৪০
সর্পিল গলিটির দুপাশে জমে রয়েছে আবর্জনার ঢিপি। দু-চারটে দোকান ছাড়া আর কিছু নেই এই গলিতে। এই মধ্যদুপুরে সেই দোকানগুলোও বন্ধ। একটি দুটিতে দোকানি বসে ঝিমোচ্ছে। একটা কুকুর ঘুমোচ্ছিল পথের ঠিক মাঝখানটিতে শুয়ে। পায়ের শব্দে সচকিত হয়ে উঠে বসল। ঘুম চোখে একবার পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে দু-বার ভৌ ভৌ করে প্রতিবাদ জানাল। তারপরে ল্যাজ নামিয়ে সরে গিয়ে একটা দোকানের গা ঘেঁষে বসে বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে রইল দলটার দিকে।
সঞ্জয় পাল সঙ্গে আরও তিনজন পুলিশকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ‘থানায় ফোর্স নেই স্যার। বেশিরভাগেরই নাইট ডিউটি চলছে। এই রেজর কিলারের জ্বালায় দিনের বেলা থানায় ঘুঘু চড়ে। যেন কলকাতা শহরে দিনের বেলায় ক্রাইম বন্ধ হয়ে গেছে। গত চার রাত ভালো করে ঘুমোতে অবধি পারিনি।’
অর্জুন মাথা নাড়ল। সে জানে, তাদের সকলেরই এক অবস্থা। মহানগরের প্রতিটি থানায় এখন একটাই আলোচ্য বিষয়।
‘কিছু খোঁজ মিলল স্যার? তখন ফোনে কী যেন বলছিলেন! এখানে কি… অর্জুন ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াল। বলল, ‘একটা লিড পেয়ে এসেছি। আমাদের ধারণা যদি সত্যি হয়, আজ রাতে রেজর কিলার আবার একটা খুন করবে।’
‘আবার? কী সর্বনাশ! গতকালই তো…,’ সঞ্জয়বাবুর মুখের রেখায় নিখাদ বিস্ময়।
‘চলুন। একদম তৈরি থাকুন। ভেতরে কজন আছে আমরা জানি না। সাবধানে যেতে হবে। এদের হাতে অস্ত্র থাকতে পারে।’
‘এখানে কি রেজর কিলার আছে?’
‘থাকতে পারে। নাও থাকতে পারে। আমরা জাস্ট একটা চান্স নিচ্ছি।’
‘ঠিক হ্যায়। চলুন স্যার। আজ রেজর কিলারের একদিন কি কলকাতা পুলিশের একদিন।’
কয়েক পা এগোতেই চায়ের দোকানটা চোখে পড়ল। এখন বেলা সাড়ে তিনটে। চায়ের দোকানে ভিড় জমে ওঠার সময় হয়নি এখনও। অর্জুন দলের সামনে থেকে এগোচ্ছে।
‘সঞ্জয়বাবু, আমি ঢুকব। আপনি আমাকে কভার করবেন। বাকিরা বাইরে থেকে ঘিরে ফেলুন। টাপুর, তুমি এখানে এসো না। চায়ের দোকানে অপেক্ষা করো। এটা পুলিশি অপারেশন।
‘হ্যাঁ স্যার। হ্যাঁ স্যার। একদম স্যার।’ সঞ্জয়বাবু অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে হয়ে দাঁড়ালেন। টাপুরও আপত্তি করল না।
অর্জুন আর তার পিছু পিছু সঞ্জয় পাল চায়ের দোকানটা ডান হাতে রেখে এগোল। টিনের চালাটার দরজা ভেজানো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ভেতর থেকে বন্ধ নয়। অতীন সামন্ত সম্ভবত আশা করেনি যে তাকে তাড়া করে পুলিশ এত দূরে এসে পৌঁছোবে। তাই হয়তো এই অসাবধানতা। অর্জুন পকেট থেকে সার্ভিস রিভলভার বের করে এগোল।
ভেতরে খুব কম শক্তির একটি হলদেটে আলো জ্বলছে। সেই আলো ভেতরের অন্ধকারকে দূর করার বদলে আরও যেন ঘনিয়ে তুলেছে। ঘরে কোনো জানলার বালাই নেই। গুমোট, তেজালো, একটা ভীষণ চেনা গন্ধ। এখানে মিউ মিউ-এর নেশা চলে, তা গন্ধ শুঁকেই যে কেউ বলে দিতে পারে। মিউ মিউ, অর্থাৎ মেফিড্রান। দামে কোকেন বা হেরোয়িনের চেয়ে সস্তা। চাহিদাও প্রচুর, বিশেষত কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। কলকাতা পুলিশ বারবার বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর পেয়ে অনেক অভিযান করেছে। সারা কলকাতা জুড়ে ছড়ানো অনেক ঘাঁটি ভেঙেছে। ডিলারদের অ্যারেস্ট করেছে। কিন্তু এখানকার কথা তাদেরও গোচরে ছিল না। এমনকি, অর্জুনের বিশ্বস্ত খবরিও বেমালুম চেপে গিয়েছিল। কেন, কে জানে! হয়তো তারও কিছু শেয়ার আছে!
মেঝেতে মাদুর পাতা। তার উপর ছড়ানো তাস। অর্থাৎ একটু আগে পর্যন্ত এখানে কেউ ছিল।
‘স্যার, এখানে তো…’
‘শশশ!’ ঠোঁটে আঙুল স্পর্শ করল অর্জুন। ঘরের পাশেই আরেকটি ঘর রয়েছে। ছোটো দরজাটা এতক্ষণ অন্ধকারে চোখে পড়েনি।
‘ওদিকে। কুইক!’ ফিসফিস করে বলল অর্জুন।
পা টিপে টিপে দুজন দরজা দিয়ে বেরোতেই ভীষণ শক্তিশালী একটা ঘুষি এসে পরল সঞ্জয়বাবুর চোয়াল লক্ষ করে। তিনি চোয়াল চেপে ধরে আঁক করে বসে পড়লেন মেঝেতে। দুটো লোক ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে পেছনের দরজা দিয়ে। অর্জুন একবার সঞ্জয়বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে ছুটে গেল ওদের পিছু পিছু। বেশি ছুটতে হল না। সামনের উপুর হয়ে মাটিতে পড়ে গোঙাচ্ছে দুজন। একজনকে চিনতে অসুবিধে হল না অর্জুনের। অতীন সামন্ত। ওদের সামনে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে টাপুর নিজের কবজিতে হাত বোলাচ্ছে।
‘লাগল, না?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘একটু। টান লেগেছে বোধ হয়। কিছু হবে না।’ ঝকঝকে চোখে তাকিয়ে বলল টাপুর, ‘সঞ্জয়বাবু কোথায় গেলেন?’
‘ভেতরে আছেন। একটু চোট পেয়েছেন।’ বলে পকেট থেকে হুইসিল বের করে ফুঁ দিল অর্জুন। সঞ্জয়বাবুর টিম ছুটে এল অকুস্থলে।
‘এদের নিয়ে গাড়িতে তোলার ব্যবস্থা করুন। সাবধান। হাড়বজ্জাত এরা। সুযোগ পেয়েই পালাবে। আগে হ্যান্ডকাফ লাগান।’
অর্জুন টাপুরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চলো। ভেতরে চলো। সঞ্জয়বাবুর আবার কী হল দেখে আসি।’
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল সঞ্জয় পাল হাসিমুখে এগিয়ে আসছেন। এক হাতে চোয়াল চেপে ধরা। অন্য হাতে কী একটা দোলাতে দোলাতে আসছেন।
‘দেখুন স্যার, কী পেয়েছি!’
অর্জুন ও টাপুর কৌতূহলী মুখে তাকাল। সঞ্জয়বাবুর হাতে ধরা দুটো হট ওয়াটার ব্যাগ।
অর্জুন মুখ টিপে হাসল। বলল, ‘দুটোই ফুল লোডেড?’
‘ইয়েস স্যার। দুটো মিলে অন্তত কেজি দুয়েক তো হবেই।’ সঞ্জয়বাবুর মুখে রাজ্যজয়ের হাসি।
‘কী আছে এগুলোতে?’ টাপুর জানতে চাইল।
‘ড্রাগস। মেফিড্রন।’
টাপুর চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাল। একটু চুপ করে থেকে চিন্তিত মুখে বলল, ‘তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল অর্জুন?’
‘কী?’
‘তার মানে অতীন সামন্ত কি এই ড্রাগের জন্য পালাচ্ছিল? মানে ও ভেবেছিল পুলিশ ওর ড্রাগ ডিলিং-এর ব্যাপারে জেনে ফেলেছে। রেজর কিলার কেসের সঙ্গে অতীন সামন্তের আদৌ কোনো যোগ আছে তো?’
সঞ্জয় পাল হতাশমুখে হাই তুললেন। বললেন, ‘এই রেজর কিলার বাঁচতে দেবে না মশাই। আমরা পুলিশরা কি মানুষ নই? ঘর-সংসার নেই আমাদের? ধুর ছাই, এমন চলতে থাকলে চাকরি-বাকরি ছেড়ে ঝোলা কাঁধে হিমালয়ে চলে যাব। আর ভালো লাগে না।’
এত মানসিক চাপের মধ্যেও সঞ্জয়বাবুর কথায় অর্জুন ও টাপুর দুজনেই হেসে উঠল। অর্জুন টাপুরকে দেখিয়ে বলল, ‘এঁর সঙ্গে আপনার পরিচয় করানো হয়নি। ইনি…’
‘চিনি স্যার। দেখেই চিনেছি। সংঘমিত্রা ব্যানার্জি। মাঝে মাঝে পুলিশের রথের চাকা তুলতেও ম্যাডামের মতো মহারথীদের প্রয়োজন হয়। অমিয় চক্রবর্তী মার্ডার কেসটা ম্যাডাম যেভাবে সলভ করলেন, আর ওই যে অরগ্যান ট্র্যাফিকিং-এর সেই কেসটা, যেখানে আমাদের হোম সেক্রেটারি জড়িত ছিলেন, উফফ! ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় মশাই।’
টাপুর লজ্জা পেল। টাপুর বিব্রত বোধ করল। আজকাল অর্জুনের সামনে কেউ তার প্রশংসা করলে অস্বস্তি হয়। মনে হয় অর্জুনের ভাগের কৃতিত্বে সে ভাগ বসাচ্ছে। অর্জুন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট। সে পরিশ্রমী, বুদ্ধিমান। নিজের কাজের প্রতি একশো শতাংশ সমর্পিত সে। কিন্তু চাকরি তো চাকরি। আর পুলিশের চাকরির মতো ‘থ্যাঙ্কলেস জব’ খুব কমই হয়। ছুটিছাটা নেই। চাকরির কোনো নির্দিষ্ট ওয়ার্কিং আওয়ার নেই। প্রাণের ঝুঁকি থাকে। প্রিয়জনকে তাদের প্রাপ্য সময়টুকু দিতে না পারার অপরাধবোধ, গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয়। এত কিছুর পরেও পান থেকে চুন খসলে ব্যঙ্গবিদ্রূপের কাঁটা ধেয়ে আসে। সবসময় মিডিয়ার আতসকাচের তলায় থাকতে হয় তাদের।
টাপুর সেই তুলনায় স্বাধীন। কেউ তাকে কাজ করার বা না করার জন্য জোর করে না। সে তার মর্জিমতো কেস নিতে পারে। এইমাত্র সঞ্জয়বাবু যে কেসগুলোর কথা বললেন, অর্জুনের সাহায্য ছাড়া কোনোটাতেই একটুও এগোতে পারত না টাপুর। তারপরেও লোকে সংঘমিত্রা ব্যানার্জির নাম জানে। তার পসার বাড়ে। অথচ অর্জুন বা অর্জুনদের মতো অনেকে রয়ে যায় ছায়ার তলে।
এখন সেই কথাটাই বলল টাপুর। বলল, ‘এতটা বলবেন না সঞ্জয়বাবু। আপনারা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর যে কাজ করে চলেছেন, তা আর কেউ না জানুক, আমি অন্তত জানি। আপনাদের কাজটা অনেক, অনেক বেশি কঠিন। পুলিশের সাহায্য ছাড়া আমি কেউ নই। কিছু নই।’
সঞ্জয় পালের মুখের রেখাগুলো নরম হয়ে এল। ভদ্রলোক সম্ভবত একটু বেশি আবেগপ্রবণ। তারপরেই স্মিত হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে ‘বাও’ করলেন নাটকীয় ভঙ্গীতে।
‘থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম!
অর্জুন এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল, ‘ব্যস ব্যস, হয়েছে। এবার কাজে লেগে পড়া যাক।’
সঞ্জয়বাবু এখনও চোয়াল চেপে ধরে আছেন। সেভাবেই বললেন, ‘ইয়েস স্যার।’
‘খুব লেগেছে?’ নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘খুব স্যার। মাড়ির দাঁত নড়ে গেল। হতচ্ছাড়া বদমাশ। এদের আপনি আমার হাতে ছেড়ে দিন। ওই সামন্তর পো-র সবগুলো দাঁত যদি না তুলেছি তো আমার নামও…’
‘আচ্ছা আচ্ছা বেশ, এক কাজ করুন, সঞ্জয়বাবুকে থামিয়ে মুচকি হেসে বলল অর্জুন, ‘অতীন সামন্তকে নিয়ে আপনার থানায় চলে যান। আপনাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া রইল। যেভাবে পারেন, ওর পেট থেকে কথা বের করুন। সময় খুব কম। বুঝতে পারছেন তো আপনি?’
‘পারছি স্যার। আপনি ভাববেন না। আমি আপনাকে জানাচ্ছি।’
৪১
সঞ্জয়বাবু অতীন সামন্ত ও তার স্যাঙাতকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আধ ঘন্টা পর ফোনটা এল অর্জুনের ফোনে। ডক্টর আঙ্কল।
‘একটা খবর আছে, অর্জুন। ভালো না খারাপ জানি না। তোমার পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু অবস্থা ভালো না। তুমি চাইলে আসতে পারো। তবে লাভ কিছু হবে কি না বলতে পারছি না।’
হাসপাতালে পৌঁছোতে বেশি সময় লাগল না। ডক্টর মজুমদার অর্জুনের অপেক্ষাতেই ছিলেন। টাপুরকে সঙ্গে দেখে একটু অবাক হলেন সম্ভবত। অর্জুন পরিচয় করিয়ে দিতে খুব অবাক হয়ে বললেন, ‘আরে, ওঁকে তো আমি চিনি। অরগ্যান ট্র্যাফিকিং কেসে ওঁর সম্পর্কে খবরের কাগজে পড়েছি। কিন্তু এ তো একদম বাচ্চা মেয়ে!’
সতীনাথবাবুর কথা বলার ধরণে হেসে উঠল টাপুর। লম্বা চওড়া স্বাস্থ্যবান মানুষটা টাপুরের পরিচয় পেয়ে শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠেছেন। কিছু মানুষ থাকে যাদের ব্যক্তিত্বে একটা পিতৃসুলভ স্নেহময় ব্যাপার থাকে। সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক। কপালের ডানপাশে জ্বলজ্বলে লাল আঁচিল। ভদ্রলোককে বেশ ভালো লেগে গেল টাপুরের। জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার পেশেন্টের কী খবর এখন?
সতীনাথবাবু বললেন, ‘আসুন না। নিজেই এসে দেখুন। অর্জুন, তুমিও এসো।’
ওমরের সুরক্ষার জন্য বিশেষ কেবিনের ব্যবস্থা হয়েছিল। সেখানেই শুয়ে আছে ওমর।
‘ওমর, দেখো কে এসেছে! তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান ওঁরা।’ বিছানার পাশে গিয়ে নরম স্বরে ডাকলেন ডক্টর মজুমদার। লাভ হল না কিছু। বেশ কয়েকবার ডাকার পর সামান্য চোখ খুলল সে। অর্জুনকে সামনে দেখেই যেন চমকে উঠল ওমর। খুব উত্তেজিত হয়ে কিছু যেন বলতে চাইল। মুখের ডানদিকটা একেবারেই বেঁকে গেছে। ঠোঁটের কষ বেয়ে লালা গড়াচ্ছে। কথা জড়িয়ে গেছে।
‘বিলাল শেখকে কে খুন করেছিল ওমর? তুমি খুনিকে চেনো। আমাদের বলো।’ অর্জুন মরিয়া হয়ে ওমরকে ঠেলতে থাকে। ওমরের গলা দিয়ে গোঁ গোঁ করে জান্তব শব্দ বেরোয়। তার অর্থ বোধগম্য হয় না। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে সে। চোখ উলটে যায়। ডক্টর মজুমদার পালস চেক করে হতাশ মুখে মাথা নাড়েন। বলেন, ‘সরি তোমাদের কোনোরকম হেল্প করতে পারলাম না। ও আবারও জ্ঞান হারিয়েছে। যদি জ্ঞান ফেরে, যদি কিছু কথা বের করতে পারি ওর মুখ থেকে, তোমাকে ফোন করে জানাব আমি।’
মাথা নাড়ল অর্জুন। যেটুকু বা আশার আলো জেগেছিল, সেটুকুও নিভে গেছে। তবু লড়াইটা ছাড়া চলবে না।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তীর্থঙ্করবাবুকে ফোন করল অর্জুন।
‘কিছু আপডেট আছে?’ জানতে চাইল সে।
‘আমরা গাড়িটাকে লোকেট করেছি, অর্জুন। লাস্ট দেখা গেছে আমহার্স্ট স্ট্রিটে। তারপর বেশ কিছুটা রাস্তায় সিসিটিভি অকেজো ছিল। তাই আর ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে এই অঞ্চলে আমার অনেক সোর্স আছে। গাড়ির ছবি আর ড্রাইভারের আবছা যে স্টিল পাওয়া গেছে, সেটা সার্কুলেট করে দেওয়া হয়েছে। আশা করছি আমরা রণজয়বাবুকে খুঁজে বের করতে পারব। একটা ব্যাপার আশ্চর্য লাগছে, বুঝলে অর্জুন। আমার টিমের অফিসার ওঁদের বাড়ি গেছিল। বাড়ির লোকেরা কিছু বুঝতেই পারছেন না। এমন কাউকে মনে করতে পারছেন না যে ব্যক্তিগত আক্রোশবশত রণজয় সেনকে কিডন্যাপ করতে পারে। পাড়াপড়শি ও তাঁর ল-ফার্মের এমপ্লয়িদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, তিনি মোটামুটি অজাতশত্রু মানুষ ছিলেন। যদিও যে পেশায় তিনি ছিলেন, সেখানে অজাতশত্রু হওয়া সম্ভব নয়।’
‘হুম! কিন্তু আশ্চর্য কীসে লাগছে আপনার?’ জানতে চাইল অর্জুন।
‘এতক্ষণে র্যানসম কল আসেনি। যদি আসত, কেসটা অনেক সহজ হয়ে যেত। অন্তত মোটিভটা নিয়ে কোনো ধন্দ থাকত না। কিন্তু সেটা যেহেতু হয়নি, সুতরাং এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রোশের অ্যাঙ্গলটাকেই জোর দিতে হচ্ছে। কিন্তু উনি নিজে কোর্টে যাওয়া ছেড়েছেন বছর দুয়েক আগেই। তাহলে এতদিন পরে কেউ কেন তাঁকে কিডন্যাপ করবে?’
‘হয়তো রাগ পুষে রেখেছিল।’
‘হওয়া সম্ভব। কিন্তু এক্ষেত্রে রাগটা কেন জানতে পারলে সুবিধে হত। পেশার কারণে শত্রু তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তার জন্য যদি কিডন্যাপ হওয়া শুরু হয়, তাহলে কলকাতা শহরের সব লইয়ারেরই এতদিনে কিডন্যাপ হয়ে যাওয়ার কথা। উকিলদের কাজটাই তো এমন। সমস্যা হচ্ছে, র্যানসম কল না আসাটা একটা নেগেটিভ দিক এই কেসের। অর্থাৎ হাতে সময় নেই। দেখছি কী করা যায়!’
‘দেখুন প্লিজ। রণজয়বাবুকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। নিখাদ ভদ্রলোক।’ ফোনের অপর প্রান্তে তীর্থঙ্করবাবুর হাসির শব্দ শোনা গেল। বললেন, ‘খারাপ লোকেদের সঙ্গে খুব কমই ক্রাইম হয় অর্জুন। আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা অন্তত তাই-ই বলে। যাক গে শোনো, ভিকটিমের রিলেটিভরা যেহেতু তোমার কিন, তাই জানিয়ে রাখি, আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তবু সবরকম পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থেকো। রাখছি এখন।’
অর্জুনকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিলেন তীর্থঙ্কর, হয়তো বলা শব্দগুলোর অভিঘাত এড়াতেই। অর্জুন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্তে। পাশ থেকে টাপুর জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল? কী বললেন তীর্থঙ্করবাবু?’
অর্জুন মাথা নেড়ে বলল, ‘কিছু ফুটেজ পাওয়া গেছে গাড়িটার। খোঁজ চলছে। সেটাই জানালেন।’
‘আর কিছু নয়?’ টাপুরের কণ্ঠস্বরে সন্দেহ।
‘না না। চলো, বেরোনো যাক।’
‘কোথায় যাবে?’
অর্জুন একটু চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে টাপুরের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘ভয় করছে টাপুর।’
টাপুর তাকিয়ে রইল অর্জুনের চোখের দিকে। ভয় কি তার করছে না! দুপুর শেষ হয় বিকেল গড়িয়েছে। অতীন সামন্ত যদি খুনগুলো করে না থাকে, তাহলে খুনি এখনও মুক্ত। সে প্রস্তুত হচ্ছে আরও একটা খুনের জন্য। এরপর সন্ধে নামবে। খুনি প্রস্তুত হবে। রাত বাড়লে আজ আরেকজন শহরবাসীর জীবনের অন্তিম অধ্যায় লেখা হবে। কে সে!
সম্ভাব্য একটা নাম মনে আসতে ধাক্কা দিয়ে চিন্তাটা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে টাপুর বারবার। কিন্তু মনের কোণে আশঙ্কার অন্ধকার জমাট বাঁধছে।
এখন সেই কথাগুলো অর্জুনকে বলল না টাপুর। বরং তার হাত স্পর্শ করল। বলল, ‘হেরে যাওয়ার আগে হার মেনে নেবে? তুমি তো সেরকম মানুষ নও অর্জুন। আমরা সকলে মিলে একটা খুনিকে খুঁজে বের করত পারব না? নিশ্চয়ই পারব।’
‘তাই যেন হয় টাপুর। তাই যেন হয়। ভগবানকে ডাকো। আর কোনো মৃত্যু আমি নিতে পারব না। নিজেকে আমার অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। কাউকে বাঁচাতে পারলাম না আমি। একজনকেও না।’
অর্জুনকে এই মুহূর্তে একজন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া মানুষ বলে বোধ হচ্ছে। টাপুর দীর্ঘশ্বাস চাপে। বলে, ‘চলো না চেষ্টা করে দেখি, অন্তত একজনকে বাঁচাতে পারি কি না!’
অর্জুন মুখ তুলে তাকাল টাপুরের মুখের দিকে। তার আত্মবিশ্বাস অর্জুনকেও সংক্রামিত করল কি! বলল, ‘চলো।’
দু পা এগোনোর আগেই টাপুরের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল এবার। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে ভুরুটা একটু কোঁচকাল সে। সুমনা সান্যালের ফোন। আবারও হয়তো জিজ্ঞাসা করবেন যে তার স্বামীর হত্যারহস্যের কিছু সুরাহা করতে পারল কি না টাপুর। কী উত্তর দেবে সে। এই সময়গুলোতে খুব অসহায় বোধ হয় তার। ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকাল, ‘হ্যাঁ বলুন।’
সুমনাদেবী কিন্তু আজ কিছু জানতে চাইলেন না। বরং বললেন, ‘তুমি বলেছিলে কিছু মনে পড়লে জানাতে। আজ সকালে সুখেন্দুর ইনশ্যিয়োরেন্সের কাগজপত্র খুঁজতে গিয়ে একটা কাগজ পেলাম। মনে হল তোমাকে জানাই। জানি না আদৌ তোমার কোনো কাজে লাগবে কি না!’
‘কী কাগজ?’ কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নিরুত্তাপ রাখার চেষ্টা করল টাপুর। তবু পুরোপুরি বোধ হয় পারল না।
সুমনা সান্যাল বললেন, ‘একটা লিগাল নোটিস। সুখেন্দুর নামে এসেছিল প্রায় বছর ষোল আগে।’
‘লিগাল নোটিস! কে পাঠিয়েছিল?’
সুমনা সান্যাল একটু থেমে বললেন, ‘আজ কাগজটা দেখে ঘটনাটা মনে পড়ল জানো! সুখেন্দুর মুখেই শোনা। পুলিশের কাছে খবর ছিল, শেয়ালদা স্টেশনে অনেকটা পরিমাণ কোকেন ঢুকবে ট্রেনে। নির্দিষ্ট দিনে রেড হয়। খুব সামান্য পরিমাণ কোকেন পাওয়া গেছিল। একজন সোর্সের খবরের সূত্র ধরে জানা যায়, একজন পুলিশ কনস্টেবল খবর জানিয়ে দিয়েছিল স্মাগলারদের যে সেদিন রেড হবে। তাই বেশিরভাগ মালই নাকি পথে অন্য স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেদিন।’
‘তারপর?’
‘সেই কনস্টেবলকে সাসপেন্ড করা হয়। কিন্তু সে বলে যে এসবই নাকি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এমনকি সুখেন্দুর নামে অভিযোগ করে যে সুখেন্দু নাকি স্মাগলারদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে মাল ছেড়ে দিয়েছে। তারপর ধরা পরার ভয়ে ওই লোকটাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। সেই সময়ে সুখেন্দু খুব টেনশনে থাকত মনে আছে। লোকটা পুলিশে কমপ্লেন করেনি। উকিলকে দিয়ে লিগাল নোটিস পাঠিয়েছিল বাড়িতে। সোজা কোর্টে কেস করেছিল।’
‘সে কী! কী নাম লোকটার?’ ঢোঁক গিলে জানতে চাইল টাপুর।
‘সুবীর। সুবীর পাল। ঘটনাটা মনে ছিল না। আজই সেই নোটিসটা দেখে মনে পড়ে গেল।’
টাপুর অর্জুনের দিকে চাইল। অর্জুন হাত নেড়ে ইশারায় জানতে চাইল, কী হয়েছে? টাপুর মাথা নাড়ল।
‘এরপর কী হয়েছিল?’
সুমনাদেবী বললেন, ‘তেমন কিছু নয়। ওই সুবীর পালের উকিলের সঙ্গে সুখেন্দু সরাসরি কথা বলেছিল দেখা করে। ভদ্রলোক যখন বোঝেন কেসটাতে মেরিট নেই, তিনি হাত তুলে নেন। কেসটাও থিতিয়ে যায়। পরে শুনেছিলাম, ওই লোকটা, মানে সুবীর পাল রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে।’
টাপুর একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার কাছে যে নোটিসটা আছে, সেখানে উকিলের সই আছে নিশ্চয়ই!’
‘আছে। কেন?’
‘উকিলের নামটা একটু বলতে পারবেন?’
‘হ্যাঁ। এই তো লেখা। রণজয় সেন। হ্যালো, হ্যালো। শুনতে পাচ্ছো তুমি? হ্যালো…’
টাপুর কিছু শুনতে পাচ্ছে না আর। নীচে ঘাসের উপর মোবাইল ফোনটা খসে পড়েছে হাত থেকে। তার চোখের সামনে দৃশ্যাবলি ঘুরছে ক্রমাগত। দ্রুত, আরও দ্রুত। নাগরদোলার মতো উপর থেকে নীচে। নীচ থেকে উপরে।
৪২
‘মস্ত বড়ো ভুল হয়ে গেল অর্জুন। সুবীর পাল। আমরা বৃথাই ঘুরে মরছিলাম। আঙ্কল এখন খুনির জিম্মায়। হিসেবমতো আজ খুন হতে চলেছেন। প্রতিবারের মতো এবারও খুনি তার শিকারকে অপহরণ করেছে। মিতুলকে আমি এসব কথা কীভাবে বলব অর্জুন? কীভাবে বাঁচাব কাকুকে?
এই মুহূর্তে পুলিশ জিপ ছুটে চলেছে সল্টলেকের পথে। গন্তব্য মিতুলের বাবার ল-ফার্ম। সেখানেই তাঁর যাবতীয় রেকর্ড স্টোর থাকে। পুরোনো কেসের ডকুমেন্ট ও সেখানেই পাওয়া যাওয়ার কথা। তবে যে কেস কোর্টে ওঠেনি, তার রেকর্ডস রণজয়বাবু রেখেছিলেন কি না, সে বিষয়ে মিতুল বা তার মা কিছুই বলতে পারছেন না।
‘তবু চেষ্টা তো আমাদের করতেই হবে টাপুর। দেখো, আজ সুমনাদেবী তো নোটিসের কাগজটা নাও পেতে পারতেন। কিন্তু পেয়েছেন। আজই পেয়েছেন। এখনও কেসটা আমাদের হাত থেকে বেরিয়ে যায়নি। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ।’
নয়ন গাড়ি চালাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে অর্জুন বলল, ‘আচ্ছা নয়ন, একটা কথা বলো। সুবীর পাল মারা যাওয়ার পর তার ফ্যামিলির কী হল, সেই সম্পর্কে কিছু বলতে পারবে কি? সুবীর পালের বড়ো ছেলে বেঁচে আছে আমরা জানি। আর তার স্ত্রী? একটু মনে করার চেষ্টা করো। কিছু কি শুনেছিলেন তুমি তোমার বাবার কাছে?’
নয়ন রাস্তায় চোখ রেখেই মাথা নাড়ল। বলল, ‘সুবীরজেঠু মারা যাওয়ার বেশ কয়েকবছর পরে একবার অনিতা জেঠিমার সঙ্গে মায়ের দেখা হয়েছিল। মা বলেছিলেন, অমন সুন্দর চেহারাটা ঝলসে গেছে একদম, বাজপড়া গাছের মতো। কী নাকি চামড়ার রোগ হয়েছিল! আর কিছু মনে পড়ছে না। জেঠিমা বলেছিল, ছেলেটা দাঁড়িয়ে গেছে। এবার শান্তি। আর পরে একবার বাবা বলেছিল বাবলুদা বিয়ে করছে, সেটা তো আপনাকে বলেছি। ব্যস। আর কিছু জানি না।’
চমকে উঠে একে অপরের দিকে তাকাল অর্জুন ও টাপুর। বাজপড়া গাছের মতো মুখের চামড়া!
‘কমলা!’ টাপুরের গলা থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল নামটা। নয়নের কানে গিয়েছিল। সে বলল, ‘না না, কমলা নয়। অনিতা। সুবীরবাবুর স্ত্রীর নাম অনিতা পাল।’
‘বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা ভুল বলেননি। বার্ধক্যে স্মৃতিভ্রংশ হলেও সুবীরবাবুর স্ত্রীর নাম তার ঠিকই মনে ছিল। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। আমাদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছিলেন সেদিন। জানতেন আমরা ওখানে যাব। তাতে সফলও হয়েছেন।’ বলল অর্জুন।
‘কিন্তু অর্জুন, এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে খুনি আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে সচেতন। খুনি জানত আমরা ওই সময়ে ওখানে যাব। কীভাবে? খুনি আমাদের থেকে এককদম এগিয়ে চলছে। আমরা যা করছি, যা ভাবছি, খুনি সেসব আগেই ভেবে ফেলছে। আরও ভালো করে বললে বলতে হয়, আমরা নিজেদের নয়, খুনির প্ল্যান অনুসারে চলছি। উফফ! আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না। কীভাবে সম্ভব অর্জুন!’
‘উত্তরটা তুমিই আমাকে বলেছিল, মনে করো টাপুর,’ বলল অর্জুন। ‘গেম খুনির কাছে পুরো ব্যাপারটাই একটা গেম। আমাদের বরাবর মাত দিয়ে গেছে সে। অথচ আমরা তা বুঝতেও পারিনি। ওর তৈরি করা গোলকধাঁধায় ঘুরে মরেছি। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। আমাদের সব খবর খুনি পাচ্ছে কীভাবে?’
কথা শেষ করার আগেই অর্জুনের হাত চেপে ধরল টাপুর। একটু অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল অর্জুন। টাপুর সাবধানি ইশারায় নয়নের দিকে আলগোছে তাকাল একবার। অর্জুন স্তম্ভিত। এমনটা হতে পারে কখনো মাথাতেই আসেনি তার। সত্যিই তো! কেনই বা নয়! নয়নকে সে কতটুকুই বা চেনে! মাত্র বছর চারেক ধরে পুলিশে চাকরি করছে সে। এর আগেও বেশ কয়েকবার বিভিন্ন কেসে অর্জুনের হয়ে গাড়ি চালিয়েছে। কিন্তু তার বাইরে কথা তেমন হয়নি কখনোই। নিজে থেকে কিছু বলেনি নিজের বা নিজের পরিবার সম্পর্কে। এই কেসের শুরু থেকেই নিজে উপযাজক হয়ে তথ্য সরবরাহ করে চলেছে সে। তার সুবীরজ্যেঠুর নাম সে নিজে থেকে না জানালে টাপুর বা অর্জুন জানতেও পারত না। প্রথম থেকেই বলে চলেছে তার বিশেষ কিছু মনে নেই। অথচ পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো করে অনেক তথ্যই ধীরে ধীরে দিয়ে চলেছে।
অর্জুনের ফোন বাজছে আবার। সঞ্জয়বাবু।
‘হ্যালো! জানতে পারলেন কিছু?’
‘মিয়াও মিয়াও র্যাকেট স্যার। কলকাতার মাঝখানে বসে ধান্দা চালাচ্ছিল। বেশ কিছু বড়ো ক্লায়েন্টের নাম পেয়েছি। বিগ ফিশ সব স্যার।’
‘রেজর কিলিং-এর ব্যাপারে কিছু জানে না, তাই তো?’
‘না স্যার। বলছে তো টিভিতে দেখেছে। খুনের ব্যাপারে কিছু জানে না। মানে স্যার, থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার পরেও একই কথা বলে চলেছে। মনে হয় সত্যিই এ সে নয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্জুন। জানত এরকমই হবে। বলল, ‘যাক, আপনি একটা বড়ো কেস তো পেলেন।’
‘আর কেস স্যার, জানেন না এরকম কেসে কী হয়? হয়তো দেখবেন এখনই উপর থেকে ফোন আসবে। আসলে এসব ড্রাগস গরিব মানুষ কজন কেনে? বেশিরভাগই তো যায় বড়োলোকের পোলাপানদের পার্টিতে। এখন কান যখন ধরা পড়েছে, মাথাও আসবে। সেটা ঘটতে দেওয়া হবে এত সহজে? হয় কখনও? ফোন এল বলে!’
অর্জুনের চোয়াল শক্ত হল।
‘সঞ্জয়বাবু।’
‘বলুন স্যার।’
‘জবানবন্দির পাকা ব্যবস্থা করুন। দেখুন অতীনের ওই শাকরেদকে সাক্ষী হওয়ার লোভ দেখিয়ে চক্রটা সম্পর্কে আরও কিছু ওগড়ানো যায় কি না। যা-ই হয়ে যাক, এরা যেন ছাড়া না পায়। এই রেজর কিলারকে সামলে নিই, তারপর এদের ব্যবস্থা করছি। নিশ্চিন্ত থাকুন। উপর থেকে যতই চাপ আসুক, ড্রাগ পেডলাররা ছাড়া পাবে না।’
অপরপ্রান্তে সঞ্জয়বাবু একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। থ্যাঙ্ক ইউ। থ্যাঙ্ক ইউ।’
৪৩
মিতুল ওর বাবার ল-ফার্মেই ছিল। এক বেলার মধ্যে ওর চোখে কালি পড়েছে। মুখের রেখায় দুশ্চিন্তার ছাপ।
‘কিছু খবর পেলে টাপুরদি?’ টাপুরকে ঢুকতে দেখেই ছুটে এল সে। টাপুর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘কাকুকে আমরা সকলে মিলে ঠিক খুঁজে বের করব। চিন্তা করিস না।’
টাপুরকে দেখে যে আশার আলো জ্বলেছিল মিতুলের মুখে, তা যেন কেউ ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। বলল, ‘মা-কে সামলাতে পারছি না টাপুরদি। মা-কে তো জানো তুমি। এমনিতেই নার্ভাস। এখন হিস্টিরিয়া রোগীর মতো করছে। এরকম চললে হাসপাতালে দিতে হবে। আমি কী করি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
টাপুর মিতুলের পিঠে হাত রাখল। বলল, ‘একটু সময় দে বোন। কাকুর কিছু হবে না, আমি কথা দিচ্ছি তোকে। এখন কথা বলার সময় নেই। তোকে যেটা চেক করতে বলেছিলাম, করেছিলি?’
মিতুল মাথা নাড়ল।
‘করেছিলাম। খুব বেশি কিছু পাইনি। কেসটা নিয়ে বাবা এগোয়নি সম্ভবত। কারণ বাবা বুঝেছিল কেসে মেরিট নেই। সেই সময়ে বাবার জুনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন অরিন্দমকাকু। আমি একটু আগেই কাকুকে ফোন করেছিলাম। কাকুর মনে ছিল কেসটার কথা। তিনিই জানালেন যে পুলিশ অফিসারের কাছে নোটিস পাঠানো হয়েছিল, তিনি সামনাসামনি বসে মিটমাটের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।’
‘তাই!’ টাপুরের মনে পড়ে গেল সুখেন্দুশেখরবাবুর বাড়ির মহার্ঘ্য অন্দরসজ্জা। জিজ্ঞাসা করল, ‘তারপর?’
‘বাবার নাকি মনে হয়েছিল, সেটা বেটার অপশন। কারণ ওই কেসটা নিয়ে লড়ে অর্থ ও সময় ব্যয় ছাড়া কোনো লাভ হবে না। বাবা চাইলে কেস দীর্ঘদিন কোর্টে গড়িয়ে টাকা রোজগার করতে পারত। কিন্তু বাবা সেটা করেনি। শুধু ওই কেস বলে নয়, কোনো কেসেই করেনি। কেসে মেরিট না থাকলে বরাবর মুখের উপর বলে দিত ক্লায়েন্টকে। নইলে আজ এই বয়সে এসে বাবাও আরও অনেক উকিলের মতো রাজার হালে জীবন কাটাতে পারত।’
‘কাকুর এই এথিকসের ব্যাপারে জানি রে। তুই বল, তারপর কী হল? সুবীর পাল মেনেছিলেন?’
‘অরিন্দম আঙ্কল জানালেন, এমনিতেই সুবীর পাল সাসপেন্ডেড ছিল। আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না। বাবা সুখেন্দুবাবুর অফারের কথা জানিয়েছিলেন ওকে। লোকটা খুব রেগে গেছিল বাবার উপর। অফিসে এসে সকলের সামনে গালিগালাজ করেছিল বাবাকে। এমনকি বলেছিল যে বাবা সুখেন্দুশেখরের থেকে ঘুষ নিয়ে কেস থেকে সরে দাঁড়াতে চাইছে। পেপারওয়েট ছুঁড়ে মেরেছিল নাকি বাবাকে লক্ষ করে।’
টাপুরের মুখে আঁধার ঘনাল। তার মানে, খুনির নেক্সট টার্গেট হল রণজয় সেন। এ নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ নেই।
‘মিতুল, আমাকে অরিন্দমবাবুর সঙ্গে একটু কথা বলাতে পারবি?’
‘এখনই বলো। আমি ফোনে ধরে দিচ্ছি।’
মিতুল মোবাইলে নম্বর ডায়াল করল। রিং হচ্ছে। বার তিনেক রিং হওয়ার পর অপর প্রান্ত থেকে ভারী কণ্ঠস্বর শোনা গেল। মিতুন জানাল, টাপুর অরিন্দমবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। ফোনটা টাপুরের হাতে এগিয়ে দিল সে।
‘হ্যালো স্যার। আমি সংঘমিত্রা ব্যানার্জি বলছি। রণজয়বাবুর কেসটা নিয়ে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলার ছিল।’
‘আমি যা জানতাম, মিতুলকে বলেছি। আর তেমন কিছু আমার তো জানা নেই। তবু বলুন কী জানতে চান। জানা থাকলে অবশ্যই বলব।’
‘রণজয়বাবু কেসটা ছেড়ে দেওয়ার পরে কি সুবীর পাল কেস নিয়ে এগিয়ে ছিলেন?’
‘সেরকম কিছু তো শুনিনি।’
‘বেশ। শেষ প্রশ্ন। আমার বা মিতুলের আগে কেউ আপনাকে সুবীর পালের কেসটা নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করেছিল কোনোদিন?’
অপরপ্রান্তে ক্ষণিক নৈঃশব্দ। তারপর অরিন্দমবাবু বললেন, ‘রণজয়দার ঘটনাটা শোনার পর থেকে আমি ভেবেই যাচ্ছি। মিতুলকে বলিনি কিছু, কারণ ভেবেছিলাম ও ভয় পাবে হয়তো। এখন মনে হচ্ছে সেদিন আমার সাবধান হওয়া উচিত ছিল।’
‘কে জানতে চেয়েছিল?’ টাপুরের কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠা।
অরিন্দমবাবু বললেন, ‘গত বছর মে মাসে আমার কাছে একজন লোক আসেন। নিজেকে একটি নামি সংবাদপত্রের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন। ইন্টারভিউ করেন। ইন্টারভিউয়ে আমার পুরোনো কেসগুলো নিয়েও আলোচনা করছিলেন তিনি। দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম যে তিনি রীতিমতো হোমওয়ার্ক করে এসেছেন। আমার অনেক কেসের সম্পর্কেই জানেন। কথাচ্ছলে সুবীর পালের কেসটা সম্পর্কে জানতে চাইলেন যখন, আমি অবাক হয়েছিলাম।’
‘স্বাভাবিক। তারপর?’
‘আমি ওঁকে বলেছিলাম আমি এই কেসে রণজয়দাকে অ্যাসিস্ট করছিলাম। লিড করছিলেন দাদা নিজেই। তো উনি জিজ্ঞাসা করলেন, কেসটা নিয়ে কেন এগোনো হল না। আমি সবই খুলে বলেছিলাম যা আজ মিতুলকে বলেছি। দাদার এথিক্সের কথাও বলেছি।’
‘ভদ্রলোকের নাম মনে আছে?’ জানতে চাইল টাপুর।
‘হ্যাঁ। প্রদ্যুত চক্রবর্তী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রেসকার্ডও দেখিয়েছিলেন। ‘ইন্টারভিউটা কোন কাগজে ছাপা হয়েছিল?’
‘কোনো কাগজেই নয়। পরে আমি ভদ্রলোককে ফোনে ধরার চেষ্টা করেছি। প্রতিবারই ফোন সুইচ অফ এসেছে। খবরের কাগজের অফিসে খবর নিয়ে জেনেছি, প্রদ্যুৎ চক্রবর্তী নামের যে সাংবাদিক সেখানে চাকরি করেন, তিনি অন্য লোক। আমি আজও জানি না, লোকটা কেন মিথ্যে পরিচয় দিয়ে আমার কাছে এসেছিল!’
টাপুর বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি সম্ভবত জানি।’
৪৪
‘খুনির প্ল্যানটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে অর্জুন। সঙ্গে মোটিভটাও। এই সিরিয়াল কিলিং হঠাৎ করে হুজুগের বশে করা খুন নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে পরিকল্পনামাফিক এগিয়েছে খুনি।’
‘হুম, সে নিয়ে এখন আর সন্দেহের অবকাশ নেই।’
‘প্রথমেই তার কাছের লোকেদের, যাদের হয়ে সে প্রতিশোধ নিতে চায়, তাদের যাবতীয় রেকর্ড মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে, যাতে করে আমরা সেই রেকর্ড ধরে খুনি অবধি পৌঁছে যেতে না পারি। তবে খুনি নিজেকে লুকিয়েও রাখতে চায়নি সম্ভবত। লুকোতে চাইলে প্রতিটা খুনে সিগনেচার ছাড়ত না। নয়নের কথা যদি সত্যি হয়, সেক্ষেত্রে বলতে হয় সুবীর পালের সিরিয়াল কিলিং নিয়ে এক ধরণের ফ্যান্টাসি ছিল, মানে ওই হিরো ওয়রশিপ গোছের। সেটা হয়তো তার ছেলের মধ্যেও তৈরি হয়েছিল। এরকম তো হয়ই। নয়নের কথা শুনলে বুঝবে, ছোটোবেলায় শোনা কথাগুলো তার মধ্যে কতটা প্রভাব ফেলেছিল। সুতরাং সুবীর পালের নিজের ছেলেও যে প্রভাবিত হবে, সেটাই স্বাভাবিক।
মিতুল এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল, ‘টাপুরদি, অর্জুনদা, একটা কথা বলার ছিল।’
দুজনেই মিতুলের মুখের দিকে তাকাল। হাসিখুশি মেয়েটা এক বেলার মধ্যে বদল গেছে পুরোপুরি। টাপুর বলল, ‘বল।’
‘টাপুরদি, এই কেসে আমি তোমার সঙ্গে থাকব।’
অর্জুন বলে উঠল, ‘সেটা সম্ভব নয় মিতুল। এই কেসটা আগের অন্য সব কেসের চাইতেও অনেক বেশি রিস্কি। আমাদের অপরাধী শুধু খুনিই নয়, পাগলও। আমি তোমাকে ইনভল্ভ করার পারমিশন পাব না। আর তাছাড়া এই মুহূর্তে তোমার মায়ের তোমাকে দরকার।’
‘মায়ের কাছে মালতীমাসি আছে। ডাক্তারকাকুকে একবার কল করলেই দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসবেন। কিন্তু বাবার কাছে কেউ নেই। বাবা ওই পাগল খুনির কব্জায় আছে। আমাকে যেতেই হবে অর্জুনদা। তোমরা আমাকে সঙ্গে না নিলে আমি একাই যাব। যেভাবে হোক বাবাকে খুঁজে বার করব।’
‘কিন্তু…’
অর্জুনের কথা শেষ হওয়ার আগে পাশ থেকে টাপুর মিতুলের কাঁধে হাত রাখল। বলল, ‘ওকে যেতে দাও অর্জুন। ডিসিডিডি স্যারের সঙ্গে আমি পরে কথা বলে নেব। প্রয়োজন হলে ক্ষমাও চেয়ে নেব।’ তারপর মিতুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল মিতুল, এই কেসটাও আমরা একসঙ্গেই শেষ করব।’
অর্জুন পর্যায়ক্রমে দুজনের মুখের দিকে তাকাল একবার। তারপর কাঁধ ঝাঁকাল শুধু। মুখে কিছু বলল না। তার পকেটে মোবাইল ফোন পিকপিক করে বেজে উঠল একবার। কোনো মেসেজ ঢুকেছে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে চোখ রাখল সে। সঞ্জয়বাবুর মেসেজ।
‘আপনাকে ফোনে পেলাম না। তাই মেসেজ করছি। পেছনে রুল ঢোকাতেই আরও উগরেছে অতীন সামন্ত। ওরা শুধু দাবার বোড়ে। আসল পালের গোদা হল প্রমোদ বৈরাগী। ব্যাবসাটা সেই চালায়। তবে সেও এই ব্যাবসার মাথা নয়। রাজারও রাজা আছে। তবে তাকে ছোঁয়া মুশকিল। ওরা মরে যাবে, সাক্ষী দেবে না ভয়ে।’
প্রমোদ বৈরাগী।
নামটা স্মৃতিকোষে ধাক্কা মারল অর্জুনের। বিলাল শেখের জেলে যাওয়ার পর ওই অঞ্চলে ড্রাগের ব্যাবসা এখন প্রমোদ বৈরাগীর আয়ত্ত্বাধীন। সিরিয়াল কিলিং-এর সঙ্গে কি প্রমোদ বৈরাগীর কোনো সম্পর্ক আছে!
অর্জুন দ্রুত সঞ্জয়বাবুর নম্বর ডায়াল করল। কেউ ফোন তুলছে না। এবার থানার নম্বরে ফোন করল সে। দুপুরে তাদের অপারেশনে সঞ্জয়বাবুর সঙ্গে যে সঙ্গী ছিলেন, তার নাম দীপক দাস। তিনি থানাতেই উপস্থিত ছিলেন। ফোন ধরে জানালেন, ‘সঞ্জয়বাবু তো বেরিয়ে গেলেন।’
‘বেরিয়ে গেলেন? কোথায় গেলেন একা?’
দীপক দাস বললেন, ‘সম্ভবত লালবাজার গেছেন প্রমোদ বৈরাগীর নামে ওয়ারেন্ট বের করতে।’
অর্জুন একটু বিরক্ত হল। ভদ্রলোকের সবেতেই তাড়া। জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি জানেন, অতীন সামন্ত কার নাম বলেছে? ওদের ব্যাবসার কিংপিন কে?’
‘প্রমোদ বৈরাগীর কথা বলেছে জানি। আর কোনো নাম তো জানি না। আরও কারো নাম বলেছে নাকি?’
অর্জুন সঞ্জয়বাবুর মেসেজের কথাটা চেপে গেল। সঞ্জয়বাবুর কথা যদি সত্যি হয়, যদি সত্যিই আরও বড়ো কোনো মাথা থেকে থাকে, সেক্ষেত্রে সর্ষের মধ্যে ভূত থাকা অসম্ভব নয়। পুলিশের লোকেদের কার কার টিকি বড়ো খুঁটিতে বাঁধা তা না জেনে আগে থেকেই কিছু বলে ফেলা ঠিক হবে না। তাই সে বলল, ‘না। তা আমি জানি না। জাস্ট জানতে চাইলাম।’
ফোনটা রেখে আবারও সঞ্জয়বাবুর নম্বর ডায়াল করল অর্জুন। এবার ফোন বাজছে।
‘হ্যালো!’
‘সঞ্জয়বাবু, কোথায় আপনি?’
‘লালবাজারে যাচ্ছি স্যার। ওয়ারেন্ট নিয়ে ফিরব। ওই প্রমোদ বৈরাগী অনেকদিন ধরে জ্বালাচ্ছে। এবার বাগে পেয়েছি ব্যাটাকে। ছাড়ব না স্যার, মাইরি বলছি।’
‘অতীন সামন্তকে দিয়ে সাক্ষী দেওয়াতে পারবেন কোর্টে?’
‘সে দেখে নেব স্যার। আগে ওকে ওই বৈরাগীকে জেলে তো ভরি। কান টানলেই মাথা আসবে।’
‘মাথাটা কে? কার কথা বলছেন?’ জানতে চাইল অর্জুন।
খুক খুক করে হাসল সঞ্জয় পাল। বলল, ‘আপনি আপনার রেজর কিলারকে খুঁজুন স্যার। এটা আমার কেস। এবার প্রমোশনটা আমার চাই।’
ফোনটা কেটে দিলেন সঞ্জয়বাবু।
‘ড্যাম!’ চাপাস্বরে গর্জন করে উঠল অর্জুন।
‘কী হল?’ পাশ থেকে টাপুর জিজ্ঞাসা করল।
‘সঞ্জয়বাবু ফালতু রিস্ক নিচ্ছেন একা একা। সত্যিই যদি ড্রাগ ব্যাবসার কোনো বড়ো মাথা থাকে, সেক্ষেত্রে সঞ্জয়বাবুর মতো কুচো পুলিশকে টিপে মারতে এদের বেশি সময় লাগার কথা নয়।’
মিতুল এবার অর্জুনের হাত চেপে ধরল। বলল, ‘প্লিজ অর্জুনদা, বাবাকে খোঁজো। অন্য সব কেস পরেও হতে পারে। বাবার কিছু হয়ে গেলে আমি সারাজীবনেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। জানো, সকালে ফিরে এসে বাবা আমাকে বলেছিল ব্যাঙ্কের কাজটা করে দিতে। আমার একটা মিটিং ছিল বলে বাবা নিজেই বেরিয়ে গেল। আমি যদি যেতাম, তাহলে বাবা আজ হারিয়ে যেত না।’
মিতুলের চোখ থেকে জলের ধারা নামছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। অর্জুন অসহায় চোখে টাপুরের দিকে তাকাল। মিতুল এখনও জানে না, ব্যাঙ্কে না বেরোলেও রণজয় সেন কিডন্যাপ হতেনই। খুনি আজ যে কোনোভাবে তাঁকে অপহরণ করত। কারণ তিনি রেজর কিলারের সাত নম্বর শিকার। টাপুর ইশারায় আশ্বস্ত করল অর্জুনকে। তারপর মিতুলকে বলল, ‘আমার উপর ভরসা আছে তো তোর? আমার মন বলছে কাকুর কিছু হবে না।’
