প্ৰথম খণ্ড
দ্বিতীয় খণ্ড

নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে – ১.৭

১.৭

ক্রমে কিছু সময় গেল। কিছু বছর কেটে গেল।

মাঠের শেষ শস্যকণা ঘরে উঠে গেছে। এখন চৈত্রের মাঝামাঝি

মাঠ এখন ধু-ধু করছে। শুকনো জমিতে হাল বসছে না। সর্বত্র চাষবাসের একটা বন্ধ্যা সময়। যতদূর চোখ পড়ছে, সমানে সাদা ধোঁয়াটে ভাব। শুকনো কঠিন জমি পাথরের মতো উঁচু হয়ে আছে। পাখ-পাখালি যেন সব অদৃশ্য অথবা সব জ্বলে পুড়ে গেছে। মনেই হয় না এই সব জমিতে সোনার ফসল ফলে, মনেই হয় না এখানে কোনও দিন বর্ষায় প্লাবন আসে। ঝোপ-জঙ্গল ফাঁকা ফাঁকা। গরিব দুঃখীরা ঝরাপাতা সংগ্রহ করছে। মুসলমান চাষীবৌরা এইসব ঝরাপাতা সংগ্রহের সময় আকাশ দেখছিল।

জোটনও আকাশ দেখছিল কারণ তার এখন দুর্দিন। ফকিরসাব সেই যে নাস্তা করে পাঁচ বছর আগে সিন্নির নাম করে চলে গেছে আর ফিরে আসেনি। আবেদালিও আকাশ দেখছিল কারণ চাষবাসের কাজ একেবারেই বন্ধ। নৌকার কাজ বন্ধ। গয়না নৌকার কাজ শীতের মরশুমেই বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে নতুন শাক-পাতা মাটি থেকে বের হবে, সেজন্য জোটন আকাশ দেখছিল। বৃষ্টি হলে চাষবাসের কাজ আরম্ভ হবে, সেজন্য আবেদালি আকাশ দেখছিল। এই অঞ্চলে আকাশ দেখা এখন সকলের অভ্যাস। কচি কচি ঘাস, নতুন নতন পাতা এবং ভিজে ভিজে গন্ধ বৃষ্টির—আহা মজাদার গাঙে নাইয়র যাওয়ানের লাখান। জোটন বলল, বর্ষা আইলে আবেদালি তুই আমারে নাইয়র লইয়া যাবি?

আবেদালি বলল, তর নাইয়র যাওনের জায়গাটা কোনখানে!

—ক্যান, আমার পোলারা বাইচা নাই?

—আছে, তর সবই আছে। কিন্তু কে-অ তরে খোঁজ-খবর করে না।

জোটন আবেদালির এই অপমানকর কথার কোনও উত্তর দিল না। গতকাল আবেদালির কোনও কাজ ছিল না। আজ সারাদিন হিন্দুপাড়া ঘুরে ঘুরে একটা কাজ সংগ্রহ করতে পারেনি। এখন চৈত্র মাস। সব কিছুতে টান পড়েছে। আবেদালি, গৌর সরকারের শণের চালে নতুন শণ লাগিয়ে দিয়েছে। যা মিলবে—সামান্য যা কিছু। সে পয়সার কথা বলেনি। আবেদালি সারাটা দিন কাজ করেছে—যেহেতু কামলার সংখ্যা প্রচুর এবং মুসলমান পাড়াতে রুজিরোজগার বন্ধ, যার গরু আছে সে দুধ বেচে একবেলা ভাত, অন্য বেলা মিষ্টি আলু সেদ্ধ খাচ্ছে। আবেদালির গরু নেই, জমি নেই, শুধু গতর আছে। গতর বেচে পর্যন্ত পয়সা হচ্ছে না। সারাদিন খাটুনির পর গৌর সরকারের সঙ্গে পয়সা নিয়ে বচসা হয়ে গেল। কুৎসিত গাল দিয়ে চলে এসেছে আবেদালি।

আবেদালির বিবি জালালি তখনও পেট মেঝেতে রেখে পড়ে আছে। সারাদিন কিছু পেটে পড়ে নি। জব্বর আসমানদির চরে গান শুনতে গেছে।

জালালি পেট মাটিতে রেখেই বলল, পাইলা নি?

আবেদালি কোনও উত্তর করল না। সে তার পাশ থেকে ছোট পুঁটুলিটা ঢিল মেরে মেঝেতে ছুঁড়ে দিল! সামনে জোটনের ঘর। ঘরের ঝাঁপ বন্ধ। জালালি পুঁটিলিটা দেখতে পেয়েই তাড়াতাড়ি উঠে বসল। এবং দাঁড়িয়ে খোলা কাপড়ের গিঁট ফের পেটে শক্ত করে বাঁধল। আবেদালি অন্যমনস্ক হবার জন্য হুঁকো নিয়ে বসল। আর জালালি ঝরাপাতা উঠানে ঠেলে ঘোলা জলে পাতিল হাঁড়ি খলখল করে ধুতে গেল।

আবেদালি কতক্ষণ হুঁকো খাচ্ছিল টের পায়নি। সে দেখল উনানের ওপাশে বসে জালালি হাঁড়িতে চাল দিচ্ছে। ওর খাটো কাপড়। দু হাঁটুর ভিতর দিয়ে পেটের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। শালী, মাগীর বড় পেট ভাসাইয়া রাখনের অভ্যাস। শরীর দেয় না আর। তবু এই ভাসানো পেট আবেদালিকে কেমন লোভী করে তুলছে। আবেদালি বেশিক্ষণ বিবিকে এভাবে বসে থাকতে দেখলে কখনও কখনও কলাইর জমি অথবা একটা ফাঁকা মাঠ দেখতে পায়। সে ফের নিজেকে অন্যমনস্ক করার জন্য বলল, জব্বাইরা গ্যাল কোনখানে? কাইল থাইকা দ্যাখতাছি না।

জালালি আবেদালির দুষ্ট বুদ্ধি ধরতে পারছে যেন। সে বলল, জব্বাইরা গুনাই বিবির গান শুনতে গ্যাছে। কাঠের হাতা দিয়ে ভাতের চালটা নেড়ে দেবার সময় জালালি বলল, গুনাই বিবির গান শুনতে আমার-অ ইসছা হয়।

এত অভাবের ভিতরও আবেদালির হাসি পাচ্ছে। এত দুঃখের ভিতর আবেদালি বলল—পানিতে নদী-নালা ভাইসা যাউক, তখন তরে লইয়া পানিতে ভাইসা যামু।

জালালির এইসব কথাই যেন আবেদালির ছাড়পত্র। মাঠে নামার অথবা চাষ করার ছাড়পত্র।

আবেদালির দিদি জোটন এতক্ষণ দাওয়ায় বসে সব শুনছিল। এত সুখের কথা সে সহ্য করতে পারছিল না। সে সন্তর্পণে ঝাঁপটা আরও টেনে চুপচাপ বসে থাকল। কোনও কর্ম নেই—শুধু আলস্য শরীরে। শার চুলের গোড়া থেকে চিমটি কেটে কেটে উকুন খুঁজছিল। আর জালালির এত সুখের কথা শুনেই যেন চুলের গোড়া থেকে একটা উকুনকে ধরে ফেলতে পারল। জোটনের মুখে এখন প্রতিশোধের স্পৃহা—মান্দার গাছের নিচে মনজুরের মুখ ভেসে উঠল। উকুনটাকে দু’নখের ভিতর রেখে ঝাঁপের ফাঁকে উঁকি দিতেই দেখল, উঠানের অন্য পাশে আবেদালি। জালালিকে সে সাপ্টে যেন বাঘ ঘাড় কামড়ে অথবা থাবার ভিতর শিকার নিয়ে পালাচ্ছে। জালালি লতার মতো দু’পায়ের ফাঁকে ঝুলে আছে। এখন চৈত্র মাস বলে কথায় কথায় ঘূর্ণি ঝড়। ধুলো উড়ে এসে ঝাপটা মারল—উঠোন অন্ধকার হয়ে ওঠায় ঘরের ভিতর আবেদালি কি করছে শিকার নিয়ে, দেখতে পেল না। সে রাগে দুঃখে এবার মাঠের ভিতর নেমে ধুলোর ঝড়ে ডুবে গেল।

চৈত্র মাস সুতরাং রোদে খাঁ-খাঁ করছে মাঠ। পুকুরগুলিতে জল নেই। একমাত্র সোনালী বালির নদীর চরে পাতলা চাদরের মতো তখনও জল নেমে যাচ্ছে। মসজিদের কুয়োতে জল নেই। গ্রামের দুঃখী মানুষেরা অনেকদূর হেঁটে গিয়ে জল আনছে। সোনালী বালির নদীতে ঘড়া ডুবছে না। নমশূদ্রপাড়ার মেয়ে-বৌরা সার বেঁধে জল আনতে যাচ্ছে। ওরা খোঁড়া দিয়ে জল তুলছে কলসিতে। ট্যাবার পুকুরে, কবিরাজ বাড়ির পুকুরে, ঘোলা জল। গরু নেমে নেমে জল একেবারে সবুজ রঙ হয়ে গেছে। বড় দুঃসময় এখন। সে বের হবার মুখে কলসি নিয়ে বের হল। সোনালী বালির নদী থেকে এক ঘড়া জল এনে হাজি-সাহেবের বাড়িতে উঠে যাবে। বুড়ো হাজি সাহেবের জন্য এত কষ্ট করে জল বয়ে আনলে কিছু তেলকড়ি মিলতে পারে—পয়সা না হোক, এক কোনকা ধান। সে নেমেই দেখল মাঠে কারা যেন ছুটে ছুটে যাচ্ছে। একদল লোক খাঁ-খাঁ রোদের ভিতর দিয়ে পালাচ্ছে। ওদের মাথায় বোধ হয় ওলাওঠার দেবী। বিশ্বাসপাড়াতে ওলাওঠা লেগেছে। সে এতদূর থেকে মানুষগুলিকে স্পষ্ট চিনতে পারছে না।

মাঠে পড়েই জোটনের মনে হল—জালালি এখন উদোম গায়ে ঘরের ভিতর। উনানে ভাত সেদ্ধ হচ্ছে। পাতা, খেড় অথবা লতাপাতায় আগুন ধরে গেলে আগুন লাগতে কতক্ষণ! নদীর দিকে হেঁটে যাবার সময় জোটনের এমন সব দৃশ্য মনে পড়ছিল। চৈত্র মাসে আগুন যেন চালে বাঁশে লেগেই থাকে। জোটনের মন ভাল ছিল না, সেজন্য দ্রুত হাঁটছে। সকলেই জল নিয়ে ঘরে ফিরছে, তাকেও তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। গ্রামে গ্রামে ওলাওঠা মহামারীর মতো। যেসব লোক রোদের ভিতর পালাচ্ছিল তারা ক্রমশ জোটনের নিকটবর্তী হচ্ছে। একেবারে সামনা-সামন্তি। জোটন তাড়াতাড়ি পাশে কলসি রেখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। গাধার পিঠে ওলাওঠা দেবী যাচ্ছেন। মাথায় করে মানুষরা ঢাকের বাদ্যি বাজাতে বাজাতে নিয়ে যাচ্ছে। জোটন ওদের পিছন পিছন বেশিদূর গেল না। সড়কের ধারে সব মান্দার গাছ। মান্দার গাছে লীগের ইস্তাহার ঝুলছে। জোটন সেই মান্দার গাছের ছায়ায় গ্রামের দিকে উঠে গেল।

পথে ফেলু শেখের সঙ্গে দেখা। ফেলু বলল, জুটি, পানি আনলি কার লাইগ্যা?

জোটন থুতু ফেলল মাটিতে। মানুষটার সঙ্গে কথা বললে গুনাহ। মানুষটা এক কোপে আনুর মরদকে কেটে এখন আন্নুকে নিয়ে ঘর করছে। একদিন বসে বসে আবেদালিকে এইসব গল্প শুনিয়েছে—মানুষটার বুকের কি পাটা? ভয়ডর নাই। সামসুদ্দিনের সঙ্গে এখন লীগের পাণ্ডাগিরি করছে।

জোটন কিছুতেই কথা বলছে না। আলের পাশে দাঁড়িয়ে ফেলুর যাবার পথ খালি করে দিচ্ছে।

কিন্তু ফেলুর লক্ষণ ভাল না। সে দাঁড়িয়ে থাকল সামনে। কেমন মুচকি হাসছে। ওর একটা চোখ বসন্তে গেছে। মুখ কী ভয়ঙ্কর কুৎসিত। অর্ধেকটা মুখ ঢাকা থাকে এখন। হাডুডু খেলার রস মরে গেছে। গতরে তেমন শক্তি নেই বুঝি। তবু চোখটা ভয়ঙ্করভাবে কেবল জ্বলছে। ফেলু মুচকি হেসে বলল, জুটি, তর ফকিরসাব তবে আর আইল না?

—কি করতে কন তবে। না আইলে কি করমু! জোটন ফের থুতু ফেলল।

ফেলু এবার অন্য কথা বলল। কারণ জোটনের মুখ দেখে ধরতে পারছে এইসব ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকাটা সে পছন্দ করছে না। সে এবার খুব ভালো মানুষের মতো বলল, মানুষগুলাইন মাথায় কইরা কি লইয়া যাইতাছে।

—ওলাওঠা দেবীরে লইয়া যাইতাছে।

—মাথাটা ভাইঙ্গা দিলে ক্যামন হয়?

জোটন এবারেও দাঁত শক্ত করে বলতে চাইল যেন, তর মাথাটা ভাঙমু নিব্বৈংশা। অথচ মুখে কোনও শব্দ করল না। লোকটার জন্য সকলের ভয়ডর। কার মাথা কখন নেবে, হাসতে হাসতে হ্যাৎ করে মাথা কাটতে ফেলুর মতো ওস্তাদ আর নেই। মানুষটাকে কেউ ঘাঁটায় না। যেন ঘাঁটালেই সে রাতের অন্ধকারে বিসমিল্লা রহমানে রহিম বলে কোরবানির খাসির মতো গলার নলি ছিঁড়ে দেবে। কোরবানির দিনে মানুষটা আরও ভয়ঙ্কর। সুতরাং জোটন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর থেকে বের হয়ে আসতে চাইল।

ফেলু দেখল চৈত্রের শেষ রোদ বাঁশগাছের মাথায়। সামসুদ্দিন তার দলবল নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখন সামনের মাঠ ফাঁকা। লতানে ঝোপ আর শ্যাওড়া গাছের জঙ্গল, আর জঙ্গলের ফাঁকে ওরা দু’জন। একটু ফষ্টিনষ্টি করার মতো মুখ করে সামনে ঝুঁকল, তারপর ফিসফিস করে বলল, দিমু নাকি একটা গুঁতা।

জোটন এবার মরিয়া হয়ে বলল, তর ওলাওঠা হইবরে নিব্বৈংশা। পথ ছাড়, না হইলে চিৎকার দিমু। বলা নেই, কওয়া নেই, এমন একটা হঠাৎ ঘটনার জন্য জোটন প্রস্তুত ছিল না। ফেলু হাসতে হাসতে বলল, রাগ করস ক্যান! তর লগে মসকরা করলাম। তারপর চারিদিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বলল, শীতলা ঠাইরেনের ডর আমারে দেখাইস না জোটন। কস তো আইজ রাইতে মাথাটা লইয়া আইতে পারি।

সামসুদ্দিন দলবল নিয়ে সঙ্গে যাচ্ছে। লীগের সভা হবে। শহর থেকে মৌলবীসাব আসবেন। সুতরাং ফেলুকে নেতা গোছের মানুষের মতো লাগছে। পরনে খোপকাটা লুঙ্গি। গায়ে হাতকাটা কালো গেঞ্জি। আর গলাতে গামছা মাফলারের মতো প্যাঁচানো। সে জোটনকে পথ ছেড়ে দিল। ওরা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ওদের ধরতে হবে। সে আল ভেঙে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে। মাঠ থেকে ওলাওঠা দেবীও গ্রামের ভিতর অদৃশ্য। তখন ধোঁয়ার মতো এক কুণ্ডলী গ্রাম মাঠ পার হয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। সে যা ভাবছিল তাই। জল নেই নদী-নালাতে। মাঠ শুকনো, পাতা শুকনো। আর সারাদিন রোদে পাতার ছাউনি তেতে থাকে, পাটকাঠির বেড়া তেতে থাকে। জোটন কাঁখের কলসি নিয়ে দ্রুত ছুটছে। সে দেখল পাশের গ্রাম থেকেও মানুষেরা ছুটে আসছে। যারা সোনালী বালির নদীতে জল আনতে গিয়েছিল তারা পর্যন্ত দুঃসময়ে আগুনের উপর সব জল ঢেলে দিল

কিন্তু এই আগুন আগুনের মতো আগুন, বাতাসের সঙ্গে মিলে-মিশে অশিক্ষিত এবং অপটু হাতের গড়া সব গৃহবাস ছাই করে দিতে থাকল। জোটনের ঘরটা পুড়ে যাচ্ছে। আবেদালির ঘরটা সকলের আগে পুড়েছে। আবেদালি জালালির অগোছালো শরীরটা সেই আগের মতো সাপ্টে ধরে রেখেছে। নতুবা ছুটে গিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতে পারে। ওর কাঁথা, বালিশ, মাদুর, কলাইকরা থালা সানকি সব গেল। পুড়ে যাচ্ছে। ঠাস ঠাস করে বাঁশ ফাটছে, হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ হচ্ছে। আগুন গ্রামময় ছড়িয়ে পড়ছে। সুতরাং কাঁচা বাঁশ অথবা কলাগাছ এবং কাদা জল সবই প্রয়োজনীয়। চারিদিকে বীভৎস সব দৃশ্য। যাদের কাঁথা বালিশ আছে তারা কাঁথা বালিশ মাঠে এনে ফেলল। জালালি তখন আমগাছের নিচে বসে কপাল থাপড়াচ্ছে। পুবের বাড়ির নরেন দাস একটা দা নিয়ে এসেছে। যেসব ঘরে আগুন লাগেনি এবার লেগে যাবে—হল্কা বের হয়ে হয়ে লম্বা হচ্ছে, চাল থেকে চালে আগুন লাফিয়ে পড়ছে, সেইসব চাল কেটে দিচ্ছে। ঘর আল্গা করে দিচ্ছে। যেন আগুন আর ছড়াতে না পারে। মানুষেরা সব হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, আগুন নেভানোর জন্য। কুয়োর জল ফুরিয়ে গেছে। হাজি সাহেবের পুকুরে যে তলানিটুকু ছিল তাও নিঃশেষ। মনজুরদের পুকুরে শুধু কাদামাটি। এখন লোকে কোদাল মেরে কাদামাটি চালে ছুঁড়ছে। তখন দূরে ওলাওঠা দেবীর সামনে ঢাক বাজছিল, ঢোল বাজছিল। বিশ্বাসপাড়াতে হরিপদ বিশ্বাস হিক্কা তুলে মারা গেল। সাইকেল চালিয়ে গোপাল ডাক্তার ছুটছে বাড়ি বাড়ি টাকার জন্য, রুগী দেখার জন্য। সে যেতে যেতে আগুন দেখে এইসব অশিক্ষিত লোকদের গাল দিল। ফি বছর হামেশাই কোনও কোনও দুঃখী গ্রামে এমন হচ্ছে। হাতুড়ে বদ্যি গোপাল ডাক্তারের এখন পোয়াবারো। রুগী কামিয়ে অর্থ, গরিব লোকদের অনটনে অর্থ দিয়ে সুদ। আলের উপর গোপাল ডাক্তার এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ক্রিং ক্রিং বেল বাজাচ্ছে। যেন বলছে, কে আছ এস, টাকা নিয়ে যাও, ওষুধ নিয়ে যাও! অর্থ দিয়ে সুদ দেবে, ঋণশোধ করবে।

খড়ম পায়ে শচীন্দ্রনাথও ছুটে এসেছিলেন। জোটন, আবেদালি এবং গ্রামের অন্য সকলে সান্ত্বনার জন্য ওকে ঘিরে দাঁড়াল। শচীন্দ্রনাথ সকলের মুখ দেখলেন। সকলে এখন আবেদালি এবং জালালিকে দোষারোপ করছে। শচীন্দ্রনাথ বললেন, কপাল।

সামসুদ্দিনের দলটা অনেক রাতে সভা শেষ করে ফিরে এল। ওরাও ঘুরে ঘুরে সকলকে সান্ত্বনা দিতে থাকল। আগুন নেভানোর চেষ্টায় বড় বড় বাঁশের লাঠি অথবা কাদামাটি নিক্ষেপ করে যখন বুঝল—কোনও উপায় নেই, সব জ্বলে যাবে—তখন ওরা মসজিদের দিকে চলে গেল। মসজিদটা এখন দাউদাউ করে জ্বলছে।

চোখের উপর গোটা গ্রামটা পুড়ে যাচ্ছে। বিশ্বাসপাড়াতে এখন ওলাওঠা দেবীর অর্চনা হচ্ছে। মাঠে সব চাষের জমিতে পোড়া কাঁথা পেতে যে যার ভস্ম থেকে তুলে আনা ধন-সম্পত্তি আগলাচ্ছে। আগুনে ওদের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

যখন আগুন পড়ে এল এবং এক ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব—জোটন শোকে আকুল হতে থাকল। ঘন অন্ধকার চারদিকে। থেকে থেকে ধোঁয়া উঠছে। সে অন্ধকারের ভিতর পোড়া ভস্ম ধন-সম্পত্তির আশায় চুপি চুপি হাজিসাহেবের গোলাবাড়িতে উঠে এল। সে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছিল। সে ঘুরেও গেল কতকটা পথ। ধান চাল পোড়া গন্ধ। আশেপাশে সব হা-অন্ন মানুষদের হা-হুতাশের শব্দ ভেসে আসছে। অন্ধকারে জোটন পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে বলল, ফুফা, আমার ঘরটা গ্যাল। ভালই হয়েছে। যামু গিয়া যেদিকে চোখ যায়। ঘরটার লাইগা বড় মায়া হইত। ফকিরসাব আর বুঝি আইল না, এও বলার ইচ্ছা। যখন এল না তখন আর কার আশায় সে এখানে বসে থাকবে। পরিচিত মানুষটা অন্ধকারে বসে টের পেল, জোটন অনেক কষ্টে এমন কথা বলছে।

পরিচিত মানুষটি বলল, আবেদালির আফুর দুফুর নাই!

জোটন এবার ফিরে দাঁড়াল। কাকে কি কমু কন। পুরুষমানুষ দিন নাই রাইত নাই খামু খামু করে, কিন্তু তুই মাইয়ামানুষ হইয়া আফুর দুফুর দ্যাখলি না। উদাম কইরা গায়ে গতরে পানি ঢাললি।

জোটন আর দাঁড়াল না। সে বকতে বকতে অন্ধকারে হাজিসাহেবের গোলাবড়িতে ঢুকে গেল। বড় বড় গোলা ভস্ম হয়ে গেছে। ধান-পোড়া মুসুরি-পোড়া গন্ধ উঠছে। কোথাও থেকে এই দুঃসময়ে একটা ব্যাঙ ক্লপ ফ্লপ করে উঠল। জোটন আগুনের ভিতর খোঁচা মারল একটা। না, কিছু বের হচ্ছে না। অন্ধকারের ভিতর কিছু ছাইচাপা আগুন শুধু কতকটা ঝলসে উঠে ফের নিভে গেল। আগুনে জোটনের মুখ পোয়াতির মুখের মতো–লোভী এবং পেট সর্বস্ব চেহারা। সেই আগুনে জোটন অন্ধকারে পথ চিনে নিল। তখন ঢাকের বাজনা, ঢোলের বাজনা ওলাওঠা দেবীর সামনে। তখন হাজিসাহেব তার তিন বিবির কোলে ঠ্যাং রেখে কপাল চাপড়াচ্ছেন আর হাজিসাহেবের তিন বেটার তিন বিবি, মাঠের মধ্যে চষা জমির উপর বিছানা পেতে ওৎ পাতার মতো অপেক্ষা করছে।

জোটনের মনে হল এই অন্ধকারে সে একা নয়। অন্য অনেকে যেন হাতে কাঠি নিয়ে পা টিপে টিপে গোপনে আগুনের ভিতর ঢুকে খোঁচা মারছে। দূর থেকে মনে হল হাজিসাহেবের একটা ঘর—সবটা জ্বলেনি। অথবা আর জ্বলবে না। সে লাফিয়ে এগোল। সে ঘরের ভিতর গতকাল কয়েক লাছি পাট দেখেছিল। জোটনের পরাণ এখন ভাদ্রমাসের পানির মতো টলমল করছে। আর তখন জোটনের পায়ের শব্দে অন্ধকার থেকে কে যেন বলল, কেডা?

—আমি…আমি…।

জোটনের মনে হল অন্ধকারে আর এক মানুষ যেন গোপনে তন্ন তন্ন করে কি খুঁজছে।

জোটন বলল, তুমি কেডা?

জোটনের মনে হল ফেলু শেখ। সেও অন্ধকারে আগুনে পোড়া সম্পত্তি চুরি করতে এসেছে। অথবা মাইজলা বিবির সনে পীরিত তার। হাজিসাহেবের মাইজলা বিবিও এই রাতের অন্ধকারে যখন কেউ কোথাও জেগে নেই, সকলে মাঠে নেমে গেছে, কিছু ফেলে গেছে এই নাম করে ফিরে এলে ফেলু শেখ চুপি চুপি চিনে ফেলবে। কার টের পাবার কথা! ফেলু সেই এক জ্বালা নিবারণের জন্য, কি যে এক জ্বালা, উজানে যেতে হাজিসাহেব ভোলা অঞ্চলের পাশে কোন এক সাগরের কূল থেকে এই মাইজলা বিবিকে তুলে এনেছিলেন। তখন সঙ্গে ছিল ফেলু। ফেলু ফুসলে ফাসলে টাকার লোভ দেখিয়ে হাজিসাহেবের নৌকায় এনে তুলেছিল মাইজলা বিবিকে। তখন হাজিসাহেব হাজি নন, তখন ফেলুর যৌবন কত বড়, ফেলুর কত নামডাক—জোয়ান মরদ ফেলু পীরিত করার অছিলা খুঁজছিল মাইজলা বিবির সনে। বোধ হয় এখন সংগোপনে গানটা গায় মাইজলা বিবি। যখন কলিমুদ্দি সাহেব হজ করতে গেলেন এবং যখন হাজি হয়ে ফিরে এলেন তখন মাইজলা বিবির সেই গান গলায়। একা আতাবেড়ার পাশে বসে বসে গাইত। ঘাটে ফেলু বসে থাকত। সে ওদের তখন বড় নৌকার মাঝি—কাজ কারবারে তাকে হাটে-বাজারে যেতে হয়, সওদা করে আনতে হয়। তাই মাইজলা বিবির সনে পীরিত রঙ্গরস করার অছিলাতে ঘাটের মাঝি হয়ে সে বসে থাকত। কিন্তু কলিমুদ্দি হজ করে এসে সবই টের পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন, মিঞা, তোমার এই আছিল মনে। তারপর হাজিসাহেব ঘাট থেকে তাড়িয়ে দিলেন ফেলুকে। সে কবেকার কথা! সেই থেকে ফেলু আর হাজিসাহেবের বাড়ি যেতে পারে না। মাঝে মাঝে মাইজলা বিবির মুখ ওর পরাণে দরিয়ার বান ডেকে আনে। তখন সে একা একা প্রায় পাগল ঠাকুরের শামিল। সে গোপাটে অথবা অন্ধকার রাতে চুপি-চুপি অশ্বত্থের নিচে নেমে আসে। ঝোপ-জঙ্গলে উবু হয়ে বসে থাকে। আতাবেড়ার পাশে কখন উঁকি দেবে মুখটা। বিবি আন্নু আজকাল হাজিসাহেবের বাড়িতে আসে-যায়। ছোট বিবির সঙ্গে আন্নুর খুব ভাব। সেই বিবি ওকে লুকিয়েচুরিয়ে তেল দেয়, ডাল দেয়, মাসকলাইর বড়ি দেয়। আন্নু বলে ছোট বিবি দেয়—কিন্তু জোটনের মন বলে সব মাইজলা বিবির কাজ। মাইজলা বিবির সনে পীরিত বড় ফেলুর।

জোটন বোঝে সব। আন্নু দেখায় ছোটবিবির সঙ্গে তার বড় ভাব—সখী সখী গলায় দড়ি ওলো সখী ভাব।

আর ফেলুর যখনই ভাবের কথা মনে হয় তখন আর একমুহূর্ত দেরি করতে পারে না। সে এই অন্ধকারে আগুনের ভিতর মাইজলা বিবিকে দেখার বাসনাতে বসে আছে। যদি আসে। চারিদিকে হল্লা–কে কোথায় ছুটছে—কে কোথায় আছে কে জানে। এই ত সময়। সুতরাং সে এখানে বসে বিবির উঠে আসার অপেক্ষায়—কি জাদু বিবির চোখে আর কি জাদু আছে এই মনের ভিতর। এই মন কি যেন চায় সব সময়। ফেলু কি যেন চায় সব সময়। তার ঘরে যুবতী বিবি আন্নু। ফেলুর বয়স দুই কুড়ির ওপরে হয়ে গেছে—তবু মনটা কি যেন চায়। এত অভাব অনটনের ভিতরও ভিতরটা কি পেতে কেবল ইসছা ইসছা করে। কিসে যে সুখ—এই আন্নুর জন্য সে কী কাণ্ড না করেছে! আলতাফ সাহেবের গলাটা সে হ্যাৎ করে কেটে ফেলেছে। পাটখেতের ভিতর আলতাফ সাহেব বাছ-পাট কেমন হয়েছে দেখতে এসেছিল। বুড়ো আলতাফ সাহেবের শেষ পক্ষের বিবিকে সে ঈদের পার্বণে পীরের দরগায় দেখে প্রায় পাগলের মতো—কি করে, কি করে! কি করবে ফেলু ভেবে উঠতে পারল না। তখন ফেলুর যৌবনকাল যায়-যায়। সে তল্লাটের ফেলু। সুতরাং সে ঈদের আর এক পার্বণে মেমান সেজে চলে গেল আলতাফ সাহেবের বাড়ি। ওকে সে পাটের ব্যবসা করতে বলল- য্যান ফেলু কত বড় মহাজন। সে দাড়িতে আতর মাখত তখন, ভাল তফন কিনে আনতো বাবুর হাট থেকে। মন খুশ থাকলেই ম্যাডেল ঝোলাত গলায়।

বুড়ো আলতাফ খেলার বড় উৎসাহদাতা ছিল। ফেলুর সঙ্গে কত জান পচান, কত বড় খেলুড়ে ফেলু তার বাড়ি মেমান হয়ে এসেছে—বিবি, বেটারা দেখুক। খেলোয়াড় ফেলুকে সে অন্দরমহলে একদিন ঢুকিয়ে দিল। ফেলুর পীরিতের ছলাকলা সব যেন জানা। ফাঁকা বুঝে ফুলের কুঁড়ির মতো আলতাফের ছোটবিবিকে কাছিমের মতো বুকের ছাতি দেখাল একদিন। আন্নু দেখল সেই বুকের ছাতিতে মেডেলগুলি ঝকঝক করছে। আন্নুর তখন মনে পড়েছিল ছোট বয়সের কথা। বালিকা আন্নু খেলা দেখতে গেছে—হা-ডু-ডু খেলা। ফেলু এসেছে খেলতে পরাপরদির হাটে। সেদিন হাটবার ছিল না, তবু কি লোক, কি লোক! দু’দশ মাইলের ভিতর কোনও যুবা পুরুষ আর সেদিন ঘরে ছিল না। মেলার মতো প্রাঙ্গণে-প্রাঙ্গণে নিশান উড়ছিল—য্যান ঈদ-মুবারক। ফেলু সেই মেলার প্রাণ ছিল। খেলা শেষ হলে ফেলুর জয়-জয়কার। আন্নু, বালিকা আন্নু সেদিনই কেমন ফেলুর ভালোবাসায় পড়ে গেল। সেই ফেলু এসেছে মেমান সেজে—আলতাফ সাহেবের বিবি নিজেকেই যেন শুধাল, এই আছিল তর মনে! তারপর সময় বুঝে হ্যাঁৎ করে গলাটা কেটে ফেলল ফেলু। পাটখেতের ভিতর হ্যাঁৎ করে কেটে ফেলল গলার নলিটা। যেমন সে কোরবানির দিন দশ পাঁচটা কোরবানিতে চাকু চালায়, বিশমিল্লা রহমানে রহিম বলে, তেমনি সে বিসমিল্লা রহমানে রহিম বলে হ্যাঁৎ করে নলিটা আলতাফ সাহেবের কেটে ফেলল। যেদিন সে বিবিকে বোরখা পরিয়ে নিয়ে আসে, সেদিন সে, হ্যাঁৎ করে গলা কেটে ফেলেছে কথাটা প্রথম জানাল বিবিকে। আন্নু শুনে বলল, এই আছিল তর মনে! বলে সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ভিতর হা-হা করে হেসে উঠেছিল। আন্নুকে দেখলে মনেই হবে না ফেলুর জন্য সে এত বড় হত্যাকাণ্ড হজম করে গেছে।

অন্ধকারে ফেলু দূরের একটা ছায়া-মূর্তি দেখছিল আর ভাবছিল। বুঝি চুপি চুপি মাইজলা বিবি উঠে আসছে। কিন্তু এখন এ কিকার গলা, জোটন মনে হয়! সে ধরা পড়ে যাবে, চুরি করতে এসেছে এই আগুনের ভস্ম ধনসম্পত্তি থেকে-তার ভয় ধরে গেল।

জোটন তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলল, নাম কইতে পার না মিঞা! আমি কেডা।

—আমি মতিউর। ফেলু অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলল।

—তোমাগ আর মানুষগুলান কই?

—আগুন দেইখ্যা পালাইছে।

—তুমি এখানে কি করতাছ?

—সানকিডা খুঁজতাছি।

—হাজিসাহেব জানে না, বৈঠকখানা ঘরডা পুইড়া যায় নাই।

—আগুনে বড় ডর হাজিসাহেবের। লোকটা দূর থেকেই কথা বলছে। এই ভস্মরাশিকে এখন সকলেরই ভয়। গলাটা স্পষ্ট নয়। গলাটা কখনও ফকির সাহেবের মতো, কখনও মনে হচ্ছে ফেলুই মতিউরের গলায় কথা বলছে। তারপর মনে হল অন্ধকারে লোকটা কিছু কুড়িয়ে পেয়েছে। এবং পেয়েই এক দৌড়।

জোটন বলতে চাইল—ধর-ধর। কিন্তু বলতে পারল না। সে নিজেও একটা সানকি খুঁজতে এসেছে অথবা কিছু চাল, পোড়া ধান হলে মন্দ হয় না, পোড়া কাঁথা হলে মন্দ হয় না—সে এখন যা পেল তাই নিয়ে আমগাছের নিচে জড়ো করল। জালালি সব জোটনের হয়ে সংরক্ষণ করছে। সে ভস্মরাশি থেকে খুঁজে-পেতে আনছে আর জালালিকে দিয়ে আবার অন্ধকারে খুঁজতে চলে যাচ্ছে।

তখন কান্না ভেসে আসছিল বিশ্বাসপাড়া থেকে। তখন ওলাওঠা দেবীর সামনে আরতি হচ্ছিল। ওলাওঠাতে আবার হয়তো কেউ মারা গেল। জোটন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সানকি, ভাঙা পাতিল অথবা পেতলের বদনা খুঁজতে খুঁজতে সেই কান্না শুনছে। রাত তখন অনেক। মাঠের ভিতর দিয়ে কারা যেন নদীর পাড়ের দিকে ছুটছে আর গাছের নিচে ইতস্তত যেসব লম্ফ জ্বলছিল—বাতাসে সব এক-দুই করে নিভে যাচ্ছে। মাঠে একটামাত্র হারিকেন জ্বলছে। হারিকেনটা হাজিসাহেবের। মহামারী লাগলে যেমন এক অশরীরী বাতাসে ভেসে বেড়ায় তেমনি এই ভস্মরাশির অন্ধকারে জোটন ভেসে বেড়াতে লাগল। জোটন অন্ধকারে পা টিপে-টিপে হাঁটছে। হাজিসাহেব মাঠে এখন কেবল সোভান আল্লা, সোভান আল্লা বলে চেঁচামেচি করছেন। তিনি ঘুমোতে পারছেন না। মাঠের ভিতর তিনি তাঁর ছোট বিবিকে নিয়ে আছেন। কে কখন কি করে যাবে—ভয়ে ঘুম আসছিল না। যাদের ভাঙা ঘর শুধু গেছে, ছেঁড়া হোগলা বিছিয়ে ঘুম যাচ্ছে তারা। সকাল হলেই হিন্দু পাড়াতে রুজি রোজগারের জন্য উঠে যেতে হবে এবং হিন্দু পাড়াতেই সব বাঁশ কাঠ। সব শণের জমি ওদের। ওদের থেকে চেয়ে আনলে ঘর এবং ঘর বানাতে বানাতে ঘোর বর্ষা এসে যাবে। জোটন এ-সময় নিজের ঘরের কথা ভাবল, ফেলু সময়-অসময় গুতা দিতে চায়, মনজুরের মতো চোখ-মুখ গরম ছিল না, চান্দের লাখান গড়বন্দি আছিল না—দিমু তরে একদিন একটা গুতা—এইসব ভেবে জোটন নিজের অভাব জোড়াতালি দিয়ে আধপোড়া ঘরের ভিতরে আর একটা বদনা পেয়েই একদৌড়। সে জালালির পাশে এসে বসল, দ্যাখ কি আনছি।

জালালি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বদনাটি দেখল। কুপির আলোতে এত বড় একটা আস্ত পেতলের বদনা—সে কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আবেদালি ঘাড় কাৎ করে তাকিয়ে আছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা তার।

—এক বদনা পানি আন ঢক-ঢক কইরা খাই। বদনা দেখেই আবেদালির কেমন জলতেষ্টা পেয়ে গেল।

জালালি বলল, আমি যাই। যদি কিছু মিল্যা যায়।

জোটন জল আনতে গেছে। আশেপাশে কেউ নেই। আবেদালি তাড়াতাড়ি বসে পড়ল। তারপর এক থাপ্পড় নিয়ে গেল গালের কাছে। বলল, তর এত সাহস! তুই যাবি চুরি করতে। পরে সে গামছা দিয়ে মুখ মুছল। ঘামে গরমে মুখ চুলকাচ্ছে। সে আমগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসতেই দেখল জোটন জলের জন্য উঠে যাচ্ছে। জলের বড় অভাব। সে অন্ধকারে এখন জল চুরি করতে যাচ্ছে।

জালালি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর কচ্ছপের মতো গলা লম্বা করে দিল। তারপর চিৎকার করে বলল,তর লাইগাই ত নিব্বৈংশা আগুন লাগল রে।

চিৎকারে ভয় পেয়ে গেল আবেদালি।—আমার লাইগ্যা বুঝি!

এবার জালালি খলখল্ করে উঠল, আমি সকলরে না কইছি ত কইলাম কি!

—কি কইবি?

—কমু তাইন আমারে ঘরে জোর কইরা ধইরা নিছে।

—ঘরে নিছি, ভাল করছি। তুই নাড়া দিয়া রানতে-রানতে প্যাট ভাসাইলি ক্যান?

—তার লাইগ্যা বঝি সময়-অসময় নাই?

গোটা ঘটনাটাই আগুনের মতো। আবেদালি এবার আরও ঘন হয়ে বসল।—আমার বুঝি ইচ্ছা হয় না ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করি।

.

ফকিরসাব নিমগাছটার নিচে বসলেন। গাছটাতে একটা কাকও উড়ছে না। সুতরাং ফকিরসাব এ-গাঁয়ের ঘরগুলো দেখলেন। বৈশাখ মাস শেষ হচ্ছে। এখন গাছে-গাছে আমের ভাল ফলন। তিনি তাঁর মালা-তাবিজের ভিতর থেকে একটা বড় পুঁটুলি বের করলেন। আর গোস্তের ওজন দেখবার সময় মনে হল এবার গ্রামের কোরবানির সংখ্যা কমে গেছে। তিনি হাত গুণে বলতে পারছেন যেন সংখ্যায় কত তারা, বকরি ঈদে এত কম কোরবানি এই প্রথম আর এই জন্যই কাকগুলি গোস্ত খুঁজে খুঁজে হন্যে হচ্ছিল। কাকগুলি উড়ে উড়ে হয়রান হয়ে গেছে। অথচ কিছুই মিলছে না। ওরা উড়ে উড়ে এদিক-ওদিক চলে গেল। সুতরাং তিনি কিঞ্চিৎ নিশ্চিন্ত বোধ করছেন। কোথাও পুঁটুলির ভিতর পান-সুপারি আছে অথবা চুনের কৌটা থেকে চুন নিয়ে ঠোঁটে লাগাবার সময়ই সুখী পায়রার মতো অনেকদিন আগের কসমের কথা মনে পড়ে গেল।

সামনে সড়ক। দূরে কোথাও আজ হিন্দুদের মেলা আছে। ফকিরসাব মনে করতে পারলেন, হয়তো এদিনেই নয়াপাড়া পার হলে ঘোড়দৌড়ের মাঠে মরশুমের শেষ ঘোড়দৌড় হবে। একবার ঘোড়দৌড়ের মাঠে গেলে হয়। কিন্তু অনেক দিন পর এদিকে আসায় কসমের কথা মনে পড়ে গেল। সড়কের পথে গলায় ঘণ্টা বাজিয়ে ঘোড়া যাচ্ছে। বিশ্বাসপাড়ার কালু বিশ্বাসের ঘোড়া—য্যান নয়নের মণি। ঘোড়াটার রঙ কালো কুচকুচে। কপাল সাদা আর সোনালী কড়ির মালা ঝুলছে ঘোড়ার গলাতে। ঘোড়াটা সড়ক ধরে দূরে চলে গেল। গ্রীষ্মের শেষ জল-ঝড়ে এ অঞ্চলের কিছু বাড়ি-ঘর ফেলে দিয়েছে। মাঠে ছোট ছোট পাটের চারা বাতাসে দুলছে। ইতস্তত মাঠের ভিতর মাথলা মাথায় চাষীরা পাটের জমিতে নিড়ান দিচ্ছিল আর আল্লা ম্যাঘ দ্যা, পানি দ্যা—এই গান গাইছিল। চৈত্রের খরা রোদ এবং শুকনো ভাবটা কেটে গেছে। এখন শুধু সবুজ প্রান্তর এবং মানুষের মুখে সুখের ইচ্ছা অথবা যেন বছর শেষ, দুঃখ শেষ—এখন অভাব কম, গরিব মানুষেরা অন্তত শাক-পাতা খেয়ে বাঁচবে। বিশেষ করে এইসব গ্রীষ্মের দিনে কচি পাট-পাতার শাক অথবা শুক্তোনি এক সানকি ভাতের সঙ্গে মন্দ নয় এবং যখন কোরবানির গোস্ত মুশকিলাসানের পাত্রটার নিচে যত্ন করে রাখা আছে, যখন মনে হচ্ছিল শেষ বয়সের সম্বল জোটন বিবিকে ধরে নিলে গোস্তের মতোই সস্তা হবে, তখন সড়ক ধরে সামনে গ্রামটার দিকে হাঁটা যাক।

মুশকিলাসানের আধারে তেল নেই। দরগার ছইয়ের নিচে রসুন গোটা ভিজানো আছে। তার তেল বড় উজ্জ্বল আলো দেয়। তেল নেই বলে আর এ-অঞ্চলে তিনি রাতে মুশকিলাসানের লম্ফ নিয়ে ঘুরতে পারবেন না। দরগায় গিয়ে লম্ফে আবার তেল ভরতে হবে। ফকির সাহেবের ইচ্ছা ছিল রসুন গোটার তেলে মুশকিলাসানের লম্ফ জ্বালাবেন এবং ছোটদের চোখে সুর্মা টেনে আস্তানা সাহেবের দরগাতে রসুলের কাছে দোয়া, জোটনের জন্য দোয়া ভিখ মেগে নিবেন। কিছুই হল না।

মসজিদের কুয়া থেকে প্রথম জল তুলে পা ধুলেন ফকিরসাব। তারপর শতচ্ছিন্ন এক জোড়া কাপড়ের জুতো, যার ফাঁকে কচ্ছপের গলার মতো বুড়ো আঙুলটা বের হয়ে আসে এবং জুতোর ভিতর পা গলাবার সময় একটা ইষ্টিকুটুম পাখি ডেকে উঠলে ফকিরসাব ভাবলেন, দিনটা ভালোই যাবে। শেষে আবেদালির বাড়িতে ওঠার মুখেই ডাকতে থাকলেন, মুশকিলাসান সব আসান করেন এবং এইসব বলতে বলতে উঠেই তিনি বুঝতে পারলেন পরবের দিনে জোটন বাড়ি নাই। তিনি যেন এই উঠোন এবং ঝোপ জঙ্গলকে বললেন, ওনারে ডাইকা দিলে ভাল হয়। অনেক দূর থাইক্যা আইছি, আবার কবে আমু ঠিক নাই। তাই ভাবছি অরে নিয়া যামু। তারপর কারও উপর ভরসা না করে নিজেই ছেঁড়া লুঙ্গি ঘাসের উপর বিছিয়ে বসে পড়লেন। খুব সন্তর্পণে মালা-তাবিজ খুলে পোঁটলা-পুঁটলি পাশে রাখলেন অন্য কোনও দিকে তাকাচ্ছেন না। যেন সব ঠিকই করা আছে, উকিল বলা আছে, মৌলবী সাবকে বলা আছে আর দু-চারটে দোয়া। ফকিরসাব এবার গলা খেকারি দিয়ে চোখ তুলতেই দেখলেন, জালালি ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে জোটনকে খবর দিতে হাজিসাহেবের বাড়ির দিকে ছুটছে।

ফকিরসাব ছেঁড়া তফনের উপর বসে জামরুল গাছের ফাঁকে সেই অস্পষ্ট মুখ দেখতে পেলেন। জোটন আসছে। আগের শক্তিসামর্থ্য যেন গায়ে নেই। জোটন নিজের ঘরে ঢুকে গেল। ফকিরসাব জোটনকে আর দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি নানারকম শব্দে ধরতে পারছেন জোটন এখন আর্শিতে নিজের মুখ দেখছে। ভিজা শনের মতো চুল—কত কষ্টে খোঁপা বাঁধা! আর তিনি মুখ না তুলেও যেন ধরতে পারছিলেন, জোটন বেড়ার ফাঁকে ফকিরসাবের মুখ হাত-পা অথবা সব অবয়ব দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যাচ্ছে।

ফকিরসাব গাছ-গাছালিকে যেন ডেকে বললেন, তাড়াতাড়ি করতে হয়।

ঘরের ভিতর জোটন সরমে মরে যাচ্ছিল। ঘরের ভিতর ফিসফিস্ শব্দ, আবেদালিরে আইতে দ্যান।

ফকিরসাব উঠোন থেকে বললেন, উকিল দ্যাখতে হয়।

জোটন এবার যেন গলায় শক্তি পাচ্ছে। ভাইবেন না। আবেদালি আইসা সব ঠিক কইরা দিব।

ফকিরসাব সঞ্চিত কোরবানির গোস্তের উপর হাত রেখে বললেন, ব্যালায় ব্যালায় রওনা হইতে হয়। না হইলে গোস্ত পইচা যাইব। বলে ফকিরসাব গোস্তের পুঁটলিটা নাকের কাছে এনে শুঁকে বললেন, গোস্তে মশলা নুন দিতে আপনের হাত কেমন?

এবার জোটন ঘরের ভিতর খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, ঘরে নেওয়ার আগে একবার পরখ কইরা দ্যাখতে সাধ যায় বুঝি!

—দ্যাখতে ইচ্ছা যায়, কিন্তু ব্যালা যে পইড়া আইতাছে।

জোটন দাঁত খুঁটছিল। মুখ কুলকুচা করে হাঁড়ির ভিতর থেকে পান সুপারি বের করে মুখে পুরল। তারপর ঝোপের ফাঁকে যখন দেখল জালালি আসছে, যখন দেখল গোপাটের অশ্বত্থ গাছের মাথা থেকে রোদ নেমে যাচ্ছে এবং যখন কামলা ফিরছে মাঠ থেকে, মাথায় পাট গাছের আঁটি, ঘাসের বোঝা, আর আবেদালি পরবের দিনও ঠাকুরবাড়ির কাজে গেছে—ফেরার সময় এখন, হয়তো সে ফিরছে, তখন জোটন ঠোট রাঙা করে বাবুর হাটের ডুরে শাড়ি পরে দেখল বুকের মাংস একেবারে শুকিয়ে গেছে। সে একটু ঠোট থেকে থুতু এনে, বুকে মেখে দিল। পাতলা থুতু দিয়ে শরীরের শুকনো ভাবটা কমনীয় করতে চাইছে অথবা মনে হল, ফকিরসাহেবের বুড়ো হাড় অঘ্রানী ধানের মতো—আশ্রয় দেবে, নিকা করবে এবং ফাঁকা মাঠের মতো উদোম গায়ে রঙ্গরস করবে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা-আল্লার মাশুল তুলতে এই বয়সেও গতর কম কৌশল করবে না।

বেলায় বেলায় আবেদালি এল। বেলায় বেলায় করণীয় কাজটুকু আবেদালি করে ফেলল। দু-চারজন গাঁয়ের লোক জমা হয়েছে উঠানে। আবেদালি সকলকে পান-তামুক খাওয়াল। হাজিসাহেবের ছোট বিবি একটা ছেঁড়া বোরখা দিল জোটনকে। আগুনের ভস্ম থেকে যে পেতলের বদনাটা তুলে এনেছিল, ফকিরসাহেবের পাশে সেটা রেখে দিল জোটন।

দুটো মেটে কলসি এনেছিল জোটন লাঙ্গলবন্দের বান্নি থেকে—যাবার সময় জোটন জালালিকে ডেকে কলসি এবং ঘরের সামান্য জিনিসপত্র অর্থাৎ গ্রীষ্মের দিনে সংগ্রহ করা ঝরা পাতা, পাটকাটি এবং দুটো সরা,—সব দিয়ে দিল। আর ছেঁড়া তফনে জোটন তার ভাঙা আর্শি, ঠাকুরবাড়ির বৌদের পরিত্যক্ত ভাঙা কাঠের চিরুনী, একটা সানকি আর সম্বলের মধ্যে কিছু ভাতের শেউই বাঁধা পুঁটলি হাতে তুলে নেবার সময়ই অন্যান্যবারের মতো আবেদালির হাত ধরে কেঁদে ফেলল। এবার নিয়ে চারবার নিকা, এবং এবার নিয়ে চারবার জোটন এই উঠান ছেড়ে বাপের ভিটা ছেড়ে মিঞা মানুষের সঙ্গে খোদার মাশুল তুলতে চলে যাচ্ছে। ফকিরসাব পোঁটলাপুঁটলি যত্ন নিয়ে বাঁধছে। পিতলের বদনাটা হাতে নিয়ে দু’বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বদনা থেকে পানি চুষে খেলেন। তারপর বাকি পানিটুকু ফেলে দিয়ে—বাঁ-হাতে পেতলের বদনা, কাঁধে ঝোলাঝুলি এবং ডানহাতে মুশকিলাসান, মুখে আল্লার নাম অথবা রসুলের নাম নিতে নিতে গোপাটে নেমে যাচ্ছেন। জোটন একহাতে একটা পুঁটলি নিয়ে আবেদালির ঘরে ঢুকে বোরখাটা মাথার ওপর তুলে দিল। আবেদালিকে বলল, জালালির দিকে তাকিয়ে বলল, জালালিরে মাইর-অ ধইর-অ না ভাই। জালালিকে বলল, সময় মত দুইটা রাইন্দা দ্যাইস।

এসব কথা বলার সময়ই জোটনের চোখ থেকে জল পড়ছিল। কত দীর্ঘদিন পরে ফের এই নিকা এবং এদিনে সে তার মোট তেরটি সন্তানের কথা মনে করতে পারল। যেন তাদের জন্যই চোখে জল। কোথাও তার দীর্ঘদিন ঠাঁই হয় না। জোটন চতুর্থবার স্বামীর ঘর করতে যাচ্ছে এবং আল্লার মাশুলের জন্য এই যাত্রা। যদি কোনও কারণে আল্লার দরবার শেষ হয়ে গিয়ে থাকে তবে সে ফের ফিরে আসবে এবং সোনালী বালির নদীতে অথবা বিলে শালুক তুলে, বাড়ি বাড়ি চিঁড়া কুটে, পরবে পরবে গেরস্থ মানুষের কাজ করে দুঃখে সুখে তার দিন কেটে যাবে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *