প্রলয় ঘূর্ণি – ৫০

৫০

জায়গাটা পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। মিতুল একটি গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে চোখ বন্ধ করে। অর্জুন জলের বোতল বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীরভাবে বলল, ‘জল খাও মিতুল। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।’

মিতুল চোখ তুলে তাকাল অর্জুনের দিকে। ওর দুই চোখে অশ্রুবিন্দু টলটল করছে। অর্জুনদা এভাবে কোনোদিন কথা বলেনি তার সঙ্গে। আজ তার জন্য টাপুরদি হারিয়ে গেছে। কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, কেউ জানে না। অর্জুনদার দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মিতুল! টাপুরদির কিছু হয়ে গেলে সে কীভাবে নিজেকে ক্ষমা করবে! কীভাবে আর কোনোদিন অর্জুনদার মুখোমুখি দাঁড়াবে! চোখে চোখ রাখবে!

প্রচন্ড কষ্টে দম আটকে আসতে চায় মিতুলের। বিপদটা যখন সে বাঁধিয়েছে, টাপুরদিকে খুঁজেও সে-ই বের করবে। করতেই হবে তাকে। সে বলল, ‘আমি বাড়ি যাব না অর্জুনদা। অন্তত যতক্ষণ না টাপুরদিকে ফিরে পাচ্ছি, ততক্ষণ যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যদি তুমি জোর করো, আমাকে তোমাদের সঙ্গে না নিতে চাও, সেক্ষেত্রে আমি এখানেই অপেক্ষা করব। কিন্তু বাড়ি ফিরে যাব না কিছুতেই।’

‘টাপুরের মোবাইল ফোন ঘরের ভেতর পাওয়া গেছে। ও কোথায় আছে আমরা জানি না। তুমি কি বুঝতে পারছ মিতুল, যে কত বড়ো বিপদ বাধিয়েছ তুমি? তুমি জেদ না করলে আজ টাপুরকে এই অবস্থায় পড়তে হত না। তারপরেও…!’ চাপা গলায় ধমকে ওঠে অর্জুন। তাকে এভাবে কথা বলতে কোনোদিন শোনেনি মিতুল। এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা অশ্রু বাঁধ ভেঙে ঝরোঝরো ধারায় নেমে আসে তার গাল বেয়ে।

অর্জুন এবার নিজের ভুল বুঝতে পারে। কণ্ঠস্বর নরম করে বলে, ‘টাপুরকে আমরা খুঁজে বের করব মিতুল। তুমি বাড়ি যাও। তোমার বাবা-মায়ের এইসময়ে তোমাকে দরকার। আর হ্যাঁ, তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, টাপুরের কিছু হবে না। আজ অবধি যতবার বিপদে পড়েছে ও, সব কাটিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এবারও আসবে। তাছাড়া এখন কেস অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। আমাদের সিরিয়াল কিলার অলরেডি ডেড। কে তাকে হত্যা করল, কেন করল জানি না আমরা। বিপদ এখনও তাই কমেনি। এই অবস্থায় তোমার এখানে থাকা ঠিক নয়।’

মিতুল মাথা নাড়ল। বলল, ‘আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি। তুমি বললে আমি গাড়িতেই বসে থাকব। কিন্তু ফিরব না। আমাকে জোর কোরো না অর্জুনদা।’

অর্জুন হতাশ মুখে কাঁধ ঝাঁকাল। মিতুল জেদ করছে। ও নিজেকে আজকের অবস্থার জন্য দায়ী করছে, বোঝে অর্জুন। কিন্তু এই মুহূর্তে অর্জুনের নিজের ভেতরে যে কী চলছে, তা কাকে সে বোঝাবে! টাপুর নিরুদ্দেশ। সে কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে কেউ জানে না। তবু তাকে অবিচল থাকার অভিনয় করে যেতে হচ্ছে। এই মহানগরের নগররক্ষক হওয়ার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে অনুদ্বিগ্নমুখে।

ভেতরে ফরেনসিকের টিম কাজ করছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সঞ্জয় পালের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হবে পোস্ট মর্টেমের জন্য। বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে অর্জুনের। গত ক-দিনে এই মানুষটার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাকে কিছুটা চিনেছিল অর্জুন। অন্তত তার মনে হয়েছিল, সে চিনেছে। ভাবতেও পারেনি, যেটুকু জেনেছে, তা মগ্নমৈনাকের মাত্র চূড়াটুকু। সাগরের অতলে ঢাকা বাকিটুকুই আসল সঞ্জয় পাল। তবু সেই স্বল্প চেনাটুকুই এই মুহূর্তে মনে পড়ে যায় অর্জুনের। হাসিখুশি, বন্ধুভাবাপন্ন একজন মানুষ। পুলিশের চাকরির বাধ্যবাধকতা, উপরওয়ালার নির্দেশমতো চলতে হওয়া নিয়ে অভিমান ছিল। সেই অভিমান বারবার উঠে আসত তার কথায়। একবার বলেছিল, মা আছেন বাড়িতে। প্রতিবেশীরাও তাই-ই জানিয়েছে। সঞ্জয়ের মায়ের সঙ্গে আজই তো দেখা হয়েছিল সেই বুড়ির বাড়িতে। বুড়ির আয়া কমলা। তখন যদি বুঝতে পারত যে কমলাই আসলে অনিতা পাল, তাহলে কি তদন্তের গতিপ্রকৃতি অন্যরকম হত? অনিতা পালকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তখনও আটকানো যেত হয়তো সঞ্জয় পালকে।

কী হলে কী হত ভেবে লাভ নেই এখন। সঞ্জয় পালকে আটকাতে পারেনি তারা। তার বাড়িতে যাওয়ার আগে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি যে যাকে তারা সারা কলকাতা জুড়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছে, সে তাদের নাকের ডগায় বসে সারা ডিপার্টমেন্টের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে।

‘অর্জুনদা, সঞ্জয় পাল এভাবে এতগুলো খুন কেন করল?’ জিজ্ঞাসা করল মিতুল।

অর্জুন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল, ‘সব কথা এখনও জানি না আমরা। কিন্তু যেটুকু জেনেছি তাতে সঞ্জয়ের মধ্যে তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়েছিল। তার জীবন সহজ ছিল না। যাদের সে ভালোবাসত, তাদের সকলকে হারাতে হয়েছে একে একে। কীরকম তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, ভাবতে পারো মিতুল? চোখের সামনে একে একে বাবা, ভাই, প্রেমিকা, নিজের সন্তান সকলকে চলে যেতে দেখার মতো কষ্ট সহ্য করতে হলে যেকোনো মানুষই ভেঙে পড়বে। সঞ্জয় হয়তো সেইসব মৃত্যুকে নিয়তি বলে মেনে নিতে পারত, যদি সেগুলি স্বাভাবিক মৃত্যু হত। কিন্তু তা তো হয়নি। নয়ন আমাদের জানিয়েছে, সঞ্জয়ের বাবা তাদের ছোটোবেলায় সিরিয়াল কিলারদের গল্প বলতেন। সঞ্জয়ের মনেও হয়তো সিরিয়াল কিলারদের নিয়ে কোনোরকম ফ্যান্টাসি তৈরি হয়েছিল, অনেকটা হিরো ওয়ারশিপের মতো। সে নিজের মতো করে তাই প্রতিশোধ নিয়েছে।’

‘কিন্তু সঞ্জয় পালকে কে খুন করল তাহলে?’ মিতুল জিজ্ঞাসা করল। অর্জুন মাথা নাড়ল। বলল, ‘জানি না। বুঝতে পারছি না।’

‘অর্জুন…’, বাড়ির ভেতর থেকে উচ্চস্বরে ডাক শুনে অর্জুন সেদিকে এগিয়ে গেল। ফরেনসিকের ডক্টর মৃন্ময় সেন অকুস্থল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ঘরের ভেতরে ইমার্জেন্সি আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই আলোয় যতটুকু পরিদর্শন সম্ভব করেছেন তিনি। মধ্যরাতে ঘুম ভাঙিয়ে প্রৌঢ় মানুষটিকে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।

‘কী বুঝলেন?’ আগ্রহী গলায় জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘ভেতরে ইমার্জেন্সির আলোয় খুব বেশি ভালো করে দেখা গেল না। সম্ভবত কটে শুয়ে ছিল ভিকটিম। বুকে ছুরি বসানো হয়েছে সেটা তো স্পষ্টই। ছুরির আঘাতেই উলটে মেঝেতে পড়েছে। কিন্তু …’

‘কী কিন্তু?’

ডক্টর সেনকে একটু অন্যমনস্ক দেখাল। স্বগোতক্তির ঢঙে বললেন, ‘যা খোলা চোখে সত্য বলে মনে হয়, তাই কি হয় সবসময়ে? জানি না। ল্যাবে নিয়ে গিয়ে দেখতে হবে।

‘আপনাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।’বলল অর্জুন, ‘আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। কাল পোস্ট মর্টেমের পর জানাব।’

‘না।’

অর্জুন অবাক হল। ‘কী না?’

‘পোস্ট মর্টেমের জন্য কোথায় পাঠাচ্ছ? মেডিকেলে?’

‘হ্যাঁ। সেখানেই জানানো হয়েছে। বডি পাঠাচ্ছি।’

‘কে করবে?’

‘বলতে পারব না এখনও। এই মাঝরাতে আদৌ কাউকে পাওয়া যাবে নাকি কাল সকালে করা হবে তাও জানি না।’

ডক্টর সেন একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘ডক্টর বিতান মুখার্জিকে অ্যাসাইন করতে বলো। ও আমার স্টুডেন্ট। আমি ফোন করে দিচ্ছি। ও পৌঁছে যাবে। পোস্ট মর্টেমের সময় আমিও থাকব সঙ্গে। আমার থাকা দরকার।’

অর্জুন মাথা নাড়ল। কেন দরকার, এই খুনের মধ্যে কী এমন দেখলেন ডক্টর সেন যাতে এই মধ্যরাতেই বডি কাঁটাছেঁড়া করতে চাইছেন নিজে হাতে, সেটা বোধগম্য হল না তার। তবু বলল, ‘হয়ে যাবে। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আপনি কি সোজা তাহলে মেডিকেলে যাবেন এখন? নয়ন তাহলে আপনাকে পৌঁছে দিক।’

‘ডোন্ট ওয়ারি মাই বয়। আমি নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছি। ড্রাইভার আছে সঙ্গে। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। তুমি শুধু বিতানকে অ্যাসাইন করার ব্যবস্থা করে দাও।’

‘ওকে স্যার।’

ভেতর থেকে সঞ্জয় পালের মৃতদেহ বের করে আনা হচ্ছে স্ট্রেচারে শুইয়ে। সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর। আজ দুপুরেও এই মানুষটা বেঁচে ছিল। অর্জুনের সঙ্গে একসঙ্গে ড্রাগ ডিলারদের অ্যারেস্ট করেছে। অথচ এই মুহূর্তে তার শরীরটা নিথর হয়ে শুয়ে আছে। সঞ্জয় পাল, কলকাতা কাঁপানো সিরিয়াল কিলিং কেসের অপরাধী, একজন ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার এই মুহূর্তে বেঁচে নেই আর। তবু কেস শেষ হল না। আজ রাতেই হয়তো সাংবাদিক বৈঠক হবে। তাতে অবধারিতভাবে অনেক প্রশ্নের উত্তর থাকবে না পুলিশের কাছে। তাতে এই মুহূর্তে কিছু যায় আসে না অর্জুনের। টাপুর কোথায় আছে, কেমন আছে, সেই উত্তর খোঁজাটা এখন তার জন্য বেশি জরুরি।’

পকেটের ভেতর থেকে ফোনটা বাজছে। ডিসিডিডি স্যারের ফোন।

‘হ্যালো স্যার। আমি স্পটেই আছি। বডি মেডিকেলে পাঠাচ্ছি।’ কেজো গলায় জানাল অর্জুন।

‘ছাড়ো ওসব। তুমি লালবাজারে এসো। সঞ্জয় পালের খুনি সারেন্ডার করেছে।

‘মানে? কে?’ বিস্ময়ে প্রশ্নটা ছিটকে বের হল অর্জুনের গলা থেকে।

‘সন্দীপ দাস। অনিরুদ্ধ মল্লিকের প্রেমিক। সে নাকি সঞ্জয় পালকে আগে থেকেই চিনত। জানত, যে মেয়েটিকে ওরা অ্যাবিউজ করেছিল, সঞ্জয় পাল তার প্রেমিক ছিল। তাই কিছুদিন আগে থেকে কন্টিনিউয়াস সঞ্জয়কে ও ফলো করতে শুরু করে। তখন ও বুঝতে পারে যে সঞ্জয় পালই সিরিয়াল কিলার। অনিরুদ্ধকেও সঞ্জয়ই খুন করেছে।’

‘এসব কথা পুলিশকে জানাননি কেন উনি?’

‘বলছে, অনিরুদ্ধর হত্যাকারীকে নিজে হাতে শাস্তি দিতে চেয়েছিল সে। সেই কারণেই…! যাই হোক একটা প্রেস কনফারেন্সের ব্যবস্থা হয়েছে। তোমার থাকা দরকার।’

অর্জুন থমকাল এক মুহূর্ত। তারপর বলল, ‘কেস তো এখনও শেষ হয়নি স্যার। বিধায়ক সুভাষ শরখেল এখনও মিসিং। তার চেয়েও বড়ো কথা, সংঘমিত্রা মিসিং। ওর কোনো ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় কেস ছেড়ে আমি আসতে পারব না স্যার। সরি।’

সৌরভ সান্যাল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘অর্জুন, সংঘমিত্রাকে আমার চেয়ে তুমি অনেক ভালো চেনো। জানো। তবু ভয় পাচ্ছ?’

‘পাচ্ছি স্যার।’

৫১

পেছনে ধুপ করে শব্দটা শুনে ঘুরে তাকিয়েছিল টাপুর। মৃদু আর্তনাদ। তারপরে সব নিস্তব্ধ।

‘মিতুল!’ ছুটে এল টাপুর। হাঁটু গেড়ে উবু হয়ে বসল মিতুলের পাশে। অন্ধকারে দৃষ্টি চলে না। স্পর্শ করে বুঝতে চেষ্টা করল পরিস্থিতিটা কী! নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখল। নিঃশ্বাস পড়ছে। কিন্তু কী হল! কীভাবে আঘাত পেল মিতুল। নাকি কেউ ওকে আঘাত করল!

সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল সে।

‘কে এখানে? কথা বলুন। বলুন কে আছেন? আমি জানি এখানে কেউ আছেন। বলুন, কে আছেন এখানে?’

সাবধানে পা টিপে টিপে এগোচ্ছে টাপুর। হঠাৎই জমাটবাঁধা অন্ধকার পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। টাপুরও বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করার মানুষ নয়। তবে আক্রমণকারী বেশ লম্বা, বলশালী। পেছনে রয়েছে বলে টাপুর ঠিক কবজা করতে পারছে না। সেই অবস্থাতেই হাঁফাতে হাঁফাতে জিজ্ঞাসা করল, ‘কে আপনি? আপনিই সেই সিরিয়াল কিলার?’

এবার আততায়ী মুখ খুলল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আপনি এখান থেকে চলে যান। এসবের মধ্যে নিজেকে জড়াবেন না।’

কণ্ঠস্বর শুনে মনে হল লোকটা মধ্যবয়স অতিক্রম করেছে। আরও বেশি হতে পারে। ভারী গলা। এই বয়সের লোককে কবজা করতে টাপুরের অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। সমস্যা হচ্ছে উচ্চতা নিয়ে। লোকটা দীর্ঘদেহী হওয়ার কারণে এবং অন্ধকারের জন্য টাপুর চেষ্টা করেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না।

চোয়াল শক্ত হল টাপুরের। গভীর নিঃশ্বাস নিল। তারপর কনুই দিয়ে লোকটার তলপেটে আঘাত করল সজোরে। লোকটা ‘আঁক্’ করে উঠল চাপাস্বরে। কিন্তু ছাড়ল না। তবে কাবু যে সে হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। লোকটা হাঁফাচ্ছে অল্প অল্প। কিন্তু টাপুরকে ছাড়েনি। টাপুর বুঝল গায়ের জোরে সে লোকটার সঙ্গে পারবে না। সুতরাং অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। প্রসঙ্গ বদলে সে বলল, ‘আপনি মিতুলকে মারলেন কেন? ও আপনার কী ক্ষতি করেছে? আপনি ভাবলেন কীভাবে যে ওকে এখানে এভাবে ফেলে রেখে আমি চলে যাব?’

‘আপনার সঙ্গীর কিছু হবে না। রণজয় সেন বেঁচে আছেন। ও-ও বেঁচে থাকবে। জ্ঞান ফিরলে বাড়ি পৌঁছে যাবে। আপনি চলে যান এখান থেকে।’ লোকটা বলল। হাসল টাপুর। ‘আপনি একজন খুনি। এতগুলো মানুষকে খুন করেছেন। আপনাকে আমি বিশ্বাস করব? আশ্চর্য!’

‘আমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া এই মুহূর্তে আপনার হাতে দ্বিতীয় কোনো চয়েজ নেই মিস ব্যানার্জি। যে কাজ শুরু হয়েছে, তা শেষ করতেই হবে। মাঝখান থেকে আপনি বিপদে পড়ে যাবেন। আপনার কোনো ক্ষতি করার ইচ্ছে সত্যিই আমার নেই।’

কথা বলতে বলতে লোকটি একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল বোধ হয়। সেই মুহূর্তে তার হাত সামান্য আলগা হল। এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল টাপুর। মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটির চোয়াল লক্ষ করে এক ঘুষি চালাল অন্ধকারে। তবে লোকটিও কম যায় না। ওইটুকু মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছে। মুখটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। উচ্চতার কারণে টাপুরের ঘুষি তার চোয়ালের নীচে গিয়ে লাগল। টাল সামলাতে না পেরে টাপুরকে ছেড়ে পাশের দেওয়ালটা ধরে ফেলল লোকটা। টাপুর ডান পায়ে ভর করে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে প্রচন্ড শক্তিতে লাথি মারল লোকটার পেটে। লোকটা পেট চেপে ধরে বসে পড়ল মেঝের উপর।

এই সুযোগ! এখান থেকে বেরোতে হবে। লোকটাকে এই ঘরে বন্ধ করে রেখে অর্জুনকে ফোন করলে সে এসে সহজেই অ্যারেস্ট করতে পারবে। কিন্তু মিতুল এখনও অজ্ঞান। তাই ওকে নিয়ে বেরোনোটা কঠিন। লোকটা পেট ধরে বজ্রাসনের ভঙ্গিতে বসে মাথাটা মেঝেতে ঠেকিয়ে রেখেছে। এখন আর নড়ছে না। একটু অস্বস্তি বোধ করল টাপুর। কিছু হয়ে টয়ে গেল না তো লোকটার! সামনে এগিয়ে দেখতে গেল সে। না, এখনও নড়ছে না বিন্দুমাত্র। লোকটা এই অবস্থায় থাকতে থাকতেই মিতুলকে নিয়ে তার বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু যদি লোকটা অমন করে বসে আছে কেন! লাথিটা বেশ জোরেই মেরেছে টাপুর। যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়।

টাপুর পায়ে পায়ে আরেকটু এগোল। অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে মাথা নীচু করল ভালোভাবে দেখার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে লোকটা তড়িৎবেগে হাত বাড়িয়ে টাপুরের পা চেপে ধরল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দিল এক হ্যাঁচকা টান। টাপুর টাল সামলাতে না পেরে আছাড় খেয়ে পড়ল। মাথাটা সজোরে ধাক্কা খেল সিমেন্টের মেঝেতে। ঠিক সেই মুহূর্তে সে টের পেল লোকটা তার মুখে রুমাল জাতীয় কিছু চেপে ধরেছে। মিষ্টি একটা গন্ধ। তারপর আর কিছু মনে নেই তার।

.

জ্ঞান ফিরে এলে চারপাশে কী ঘটছে বুঝতে অসুবিধে হল টাপুরের। ক্লোরোফর্মের প্রভাবে মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ঘুমের আবেশ সারা শরীর জুড়ে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কালো জলে ডাহুক পাখির মতো ডুব দিচ্ছে তার চেতনা। মাথার ভেতর শব্দ উঠছে গুব গুব গুব।

প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে ঘুমের ঘোর ছিন্ন হল সহসাই। জোরে জোরে হর্নের শব্দে ধড়মড়িয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল টাপুর। আর ঠিক তখনই সে উপলব্ধি করতে পারল যে তার হাত-পা, মুখ সবই বাঁধা। গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে রাখা হয়েছে তাকে। শরীর বাঁকিয়ে চুরিয়ে প্রতিবাদ করতে চাইল টাপুর। গলা দিয়ে একটা জান্তব গোঙানির মতো শব্দ ছাড়া আর কিছু বেরোল না। বাঁধা পা-দুটি দিয়ে পেছনের দরজায় ধুপ ধুপ করে লাথি মারার চেষ্টাও করল টাপুর। সামনের ড্রাইভিং সিটের ব্যক্তিকে তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত বলে মনে হল না।

এই অবস্থায় মাথাঠান্ডা রাখা দরকার। দেখাই যাক না লোকটা কোথায় যাচ্ছে, কী করতে চায় তাকে নিয়ে! এভাবেই প্রায় পনেরো মিনিট চলার পর টাপুরের মনে হল, গাড়িটা বড়ো রাস্তা ছেড়ে কোনো গলির মধ্যে ঢুকছে। রাস্তার আলো কমে এসেছে। আশেপাশে গাড়ির শব্দও কম। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে জায়গাটাকে। একসময় গাড়িটা থেমে গেল। লোকটা ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে নেমে এল। পেছনের দরজা খুলে টাপুরের ৫৪ কেজির শরীরটা পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। অনাত্মীয় পুরুষস্পর্শে টাপুরের শরীর সংকুচিত হল ঘৃণায়। দুই ভুরুর মাঝে ভাঁজ পড়ল। একবার শরীরটা ঝাঁকুনি দিল। তাতে অবশ্য লোকটার বাহুবন্ধনী আলগা হল না।

একটা গ্যারেজের মতো জায়গা। সামনে বেশ কিছু টু-হুইলার সার দিয়ে দাঁড় করানো। টাপুরকে মাটিতে শুইয়ে লোকটা শাটার খুলল। তারপর নীচু হয়ে টাপুরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জ্ঞান ফিরে এসেছে দেখছি। উঠুন। ভেতরে চলুন।’

দুই হাতে আবারও পাঁজাকোলা করে তুলে নিল টাপুরকে।

‘আমার পা খুলে দিন। আমি হেঁটে যাব।’

লোকটা খুক খুক করে হাসল। বলল, ‘আপনার পায়ের জোর দেখা হয়ে গেছে। তাই সেই রিস্কটা নিতে পারছি না। সরি।’

‘আমি কেন? আমাকে নিয়ে কী করতে চান আপনি?’ কঠিন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

লোকটা হাসল। বলল, ‘ভয় নেই। আপনার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য আমার নেই। করবও না। কিন্তু আপনি বড্ড বেশি নাক গলিয়ে ফেলেছেন এই কেসে। ভুল করেছেন। তাই আজকের কাজটা শেষ হওয়ার আগে আপনাকে কোনোভাবেই ছেড়ে দিতে পারি না। সাবধানে পা ফেলুন। চারদিকে জিনিসপত্র ছড়ানো।’

টাপুরের মুঠো ভাঁজ হল। অন্ধকারের চোখদুটো জ্বলে উঠল রাগে। কে জানে কেন এই মুহূর্তে তার ভয় করছে না এতটুকু। অথচ ভয় করারই তো কথা ছিল। এই লোকটাই যদি রেজর কিলার হয়, সেক্ষেত্রে যে কোনো মুহূর্তে সেও খুন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেটা নিয়ে এখন ভাবছে না টাপুর। বরং আশ্চর্য হয়ে সে উপলব্ধি করছে, এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও তার কৌতূহল হচ্ছে সবটুকু জানার জন্য। হাত বাঁধা। তাই পকেটের রিভলভারটা আছে কিনা বুঝে উঠতে পারছে না এখনও। যদি না লোকটা তার পুরো শরীর পরীক্ষা করে দেখে, তবে সেটা চোখে নাও পড়তে পারে। পুরোটাই চান্সের ব্যাপার। যা থাকে কপালে ভেবে আর আপত্তি করল না সে। লোকটার পেছনে পেছনে ভেতরে প্রবেশ করল।

ঘরের ভেতরটা অসম্ভব অগোছালো। যা ভেবেছিল তাই। এটা সম্ভবত ছোটো কোনো গ্যারেজ, যেখানে টু-হুইলার সারাই করা হয়ে থাকে। তবে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে টাপুরের মনে হল, জায়গাটা ইদানীং ব্যবহার হয় না। যন্ত্রপাতিতে ধুলো পড়েছে। রং-চটা দেওয়ালের কোণে ঝুল, মাকড়শার জাল। একটা ভ্যাপসা গন্ধ জমাট বেঁধে আছে ঘরের বাতাসে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মাথা ঝিমঝিম করে টাপুরের। ঘরের গন্ধের জন্য, না ক্লোরোফর্মের প্রভাবে, কে জানে! লোকটা যখন ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমাল দিয়ে তার নাক চেপে ধরেছিল, টাপুর নিঃশ্বাস বন্ধ করে থেকেছে যতক্ষণ সম্ভব। শেষের দিকে আর পেরে ওঠেনি। তবে সেই কারণেই হয়তো এত তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরে এসেছে তার। তবু শরীরটা বড়ো দুর্বল বোধ হচ্ছে। দুই চোখের পাতায় নাছোড় আঠালো তন্দ্ৰা।

এই ঘরের পাশে আরেকটি ঘর আছে। মাঝের দরজায় নোংরা, কালো গ্রিজ লাগা পর্দা ঝুলছে। সেদিকে তাকিয়ে টাপুরের মনে হল, ভেতরে কেউ আছে সম্ভবত। নিজে থেকে কিছু জানতে চাইল না সে।

‘বসুন।’একটা পিচবোর্ডের কার্টন দেখিয়ে বলল লোকটা। এই ঘরের আলোয় লোকটাকে দেখতে অসুবিধে হচ্ছে না টাপুরের। তবে শুধু চোখটুকুই সে দেখতে পাচ্ছে। নাক, মুখ মাস্কে ঢাকা। মাথায় হুডির টুপিটা টানা। সঞ্জয় পালকে দেখেছে সে। আজ দুপুরেই প্রথমবার সন্দেহ হয়েছিল সঞ্জয়বাবুর উপর। অর্জুনকে জানিয়েও ছিল সেই কথা। শেয়ালদায় সুবীর পালের বাড়িতে গিয়ে তারা জেনেছে টাপুরের সন্দেহ ভুল ছিল না। কিন্তু এ তো সঞ্জয় পাল নয়। তাহলে কে! তবে কি রেজর কিলার একজন নয়! লোকটার চোখের দিকে তাকাল টাপুর। আশ্চর্য!

‘আমার হাতটা খুলে দিন। নইলে বসব কীভাবে?’

লোকটা কোনো উত্তর দিল না। হাতও খুলল না। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে একটা ব্যাগপ্যাক খুলছে নিজের মনে।

টাপুর হাতবাঁধা অবস্থাতেই কার্টনের উপরে বসল। আর বসতে গিয়ে টের পেল তার রিভলভারটা নিজের জায়গায় নেই। অন্ধকারে হুটোপুটির সময় পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। কিংবা তাকে অজ্ঞান করে সরিয়ে নিয়েছে লোকটা। হতাশ বোধ করল টাপুর। একে তো হাত-পাবাঁধা, তার উপর অস্ত্র ছাড়া এরকম দুর্ধর্ষ খুনির সঙ্গে লড়বে কীভাবে সে!

মিনিট খানেক পরে উঠে দাঁড়াল লোকটা। তারপর ব্যঙ্গভরা গলায় বলল, ‘আর একটু কোয়াপারেট করুন তো ম্যাডাম। বেশি সময় লাগবে না।’

টাপুর বলল, ‘আপনার কী মনে হয়? আপনার কাজ শেষ হওয়ার পর এখান থেকে ছাড়া পেয়ে আমি পুলিশকে আপনার কথা বলব না? আপনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারবেন?

লোকটা ঘুরে দাঁড়াল। তীব্রকণ্ঠে বলল, ‘আপনাকে কে বলল আমি নিজেকে লুকোতে চাই? কিন্তু কাজ শেষ করার আগে আমার ধরা দিতে আপত্তি আছে।’

টাপুর সময় ক্ষয় করতে চায়। প্রাণপণে প্রার্থনা করে, পুলিশ এখানে এসে পৌঁছোক। তার আগে লোকটাকে আটকে রাখতে হবে। পিছমোড়া করে বাঁধা হাতটা নড়ানোর চেষ্টা করে দেখেছে সে। শক্ত বাঁধুনি। খোলা সম্ভব নয়।

‘এতগুলো মানুষকে খুন করতে আপনার হাত কাঁপল না? কেন করছেন এসব? আমি জানি, সঞ্জয়বাবুর সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। তার রাগটা তবু বুঝতে পারি। কিন্তু আপনি? আপনি কে? আপনি কেন তাঁকে সঙ্গ দিলেন এই হত্যাযজ্ঞে?’

লোকটার চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠল। তারপর খুক খুক করে হাসল। বলল, ‘সঞ্জয়! আপনার মনে হয় এসব আমি সঞ্জয়ের জন্য করেছি। হ্যাঁ, প্ল্যান ওরই ছিল। ও প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। যারা যারা ওর জীবনে শনি হয়ে এসেছিল, তাদের সকলকে হত্যা করতে চেয়েছিল ও। করেওছে। কিন্তু…’

‘কিন্তু কী?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

লোকটা চুপ করে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর বলল, ‘কিন্তু আমার প্রতিশোধ তো আমাকেই নিতে হবে। নিয়েওছি। তবে শেষ খুনটা না করলে খেলাটা শেষ হবে না। সেটা আমি তো হতে দিতে পারি না ম্যাডাম। এটা সঞ্জয়ের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার টোকেন বলতে পারেন। ও অনেক করেছে। কিন্তু শেষটুকু করে উঠতে পারল না। সেটুকু ওর হয়ে আজ আমিই না হয় করে দেব।’

অবাক হল টাপুর। জিজ্ঞাসা করল, ‘করতে পারল না মানে?’

লোকটা হাসল। তারপর বলল, ‘মরা মানুষ কাউকে খুন করতে পারে না।’

৫২

‘স্যার, ডক্টর সেন আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আপনাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। বললেন, ফোন লাগেনি।’ নিজের মোবাইল ফোনটা অর্জুনের দিকে এগিয়ে দিয়ে নয়ন বলল।

অর্জুন পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে দেখল। ভুরুতে ভাঁজ পড়ল তার। ফোনে চার্জ শেষ হয়ে সুইচড অফ হয়ে গেছে। নয়নের হাত থেকে তার ফোনটা নিয়ে কানে ঠেকাল সে।

‘হ্যাঁ স্যার। বলুন। কিছু পাওয়া গেল?’

অপর প্রান্তে ডক্টর সেনের গলা শোনা গেল।

‘এখনও কাজ শেষ হয়নি। ভালো করে শুরুই হয়নি বলতে পারো। শেষ হলে কনফার্ম করতে পারব। ওখানে বডি দেখেই সন্দেহ হয়েছিল আমার। এখন এখানে এসে আলোতে দেখে নিশ্চিত হলাম। ভিকটিমের শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ খুব ক্লিয়ার। অ্যাপারেন্টলি আমি কোনো নিডল মার্ক খুঁজে পেলাম না। বিষ সম্ভবত ওরালি ফিড করা হয়েছে। যেহেতু ছুরি মারার পর বিষ খাওয়ানো সম্ভব নয়, সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে বিষ আগে খাওয়ানো হয়েছে। এবার বিষক্রিয়ার মারা গেছে নাকি ছুরির আঘাতে, এই মুহূর্তে সেটা বলা একটু মুশকিল। যদি আগে মারা গিয়ে থাকে, তাহলে সম্ভবত যে ছেলেটি ছুরি মেরেছে, কী যেন নাম…’

‘সন্দীপ দাস।’ বলল অর্জুন।

‘হ্যাঁ। সন্দীপ দাস। সম্ভবত তোমাদের ওই সন্দীপ দাস অন্ধকারে বোঝেইনি যে তার টার্গেট অলরেডি মৃত। তাকে জিজ্ঞাসা করে কনফার্ম করো আমাকে সে যখন ছুরি মেরেছিল, তখন ভিকটিম কী করছিল জানা দরকার।’

‘আমি জানাচ্ছি আপনাকে।’ বলল অর্জুন। ফোনটা রেখে লালবাজারে ফোন লাগাল। ডিসিডিডি স্যার প্রেস কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করছেন। জানা গেল, জেরায় সন্দীপ যে জবানবন্দি দিয়েছে, তাতে সে জানিয়েছে, সঞ্জয়কে যখন সে খুন করে, তখন সঞ্জয় বেঁচে ছিল।

আজ বিকেলের পর থেকে সন্দীপ দাস সঞ্জয়কে ফলো করে গেছে ক্রমাগত। রাতে সঞ্জয়কে এখানে একা ঢুকতে দেখে সে প্রথমে বাইরে অপেক্ষা করে কিছুক্ষণ। তারপর যখন দেখে সঞ্জয় বেরিয়ে আসছে না, তখন সেও ঢুকেছিল ভেতরে। অন্ধকার ঘরে কটের উপর সঞ্জয়কে শুয়ে থাকতে দেখেছিল। সঞ্জয়ের শরীরটা কট থেকে নীচের দিকে ঝুলে ছিল। সেই অবস্থাতেই সে ছুরি মেরেছিল সঞ্জয়কে। সঞ্জয় সেইসময় তার পা আঁকড়ে ধরে। পা ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য টানলে সঞ্জয়ের শরীরটা কট থেকে গড়িয়ে পড়েছিল মেঝের উপর। সন্দীপ এরপর ভয় পেয়ে চলে আসে সেখান থেকে।

অর্জুন ফোন করে সন্দীপ দাসের স্বীকারোক্তিটুকু জানাল ডক্টর সেনকে। তিনি মন দিয়ে শুনলেন। বললেন, ‘সন্দীপের পরিশ্রমটুকু মাঠে মারা গেল। আর্সেনিক পয়জনিং করা হয়েছিল সঞ্জয়কে। খাদ্য বা পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে আর্সেনিকের উপস্থিতি টের পাওয়া সম্ভব নয়। সন্দীপ ছুরি না মারলেও সঞ্জয়ের আয়ু ফুরিয়ে এসেছিল। শরীরে বিষ ছড়িয়ে গেছিল তার। আর সেই বিষ দেওয়া হয়েছিল ছুরি মারার অন্তত দেড় থেকে তিন ঘন্টা আগে।’

পুরো জায়গাটা সিল করে দেওয়া হচ্ছে। সঞ্জয় পালকে সন্দীপ ছাড়া আর কে হত্যা করতে চাইতে পারে? অন্য কোনো ভিকটিমের রিলেটিভ? তাই যদি হয়, তাহলেও অর্জুন সেই ব্যক্তির হাত থেকে কিছু খাবেই বা কেন? বিষ খাদ্য বা পানীয়র সঙ্গে মেশানো হয়েছিল। ইঞ্জেক্ট করা হয়নি। অর্থাৎ যে তাকে বিষ দিয়েছিল, সে সঞ্জয়ের যথেষ্ট কাছের মানুষ। তা কাছের মানুষই যদি হয়, তাহলে তাকে মারতে চাইবে কেন! আর যদি সঞ্জয় আত্মহত্যা করতে চায়, সেক্ষেত্রেই বা শেষ খুনের আগে তা করবে কেন? তবে কি অন্তিম খুনটা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে! অর্জুনের শিরদাঁড়া বেয়ে হিমবাহ গড়িয়ে নামে। সামনে দাঁড় করানো গাড়ির বনেট আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলায় সে।

‘অর্জুনদা?’ গাড়ি থেকে নেমে এসে ডাকল মিতুল। আদেশ অনুরোধে কাজ হয়নি। বাড়ি ফেরেনি সে।

‘বলো।’

‘এখন কোথায় যাবে তুমি? টাপুরদিকে খুঁজবে না?’

‘খুঁজতে তো হবেই। কিন্তু এত বড়ো শহরে কোথায় আছে ও কীভাবে জানব?’ অর্জুনের কণ্ঠস্বরে হাহাকার বেজে ওঠে।

‘আমি এতক্ষণ এখানে বসে পুরো ঘটনাটা মনে মনে সাজাচ্ছিলাম। কিছু ব্যাপারে খটকা লাগছে জানো?’

‘কী ব্যাপারে?’

মিতুল একটু ভেবে বলল, ‘আমরা যখন এখানে আসি, এখানে অন্য কোনো গাড়ি ছিল না। গলির অন্য মুখে দাঁড় করালে সেটা আলাদা কথা। কিন্তু আমরা যেদিক দিয়ে ঢুকেছি, সেখানে অন্তত ছিল না।’

‘আমরা বাড়ির পেছন দিয়ে ঢুকেছিলাম। পেছনের ঘরে, মানে যেখানে ডেডবডি ছিল, সেখানে আলো জ্বলা দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি যখন ওই ঘরে ঢুকলাম তখন ঘর অন্ধকার ছিল। এর মানে কী দাঁড়াচ্ছে? আমরা ওই বাড়িতে ঢোকা, আমার অজ্ঞান হওয়া আর জ্ঞান ফেরার পর ওই ঘটে যাওয়ার মাঝের সময়টাতে কেউ ওখানে ছিল? কে? সন্দীপ দাস?’

‘সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। তাকে জেরা করে জানতে হবে।’

মিতুল বলল, ‘কিন্তু সন্দীপ দাস আমাকে আঘাত করতে যাবে কেন? আর সে তো লালবাজারে আত্মসমর্পণ করেছে। আর তা-ই যদি হবে তাহলে টাপুরদি কোথায় গেল? তুমি যখন ফোনে ডক্টর সেনের সঙ্গে কথা বলছিলে, আমি ওভারহিয়ার করেছি। সরি ফর দ্যাট। সন্দীপ বলেছে, সঞ্জয় ওই বাড়িতে ঢোকার একটু পরে সেখানে ঢুকেছিল। সে ওকে ছুরি মেরে বেরিয়ে আসে। ওর কথা যদি সত্যি হয় অর্জুনদা, তাহলে আমাকে কে মারল? তার মানে কি আরও কেউ সেইসময়ে ওই বাড়িতে উপস্থিত ছিল?’

অর্জুন মিতুলের মুখের দিকে তাকাল। মিতুল বরাবর টাপুরের ছায়া হয়ে থেকেছে। বিভিন্ন কেসে টাপুরের সঙ্গে কাজও করেছে। মনে হত, পুরোটাই ওর খেয়াল। শখ। মিতুলের বয়স কম। অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে। নিজে কর্পোরেটে মোটা বেতনের চাকরি করছে। বিদেশে যাওয়ারও কথা চলছে। এসবের মাঝখানে টাপুরের গোয়েন্দাগিরিতে ওকে কোনোদিনই আলাদা করে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা মনে হয়নি অর্জুনের। আজ মনে হচ্ছে, সে ভুল ছিল। মিতুল বুদ্ধিমতী মেয়ে। সাহসীও। আজ এই বিপদের রাতে যেন মিতুল প্রথমবার টাপুরের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।

‘অর্জুনদা, আমার ধারণা আরও কেউ ছিল এই বাড়িতে। ধারণা নয়, আমি শিয়োর। হতে পারে সেই সঞ্জয় পালকে বিষ দিয়েছিল। সেই টাপুরদিকে কিডন্যাপ করেছে, অথবা টাপুরদি ওকে ফলো করতে ওর পিছু নিয়েছে।’

‘না মিতুল। পিছু নেওয়ার দরকার হলেও টাপুর তোমাকে এখানে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে কখনো যেত না।’

‘স্যার!’ বিধাননগর থানার ওসি এসে দাঁড়িয়েছেন সামনে।

‘বলুন।’ মুহূর্তে অর্জুনের মধ্যে কেজো শরীরী ভাষা ফিরে এল।

‘বাড়ির মালিকের নাম পাওয়া গেছে।’

‘কী নাম?’

‘বহ্নিশিখা মজুমদার।

অর্জুন ও মিতুল একে অপরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল।

‘আপনি চেনেন নাকি?’ জিজ্ঞাসা করলেন ওসি।

‘চিনি। বহ্নিশিখা মজুমদার ভিকটিমের স্ত্রী।’ বলল অর্জুন।

‘সে কী!’ অবাক হলেন ভদ্রলোক। বললেন, ‘তাহলে কি তিনিই খুনি? স্বামীকে খুন করেছেন, বা করিয়েছেন?’

‘সেটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’ বলল অর্জুন। ‘কেন?’

‘আজই খবর নিয়েছি। বহ্নিশিখার এক পুরোনো কলিগ জানিয়েছেন যে তিনি গত দুই বছর ধরে মেন্টাল অ্যাসাইলামে আছেন।’

‘মাই গড! সেইজন্যই বোধ হয় গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বাড়ির খাজনা জমা হয়নি। খবর নিয়ে জেনেছি, এখানে বহুদিন ধরেই কেউ থাকে না। কেউ আসতও না। তবে উলটো পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধা মহিলা

আছেন। জানালেন, রাতে ঘুম হয় না। ঘুম ভেঙে গেলে জানলার সামনে বসে থাকেন। তিনি এক মাসে প্রায় বেশ কয়েক বার গভীর রাতে এই বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখেছেন তিনি। একদিন রাতে দুইজনকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা গাড়িতে উঠতে দেখেছিলেন। একজনের উচ্চতা মাঝারি। অন্যজন বেশ লম্বা ছিল। অন্ধকারে মুখ দেখতে পাননি তিনি। নিজের পুত্রবধূকেও জানিয়েছিলেন সে কথা। কিন্তু দিনের বেলায় খোঁজ করে কাউকে পাওয়া যায়নি ও বাড়িতে। তাই আর কেউ গা করেনি।’

অর্জুন চিন্তিত মুখে বলল, ‘এর মানে ধরে নেওয়া যেতে পারে, রেজর কিলার যদি একজনের বেশি লোক হয়, তাহলে তারা এখানেই মিট করত। এখানেই সম্ভবত খুনগুলির পরিকল্পনা হয়েছিল। সেই দলেরই যদি কেউ সঞ্জয়কে খুন করে থাকে, তাহলে সে অবশ্যই এই বাড়ির কথা জানত। এও জানত যে সঞ্জয় পাল আজ ওই সময়ে এখানে আসবে। এখানে বসে সঞ্জয়কে খাদ্য বা পানীয়র সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়েছিল সে। কিংবা হয়তো এখানে আসার আগেই খাইয়েছিল। এই মুহূর্তে জরুরি হল এই অপরজন কে তা জানা। সংঘমিত্রা ব্যানার্জি ওই লোকটার কবজায় আছে এখনও। আমাদের বেরোতে হবে।’

‘কোথায় যাবেন স্যার? আমিও যাব আপনার সঙ্গে। একযাত্রায় পৃথক ফল হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। তীর্থঙ্করবাবু প্রেস কনফারেন্সের জন্য লালবাজারে ফিরে গেছেন। আমাদের বিধাননগর পুলিশের উপরেও একটু ভরসা করে দেখুন।

‘চলুন।’

অর্জুন গাড়ির দিকে এগোল। মিতুলকে বলল, ‘তুমি আমার সঙ্গে চলো মিতুল। তোমার গাড়ির চাবি রেখে যাও। কেউ তোমার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে।’ ওসি স্বপন সিংহ গাড়িতে উঠতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আরেকটা কথা বলা হয়নি স্যার। এই বাড়িটা বহ্নিশিখাদেবী নিজে কেনেননি বা বানাননি।

‘তবে?’

‘বাড়িটা পৈতৃক সূত্রে দান হিসেবে পাওয়া। ভদ্রমহিলার বাবা তাঁকে গিফট ডিড করে দিয়েছিলেন। বাড়িটা তিনিই কিনেছিলেন বছর বিশেক আগে।’

অর্জুনের ভুরু কোঁচকাল। কুঁচকেই রইল কিছুক্ষণ। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘ভদ্রলোকের নাম জানেন?’

‘হ্যাঁ স্যার।’ ওসি নামটা বললেন।

অর্জুনের মুখের ভাবে যে অভিব্যক্তিটি ফুটে উঠল, তার শুধু একটিই নাম দেওয়া চলে। নিখাদ বিস্ময়। মিতুল দাঁড়িয়েছিল পাশেই। অর্জুনের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, এই বাড়ির মালিক অপরিচিত নয় অর্জুনের কাছে। অর্থাৎ এই কেসের সূত্রে আগেও সে সামনে এসেছে। সাধারণত এরকমই হয়ে থাকে দেখেছে মিতুল। তাই সে অবাক হল না। বলল, ‘অর্জুনদা, টাপুরদিকে খুঁজে বের করার এখনও একটা উপায় আছে।’

‘কী?’

‘টাপুরদির হাতে স্মার্টওয়াচ পরা ছিল আজ, আমি দেখেছি। ওটা থেকে ওর লোকেশন পাওয়া যেতে পারে।’

‘সেরকম হলে কিডন্যাপার কি সেটা ওর কাছে থাকতে দেবে?’ ক্লান্তমুখে বলল অর্জুন।

‘আহ্, ওটা খুব অ্যাডভান্সড সিক্সথ জেনারেশন স্মার্টওয়াচ। নতুন কিনেছে টাপুরদি। এমনিতে দেখে বোঝার উপায় নেই যে ওটা সাধারণ ঘড়ি নয়। সেটুকুই আশা। তবে ওর তো দুটো ফোন। তোমার কাছে যেটা আছে সেটার সঙ্গে সম্ভবত স্মার্টওয়াচ কানেক্টেড নয়। কারণ ওই ফোনটা ক-দিন ধরে একটু ডিসটার্ব করছিল বলে টাপুরদি ওটা ক্যারি করছিল না।’

অর্জুন চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেক্ষেত্রে ওর ফ্ল্যাটে যেতে হবে। কিন্তু ওর কিডন্যাপার যদি ওর স্মার্টওয়াচটা খুলে নিয়ে থাকে!

‘এই চান্সটুকু আমাদের নিতেই হবে অর্জুনদা। আর কোনো উপায় নেই। এখন এই রাতে ট্র্যাফিকের সমস্যা নেই। তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব। এক কাজ করি বরং আমি টাপুরদির ফ্ল্যাটে যাচ্ছি। তুমি এদিকটা দেখো আর কোনোভাবে ওর লোকেশন ট্র্যাক করতে পারো কি না! আমি ফোনটা পেলে তোমাকে আপডেট দেব।’

‘ফোন পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড নয়?’

মিতুল হাসল।

‘আমি জানি পাসওয়ার্ড। তোমার ফোন নম্বরের লাস্ট চারটা ডিজিট।’ বলে অর্জুনের উত্তরের অপেক্ষা না করে ছুটে গিয়ে নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। অর্জুন ঢোঁক গিলল। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল, ‘এত রাতে একা যেয়ো না। আমি তোমার সঙ্গে কাউকে পাঠাচ্ছি।

গলাটা কেঁপে গেল তার। মিতুল আর আপত্তি করল না।

৫৩

‘আপনি সঞ্জয়বাবুকে খুন করেছেন? কেন?’ বিস্ময়ে ছিটকে উঠে দাঁড়ায় টাপুর।

সামনের ব্যক্তি নির্লিপ্ত মুখে হাসে।

‘আজকের পরে ওর আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন ছিল না বলে!’

টাপুরের ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ হাসির রেখা ফুটে ওঠে। তেতো গলায় বলল সে, ‘কত সহজ, না? আপনারা কত সহজে একের পর এক মানুষকে খুন করে চলেছেন।’

‘খুন নয়। খুন নয়। মৃত্যুদন্ড!’

‘আপনি বিধাতা নন। কাউকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার অধিকার কেউ আপনাকে দেয়নি। সেই হিসেবে ধরলে, একই দন্ড আপনারও প্রাপ্য।’

লোকটা উত্তর দিল না। ব্যাগপ্যাক খুলে একটা সিরিঞ্জ আর অ্যাম্পিউল বের করল। টাপুর জিজ্ঞাসা করল, ‘এসব কী!’

লোকটা সিরিঞ্জের ঢাকনা খুলতে খুলতে বলল, ‘আপনার আরেকটু লম্বা ঘুমোনো উচিত ছিল। এসব খুনোখুনি চোখে দেখতে ভালো লাগবে না আপনার।

টাপুরের চোয়াল শক্ত হল।

‘শুনুন ম্যাডাম। একটা ছোট্টো পুশ। তারপর আপনি ঘুমিয়ে পড়বেন। আমি আমার কাজ সেরে চলে যাব। আপনি কিছু টেরও পাবেন না। আই প্রমিজ।’

টাপুর নিজেকে বরাবর সাহসী বলেই মনে করে। অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও মাথাঠান্ডা রাখার ক্ষমতা আছে তার তা সে নিজের অভিজ্ঞতায় জেনেছে। কিন্তু তাকে এর আগে কোনো সিরিয়াল কিলারের হাতেও পড়তে হয়নি।

লোকটাকে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তায় ব্যস্ত রাখার জন্য প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল টাপুর। বলল, ‘সুভাষ সরখেল কোথায়? তাঁকেও তো তুলে এনেছিলেন আপনি? নাকি সঞ্জয়বাবু?’

লোকটার চোখ কোঁচকাল। বলল, ‘এত কথা জেনে কি সত্যিই কোনো লাভ আছে আপনার? যাক গে, জানতে যখন চাইছেন তখন বলছি। সুভাষ সরখেলকে সঞ্জয় কিডন্যাপ করেনি।’

‘তাহলে কি আপনি করেছেন?’

লোকটা কিছু না বলে অ্যাম্পিউলে সিরিঞ্জ ঢোকাল। সিরিঞ্জে আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে বাতাস বের করে দিল। বলল, ‘কিডন্যাপ কোথায়? উনি নিজেই তো আমার সঙ্গে এলেন। অনেকদিনের চেনা-পরিচয় আমাদের। হাতটা এদিকে দিন দেখি। চিন্তা করবেন না। আপনাকে আমি খুন করব না। এটা সাধারণ কেটামাইন ইঞ্জেকশন। কিছুক্ষণ অজ্ঞান হয়ে থাকবেন আপনি। ব্যস। তার মধ্যে আমার কাজ শেষ হয়ে যাবে।’

‘আমার ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্য যদি আপনার নাই-ই থাকে, তাহলে এখানে আনলেন কেন আমাকে?’

লোকটা এগিয়ে এল। টাপুরের মুখের কাছে মুখ এনে খুক খুক করে হাসল একবার। বলল, ‘আপনার মতো সাংঘাতিক মহিলাকে ওখানে ছেড়ে এলে এতক্ষণে হয়তো আপনি আমাকে খুঁজে বের করে ফেলতেন। আমার কাজটা শেষ হত না। শেষ কাজের বেলায় আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না। যাই হোক, চোখ বুজুন তো। ভয় নেই। চাইলে অর্জুনের কথা ভাবুন। ভালো ছেলে ও। আপনাদের বেশ মানায়।’

এই মুহূর্তে আর কোনো কিছুই আশ্চর্য করছে না টাপুরকে। লোকটার কপালের ডানদিকে আঁচিলটা চোখে পড়ে গেছে তার। মুখ ঢাকা সত্ত্বেও এখন তাকে চিনতে তার আর অসুবিধে হচ্ছে না এতটুকু। তবু না মেলা হিসেব কিছু আছে। ধমনীপথে কেটামাইন টাপুরের রক্তে মিশছে। সত্যিই এখন তার অর্জুনের মুখ মনে পড়ছে। অর্জুন আসবে, সে জানে। যেভাবেই হোক তাকে খুঁজে বের করে ফেলবে অর্জুন।

লোকটা উঠে পাশের ঘরে গেল। কী করছে ওখানে? এতক্ষণ বাঁধা থাকার ফলে হাতে-পায়ে টনটনে ব্যথা। একবার উঠে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা করল টাপুর পারল না। চোখ বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিল বুক ভরে। ডান হাতের আঙুলটা প্রাণপণে বাঁকিয়ে বাঁ হাতের কবজি অবধি নিয়ে যেতে পারল সে কোনোক্রমে। তারপর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে রিস্টওয়াচের পাশে একটা ছোট্টো বোতাম টিপে ধরল। কেটামাইনের প্রভাব শুরু হতে কিছুটা সময় লাগবে আরও। সেটুকু কী কাজে লাগাতে পারবে সে!

ঠিক সেই মুহূর্তে টাপুরের ফ্ল্যাটের দরজার পাসওয়ার্ড লক খুলে ভেতরে ঢুকল মিতুল। অন্ধকার ড্রয়িং রুম। ভেতরে টাপুরদির বেডরুম থেমে বিপবিপ শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে এখান থেকে। পা দুটো মুহূর্তের জন্য জমে গেল মিতুলের তারপরেই ছুটে গেল ঘরে। বেডসাইড টেবিলের উপর মোবাইল ফোনটা চার্জে বসানো। ক-দিন ধরেই টাপুরদি বলছিল, ফোনটা খুব তাড়াতাড়ি চার্জ খোয়াচ্ছে। ফলে বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল না।

চার্জারের তারটা খুলে ফোনটা হাতে তুলে নিল মিতুল। চার ডিজিটের পাসওয়ার্ড দিয়ে ফোন আনলক করতে অসুবিধে হল না। জিপিএস মেসেজ ব্লিঙ্ক করছে। মিতুল জানে, এটাই এই মুহূর্তে টাপুরদির লোকশন। নিজের ফোনটা পকেট থেকে বের করে অর্জুনের নম্বর ডায়াল করল সে। সুইচড অফ। উত্তেজনায় হাত কাঁপছে তার। এখানে আসার আগে বিধাননগর থানার ওসির নম্বর দিয়েছিল অর্জুনদা। সেই নম্বরে ফোন করে অর্জুনদাকে চাইল সে।

‘অর্জুনদা। টাপুরদিকে পেয়ে গেছি। তোমাকে লোকেশন পাঠাচ্ছি। শিগগির যাও।’

৫৪

এদিক-ওদিক দৃষ্টি চালনা করে একটু দূরে রট আয়রনের তাকের উপর রাখা ওয়ার স্ট্রিপারটা দেখতে পেল টাপুর। আরও কিছু যন্ত্রপাতি রয়েছে ওখানে। আপাতত স্ট্রিপারটা হাতে পেলে এই পরিস্থিতিতে সুবিধে হতে পারে। কিন্তু তাকটা বেশ খানিকটা দূরে। এই হাত-পা-বাঁধা অবস্থায় ওখানে যাওয়াটাই সমস্যা। উপরন্তু লোকটাও পাশের ঘর থেকে যে কোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে।

যা থাকে কপালে ভেবে টাপুর হাতের তালুতে ভর করে একটু একটু করে এগোতে শুরু করল। নিয়মিত যোগাসনের ফলেই হোক বা প্রবল ইচ্ছেশক্তির কারণে, মিনিট তিনেক সময় লাগল দূরত্বটা অতিক্রম করতে। কিন্তু তবু স্ট্রিপারটা টাপুরের হাতের বাইরেই রয়ে গেছে। এভাবে বসে ওটা হাতে পাওয়া সম্ভব নয়।

উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল টাপুর। হচ্ছে না। এখান থেকে বসে শেলফে জোরে ধাক্কা দিলে স্ট্রিপারটা নীচে পড়লেও পড়তে পারে। কিন্তু তাতে স্ট্রিপারের সঙ্গে আরও অনেক কিছু পড়বে হুড়মুড়িয়ে। শব্দে লোকটা পাশের ঘর থেকে ছুটে আসবে। টাপুরকে হয়তো খুন করার কোনো প্ল্যান নেই তার, কিন্তু তার কাজে বাধা সৃষ্টি করলে কি আর বাঁচিয়ে রাখবে!

দেওয়াল ও তাকের জোড়ের অংশটায় টেনে-হিঁচড়ে পিঠ ঠেকাল টাপুর। পায়ের উপর ভর দিয়ে পিঠে অল্প অল্প করে চাপ দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। একটু উঠতেই আবার বসে পড়ল। হচ্ছে না। পায়ের কাফ মাসলে অসম্ভব টান পড়ছে। ব্যথায় চোখে জল চলে এল তার। কয়েকবার গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস নিল। শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে পিছমোড়া করে বাঁধা হাতে দেওয়ালে ভর দিয়ে নিজেকে আবারও তুলে ধরতে চেষ্টা করল টাপুর। পা দুটো ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। দেওয়ালে ঘষা লেগে হাতের তালুর ছাল উঠে গেছে। দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল সে।

কতক্ষণ কেটেছে জানে না টাপুর। স্ট্রিপারটা তার হাতের একদম সামনে এখন কেটামাইন সম্ভবত তার কাজ শুরু করেছে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। হাতে সময় নেই আর। হাত দিয়ে অস্ত্রটা ধরতে চেষ্টা করল টাপুর। কিন্তু হাতের ঠেলায় সেটা নীচে পড়ে গেল। ভাগ্যিস মেঝেতে না পড়ে পিচবোর্ডের কার্টনের উপর পড়েছে, তাই খুব বেশি শব্দ হয়নি। ধীরে ধীরে নীচে বসে পড়ল সে। স্ট্রিপারটা পিছমোড়া অবস্থাতেই হাতে ধরতে পারল। এটা দিয়ে হাতের দড়ির বাঁধন কাটা সহজ হবে না। কিন্তু এটাই আপাতত একমাত্র উপায়।

শরীর আর চলছে না। বারবার হাত থেকে পিছলে যাচ্ছে ওয়ার স্ট্রিপার। মনের অবশিষ্ট শক্তিটুকু প্রয়োগ করে কোনোমতে হাতের বাঁধন কাটতে সমর্থ হল টাপুর। এরপর পায়ের বাঁধন কাটায় অসুবিধে রইল না কিছু। হাতে-পায়ে ঝিঁঝি ধরেছে। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মাথাটা টলে গেল তার। দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলাল। শেফের উপর থেকে একটা বড়ো মাপের রেঞ্চ টেনে নিল। হাঁটতে গিয়ে টের পেল তার পা আর চলছে না। মাথার ভেতর সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি।

আলতো হাতে পর্দা সরাল টাপুর। এখান থেকে লোকটার পিঠ দেখা যাচ্ছে। উপুড় হয়ে বসে কিছু করছে লোকটা। কী করছে! ভালো করে দেখতে গিয়ে পা দুটো সেখানেই জমে গেল টাপুরের। লোকটার সামনে শোয়ানো একটা দেহ। মানুষের দেহ। সম্পূর্ণ নগ্ন। বয়স্ক পুরুষ। চোখ দুটো বোজা। লোকটা কি মরে গেছে! এই কি তাহলে রেজর কিলারের শেষ ভিকটিম! এত চেষ্টা করেও খুনটা আটকাতে পারল না টাপুর!

টাপুরের চোখের সামনে পুরো ঘরটা দুলছে। বোধটুকু মুছে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আটকাতে হবে! একে কিছুতেই পালাতে দেবে না টাপুর। এত দূর এসে হেরে যাবে না কিছুতেই সে। অন্তত সেইটুকু সময় তাকে জেগে থাকতেই হবে, যেভাবেই হোক।

পা টিপে টিপে খুনির দিকে এগোল টাপুর। আর একটুখানি। কিন্তু তার আগেই আবার মাথাটা টলে গেল টাপুরের। পাশে রাখা টেবিল ধরে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করলেও পুরোনো টেবিল মড়মড় শব্দে আপত্তি জানাল। সেই শব্দে চমকে ঘুরে তাকাল লোকটা। টাপুরও আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে রেঞ্চটা তুলে সজোরে বসিয়ে দিল লোকটার মাথায়। লোকটা বিস্মিত মুখে তাকাল টাপুরের দিকে। তারপর নিজের মাথায় হাত দিল। রক্তের সরু ধারা নেমে আসছে কপাল বেয়ে। টাপুরের ঠোঁটের কুলে কুলে হাসির ঢেউ খেলে গেল। পর মুহূর্তে বোধের শেষ বিন্দুটুকু মুছে গেল তার। চোখের সামনে নেমে এল অন্ধকার পর্দা। শূন্যে হাত বাড়িয়ে কিছু আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করেও মুঠি বাতাস কেটে বেরিয়ে গেল। মেঝের উপর পড়ে গেল টাপুর, স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার পাশেই।

কলকাতা পুলিশ ও বিধাননগর পুলিশের প্রায় গোটা আষ্টেক গাড়ি এসে থেমেছিল গলির মুখে। অর্জুনের মোবাইল ফোনে জিপিএস-এর দেখানো পথ ধরে শব্দহীন শ্রেণীবদ্ধ পিঁপড়ের মতো এগিয়েছিল তারা। ঘিরে ফেলেছিল গ্যারেজটাকে। স্পেশাল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশকর্মী নিঃশব্দে খুলে ফেলেছিল শাটারের তালা। ভেতর থেকে সাড়া মেলেনি। দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক স্থির হয়ে দাঁড়াতে দিচ্ছিল না অর্জুনকে।

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে ভেতরে ঢুকেছিল অর্জুন। কারো অপেক্ষা করেনি। অগ্রপশ্চাৎ ভাবেনি। তার মাথায় ঘুরছিল, টাপুর ঠিক আছে তো!

বাইরের ঘরে কেউ ছিল না। পর্দার ফাঁক দিয়ে টাপুরের জুতোটা এক ঝলক দেখে ভেতরে ছুটে গিয়েছিল অর্জুন। পর্দা সরাতেই সেকেন্ডেরও ভগ্নাংশ সময়ে আততায়ী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার উপরে। কিছু বোঝার আগেই বুকের মধ্যে আমূল বিধিয়ে দিয়েছিল দীর্ঘ ছোরা। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছিল আততায়ীর শরীর। প্রাণহীন শরীরটা লুটিয়ে পড়ার পরেও তার চোখ ছিল খোলা। সেই চোখে কোথাও বেদনা ছিল কি! কিংবা স্নেহাস্পদ বন্ধুপুত্রকে আঘাত করার জন্য অনুতাপ? শত হলেও অর্জুন তার সতীনাথ আঙ্কলকে ভালোবাসত। শ্রদ্ধা করত। হয়তো ছিল অনুশোচনা। তাই হয়তো তার চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছিল ঠান্ডা সিমেন্টের মেঝের উপরে।

বিধায়ক সুভাষ সরখেল সেদিন শুধু প্রাণে বেঁচেছিলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ সংঘমিত্রা ব্যানার্জির জন্য। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে ও আরও অনেক জায়গাতেই তিনি সে কথা উল্লেখ করেছেন একাধিকবার। কিন্তু সেসব তো অনেক পরের কথা। তারও আগে সেদিনের কথা বলি, যেদিন অ্যাম্বুলেন্সে পাশাপাশি শুইয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল টাপুর ও অর্জুনকে। টাপুরের জ্ঞান ফিরেছিল ঘন্টা তিনেকের মধ্যে। ঘোর পুরোপুরি কাটতে আরও ঘন্টা দেড়েক। কিন্তু অর্জুন সেদিন তার মতো ভাগ্যবান ছিল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *