প্রলয় ঘূর্ণি – ১

২ ডিসেম্বর, সোমবার, এম জি রোড, কলকাতা, রাত দেড়টা

শেয়ালদা স্টেশনের কাছে এম জি রোডের যে দিকটায় সারসার সস্তার লজ, হোটেল, মেসগুলি কোনোক্রমে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, মহানগরীর ক্রমবর্ধমান জনবসতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা রাজ্য এমনকি রাজ্যের বাইরে থেকে ছেলেমেয়েরা চাকরি বা উচ্চশিক্ষার আশায় এসে ভিড় জমায় যেখানে, সারাদিনের সেই কোলাহলমুখর রাস্তাটি রাত বাড়লেই কাশ-কফ-বাতব্যাধিগ্রস্ত বৃদ্ধার মতো ধুঁকতে ধুঁকতে ঘুমিয়ে পড়ে একসময়, তখনই সেই ঘুমন্ত রাজপথে জেগে ওঠে অন্য এক কলকাতা। সেই কলকাতার অন্ধকার রাতের চেয়েও গভীর, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের চেয়েও শ্বাসরোধী। দারিদ্র্য, হতাশা, নিত্য জীবনযুদ্ধের সঙ্গে অপরাধ, মহানগরীর পাতাললোকে হাত ধরাধরি করে বাঁচে সেখানে।

সেই রাস্তা দিয়ে এই মুহূর্তে উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে চলেছে এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি। চেহারা দেখে মনে হয় বয়স পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবে। প্রাণপণ চেষ্টা করছে সে পা দুটোকে বাগে আনতে। একটা সময় ছিল যখন বোতলের পর বোতল পেটে ঢেলেও পা কাঁপত না তার। এখন এত বছরের অনভ্যাসে মদ আর সয় না। বয়স বাড়ছে, শরীরেও এখন নানান রোগ ঘাঁটি গেড়েছে। তবু আজ অনেকটা মদ খেয়েছে লোকটা, ঠিক যতটা নেশা হলে বুকের জ্বালাযন্ত্রণাগুলো ঢাকা পড়ে যায়।

কথাটা মনে আসতে নিজের মনেই হেসে ফেলে বিলাল। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, লোকটার নাম বিলাল শেখ। একসময় শরীরে অসুরের মতো শক্তি ছিল বিলালের। ছিনতাই, ডাকাতি থেকে খুনজখম এমন কোনো অপরাধ ছিল না যা করতে বিলালের হাত কাঁপত। আহা, সেসব অন্যরকম দিন ছিল। প্রতিদিন সকালে উত্তেজনা নিয়ে ঘুম ভাঙত তার। নিয়মিত মুগুর ভাজা শরীরটা ছিল লোহার মতো কঠিন। সেই সময় বিলাল শেখের নামে শেয়ালদা চত্বর কাঁপত।

আজ আর সেই রামও নেই, অযোধ্যাও নেই। জীবনে বড়ো বড়ো অপরাধ করে পুলিশের হাতে ধরা পড়েনি যে লোক, সামান্য একটা এক্সটর্শন কেসে তাকে জেলে যেতে হল। ভুঁইফোঁড় এক বিল্ডারের থেকে টাকা চেয়েছিল। বিলালের এলাকায় একটা ইটও তার অনুমতিব্যতীত, বলা ভালো তাকে নজরানা না দিয়ে গাঁথা চলত না সে সময়ে, সেখানে নতুন বিল্ডার শুরুতেই বেশ ব্যাবসা সাজিয়ে বসেছিল। জমির চারপাশে দেওয়াল তুলে বিশাল লোহার গেট লাগানোও হয়ে গেছিল। বিলালের কাছে খবর ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু যে বিলালের কাছে তার এলাকার কোনো খবরই চাপা থাকত না, কে জানে কেমন করে সেবার সে জানতে পারেনি সেই বিল্ডারের মাথায় বড়ো মানুষের হাত ছিল। ফলে বেশ কয়েকবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও যখন বিল্ডার টাকা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ দেখাল না, তখন বিলালের ছেলেরা বিল্ডারের অফিসে গিয়ে সামান্য ভাঙচুর চালিয়ে এসেছিল।

পুলিশও অনেকদিন ধরে বিলালের পেছনে পড়ে ছিল। এবারে সুযোগ পেয়েই একগাদা কেস দিয়ে দিল তার নামে। যদিও সেই কেসগুলোর বেশিরভাগই তারই কীর্তি, তবু প্রমাণ ছিল না কিছু। কিন্তু প্রমাণ হল। জেলে টানা তিনদিন থার্ড ডিগ্রির পর মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছিল বিলাল। চোদ্দ বছর জেল খেটে যখন বেরিয়ে এল, দেখল তার রাজত্ব আর তার নেই। এলাকার নতুন ছেলে ছোকরারা তাকে পাত্তা দিল না।

বিয়েশাদি করেনি বিলাল। তবে লতিকা তার বউয়ের চেয়ে কম কিছু ছিল না। সেই লতিকাও বিলালেরই একসময়ের খাস শাকরেদ বাদশার সঙ্গে ঘর বেঁধেছে। একটা ছেলেও আছে তাদের। প্রথম দিন বিলালকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল লতিকা। বাড়ির উঠোনে কাপড় মেলছিল ও। ভেজা কাপড়টা উঠোনে পড়ে গেছিল হাত থেকে। ভয়ে সাদা হয়ে গেছিল ওর সুন্দর মুখটা। বাঁশপাতার মতো থরথর করে কাঁপছিল। কাঁপা গলাতেই বলেছিল, ‘তুমি!’

‘কেমন আছিস রে?’ জিজ্ঞাসা করেছিল বিলাল।

‘তোমার ছুটি হয়ে গেছে?’

‘হ্যাঁ, আজই সকালে বেরিয়েছি। বেরিয়েই তোর কাছে এলাম। খুব খিদে পেয়েছে। খাবারদাবার আছে কিছু?’ খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল বিলাল, যেন কিছুক্ষণের জন্য বাইরে কোনো কাজে গেছিল।

লতিকার মধ্যে সেখান থেকে নড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। ঠিক তখনই ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল ছেলেটা, পেছনে পেছনে বাদশা। নেহাত বাচ্চা ছেলে নয়। বারো তেরো বছর বয়স তো হবেই। বয়ঃসন্ধির রুক্ষতা চোখেমুখে। অপরিচিত ব্যক্তি দেখে ভুরুতে কুঞ্চন। লতিকার মুখখানা যেন কেটে বসানো। বাদশাকে দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল বিলাল। বাচ্চা ছেলে হলে তবু না হয় স্নেহভাব জাগার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এই কিশোরকে দেখে তা হল না। বরং বিরক্তি এল। কথা খুঁজে না পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘নাম কী রে তোর?’

বিলালের চেহারা, চোয়াড়ে কথার ধরন বোধ হয় ঠিক পছন্দ হয়নি ছেলেটার। ভুরুর কুঞ্চন গভীরতর হয়েছিল। নিতান্ত অনিচ্ছাস্বত্তেও জবাব দিয়েছিল, ‘অভিষেক হাঁসদা।’

সেই মুহূর্তে মুখ তুলে বাদশার দিকে তাকিয়েছিল বিলাল। বিলাল যখন এই চত্বরের মুকুটহীন সম্রাট ছিল, বাদশা ছিল তার ডান হাত। সে তো ভুলেই গিয়েছিল যে বাদশার আসল নাম শ্যামল হাঁসদা। বাদশা একটাও কথা বলেনি। বিলাল লতিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘আসি রে!’

সেই যে চলে এসেছিল, গত পনেরো দিনে আর ও মুখো হয়নি বিলাল। এই কদিনে সে ভালোমতোই বুঝে গেছে যে যে রাজত্ব সে ফেলে গেছিল, তা আর বিলালের নেই। নতুনকে জায়গা ছেড়ে দিতেই হয়। তার দলের ছেলেদের কেউ নেই আর তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। কেউ কেউ এই অন্ধকারের দুনিয়া ছেড়ে ঘোরতর সংসারী বাদশার মতো। কেউ কেউ নতুন সম্রাটের আশ্রয়ে আছে। দু-চারজনের ঠাঁই হয়েছে হাজতে। বেশিরভাগেরই কোনো পাত্তা নেই। বিলাল জেলে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বাদশা লতিকাকে বিয়ে করেছে, খবর নিয়ে জেনেছে বিলাল। বিয়ের পর শুরু শুরুতে ছুতোরের কাজ করত, এখন নাকি বড়োবাজারে একটা ফার্নিচারের দোকান দিয়েছে বাদশা।

কথাটা মনে আসতেই দমচাপা হাসির বাষ্প পেটের ভেতর গুড়গুড়িয়ে উঠল বিলালের। এই বাদশার হাতে জাদু ছিল। ছুরি-ছোরা, ক্ষুর ডেকে কথা বলত। বাদশা গলায় ক্ষুর চালালে শিকার নিজেও টের পেত না। ওর নামই হয়ে গেছিল ক্ষুর-চেরা বাদশা। আজ সেই হাত কিনা নিরিমিষ করাত চালায়। আপন মনে হাসতে হাসতেই পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরাল। লতিকা বিড়ির গন্ধ পছন্দ করত না। বলত, ‘ছিগারেট খা। ছোটোলোকের মতো বিড়ি খাবিনে বিচ্ছিরি গন্ধ, আমার ঘেন্না করে। ছিঃ!’

বিলাল ওর থুতনি ধরে নেড়ে দিয়ে বলত, ‘সিগারেট খেলে তো কোট-প্যান্ট পরতে হবে লতিকারানি।’

লতিকা হেসে বলত, ‘পরবি। তোর তো এত টাকা। কোট-প্যান্ট পরলে তোকে জোশ লাগবে।’

বিলাল ওকে কাছে টেনে বলত, ‘বিলাল শেখ যা পরে তাই ফ্যাশান। এই শ্যালদা চত্বরের রাজা হলাম আমি জানেমন। আর তুই রানি। শ্যালদা ইস্টিশানের কোন্ গাড়ি থেকে কী মাল নামছে, কোন্ গাড়িতে কী মাল উঠছে বিলাল শেখের কাছে সব খবর থাকে। আমাকে এড়িয়ে এখানে একটা মাছিও গলতে পারে না।’

লতিকা আদুরে মার্জারির মতো বিলালের বাহুবন্ধনে গলতে থাকত, গলে যেত। হাসলে লতিকার ডান গালে টোল পড়ত। সেদিন তো টোলটা কই চোখে পড়ল না! মাত্র চোদ্দ বছরে কি একটা আস্ত টোল হারিয়ে যায়! যেতে পারে!

লতিকা আর আগের লতিকা নেই। তাতে কী! সেও তো এখন আর সেই আগের বিলাল নেই। পুলিশি অত্যাচার আর দীর্ঘ জেলযাপন যথেষ্ট প্রভাবও ফেলেছে বিলালের দেহে। তার সেই লোহার মতো শরীর শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেছে। পাঁজরার হাড় ক-টা খালি চোখে গোনা যায়। পেটে মাঝেমধ্যে ভীষণ ব্যথা করে, কে জানে বড়োসড়ো কোনো রোগ বাসা বাঁধল কি না!

তবে রোগের ভয় পায় না বিলাল। ভয় অন্য জায়গায়। যখন সে এই চত্বরের সিংহ ছিল, সেই সময়ে তার অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল। অন্ধকার দুনিয়ায় বন্ধুরা ভুলে গেলেও শত্রুরা সহজে ভোলে না। তা ছাড়া বিলালের সেই রোয়াব নেই, সে এখন নখদন্তহীন সিংহ। পুরোনো শত্রুরা অনেকেই জেনে গেছে তার জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার খবর। তাদের ব্যাবসায় শত্রুর ক্ষমা নেই। কারণ আজ তাকে ক্ষমা করে ছেড়ে দিলে হয়তো কাল বিলালই ঘুরে দাঁড়িয়ে ওদের আবার আঘাত করবে। বিলাল জানে, তাকে বাঁচতে দেবে না ওরা। তবে শুধু শত্রুরাই নয়, পুরোনো খবরিদের দুই একজনও মনে রেখেছে তাকে। কখনো হয়তো বিলাল তাদের কোনো সাহায্য করেছিল। এরা উপকারীর উপকার ভোলে না। সেরকমই দুই একজন নিজেরাই যেচে এসে দেখা করেছে বিলালের সঙ্গে। তাদের কাছেই খবর পেয়েছে বিলাল, তাকে যে কোনো মুহূর্তে খালাস করে দেওয়া হতে পারে।

বিড়ির শেষভাগটুকু রাস্তার পাশে ছুড়ে ফেলল সে। পেটের ব্যথাটা বাড়ছে। হাঁটতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে তার। লতিকার মুখটা মনে পড়ছে। জেলে না গেলে আজ লতিকা তার বউ হত। ছেলেটা বিলালের হত।

লতিকাকে একবার দেখার ইচ্ছেটা তীব্র হচ্ছে। একবার, শেষবারের মতো। তারপর এই চত্বর ছেড়ে বরাবরের মতো চলে যাবে বিলাল। আর কোনোদিন ফিরে আসবে না এখানে। ওদের জীবনে নাক গলাবে না। নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলবে একেবারে গোড়া থেকে। হেরে পালিয়ে যাওয়ার লোক নয় সে। ফিরে সে আসবেই, তবে লতিকাকে ভুলে যাবে একদম।

গলার কাছে দলা পাকানো অভিমানটা গেলার চেষ্টা করে বিলাল। এক মুহূর্ত দ্বিধার পর গলির ভেতর পা রাখে সে। পেটের ভেতর যেন একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি লাভা উদ্গীরণ করে চলেছে। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে তার বুকেও ধিকিধিকি জ্বলছে আঙরার মতো। আর কয়েক পা। তারপরেই বাদশার বাড়ি। ওই বাড়িতে লতিকা থাকে। ওদের ছেলেটা থাকে। ওরা কি এখন ঘুমোচ্ছে! মনে পড়ে যায় লতিকা কেমন বিলালের বুকের কাছটাতে লেপ্টে ঘুমোত। কী জানি চুলে কী একটা তেল মাখত লতিকা, ওর চুল থেকে জুঁইফুলের সুবাস আসত। এখনও কি সেই একইরকম গন্ধ আসে! বাদশার বুকের কাছে লতিকাকে কল্পনা করে বুকের কাছে বিষ ঢেঁকুর ওঠে বিলালের। অন্ধকারে রাস্তায় হোঁচট খায়। মুখ থেকে কাঁচা একটা খিস্তি বেরিয়ে আসে তার।

এই গলির ভেতরটা বেশ অন্ধকার। স্ট্রিট ল্যাম্প আছে বটে, তবে সেগুলো জ্বলছে না। আগে যখন বিলাল এখানকার সম্রাট ছিল, তার ছেলেরা সব বাল্ব খুলে চোরবাজারে বেচে দিত। অন্ধকারের সাম্রাজ্যে আলোর কাজ কী! এখনও সেই নিয়ম বহাল আছে। পা টেনে হাঁটতে থাকে বিলাল। টের পায় না, কেউ একজন অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে অনুসরণ করছে তাকে। এবার পেছনের মানুষটা এগিয়ে এসে বিলালের কাঁধে হাত রাখল।

বিদ্যুতের গতিতে ঘুরে তাকাল বিলাল। ডান হাতটা সামনে এগিয়ে এল আত্মরক্ষার অভ্যস্ত রিফ্লেক্সে। কিন্তু সময় পাওয়া গেল না। লোকটা সাঁড়াশির মতো লম্বা লম্বা আঙুল দিয়ে বাঁ হাতে চেপে ধরল বিলালের গলা। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে বিলালের। একটুখানি প্রাণবায়ুর জন্য ডাঙায় তোলা মাছের মতো মুখ খুলে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে সে। লোকটা পকেট থেকে ডান হাত বের করে একমুঠো সাদা রঙের গুড়ো মুখে ঠেসে ঢুকিয়ে দিল তার।

বিলালের চোখদুটো বাতাসের অভাব ও আতঙ্কের যুগপৎ তাড়নায় ঠেলে বেরিয়ে আসছে। এ জিনিসের স্বাদ গন্ধ তার অজানা নয়। অথচ মুখ থেকে বের করে দেওয়ার উপায় নেই। লোকটা ডান হাত দিয়ে ঠেসে ধরে আছে তার মুখ। জিনিসটা গলা দিয়ে নামছে, ধীরে ধীরে রক্তে মিশে যাচ্ছে। ঝিমিয়ে পড়ছে বিলাল।

পুরো ব্যাপারটা শেষ হতে মিনিট দশেক লাগল। এখন রাস্তায় পড়ে আছে বিলালের জ্ঞানহীন দেহ। সামনে দাঁড়ানো মানুষটা এবার উঁচু হয়ে বসল বিলালের দেহের পাশে। গ্লাভস পরা হাতে নাড়ি টিপে পরীক্ষা করল। তারপর কাঁধের ব্যাগ থেকে একট ক্ষুর বের করে বিলালের গলাটা এক টানে ফাঁক করে দিল।

মৃতের নাম বিলাল শেখ। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে গলা কেটে মৃত্যু। পিতার নাম, আহমেদ শেখ, মায়ের নাম ফরজানা বিবি। আদি বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলা। পেশা, স্মাগলিং, এক্সটরশন মার্ডার অ্যান্ড আদার ক্রাইমস। ভিকটিম জেলে ছিল চোদ্দ বছর। পনের দিন আগে ছাড়া পেয়ে জেল থেকে বেরিয়েছিল।

লোকাল থানার প্রাথমিক রিপোর্টটাতে চোখ বুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্জুন। কেসটাতে মাথা ঘামানোর তেমন কিছু নেই।

‘কোন জেলে ছিল বিলাল শেখ?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘অনেক জেল ঘুরে শেষে চার বছর দমদম ক্যানটনমেন্ট জেলে ছিল স্যার’, বলল এম জি রোড থানার ওসি সঞ্জয় পাল। দোহারা চেহারা, মাঝারি উচ্চতার মানুষটিকে দেখলে ঠিক পুলিশ বলে মনে হয় না। মনে হয় স্কুল শিক্ষক বা সরকারি অফিসের কেরানি হলে মানাত ভালো। চোখের কালো ফ্রেমের চশমাটা অ্যান্টিকের পর্যায়ে পড়ে কি না সে নিয়ে গবেষণার অবকাশ আছে। অন্তত অমন চশমার ফ্রেম বাজারে এখনও মেলে এমন ধারণা ছিল না অর্জুনের। ভদ্রলোকের বয়স চল্লিশের উপরেই হবে বোধ হয়। তবে কমও হতে পারে। একেক জন মানুষ আছে যাদের বয়স চেহারায় ছাপ ফেলে না। সঞ্জয় পাল সেরকম মানুষ। তবে চেহারা পুলিশ হওয়ার উপযুক্ত বলে মনে না হলেও চশমার কাচের পেছনে চোখের দৃষ্টি বেশ উজ্জ্বল। শুধু চোখদুটো দেখে বোঝা যায় সঞ্জয় পাল পুলিশ অফিসার হিসেবে হয়তো অযোগ্য নন

‘একটা ডিটেলড রিপোর্ট বানিয়ে লালবাজারে পাঠিয়ে দেবেন। অটোপ্সি রিপোর্ট এলেও আমাকে পাঠাবেন। আর ফরেনসিকের রিপোর্টও। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা, এই বিলাল শেখের পাস্ট হিস্ট্রি যদি কিছু জেলের নথিতে থাকে, সেটাও দেবেন তো। একবার দেখে নেব।’ হালকা গলায় বলল অর্জুন। এই ধরনের কেসে মাথা ঘামানোর বিশেষ কিছু থাকে না। এইসব গ্যাং-এর নিয়মই এই। শত্রুর শেষ রাখে না কেউ। বিলাল শেখ পুরোনো খেলুড়ে। জেলে ছিল, তাই এত দিন প্রাণে বেঁচে ছিল।

কবজি উলটে ঘড়ি দেখল অর্জুন। সন্ধে সাতটা বাজে। গত সপ্তাহখানেক ধরে কাজের চাপ তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। তার উপর ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল ছুটিতে আছেন। মেয়ের গ্র্যাজুয়েশন উপলক্ষে দিল্লি গেছেন। পুলিশের চাকরিতে এমনিতেই ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু সন্তানের জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তটা মিস করতে চাননি।

ফোনটা রিং হচ্ছে। আজ মিতুলের জন্মদিন। ডিনারে যাওয়ার কথা আছে। ফোনটা ধরে অর্জুনের ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল।

‘বলুন ম্যাডাম!’

‘আসছো তো?’ অপর প্রান্তে টাপুরের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

‘আসব তো বলেইছি। মিতুলের জন্মদিন বলে কথা। না গেলে চলবে?’

‘প্রশ্নই আসে না।’

‘সেই তো। গরিব পুলিশের কপালে এমন ফ্রি-এর ট্রিট বড়ো একটা তো মেলে না। তাই হঠাৎ মটাৎ মিলে গেলে ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। তোমরা কটা নাগাদ পৌঁছোবে বল। আমি পৌঁছে যাব সোজা এখান থেকে।

‘ইশ, অফিস থেকে সোজা আসবে? ইউনিফর্মে নাকি?’ আঁতকে উঠল টাপুর।

‘আরে না রে বাবা। ইউনিফর্মে নেই আমি। আচ্ছা শোনো, একটা ভুল হয়ে গেছে।’ কাঁচুমাচু গলায় বলল অর্জুন।

‘কী হল আবার?’ টাপুরের গলায় সন্দেহের সুর, ‘আবার না আসার জন্য কোনো অজুহাত দেবে না তো!’

‘গোয়েন্দাগিরি করে করে সন্দেহ করাটা তোমার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে টাপুর, বলল অর্জুন, ‘শোনো, একটা মার্ডারের কেস নিয়ে ঘেঁটে ছিলাম। তাই মিতুলের গিফট কেনা হয়নি। এখন কিনতে গেলে পৌঁছোতে দেরি হয়ে যাবে। কী করি বলো তো? পরে দিয়ে দিলে ও কি রাগ করবে?’

ও প্রান্তে টাপুরের খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল। বলল, ‘তোমাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। জানি তো এমন কিছু একটা কান্ড ঘটাবে। কিছু কিনতে হবে না। তুমি চলে এসো। আমি তোমার হয়ে গিফট কিনে রেখেছি। তুমি শুধু দিয়ে উদ্ধার কোরো আমাকে।’

অর্জুন হাসল। গলা নামিয়ে একবার এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে বলল, ‘তুমি না থাকলে যে আমার কী হত!’

টাপুরের কণ্ঠস্বরও নরম হয়ে এল। মৃদুস্বরে বলল, ‘থাক, অত মিষ্টি কথায় কাজ নেই। তাড়াতাড়ি চলে এসো। দেরি কোরো না। মিতুল রাগ করবে কিন্তু।’ অর্জুন হেসে বলল, ‘মিতুলকে জিজ্ঞাসা করো, শুভমকে নিয়ে আসব কি না!’

টাপুর বলল, ‘তোমার ঘটকগিরি করার শখ জেগেছে, তুমিই বরং ওকে জিজ্ঞাসা করে নিও। আমি এসবের মধ্যে নেই। এসব বলে কে ওর ধাঁতানি খেতে যাবে? এমনিতেই ওর মুড অফ দেখছি।’

‘কেন?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন, ‘মিতুলের আবার কী হল?’

টাপুর বলল, ‘ওর প্রোজেক্ট থেকে অনসাইটে পাঠাতে চাইছে। জানোই তো, অনেকদিন ধরে টালবাহানা করে বাইরে যাওয়া আটকাচ্ছে ও। এবার বোধ হয় আর সেটা হবে না।’

‘যাহ্, সেটা তো ভালো কথা। বিদেশ যাবে। ডলার, ইউরোতে টাকা কামাবে আমাদের জন্য বেশ চকোলেট, পারফিউম-টিউম নিয়ে আসবে। যাবে না কেন? এটা কেরিয়ারের প্রাইম টাইম। ঘুরে আসতে বলো। আচ্ছা, আমি যাচ্ছি তো, বুঝিয়ে বলব।’

ই এম বাইপাসের ধারে এই শপিং মলটি এক দশকের বেশি পুরোনো। নানান রকম দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের দোকান, ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, মাল্টিপ্লেক্স নিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি গমগম করে। এরই তিনতলায় ফুড কোর্টের পাশে কন্টিনেন্টাল রেস্তরাঁতে বসে ছিল ওরা তিনজন।

অর্জুন বলল, ‘জন্মদিনে মন খারাপ করে থাকতে নেই। তোমায় তো আর যাবজ্জীবনের জন্য কেউ নির্বাসন দিচ্ছে না রে বাবা। ক-মাস কী বড়োজোর বছরখানেকের জন্য যাবে। নতুন জায়গা দেখবে। তাতে কী হল? অবশ্য তোমার দিদির গোয়েন্দাগিরিতে একটু অসুবিধে হবে বই কী। তা তিনি যদি অনুমতি করেন তবে তোমার হয়ে আমি প্রক্সি দিতে পারি।’

টাপুর ক্রিম অ্যান্ড মাশরুম স্যুপ থেকে মুখ না তুলেই বলল, ‘কলকাতা পুলিশের হাতে কি আজকাল কেস-টেস একেবারেই নেই?’

অর্জুন ছদ্মদুঃখের সঙ্গে বলল, ‘আমাদের কপাল কি আর তোমার মতো ম্যাডাম? তোমার হাতে তো এখন সেই কেস। বৃহষ্পতি একেবারে তুঙ্গে।’ মিতুল বেকড ফিশ স্টার্টারে কামড় বসিয়ে অর্জুনের কথায় সায় দিল, ‘টাপুরদির এখন আলাদাই ব্যাপারস্যাপার। সব কেসের কথা তো আমাকেই বলে না। সরকারি কাজ, নাকি হাইলি কনফিডেনশিয়াল। তোমাকে বলবে কি না দেখো! তুমি তো আবার সরকারের ঘরের লোক।’

টাপুর এবার বোধ হয় প্রসঙ্গ বদলাতেই অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার কাজ কেমন চলছে? নতুন কেস এল কিছু?’

অর্জুন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘একটা মার্ডার কেস এল। অবশ্য ঠিক আমার কেস বলা যায় না। লোকাল থানা থেকে একটা মার্ডার রিপোর্ট করেছে।’

টাপুর কৌতূহলী মুখে তাকাল।

‘মার্ডার? কার?’

অর্জুন বলল, ‘লোকটা পুরোনো পাপী। বছর চোদ্দ জেল খেটে দিন পনেরো আগেই বেরিয়েছিল। শেয়ালদা অঞ্চলে রাহাজানি, ছিনতাই দিয়ে শুরু করে বছর দশেকের মধ্যে হয়ে উঠেছিল সেই অঞ্চলের মুকুটহীন সম্রাট। হাফ বা ফুল মার্ডারও করেছে কয়েকটা। রেলওয়ে দিয়ে যত স্মাগলিং হয়, সেসবই লোকটার সুপারভিশনে হত। বেশ ফুলেফেঁপে উঠেছিল ব্যাবসা। তার মধ্যেই একবার একটা পাতি এক্সটর্শন কেসে ধরা পড়ে জেলে গেল। বেরিয়ে এসেই খুন!’

‘কে করল?’ জিজ্ঞাসা করল মিতুল।

অর্জুন বলল, ‘সে আমি কীভাবে বলব! ওই অঞ্চলে ছোটো থেকে বড়ো নানা সাইজের দাদা আছে। তার মধ্যে কার কার সঙ্গে বিলাল শেখের শত্রুতা ছিল কে জানে! তবে তোমার মাথা ঘামানোর মতো কেস নয়। এইসব গ্যাংগুলো নিজেদের ব্যাবসায় কোনো থ্রেটকে বরদাস্ত করে না। কেউ মাথা তুলে দাঁড়ানোর আগেই সরিয়ে দেয়। আর যদি বা কেউ লড়াই করে মাথা তোলেও, সে তখন সরিয়ে দেয় আগের কিংপিনকে। অপরাধজগত এভাবেই চলে। এর মধ্যে কোনো সূক্ষ্ম চিন্তাভাবনার খোরাক নেই। তবে মোডাস অপারেন্ডি বেশ ইন্টারেস্টিং।’

‘কীরকম?’

‘ডেডবডির গলা কাটা ছিল। অন্যদিকে অনেকটা পরিমাণ কোকেন মুখে ঠেসে দিয়েছে খুনি।’ বলল অর্জুন।

‘সে কী! এত সহজ সব উপায় থাকতে এত এক্সপেন্সিভ মার্ডার, তাও আবার একজন ফুরিয়ে যাওয়া এক্স ডনের জন্য? খরচায় পোষাবে তো?’ মৃদু হেসে বলল টাপুর।

অর্জুন ও মিতুলও হাসল।

ওয়েটার এসে মেন কোর্স সার্ভ করে গেল। অর্জুন নিজের জন্য চিকেন পাস্তা উইথ হোয়াইট সস অর্ডার করেছে। প্লেটটা আসতেই টেনে নিয়ে হামলে পড়ে খেতে শুরু করল। সেই দুপুরের পর থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। টাপুর স্নেহার্দ্র দৃষ্টিতে তাকাল অর্জুনের দিকে। তারপর মৃদু হেসে নিজের খাওয়ায় মন দিল।

খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরোতে এগারোটা বেজে গেল। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরোতে যাবে, এমন সময় ফোনটা এল অর্জুনের মোবাইল ফোনে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকাল অর্জুন।

‘হ্যালো!’

অপর প্রান্তে এম জি রোড থানার ওসি সঞ্জয় পালের গলা শোনা গেল। ‘স্যার, বিলাল শেখের অটোপ্সি রিপোর্টটা এসে গেছে। রক্তে অতিরিক্তমাত্রায় কোকেন পাওয়া গেছে ঠিকই, কিন্তু মৃত্যু হয়েছে শ্বাসরোধ হয়ে। শ্বাসনালীতে কোকেন ঢুকে এয়ার প্যাসেজ বন্ধ হয়েছে দম আটকে মারা গেছে লোকটা। ক্ষুর চালানো হয়েছে পরে। মানে ততক্ষণে ভিকটিম অলরেডি ডেড। আর একটা কথা। বিলাল শেখের লিভারের অবস্থা খুব খারাপ ছিল স্যার। সিস্টে ভরে গেছিল, ফুলে উঠেছিল। অটোপ্সি সার্জেন বললেন, এমনিতেও বেশিদিন বাঁচত না।

‘কোকেন দিয়েই যদি খুন করার ছিল, তাহলে গলা কাটল কেন? সঞ্জয় পাল একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘বোধ হয় মৃত্যু নিশ্চিত করতে। মানে, তাছাড়া আর কোনো কারণ তো মাথায় আসছে না।’

‘হুম, ভিকটিম রেজিস্ট করেছিল? কোনো সুপারফিশিয়াল উন্ড পাওয়া গেছে?’

‘না স্যার। সেরকম কিছু তো রিপোর্টে নেই। খুব স্মুদ মার্ডার।’

‘হওয়াই স্বাভাবিক।’ বলল অর্জুন, ‘বিলাল শেখের শত্রু কেউ থাকলে তার প্রফেশনাল হওয়ারই কথা। আর লোকটার শরীরের যেরকম অবস্থা দেখলাম তাতে খুব বেশি রেজিস্ট করা সম্ভব এমনিতেও হত না। যাক গে, ফরেনসিক থেকে রিপোর্ট এসেছে? কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে?’

‘না স্যার, এখনও আসেনি। এলেই আপনাকে ইনফর্ম করছি’, জানালেন ওসি সঞ্জয় পাল, ‘এই কেসে মেরিট নেই স্যার। এখন ওই এলাকার দাদা হল প্রমোদ বৈরাগী। আমি খবর নিতে লোক লাগিয়েছি। ওর লোকেরা কেউ করলে জানতে পেরে যাব। তবে তাতে লাভ কতখানি হবে বলতে পারছি না।’

‘কেন?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

সঞ্জয় পাল গলা নামিয়ে বললেন, ‘আসলে এই প্রমোদ বৈরাগীর মাথায় একজন হেভিওয়েট মন্ত্রীর হাত আছে। বোঝেনই তো! আমাদের তো সবদিক বাঁচিয়েই কাজ করতে হয়। আর তাছাড়া এই বিলাল শেখও এমন কিছু ধোয়া তুলসীপাতা ছিল না। তাই ও মরলে ডান-বাম, লাল-নীল-হলুদ-সবুজ, মন্দ-ভালো কোনো দলেরই কিছু যাবে আসবে না।’

অর্জুন বিরক্তমুখে বলল, ‘কার হাত আছে কী আছে বা কার যায়-আসে এসব আমার জানার দরকার নেই। একজন খুন হয়েছে। তদন্তটা ঠিকভাবে করুন। এখন আইনরক্ষক হয়ে একটা পেটি গুন্ডার ভয়ে তদন্ত করবেন না, এটা কেমন কথা?’

সঞ্জয় পাল বোধ হয় একটু আহত হলেন। বললেন, ‘স্যার, আপনারা লালবাজারে বসে এসব বলতে পারেন। আমাদের লোকাল থানায় লোকাল

নেতাদের তোয়াজ করে না চললে কাজ করতে দেবে না। সৎভাবে কাজ করতে সকলেই চায় স্যার। কিন্তু সকলেরই ঘর-পরিবার আছে, বউ-বাচ্চা আছে। তাছাড়া আমাদের উপরেও অফিসাররা আছেন।

অর্জুনের একটু খারাপ লাগল। এভাবে বলাটা হয়তো উচিত হয়নি। বলল, ‘আমাকে জানাবেন কোনো খবর পেলে। কে কত বড়ো মাতব্বর দেখার দরকার নেই, নিজের কাজটা সৎভাবে করুন আপনি। বাকিটা পরে বুঝে নেওয়া যাবে।’

সঞ্জয় পাল মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, ‘জানাব। কাজ তো সকলেই সৎভাবে করার চেষ্টা করে স্যার। কিন্তু বেশি সৎ থাকতে গেলে উলটো নিজেকেই যখন ফেঁসে যেতে হয়, তখন কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না। আপনিও তো ডিপার্টমেন্টেরই লোক। আপনি বলুন তো, কাজ করার সদিচ্ছা থাকলেই সবসময় কাজ করা যায়? যাই হোক, আমি আমার সোর্সদের লাগিয়ে দিয়েছি। খবর নিয়ে জানাচ্ছি।’

বিলাল শেখের কেসটা ভুলেই গেছিল অর্জুন, মনে পড়ল সঞ্জয় পালের ফোনে। সকাল সকাল অফিস পৌঁছোতে ফোন এল অর্জুনের মোবাইলে। খুনের পর দিন দশেক কেটে গেছে। তদন্ত তেমন কিছু এগোয়নি।

‘হ্যাঁ, বলুন সঞ্জয়বাবু? কী খবর?’

ফোনের ওপার থেকে ওসি সঞ্জয় পাল বললেন, ‘বিলাল শেখের খুনের পেছনে প্রমোদ বৈরাগীর হাত নেই স্যার। প্রমোদ বৈরাগীর খুব কাছের লোক জানিয়েছে, প্রমোদ আদৌ বিলালের ফিরে আসা নিয়ে চিন্তিত ছিল না। তা ছাড়া সে বউ-বাচ্চা নিয়ে ব্যাংকক বেড়াতে গেছে দিন পনেরো হল।’

অর্জুন গম্ভীর গলায় বলল, ‘কাউকে খুন করানোর জন্য তাকে নিজেকেই উপস্থিত থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই নিশ্চয়ই?’

সঞ্জয় পাল বলল, ‘না স্যার, তবে এই এলাকায় আমার সোর্সরা জানিয়েছে যে সত্যিই এখানকার যত ছোটো বড়ো দাদারা আছে, তাদের কেউই বিলাল শেখকে খুন করেনি। আমি আরও খোঁজ নিচ্ছি। বিলাল শেখের এক এক্স গার্লফ্রেন্ড ছিল, নাম লতিকা। বিলাল জেলে যাওয়ার পর লতিকা বিলালেরই ডানহাত বাদশাকে বিয়ে করে নেয়। বিলাল নাকি জেল থেকে বেরিয়েই লতিকার কাছে গেছিল। আমি বাদশার পেছনেও লোক লাগিয়ে রেখেছি।’

‘এই বাদশা কোথায় থাকে?’ জানতে চাইল অর্জুন।

‘আমাদের এলাকাতেই থাকে স্যার। এখন বড়োবাজারে কাঠের ফার্নিচারের দোকান দিয়েছে। আগের লাইন ছেড়ে দিয়েছে পুরোপুরি। একটা ছেলেও আছে বাদশা আর লতিকার। তবে বাদশাকে আমরা সন্দেহের বাইরে রাখছি না এখনই। ওর কাছে বিলালকে খুন করার মোটিভ আছে। বউয়ের প্রাক্তন, তাও আবার যদি সে বিলাল শেখের মতো মাফিয়া হয়, সে উড়ে এসে জুড়ে বসলে কোন স্বামীটা খুশি হয়? আর তাছাড়া…’

‘তাছাড়া?’

‘একসময় বাদশার নাম ছিল ক্ষুর-চেরা বাদশা। কারণ ছুরি, ক্ষুরের মতো অস্ত্র চালানো যদি শিল্প হয়, তবে বাদশা ছিল জাত শিল্পী।’

‘হুম! নজর রাখুন। আর আমাকে আপডেট দেবেন।’

আপডেটটা এল বিকেল নাগাদ। সঞ্জয় পালের কণ্ঠস্বর বেশ উত্তেজিত

শোনাচ্ছে।

‘দুটো খবর পেলাম স্যার।’

‘একবারে দুটো? বলেন কী? বলুন শুনি।’

‘বিলালের মারা যাওয়ার আগের দিন বাদশা বাজার থেকে একটা নতুন ক্ষুর কিনেছিল। বাজারে অনেকেই দেখেছে ওকে ক্ষুরটা কিনতে। সবার সামনে দাঁড়িয়েই ও ক্ষুরের ধার পরীক্ষা করছিল।’

অর্জুনের ভুরু কোঁচকাল বিরক্তিতে। বলল, ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী খুনটা কিন্তু নতুন ক্ষুরে হয়নি সঞ্জয়বাবু। পুরোনো, ভোঁতা ক্ষুর দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে খুন করেছে খুনি।’

‘যদি বাড়ি এনে ভোঁতা করে নেয়…,’ বলতে গিয়ে থেমে যান সঞ্জয় পাল। যুক্তিটা নিজের কানেই বিশ্বাসযোগ্য ঠেকে না সম্ভবত।

‘আর দ্বিতীয় খবরটা কী?’ সঞ্জয় পালের কল্পনার উড়ানকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘বিলাল শেখ জেল থেকে ফিরে আসার পর রেলস্টেশনের পাশে একটা বস্তিতে পুরোনো এক শাগরেদের ফাঁকা খোলিতে থাকছিল। সেখানে গেছিলাম খোঁজ নিতে। লোকটা অসুস্থ ছিল। চিকিৎসা চলছিল। ওষুধ-বিষুধ, প্রেসক্রিপশন পেয়েছি। কিন্তু আরেকটা জিনিস পেয়েছি। আপনি একবার আসতে পারবেন?’

অর্জুন কবজি ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। বলল, ‘এখন?’

‘আসুন না স্যার। পুলিশ স্টেশনেই আসুন। একটা জিনিস দেখাব আপনাকে আমিই যেতাম। কিন্তু আজ থানায় ফোর্স কম।’

উঠে দাঁড়াল অর্জুন। হাত আপাতত খালিই আছে। ঘুরে আসা যেতেই পারে। একটু কৌতূহলও যে হচ্ছে না তা নয়। তবে সঞ্জয়বাবুকে বিশ্বাস নেই। হয়তো গিয়ে দেখবে তেমন কিছুই নয়।

শেয়ালদা পৌঁছোতে পৌঁছোতে ছ-টা বাজল। অফিস ছুটির সময়ে এই অঞ্চলে অসম্ভব ভিড় থাকে। সেই কথা ভেবেই পুলিশ জিপ নেয়নি অর্জুন। বরং বাইক চালিয়ে এসেছে। এতে কিছুটা সময় বেঁচেছে বটে, তবে এই ভিড়ের মধ্য দিয়ে বাইক চালানোও কম কষ্টসাধ্য নয়।

থানায় পৌঁছোতে সঞ্জয় পাল নিজেই এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘আসুন স্যার। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।’

সাধারণত লোকাল থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকরা তাদের নিজেদের কাজে লালবাজারের নাক গলানো পছন্দ করেন না, জানে অর্জুন। সে নিজে যখন কসবা থানায় ছিল, তারও ভালো লাগত না। সঞ্জয় পাল এ বিষয়ে ব্যতিক্রম। ভদ্রলোক বেশ বিনয়ী। যে ক-দিন কথা হয়েছে, ভালো ব্যবহার তো করেইছেন। উপরন্তু নিজে থেকে কেসের খুঁটিনাটি জানিয়েছেন অর্জুনকে, যার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। ভদ্রলোক সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন যে অর্জুন কেসটা নিয়ে আগ্রহী।

‘বলুন সঞ্জয়বাবু, কী দেখাবেন?

‘আসুন স্যার। বসুন।’ বলে নিজেই চেয়ারটা টেনে ধরলেন তিনি। অর্জুন বসল।

এবার সঞ্জয়বাবু টেবিলের অপরপ্রান্তে গিয়ে ড্রয়ার থেকে একটা ছোটো সবুজ ডাইরি বের করলেন।

‘এটা দেখুন স্যার।’

‘কী এটা?’

‘বিলালের ডাইরি সম্ভবত।’

‘বিলাল ডাইরি লিখত?’ চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘না না। মানে সেরকম ডাইরি নয়। আপনি নিজেই দেখুন না।’ বলে এগিয়ে দিলেন ওসি সঞ্জয় পাল। অর্জুন হাত বাড়িয়ে নিল ডাইরিটা। উলটেপালটে দেখল। পরপর তারিখ লেখা আছে। তারিখের পাশে টাকার অঙ্ক। কয়েক জায়গায় টাকার অঙ্কের পাশে কিছু নাম লেখা আছে। বেশিরভাগই ইনিশিয়ালস। আর আছে কয়েকটি ফোন নম্বর

‘এটা কাজের জিনিস। যে নামগুলো আছে তাদের খোঁজ নিন। আপনি নিজের মতো করে তদন্ত করুন যদিও এর সঙ্গে বিলাল শেখের মার্ডারের কোনো যোগ আছে কি না জানি না। না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এটা সেই সময়কার ডাইরি যখন বিলাল এই অঞ্চলে অ্যাকটিভ ছিল। সময়টা যেহেতু কম নয়, তাই শুধু এই ডাইরির ভরসায় থাকা ঠিক হবে না।’ বলল অর্জুন।

‘জানি স্যার। সেটা আমিও ভেবেছি। তবু আপনাকে দেখালাম অন্য একটা কারণে।’ বলে কয়েকটা রো-এর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন সঞ্জয়বাবু। সেগুলোতে লাল ঢ্যাড়া দিয়ে দাগ দেওয়া। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি রো-এর পাশে লেখা ‘মামু’।

‘মামু! সেটা কে?’

সঞ্জয় পাল মাথা নিচু করলেন। লজ্জিত কণ্ঠে বললেন, ‘স্যার, এদের ভাষা পুলিশকে এরা মামু বলে

অর্জুন অবাক হল না। পুলিশের চাকরি তো নতুন করছে না সে। তবু ধাক্কাটা এড়াতেও পারল না। টাকার অঙ্কগুলো নেহাত ফেলনা নয়। একেক ক্ষেত্রে তো তা ছয় সংখ্যাও পার করেছে। অস্ফুটে বলল, ‘এত?’

সঞ্জয় পাল বিষণ্ণ হাসলেন। তারপর বললেন, ‘আপনাকে আগের দিন বললাম না স্যার! আপনার কী মনে হয়? এত এত টাকা আমাদের মতো চুনোপুটি পুলিশের পকেটে ঢুকেছে? আপনিও জানেন, আমিও জানি, উপর লেভেলে সেট আপ হয়ে যায় যখন, আমাদেরও আর কিছু করার থাকে না। যদি কেউ তবু কাজ করতে চায়, আপনার কথামতো সৎভাবে করতে চায়, তাদের জন্য এই চাকরি খুব একটা সুখের হয় না।’

পৃষ্ঠা ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় দৃষ্টি স্থির হল অর্জুনের। সেখানে একটি পাতায় দুটি মাত্র এন্ট্রি। একটিতে লেখা, বড়দা। নামের পাশে লেখা টাকার অঙ্কটা দেখলে চমকে উঠতে হয়। ঠিক তার নীচেই লেখা, মামু। সেখানেও বেশ বড়ো অঙ্ক।

‘এটা দেখেছেন?’ ডাইরিটা সঞ্জয় পালের দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘দেখেছি স্যার।’

‘এই বড়দাটা কে? বিলালের কোনো দাদা ছিল নাকি?’

‘আমি খোঁজ নিয়েছি। এরকম কোনও ইনফর্মেশন আমাদের কাছে নেই। এক বোন ছিল। অনেক দিন আগেই নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। আর ভাই-বোন ছিল না।’

‘আজ থেকে পনের বছরো আগের এন্ট্রি। পাঁচ লক্ষ টাকা সামান্য অ্যামাউন্ট নয় সঞ্জয়বাবু। বিলাল এত এত টাকা ছড়াচ্ছিল কেন? একটু খোঁজ করুন সেই সময়ে কী হয়েছিল। বিলালের দলের পুরোনো কেউ এ চত্বরে থাকলে উঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করুন। কিছু সূত্র পাওয়া গেলে যেতেও পারে। আরেকটা কথা। এইসব হিসেব দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বিলাল ব্যাবসা করে কম রোজগার করেনি। যখন সে অ্যারেস্ট হয়, তার অ্যাকাউন্ট বা টাকার কোনো হদিশ পাওয়া গেছিল?’

‘বলতে পারব না স্যার। পুরোনো কেস ফাইল ঘেঁটে দেখতে হবে।’

‘বেশ, দেখুন। আমাকে জানান আপডেট।’

মাথা নাড়লেন সঞ্জয় পাল। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ডাইরিটা আপনার কি লাগবে?’

অর্জুন ডাইরিটা উলটে পালটে দেখল একবার। তারপর বলল, ‘আপনার কাছেই থাক। পরে যদি দেখা যায় এই মামু বা বড়দাদের মধ্যেই কেউ খুন করেছে বিলালকে, তখন এটা কোর্টে পুলিশের তরফে এক্সিবিট হিসেবে কাজে লাগবে। আমি পৃষ্ঠাগুলোর ছবি তুলে নিচ্ছি।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *