালো!’ গলাটাকে যথাসাধ্য স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল।
সৌরভ সান্যাল হাই-হ্যালোর ধার মারালেন না। বললেন, ‘কোথায় আছো?’
‘বাড়িতে স্যার’, বলল অর্জুন।
‘এক কাজ করো। সোজা কালিন্দীতে চলে যাও। একটা মার্ডার হয়েছে। লোকাল থানা রিপোর্ট করেছে। কেসটা ইম্পর্ট্যান্ট।’
‘কালিন্দী মানে দমদম কালিন্দী?’
‘হ্যাঁ,’ বললেন ডিসিডিডি, ‘মৃতের নাম সুখেন্দুশেখর ভৌমিক। এক্স-কপ, বর্তমানে রিনাউন্ড অথর
অর্জুনের সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল নামটা। গত বইমেলায় বইটা কিনে পড়েছিল। চার ভাগ সত্যের সঙ্গে ছয় ভাগ জল মিশিয়ে লেখা গুলগল্প সব। পুলিশ তো নয়, যেন জেমস বন্ডের বাবা। তবে সে যাই হোক, বানিয়ে বানিয়ে গল্প লেখা তো আর এতবড়ো অপরাধ নয় যে সেজন্য কেউ কাউকে খুন করে ফেলবে! তাহলে লোকটাকে মার্ডার করল কে?
প্রশ্ন করার আগেই উত্তর এল।
‘গলা কেটে খুন। কেসটা কভার করো। আর শোনো, মিডিয়াকে ধারেকাছে ঘেঁষতে দেবে না। কোনো বয়ান দেবে না। ফরেনসিক টিম রওনা দিয়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি পৌঁছোও। অল দ্য বেস্ট!’
ফোনটা রেখে কয়েক মুহূর্ত থুম হয়ে বসে রইল অর্জুন। খুনটা তাকে ততটা ভাবাচ্ছে না যতটা গলা কাটার ব্যাপারটা। আলস্য ঝেড়ে ফেলে বিছানা থেকে নামল সে। গত দুইদিন ধরে শরীরটা ঠিক জুত নেই। বাড়াবাড়ি কিছু নয়, সিজন চেঞ্জের সাধারণ জ্বরজারি, গলা ব্যথা। কিন্তু শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছে। বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বের করে মুখে দিল অর্জুন। জল দিয়ে সেটিকে গিলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিল ক্লকে সময় দেখাচ্ছে সোয়া পাঁচটা। এখন ট্রাফিক কমই থাকবে। আধ ঘন্টার মধ্যে কালিন্দী পৌঁছে যেতে পারবে। মোবাইল ফোন অ্যাপে ক্যাব বুক করে নিল অর্জুন। তারপর বাথরুমে ঢুকে গেল।
অর্জুন যখন অকুস্থলে পৌঁছোল, তখন সকাল পৌনে ছ-টা বাজে। এত সকালেও জায়গাটায় বেশ ভিড়। কলকাতা শহরে নিত্যদিন হাজারটা ঘটনা ঘটে বটে, তা বলে রাস্তায় কোনো বিখ্যাত মানুষের লাশ রোজ রোজ পড়ে থাকে না। আসার সময় রাস্তায় চেক করে দেখে নিয়েছে অর্জুন, ফেসবুকে সুখেন্দুশেখরের পেজে ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। সুতরাং তাঁর মৃত্যুটা যে মিডিয়ার কাছে যথেষ্ট সেনসেশনাল নিউজ, সেটা ভালোই বুঝতে পারছে অর্জুন।
অকুস্থলে পৌঁছে দেখল ইতিমধ্যে মিডিয়া সেখানে পৌঁছে গেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্জুন। আবার ডিসিডিডি স্যারকে এর ব্যাখ্যা দিতে হবে তাকে। ভিড় ঠেলে সামনে এগোল সে। পুরো জায়গাটা ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়েছে। অর্জুনকে দেখে একজন অল্পবয়েসি অফিসার এগিয়ে এল।
‘স্যার আমি সাউথ দমদম থানার সাব ইন্সপেক্টর অভিজিত শূর।’
গাড়িতে আসতে আসতেও মাথাটা দপদপ করছিল অর্জুনের। এখন একটু কমেছে। প্যারাসিটামল কাজ শুরু করেছে বোধ হয়। দূর থেকে মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে দেখল সেখানে ফরেনসিকের লোকজন কাজ করছে। অভিজিতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন, ‘প্রথম কে দেখেছে লাশ?’
অভিজিত বলল, ‘এখানকার স্থানীয় এক ভদ্রলোক। এখান থেকে একটু দূরে বাড়ি। খুব ভোরে দিল্লির ফ্লাইট ছিল ভদ্রলোকের ছেলের। ক্যাব আসতে দেরি হওয়ায় রাস্তায় এগিয়ে আসেন। এক দল কুকুরের চিৎকার শুনে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে দেখতে গিয়ে দৃশ্যটা চোখে পড়ে তাঁর।’
অর্জুন আশেপাশে দৃষ্টি বোলাল। এই জায়গাটা কিছুটা ফাঁকা। বাড়ি আছে, তবে সেগুলি বেশ দূরে। হয়তো সেই কারণেই মার্ডারার জায়গাটা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু সুখেন্দুশেখর এখানে এই গলির ভেতরে এসেছিলেন কেন! তার বাড়ি তো বিরাটির দিকে।
‘ভিকটিমের বাড়ির লোকদের খবর দেওয়া হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন। ‘হ্যাঁ স্যার। ভিকটিমের স্ত্রী এসেছেন’, বলে ভিড়ের দিকে ইশারা করল অভিজিত। সেখানে এক প্রৌঢ়া চুপচাপ একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছেন কাঁদছেন না। তবে তার দৃষ্টিতে শোক চাপা নেই। অর্জুন চাপা গলায় বলল, ‘ওঁকে এখানে এভাবে বসিয়ে রেখেছ কেন?’
অভিজিত কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘কী করব স্যার? আমরা বলেছিলাম চলে যেতে। ওঁর তো এখানে কোনো কাজ নেই। বডি মেডিক্যাল কলেজে যাবে। পোস্ট-মর্টেমের পর হ্যান্ডওভার হবে। উনি রাজি হলেন না। ইনসিস্ট করলেন যে যতক্ষণ বডি মুভ না করানো হয়, তিনি এখানেই থাকবেন।’
অর্জুন কথা না বাড়িয়ে মৃতদেহ যেখানে পড়ে আছে, সেই জায়গাটার দিকে এগিয়ে গেল।
রাস্তার পাশে ঘাসের উপর পড়ে আছে দেহটি। গলার নলির কাছটা কাটা। ফরেনসিকের ডক্টর মৃন্ময় সেন অকুস্থলে এসেছেন। তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াল অর্জুন। জিজ্ঞাসা করল, ‘কী বুঝছেন?’
প্রৌঢ় ভদ্রলোক মাথা তুলে অর্জুনকে দেখে স্মিত হাসলেন। তারপর হাত নেড়ে নীচে বসতে বললেন। অর্জুন উবু হয়ে তাঁর পাশে বসল। ডক্টর সেন মৃতদেহের গলার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললেন, ‘ভালো করে দেখো। গলাটা একটানে কাটা নয়। সেক্ষেত্রে আরও স্মুথ অ্যান্ড ডিপ হত।’
মাথা নাড়ল অর্জুন। ডক্টর সেন আবার বললেন, ‘কাটটা শুরু হয়েছে বাঁ কানের নীচ থেকে। সেখান থেকে এক্সটার্নাল করোটিড আর্টারি কেটে ক্রমশ ডানদিকে কিছুটা নীচে নেমে এসেছে কাটা দাগ। যথেষ্ট কাটাছেঁড়া আছে, টিস্যু ড্যামেজ হয়েছে কাটের আশেপাশে। এর থেকে কী বুঝতে পারছ?’
অর্জুন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ডক্টর সেনের দিকে তাকাল। ডক্টর সেন বললেন, ‘দেখো, এই কাট পেছন থেকে হয়েছে সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। সামনে থেকে হলে ভিকটিম রেসিস্ট করার চেষ্টা করত। সেটা যদি নাও করে সেক্ষেত্রেও কাট কানের নীচ থেকে শুরু হত না কোনোভাবেই, হরাইজন্টাল লাইন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকত। সুতরাং ধরে নিচ্ছি মার্ডারার পেছন থেকে জাপটে ধরে অতর্কিতে গলা কেটেছে। বাঁ কানের নীচ থেকে কাট শুরু হয়েছে। সুতরাং খুনি রাইট হ্যান্ডেড পার্সন। ভিকটিম প্রৌঢ়, শারীরিক দিক থেকে দুর্বল। মার্ডারারের বয়স অবশ্যই ভিকটিমের চেয়ে কম, এবং যথেষ্ট শক্তিশালী, এবং অবশ্যই স্কিলড। খুনের অস্ত্র সম্পর্কে এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে সেটা খুব ধারালো নয়। যথেষ্ট যন্ত্রণা দিয়ে খুন করা হয়েছে ভদ্রলোককে।
‘মার্ডারারের হাইট কেমন হতে পারে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
ডক্টর সেন ঠোঁট উলটে বললেন, ‘সেটা বলা মুশকিল। নির্ভর করছে, অ্যাটাকের সময় ভিকটিম কেমন পোজিশনে ছিলেন তার উপর। সুখেন্দুবাবু যথেষ্ট লম্বা। এখন যদি দুজনেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে মার্ডারারের উচ্চতা ভিকটিমের চেয়ে সামান্য কম হতে পারে, বা সমানও হতে পারে। যদি ভিকটিম বসে থাকে, বা উঁবু হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে বলা সম্ভব নয়।’
‘হুম, আপনার কী মনে হচ্ছে?’ জানতে চাইল অর্জুন, ‘মার্ডারার কোনো প্রফেশনাল লোক হওয়ার সম্ভাবনা কতটা?’
ডক্টর সেন একটু চিন্তা করলেন। তারপর কপাল চুলকে বললেন, ‘কী বলি! প্রফেশনাল হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। কারণ ক্ষুর সাধারণ বা অপেশাদার খুনির অস্ত্র নয়। আবার সেরকম নাও হতে পারে। কারণ প্রফেশনাল কিলার হলে এমন ভোঁতা অস্ত্র ব্যবহার করবে কেন?’
সুখেন্দুশেখরের মৃতদেহের দিকে তাকাল অর্জুন। হাতদুটো পেছনে মুড়ে হ্যান্ডকাফ লাগানো। সস্তার জিনিস, আজকাল অনলাইনেই কিনতে পাওয়া যায়। মনে পড়ল, গতকালই দুপুরে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন সুখেন্দুবাবু। লিখেছিলেন, এই বয়সে এসে জীবনকে নতুন করে উপভোগ করছেন তিনি। জীবন খুব সুন্দর। প্রতিটা সকাল তাঁর কাছে জীবনের নতুন অর্থ বয়ে আনে। তখনও তিনি জানতেন না, পরের দিনের সূর্যোদয় তাঁর আর দেখা হবে না।
৭
‘কেসটা নিয়ে উপরমহল থেকে চাপ আসছে অর্জুন। সুখেন্দুশেখর ছিলেন ফেসবুক সেলিব্রিটি। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার চেয়ে শক্তিশালী আর কী আছে! তুমি এর গুরুত্বটা বুঝতে পারছ তো?’ গম্ভীর গলায় বললেন সৌরভ সান্যাল।
অর্জুন বলল, ‘বুঝতে পারছি স্যার। ভিকটিম সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ছিলেন। আর সেটাই এই কেসের ড্র-ব্যাক। মিডিয়ার কাছে এই মার্ডার এখন হট টপিক। কিন্তু আমরাও আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। ডক্টর সেনের সঙ্গে কথা বলেছি আমি। তাঁর মতে খুনটা করার জন্য খুনিকে স্ট্রাগল করতে হয়নি। পেশাদার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওই এলাকার হিস্ট্রি শিটারদের নজরে রাখা হয়েছে। খবরিদের অ্যালার্ট করে দিয়েছি।’
‘এখানে দুটো ব্যাপার আছে অর্জুন। সুখেন্দুবাবু সেদিন গিয়েছিলেন নৈহাটি ফেরার সময় তিনি অত রাতে কালিন্দীতে গেলেন কেন ভেবে দেখেছ?’
অর্জুন বলল, ‘এই ব্যাপারটা আমাকেও ভাবাচ্ছে। সুখেন্দুবাবুর গাড়ির ড্রাইভারই সেটা বলতে পারবে। তার খোঁজ চলছে।’
সৌরভ সান্যাল বললেন, ‘এক্স্যাক্টলি। দুই নম্বর প্রশ্নটা এটাই। ড্রাইভার গেল কোথায়?’
‘সেদিনের অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ওঁরা জানিয়েছেন, সেদিন সুখেন্দুবাবুকে পৌঁছে দেওয়ার কথা তাঁদেরই ছিল। অনুষ্ঠানের শেষে সুখেন্দুবাবুকে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। যে গাড়ি ঠিক করা হয়েছিল, তার ড্রাইভার আরেকজন অভ্যাগতকে পৌঁছে দিতে কাছেই গিয়েছিল। দশ মিনিটের মধ্যে সে চলে আসে। কিন্তু ততক্ষণে সুখেন্দুবাবু কাউকে না জানিয়েই বেরিয়ে গেছেন। তাঁকে ফোনে ধরা হলে তিনি জানান, তিনি অনুষ্ঠানের আয়োজকদের গাড়িতেই ফিরছেন কলকাতা।’
‘আশ্চর্য! আয়োজকদের গাড়িতে ফিরলেন, অথচ আয়োজকরাই জানলেন না!’
‘সেই প্রশ্নটা আমিও করেছিলাম। ওঁরা জানালেন, অনুষ্ঠানের জন্য মোট চারটি গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ড্রাইভাররা সকলেই স্থানীয় ও পরিচিত। সুখেন্দুবাবুর সঙ্গে কথা হওয়ার পর আয়োজকরা তৎক্ষণাৎ খোঁজ নেন। জানতে পারেন তাদের ঠিক করা কোনো গাড়িতেই সুখেন্দুবাবু যাননি। সেই সময়ে আরও কয়েকজন অতিথিদের কলকাতায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপার ছিল। আয়োজকরা ব্যস্ত ছিলেন। সেই কারণেই হয়তো ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেননি তাঁরা। ভেবেছিলেন, অনুষ্ঠানের অতিথি বা দর্শকদের মধ্যে কারোর গাড়িতে হয়তো কলকাতা ফিরে গেছে সুখেন্দুবাবু।
সৌরভবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘বরং তাদের ঝামেলা পোহাতে হল না বলে মনে মনে সম্ভবত খুশিই হয়েছিলেন আয়োজকরা। যাই হোক, খোঁজ নাও। আমাদের এই ড্রাইভারই ধরে নেওয়া যেতে পারে খুনি বা খুনির সহযোগী।’
‘কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন আছে স্যার’, বলল অর্জুন, ‘মোটিভ! সুখেন্দুবাবুর ওয়ালেটে হাজার তেরো টাকা ছিল। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানে উপস্থিতির সাম্মানিকস্বরূপ ওঁরা দশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এছাড়া দুই হাতে তিনটি সোনার আংটি ছিল। তার মধ্যে একটি আবার হিরে বসানো। পাঞ্জাবিতে সোনার বোতাম ছিল। কিছুই কিন্তু চুরি যায়নি। অর্থাৎ চুরি বা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে এই খুন হয়নি। আমরা মৃতের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। ভদ্রমহিলা বেশ শক্ত। পুলিশকে পুরোপুরি সহযোগিতা করছেন। তিনি জানিয়েছেন যে সুখেন্দুবাবুকে খুন করতে পারে সেরকম কোনো শত্রু ছিল না। থাকলেও তিনি জানেন না। মোটিভটা ক্লিয়ার হচ্ছে না স্যার।’
ডিসিডিডি একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘এক কাজ করো অর্জুন। সুখেন্দু ভৌমিক সম্পর্কে বিশদে খোঁজখবর করো। গলা কেটে খুন করার রেকর্ড যাদের আছে, সেইসব হিস্টি শিটারদের রেকর্ড বের করে দেখো। কারা কারা বাইরে আছে এখন, তাদের মধ্যে কারা এখনও কাজ করছে দেখো। আমাকেও উপরে জবাব দিতে হবে। দুই দিন সময় দিলাম। এর মধ্যে কিছু অন্তত আমার হাতে এনে দাও যা দিয়ে আমি আরও কিছুটা সময় কিনতে পারি। আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড! রাইট?’
‘ইয়েস স্যার!’
ডিসিডিডির কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাকলনির এক কোণে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে উইলসের প্যাকেট বের করল অর্জুন। কলেজ জীবনে ধূমপানের অভ্যেস ছিল। তারপর একটা সময় নিজে থেকেই ছেড়ে দিয়েছিল সে। আজকাল কাজের চাপে আবার শুরু করেছে। রোজই দোকান থেকে সিগারেটের প্যাকেট কেনার সময় ভাবে আজই শেষ। একটা অপরাধবোধ কাজ করে। কিন্তু কলেজের আমলে যত সহজে নেশাটা ঝেড়ে ফেলতে পেরেছিল, এবারে আর এটা সম্ভব হচ্ছে না।
সিগারেটটা ধরিয়ে দুটো টান দিতে না দিতেই পকেটে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে নামটা দেখে অর্জুনের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল।
‘হুম, বলো!’
ও প্রান্তে টাপুরের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
‘নিউজ দেখেছ?’
‘না’, বিস্মিত কণ্ঠে বলল অর্জুন, ‘কী হল?’
টাপুর বলল, ‘তোমার ভিকটিমের বই যে প্রকাশনা থেকে বেরোত, তার গোডাউনে আগুন লেগেছে।’
‘কী বলছ!’
‘আধ ঘন্টা আগের ঘটনা। লক্ষ লক্ষ টাকার বই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সুখেন্দু ভৌমিকের বইগুলি বইমেলার জন্য সব নাকি নতুন এডিশন ছাপা হয়েছিল। সব গেছে।’
‘কীভাবে হল?’
‘সংস্থার কর্ণধারের বক্তব্য, এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, অন্তর্ঘাত। কেউ ইচ্ছে করেই আগুন লাগিয়েছে।’
অর্জুন খুব অবাক কণ্ঠে বলল, ‘তাতে লাভ কী! পান্ডুলিপি তো আছে প্রকাশকের কাছে। আবার নতুন করে ছাপিয়ে নেবে।’
টাপুর হাসল। বলল, ‘বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে প্রকাশনা সংস্থা। এখন কতদিনে ঘুরে দাঁড়াতে পারে দেখো! আমি বলব, তুমি বরং যাও। একবার ছাই উড়িয়ে দেখো। কে বলতে পারে, কোনো লুকোনো রতন পেয়ে গেলে যেতেও তো পারো?’
‘বলছ?’
‘হুম, বলছি,’ মৃদু হেসে বলল টাপুর।
৮
সারদা প্রকাশনার মালিক অনিরুদ্ধ মল্লিক মধ্যবয়েসি ব্যক্তি। তিন প্রজন্মের বই-ব্যবসায়ী তাঁরা। সাহিত্যের বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে কলেজ-ইউনিভার্সিটি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বইও প্রকাশ করেন। বইপাড়ার ছোটো ও মাঝারি প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কাছে অনিরুদ্ধ মল্লিকের বাবা জগতবন্ধু মল্লিক ছিলেন অভিভাবকের মতো। সকলে তাঁকে শ্রদ্ধা করত। জগতবন্ধুবাবুর মৃত্যুর পর অনিরুদ্ধ ব্যাবসার হাল ধরেছেন বছর তিনেকে আগে। প্রথমে বছরখানেক তেমন সুবিধে করতে না পারলেও এখন মোটামুটি গুছিয়ে এনেছেন।
প্রকাশনার গুদামে আগুন লাগার খবরে যথেষ্ট ভিড় জমেছে গুদামের সামনে। প্রায় চল্লিশ মিনিট টানা আগুন জ্বলেছে। এই এলাকায় অনেক প্রকাশনার গুদাম রয়েছে যেগুলি কার্যত কাগজের মতো দাহ্যে ঠাসা। দমকলকে আগুন থামাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। একেই তো উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলে সরু সরু সব রাস্তা। তার উপর পুরোপুরি অপরিকল্পিত। দমকলের গাড়ি ঢোকানো এক্ষেত্রে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল।
ধ্বংসস্তূপের উপরেই বসেছিলেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। বয়স চল্লিশের আশেপাশে। ছিপছিপে, ব্যায়াম করা সুন্দর চেহারা। পরনে কালো রঙের কলার দেওয়া পোলো টিশার্ট ও জিনস। পায়ে স্পোর্টস শু। অর্জুনের দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘এসব কী হয়ে গেল বলুন তো?’
অর্জুন চারিদিকে তাকাল। ভেতরে রাশি রাশি ছাই পড়ে আছে। বিশাল গোডাউনের ডানদিকে তবু কিছু বই বেঁচেছে, বাঁদিকের অংশটা পুরোটাই জ্বলে খাক হয়ে গেছে। বই পুড়তে দেখলে সত্যিই কষ্ট হয়।
‘এসব কীভাবে হল?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘জানি না। আমি দোকানে ছিলাম। ফোন পেলাম, গোডাউনে আগুন লেগেছে। এসে দেখি দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। এসেই জল ঢালার ব্যবস্থা করি। এখানে অন্যান্য প্রকাশনারও গোডাউন আছে। আগুন ছড়িয়ে পড়লে ভয়ঙ্কর বিপদ হতে পারত। তাই সকলে মিলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দমকল এসে পৌঁছোনোর আগেই ডানদিকের আগুন নিভিয়ে ফেলতে পেরেছিল।’
‘ইলেকট্রিসিটির লাইন সার্ভিসিং করানো হয়?’
‘নিয়মিত,’ বিমর্ষমুখে বললেন অনিরুদ্ধবাবু, ‘আমার কাছে সব কাগজপত্র আছে। বাবার আমলের পুরোনো সার্কিট একেবারে তার জড়িয়ে জঙ্গল হয়ে ছিল। আমি সব বদলে আধুনিক সার্কিট বসিয়েছি। অগ্নিনিরোধক দামি তার ব্যবহার করেছি। এটা শর্ট সার্কিটের আগুন বলে মনে করি না আমি। আপনারাও ভেতরে গেলে দেখতে পাবেন, যেদিকে মেন সুইচ আছে সেদিকে বিশেষ আগুন ছড়ায়নি।’ অর্জুন স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বলল, ‘এর অর্থ কী দাঁড়ায় আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন!’
অনিরুদ্ধ মল্লিক চোখ তুলে তাকালেন অর্জুনের মুখের দিকে। তারপর কেটে কেটে বললেন, ‘অবশ্যই বুঝতে পারছি। শুধু তাইই নয়, এ আমার দৃঢ় ধারণা যে কাজটা কেউ ইচ্ছে করেই করেছে।’
‘তার মানে কে করতে পারে সেই সম্পর্কেও নিশ্চয়ই আপনার ধারণা আছে! অনিরুদ্ধ মল্লিক চোখ নামিয়ে নিলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘জানি না। সেটা আপনারা খুঁজে বের করুন বরং! আমিও জানতে চাই কে আমার এত বড়ো ক্ষতি করল।’
‘যখন আগুন লাগে সেই সময়ে গোডাউনে কেউ ছিল না?’ অর্জুন জানতে চাইল।
অনিরুদ্ধবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমাদের দোকান কাছেই। দোকানে বেশি বই স্টোর করা সম্ভব হয় না। স্টক এই গোডাউনে থাকে। প্রয়োজন মতো এখান থেকে নিয়ে যায় ছেলেরা। অন্য সময় গোডাউনে তালা লাগানো থাকে।’
অর্জুন ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিন্তু আগুন তো ভেতরে প্রথমে লেগেছে। সেটা ছড়িয়ে পড়ার পর বাইরের লোকেরা দেখেছে। গোডাউনে যদি তালা থাকে, তাহলে ভেতরে আগুন লাগল কীভাবে?’
অনিরুদ্ধ মল্লিক বললেন, ‘দেখুন সেটা অনেক ভাবেই করা যেতে পারে। গোডাউনটা পুরোনো কনস্ট্রাকশন। ঘুলঘুলি আছে অনেক। বই হাইলি ইনফ্লেমেবল কমোডিটি। সুতরাং আগুন লাগাতে শুধু একটা জ্বলন্ত দেশলাইয়ের বেশি তো কিছু লাগে না, তাই না? আমি সত্যিই জানি না কীভাবে আগুন লেগেছে। শুধু এটুকু জানি আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।’
অর্জুন এবার জিজ্ঞাসা করল, ‘এসব ইনশিয়োর করানো ছিল না?’
অনিরুদ্ধবাবু উপর-নীচে মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘ছিল। কিন্তু সেই ইন্স্যুরেন্সের টাকা কবে পাব, আদৌ পাব কি না তাও তো জানি না। সামনে বইমেলা। সারা বছর ধরে আমরা বই বিক্রেতারা ওই পনেরোটা দিনের অপেক্ষায় থাকি। নতুন প্রচুর বই ছাপানো হয়েছিল বইমেলার জন্য। সব গেল।’
‘একটা কথা জানতে চাই,’ বলল অর্জুন, ‘সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের বই তো আপনারা করেন। তাঁর বইগুলোর কী অবস্থা?’
প্রশ্নটা শুনে একটু অবাক হলেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। বললেন, ‘ওই বইগুলো বাঁ দিকের তাকে থাকত। ওঁর বইয়ের কাটতি খুব বেশি। বইমেলার জন্য পাঁচটা বই মিলে প্রায় হাজার চারেক কপি ছাপানো ছিল। সব ছাই হয়ে গেছে।’
অর্জুন অনিরুদ্ধবাবুকে পাশ কাটিয়ে গোডাউনের ভেতর ঢুকল। ঢুকেই বুকের মধ্যে জোর ধাক্কা লাগল। প্রায় অন্ধকার গোডাউন জুড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বইয়ের দগ্ধ শব। কিছু আধ-পোড়া, কিছু একেবারে ছাই। গোডাউনের দুদিকের দেওয়াল নিরেট। সেখানে স্টিলের র্যাকে থাকেথাকে সাজানো খবরের কাগজে মোড়া বইয়ের প্যাকেট। দরজার মুখোমুখি দেওয়ালে দুটো জানলা। এখন দুটোই বন্ধ। জানলার দুই পাশেও বইয়ের র্যাক রয়েছে।
অর্জুন এগিয়ে গেল জানলার দিকে। জানলায় শিক নেই। ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে বন্ধ করা। দ্বিতীয় জানলাটির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ব্যাপারটা চোখে পড়ল তার। এখানে ছিটকিনি ঢোকানোর আংটাটা ভাঙা। জানলা ভেজানো আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা বন্ধ নয়। হাত দিয়ে ঠেলতেই পাল্লাটা খুলে গেল। নীচু হয়ে এদিক ওদিক দৃষ্টি বুলোতেই ভাঙা আংটাটা মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা গেল। উবু হয়ে সেটা কুড়িয়ে নিল অর্জুন।
‘অনিরুদ্ধবাবু, একবার এদিকে আসবেন,’ উচ্চস্বরে ডাকল অর্জুন।
অনিরুদ্ধ মল্লিক অর্জুনের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
‘এটা কবে ভেঙেছে?’ জানতে চাইল অর্জুন।
অনিরুদ্ধবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘আমি জানি না তো। এটা আজকের আগে আমার চোখে পড়েনি।’
‘গোডাউনের চাবি কার কাছে থাকে?’
‘একটা আমার কাছে থাকে’, বললেন অনিরুদ্ধ মল্লিক, ‘আরেকটা থাকে আমাদের দোকানে যিনি কাউন্টারে বসেন, সেই অখিলদার কাছে। অনেক পুরোনো লোক। বাবার আমল থেকে আছেন। আমাকেও কোলেপিঠে বড়ো করেছেন। খুব বিশ্বাসী। দোকানের চাবিও অখিলদার কাছেই থাকে। তিনিই সকালে দোকান খোলেন।’
‘আমি অখিলবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চাই। তিনি কি দোকানেই আছেন?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘না, অখিলদার স্ত্রীর অসুখ। তিনি দোকানে আসেননি আজ।’ বললেন অনিরুদ্ধবাবু।
অর্জুন জানলা দিয়ে বাইরে চোখ রাখল। বলল, ‘এই জানলার বাইরে কী আছে?’
অনিরুদ্ধবাবু বললেন, ‘এদিকে একটা কানা গলি আছে। এখান থেকে দুটো বাড়ি পরেই শেষ হয়েছে।’
অর্জুন জানলা দিয়ে লাফিয়ে পেছনের গলিতে নামল। অনিরুদ্ধবাবু ভুল কিছু বলেননি। গলিটা সত্যিই কানা, অর্থাৎ একদিকে দেওয়াল তোলা। অন্যদিকটা ঘুরে গিয়ে গোডাউনের সামনের রাস্তার উপর কিছুদূরে উন্মুক্ত হয়েছে। গলির মুখের একটা মুদির দোকান। সেখানে বৃদ্ধ দোকানি বসে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন। অর্জুন সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চোখ তুললেন। বললেন, ‘কী চাই? ‘ অর্জুন বলল, ‘গত ঘন্টাদুয়েকের মধ্যে অচেনা কাউকে এই গলি দিয়ে বেরোতে দেখেছেন?’
বৃদ্ধ একবার গলির দিকে একবার অর্জুনের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি পুলিশ?’
অর্জুন মাথা নাড়ল। বৃদ্ধ বললেন, ‘হু, মল্লিকবাবুদের গুদামে আগুন লেগেছে শুনেছি। একটু আগেই গিয়ে দেখে এলাম। অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।’
অর্জুন একটু অস্থির কণ্ঠে বলল, ‘আপনি দেখেছেন কাউকে?’
বৃদ্ধ দুইদিকে মাথা নেড়ে বললেন, ‘কত লোকই তো আসে যায়। অত কী আর মনে থাকে?
অর্জুন পকেট থেকে নিজের কার্ড বের করে লোকটার হাতে দিয়ে বলল, ‘তবু মনে করার চেষ্টা করে দেখুন। এটা আমার কার্ড। কিছু মনে পড়লে এই নম্বরে ফোন করে আমাকে জানাবেন।’
৯
সারাদিন যথেষ্ট ছোটাছুটি গেছে। অফিস থেকে বেরিয়ে টাপুরের ফ্ল্যাটে এসেছে অর্জুন। ঝালমুড়ি দিয়ে গরম দার্জিলিং চা খাওয়ার পর মাথাটা কিছুটা ঠান্ডা হয়েছে।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে টাপুর জিজ্ঞাসা করল, ‘কেসের কতদূর?’
অর্জুন বলল, ‘সুখেন্দুশেখরকে সেদিন যে ড্রাইভার নিয়ে এসেছিল, তার খোঁজ চলছে। এখনও খোঁজ মেলেনি। তাকে পাওয়া গেলে কিছু সুরাহা হবে বলে মনে হয়।’
‘ড্রাইভারকে সন্দেহ করছ?’ জানতে চাইল টাপুর।
‘তা করছি। সে খুনি কি না জানি না এখনও, না হলেও খুনের সঙ্গে অবশ্যই জড়িত। নিদেনপক্ষে উইটনেস তো বটেই!’ বলল অর্জুন।
টাপুর বলল, ‘সুখেন্দুশেখরের ফেরার কথা ছিল নিজের বাড়িতে বিরাটিতে, সেখানে তিনি কালিন্দীর ভেতরে গলিতে কেন গেলেন? তাও আবার মধ্যরাতে? হেঁটে নিশ্চয়ই যাননি। সুতরাং যে গাড়িতে নৈহাটি থেকে রওনা দিয়েছিলেন, সেই গাড়িতেই কালিন্দী গিয়েছিলেন। এবার প্রশ্ন হল, স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন, না তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জায়গাটা বেশ শুনশান। তাহলে কি তাঁকে খুন করার জন্যই ওখানে নিয়ে গিয়েছিল খুনি? অনেক প্রশ্ন অর্জুন, উত্তর মিলছে না।’
অর্জুন হাসল। বলল, ‘তোমাকে কে বলল জায়গাটা শুনশান? গিয়ে দেখে আসাও হয়ে গেছে?’
টাপুর মৃদু হাসল। বলল, ‘কেসটা ইনটারেস্টিং! তাই আর কী!’
অর্জুন বলল, ‘তা কী বুঝলে?’
টাপুর একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তারপর বলল, ‘তোমার কাছে ডেডবডির ছবি ছিল না? দেখাতে পারবে আমাকে?’
অর্জুন নিজের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকটা ছবি তুলেছিল। গ্যালারি খুলে ফোনটা এগিয়ে দিল টাপুরের হাতে। টাপুর মন দিয়ে দেখল ছবিগুলো। তারপর মাথা নেড়ে বলল, ‘উহু! মিলছে না। তোমাদের অটোপ্সি সার্জেনের কথা অনুসারে খুনি পেছন থেকে এমন আচমকা ভিকটিমের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়েছে। তারপর গলার ছুরি বা সেরকম কোনো ভোঁতা অস্ত্র চালিয়েছে। এবার প্রশ্ন হল যে ভোঁতা অস্ত্র কেন? যদি সেটা ইচ্ছাকৃত হয় তাহলে কারণ হতে পারে যে খুনি চেয়েছিল সুখেন্দুবাবুকে বেশি কষ্ট দিয়ে মারতে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, নৈহাটি থেকে কলকাতা ফেরার পথে অনেকটা রাস্তাই বেশ শুনশান থাকে, বিশেষত ন্যাশনাল হাইওয়ের দিকটা। মধ্যরাতে দূরপাল্লার ট্রাক ছাড়া আর বিশেষ যানবাহনও থাকে না। তাহলে সেই জায়গা ছেড়ে কালিন্দীর গলিতে খুন করতে বয়ে আনল কেন খুনি। এখানে কাছেপিঠে অনেক বাড়ি। ভিকটিম চিৎকার করলেই খুনি ধরা পড়ে যেতে পারত। তবু রিস্ক কেন নিল! বাই দ্য ওয়ে, কয়েকদিন আগে আরেকটা ক্ষুরে কাটা খুনের কেস এসেছিল না তোমার কাছে? সেটার কিছু কিনারা হল?’
অর্জুন মাথা নাড়ল। তারপর কিছু মনে পড়তে টাপুরের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ডায়াল করল। রিং হচ্ছে।
পরমুহূর্তে অপর প্রান্তের কণ্ঠস্বর শুনে বলে উঠল, ‘হ্যালো, সঞ্জয়বাবু!’
‘হ্যাঁ স্যার, বলুন!’ বললেন এম জি রোড থানার ওসি সঞ্জয় পাল।
‘আমার মোবাইল নম্বরে বিলাল শেখের বড়ির ছবিগুলো ইমিডিয়েটলি পাঠান। আর কেসটার কিছু সুরাহা হল কি?’
‘সুরাহা বলা যায় না স্যার। তবে আপনি যা যা খোঁজ নিতে বলেছিলেন, সেগুলো নিয়েছি। বিলাল শেখের টাকাপয়সার খোঁজ কেউ জানে না। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল দুটো। তবে সেগুলোতে খুব সামান্যই টাকা ছিল। বিলাল জেলে যাওয়ার পরে তার ব্যাবসার সমস্ত টাকা কোথায় গেল কেউ বলতে পারেনি। ওর দলের একজন জানাল, অনেকে সন্দেহ করে, লতিকা সব জানত বিলালের টাকার কথা। সে-ই সব নিয়েছে। কিন্তু ওদের অবস্থা দেখে সেরকম মনে হয় না। গত কদিন লোক লাগিয়ে রেখেছিলাম বাদশার পেছনে। গরিব না হলেও অবস্থা খুব একটা ভালো নয় স্যার। দোকানটা এখনও খুব ভালো করে দাঁড়ায়নি। বাজারে বাদশার দেনা আছে। ছেলেটাকে প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ায়। সেখানেও ফিজ ডিউ আছে মাস দুয়েকের
‘আর? ওই ডাইরিটার ব্যাপারে কিছু জানলেন?’
‘বিলালের এগেনস্টে অনেক কেস ছিল। কোন কেসে যে কাকে টাকা খাইয়েছে বোঝা মুশকিল।’
অর্জুন একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘আচ্ছা, বিলাল শেয়ালদা চত্বরে কতদিন অ্যাকটিভ ছিল? মানে সালটা বলতে পারবেন?’
‘বছর চোদ্দ আগে ধরা পড়ে ও’, বললেন সঞ্জয় পাল, ‘তার আগেও ধরুন বছর দশেক।’
তার মানে সেই সময়ের মধ্যে শেয়ালদা স্টেশন দিয়ে স্মাগলিং-এর যেসব কেস রেজিস্টার হয়েছে, সেগুলো ঘাঁটলে কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে, ভাবল অর্জুন। বলল, ‘ঠিক আছে। ছবিগুলো এখনই পাঠান। আপনার কাছে আছে তো?’
সঞ্জয় পাল বলল, ‘আছে স্যার। আমি হোয়াটস্যাপ করে দিচ্ছি আপনাকে।’
মিনিট খানেকেরও কম সময়ে অর্জুনের মোবাইলে টুংটুং শব্দ করে ছবিগুলো ঢুকল। সেগুলো খুলে দেখল অর্জুন।
মোবাইলটা টাপুরের হাতে দিল অর্জুন। টাপুর একে একে পাঁচটা ছবি দেখল। তারপর অর্জুনের দিকে তাকাল। অর্জুন বলল, ‘কী বুঝলে?’
টাপুর বলল, ‘কিছুই না। আমি শিয়োর নই। তবে একটা হাঞ্চ হচ্ছে।’
‘কীসের হাঞ্চ?’
টাপুর একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, ‘আমার হাঞ্চটা ভুল হলেই খুশি হব। কিন্তু মনে হচ্ছে সেটা নাও হতে পারে।’
‘আমি জানি কী ভাবছ তুমি। বিলাল শেখের মার্ডারের সঙ্গে সুখেন্দু শেখরের মার্ডারের যোগসূত্র আছে বলে মনে করছ তো?’ বলল অর্জুন।
টাপুর হাসল। বলল, ‘সেটা তুমিও ভাবছ অর্জুন। কিন্তু তোমার ইগো সেটা তোমাকে স্বীকার করতে বাধা দিচ্ছে। না হলে তুমি এত সহজে বুঝে যেতে না যে আমি কী ভাবছি। মার্ডারের অস্ত্র হিসেবে আজকাল ক্ষুর কিন্তু খুব একটা কমন নয়। আর তা ছাড়া…’
‘তাছাড়া? আবার কী?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
টাপুর শান্ত গলায় বলল, ‘আমার আরও ধারণা খুন হয়তো এখানেই শেষ নয়। আমার মনে হচ্ছে আরও খুন হবে।’
