প্রলয় ঘূর্ণি – ১৫

১৫

২৮ ডিসেম্বর, শনিবার, রাত ২টো, ধাপার মাঠ

কতক্ষণ জ্ঞান ছিল না মনে করতে পারেন না বলাই সাহা। জ্ঞান ফিরতে বিশ্রী গন্ধটা নাসারন্ধ্রে ধাক্কা মারল তাঁর। অন্ধকারে দৃষ্টি চলে না। হঠাৎ করে বুঝে উঠতে পারলেন না কোথায় আছেন, কিংবা আসলে তাঁর কোথায় থাকার কথা ছিল!

হাত-পা নাড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন বলাই সাহা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ল, ইস্টার্ন বাইপাসে শপিং মল থেকে বেরিয়ে ক্যাবের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। প্রায় পনেরো মিনিট অপেক্ষার পর ক্যাব ড্রাইভার রাইড ক্যানসেল করে দিয়েছিল। বিরক্ত মুখে রাস্তার দিকে হাঁটা লাগিয়েছিলেন তাই। আজকাল কলকাতার রাস্তায় হলুদ ট্যাক্সি দেখা যায় না বললেই চলে। তবু হঠাৎ মটাৎ দু-একটা মিলে যে যায় না তাও নয়। আজও গেছিল।

লড়ঝড়ে ট্যাক্সিটা দেখে ভক্তি হয়নি বিশেষ। কিন্তু উপায় ছিল না। একে তা অনেকটা রাত হয়ে গেছিল, উপরন্তু পেটে বেশ খানিকটা মদ পড়ায় পা ঠিক জায়গায় পড়ছিল না বলাই সাহার। কাল আবার সকালে স্কুল আছে। আজকাল আর আগের মতো ছিপছিপে চেহারাটা নেই তার। এই নতুন স্কুলটা আগের স্কুলগুলোর মতো নয়। বেতন যদিও দারুণ দেয়, কাজও করিয়ে নেয় গলায় পা দিয়ে। এ তো আর সরকারি স্কুল নয়।

সরকারি স্কুলের চাকরিটা ছাড়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। নিশ্চিত জীবন, চাকরি শেষে পেনশন, এত সুখ ছেড়ে বেসরকারি স্কুলে এসেছিলেন বলাই সাহা। বেতনের লোভ ছিল তো বটেই। কিন্তু সেটাই তো সব ছিল না। এই স্কুলের মালিক বি বি আগরওয়ালা প্রভাবশালী ব্যক্তি। কলকাতার একটা বড়ো ক্লাবে তাঁর শেয়ার খাটে। বলাই সাহার খুব আশা ছিল আগরওয়ালার হাত ধরে ক্লাবে কোচিং-এর সুযোগ মিলে যাবে। নইলে বেসরকারি স্কুলের বড়োলোক বাপ-মায়ের থলথলে চেহারার ছেলেদের মাঠে দৌড় করিয়ে আর যাই হোক, জব স্যাটিসফেকশন মেলে না।

আজকাল নিজেও বেশি দৌড়ঝাঁপ করতে পারেন না বলাই সাহা। বয়স তো কম হল না। সার্টিফিকেটে পঞ্চান্ন দেখালেও আসল বয়স সাতান্ন পেরিয়েছে পাঁচ মাস আগে। কোমরের চারপাশে চর্বির পাকাপাকি বসতি, রক্তে চিনির আধিক্য। রক্তচাপ উর্দ্ধমুখী। আজকাল অল্পেই হাফ ধরে যায়।

আগরওয়ালার কাছে দরবার করতে চেষ্টা করেছিলেন বলাই সাহা। এতগুলো বছর ধরে খেলাধুলোর সঙ্গে যুক্ত তিনি। তাঁর হাত দিয়ে ভালো ভালো প্লেয়ার বেরিয়েছে। স্কুলের চাকরি ছাড়াও ছোটোখাটো অনেক ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন তিনি। এখনও শেষ বয়সে এসে একটু শান্তির জীবন চান। বড়ো ক্লাবে একবার ঢুকে পড়তে পারলে বাকি জীবনটা মসৃণভাবে কেটে যাবে।

সে কারণেই অনুরোধ করেছিলেন আগরওয়ালাকে। এখনও ভাবতে গেলে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে বলাই সাহার। আগরওয়ালা চুপচাপ তারিয়ে তারিয়ে শুনেছিলেন তাঁর আর্জি। তারপর ভুঁড়ি দুলিয়ে খিক খিক করে হেসেছিলেন অনেকটা সময় নিয়ে। হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, ‘পহেলে আপনা তোন্দ তো কম কিজিয়ে সাহাবাবু। ফির আইয়ে কোচিং করবানে। আইনেমে আপনে আপকো দেখা হ্যায় কভি? অ্যায়সে উতরেঙ্গে আপ ময়দানমে?’

লজ্জায়, অপমানে মুখ কালো হয়ে গেছিল বলাই সাহার। কলকাতার ময়দানে সামান্য হলেও তাঁর পরিচিতি আছে। শালা মারোয়ারি বানিয়া কী জানবে ফুটবল কাকে বলে? ফুটবল হল বাঙালির কলজে। একসময় ফুটবল বলাই সাহার পায়ের ইশারায় বাইজির মতো নাচত। ময়দানের প্রতিটা ঘাস বলাই সাহার চেনা ছিল। এখন না হয় ঘোড়া বুড়ো হয়েছে। কিন্তু রক্তের তেজ যায়নি তার আজও। ফুটবল দুর্বলের খেলা নয়। দুর্বলতাকে বরাবর ঘৃণা করেন বলাই সাহা। গন্ডারের মতো মোটা ঘাড়ওয়ালা মারোয়ারি আগরওয়ালা আজ এসেছে তাঁকে ময়দান চেনাতে! শুধু পয়সা ছাড়া আর কী যোগ্যতা আছে ওর?

মনটা খুব খারাপ ছিল দুপুর থেকেই। বারে বসে গলা অবধি মদ খেয়েছেন আজ। ট্যাক্সির সিটে গা এলিয়ে দিয়ে নিজের অতীতের কথা, আগরওয়ালার কথা, সর্বোপরি নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবতে ভাবতে চোখ জড়িয়ে এসেছিল বলাই সাহার। ঘোরের মধ্যে শুধু টের পেয়েছিলেন নাকের উপর চেপে ধরা রুমালের মিষ্টি গন্ধটা। আর কিছু মনে নেই তাঁর।

চারপাশে চোখ বুলিয়ে চাপ চাপ অন্ধকার ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে উঠছে। আর পারলেন না তিনি। মাটিতে শোয়া অবস্থাতেই ডানদিকে মাথা কাত করে হড়হড় করে বমি করলেন। কিছুটা টক গন্ধওয়ালা অর্ধপাচ্য খাদ্য ও মদ পাকস্থলী থেকে বেরিয়ে এসে পাশের মাটিতে আর কিছুটা তাঁর নিজের গায়েই পড়ল।

‘কে আছেন? আমাকে কেন এনেছেন এখানে?’ কফ বসা গলায় চিৎকার করে ওঠেন বলাই সাহা।

‘চিৎকার করবেন না স্যার। করলেও কেউ শুনতে পাবে না।’ ফিসফিস করে বলে উঠল জমাট বাঁধা অন্ধকার।

কে বলল কথাটা! কাউকে দেখতে পেলেন না বলাই সাহা।

‘কে? কে আপনি?

কেউ উত্তর দিল না।

‘আমাকে কেন এভাবে বেঁধে রেখেছেন? কী চান আপনারা?’ শেষের দিকের কথাগুলো যেন কান্নার মতো শোনাল।

‘কাঁদছেন কেন? পুরুষ মানুষ কাঁদে না স্যার, আপনিই তো বলেছিলেন। মনে পড়ে?’ ফিসফিস করে বলল লোকটা

মনে না পড়ার কোনো কারণ নেই। এই কথাটা হাজার বার বলেছেন তিনি। একজনকে তো নয়, কত ছাত্রকে বলেছেন। তার ছাত্ররা খেলার মাঠে দুর্বল হয়ে পড়লে, তাঁর বেতের বারি খেয়ে চোখে জল এলে বারবারই বলেছেন। দুর্বলতা পুরুষ মানুষকে মানায় না।

লোকটাকে দেখতে পাচ্ছেন না বলাই সাহা। শুধু একটা জমাটবাঁধা অন্ধকার নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। এবার অন্ধকারটা ঝুঁকে এল বলাই সাহার দিকে। এই মুহূর্তের অপেক্ষাতেই ছিলেন তিনি। সেই মুহূর্তে মাথা তুলে কপাল দিয়ে লোকটার নাকে সজোরে আঘাত করলেন। ছিটকে পড়তে পড়তে হাতে ভর দিয়ে ব্যালেন্স সামলাল লোকটা। সেই অবস্থাতেই প্রচন্ড এক ঘুষি চালাল বলাই সাহার চোয়ালে। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। তারপর চোখ বুজে বমি ভেজা মাটির উপর মাথা রাখলেন বলাই সাহা। খুব ক্লান্ত লাগছে তাঁর। শরীরটা ভারী বোধ হচ্ছে।

উঠে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে পেছন ফিরে হাঁটতে লাগল লোকটা। তাহলে কি তাকে ও মারবে না? বলাই সাহার বুক থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল।

কিন্তু স্বস্তিটা দীর্ঘস্থায়ী হল না। লোকটা আবার ফিরে আসছে। ওর হাতে ওটা কী? সামনে আসতে দেখা গেল একটা ভারী সিলিন্ডার বয়ে এনেছে লোকটা। পাঁচ লিটারের যেসব ছোটো আকারের এল পি জি সিলিন্ডারের মাথায় স্টোভ বার্নার বসানো থাকে, সেই ধরণের ছোটো সিলিন্ডারটি। লোকটা কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা পাকানো পাইপ বের করে আনল।

সময় নিয়ে পাইপের মাথাটা একটা রেগুলেটরের সাহায্যে সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত করল লোকটা। বলাই সাহা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল পুরো পর্বটা। তারপর সেটা হাতে নিয়েই এগিয়ে এল লোকটা। হাঁটু ভাঁজ করে বাবু হয়ে বসল বলাই সাহার পাশে।

বলাই সাহা চুপ করে থাকেন। প্রাণপণে চোখ চেপে বুজে থাকেন তিনি। লোকটা এবার তাঁর কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘আপনার প্যান্টটা একটু খুলে দেব। প্লিজ কো-অপারেট করুন!’

‘প্যান্ট!’ আর্তনাদ করে ওঠেন বলাই সাহা।

লোকটা উত্তর দিল না। অন্ধকারেই টর্চ জ্বেলে বলাই সাহার ট্রাউজারের জিপটা খুলল টেনে। তারপর হ্যাঁচকা টানে ট্রাউজার ও অন্তর্বাসটা নামিয়ে আনল হাঁটু অবধি। ভালো করে তাকিয়ে দেখে তৃপ্তমুখে মাথা নাড়ল।

‘পারভার্ট!’ এই অবস্থাতেও গর্জে উঠলেন বলাই সাহা।

লোকটা এবার সিলিন্ডারটা তুলে এনে বলাই সাহার মাথার পাশে রাখল। ঠিক সেই মুহূর্তে মাথার ভেতরে কিছু একটা ঘটে গেল বলাই সাহার। স্পোর্টসম্যান তিনি। বাঁচার তাগিদে ভুলে যাওয়া রিফ্লেক্স জেগে উঠল মুহূর্তের জন্য। মাথা উঠিয়ে কামড়ে ধরলেন তিনি লোকটার কবজি।

আঃ করে মৃদু চিৎকার করে উঠল লোকটা। এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিল হাত কামড়টা পড়েছে শার্টের স্লিভের উপর। তাই আঘাত গভীর হতে পারেনি। সে সপাটে এক চড় মারল বলাই সাহার গালে। তারপর একবার সখেদে মাথা নাড়ল। পাইপের খোলা মুখটা গুঁজে দিল হাল ছেড়ে দেওয়া বলাই সাহার মুখের ভেতর। তিনি গোঁ গোঁ করে প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করলেন বটে, তাতে লাভ বিশেষ হল না। লোকটা রেগুলেটরের নব ঘোরালো শেষ বিন্দু অবধি।

গলগল করে সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বেরিয়ে প্রবেশ করছে বলাই সাহার গলায়। কাটা পাঁঠার মতো ধড়ফড় করছে বেঁধে রাখা শরীরটা। বাঁচার জন্য কী ভীষণ আকুতি! চোখদুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। লোকটা বলাই সাহার পাশে গালে হাত দিয়ে বসে মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল তার শিকারের মুখের রেখায় যন্ত্রণার চিহ্নগুলি। ধীরে ধীরে ছটফটানি শান্ত হয়ে এল। বলাই সাহার খোলা চোখ এখন তাকিয়ে আছেন রাতের তারাভরা আকাশের দিকে।

লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল এবার। তারপর ব্যাগ থেকে ভোঁতা ক্ষুরটা বের করে আনল সে। সযত্নে বলাই সাহার গলাটা কাটতে থাকে। ডান দিক থেকে বাঁ দিক। ব্যাস, আজ এই পর্যন্তই।

টর্চের আলোয় নিজের শিল্পকর্মের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে লোকটা। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে তার। পাইপসহ সিলিন্ডারটা সেখানেই পড়ে থাকে। বাকি জিনিসপত্র ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে ধাপার জমা জঞ্জাল পেরিয়ে রাস্তায় পা রাখে সে।

১৬

‘মার্ডারার ইচ্ছে করেই বডিটা এমন জায়গায় ফেলেছে যাতে লোকের নজরে পড়ে,’ বললেন সৌরভ সান্যাল। আজ অকুস্থলে তিনি নিজেই এসেছেন।

অর্জুন মাথা নাড়ল।

‘সেটা খুব ক্লিয়ার, স্যার। নইলে ধাপার মাঠে বডি লুকোনোর হলে এমনও জায়গা আছে যেখানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হত। জঞ্জাল পোড়ানোর সময় পুড়ে ছাই হয়ে যেত বডি। কিন্তু মার্ডারার সেই পথে যায়নি। ধরে নেওয়া যেতে পারে যে চেয়েছিল যে লোকে জানুক এই খুনের কথা।’

‘অর্জুন, এবার একটা ঝড়ের জন্য তৈরি থাকো। বলাই সাহা একসময়ে কলকাতার ছোটো ও মাঝারি অনেক ক্লাবে খেলেছেন। কোচ হিসেবে খুব সাকসেসফুল না হলেও ময়দানে পরিচিত মুখ। মিডিয়া এমনিতেই তেতে আছে।’

সৌরভ সান্যালের কণ্ঠস্বরে দুশ্চিন্তা আর ঢাকা পড়ছে না। অর্জুন তাকাল মৃতদেহের দিকে। চিৎ হয়ে পড়ে আছে দেহটা। মাথার উপর দুই হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা। দুই পাও একসঙ্গে বাঁধা। মুখের রঙ কালচে। চোখ দুটো বিস্ফারিত। বোঝাই যায় শ্বাসবায়ুর অভাবে মৃত্যু হয়েছে ভিকটিমের। কিন্তু বাকি তিনটে হত্যার মতো এক্ষেত্রেও গলা কাটা।

ডক্টর সেন নিজের পর্যবেক্ষণ শেষ করে তাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। ডিসিডিডি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কখন হয়েছে খুনটা? কী মনে হয়?’

ডক্টর সেন বললেন, ‘সেটা তো এভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে মনে হয় মাঝরাতের পর।’

‘এত রাতে বলাই সাহা এখানে এই ধাপার মাঠে কেন আসতে যাবে অর্জুন?’

অর্জুন বলল, ‘আসবে না, যদি না কেউ উঠিয়ে নিয়ে আসে।’

‘তার মানে দাঁড়াচ্ছে মার্ডারার বলাই সাহাকে কিডন্যাপ করে ধাপার মাঠে এনে হত্যা করেছে। এদিকটা শুনশান থাকে। লোকচক্ষুর আড়ালে কাউকে মেরে ফেলা সহজ।’ বললেন সৌরভ সান্যাল, ‘কিন্তু আমাকে ভাবাচ্ছে গলার কাটাটা। খুন করার পর খুনি ক্ষুর দিয়ে গলা কাটছে কেন?’

অর্জুন বলল, ‘সাধারণত সিরিয়াল কিলিং-এর ক্ষেত্রে দেখা যায় খুনিরা নিজেদের সিগনেচার ছাড়ার চেষ্টা করে। মানে আর্টিস্ট যেমন প্রতিটা ছবির নীচে সই করে, তেমনই মার্ডারারের কাছেও প্রতিটা মার্ডার একেকটা অ্যাকমপ্লিশমেন্ট। এক্ষেত্রে ক্ষুর দিয়ে গলা কাটাটা হয়তো আমাদের এই খুনির সিগনেচার।

সৌরভ সান্যাল ছদ্ম গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন, ‘ওদিকে আমার উপর উপরওয়ালা আর মিডিয়া একসঙ্গে তান্ডব করছে। আর এখানে ইনি মার্ডারারের শিল্প-প্রতিভার বিচার করতে বসেছেন। দেখছেন তো ডক্টর সেন, কাদের নিয়ে আমাকে কাজ করতে হয়!’

ডক্টর সেন হাসলেন। বললেন, ‘আপনাদের কিছু দেখার থাকলে দেখে নিন। আর দেখা হয়ে গেলে বডি তুলতে বলুন।’

‘আমি একটু দেখে আসি স্যার’, বলে এগিয়ে গেল অর্জুন। ডক্টর সেনের প্রাথমিক ধারণা সত্যি বলে মেনে নিলে এই খুনটা সত্যিই ভীষণ ভয়ঙ্করভাবে হয়েছে। বলাই সাহার মুখটা সামান্য খোলা। মুখের চারপাশে ভনভন করে মাছি ও ছোটো ছোটো পোকা উড়ছে। নীলচে শরীর ফুলে উঠেছে খানিকটা। মৃতদেহে ম্যাগট কালচার শুরু করে গেছে ইতিমধ্যে। হয়তো পরিবেশের কারণেই পচন ধরার প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়েছে। এখানে এমনিতেই চারিদিকে এত দুর্গন্ধ যে মৃতদেহের পচনের গন্ধ বেরোলেও তা আলাদা করে খুব বেশি টের পাওয়া যাচ্ছে না।

মৃতদেহের চারপাশটা ঘুরে দেখল অর্জুন। চতুর্দিকে ময়লার ঢিপি জমে আছে। হাজারো আবর্জনার মাঝে সূত্র খুঁজতে যাওয়া বৃথা।

চলেই আসছিল অর্জুন, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। একদম সামনে থেকে দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু এই কোণ থেকে বলাই সাহার সামান্য খোলা মুখের ভেতরে কিছু যেন দেখা যাচ্ছে।

‘স্যার, এদিকে আসুন!’ উচ্চকণ্ঠে ডাকল অর্জুন। সৌরভ সান্যাল ও ডক্টর সেন ছুটে এলেন। আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফোর্সের বাকিরাও এগিয়ে এল।

‘স্যার, ভিকটিমের মুখের ভেতরে কিছু আছে। ডান গালের ভেতর দেখুন, জিভের ফাঁক দিয়ে কিছু দেখা যাচ্ছে,’ বলল অর্জুন। ডক্টর সেন লাশের পাশে আবর্জনার উপরেই উবু হয়ে বসলেন। গ্লাভস পরা ডান হাতের আঙুল ভিকটিমের মুখের ভেতর ঢুকিয়ে গাল ও মাড়ির দাঁতের মাঝখান থেকে বের আনলেন জিনিসটা। একটা কালো বোতাম, এখনো তাতে কালো সুতো সুতোর টুকরো জড়ানো।

কনস্টেবল লক্ষ্মণ সিং এভিডেন্স ব্যাগ এগিয়ে দিল। ডক্টর সেন বোতামটাকে সেই ছোট্ট প্লাস্টিকপ্যাকে ঢুকিয়ে ডিসিডিডি সৌরভ সান্যালের হাতে দিলেন। ‘ভিকটিম রেজিস্ট করার চেষ্টা করেছিল,’ বললেন ডক্টর সেন, ‘হাত-পা বাঁধা থাকায় সম্ভবত মুখ দিয়ে কামড়ে ধরেছিল। তাতেই বোতাম ছিঁড়ে এসেছে। সুতরাং ধরেই নেওয়া যায় যে এটি আমাদের শ্রীমান সিরিয়াল কিলার বন্ধুর। ভিকটিমের মুখের ভেতর থেকে স্যালাইভা টিস্যু নিয়ে টেস্ট করে দেখতে হবে যে কোনো ফরেন ডি এন এ পাওয়া যায় কি না। আপাতত নিজেদের হেফাজতে যত্ন করে রাখুন জিনিসটা। এই কেসে প্রথম আপনাদের হাতে কোনো সূত্ৰ এল। আমিও কিন্তু মিস করে গেছিলাম। বুড়ো হয়েছি তো! ক্রেডিট গোজ টু অর্জুন।’ সৌরভ সান্যাল হাসিমুখে অর্জুনের পিঠ চাপড়ে দিলেন। বললেন, ‘ওয়েল ডান!’

ধাপা থেকে বেরিয়ে পুলিশ জিপে ওঠার আগে অর্জুনকে ডাকলেন ডিসিডিডি। বললেন, ‘সন্ধেবেলায় একটা প্রেসমিট রাখছি। মিডিয়াকে শান্ত করা দরকার। তুমি সঙ্গে থাকবে। শার্প সিক্স ও ক্লক, ওকে?

‘ওকে স্যার’, মাথা নাড়ল অর্জুন।

১৭

বিলাল শেখ, সুখেন্দুশেখর ভৌমিক, অনিরুদ্ধ মল্লিক ও বলাই সাহার ডেডবডি ও অকুস্থলের বেশ কিছু ছবি সারা টেবিলে সাজিয়ে সামনে চিন্তিত মুখে বসে ছিল টাপুর। রাত সাড়ে দশটা বাজে। প্রেস মিট ছিল আজ অর্জুনের। সেই মিটের সরাসরি ব্রডকাস্ট টিভিতে দেখেছে টাপুর। কলকাতা পুলিশকে কার্যত তুলোধোনা করেছে মিডিয়া।

মিট শেষে সোজা অফিস থেকে বেরিয়ে তার বাড়িতে এসেছে অর্জুন। ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছিল ওকে। এই কেস নিয়ে কতটা খাটছে অর্জুন, খুব ভালো করে জানে টাপুর। একেকদিন রাতে বাড়িও ফেরে না। আজকাল আর আগের মতো ঘন ঘন তার ফ্ল্যাটে আসার সময় পায় না। প্রথম প্রথম খারাপ লাগত একটু। কিন্তু টাপুর বোঝে যে তাদের পেশাটাই এমন। ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকে না। তবু তারা দুজনেই জানে, কাজের ব্যস্ততার বাইরেও একটা খোলা ছাদ আছে। ক্লান্ত শরীর মন নিয়ে সেখানে পৌঁছোলে আশ্রয় মেলে। মেলে শান্তি। তাদের এই সম্পর্ককে এখনও কোনো নামে বাঁধেনি তারা। টাপুরের মনে হয় নাম দিলেই সম্পর্কের পরিসর সংকীর্ণ হয়ে যায়। তখন আসে চাহিদা, কিছু পাওয়ার আশা।

মিতুল অবশ্য অন্য কথা বলে। বলে টাপুরের নাকি কমিটমেন্ট ফোবিয়া আছে। মিতুলের কথা মনে হতেই টাপুরের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা খেলে যায়। পাগলি একটা। তবে সত্যিই ওর মতো করে টাপুরকে কেউ বোঝে না। মাঝে মাঝে মনে হয় হয়তো সত্যিই বলে ও। অর্জুনের কাছে টাপুর কৃতজ্ঞ যে সে তাকে কখনো জোর করেনি। অর্জুন জোর করলে ওকে ফেরানোর সাধ্য টাপুরের ছিল না। কিন্তু এটাও ঠিক যে ও অপেক্ষায় আছে। টাপুর কি নিজে সমৰ্পণ করতে চায় না? দিনের শেষে এই খালি ফ্ল্যাটে একটা মানুষের উপস্থিতি অনুভব করতে তো তারও ইচ্ছে করে। তবু কী জানি কীসের বাধা! কিছু দ্বিধা তাকে বাধা দেয় সম্পূর্ণ সমৰ্পণে।

এই মুহূর্তে সোফায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে অর্জুন। ভীষণ ক্লান্ত ছিল ও, তার চেয়েও বেশি ছিল বিরক্ত। প্রেস আর টেলি মিডিয়ার প্রতিনিধিদের যুগপৎ সাঁড়াশি আক্রমণে কলকাতা পুলিশকে কার্যত দিশেহারা দেখাচ্ছিল। সেখান থেকে বেরিয়েই টাপুরের কাছে এসেছিল অর্জুন, হয়তো দাহের উপর একটু শীতলতার প্রত্যাশায়। চা জলখাবার খেয়ে সোফাতেই শুয়ে ঘুমোচ্ছে এখন। ঘুমন্ত অর্জুনের মুখটা দেখে বড্ড মায়া হয় টাপুরের। কেমন শিশুর মতো সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। অর্জুনকে এতটা সুন্দর কই আগে তো কখনো মনে হয়নি! খুব ইচ্ছে করে ওর এলোমেলো চুলগুলোতে বিলি কাটতে, আরও কিছুক্ষণ এভাবেই ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে।

লজ্জা পায় টাপুর। নিজের মনকে শাসন করে। টেবিলে ছড়ানো ছবিগুলোর দিকে তাকায়। চারজন ভিকটিম, শহরের চারটা আলাদা আলাদা জায়গা। চারজনের মধ্যে মিল বলতে ক্ষুর দিয়ে কাটা গলা। কাটা দাগগুলোকে মন দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে টাপুর। প্রত্যেকটা হত্যার পদ্ধতি আলাদা। কিন্তু তারপরেও ক্ষুরের ব্যবহার কেন! হত্যাকারী কি কিছু বলতে চায়!

সাধারণত দেখা যায়, সিরিয়াল কিলিং-এর ক্ষেত্রে কিলারের মধ্যে একটা আশ্চর্য আত্মবিশ্বাস কাজ করে। তারা পুলিশের দিকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে চায়। বুদ্ধির খেলায় নামতে চায় অনেক ক্ষেত্রেই। ভাবটা এমন, যে এই নাও তোমার সামনে সূত্র সাজিয়ে দিচ্ছি। পারলে ধরে দেখাও আমাকে। এ কী এমনই কিছু! অর্জুনের যাই মনে হোক, টাপুরের কোনো সন্দেহ নেই যে এটা সিরিয়াল কিলিং-এর কেস। কলকাতা শহরে রাতের অন্ধকারে কোনো সাইকোপ্যাথ ঘুরে বেড়াচ্ছে! সত্যিই কি সাজিয়ে দিচ্ছে কোনো সূত্র যা এখনও তাদের চোখে পড়ছে না!

হত্যাগুলির প্রতিটির ক্ষেত্রে মোডাস অপারেন্ডি পৃথক। কেন? ভাবতে থাকে টাপুর। সাধারণ খুনের ক্ষেত্রে যেসব উপায় হত্যাকারীরা সাধারণত অবলম্বন করে থাকে, এই খুনগুলো সেরকম নয়। কেউ কেন একজন দাগি আসামিকে মুখে কোকেইন ঢুকিয়ে খুন করবে? কেন একজন ফুটবল কোচের মুখে গ্যাসের সিলিন্ডারের পাইপ গুঁজে দেবে? এত বীভৎসতা কেন?

বিলাল শেখের মৃতদেহটা দেখে টাপুর। সেন্টার টেবিলের নীচের র‍্যাক থেকে একটা রাইটিং প্যাড টেনে নেয়। লেখে, বিলাল শেখ, লোকাল মাফিয়া, এম জি রোড।

অন্যমনস্কভাবে পেনের ঢাকনাটা দাঁত দিয়ে চিবাতে থাকে টাপুর। এম জি রোড থানার ওসির সোর্স জানিয়েছে যে কেউ একজন বিলাল শেখের মৃত্যুর আগে রোজ রাতে সেখানে যেত। সুতরাং ধরে যেওয়া যেতে পারে খুনি রীতিমতো প্ল্যান করে, হয়তো বা বিলাল শেখকে একাধিক দিন অনুসরণ করে খুনটা করেছে। সে জানত বিলাল ওই জায়গা দিয়ে বাড়ি ফেরে।

কিন্তু সুখেন্দুশেখর ভৌমিক? তার তো ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। সেদিনের গাড়ির ড্রাইভারের সন্ধান এখনও মেলেনি। সেই ড্রাইভারই যদি খুনি হয় তাহলে সে ইচ্ছে করেই সেই রাতে সুখেন্দুশেখর ভৌমিককে কালিন্দীর শুনশান গলিতে নিয়ে গিয়েছিল। এখানেও দেখা যাচ্ছে যে খুনটা পূর্বপরিকল্পিত। খুনি জানত যে সুখেন্দুবাবু সেদিন নৈহাটিতে যাবেন। সেও সেইমতো নৈহাটির অনুষ্ঠানে গেছিল। যেভাবেই হোক সুখেন্দুবাবুকে ফাংশনের শেষে সেখান থেকে বের করে এনেছিল। এখানে একটা খটকা অবশ্য থেকেই যাচ্ছে। যে এত সুসংবদ্ধভাবে পরিকল্পনা মাফিক খুন করছে, সে এতখানি রিস্ক কেন নিল? অনুষ্ঠান শেষে যদি কর্মকর্তাদের গাড়ি থাকত, তাহলে তো সুখেন্দুবাবু সেই গাড়িতেই চলে যেতেন। সেক্ষেত্রে খুনির কষ্ট করে নৈহাটি যাওয়াটা ব্যর্থ হত সন্দেহ নেই।

টাপুর মোবাইল ফোনে সুমনাদেবীর নম্বর ডায়াল করল। তৃতীয়বার রিং হওয়ার আগেই অপর প্রান্তে সুমনা ভৌমিকের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। টাপুর বলল, ‘একটা কথা জানার জন্য বিরক্ত করলাম আপনাকে।’

‘হ্যাঁ বলুন,’ সুমনাদেবীর কণ্ঠস্বর একটু ভারী শোনাল।

‘জানতে চাইছি যে সুখেন্দুবাবু বাড়ি থেকে নিয়মিত বেরোতেন? নাকি শুধু অনুষ্ঠান বা কোনো বিশেষ কাজ থাকলেই বাইরে যেতেন?’

সুমনাদেবী বললেন, ‘না না, রোজই তো বেরোত ও। যতদিন চাকরি করত, ততদিন তো বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক খুব সামান্যই ছিল। রিটায়ারমেন্টের পর ঘরে বসে থাকতে পারত না। রোজ সকালে নিজে বাজারে যেত। দরকার না থাকলেও যেত। বন্ধুবান্ধবের যাদের সঙ্গে চাকরির ব্যস্ততার জন্য যোগাযোগ কমে এসেছিল, ফেসবুকে এসে নতুন করে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। প্রায়ই বন্ধুরা আড্ডা দিতে যেত কোনোখানে।’

‘রাতে? রাতে বেরোতেন?’ জানতে চাইল টাপুর।

‘হ্যাঁ। রাতে খাওয়ার পর গলির ভেতর হাঁটত। আমাদের গলিটার ভেতর দিয়ে একটু দূরে গেলে জায়গাটা বেশ শুনশান থাকে। তিনি বলতেন যে ওই সময়টা হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো কেসগুলো নিয়ে মাথার মধ্যে ঘাঁটাঘাঁটি করতেন। সেখান থেকেই লেখার মেটিরিয়াল তুলে আনতেন। এমনিতেই আমাদের বাড়িতে ডিনার বেশ দেরিতেই হয়। বহুদিনের অভ্যেস। তারপর বেরোত ও। কোনো কোনোদিন তো ফিরতে ফিরতে রাত বারোটাও বাজিয়ে দিত।’

‘বেশ, এটুকুই জানার ছিল,’ টাপুর বলল।

‘কিছু জানতে পারলেন?’ সুমনাদেবীর কণ্ঠে আশা-নিরাশার দোলাচল।

টাপুর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘এখনও নয়। কিছু জানতে পারলে আপনাকে জানাব।’

ফোনটা রেখে কিছুক্ষণ থুম হয়ে বসে রইল টাপুর। মাথার ভেতর অনেক রকম ভাবনার সম্মুখ সমর চলছে। আস্তে আস্তে ঝড়টা শান্ত হয়ে এল। চোখদুটো জ্বলে উঠল টাপুরের।

‘অর্জুন… অর্জুন…!’

‘হুম,’ ঘুমের ঘোরে জড়ানো গলায় উত্তর দিল অর্জুন।

‘ওঠো না প্লিজ,’ উত্তেজিত স্বরে বলল টাপুর।

‘কী হল?’ কোনোক্রমে চোখ খুলে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘বলছি ড্রাইভার সুখেন্দু ভৌমিককে খুন করতে কালিন্দীতে কেন নিয়ে গেল?’

‘কেন?’ অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে বসল অর্জুন।

টাপুর সোজা হয়ে বসল অর্জুনের মুখোমুখি। বলল, ‘আরে শোনো না, সুমনা ভৌমিক বললেন যে সুখেন্দুবাবু রাতের দিকে হাঁটতে বেরোতেন। রাস্তাটাও বেশ শুনশান থাকত। তাহলে তখন না খুন করে অত কষ্ট করে নৈহাটি থেকে বয়ে কালিন্দীতে নিয়ে এসে খুন করতে গেল কেন খুনি? কেন এতটা রিস্ক নিল?’

‘কেন? কী বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না!’ হাই তুলে বলল অর্জুন। ওর দুই চোখে এখনও জড়িয়ে আছে গভীর ঘুম।

টাপুর অস্থিরভাবে দুই হাতে অর্জুনের বাহু ধরে ঝাঁকালো।

‘প্লিজ অর্জুন, বোঝার চেষ্টা করো। এভরিথিং ইজ প্ল্যানড, প্ল্যানড ফর সাম রিজনস। এটা একটা সিরিয়াল কিলিং-এর কেস। সবগুলো খুন রিলেটেড, হয় একে অপরের সঙ্গে, না হয় খুনির সঙ্গে। অ্যান্ড দে মাস্ট হ্যাভ ফলোড সাম প্যাটার্নস।’

অর্জুন এবার সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘কীসের প্যাটার্ন? কিছু বুঝতে পেরেছ তুমি?’

টাপুর এবার মিইয়ে গেল। বলল, ‘এখনও নয়। আরেকটু ভাবতে হবে। তুমিও ভাবো। তবে খুনি সহজ লোকেশন ও সুযোগ ছেড়ে ভিকটিমকে কালিন্দীতে তুলে নিয়ে গিয়ে এমনি এমনি মারেনি। আর বলাই সাহা? তাকে কেন ধাপার মাঠে নিয়ে গেল? ভাবো অর্জুন। এমনি এমনি নয়। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম যে খুনটা লুকোনোর জন্য ওই জায়গা বেছেছে। কিন্তু তা তো নয়। তা হলে বডি অমন খোলা জায়গায় ফেলে রাখত না যেখানে সহজেই লোকের নজরে পড়ে।’

‘কিন্তু বিলাল আর অনিরুদ্ধের ক্ষেত্রে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘বিলাল শেখ। সে অবশ্য ওই চত্বরেই থাকত। তাকে তার বর্তমান বাসস্থানের কাছেই মেরেছে। কিন্তু অনিরুদ্ধ মল্লিক?’

অর্জুন বলল, ‘অনিরুদ্ধ মল্লিক রাতে মাঝেমধ্যে ওই এলাকায় যেতেন। অনিরুদ্ধ মল্লিকের মাকে যে মহিলা রাতে দেখাশোনা করে, তার থেকে খবর নিয়ে জানা গেছে সপ্তাহে দুই-এক দিন রাতের দিকে বেরোতেন। তবে সে এও জানিয়েছে যে অনিরুদ্ধ মল্লিকের মদ্যপানের অভ্যেস ছিল। প্রায়ই মদ্যপ অবস্থায় বেশ গভীর রাতে বাড়ি ফিরতেন।’

‘অর্থাৎ শুধু রাজারহাটে নয়, অন্যত্র খুন করারও সুযোগ ছিল। হুম!’ একটু চিন্তিত দেখল টাপুরকে।

‘ওই কাজের মহিলার কাছে আরও একটা খবর পেলাম।’ বলল অর্জুন।

‘কী?’

‘অনিরুদ্ধ মল্লিকের স্ত্রী প্রেগন্যন্ট ছিলেন। মাস দুয়েকের প্রেগন্যান্সি!’

টাপুর বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল অর্জুনের মুখের দিকে। সুমনাদেবীর অনিরুদ্ধ মল্লিকের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন নিয়ে বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার। অর্জুন আবার হাই তুলে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজল। সেভাবেই বলল, ‘রাতে দুটো খেতে দেবে না বললেই হত। রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। বাড়ি ফিরতে হবে। ওদিকে আবার রাতের শহরে মারাত্মক খুনি ঘুরছে।’

টাপুর লাফিয়ে উঠল। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেত বলল, ‘এমা ইশ্! ঘড়ির দিকে খেয়ালই করিনি। আমি এখনই খাবার গরম করে দিচ্ছি।’

অর্জুন মুচকি হাসল।

‘আর শোনো,’ টাপুর রান্নাঘর থেকেই বলল, ‘এত রাতে আজ আর বাড়ি ফিরে কাজ নেই। তবে সোফায় ঘুমোতে হবে কিন্তু। বিছানা ছাড়া আমার ঘুম হয় না।’

১৮

কাল রাতে অর্জুনকে বাড়ি ফিরতে দেয়নি টাপুর। আজ সকালে দুজনে একসঙ্গে মর্নিং ওয়াকে গেছে। ফিরে এসে টাপুর ব্রেকফাস্ট বানিয়েছে। এতদিন দুজনে একসঙ্গে কাজ করছে বন্ধু হিসেবে, কখনো বা সহকর্মী হিসেবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি এসেছে তারা। দুজনের কেউই নিজেদের অনুভূতিকে আড়াল করেনি। দুজনেই হৃদয় দিয়ে জেনেছে যে অপরজন তারই। মিতুল তাদের বিয়ে নিয়ে মজা করেছে অনেকবার। কিন্তু টাপুরের দ্বিধাটা বোঝে অর্জুন। তাই তাকে সময় দিতে চেয়েছে।

টাপুরের সঙ্গে জীবন কাটাতে অবশ্যই চেয়েছে অর্জুন। কিন্তু গত রাতটা তাদের কাছে অন্য রকম ছিল। দুজনে দু-ঘরে থেকেও বড্ড কাছে ছিল তারা। সকালে উঠে অর্জুনের জন্য টিফিন বানানোর সময় টাপুরের মুখে যে আলোটা ছিল, সেটা একদম নতুন। দুজনের জন্য একটা ছাদ, হাতে হাত রেখে পথ চলা, নিজেদের একটা সংসার, আরও অনেক কিছুর জন্য এতটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা এর আগে এভাবে কখনো অনুভব করেনি অর্জুন।

ব্রেকফাস্টের টেবিলে টাপুরের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। আজ যেন আরও বেশি সুন্দর দেখাচ্ছিল ওকে। টাপুর বোকা এমন অভিযোগ অতি বড়ো শত্রুও করতে পারবে না। অর্জুনের মুগ্ধ দৃষ্টি চিনতে অসুবিধে হয়নি তার। কিন্তু অন্যদিনের মতো ছদ্ম ধমক দেয়নি, বা ইয়ার্কি করে উড়িয়ে দেয়নি।

বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল টাপুর। মৃদুস্বরে বলেছিল, ‘রাতে আসবে?’

অর্জুন চোখ রেখেছিল টাপুরের চোখে। তারপর মৃদু হেসে বলেছিল, ‘দেখি! এখনই কথা দিতে পারছি না। তবে চেষ্টা করব।’

টাপুর বলেছিল, ‘আগামীকাল নিউ ইয়ার ইভের রাত। মিতুল কাল রাতে বাইরে ডিনারের প্ল্যান করছিল। তুমি কি আসতে পারবে?’

‘কোথায় যাবে ঠিক করেছ কিছু?’ হেসে জিজ্ঞাসা করেছিল অর্জুন।

‘পার্ক স্ট্রিট। প্লিজ আজ যদি আসতে নাও পারো কাল অন্তত এসো!’

‘বেশ, আসব। মিতুলকে বলে দিও ওর অনসাইটে যাওয়ার আগে কাল ট্রিট আমার তরফে।’

আলো ঝলমলে হাসি হেসেছিল টাপুর। সকালটা আরও বেশি করে সুন্দর হয়ে গেছিল সেই মুহূর্তে। ঘর ছেড়ে বেরোনোর মুখে থমকে দাঁড়িয়েছিল অর্জুন। টাপুরের হাতে হাত রেখেছিল একবার। চোখে চোখ।

অফিসে নিজের ডেস্কে পৌঁছেই বলাই সাহার অটোপ্সি রিপোর্ট হাতে এল। চেয়ার টেনে বসে ফাইলটা খুলল অর্জুন। একইরকম ভাবে গলা কেটে খুন। মৃতের রাইট ক্যারোটিড আর্টারি সম্পূর্ণরূপে কাটা হয়েছে। ট্রাকিয়া, ল্যারিক্স ও ইসোফেগাসে গভীর ক্ষত রয়েছে। সার্ভাইক্যাল ভার্টিব্রার হাড় আংশিকভাবে কেটেছে।

কাটা দাগ মৃতের গলার ডানদিকে বেশি গভীর। যেহেতু মৃতদেহ সোজা চিৎ হওয়া অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেক্ষেত্রে হত্যাকারীর ডানহাতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

পরের পাতা ওল্টাতে যাচ্ছিল অর্জুন, ঠিক তখনই ফোনটা এল। অভিজিত শূর। মনে পড়ল এঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের মৃত্যুর পরদিন সকালে। দমদম থানার অফিসার।

‘হ্যাঁ বলুন, এনি আপডেট?’

অভিজিত বলল, ‘সরি টু ইন্টারফেয়ার। আমি জানি সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের কেসটা লালবাজারে আপনারা দেখছেন, কিন্তু কেসটা খুব ইন্টারেস্টিং। বিশেষ করে টিভিতে দেখলাম পুরো ব্যাপারটাতে মিডিয়া সিরিয়াল কিলিং-এর একটা অ্যাঙ্গল দিয়েছে।’

‘হুম। কোনো দরকারে ফোন করেছিলেন?’ বলাই সাহার পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে চোখ রেখেই জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

অভিজিত শূর বলল, ‘আমি সুখেন্দুশেখরবাবুর ফেসবুক পেজটা ফলো করি প্রথম থেকেই। আগে তো তিনি ফেসবুকেই লিখতেন। অফিসের কাজের চাপে সব সময় সঙ্গে সঙ্গে পড়া হত না। তাই আমি প্রথমদিকে পোস্টগুলো সেভ করে রাখতাম। পরে যখন বই প্রকাশের কথা হল, তারপর থেকে তিনি পোস্ট করে একদিন রেখে দিয়েই সেটা মুছে ফেলতেন। তাই আমিও পরে পড়ার জন্য সব পোস্ট কপি করে নোটপ্যাডে সেভ করে রাখতাম।’

কথাটুকু বলে একটু থামল অভিজিত। অর্জুনের ভুরু কোঁচকাল। হাত থেকে পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা টেবিলের উপর রেখে বলল, ‘হুম?’

অভিজিত বলল, ‘আমার মোবাইলে সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের সব পোস্টগুলো পরপর সেভ করা ছিল আলাদা ফোল্ডারে। পরের দিকে তিনি আর ফেসবুকে লিখতেন না। সরাসরি বইয়ে ছাপা হত কাহিনিগুলি। যাই হোক, যেটা বলছিলাম। আমার মোবাইলে স্টোর করা পোস্টগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ ঘটনাই নিজের বইয়ে রেখেছেন তিনি। বইগুলোও আছে আমার কাছে। গতকাল আমার ক্লাউডের স্টোরেজ খালি করতে গিয়ে ফোল্ডারটার কথা মনে পড়ল। খুলে দেখতে গিয়ে দেখলাম তিনটে ঘটনা এমন আছে যেগুলি কোনো বইয়ে নেই।’

‘আচ্ছা, কী ঘটনা?’ জানতে চাইল অর্জুন।

অভিজিত বলল, ‘দুটি ঘটনা এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু তিন নম্বরটিতে শেয়ালদা স্টেশনে রেলওয়ে দিয়ে ড্রাগস স্মাগলিং-এর উল্লেখ আছে। সুখেন্দুবাবুর টিম এরকম একটা খবর পেয়ে স্টেশনে যান। সেই সময়ে শেয়ালদা অঞ্চলে যেসব মস্তানরা এসব স্মাগলিং র‍্যাকেট চালাত, তাদের উপর অনেকদিন ধরেই পুলিশের নজর ছিল। তাদেরই মধ্যে একজন ছিল বিলাল শেখ। ওই অঞ্চলের সবরকম স্মাগলিং-এর অকথিত রাজা ছিল সে। একটা স্মাগলিং কনসাইনমেন্ট ধরার জন্য রেল পুলিশের সঙ্গে যৌথ অভিযান করেছিল কলকাতা পুলিশ। সেই অভিযান ফেল করেছিল তাদেরই টিমের একজনের জন্য। পরবর্তীতে ওই ডনকে অন্য কেসে অ্যারেস্ট করেছিলেন তিনি। গল্পে এর চেয়ে বেশি আর কিছু জানা যাচ্ছে না।’

‘বিলাল শেখ! বিলাল শেখের নাম লিখেছিলেন ভদ্রলোক?’ অর্জুন সোজা হয়ে বসল।

‘হ্যাঁ। গল্পটা পড়ে আমার সন্দেহ হয় স্যার। মিডিয়া মারফত বিলাল শেখের মার্ডারের ঘটনাটা জানি। গল্পে যে সময়ের উল্লেখ আছে, সেই সময়ে শেয়ালদা চত্বরে স্মাগলিং-এর কিংপিন ছিল বিলাল শেখ। তখনই মনে হল গল্পের বিলাল শেখই আমাদের ভিকটিম বিলাল শেখ।’

‘খুব ভালো কাজ করেছেন আপনি। বাই দ্য ওয়ে, যার জন্য মিশন ফেল করেছিল, গল্পে তার নাম আছে কি?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল।

‘না স্যার, কিচ্ছু নেই। ইন ফ্যাক্ট গল্পটা কোনো বইয়েও ইনক্লুড করেননি সুখেন্দুশেখরবাবু। দুই বছরে আগের পোস্ট এটা। মনে হয় না এই গল্প আর কারোর কাছে আছে।’

অর্জুন বলল, ‘আমাকে গল্পটা পাঠাতে পারবেন?’

‘অবশ্যই স্যার’, বলল অভিজিত, ‘আমি এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ। থ্যাঙ্কস আ লট!’

ফোনটা রেখে কিছুক্ষণ মাথার রগ টিপে ধরে বসে রইল অর্জুন। চারটি খুন। সুখেন্দুশেখরের সঙ্গে অনিরুদ্ধ মল্লিকের পরিচয় ছিল। অভিজিতের সন্দেহ যদি ঠিক হয়, সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হয় বিলাল শেখকেও চিনতেন সুখেন্দুবাবু, এবং পরিচয়টা উভয়ত। বাকি রইল বলাই সাহা। বলাই সাহার সঙ্গে বাকিদের কারোর পরিচয় ছিল কি না সেটা এখনি বলা যাচ্ছে না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্জুন। টাপুরই ঠিক। খুনগুলি সিরিয়াল কিলিং হলেও হয়তো উদ্দেশ্যহীন নয়।

মোবাইলে টুং করে শব্দ হল। অভিজিতের মেসেজ ঢুকল। ফাইলটা খুলে গল্পটা পড়তে শুরু করল অর্জুন। সুখেন্দুশেখরবাবুর লেখায় সাহিত্যগুণ কতটা ছিল বলা মুশকিল, কিন্তু বেশ টানটান একটা গতি অবশ্যই ছিল। বৈঠকি চালে বলে চলা ঘটনাগুলি পাঠককে টেনে রাখে। অর্জুন নিজে এই ডিপার্টমেন্টের লোক হয়ে বুঝতে পারে যে এগুলির বেশিরভাগই গুলগল্প। কিন্তু বাইরের পাঠক তা ধরতে পারবে না।

গল্পটা পড়া শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠল অর্জুন। সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের কর্মজীবনের সমস্ত রেকর্ড খুঁজে বের করতে হবে। জানা দরকার, বিলাল শেখের সঙ্গে সত্যিই কোনো যোগাযোগ ছিল কি না তাঁর।

নিজের ভাবনাতেই ডুবে ছিল অর্জুন। আবারও ফোন বাজছে। স্ক্রিনে নামটা দেখে সোজা হয়ে বসল সে। মন্টু দত্ত। একসময়ে ময়দানে সেকেন্ড ডিভিশন ফুটবল খেলত। সম্ভাবনা ছিল। এরপর একটা অ্যাক্সিডেন্টে হাঁটুর চাকতি গুঁড়িয়ে যায়। অপারেশনের পর হাঁটাচলা করতে পারলেও খেলা বন্ধ হয়ে যায় বরাবরের মতো। তবে ময়দানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। ছোটোখাটো ক্লাবের বিভিন্ন ম্যাচে প্লেয়ার সরবরাহ করে থাকে সে। বলা যায় ময়দানের দালাল। আরেকটা পরিচয় আছে মন্টুর। পুলিশের সোর্স সে। মধ্য কলকাতা অঞ্চলে অনেক অন্ধকারের খবর সে রাখে।

‘হ্যালো মন্টু, বলো। খবর কিছু পেলে?’

‘খবর আছে স্যার। বলাই সাহাকে হাড়ে হাড়ে চিনি আমি। শয়তানের হাতবাক্স যাই হোক, আমি কি পুলিশ স্টেশনে আসব, না অন্য কোথাও দেখা করবেন?’

১৯

উত্তর কলকাতার যে সব পাড়ায় গলির ভেতর তস্য গলি, রোয়াক, পাড়ার মোড় এখনও টিকে আছে, এমনই এক এঁদো গলির ভেতর অনেকটা জায়গা জুড়ে বাড়িটা। চতুর্দিকে ঘেরা মোটা ইটের উঁচু দেওয়াল। বাড়িতে ঢোকার সদর দরজাটা সেই তুলনায় বেশ খর্ব। ঢোকার মুখের প্রশস্ত উঠোন। কলকাতার বুকে এতটা জায়গা জুড়ে বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও যে প্রোমোটার আগ্রহ দেখায়নি তার কারণ এই গলিতে বড়ো গাড়ি ঢোকার উপায় নেই। এই বাড়ির বয়স হিসেব মতো একশোরও বেশি। বিস্মৃতপ্রায় অতীতে এই গলির প্রায় সব বাড়িই এই পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ছিল। বনেদি পরিবার। নীল রক্ত। দিন বদলায়, সময় বদলায়। মালিকানাই বা অপরিবর্তিত থাকবে কেন?

‘বাড়িতে ঘুঘু চড়া’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ দেখতে হলে এই বাড়িতে অবশ্যই পায়ের ধুলো দেওয়া উচিত। একসময় এ বাড়ি গমগম করত অনেক মানুষের কোলাহলে। এখন এখানে খোপে খোপে ঘুঘুদের অবাধ সংসার। বেশিরভাগ ঘরই আর ব্যবহারযোগ্য নেই। উঠোনে ঝাঁট পড়ে না বহুকাল। এই বাড়ির বর্তমান বাসিন্দারাও গৃহস্থালির রোজনামচায় উৎসাহ হারিয়েছে। পচা পাতা, পাখির বিষ্ঠা, আরও কত কী জমে দম বন্ধ করা দুর্গন্ধ ভারী কুয়াশার মতো চেপে আছে এ বাড়ির আঙিনায়।

বারান্দা ও কোণের একটি ঘর ছাড়া আলোর কারবার নেই এ বাড়িতে। যে লোকটি থাকে এখানে, সে সকালে উঠে বেরিয়ে যায়। ঘুঘুরা নিজেদের বাসা থেকে অলস চোখে তাকিয়ে দেখে হয়তো, কখনো বা দেখেও না। কোথায় যায় কেন যায় সে নিয়ে ঘুঘুদের মাথাব্যথা নেই। এমনকি লোকটা কত রাতে ফেরে বা আদৌ ফেরে কি না তা নিয়েও ভাবে না কেউ। একদিন হয়তো তাকে নিয়ে ভাবার মতো মানুষেরা ছিল এই বাড়িতে, একজন নয় হয়তো অনেকেই ছিল। একে একে নিভেছে দেউটি। এখন লোকটি প্রেতের মতো এ বাড়িতে বাস করে। কখনো কখনো তার নিজেকে অশরীরী বলে ভ্রম হয়। মনে হয় কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না। এ এক অন্যরকম উত্তেজনা।

এখন এই মুহূর্তে লোকটা বাড়িতেই আছে। আলো-অন্ধকার ঘরে একটা টিমটিমে পঁচিশ ওয়াটের বাল্বের আলো হলদেটে লসিকার মতো গড়িয়ে নামছে ঘরের দেওয়াল, ছাদ বেয়ে। লোকটার সামনে একটা জীর্ণ কাঠের টেবিলের উপর গত কয়েকদিনের পেপার ছড়ানো। সবচেয়ে উপরে রাখা পেপারটার ফ্রন্টপেজে বলাই সাহার হাসিমুখের ছবির পাশেই ধাপার মাঠে জঞ্জালের মধ্যে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা অবস্থার ছবি।

পেটের ভেতর কুলকুল করে এক গামলা হাসি ঘুলিয়ে ওঠে লোকটার। দুলে দুলে হাসতে থাকে সে। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। বলাই সাহার ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে স্থিরদৃষ্টিতে। চোখের সামনে ছবিগুলো ভেসে উঠতে থাকে চলচ্চিত্রের মতো।

..আর পারছি না স্যার। ছেড়ে দিন স্যার…

রোগা কিশোরটির পেটে রুলের গুঁতো মারেন গেম টিচার।

…লজ্জা করে না? পারছি না বলতে লজ্জা করে না? পুরুষমানুষ না তুই? চুড়ি পরে বাড়িতে বসে থাক যা।

আবার রুলের বারি পড়ে মাথায়।

…এই মাঠের চারদিকে আরও পাঁচ রাউন্ড মারবি।

…আর পারছি না স্যার… আমি মরে যাব স্যার…

…মেয়েছেলের মতো নাকে কাঁদছিস কেন? অ্যাই তুই আদৌ ছেলে তো? প্যান্ট খোল দেখি! খোল, প্যান্ট খোল। অ্যাই সবাই এদিকে আয়। আজ পরীক্ষা করে দেখা হবে এটা আদৌ ব্যাটাছেলে কি না…

চারদিকের মুখগুলো বদলে যাচ্ছে। ষোলো বছরের বাচ্চা ছেলেটাকে ঘিরে ধরেছে এক ঝাঁক রাক্ষস। ওদের লাল চোখ, ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা শ্বদন্ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে লোকটা।

ষোলো বছরের কিশোরের রোগাভোগা দেহটা মাঠের মাঝখানে পড়ে আছে। তরতরে মুখখানা নীল হয়ে উঠেছে। ছেলেটা বাঁচতে চেয়েছিল। শেষ মুহূর্ত অবধি হাতজোড় করে বলেছিল, ‘আর পারছি না স্যার। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বুকে ব্যথা করছে। ছেড়ে দিন স্যার।’

আবারও রুলের বারি। আবার, আবার, আবারও। ছেলেটার দৃষ্টির সমুখ থেকে সব আলো নিভে যেতে থাকে। নিভে যায় একসময়। তারপর একটা নীলচে হয়ে আসা রোগা ছেলেকে নিয়ে ছুট ছুট ছুট। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল। এই মুহূর্তে সেই ছেলেটার ঘামে ভেজা এলোমেলো চুল, নীল হয়ে যাওয়া মুখখানা, পায়ের পাতার তলায় লাল দগদগে ঘা সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে লোকটা। আর দেখতে পাচ্ছে খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বলাই সাহার চোখ ওলটানো ভেটকি মাছের মতো মৃত মুখটা।

লোকটার অধরোষ্ঠে কুলে কুলে হাসির ঢেউ উথলে ওঠে। উচ্চস্বরে হাসতে থাকে সে। হাসতে হাসতে হাঁফাতে থাকে। হাঁফাতে হাঁফাতে ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে শিশুর মতো। এ আজ নতুন কিছু নয়। রোজই কাঁদে লোকটা, রোজই হাসে। মাঝে মাঝে বড্ড ভয় করে তার। রাক্ষস, তার চারপাশ জুড়ে শুধু রাক্ষস, হাজারে হাজারে, লাখে লাখে, কোটিতে কোটিতে। রাতে ঘুমোতে পারে না সে। ঘুমোলেই মনে হয় চারদিক থেকে রাক্ষসেরা ঘিরে ধরেছে তাকে। কত রাত ভালো করে ঘুমোয়নি।

চেয়ারে বসেই চোখ বোজে লোকটা। দুলে দুলে গুনগুন করে গান গায়,

খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে!
ধান ফুরোল পান ফুরোল খাজনার উপায় কী?
আর কটা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।

সবুর! সবুর! আর কটা দিন? কত দীর্ঘ সময় ধরে সবুরই তো করে এসেছে সে। আর যে সবুর সয় না। রক্তাক্ত কুরুক্ষেত্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে একা অভিমন্যু, যাকে একদিন দলে দলে ঘিরে ধরেছিল মহারথীরা। মধ্যমপান্ডবের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও হেরে গেছিল সেই কিশোর। নিজের তরুণ বয়সটার কথা মনে পড়ে যায় তার। মনে পড়ে পরিবারের দিকে ঘনিয়ে আসা প্রথম আঘাতের কথা। তারপর আঘাতের পর আঘাত নেমে এল। একে একে মুছে গেল তার আপনজনেরা। তবে সে মরবে না এত সহজে। বেঁচে থাকতেই হবে তাকে, অন্তত আরও কিছুদিন। বেঁচে থাকতে হবে খেলাটা শেষ করার জন্য। খেলা!

বসে বসেই ঝিমোতে থাকে সে। ঝিমোতে ঝিমোতেই গুনগুন করে গাইতে থাকে, ‘আর কটা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।’— গাইতে গাইতে সেলুলয়েডের ছবির মতো সারি সারি ছবি ভেসে উঠতে থাকে তার মস্তিষ্কের পটে। বাবা, ভাই, প্রেমিকা, স্ত্রী-সন্তান সকলের হাসিমুখ দেখতে পায় সে। আবার মুখগুলো ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। বেদনা, ক্রোধ, অসহায়তা, আর্তির রং সব প্যালেটের গায়ে মাখামাখি হয়ে কালো হয়ে ওঠে তার স্মৃতির ক্যানভাস। কতগুলো মানুষ মিলে এই বাড়িতে একদিন প্রচন্ড ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করেছিল। সেই প্রলয় ঘূর্ণি চিরকালের মতো বদলে দিয়েছিল লোকটার জীবন।

সেই ঘূর্ণি গুটিয়ে আনছে সে। ঢেউগুলো শান্ত হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। তরঙ্গ ভাঙতে ভাঙতে এগোচ্ছে লোকটা। আর কটাদিন মাত্র বাকি। তারপর সব শান্ত হয়ে যাবে। যাবেই।

ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। সামনে দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো ঘড়িটার দিকে তাকাল। এ ঘড়ির বয়স তার স্বর্গত পিতার চেয়েও বেশি। নিয়ম করে দিনে দুবার চাবি ঘোরাতে হয়। লোকটা এই কাজটা যত্ন নিয়েই করে। সময়, সময় বড়ো জরুরি জিনিস। হিসেবের গড়মিল হলে খেলার মজাটাই যাবে নষ্ট হয়ে।

রাত সাড়ে এগারোটা বাজে এখন। আর মাত্র আধ ঘন্টা পরে একটা আস্ত বছর ফুরিয়ে যাবে। তাতে অবশ্য তার কিছু যায় আসে না এখন। কত সময়, কত মুহূর্তই তো গড়িয়ে গেল তার জীবন থেকে। একটা বছরের পরিবর্তন তাকে নতুন করে আর ভাবায় না।

কিন্তু বসে থাকারও উপায় নেই আর। উঠতে হবে এবার। আজ বর্ষবরণের রাতে কলকাতা পুলিশকে নতুন বছরের উপহার পাঠাতে হবে তো! মুচকি হাসে লোকটা। তারপর টেবিলে ছড়ানো-ছিটোনো কাগজের মধ্য থেকে একটা কাগজ টেনে চোখের সামনে নিয়ে এল। ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা একজন বয়স্কা মহিলার ছবির প্রিন্ট আউট। মহিলার ফর্সা গলাটা তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে। প্রতিবার যখন সে ভোঁতা খুর দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে গলা কাটে সময় নিয়ে, ঘন রক্ত গড়িয়ে নামে, কেমন যেন ঘোর লাগে তার। তাজা রক্তের গন্ধে দামি মদের চেয়েও বেশি নেশা হয়।

ছবিটার দিকে মোহগ্রস্থের মতো অনেকক্ষণ চেয়ে রইল লোকটা। তারপর লাল কালির কলম দিয়ে ভদ্রমহিলার গলায় লাল কালির জেল পেন দিয়ে ঘষে ঘষে দাগ কাটতে থাকল সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *