প্রলয় ঘূর্ণি – ২০

২০

৩১এ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার, ট্যাঙরা, রাত সাড়ে তিনটা

সদ্যোজাত নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছে এ শহর। নগরীর রাস্তায়, মোড়ে, প্রতিটি গলিতে আজ সারারাত আলো জ্বলবে। পার্কস্ট্রিটের রেস্তোরাঁ বারগুলি রাত পার করে প্রায় ভোর পর্যন্ত খোলা থাকবে আজ। যতদিন সেবাস্টিন বেঁচে ছিল, ডক্টর নিরুপমা গোমস প্রতি বর্ষবরণের রাতে হাসপাতাল থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতেন। যেতেন চায়না টাউনে তাঁদের প্রিয় রেস্তোরাঁয়। রাতের ডিনার সেরে সারারাত সেই কলেজ জীবনের মতো কলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন তারা। কখনও পার্ক স্ট্রিটে যেতেন। বো ব্যারাকের ফুটপাথে হাতে হাত রেখে হেঁটে বেড়াতেন। কখনো বা লং ড্রাইভে যেতেন ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে। সারা বছর ধরে বাড়ি, হাসপাতাল, নার্সিং হোমে শাটল ককের মতো ছিটকে বেড়াতে হত দুজনকেই। তাই ওই একটা রাত তারা দুজনে দুজনকে দিতেন। শত ব্যস্ততাতেও এর অন্যথা হয়নি কখনও।

পাঁচ বছর আগে একদিন ঘুমের মধ্যেই চলে গেল সেবাস্টিন। সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। শহরের নামি কার্ডিওলজিস্ট নিরুপমা গোমস তার স্বামীর চিকিৎসা করার সুযোগটুকু পেলেন না। সেবাস্টিন ছিল প্রেমিক স্বামী, স্নেহময় পিতা। খেতে ও খাওয়াতে ভালোবাসত। সকলকে নিয়ে হইহই করে বাঁচতে ভালোবাসত। কবে যে নিজের হৃদপ্রকোষ্ঠে ও রক্তনালীতে অতিরিক্ত পরিমাণে স্নেহ সঞ্চয় করে বসেছিল সে, নিরুপমা জানতেই পারেননি। যখন জানলেন, তখন সব হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে।

সেই থেকে নিজেকে সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু বাড়ি আর কাজের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছিলেন নিরুপমা। তিনটে বছর কেটেছিল এভাবেই। একমাত্র মেয়ে সিডনিতে থাকে, সেখানেই এক সাহেব ডাক্তারকে বিয়ে করেছে। নিজেদের একটা ছোটো হাসপাতাল শুরু করেছে ওরা। অল্প বয়স, অনেক স্বপ্ন চোখে। নিরুপমাকে ওরা বারবার অনুরোধ করছে যাতে তিনি সিডনি চলে যান, তাদের হাসপাতাল জয়েন করেন। সিটিজেনশিপের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

এতদিন রাজি হননি নিরুপমা। এই শহরে তার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সেবাস্টিনের সঙ্গে সেই মেডিকেল কলেজে পরিচয়, সেখান থেকে প্রেম, বিয়ে, মা হওয়া। এই শহর ছেড়ে ভালো থাকবেন না। কিন্তু সেবাস্টিনের অনুপস্থিতি তাঁকে অহরহ পোড়ায়। আজকাল বড্ড ক্লান্ত বোধ করেন। শরীর ভালো যায় না। বয়সজনিত নানান রোগ বাসা বেঁধেছে দেহে। তা ছাড়া হার্টে পেসমেকার বসানো হয়েছে বছর চারেক হল। হার্টের ডাক্তারের নিজের হৃদয়ের অবস্থা গতিকের নয়, এই খবরটা রটে গেলে পেশাগত জীবনেও প্রভাব পড়তে বাধ্য। তাই অপারেশনটা গোপনেই হয়েছে।

আজকাল তাই একা থাকতে ভয় হয়। হয়তো একদিন সকালে তাঁরও আর ঘুম ভাঙবে না। কেউ জানতেও পারবে না যে তিনি আর নেই। তাছাড়া মেয়েটাও মা হতে চলেছে। আজকাল নিরুপমারও মাঝে মাঝে কচি স্পর্শ অনুভব করতে ইচ্ছে হয়। তাই ঠিক করেছেন, সিডনিতে চলেই যাবেন তিনি। এই বয়সে শেকড় উপড়োতে কষ্ট হয়তো হবে, কিন্তু এ শহরে এই একাকিত্ব আর সহ্য হচ্ছে না। জীবনের আর যে কটা দিন বাঁচবেন, আপনজনদের সঙ্গেই কাটাবেন নতুন দেশে।

সেইমতো যেসব হাসপাতালে ভিজিটিং কনসাল্ট্যান্ট ও সার্জেন হিসেবে কাজ করেন তিনি, সকলকেই জানিয়ে দিয়েছেন যে জানুয়ারির পর থেকে আর কাজ করবেন না। জানুয়ারির মধ্যে ভিসা এসে যাবে। আপাতত পার্মানেন্ট রেসিডেন্টশিপের অ্যাপ্লাই করেছেন। পিআর পেতে অসুবিধে হবে না। তারপর ওখানে ভালো লাগলে সিটিজেনশিপ নিয়ে পাকাপাকিভাবে থেকে যাবেন।

সেবাস্টিনের মৃত্যুর পর এই প্রথমবার কিছুটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি বর্ষবরণের রাতে বাড়ি থেকে বেরোলেন। গত আঠারো বছর ধরে তিনি মেডিকেয়ার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে কাজ করছেন। বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডাক্তারদের জন্য শহরের ফাইভ স্টার হোটেল রয়্যাল প্যালেসে একটি পার্টির আয়োজন করেছিল। অন্যদিন হলে হয়তো যেতেন না। কিন্তু কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার আগে এই শহরটার প্রতি ভীষণ টান অনুভব করছেন তিনি। সহকর্মীরা বারবার অনুরোধ করেছিল এক ঘন্টার জন্য হলেও একবার অন্তত যেতে। সকলের অনুরোধ ফেলতে পারেননি নিরুপমা গোমস। তবু ভেবেছিলেন বারোটা বাজলেই পার্টি ছাড়বেন। কিন্তু সেটা আর হল কই? দু-কথা চার কথা, বিদায় সম্ভাষণে সময় গড়াতে গড়াতে কখন একটার কাঁটা ছুঁল, টেরও পাননি তিনি।

হোটেলের লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক লাগছিল নিরুপমার। সেবাস্টিনের মৃত্যুর পর নিজেকে যেন স্বরচিত কারাগারে বন্দি করে রেখেছিলেন তিনি। আজ অনেকদিন পর এই পার্টিতে এসে অনুভব করলেন যে সকলের মাঝে ভালো লাগছে তাঁর। তারপরেও একটা অপরাধবোধ তাকে ভেতরে ভেতরে পীড়া দিচ্ছে। তবে কি সেবাস্টিনকে ভুলে যাচ্ছেন নিরুপমা? ওঁকে ছাড়া বাঁচাটা সহনীয় হয়ে যাচ্ছে তাঁর কাছে?

লিফট সামনে এসে দাঁড়াতে ভেতরে ঢুকলেন। লিফটে তিনি ছাড়াও একজন লোক রয়েছে। জিনসের উপর কালো হুডি, মাথায় টানা টুপি। নিরুপমাকে দেখে হেসে ঘাড় নাড়ল লোকটা। বলল, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার, ম্যাডাম!’

নিরুপমা চিনতে পারলেন না লোকটিকে। লোকটা হয়তো চেনে তাকে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ শহরে ডক্টর নিরুপমা গোমসকে চেনার লোক কম নেই। নিরুপমাও সৌজন্যমূলক হেসে মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার!’

নিরুপমা লিফটে দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটা লিফটের দেওয়ালে হেলান দিয়ে রয়েছে তার পেছনেই। লিফট মন্থরগতিতে নীচে নামছে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে তার গাড়ি রয়েছে। নিজেই ড্রাইভ করে এসেছেন তিনি।

লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোর পেরোতেই নিরুপমা একমুহূর্তের জন্য অনুভব করলেন যে পেছনের ব্যক্তিটি তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকানোর চেষ্টা করলেন তিনি। তার আগেই লোকটা পেছন থেকে তার নাক-মুখ চেপে ধরল। একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে এল তাঁর। পরমুহূর্তে অনুভব করলেন যে ধীরে ধীরে অন্ধকার গহ্বরের ভেতর তলিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

জ্ঞান ফিরতে নিরুপমা গোমস প্রথমটা কিছু বুঝতে পারলেন না তিনি কোথায় আছেন। জায়গাটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। ধীরে ধীরে চোখটা সয়ে এল। চারিদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে মোঙ্গলীয় অন্দরসজ্জা দেখে বুঝলেন, জায়গাটা সম্ভবত কোনো চিনা হোটেলের ভেতর। মাঝে বেশ কয়েক বছর আসা হয়নি। তবে স্থানটি অপরিচিত বলে মনে হল না। উঠে বসার চেষ্টা করলেন তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে টের পেলেন শরীরে কোনো সাড় নেই। হাত-পা কিছুই নড়ছে না। কথা বলার চেষ্টা করে বুঝলেন স্বরযন্ত্র প্রায় বিকল। এই মুহূর্তে ডক্টর নিরুপমা গোমস একটি জড় পদার্থে পরিণত হয়েছেন। নিরুপমা ডাক্তার। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে তাঁর শরীরে একাধিক স্থানে লিডোকেইন জাতীয় ওষুধ ইনজেক্ট করা হয়েছে। যার ফলস্রুতিতে এই সাময়িক সারহীনতা।

সামনে অন্ধকারে শরীর মিশিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেউ, দারুমূর্তির মতো স্থির। নিরুপমা স্পষ্ট দেখতে না পেলেও অনুভব করতে পারছেন তাকে

‘কে আপনি? কী চান?’ হালকা গোঙানির মতো জড়ানো স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন নিরুপমা।

এবার সামনে এগিয়ে এল লোকটা। রেস্তোরাঁর রঙিন কাচের শার্সি ভেদ করে নরম আলো প্রবেশ করছে। সেই আলোয় লোকটাকে দেখতে পেলেন নিরুপমা। পরনে জিনসের উপর সেই কালো হুডি জ্যাকেট। পায়ে কালো চামড়ার বুট। মাথার উপর টানা টুপির কারণে মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। মাথা নীচু করে নিরুপমাকে মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করল লোকটা। কোনো উত্তর দিল না।

নিরুপমা টের পেলেন গলার কাছে কান্না দলা পাকাচ্ছে। প্রচন্ড ভয় তাঁর মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করছে। কিন্তু তিনি একজন সার্জেন। অপারেশন থিয়েটারে চূড়ান্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখার কৌশল দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আয়ত্ব করেছেন। তাই আজও কান্নাটাকে ঠেলে দিতে পারলেন কণ্ঠনালীর নীচে। সেভাবেই বললেন, ‘আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছেন? আমি কি আপনার কোনো ক্ষতি করেছি?’

সামনের লোকটি নীরব।

নিরুপমার জিভ জড়িয়ে যাচ্ছে। কথা বলতে অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে। তবু সেভাবেই বললেন, ‘আমাকে ছেড়ে দিন। যেতে দিন প্লিজ।’

লোকটা এগিয়ে আসে। এবার তার মুখ দেখতে পান নিরুপমা। চিনতে অসুবিধে হয় না, আজ রাতে লিফটে দেখা সেই লোকটা। ডক্টর নিরুপমা গোমস নিজের স্মৃতিতে হাতড়াতে থাকেন। এর আগে কি কোথাও দেখেছেন একে! মনে পড়ে না।

চুপ করে থাকেন নিরুপমা।

‘কত টাকা চাই আপনার? আমি দিতে রাজি আছি!’ খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো শেষ চেষ্টা করেন নিরুপমা। আলো-আঁধারিতেও লক্ষ করেন লোকটার গম্ভীর মুখ। ঠিক সেই মুহূর্তে নিরুপমা অনুভব করলেন কথাটা বলা ভুল হয়ে গেল।

লোকটা নিরুপমার মুখের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে কেটে কেটে বলল, ‘ঠিক এই কথাটা আপনাকে সেদিন আমিও আপনাকে বলেছিলাম, মনে পড়ে? কত টাকা লাগবে আপনার! আপনি তো টাকা নিয়ে আমার ভাইটাকে বাঁচিয়ে দিতে পারতেন সেদিন ম্যাডাম। আপনি তো সেটা করেননি। মনে পড়ে? এরকমই নিউ ইয়ার ইভ ছিল সেদিনও।’

নিরুপমাদেবী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করেন। এই মুহূর্তে কে জানে কোন অজ্ঞাত কারণে তার আর ভয় করছে না। বরং মনে হয় সেবাস্টিন খুব কাছেই কোথাও তাঁর অপেক্ষায় আছে। কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। এ শহরের শরীর জুড়ে রয়েছে সেবাস্টিনের স্মৃতি। সেই জন্যই বোধ হয় সেবাস্টিন আজ তাকে নিতে এসেছে।

যখন নিরুপমা গোমস এসব ভাবছেন, ততক্ষণে লোকটি নিজের ব্যাগপ্যাক থেকে লোকটা ধীরে-সুস্থে সিরিঞ্জ, অ্যাম্পিউল, স্পিরিট বের করল। ইঞ্জেকশনে তরল ওষুধ টানতে টানতে যেন কতকটা আপনমনেই বলল, ‘এটা একটা গেম, জানেন তো। আপনি আপনার চাল দিয়ে দিয়েছেন। এবার আমার চাল দেওয়ার পালা। সমান ঘর ঘুঁটি এগোতে হবে আমাকেও। আই ফর আই, ব্লাড ফর ব্লাড, লাইফ ফর লাইফ।’

লোকটা নিরুপমার শিরায় প্রবেশ ওষুধ করাল। একবার, দুবার, তিনবার … প্রতিবারই তরলটিকে ভীষণ দ্রুতগতিতে শরীরের ভেতরে ঠেলে পাঠিয়ে বেশ যত্ন করে তুলোয় স্পিরিট ডুবিয়ে মুছে দিল জায়গাটা। নিরুপমা চোখ বুজে শুয়ে রইলেন সেভাবেই।

কয়েক মিনিট কেটে গেল। বুকের ভেতর যন্ত্রণাটা এখন বেশ টের পাচ্ছেন ডক্টর নিরুপমা গোমস। ব্যথাটা বাড়ছে ক্রমশ, ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর বাঁ হাত, ঘাড় ও চোয়াল বেয়ে। কার্ডিওলজিস্ট তিনি। এই ব্যথার অর্থ বুঝতে তার অসুবিধে হয় না। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগলেন তিনি। মাথার ভেতর কেউ যেন হাজারটা হাতুড়ি একসঙ্গে পিটছে। নীচের চোয়ালটা বেঁকে যাচ্ছে। চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে যন্ত্রণায়। একেই কি মৃত্যুযন্ত্রণা বলে!

মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই মুহূর্তে আশ্চর্যজনকভাবে নিরুপমা গোমসের মনে পড়ে গেল ঘটনাটা। আজকের মতো এক বর্ষবরণের রাতে এক কিশোরকে নিয়ে তার পরিবারের লোকেরা এসেছিল হাসপাতালে। খেলার মাঠে হার্ট অ্যাটাক। এমনিতেই সব সেরে বেরোতে দেরি হয়ে গেছিল সেদিন। সেবাস্টিন ট্যাংরায় তাদের প্রিয় চাইনিজ রেস্তোরাঁয় বসে ছিল তাঁর অপেক্ষায়। জুনিয়ার ডাক্তারদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন নিরুপমা। ছেলেটির দাদা বারবার অনুরোধ করছিল যাতে নিরুপমা চলে না যান। নিরুপমার কাছে সময় ছিল না সেই অনুরোধে কান দেওয়ার। তা ছাড়া তাঁর মনে হয়েছিল ছেলেটির অবস্থা খুব বেশি খারাপ নয়। তার উপর বয়স কম। সে ঠিক লড়ে নেবে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে ভুল হয়েছিল সেদিন তাঁর। ডিনার সেরে রেস্তোরা থেকে বেরোনোর মুখেই পেয়েছিলেন খবরটা। সেবাস্টিন নিজে ড্রাইভ করে তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল। কিছু করার ছিল না আর। ছেলেটির পরিবার কাঁদছিল, হা-হুতাশ করছিল। শুধু তার তরুণ দাদাটির চোখে যেন আগুন জ্বলছিল। নিরুপমাকে দেখে তেড়ে এসেছিল সে। হাসপাতালের কর্মীরা ধরে ফেলে তাঁকে। নিরুপমাকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যায় তারা।

নিরাপদ! বোধের শেষ বিন্দুটুকু মুছে যেতে যেতে ক্লিষ্ট হাসির রেখা ফুটে ওঠে ডক্টর নিরুপমা গোমসের ঠোঁটের কোণে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি, সেবাস্টিন তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাড়িয়ে দিয়েছে হাত। যেতে হবে, সময় হয়েছে। লোকটা, যে এতক্ষণ ধরে এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিল, এখন ব্যাগ থেকে ধারালো ক্ষুরটা বের করে আনল।

২১

‘ডক্টর নিরুপমা গোমস, বয়স বাষট্টি, কার্ডিওলজিস্ট। মৃত্যু হয়েছে রাত দুটো থেকে সকাল পাঁচটার মধ্যে। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, কিন্তু অবশ্যই নর্মাল নয়। কারণ গলায় ক্ষুর চালানো হয়েছে। অটোপ্সি সার্জেনের মতে মৃতের শরীরে এমন কোনো রাসায়নিক ইন্ট্রাভেনাস ইনজেকশন হিসেবে পুশ করা হয়েছিল যার কোনো ট্রেস পাওয়া যায় না। যেমন পটাশিয়াম ক্লোরাইড। শরীরে তিন চার জায়গায় ফ্রেশ নিডল মার্ক পাওয়া গেছে। বেশ। আর কিছু?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

‘ডক্টর গোমজ হার্ট পেশেন্ট ছিলেন,’ বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল অর্জুন। এখন নিজের উপর রাগ হচ্ছে তার। গতকাল বর্ষবরণের রাতে সে, অর্জুন রায়, রেজার কিলার কেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার, যখন পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁয় বান্ধবীর সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিল, তখন এই শহরে এক নৃশংস খুনি কাজ করে চলেছিল পরিকল্পনামতো। আরেকজন শিকারকে পৌঁছে দিচ্ছিল মৃত্যুর মুখে। খবরটা শোনার পর কিছুক্ষণের জন্য অর্জুনের সব অনুভূতি অবশ হয়ে এসেছিল। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল টাপুরের মুখের দিকে। ওরা ভয় পেয়েছিল। বারবার জানতে চেয়েছিল, কী হয়েছে। অর্জুনের হাতে সময় ছিল না। শুধু তথ্যটুকু দিয়ে ছুটে গেছিল সে অকুস্থলে।

গত রাত থেকে আজ সন্ধে পর্যন্ত কাজের মধ্যেই ডুবে থাকতে হয়েছে। ছুটে বেড়াতে হয়েছে সারা শহর জুড়ে। তারই মাঝে নিজেকে বারবার দোষারোপ করেছে অর্জুন। ভুল হয়ে গেল, খুব বড়ো ভুল। তার আরও বেশি সাবধান হওয়া উচিত ছিল। দিনের শেষে নিজের বাড়ি না ফিরে টাপুরের ফ্ল্যাটে এসেছে সে। অর্জুনের মাথা আর কাজ করছে না। একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো হত। এরকম পরিস্থিতিতে টাপুর অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে ভাবতে পারে, আগেও দেখেছে সে। তাই এখন টাপুরকে তার প্রয়োজন।

টাপুর কাগজটার দিকে চোখ রেখে বলল, ‘প্ল্যানড মার্ডার। কিলার জানে সে কাকে কাকে মারতে চায় ও কেন! মোটিভ স্পষ্ট নয়। প্যাটার্নও নয়। খুনিকে ধরতে হলে আগে এ দুটো খুঁজে বের করতে হবে অর্জুন। আমি শিয়োর, খুনি কিছু না কিছু সূত্র ছাড়ছে তোমাদের, মানে পুলিশের জন্য। ইট ইজ আ গেম ফর হিম। খুনি জানে খেলা এক তরফা হয় না।’

‘কী করে বুঝলে যে খুনি কোনো সূত্র ছাড়ছে?’

‘খুব সোজা। তুমি এখন ঘেঁটে আছ। নইলে তুমিও বুঝতে পারতে। একটা উদাহরণ দিই। ধরো ক্ষুর দিয়ে গলা কাটা। এর দরকার ছিল কি?’

দুই দিকে মাথা নাড়ল অর্জুন বাধ্য ছাত্রের মতো।

টাপুর উজ্জ্বল মুখে বলল, ‘এক্সাক্টলি। মোডাস অপারেন্ডি আলাদা, কিন্তু গলা কাটা কমন। কারণ, খুনি পুলিশকে বোঝাতে চায়, খুনগুলো একই লোকের কাজ। ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে সে। আমি নিশ্চিত আরও কিছু না কিছু কমন নিশ্চয়ই আছে। আমাদের আরও ভাবতে হবে। আরও বেশি করে স্টাডি করতে হবে প্রত্যেকটা খুন। আমরা শিয়োর কিছু মিস করে যাচ্ছি।’

অর্জুন টাপুরের মুখে দৃষ্টি স্থাপন করে বলল, ‘এখন পর্যন্ত পাঁচটা খুন হয়েছে। যেমন তুমি বললে, প্রত্যেকটা খুনের জায়গা আলাদা, মোডাস অপারেন্ডি আলাদা, ভিকটিমরা আলাদা সোশ্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে। যদি কিলার আগে থেকেই প্ল্যান করে থাকে যে কারা তার শিকার হবে, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এরাই কেন? এদের মধ্যে কমন গ্রাউন্ড কী আছে?’

টাপুর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘অফ কোর্স কমন গ্রাউন্ড কিছু না কিছু আছে। আছেই। মে বি, কিলারই তাদের কম গ্রাউন্ড!’

‘মানে?’

‘মানে বলতে চাইছি, হয়তো এদের প্রতি কিলারের কোনো বিদ্বেষ ছিল। এদের প্রত্যেকের প্রতি।’ কথাটা বলতে বলতে চোখের তারা স্থির হয়ে গেল টাপুরের। বিড়বিড় করে বলল, ‘হয়তো কেন। অফ কোর্স ছিল। সব প্রি-প্ল্যানড, অর্জুন। কিলার র‍্যানডম খুন করছে না। ভিকটিম পূর্বনির্ধারিত। অর্থাৎ খুনি এদেরই খুন করতে চেয়েছিল। সুতরাং মোটিভ আছেই।

‘কিন্তু কিলারের প্ল্যানটা কী? খুনের প্যাটার্ন আমাকে আরও বেশি টেনশনে ফেলে দিচ্ছে।’

‘হুম’, চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল টাপুর।

অর্জুন একটু ভেবে বলল, ‘দেখো প্রথম দুটো তিনটে মার্ডারের মধ্যে সময়ের গ্যাপ অনেক বেশি ছিল। অর্থাৎ তখনো কিলারের মনে সংশয় ছিল, ধরা পড়ার ভয় ছিল। যত দিন এগিয়েছে, দুটো মার্ডারের মাঝের গ্যাপ কমেছে। শেষ খুনটা হয়েছে স্রেফ তিনদিনের গ্যাপে। অর্থাৎ এখন খুনি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তার ভয় ভেঙে গেছে। আই অ্যাম অ্যাফ্রেড যে এরপর হয়তো আরও ঘন ঘন খুন হবে।’

টাপুর মন দিয়ে শুনছিল অর্জুনের কথা। তবে এই মুহূর্তে তাকে খুব অস্থির দেখাচ্ছে। অস্থিরভাবেই বলল সে, ‘কেন?’

‘কী কেন? কী বলতে চাইছ?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল টাপুর। অস্থিরমুখে পায়চারি করল কয়েকবার একবার জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘ডেটগুলো বলো আমাকে।’

‘কীসের ডেট?’

‘উফ!’ বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল টাপুর, ‘খুনের ডেট। কুইক। প্ৰথম খুনটা কবে হয়েছিল?’

কথাটা জিজ্ঞাসা করতে করতে সেন্টার টেবিলের উপর রাখা কাগজ ও পেনটা টেনে নিল টাপুর।

‘২রা ডিসেম্বর, সোমবার,’ মোবাইল থেকে বলল অর্জুন, ‘মৃতের নাম বিলাল শেখ।’

‘নেক্সট?’

‘১৫ই ডিসেম্বর, রবিবার। মৃত সুখেন্দুশেখর ভৌমিক।’

‘তারপর?’ টাপুর কাগজ থেকে মুখ না তুলেই জিজ্ঞাসা করল।

‘২৩এ ডিসেম্বর, আবার সোমবার। অনিরুদ্ধ মল্লিক।’

টাপুর জিজ্ঞাসা করল, ‘এর পরের খুন কবে হয়েছিল?’

অর্জুন বলল, ‘এর পাঁচদিন পর। শনিবার, ২৮এ। বলাই সাহা।’

‘আর শেষটা ৩১এ ডিসেম্বর, তাইতো?’

‘হ্যাঁ’, মাথা নেড়ে বলল অর্জুন।

খাতায় লেখা সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল টাপুর। কোনো পারমুটেশন কম্বিনেশন করেই হিসেব মিলছে না। তবে কি…!’

‘ওহ, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। সারদা পাবলিকেশনের গোডাউনের পাশের গলির মুখে এক দোকানিকে আমার কার্ড দিয়ে এসেছিলাম। বলেছিলাম কিছু মনে পড়লে জানাতে। আজ তিনি ফোন করেছিলেন।’

টাপুর আগ্রহী কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘কী বললেন?’

‘তিনি সারদা পাবলিকেশনের এক ছোকরা কর্মচারীকে গলিতে ঢুকতে দেখেছিলেন আগুন লাগার আগ দিয়ে। খোঁজ নিতে গিয়ে শুনি সে নাকি বইয়ের দোকানের চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছে। দোকান থেকে নাম ঠিকানা জেনে ওর গ্রামের পুলিশ স্টেশনে ফোন করেছিলাম। ওখানকার পুলিশ ওকে পাকড়াও করেছে। সন্ধের মুখে ফোন করে জানাল, একটু ভয় দেখাতেই ছেলেটা মুখ খুলেছে। অনিরুদ্ধ নাকি ওকে দশ হাজার টাকা দিয়েছিল গোডাউনে আগুন লাগানোর জন্য।’

টাপুর হাসল। বলল, ‘এরকমই কিছু সন্দেহ করেছিলাম। অর্থাৎ এতে অন্তত আমাদের সিরিয়াল কিলারের কোনো হাত নেই। এই কেসে আগুনের অ্যাঙ্গলটাকে আপাতত বাদ দেওয়া যেতে পারে।’

‘হুম।’

টাপুর চুপ করে আছে। ওকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।

অর্জুন বলল, ‘কী ভাবছ, বলো তো?’

টাপুর চোখ তুলে বলল, ‘যদি সত্যিই কোনো প্যাটার্ন খুঁজে না পাওয়া যায় অর্জুন, আমাদের কাজটা আরও বেশি কঠিন হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে এই কলকাতা শহরের যে কোনো মানুষই হত্যাকারীর শিকার হতে পারে। কেউ বিপদসীমার বাইরে নয়।’

অর্জুন মাথা নীচু করে মৃদু হাসল। তারপর চোখ তুলে গলায় ছদ্মবিষাদ মিশিয়ে বলল, ‘সেটাই ভাবছি। পুলিশে চাকরি করি। এক পাগল খুনির পেছনে দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছি। কবে কী হয়ে যাবে কে জানে! তা বলে তুমি মোটেও ভেবো না যে আমি মরতে ভয় পাই। কিন্তু ব্যাচেলর অবস্থায় মরে যেতে আমার তীব্র আপত্তি আছে।’

টাপুর নিজের চিন্তাতেই ডুবে ছিল। হঠাৎ করে অর্জুনের মুখে এমন কথা শুনে হেসে ফেলল। বলল, ‘ব্যাচেলর থাকার জন্য কে তোমায় মাথার দিব্যি দিয়েছে শুনি। লক্ষ্মী একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেললেই তো ল্যাটা চুকে যায়।’

অর্জুন হাত বাড়িয়ে টাপুরের হাতে হাত রাখল। তারপর ওর চোখের দিকে তাকিয়ে গলায় বলল, ‘লক্ষ্মী মেয়েতে কাজ নেই আমার। বরং একটি লক্ষ্মীছাড়াকে জীবনে চাই। বিয়ে তো কবেই করে ফেলতাম, শুধু সে ঘাড় পাতছে না বলে বিয়েটা আটকে আছে।’

টাপুর হাতটা ছাড়িয়ে নিল না। সেভাবেই বসে রইল মাথা নীচু করে। সে তো কোমলাঙ্গী নারী নয়। তবু মাঝেমধ্যে সবল পুরুষের কাছে নারীহৃদয় আশ্রয় চায়, প্রেম চায়, আদর চায়। চায় প্রিয় পুরুষের চোখে নিজের জন্য মুগ্ধতা দেখতে। কে জানে কেন অকারণে আজ চোখে জল আসছে টাপুরের। এত ভালোবাসাকে কতদিন আর দূরে সরিয়ে রাখবে! কেনই বা রাখবে! আজকাল তারও মন স্থিতি চাইছে বুঝতে পারে টাপুর। একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘একটা কথা বলব?’

‘হুম!’

‘যে বদভ্যাসটা একবার ছেড়েছ, সেটাকে আবার তোমার মনের দখল নিতে দিও না। কাজের চাপ আছে। থাকবেও। সিগারেটটা আর খেয়ো না প্লিজ।’

২২

সুমনা ভৌমিকের বাড়ির ড্রয়িংরুম দেখে বোঝা যায়, এই বাড়ির মালিক বেশ অর্থবান ছিলেন। তিনতলা বাড়ি। মার্বেলে মোড়া মেঝে, দেওয়ালে দামি পেন্ট। বসার ঘরের সিলিং থেকে ঝুলন্ত ঝাড়বাতিটার দামও অন্তত লক্ষ টাকার কম হবে না। আধুনিকতার স্পর্শ খুব বেশি না থাকলেও গৃহসজ্জায় গৃহস্বামিনীর আন্তরিকতার অভাব নেই। সেগুন কাঠের সোফার উপর ভেলভেটের গদি ও রঙিন কুশন পাতা। ডান পাশের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা শোকেসে কৃষ্ণনগরের মাটির ঘোড়া থেকে মার্বেলের সাদা হাতির পরিবার সবই সুন্দর করে সাজানো। টাপুরকে ঝাড়বাতিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুমনা বললেন, ‘এটা সুখেন্দু নিজে পছন্দ করে কিনেছিল অকশন থেকে। ও খুব শৌখিন ছিল।’

মাথা নেড়ে ঘরের দিকে চোখ বোলাল টাপুর। শোকেসের উপরের দেওয়ালে বেশ কিছু ফোটোফ্রেম টানানো। বেশিরভাগ ছবিই সুখেন্দুশেখরবাবুর চাকরি জীবনের।

টাপুর উঠে গিয়ে দাঁড়াল ছবিগুলির সামনে। চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়কার তরুণ সুখেন্দুশেখরের মুখের সরলতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুছে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে পোড়খাওয়া পুলিশ অফিসারের অভিজ্ঞতা।

‘সুখেন্দু ওর কাজের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস ছিল বরাবর,’ চেয়ারে বসেই বললেন সুমনা ভৌমিক।

টাপুর ছবিগুলোর দিকে চোখ রেখেই বলল, ‘সেটা এই ছবিগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। বেশ কিছু পুরস্কারও পেয়েছেন দেখছি।’

গর্ব ও শোককে যদি এক আধারে স্থান দেওয়া যেত, তাহলে সুমনা ভৌমিকের অভিব্যক্তির সঠিক বর্ণনা সম্ভব হত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন তিনি, ‘হ্যাঁ, আপনাকে তো আগেই বলেছি, সুখেন্দু একজন কড়া অফিসার ছিল। সেই কারণেই চাকরিতে জয়েন করার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে লালবাজারে পোস্টিং পেয়ে গেছিল। কত কেসে কাজ করেছে, কত অপরাধীদের অ্যারেস্ট করে তাদের আইনের দরজায় পৌঁছে দিয়েছে। ওর লেখা বইগুলো পড়েছেন?’

টাপুর বইগুলি আগে পড়েনি। কেসটা হাতে নেওয়ার পরে পাঁচটা খন্ড পড়ে শেষ করেছে। সেসব কথা অবশ্য সুমনাদেবীকে বলল না সে। মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, পড়েছি।’

সুমনা ভৌমিক খুশি হলেন। উঠে এসে টাপুরের পাশে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘এই যে ছবিটা দেখছেন, ভি আই পি রোডের ধারে বেআইনি বারগুলোতে ঘুঘুর বাসা তৈরি হয়েছিল। সেগুলিতে একের পর এক অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সাফ করেছিল ওর টিম। সেই জন্যই এই পুরস্কার ঠিক রিটায়ারমেন্টের আগেই পেয়েছিল।’

‘আর এটা?’ একটা ছবির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে জিজ্ঞাসা করল টাপুর।

সুমনাদেবী ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা প্রায় বছর বিশেক আগেকার ছবি। শিয়ালদা স্টেশন দিয়ে স্মাগলিং-এর একটা র‍্যাকেট সেই সময়ে খুব সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাদের কিংপিনকে অ্যারেস্ট করেছিল ও। সেইসময় পুরস্কার পেয়েছিল।’

টাপুর ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর সোফায় গিয়ে বসল। একটু চুপ করে কিছু যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘মিসেস ভৌমিক, আপনি সেদিন বলেছিলেন অনিরুদ্ধ মল্লিক সমকামী ছিলেন। আপনি সম্ভবত সুখেন্দুবাবুর মৃত্যুর পেছনে অনিরুদ্ধ মল্লিকের হাত থাকার সম্ভাবনা আছে বলে সন্দেহ করছেন।’

‘সন্দেহ নয়, আমি নিশ্চিত’, গম্ভীর কণ্ঠে বললে সুমনা ভৌমিক।

টাপুর বলল, ‘বেশ। কিন্তু এখানে একটা ব্যাপার আছে। এই খুনগুলোকে পুলিশ সিরিয়াল কিলিং হিসেবেই দেখছে। তাছাড়া অনিরুদ্ধ মল্লিক নিজেও খুন হয়েছেন। সুতরাং এর পরে আর তাঁকে সন্দেহ করা যায় কি?’

সুমনাদেবী একটু অস্থির হয়ে বললেন, ‘আপনাকে আমি ফোনে সব কথা বলিনি। আমার হাসব্যান্ড সব জেনে ফেলার পর যখন অনিরুদ্ধকে ফোন করেছিল, অনিরুদ্ধ বলেছিলেন সুখেন্দুকে দেখে নেবেন। তাতে সুখেন্দু ওকে হুমকি দিয়েছিল, ওর ফেসবুকে দেড় লাখের উপর ফলোয়ার আছে। সেখানে অনিরুদ্ধর কলেজের কেসটা নিয়ে একটা এপিসোড লিখবে। আমি শুনে খুব রাগ করেছিলাম। সুখেন্দু আমাকে বলেছিল, ওসব কথা শুধু ভয় দেখানোর জন্যই বলেছে ও। কিন্তু ভেবে দেখুন, অনিরুদ্ধ তো আর জানত না যে সুখেন্দু শুধুই ভয় দেখাতে চেয়েছিল। এরকম একটা কথা বাইরে আসুক, সেটা কি অনিরুদ্ধ মল্লিক চাইবেন? আমি শিয়োর, সুখেন্দুর মৃত্যুর পেছনে অনিরুদ্ধ মল্লিকের হাত আছে। আমি সুখেন্দুকে তখনই বলেছিলেন, এসব কথা না বললেই পারতে। তা সে বরাবরের গোঁয়ার মানুষ। ভুলে যেত যে গায়ের ইউনিফর্মটা আর নেই।’

‘সবই তো বুঝলাম,’বলল টাপুর, ‘কিন্তু অনিরুদ্ধ মল্লিকের কিন্তু স্ট্রং অ্যালিবাই আছে। সুখেন্দুবাবুর মৃত্যুর দিন তিনি লেক টাউনে এক আত্মীয়ের বাড়িতে একটা জন্মদিনের পার্টি অ্যাটেন্ড করতে গেছিলেন। ওই পার্টিতে আরও অনেক লোকজন ছিল। সেই রাতে পার্টি শেষ হতে হতে বেশ রাত হয়ে গেছিল বলে আর বাড়ি ফেরেননি তাঁর পরিবার। পরদিন সকাল দশটা নাগাদ ফিরে যান।

‘খুন করতে হলে নিজে হাতেই করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই’, বললেন সুমনা ভৌমিক। ‘অন্য কাউকে দিয়েও তো করাতে পারে, তাই না?’

‘তা অবশ্য পারেন,’ টাপুর বলল। ‘কিন্তু কী জানেন তো, খুন ব্যাপারটা অত সোজা নয়। অনিরুদ্ধ মল্লিক ব্যবসায়ী মানুষ। ব্যাবসাটা বোঝেন তিনি। এরকম ক্ষেত্রে যদি ধরেও নিই যে তিনি সম্মানহানির ভয় পেয়েছিলেন, তবুও সেজন্য খুন করে ফেলার যুক্তিটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার চেয়ে নিগোশিয়েট করাটা সহজ ছিল। খুন কেন করবেন?’

টাপুরের যুক্তিটা সুমনাদেবীর পছন্দ হল না। বললেন, ‘সেসব আমি জানি না। আমি শুধু জানতে চাই যে সুখেন্দুকে কেন এভাবে খুন হতে হল! আর অনিরুদ্ধ মল্লিক যদি না হন, তাহলে কে খুন করল ওকে! ও তো কারো কোনো ক্ষতি করেনি!’

টাপুর বলল, ‘দেখুন, ক্ষতির ব্যাপারটা কিন্তু আপেক্ষিক। সেভাবে ভাবতে গেলে একজন প্রাক্তন পুলিশ অফিসারের শত্রু কম থাকার কথা নয়। যদি আমরা সিরিয়াল কিলিং-এর অ্যাঙ্গলটাকেও মেনে নিই, তবুও আমার মনে হচ্ছে এক্ষেত্রে খুনি র‍্যানডম তার শিকার নির্বাচন করছে না। আমার ধারণা সুখেন্দুবাবু তার খুনিকে চিনতেন। অন্তত কোনো না কোনো যোগাযোগ ছিল তাঁর।’

সুমনাদেবী অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললেন, ‘দীর্ঘ চাকরি জীবনে অজস্র কেসের সঙ্গে যুক্ত ছিল সুখেন্দু। কত অপরাধীকে শাস্তি দিয়েছে। এভাবে একজনকে খুঁজে বের করা সম্ভব নাকি?

টাপুর চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল। বলল, ‘তা হয়তো নয়। কিন্তু ভেবে দেখুন এমন অপরাধী, যার যোগ বাকি পাঁচজন ভিকটিমের সঙ্গেও আছে, এমন লোক নিশ্চয়ই খুব বেশি নেই। মিসেস ভৌমিক, আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। আমি বাকি পাঁচটা কেসের সম্পর্কে যা তথ্য এখন অবধি আমার হাতে এসেছি, সব আমি আপনার কাছে রেখে যাচ্ছি। আপনার কাজ হবে এগুলি মন দিয়ে দেখা। এদের মধ্যে কাউকে আপনি চেনেন কি না, সুখেন্দুবাবুর মুখে কারো সম্পর্কে কিছু শুনেছিলেন কি না ভাবুন। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। এক পাগল খুনি সারা শহর জুড়ে একের পর এক খুন করে বেড়াচ্ছে। আপনি এ ব্যাপারে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারলে হয়তো আমরা খুনির আরেকটু কাছে পৌঁছোতে পারব।’

‘তার মানে আপনি ধরেই নিচ্ছেন যে সুখেন্দুর খুনের পেছনে অনিরুদ্ধ মল্লিকের হাত নেই, তাই তো?’

টাপুর সুমনা ভৌমিকের হাতের উপর হাত রাখল। হালকা করে চাপ দিয়ে বলল, ‘আমি কিছুই ধরে নিচ্ছি না। সব সম্ভাবনাই খোলা থাকছে। আপনি একটু চেষ্টা করে দেখুন। প্লিজ।’

২৩

‘নিরুপমা গোমজের মেয়ে-জামাই অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে স্যার, বডি হ্যান্ড ওভারের প্রসেস চলছে। আপনি বলেছিলেন ওঁদের সঙ্গে কথা বলবেন।’

ফোনের অপর প্রান্ত থেকে সৌরভ সান্যাল বললেন, ‘হবে না অর্জুন মুখ্যমন্ত্রীর কেবিনের বাইরে বসে আছি। আজ কপালে শনি নাচছে। কেসটা সম্ভবত হাত থেকে বেরিয়ে গেল হে।’

‘কেন?’ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন, ‘আমরা তো যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। আমাদের টিম দিন-রাত এক করে কাজ করছে। গত কয়েকদিনে টিমের কেউ দিনে তিন ঘন্টার বেশি ঘুমোয়নি।’

সৌরভ সান্যাল প্রবোধ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘অত উত্তেজিত হলে চলবে কী করে? আমি জানি তোমরা চেষ্টা করছ। আই অ্যাম প্রাউড অব মাই টিম। কিন্তু ইতিমধ্যে পাঁচটা খুন হয়ে গেছে। এটাও তো ঠিক যে আমরা খুনগুলো আটকাতে পারিনি। এখনও পর্যন্ত খুনির সম্পর্কে কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। এটা এখন ন্যাশনাল মিডিয়া নিউজ। সেন্ট্রাল এই নিয়ে স্টেটকে চাপে ফেলেছে। যা মনে হচ্ছে তাতে কেসটা স্পেশাল ব্যুরোর হাতে যাবে হয়তো। কারণ মুখ্যমন্ত্রী কখনোই চাইবেন না যে কেন্দ্র থেকে সিবিআই এসে কেসে নাক গলাক। তবু আমি কিছুটা টাইম বাই করার চেষ্টা করব। কিন্তু কথা দিতে পারছি না।’

অর্জুন হতাশ কণ্ঠে বলল, ‘প্লিজ স্যার, আর একটু সময় দিন।’

‘আমার হাতে আর কিছু নেই অর্জুন,’ বললেন সৌরভ সান্যাল, ‘চেষ্টা করব এটুকু বলতে পারি। তুমি এক কাজ করো। ডক্টর গোমজের মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলো। জিজ্ঞাসা করো, তাঁরা কিছু জানেন কি না বা কাউকে সন্দেহ করেন কি না।’

‘ইয়েস স্যার,’ বলে ফোনটা কেটে পকেটে ঢোকাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে আনল। সেটা ধরেই দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর আবার প্যাকেটটা ঢুকিয়ে করিডর দিয়ে হেঁটে এগোল। সময় নষ্ট করার সময় নেই এখন।

নিরুপমা গোমজের মেয়ে-জামাই অবশ্য এ বিষয়ে কোনো আলোকপাত করতে পারলেন না। ডক্টর গোমজের মেয়ে বিশাখা সিম্পসন বললেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর থেকেই মা মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিল। প্রথমদিকে আমার কাছে সিডনিতে গিয়ে থাকতে রাজি করাতে পারিনি। কিন্তু ক-মাস আগে রাজি হয়েছিল মা। ভিসার অপেক্ষা করছিল। এ মাসে বা আগামী মাসেই এই দেশ ছেড়ে চলে যেত। তার আগেই…’

অর্জুন বলল, ‘ডক্টর গোমজ যে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন এ কথা কে কে জানত?’

বিশাখা কাঁধ ঝাঁকালেন। বললেন, ‘বলতে পারব না। তবে মা যেসব হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত, সেই সব জায়গাতেই নোটিস দিয়ে দিয়েছিল। মার এখানে বন্ধুবান্ধব যাঁরা আছেন, তারাও জানত। এর বেশি আমি বলতে পারব না। তবে মায়ের মুখে শুনেছিলাম, সেই রাতে পার্ক স্ট্রিটের একটি হোটেলে নিউ ইয়ার পার্টিতে ইনভাইটেড ছিল মা। বাবার মৃত্যুর পর থেকে নিউ ইয়ার ইভে মা বাড়ি থেকে বেরোত না। কারণ বাবা বেঁচে থাকাকালীন ওই রাতটা দুজনে একসঙ্গে সেলিব্রেট করত। এবার দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে পার্টিতে গিয়েছিল। আর তাতেই এভাবে মরতে হল মাকে। না বেরোলে হয়তো বেঁচে যেত।’

‘পার্ক স্ট্রিটে পার্টি ছিল। অথচ ডেডবডি ট্যাংরার রেস্টুরেন্টের ভেতরে পাওয়া গেছে,’ বলল অর্জুন।

বিশাখা বললেন, ‘সেটাই তো অবাক করছে। মা পার্কস্ট্রিট থেকে ট্যাংরায় গেল কেন? আর তাও ওই রেস্টুরেন্টে!’

‘কেন? ওই রেস্টুরেন্টে কেন? ওই রেস্টুরেন্ট স্পেশাল কী?’

বিশাখা বিষণ্ণ হাসল। বলল, ‘আমার বাবা আর মায়ের মেডিকেল কলেজে প্রথম পরিচয়। বাবার চাইনিজ কুইজিন ভীষণ পছন্দ ছিল। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় দুজনের কারোর হাতেই বেশি টাকা থাকত না। তবু দুজনে বিশেষ বিশেষ অকেশনে চায়না টাউনে খেতে যেত। বিয়ের পরে দুজনের ব্যস্ততা বাড়ে। দুজনেই এই শহরের নামি ডাক্তার। তারপর আমি জন্মালাম। কিন্তু নিউ ইয়ার ইভে চায়না টাউনে যাওয়াটা ওদের কাছে একটা রিচুয়াল ছিল, ভালোবাসার উদযাপন বলতে পারেন। বাবার মৃত্যুর আগে অবধি কখনো এই নিয়মের বাত্যয় হয়নি। দুজনেই নিজেদের ব্যস্ত স্কেজুল থেকে সময় বের করেছেন যেভাবেই হোক।’

অর্জুন সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘এর মানে দাঁড়াচ্ছে যে খুনির কাছে এসব তথ্য ছিল। তা ছাড়াও ডক্টর গোমজের কোথায় পার্টি ছিল, কোন রেস্টুরেন্টে তিনি অত বছর আগে নিউ ইয়ার ইভ কাটাতেন, সব জানত খুনি। প্রশ্ন হল কীভাবে?’

‘সেটা জানা কঠিন নয়’, বললেন বিশাখা, ‘মা যে পার্টিতে গিয়েছিল, সেখানে অনেকেই আমন্ত্রিত ছিল। মা দেশ ছেড়ে চলে যাবেন বলেই বাবার মৃত্যুর পর এবার প্রথম কোনো নিউ ইয়ার পার্টিতে উপস্থিত থাকছিলেন। এই কথা অনেকেই জানত।’

‘কিন্তু ডক্টর গোমসের বডি পার্ক স্ট্রিটে পাওয়া যায়নি, গিয়েছিল ট্যাংরায়। সেখানে যাওয়ার কোনো কথা ছিল না তাঁর? আপনি শিয়োর?’ জানতে চাইল অর্জুন।

‘মা নিউ ইয়ার ইভে চায়না টাউনে যাবে না, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। বাবা ও মায়ের মধ্যে যে কতটা গভীর প্রেম ছিল, আপনি ভাবতে পারবেন না। বাবাকে ছাড়া মা নিজে থেকে কখনো ওখানে যাবে না, বিশেষ করে নিউ ইয়ার ইভে তো নয়ই। অফিসার, আমি নিশ্চিত যে খুনি মাকে কিডন্যাপ করেছিল।’

অপহৃতা যে হয়েছিলেন ডক্টর গোমজ, সে বিষয়ে এখন আর অর্জুনেরও সন্দেহ নেই। এবারই তো প্রথম নয়, এর আগেও সুখেন্দুশেখর ও বলাই সাহাকেও উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় খুন করা হয়েছিল। এতদিন মনে হয়েছে হয়তো লোকচক্ষু থেকে দূরে নিয়ে যাওয়াই উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এখন অন্য রকম একটা সন্দেহ জাগছে অর্জুনের মনে। এই চাইনিজ রেস্তোরাঁতেই কেন? অন্য জায়গায় নয় কেন? কোনো নিভৃত স্থানে, গলি বা জংলা জায়গায় নয় কেন? বর্ষবরণের রাতে যখন এমনিতেই রাস্তাঘাটে লোকসমাগম বেশি থাকে, রেস্তোরাঁগুলোও অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি রাত অবধি খোলা থাকে, তখন এরকম জায়গা বাছল কেন খুনি?

আর অপহরণটা হলই বা কীভাবে? হোটেলের সিসিটিভি থেকে কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। অদ্ভুত ব্যাপার হল যে সময়ে ডক্টর গোমস পার্টি থেকে বেরোন, সেই সময়ের সিসিটিভি কানেকশন লস্ট দেখাচ্ছে। প্রায় বারো মিনিট সিসিটিভিতে কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

সে কথা বিশাখাকে বলল অর্জুন। বিশাখা বিরক্তমুখে বললেন, ‘ডিসগাস্টিং! একটা রিনাউন্ড ফাইভ স্টার হোটেলের সিকিয়োরিটি সিস্টেমের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা কোথায় এই শহরে? একের পর এক লোক খুন হয়ে যাচ্ছে। আপনারা কী করছেন? সরি টু সে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই করতে পারেননি আপনারা। আমি আমার মাকে হারিয়েছি। আর কত মৃত্যু হলে আপনারা কিছু অ্যাকশন নেবেন, বলতে পারেন? প্লিজ, ‘চেষ্টা করছি’ কথাটা বলবেন না।’

অর্জুন বিশাখার শ্লেষটা পাশ কাটিয়ে গেল। বলল, ‘আপনার মায়ের হার্টের সমস্যার কথা কে কে জানত?’

‘খুব বেশি কেউ নয়। মাই মাদার ওয়াজ আ প্রাইভেট পারসন। নিজের কথা বেশি বলতে পছন্দ করত না। তাছাড়া নিজে একজন কার্ডিয়াক সার্জন হয়ে নিজের হার্টের রোগের কথা ফলাও করে প্রচার করা কোনো কাজের কথা নয়। তবে মার হাসপাতালের সামান্য কয়েকজন কলিগ, দু-চারজন বন্ধুবান্ধব ও মায়ের অপারেশন যিনি করেছিলেন তিনি জানতেন। বাই দ্য ওয়ে, অটোপ্সি রিপোর্ট অনুযায়ী শুনেছি হার্ট অ্যাটাকের কোনো কারণ পাওয়া যায়নি। গলার কাটা দাগটা না থাকলে আর অমন অদ্ভুত লোকেশন না হলে এটা খুন বলে ধরা যেত না। কীভাবে খুন করা হয়েছে আমার মাকে, জানতে পারি কি?’

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে বিশাখার গলাটা কেঁপে গেল। অর্জুন বলল, ‘সম্ভবত পটাশিয়াম ক্লোরাইড ইঞ্জেক্ট করে। সারা শরীরে একাধিক ফ্রেশ নিডল মার্ক পাওয়া গেছে।’

‘মাই গড!’

অর্জুন একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আই অ্যাম সরি ফর ইয়োর লস, মিসেস সিম্পসন। কিন্তু এই কেসে আপনার সাহায্য আমার চাই। কারণ, খুনগুলো কোনো র‍্যানডম খুন নয়, যদিও আমরা এখনও এগুলোর মধ্যে রিলেশনটা বুঝে উঠতে পারিনি। মিসিং লিংকগুলো আমাদের কাছে নেই। কিন্তু হয়তো আপনার কাছে আছে। তাই প্রতিটা খুনের ক্ষেত্রেই আমরা মৃতের কাছের মানুষদের অনুরোধ করছি, সেই একই অনুরোধ আপনাকেও করছি। প্লিজ ভাবুন। একটু ভেবে বলুন, ডক্টর গোমসের কোনো শত্রু ছিল কি না। বা কেউ ছিল কি না যে তাঁকে অপছন্দ করত। খুনটা একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁতে হয়। আপনার কাছেই আমরা জানতে পারছি আগে প্রতিটি বর্ষবরণের রাতে তিনি ওই রেস্তোরাঁয় প্রতি বছর যেতেন। খুনটাও হয়েছে একই ডেটে। তাই আমরা ধরে নিতে পারি, ওই ডেট ও লোকেশনের সঙ্গে এই খুনের সম্পর্ক আছে। আর সেই সম্পর্কটাই এক্ষেত্রে আমাদের এস্টাব্লিশ করতে হবে। আপনি আমাদের এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন।

‘আমি? কিন্তু কীভাবে?’

‘প্লিজ মনে করার চেষ্টা করুন, কোনো বর্ষবরণের রাতে কী কিছু ঘটেছিল? এমন কিছু, যা আপনি আপনার মায়ের কাছে শুনেছিলেন, বা জানতেন? কোনো দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো ঘটনা?’ উদ্‌গ্রীব স্বরে জানতে চাইল অর্জুন।

বিশাখা ভাবলেন কিছুক্ষণ। তারপর হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘আমার সত্যি কিছু মনে পড়ছে না। আর তাছাড়া আমি গত প্রায় তেরো বছর ধরে বাড়ি ছাড়া। তার মধ্যে কিছু হয়ে থাকলে আমার জানার কথা নয়। কারণ দূরে থাকতাম বলে এমন কোনো ঘটনা আমাকে মা বা বাবা জানাত না যাতে আমার বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা হতে পারে। এমনকি মা নিজের হার্টের সমস্যার কথাও আমাকে অনেক পরে জানিয়েছিল।’

অর্জুন দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, ‘তবু একটু ভাববেন। আমার নম্বরটা রাখুন। কিছু মনে পড়লে জানাবেন প্লিজ।

২৪

‘হ্যালো। সুখেন্দুবাবুর স্ত্রী তোমার সাহায্য চেয়েছিলেন বলেছিলে। কিছু এগোতে পারলে এই ব্যাপারে?’ ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

‘এখনও না। আমি ওঁদের বাড়িতে গেছিলাম। একটা ব্যাপারে একটু খটকা লাগছে।’

‘কী ব্যাপারে?’

‘সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের বাড়ি দেখে একটু অবাক হলাম জানো! এত বড়ো বাড়ি, এত দামি দামি আসবাব! পুলিশ চাকরি করে এত বিলাসিতা একটু আশ্চর্য লাগছে।’

‘পৈতৃক সম্পত্তি হতে পারে তো!’

‘না। আমি কথাচ্ছলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সুমনা ভৌমিক বললেন যে সুখেন্দুবাবুর পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্ত ছিল। তাঁর বাবা পেপারমিলে চাকরি করতেন। সেখান থেকে…’

অর্জুনের মনে পড়ে গেল বিলাল শেখের ডাইরিটার কথা। সব পুলিশ যে শুধু সরকারের থেকেই বেতন পায়, তা তো নয়। হঠাৎ বিদ্যুৎচমকের মতো মনে এল একটা সম্ভাবনার কথা। হতে পারে? হতে পারে কি! খোঁজ নিতে হবে। মুখে বলল, ‘তুমি কী বলতে চাইছ বুঝতে পারছি।’

টাপুর চুপ করে রইল।

অর্জুন এবার বলল, ‘আমি আজ একটা জায়গায় যাচ্ছি। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?’

টাপুর একটু অবাক হল। জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায়?’

অর্জুন বলল, ‘মিনিট পনেরোর মধ্যে রেডি থাকো। আমি তোমাকে পিক করে নিচ্ছি।’

‘কোথায় যাচ্ছি সেটা তো বলবে!’

‘যেখানে যাচ্ছি সেখানে যদি কিছুমাত্র সূত্র পাওয়া যায়, তাতে তোমার কেসের উপকারই হবে।’

‘আমার কেস! আমার আবার কেস কোথা থেকে পেলে?’

‘কেন? সুখেন্দুশেখরের হত্যারহস্যের কেস নাওনি তুমি?’

‘ধুর! ওটা তোমাদের কাজ। ও নিয়ে আমি ভাবছিই না। তবে তুমি যখন বলছ, তখন যাব।’ বলল টাপুর।

অন্য প্রান্তে অর্জুনের মৃদু হাসির শব্দ শোনা গেল। ‘শুধু আমি বলছি বলেই যাবে?’

‘হুম!’ টাপুরের ঠোঁটের কুলের হাসির রেখা ফুটে উঠল। ‘তুমি ব্যস্ত মানুষ। এই সুযোগে যদি একটু কফি খাওয়ার সময় জুটে যায়, সেই লোভেই যাচ্ছি।’

‘শুধুই কফির লোভে?’ অর্জুনের কণ্ঠস্বর গাঢ় শোনাল।

‘আবার কী!’ হাসি চেপে বলল টাপুর।

‘বেশ, তাই সই। তৈরি থাকো। চটপট। আসছি আমি।’

ঘন্টা খানেক পরে অর্জুন আর টাপুর বসে আছে রাজারহাটের একটি ফ্ল্যাটের এক-চিলতে বসার ঘরে। স্ট্যান্ড অ্যালোন বিল্ডিং। প্রতি ফ্লোরে দুটি করে ফ্ল্যাট। সিঁড়ি ও বিল্ডিং-এর বহিরাঙ্গের দশা দেখলে বোঝা যায় মেইন্টেনেন্স খুবই খারাপ। তবে এই ফ্ল্যাটের ভেতরটি যথেষ্ট সুসজ্জিত। খুব বিলাসবহুল অবশ্য নয়, আসবাবের আতিশয্যও নেই, তবে ছিমছাম, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

এই ফ্ল্যাটে যিনি ভাড়া থাকেন তার নাম সন্দীপ দাস। গত বছর তিনেক ধরে এখানে থাকছেন তিনি। পেশায় ইনশ্যুরেন্স এজেন্ট। অর্জুন খোঁজ নিয়ে জেনেছে, সন্দীপের রোজগারপাতি তেমন ভালো নয়। তবে সে যাই হোক না কেন, ভদ্রলোকের নিজের চেহারার প্রতি যত্ন আছে ষোলোর উপর আঠারো আনা। চকচকে ফর্সা মুখ, ভুরুর অতিরিক্ত রোম তুলে ফেলায় ভুরুর নীচে সাদাটে মাংসখন্ড উঁচু হয়ে আছে। দাড়ি গোঁফ চকচকে করে কামানো। আধুনিক স্টাইলে চুল কাটা। তাতে তামাটে রং। বয়স চল্লিশের নীচেই হওয়া উচিত। ছিপছিপে শরীরের গঠন। শরীরী ভাষা কিছুটা মেয়েলি। এই মুহূর্তে অর্জুন ও টাপুরের সামনে বসে সন্দীপ দাস ডান হাতের তর্জনী দিয়ে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলে চুলকোচ্ছে। চোখের দৃষ্টি নত। এই মুহূর্তে তাকে শোকার্ত দেখাচ্ছে। প্রথমে কথা বলতেই রাজি হয়নি সন্দীপ। বাধ্য হয়ে অর্জুনকে নিজের পুলিশি রোয়াবের সামান্য নমুনা দেখাতে হয়েছে। কাজ হয়েছে তাতে।

‘অনিরুদ্ধ মল্লিকের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কী ছিল?’ ভ্যানতারা না কষে সরাসরি প্রশ্ন করল অর্জুন।

সন্দীপের চোখেমুখে স্পষ্ট অস্বস্তি। অর্জুন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখ সরাচ্ছে না, যা সন্দীপের উপর আরও বেশি করে চাপ সৃষ্টি করছে। একটু চুপ করে থেকে সে বলল, ‘অনিরুদ্ধ ওয়াজ মাই বয়ফ্রেন্ড, ইউ নো! উই ওয়ার ম্যাডলি ইন লাভ। হি ওয়াজ মাই লাইফ। মাই এভ্রিথিং। যবে থেকে ভালোবাসা কী বুঝতে শিখেছি, ওকে ছাড়া আর কারোর কথা ভাবিনি কখনও।’

বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠল সন্দীপ।

অর্জুন কিছু বলতে যেতে টাপুর আলতো করে তার হাতে চাপ দিল। তারপর নিজে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা। অনিরুদ্ধবাবুর মৃত্যু সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।’

বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সন্দীপ। টাপুর ওকে কাঁদতে দিল। বেশ খানিকক্ষণ পরে বলল, ‘আমরাও চাই, অনিরুদ্ধবাবুর খুনি ধরা পড়ুক। তার জন্য আপনার সাহায্য দরকার হবে আমাদের।’

সন্দীপ নিজেকে সামলে বাঁ হাতের উপর পিঠ দিয়ে চোখ মুছল। তারপর বলল, ‘বলুন কী জানতে চান।’

‘অনিরুদ্ধবাবুকে আপনার চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠভাবে তো আর কেউ চিনত না। বলুন তো, ওঁকে কি মারা যাওয়ার আগে খুব বেশি চিন্তিত দেখাচ্ছিল? কিংবা কোনো লাইফ থ্রেট পেয়েছিলেন তিনি?’

‘লাইফ থ্রেট? না। তবে সুখেন্দুবাবুর সঙ্গে একটা ঝামেলা হয়েছিল। সেটা অবশ্য অনি সামলেও নিয়েছিল।’

টাপুরের মনে পড়ল সুমনাদেবীর বলা কথাগুলো। তবু জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ধরণের ঝামেলা?’

‘সুখেন্দুবাবু তার বইগুলো অনির পাবলিকেশন থেকে তুলে নিতে চাইছিলেন। অনি মানা করায় তিনি থ্রেট দেন যে আমাদের গোপন কথা তিনি সকলকে জানিয়ে দেবেন। এমনকি পুরোনো কথাও।’

টাপুর একটু অবাক হওয়ার ভান করে জিজ্ঞাসা করল, ‘সে কী! তিনি এসব কথা কোথা থেকে জানলেন? অনিরুদ্ধবাবুর সঙ্গে আপনার সম্পর্কের ব্যাপারে কে কে জানত?’

সন্দীপ একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘খুব বেশি কেউ নয়। অনিরুদ্ধ নিজের সোশ্যাল স্ট্যাটাস নিয়ে খুব সচেতন ছিল। তাই কাউকে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে, এমনকি নিজের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের ব্যাপারেও জানাতে চাইত না। এই নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক মন কষাকষি, এমনকি ঝগড়া অবধি হয়েছে। ও যখন বিয়ে করল, তখন আমাদের ব্রেক আপ হয়ে গেছিল এই নিয়ে। দুই মাস ওকে ছেড়ে যে কীভাবে ছিলাম, সে আমিই জানি। তারপর ও একদিন নিজে এল। আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদল, জানেন। বলল, ওর স্ত্রীর সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু নামকে ওয়াস্তে লোক দেখানো বিয়ে ওটা। ওর বউ গরিব ঘরের মেয়ে। সে মেনে নিয়েছে। তারপর থেকে আমাদের বন্ডিং আরও বেশি স্ট্রং হয়েছিল।’

‘আর অনিরুদ্ধবাবুর বাড়ির লোক, বন্ধুবান্ধব? তারা জানত না?’

‘বাড়ির লোক বলতে অনির মা সন্দেহ করত বরাবরই। তবে আমাকে চিনত না। আর বন্ধু…,’ কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে চুপ করে গেল সন্দীপ।

‘কী হল? বন্ধুদের মধ্যে কেউ জানত আপনাদের সম্পর্কের কথা?’ টাপুর জিজ্ঞাসা করল।

সন্দীপ একটু সময় নিল। তারপর বলল, ‘কী বলি! এখন আর বন্ধু বলতে অনির তেমন কেউ ছিল না আমি ছাড়া। তবে কলেজ লাইফে আমাদের কমন বন্ধুরা ছিল।’

‘তারা জানত?’

সন্দীপ মাথা নীচু করল। তারপর বলল, ‘এখন যখন অনিই নেই, তখন আর লুকিয়ে কী হবে! জানত বললে ভুল হবে, তবে একবার জানার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।’

‘কেমন?’

‘তখন আমাদের ফাইনাল ইয়ার। একদিন ক্লাসের শেষে ফাঁকা ক্লাসরুমে আমরা দুজন একটু বেসামাল অবস্থায় ছিলাম। এমন সময় আমাদেরই জুনিয়ার একটি মেয়ে ক্লাসে এসে ঢোকে। আমাদের ও ওই অবস্থায় দেখে ফেলেছিল। প্রথমে ভয় পেয়ে গেছিল। তারপর তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল। সেদিন আমি আর অনি দুজনেই খুব ভয় পেয়েছিলাম। লোকে যদি জানতে পারে আমাদের সম্পর্কের কথা, তাহলে অনির বাড়িতে ঝড় বয়ে যাবে। এমনকি ওর বাবা ওকে ত্যাজ্যপুত্রও করে দিতে পারে। শুধু তাই তো নয়, কলেজে বদনাম হবে। হয়তো কর্তৃপক্ষ আমাদের দুজনকেই সাসপেন্ড করবে।’

‘তারপর?’

সন্দীপ দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার চোখ ছলছল করছে। বলল, ‘সেদিন যা হয়েছিল, খুব খারাপ হয়েছিল।’

‘কী হয়েছিল, খুলে বলুন?’ অর্জুনের কণ্ঠস্বরে আদেশের সুর। সন্দীপ তার মুখের দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘পাপ। সেদিনের সেই পাপের ফলেই আজ হয়তো অনিরুদ্ধকে হারাতে হল আমাকে।

অনেকক্ষণ চুপ করে রইল সন্দীপ। মনে হল সে নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করছে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল।

‘মেয়েটির নাম ছিল রেশমি। শান্ত, চুপচাপ মেয়ে। কথা কম বলত। সেদিন আমাদের ওইভাবে দেখে ওর মুখে ঘৃণার ভাব ফুটে উঠতে দেখেছিলাম আমরা। ও বেরিয়ে গেছিল ক্লাসরুম ছেড়ে। অনিরুদ্ধ গুম হয়ে বসে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, কিছু করতে হবে।’

‘কিছু করতে হবে বলতে?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল।

‘বিশ্বাস করুন, আমি বারবার মানা করেছিলাম ওকে। বলেছিলাম, রেশমি হয়তো কাউকে কিছু বলবে না। দরকার হলে আমি ওকে বুঝিয়ে বলব। অনিরুদ্ধ বলল রিস্ক নেওয়া যাবে না। আমার সঙ্গে এই নিয়ে ঝগড়াও হয়েছিল। দুইদিন কলেজে যাইনি আমি। তৃতীয় দিনে অনিরুদ্ধের ফোন পেলাম। ও বলল, কাজ হয়ে গেছে। রেশমি আর মুখ খুলবে না।’

‘কী হয়েছিল রেশমির সঙ্গে?’

‘অনিরুদ্ধ একজনকে টাকা দিয়ে রেশমিকে অ্যাসল্ট করিয়েছিল।’

‘কী!’ আঁতকে উটল অর্জুন।

সন্দীপ মাথা নীচু করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘অন্যায় করেছিল অনিরুদ্ধ। সেই ঘটনার ভিডিও নিজে হ্যান্ডিক্যামে বানিয়েছিল ও। তখন মোবাইল ফোন ছিল বটে, তবে তাতে ক্যামেরার চল ছিল না। সোশ্যাল মিডিয়াও ছিল না। সেই ভিডিও ও বন্ধুদের মেল আইডিতে পাঠিয়েছিল। সিডিতে করে বিলি করেছিল কলেজে। সকলে রেশমিকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্ৰ করে আমার সঙ্গে অনিরুদ্ধের ভীষণ ঝগড়া হয়। আমি বলেছিলাম, ওর সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখব না। তাতে ও আরও রেগে গিয়ে একদিন কলেজের মাঝখানে রেশমিকে নোংরা নোংরা কথা বলে। সেদিন বাড়ি ফিরে গিয়ে রেশমি সুইসাইড করে। গলায় ওড়না দিয়ে ফাঁসি লাগিয়ে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল ও।’

‘রেশমির বাড়িতে কে কে ছিল? কোথায় ওর বাড়ি বলতে পারবেন?’

সন্দীপকে এবার ভাবতে হল না। বলল, ‘শেয়ালদার কাছে কোথাও একটা ভাড়া থাকত ওরা। ভাই-বোন নেই। মা-হারা মেয়ে ছিল। অবস্থা ভালো ছিল না ওদের। ওর বাবা ট্রেনে হকারি করতেন। রেশমি টিউশনি পড়িয়ে পড়াশোনা চালাত। ওই ঘটনার বছর খানেক পরে আমি একবার গিয়েছিলাম খোঁজ নিতে। অনিরুদ্ধকে জানাইনি। গিয়ে শুনি ওর বাবাও মারা গেছে রেশমির মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই। ট্রেনে কাটা পড়েছিলেন। লোকে বলে সুইসাইড।’

অর্জুন উঠে দাঁড়াল; সঙ্গে টাপুরও। বলল, ‘আর কিছু যদি মনে পড়ে, মনে হয় জানানো যেতে পারে, তবে জানাবেন।’

‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করার ছিল!’ পেছন থেকে বলল সন্দীপ।

অর্জুন ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘বলুন।’

‘রেশমির মৃত্যুর সঙ্গে কি সত্যিই অনিরুদ্ধের মৃত্যুর কোনো যোগ আছে। কিন্তু রেশমি তো অনেক দিন আগে…’

‘আমরা এখনও জানি না। তদন্ত চলছে। আচ্ছা, শেষ একটা প্রশ্ন। এমন কারো কথা জানেন, যে রেশমির হয়ে এতদিন পরে প্রতিশোধ নিতে পারে?’ সন্দীপ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল অর্জুনের দিকে, যেন ও মাথার ভেতরে হাতড়াচ্ছে।

চেনেন এমন কাউকে?’ আবারও জিজ্ঞাসা করল অর্জুন। সন্দীপ চোখ সরিয়ে নিল। তারপর দুই দিকে মাথা নাড়ল।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে এক মুহূর্তের জন্য থামল অর্জুন। একটু যেন দ্বিধা করল। তারপর সন্দীপের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একটা শেষ প্রশ্ন। আপনি কি জানতেন, অনিরুদ্ধ মল্লিকের স্ত্রী দুই মাসের প্রেগন্যান্ট?’

‘কী!’ ছিটকে উঠে দাঁড়াল সন্দীপ। বিমূঢ়, হতচকিত তার মুখভাব। অর্জুন মাথা নাড়ল। সন্দীপ ধপ করে আবার বসে পড়ল বিছানার উপর। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *