১০
২৩ ডিসেম্বর, সোমবার, রাজারহাট গোপালপুর, রাত দুটো
অনিরুদ্ধ মল্লিকের একটা গোপন জীবন আছে যার ব্যাপারে খুব কম লোকই জানে। আর সেই সামান্য সংখ্যক লোক সম্মানের খাতিরে হোক বা অর্থের লোভে, মুখ খুলবে না।
এই অঞ্চলটা নিউটাউন অ্যাকশন এরিয়ার বাইরে, তবে খুব বেশি দূরে নয়। কাছেই একটা বাজার আছে। বাজারের গা ঘেঁষে চার লেনের রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে মিনিট তিনেক ড্রাইভ করলেই চৌমাথা মোড়। কিছুটা এগোলে ডান দিকে যে রাস্তাটা বেঁকে যায়, সেদিকে গাড়িটা ঘুরিয়ে দিলেন তিনি। মোটামুটি আধ কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তার ধার ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নামলেন। গাড়ির দরজার লকটা টেনে পরীক্ষা করে দেখলেন বার দুয়েক।
অনিরুদ্ধ মল্লিক অতিরিক্ত সাবধানী মানুষ, সেটা গাড়ির দরজার লক একাধিকবার পরীক্ষা করাই হোক বা নিজের নৈশজীবনের গোপনীয়তা বজায় রাখার ব্যাপার। সমাজে তাঁদের পরিবারের একটা সম্মান আছে। শুধু গোপন জীবনই বা কেন, অনিরুদ্ধ মল্লিক তার আসল চেহারাটাও এত বয়স পর্যন্ত সাধারণের কাছে সযত্নে লুকিয়ে রাখতে পেরেছেন।
বাবা জানতেন। ভাবনাটা আসতেই একটা তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠল তাঁর অধরোষ্ঠে। বাবা কখনো চাননি যে সারদা প্রকাশনীর দায়িত্ব অনিরুদ্ধের হাতে আসুক। চার পুরুষের ব্যাবসার প্রতি ভীষণ টান ছিল বাবার, হয়তো বা সন্তানের চেয়েও বেশি। আসলে নিজের সন্তান তো! অনিরুদ্ধকে হাড়ে হাড়ে চিনে ফেলেছিলেন তিনি। বুঝে গেছিলেন তার হাতে এলে এই ব্যাবসা বেশিদিন টিকবে না আর। ভাগ্যিস বুড়ো হার্ট অ্যাটাকে চলে গেছেন ঠিক সময়ে। নইলে অনিরুদ্ধকে আজ তহবিল তছরূপের দায়ে জেলে যেতে হত। নিজের ছেলেকেও ছাড়তেন না তিনি। ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। দেখেছেন, যখনই তিনি বিপদে পড়েন, ঈশ্বরের কৃপায় ঠিক কোনো না কোনোভাবে সব সমস্যার সমাধান নিজে থেকেই হয়ে যায়। বাবা ঠিক সময়ে মারা গিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছেন।
পায়ে হেঁটে সরু গলির ভেতর ঢুকলেন অনিরুদ্ধ। এই গলিতে গাড়ি ঢোকে না। সপ্তাহে একদিন বা বড়োজোর দুদিন মধ্যরাতে এখানে আসেন তিনি। ঘন্টা দুই-তিনেক কাটিয়ে ভোরের আলো ফোঁটার আগে বেরিয়ে যান।
আজ অনিরুদ্ধ মল্লিক একটু অন্যমনস্ক। পুলিশ অফিসার ইনশিয়োরেন্সের কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন কেন! তবে কি কিছু সন্দেহ করেছেন ভদ্রলোক? কিন্তু তিনিই বা কী করবেন? ব্যাবসা হাতে আসার পর প্রথমদিকে দুই হাতে টাকা উড়িয়েছেন অনিরুদ্ধ। বাজারে গলা অবধি দেনা। বেশি দেরি হলে পাওনাদাররা ছেড়ে কথা বলবে না কেউ। সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। জেলেও যেতে হতে পারে। তাই এটুকু কারচুপি তো তাঁকে করতেই হত।
আর তাছাড়া কারণ শুধু এটুকুই তো নয়। বইপাড়া ছোটো জায়গা। এখানে খবর হাওয়ায় ওড়ে। অনিরুদ্ধ মল্লিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছিলেন যে সুখেন্দুশেখর বেশি টাকার লোভে তাদের প্রকাশনা থেকে সব বই তুলে অন্য তাদের অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকাশনাকে দিয়ে দেবেন। প্রাথমিক কথাবার্তাও সারা হয়ে গেছিল। খুব রাগ হয়েছিল অনিরুদ্ধবাবুর। সুখেন্দুবাবুকে বুঝিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভদ্রলোক মানতে চাননি। সুখেন্দুবাবু তাঁদের প্রকাশনার বেস্টসেলিং লেখক। তিনি বেরিয়ে গেলে আর্থিক ক্ষতি তো হতই, উপরন্তু প্রকাশনার নাম খারাপ হত।
এখন সুখেন্দুবাবু বেঁচে নেই। যেই তাঁকে খুন করে থাকুন, তাঁকে মনে মনে ধন্যবাদ দেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। আবার সেই ঈশ্বরের হাত। ঠিক সময়ে ঠিক ব্যাপারটা বরাবর ঘটে যায় তাঁর জীবনে। গোডাউনে খুব বেশি বই ছিল না কাল। বেশিরভাগ নতুন আর দামি বই-ই গোপনে সরিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। পুরোনো, বিক্রি না হওয়া, পোকায় কাটা বইগুলোই রাখা ছিল। কিন্তু তাতে পুরো খেলাটাই বদলে গেছে। অখিলদাকে লুকিয়ে গোডাউনের বই বদলানোটা সহজ ছিল না। মোক্ষম মুহূর্তে অখিলদার স্ত্রী অসুস্থ হলেন।
তৃপ্তির হাসি হাসেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। সবার সহানুভূতি এখন তাঁর দিকে। অন্য প্রকাশনা চাইলেও এখন বিতর্কের ভয়ে তাঁর প্রকাশনার টাইটেল নিতে পারবে না। আজকাল সমাজ মাধ্যমের যুগে মানুষের অসহিষ্ণুতা সহজেই বেড়ে উঠে। কেউ ভেতরের সত্য খুঁজতে যায় না। এখানে আবেগ বিকোয়। ইনশিয়োরেন্সের টাকা পুরোটাই পেয়ে যাবেন অনিরুদ্ধবাবু। সুখেন্দুশেখরের সই সহ জাল দলিল বানিয়ে রেখেছেন আগে থেকেই। যতদিন বইয়ের কপিরাইট থাকবে, সুখেন্দু শেখরের সব বই সারদা থেকেই প্রকাশিত হবে।
খুক খুক শব্দ করে হেসে ফেলেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। আজ তিনি সত্যিই খুব খুশি। সব কিছুই তাঁর পরিকল্পনা মাফিক হয়েছে। এখন ইনশিয়োরেন্সের টাকাটা এসে গেলেই তাঁর সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। দ্রুত পা চালান তিনি। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে তাঁর গন্তব্য। সেখানে অপেক্ষায় আছে তার গভীর রাতের বন্ধু।
‘অনিরুদ্ধবাবু!’
কেউ তাঁর কাঁধে হাত রাখল। চমকে উঠলেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। এত রাতে কে এখানে! তিনি যে এখানে আসেন কেউ তো জানে না।
পেছন ফিরে তাকালেন তিনি। অন্ধকারে মিশে একজন দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা ভালো বোঝা যায় না।
‘কে?’ জিজ্ঞাসা করলেন অনিরুদ্ধ মল্লিক।
‘চিনতে পারলেন না?’ লোকটার কণ্ঠস্বরে তরল কৌতুক।
অনিরুদ্ধ মল্লিক বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। লোকটা হঠাৎই সজোরে এক লাথি মারল অনিরুদ্ধ মল্লিকের বুকে। আচমকা ধাক্কায় রাস্তার উপর ছিটকে পড়লেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। লোকটা এগিয়ে এসে তার বুকে চেপে বসল। অনিরুদ্ধবাবু যুবক, নেহাত শক্তিহীন নন। কিন্তু এই লোকটার শরীরে যেন অসুরের বল। লোকটা ডান হাতটা মুঠো করে এবার ঘুষি মারল অনিরুদ্ধ মল্লিকের মুখ লক্ষ করে। প্রচন্ড আঘাতে চোখের সামনে অন্ধকার দেখলেন তিনি। দ্বিতীয় ঘুষিটা এসে পড়ার আগে মুখটা সরিয়ে নিতে চেষ্টা করেও বিফল হলেন। আঘাতটা লাগল কান বরাবর। মাথার ভেতরটা ঝনঝন করে উঠল।
এবার লোকটা নিজের জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটা সবুজ রঙের মেয়েদের ওড়না বের করে আনল। অনিরুদ্ধ বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখলেন তাতে আগে থেকেই ফাঁস তৈরি করা। লোকটা অনিরুদ্ধর চুলের মুঠি ধরে টেনে মাথাটা কিছুটা উপরে তুলল। তারপর যত্ন করে ফাঁসটা পরিয়ে দিল অনিরুদ্ধ মল্লিকের গলায়। সেই অবস্থাতেই একের পর এক ঘুষি পড়তে লাগল অনিরুদ্ধর মুখে, ঠোঁটে, চোয়ালে। ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়তে লাগলেন তিনি।
এবার লোকটা উঠে অনিরুদ্ধ মল্লিকের বুকে পা দিয়ে দাঁড়াল। অনিরুদ্ধ মাথা তুলতে চেষ্টা করলেন কয়েকবার। তারপর হাল ছেড়ে চোখ বুজলেন। লোকটা গলার ওড়নাটা ধরে টান মারল এবার। টানতেই থাকল যতক্ষণ না অনিরুদ্ধের যাবতীয় প্রতিরোধ থেমে গেল। তার নিথর শরীরটা পড়ে রইল গলির ধুলোর উপর যেখান থেকে আর কয়েকটা মাত্র পা এগোলে তিনি পৌঁছে যেতেন তার প্রেমিকের কাছে। সেখানেই দয়িতের বাহুবন্ধনে রাত কাটানোর কথা ছিল তাঁর।
চোখের সামনে অন্ধকারটা জমাট বাঁধছে। লোকটা তাঁর সামনে বসে মাথাটা ঝুঁকিয়ে তাকিয়ে আছে অনিরুদ্ধবাবুর মুখের দিকে। যেন প্রতিটি মুহূর্ত পরম তৃপ্তির সঙ্গে মনের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছে সে। একসময় বোধের শেষ বিন্দুটুকু লুপ্ত হল অনিরুদ্ধ মল্লিকের। জেগে থাকতে পারলে তিনি দেখতেন লোকটা পকেট থেকে ক্ষুর বের করে ধীরেসুস্থে ফালা করে দিচ্ছে তাঁর গলার একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত।
১১
‘এসব কী হচ্ছে অর্জুন?’ বিরক্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন সৌরভ সান্যাল।
অর্জুন মাথা নীচু করে বলল, ‘মিডিয়া হেঁকে ধরছে। এভাবে কাজ করা খুব মুশকিল স্যার। আমাদের টিম যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।’
অস্থিরভাবে মাথা নেড়ে সৌরভবাবু বললেন, ‘তাতে লাভ কি আদৌ হচ্ছে? এই শহরের ল অ্যান্ড অর্ডার বজায় রাখার দায়িত্ব কলকাতা পুলিশের। এভাবে পরপর তিনটে মৃত্যু…’
‘কিন্তু মৃত্যু তিনটে যে পরস্পর রিলেটেড, তার নিশ্চয়তা কী স্যার?’ বিরস কণ্ঠে বলল অর্জুন, ‘এটা মিডিয়ার তৈরি একটা মিথও তো হতে পারে। ঠিক আছে মানলাম সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের সঙ্গে অনিরুদ্ধ মল্লিকের একটা যোগসূত্ৰ না হয় ছিল। এক্ষেত্রে দুটো মার্ডারের মধ্যে সম্পর্ক থাকলে থাকতেও পারে। কিন্তু এর সঙ্গে বিলাল শেখের মার্ডারটাকে কানেক্ট করার কি সত্যিই কোনো কারণ আছে? শুধু ক্ষুর দিয়ে গলা কাটা হয়েছে বলে?’
সৌরভ সান্যাল অর্জুনের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘বোসো!’
অর্জুন চেয়ার টেনে বসল। তবে তার চোখেমুখে অসন্তোষ চাপা থাকছে না। তারই বা দোষ কোথায়! গত কয়েকদিন তার টিমের সকলে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে কাজ করেছে। অনেক রাতে বাড়িতেও ফেরা হয়নি। এমনিতেই সামনে লোকসভা নির্বাচন। তাই রিসোর্স কম। তা পুলিশ কম বলে শহরের ক্রাইম তো বন্ধ হয়ে যাবে না। তার উপর মিডিয়ার অত্যাচার কম ছিল না। গোদের উপর বিষের ফোঁড়ার মতো উড়ে এসে জুড়ে বসেছে সোশ্যাল মিডিয়া। সেখানে আবার সকলেই অপরাধ বিশেষজ্ঞ। পুলিশ কত অপদার্থ সেটা প্রমাণ করাই যেন নেট নাগরিকদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘দেখো অর্জুন, তোমার কাজ সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই। আই ট্রাস্ট অন ইয়োর এবিলিটিজ। কিন্তু পাবলিক তো সেটা জানে না। তার উপর উপর থেকে রোজ আমার কাছে কাজ কতটা এগোল তার রিপোর্ট তলব করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় আমাদের কিছু তো জবাব দিতে হবে, তাই না? মিডিয়া অলরেডি তিনটে মৃত্যুকে সিরিয়াল কিলিং তকমা দিয়ে বসে আছে। সত্যি বলতে কী, আমরাও কোনো সম্ভাবনাকেই সরিয়ে রাখতে পারি না। তার উপর তিনটি খুন একইভাবে হয়েছে গলা কেটে।
অর্জুন সৌরভবাবুকে থামিয়ে বলল, ‘কিন্তু স্যার, শুধু ক্ষুরের ব্যবহারের কারণে সিরিয়াল কিলিং ভেবে ফেলাটা টু আরলি প্রেডিকশন হয়ে যাচ্ছে না?’
‘পসিবল। কিন্তু শুধু পসিবিলিটি দিয়ে কাজ হবে না। আমাদের প্রমাণ চাই। তোমাকে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দিতে হবে না যে কেসটা কোন দিকে টার্ন নিচ্ছে। ইউ আর ইন্টেলিজেন্ট এনাফ ফর দ্যাট!’
অর্জুন মাথা নাড়ল। ম্লান হেসে বলল, ‘সেটা তো পুলিশ কিছু প্রেডিক্ট করার আগেই মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়া উদ্যোগ নিয়ে নিজেরাই রায় দিয়ে দিয়েছে। সিরিয়াল কিলিং-এর সম্ভাবনাটা আমি নাকচ করে দিচ্ছি না। কিন্তু স্যার, পোক্ত প্রমাণ ছাড়া সেই ধারণা নিয়ে এগোনো উচিত হবে বলে মনে হয় না। আপাতত আমি তিনটি কেসকে ইন্ডিভিজুয়াল কেস হিসেবেই দেখছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কেসের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে ওই ক্ষুর দিয়ে গলা কাটা ছাড়া সেভাবে কোনো প্যাটার্ন আমি এখনও এস্টাব্লিশ করতে পারিনি।’
‘হুম!’ চিন্তিত মুখে মাথা নাড়লেন সৌরভ সান্যাল। তারপর বললেন, ‘বাই দ্য ওয়ে, অনিরুদ্ধ মল্লিক অত রাতে রাজারহাটে গিয়েছিলেন কেন জানতে পেরেছ?’
অর্জুন বলল, ‘ভদ্রলোকের বাড়ির লোক একদম কো-অপারেট করছেন না স্যার। অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছি। বারবার তোতাপাখির মতো একই কথা বলে যাচ্ছেন যে তাঁরা কিছু জানেন না।’
‘পরিবারের একজন সদস্য মধ্যরাতে গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন, কেউ কিছু জানল না, এমনকি তাঁর স্ত্রীও নয়, এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। ওঁরা শিয়োর কিছু লুকোচ্ছেন।’
অর্জুন মাথা নাড়ল। বলল, ‘জানি। আমি ওই এলাকার সোর্সদের অ্যালার্ট করে দিয়েছি। ওদের বলেছি অনিরুদ্ধ মল্লিকের বাড়ির কাজের লোকদের থেকে কথা বের করতে। আশা করছি এক দু-দিনের মধ্যে কিছু জানতে পেরে যাব। অনিরুদ্ধ মল্লিক গলির বাইরে গাড়ি পার্ক করে পায়ে হেঁটে এগোচ্ছিলেন। নিউটাউন অ্যাকশন এরিয়ার বাইরে জায়গাটা, এখনও খুব বেশি ডেভেলপড নয়। আশেপাশে কিছু ফ্ল্যাট এদিক-ওদিক গজিয়ে উঠেছে। প্লট করেও জমি বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তাতে সামগ্রিকভাবে এলাকার বেসিক চরিত্রটা বদলায়নি। বেশিরভাগই মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের বাস ওই অঞ্চলে। ওখানে অনিরুদ্ধ মল্লিকের কী কাজ থাকতে পারে সেটা জানতে আরেকটু সময় লাগবে।’
‘তিনজন ভিকটিমের মধ্যে দুজনের তো যোগাযোগ ছিল। বিলাল শেখের সঙ্গে এদের কোনোভাবে কোনো কানেকশন ছিল কি না সেটা খুঁজে দেখো অর্জুন।’ একটু চিন্তিতমুখে বললেন সৌরভ সান্যাল। অর্জুন বুঝল ডিসিডিডি স্যারও সিরিয়াল কিলিং-এর ধারণাটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। সে বলল, ‘আমি সব প্রোবাবিলিটিই খতিয়ে দেখছি। তবে স্যার, একটা কথা ভাবছি!
‘কী কথা?’
‘বাই চান্স, মার্ডারগুলো যদি সত্যিই সিরিয়াল কিলিং হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে হয়তো আরও খুন হবে। লোকের কাছে পুলিশের মুখ পুড়বে। আমাদের বোধ হয় রাতের বেলা করে রাস্তায় টহলদারি বাড়ানো উচিত!’ বলল অর্জুন।
সৌরভ সান্যাল সামনে এগিয়ে ঝুঁকে বসলেন। অর্জুনের চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘উচিত তো অনেক কিছুই। কিন্তু সমস্যা অনেক। প্রথমত, এখন সারা কলকাতা জুড়ে পাহারা বসানোর মতো ফোর্স আমাদের কাছে নেই। নির্দিষ্ট কোনো জায়গাও আমাদের জানা নেই। দ্বিতীয়ত, এভাবে হঠাৎ করে শহর জুড়ে পাহারা বাড়ালে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। মিডিয়া কেসগুলো নিয়ে আরও বেশি মাথা ঘামাবে। তবে যেটা আমরা করতে পারি তা হল, কলকাতার প্রত্যেক থানার একজন কি দুজন অফিসারকে নিয়ে একটা কোর টিম তৈরি করতে পারি। টিমের প্রত্যেকে নিজের এলাকার সোর্সদের অ্যালার্ট করবে। কেউ রাতে সন্দেহজনক কাউকে ঘোরাফেরা করতে দেখলে খেয়াল রাখবে, প্রয়োজন হলে জানাবে আমাদের।’
‘সেই সঙ্গে থানাগুলোকে অ্যালার্ট থাকতে বলতে হবে। তারা নিজেদের মতো করে রাতের টহলদারি বাড়াবে। আর ট্র্যাফিক পুলিশদেরও অ্যালার্ট থাকতে বলা দরকার। সাসপিশাস মুভমেন্ট চোখে পড়লেই অ্যাকশন নেবে।’
মাথা নেড়ে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন সৌরভ সান্যাল। তারপর মুখ তুলে বললেন, ‘ঈশ্বরে বিশ্বাস করো, অর্জুন?’
শেষের প্রশ্নটায় একটু ধাক্কা খেল অর্জুন। ভাবনাটাকে দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে মাথা নাড়ল। বলল, ‘করি!’
সৌরভ সান্যাল হাসলেন। বললেন, ‘তবে ঈশ্বরকে ডাকো। প্রার্থনা করো যেন আর খুন না হয়। এরপর আবার একই প্যাটার্নে মার্ডার হলে কিন্তু আর কোনোভাবেই ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়া যাবে না মনে রেখো।’
অর্জুনের মনে পড়ে গেল টাপুরের কথা। ও সেদিন বলেছিল হয়তো আরও খুন হবে। অনিরুদ্ধ মল্লিকের খুনের পর এখন ওকে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হচ্ছে, এখনও কি একই কথা বলবে টাপুর?
১২
‘স্যার, বিলালের কেসে একটা ব্রেক থ্রু পাওয়া গেছে। আপনি কি আসবেন?’ সঞ্জয় পালের গলায় উত্তেজনা স্পষ্ট। অর্জুন অফিস থেকে বেরোনোর আগে কাজ গোছাচ্ছিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত সাড়ে দশটা বাজে। হাতের ফাইলটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল সে। বলল, ‘আসছি। আপনি পুলিশ স্টেশনেই আছেন তো?’
সঞ্জয়বাবু বললেন, ‘আছি স্যার। আপনি আসুন।’
এম জি রোড পুলিশ স্টেশনে যখন পৌঁছোল অর্জুন, তখন ঘড়ির কাঁটা সোয়া এগারোটা পার করেছে। রাতের পথে বড়ো মালবাহী ট্রাকেদের অবাধ যাতায়াত ফলে অনেক সময়েই সিগনালে লম্বা লাইন পড়ে যায়। নইলে এটুকু রাস্তা আসতে এতটা সময় লাগার কথা নয়।
সঞ্জয়বাবু অর্জুনের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তাকে ঢুকতে দেখে এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘ভেতরে চলুন স্যার।’
ভেতরে ছোটো একটা ঘরে বেঞ্চের উপর ভীষণ রোগা একজন লোক কোলকুঁজো ভঙ্গিতে বসে আছে। পরনে লুঙ্গির উপর ময়লা হাফ শার্ট। পায়ে ক্ষয়ে যাওয়া হাওয়াই চটি। গালে বেশ কয়েক দিন না কাটা অপরিচ্ছন্ন দাড়িগোঁফ। অর্জুনদের ঢুকতে দেখে চোখ তুলে তাকাল। লাল চোখ। সারা শরীর দিয়ে ভুরভুর করে সস্তার দেশি মদের গন্ধ বেরোচ্ছে।
সঞ্জয় পাল একটা চেয়ার টেনে অর্জুনকে বললেন, ‘বসুন স্যার।’
অর্জুন বসতে নিজেও একটা চেয়ার টেনে বসলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘এর নাম ওমর আফজল। এম জি রোড, মৌলালি, শেয়ালদা স্টেশন, এন্টালি, আমহার্স্ট রোড, কলেজ স্ট্রিট এলাকায় রিক্সা চালায় ও। রাতে রিকশাতেই ঘুমোয়। বিলালের মার্ডারের ব্যাপারে ওর কাছে কিছু খবর আছে। ওমর কিছু দেখেছে। আপনি বরং ওর মুখেই শুনুন।’
অর্জুন ওমরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী দেখেছ তুমি ওমর?’ লোকটা লাল চোখ তুলে একবার সঞ্জয় পালের দিকে তাকাল। সঞ্জয় পাল মাথা নাড়লেন। ওমর বলতে শুরু করল।
‘বিলাল শেখ যেদিন মারা গেল, তার কয়েক দিন আগের ঘটনা। আমি স্যার সেদিনও অন্যান্য দিনের মতো রাত সাড়ে এগারোটায় লাস্ট ভাড়া খেটেছি। তারপর ভজার দোকান থেকে তরকা রুটি কিনে খেলাম। এম জি রোডের উপর ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের পাশে সাইড করে রিকশা রেখে ওর উপরে শুয়েই ঘুমোচ্ছিলাম। তখন কত রাত হবে জানি না। একটা কালো রঙের মোটর সাইকেল এসে দাঁড়াল আমার রিকশা থেকে কিছুটা দূরে। একজন লোক বাইক থেকে নামল দেখলাম। তারপর বাইক দাঁড় করিয়ে আমার রিকশার পাশ দিয়ে হেঁটে কোথায় যেন চলে গেল। ঘুম ভেঙে যাওয়ায় আমার আর ঘুম আসছিল না। অনেকক্ষণ ঘুমের চেষ্টা করে উঠে একটা বিড়ি ধরাব ভাবছি, তখনই লোকটা আবার ফিরে এসে বাইকে করে চলে গেল। লোকটার কাঁধে একটা ব্যাগ ছিল।’
‘লোকটার মুখ দেখেছিলে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
ওমর মাথা নাড়ল। বলল, ‘না স্যার। রাতের বেলা। তা ছাড়া লোকটা ওই যে আজকাল মাথা ঢাকা জ্যাকেট হয় না, সেগুলো পরে ছিল।’
‘হু! হুডি। তারপর?’ জানতে চাইল অর্জুন।
‘তারপর স্যার প্রতি রাতেই আসত লোকটা। বাইক দাঁড় করিয়ে কোথায় যেন যেত। আবার কিছুক্ষণ পরে চলে আসত।’
‘তোমার সন্দেহ হয়নি?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
ওমর ওর ছোপ ধরা দাঁত বের করে হাসল। বলল, ‘আমাদের ওই চত্বরে সব কি আর সাদা কাজকম্ম হয়? আপনাদের আর কী বুঝিয়ে বলব! সবই তো জানেন স্যার। এখানে খেটে খেতে হলে চোখ কান বুজেই থাকতে হয়।’
সঞ্জয় পাল এবার পাশ থেকে বললেন, ‘ওমর আমাদের পুরোনো সোর্স। যথেষ্ট ডিপেন্ডেবল।
অর্জুন মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তারপর বলো!’
ওমর বলল, ‘এরকম প্রায় ছয়-সাত দিন চলেছিল। লোকটাকে আমি শেষ দেখেছিলাম বিলাল শেখ যেদিন খুন হল সেই রাতে। সেদিন কিন্তু লোকটা অন্যদিনের চেয়ে একটু দেরিতে ফিরেছিল। দেখে মনে হচ্ছিল খুব তাড়া। পরদিন ভোরে জানলাম একটা ডেড বডি পাওয়া গেছে। সেদিনের পর থেকে লোকটাকে আর আসতে দেখিনি।’
অর্জুন আর সঞ্জয় পাল নীরবে দৃষ্টি বিনিময় করল।
অর্জুন এবার চেয়ার টেনে ওমরের কাছে এগিয়ে বসল। গলাটা যথাসম্ভব নরম করে বলল, ‘ওমর, একমাত্র তুমিই লোকটাকে দেখেছ। একদিন নয়, একাধিকবার দেখেছ। যদি এই-ই বিলাল শেখের খুনি হয়, তাহলে তুমি আমাদের সাহায্য করতে পারো ওকে ধরতে। মনে করার চেষ্টা করো, ভেবে দেখো এমন কিছু কি তুমি লক্ষ করেছিলে যা তোমার অদ্ভুত লেগেছিল? কিংবা ধরো এমন কোনো চিহ্ন বা যা কিছু হোক, যা দিয়ে আমরা লোকটাকে চিনতে পারি। বাই দ্য ওয়ে, লোকটা কোন বাইক চালাত, কোন মডেল, কোন ব্র্যান্ড বা বাইকের নম্বর কিছু খেয়াল করেছিলে কি?’
ওমর দু-দিকে মাথা নাড়ল। বলল, ‘নম্বর দেখিনি স্যার। মোটর সাইকেলটা আমার দিকে উলটো করে দাঁড় করাত লোকটা। তবে বেশ লম্বা-চওড়া চেহারা ছিল। যোয়ান মানুষ। মাথা নীচু করে হনহন করে হাঁটত।’
‘লম্বা মানে কতটা লম্বা হবে? আমার মতো?’ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন। তার নিজের উচ্চতা পাঁচ ফুট এগারো।
ওমরকে একটু যেন দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল। অর্জুনকে আপাদমস্তক মেপে মাথা নেড়ে বলল, ‘তা হবে স্যার। একটু বেশিও হতে পারে!’
অর্জুন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার চেয়েও লম্বা মানে ছয় ফুট বা তার বেশি উচ্চতা হওয়ার কথা খুনির। ডক্টর সেনের মত অনুসারেও দাঁড়ানো অবস্থায় খুন হলে খুনি এতটা লম্বা হওয়ার কথা নয়। তবে বসা বা ঝুঁকে থাকা অবস্থায় খুন হলে খুনি লম্বা হতেও পারে। সেক্ষেত্রে ওমরের বর্ণনায় বিশ্বাস করা চলে। অবশ্যই এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর। গড়পরতা বাঙালিদের মধ্যে ছয় ফুট বা তার বেশি উচ্চতার লোক খুব বেশি দেখা যায় না। ওমরের কথা বিশ্বাস করলে পুলিশের কাজটা বেশ খানিকটা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল লোকটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য!
ওমরের দিকে ভালো করে তাকাল অর্জুন। ক্ষয়াটে চেহারা, চোখদুটো বেশ লাল। মদ তো খায়ই, অন্য নেশা থাকাও বিচিত্র নয়। সুতরাং রাতের অন্ধকারে নেশার ঘোরে কী দেখতে কী দেখেছে, তার উপর ভরসা করা যায় না পুরোপুরি। আবার যেখানে কোনো থ্রেডই নেই এই কেসে, তাই যেটুকু মিলেছে সেটাকে
অবহেলাও করাও যায় না।
সঞ্জয় পালের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল অর্জুন। দুজনেই উঠে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অর্জুন চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘লোকটাকে ট্রাস্ট করা যায়?’
সঞ্জয় পাল বলল, ‘এর আগেও ওমর আমাদের বেশ কিছু কাজের খবর এনে দিয়েছে। রিকশা নিয়ে সারাদিন এই এলাকাতেই পাক দেয়। ফলে ওর কাছে অনেক খবর থাকে। রাতের বেলা নেশা করে ঠিকই। তবে লোকটা কাজের। চোখ-কান খোলা রাখে।’
‘সিসিটিভি ফুটেজের ব্যবস্থা করুন’, বলল অর্জুন।
‘হয়ে যাবে স্যার। আজ রাত হয়ে গেছে, বাড়িতে মা অপেক্ষা করবে। আমি না ফেরা অবধি বুড়ি কিছুতেই ঘুমোবে না। আমি বের করে আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি কালকের মধ্যে। অসুবিধে নেই তো?’ কাঁচুমাচু মুখে বললেন সঞ্জয় পাল।
অর্জুন হাসল। বলল, ‘না, আপনি বাড়ি যান! কাল পাঠালেও চলবে।’
১৩
মুখ্যমন্ত্রী অম্লান চক্রবর্তী টাপুরকে নিজের অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সপ্তাহ দুয়েক আগে। রাজ্য সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ গোপন নথি কীভাবে যেন বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ব্যাপারটা ধরা পড়তে দেরি হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেগুলি কীভাবে বা কার মারফত বাইরে যাচ্ছে সেটা কিছুতেই ধরা যাচ্ছিল না। অন্যদিকে ঘটনাটা যথেষ্ট সংবেদনশীল, কারণ ওইসব নথির সংবাদ মন্ত্রীসভার খুব অল্প সংখ্যক কয়েকজন মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ আমলা ছাড়া কারোর জানার কথা নয়। বিনা প্রমাণে কারোর উপর দোষারোপ করাও সম্ভব নয়। সুতরাং সংঘমিত্রা ব্যানার্জিকে প্রয়োজন ছিল তাঁর।
গত দুই সপ্তাহ তাই টাপুর দম ফেলার ফুরসত পায়নি। এরই মাঝে দুটো কেস এসেছিল। সবার কাছেই ক্ষমা চেয়ে ফেরাতে হয়েছে। মিতুল অফিস নিয়ে ব্যস্ত। অনসাইটে যাওয়াটা এবার বোধ হয় বেচারি আর এড়াতে পারবে না। ক-দিন ধরে মন খারাপ করে ঘুরছে আর ফোন করলেই ঘ্যানঘ্যান করছে। কাল সারারাত ধরে সরকারি নথি রহস্যের জট ছাড়িয়েছে টাপুর। ভোর রাতের দিকে অম্লান চক্রবর্তীকে নিজের ফাইন্ডিংস মেল করে ঘুমোতে গেছে।
ফোনটা এসেছিল সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ। ফোনের অপর প্রান্তের ভদ্রমহিলা মৃদুভাষিনী। সুন্দর ও স্পষ্ট উচ্চারণে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি।
‘আমার নাম সুমনা ভৌমিক। আমি কি সংঘমিত্রা ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলছি?’
‘হ্যাঁ, আমি সংঘমিত্রা বলছি!’
ভদ্রমহিলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলেছিলেন, ‘আমি সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের স্ত্রী।’
দীর্ঘ নির্ঘুম রাত কাটানোর কারণেই হয়তো, নামটা মাথার ভেতর অনুরণন তুললেও ব্যক্তিটি কে হঠাৎ করে মনে করতে পারল না টাপুর। মস্তিষ্কের মধ্যে হাতড়াতে থাকল। অপর প্রান্তের নারী হয়তো সেটা বুঝলেন। বললেন, ‘আমার স্বামী পুলিশে চাকরি করতেন। অবসর নিয়েছিলেন। লেখালেখি করতেন। সম্প্ৰতি খুন হয়েছেন।’
‘সুখেন্দুশেখর ভৌমিক!
‘হ্যাঁ, চিনতে পেরেছেন?’ একইরকম মৃদুকণ্ঠে বললেন ভদ্রমহিলা।
টাপুর বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু কেসটা তো কলকাতা পুলিশ দেখছে। আশা করি খুব শিগগিরই খুনি ধরা পড়ে যাবে।’
সুমনা ভৌমিক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বললেন, ‘আমিও সেই আশাতেই আছি। কিন্তু আপনার সঙ্গে অন্য একটা বিষয়ে একটু কথা বলতে চাই। একবার দেখা করা সম্ভব কি?’
টাপুর দেওয়াল ঘড়ির দিকে চোখ রাখল। আরেকটু বিছানায় গড়ানোর ইচ্ছে ছিল যদিও, কিন্তু ঘুমটা কেটে গেছে। একজন সদ্যবিধবাকে বাড়িতে আসতে বলা ভালো দেখায় না। তাই বলল, ‘বলুন কোথায় দেখা করলে আপনার সুবিধে হয়? আপনার বাড়ি তো বিরাটিতে, না?’
সুমনা তাড়াতাড়ি বলল, ‘না, আপনাকে আসতে হবে না। কাজের বাড়ি। লোকজন আছে। সকলের সামনে আমি কথা বলতে চাইছি না। আমিই যাব আপনার বাড়িতে।’
অতএব বিছানার মায়া ছাড়তে হয়েছে টাপুরকে। যোগাসন ও ব্রেকফাস্ট সেরে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে সবে টেবিলে বসেছে, এমন সময়ে কলিং বেলটা বেজে উঠল। ঘড়িতে কাটায় কাঁটায় সাড়ে নটা বাজে। ভদ্রমহিলার সময়জ্ঞান দেখে মনে মনে খুশি হল সে। দরজার ওপারে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর বয়স ষাটের আশেপাশে হওয়ার কথা। মাঝারি উচ্চতা, ক্ষীণাঙ্গী। ভদ্রমহিলার চোখেমুখে শোকের প্রলেপ সত্ত্বেও যথেষ্ট সুন্দরী তিনি। মাথার চুলের পাক লুকোনোর জন্য রং করেননি। ফলে কালোর মাঝে রুপোলি ঝিলিক তার চেহারায় এক শান্ত সৌম্যশ্রী যোগ করেছে।
টাপুরের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করলেন তিনি। ফিকে হেসে বললেন, ‘আমি সুমনা। আমিই ফোন করেছিলাম আপনাকে।’
‘আসুন, ভেতরে আসুন।’
ভেতরে এসে ঘরের চারদিকে দৃষ্টি বোলালেন সুমনা। বললেন, ‘আপনাকে বিরক্ত করলাম না তো?’
টাপুর হাসল। মুখোমুখি সোফায় বসে বলল, ‘একদম নয়। আপনার স্বামীর ব্যাপারটা শুনেছি। আমি সত্যিই দুঃখিত!’
সুমনা মাথা নীচু করে বলল, ‘ব্যাপারটা খুবই আকস্মিক। এরকম কিছুর কথা ভাবতেও পারিনি আমি। দীর্ঘ চাকরি জীবনে পুলিশের অনেক শত্রু তৈরি হয়। অথচ সেই সময়ে ওঁর গায়ে কোনোদিন আঁচড়ও লাগেনি। এখন যখন সেসব থেকে দূরে, তখন এরকম একটা ঘটনা আমাদের সকলকেই হতভম্ব করে দিয়েছে।’
টাপুর বলল, ‘আপনি চা খাবেন তো? না কফি? একটু বসুন। আমি বানিয়ে আনছি এখনই।’
সুমনা বললেন, ‘আমি দিনে দু-বারই চা খাই। সকালে খেয়ে এসেছি। আর কিছু খাব না। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। ব্যাঙ্কে যাওয়ার নাম করে বেরিয়েছি। আমি আমার কথাগুলো বরং আগে বলে নিই।’
সোজা হয়ে বসল টাপুর। বলল, ‘বলুন।’
সুমনা ভৌমিক বলতে শুরু করলেন।
‘আপনি বোধ হয় জানেন, সুখেন্দু বছর দুয়েকের একটু বেশি সময় ধরে ফেসবুকে লেখালেখি করত। তারপর পাঁচটা বইও বেরোয় ওর। বইগুলো প্রকাশনীর বেস্ট সেলার ছিল। কিন্তু ইদানীং শুখেন্দুর মনে হচ্ছিল যে প্রকাশনা সংস্থা তাঁকে ঠকাচ্ছে। বই বিক্রির সঠিক হিসেব দিচ্ছে না। অন্য একটি প্রকাশনার সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা সারা হয়ে গেছিল ওর। সেই সময়ে অনিরুদ্ধ মল্লিক ওকে ফোন করে থ্রেট দিয়েছিলেন যে তিনি ওঁকে দেখে নেবেন।
‘সে কী! এই কথাগুলো আপনি পুলিশকে বলেননি?’
‘বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু তার আগেই তো অনিরুদ্ধ মল্লিকও মারা গেলেন। সুমনা ভৌমিক বললেন।
টাপুর বলল, ‘যদিও কোনো লেখক তাঁর বই তুলে নিতে চান বলে তাঁকে খুন করানোর আইডিয়াটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবু আমার মনে হয় কথাগুলো পুলিশের জানা উচিত!’
সুমনা ভৌমিক বললেন, ‘আসলে শুধু এটুকু ব্যাপার তো নয়। আমার স্বামী অনিরুদ্ধ মল্লিকের ব্যাপারে আরও কিছু কথা জেনে ফেলেছিলেন। হয়তো সেই কারণে…’
‘কী কথা?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল টাপুর।
সুমনা ভৌমিকের মুখের রেখায় এই প্রথম দ্বিধার ভাব ফুটে উঠতে দেখল টাপুর। দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন তিনি। চোখেমুখে অস্বস্তির ভাব স্পষ্ট। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার মাথা তুলে বলল, ‘কী যে বলি! আসলে আমরা বয়স্ক মানুষ। কিছু ব্যাপারে মানসিক উদারতা এখনও আয়ত্ব করে উঠতে পারিনি।’
টাপুর বলল, ‘আপনি আমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন।’
সুমনা দ্বিধাটুকু ঝেড়ে ফেললেন এবার। বললেন, ‘বলব বলেই তো এসেছি। অনিরুদ্ধ মল্লিক আমার স্বামীকে বই করার প্রস্তাব যখন দেন তখন তাঁর ব্যাপারে আমরা কিছুই জানতাম না। এরপর ওর প্রথম বইটা বেরোনোর পর আমার মাসতুতো বোনের ছেলে দীপ্তেশ একদিন কথাচ্ছলে ঘটনাটা বলেছিল আমাদের।’ এটুকু বলে সুমনাদেবী নিঃশ্বাস নিলেন। তারপর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলতে শুরু করলেন।
‘দয়ানন্দ সায়েন্স কলেজে দীপ্তেশের সঙ্গে পড়তেন অনিরুদ্ধ। দুজনেই ম্যাথেমেটিক্সে অনার্স। কলেজে পড়াকালীন একটি মেয়েকে কেন্দ্র করে কিছু একটা খারাপ ঘটনা ঘটেছিল যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন অনিরুদ্ধ ও তার কিছু বন্ধুবান্ধব। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বেশ জলঘোলাও নাকি হয়েছিল সেই সময়ে। অনিরুদ্ধর পরিবার, বিশেষ করে তার বাবা প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। যার ফলে পুলিশ কেস অবধি না গড়ালেও কলেজ কর্তৃপক্ষ অনিরুদ্ধের বিরুদ্ধে বেশ কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেই সময়ে। তাকে কলেজ থেকে রাস্ট্রিকেট করার কথা হয়েছিল। কিন্তু অনিরুদ্ধের বাবা তার আগেই ছেলেকে সেখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়ে দেন।’
‘কেসটা কী ঘটেছিল ঠিক?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুর।
সুমনা বললেন, ‘একটি মেয়েকে কলেজে উত্যক্ত করতেন অনিরুদ্ধ ও তার বন্ধুরা। মেয়েটির উপরে এতটাই মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন তারা যে মেয়েটি শেষমেষ আত্মহত্যা করেছিল। কিন্তু এর পেছনে আসল কারণ নাকি ছিল অন্য। মেয়েটি দীপ্তেশকে কলেজের এক সহপাঠী বন্ধুর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেছিল। সেটা গোপন করার জন্যই উলটো মেয়েটিকে থ্রেট দিতে থাকে অনিরুদ্ধ।
টাপুর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এটা আর এমন কী ব্যাপার? কলেজে তো প্রেম, ঘনিষ্ঠতা হয়েই থাকে। সব কলেজেরই আড়ালে আবডালে আপত্তিজনক দৃশ্য দেখা হামেশাই যায়। এর জন্য…’
সুমনা ভৌমিক টাপুরকে থামিয়ে বললেন, ‘ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নয়। অনিরুদ্ধ মল্লিক যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছিলেন, সে একটি ছেলে। মানে, কী ভাবে বলি, আসলে…’
টাপুর বলল, ‘মানে অনিরুদ্ধ মল্লিক সমকামী ছিলেন?’
সুমনা ভৌমিক মাথা নীচু করলেন। বললেন, ‘উনি কিন্তু বিবাহিত।’
‘হুম!’ বলে চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল টাপুর। ‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে সুখেন্দুবাবু সেই কথা জেনে গেছিলেন বলে তাঁকে খুন করিয়েছেন অনিরুদ্ধ মল্লিক। কিন্তু সুখেন্দুবাবু যে জানেন, সেটা অনিরুদ্ধ জানলেন কীভাবে?’
সুমনা মৃদুকণ্ঠে বললেন, ‘বই তুলে নেওয়ার কথা জানতে পেরে অনিরুদ্ধ ফোন করে আমার স্বামীকে ধমকধামক দিতে থাকেন। তখন রেগে গিয়ে সুখেন্দুও বলেছিল যে দয়ানন্দ সায়েন্স কলেজে কী ঘটেছিল সব জানেন তিনি। প্রয়োজন হলে সবাইকে জানাতেও দ্বিধা করবেন না। তাই…’
‘বুঝলাম। কিন্তু আমার কাছে আপনি কী চান? এটা তো পুলিশের কেস! টাপুর নরম গলায় বলল।
সুমনা চোখ তুলে তাকালেন তার দিকে। বললেন, ‘দেখুন, পুলিশের স্ত্রী আমি। সুখেন্দু তার বইয়ে যাই লিখে থাকুক, পুলিশের কাজের ধরনের সঙ্গে আমি পরিচিত। ওর কাজের সূত্রে লালবাজারে আমার পরিচিত অনেকেই আছে। আমি শুনেছি পুলিশ নাকি সব মার্ডারগুলোকে একসঙ্গে তদন্ত করছে। আপনার অনেক নাম শুনে এখানে এসেছি আমি। আমি চাই আপনিও সুখেন্দুর মার্ডার কেসটা আলাদাভাবে একটু দেখুন।’
টাপুর বলল, ‘দেখুন, আমার ব্যাপারে আপনি কী শুনেছেন জানি না। কিন্তু একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের এক্তিয়ার খুব সীমিত। এভাবে কোনো মার্ডার কেসের মধ্যে আমি লাফিয়ে পড়তে পারি না। আমাকেও পুলিশের সাহায্য নিতে হয়। তাই মার্ডার কেসের তদন্ত আমি কতটা করতে পারব জানি না, তবে আমি কিছুটা খোঁজখবর নিতে পারি। আপনি এখন বাড়ি যান, আমি একটু খোঁজ নিয়ে জানাব আপনাকে। কেমন?’
‘আপনার ফিজটা?’
টাপুর হাসল। বলল, ‘আদৌ কিছু করতে পারব কি না জানি না। তাই ফিজের কথা এখন থাক। যদি কিছু সাহায্য সত্যিই করতে পারি, তখন না হয় দেখা যাবে।’
১৪
সিসিটিভি ফুটেজগুলো মন দিয়ে দেখছিল অর্জুন যখন টাপুরের ফোনটা এল। সঞ্জয় পাল করিৎকর্মা লোক। পরদিন সকালেই ফুটেজগুলো পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফোন করে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘স্যার, বলেছিলাম না ওমর ভালো সোর্স। বিশ্বাস করা যায়। ফুটেজগুলো দেখুন স্যার। একটা লোককে সত্যিই টানা চার পাঁচদিন ধরে এম জি রোডের যেখানে ওমর বলেছিল সেখানে বাইক দাঁড় করাতে দেখা যাচ্ছে। তবে মুখ দেখা যাচ্ছে না স্যার।’
‘বাইকের নম্বর?’ জিজ্ঞাসা করেছিল অর্জুন।
‘না স্যার। একেই অন্ধকার, তার উপর বাইকটা এমনভাবে দাঁড় করানো যে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তবে এ যদি কিলার হয়, তবে যথেষ্ট চালাক স্যার লোকটা। কোথায় কোথায় সিসিটিভি ক্যামেরা আছে খুব ভালোভাবে জানে। সেভাবেই এমনভাবে এগিয়েছে যাতে কোনোভাবেই ওর মুখ দেখা না যায়। উপরন্তু খুন করার জন্য এমন গলি বেছেছে যেখানে ক্যামেরা নেই।’
‘হুম’, অর্জুনের গলা একটু চিন্তিত শোনাল। বলল, ‘কিন্তু প্রশ্ন হল চার-পাঁচদিন ধরে ঘুরে ওই দিনই খুনটা করল কেন? আগেও তো করতে পারত। বিলাল শেখ রোজই ব্লু নাইল বার থেকে মদ খেয়ে ওই রাস্তা দিয়ে ফিরত।’
সঞ্জয় পাল একটু চিন্তা করে বললেন, ‘হয়তো রোজ তিন-চারদিন ধরে শ্যাডো করেছে। পুরো এরিয়াটা রেকি করে পরিকল্পনা স্থির করেছে। তারপর একদিন যখন দেখেছে যে বিলাল শেখ ওই গলিতে ঢুকেছে যেখানে সিসিটিভি নেই, তখন ক্ষুর চালিয়েছে।’
‘হতে পারে’, বলল অর্জুন। ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি আপনার সোর্সদের অ্যালার্ট থাকতে বলুন। আমি ফুটেজগুলো দেখি।
গত দু-ঘন্টা ধরে প্রতিটি ফ্রেম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে অর্জুন। উপরের দিকে ক্যামেরার অ্যাঙ্গল থেকে লোকটার মুখ চোখ বা শারীরিক গঠন কিছু বোঝা যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু সঞ্জয় পাল ভুল বলেননি। লোকটা জানে ক্যামেরা কোথায়, কোন অ্যাঙ্গেলে আছে। সব জেনেই নিজের পরিচয় লুকিয়ে কাজটা সেরেছে। এটা একদিনে হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে খুনি।
হঠাৎই ভাবনাটা একটা ঝাঁকুনি দিল। যদি সত্যিই বিলাল শেখ, সুখেন্দুশেখর ভৌমিক ও অনিরুদ্ধ মল্লিকের মৃত্যু একসুতোয় গাঁথা হয়, অর্থাৎ যদি এই খুনগুলো সিরিয়াল কিলিং হয়, তবে আচমকা রাস্তায় বেরিয়ে অপরিকল্পিত পথচারীদের খুন এটা নয়। খুনি জানে যে সে কাদের খুন করবে। তাদের খুনের আগে রীতিমতো প্রস্তুতি নিয়েছে সে। তবে কি আরও কেউ বাকি আছে? এই মুহূর্তে অর্জুন যখন বিলাল শেখের খুনির ফুটেজ দেখছে, সেই মুহূর্তে এই মহানগরীর কোনো কোণে হয়তো খুনি চতুর্থ খুনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কথাগুলো মাথায় আসতেই অস্থির বোধ করছিল অর্জুন। কোনো এক পাগল খুনি এই শহরের রাস্তায় রাস্তায় খুন করে বেড়াচ্ছে। আর পুলিশ হয়ে সে কিছু করে উঠতে পারছে না সেই বোধটাই অর্জুনকে স্থির হয়ে বসতে দিচ্ছে না এক জায়গায়। নিজের অজান্তের পকেটের দিকে হাত বাড়িয়েছিল সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে নিয়ে আসার জন্য। ঠিক তখনই ফোনটা এল। টাপুরের ফোন।
‘বলো!’
ওপার থেকে টাপুর হালকা গলায় বলল, ‘সকাল সকাল এত চাপ কীসের?’
‘কীসের চাপ?’ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘সে তো তুমি বলবে’, খুকখুক করে হেসে বলল টাপুর, ‘তোমার গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছে টেনশনে আছ। কী হল?’
অর্জুন ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘আর কী! তিনখানা মার্ডার কেস ঝুলছে মাথার উপর। এখন তুমি ডিসিডিডি স্যারকে ফোন করলে এর চেয়ে টেনসড গলা শুনতে পেতে।’
টাপুর তরল কণ্ঠে বলল, ‘ধরো তোমাকে যদি আমি কিছু খবর দিই? মনে করো এই মুহূর্তে সংঘমিত্রা ব্যানার্জি তোমার সোর্স। পরিবর্তে আমি কী পাব?
‘কী চাই?’ নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
‘বেশ, পরে বলব,’ বলল টাপুর। ‘এখন খবরটা শোনো। আমার কাছে সুমনা ভৌমিক এসেছিলেন।’
‘সুমনা ভৌমিক কে?’ মনে করার চেষ্টা করল অর্জুন।
‘সুখেন্দুশেখর ভৌমিকের স্ত্রী,’ বলল টাপুর
অর্জুনের চোয়াল শক্ত হল। পরক্ষণেই স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘স্বামীর খুনিকে ধরার ব্যাপারে পুলিশের উপর ভরসা রাখতে পারছেন না। তাই তো?’
টাপুর চুপ করে রইল। অর্জুন পকেট থেকে বের করে সিগারেটটা ঠোঁটে চাপল। লাইটার দিয়ে সেটা ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘কী বললেন?’
টাপুর বলল, ‘অনিরুদ্ধ মল্লিকের সম্বন্ধে একটা খবর জানলাম। জানি না এই কেসে তোমার কোনো কাজে লাগবে কি না! তবু তোমার জেনে রাখা ভালো।’
‘কী কথা?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন। টাপুর সুমনা ভৌমিকের মুখে শোনা দয়ানন্দ কলেজের ঘটনাগুলি খুলে বলল অর্জুনকে। এও জানাল যে সুখেন্দুশেখর ভৌমিক এসব খবর জেনে অনিরুদ্ধকে থ্রেট দিয়েছিলেন।
‘ব্ল্যাকমেল!’
‘সর্ট অফ।’ বলল টাপুর।
‘কেসটা নিলে তুমি?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।
টাপুর বলল, ‘কেস কোথায় যে নেব? এটা তোমাদের কেস। এখানে আমার কিছুই করার নেই। তবে কেসটা ইন্টারেস্টিং। একটু মাথা খাটাতে মন্দ লাগবে না।’
অর্জুন শুকনো হাসল। বলল, ‘বেশ তো। খাটাও মাথা। খেটে খেটে আমার মাথা আর কাজ করছে না। তুমি একটু লোড শেয়ার করলে তো ভালোই হয়।’
টাপুর বলল, ‘অর্জুন, মৃত্যুর রাতে অনিরুদ্ধ মল্লিক কোথায় যাচ্ছিলেন জানতে পেরেছ কিছু?
অর্জুন বলল, ‘আমার এক সোর্স গতকাল জানিয়েছে, শুধু সেদিনই নয়, অনিরুদ্ধ মল্লিক প্রায়ই ওই এলাকায় যেতেন গভীর রাতে। তবে ঠিক কোন বাড়িতে যেতেন বা কার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন জানে না সে। ওই গাড়িটাকে প্রায়ই মাঝরাতে ওই একই জায়গায় পার্ক করা থাকতে এলাকার অনেকে দেখেছে।’
‘তবে কি ধরে নেওয়া যেতে পারে যে অনিরুদ্ধ মল্লিক মধ্যরাতে অভিসারে বেরোতেন?’ বলল টাপুর।
অর্জুন বলল, ‘সেরকমই ধারণা হচ্ছে। তবে সমস্যা হল ওঁর বাড়ির লোক মুখ খুলছে না।’
‘খুব স্বাভাবিক!’ বলল টাপুর, ‘অনিরুদ্ধ মল্লিকের ফ্যামিলি সম্বন্ধে যেটুকু আমরা জেনেছি তাতে ওঁরা উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবার। এই ধরনের পুরোনো বনেদি পরিবারগুলো সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আছে। এদের কাছে সামাজিক সম্মান বাকি সব কিছুর উপরে। অনিরুদ্ধ মল্লিকের ফোন রেকর্ড ট্রেস করেছ?’
অর্জুন বলল, ‘হুম। এখানে একটা ব্রেক থ্রু হাতে আসতে আসতেও পিছলে গেছে। সেই রাতে শেষ মেসেজ করেছিলেন যে নম্বরে, সেই নম্বরটা এখন আর ট্রেস করা যাচ্ছে না। মেসেজে শুধু লেখা ছিল, ‘রাতে আসছি।’ খুনের পরদিন সকাল থেকেই ফোন সুইচ অফ।’
‘নম্বরটা কার? মানে কার নামে রেজিস্টারড?’উত্তেজিত স্বরে জিজ্ঞাসা করল টাপুর।
‘অনিরুদ্ধ মল্লিকের নামে।’
