প্রলয় ঘূর্ণি – ৩০

৩০

লালবাজারে সৌরভ সান্যালের কেবিনে বিশাল সেক্রেট্রারিয়ট টেবিলের অপর প্রান্তে বসে আছে টাপুর। পাশে অর্জুন।

ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল স্বভাবগত দিক দিয়ে রসিক মানুষ। বললেন, ‘আমাকে আর বিপদে ফেলবেন না ম্যাডাম। এমনিতেই গলা অবধি ডুবে আছি। এই নিয়ে ছয়খানা খুন হল। এবার আমার চাকরিটা যদি বেঁচেও যায়, নির্ঘাত শীতলকুচিতে ট্রান্সফার দেবে।’

কথাগুলো মজাচ্ছলে বলা হলেও তার দুশ্চিন্তাটা নেহাত মিথ্যে নয়। শুধু ডিসিডিডিই বা কেন, কমিশনার, আইজি, ডিআইজি সকলের রাতের ঘুম উড়ে গেছে। স্টোনম্যান কান্ডের পর এত জটিল সিরিয়াল কিলিং-এর কেস এ শহরবাসী অন্তত প্রত্যক্ষ করেনি।

অর্জুন বলল, ‘স্যার, মিস ব্যানার্জি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। ওঁর নিজস্ব কিছু ধারণা আছে এই কেসের ব্যাপারে। আমার মনে হয় উনি কিছুটা হলেও হেল্প করতে পারেন।’

সৌরভ সান্যাল কাঁধ ঝাঁকালেন। মুখে হাসি টেনে বললেন, ‘এখন আমাদের খড়কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরার মতো অবস্থা। আর মিস ব্যানার্জি তো এখন সেলেব্রিটি ইনভেস্টিগেটর। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর অবধি কাছের মানুষ। তিনি বললে শুনতে তো হবেই।’

সৌরভ সান্যাল টাপুরকে বরাবরই স্নেহ করে এসেছেন। আজ তাঁর কথার ভঙ্গিটা একটু অন্যরকম লাগল টাপুরের। মনে হল, এই আপাত প্রশংসার আড়ালে সামান্য হলেও শ্লেষ মিশে আছে। তাই সে খুব নরম গলায় বলল, ‘স্যার, পুলিশের কাজে নাক গলানোর আমি কেউ নই। আমার হাতে না আছে সেই পাওয়ার, না আছে টেকনিকাল সাপোর্ট। পুলিশ যা পারে, একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ সারাজীবন চেষ্টা করলেও তা পারবে না। বাস্তবটা তো আর কাল্পনিক গোয়েন্দা কাহিনি নয়। আমাদের এক্তিয়ারের পরিধি ঠিক কতটুকু আপনার চেয়ে আর কে ভালো জানে!’

সৌরভ সান্যালের মুখ দেখে মনে হল টাপুরের কথায় খুশি হয়েছেন। গত কদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম, অসম্ভব মানসিক চাপ, কিছু করতে না পারার অসহায়তা, সর্বোপরি উপরমহলের চাপে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে এমনিতেই তার উপর টাপুরের সাহায্য করতে চাওয়া যেন তাদের ডিপার্টমেন্টের অক্ষমতার দিকেই আঙুল তুলছিল। ক্ষণিকের জন্য রাগ হয়ে গেছিল। এখন টাপুরের নম্র ব্যবহারে নিজেই লজ্জা পেলেন। তিনি জানেন, টাপুরের অসাধারণ ডিডাকশন ক্ষমতার কথা। সে যদি পুলিশ বিভাগে চাকরি করত, তাহলে ডিপার্টমেন্টের অ্যাসেট হতে পারত। কিন্তু সৌরভ সান্যাল এও জানেন, কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের হাত বাঁধা থাকে। আইনের ফাঁসে জড়িয়ে এমন অনেক কিছু করতে পারে না পুলিশ, যা সেই মুহূর্তে করা দরকার হয়ে পড়ে। এরকম অনেক পরিস্থিতিতে সংঘমিত্রা ব্যানার্জি এর আগেও রক্ষাকর্তা হয়ে এসেছে।

টাপুর আবার বলল, ‘আমি নিজের আগ্রহবশত কেসটা নিয়ে একটু স্টাডি করেছিলাম। কিন্তু এতে আমার খুব বেশি কিছু করার নেই। বড়োজোর আমি আমার ভাবনাচিন্তা, ডিডাকশন দিয়ে পুলিশের পাশে থাকতে পারি, যদি আপনি অনুমতি দেন

সৌরভ সান্যাল বললেন, ‘বলুন শুনি, কী ভাবছেন আপনি কেসটা নিয়ে জানেন তো, কাল রাতে আরেকটা খুন হয়েছে। নিউটাউনের একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কর্মীর ডেডবডি উল্টোডাঙা ফ্লাইওভারের নীচে পাওয়া গেছে।’

‘আমি শুনেছি নিউজে। সে কারণেই মনে হল আপনার সঙ্গে দেখা করার কথা।’ বলল টাপুর

‘বলুন কী বলতে চান।’

‘যিনি খুন হয়েছেন, শুনেছি তার বাড়ি বরানগর। নিউটাউন থেকে বরানগর যাওয়ার পথে যদি বা দেবাশীষ উল্টোডাঙা হয়ে ঘুরেও যেতে চান, সেক্ষেত্রেও ফ্লাইওভারের নীচে বাইপাসের দিকটায় যাওয়ার দরকার পড়ে না। তাহলে অত রাতে তিনি সেখানে গেলেন কেন?’

সৌরভ সান্যাল হাসলেন। বললেন, ‘সেটা জানা থাকলে তো ভালোই হত। তবে ভিকটিমের লাশের পাশে তার শ্যালিকার মোবাইল ফোন পাওয়া গেছে। ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, আজ সন্ধের পর মার্কেটে গেছিলেন তিনি। সেই সময় তাঁর ফোনটি খোয়া যায়। থানায় ডাইরিও করেছিলেন। ডাইরির কপি আমরা পেয়েছি। তিনি মিথ্যে বলছেন না। সন্দেহ হচ্ছে, ওই নম্বর থেকে ফোন করে খুনি ভিকটিমকে ওই জায়গায় ডেকেছিল।’

‘ফোন লক ছিল না?’

‘ছিল। তবে সম্ভবত সিম বের করে অন্য ফোন থেকে কল করেছে খুনি। দেবাশীষের নম্বর হয়তো আগে থেকেই জানত। তাই অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।’

‘আশ্চর্য তো! খুনি ডাকল আর তিনি চলে গেলেন?’

সৌরভ সান্যাল বললেন, ‘এমন কিছু হয়তো বলেছিল, যাতে তিনি ভয় পেয়ে গেছিলেন। ফোনের হোয়াটস্যাপ মেসেজ চেক করেছে আমাদের সাইবার টিম। কিছু ডিলিটেড মেসেজও পুনরুদ্ধার করেছে। ভিকটিমের সঙ্গে তার শ্যালিকার সম্পর্কটা ঠিক স্বাভাবিক শালি-জামাইবাবুসুলভ না হওয়ারই সম্ভাবনা। দুজনের মধ্যে বেশ কিছু এমন মেসেজ চালাচালি হয়েছে যেগুলোকে ঠিক নির্দোষ বলা চলে না। যাই হোক, আপনি খুনগুলো নিয়ে কী ভাবছেন বলুন শুনি।’

টাপুর একবার অর্জুনের দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘আগে জানিয়ে নিই, আপনার পারমিশন ছাড়াই গত কয়েকদিনে আমি এই কেসটা নিয়ে একটু খোঁজখবর নিয়েছি। কিছু লোকের সঙ্গে কথাও বলেছি। সেকেন্ড ভিকটিম সুখেন্দুশেখরবাবুর স্ত্রী আমাকে অ্যাপোয়েন্ট করেছিলেন তার স্বামীর খুনের ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য।’

সৌরভ সান্যালের অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ল না। বরং মনে হল এরকমই কিছু আশা করেছিলেন তিনি।

টাপুর আবার বলতে শুরু করল, ‘সুখেন্দুশেখরবাবুর স্ত্রী আমাকে জানান, প্রকাশক অনিরুদ্ধ মল্লিকের সঙ্গে সুখেন্দুবাবুর কিছু ঝামেলা হয়েছিল। সুখেন্দুবাবু তাঁকে থ্রেট দেন তাঁর পুরোনো পাপের কথা সকলকে জানিয়ে দেবেন বলে। অনিরুদ্ধ মল্লিকের একটা গোপন জীবন ছিল। তার প্রেমিকের সঙ্গে কথা বলাটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।’

এটুকু বলে থামল টাপুর। অর্জুনের দিকে তাকাল। অর্জুন এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল, ‘আমি সন্দীপ দাসের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনিও আমাদের কাছে তাঁদের সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছেন।’

সৌরভ সান্যাল এবার নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, ‘অর্জুনের মুখে আমি সন্দীপের বয়ান শুনেছি। এর সঙ্গে এই সিরিয়াল কিলিং কেসের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে কি! আমি জানি না। অর্জুন, কিছু পাওয়া গেল মেয়েটার সম্পর্কে?’

অর্জুন বলল, ‘সম্পর্ক যে আছেই তা বলতে পারি না স্যার। তবে থাকতেই পারে। মেয়েটির নাম রেশমি। সারনেম মনে করতে পারছে না সন্দীপ। তবে আমি পুলিশি নথি চেক করেছি। কিছু খুঁজে পাইনি।’

‘আর কিছু?’

‘আরও আছে স্যার। বলাই সাহার খবর পেয়েছি।’ বলল অর্জুন। ‘আমার সোর্স মারফত জানতে পারলাম, লোকটার কুকীর্তির অন্ত নেই। অসম্ভব স্বার্থপর ও সুবিধাবাদী। ফুটবলার হিসেবে খুবই মাঝারি মানের হলেও মাঠের রাজনীতি ভালো বুঝত। অনেক উঠতি প্লেয়ারের ভবিষ্যত যে নষ্ট করেছে লোকটা তার ইয়ত্তা নেই। নিজেও তেমন কিছুই করতে পারেনি। তবু লোকের পেছনে কাঠি করা বন্ধ করেনি। এমন লোকের শত্রুর অভাব থাকার কথা নয়। আরেকটা ঘটনা শুনলাম। তের চোদ্দ বছর আগে একবার স্কুলে প্র্যাকটিস করানোর সময় একটা ছেলের উপর নাকি এত বেশি টরচার করেছিল, ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়ে। হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছিল। হাসপাতালে নিয়ে গেলে মারা যায়।’

‘সে কী! ছেলেটার ফ্যামিলির সঙ্গে কথা বলেছ?’ জিজ্ঞাসা করলেন সৌরভ সান্যাল।

‘এখানেই সমস্যা। ছেলেটার সম্পর্কে কোনো রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত ছেলেটার ফ্যামিলি পুলিশের দ্বারস্থ হয়নি। যে সোর্সের কাছ থেকে খবরটা জেনেছি, সেও নাম বলতে পারেনি। তবে বলছে মধ্য কলকাতার একটি সরকারি স্কুলে পড়ত ছেলেটা।’

‘স্কুলে খবর নিয়েছ?’

অর্জুন বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়ল। বলল, ‘সেখানেও একই কেস। ছেলেটার রেকর্ডস পাওয়া যাচ্ছে না। ওই ব্যাচের সব স্টুডেন্টসদের রেকর্ড আছে। শুধু সেই ছেলেটির নেই। তবে স্কুলের এক বয়স্ক কর্মচারী জানিয়েছে, ছেলেটি ক্লাস ইলেভেনে পড়ত। স্কুল থেকেই ওর বাড়ির লোককে খবর দেওয়া হয়েছিল। হাসপাতালেও পাঠানো হয়েছিল। তবে ৩১ শে ডিসেম্বরের রাতে হাসপাতালে ডাক্তার কম ছিল হাসপাতালে। ছেলেটা ঠিকমতো চিকিৎসা পায়নি। সেই রাতেই মারা যায়।’

অর্জুন বলল, ‘এখানেই একটা সূত্র আসছে আমাদের হাতে স্যার। এখন পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র সূত্র।’

‘কীরকম?’

‘স্কুলের ওই কর্মচারী আমাদের জানিয়েছে, সেদিন ছেলেটিকে প্রথমে মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল স্কুল থেকে। সেখানে বেড না পাওয়ায় সেখান থেকে ছেলেটার বাড়ির লোক ওকে মেডিকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই ছেলেটা মারা যায়।’

‘এখানে সূত্রটা কোথায়?’ জানতে চাইলেন সৌরভ সান্যাল।

অর্জুন টাপুরের দিকে তাকাল। সূত্রটা আসলে টাপুরেরই আবিষ্কার। স্কুল আর হাসপাতালেও সেই গিয়েছিল খোঁজ নিতে। এখানে আসার আগে অর্জুনকে বারবার বলেছে, ডিসিডিডি স্যারকে যেন সে কথা না জানানো হয়। অর্জুন আপত্তি জানিয়েছিল। টাপুরের ক্রেডিট নেওয়ার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। টাপুরই জোর করেছে। বলেছে, ‘তুমি জানো অর্জুন, এই ইনভেস্টিগেশনের কোনো পারমিশন আমার নেই। আমি আইনত এটা করতে পারি না। কিন্তু তুমি পারো। কে করল, সেটা বড়ো কথা নয়। খুনি পাগল হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একে থামানো দরকার। ডিসিডিডি স্যারের সঙ্গে কথা বলো। আমাদের পাওয়া সূত্রগুলো জানাও।’

এখন সৌরভ সান্যালের প্রশ্নে একবার টাপুরের দিকে তাকাল অর্জুন। তারপর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলল, ‘ডক্টর নিরুপমা গোমস ওই হাসপাতালের কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন সেই সময়ে। আর এদিকে ডক্টর গোমসের হত্যাও হয়েছে বর্ষবরণের রাতেই। স্যার, আমার ধারণা কোথাও ছেলেটির মৃত্যুর সঙ্গে বলাই সাহা ও নিরুপমা গোমস দুজনেরই হত্যার যোগসূত্র রয়েছে।’

সৌরভ সান্যাল অনেকটা সময় চুপ করে রইলেন। তারপর হঠাৎই গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে বসে অর্জুনের চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘এখন আমাদের ডিপার্টমেন্টে লোক কম আছে। তোমার উপর খুব চাপ পড়ে যাচ্ছে অর্জুন। তুমি চাইলে ফোর্সের বাইরে কারোর সাহায্য নিতে পারো এই কেসের ব্যাপারে। আমি কমিশনার স্যারের সঙ্গে কথা বলে নেব। তোমাকে এই নিয়ে ভাবতে হবে না। গো অ্যাহেড।’

৩১

দেবাশীষ দত্তের স্ত্রী সুনৃতা কাঁদছিলেন না। চোখেমুখে শোকের অনুলেপ যদিও সেই শোকের বহিঃপ্রকাশ নেই।

‘আপনি জানেন, যে দেবাশীষবাবু কাল রাতে উল্টোডাঙা ফ্লাইওভারের তলায় কেন গেছিলেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

সুনৃতা দুইদিকে মাথা নাড়লেন। টাপুর একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল, ‘আপনার বোনের ফোন থেকে শেষ ফোন এসেছিল আপনার হাসব্যান্ডের ফোনে। এই ব্যাপারে কিছু জানেন?

সুনৃতা চোখ তুলে তাকালেন টাপুরের দিকে। টাপুরের মনে হল সেই দৃষ্টিতে মিশে আছে এক রাশ ভর্ৎসনা। একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর এই অসম্মান চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো অন্যায়। অপরাধ। নিজেকে শাসন করল টাপুর। সামনে বসে থাকা এই নারী গৃহবধূ। ঈষৎ পৃথুলা। বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখায়। কিন্তু তিনি নির্বোধ নন। কোনো স্ত্রীই এতটা নির্বোধ হয় না যে স্বামীর মনের চলন বুঝতে ভুল করে। সকলে বোঝে। সক্কলে। শুধু সংসারের মিথ্যে খোলসটুকুর প্রতি নারীমাত্রেই বড়ো মায়া। শুধু সেটুকুকে ধরে রাখা, টিকিয়ে রাখার জন্যই মিথ্যে অভিনয় চলে। কখনও বা জীবনভর। সেই খোলসটুকুর অভিমান ভেঙে দিতে নেই।

কিন্তু তদন্তের খাতিরে কঠিন হতেই হয় টাপুরকে। নিজের প্রশ্নের জন্য নিজেই মরমে মরে যায়। তবু উত্তরটা চাই তার। সুনৃতা চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর কাটা কাটা উচ্চারণে বললেন, ‘আমার বোনের সঙ্গে দেবাশীষের সম্পর্কটা যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ ছিল। মাঝরাতে ফোন করার মতোই ঘনিষ্ঠ। তবে অত রাতে সাবু, মানে সেবন্তী ওকে ওই জায়গায় দেখা করতে ডেকেছিল এটা বিশ্বাস করতে আমার একটু কষ্ট হচ্ছে। ও জানিয়েছে ওর ফোন হারিয়ে গেছিল।’

‘একটা কথা বলুন, দেবাশীষবাবুর কি কোনো শত্রু ছিল?’

সুনৃতা একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আমার পরিচিত বৃত্তের মধ্যে এরকম কিছু আমার অন্তত জানা নেই।’

‘আর কাজের জায়গায়?’

‘সেটা আমি বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ, কখনো সখনো বাড়ি থেকে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করত ও। কনফারেন্স মিটিং চলত দীর্ঘ সময়। তো সেই সময়গুলোতে ওর কথাবার্তা আমার যেটুকু কানে আসত, তাতে আমার মনে হত ও একটু বেশি রুড।’

‘রুড বলতে?’

সুনৃতা মাথা নাড়লেন। ‘আমি ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। কিন্তু ওর ব্যবহার আমার ভালো লাগত না। দু-একবার কথাচ্ছলে ওকে বলেওছি সেই কথা। বলত, যা বোঝো না, সে নিয়ে কথা বোলো না। জুনিয়ারদের দাবিয়ে না রাখলে এরা মাথায় চড়ে বসে।’

‘দেবাশীষবাবুকে দেখে আপনার কখনো টেনসড মনে হয়েছে? কখনো মনে হয়েছে যে কোনও দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি?’

‘না। সেরকম কিছু তো মনে হয়নি। এই কোম্পানিতে আসার পর থেকে বরং খুব খুশিই ছিল। বলছিল, এখানকার ওয়ার্ক কালচার ভালো। ওকে অনেকটা পাওয়ার দেওয়া হয়েছিল। এর আগের চাকরিগুলোতে ও খুশি ছিল না একদম।

‘কেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

সুনৃতা একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘এর আগের কোম্পানিতে বেতন ওর মনোমতো ছিল না। প্রোমোশন আটকে ছিল। আর তার আগের কোম্পানিতেও কিছু ঝামেলা হয়েছিল। সেই তুলনায় এখনকার চাকরিতে খুশি ছিল দেবাশীষ।’

‘কী ঝামেলা হয়েছিল জানেন আপনি?

সুনৃতা একটু ভেবে বললেন, ‘বছর চারেক আগের ঘটনা তো। ঠিক মনে পড়ছে না পুরো ব্যাপারটা। তবে ওর টিমে কাজ করত এক ভদ্রমহিলা। তাকে নিয়ে একটা প্রবলেম হয়েছিল। আসলে ও আমাকে অফিসের কথা খুলে খুব একটা বলত না। তবে সেই সময়ে ওকে খুব টেনসড দেখতাম। পরে তো ওই চাকরিটা ছেড়েই দিল।’

‘ওই কোম্পানির নাম বলতে পারবেন?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘গ্রিমটেক সলুশনস প্রাইভেট লিমিটেড। গোলপার্কে ওদের হেড অফিস। ‘ টাপুর উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘বেশ। আজ আসছি। ইনি অর্জুন রায়। দরকার পড়লে হয়তো আবার আসতে হবে। তবে আপনার যদি আর কিছু মনে পড়ে যা এই কেসে ইম্পর্ট্যান্ট মনে হয় আপনার, তাহলে এই অফিসারের নম্বরে ফোন করে জানাবেন।’

নিজের পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিল অর্জুন।

দেবাশীষ দত্তের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘নেক্সট? টাপুরকে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছে। বলল,’দেবাশীষ দত্তের পুরোনো কোম্পানিতে যাবে একবার?’

‘সে তো অনেক পুরোনো গল্প। লাভ কিছু হবে? সময় কিন্তু কম টাপুর। এখন খুনি প্রায় রোজ রোজ খুন করা শুরু করেছে? কে জানে আজ আবার কারোর নম্বর আসবে কি না! পাগলটাকে আটকাতেই হবে। প্রতিটা মুহূর্ত এখন ইম্পর্ট্যান্ট।’

‘জানি’, বলল টাপুর। ‘আর সেই জন্যেই ভিকটিমদের অতীত সম্পর্কে যতটা সম্ভব ইনফর্মেশন গ্যাদার করতে চাইছি। আমিও জানি সময় খুব কম। আমার মন বলছে, আবারও কিছু হবে। খুব শিগগির। লেটস গো!’

৩২

পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে অর্জুন আর টাপুর বসে আছে গ্রিমটেক সলুশনের অফিসে। তিনতলা বিল্ডিং। একতলায় রিসেপশন ও হায়ার অথোরিটিদের নিজস্ব কেবিন। উপরের দুটি তলায় বিপিও ও আইটি প্রোজেক্টস চলে। রিসেপশনের মেয়েটি চোখ-ধাঁধানো সুন্দরী। তবে ত্বকের উপর কৃত্রিম প্রসাধনীর অতিরিক্ত প্রলেপের নীচে তার স্বাভাবিক রূপ চাপা পড়ে গেছে। কেমন যেন রোবটের মতো দেখাচ্ছে তাকে। টাপুর ও অর্জুন সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মাপা হাসি উপহার দিয়ে বলল, ‘কীভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাদের?’

টাপুরের হঠাৎ মনে হল, এই রকম হাসি আয়ত্ত করাও কম আয়াসসিধ্য কাজ নয়! অর্জুন আজ সাদা পোশাকে এসেছে এখানে। ফলে তাকে পুলিশ হিসেবে চিনতে পারেনি মেয়েটি। তবু সুদর্শন পুরুষ দেখলে মেয়েদের চোখের তারায় যে পরিবর্তন আসে, তা টাপুরের মতো মেয়ের নজর এড়ানোর কথা নয়। অর্জুন বলল, ‘আমি আপনাদের একজন প্রাক্তন কর্মী সম্পর্কে খবরাখবর নিতে এসেছি। আশা করি আপনারা কো-অপারেট করবেন।’

কথাটা বলে নিজের আই কার্ডটা মেয়েটির সামনে মেলে ধরল অর্জুন। মেয়েটির মুখের চেহারা মুহূর্তে বদলে গেল। ক্ষণকাল আগের মুগ্ধতার পাশাপাশি জায়গা করে নিল সম্ভ্রম। বলল, ‘আপনি একটু অপেক্ষা করুন প্লিজ। সামনে সোফায় বসুন।’

টাপুর ও অর্জুন নীরবে দৃষ্টিবিনিময় করল। অর্জুন বলল, ‘আমাদের তাড়া আছে। তাড়াতাড়ি করুন।’

মেয়েটি ডেস্কে রাখা টেলিফোনের রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল। নির্দিষ্ট একটি এক্সটেনশন নম্বর ডায়াল করল। মিনিট দুয়েকের বেশি সময় লাগল না পুরো ব্যাপারটা মিটতে। মেয়েটি অর্জুন ও টাপুরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাঁ দিকের করিডর দিয়ে প্রথম কেবিনে চলে যান। ওখানে আমাদের এইচ আর ম্যানেজার মিস্টার গৌতম বসাক আছেন। আপনি যা জানতে চান, ওঁকে জিজ্ঞাসা করবেন।’

গৌতম বসাকের বয়স পঞ্চাশের উপরেই হবে। খর্ব দেহ, গাট্টাগোট্টা চেহারা, কুতকুতে চোখ। চকচকে মুখে মঙ্গোলিয় ছাপ। মনের ভাব তার মুখের রেখায় চিহ্ন রাখে না।

‘হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?’

অর্জুন সরাসরি কাজের কথায় গেল।

‘আপনাদের এক এক্স এমপ্লয়ি সম্পর্কে জানতে এসেছি। নাম দেবাশীষ দত্ত। চার বছর আগে চাকরি ছেড়েছিলেন এখান থেকে।’

গৌতম বসাকের চোখের দৃষ্টিতে চঞ্চলতা দেখা দিল। বললেন, ‘বুঝেছি। খবরটা শুনেছি। কিন্তু দেবাশীষ অনেকদিন আগে এখানকার চাকরি ছেড়েছে। কীভাবে আমি আপনাদের সাহায্য করতে পারব বুঝতে পারছি না।’

‘বেশি কিছু করতে হবে না। উনি কেন চাকরি ছেড়েছিলেন, সেটা শুধু জানতে চাইছি।’

গৌতম বসাক বললেন, ‘আমাদের এই ধরণের কর্পোরেট কোম্পানিতে এসব হয়েই থাকে। খুব ইম্পর্ট্যান্ট কোনো ব্যাপার নয়। আজ দেবাশীষের খুনের খবরটা নিউজে শোনার পর ঘটনাটা মনে পড়ল। একজন ফিমেল এমপ্লয়ি দেবাশীষের নামে কমপ্লেন করেছিল।’

‘ওয়ার্কপ্লেস হ্যারাসমেন্ট?’ পাশ থেকে জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

‘সেরকমই বলতে পারেন।’ একটু বিরক্ত মুখে গৌতম বসাক বললেন। ‘তবে সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট টাইপের কিছু নয়। আসলে ভদ্রমহিলা মাস তিনেক মেটারনিটি লিভে ছিলেন। সদ্য জয়েন করেছিলেন অফিস। ফিমেল এমপ্লয়িদের কিছু সমস্যা তো থাকেই। এই কারণে আমরা মেয়েদের, বিশেষত বিবাহিত মেয়েদের চাকরিতে নিতে চাই না।’

টাপুরের মুখের রেখা বিরক্তিতে কুঁচকে গেল।

‘ব্যাপারটা কী?’ পরিস্থিতি এড়াতে তাড়াতাড়ি জানতে চাইল অর্জুন।

‘আসলে ওই মহিলার বাচ্চাটা খুব অসুস্থ থাকত। তাই বারবার ছুটি নিত। হাফ ডে করেই বাড়িতে ছুটত। এভাবে কাজ হয় নাকি! দেবাশীষের দোষ ছিল না। এই নিয়ে বকাবকি করেছিল। এরই মধ্যে একদিন দুপুরে মহিলার ফোন আসে। বাচ্চা অসুস্থ। বাড়ি চলে যেতে চেয়েছিল। দেবাশীষ যেতে দেয়নি। একটু কড়া হয়েছিল। বলেছিল, যেতে হলে রেজিগনেশন লেটার দিয়ে তবে যেতে। সেই মহিলা নিজের কাজ সেরে সন্ধেবেলায় বাড়ি যান। সেই রাতে ওর বাচ্চাটা মারা যায়। পরে শুনেছি বাচ্চাটা নাকি হার্টে জন্ম থেকেই সমস্যা ছিল। এখানে দেবাশীষের দোষ ছিল না। কিন্তু মহিলার হাসব্যান্ড অফিসে এসে খুব ঝামেলা করেছিল। মিডিয়ায় যাওয়ার থ্রেট দেয়। বাধ্য হয়ে আমরা দেবাশীষকে কিছুদিনের জন্য সাসপেন্ড করি। এরপর ও নিজেই চাকরি ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে জয়েন করে।’

অর্জুন টাপুরের দিকে তাকাল। ওকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। টাপুর এবার নিজেই জিজ্ঞাসা করল, ‘এরপর সেই ফিমেল এমপ্লয়ির কী হল?’

‘সেও চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল তখনই। আমরা ওর সমস্ত ডিউজ মিটিয়ে দিয়েছি। তারপর আর কোনো খবর জানি না।’

‘ভদ্রমহিলার নাম কী?’

গৌতম বসাক একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘বহ্নিশিখা। সারনেমটা মনে নেই। আমাদের রেকর্ডসে পেয়ে যাবেন। দাঁড়ান, আমি চেক করে জানাচ্ছি।’ ফোন তুলে কাউকে ফোন করলেন বসাক। টাপুর ও অর্জুন অপেক্ষা করছে। মিনিট পাঁচেক বাদে একজন যুবক হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল কেবিনে।

‘এসো বিজন। বহ্নিশিখার রেকর্ডস এনেছ?’

‘না স্যার। রেকর্ডস নেই।’

‘নেই মানে?’ বসাকের ভুরু কোঁচকাল।

‘ডেটাবেসে বহ্নিশিখাদির এমপ্লয়ি আই ডি প্রাইমারি কি হিসেবে সার্চ করলে ‘ডেটা নট ফাউন্ড’ দেখাচ্ছে। আমি বেশ কয়েকবার ডেটাবেস রিফ্রেশ করলাম। বহ্নিশিখাদির সম্পর্কে সব ডেটা কেউ ডিলিট করে দিয়েছে।’

‘কে করতে পারে? কী আশ্চর্য!’

‘স্যার, সেটা তো বলা সম্ভব নয়। এখানে এতজন কাজ করে। চার বছরে কতজন কাজ ছেড়েও চলে গেছে। এদের মধ্যে কে এই কাজটা করেছে কীভাবে

বলব। তবে…

‘তবে?’

‘অ্যাকাউন্টস সেকশনে কোনো ইনফরমেশন থাকলেও থাকতে পারে। বহ্নিশিখাদির ডিউজ ক্লিয়ার করার প্রসিজার ওখানেই হয়েছে। ওদের কাছে খোঁজ করে দেখতে হবে। অবশ্য চার বছরের পুরোনো ডেটা ওরা আদৌ রেখেছে কি না জানি না।’

অর্জুন কিছু বলার আগেই গৌতম বসাক বললেন, ‘যাও, খোঁজ করে দেখো। এঁরা বসে আছেন। তাড়াতাড়ি যাও।’

মিনিট পনেরো পর ফিরে এল বিজন। বলল, ‘অ্যাকাউন্টস সেকশন থেকে বলছে, ইয়ার ক্লোজিং-এর পর চাকরি ছেড়ে দেওয়া এমপ্লয়িদের ডেটা ওরা ডিলিট করে দেয়। তবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ট্র্যানজ্যাকশন হিস্ট্রি চেক করার পর বহ্নিশিখা মজুমদারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বরটা পাওয়া গেছে। এটা দিয়ে কোনো কাজ হবে কি?’

অর্জুনকে হতাশ দেখাচ্ছে। টাপুর বলল, ‘আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। প্লিজ অ্যাকাউন্ট নম্বর, ব্যাঙ্কের নাম, ব্রাঞ্চ কোডটা আমাদের লিখে দিন।’

৩৩

‘এই অ্যাকাউন্ট তো ক্লোজ হয়ে গেছে স্যার।’ বললেন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার।

‘আচ্ছা সে হোক, অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নাম তো আপনাদের ডেটাবেসে থাকবে, তাই না?’ টাপুর বলল।

ম্যানেজার মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘তা তো থাকবেই।’

‘নামটা আমাদের চাই।’

ম্যানেজার সামনে রাখা ডেস্কটপে ঝুঁকে পড়লেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মুখ তুলে বললেন, ‘বহ্নিশিখা মজুমদার।’

‘ছবি আছে?’

ম্যানেজার উপর-নীচে মাথা নাড়লেন। উঠে দাঁড়াল অর্জুন। সোজা চলে গেল ম্যানেজারের পেছনে। তারপর ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে তাঁর মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বলল, ‘এই ভদ্রমহিলার পুরো রেকর্ড আমাদের চাই। ইমিডিয়েটলি। আচ্ছা, অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করার সময় কি পুরো টাকাটা ক্যাশে উইথড্রয়াল হয়েছিল? নাকি অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হয়েছে?’

ম্যানেজার একটু সময় নিলেন। তারপর বললেন, ‘পুরো অ্যামাউন্টটাই ব্যাঙ্গালোরে একটা চ্যারিটেবল হার্ট ট্রিটমেন্ট অরগানাইজেশনের নামে ট্রান্সফার হয়েছে।’

অর্জুন একটু থমকাল। তারপর বলল, ‘ভদ্রমহিলার অ্যাড্রেসটা দিন।’

ঠিকানাটা মানিকতলার দিকে। ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়েই গাড়িতে উঠে বসল অর্জুন ও টাপুর। ড্রাইভার নয়ন কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল। খুব চটপটে ও বুদ্ধিমান ছেলে। তাকে নির্দেশ দিল অর্জুন, ‘মানিকতলা যাব, নয়ন।’

দেরি না করে গাড়ি স্টার্ট করল নয়ন। অর্জুন ও টাপুর দুজনের কেউই কোনো কথা বলছে না। নয়ন স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে বলল, ‘একটা কথা বলব, স্যার?’

অর্জুন নিজের ভাবনাতেই ডুবে ছিল। নয়নের কথায় তার দিকে তাকাল সে।

নয়ন বলল, ‘আমার বাবা কলকাতা পুলিশেই চাকরি করতেন।’

অর্জুন বলল, ‘তাই নাকি!

নয়ন হাসল। আমি কিন্তু ছোটো থেকেই জানতাম, আমি পুলিশ হব। জানেন, বাবা স্টোনম্যান কেসের কোরটিমেও ছিলেন। তখন বাবা এস আই। কিন্তু বাবার উপরে বড়োকর্তারাও খুব ভরসা করতেন।’

‘তাই নাকি! স্টোনম্যান কেস! তার মানে অনেক গল্প আছে ওঁর ঝুলিতে। একদিন আলাপ করতে হবে।’

নয়ন বিষণ্ণ হাসল। বলল, ‘বাবা নেই। চার বছর আগে অন ডিউটি মারা গেছেন। বাবার জায়গাতেই তো চাকরিটা পেলাম আমি ডাই-ইন হারনেস গ্রাউন্ডে। ইচ্ছে ছিল, আরও পড়াশোনা করব। ইউপিএসসি দিয়ে আইপিএস হব। বাবা মারা যাওয়ার পর পুরো পরিবারের চাপ আমার উপর। লোকে বলল সরকারি চাকরি। কেউ হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে! আমিও চাকরি জয়েন করে নিলাম। শুধু লেখাপড়াটা আর হল না।’

অর্জুন বলল, ‘তাতে কী! এখনও পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিতে পারো তুমি। আমিও কিন্তু পুলিশে চাকরি করতে করতেই আইপিএস পাশ করেছি। চাকরি ছেড়ে ট্রেনিং নিয়ে আবার জয়েন করেছি। তুমিও পারবে।’

নয়নের চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অর্জুন বলল, ‘তুমি কী বলবে বলছিলে?’

নয়ন রাস্তায় একটা বাঁক ঘুরল। ঘড়িতে পৌনে বারোটা বাজলেও বাঙালির এখনও অফিস টাইম। ভিড় তাই কম নয়। রাস্তায় চোখ রেখে দক্ষ হাতে ভিড় কাটাল নয়ন। তারপর বলল, ‘বাবা যখন স্টোনম্যান কেসে কাজ করত, কত গল্প শুনতাম। ভাবতাম আমিও একদিন এমন কোনো কেসে কাজ করব। দেখুন, এখন এই কেসে আপনাদের সঙ্গে থাকার তো অন্তত সুযোগ পাচ্ছি!’

‘তুমি ভালো কাজ করছ নয়ন। ভবিষ্যতে অনেক উন্নতি করবে। আর স্টোনম্যান কেসের সঙ্গে এই কেসের বেশ খানিকটা পার্থক্য আছে। মিল বলতে, দুটোই সিরিয়াল কিলিং।’

নয়ন গাড়ির গিয়ার চেঞ্জ করে বলল, ‘সেই সময়ে বাবার এক সহকর্মী ছিলেন সুবীরজেঠু। তিনিও কলকাতা পুলিশেই ছিলেন। স্টোনম্যান কেসে কাজও করছিলেন। আমার বাবা খুব গম্ভীর মানুষ ছিলেন। আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা কমই হত। কিন্তু সুবীরজেঠু আমাদের অনেক গল্প বলতেন। প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়ি। তা তাঁর মুখেই শুনেছিলাম স্টোনম্যান কেসের সময় কলকাতা পুলিশ একজন অংকের প্রফেসরের সাহায্য নিয়েছিল প্যাটার্ন বোঝার জন্য। এই রেজর কিলিং-এর কেসে এরকম কেউ সাহায্য করতে পারে না?’

অর্জুন আড়চোখে তাকাল টাপুরের দিকে। তারপর বলল, ‘সবরকম চেষ্টাই তো হচ্ছে।

নয়ন বলল, ‘জানেন স্যার। সুবীরজেঠু দেশ-বিদেশের প্রচুর ডিটেকটিভ বই পড়তেন। সেইসব গল্প আমাদের ভাইবোনদের শোনাতেন। আমিও যেতাম জেঠুর বাড়ি। জেঠু বলতেন, যে কোনো সিরিয়াল কিলারই বুদ্ধিতে কোনো পুলিশ ডিটেকটিভের চেয়ে কম নয়। আবার একের বেশি মার্ডার হলেই তাকে সিরিয়াল কিলিং বলা যায় না। দুটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হয়। প্রথমত, অন্ততপক্ষে তিনটে মার্ডার করতেই হবে। দ্বিতীয়ত, প্যাটার্ন। কোনো সিরিয়াল কিলার র‍্যানডম মার্ডার কক্ষনও করবে না। তার একটা সিগনেচার থাকবেই থাকবে।’

‘সিগনেচার!’ প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে নয়নের দিকে তাকাল অর্জুন।

মাথা নাড়ল নয়ন। বলল, ‘সুবীরজেঠুও তাই বলতেন। কিন্তু সুবীরজেঠু বলতেন, পুলিশ ছাই পারবে স্টোনম্যানকে ধরতে। বলতেন, সিরিয়াল কিলার পুলিশের সামনে বাসি রুটির মতো করে সূত্র ছুঁড়ে দেয়। ভাবটা এমন, পারলে আমাকে ধরে দেখা। বলতেন, ভাব নয়ন, একটা লোক পুরো পুলিশ ফোর্সের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। আর কলকাতা পুলিশ, যাকে নাকি প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বলা হয়, তারা কেঁউকেঁউ করে রাতবিরেতে গলি পাহারা দিচ্ছে কুত্তার মতো!’

কথাটা বলেই জিভ কাটল নয়ন। উর্দ্ধতনের সামনে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মুখ খুলে ফেলেছে বুঝে একদম চুপ হয়ে গেল। বাকি রাস্তা আর একটাও কথা বলল না সে। টাপুরও কিছু শোনেনি ভাব করে জানলা দিয়ে বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। নয়ন কথাগুলো ভুল বলেনি। বলা ভালো, নয়নের সুবীরজেঠু সিরিয়াল কিলারদের একদম ঠিকমতো স্টাডি করেছিলেন। তবু পুলিশে চাকরি করে একজন কিলার সম্পর্কে এতটা মুগ্ধতাও ঠিক প্রশংসার্হ নয়। একজন খুনি আর যাই হোক, এমন বীরপুজো পাওয়ার যোগ্য নয় কখনোই।

মানিকতলার যে বাড়িটার ঠিকানা ব্যাঙ্কে দেওয়া ছিল, সেখানে পৌঁছে দেখা গেল সেটি একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। বাড়ির মালিক বিশ্বরূপ মন্ডল মধ্যবয়েসি ব্যক্তি। পুলিশ দেখে সাধারণত কেউই খুশি হন না। ইনিও হলেন না। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, বহ্নিশিখা মজুমদার এ বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। প্রায় তিনবছর এখানে ছিলেন তিনি।

‘একটু কথা ছিল।’ বলল অর্জুন।

একটু দ্বিধা করলেন ভদ্রলোক। গেট খুলে ধরে বললেন, ‘আসুন। ভেতরে আসুন।’

দোতলা বাড়ির একতলায় সামনের দিকে প্রশস্ত বসার ঘর। বাইরের দিকে ঘরের একপাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি বোঝা গেল। একতলার পেছন দিকে একটা লাগোয়া দুই কামরার ছোটো ফ্ল্যাট মতো রয়েছে। সেখানেই থাকত বহ্নিশিখা মজুমদার।

বসার ঘরটি একটু এলোমেলো। খুব বেশি গোছানো লোক নন এই বাড়ির সদস্যরা। আসবাবও যা আছে বেশ পুরোনো। পুরু ধুলো জমেছে। দেওয়ালের অবস্থা ভালো নয়। ছত্রাক জন্মেছে সেখানে। অনেকদিন রং পড়ে না দেখেই বোঝা যায়।

টাপুর এবার জিজ্ঞাসা করল, ‘ভদ্রমহিলা কি বিবাহিত ছিলেন?’

মাথা নাড়লেন বিশ্বরূপবাবু। বললেন, ‘হ্যাঁ। তবে স্বামী সঙ্গে থাকতেন না।’

‘মানে সেপারেটেড?’

‘না। আমার মা তখনও বেঁচে। মা খুব গল্পগুজব করতে ভালোবাসত। হাঁটুর ব্যথা নিয়ে কোথাও যেতে পারত না তো, তাই মাঝেমধ্যে নীচের তলায় বহ্নিশিখার সঙ্গে গল্প করতে নামত। মার মুখেই শুনেছিলাম, ওঁর স্বামী নাকি চাইত না যে সে শ্বশুরবাড়িতে থাকুক। তাই এখানে বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন।

‘কেন? চাইতেন না কেন?’

‘তা কী করে জানব? ভাড়াটেকে অত কি জিজ্ঞাসা করা যায়? তবে কখনো কখনো ভদ্রমহিলার হাসব্যান্ড আসতেনও এখানে। ছুটির দিনে সারাদিন এসে থাকতেন। দুজনে বেড়াতে যেতেন দেখতাম। তবে রাতে থাকতেন না খুব বেশি।’

‘হাসব্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ভালোই ছিল তার মানে?’

‘দেখুন, আমি বা আমার স্ত্রী ভাড়াটের ব্যাপারে মাথা ঘামানো পছন্দ করি না। তবে ওই যে বললাম, মা একটু হাঁড়ির খোঁজ নিতে পছন্দ করত। আমি সেজন্য দু-একবার বকাবকিও করেছি। মা বলত, প্রেমের বিয়ে দুজনের। বহ্নিশিখা নাকি খুব বড়ো ঘরের মেয়ে। বাড়ির অমতে বিয়ে করেছিল। শ্বশুরবাড়িতে যা-ই সমস্যা থাক, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল। তারপর একদিন মা-ই বলল, নীচের ভাড়াটে বউটার বাচ্চা হবে। বাচ্চাটা হলও। ওর হাসব্যান্ড এসে সেই সময়ে এখানে প্রায়ই থাকত। বাচ্চাটা জন্ম থেকেই খুব ভুগত।’

‘তারপর?’

‘তারপর কী বলি! বাচ্চাটার হার্টে জন্মগত কিছু সমস্যা ছিল। আমিও একবার রাতে হাসপাতালে নিয়ে ছুটেছি। একটা আয়া রাখা ছিল। বহ্নিশিখা যখন অফিসে জয়েন করল, বাচ্চাটা আয়ার কাছেই থাকত। খুব কাঁদত। যখন-তখন অসুস্থ হয়ে পড়ত। তখন ওকে খবর দেওয়া হত।’

‘বাচ্চাটা অত অসুস্থ থাকত। ওর বাবা এসে থাকত না কেন এখানে?’ এবার টাপুর জিজ্ঞাসা করল।

‘সেসব আমি বলতে পারব না ম্যাডাম। তবে বহ্নিশিখা ম্যাডামের অফিস জয়েন করার পর থেকে সমস্যাটা খুব বেড়েছিল। সেই সময়ে দুপুরে ম্যাডাম না থাকলে দেখেছি ওর হাসব্যান্ড এসে বাচ্চাটাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে ছুটতেন। ওদের সময়টা খুব খারাপ চলছিল। তারপর তো…’

‘বাচ্চাটা মারা গেল কীভাবে?’

ভদ্রলোককে বিষণ্ণ মনে হল। বললেন, ‘একদিন দুপুরে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল বাচ্চাটা। আমরা ফোন করলাম বহ্নিশিখা ম্যাডামকে। উনি বললেন আসছেন। আধ ঘণ্টা পরে ফোন করে বললেন, অফিস থেকে ছাড়ছে না। ওদিকে সেদিন আবার ওঁর হাসব্যান্ডও কলকাতায় ছিলেন না। কী কাজে শহরের বাইরে গেছিলেন। আমরাই বাচ্চাটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ঘণ্টা দুয়েক পরে যখন ম্যাডাম এসে পৌঁছোলেন, তখন বাচ্চাটার শেষ অবস্থা। এমনিতেও কিছু করার হয়তো ছিল না। মিনিট পনেরোর মধ্যেই মারা যায় বাচ্চাটা।’

‘তারপর?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

‘তারপর আর কী! বহ্নিশিখা ম্যাডাম এরপরেই কেমন পাগল পাগল হয়ে গেলেন। ওর হাসব্যান্ড আসত তবুও। কিন্তু হাসব্যান্ডকে সহ্য করতে পারছিলেন না। ভদ্রলোককে দেখতাম আসতেন, আর মুখচুন করে ফিরে যেতেন। বহ্নিশিখা ম্যাডাম অফিসেও যেতেন না। শুনেছিলাম চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে আমাদেরও চিনতে পারতেন না। মাঝরাতে শুনতাম চিৎকার করে কাঁদছেন। দেওয়ালে মাথা ঠুকে রক্তারক্তি কান্ড বাধিয়ে দিতেন। হাসব্যান্ডের দিকে একদিন সবজি কাটার ছুরি নিয়ে তাড়া করেছিলেন। পাগল মতো হয়ে গেছিলেন। সত্যি বলতে কী, এর পরে আমরাও ওঁকে এখানে রাখতে সাহস পাচ্ছিলাম না। ওর হাসব্যান্ডকে বাধ্য হয়েই বলেছিলাম, বাসা খালি করে দিতে। এর দিন পনেরো পরে একদিন ওঁর বাবা এসে ওঁকে নিয়ে গেলেন।’

‘বাবা! তিনি কোথায় ছিলেন এতদিন? খবর পেলেন কী করে?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল।

‘তা তো বলতে পারব না। হয়তো জামাই খবর দিয়েছে। তবে বেশ বড়োলোক। লম্বা-চওড়া চেহারা। বড়ো গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। মেয়েকে নিয়ে আমার পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। জিনিসপত্রও নিলেন না। আমি বলেছিলাম, আপনার ঠিকানা দিন। আমি পাঠিয়ে দেব সব জিনিস। উনি বললেন, দরকার হবে না। একার সংসার। খুব বেশি জিনিসপত্র ছিলও না। বেশিরভাগই বাচ্চাটার ব্যবহার্য জিনিস, দোলনা, খেলনাপাতি, জামাকাপড় এসব। সেসব আমি কাউকে দিইনি। সব আমার বাড়ির গ্যারেজে রেখে দিয়েছি। যদি কোনোদিন নিতে আসে সেই ভেবে। শত হলেও স্মৃতি তো!’

‘ভদ্রমহিলার বাবার নাম বা ঠিকানা কিছু জানেন?’

‘না। উনি বলেননি।’

অর্জুন কিছু বলার আগেই টাপুর বলল, ‘আমরা কি জিনিসপত্রগুলো একবার দেখতে পারি?’

৩৪

জিনিসপত্র ঘেঁটে খুব বেশি কিছু পাওয়া গেল না। একটা বেগুনি রঙের পুরোনো ফাইল ঘেঁটে কিছু কাগজপত্রের মধ্যে বহ্নিশিখা মজুমদারের বাচ্চার কিছু মেডিকেল রিপোর্টস মিলল। কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ ছিল বাচ্চাটার

‘অর্জুন, আমার ঠিক ভালো লাগছে না।’ অন্যমনস্কভাবে বলল টাপুর। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই ওকে কেমন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল।

‘কী হল?’

‘কী যেন মিস করে যাচ্ছি, ঠিক ধরতে পারছি না। মনে হচ্ছে চোখের সামনে সাজিয়ে দিয়েছে সব খুনি। পুলিশকে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছে। অথচ সেসব সূত্র আমাদের চোখে পড়ছে না। গাড়ি দাঁড় করাতে বলো প্লিজ।’

‘কোথায়? এখানে?’ অর্জুনের বিস্মিত প্রশ্ন।

‘কাছাকাছি কোথাও কোনো ক্যাফে আছে যেখানে একটু বসা যেতে পারে?’

অর্জুন গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। নয়ন এতক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছিল। এবার বলল, ‘সামনে একটা কফিশপ আছে স্যার। দাঁড় করাব?’

‘হ্যাঁ, দাঁড়িয়ে যাও।’

কফিশপের ভেতরটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। বাইরের পোড়া গরম থেকে ভেতরে ঢুকে শরীরটা জুড়িয়ে গেল। কোণের দিকে একটা টেবিল দেখে বসল দুজনে অর্জুন ভদ্রতার বশে নয়নকেও কফির আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সে মাথা নেড়ে জানিয়েছে, সে কফি খায় না। তাতে অবশ্য অর্জুনও স্বস্তিই পেয়েছে। সে চায়নি, কেসের আলোচনার মাঝে তৃতীয় কেউ এই মুহূর্তে থাকুক।

দুই কাপ ক্যাপুচিনোর অর্ডার দিল অর্জুন। তারপর বলল, ‘শান্ত হও টাপুর। এটা মাথাগরম করার সময় নয়।’

টাপুর মাথা নীচু করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তুমি বোসো, আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি।’

ওয়াশরুমে ঢুকে মুখে চোখে জলের ছিটে দিল টাপুর। আয়নার নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেকে হেরো বলে মনে হল। একটা উন্মাদ তার নাকের ডগা দিয়ে একের পর এক খুন করে চলেছে, অথচ সে কিছুই ধরতে পারছে না। বাথরুম থেকে ঘুরে এসে দরজা ঠেলে বেরোতে যাবে, কাউন্টারের পেছনের দেওয়ালে ঝোলানো অয়েলপেইন্টিং-এ তার নজর আটকে গেল। বিশাল ক্যানভাস জুড়ে একটি সূর্যমুখীর ছবি। নিখুঁত তুলির টানে উজ্জ্বল হলুদ পাপড়িগুলি যেন জীবন্ত। ফুলের মাঝে গোল গাঢ় খয়েরি রঙের অংশে প্রতিটি ফ্লোরেট খালি চোখেই দেখা যায়। আশ্চর্যরকম নিখুঁত তাদের সজ্জা, যেন সারিবদ্ধভাবে আবর্ত সৃষ্টি করেছে। সেদিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল টাপুর। কেটে গেল কয়েক মুহূর্ত। হঠাৎই চঞ্চল হয়ে উঠল টাপুরের চোখ। তাই তো, এই কথাটা কেন এতক্ষণ মনে আসেনি।

অর্জুন টেবিলে বসে লক্ষ করছিল টাপুরকে। এবার গলা তুলে ডাকল, ‘টাপুর, কী হল?’

টাপুর দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল টেবিলের কাছে। দাঁড়ানো অবস্থাতেই জিজ্ঞাসা করল, ‘অর্জুন, বিলাল শেখ কবে খুন হয়েছিল?’

অর্জুন হঠাৎ করে টাপুরের ব্যবহার পরিবর্তনে অবাক হলেও সেটা প্রকাশ করল না। বলল, ‘২ ডিসেম্বর।’

টাপুর ব্যাগ থেকে পেন বের করল। তারপর টেবিলের উপর থেকে একটা পেপার ন্যাপকিন টেনে নিয়ে তার উপর লিখল তারিখটা।

‘সুখেন্দুশেখর?’

‘কী?’

টাপুরকে অস্থির দেখাচ্ছে। চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল সে।

‘বলছি কবে খুন হয়েছিল?’

‘১৫ তারিখ। ১৫ই ডিসেম্বর।’

তারিখটা আবারও লিখল টাপুর। ‘নেক্সট? অনিরুদ্ধ মল্লিক?’

‘২৩ তারিখ’, অর্জুনের কণ্ঠস্বরেও কৌতূহল।

টাপুর লিখে চলেছে।

‘ইশ, এই ব্যাপারটা এতদিন কেন আমার মাথায় আসেনি?’ অস্থির কণ্ঠে বলল সে।

‘কী আসেনি মাথায়? কী বলছ?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল।

‘বলছি। নেক্সট ডেট বলো। বলাই সাহা…’

‘২৮।’

‘আটাশ… ওকে। নিরুপমা?’

‘৩১ শে…’

‘শেষ দেবাশীষ?’

‘২ জানুয়ারি!’

‘মাই গড!’ টাপুরের মুখ উত্তেজনায় থমথম করছে। পেন ধরা হাতটা কাঁপছে ওর।

‘কী হল টাপুর?’

‘আমি বুঝতে পারিনি… আমি বুঝতে পারিনি এতদিন’ এত বড়ো বোকা বনে গেলাম। আজ এই সূর্যমুখীর ছবিটা না দেখলে এখনও মাথায় আসত না।’ বিড়বিড় করে চলেছে টাপুর।

‘টাপুর!’ একটু উচ্চস্বরে ধমকে উঠল অর্জুন। ‘কী হয়েছে তোমার? কী বুঝতে পেরেছ?’

‘তুমি বুঝতে পারছ না অর্জুন? তারিখগুলোর মাঝের গ্যাপগুলো দ্যাখো। প্রথম দুটো খুনের মধ্যে তেরো দিনের তফাত। পরের দুটোয় আট।’

‘সে তো জানি। যত দিন গেছে, খুনির কনফিডেন্স বেড়েছে। ঘন ঘন খুন করতে শুরু করেছে।’

‘ভুল অর্জুন। আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু খুনির আত্মবিশ্বাসের অভাব কোনোদিনই ছিল না। আর এটাই সত্যি।’

‘মানে?’

‘বলছি। প্রথম খুন দুটোর মধ্যে তের দিনের গ্যাপ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খুনের গ্যাপ নেমে এসেছে আটে। তৃতীয় ও চতুর্থের ক্ষেত্রে সেটা পাঁচ দিন। এর ঠিক তিন দিন পরে পঞ্চম খুন হয়েছে। তার দুই দিনের মাথায় ষষ্ট খুন। তার মানে এর পরের খুনটা হবে…’

‘আজ!’ টাপুরের কথার মাঝের ঘোরলাগা গলায় বলে উঠল অর্জুন। ‘শিট! ফিবোনাকি সিরিজ ইন ব্যাকওয়ার্ড ডিরেকশন…’

‘একদমই তাই। আমি এর আগেও তারিখগুলো নিয়ে বারবার ভেবেছি। প্যাটার্ন খোঁজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুটি তারিখের গ্যাপের মধ্যেও যে প্যাটার্ন থাকতে পারে, সেটা মাথায় আসেনি একবারের জন্যেও। আজ কেউ খুন হবে অর্জুন। আজই। ফিবোনানি কখনও তার পথ বদলাবে না। হাতে সময় নেই। এই খুনটা যেভাবে হোক আটকাতেই হবে।’

ওয়েটার এসে দুই কাপ কফি রাখল টেবিলে। সেদিকে না তাকিয়ে টাপুর বলল, ‘বিল পে করে দিচ্ছি। এখনই বেরোতে হবে। কফি খাওয়ার সময় হবে না এখন।’

অর্জুন বলল, ‘তুমি গাড়িতে গিয়ে বোসো। আমি বিল দিয়ে আসছি।’

টাপুর আপত্তি না করে কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসল। মিনিট দুয়েকের মাথায় অর্জুনও এল। হাতে লিড লাগানো দুটি পেপার গ্লাস। একটা টাপুরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ধরো।’

টাপুর ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকাল অর্জুনের দিকে। যেন, এসব আবার এখন কেন! অর্জুন বলল, ‘খালি পেটে যুদ্ধ হয় না। এর পরে কখন খাওয়ার সময় পাবে জানি না।’

টাপুর গ্লাসটা নিল। তারপর আনমনে বলল, ‘কিন্তু এতবড়ো কলকাতা শহরে কোথায় খুঁজব আমরা?’

অর্জুন বলল, ‘আমি ডিসিডিডি স্যারকে জানিয়েছি। আজ রাতে সারাশহর জুড়ে কড়া নিরাপত্তা থাকবে। চিন্তা কোরো না, আজ কিছুতেই খুন হতে দেব না আমরা। তাহলেই খুনির প্যাটার্ন ভেঙে যাবে। সেক্ষেত্রে হয়তো খেলাটা সে থামিয়ে দিলেও দিতে পারে! অন্তত আমরা আরও কিছুটা সময় তো পাব তাকে ধরার। ভেঙে পোড়ো না টাপুর। সব হবে।’

টাপুরের ফোন বাজছে। মিতুল।

‘টাপুরদি তুমি কোথায়?’ মিতুলের কণ্ঠস্বরে চাপা উদ্বেগ।

‘কেন রে কী হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

‘আজ সকালের সরাইঘাট এক্সপ্রেসে বাড়ি ফিরেছে বাবা-মা। দশটা নাগাদ বাবা ব্যাঙ্কে গিয়েছিল। তারপর থেকে আর কনট্যাক্ট করা যাচ্ছে না।’

‘কনট্যাক্ট করা যাচ্ছে না মানে?’

‘ফোন সুইচ অফ। এখন দুটো বাজে। আমি ব্যাঙ্কে গেছিলাম। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার আমার চেনা। বাবার কথা জিজ্ঞাসা করতে বললেন, বাবা নাকি ব্যাঙ্কে যায়ইনি। কনফার্ম করার জন্য উনি নিজেই সিসিটিভি রেকর্ডিং-ও চেক করলেন। সত্যিই বাবা যায়নি ওখানে। তাহলে কোথায় গেল?’

অর্জুন এতক্ষণ টাপুরের কথা শুনছিল। এবার পাশ থেকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে টাপুর?’

‘কাকু, মানে মিতুলের বাবা ব্যাঙ্কে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু বাড়ি ফেরেননি। ফোন সুইচ অফ।’

হাত বাড়িয়ে টাপুরের হাত থেকে ফোনটা নিল অর্জুন। বলল, ‘চিন্তা কোরো না। হয়তো চার্জ ফুরিয়ে গেছে। এসে পড়বেন। তবু আমি ফোনের লাস্ট লোকেশন ট্রেস করতে বলছি। আর হ্যাঁ, কাকুর পুরো নাম, বয়স আর একটা ছবি আমাকে হোয়াটস্যাপ করে দাও।’

‘আমার খুব চিন্তা হচ্ছে অর্জুনদা।’ মিতুলের গলা শুনে মনে হল বেচারি বোধ হয় কেঁদেই ফেলবে। তাকে সান্ত্বনা বলল অর্জুন, ‘একটু সময় দাও আমাকে। কাকিমাকে দেখো তুমি। শান্ত থাকো। দেখছি আমি।’

কলটা কেটে টাপুরের হাতে ফোন ফেরত দিল অর্জুন।

‘এসব কী হচ্ছে অর্জুন? আমার জাস্ট মাথা কাজ করছে না।’ বলল টাপুর।

‘না করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন অস্থির হলে চলবে না। দেখছি আমি।’

‘কিছু করো, প্লিজ।’

অর্জুন টাপুরের হাতে হাত রেখে আলতো করে চাপ দিল। শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘চিন্তা আমারও হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে আপাতত এই সিরিয়াল কিলারের কেসটা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট টাপুর। আমার কাজের জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হয়। তা বলে তুমি ভেবো না কাকুকে খোঁজার ব্যাপারে আমি অবহেলা করব।’

টাপুর একটু অবাক হয়ে তাকাল অর্জুনের মুখের দিকে। এতদিন ধরে চেনে সে তাকে। অথচ ওর এই শান্ত, স্থিতধী রূপটির সঙ্গে পরিচিত ছিল না টাপুর। বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারা বোধ হয় পুলিশে চাকরি করার অন্যতম প্রধান শর্ত। এতদিন অর্জুনের প্রতি চোরা একটা ঈর্ষা কোথাও ছিল টাপুরের মনে। অর্জুন পুলিশ। ওর হাতে ক্ষমতা আছে, টাপুরের নেই। অর্জুন চাইলেই এমন অনেক স্টেপ নিতে পারে যা টাপুরের এক্তিয়ারের বাইরে। আজ প্রথমবার মনে হল, টাপুর স্বাধীন। টাপুর অস্থির হতে, যেখানে খুশি, যখন খুশি ছুটে যেতে পারে। অর্জুন পারে না। তার প্রতিটি পদক্ষেপের হিসেব দিতে হয় উপরওয়ালাকে। দেশের সংবিধান তার হাতে কিছু ক্ষমতা হয়তো দিয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা অসীম নয়। ক্ষমতার চাইতে দায়িত্বের বোঝা হাজারগুণ বেশি ভারী।

অর্জুনের ফোনে বিপ বিপ শব্দ করে মেসেজ ঢুকল। মিতুলের মেসেজ। ওর বাবার ছবি। নাম রণজয় সেন। বয়স বাষট্টি। সঙ্গে একটা মোবাইল নম্বর লেখা। নিরুদ্দিষ্টের নম্বর।

অর্জুন ছবিটা কাউকে ফরোয়ার্ড করল। তারপর ফোন করে নির্দেশ দিল, ‘এই নম্বরের মালিক গত চার ঘন্টা ধরে মিসিং। ফোন সুইচড অফ। ফোনের লাস্ট লোকেশন দেখে নিয়ে জানাও আমাকে প্লিজ, অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *