৪৫
ঘড়ির কাঁটা রাত ন’টা পার করে গেছে। সকালে জলখাবারের পর থেকে কারোর কিছু পেটে পড়েনি। রাতেও খাওয়া হবে এমন আশা নেই। পথে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নয়ন সকলের জন্য স্যান্ডউইচ কিনে নিয়ে এল। মিতুল খেতে চাইছিল না। টাপুর বলল, ‘বিপদের সময়ে আগে পেট ঠান্ডা রাখতে হয় মিতুল। নইলে লড়বি কী করে! কিছু খেয়ে নে। এর পরে আর কখন খাওয়া হবে তার কোনো ঠিক নেই।’
খানিকটা বাধ্য হয়েই একটা স্যান্ডউইচ হাতে তুলে নিল মিতুল। সেটা হাতে নিয়েই জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর স্যান্ডউইচ কামড় দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা টাপুরদি, বাবা তো কারো ক্ষতি করেনি কোনওদিন। মিথ্যে স্তোক দিয়ে ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে টাকা লোটেনি। ঘুষ খেয়ে ইচ্ছে করে কেস হেরে যায়নি। নিজের কাজটা সম্পূর্ণ সততার সঙ্গে করে গেছেন সারাটা জীবন। বাবার অনেক সহকর্মীকে চিনি যাঁরা নিজেদের পেশাটাকে ব্যাবসা ছাড়া কখনও কিছু ভাবেননি। টাকা রোজগার করার জন্য নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়েছেন। বাড়ি, গাড়ি, জমি, সম্পত্তি বাড়িয়েছেন। এখনও বাড়িয়ে চলেছেন। কই, তাদের তো কিছু হল না? কিডন্যাপ হতে হল আমার বাবাকে?’
টাপুর উত্তর দিল না। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই টাপুর একটু বেশি চুপ হয়ে আছে। যেন গভীরভাবে কিছু ভাবছে। অর্জুন অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ করছিল। এখন জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ভাবছ বলো তো টাপুর?’
‘একটা সন্দেহ মনের মধ্যে খচখচ করছে অর্জুন। একজনের সম্পর্কে একটু খবর নিতে পারবে?
‘কার সম্পর্কে?’
টাপুর কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। নয়ন গাড়ি চালাচ্ছে। নিজের মোবাইল বের করে হোয়াটস্যাপে একটা নাম টাইপ করল সে। তারপর মেসেজটা অৰ্জুনকে পাঠিয়ে দিল। বলল, ‘খবর নাও। সবকিছু।’
নামটা দেখে অর্জুনের মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল।
‘কী বলছ? কিন্তু কেন?
‘জানি না। জাস্ট একটা হাঞ্চ। প্লিজ খবর নিতে বলো।’
অর্জুন না কথা না বাড়িয়ে কাউকে মেসেজ করল। মেসেজটা পাঠিয়ে দিয়ে বলল, ‘বেশ, তুমি যখন বলছ, বলে দিলাম। দেখা যাক।’
ফোনটা পকেটে ঢোকানোর আগেই সেটা বেজে উঠল। তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত। ‘কিছু পাওয়া গেল?’
অপরপ্রান্তের কণ্ঠস্বর একটু ক্লান্ত শোনাল। খুক খুক করে কাশছে।
‘একটা ঠিকানা হোয়াটস্যাপ করে দিচ্ছি অর্জুন। চলে এসো এখানে।’
‘কার ঠিকানা? রণজয়বাবুর কোনো হদিশ মিলল?’ অর্জুনের কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ।
‘তুমি আগে এসো। দেরি কোরো না। ক্যানাল স্ট্রিট। এন্টালি থানার আন্ডারে পড়ছে।’ বললেন তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত।
ফোনটা স্পিকারে ছিল। নয়নকে কিছু বলতে হল না। সে গাড়ির স্পিড বাড়াল। ডুকরে উঠল মিতুল।
‘বাবা বেঁচে আছে তো অৰ্জুনদা?’
অর্জুনের কাছে কোনো উত্তর নেই। এই মুহূর্তে শুধু প্রাণপণ প্রার্থনা করা ছাড়া কিছু করারও নেই তার।
তীর্থঙ্করবাবুর পাঠানো ঠিকানায় পৌঁছোতে প্রায় পঁচিশ মিনিট লাগল। রাতের বেলা, তাই রাস্তায় ভিড় তবু কম ছিল। রাস্তার ডানহাতে একটা সরু গলি। গাড়ি ঢোকার উপায় নেই। আরও দুটো পুলিশ জিপ দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানে। অর্থাৎ তীর্থঙ্করবাবু ভেতরেই আছেন।
নয়নকে বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করতে বলে অর্জুন, টাপুর ও মিতুল পায়ে হেঁটে এগোল। গলির ভেতরে স্ট্রিট লাইটের বালাই নেই। আশেপাশের বাড়ি থেকে টিভি সিরিয়ালের শব্দ ভেসে আসছে। জানলা দিয়ে যেটুকু আলো গলিপথে এসে পড়ছে, তার সাহায্যেই পথ চলা।
কানাগলি। বাড়িটা গলির প্রায় শেষপ্রান্তে। অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো অতিবৃদ্ধ এক বাড়ি। যেখানে সেখানে পলেস্তারা খসে ইটের দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। দেওয়াল কয়েক জায়গায় ভাঙা। কেউ ঢুকতে চাইলে তার গেটের প্রয়োজন হবে না। অনায়াসে ভাঙা প্রাচীর টপকে প্রবেশ করতে পারে। তবে এই বাড়িতে ঢোকার দরকার বোধ হয় কারো পড়ে না।
গেটের সামনে স্থানীয় কিছু মানুষের জটলা। এলাকার পথকুকুরেরা অবধি কৌতূহলী ভঙ্গিতে ঘোরাফেরা করছে কাছাকাছি। উর্দিধারী পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। অর্জুন আগে ঢুকে আই কার্ড দেখাতে তারা স্যালুট ঠুকল। বলল, ‘স্যার ভেতরে অপেক্ষা করছেন। চলে যান।’
পুরো চত্বর জুড়ে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
‘আগুন লেগেছিল এখানে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘লাগানো হয়েছিল স্যার। একটা ঘরে। কয়েক বালতি জল ঢালতেই নিভে গেছে। আমরা পৌঁছোনোর আগেই লোকাল লোকেরা নিভিয়ে দিয়েছে।’
অর্জুন কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে এগোল। টাপুর ও মিতুলও এগোল সঙ্গে। উঠোন পেরিয়ে ভগ্নপ্রায় দালান। একটা ঘরে আলো জ্বলছে। বাকি ঘরগুলো অন্ধকার। ঘরের সামনে জমা ধুলো ও পাখির বিষ্ঠার আলপনা দেখলে মনে হয় সেগুলি ব্যবহার হয় না। দরজার তালার হাতলে মরচেও সেই ধারণাকেই স্বীকৃতি দেয়। বারান্দা পার করে উদ্দিষ্ট ঘরে ঢুকতেই সামনে এক বেশ রোগা চেহারার ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। মাঝারি উচ্চতা। বয়স পঞ্চাশের উপরেই হওয়ার কথা। দেখে কে বলবে ইনিই কলকাতা পুলিশের মিসিং পারসন স্কোয়াডের সবচেয়ে দক্ষ অফিসার। শুধু ধারালো চোখদুটি দেখলে বোঝা যায় এই ব্যক্তি সাধারণ নন। অর্জুন এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করল। তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত।

‘রণজয় সেনের কোনো খবর পাওয়া গেল?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
তীর্থঙ্করবাবুকে হতাশ দেখাল। মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমাদের আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে অর্জুন। আমরা আসার আগেই রণজয়বাবুকে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দে সকলে পেছনে ফিরে তাকাল। মিতুল কাঁদছে। ভীষণ কাঁদছে। কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে তার শরীর।
অর্জুন টাপুরকে ইশারা করল। টাপুর মিতুলকে ধরে বাইরে বেরিয়ে গেল। অর্জুন এবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার সোর্সদের মধ্যে একজন গাড়িটা আইডেন্টিফাই করেছিল গাড়ির গায়ে একটা স্টিকার দেখে। এন্টালির কাছে একটা কার রেন্টালের গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল কিডন্যাপিং-এর জন্য। সেই কার রেন্টালে গিয়ে আমরা জানতে পারি বাবলু পাল নামে একজন বেশ মোটা টাকা দিয়ে গাড়িটা ভাড়া নিয়েছিল দুই মাসের জন্য। কার রেন্টালের মালিক অবাক হয়েছিলেন। কারণ যে টাকা বাবলু পাল তাকে দিয়েছিল, তা দিয়ে নতুন না হোক একটা ভালো কন্ডিশনে থাকা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি অনায়াসে পেয়ে যেতে পারত সে। সেটা না করে কেন গাড়ি ভাড়া নিলে বলতে পারো অর্জুন?’
তীর্থঙ্করবাবু যেন স্কুলের কড়া মাস্টারমশাই। অর্জুনও ছাত্র মন্দ নয়। বলল, ‘নতুন গাড়ি কিনতে হলে কাগজপত্র দেখাতে হত। বেনামে ভুয়ো কাগজ দেখিয়ে গাড়ি ভাড়া করা যায়। কেনা মুশকিল। তাছাড়া রেজিস্ট্রেশনে অনেক ঝক্কি। সময়ও লাগে।’
‘গুড। তবে এখানেও একটা কিন্তু আছে। বাবলু পাল নিজের নাম, ঠিকানা কিন্তু ভুয়ো দেয়নি। দেয়নি বলেই আমরা এই বাড়ি অবধি পৌঁছোতে পেরেছি। আমার ধারণা সে ঝামেলা নিতে চায়নি। আরেকটা ব্যাপার মনে হচ্ছে। হয়তো খুনি চেয়েছিল আমরা এখানে আসি। তাই সে পদে পদে আমাদের জন্য ব্লু ছেড়ে এগিয়েছে। আর ঠিক এই ব্যাপারটাই আমাকে আশ্চর্য করছে অর্জুন।’
অর্জুনের মনে পড়ে গেল টাপুর এই কথাগুলোই বলেছিল। তাই সে আশ্চর্য হল না। ঘরের ভেতরটা দেখে বুঝতে অসুবিধে হয় না, কিছুক্ষণ আগেই এই ঘরে আগুন ধরানো হয়েছে। দুর্ঘটনা নয়, ইচ্ছে করে ঘটানো অঘটন। এখনও ছাই চাপা আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে স্থানে স্থানে। কাগজ পোড়া গন্ধে ভরে গেছে পুরো বাড়িটাই। দেওয়ালেও দহনের ছোপ।
এগিয়ে গিয়ে ছাইয়ের ভেতর খুঁজতে শুরু করল অর্জুন। টাপুরও ঘরে ফিরে এসেছে। সেও হাত লাগাল। কাগজ পোড়া ছাইয়ের মধ্যে থেকে একটা আধপোড়া শার্ট বেরোল। বুকের কাছে খানিকটা রক্তের ছোপ ধরা। খুনি যেন অবহেলায় ফেলে রেখে গেছে পুলিশের জন্য। টাপুর টেনে বের করল শার্টটা। খুটিয়ে দেখে অর্জুনের দিকে এগিয়ে দিল সেটা।
‘ডান হাতের স্লিভটা দেখো অর্জুন!’
অর্জুন দেখল। স্লিভের কাছটা সামান্য ছেঁড়া। একটা বোতাম নেই। ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল তার। হারিয়ে যাওয়া বোতামটা এখন লালবাজারে স্যাম্পলরুমে রাখা আছে সযত্নে। শার্টটা রেখে উঠে দাঁড়াল যে। ঘরের দেওয়ালে বেশ কিছু ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ রয়েছে। অন্য দেওয়ালে একটি বেশ বড়ো কলকাতা শহরের ম্যাপ। ফোটগ্রাফগুলো কাচে ঢাকা থাকায় পোড়েনি বটে, তবে ঝলসে গেছে।
‘এগুলোকে কম্পিউটারে ফেলে রিট্রিভ করা যাবে না অর্জুন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।
‘যেতে পারে। তবে সময় লাগবে। মিতুল কোথায়?’ অর্জুন বলল।
‘ওকে এখানে আসতে মানা করেছি। বাইরে বারান্দায় বসে আছে।’
মাথা নাড়ল অর্জুন। তীর্থঙ্করবাবুও পোড়া কাগজ খুঁজে দেখায় হাত লাগিয়েছেন। টাপুর তাকিয়ে আছে দেওয়ালে টাঙানো ম্যাপটার দিকে। ম্যাপের গায়ে কয়েকটা জায়গায় রাউন্ড ম্যাপ পিন লাগানো।
‘অর্জুন…’
‘কী হল?’
‘এদিকে দেখো। তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ।’
অর্জুনের সঙ্গে তীর্থঙ্করবাবুও এগিয়ে এলেন। এতক্ষণ চোখে পড়েনি। একট মন দিয়ে দেখতেই বোঝা গেল এতদিন ধরে শহরের যে সব জায়গায় খুনগুলো হয়েছে, সেগুলোই পিন দিয়ে নির্দেশ করেছে খুনি।’
অর্জুন একটু হতাশ হল। বলল, ‘এ তো আমরা জানি। পরের খুন কোথায় হবে সেটা জানা থাকলে বরং সুবিধে হত।’
‘পেন আছে? বা মার্কার?’ ম্যাপটার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক গলায় বলল টাপুর। তীর্থঙ্করবাবু পকেট থেকে মার্কার বের করে এগিয়ে দিলেন টাপুরের দিকে।
‘দেখো। প্রথম খুনটা হয়েছিল এম জি রোডে। বিলাল শেখ। দ্বিতীয়টা সুখেন্দুশেখরবাবু, কালিন্দীতে।’ দুটো মার্ডার স্পট মার্কার দিয়ে যোগ করে একটা সামান্য বক্ররেখা টানল টাপুর।
‘এরপরে অনিরুদ্ধ মল্লিক। রাজারহাট।’ রেখাটি তৃতীয় স্পট অবধি প্রসারিত হল।
‘চতুর্থ বলাই সাহা। ধাপা।’ রাজারহাট থেকে রেখা ঘুরে এসে ধাপা স্পর্শ করল।
‘নেক্সট। ডক্টর নিরুপমা গোমজ। ট্যাংরা। পাঁচ নম্বর।’
রেখা টানা হতেই অর্জুন আর তীর্থঙ্করবাবু একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘এ তো…!’
টাপুরের মুখে তখন যুদ্ধজয়ের হাসি।
‘এর পরে দেবাশীষ দত্ত। উল্টোডাঙা ফ্লাইওভার।’
‘মাই গুডনেস!’ বিস্ময়ে পেছাতে গিয়ে দেওয়ালে ধাক্কা খেলেন তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত। তাদের সামনে ম্যাপের উপর এই মুহূর্তে একটি আবর্ত আঁকা হয়েছে যার অভিমুখ কেন্দ্রের দিকে।
‘স্পাইরাল!’ অর্জুন অস্ফুটে উচ্চারণ করল।
‘ফিবোনাকি, অর্জুন, ব্যাকওয়ার্ড ফিবোনাকি। হত্যার তারিখের মতো হত্যার স্থানের ক্ষেত্রেও ব্যাকওয়ার্ড ফিবোনাকি প্যাটার্ন তৈরি করে এগিয়েছে খুনি। হিসেব মিলে যাচ্ছে। আমরা বারবারই ভাবছিলাম, খুনি এক জায়গা থেকে কিডন্যাপ করে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে খুন কেন করছে! আসলে পুরোটাই তার গেমপ্ল্যানের অংশ।’
‘অর্জুন!’ উত্তেজিতস্বরে বলে উঠলেন তীর্থঙ্কর। টাপুর ও অর্জুন দুজনেই ঘুরে তাকাল তাঁর দিকে।
‘অর্জুন, এই লাইন ধরে খুন হলে পরবর্তী খুনটা উল্টোডাঙা ফ্লাইওভারের পর থেকে শুরু হয়ে সল্টলেকের কোনো অংশে হওয়ার কথা। তাহলে আমরা এখানে কী করছি?’
তিনজনেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর ঝড়ের বেগে বারান্দায় বেরিয়ে এল। কিন্তু মিতুল! মিতুল কোথায়?’
‘এখানে যিনি বসেছিলেন, তিনি কোথায়?’ একজন পুলিশ কনস্টেবলকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘এখানেই তো ছিলেন এতক্ষণ। আমি বাইরে লোকেদের জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম। খেয়াল করিনি…’
‘মিতুল…!’ উচ্চস্বরে ডাকল অর্জুন। টাপুর বারান্দায় উঠে ছুটে গেল বাড়ির পশ্চিমের দিকে।
‘মিতুল! কোথায় তুই?’ প্রায় চিৎকার করে উঠল টাপুর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে কোনো জায়গা থেকে উত্তর এল, ‘টাপুরদি, আমি এদিকে। তাড়াতাড়ি এসো।’
কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে ছুটে গেল টাপুর। পেছনে পেছনে এল বাকিরাও। পশ্চিমদিকে বারান্দাটা এল শেপে উত্তর দিকে প্রসারিত হয়েছে। জায়গাটা ঘন অন্ধকারে ঢাকা। ঝোপঝাড় উঠে এসেছে ঘরের দেওয়াল অবধি। হেঁটে এগোতে গেলে লতায়, ডালে পা বেধে যায়। মোবাইল টর্চের আলোতে এগোল তারা। দূরে একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মিতুল। দরজায় কান ঠেকিয়ে কিছু শুনছে।
দ্রুত এগোল টাপুর। বারান্দার ভাঙা গর্তে পা পড়ে ডান পায়ে টান লাগল। কিন্তু যন্ত্রণাকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এটা নয়।
‘এখানে কী করছিস মিতুল? এত অন্ধকার, সাপখোপ থাকতে পারে!
আঙুলে তর্জনী স্পর্শ করল মিতুল। দরজায় কান ঠেকিয়ে টাপুরকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। টাপুরও কান পাতল। প্রথমে সেভাবে কিছু শুনতে না পেলেও ভালো করে শোনার পর মনে হল ভেতর থেকে খুব মৃদু, ক্ষীণ গোঙানির শব্দ আসছে যেন। দরজায় তালা ঝুলছে। তবে এই তালাটা অপেক্ষাকৃত নতুন।
‘অর্জুন। এখানে দেখো। দরজা ভাঙতে হবে। ভেতরে কেউ আছে।’
অর্জুন ও বাকিরা ছুটে এল। পুরোনো কাঠের দরজা রোদে-জলে পচে ভঙ্গুর হয়ে গেছে। বারদুয়েক জোরে ধাক্কা দিতেই মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। ভেতরে মেঝের উপর কেউ শুয়ে আছে। হাত-পা, মুখ দড়ি দিয়ে বাঁধা। এতক্ষণ সম্ভবত অচেতন ছিল। এখন অল্প অল্প করে জ্ঞান ফিরে আসছে। দেওয়ালের দিকে মুখ করে গুটিসুটি মেরে শুয়ে গোঙাচ্ছে মানুষটি।
অর্জুন টর্চের আলো ফেলল। ছাই রঙের শার্ট আর খাদির ট্রাউজার পরনে।
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তার পরেই ছুটে গেল মিতুল। শুয়ে থাকা মানুষটিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল, ‘বাবা!’
৪৬
রাত এখন এগারোটা। অর্জুনের ফোন বাজছে। ফোন রিসিভ করে অপর প্রান্তের কথা শুনতে শুনতে তার মুখের ভাব সম্পূর্ণ বদলে গেল। টাপুর পাশেই দাঁড়িয়েছিল। লক্ষ করছিল অর্জুনকে। ইশারায় জিজ্ঞাসা করল, কী ব্যাপার। মাথা নাড়ল অর্জুন। আরও মিনিট খানেক কথা বলে ফোনটা অফ করে পকেটে রাখল। তারপর মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘এই বাড়ির মালিকের নাম জানা গেছে টাপুর। তোমার ধারণাই ঠিক। তুমি খবর নিতে বলেছিলে বলেই জানা গেল। নইলে আমি একটুও সন্দেহ করিনি। জাস্ট ভাবতেই পারছি না। তুমি কীভাবে আঁচ করলে, বলো তো?’
‘পরে বলব। এখন সময় নেই অর্জুন। খুনি কিন্তু এখনও অধরা।
স্থানীয় লোকেরা এত রাতেও ভিড় করে আছে। পূর্বোক্ত কনস্টেবল এগিয়ে এসে অর্জুনকে বললেন, ‘এদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম স্যার। বলছে, এখানে সুবীর পালের স্ত্রী ও ছেলে থাকে। আজ দুপুরেও দেখেছে তারা তার স্ত্রীকে। তৈরি হয়ে কোথাও বেরোচ্ছিল। তারপরে আর ফিরে এসেছিল কি না কেউ জানে না।’
‘সুবীর পালের ছেলের নাম বলেছে এরা?’ টাপুরের দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে কনস্টেবলকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘হ্যাঁ স্যার।’ নামটা বললেন কনস্টেবল।
সন্দেহের আর জায়গা ছিল না। অর্জুনের চোখের তারায় আঁধার ঘনাল।
‘আমাদের বেরোতে হবে অর্জুন,’ বললেন তীর্থঙ্করবাবু। ‘রণজয়বাবু এখানে। তার মানে খুনির টার্গেট তিনি কখনোই ছিলেন না। আমাদের রণজয়বাবুকে খোঁজার কাজে ব্যস্ত করে সে নিজের কাজ হাসিল করবে, এই তার উদ্দেশ্য।’
‘আর আমার ধারণা ঠিক হলে এটাই তার শেষ খুন,’ পেছন থেকে বলল টাপুর। কখন সে ও মিতুল পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, টের পায়নি অর্জুনরা। টাপুর এগিয়ে এসে বলল, ‘এটা শেষ খুন বলেই এতটা রিস্ক নিয়েছে খুনি। প্রায় সব তথ্যপ্রমাণই আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে স্বেচ্ছায়। অর্থাৎ নিজেই ধরা দিয়েছে বলা যায়। তার খেলা শেষের পথে। শেষবারের মতো আমাদের চালকে মাত দিয়ে সে এন্ড পয়েন্টের দিকে এগোচ্ছে। অথচ আমরা এখনও জানি না, রণজয়কাকু না হলে খুনির টার্গেট কে!’
‘কিন্তু টাপুরদি, খুনি কেন ধরা দিতে চাইছে? কেন নিজেই সব তথ্যপ্রমাণ এভাবে তুলে দিচ্ছে পুলিশের হাতে? এর মানে দাঁড়ায়, কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ধরা পড়া বা না পড়া নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু কেন?’
টাপুর বলল, ‘জানি না রে। আসলে আমাদের সকলের মনের মধ্যে একটা তালাবন্ধ কুঠুরি থাকে। তার ভেতর আলো-আঁধারের খেলা চলে নিয়ত। হয়তো খুনির জীবনে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যই ছিল এই খুনগুলো করা। শেষ খুনটা হয় গেলে তার উদ্দেশ্যও শেষ হয়ে যাচ্ছে। তখন ধরা পড়া বা না পড়ায় তার আর কিছু যায় আসে না।’
গলির মুখে একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল। রণজয় সেন এখনও অর্ধ-অচেতন। তাকে ট্রলিতে শুইয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়া হল অ্যাম্বুলেন্স অবধি। মিতুলও গাড়িতে উঠল তার বাবার সঙ্গে। টাপুর ওর হাত ধরে বলল, ‘এইসময় আমার তোর সঙ্গে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু বুঝতেই তো পারছিস এদিকের অবস্থা!’
মিতুল সামান্য হাসল। টাপুরের হাতে আলতো করে চাপ দিয়ে বলল, ‘এবার তোমার সঙ্গে থাকতে পারলাম না টাপুরদি। তা বলে যেন ভেবো না এরপর থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ছাড়াই তুমি কেস সলভ করে ফেলবে। মনে রেখো, টাপুর-মিতুল জুটি না হলে কেসও অসন্তুষ্ট হয়।’
হেসে এলল টাপুর। বলল, ‘আর এরপর কি তুই বিদেশ থেকে উড়ে এসে আমার সঙ্গে কেস সলভ করবি?’
মিতুলের মুখে ছায়া নেমে এল। ম্লান হেসে বলল, ‘এই নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব। এখন যাও, ওই পাগল খুনিকে আটকাও তুমি। আর একটাও খুন হতে দিও না।’
অ্যাম্বুলেন্সের দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে দিল টাপুর। গাড়ি বেরিয়ে গেল মিতুল আর ওর বাবাকে নিয়ে। টাপুর স্থাণুর মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর দ্রুত পায়ে হেঁটে গলির ভেতর এগিয়ে গেল যেখানে অর্জুনরা দাঁড়িয়ে আছে। বলল, ‘সব থানায় এই মুহূর্তে অ্যালার্ট করো। জিজ্ঞাসা করো আজ বিকেলের পর থেকে সারা শহরে কোন কোন মিসিং কেস লজ হয়েছে। আওয়ার লাস্ট ভিকটিম ইস ইন গ্রেভ ডেঞ্জার।’
খবরটা অবশ্য অযাচিতভাবেই এল। কাউকে জিজ্ঞাসা করার আগেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এসে পড়ল তাদের মাঝে। তারা বেরোতে যাবে, এমন সময় নয়নের ওয়াকি টকিতে খবর এল, মৌলালি অঞ্চলের পরপর পাঁচবারের জয়ী বিধায়ক সুভাষ সরখেলকে আজ রাত ন’টার পর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
এন্টালি থানার মেজোবাবু সমীর ভুইঞা সঙ্গেই ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে থানায় ফোন করলেন। কয়েক মিনিট পর ফোন রেখে যা জানালেন তা হল, গত কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন সুভাষ সরখেল। কোল্ড ডায়েরিয়া হয়েছিল। আজ সকালে হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে অনেকদিন পরে পার্টি অফিসে গিয়ে বসেছিলেন। এই অঞ্চলে সুভাষবাবুর প্রবল পরাক্রম। আগে অন্য দল করতেন। অম্লান চক্রবর্তীর দল ক্ষমতায় আসার পর রং বদলে এই দলে যোগ দিয়েছেন। এই অঞ্চলে সুভাষ সরখেলই শেষ কথা।
আজ দুপুরে পার্টি অফিসে বসে পরপর দুটো মিটিং করেন সুভাষবাবু। দলীয় কর্মীদের অনেকেই দেখা করতে এসেছিল। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য শুভেচ্ছা জানাতেও এসেছিল অনেকে। সকলের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। অনেকক্ষণ গল্পগুজবও করেন। বেশ হালকা মুডে ছিলেন। তারপরে পাঁচটা নাগাদ বলেন তার ক্লান্ত লাগছে। বাড়ি যাবেন। খোঁজ করতে দেখা যায় তাঁর গাড়ির ড্রাইভার উপস্থিত নেই। গাড়ির চাবিও ড্রাইভারেরই কাছে। ড্রাইভারকে ফোনেও পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল না সুভাষবাবুর সুরক্ষার দায়িত্বে যিনি ছিলেন, তাঁকেও। সুইচড অফ। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরেও যখন দুজনের কেউই ফিরে এলেন না, তখন সেখানে উপস্থিত একজন বলেন, তাঁর কাছে গাড়ি আছে। তিনি সুভাষবাবুকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারেন।
সুভাষ সরখেলের বাড়ি পার্টি অফিসের খুব কাছেই। মিনিট দশেকের পথ। কয়েকজন সঙ্গে যেতে চেয়েছিলেন। সুভাষবাবু নিজেই মানা করেন। বলেন, ভিড় বাড়িয়ে লাভ নেই। আরও জানান, ওই ভদ্রলোক তাঁর পূর্বপরিচিত। কেউ কিছু সন্দেহ করেনি। সে সুভাষবাবুকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। এর পরে আর কিছু খবর পাওয়া যায়নি। বাড়িতে পৌঁছোননি সুভাষ সরখেল। ফোনও সুইচড অফ আসছে। ড্রাইভার আর সিকিয়োরিটি অফিসারকে আধ ঘন্টা পরে পাশের গলিতে খুঁজে পাওয়া গেছে অজ্ঞান অবস্থায়। দুজনকেই ক্লোরোফর্ম দেওয়া হয়েছিল।
অর্জুনের চোয়াল শক্ত হল। সমীর ভুইঞাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি তো লোকাল লোক। অনেক বছর আছেন এই থানায়?’
‘এখানেই আমার চাকরি জীবন শুরু স্যার। সতেরো বছর আগে। মাঝে চার বছর জোড়াসাঁকো থানায়, দুই বছর গিরিশ পার্কে ছিলাম। তারপর আবার এখানে। এই এলাকা আমি হাতের তালুর মতো চিনি।’ সমীরবাবুর মুখের রেখা গর্ব ফুটে উঠল।
‘তাহলে তো আপনি সুভাষ সরখেল সম্পর্কে ভালোই জানেন। একটা কথা বলুন, বিলাল শেখের নাম শুনেছেন?’
সমীর ভুইঞা বোধ হয় অবাক হলেন। মাথা নাড়লেন তিনি। শুনেছেন ‘বিলাল শেখের সঙ্গে সুভাষ সরখেলের কোনো যোগাযোগ ছিল? জানেন? ‘ মেজোবাবুকে একটু দিশেহারা দেখাল। উপর-নীচে মাথা নাড়লেন আবারও। বললেন, ‘তখন সুভাষবাবুও উঠতি নেতা। পায়ের নীচে মাটি শক্ত করছেন। মিথ্যে বলব না স্যার। শুনেছি বিলালের সঙ্গে ভালোই সদ্ভাব ছিল। দুজনেই দুজনকে মদত যোগাত।’
অর্জুন টাপুরের দিকে তাকাল। হিসেব মিলে যাচ্ছে। টাপুরের মুখও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
‘আর প্রমোদ বৈরাগীর সঙ্গে?’
সমীরবাবু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তার অভিব্যক্তিতে দ্বিধার ছাপ স্পষ্ট। তারপর বললেন, ‘বিলাল জেলে যাওয়ার পর থেকে সুভাষ সরখেলের হয়ে প্রমোদ কাজ করত। তখনও সে ডন হয়ে ওঠেনি। সাধারণ পার্টি কর্মী হিসেবেই কাজ করত ও। কিন্তু রেকর্ড ভালো ছিল না। পার্টির আড়ে তোলাবাজি থেকে মস্তানি অবধি সবই করত শুনেছি। বিলাল আর প্রমোদের সম্পর্ক তখন সাপে-নেউলে। রোজই গ্যাং ওয়ার চলছে। কোনো না কোনো গ্যাং-এর লোক হামেশাই জখম হচ্ছে। লাশও পড়ত মাঝেসাঝে। এরপর বিলাল অ্যারেস্ট হল। বিলালকে জেলে পাঠানোর পেছনেও সুভাষ সরখেল ও প্রমোদের হাত ছিল বলে শোনা যায়। ওরাই প্ল্যান করে বিলালকে সরিয়ে দিয়েছিল। ওর দল ভেঙে গেল। তারপর আর কী? প্রমোদের একার রাজত্ব!
সঞ্জয়বাবুর সঙ্গে হওয়া শেষ কথাগুলো মনে পড়ে গেল অর্জুনের। বলল, ‘আজ একটা রেডে দুজন ড্রাগ পেডলার ধরা পড়েছে। তারা জানিয়েছে যে এই ব্যাবসা আসলে প্রমোদ বৈরাগীর। কিন্তু তারও মাথার উপর কেউ আছে। আপনার কি মনে হয় সমীরবাবু, ড্রাগের ব্যাবসার কিংপিন সুভাষ সরখেল হতে পারে? এমন তো হতেই পারে না যে এই অঞ্চলে এরকম কিছু দীর্ঘদিন ধরে চলছে, অথচ আপনি বা আপনারা কিছু জানেন না?’
সমীরবাবু বিষণ্ণ মুখে হাসলেন। বললেন, ‘দেখুন স্যার। আপনি কতটুকু জানেন আমি জানি না। কিন্তু আমি বা আমরা কিছু জানলে সেটা উপরমহলেও জানবে না সেটা ভাবলেন কী করে? সব জানা থাকলেই কি অ্যাকশন নেওয়া যায়? আমাদেরও অর্ডারের অপেক্ষা করতে হয়। আর কিছু কিছু অর্ডার কোনোদিনই আসে না। ফলে আমাদেরও কিছু করার থাকে না।’
অর্জুন ও তীর্থঙ্করবাবু নীরবে দৃষ্টিবিনিময় করলেন। অথচ দেখা গেল দুজনের কেউই একে অপরের চোখে চোখ মেলাতে পারছে না। টাপুরের মতো বাইরের একজনের সামনে এই কথাগুলো ওঠায় অস্বস্তি হচ্ছে। কথা ঘোরাতে অর্জুন বলল, ‘আমাদের আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।’ তারপর তীর্থঙ্করবাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার, আপনি কি যাবেন?’
‘আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, অফিশিয়ালি তা ওভার হয়েছে,’ বললেন তীর্থঙ্করবাবু, ‘কিন্তু আমাদের ধারণা যদি ঠিক হয়, যদি সুভাষ সরখেলই রেজর কিলারের শেষ ভিকটিম হয়, সেক্ষেত্রে সল্টলেক এলাকায় কোথাও খুনটা হওয়া উচিত। আর সল্টলেক কিন্তু ছোটো জায়গা নয়। বাইরের লোকেদের কাছে সল্টলেক কোনো গোলোকধাঁধার চেয়ে কম নয়। সেক্ষেত্রে সেখানে খুনি কোন জায়গায় খুনটা করবে তা আমরা জানি না। বিধাননগর থানায় ফোন করে ফোর্স পাঠাতে বলো। সেখানে ফোর্স না থাকলে লালবাজারে জানাও। মোট কথা, গোটা অঞ্চলটা ঘিরে ফেলার মতো ফোর্স দরকার। আমি আমার সল্টলেকের সোর্সদের অ্যাকটিভ করে দিয়েছি অলরেডি। আমি থাকব তোমাদের সঙ্গে। অ্যাট লিস্ট আমার সোর্সদের সঙ্গে কমিউনিকেট করার জন্য আমাকে থাকতেই হবে।
৪৭
সল্টলেকের বাসিন্দারা যা-ই বলুন, বাইরের লোকদের জন্য এখানকার রাস্তা সম্পর্কে তীর্থঙ্করবাবুর ব্যাখ্যা একদম ঠিক। নয়নের মতো ভালো ড্রাইভার অবধি কিছুক্ষণ ঘুরপাক খাওয়ার পর বাধ্য হয়ে জিপিএস অন করল।
শেয়ালদা থেকে সল্টলেক পৌঁছোনোর মাঝের সময়টুকুর মধ্যে বিধাননগর থানা পুরো ফোর্স নামিয়ে দিয়েছে রাস্তায়। অর্জুনরা গিয়ে পৌঁছোতেই বিধাননগর থানার সিনিয়ার ইন্সপেক্টর মিহির দত্ত এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘এত কম সময়ে যতটা সম্ভব হয়েছে, পুলিশ কভার করা হয়েছে। তবে আমাদের ফোর্সও লিমিটেড। রাস্তায় প্রতিটা গাড়ি থামিয়ে চেকিং চলছে। সন্ধের পর থেকে বিভিন্ন রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ লালবাজারে পাঠিয়ে দিয়েছি। সেখানে চেক করা হচ্ছে। আমরা টাইম টু টাইম আপডেট পাচ্ছি। আসলে সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কাছে সাসপেক্টের কোনো চেহারার বর্ণনা বা ছবি নেই যা দেখে মেলানো যেতে পারে।’
অর্জুন একবার টাপুরের দিকে তাকাল। তারপর মিহির দত্তের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছবি আছে। আমি বলে দিচ্ছি। আপনি পেয়ে যাবেন। যদিও প্রমাণ বা হাতেনাতে ধরা ছাড়া ছবি পেয়েও লাভ হবে না কিছু, তবে তাকে আটকে রেখে খুনটা আটকানো যেতে পারে।’
মিহির দত্ত মাথা নাড়লেন। তারপর নিজের টিমের দিকে এগিয়ে গেলেন। টাপুর অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমাদের সাসপেক্টের সম্পর্কে সব রকম ইনফরমেশন চাই অর্জুন। কাউকে বলো খবর নিতে।’
‘বলে দিয়েছি অলরেডি। খবর এসে গেলেই কনফার্ম হয়ে যাব। চিন্তা কোরো না।’
টাপুর দীর্ঘশ্বাস চাপল। অর্জুন চিন্তা করতে মানা করলেও চিন্তাটা যাচ্ছে কই? মিতুল ফোনে জানিয়েছে, রণজয়কাকু এখন নিরাপদ। জ্ঞানও ফিরে এসেছে। অল্পস্বল্প কথাও বলতে পারছেন। তবে কড়া সেডেটিভের প্রভাবে ঘোরের মধ্যে আছে। ডাক্তার বলেছেন, কাল সকালের মধ্যে অনেকটা সুস্থ বোধ করবেন তিনি। এটা বড়ো স্বস্তি।
পুরো এলাকাটা পুলিশে ছেয়ে গেছে। টাপুর ভাবল, সে না এলেই পারত এখানে সত্যিই তার কোনো কাজ নেই। বরং পুলিশ টিমের অনেকেই তার দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে। তার উপস্থিতিতে অস্বস্তি বা বিরক্তি বোধ করছে। ভালো তারও লাগছে না। কলকাতা পুলিশ ও বিধাননগর পুলিশ হাতে হাত মিলিয়ে নিজেদের পুরো ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাজ করছে। একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হয়ে টাপুর এর বেশি কীই বা করবে! বরং এই মুহূর্তে অর্জুনের কাছে হয়তো সে লায়াবিলিটি।
পায়ে পায়ে সে অর্জুনের দিকে এগিয়ে গেল। ও ব্যস্ত খুব। একটু অপেক্ষা করল। অর্জুন তীর্থঙ্করবাবুর সঙ্গে কথা বলছে হাত নেড়ে। ওকে উত্তেজিত দেখাচ্ছে। স্ট্রিটলাইটের হলদে আলো ওর মুখে এসে পড়েছে পাশ থেকে। কপালের উপর ঘামে ভেজা চুল। ঈষৎ ঘর্মাক্ত সাদা শার্ট পিঠের সুঠাম আদলকে পরিস্ফুট করে তুলেছে। পরিশ্রমী পুরুষ সুন্দর, বড়ো বেশি সুন্দর।
অর্জুন। হঠাৎ ঢেউয়ের মতো অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতি ভাসিয়ে নিয়ে গেল টাপুরের অন্তঃস্থল। এই মানুষটা তাকে ভালোবাসে। নিজের অনুভূতিকে লুকোয়নি সে কোনোদিন। টাপুরের জন্য অপেক্ষায় থেকেছে। জোর করেনি। ভালোবাসা ফিরেও চায়নি। শুধু পাশে থেকেছে। থাকতে চেয়েছে। অথচ টাপুর নিজের হৃদয়কে বুঝেও বুঝতে চায়নি। চোখ চেপে বন্ধ করে থেকেছে, পাছে অনুভূতি অনাবৃত হয়ে পড়ে তার নিজের হৃদয়ের কাছেই। কীসের যেন বাধা তাকে পরিপূর্ণ সমর্পণের দিকে এগোতে দেয়নি!
কিন্তু কী আশ্চর্য মানবহৃদয়! আজ এই মধ্যরাতে, এই চূড়ান্ত উত্তেজনার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে টাপুরের ভালো লাগছে। ইচ্ছে করছে অর্জুনের কাছে ছুটে যেতে। ওকে স্পর্শ করতে। ইচ্ছে করছে তার চোখে চোখ রেখে বলতে যে তার হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য শুধু অর্জুনের জন্যই সাজিয়ে রেখেছিল এতদিন ধরে। বলতে ইচ্ছে করছে, আজ রাতটুকু তার নিজেকে অনুভব করার রাত। আজ যদি সব কিছু ঠিকঠাক হয়, রেজর কিলার ধরা পড়ে, সাফল্যের মুহূর্তে অর্জুন জানবে তার অপেক্ষা শেষ হয়েছে।
‘টাপুর!’অর্জুন ডাকছে। নিজের হৃদপিন্ডের আচমকা লাফিয়ে ওঠা টের পেল টাপুর। নিজের উপরে রাগ হচ্ছে তার। এটা কী দুর্বল হওয়ার সময়! অর্জুন এগিয়ে আসছে তার দিকে। সামনে এসে বলল, ‘ফুটেজ চেক করে দেখা গেছে, রাত সওয়া দশটা নাগাদ একটা গাড়ি সেক্টর টু-এ ঢুকেছে। গাড়িটার নম্বর প্লেট ভুয়ো। কালো কাচ লাগানো ছিল।’
ক্ষণমুহূর্ত আগের ভাবনা টাপুরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তাই অর্জুনের কথাটা মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে সময় লাগল।
‘টাপুর? তুমি ঠিক আছ?’ অর্জুনকে উদ্বিগ্ন মনে হল।
‘না। না ঠিক আছি।’ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল টাপুর।
অর্জুন গভীর অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। বলল, ‘তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে। সারাদিন সেভাবে কিছু খাওয়াও হয়নি। তুমি বাড়ি যাও টাপুর।’
‘নো ওয়ে! তুমিও তো খাওনি। আমি যাব না।
‘প্লিজ। পুলিশ নিজের কাজ করছে। এখানে তোমার বিশেষ কিছু করার নেই। আর…’
অর্জুন বাকিটুকু বলতে যেন দ্বিধা করছে বুঝতে পারল টাপুর। ‘কী হল? বলো!’
‘দেখো। এখানে অনেক অফিসার র্যাঙ্কের পুলিশ কাজ করছে। প্রত্যেকে কতটা পরিশ্রম করছে তুমি দেখছ। সারা সল্টলেক ঘিরে ফেলা হয়েছে। লালবাজার থেকে আরও ফোর্স আসছে। কিন্তু সকলে তো সমান নয়। তোমাকে এখানে অনেকেই চেনে, বা নামে জানে। সমস্যাটা হল…’
‘আমার উপস্থিতি তারা পছন্দ করছে না। তাই তো?’ শীতল গলায় জিজ্ঞাসা করল টাপুর। অর্জুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁধ ঝাঁকাল।
নিজেকে সামলে নিল টাপুর। স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘বেশ। আমি চলে যাচ্ছি। অল দ্য বেস্ট! তবে কাজ শেষ হলে, রেজর কিলার ধরা পড়লে সোজা আমার বাড়িতে আসবে। কেমন?’
অর্জুন ঠোঁট টিপে হাসল। মুহূর্তের জন্য টাপুরের মনে হল, তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ সরিয়ে নিল সে।
‘আমি পুলিশ জিপ বলে দিচ্ছি। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে।’ অর্জুন বলল।
‘দরকার নেই। আমি ক্যাব করে নেব।’
‘না। এত রাতে তোমাকে ক্যাবে একা ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। বিশেষ করে যেখানে খুনি এখনও খ্যাপা ষাঁড়ের মতো খোলা ঘুরে বেড়াচ্ছে!’
টাপুর মাথা নাড়ল।
টাপুর বৈশাখী মোড় পার করার আগেই মিতুলের ফোনটা এল।
‘তুমি কোথায় টাপুরদি?’
‘সল্টলেকে। বাড়ি ফিরছি।’
‘বাড়ি ফিরছ মানে? খুনি ধরা পড়ে গেছে?’
‘না। পুলিশ নিজেদের কাজ করছে। এখানে আমার কিছু করার নেই রে।’
‘তুমি পিছিয়ে আসছ টাপুরদি? তুমি?’মিতুলের কণ্ঠস্বরে অবিশ্বাসের সুর বেজে ওঠে।
‘মিতুল, আসলে…’
‘তুমি যদি খুনিকে খুঁজতে না চাও, আমি একাই খুঁজব। আমার বাবাকে যে এতটা কষ্ট দিয়েছে, আমি তাকে ছাড়ব না।’ কেটে কেটে বলল মিতুল।
‘তুই কোথায়?’
‘সল্টলেকে ঢুকছি।’
‘সল্টলেকে? একা? এত রাতে? এটা তুই ঠিক করিসনি মিতুল। কাকু হাসপাতালে। তুই এই অবস্থায় একা এখানে এসেছিস?’ টাপুর বোধ হয় অবাক হতেও ভুলে যায়।
‘পিসি খবর পেয়ে শ্রীরামপুর থেকে এসেছে একটু আগে। বাবার কাছে হাসপাতালে থাকবে আজ রাতটা। আমাকে বাড়ি যেতে বলছিল। তাই চলে এসেছি। একা আসাটা সমস্যা নয়। গাড়ি নিজে ড্রাইভ করেই এসেছি।’
‘এক মিনিট হোল্ড কর।’ কথাটা মিতুলকে বলে টাপুর একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। তারপর ড্রাইভারকে বলল, ‘এখানে গাড়ি থামান প্লিজ। আমার এক বন্ধু আসছে। আমি ওর সঙ্গে যাব।’
‘স্যার আমাকে আপনাকে ঠিকমতো বাড়ি পৌঁছে দিতে বলেছেন, ম্যাডাম।’
‘কোনো অসুবিধে নেই। আমি আপনার স্যারের সঙ্গে কথা বলে নেব।’
ফোনটা কানে চেপে টাপুর বলল, ‘আমি বৈশাখী মোড়ের কাছে অপেক্ষা করছি। চলে আয়। তুই ঠিকই বলেছিস। কাজ শেষ না করে মাঝপথে এভাবে ফিরে যাওয়া যায় না।’
৪৮
রাতের সল্টলেক। স্ট্রিটলাইটের হলদে আলো ছাড়া বাকি সব ঘুমিয়ে আছে নিঃসাড়ে। মিতুল গাড়ি চালাচ্ছে চুপচাপ। টাপুর জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘তুই শিয়োর কাকু ঠিক শুনেছেন?’
‘জানি না। বাবা এখনও ঘোরের মধ্যে আছে। কথা খুব বেশি হয়নি। মাঝে একবার জ্ঞান এসেছিল, তখন যেটুকু ছাড়া ছাড়াভাবে বলেছে সেটাই বললাম তোমাকে। লোকটাকে সম্ভবত ফোনে কথা বলতে শুনেছিল বাবা।’ গম্ভীরমুখে বলল মিতুল।
টাপুর তাকাল ওর মুখের দিকে। রাস্তার আলো জানলার কাচ ভেদ করে মিতুলের মুখে এসে পড়েছে। সেই আলোয় ওর মুখটা অস্বাভাবিক ধারালো লাগছে। তীক্ষ্ণ নাক, ছোটো কপাল, ধারালো চিবুক। চোখের দৃষ্টিতে প্রতিজ্ঞা ও রাগ। আজ যেন ও খালি হাতে ফিরবে না বলেই বেরিয়েছে। মিতুলকে এত বছর ধরে চেনে টাপুর। নরমসরম মেয়ে ও। আবেগপ্রবণ। কিছুটা হঠকারীও। কিন্তু এতদিন ধরে যাকে জেনে এসেছে, তার সঙ্গে আজকের এই মিতুলের সামান্যতম মিল খুঁজে পাচ্ছে না সে। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে ওকে একা ছেড়ে দিত টাপুর!
‘ফোনে যদি এসব কথা আলোচনা করে থাকে, তাহলে ধরে নিতেই হয় যে খুনি একা নয়। ফোনের অপরপ্রান্তে আরও কেউ আছে যে পরিকল্পনার সবটুকু জানে। হয়তো খুনির সঙ্গী। উফ্, একা রামে রক্ষা নেই সুগ্রীব দোসর।’ পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করল টাপুর। মিতুল মৃদু হাসল। বা বলা ভালো, হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু ওর সেই পরিচিত হাসিটা খুঁজে পাওয়া গেল না।
মিনিট সাতেকের মধ্যে গাড়িটা এসে থামল খালের ধার ঘেঁষে একটা আবাসনের কাছে। এগুলি সরকারি লিজে পাওয়া জমিতে তৈরি কো-অপারেটিভ বিল্ডিং। এখানকার বাসিন্দারা বেশিরভাগই সরকারি চাকুরে বা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী। বিল্ডিংগুলি ডানহাতে রেখে পায়ে হেঁটে এগোল টাপুর ও মিতুল।
‘এই জায়গাটার কথাই বলেছিল কাকু?’ জিজ্ঞাসা করল মিতুল।
‘হুম’, চাপা গলায় উত্তর দিল মিতুল। ‘জড়িয়ে জড়িয়ে বলছিল। আমি যেটুকু বুঝেছি তাতে জায়গাটা এখানেই কোথাও হওয়া উচিত।’
‘চল। খুঁজে দেখা যাক।’
অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে এগোল দুজনে। এক মিনিটেরও কম সময়ে একতলা বাড়িটা প্রথমে টাপুরেরই চোখে পড়ল। খুব সাধারণ চেহারার একটা ছাদ পেটানো বাড়ি। ছাদের কিনারায় বিম থেকে লোহার রড মাথা উঁচিয়ে রয়েছে। এই বাড়ি যিনি বানিয়েছিলেন, হয়তো কোনোকালে দোতলা, তিনতলা তোলার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু বাস্তবে ছাদের চারপাশে কার্নিশটুকুও গড়ে ওঠেনি। ন্যাড়া ছাদের একদিক থেকে ইট খসে পড়েছে বেশ কিছু। বাড়িটার অবস্থাও জরাজীর্ণ। দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছে। বাড়ির সারা শরীর জুড়ে কালচে দাগছোপ। দরজা জানলাগুলোরও ভগ্নদশা। কোনোমতে টিকে রয়েছে। বারান্দার উপর ঢিপি করে রাখা সংসারের অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, আবর্জনা। যেন ভরা সংসার ফেলে এ বাড়ির লোকেরা বহুদিন আগে খুব তাড়াহুড়োয় চলে গেছিল বাড়ি ছেড়ে। আর ফিরে আসা হয়নি কোনোদিন। বাড়ির সামনের একচিলতে উঠোনে এখনও ছিন্ন কাপড় মেলার নাইলনের দড়ি ঝুলছে। গেটের পাশে স্টিলের প্লেটে লেখা বাড়ির নম্বর কষ্ট করে পড়ে বুঝতে হয়। সল্টলেকের মতো অভিজাত স্থানে এমন বাড়ি আশা করা যায় না।
‘টাপুরদি!’ টাপুরের হাত চেপে ধরল মিতুল। ওর হাত বরফের মতো শীতল, টের পেল টাপুর।
‘এই নম্বরটাই তো!’
‘এটাই বোধ হয়।’
নিঃশ্বাস ছাড়ল টাপুর। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল প্রাণপণে। তবু বুকের ভেতরের কাঁপুনিটা বন্ধ হচ্ছে না। এর আগেও বিভিন্ন কেসে তাদের রাতের বেলা দুঃসাহসিক অভিযান করতে হয়েছে। অম্লান চক্রবর্তীর বাড়িতে সিকিউরিটি ভেদ করে ঢুকতে হয়েছে। পার্থক্য একটাই। সেসব ক্ষেত্রে তাদের টার্গেট কোনো পাগল সিরিয়াল কিলার ছিল না।
পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে কাউকে একটা মেসেজ করল টাপুর। তারপর ফোনটা জিনসের পকেটে ঢুকিয়ে মিতুলের দিকে তাকিয়ে বলল, —চল। ভেতরে যাওয়া যাক।’
গেটটার অবস্থা খারাপ হলেও তালাটা একেবারে নতুন। সদ্য লাগানো হয়েছে। একবার গেটটা হাত দিয়ে মৃদু ঠেলল টাপুর। শব্দ করা যাবে না। তাতে খুনি সাবধান হয়ে যাবে। আজ রণজয় সেন না থাকলে এত সহজে এখানে পৌঁছোনো যেত না। ঐরকম খুনির কবলে থেকেও মাথাঠান্ডা রেখেছিলেন তিনি। ক্লোরোফর্মের প্রভাব কেটে গেলেও ঘুমের ভান করে পড়ে ছিলেন। মেঝের উপর শুয়ে থেকে ফোনে বলা কথাগুলো শুনেছিলেন কান পেতে। পরে উদ্ধার হওয়ার পর হাসপাতালে মিতুলকে জানিয়েছিলেন। কড়া সেডেটিভের ঘোরের মধ্যে শুধু বাড়ির নম্বরটাই বলতে পেরেছিলেন। খুনি নাকি বলেছিল, এটাই শেষ কাজ। আবর্তের মধ্যবিন্দুতে সল্টলেক। দুইয়ে দুইয়ে চার করতে অসুবিধে হয়নি।
‘কীভাবে ঢুকবে টাপুরদি?’ ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল মিতুল। টাপুর ততক্ষণে এগিয়ে গেছে খানিকটা। পরের বাড়িটি একটি তিনতলা বাড়ি। উঁচু দেওয়াল, বিশাল গেট। কালো গ্রানাইটের নেমপ্লেটে চোখ রাখলে বোঝা যায় বাড়িওয়ালা রাজ্য সরকারের একজন আমলা। গেটের উপর সিসিটিভি ক্যামেরা বাইরে থেকেও স্পষ্ট চোখে পড়ছে।
টাপুরের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘গেটে সিকিয়োরিটি নেই দেখছি।’
‘তুমি কী করার কথা ভাবছ টাপুরদি? এই বাড়িতে কী করবে?’
‘এখান দিয়েই ঢুকব ভাবছি।’
একটু অবাক হল মিতুল। বলল, ‘কেন? ওই বাড়ির গেট তো এমনিতেই দুর্বল। তাছাড়া দেওয়ালও খুব বেশি হলে বুক সমান উঁচু হবে। ওই দেওয়াল পেরোতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।’
‘জানি। কিন্তু আমি চাইছি না খুনি যদি সত্যিই ওই বাড়িতে থেকে থাকে, তাহলে সে সচেতন হয়ে যাক।’ বিড়বিড় করে কতকটা নিজের মনেই বলল টাপুর। তারপর হালকা পায়ে হেঁটে পেরিয়ে গেল পরের বাড়িটাও। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাড়ির মাঝে খানিকটা ফাঁকা জায়গামতো আছে দেখা গেল। হাঁটা পথ নয়, নেহাতই দুই বাড়ির মাঝের জায়গাটুকু। কষ্ট করে হেঁটে পেরোনো যেতে পারে।
মিতুলের মনে পড়ে গেল, অমিয় চক্রবর্তী হত্যারহস্য সমাধানের সময় এরকমই একটা গলির ভেতর দিয়ে ঢুকতে হয়েছিল তাদের তন্ময়ের খোঁজে। সেদিন জীবনে প্রথমবার গাছেও চড়েছিল মিতুল। মনে হতে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল তার। মনে হল, আজ যদি টাপুরদি সঙ্গে না থাকত, মুখে যাই বলুন, একা একা এই বাড়িতে ঢোকার সাহস সত্যিই তার হত না। টাপুরদির উপস্থিতিটাই তাকে আলাদা সাহস যোগায়। এখনও তার ব্যতিক্রম হল না।
‘সাবধানে আয়, মিতুল। যা জঙ্গল হয়ে রয়েছে জায়গাটা, সাপখোপ না থাকুক, বিষাক্ত পোকামাকড় থাকতেই পারে।’
নিঃশব্দে পা টিপে এগোল মিতুল। টাপুরের মোবাইল টর্চ মাটির দিকে তাক করা। ওই আলোয় রাস্তাটা পার হয়ে যেতেই একটা বিশাল অট্টালিকার পেছনে এসে পড়ল তারা। উঁচু পাঁচিলের পেছন থেকে তারস্বরে অন্তত দুটি কুকুর চিৎকার করছে।
‘টাপুরদি…’
টাপুর তর্জনী তুলে আঙুলে ছোঁয়াল। তারপর দ্রুত মিতুলের হাত ধরে টান দিল। লম্বা লম্বা পা ফেলে ওরা হাজির হল ভাঙাচোরা বাড়িটার পেছনে।
‘অ্যান্ড, হেয়ার ইজ… বিঙ্গো…,’ চাপা গলায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল টাপুর। মিতুলও বিস্মিত। বাড়িটার পেছনের দেওয়ালটা প্রায় ভেঙে পড়েছে। ভেতরে জঙ্গল, আগাছা আছে বটে, তবে তা তাদের পথরোধ করার মতো দুর্গম নয়। তার চেয়ে বড়ো কথা হল, পেছনের দেওয়ালের মাথায় ঘুলঘুলি দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ঘরের ভেতর কম পাওয়ারের আলো জ্বলছে।
‘টাপুরদি?’
‘হুম!’
‘রিভলভারটা নিয়েছ সঙ্গে?’
টাপুর উত্তর দিল না। শুধু মিতুলের ধরা হাতে আলতো করে চাপ দিল। ‘লেটস গো ইনসাইড!
পালকের মতো নরম পায়ে দুজনে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। এখান থেকে বাড়ির মধ্যে কারোর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। টাপুর পায়ে পায়ে এগোতে লাগল। একটু এগোতেই শুকনো পাতায় পা লেগে হালকা মচমচ শব্দ উঠল। চমকে সরে গেল টাপুর। মিতুল ওর হাত আঁকড়ে ধরল আবার।
ডান দিকে বাঁক নিতেই একটা খাটো দরজা চোখে পড়ল। এটা সম্ভবত সিঁড়ির ঘর। আলতো করে দরজায় একটু চাপ দিতে বোঝা গেল ভেতরে ছিটকিনি তোলা। তবে তা আলগা হয়ে এসেছে। একটু জোরে ঠ্যালা দিলেই ভেঙে যাবে হয়তো কিন্তু তাতে শব্দ হওয়ার সম্ভাবনা।
‘কী করবে?’ চাপাস্বরে জিজ্ঞাসা করল মিতুল।
‘সামনে দিয়ে ঢোকা সেফ হবে না রে। এই দরজাটা ব্যবহার করতে পারলে ভালো হত। দাঁড়া দেখছি।’
টাপুর সামনের দরজাটা বাঁ হাতে টেনে ধরতেই দুটি দরজার মাঝে আধ সেন্টিমিটার মতো ফাঁক তৈরি হল। কোমরের বেল্টের মধ্য থেকে ছোটো একটা ফোল্ডিং ছুরি বের করে আনল সে। এই বেল্টটা আলাদা করে অর্ডার দিয়ে বানানো। কিছু কিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এতে ভরা থাকে। সেরকম বিপজ্জনক কেস থাকলে এটা পরে নেয় টাপুর
ছুরিটার নীচে ছোটো বোতাম টিপতেই ভাঁজ খুলে গেল। সেটা দরজার ফাঁক দিয়ে উপরদিকে উঠিয়ে খানিক নাড়াচাড়া করতেই পুরোনো কাঠের একটা টুকরো খসে পড়ল। একটু শব্দ হল বটে তবে সেটা তেমন জোরদার নয়। টুকরো ভাঙার ফলে দরজার উপরদিকে যে ফোকরটা তৈরি হল, তা দিয়ে সহজেই হাত গলিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে ফেলতে পারল টাপুর।
‘চলে আয় মিতুল।’
ভেতরে ঢুকতেই একরাশ অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের দৃষ্টিপথের উপর।
‘মোবাইল টর্চটা জ্বালবে টাপুরদি?’ জিজ্ঞাসা করল মিতুল।
‘নাহ্, সেটা ঠিক হবে না। লোকটা কোথায় লুকিয়ে বসে আছে কে জানে! আলো জ্বাললে ধরা পড়ে যাওয়ার চান্স আছে।’
হাতড়ে হাতড়ে এগোতে দেখা গেল, সিঁড়ির পাশে আরেকটা দরজা রয়েছে। সেটা হাত দিয়ে সামান্য ঠেলতেই খুলে গেল। টাপুর হঠাৎই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দু-পা পিছিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলল, ‘তুই বেরিয়ে যা মিতুল। ভেতরে আমি একা যাব।’
‘নো ওয়ে। আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি। তুমি না এলেও আমি আসতাম তা তোমাকে আগেই বলেছি। বিপদের সম্ভাবনা থাকলে তুমি বাইরে যাও টাপুরদি। বাকিটা আমাকে দেখে নিতে দাও।’
মিতুলকে এভাবে কথা বলতে কখনও শোনেনি টাপুর। অবাক হয়ে তাকাল ওর মুখের দিকে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আমাদের দুজনের ভালোর জন্যেই বলছিলাম রে। আমার কিছু হলে তুই অন্তত অর্জুনকে খবর দিতে পারতিস। একসঙ্গে দুজনের এই বিপদে পা দেওয়াটা ঠিক নয় ভেবেই বলেছিলাম। যাক গে, আয়।’
মিতুলের খারাপ লাগল। মনে হল, টাপুরদিকে এভাবে না বললেই হত। আসলে আজ সকাল থেকে তার স্নায়ুর উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে তাতে তার মাথাও ঠিকভাবে কাজ করছে না। প্রচন্ড রাগ তাকে মধ্যরাতে এই বিপদের মধ্যে টেনে এনেছে, যেখানে অন্য সময় হলে সে আসার কথা ভাবতেও পারত না। টাপুরদির অন্যান্য কেসে মিতুল বরাবর ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছে। কিন্তু এবারে নিজের কাজ, অনসাইটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল, সেভাবে নিজেকে জড়ায়নি সে। বা সময় পায়নি। তবু ভাগ্যের এমন পরিহাস, এই কেসেই সে সবচেয়ে বেশি করে জড়িয়ে পড়ল। মা বরাবর তাকে টাপুরদির সঙ্গে গোয়েন্দাগিরি করা থেকে আটকাতে চেয়েছে। বাবারই উৎসাহ ছিল। নিজের পেশাগত সূত্র ধরে অন্ধকার জগতটাকে খুব কাছ থেকে চিনতেন রণজয় সেন। এর বিপদ জানতেন ভালো করেই। তবু একবারের জন্যেও মিতুলকে আটকাননি বাবা। অথচ আজ সেই মানুষটা হাসপাতালে পড়ে আছেন যখন, মিতুক কীভাবে হাল ছেড়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারত!
একটু অন্যমনস্ক হয়ে দরজার সামনে বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল মিতুল। খেয়াল করেনি যে টাপুরদি ভেতরে ঢুকে গেছে। অন্ধকার ঘরে ভেতর থেকে একটা কিছু পড়ার শব্দ আসতেই চমকে উঠল সে। তড়িঘড়ি ঘরের ভেতরে পা দিতেই মাথায় ভারি কিছুর আঘাত পেয়ে ছিটকে পড়ল মিতুল।
‘আঃ!’
একবার হাত বাড়িয়ে কিছু আঁকড়ে ধরতে চাইল সে। চোখের সামনে একটা কালো পর্দা নেমে এল ঝুপ করে।
৪৯
জ্ঞান ফিরতে মাথার পেছনে ব্যথা টের পেল মিতুল। টাপুরদি কোথায়! দু-বার ডেকেও সারা মিলল না। সারা ঘর জুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যে দরজা দিয়ে তারা ঘরে ঢুকেছিল, এখন সেটাও বন্ধ। উঠে বসতে গিয়ে মিতুল টের পেল তার শরীরে শক্তি অবশিষ্ট নেই এতটুকু। অতি কষ্টে দুই হাতে ভর করে উঠে দাঁড়াল সে। খুনি তার হাত পা বাঁধেনি। টলতে টলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ।
অন্ধকারে চোখে কিছুটা সয়ে এসেছে এতক্ষণে। সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে দেখল মিতুল। নাহ্, টাপুরদি কোথাও নেই। এর আগেও এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাদের। কিন্তু তখন টাপুরদি সঙ্গে ছিল। লোকটা টাপুরদির কোনো ক্ষতি করেনি তো! কথাটা মনে হতেই শিরদাঁড়া বেয়ে হিমশীতল একটা স্রোত বয়ে গেল তার। টাপুরদি আসতে চায়নি। এই প্রথমবার সে কোনো কেস থেকে স্বেচ্ছায় সরে যেতে চেয়েছিল। মিতুল তাকে এখানে টেনে এনেছে নিজের স্বার্থে। টাপুরদির কিছু হয়ে গেলে মিতুল অর্জুনদাকে কী জবাব দেবে!
দরজায় প্রাণপণে ধাক্কা মারল মিতুল। শরীরের সবটুকু শক্তি একত্রিত করে চিৎকার করে নাম ধরে ডাকল টাপুরের। কেউ সাড়া দিল না। সারা বাড়ি জুড়ে পিনপতন স্তব্ধতা। সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। টাপুরদি সবসময়ে বলে বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। মনের শক্তিই আসল। এই লড়াইটা মিতুলের। তাকে এটা জিততেই হবে।
বেশ কয়েকবার খুব দ্রুত গভীর নিঃশ্বাস নিল মিতুল। তারপর ছুটে গিয়ে কাঁধ দিয়ে দরজায় ধাক্কা মারল। কাঁধের কাছটা ঝনঝন করে উঠল যন্ত্রণায়। দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল সে ব্যথার আর্তনাদ আটকাতে। দম নিল একটু। তারপর আবার একইভাবে গিয়ে আঘাত করল দরজায়। একবার দু-বার তিনবার চারবারের বার মড়মড় শব্দ শোনা গেল। পুরোনো কাঠের দরজা নিরাশ করল না মিতুলকে। আরও বার দুয়েকের ধাক্কায় একদিকের পাল্লা ভেঙে পড়ল।
আবারও সেই সিঁড়ির ঘর। কেউ কোথাও নেই। মিতুলের মনে পড়ল, দেওয়াল টপকে ঢোকার মুখে পেছনের দিকের একটা ঘরে আলো জ্বলতে দেখেছিল তারা। এই মুহূর্তে একটুও আর ভয় করছে না মিতুলের। এত অবধি এগিয়ে এসে আর পেছোনোর জায়গা নেই। এই মুহূর্তে খুনিকে ধরার চেয়েও জরুরি টাপুরদিকে খুঁজে বের করা।
অজ্ঞান হওয়ার আগে ঠিক কী ঘটেছিল, মনে করার চেষ্টা করল মিতুল। সে ও টাপুরদি একসঙ্গেই এই ঘরে ঢুকেছিল। টাপুরদি আগে, মিতুল পরে। অন্ধকার ঘরে পা রাখতেই মাথায় আঘাত পেয়েছিল সে। তার পরে আর কিছু মনে নেই। অর্থাৎ খুনি ঘরের ভেতরেই অপেক্ষা করছিল। মাথায় আঘাত করা ছাড়া মিতুলেরও আর কোনো ক্ষতি করেনি। এর একটাই অর্থ হয়। খুনি শুধু তাকে অজ্ঞান করতেই চেয়েছিল। মারতে নয়।
অন্যদিকে টাপুরদি আগে ঘরে ঢুকলেও অন্ধকারে খুনিকে দেখতে পায়নি। কিন্তু মিতুলের আর্তনাদ শুনে নিশ্চয়ই বুঝেছিল যে ঘরে তারা ছাড়াও আরও কেউ উপস্থিত আছে। সেই মুহূর্তে কী করেছিল টাপুরদি? পালিয়ে গেছিল! না, টাপুরদি মিতুলকে বিপদের মুখে ফেলে কোনোদিন পালাবে না। সম্ভবত এই অন্ধকারে, অচেনা পরিবেশে আততায়ীর সঙ্গে লড়াইও করতে পারেনি। সেরকম হলে মিতুল এখানে এভাবে পড়ে থাকত না। অর্থাৎ, আততায়ী টাপুরদিকে ও কিছু করেছে।
সিঁড়ির দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল মিতুল। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বাড়ির সামনের দিকে এগোলো। বারান্দায় উঠে সামনের দরজার দিকে তাকাল। কী আশ্চর্য! দরজাটা ভেজানো বটে, কিন্তু বন্ধ নয়। অথচ এই বাড়িতে ঢোকার সময়ে এই দরজায় তালা ছিল, স্পষ্ট মনে আছে মিতুলের। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। খোলা দরজা দিয়ে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো ঢুকছে। সেই আলোয় দেখতে পেল, ঘরটা বেশ বড়ো। এই ঘরটা হয়তো একসময় ড্রইংরুম হিসেবে ব্যবহার হত। এখন বহুদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার ফলে দেওয়ালে, ছাদে ঝুল জমেছে। মেঝের উপর পুরু ধুলোর আস্তরণ।
হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় পকেটে হাত দিল মিতুল। মোবাইলটা পকেটেই আছে। বুকের দম চাপা ভাবটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে এল মিতুলের। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে মোবাইল বের করে টাপুরদির নম্বর ডায়াল করল সে। রিং হচ্ছে না। ফোন সুইচ অফ। ফোন ধরা হাতটা কাঁপছে তার। অর্জুনের নম্বর ডায়াল করল সে এবার।
‘হ্যালো, মিতুল, কোথায় তুমি?’ অর্জুন উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল।
মিতুল তাকে সংক্ষেপে সবটুকু জানাল।
‘টাপুর আমাকে মেসেজ করেছিল। কিন্তু ব্যস্ত ছিলাম বলে হোয়াটস্যাপ চেক করা হয়নি আমার। জাস্ট দু-মিনিট আগে দেখলাম। এসব কেন করলে তোমরা? অন্তত একবার ফোন করে তো জানাতে! আমি আসছি। তুমি এক্ষুনি ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসো। আর এক সেকেন্ডও ওখানে থাকবে না তুমি।’
ফোনটা রেখে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল মিতুল কয়েক মুহূর্ত। অর্জুনদা আসছে। কিন্তু এখন তো এখান থেকে যাওয়া চলবে না তার। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে দৃপ্তপদে এগিয়ে গেল মিতুল। এই ঘরের ডানদিকে ও সামনে দুটি দরজা আছে। কোণের দিকে একটা বাথরুম আছে যদিও সেটা পুরোপুরি ভাঙা। সামনের দরজাটা হাট করে খোলা। সেটা দিয়ে প্রথমে ঢুকল সে। এটা একটা ছোট্টো ঘর। দেওয়ালে শেল্ফ রয়েছে। অর্থাৎ কোপোকালে এটি কিচেন হিসেবে ব্যবহৃত হত। এই ঘরের অন্যদিকে আরেকটা দরজা রয়েছে। সেটা অবশ্য বন্ধ। মিতুলের মনে হল, বন্ধ দরজার উল্টোপাশে যে ঘরটি রয়েছে, সম্ভবত সেখানেই সে বন্দি ছিল। এখানে কাউকে চোখে পড়ল না তার।
বেরিয়ে আবারও ড্রইং রুমে এসে পৌঁছোল সে। ডানদিকের দরজাটা বন্ধ। এই বাড়িতে ঢোকার সময় এ ঘরেই আলো জ্বলতে দেখেছিল তারা। অদ্ভুত ব্যাপার এই দরজায় নতুন স্টিলের ডোরলক লাগানো হয়েছে।
খুব সহজেই দরজা খুলে ফেলতে পারল সে। ঘরের ভেতরে ঘন অন্ধকার। আসবাবের মধ্যে একটা ফোল্ডিং কট আর টেবিল দেখা যাচ্ছে আবছা। মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালাতেই ভেতরটা দৃশ্যমান হল। ভেতরে পা দিতেই পা দুটি জমে গেল তার। ঘরের মেঝেতে থৈ থৈ করছে রক্ত। কটের পাশে ঠিক পাশেই সেই রক্তের মধ্যে চিৎ হয়ে পড়ে আছে একজন মানুষ। চোখদুটো বিস্ফারিত। মুখ খোলা। বুকের মধ্যে একটা ছোরা আমূল বেঁধানো।
লোকটাকে চেনে মিতুল। এখানে আসার পথেই টাপুরদি মোবাইলে ছবি দেখিয়েছিল। কলকাতা পুলিশের কর্মী, মহাত্মা গান্ধী রোড থানার সাব ইন্সপেক্টর সঞ্জয় পাল। মহানগরের বুকে ঘটে চলা একের পর এক খুনের হোতা, রেজর কিলার সঞ্জয় পাল এই মুহূর্তে মৃত অবস্থায় শুয়ে আছে মিতুলের সামনে।
গা গুলিয়ে উঠল মিতুলের। চোখের সামনে পুরো ঘরটা দুলছে। তারপরেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল দরজার সামনে ধুলোর উপরে!
