৫৫
ছয় মাস পরের কথা।
অফিসে একটা মিটিং সেরে নিজের কিউবিকলে এসে বসল মিতুল। কবজি উলটে ঘড়ির দিকে তাকাল। দুপুর পৌনে দুটো বাজে। অনসাইট যেতে চায়নি বলে নতুন প্রজেক্টটা ছাড়তে হয়েছে তাকে। ভালো প্রসপেক্ট ছিল ওই অ্যাকাউন্টে। ছাড়ার সময় খারাপ যে একটু লাগেনি, তা নয়। ম্যানেজার বার বার অনুরোধ করেছিলেন সিদ্ধান্তটা আরেকবার ভেবে দেখতে। অন্তত একটা বছরের জন্য ঘুরে আসতে। মিতুল রাজি হয়নি। বাবা-মাকে ছেড়ে, টাপুরদিকে ছেড়ে, এই শহর ছেড়ে কোথাও গিয়ে ভালো থাকবে না সে। আর সেটা উপলব্ধি করার পর সিদ্ধান্তটা নেওয়া সহজ হয়ে গেছিল। বাবা বার বার বলেছিল চলে যেতে। এক বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে। মা অবশ্য কিছু বলেনি। মিতুল বুঝতে পেরেছিল, বাবার উপর হওয়া অ্যাটাকটার পর থেকে মা-ও ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। মুখে কিছু না বললেও মনে মনে চাইছে মিতুল কাছে থাকুক।
এই প্রজেক্টটা নতুন। নতুন দায়িত্ব। কাজের ধরণও আলাদা। চ্যালেঞ্জটা মন্দ লাগছে না। একটা মেল আসার কথা ছিল। সেটা চেক করে ল্যাপটপের স্ক্রিন লক করে উঠে দাঁড়াল মিতুল। খিদে পেয়েছে। ক্যানটিনে যাবে। ঠিক তখনই ফোনটা এল। স্ক্রিনে নামটা দেখে মিতুলের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। টাপুরদি।
‘বলো।’
‘ব্যস্ত?’
‘না। এখন ফ্রি আছি। কী ব্যাপার? নতুন কেস?’ জিজ্ঞাসা করল মিতুল।
‘হুম। তুই আসতে পারবি?’
‘কোথায়?’
‘তোর অফিসের কাছেই। দরবারি বলে যে নতুন রেস্তোরাঁটা হয়েছে ওখানে চলে আয়।’
‘তোমার ক্লায়েন্ট আসছে বুঝি?’
ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে টাপুরের হাসির শব্দ শোনা গেল। তারপর বলল, ‘তুই আয়। বলছি।’
অফিস থেকে বেরিয়ে দরবারি-তে পৌঁছোতে মিনিট দশেকের বেশি লাগল না। ভেতরে ঢুকতেই টাপুর হাত তুলে ইশারা করল। মিতুল এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে টাপুরদির মুখোমুখি বসল।
‘কোথায় তোমার ক্লায়েন্ট? কী কেস?’ ক্যাফের চারদিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করল মিতুল।
টাপুর বলল, ‘আসছে। এসে যাবে অল্পক্ষণের মধ্যেই। তুই বস তো।’
ওয়েটার জল দিয়ে গেল। টাপুরদি তাকে বলল, একজনের জন্য অপেক্ষা করছে তারা। এসে গেলেই অর্ডার দেওয়া হবে।
মিতুল জলের গ্লাসটা তুলে চুমুক দিল। টাপুর জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকু কেমন আছেন রে এখন?’
‘ভালো। মাচ বেটার। ওই ঘটনায় একটা জিনিস ভালো হয়েছে। বাবা আবার ফার্মে যাওয়া শুরু করেছে। রোজ না হলেও সপ্তাহে দু-তিনদিন যায়। আমি বলেছি আবার কোর্টে যাওয়া শুরু করতে।’
‘বাহ্, এ তো ভালো কথা। কাকুর এমন কিছু বয়স তো নয়। এখনই কেন প্র্যাকটিস ছাড়বেন!
‘সেই-ই তো। মা অবশ্য গাঁইগুঁই করছে। অ্যাটাকটার পর থেকে একটু ইনসিকিয়োরিটিতে ভুগছে মা। যদিও সব কিছু জানানো হয়নি। তবু বাবাকে বাইরে ছাড়তে চায় না। কিন্তু বাবা নিজেও বোধ হয় মনে মনে চাইছে কাজ শুরু করতে। দেখা যাক কী হয়। যাই হোক, তোমার কথা বলো। আর হ্যাঁ, আজ কেসটার ব্যাপারে পুরো শুনব। গত ক-মাস এত ছোটাছুটি গেছে, সেভাবে কথাই হয়নি তোমার সঙ্গে। আজ মওকা ভি হ্যায়, ঔর দস্তুর ভি। গল্প শোনাও।’
টাপুর হাসল। বলল, ‘কী শুনতে চাস বল। মোটামুটি সবই তো জানিস।’
‘অনেক কিছুই এখনও অস্পষ্ট আমার কাছে। গোড়া থেকে বলো যতক্ষণ না তোমার ক্লায়েন্ট এসে পৌঁছোয়।’
টাপুর বলতে শুরু করল।
‘সঞ্জয় পালের পরিবারের সঙ্গে একের পর এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে বার বার। তার বাবা সুবীর পাল কলকাতা পুলিশে চাকরি করতেন। হেড কনস্টেবল ছিলেন। খবর নিয়ে জেনেছি, নিজের কাজে যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন তিনি। ছিলেন সাহসী ও সৎ। সুখেন্দুশেখর ভৌমিক সেইসময় লালবাজারে পোস্টেড ছিলেন নারকোটিক ডিপার্টমেন্টে। সেই ডিপার্টমেন্টেই কাজ করতেন সুবীর পাল। বিলাল শেখের ব্যাপারে পুলিশের কাছে অভিযোগ যথেষ্টই ছিল। কিন্তু স্থানীয় নেতা সুভাষ সরখেলের হাত ছিল তার মাথায়। আর বিলালও নেতা ও পুলিশদের যথোপযুক্ত উৎকোচ দিয়ে খুশি রাখত। স্মাগলিং-এর টাকার শেয়ার পেত তারাও।’
‘এসব ঘটনা তুমি এত ডিটেলে জানলে কীভাবে?’ মিতুল জানতে চাইল। টাপুর বলল, ‘সব মিটে যাওয়ার পর একটু খোঁজখবর করেছিলাম রে। অর্জুনের কাছ থেকেই শেয়ালদা স্টেশনে রেইডের ফাইলগুলো পেয়েছিলাম। সুখেন্দুবাবুর এক সহকর্মী, যিনি একটি রেইডে অংশ নিয়েছিলেন, দেখলাম আমার পরিচিত। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে আন-অফিশিয়ালি জানান ঘটনাগুলো।’
‘আচ্ছা বলো। তারপর?’
‘হুম, আগেই বলেছি সুবীর পাল নিজে সৎ পুলিশকর্মী ছিলেন। প্রায় তিনটে রেইডে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। দেখেছিলেন, কীভাবে ঘুষের বিনিময়ে মাল ছেড়ে দেওয়া হয়। কাস্টমসের কিছু অফিসারদের সঙ্গেও এদের গোপন আঁতাত ছিল।
‘একবার বড়ো কনসাইনমেন্ট আসার কথা ছিল। খবর পেয়ে সুখেন্দুবাবুর টিম রেইড করল। বোঝাপড়ার পর মালের সামান্য অংশ সিজ করে বাকি মাল ছেড়ে দেওয়া হল। সুবীরবাবু এবার প্রতিবাদ করলেন। ফলত, তাকে হুমকি দেওয়া হল। তিনি ভয় পেলেন না। বললেন, উপরমহলে সব জানাবেন। সুখেন্দুশেখর এরপর বিলাল শেখ ও সুভাষ সরখেলের সঙ্গে ষড় করে সুবীর পালকে ফাঁসিয়ে দিলেন। সাসপেন্ড হলেন সুবীরবাবু। তবু তিনি হার মানলেন না। তিনি বুঝেছিলেন, পুলিশকে জানিয়ে লাভ হবে না। সুতরাং ঠিক করলেন, সরাসরি আদালতে মামলা করবেন। এর জন্য তোর বাবার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন তিনি। ফল কী হয়েছিল, তুই তো জানিস।’
বিমর্ষমুখে মাথা নাড়ল মিতুল। বলল, ‘জানো ক-দিন আগে বাবার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলছিলাম। বাবা বলল, কেসটায় একেবারেই মেরিট ছিল না। সুবীরবাবুর কাছে প্রমাণ বলতে কিছুই ছিল না। উলটো সুখেন্দুশেখর তাকে দোষী প্রমাণ করার জন্য এত বেশি প্রমাণ সাজিয়ে রেখেছিলেন যে কেস জেতা অসম্ভব ছিল। তিনি সেই কথাই বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন সুবীরবাবুকে। বলেছিলেন, প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করতে। কিছু ভদ্রলোক রেগে যান। বোধ হয় কিছুটা শর্ট টেমপার্ডও ছিলেন। মানসিক অবসাদেও ভুগছিলেন তিনি। এর কিছুদিন পরেই বাবা জানতে পারেন, ভদ্রলোক রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন।’
টাপুর মাথা নেড়ে বলল, ‘হুম, অবসাদ অস্বাভাবিক নয়। আমার পরিচিত যাঁর কাছ থেকে কথাগুলো শুনেছি, তিনি জানিয়েছেন, সুবীর পাল এমনিতেও মানসিকভাবে খুব একটা সুস্থ ছিলেন না। এর আগেও এক সহকর্মীর সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে তাকে পুলিশ স্টেশনের মধ্যেই খুব মেরেছিলেন তিনি। সকলের সামনে গলা টিপে ধরেছিলেন। সেইসময়ে তাঁর কর্মদক্ষতার কথা মাথায় রেখে শুধু ধমকধামক দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এর কিছুদিন পরে পুলিশ স্টেশনের মধ্যেই ঐ সহকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েন। খাদ্যে বিষক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছিল। ঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে বেঁচে যান তিনি। কিন্তু সকলেই সুবীর পালকেই সন্দেহ করেছিল যদিও তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
‘হুম, তার মানে হিংস্রতা, প্রতিশোধপরায়ণ প্রবৃত্তি সঞ্জয় পালের রক্তেই ছিল! ‘ছিল বলেই ধরে নেওয়া যায়। না হলে এতগুলো মানুষকে খুন করা সহজ ব্যাপার নয়।’
‘আচ্ছা, বিলাল শেখ, সুখেন্দুশেখর ও সুভাষ সরখেলের কারণে বাবার মৃত্যুর বদলা নিতে চেয়েছিল সঞ্জয় পাল। প্রথম দুজনকে খুন করেছিল। তৃতীয় জনকে খুনের আগে নিজেই খুন হয়ে যায়। কেন সেটা তুমি বলবে। আগে বাকি খুনগুলো সম্পর্কে শুনি। অনিরুদ্ধ মল্লিকের কেসটা কী?’
৫৬
‘এই ব্যাপারটা সত্যিই আনফরচুনেট রে মিতুল।’
‘বলো বলো।’
‘মেয়েটার নাম রেশমি। সুবীরবাবুদের বাড়িতে ভাড়া থাকত ওরা। খুব গরিব ছিল ওরা। মেয়েটার মা ছিল না। বাবার সঙ্গে থাকত। সঞ্জয়ের থেকে কয়েক বছরের ছোটো ছিল রেশমি। অল্প বয়স থেকেই দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ওর সঙ্গে হওয়া কলেজের ঘটনাটা তো তোকে আগেই জানিয়েছি। অনিরুদ্ধ মল্লিক সন্দীপের সঙ্গে সম্পর্ক ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে রেশমিকেই ফাঁসিয়ে দিয়েছিল। ওকে সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজ করেছিল। সেইসময়ে তো এখনকার মতো এম এম এস-এর অত চল ছিল না। পুরো ব্যাপারটা রেকর্ডিং করে ওকে ক্রমাগত থ্রেট দেওয়া হচ্ছিল। মেলের মাধ্যমে ছড়িয়েও দেওয়া হয়েছিল ভিডিও ক্লিপ। সঞ্জয় তখন সবে গ্র্যাজুয়েট হয়েছে। চাকরির চেষ্টা করছে। প্রেমিকার হয়ে লড়াই করার ক্ষমতা তার সেইসময়ে ছিল না। তার উপরে অনিরুদ্ধ মল্লিক ধনী পরিবারের ছেলে। এরই মধ্যে রেশমি সুইসাইড করল।
‘সত্যিই টাপুরদি, অনিরুদ্ধ মল্লিক লোকটা খুব খারাপ।’ বলল মিতুল।
টাপুরের মোবাইল ফোনে টুং টুং করে মেসেজ ঢুকল। সেটায় চোখ বুলিয়ে বলল, ‘কফির অর্ডার দিই, বল?’
‘তোমার ক্লায়েন্টের কী হল?’
‘মেসেজ করেছে। রাস্তায় আছে। একটু দেরি হবে। সে যখন আসবে তখন আসবে। আমরা ততক্ষণ এক রাউন্ড করে কফি খেতেই পারি। তুই কী নিবি?’
‘মোকা বলো আমার জন্য।’
ওয়েটারকে ডেকে টাপুর দুই কাপ কফির অর্ডার দিল। নিজের জন্য ব্ল্যাক কফি আর মিতুলের জন্য ক্যাফে মোকা। তারপর বলল, ‘হুম যা বলছিলাম। সেইসময় থেকেই সম্ভবত সঞ্জয় পাল প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভেবে রেখেছিল। আর সেই কারণেই অনিরুদ্ধ মল্লিক ছিল তার তিন নম্বর টার্গেট।’
‘কিন্তু সিরিয়াল কিলিং কেন? আর এতদিন অপেক্ষাই বা কেন?’
‘এটা ভালো প্রশ্ন করেছিস। আমিও ভেবেছি এটা নিয়ে। আসলে সঞ্জয় পালের জীবনে পরপর দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে চলেছিল। একটা প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যদি সঞ্জয় ধরা পড়ত বা মারা যেত, সেক্ষেত্রে বাকি কাজগুলো শেষ হত না। তাই সে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছে। প্ল্যান বানিয়েছে। তবে আরেকটা কারণও হতে পারে।’
‘কী কারণ?’
‘সেটা পরে বলছি। আগে বলাই সাহা আর ডক্টর নিরুপমা গোমজের কথা বলে নিই।’
‘বেশ। বলো।’
‘সঞ্জয়ের ছোটো ভাই টুবলুর জন্ম থেকেই হার্টের সমস্যা ছিল। শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল সে। তার স্কুলে গেম টিচার ছিলেন বলাই সাহা। একজন শিক্ষকের কাছে যে সংবেদনশীলতা আশা করা যায়, তা তার ছিল না। ছাত্রদের উপরে কারণে অকারণে নিষ্ঠুর হতেন। মারধোর করতেন। কঠিন শাস্তি দিতেন। টুবলুর শারীরিক দুর্বলতা বলাই সাহার বিরক্তি উৎপাদন করত। ফলে তিনি প্রায়ই কঠোর হতেন তার উপরে। এরকমই একদিন মাঠে রোদের মধ্যে দৌড় করান তিনি টুবলুকে। ছেলেটার হাঁফ ধরে। তার দুর্বল হৃদযন্ত্র আর নিতে পারছিল না। ষোল সতেরো বছরের ছেলেটা বারবার গেম টিচারকে কাতর অনুরোধ করে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। বলাই সাহা ছাড়েননি। কিছুক্ষণের মধ্যে মাঠেই টুবলুর হার্ট অ্যাটাক হয়। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
‘এরপর স্কুল থেকে তার বাড়িতে খবর দেওয়া হলে পরিবারের লোকজন ছুটে আসে স্কুলে। সুবীর পাল ততদিনে মারা গেছে। বাড়ির অভিভাবক বলতে কলেজ পড়ুয়া সঞ্জয়। ভাইকে নিয়ে কোনোমতে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটে সে। বর্ষবরণের সন্ধে। প্রাথমিক চিকিৎসা করে ডক্টর গোমজ স্বামীর সঙ্গে ডিনারে যাবেন বলে বেরিয়ে যান। সঞ্জয় বার বার তাঁকে অনুরোধ করেছিল তার ভাইকে ছেড়ে না যেতে! কিন্তু নিরুপমাদেবীর মতো অভিজ্ঞ চিকিৎসক সেদিন পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে ভুল করেছিলেন। ভেবেছিলেন, টুবলুর বয়স কম। ঠিক লড়ে নেবে। অন্য জুনিয়ার ডাক্তারদের উপর দায়িত্ব ও প্রয়োজনমতো নিৰ্দেশ দিয়ে তিনি হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। তারও ঘন্টা দুয়েক পরে পরপর দুটো হার্ট অ্যাটাক হয় টুবলুর। একটা মাইল্ড হলেও পরেরটা সিভিয়ার ছিল। সেই ধাক্কা সামলাতে পারেনি ছোটো ছেলেটা। মারা যায় ও। আর সঞ্জয়ের হিটলিস্টে আরও দুটো নাম যুক্ত হয় এক দিনের মধ্যে। তবে সময়ে হিসেবে দেখেছি, রেশমির ঘটনাটা এর দুই বছর পরে ঘটেছিল। আগে টুবলুর মৃত্যু হয়েছিল, পরে রেশমির।
ওয়েটার এসে দুটো কফি টেবিলে রেখে গেল। মিতুল চিনির স্যাশে ছিঁড়ে নিজের কাপে ঢালল। চামচ দিয়ে নেড়ে মুখে ঠেকিয়ে বলল, ‘পারফেক্ট। তারপর বলো। দেবাশীষ দত্তের খুনের ঘটনাটা কী?’
‘তোকে তখন বললাম না, পুরোনো খুনগুলোর প্রতিশোধ নিতে দেরি করার পেছনে আরেকটা কারণ থাকতে পারে? এবার সেই কথায় আসি। এরপর সঞ্জয় পুলিশে চাকরি পায়। কয়েক বছর কেটেও যায়। এই সময়েই তার জীবনে আসে বহ্নিশিখা মজুমদার। কীভাবে বা কোথায় তাদের দেখা হয়েছে, কেমন করে প্রেম হয়েছিল, সেসব বলতে পারব না। তবে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ের পর স্ত্রীকে ভাড়াবাড়িতে নিয়ে তোলে সঞ্জয়। সম্ভবত নিজেদের শেয়ালদার বাড়িতে ঘটা একের পর এক দুর্ঘটনার কথা ভেবে নতুন জীবন সে সেখানে শুরু করতে চায়নি। শুনেছি তার মা অনিতাদেবীও ওই বাড়িতে থাকতেন না আর। অন্যত্র বাড়িভাড়া করে থাকতেন। হয়তো সকলেই পুরোনো ঘটনা ভুলে নতুন করে বাঁচতে চেয়েছিল। হয়তো প্রতিশোধের ইচ্ছেটাও মরে এসেছিল তার। কিন্তু ডেস্টিনি। আবারও ডেস্টিনির শিকার হতে হল সঞ্জয়কে। কিংবা বলা ভালো মানুষের নিষ্ঠুরতার….’
‘এক মিনিট। একটু ইন্টারাপ্ট করছি। বলল মিতুল। তুমি বলেছিলে, দেবাশীষ দত্ত সঞ্জয়ের স্ত্রীর বস ছিল। দেখো, চাকরি আমরাও করি। ভালো বস মানে সোনার পাথরবাটি। তা বলে কি আমি তাকে খুন করব? বহ্নিশিখার সেরকম অসুবিধে হলে চাকরি ছেড়ে দিতেই পারত। প্রাইভেট জব। এক্সপেরিয়েন্স থাকলে আবারও পাওয়া যায়।’
টাপুর হাসল। বলল, ‘সব প্রাইভেট জব এক নয় মিতুল। তুই তোর আইটি জব দিয়ে অন্যান্য চাকরির বিচার করিস না। আমি বলছি না তোর চাকরিতে স্ট্রাগল নেই! আছে, আমি জানি। আমি নিজেও ছিলাম এই ফিল্ডে। আমি জানি কতটা চাপের মধ্যে কাজ করতে হয় এখানে। কিন্তু তবু বলব, এখানে না পোষালে সুইচ করা যায়। উপরওয়ালা অশালীন আচরণ করলে এইচ আর-এ জানানো যায়। কিন্তু সব বেসরকারি চাকরিতে এরকম হয় না রে।’ বিষণ্ন মুখে বলল টাপুর।
‘জানি।’
‘দেবাশীষের কিছু অধস্তন সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর নিয়ে জেনেছি, লোকটার চরিত্রও ভালো ছিল না। তার উপর ভয়ঙ্কর মিসোজিনিস্ট। তার ধারণা ছিল মেয়েরা চাকরি করার যোগ্য নয়। যে সমস্ত জুনিয়ার মেয়েরা তার অশালীনতাকে সহ্য করত না, বা তার ইঙ্গিতে সাড়া দিত না, তাদের জীবন বিষবৎ করে তুলত। কাজের বোঝা চাপিয়ে দিত। শ্বাস নেওয়ার সময় পেত না কোম্পানির মহিলাকর্মীরা। বহ্নিশিখার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। ছেড়ে দিতেও পারেনি সে চাকরি। তার ছেলেটির জন্মগত হার্টে ত্রুটি ছিল। হয়তো হেরিডিটি। টুলুরও একই রোগ ছিল মনে আছে তোর?’
মাথা নাড়ল মিতুল।
‘হুম, সেই কারণে প্রচুর টাকার দরকার ছিল তার। বড়োলোক বাবার কাছে সে হাত পাততে পারেনি কারণ বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে সঞ্জয়কে বিয়ে করেছিল সে। অন্যদিকে সঞ্জয়ের বেতন এমন কিছু বেশি ছিল না যাতে করে দুইদিকে সংসার চালিয়ে বাচ্চার চিকিৎসার খরচও চালাতে পারে। যাই হোক, তারপর বাচ্চাটা মারা গেল। শোকে দুঃখে বহ্নিশিখা পাগল হয়ে গেল। ওর বাবা সতীনাথ মজুমদার এসে নিয়ে গেলেন তাকে। এই মুহূর্তে সিনে প্রথমবার সতীনাথবাবুর এন্ট্রি হল।’
‘আচ্ছা, সঞ্জয়বাবু তার স্ত্রীর সঙ্গে কেন থাকতেন না?’
‘বলতে পারব না। তবে আমার ধারণা, মা ও স্ত্রীর কোনোরকম দ্বৈরথের ব্যাপার ছিল। খুব কমন সিনারিয়ো। অন্যদিকে সঞ্জয় পালের মা অনেক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছেন। হয়তো সেই কারণেই মাকে ছেড়ে আসতে পারেননি।’
‘কিন্তু সঞ্জয়ের মা তো ভাড়াবাড়িতে থাকতেন বললে!’
‘সঞ্জয়ও সেখানেই থাকত। স্ত্রীর মৃত্যুর পর শেয়ালদার বাড়িতে ফিরে আসে। সঞ্জয়ের মা জেরায় জানিয়েছেন, তাদের শেয়ালদার বাড়িতে খুব কম সময়ই থেকেছেন তাঁরা। এর আগেও লালবাজারের কাছে বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। সুবীরবাবুর চাকরি যাওয়ার পরে ফিরে এসেছিলেন। ভদ্রমহিলার মতে, ওই বাড়িতে অভিশাপ আছে। ছেলের প্ল্যানের ব্যাপারে নাকি কিছুই জানতেন না তিনি। ওই বুড়ির বাড়িতে সঞ্জয় পালই মা-কে কী বলতে হবে শিখিয়েপড়িয়ে পাঠিয়েছিলেন। ছেলের মৃত্যুতে খুব ভেঙে পড়েছেন। বয়স্ক মানুষ। খারাপ লাগছে।’
‘বেশ। আরেকটা প্রশ্ন। তুমি তো বলেছিলে সতীনাথবাবু জামাইকে মেনে নেননি। তাহলে কেন সঞ্জয় পালের ষড়যন্ত্রের অংশীদার হলেন তিনি?’
টাপুর চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘এই প্রশ্নের উত্তর যে দুজন দিতে পারত, তারা কেউই নেই। তাই এক্ষেত্রেও আসল কারণটা বলতে পারব না। তবে একটা হাইপোথিসিস খাড়া করতেই পারি। একমাত্র মেয়ের অবস্থা দেখে রাগে পাগল হয়ে ওঠেন সতীনাথবাবু। নিজে তিনি একজন চিকিৎসক। তাই হয়তো নিজের নাতির এমন মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারেননি। এমনও হতে পারে যে উন্মত্ত বহ্নিশিখা প্রতিশোধ চেয়েছিল। তাই তার ইচ্ছে পূরণের জন্য তিনিও সঞ্জয় পালের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, খুন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। আসলে, খুন করা খুব কঠিন রে মিতুল। আমরা সকলেই জীবনের কখনো-না কখনো রাগে কাউকে খুন করার কথা ভাবি। কিন্তু করতে পারি কি?’
মাথা নাড়ল মিতুল।
‘সতীনাথবাবু ভেবেছিলেন, তিনি দেবাশীষকে খুন করতে পারবেন না। সেই কারণেই জামাইয়ের উপরে নির্ভর করতে হয়েছিল তাঁকে। জামাইয়ের সিরিয়াল কিলিং- -এর প্ল্যান শোনেন তিনি। সবরকম সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। সাহায্যও করেন। এম জি রোডের সিসিটিভিতে যে বাইক-আরোহীকে দেখা গিয়েছিল, সে কিন্তু সঞ্জয় পাল নয়। সতীনাথ মজুমদার। সঞ্জয়ের উচ্চতা মাঝারি। অন্যদিকে সতীনাথবাবু ছয় ফুটের মতো লম্বা। পুলিশকে বিভ্রান্ত করাই ছিল উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্যে ওমর রিকশাওয়ালাকে টাকার লোভ দেখিয়ে মিথ্যে বয়ান দেওয়াতে অসুবিধে হয়নি। পরবর্তীতে হয়তো সে সঞ্জয়কে ব্ল্যাকমেল করছিল। তখন তাকে বিষ ইঞ্জেকশন সঞ্জয়ই দিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে জ্ঞানহীন অবস্থায় ফেলে রাখার দায়িত্ব কিন্তু সতীনাথ মজুমদারই নিয়েছিলেন। হয়তো এটাই ডিল ছিল। সাহায্য তিনি করবেন। পরিবর্তে বহ্নিশিখার হয়ে প্রতিশোধ নেবে সঞ্জয়।’
৫৭
‘সেদিন তোমাকে সতীনাথবাবু কেন কিডন্যাপ করলেন, টাপুরদি?’ মিতুল জানতে চাইল।
‘আমাকে তিনি বলেছিলেন, আমি নাকি অনেক বেশি জেনে গেছি। তাই তাঁর কাজ শেষ না হওয়া অবধি আমাকে ছাড়তে পারবেন না তিনি। অথচ দেখ, সেই রাতে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে না গেলে তাঁকে হয়তো পুলিশ ধরতেও পারত না।’ বলল টাপুর।
‘ভদ্রলোক ওভার কনফিডেন্সে ভুগছিলেন। কিন্তু যাই বলো টাপুরদি, সতীনাথবাবুর মতো চিকিৎসক, যিনি নাকি গরিব মানুষের কাছে ভগবান, তিনি যে মানুষ খুন করতে পারেন সে কথা কে ভেবেছিল!’
টাপুর একটু অন্যমনস্ক হল। বলল, ‘এ নিয়ে গত ক-মাসে অনেক ভেবেছি, জানিস মিতুল। অর্জুনের কাছে ভদ্রলোক সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি, মেয়ের জন্মের বছরখানেকের মধ্যেই স্ত্রীবিয়োগ হয় তাঁর। এরপর আর বিয়ে করেননি। মেয়েকে ঘিরেই ছিল তাঁর জীবন। মেয়েকে চক্ষে হারাতেন। সেই মেয়েই যখন বাবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করেছিল, তখন দুঃখ পেয়েছিলেন তিনি। নিজেকে নাকি গুটিয়ে নিয়েছিলেন। সেইসময় থেকেই বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ কমে আসে তাঁর। অথচ, অর্জুনের বাবার ছোটোবেলার বন্ধু ছিলেন তিনি। কলকাতায় মিশনে একসঙ্গে পড়তেন।
‘একটা ব্যাপার আমার আশ্চর্য লেগেছে। সতীনাথবাবুর বয়স ষাটের আশেপাশে। অথচ কত সহজে উনি তোমাকে কাবু করে ফেললেন।’
টাপুর হাসল। বলল, ‘শুধু কাবু? আমাকে কাঁধে তুলে বয়ে নিয়ে গেছেন তুলোর বস্তার মতো। অর্জুনের থেকে জানলাম, ভদ্রলোক অল্প বয়স থেকে বক্সিং করতেন। ওয়েস্টবেঙ্গল স্টেট লেভেল বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে জিতেছিলেন সতেরো বছর বয়সে। এরপর কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি বক্সিং চালিয়ে গেছেন। ন্যাশনাল বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপে অংশগ্রহণ করেন পঁচাশি সালে। কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি ওঠার পর লিগামেন্টে চোট পেয়ে সরে যেতে হয়। এরপর প্রফেশনাল রিং থেকে বিদায় নিলেও অভ্যেস ছাড়েননি। নিয়মিত শরীরচর্চা ও বক্সিং প্র্যাকটিস করতেন বাষট্টি বছরে পৌঁছেও।’
‘যাক, নিশ্চিত হলাম।’ গম্ভীর মুখে বলল মিতুল।
‘কেন?’
‘না, একজন বাষট্টি বছরের লোকের কাছে তোমার হেরে যাওয়া মানতে পারছিলাম না। এখন প্রোফাইল শুনে মনে হল, তাহলে চলতে পারে।’
হেসে উঠল টাপুর।
‘আচ্ছা টাপুরদি, একটা কথা বলো। সঞ্জয়কে কেন খুন করলেন সতীনাথবাবু?’
‘সঞ্জয়ও আসলে ছিল সতীনাথবাবুর অপরাধী। জামাইকে কোনোদিনই ক্ষমা করেননি তিনি। হয়তো মনে মনে বহ্নিশিখার অবস্থার জন্য সঞ্জয়কেই দায়ী করতেন সতীনাথবাবু। তাই সঞ্জয় দেবাশীষ দত্তকে খুন করার পরে তার প্রয়োজন ও ফুরিয়েছিল সতীনাথবাবুর কাছে। প্রথম সুযোগেই ওকে বিষ খাইয়েছিলেন তিনি। যদিও পরে সঞ্জয়ের শেষ কাজটা তিনি শেষ করতে চেয়েছিলেন। আসলে কী বল তো, সঞ্জয় বল বা সতীনাথবাবু, দুজনের কেউই মানসিকভাবে সুস্থ তো নন। যে বা যারা এভাবে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে একের পর এক মানুষ খুন করতে পারে, তারা অসুস্থ। তাই কোন ভাবনার বশবর্তী হয়ে সঞ্জয়কে বিষ দিয়েছিলেন তিনি, তা বলতে পারব না! তবে সেদিন তিনি না মারলে সন্দীপ দাসের ক্ষমতা ছিল না সঞ্জয়কে মারার। সঞ্জয়ের প্রায় মৃত শরীরটার উপর ছুরি চালিয়েছিল সে। সেটাও ঠিকমতো মারতে পারেনি। আঘাত গভীর ছিল না। সঞ্জয় সুস্থ থাকলে, জেগে থাকলে হয়তো আরেকটা খুন বাড়ত। সঞ্জয়ের জায়গায় ওখানে সন্দীপ দাসের বড়ি পড়ে থাকত।’
‘বলছি এই কেসে টাকাকড়ি কিছু মিলল? নাকি পুরোটাই সোশাল ওয়ার্ক? মানে পুলিশ তো তোমাকে সেভাবে ক্রেডিটও দেয়নি দেখলাম।’
টাপুর হাসল। বলল, ‘এটা কলকাতা পুলিশের মিশন ছিল। আমার খুব বেশি কিছু করার ছিল না। করিওনি সামান্য সাহায্য করা ছাড়া। সেটুকু আমাকে ছাড়াও হতে পারত রে মিতুল। আর সাহায্য তো তুইও করেছিস। সেদিন তুই আমার ফ্ল্যাটে গিয়ে আমার স্মার্টফোনের লোকেশন অর্জুনকে না জানালে ওরা কখনোই ঠিকসময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছোতে পারত না।’
‘তাই তো। সেই জন্য একদিন ফাইভ স্টার ডিনার করাবে তুমি আমাকে। মনে থাকে যেন! তবে তুমি একটুও ক্রেডিট পেলে না, সেজন্য রাগ হচ্ছে আমার।’
‘একেবারে কিছুই যে পাইনি, তা নয় অবশ্য।
‘পেয়েছ?’ লাফিয়ে উঠে জিজ্ঞাসা করল মিতুল।
টাপুর হাসিমুখে বলল, ‘মুখ্যমন্ত্রী ডেকেছিলেন অফিসে। নেহাত খালি পকেটে ফিরতে হয়নি।’
‘গ্রেট!’ হাসল মিতুল। কবজি উলটে ঘড়ি দেখল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার ক্লায়েন্ট কোথায় গো?’
টাপুর মুখ টিপে হেসে বলল, ‘এই এলো বলে। ওই তো এসে গেছে।’
দরজার দিকে ঘুরে তাকাল মিতুল। দেখল দরজা ঠেলে ঢুকছে অর্জুনদা। সেই রাতে ছোরার আঘাত গভীর ছিল। হাসপাতালে প্রায় সাত দিন যমে-মানুষে লড়াই চলেছিল। টাপুরদিকে সেই প্রথমবার কাঁদতে দেখেছিল মিতুল।
তারপরে কেটে গেছে ছয় মাস। সকলের প্রার্থনার কারণেই হোক, বা ডাক্তারের হাতযশে, অর্জুনদার বিপদ কেটেছিল। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে সময় লেগেছিল যদিও। খবরের কাগজ, নিউজ চ্যানেল থেকে কলকাতা পুলিশের ফেসবুক পেজ পর্যন্ত সর্বত্র অর্জুনদার ছবিতে ছবিতে ছয়লাপ ছিল সেইসময়টা। অথচ মানুষটা নিজে তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে চলেছিল হাসপাতালের বেডে শুয়ে।
আজ অর্জুনদাকে বেশ তরতাজা দেখাচ্ছে। আবার আগের মতো প্রাণশক্তিতে ভরপুর। পরনে সাদা শার্ট কনুই অবধি গোটানো, ব্লু ডেনিম আর সাদা স্নিকার।
‘অর্জুনদা? তোমার ক্লায়েন্ট?’
অর্জুন হাসিমুখে চেয়ার টেনে বসল। বলল, ‘ক্লায়েন্টই বটে। কেন টাপুর তোমাকে বলেনি কিছু?’
‘কী বলবে?’ মিতুল ভুরু কুঁচকে টাপুরের মুখের দিকে তাকাল। সে ঠোঁট টিপে হাসছে। অর্জুনও।
‘তোমরা আমাকে বলবে কিছু?’
অর্জুন হাত উলটে বলল, ‘দেরি করে এলাম। ভাবলাম টাপুর তোমাকে সব জানিয়ে রাখবে। ও হরি, এখনও সে মুখই খোলেনি। আমাকে বলতে হবে দেখছি। মানে ব্যাপারটা হল গে, হাসপাতালে মরতে বসে মনে হল, মরেই যদি যাই, তাহলে জীবনের আসল কাজটাই অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। ভদ্রমহিলা এমনিতে তো ঘাড় পাতেন না। অসুখের সুযোগে যদি ডিলটা করিয়ে নেওয়া যায়…’
‘কীসের ডিল?’ বড়ো বড়ো চোখ করে জিজ্ঞাসা করল মিতুল।
‘ওই আর কী! বাকি জীবনের জন্য আমার দায়িত্ব নেওয়ার।’
মিতুল একবার অর্জুনদার মুখের দিকে, একবার টাপুরদির মুখের দিকে পর্যায়ক্রমে তাকাল। দুজনেই প্রাণপণ হাসি চাপার চেষ্টা করছে।
‘তার মানে তোমরা অফিশিয়ালি ডেট করছ? সত্যি?’
টাপুরের গাল, নাকের ডগার রক্তিমাভা। অর্জুন মাথা নীচু করে টেবিলের উপর টকটক করে আঙুল দিয়ে তবলা বাজাচ্ছে। ওয়েটার এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘আর কিছু দেব? কফি?’
টাপুর হুঙ্কার দিয়ে উঠল।
‘নিকুচি করেছে কফির। আজ ভরপেট লাঞ্চ করব। টাপুরদি, অর্জুনদা, বিল কে দেবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ডিসাইড করে নাও। হু!’
॥ পরিশিষ্ট।।
রবিবার সকালবেলাটা নিজের প্রাসাদোপম বাড়ির লনে জন আদালত চালান বিধায়ক সুভাষ সরখেল। সকাল আটটা নাগাদ পাটভাঙা সাদা শার্ট ও ট্রাউজার পরে এসে বসেন। তাকে তখন দেখায় অনেকটা ঈশ্বরের মতো। যেন হাত উল্টোলেই সকলের সব মনস্কামনা পূরণ করতে পারেন তিনি।
মনস্কামনা! নিজের মনে হাসেন সুভাষ সরখেল। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন। বাবা ছিল স্কুলমাস্টার। লেখাপড়ায় কোনোদিনই মাথা ছিল না তার। স্বপ্ন হোক, বা মনস্কামনা, একটাই ছিল তার। ধনী হওয়া। ক্ষমতাবান হওয়া। অল্প বয়সে রাজনীতি শুরু করেছিলেন। একটা জিনিস বুঝেছিলেন, নেতা হয়ে ক্ষমতা পাওয়া যাবে। মিলবে অর্থও। তবে সেটা সময়সাপেক্ষ। সুযোগ চেনার বুদ্ধি চাই।
সুযোগ এসেছিল আকস্মিকভাবেই। বিলালের সঙ্গে সেটিং-টা ভালোই চলছিল। অর্থাগমও মন্দ হচ্ছিল না। খিদে বাড়ছিল তাঁর। এরপর বিলাল অ্যারেস্ট হল। সেই অ্যারেস্টের পেছনেও তাঁরই হাত ছিল। ব্যাটার নোলা এতটাই বেড়েছিল, সে এক্সটরশন মানি আদায় করতে গেছিল সুভাষবাবুর শালার থেকেই। ওই প্রোজেক্টে বেনামে তাঁর নিজেরও ইনভেস্টমেন্ট ছিল। সুতরাং বিলালের ডানা ছাঁটতেই হয়েছিল সুভাষবাবুকে। এরপর বিলালের সঞ্চিত সব অর্থ সুভাষ সরখেলের হাতে এসেছিল কাকতালীয়ভাবেই।
লতিকার উপর অনেকদিন ধরেই দৃষ্টি ছিল সুভাষ সরখেলের। বিলাল জেলে যেতেই লতিকাকে বিছানায় তোলার বন্দোবস্ত করা গেল। বিলালের বিছানা গরম করতে পারলে তাঁরই বা পারবে না কেন! কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, লতিকা নরম মেয়েছেলে নয়। প্রস্তাব দিতেই কালনাগিনীর মতো ফোঁস করে উঠল। জোর করতে জানা গেল, মেয়েটা পেট বাঁধিয়ে বসে আছে। বাচ্চা বিলালের।
তাতেও অবশ্য আপত্তি ছিল না সুভাষ সরখেলের। যে মেয়ে ফোঁস করতে জানে, সহজে ধরা দেয় না, তাকে বাগে আনার মধ্যে আলাদাই উত্তেজনা আছে। কিন্তু সেইসময়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল বাদশা। সুভাষ সরখেলের পায়ে পড়ে গেছিল ও। বলেছিল, বিলালের সব সম্পত্তির সন্ধান ও জানে। পরিবর্তে শুধু লতিকাকে ছেড়ে দিতে হবে।
তা ছেড়েছিলেন সুভাষ। মেয়েমানুষ যাবে আসবে। কিন্তু বিলালের সম্পত্তির হিসেব কম হবে না। লোভে জিভ লকলক করে উঠেছিল তাঁর। রাজি হয়ে গেছিলেন তিনি। বাদশা পেল বিলালের মেয়েছেলে, পেটে বিলালের বাচ্চাসহ। পরিবর্তে সুভাষ সরখেল পেলেন রাশি রাশি অর্থ। অগুন্তি।
অর্থ থাকলে কী না হয়! মাঝারি মাপের নেতা থেকে বিধায়ক অবধি উত্তরণের পথটা তারপর নিতান্তই সহজ ছিল। এখন বয়স হয়েছে। বেঢপ মোটাও হয়ে পড়েছেন। পার্টির কাজকর্ম বেশি করতে পারেন না। তবে সপ্তাহে তিনদিন সকালে নিজের বাড়ির লনে এসে বসেন। ঘন্টা দুয়েক এলাকার লোকদের অভাব অভিযোগ শোনেন। তাদের আশ্বাস দেন। পাশে দাঁড়িয়ে তার সেক্রেটারি প্রয়োজনমতো নোটস নেয়। এবারে শোনা যাচ্ছে, লোকসভাতে টিকিট পেটে পারেন। বিধায়ক হওয়ার চেয়ে সাংসদ হওয়া সবসময়েই মুনাফার। তার উপর অ্যাটাকের পর থেকে জনমানসে তাকে নিয়ে একটু সফট কর্নার তৈরি হয়েছে। সামনে কয়েক মাসের মধ্যে লোকসভা নির্বাচন। সেটাকেই কাজে লাগাতে চায় তার পার্টি। তবে এখনও কেউ জানে না, বিরোধীদের তরফেও তাঁকে তাদের পার্টিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জিতলে সোজা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। নিদেন পক্ষে প্রতিমন্ত্রী তো বটেই। তবে বিরোধীদের আসন এখনও এ রাজ্যে একটু টলমলে। অম্লান চক্রবর্তীর গ্রহণযোগ্যতা এখনও এ রাজ্যের মানুষের কাছে কিছুটা হলেও বেশি। তাই সিদ্ধান্ত নিতে একটু সময় নিচ্ছেন সুভাষ
একনাগাড়ে অনেকের কথা শুনে ক্লান্ত লাগছে। বেলা দশটাতেই বেশ চড়া রোদ। সকালে লুচি, আলুর দম খেয়েছেন। অম্বল হয়ে গেছে। গলাবুক জ্বালা করছে। ‘আর কেউ আছে বিনোদ?’ পাশে দাঁড়ানো সেক্রেটারিকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি
সেক্রেটারি বিনোদ বসু গত প্রায় পনেরো বছর ধরে তাঁর জন্য কাজ করছে। সে বলল, ‘এক মহিলা সমবায় সমিতির মেম্বার এসেছেন একজন, বড়দা। বিধবা, অনাথাদের নিয়ে কাজ করে ওরা। টুকটাক হাতের কাজ, বড়ি, আচার বানিয়ে বিক্রি করে। এন জি ও মতো। ওদের বিজনেসের মূলধন কম। তাই সমস্যা হচ্ছে। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। যদি সরকারের তরফ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যায় সেই আশায় এসেছে।’
নাক কুঁচকে মুখটা বিকৃত করলেন সুভাষ সরখেল। বললেন, ‘ধুর ধুর, সকলের শুধু চাই আর চাই। টাকা কি গাছ থেকে পড়ে নাকি? বেশি সময় দিতে পারব না। যাও আসতে বলো।’
লন দিয়ে হেঁটে আসা মহিলার দিকে তাকিয়ে সুভাষ সরখেল আবারও হতাশ হলেন। ভদ্রমহিলা প্রায় বৃদ্ধা। এরা এটুকুও বোঝে না, সুন্দরী কচি মেয়েরা এসে কোনোকিছুর জন্য অনুরোধ করলে তবু চেষ্টা করতে ইচ্ছে করে। এইসব বুড়িধুরিদের এসব কাজে পাঠায় কেন কে জানে! তার মধ্যে চেহারা দেখো। মুখ দেখে মনে হয় কড়া আঁচে ঝলসে গেছে এমন কালো!
মহিলা এগিয়ে এসে হাত জোর করলেন।
‘আমি অনিতা পাল। আমরা বিধবা, অনাথা মেয়েদের নিয়ে একটা সমবায় চালাই।’
সুভাষ সরখেল মাথা নাড়লেন। অনিতা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট প্যাকেট বের করে সুভাষবাবুর হাতে দিলেন। বললেন, ‘আমাদের বানানো হজমি। খেয়ে দেখুন। হজমের সমস্যা, অ্যাসিডিটি কমায়।’
সুভাষবাবু প্যাকেটটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। বললেন, ‘অ্যাসিডিটি কমবে?’
‘টেস্ট করে দেখুন স্যার। আমাদের এই হজমির বিক্রি সবচেয়ে বেশি। বিক্রি করে কুলোতে পারি না। তাই সরকারের তরফে একটু সাহায্য পেলে ব্যাবসাটা বাড়াতে পারতাম। মেয়েগুলোর একটু সুরাহা হত।’
সুভাষ সরখেল প্যাকেট খুলে তিন-চারটা হজমি বড়ি তুলে মুখে পুরলেন। ছোটো ছোটো মার্বেলের গুলির মতো আকার। বেশ টকমিষ্টি স্বাদ। বললেন, ‘বেশ তো। আপনাদের ঠিকানা আর যোগাযোগের নম্বর রেখে যান বিনোদের কাছে। একদিন না হয় গিয়ে ঘুরে আসব। দেখে আসব কেমন কাজ করেন আপনারা। মেয়েদের সঙ্গেও আলাপ-পরিচয় হবে।’
সুভাষ সরখেলের দৃষ্টির ইশারা পড়ে নিতে অসুবিধে হয় না অনিতার। মাথা নাড়েন তিনি। ব্যাগ থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে বিনোদবাবুর হাতে দেন তিনি। তারপর যে পথে এসেছিলেন, সেই পথেই বেরিয়ে যান। বাইরে এসে রাস্তা পার করে একটা বাসে উঠলেন অনিতা পাল। ব্যাগটা খুলে একটা ফোটোগ্রাফ বের করলেন। স্বামী, দুই সন্তান নিয়ে ভরা সংসারের ছবি। ঠোঁটের কোণে একটা ক্লান্ত, বিষণ্ণ হাসির রেখা ফুটে উঠল তার। আরেকটা হজমিগুলির প্যাকেট বের করে কয়েকটা গুলি মুখে দিলেন। তারপর চোখ বুঝে মাথাটা এলিয়ে দিলেন বাসের সিটে। সঞ্জয়ের বাকি রেখে যাওয়া কাজ শেষ করে এসেছেন তিনি। প্রমোদ বৈরাগীর সব কালো ব্যাবসার হালহদিশ ফাইলে ভরে স্পিড পোস্টে পাঠিয়ে দিয়েছেন অফিসার অর্জুন রায়ের ঠিকানায়।
‘টিকিট…. টিকিট….,’ কনডাক্টর সামনে এসে দাঁড়াল। ‘কোথায় যাবেন?’
‘এ গাড়ি কোথায় যায়?’ ক্লান্ত চোখ খুলে জিজ্ঞাসা করলেন অনিতা পাল।
‘ধর্মতলা। কোথাকার দেব?’
‘লাস্ট স্টপেজ।’ বলে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে কন্ডাক্টরের হাতে দিলেন। কন্ডাক্টর খুচরো ফেরত দিয়ে এগিয়ে গেল। অনিতা পাল আবারও চোখ বুজলেন
পুলিশ কোনোদিন জানবে না, পুরো খেলাটার মাস্টারমাইন্ড আর কেউ নয়, তিনি স্বয়ং। সঞ্জয় শুধু মায়ের কথামতো প্রতিটি স্টেপ এক্সিকিউট করেছে। পরিকল্পনাটা তো আর আজকের নয়। অনিতার স্বামী সুবীর পালের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ সুবীর নিজেই নিতে চেয়েছিলেন। বেঁচে থাকলে নিতেনও ন সুবীর চলে গেলেন রোড অ্যাক্সিডেন্টে। একের পর এক দুর্যোগের ঘনঘটা নেমে এল তাদের পরিবারে। স্বামীর ফেলে যাওয়া কাজের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন অনিতা। প্রতিশোধের কুরুক্ষেত্রে তার সারথি সঞ্জয়। বেড়ে চলল হিটলিস্টও।
মাঝে অবশ্য বিয়ের পর সঞ্জয়ের মন বদলে গেছিল। অনেক বুঝিয়েও লাভ হয়নি কিছু। একটা বাইরের মেয়ের জন্য পরিবারের প্রতি কর্তব্য ভুলে গেছিল সে। নিভে যাচ্ছিল ওর প্রতিশোধের ইচ্ছেটাও। সেইসময়ে বাচ্চাটা মারা যাওয়ায় আবার ফিরে এল সঞ্জয়। তাতে কী! পুত্রবধূর হয়েও প্রতিশোধের পরিকল্পনা তো অনিতা পাল নিজেই করেছিলেন। সঞ্জয়ের মৃত্যুতে দুঃখ নেই তাঁর। সতীনাথ মজুমদারের জন্যে তো নয়ই। শুধু কাজটা সেরে যেতে পারল না বুড়োটা। একটা বাচ্চা মেয়ের কাছে হেরে গেল।
বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে যায় অনিতা পালের। সবই হল। শুধু খেলার প্যাটার্নটা নষ্ট হয়ে গেল, এই যা। তবু ভালো লাগছে আজ। এবার নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারেন অনিতা। এই বাস গন্তব্যে পৌঁছোনোর আগেই নিজের আপনজনেদের কাছে পৌঁছে যাবেন তিনি। খেলা শেষ।
***
