প্রলয় ঘূর্ণি – ২৫

২৫

রাত যখন গভীর হয়, বাড়ির খোলা ছাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকে লোকটা। ক্লান্ত লাগলে বসে পড়ে। কোনো কোনো দিন ছাদ থেকে নামতেই ইচ্ছে করে না। ছাদের এক কোণে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে সে তখন। কতদিন এই ছাদে ঝাঁট পড়েনি। আগে এই জায়গাটা ঝকঝক করত। ভাইটা ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে খুব ভালোবাসত। বয়সে অনেকটাই ছোটো ছিল ভাই। বাবা মায়ের শেষ বয়সের সন্তান। ওর প্রতি অদ্ভুত এক অপত্যভাব কাজ করত লোকটার মনে। রোগাসোগা, দুর্বল ছিল। বাইরে খেলতে যেতে চাইত না। দাদার কাছে ছিল তার যাবতীয় আবদার।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে লোকটা। আলসের পাশে দাঁড়িয়ে চারদিকে দৃষ্টি বোলায়। দেখতে দেখতে কত বদলে গেল শহরটা। এই বাড়ির আশেপাশে বড়ো বড়ো ঝকঝকে আবাসন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সদর্পে। রোদের তাপ, দক্ষিণা বায়ুর শীতল স্নিগ্ধ স্পর্শ, দুই-ই ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে গেছে তার জীবন থেকে।

শুধু তো এটুকুই নয়। আরও ছিল, কতকিছু ছিল তার। এখন কিছুই নেই। দিনের শেষে এই বাড়ি ফেরার শেষ আকর্ষণটুকু হারিয়ে ফেলার আগে সব কাজ সেরে নিতে হবে তাকে। আর সময় নেই। আর মাত্র দুটো কাজ বাকি। তারপর সব যুদ্ধ শেষ।

মৃদু হাসে লোকটা। কটা মাত্র দিন, অথচ পরিকল্পনাটা চলেছিল প্রায় দশ বছর ধরে। একটা সময় অবশ্য নিজের লক্ষ্য থেকে সরেছিল সে। ভেবেছিল সব ভুলে নতুন করে বাঁচবে। কিন্তু নিয়তির অন্য পরিকল্পনা ছিল। সুস্থ জীবনের স্বপ্ন মুছে গেছে নিঃশেষে। আবারও কোমর বেঁধেছে সে। দাঁতে দাঁত চেপে ধীরে ধীরে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়েছে। যারা তাকে এই খাদের ধারে এনে দাঁড় করিয়েছে, তাদের এক এক করে সরিয়ে দিয়েছে লোকটা।

সিগারেটটা ধরিয়ে দীর্ঘ সুখটান দিল সে। চোখদুটো আবেশে বুজে এল। ঠিক সেই সময়ে পকেটের ভেতর থেকে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল রাতের নৈঃশব্দ ভঙ্গ করে।

‘হ্যালো!’

‘হ্যালো, আমি ওমর বলছিলাম!’ ফোনের অন্য প্রান্তের কণ্ঠস্বর বলে ওঠে। ‘বল। আবার কী হল?’

‘বলছি, কিছু টাকার দরকার ছিল। হাত একদম খালি।’

চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল লোকটার। ওমরকে সে ব্যবহার করেছিল পুলিশকে মিসগাইড করার জন্যই। ধরা পড়ার ভয় অবশ্য ছিল না। তবে কাজ শেষ হওয়ার আগে অ্যারেস্ট হতে আপত্তি আছে তার। আর সে জন্য সময় প্রয়োজন। পুলিশকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা দরকার ছিল।

বিলালকে খুনের আগে ওই অঞ্চলে রেকি করার কোনো প্রয়োজন তার ছিল না। করেওনি। ওমরকে আগে থেকেই চিনত লোকটা। ওই অঞ্চলের পুরোনো রিকশাওয়ালা, পুলিশের খোঁচড়। ওকে দিয়ে কাজ বাগানো সহজ ছিল। কাজও হয়েছিল। ওমর জাত শয়তান। নেশায় ডুবে থাকে গলা অবধি। লোকটা ভেবেছিল, পয়সা আর মদ পেলেই ওমর চুপ থাকবে। শত হলেও এর আগে তার কাছ থেকে কিছু সাহায্য পেয়েছে ওমর।

এখানে তার চালে একটু ভুল হয়ে গেছে। আগেই বোঝা উচিত ছিল, ওমর পকেটে টান পড়লেই আবারও হাত পাতবে। ব্ল্যাকমেল করবে। সেদিন বিলাল শেখকে খুন করে বেরোনোর সময় টের পেয়েছিল ওমর পুরো ব্যাপারটাই দেখেছে। শয়তানটা কথা দিয়েছিল সে কাউকে বলবে না। অকারণে কাউকে খুন করতে ভালো লাগে না লোকটার। কিছু টাকা আর এক পাইট মদ দিয়ে মুখ বন্ধ করেছিল সেদিন।

কিন্তু না। ওকে ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হয়নি। বারবার ওর মুখ বন্ধ করার মতো টাকা লোকটার কাছে নেই। মনটা পানসে হয়ে যায়। খেলাটা যখন বেশ প্ল্যানমাফিক চলছিল, তখনই এই ছন্দপতন। একটা অর্থহীন চাল। প্রয়োজনীয়। একটা বাজে খুন পুরো খেলার ‘বিউটি’-টাকেই নষ্ট করে দেবে।

‘কত টাকা লাগবে?’ জিজ্ঞাসা করল লোকটা।

‘আমি বারবার আপনাকে জ্বালাব না। এই রিকশাওয়ালার জীবন আর ভালো লাগছে না। শরীর চলে না আজকাল। বেশি চাইছি না। আপনি বরং একবারে দুই লাখ দিয়ে দিন। আমি দেশে ফিরে যাব। আর কলকাতা শহরে ফিরে আসব না।’

লোকটা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আজ রাতে তোর স্ট্যান্ডেই থাকবি তো?’

ওমর কিছু ভাবল যেন। তারপর বলল, ‘আজকে একটু দামি মাল খেতে ইচ্ছে করছে। শেষ বার। মাইরি বলছি। আর কোনোদিন চাইব না। মৌলালীর কাছে সানি সিজন বারটা আছে না! ওখানে আসুন না রাত এগারোটা নাগাদ। হাতে হাতে লেনদেনও হবে।’

লোকটা মনে মনে ওমরের বুদ্ধির তারিফ না করে পারল না। ওমর সন্দেহ করছে যে লোকটা ওকে খুন করতে পারে। তাই এমন জায়গায় ডাকছে যেখানে আরও লোকজন থাকবে। ফোনটা রেখে কিছুক্ষণ ছাদের কার্নিশের প্রান্তে দাঁড়িয়ে রইল সে। লোভ। লোভ বড়ো ভয়ঙ্কর জিনিস। ওমরের লোভ তার এত সুন্দর করে ধাপে ধাপে সাজিয়ে তোলা খেলাটা নষ্ট করে দিতে চাইছে। হাতের তালু ঘামছে, টের পায় লোকটা। কী করবে এমন যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে! একটা ফোন করা দরকার।

রাত এগারোটা নাগাদ সানি সিজন বারের সামনে যখন পৌঁছোল সে, সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল ওমর। বারের সামনে নিয়ন আলোয় নাম লেখা। নতুন বছরের প্রথম দিন। ভিড়ে ঠাসা। এটা উচ্চবিত্তদের জায়গা নয়। আবার নিম্নবিত্তদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ দেশে এই দুই সামাজিক স্পেকট্রামের মাঝখানে নিজেদের সামাজিক স্ট্যাটাস নিয়ে নিয়ত দ্বিধাপীড়িত এক প্রায় অদৃশ্য প্ৰজাতি বাস করে। তারাই আসে এখানে, হয়তো অস্তিত্বের সঙ্কট কাটাতেই।

দুজনে বারে একসঙ্গে মদ খেল অনেকটা সময় নিয়ে। তারপর টাকার প্যাকেটটা ওমরের হাতে দিল লোকটা। ওমরের ঠোঁটের কোণে একটা তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তারপর আবার গ্লাসে চুমুক দিল।

‘আজ রাতেই ফিরে যাবি দেশে। কাল সকালে যেন তোকে দেখতে না পাই।’ লোকটা বলল চাপাস্বরে।

ওমর নিবিষ্টমনে মদ খেয়ে চলেছে।

‘কী হল? উত্তর দিচ্ছিস না যে!’

‘যাব বলেছি তো! শরীরটা ঠিক নেই। কটা দিন যাক। তারপর যাব।’ লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওমরকে সুযোগ দিতে চেয়েছিল সে। কিন্তু এখন সে বুঝে গেছে, লাভ নেই। বোকাটাকে লোভ পেয়ে বসেছে। এত সহজে সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে ছাড়বে না ও। আরও কিছুক্ষণ মদ খাওয়ার পর উঠে দাঁড়াল লোকটা। তারপর বলল, ‘আজকের পর থেকে তুই আমাকে চিনিস না, কেমন? পুলিশকে যেমন বলেছিস, আবার জিজ্ঞাসা করলে একই কথা বলবি।’

‘পাক্কা!’ বলে স্যালুটের ভঙ্গিতে কপালে হাত ছোঁয়াল ওমর। বিচ্ছিরি হাসি হাসল একটা। উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও নেই তার। লোকটা নিজের ব্যাগ থেকে একটা অ্যাম্পিউল আর এক সিরিঞ্জ বের করল। চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল একবার। এত রাতে বারে লোকের ভিড় কিছুটা হলেও কমে এসেছে। যারা আছে, তারাও নেশায় চুর। বারের কর্মী, বাউন্সাররাও ঝিমোচ্ছে। কেউ তাদের দেখছে না। ব্যাগ দিয়ে আড়াল করে সিরিঞ্জে ওষুধ ভরে নিল লোকটা। ওমরের হাতে হাত রাখল। তারপর খুব যত্ন করে নিজের হাতের তলা দিয়ে তরলটুকু পুশ করে দিল ওমরের ধমনীর মধ্য দিয়ে। আবারও বের করল আরেকটা অ্যাম্পিউল। পরপর চারটে ইঞ্জেকশনের পর সব গুছিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল সে। ওমরের মধ্যে নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ নেই।

‘চলি রে।’

বলে লোকটা বেরিয়ে এল বার থেকে। দরজার কাছে পৌঁছে একবার পেছন ফিরে দেখল। ওমর টেবিলের উপর মাথা এলিয়ে শুয়ে আছে। লোকটা নিজের মনেই মাথা নাড়ল। এসব ঝুটঝামেলা ভালো লাগে না তার। লোভ, লোভ। ওমরের লোভই ওর সর্বনাশ ডেকে আনল। শয়তান… শয়তান… রাস্তা দিয়ে একা হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করতে থাকে লোকটা।

২৬

হাসপাতালের করিডর ধরে এগোতেই সঞ্জয় পালের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা।

‘কী ব্যাপার? কীভাবে হল এসব?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

সঞ্জয় পাল ব্যাজার মুখে বললেন, ‘মধ্যরাতের পর, তখন একটা-দেড়টা হবে। রাউন্ডে বেরিয়েছিলাম। ওই এলাকাতেই ছিলাম। ওয়াকি টকিতে খবরটা পেয়ে গিয়ে দেখি এই কান্ড।’

‘অজ্ঞান অবস্থায় ছিল?’

‘হ্যাঁ। বারের ম্যানেজার ভেবেছিল, বেশি মাল খেয়ে হুঁশ হারিয়ে ফেলেছে। পরে ওঠাতে গিয়ে দেখে নড়ে না। ভেবেছিল মরে টরে গেছে বোধ হয়। ভয় পেয়েছিল খুব। পরে আমি গিয়ে দেখি বেঁচে আছে। নিঃশ্বাস পড়ছে। হাসপাতালে নিয়ে এলাম।’

‘ডাক্তার কী বলছেন?’ জানতে চাইল অর্জুন।

‘এখনও তো জ্ঞান আসেনি। ডাক্তার বলছেন, কোমাতে চলে গেছে।’

‘কীভাবে হল?’

‘আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তো বললেন, কী যেন একটা ওষুধ ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে ওকে। অনেক বেশি পরিমাণে দেওয়া হয়েছে। মরেনি যে, সেই অনেক। কোমা থেকে ফিরে এলেও ভেজিটেবল হয়ে থাকবে সারাজীবন।’

‘কী হয়ে থাকবে?’ ভুরু কোঁচকায় অর্জুন।

‘ভেজিটেবল স্যার। প্যারালাইসিস। সারা শরীরে কোনো সার নেই।’ বলতে বলতে অর্জুনের পেছনে তাকালেন সঞ্জয় পাল। বললেন, ‘ওই তো ডাক্তারবাবু আসছেন। আপনি কথা বলুন।’

ডাক্তার ভদ্রলোক সৌম্যদর্শন দীর্ঘদেহী প্রৌঢ়। প্রথম দর্শনের একটু চেনা লাগল অর্জুনের। ভদ্রলোকও একটু থমকালেন। তারপর তাঁর মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল হাসিতে।

‘তুমি অতীন্দ্রর ছেলে না? অর্জুন, রাইট!’

‘সতীনাথ আঙ্কল!’

ডক্টর সতীনাথ মজুমদার অর্জুনের বাবার স্কুলজীবনের বন্ধু ছিলেন। বর্তমানে যোগাযোগ কমে এলেও সুতোর টানটা ছিঁড়ে যায়নি। আগে বাবা কলকাতায় এলেই ডক্টর আঙ্কলের সঙ্গে দেখা করতেন। অর্জুনও ছোটোবেলায় বাবার সঙ্গে কয়েক বার গেছিল আঙ্কলের বাড়িতে। আঙ্কলের মেয়ে বনিদিদির সঙ্গে বেশ ভাব ছিল তার। তারপর মাঝে এত বছরের অদর্শন। তাই প্রথম দেখায় চিনতে পারেনি অর্জুন।

‘এখানে কেন? কোনো কেসের ব্যাপারে?’ জিজ্ঞাসা করলেন ডক্টর মজুমদার। অর্জুন মাথা নাড়ল। তারপর ওমরের ব্যাপারটা খুলে বলল তাঁকে।

‘পেশেন্ট কি কোনো কেসের সাক্ষী?’

‘হ্যাঁ, যথেষ্ট ইম্পর্ট্যান্ট সাক্ষী। কলকাতায় রাতের বেলায় যে খুনগুলো হচ্ছে, শুনেছেন তো?’

‘ইয়েস, দ্যাট রেজর কিলার?’

এই নামটা মিডিয়ার দেওয়া, জানে অর্জুন। মাথা নাড়ল সে। বলল, ‘এই লোকটি একমাত্র মানুষ যে কিলারকে দেখেছে।’

‘মাই গড! আমি এরকমই কিছু আন্দাজ করেছিলাম।’

‘কেন?’

ডক্টর মজুমদার মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘তোমার উইটনেসকে যে মেডিসিন ইনজেক্ট করা হয়েছে, তার নাম লিনকমিসিন। এটা ইন্ট্রামাসকুলার ইনজেকশন। শুধু তাই নয়, ওই ওষুধের হাই ওভারডোজ দেওয়া হয়েছে। এই ইঞ্জেকশন প্যারালাইসিস ইনডিউস করে।’

অর্জুনকে হতাশ দেখাল। জানতে চাইল, ‘কতদিন থাকবে এই অবস্থা?’

‘বলা যায় না,’ মাথা নাড়লেন ডক্টর খাস্তগীর। ‘এত হাই ডোজের পর বেঁচে থাকাটাই আশ্চর্যের। তবে যে দিয়েছে, সে সম্ভবত ডোজের পরিমাণটা খুব ভালোভাবে জানে। আর জানে বলেই এমনভাবে দিয়েছে যাতে করে একেবারে মরে না গেলেও জীবন্বত হয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু একটা ব্যাপার আমার অবাক লাগছে।’

‘কী?’ জানতে চাইল অর্জুন।

‘কিলার যেভাবে একের পর এক খুন করে চলেছে, মানে নিউজে তো দেখছি, তাতে এত কষ্ট করে ইঞ্জেকশন দিয়ে কোমায় পাঠানোর চেয়ে মেরে ফেলা বেশি সহজ ছিল। মানে মদে বিষ মিশিয়ে টিশিয়ে আর কী! মারল না কেন বলো তো?’

এর উত্তর অর্জুনেরও জানা নেই। তাই কাঁধ ঝাঁকাল সে।

‘স্ট্রেঞ্জ, ভেরি স্ট্রেঞ্জ!’ ডক্টর মজুমদার বললেন।

‘কোনোভাবেই ওকে দিয়ে কথা বলানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়?’ জানতে চাইলে অর্জুন।

‘আই অ্যাম আফ্রেড মাই বয়, ইট ওন্ট বি পসিবল ইন নিয়ার ফিউচার। মিরাকেল ছাড়া অসম্ভবই ধরে নাও।’

মাথা নাড়ল অর্জুন। তারপর মুখে হাসি টেনে বলল, ‘এতদিন পরে দেখা হল, তাও এভাবে। বনিদিদি কেমন আছে? অনেকদিন দেখা হয় না।’

ডক্টর মজুমদার একটু হাসলেন। বললেন, ‘ভালো আছে। তা তোমার বাবা-মা ভালো আছেন তো? বহুদিন দেখাসাক্ষাৎ হয় না।’

মাথা নাড়ল অর্জুন। তারপর বলল, ‘আঙ্কল, আপনার পেশেন্ট, মানে ওই ওমর আফজলের সেরে ওঠাটা খুব জরুরি। ওর যদি জ্ঞান ফেরে আমাকে জানাবেন প্লিজ।’

ডক্টর সতীনাথ মজুমদার বললেন, ‘অফ কোর্স! তুমি এক কাজ করো। আমার ফোন নম্বরটা সেভ করে রাখো। কিছু জানার দরকার থাকলে ফোন করে নিও। আর তোমার কোনো কার্ড থাকলে দিয়ে যাও। পেশেন্টের বাই চান্স যদি জ্ঞান ফেরে, আমি তোমাকেই সবার আগে ফোন করব। ডোন্ট ওয়ারি।’

ডাক্তারের সঙ্গে কথা শেষ করে সঞ্জয় পালের দিকে এগোল অর্জুন। ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে খারাপই লাগল তার। স্পষ্টতই হতাশ দেখাচ্ছে তাঁকে। অর্জুনকে দেখে বললেন, ‘ওমর খুব ভালো সোর্স ছিল। অনেকদিন ধরে চিনি। নেশা করত ঠিকই, কিন্তু চার পাইট টানার পরেও ওর মাথা আর চোখ দুইই কাজ করত। সবদিকে নজর রাখত। কত কেসে যে ও আমাদের সাহায্য করেছে তার ইয়ত্তা নেই। আগেরদিনও বলেছিলাম, ওমর, নেশা করে করে শরীরটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিস। এই মদই তোকে খাবে। হেসেছিল। বলল, ‘আমি খারাপ মানুষই ভালো আছি সাহেব। ভালো মানুষ হলে আপনাদের কাজে লাগতাম না। সত্যি মনটা খারাপ লাগছে।’

সঞ্জয়ের দিকে আজ প্রথমবার ভালো করে তাকাল অর্জুন। মাঝারি উচ্চতা, চেহারায় কোনো বিশেষত্ব নেই। মাথার চুল উঠে কপাল চওড়া। যে সমস্ত পুলিশ কর্মীরা সারাজীবন পুলিশে থেকে গতানুগতিক রুলবুক মেনে কাজ করে যায়, কল্পকাহিনির মতো অ্যাডভেঞ্চার বা ঘনঘোর রহস্য তাদের কপালে জোটে না, ডিউটির নিগড়ে বাঁধা জীবনে পরিবার, প্রিয়জনদের সময় দিতে না পারা সত্ত্বেও কাজ করে যেতে হয়, তারপর কাজ করতে করতেই অবসরের সময় ঘনিয়ে আসে, সুখেন্দুশেখরের মতো গালভরা গল্প এদের ঝুলিতে থাকে না, সঞ্জয় পাল তাদেরই একজন। একজন সামান্য খবরির জন্য দুঃখবোধ করার মতো একটা মন আছে তাঁর।

সঞ্জয়ের কাঁধে হাত রেখে আলতো করে চাপ দিল অর্জুন। বলল, ‘চিন্তা করবেন না সঞ্জয়বাবু। কেসটা আমরা ক্র্যাক করবই। ওমরের এই অবস্থা যে করেছে, সে ঐ সিরিয়াল কিলারই হোক বা অন্য কেউ, ধরা পড়বেই। আমাদের কলকাতা পুলিশ চাইলে সব করতে পারে।’

সঞ্জয় পাল চোখ তুলে তাকালেন। বললেন, ‘পারতেই হবে স্যার। একটা পাতি খুনি আমাদের বারবার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবে, আর আমরা জবাব দেব না? কলকাতা পুলিশ চুড়ি পরে বসে আছে নাকি? আই অ্যাম অলওয়েস অ্যাট ইয়োর সার্ভিস স্যার। যে কোনো প্রয়োজনে আমি আছি আপনার সঙ্গে।’

২৭

দরজাটা খুলে ভুরু কোঁচকাল টাপুর। সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে মিতুল। কাঁধে একটা ঢাউস ব্যাগ।

‘কী ব্যাপার? সক্কাল সক্কাল? অফিস-কাছারি নেই?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

মিতুল টাপুরকে প্রায় ঠেলেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। সোফার উপর ব্যাগটা রেখে জুতো খুলতে খুলতে বলল, ‘এই প্রোজেক্ট থেকে রিলিজ পেয়ে গেছি। অফিসের ঝামেলা নেই। মাঝে একটু নতুন প্রোজেক্টের অফশোরের কত্তাদের মুখ দেখিয়ে আসতে হবে বার-কয়েক। বাকিটা ওয়ার্ক ফ্রম হোম। ভিসা প্রসেস চলছে। পেতে পেতে মাস খানেক লেগে যাবে। বাবা-মা জলপাইগুড়ি গেছে বাবার খুড়তুতো ভাইয়ের মেয়ের বিয়েতে। আমাকে ধরেবেঁধে নিয়ে যেতে চাইছিল। ফাঁক গলে পালিয়ে এসেছি। আপাতত কয়েকদিনের জন্য এখানেই বডি ফেলব। আপত্তি আছে?’

টাপুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘এসেই যখন পড়েছিস, আমার আপত্তি থাকলেই কী আর না থাকলেই বা কী!’

‘সেই তো! তোমার আপত্তিকে পাত্তা দিতে বয়েই গেছে আমার। তাছাড়া তোমার সঙ্গে ঝগড়াও আছে।’

‘কেন? আমি আবার কী করলাম?’

মিতুল গম্ভীর মুখে বলল, ‘তুমি সিরিয়াল কিলারের কেসটাতে কাজ করছ আমাকে জানাওনি।’

‘এমন আজেবাজে খবর কে দেয় রে তোকে?’

‘অর্জুনদা বলেছে, ওই যে রাইটার ভদ্রলোকের ওয়াইফ তোমাকে মার্ডার কেসের তদন্ত করার ভার দিয়েছেন। তুমি কই, বলোনি তো আমাকে?’ ব্যাজার মুখে বলল মিতুল।

‘কী বলব?’ মাছি তাড়ানোর মতো করে মিতুলের কথাটা উড়িয়ে দিয়ে টাপুর বলল, ‘ভারী তো কেস। আদৌ এই কেসে আমার কিছু করার আছে কি না তাই-ই জানি না। গত দুই দিনে এক স্টেপও এগোতে পারিনি। ভদ্রমহিলাকে মানা করে দেব, আমার দ্বারা হবে না। ধুর, সিরিয়াল কিলার ধরা প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাজ নাকি?’

‘এই না না, প্লিজ মানা কোরো না। দেখো আমি তো চলেই যাব। কবে আবার ফিরব জানি না। যাওয়ার আগে একটা কেসে অন্তত তোমার সঙ্গে কাজ করে যাই। প্লিজ প্লিজ, লক্ষ্মী দিদি আমার।’ মিতুল লাফিয়ে উঠে এসে টাপুরের গালে চকাস করে একটা চুমু খেল।

‘ভাগ! একদম ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করবি না বলে দিচ্ছি। যেমন তুই, তেমন অর্জুন। পুলিশের কাছে যেসব সুবিধে আছে, ফোর্স আছে, সোর্স আছে, আমার আছে? বোকার মতো কথা বলিস না। বাই দ্য ওয়ে, কাকু কাকিমাকে বলেছিস, তুই এখানে থাকবি?’

‘না বললে ছাড়ত নাকি? ধরে নিয়েই যেত জলপাইগুড়ি। ভাবো টাপুরদি, আজ বাদে কাল আমি ওই সাহেবসুবোদের দেশে একা থাকব, আর আমার মা-বাবা কি না এখনও আমাকে এই কলকাতা শহরে আমার নিজের বাড়িতে একা ছাড়তে ভয় পায়!’

হেসে ফেলল টাপুর। মিতুলের গালটা টিপে দিয়ে বলল, ‘এমনি এমনি ভয় পায় না বাবু। তোমার মতো বিছুটির কেউ কিচ্ছুটি করতে পারবে না তা কাকু কাকিমাও জানেন। কেউ কিডন্যাপ করতে এলে উলটো র‍্যানসম দিয়ে ফেরত দিয়ে যাবে। আর সেজন্যই ওরা ভয় পান যে তুই উল্টো কাউকে কিছু করে না বসিস।’

‘বাহ্, আমার সম্পর্কে তোমাদের কী উচ্চ ধারণা! শুনেও খুশি হলাম। যাক গে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকবকই করবে, নাকি অতিথিকে কিছু খাওয়াবেও? সকালে দাঁত ব্রাশ করেই বেরিয়ে পড়েছি। এখনও ব্রেকফাস্টও করিনি।’

টাপুরের মুখটা কোমল হয়ে এল। বলল, ‘চেঞ্জ করে নে। আজ সুজির উপমা বানাচ্ছি, কারিপাতা আর সর্ষে ফোড়ন দিয়ে। খাবি তো?’

‘জমে যাবে। আর শোনো না, কটা ছোলার ডাল রোস্ট করে ফেলে দিও ওতে। দারুণ লাগে।’

হাসল টাপুর। বলল, ‘বেশ। দেব। আর শোন, একটু রান্নাবান্না শিখে নে এইবেলা। নইলে ও দেশে গিয়ে ফ্রোজেন ফুড খেয়েই কাটাতে হবে।

‘চা কফি করতে পারি, ইনস্ট্যান্ট নুডলস সেদ্ধ করতে পারি। ফ্রোজেন স্ন্যাকস ভাজতে পারি। আপাতত ওতেই চলে যাবে। এমনিতেই মনমেজাজ ভালো নেই। আর রান্নাবান্নার কথা বলে পাকিও না বস,’ বলে ঘরে ঢুকে গেল মিতুল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পোশাক বদলে সোফায় এসে বসল। সেখান থেকেই উঁচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘টাপুরদি, এই যে খুনগুলো হচ্ছে, সত্যিই কি সিরিয়াল কিলারের কাজ?’

টাপুর আভেনের আঁচ কমিয়ে কড়াটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। বলল, ‘আপাতদৃষ্টিতে তো তাই-ই মনে হচ্ছে।’

‘অর্জুনদা বলল, একজন নাকি উইটনেস ছিল। তাকেও কেউ ইনজেকশন দিয়ে প্যারালাইজ করে দিয়েছে।’

টাপুর মাথা নাড়ল। সেও অর্জুনের মুখে শুনেছে ঘটনাটা।

মিতুল বলল, ‘তাহলে কিন্তু এখানেও একটা কোয়েশ্চেন মার্ক থেকেই যাচ্ছে টাপুরদি। লোকটা যদি সিরিয়াল কিলারই হয়, তাহলে উইটনেসকে খুন করল না কেন? মানে যে লোক পাঁচখানা খুন নির্বিকারভাবে করতে পারে, তাহলে আরও একখানা করতে তো তার অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। তবু লোকটাকে খুন না করে প্যারালাইজ কেন করল?’

টাপুর বলল, ‘এই কথাটাই কাল থেকে আমিও ভেবে চলেছি? কেন করল? শুনেছি লোকটা রিকশাওয়ালা। রাতবিরেতে রাস্তায় রিকশাতেই ঘুমোত। তাকে খুন করা তো খুবই সহজ ছিল। কেন করল না? কেন এ রিস্ক নিয়ে বারে গিয়ে মদ খাইয়ে বেহুঁশ করে ইনজেকশন পুশ করল শুধু প্যারালাইজ করতে?’

‘বারে মদ খাইয়ে ইঞ্জেকশন দিয়েছে?’ চোখ বড়ো বড়ো করে জিজ্ঞাসা করল মিতুল, ‘এটা কিন্তু আমার জানা ছিল না? ওই বারে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না? সেখানে পাওয়া যায়নি কিছু?’

‘ছিল। একজন ব্লু জিনস আর কালো হুডি পরা লোককে দেখা গেছে ওমরের সঙ্গে। কিন্তু ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে বসেছিল লোকটা। এমনকি বারে এন্ট্রান্সের মুখে সিসিটিভির সামনে মাথা নীচু করে রেখেছিল যাতে ফুটেজে মুখ দেখা না যায়।’

‘আমার মনে হয় জানো টাপুরদি, লোকটা ইচ্ছে করেই খুন করেনি। হয়তো পাত্তা দেয়নি।’ বলল মিতুল।

‘আরেকটা কারণ হতে পারে।’ বলল টাপুর।

‘কী কারণ?’

‘প্ল্যান। ওমর নামের ওই রিকশাওয়ালাকে খুন করা খুনির প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। তাই ওকে চুপ করাতে চেয়েছিল, খুন করতে নয়।’

‘তাতে কী? নাই বা থাকল প্ল্যানে! যে এতগুলো খুন করতে পারে, আরেকটা খুন করতে তার কী?’

টাপুর মাথা নাড়ল। বলল, ‘তুই বুঝতে পারছিস না। খুনগুলো কোনো প্যাটার্ন ফলো করে হচ্ছে। শিয়োর হচ্ছে। এই লোকটাকে খুন করলে হয়তো খুনির সেই প্যাটার্নটা নষ্ট হয়ে যেত।’

‘প্যাটার্ন! মাই গড! কেমন প্যাটার্ন? তুমি ধরে ফেলেছ? আমার রীতিমতো গুজবাম্প হচ্ছে। দেখো…’ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল মিতুল।

‘না রে, এখনও নয়।’ হতাশ গলায় বলল টাপুর। একটুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর রান্নাঘরে ঢুকে গেল। কড়া থেকে ঢাকনাটা খুলে বার কয়েক খুন্তি দিয়ে ঘেঁটে কড়া থেকে ছাড়াল নীচে লেগে থাকা সুজিগুলোকে। তারপর দুটো প্লেটে উপমা সার্ভ করল। দুটি কাপে সসপ্যান থেকে ঢেলে নিল ধোঁয়া ওঠা দার্জিলিং চা। সবকিছু ট্রেতে সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল সে।

‘আয়, খেতে আয়।’

মিতুলও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ডাইনিং টবিলের চেয়ার টেনে বসে উপমার প্লেট টেনে নিল নিজের দিকে। তারপর আবারও জিজ্ঞাসা করল, ‘প্লিজ টাপুরদি, পাজলটা সলভ করো। পারলে তুমিই পারবে। এটা পুলিশের কম্মো নয়।

টাপুর চায়ের কাপে চুমুক দিল। একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘পাজল!’

‘পাজল নয় তো কী! এর জন্য লজিক দরকার, যেটা তোমার আছে। প্লিজ টাপুরদি, চেষ্টা করো। লোকটা কিন্তু ওই রিকশাওয়ালাকে খুন না করে খুব বড়ো একটা রিস্ক নিয়েছে। ধরো, যদি লোকটার জ্ঞান ফিরে আসে? কী যেন নাম লোকটার?’

‘ওমর।’

‘হ্যাঁ ওমর, তার যদি জ্ঞান ফিরে আসে। কিংবা কথা বলতে পারে! তখন? এতটা রিস্ক কীভাবে নিল খুনি?’

টাপুর চুপ করে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘ডাক্তারের মতে ওমরের খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হওয়ার চান্স নেই। আর যদি পরে হয়ও, হয়তো ততদিনে খুনি তার গেমের এন্ড পয়েন্টে পৌঁছে যাবে। তখন আর ওমরের সাক্ষী তার জীবনে আর কোনো প্রভাব ফেলবে না!’

‘এন্ড পয়েন্ট! মানে?’

টাপুর মাথা নীচু করে চামচে করে উপমা তুলে মুখে দিল। উত্তর দিল না কিছু মিতুলের মনে হল, টাপুরদি মুখে যাই বলুক, কেসটা নিয়ে সে যথেষ্ট চিন্তিত।

২৮

‘কেসটা মনে হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী স্পেশাল ব্রাঞ্চকে দেবেন।’ বিষণ্ণ মুখে বলল অর্জুন।

রাতের খাওয়া শেষ করে টিভিতে খবর দেখছিল টাপুর আর মিতুল, তখনই বেজেছিল কলিং বেলটা। অর্জুনকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। গত দু-দিন বাড়ি ফেরেনি সে। খাওয়া-দাওয়া কিছুই হয়নি ঠিকমতো। চোখের নীচে কালি, উস্কোখুস্কো চুল। এসেই বলেছে, ‘প্লিজ, তাড়াতাড়ি কিছু খেতে দাও টাপুর। সময় নেই। বিশ মিনিটের মধ্যে বেরোতে হবে আবার। পেট্রোলিং-এ বেরিয়েছি। এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, তাই…’

টাপুর মৃদু হাসল। তাড়াতাড়ি বেঁচে যাওয়া ভাত, ডালের সঙ্গে চটজলদি ভাজা মাছ আর পাঁপড় ভেজে বেড়ে দিল অর্জুনের সামনে। অর্জুন চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। কথা বলছে না। ওর জন্য কষ্ট হচ্ছে টাপুরের। সে বলল, ‘এত বেশি চাপ নিয়ে ফেলো না অর্জুন। তোমরা তো চেষ্টা করছ। কতটা পরিশ্রম করছ তোমরা, সেটা সৌরভবাবু নিজেও জানেন।’

‘জানেন।’ খেতে খেতেই বলল অর্জুন, ‘কিন্তু তাঁর হাতেও আর কিছু নেই। এই কেসে একমাত্র বিলাল শেখ ছাড়া বাকি চারজনই কিন্তু সমাজের গণ্যমান্য লোক। ফলে মিডিয়া কভারেজও বেশি পাচ্ছে, দেখছই তো? এরকম অবস্থায় পুলিশের হাতেই বা আর কী করার আছে? মিডিয়াকে কীভাবে বোঝাব যে পুরো কলকাতা শহরের প্রতিটি রাস্তা, প্রত্যেক গলি বা বস্তিতে পুলিশ বহাল করার মতো অত ফোর্স আমাদের হাতে নেই। সামনে ইলেকশন। বিরোধীরা মুখ্যমন্ত্রীকে এই নিয়ে চাপ দিচ্ছে। নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কেসটা ডিসিডিডি স্যারের নাগালেরও অনেক বাইরে চলে গেছে। পুলিশ সারা রাত ধরে রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে। কেউ জানে না পরের ভিকটিম কে হবে? পরের খুনটা কোথায় হবে? এরকম অবস্থায় খুনিকে আটকাব কীভাবে বলতে পারো?’

মিতুল উঠে গিয়ে গ্লাসে করে জল এনে অর্জুনের সামনে রাখল।

‘থ্যাঙ্ক ইউ মিতুল। আমার কথা ছাড়ো। তোমার যাওয়ার কী হল? কবে যাচ্ছ?’

‘মোটামুটি মাস খানেক ধরে রাখো এখনও। ততদিনে কেসটা সলভ করো। নইলে ওখানে গিয়েও কাজে মন বসাতে পারব না।’ হেসে বলল মিতুল।

টাপুর বলল, ‘আজ আমি আর মিতুল আলোচনা করছিলাম, খুনি ওমরকে খুন কেন করল না! তুমি এই নিয়ে কিছু ভেবেছ অর্জুন?’

‘ভেবেছি। অনেকগুলো পসিবিলিটি আছে। তার মধ্যে যেটা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে সেটা হল ওমরকে খুন করার কোনো প্ল্যান খুনির ছিল না। মুখ বন্ধ করতে হলে খুন না করলেও যদি চলে, তাহলে শুধুমুধু খুন করতে যাবেই বা কেন?’

টাপুর ও মিতুল হাসিমুখে দৃষ্টি বিনিময় করল। ব্যাপারটা অর্জুনের নজর এড়ায়নি। জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল? তোমরা হাসছো কেন?’

মিতুল হাসিমুখেই বলল, ‘এই কথাটাই টাপুরদি আজ সকালে বলছিল। গ্রেট মেন থিংক অ্যালাইক!’

অর্জুন বলল, ‘ওমরের জ্ঞান ফিরে আসাটা খুব জরুরি। আমার ধারণা একমাত্র ওই জানে খুনির পরিচয়।’

‘ডাক্তার কী বলছেন?’ জানতে চাইল টাপুর।

‘আজ নাকি একবার সকালের দিকে জ্ঞান ফিরেছিল। নার্স পেশেন্টের মুভমেন্ট দেখে আর এম ও-কে জানায়। সতীনাথ আঙ্কল হাসপাতালেই ছিলেন তখন। প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন যাতে পুরোপুরিভাবে ওর জ্ঞান ফেরানো যায়। কিন্তু লাভ হয়নি। আবারও কোমায় চলে যায় ওমর। আঙ্কল নিজেও খুব মর্মাহত হয়ে পড়েছেন। আমাকে বললেন, চেষ্টা করেছিলাম অর্জুন। সাক্সেসফুল হল না চেষ্টাটা। কী আর বলব! আমাদেরই কপাল খারাপ।’

অর্জুনের খাওয়া শেষ হয়ে গেছিল। উঠে দাঁড়িয়ে হাত ধুতে গেল বাথরুমে। টাপুর বসে রইল সেখানেই। ওমরের জ্ঞান না ফেরা এই কেসের সবচেয়ে বড়ো নেতিবাচক দিক। হাসপাতালে তার পর্যাপ্ত সিকিয়োরিটির ব্যবস্থা পুলিশ করেছে, জানে টাপুর। তবু একটা খচখচানি মনের ভেতর রয়েই যাচ্ছে। প্যাটার্ন ভাঙা না ভাঙা নিয়ে যতই তরজা চলুক, টাপুর বা অর্জুন নিজেরা যতই যুক্তি দেখাক, খুনি এত বেশি উদার হবে এটা যেন মানা যাচ্ছে না যেখানে সে ভালো করেই জানে ওমরের জ্ঞান ফিরে এলে তার সব পরিকল্পনা কেঁচে যাবে।

অর্জুন বাথরুম থেকে হাত ধুয়ে বেরিয়ে এসে বলল, ‘ডিসিডিডি স্যার, কমিশনার স্যার আজ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী তিনদিন সময় দিয়েছেন। এর মধ্যে যদি খুনিকে ধরা যায়, তাহলে ভালো। নাহলে কেসটা সিআইডির হাতে তুলে দিতে বাধ্য হবেন তিনি। যাক গে, থ্যাংকস ফর দ্য ডিনার। আমি পালাই।’

সোফায় বসে জুতো পরতে লাগল অর্জুন। টাপুর হঠাৎ বলে উঠল, ‘একটা ফেভার চাই তোমার থেকে অর্জুন।’

অর্জুন জুতোর ফিতে বাঁধা বন্ধ করে টাপুরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। টাপুর বলল, ‘এখনও পর্যন্ত ভিকটিমদের সম্পর্কে যা যা জানতে পেরেছ, আমাকে দিতে পারবে? ভয় পেয়ো না, কেস সলভ হলে তোমার ক্রেডিট আমি নেব না।’

হাসার চেষ্টা করল টাপুর। কিন্তু হাসিটা ঠিক ফুটে উঠল না। অর্জুন ওর মুখের দিকে তাকাল। টাপুরকে সে চেনে। তার অভিব্যক্তির সামান্যতম পরিবর্তন সে ধরে ফেলতে পারে। এখন সে বুঝল, টাপুর চেষ্টা করেও কেসটা থেকে দূরে থাকতে পারছে না। পরিস্থিতিটা একটু হালকা করার জন্য মুচকি হেসে বলল সে, ‘সব দিয়েই তো বসে আছি ম্যাডামকে। শুধু ক্রেডিট নিয়ে আর কী করব?’

মিতুল টাপুরের দিকে তাকিয়ে দেখল তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। হাসি চেপে সে বলল, ‘আমি কি এখান থেকে যাব? তোমাদের রোমান্স যদি আরও কিছুক্ষণ চলে বলো আমি তবে ও ঘরে যাই।’

‘তুই থামবি, মিতুল?’ ধমক লাগাল টাপুর। তারপর অর্জুনের দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, ‘কাজে যাও। এখন তোমার দেরি হচ্ছে না?’

‘হচ্ছে। যাই।’ দরজার বাইরে পা রাখল অর্জুন। টাপুর পেছন থেকে বলল, ‘যা বললাম, মনে রেখো। রেকর্ডস সব পাঠিও আমাকে মনে করে।’

অর্জুন চলে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে সোফায় এসে বসল টাপুর। তাকে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছে। মিতুল জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল? কী ভাবছ?’

‘ভাবছি খুনিকে টেক্কা দিতে হলে আমাদের তার মতো করে ভাবতে হবে। আচ্ছা মিতুল, খুনগুলো সম্পর্কে কিছুটা তো জানিস তুই। তাই তো?’

মাথা নাড়ল মিতুল। গত কয়েকদিনে খবরের কাগজ, টিভি নিউজে যা যা দেখিয়েছে, পুরোটাই গোগ্রাসে গিলেছে সে।

‘আচ্ছা, এই খুনি, যাকে মিডিয়া বলছে রেজর কিলার, তার সম্পর্কে তোর কী অভিমত? মানে কী মনে হয়? তার মাথায় কী চলছে?’

মিতুল চুপ করে রইল বেশ খানিকক্ষণ। তারপর বলতে শুরু করল।

‘দেখো, আগে তুমি নিজেও বলেছ, খুনগুলো প্ল্যানড। আমারও তাইই মনে হচ্ছে। এবার যদি ভাবি, কেউ কেন এভাবে প্ল্যান করে কিছু লোককে খুন করবে, তাতে একটা কথাই মনে হয়, এই ভিকটিমদের সঙ্গে খুনির কিছু শত্ৰুতা ছিল।’

‘শত্রুতা ছিল তো বুঝলাম। কিন্তু সে তো আমাদের সকলেরই থাকে, তা-ই না? অনেককে আমরা পছন্দ করি না। অনেকে আমাকে পছন্দ করে না। পেছনে বাঁশ দেওয়ার মতো লোকের অভাব কোনো মানুষের জীবনেই হয় না। কিন্তু তা বলে তো কেউ তাদের খুন করতে যায় না। যায় কী!’

মাথা নাড়ল মিতুল।

‘তাহলে? এক্ষেত্রে ধরে নিতে পারি, এই ভিকটিমদের সঙ্গে খুনির শত্রুতাটা খুব সামান্য নয়। এই লোকগুলো এমন কিছু করেছিল যা কিলারকে গভীরভাবে আঘাত করেছে।’

‘এতজন মিলে একজনের পেছনে লেগেছিল বলতে চাইছ?’ মিতুল একটু অবাক হল।

‘ঠিক তা বলতে চাইছি না। এমনও বলছি না যে তারা একসঙ্গে মিলিতভাবে খুনির কোনো ক্ষতি করেছিল। কারণ এখনও পর্যন্ত ভিকটিমদের নিজেদের মধ্যে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ আমরা পাইনি যাতে করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো যায়। কিন্তু বিভিন্ন সোর্স থেকে ভিকটিমদের সম্পর্কে আমরা এখনও পর্যন্ত যেটুকু জেনেছি, তাতে সকলেই ধোয়া তুলসীপাতা ছিলেন, এমন নয়। যেমন অনিরুদ্ধ মল্লিক। সন্দীপ দাসের কাছে জেনেছি তার জন্য একটি মেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল। আবার বিলাল শেখ একজন স্মাগলার ছিল। তারপর সুখেন্দুশেখর। আমার ধারণা, ভদ্রলোকের সব আয় সোজা পথে হত না। মানে পুলিশে চাকরি করে যারা সকলেই তো আর সাধু নয়…’

‘শুধু তোমার বয়ফ্রেন্ড ছাড়া,’ ফিক করে হেসে বলল মিতুল।

‘তুই থামবি? অর্জুন আমার বয়ফ্রেন্ড নয়।’

‘তাহলে কী! তোমার এই ধরি মাছ না ছুঁই পানি খেলাটা কদ্দিন চলবে টাপুরদি? বেচারাকে এভাবে দগ্ধে মারছ, দয়ামায়া নেই তোমার?’

‘আবার? তুই বসে থাক। আমি গেলাম শুতে।’

‘আচ্ছা আচ্ছা বাবা, বলো কী বলছিলে।’ টাপুরের হাত ধরে বলল মিতুল। ‘দেখো, ভিকটিমরা খারাপ মানুষ হতে পারে, কিন্তু সেটা কখনোই মার্ডার জাস্টিফাই করে না।’

‘অবশ্যই করে না। তবে একজন সিরিয়াল কিলারকে কখনোই আমি সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ বলতে পারি না। সুতরাং এরকম আশাও করতে পারি না যে সে সব কিছু লজিক্যালি জাস্টিফাইড কাজ করবে। লোকটা অসুস্থ। অবশ্যই অসুস্থ। কিন্তু কেন? তার এরকম মানসিক অবস্থার জন্য দায়ী কি তাহলে এই ভিকটিমরা?’

‘হতে পারে। আবার সত্যি বলতে কি, মানসিকভাবে অসুস্থ হওয়ার জন্য সেভাবে কোনো কারণ বোধ হয় লাগে না। এক বা একাধিক ইনসিডেন্ট সিম্পটমসগুলোকে ট্রিগার করতে পারে। কিন্তু রোগটা আগে থেকেই থাকে। হয়তো পরিবেশ, বা হেরিডিটি। আপাতত খুনি কে সেটা না জানলে, অ্যাট লিস্ট খুনির সঙ্গে ভিকটিমের কানেকশন এস্টাব্লিশ করতে না পারলে ফারদার খুন থামাবে কীভাবে? পুলিশই বা কী করবে এক্ষেত্রে?’

টাপুর হাতে মুখ গুঁজে ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর মুখ তুলে বলল, ‘সেটাই তো রে। খুনির পরিকল্পনা একেবারে যাকে বলে ফ্ললেস। এক্সিকিউশনও তাই। কোনো সূত্র ছাড়ছে না যা দিয়ে পুলিশ এগোতে পারে। হোক না হোক, এইসব খুনের সূত্র এই ভিকটিমদের অতীতেই লুকিয়ে আছে। কিন্তু সমস্যা হল, সময় খুব কম। অর্জুনকে সাহায্য করতে হলে বাড়িতে বসে থেকে কাজ হবে না।’

‘কী করবে তাহলে, কিছু ভেবেছ?’

মুচকি হাসল টাপুর। বলল, ‘ভাবছি। কতটা লাভ হবে জানি না। তবে চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী! বাই দ্য ওয়ে, আজ দুই তারিখ তো? মানে অর্জুনদের হাতে পাঁচ তারিখ অবধি সময় আছে।’

‘হুম, তার মধ্যে তুমি ঠিক মিস্ট্রি সলভ করে ফেলবে।’ বলল মিতুল।

‘যদি না এর মধ্যে আবারও কোনো খুন হয়।’

২৯

২রা জানুয়ারি, রাত ১ঃ৩০

দেবাশীষ দত্ত নিউটাউনে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। একটি ছোটো কোম্পানির বিপিও-তে সাধারণ কর্মী হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেছিল বছর দশেক আগে। লেখাপড়ায় মাঝারি মানের ছাত্র সে। কিন্তু মানুষ হিসেবে দেবাশীষ যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী। বিশেষত সুযোগ চিনে নিতে অসুবিধে হয় না তার। বারবার কোম্পানি বদলেছে এই ক-বছরে। পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ছোটোখাটো একটা নামি মাল্টিন্যাশনাল বিপিও-র মাঝারি মাপের প্রোজেক্টের ম্যানেজার সে। গত বছর বরানগরের দিকে ফ্ল্যাট কিনেছে। একটা চারচাকাও কেনা হয়েছে গিন্নির ইচ্ছানুসারে।

ল্যাপটপটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল দেবাশীষ। একটি আমেরিকান কোম্পানির জন্য কাজ করে তাদের টিম। কাজ শুরু হয় দুপুরের পরে। তাই অফিসেও আসে দুপুর দুটোর পরেই। তবে কাজ শেষ হতে হতে প্রায়ই মধ্যরাত গড়ায়। সাধারণত রাত বারোটার আগেই বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু পরের সপ্তাহে মার্কিনি ক্লায়েন্ট ভিজিটে আসবে। কাজের চাপ তাই একটু বেশিই। আজ খুব দেরি হয়ে গেল।

ওয়াশরুম থেকে ঘুরে এসে পাশের কিউবিকলে ঘাড় গুঁজে কাজ করে চলা শ্যামল নামের জুনিয়ার ছেলেটিকে বলল, ‘চলি রে। কাল তোর কোন শিফট?’ শ্যামল বলল, ‘কাল তো ডে অফ আমার। তোমাকে তো বলেছিলাম দেবাশীষদা। ছেলেটাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।’

দেবাশীষের মুখ গম্ভীর হল। ডাক্তার না আর কিছু। নিশ্চয়ই অন্য কোনো কোম্পানিতে ইন্টারভিউ আছে। ভারী প্যাকেজ। ভালো জবপ্রোফাইল। এসব খেলায় দেবাশীষ নিজে প্রথম সারির খেলুড়ে। দশ বছরে চারটে কোম্পানি বদলেছে। প্রতিবারই কেরিয়ারের সিঁড়ি বেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠেছে। সুতরাং এসব অজুহাত ধরতে তার সময় লাগে না। বলল, ‘জানিসই তো এখন কীরকম চাপ চলছে। দম ফেলার ফুরসত নেই। এখন এভাবে ছুটিছাটা করলে এর প্রভাব কিন্তু অ্যাপ্রাইজালে পড়বে। তখন ঘ্যানঘ্যান করতে আসিস না।’

শ্যামলের মুখে কেউ যেন এক পোঁচ কালি লেপে দিল। বলল, ‘সত্যি বলছি দেবাশীষদা। আজ পাঁচদিন হয়ে গেল ছেলেটার জ্বর নামছে না। অ্যান্টিবায়োটিক খাইয়েও লাভ হচ্ছে না। পেটের ব্যথায় ছটফট করে। রাতে ঘুমোতে পারে না। পাড়ার ডাক্তারবাবুকে দেখাচ্ছিলাম। তিনিই একজন পিডিয়াট্রিশিয়ানকে রেফার করলেন। কালই অ্যাপোয়েন্টমেন্ট পেয়েছি।’

দেবাশীষ কাঁধ ঝাঁকাল। কাল তার শ্যালিকার বিবাহবার্ষিকী। সন্ধের পর পার্টিতে যেতে হবেই। বউকে তবু বোঝানো যায়, শালিকে চটাবে কে! শ্যামল ছুটির কথা বলেছিল বটে, কিন্তু তখন আগামীকালের পার্টির কথাটা মাথায় ছিল না। এখন শ্যামলকে কাল ছুটি দিতে হলে ওর ভাগের কাজটাও তাকেই ওঠাতে হবে। সামনেই একটা মডিউল ডেলিভারি আছে। প্রচুর ওয়ার্কলোড। মনটা তিতকুটে হয়ে গেল দেবাশীষের। বলল, ‘বাচ্চাকাচ্চা থাকলে অসুখবিসুখও থাকবেই। সেজন্য যদি অফিস ছুটি করতে হয়, তাহলে চাকরি করার দরকার কী! মাস শেষ হতে এল। তোর টিম এখনও টারগেট থেকে অনেক দূরে। তার দায় কে নেবে? তোর ছুটি পাওনা আছে। সে তুই নিতেই পারিস। কিন্তু প্রোজেক্ট হেড হিসেবে সেক্ষেত্রে তোর ইররেসপনসিবিলিটির কথা আমাকেও হায়ার অথোরিটিকে জানাতে হবে। তখন কিন্তু কাঁদুনি গেয়ে লাভ হবে না

শ্যামল মাথা নীচু করে কাজ করতে লাগল। আঙুলগুলো কিবোর্ডের উপর নড়াচড়া করছে যন্ত্রের মতো। অপমান, অসহায়তায় চোখের পাতায় জলবিন্দু টলটল করছে তার। কিন্তু সেটাকে গড়িয়ে পড়তে দেয় না সে।

শ্যামলকে কথাগুলো শোনাতে পেরে মনে মনে বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব করল দেবাশীষ। ব্যাগটা কাঁধে তুলে কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে গিয়ে লিফটের সামনে দাঁড়াল। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে একবার হোয়াটস্যাপ মেসেজটা চেক করল সে। প্রথম মেসেজটাই স্ত্রী সুনৃতার। গুড নাইট মেসেজ করেছে পৌনে বারোটায়। এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে ও। সকালে মিঠাইয়ের স্কুল থাকে। ভোরে উঠতে হয় ওকে। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সেই কেমন গিন্নিবান্নি হয়ে উঠেছে সুনৃতা। মিঠাইয়ের জন্মের পর থেকে ওজন বেড়েছে হু-হু করে। সামনের দিকের চুল উঠে কপাল চওড়া। সবসময় কেমন আগোছালো থাকে। এই নিয়ে অনেকবার বলেছে দেবাশীষ। বুঝিয়েছে, ‘চেহারার একটু যত্ন নাও। জিমে ভর্তি হও দরকার হলে। পার্লার টার্লারে যাও।’ কে শোনে কার কথা। সুনৃতার শুধু এক জবাব। অত সময় কোথায়!

কথাটা মনে হয়েই বিরক্তিতে মুখের রেখাগুলি কুঁচকে যায় দেবাশীষের। সুনৃতা পাশাপাশি মনের পটে ভেসে ওঠে আরেকটি হাসিমুখ। তার শ্যালিকা সেবন্তী।

মাত্র দেড় বছরের তো ছোটো সুনৃতার চেয়ে। অথচ শরীরটাকে এখনও পঁচিশ ছাব্বিশের কোঠায় বেঁধে রেখেছে। সরু কোমর, ভারী বুক ও নিতম্ব। মোমের মতো মসৃণ ত্বক। চটুল হাসি, চকিত কটাক্ষ। অমন দেবভোগ্য নারী কি না গিয়ে পড়েছে অনিমেষের মতো পুরুষের নিরস হাতে। অধ্যাপক মানুষ। বই পড়ে পড়ে চোখে মোটা কাচের চশমা। সেই কাচ ভেদ করে নারীর রূপ-যৌবন তার চোখে ধরা পড়ে না।

‘ওয়েস্টেজ। আ কমপ্লিট ওয়েস্টেজ অফ হেভেনলি বিউটি!’ নিজের মনেই বলে দেবাশীষ। আজকাল সেবন্তী দেবাশীষকে একটু বেশিই গুরুত্ব দেয়, বোঝে দেবাশীষ। দিদির অনুপস্থিতিতে ঘনিষ্ঠ হতে চায়। হোয়াটস্যাপে দ্বৈত অর্থবহনকারী মেসেজ আসে। দেবাশীষও উত্তর দেয়। মাঝেমধ্যে শপিং মল বা কফিশপে দেখা করে তারা। হাতে হাত রাখে। কখনও বা দেবাশীষের চঞ্চল আঙুল ছুঁয়ে যায় সেবন্তীর উন্মুক্ত কটিদেশ। এই পর্যন্তই। এর চেয়ে বেশি দুজনের কেউই এগোয় না। এ তাদের দুজনের গোপন খেলা। অন্যদিন রাতে শুতে যাওয়ার আগে একটা মেসেজ অন্তত আসে সেবন্তীর কাছ থেকে। আজ আসেনি। হয়তো অনিমেষ সঙ্গে ছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে দেবাশীষের বুক থেকে।

লিফট সোজা গিয়ে নামল আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং-এ। নিজেই ড্রাইভ করে দেবাশীষ। গাড়ি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এমন সময় পকেটের ভেতর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। গাড়ি চালানোর সময় সাধারণত ফোন রিসিভ করে না দেবাশীষ। কিন্তু এত রাতে কে ফোন করতে পারে! ভাবনাটা মস্তিষ্কের দেওয়ালে চুড়বুড়ি কাটছে। আবার ফোন। গাড়িটা সিগনালে দাঁড়াতেই পকেট থেকে ফোনটা বের করল দেবাশীষ। সেবন্তীর ফোন। এত রাতে! এখনও ঘুমোয়নি ও!

‘হ্যালো!’

‘আপনি কি দেবাশীষ দত্ত বলছেন?’ অচেনা পুরুষকণ্ঠ শুনে দেবাশীষের ভুরু কোঁচকাল।

‘হ্যাঁ বলছি। আপনি কে? সেবন্তীর ফোন আপনার কাছে গেল কীভাবে?’

‘আমি বিধাননগর পুলিশ স্টেশন থেকে বলছি। উল্টোডাঙা ফ্লাইওভারের নীচে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। গাড়িতে একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন। তারই ফোনে লাস্ট ডায়ালড নম্বর থেকে আপনাকে ফোন করছি। ব্যাগে আই কার্ডে নাম লেখা আছে সেবন্তী পাল। আপনি কি এখানে আসতে পারবেন?’

‘আমি আসছি এখনই।’

সেবন্তীর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে! মাথা কাজ করছে না দেবাশীষের। এত রাতে কোথায় যাচ্ছিল ও! কী আশ্চর্য! সেইজন্যেই আজ রাতে মেসেজ করেনি। গাড়ির স্পিড বাড়াল দেবাশীষ। উল্টোডাঙা ফ্লাইওভারটা যেদিকে ভি আই পি রোড থেকে ই এম বাইপাসের দিকে টার্ন নিয়েছে, সেখানেই চোখে পড়ল সাইড করে দাঁড় করানো গাড়িটা। পাশে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। এটা কার গাড়ি! অনিমেষের তো নয়! তবে কি সেবন্তী অন্য কারো সঙ্গে ছিল?

গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল দেবাশীষ ভদ্রলোকের দিকে।

‘আপনি ফোন করেছিলেন? অ্যাক্সিডেন্টের কথা বলেছিলেন?’

ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন। পুলিশের পোশাক নেই পরনে। নীল জিনস আর কালো হুডি। বললেন, ‘আমিই ফোন করেছিলাম। ভদ্রমহিলা বেঁচে আছেন। চিন্তা নেই। সামনে বাইপাসের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপনি কি যাবেন সেখানে?’

মাথা নাড়ল দেবাশীষ। ‘আমি তাহলে আমার গাড়িতে যাচ্ছি। আপনি?’

‘আপনাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্যেই তো অপেক্ষা করে আছি আমি।’ কথাটা বলে অদ্ভুতভাবে হাসলেন ভদ্রলোক।

‘মানে?’

ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন দেবাশীষের খুব কাছে। অবাক হওয়ার সময় পেল না দেবাশীষ। পেটের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা টের পেল সে। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল পেটের কাছে শার্টটা রক্তে ভিজে উঠেছে। সামনে দাঁড়ানো লোকটার মুখে তৃপ্তির হাসি। আবারও দেবাশীষের পেটের মধ্যে আমূল বিঁধে গেল লোকটার হাতে ধরা ছুরি। আবারও। হাঁটু ভেঙে রাস্তাতেই বসে পড়ল দেবাশীষ। ধীরে ধীরে তার শরীরটা হেলে পড়ল একদিকে।

সামনের লোকটা আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল একইভাবে। তারপর দেবাশীষের মৃত শরীরটার পাশে বসে একটা ভোঁতা ক্ষুর দিয়ে গলাটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চিরে দিল এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত। তারপর পকেট থেকে সেবন্তীর মোবাইল ফোনটা বের করে মৃতদেহের পাশে রেখে দিল যত্ন করে। এটা জোগাড় করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে। হাসল নিজের মনেই। লকড ফোন থেকে কল করা সম্ভব ছিল না। সিম বের করে অন্য ফোনে ভরে কাজটা করতে হয়েছে। অথচ দেবাশীষ দত্ত সেটুকু সম্ভাবনাও ভেবে দেখেনি।

ভাগ্য! একেই ভাগ্য বলে! আর বেশি পথ বাকি নেই। বাকিটুকু ভাগ্য তার সঙ্গেই থাকবে, জানে লোকটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *