৩৫
ফোনটা রেখে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল অর্জুন। টাপুর জিজ্ঞাসা করল, ‘এখন কোথায় যাচ্ছি আমরা? কিছু ভেবেছ কোথা থেকে শুরু করব?’ অর্জুন কিছু বলার আগেই তার ফোন বাজতে শুরু করল। এম জি রোড থানার ওসি সঞ্জয় পাল।
‘বলুন সঞ্জয়বাবু।’
‘স্যার, বিলাল শেখের ডাইরির ডেটগুলো নিয়ে ওর পুরোনো চ্যালাচামুন্ডাদের মধ্যে একটু খোঁজখবর করছিলাম। একটা ঘটনা জানতে পারলাম।’
‘কী ঘটনা?’
‘ফোনেই বলব? না আপনি থানায় আসবেন?’
‘এখন সময় নেই সঞ্জয়বাবু। আপনি ফোনেই বলুন।’ক্লান্ত গলায় বলল অর্জুন। ফোনটা স্পিকারে দিল যাতে টাপুরও শুনতে পারে।
‘বিলাল শেখ অ্যারেস্ট হওয়ার বছর দুয়েক আগের ঘটনা। রাজস্থান থেকে ড্রাগের একটা বড়ো কনসাইনমেন্ট আসার কথা ছিল রেলপথে। পুলিশ খবর পেয়ে ট্রেনে রেড করেন।’
অর্জুন সোজা হয়ে বসল। টাপুরও।
‘তারপর?’
‘বিলালের সেই সময়ে খুব ঘনিষ্ঠ লোক ছিল বান্টা। মাঝে বছর চারেক জেলে ছিল। এখন একটা পান-বিড়ির দোকান দিয়েছে শেয়ালদা স্টেশনে। পুলিশের সোর্সও। অনেক খবর রাখে। সে-ই বলল যে অ্যারেস্ট হওয়ার কয়েক বছর আগে একবার পুলিশ রেইডে বিলালের প্রায় চল্লিশ লাখ টাকার মাল ধরা পড়েছিল। একজন বড়ো নেতার সঙ্গে বিলালের খুব মাখোমাখো সম্পর্ক ছিল। বিলালের ব্যাবসার কাটমানি সেই নেতা পেত, পরিবর্তে পুলিশের ঝামেলা মেটাত তো সেই নেতাই রফা করে দেন। এক পুলিশ অফিসারকে বড়ো অ্যামাউন্টের ঘুষ নিয়ে সেবার ছেড়ে দিয়েছিল বিলালকে। মালও যা ধরা পড়েছিল, তার খুব কম অংশই রেকর্ডে দেখানো হয়েছিল। বাকিটা বিলাল ফেরত পেয়েছিল। এই পুলিশ অফিসার কে আপনি ভাবতে পারবেন না স্যার।’
‘ভাবতে পারছি বোধ হয়। সুখেন্দুশেখর ভৌমিক। তাই তো?’
‘কী করে বুঝলেন স্যার?’
‘আন্দাজ করলাম। যাক গে, আর কিছু বলবেন?
‘হ্যাঁ। তারপরেও একটা ঘটনা ঘটেছিল।’
‘কী ঘটনা?’ অর্জুন জানতে চাইল।
অনেকক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলে বোধ হয় একটু হাঁফিয়ে উঠেছিলেন সঞ্জয় পাল। একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর বললেন, ‘ফোর্সেরই একজন সিনিয়ার কনস্টেবল প্রতিবাদ করেছিল। সুখেন্দুশেখরকে থ্রেট করেছিল যে উপরমহলে জানিয়ে দেবে তার কুকীর্তির কথা। ঘুষের লোভ দেখিয়েও তার মুখ বন্ধ করা যায়নি। এরপর সুখেন্দুশেখর উলটো তাকেই ট্র্যাপ করে।’
‘মানে? কীভাবে?’
‘উপর লেভেলে তার নামে কোরাপশন চার্জ আনে। আরও বলে তার সঙ্গে নাকি বিলাল শেখের গোপন আঁতাত ছিল। সেই কনস্টেবলই পুলিশের রেইডের খবর পৌঁছে দিত বিলালকে। আগে থেকেই সাবধান হয়ে যেত বিলাল। ফলে সাসপেন্ড হতে হয় সেই কনস্টেবলকে। ভেতরের খবর বাইরে ছড়াতে সময় লাগে না। পাড়ার মধ্যেও বদনাম ছড়িয়ে গেছিল। ভদ্রলোকের ফ্যামিলিকে নানাভাবে হ্যারাসড হতে হচ্ছিল। এর কয়েকদিন পরেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় চলন্ত লরির নীচে পড়ে যান তিনি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই রাস্তাতেই শেষ।’
অর্জুন আর টাপুর নীরবে শুনছিল। চলন্ত গাড়ির ভেতর শ্বাসরোধী উত্তেজনা। অর্জুন এবার জিজ্ঞাসা করল, ‘নাম কী ভদ্রলোকের, জানতে পেরেছেন?
‘হ্যাঁ। বান্টা শুধু নামটাই মনে করতে পারছে। নাম বলল সুবীর। পদবি মনে নেই।’
সজোরে গাড়িটা ব্রেক কষল নয়ন। ফোন স্পিকারে থাকায় অপরপ্রান্তের প্রত্যেকটা কথা তারও কানে গেছে। এখন অস্ফুটে বলল, ‘সুবীরজেঠু!’
অর্জুন বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইয়ু সঞ্জয়বাবু। আপনার ইনফর্মেশন আমাদের অনেক সাহায্য করবে। আরও কিছু জানতে পারলে জানাবেন। আপনার সোর্স সত্যিই প্রশংসা করার মতো। রাখছি এখন।’
‘কিছু জানতে পারলেন স্যার?’ জিজ্ঞাসা করলেন সঞ্জয় পাল।
‘খুব বেশি কিছু নয়। তবে বেশ কিছু সূত্র হাতে এসেছে। আজ কিছুতেই আরেকটা খুন হতে দেব না আমি।’ অর্জুনের কণ্ঠস্বরে আত্মপ্রত্যয়।
‘আজ! আজ খুন হবে? কীভাবে জানলেন?’ সঞ্জয় পাল রীতিমতো বিস্মিত।
‘জেনেছি। সে অনেক কথা। সব পরে বলব। শুধু আপনি আপনার থানার ফোর্সকে অ্যালার্ট রাখবেন। আজ রাতে যেন ওই এলাকায় কড়া নজরদারি চলে।’
‘আমার এলাকায় খুন হবে? আবার?’ সঞ্জয়বাবুর গলা শুনে মনে হয় তিনি হতাশ বোধ করছেন। ভাবটা এমন যেন আবার এসব ঝামেলা কেন!
‘কোন এলাকায় হবে তা কীভাবে বলব? আপনি অ্যালার্ট থাকুন।
‘ওকে স্যার।’
‘হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে টাচে থাকবেন। কোনো সমস্যা বুঝলে সময় নষ্ট না করে কনট্যাক্ট করবেন। ঠিক আছে?’
‘ওকে ওকে। আপনি অন্যদিকে দেখুন। আমার এলাকায় ব্যাটাকে পা রাখতে দেব না।’
ফোন রেখে নয়নের দিকে তাকাল অর্জুন। বলল, ‘এবার বলো নয়ন। সুবীরবাবু সম্পর্কে যা যা জানো বলো আমাকে।’
গাড়িটাকে ড্রাইভ করে রাস্তার এক পাশে দাঁড় করাল নয়ন। তারপর বলল, ‘আমি তখন বেশ ছোটো ছিলাম স্যার। খুব বেশি মনে নেই। বাবা বেঁচে থাকলে সাহায্য করতে পারতেন। কিন্তু…’
‘তোমার যতটুকু মনে আছে, সেটুকুই বলো! ভদ্রলোকের পদবি মনে আছে তোমার?’
মাথা নাড়ল নয়ন। বলল, ‘বাবা সুবীরদা বলে ডাকতেন মনে আছে। পদবি তো মনে নেই স্যার।’
‘বাড়িতে কে কে ছিল আর? এমন কেউ ছিল যে এতদিন পর্যন্ত রাগ পুষে রাখতে পারে?’ পাশ থেকে জিজ্ঞাসা করল টাপুর।
নয়ন কিছু বলার আগেই অর্জুন বলল, ‘এই সুবীরবাবুর কেসটার সঙ্গে সিরিয়াল কিলারের যে কোনো যোগ আছে, সেটা ধরে নিচ্ছ কীভাবে টাপুর? যদি না থেকে থাকে, তাহলে এটা নিয়ে এখন সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।’
‘আমি ধরে কিছুই নিচ্ছি না অর্জুন,’ একটু কঠিন গলায় বলল টাপুর। ‘আমাদের হাতে এখন অন্ধকারে হাতড়ানো ছাড়া আর কিছু উপায় আছে কি?’
অর্জুন চুপ করে রইল। নয়ন বলল, ‘যতদূর মনে পড়ছে, দুই ছেলে ছিল সুবীরজেঠুর। ছোটোজন আমার থেকে একটু ছোটো ছিল। ভালো নাম জানি না। ডাক নাম টুবলু। টুবলুর জন্ম থেকেই হার্টে কী যেন সমস্যা ছিল। খুব ভুগত পরে বাবার কাছে শুনেছিলাম, স্কুলে দৌঁড়োতে গিয়ে নাকি হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা গেছিল।’
মুহূর্তে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে সোজা হয়ে বসল অর্জুন।
‘স্কুলে হার্ট অ্যাটাক?
‘হ্যাঁ স্যার। বাবা বাড়ি এসে বলেছিল মা-কে, আমার পরিষ্কার মনে আছে। বলেছিল, পরিবারটা ভেসে গেল। প্রথমে সুবীরদা, তারপর টুবলু।’
‘সুবীরবাবুর বড়ো ছেলে? তার কী হল?’
নয়ন একটু ভাবল। বলল, ‘জানি না স্যার। সুবীরজেঠু মারা যাওয়ার পর বাবা তবু মাঝেমধ্যে ওদের খবর নিত। কিন্তু একটা সময়ের পর বাবার মনে হয়েছিল, ওরা কারোর সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে চায় না। জেঠিমা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল জেঠু মারা যাওয়ার পর। একটা সময়ের পরে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল স্যার।’
টাপুর বলল, ‘তুমি অনেক বড়ো সাহায্য করলে নয়ন। একটা কথা বলো, সুবীরবাবুর বড়ো ছেলের নাম মনে আছে তোমার?’
নয়ন ভাবল একটু। তারপর বলল, ‘ভালো নাম তো জানতাম না, ডাকনাম বোধ হয় ছিল বাবলু। হ্যাঁ, বাবলুই ছিল। বাবলু আর টুবলু দুই ভাই। বাবা ওদের কথা বলত খুব। একবার আমাদের বাড়ির কালীপুজোয় এসেছিল মনে আছে।
‘তুমি চেনো ওদের বাড়ি?’
মাথা নাড়ল নয়ন। বলল, ‘না ম্যাডাম। আমি কখনো যাইনি। তবে শেয়ালদার কাছাকাছি কোথাও হবে। সেরকমই শুনেছিলাম।’
‘আবার শেয়ালদা? আশ্চর্য!’
এতে আশ্চর্যের কী আছে বুঝল না নয়ন। একবার অর্জুনের দিকে তাকাল সে। অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘একটু ভালো করে ভেবে বলো তো নয়ন, এমন কিছু মনে আছে তোমার যাতে বাবলুকে খুঁজে বের করা যায়? একটু নিজের স্মৃতি হাতড়ে দেখো। আমাদের হাতে একটুও সময় নেই।’
বেশ খানিকটা সময় নিল নয়ন। মাথা নীচু করে রইল। তারপর মাথা তুলে বলল, ‘সুবীরজেঠু মারা যাওয়ার পর থেকে ওদের নিয়ে সেভাবে আর আলোচনা হতও না বাড়িতে। তবে কয়েক বছর আগে বাবা একবার মা-কে বলেছিল, এক পুরোনো কলিগের সঙ্গে দেখা হল। তার কাছেই শুনলাম, সুবীরদার ছেলে নাকি বিয়ে করেছে। ভালোই হয়েছে। সংসারটা এমনিতেও শেষ হয়েই গেছিল প্রায়। মা জিজ্ঞাসা করেছিল, ওই ভাড়াটে মেয়েটাকেই নাকি যার সঙ্গে ভাব ছিল? তখন বাবা বলেছিল, না। ওই মেয়েটা নাকি সুইসাইড করেছে।’
‘সুইসাইড করেছে!’ অর্জুন ও টাপুর একে অন্যের দিকে তাকাল। তাহলে কি মেয়েটা রেশমি! অনিরুদ্ধ মল্লিক। মিলে যাচ্ছে। সব মিলে যাচ্ছে।
‘এই বাবলুকে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে অর্জুন। আমার ধারণা বাবলুই বহ্নিশিখা মজুমদারের স্বামী।’ বলল টাপুর।
অর্জুন মুহূর্তকাল চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘চলো নয়ন, আমাদের রেজর কিলারকে খুঁজে বের করা যাক। লোকটাকে দেখলে চিনতে পারবে তুমি?’
নয়ন একটু ভাবল। বলল, ‘শেষ যখন দেখেছি, তখন বাবলুদা কলেজে পড়ত। আমিও তখন খুব ছোটো। এতদিন পরে চেহারা কতটা বদলেছে তা তো জানি না। মুখটা হালকা মনে আছে।’
অর্জুনের ফোন বাজছে। ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকাল সে। অপরপ্রান্তের কলার কী বলল শোনা গেল না। শুধু অর্জুনের ভুরুটা একটু কোঁচকাল। ফোনটা রেখে অন্য একটি নম্বর ডায়াল করল সে। বলল, ‘একটা ছবি পাঠাচ্ছি। আর লোকেশনও পাঠাচ্ছি। ওই লোকেশনের কাছাকাছি যা যা সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যাবে, চেক করুন। এই ভদ্রলোক নিরুদ্দেশ। লাস্ট ওই লোকেশনে মোবাইল সিগনাল পাওয়া গেছে সকাল পৌনে এগারোটা নাগাদ। দেখুন। কিছু পাওয়া গেলে আমাকে ফরোয়ার্ড করুন।’
‘কী হল? কাকুর মোবাইলের লাস্ট লোকেশন কোথায় ছিল?’টাপুরের কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট উদ্বেগ।
‘সল্টলেক করুণাময়ীর কাছে, সকাল এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট আগে।’ বলল অর্জুন।
৩৬
‘আমাদের কাছে এখন খুনির নাম আছে। বাবলু। পরবর্তী খুনের তারিখ আছে। আজ রাতে। কিন্তু কোথায় খুন হবে, কে-ই বা খুন হবে এখনও আমরা জানি না।’ বলল টাপুর। তারা এই মুহূর্তে বসে আছে ডিসিডিডি সৌরভ সান্যালের সামনে। তাঁকে যথেষ্ট উত্তেজিত দেখাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আর কিছু কি আমরা জানতে পারছি?’
অর্জুন বলল, ‘এখনও নয়। নয়ন জানিয়েছে খুনির বাড়ি শেয়ালদার আশেপাশে কোথাও। তবে একটা উপায় আছে জানার।’
‘কী?’
‘কনস্টেবল সুবীরবাবু, অর্থাৎ বাবলুর বাবা কলকাতা পুলিশেই চাকরি করতেন। খুঁজলে তাঁর রেকর্ড পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে তাঁর বাড়িও খুঁজে পাওয়া সম্ভব যদিও আমরা জানি না খুনি এখনও ওই বাড়িতেই আছে কি না!’
‘চেষ্টা করতে দোষ কী? আমি এখনই বলে দিচ্ছি রেকর্ড খুঁজতে। আর কিছু?’
টাপুর অর্জুনের দিকে তাকাল। অর্জুন বলল, ‘সংঘমিত্রা ম্যাডামের এক পরিচিত ভদ্রলোক আজ সকাল দশটার পর থেকে নিখোঁজ। উনি আমাদের এত সাহায্য করছেন। ভদ্রলোককে খুঁজে বের করতে আমাদেরও ওঁকে সাহায্য করা উচিত।’
‘কে বলুন তো?’ সৌরভ সান্যাল টাপুরের মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন।
‘রনজয় সেন। বয়স বাষট্টি। পেশায় ল-ইয়ার, যদিও দু বছর আগে স্ট্রোক হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর থেকে এখন রেগুলার প্র্যাকটিস করেন না। ভদ্রলোকের একটা ল-ফার্ম আছে সল্টলেকে। বেশ কয়েকজন জুনিয়ার কাজ করে ওঁর আন্ডারে। আপনি তো আমার সহকারী মৈথেলীকে চেনেন। ওরই বাবা।’
‘আই সি! কখন ঘটল ঘটনাটা?’
‘আজই। সকাল দশটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। আর ফেরেননি। ফোন সুইচড অফ। বাড়ির লোকেরা খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।’
‘আচ্ছা। অর্জুনের কাছে মিসিং কেসের সব ডিটেলস দিয়ে দিন। ও ওটা মিসিং পারসন স্কোয়াডে আর্জেন্ট বেসিসে কনভে করবে। আর অর্জুন, ঐ ডিপার্টমেন্টে তীর্থঙ্কর আছে। চেনো তো তুমি?’
অর্জুন উপর-নীচে মাথা নাড়ল। সে চেনে। জানে, মিসিং পারসন কেসে তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত ইজ দ্য বেস্ট। তাঁর মতো সোর্স কলকাতা পুলিশের খুব কম অফিসারের হাতেই আছে।
সৌরভ সান্যাল বললেন, ‘ওকে তুমি কেসটার ডিটেলস দিয়ে দাও। আমি ওকে ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি, আর্জেন্ট বেসিসে এই কেসটা টেকওভার করতে। ওর সঙ্গে টাচে থেকো তুমি।’
‘শিয়োর স্যার।’
টাপুর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সৌরভ সান্যাল এবার টাপুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখুন মিস ব্যানার্জি। রেজর কিলারের এই কেসটা যেরকমভাবে ঘনিয়ে উঠেছে, আর একটা মার্ডারও যদি হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের হাত গুটিয়ে নিতে হবে। এখন এই কেস কলকাতা পুলিশের সম্মানের প্রশ্ন। আপনি যা বলছেন, তা যদি সত্যি হয়, আমি সত্যিই আর ভরসা পাচ্ছি না। হাতে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়। আমরা জানি না কে খুন হতে যাচ্ছে! আমরা আমাদের মতো করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। সঙ্গে আমি নিজের দায়িত্বে আপনাকেও পূর্ণ স্বাধীনতা দিচ্ছি, পারলে খুনটা আটকান।
মাথা নাড়ল টাপুর। উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দনের জন্য হাত এগিয়ে দিল। তারপর বলল, ‘আপাতত আমার প্রথম কাজ হল সুবীরবাবুর সম্পর্কে তথ্য খুঁজে বের করা। সেটা যদি সম্ভব হয়, আমরা এগোতে পারব। না হলে আবার পথটা কানাগলির মুখে এসে থেমে যাবে।’
‘রাইট! অর্জুন, তুমি রেকর্ড সেকশনে এক্ষুনি যাও। দেখো কিছু পাওয়া যায় কি না! দরকার হলে নয়নকে সঙ্গে নিয়ে যাও। দেখো ও আইডেন্টিফাই করতে পারে কি না!’
‘আমিও কি সঙ্গে যেতে পারি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।
‘শিয়োর। অর্জুনের সঙ্গে যান আপনি। যা দরকার দেখে নিন। অল দ্য বেস্ট।’
সুবীর নামে মোট ঊনচল্লিশ জন প্রাক্তন পুলিশকর্মীর রেকর্ড পাওয়া গেল যারা গত পঁচিশ বছরে পুলিশে চাকরি করেছে, এবং কোনো না কোনো সময়ে লালবাজারে পোস্টিং ছিল।
অর্জুন বলল, ‘এদের মধ্যে কেউ সাসপেন্ড হয়েছিল কি না, বা রিটায়ারমেন্টের আগেই চাকরি ছেড়েছিল কি না দেখা দরকার।’
‘রাইট!’
রেকর্ড ডিপার্টমেন্টের কর্মী ভদ্রমহিলা অভিব্যক্তিহীন মুখে কিবোর্ড টিপে চলেছেন নির্দেশ অনুসারে। প্রয়োজনীয় তথ্যে মিল বা অমিল নিয়ে যেন তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। লালবাজারের মতো জায়গা, যেখানে রোজই নতুন নতুন ঘটনার ঘনঘটা, সেখানে বসে এমন অবিচল মুখে কাজ করে যেতে পারেন কী করে কে জানে, ভাবল টাপুর। মাথার উপরে উঁচু সিলিং থেকে লম্বা ডাঁটি থেকে ঘটংঘট শব্দে ঘুরছে ঠাকুরদা ফ্যান, যেন ভদ্রমহিলার গাম্ভীর্যের সঙ্গে যথাযোগ্য আবহ রচনা করে চলেছে।
‘দেখো, এদের মধ্যে পাঁচ জন কোনো না কোনো সময়ে সাসপেন্ড হয়েছে, ছয়জন সুবীর চাকরি শেষ হওয়ার আগেই মারা গেছে। তিন জন চাকরি ছেড়েছেন বা চাকরি চলে গেছে।’
‘গুড!’ বলল টাপুর। এদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি সাসপেন্ড ও হয়েছিলেন, এবং সাসপেন্ড অবস্থাতেই মারা যান?’
মোটামুটি মিনিট তিনেক সময় লাগল। পাওয়া গেছে। এরকম দুইজন সুবীর আছেন। একজন সুবীর সামন্ত, অপরজন, সুবীর পাল।
‘নয়ন, দেখো তো? চিনতে পারো কি না!’
নয়ন বেশ কিছুক্ষণ ছবিদুটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হতাশ মুখে মাথা নাড়ল। ‘এই ছবিদুটিই দুজনের কম বয়সের ছবি। আমি যখন সুবীরসজঠুকে দেখেছিলাম, তিনি ততদিনে মধ্যবয়স পার করে ফেলেছেন। আর মুখও ভালো করে মনে নেই এতদিন পর। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না স্যার।’
‘সময় নষ্ট করে লাভ নেই অর্জুন। এই দুজনেরই রেকর্ডস নিয়ে নাও। খোঁজ শুরু করতে হবে। সময় নেই সময় নষ্ট করার।’ বলল টাপুর।
৩৭
সুবীর পালের ঠিকানা লালবাজারের খুব কাছেই। পায়ে হেঁটে মিনিট দশেক লাগার কথা। বর্তমানে বাড়ির যিনি মালিক, তিনি সুবীরবাবুর পর দু-বার হাতবদলের পর কিনেছেন বাড়িটি। ফলে সুবীর পাল সম্পর্কে খুব বেশি খবর দিতে পারলেন না তিনি। বললেন, ‘আপনি পাশের বাড়িতে খোঁজ নিতে পারেন। ওঁরা এখানকার পুরোনো বাসিন্দা। আপনারা যাঁকে খুঁজছেন, তাঁকে চিনলেও চিনতে পারেন।’
পাশের বাড়িটি সত্যিই বেশ পুরোনো। দেখে মনে হয়, বাড়ির মালিকের আর্থিক অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। দেওয়ালে শ্যাওলা, এখানে সেখানে প্লাস্টার খসে পড়েছে। কলিং বেল বাজাতে এক খুনখুনে বুড়ি জানলার পর্দা সরিয়ে মুখে বের করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে র্যা? কী চাই?’
অর্জুন জানলার কাছে সরে গিয়ে বলল, ‘বাড়িতে কেউ আছে? একটু কথা বলতাম।’
‘কী কতা? আমিই আছি। আমাকে বলো।’
বুড়িকে দেখে বিশেষ আশা জাগল না। তবু বলল, ‘একটু বাইরে আসবেন? তাহলে কথা বলতে সুবিধে হত।’
বুড়ির মুখখানি করুণ হয়ে উঠল। বললেন, ‘আমাকে বাইরে থেকে তালা দিয়ে কাজে যায় ছেলে-বউ। আমি তো বাইরে বেরোতে পারব না বাবা।’
অর্জুন ও টাপুর দৃষ্টিবিনিময় করল নীরবে। টাপুর ইশারায় বুড়িকেই জিজ্ঞাসা করতে বলল অর্জুনকে।
‘আপনাদের পাশের বাড়িতে সুবীর পাল থাকতেন। আপনি চেনেন? ‘ বুড়ি একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘বুড়ো হয়েছি তো। অত নামধাম মনে থাকে না বাবা।’
অর্জুন দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল হতাশায়। বলল, ‘পুলিশে চাকরি করতেন উনি।’
‘হ্যাঁ, একজন পুলিশ তো থাকত ওই বাড়িতে। ভালো লোক। আমাকে মিষ্টি খেতে দিত। এরা আমাকে মিষ্টি দেয় না। কত করে বলি!’
‘মনে করে বলুন তো দিদা, ওই পুলিশ ভদ্রলোকের পরিবারে কে কে ছিল? ‘ পাশ থেকে টাপুর জিজ্ঞাসা করল।
‘তুমি কে গো মেয়ে? কী সোন্দর মুখখানা! আমিও যখন বে হয়ে এলাম, ওমনি সোন্দর ছিলাম। আমার উনি কইতেন, চাঁদমুখী বউ। সকলের সামনে আবার কথাই কইতেন না। তা তিনি ছেলেন মাস্টার মানুষ। ছাত্ররা খুব ডড়াত। বে-র পরে তো আমি ভয়েই মরি। পরে বুজিছি, ওঁর মতন নরম মানুষ হয় না কো। এই তোমরা একন এলে, আর একটু আগে এলে আমার বরের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে পারতুম।’
টাপুরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বোঝাই যাচ্ছে, এই মানুষটির কাছ থেকে বিশেষ কিছু জানা যাবে না। এঁর স্বামী হয়তো বলতে পারবেন কিছু। জিজ্ঞাসা করল, ‘উনি কখন আসবেন? দেরি হবে কি?’
বুড়ি একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘ছাত্র পড়াতে গেচে তো! এসে গা ধোবে। মুড়ি খাবে। মোটা মোটা বই পড়বে। সনঝে লাগবে। তাপ্পর আসবে।’
টাপুরের মুখের আলোটা নিভে গেল। বলল, ‘আপনি প্লিজ একটু মনে করে বলুন, ওই পুলিশ ভদ্রলোকের পরিবারে কে কে ছিল?’
‘পরিবার!’ বুড়ি একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘অনিতা। আমার কাছে আসে তো! কত গল্প করে। বাবা, তুমি আমার দরজার তালাটা খুলে দেবে?’
‘অনিতা কে?’
‘পুলিশের বউ।’
অর্জুন জানতে চাইল, ‘ছেলে ছিল কি ওদের? দুই ছেলে?’
বুড়ি কেমন বিহ্বলমুখে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর পরদাটা ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘তোমরা যাও। আমি ঘুমুব একন।’
অর্জুন-টাপুররা বেরোতে যাবে, দেখল একজন বয়স্কা মহিলা গেট ঠেলে বাড়িতে ঢুকছে। পরনে সস্তার সিন্থেটিক শাড়ি। চুলে পাক ধরেছে। মুখের চামড়া খসখসে কালো, বাজ পড়ে পুড়ে যাওয়া গাছের ছাল যেমন। পানের রসে মুখ লাল। ওদের দেখে ভুরু কোঁচকাল।
‘আপনারা?’
জবাব না দিয়ে অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কে? বয়স্ক মহিলা, তাকে এভাবে তালা বন্ধ করে রাখেন কেন সারাদিন?’
‘সারাদিন? কে বলেছে সারাদিন তালা দিয়ে রাখি?’ মহিলার ভুরুর ভাঁজ গভীরতর হল। মুখের রেখায় বিরক্তির ঝাঁঝ।
অর্জুন কিছু বলতে যাচ্ছিল। টাপুর তার হাত চেপে ধরল। কিছু না বলার ইশারা।
‘আপনি কে হন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।
‘আমি কমলা। এখানে আয়ার কাজ করি। দিনের আয়া। রাতে অন্যজন দেখে। পাড়ার মোড়ে পান কিনতে গেছিলাম। তালা দিয়ে না গেলে দরজা খুলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। কী করব?’
‘আপনি কি এই এলাকার মানুষ?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।
‘হ্যাঁ। কাছেই বাজারের মাঠে বাড়ি আমার। কেন?’ রুক্ষস্বরে জিজ্ঞাসা করল মহিলা।
‘পাশের বাড়িতে অনেক বছর আগে এক পুলিশ অফিসার থাকতেন। চেনেন? ‘কে? সুবীরবাবু?’
সোজা হয়ে দাঁড়াল টাপুর। অর্জুনের মুখেও উত্তেজনা। ‘হ্যাঁ। তিনিই। আপনি চেনেন? এখানে ওর পরিবারে কে কে ছিল বলতে পারেন?
‘কেউ ছিল না। একা থাকত।’
‘একা!’ আশ্চর্য হল টাপুর। বুড়ির জানলার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলল, ‘তবে যে উনি বললেন, বউ ছিল। নাম অনিতা। বললেন, ওঁর হাসব্যান্ড ফিরলে আরও ভালো করে বলতে পারবেন!’
কমলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ‘কেউ নেই। স্বামী মারা গেছে চল্লিশ বছর আগে। অনিতা ওর নিজের মেয়ের নাম। সেও আর নেই। গত বছর হার্ট অ্যাটাকে ঘুমের মধ্যেই শেষ। এক ছেলে আছে। দিল্লিতে থাকে পরিবার নিয়ে। এখানে টাকা পাঠিয়ে দেয়। আমরা দেখাশোনা করি। নিজে আসে না। খবরও নেয় না। মাথার ঠিক নেই মাসিমার। সব গুলিয়ে ফেলেন আজকাল।’
অর্জুন প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল, ‘আপনি সুবীরবাবু সম্পর্কে আর কিছু বলতে পারবেন?
কমলা বলল, ‘আপনারা কে? এতদিন পর সুবীরবাবুর খোঁজ নিচ্ছেন যে?’
অর্জুন গম্ভীরমুখে বলল, ‘পুলিশ।’
পুলিশের নাম শুনে কমলার মুখের ভাবে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। বলল, ‘অ! সুবীরবাবুও পুলিশ ছিলেন। এখানে থাকতেন। আমি ঘরের কাজকম্ম করে দিতাম। ঘর মোছা, বাসন মাজা, কাপড় ধোয়া-পাকলা করা, এসব। ভালো মানুষ ছিলেন। আমরা কাজ করে খাই। পুরুষ মানুষের চোখের দিরিষ্টি পড়তে পারি। সুবীরবাবু কোনোদিন কুনজর দেননি। তারপর চাকরি চলে গেল।
‘সাসপেন্ড হয়েছিলেন।’ বলল অর্জুন
‘অ্যা! লোকে যে বলে ঘুষ নিয়ে চাকরি গেছল। আমি অত জানি না। একদিন আমাকে ডেকে বললেন, আমি এখেনে থাকব না কমলা। আমাকে এক হাজার ট্যাকা দেলেন। কোথায় চলে গেলেন। তারপর কদিন পরে আবার এলেন। বাড়ি বিক্রি করে আবার চলে গেলেন। আর জানি না।’
‘তার পরিবারে কেউ ছিল না? আপনি ঠিক জানেন?’
‘জানব না? থাকলে জানতে পেতাম না! একদম একা-বোকা মানুষ ছিলেন। ভালো মানুষ।’
ভেতর থেকে বুড়ি খুনখুনে গলায় হাঁক পাড়লেন
‘কে রে অনিতা? কদ্দিন পরে এলি। দ্যাখ তো তোর মেসোমশাই এখনও আসে না কেন!’
কমলা একবার অর্জুনের মুখের দিকে তাকাল। তারপর বারান্দা দিয়ে উঠে ভেতরে চলে গেল।
৩৮
পরবর্তী গন্তব্য সুবীর সামন্তের বাড়ি। শেয়ালদা স্টেশনের গায়েই দোতলা বাড়িটি। ভগ্নপ্রায় দশা। খুঁজে দেখা গেল, কলিং বেল বলে কিছু নেই। মরচে ধরা কড়া বেশ কয়েকবার সশব্দে নাড়ার পর ভেতর থেকে মনুষ্যকণ্ঠের সারা মিলল। মুহূর্ত পরেই দরজাটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। দরজার ওপারের মধ্যবয়সি ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাকে চাই?’
ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর কেমন ভাঙা ভাঙা। বেশ লম্বা। বয়স চল্লিশের আশেপাশে হবে। পরনে পাজামা। উর্দ্ধাঙ্গ অনাবৃত।
‘এটা কি সুবীর সামন্তের বাড়ি?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘তাঁকে কী দরকার?’
‘তাঁকে ঠিক এই মুহূর্তে দরকার নেই। যদ্দুর জানি, তিনি বেঁচেও নেই। আপনি কে হন সুবীরবাবুর?’ উত্তাপহীন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘ছেলে। কেন?’ ভদ্রলোকের চোখেমুখে বিরক্তির চিহ্ন।
‘আপনিই বাবলুবাবু তো?’ হঠাৎ করে পাশ থেকে বেমক্কা প্রশ্ন করে বসল টাপুর। লোকটা খানিক হকচকিয়ে গেল। তারপর নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘কে বাবলু? আমি কোনো বাবলুকে চিনি না।’
অর্জুন এবার নিজের পুলিশের পরিচয়পত্র বের করে দেখাল।
‘লালবাজার থেকে আসছি। বসে কথা বলতে পারলে ভালো হয়।’
লোকটার চোখেমুখে নিমেষে অনেকরকম অভিব্যক্তি খেলে গেল। তারপর বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন। আমি শার্টটা পরে আসছি। ভেতরে মা আছেন। পুলিশ দেখলে ভয় পাবে। বাইরে সামনের চায়ের দোকানে বসে কথা বলছি।’
কবজি উলটে ঘড়ি দেখল অর্জুন। দুপুর দুটো বাজে। বলল, ‘তাড়াতাড়ি করুন যা করবেন। আমাদের হাতে সময় নেই।
‘এখনই আসছি।’ বলে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন ভদ্রলোক। অর্জুন ও টাপুর অপেক্ষা করতে লাগল।
‘এত সময় লাগছে কেন অর্জুন?’ টাপুরের কণ্ঠস্বরে অস্থিরতা।
তাই তো! এত সময় তো লাগার কথা নয়। একটা শার্ট গলাতে কতক্ষণ লাগে। কড়া নাড়ল অর্জুন। কোনো সাড়া এল না ভেতর থেকে। আবারও কড়া নাড়ল। আরও জোরে।
‘দরজা ভাঙো!’ টাপুরের গলায় নির্দেশের সুর।
পুরোনো পলকা কাঠের দরজা। নীচের দিকে ক্ষয়ে গেছে। কাঠে ফাঁটল ধরেছে। দু-চারটে ধাক্কাতেই পুরো দরজাটা মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। ছুটে গিয়ে ভেতরে ঢুকল দুজনে। কেউ নেই। পেছনে রান্নাঘরের পাশে দরজা খোলা। পেছনের দেওয়াল আধ মানুষ উঁচু। ডিঙোনো কঠিন কিছু নয়।
‘পাখি পালিয়েছে।’বলল টাপুর। অর্জুন ছুটে গিয়ে এক লাফে দেওয়াল ডিঙোল নিজেও। দৌঁড়ে গেল বড়ো রাস্তা অবধি। কোথাও পাওয়া গেল না সুবীর সামন্তের ছেলেকে। ব্যাপার দেখে পাড়ার আশেপাশের কিছু কৌতূহলী লোক জড়ো হয়েছিল। অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘এই বাড়িতে কে কে থাকে?’
এক মুরুব্বি গোছের বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘কেউ থাকে না। শুধু অতীন থাকত। বাপ, মা তো আগেই গেছে। আর কে থাকবে?’
‘অতীন? ওর ডাক নাম কি বাবলু?’ জানতে চাইল অর্জুন।
‘তা তো বলতে পারব না। অতীন বলেই তো ডাকে সবাই। এক নম্বরের জোচ্চোর।’
‘কী করে এই অতীন?’
‘কী করে না তাই বলুন না? জুয়া, মেয়েমানুষের দালালি, আরও সবরকম গুণ আছে। যেমন বাবা, তেমনই ছেলে।’
‘কেন? সুবীরবাবু কেমন মানুষ ছিলেন?’
‘ছেলের মতোই। ঘুষ খেতে গিয়ে ধরা পড়ে সাসপেন্ড হল তারপর। একদম বাজে লোক। মদ খেয়ে রোজ বউ পেটাত।’
অর্জুন ও টাপুর নীরবে দৃষ্টিবিনিময় করল। বলল, ‘অতীনের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক কেমন ছিল?’
মুরুব্বি ভদ্রলোক ঘাড় নাচালেন। বললেন, ‘সে আমরা ঘরের কথা কীভাবে জানব। তবে সামনাসামনি কোনো সমস্যা দেখিনি।’
টাপুর জিজ্ঞাসা করল, ‘অতীনের এক ভাই ছিল না?’
‘ছিল তো…’
ভদ্রলোকের মুখের কথা টেনে নিয়ে অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘এই অতীনকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে বলতে পারবেন কেউ?’
পেছন থেকে একটা অল্পবয়সি ছেলে এগিয়ে এল। লক্কা পায়রার মতো লাল রঙের চুলের ছাট। বলল, ‘ঘোষবাগানের বস্তিতে গিয়ে খোঁজ করুন। ওখানে ওর ইয়ারদোস্ত থাকে। ওখানে নেশাভাঙ করে। গেলে ওখানেই যাবে।’
‘চলো টাপুর,’ বলে টাপুরের হাত ধরে টানল অর্জুন। দুজনে দ্রুত গাড়িতে গিয়ে বসল। অর্জুনের হাত মুঠো, শিরদাঁড়া সোজা করে বসে আছে। চোখেমুখে উদ্বেগের চিহ্ন স্পষ্ট।
‘চিন্তা কোরো না। আমরা ধরে ফেলব।’ বলল টাপুর।
অর্জুন নীরবে মাথা নাড়ল। তার চোখের দৃষ্টি রাস্তার উপর নিবদ্ধ।
‘একটু তাড়াতাড়ি চালাও নয়ন।’
অর্জুন জানে নয়ন সাধ্যমতো দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছে। কলকাতা শহরের রাস্তায় এর চেয়ে তাড়াতাড়ি চালানো অসম্ভব। তবুও বলে। ঘোষবাগানের বিএ ব্লকের এই বস্তিটির বেশিরভাগ অধিবাসীই রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে ট্রেনের কুলিরা যেমন থাকে, তেমনই বাস করে হকার থেকে পকেটমার। বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত। সরু সরু গলি-ঘুপচি। গলির মাঝেই আড়াআড়ি করে দড়িতে কাপড় শুকোচ্ছে। টাইমকলের মুখখানা কে কবে খুলে নিয়েছে কে জানে! অবিরল ধারায় জল বয়ে চলেছে। পুরো অঞ্চলটা কর্দমময়। আশেপাশের লোকেদের অবশ্য সে নিয়ে ভ্রূক্ষেপ নেই। মহিলারা মধ্যদুপুরে মুখোমুখি ঘরের দুয়ারে বসে গজল্লা করছে। টাপুরকে দেখে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ঘুরে তাকাচ্ছে কেউ কেউ।
‘এখানে অতীনকে কোথায় খুঁজবে অর্জুন? জায়গাটা নেহাত ছোটো তো নয়! বলল টাপুর।
‘ছোটো নয়। তার চেয়েও বড়ো কথা হল, জায়গাটা আমাদের চেয়ে ঢের ভালো ওই লোকটা চেনে। আমাদের ওকে খুঁজে বের করার অনেক আগে ও খবর পেয়ে যাবে। তবে একটা উপায় আছে। দাঁড়াও, এক মিনিট।’ বলে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করল অর্জুন। একটু দূরে দাঁড়িয়ে কিছু কথা বলল। তারপর মোবাইলটা পকেটে রেখে টাপুরের কাছে ফিরে এসে বলল, ‘চলো। সোজা উত্তরের দিকে একটা ওয়াটার ট্যাঙ্ক আছে। ওদিকে যেতে হবে।’
‘ওখানে আছে অতীন?’
‘থাকলেও থাকতে পারে। শিয়োর অবশ্যই নই। আমার এক সোর্স থাকে এই বস্তিতে। সেই জানাল, ওদিকটাতে সমাজবিরোধীদের আখড়া। নেশাভাঙ চলে দেদার। চলো।’ বলে নিজেই এগোল সে। টাপুর একটু দ্বিধাগ্রস্থমুখে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর অর্জুনকে অনুসরণ করল।
৩৯
ট্যাঙ্কের নীচে বেশ মজলিশ সাজিয়ে বসা হয় প্রায়ই, তা এক নজরে দেখলেই মালুম হয়। মাদুর পাতা। এক সিগারেটের খালি প্যাকেট, মদের বোতল, ভাঙা গ্লাসের ঢিপি। এক পাশে রোল সিগারেটের একটা খালি প্যাকেট, পাশে কয়েকটা পাতলা কাগজ পড়ে আছে। একটা তুলে নিয়ে নাকে ঠেকাল অর্জুন। তারপর আশেপাশে তাকাল। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
টাপুর লক্ষ করল একটু দূরে একটা পনেরো ষোলো বছর বয়সি ছেলে দাঁড়িয়ে তাদেরই দেখছে। টাপুর হাত তুলে ডাকল, ‘এই ভাই শোনো।’
ছেলেটা চমকে উঠল। তারপরেই দে দৌড়। টাপুর প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে পেছনে ছুটল ছেলেটার। অলিগলি ভেঙে ছুটছে ছেলেটা। সে এখানকার রাস্তা চেনে হাতের তালুর মতো। টাপুরের ক্ষেত্রে তা তো নয়। ফলে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে। যে মুহূর্তে মনে হতে লাগল ছেলেটাকে আর ধরতে পারবে না, ঠিক তখনই দেখল ছেলেটা ছিটকে পড়েছে রাস্তার উপর। সামনে গলির মুখে পাহাড়ের মতো পথরোধ করে দাঁড়িয়ে অল্প অল্প হাঁফাচ্ছে অর্জুন। তারই ধাক্কায় পড়ে গেছে ছেলেটা। অর্জুনকে সে সামনে আশা করেনি।
টাপুর এগিয়ে ধরে ছেলেটাকে টেনে তুলল। রোগা বুকটা হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে। হাঁটু আর কনুইয়ের কাছটা ছড়ে গেছে। জিজ্ঞাসা করল, ‘খুব লেগেছে রে?’
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
‘কী নাম তোর?’
‘বিজু।’ মাথা নীচু করে অশ্রুতপ্রায় কণ্ঠে বলল ছেলেটা।
‘দৌড়োচ্ছিলি কেন?’
বিজু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল উত্তর দিল না।
‘বল, কেন দৌড়োচ্ছিলি? ওদের কাছে খবর দিতে?’
বিজু তবুও চুপ। অর্জুন এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। টাপুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব নরম গলায় বলল, ‘ওই যে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, উনি পুলিশের লোক। বুঝলি? শুধুমুধু ফেঁসে যাবি। এমনিতে কিছু হবে না তোর। জেল টেল হওয়ার চান্সই নেই। কিন্তু পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা, সেটা জানিস তো? তোকে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে না। থানায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখবে ঘন্টার পর ঘন্টা। তোকে দিয়ে কথা ওগড়ানোর জন্য মারধোর করবে হয়তো। এবার দেখ, সবাই তো সমান নয়। পুলিশের চাকরিতে ভালো মানুষ, খারাপ মানুষ আছে। সেরকম কারো হাতে পড়লে তোর কী দশা হবে ভেবে দেখ। হাজারটা সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হয় ওদের। হয়তো তোর উপর একটা চুরি বা ছিনতাইয়ের কেস ঝুলিয়ে দিল। তখন? উকিল জোটাতে পারবে তোর বাড়ির লোক? হোমগুলোর অবস্থা জানিস?’
অনেকক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলে কিছুটা হাঁফিয়ে গেছিল টাপুর। এবার নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য থামল। গভীর দৃষ্টিতে তাকাল ছেলেটার মুখের দিকে। খড়ি ওঠা মুখ, চোখদুটো ভাসা ভাসা। হঠাৎ করে খুব মায়া হল টাপুরের। মনে পড়ে গেল লালনের মুখটা। অরগ্যান ট্র্যাফিকিং চক্রের হাতে পড়েছিল লালন। ওর একটা কিডনি কেটে নিয়েছিল ওরা। সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেও ধরা পড়ে গেছিল। কলকাতা পুলিশ টাপুরেরই সহযোগিতায় পুরো চক্রটাকে ধরতে পেরেছিল, যদিও পালিয়ে গেছিল ওদের মাস্টারমাইন্ড। লালন এখন ভালো আছে। টাপুরের বন্ধু উত্তীয় ওর দায়িত্ব নিয়েছে। আগামী বছর মাধ্যমিক দেবে লালন।
অর্জুন এবার বিজুর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ওদের ডেরাটা কোথায়? যদি বলে দিস, ছেড়ে দেব তোকে। নইলে…’
বিজু এখনও হাঁফাচ্ছে। বলল, ‘খালের পারে। হুই উত্তুরে। খালিদ চাচার সাইকেল রিপেয়ারিং-এর দোকানের পেছনে।’
‘অতীনকে চিনিস?’
মাথা নাড়ল বিজু। অর্থাৎ সে চেনে।
‘এসেছে আজ এখানে?’
আবারও উপর-নীচে মাথা নাড়ল সে।
অর্জুন টাপুরের দিকে তাকাল। টাপুর মাথা নাড়ল।
‘সঙ্গে চল। আমাদের পথ দেখিয়ে দিবি।’
‘আমাকে ছেড়ে দ্যান। আমাকে ওরা মারবে।’ কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল বিজু।
অর্জুনের কণ্ঠস্বর কঠিন হল। বলল, ‘না গেলে আমি মারব। তুই দূর থেকে দেখিয়ে চলে আসবি। বাকিটা আমরা সামলে নেব।’
টাপুর অর্জুনের কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল, ‘ওখানে বেশি লোক থাকতে পারে অর্জুন। আমাদের দুজনের এভাবে যাওয়া ঠিক হবে না। নিয়ারেস্ট থানা থেকে ফোর্স ডেকে নাও।’
অর্জুন একটু ভাবল। বলল, ‘এম জি রোড থানায় সঞ্জয়বাবু আছেন। ফোন করে দিলে বেশি সময় লাগবে না আশা করি।’
‘তাই করো তাহলে।’
সঞ্জয়বাবু থানাতেই ছিলেন। অর্জুনের ফোন পেয়ে বললেন, ‘আমরা দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছোচ্ছি, স্যার। আপনি একা একা রিস্ক নেবেন না। এদের এলেবেলে মস্তান ভাববেন না। ওই এলাকায় ড্রাগের খুচরো ব্যাবসা চলে। আমসও থাকতে পারে। আপনি অপেক্ষা করুন প্লিজ।’
‘আসুন আপনি।’ বলে ফোনটা রেখে দিল অর্জুন।
‘কী বললেন? আসছেন?’ জানতে চাইল টাপুর।
‘মাথা নাড়ল অর্জুন।’
অর্জুনের ফোন বাজছে। তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত।
‘হ্যালো!’
‘অর্জুন। আমার এক সোর্স রণজয় সেনকে ঘন্টা দুয়েক আগে মালিকতলার দিকে একটা ভ্যানে দেখেছে সিগনালে। পেছনের সিটে ঘুমিয়ে ছিলেন। সম্ভবত অজ্ঞান ছিলেন। গাড়ি চালাচ্ছিল যে, সে কালো হুড়ি পড়ে ছিল। আমরা সিগনালের সিসিটিভি ফুটেজ বের করেছি। মারুতি ভ্যানটাকে আইডেনটিফাই করা গেছে। কিন্তু নেমপ্লেট ভুয়ো। জোড়াসাঁকোর কাছে একটা গলির ভেতর ভ্যানটাকে দাঁড়ানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে ওই জায়গাটাতে রাস্তায় কোনো সিসিটিভি নেই। ফলে রণজয় সেনকে গাড়ি থেকে বের করার পর কোথায় ও কীভাবে নিয়ে গেছে, সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। আমি খুঁজে দেখছি, আশেপাশে কোথাও কোনো দোকানে সিসিটিভি পাওয়া যায় কি না! আপডেট জানাচ্ছি।’
অর্জুন ফোন রেখে দেখল টাপুর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবটুকু খুলে বলল সে টাপুরকে। বলল, ‘চিন্তা কোরো না। কাকুকে ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে। তীর্থঙ্কর দাশগুপ্তর হাতে যখন কেস গেছে, একদম নিশ্চিন্ত থাকো। উনি ডিপার্টমেন্টের অ্যাসেট।’
মাথা নাড়ল টাপুর। অর্জুন যতই প্রবোধ দিক, দুশ্চিন্তাটা একেবারে ঝেড়ে ফেলতে পারছে কই! কাকুর কিছু হয়ে গেলে মিতুলের কাছে মুখ দেখাবে কীভাবে! কীভাবে বলবে তাকে যে কাকুকে খোঁজার দায়িত্ব অন্য কারোর কাঁধে ছেড়ে সে রেজার কিলারকে খুঁজতে ব্যস্ত ছিল! একটা তীক্ষ্ণ, তীব্র অপরাধবোধ মনের ভেতর ঘুণপোকার মতো আঁচড়াচ্ছে! ভালো লাগছে না। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। এমন উভয়সঙ্কটে টাপুর এর আগে কখনও পড়েনি।
