নিঃসঙ্গ পাইন – ১৫

১৫

জোসেফিন খুব সুসংবদ্ধ চিন্তাধারার মানুষ। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ভিসা কী টাইপের?

সাকিনা ঠিক জবাব দিতে পারল না, জোসেফিন তখন বললেন, ‘তোমার কী গ্রিনকার্ড আছে?

এবার সাকিনার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার গ্রিনকার্ড আছে।

‘বাঁচালে! তার মানে তোমার কোথাও চাকরি করতে কোনো বাধা হবে না। জে-ভিসা হলে মুশকিল হয়ে যেত। তোমার স্বামী কি এদেশের সিটিজেনশিপ পেয়ে গেছে? না, এখনো পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট?’

‘ঠিক জানিনা।’ সাকিনার নিজেকে খুব মূর্খ বলে মনে হল। স্বামীর সম্বন্ধে সাধারণ জ্ঞাতব্য বিষয়গুলো সে এখনো জানে না। কেন রকিব তাকে বলেনি? তার যে গ্রিনকার্ড আছে, তাইতো সে জানত না কয়েকমাস আগেও। একটু ঠেকে-ঠেকে বলল, ‘ওর আপন চাচা আছেন এদেশে, উনি সিটিজেন, তা জানি।’

জো আর কথা বাড়ালেন না, সংক্ষেপে বললেন, ‘তাই হবে। চাচা নিশ্চয় রকিবকে স্পনসর করে এদেশে এনেছেন। সিটিজেন না হলেও পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট তো বটেই। তা না হলে তোমার গ্রিনকার্ড হত না। যাক সে কথা। তুমি পড়াশোনা করেছ কদ্দূর? কোন্ বিষয়ে? কিছু মনে কোরো না যেন, এতসব ব্যক্তিগত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি বলে।’

‘না না তা কেন? আমার জন্যই তো। যা-যা দরকার সব জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ছিলাম। হঠাৎ বিয়ে হয়ে যাওয়াতে পরীক্ষা দিতে পারিনি।’

জোসেফিন জাহানারার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অনার্সটা কী? ও কি কলেজ- গ্র্যাজুয়েট? তোমাদের দেশের সিস্টেমটা ঠিক বুঝি না।’

জাহানারা বললেন, ‘না, ও কলেজ গ্র্যাজুয়েট হতে পারেনি। টুয়েলফথ ক্লাসের পর যে-গ্র্যাজুয়েশন সেটা ক’রে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মেজর করছিল— কী বিষয়ে সাকিনা?’

‘বাংলা—’

‘ও বাংলায় মেজর করছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা তিনবছরের কোর্স, এটা শেষ করে পরীক্ষা দিলে

‘বুঝেছি। তুমি তাহলে হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েট। তা এখন একটা ট্রাভেল-এজেন্সিতে চাকরি পেতে কোনো অসুবিধে হবে না। তবে ট্র্যাভেল-এজেন্সির চাকরিতে মাইনে তো বেশি হবে না। তোমাকে প্রথমে কিছুদিন চাকরি করে কিছু টাকা জমিয়ে কোনো একটা কোর্স করতে হবে। কোনো টেকনোলজির ওপর কোর্স—’

‘সেটা কী রকম?’

‘যেমন ধর রেডিয়োগ্রাফার বা ফিজিয়োথেরাপিস্টের কোর্স। এসব কোর্সে ভর্তি হতে বেসিক কোয়ালিফিকেশান বিশেষ লাগে না, হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েট হলেই হয়। অথচ যে-কোনো হাসপাতালে এসব চাকরিতে মাইনে খুব ভালো। এ বিষয়ে নাসির তোমাকে সবচেয়ে বেশি হেল্প করতে পারবে। ওকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক, ডিরেক্টর অনেকের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব। তবে ওটা পরের কথা। ও-বিষয়ে নাসিরের সঙ্গে আলাপে বসব হয়তো ছয়মাস-একবছর পরে। এখন চলো যাই ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলার্স-এ। ওখানে আমার এক বান্ধবী চাকরি করে, বহু বছর ধরে। সুরেখা ওর নাম। খুব ভালো মেয়ে। ইন্ডিয়ান। ওর স্বামীও ডাক্তার। বিয়ে হয়ে এদেশে এসে প্রথম-প্রথম খুব মন খারাপ করত। দেশের মা-বাবা ভাই-বোনদের খুব মিস করত। সেই-যে তখন চাকরি নিয়েছিল—এখন ওর দুটো বাচ্চা, একবোন একভাইকে নিয়ে এসেছে ইন্ডিয়া থেকে, একা লাগার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, টাকারও প্রয়োজন নেই তেমন—তবু চাকরিটা ছাড়েনি। স্রেফ মায়াতে। দেখবে তোমারও খুব ভালো লাগবে। আমি সুরেখাকে যা জানি, ও তোমাকে খুব মায়া করবে।’

ফোন বেজে উঠল; সাকিনা বসার ঘর থেকে উঠে রান্নাঘরের দেয়ালে ঝোলানো ফোনের কাছে গেল। ‘হ্যালো’ বলেই হঠাৎ চমকে এদিকে একবার মুখ ফেরাল। জাহানারা আর জোসেফিন নিজেদের মধ্যে কথায় মশগুল। সাকিনা চাপা গলায় বলল, ‘একটু ধরে থাক। নিচে পাশের বাড়ির খালাম্মা আছেন। আমি বেডরুমে গিয়ে ফোন ধরছি।’

বসার ঘরে এসে বলল, ‘খালাম্মা, আপনারা একটু বসেন, রকিব ফোন করেছে। আমি ওপরে গিয়ে কথা বলে আসি।’

জাহানারাও হঠাৎ যেন চমকে জমে যান। তারপর সম্বিত ফিরে বলেন, ‘হ্যাঁ, যাও, যাও। আমরা বসছি।’

দৌড়ে দোতলায় উঠবার ইচ্ছেটা প্রাণপণে দমন করে টকটকে মুখ নিচু করে সাকিনা ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায়। তার বুকে ঢেঁকির পাড় পড়ছে। কী কী জিজ্ঞেস করবে, যতই ভেবে নিতে চাচ্ছে, সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ফোনে আবার ‘হ্যালো’ বলতে রকিবের অসহিষ্ণু গলা শোনা গেল, ‘উঠে আসতে এত দেরি করে? লং ডিসট্যান্স কলে পয়সা ওঠে না?’

সাকিনা প্রাণপণে বুকের কাঁপন চেপে বলে, ‘আগের ঠিকানায় নেই নাকি? আগের ফোনে নো-রিপ্লাই হয় যে!’

‘ফোন করেছিলে নাকি? তোমাকে না বলেছিলাম তোমার ফোন করার দরকার নেই, আমিই করব?’

সাকিনার হঠাৎ রাগ চড়ে যায়, ‘করনি তো প্রায় সাতদিন। একা-একা কেমন আছি, সে খোঁজটুকু নেবার কথাও খেয়াল হয়নি? এখন কোন্ ঠিকানায় আছ?’

‘কী ঠিকানা ঠিকানা করছ? নো-রিপ্লাই হলেই ঠিকানা বদল হবে কেন? আমি কি চব্বিশঘণ্টাই রুমে বসে থাকব নাকি? মাঝেমাঝে বাইরে যাব না?’

‘তাই বলে রাত দুটোয়? ভোর চারটেয়? সকাল ছটায়? বল তুমি কোথায় থাকছ আজকাল। কার বাসায়? কার সঙ্গে?’

‘এসব কী বলছ সাকিনা? কে তোমার মাথায় কী ঢুকিয়েছে?

‘কেউ মাথায় কিছু ঢোকায়নি। শুধু একটা খবর পেয়েছি—মিরান্ডা স্ট্যানলিকে ছেড়ে চলে গেছে স্যানডিগোয়েতে তার বাবার বাড়িতে। আমি ইচ্ছে করলে মিরান্ডার বাসার ফোন নম্বর স্ট্যানলির কাছ থেকে নিতে পারতাম কিন্তু আমার রুচিতে বেধেছে। তাই তোমাকেই সরাসরি জিজ্ঞেস করছি। সোজা হ্যাঁ অথবা না দিয়ে জবাব দাও— তুমি মিরান্ডার বাসায় থাকছ কি না।’

এটুকু বলতেই সাকিনার যেন বুক ফেটে গেল। মিরান্ডার সঙ্গে আছ কিনা বলতে চেয়েছিল কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারল না।

ফোনের ওপাশে পরিপূর্ণ নিস্তব্ধতা। এপাশে সাকিনাও মুখ খুলতে পারছে না, কারণ মুখ খুললেই কান্নার স্রোত বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসবে। হঠাৎ সে রিসিভারটা আছড়ে ক্রেডলের ওপর রেখে বিছানায় ঝাঁপিয়ে উপুড় হয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল এবং একবার মাত্র কেঁদে উঠেই মুখে হাতচাপা দিল। নিচের ঘরে খালাম্মা আর জো মামী বসে আছেন। সে আঁচল মুঠ করে পাকিয়ে মুখে গুঁজে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। কলটা পুরো ছেড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে কান্নার দমকটা সামলাল। তারপর মুখেচোখে খুব করে পানি দিয়ে মুখ মুছল তোয়ালেতে। আয়নায় তাকিয়ে দেখল চোখ লাল হয়ে গেছে। সারা মুখে কান্নার ছাপ প্রকট। সে কেয়ার করল না। নিচে নেমে শান্ত গলায় বলল, ‘চলুন বেরিয়ে পড়া যাক।’

জোসেফিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখন সাড়ে বারোটা। চল প্রথমে কোথাও গিয়ে লাঞ্চ খেয়ে নিই। বুবু, তুমি বাইরে খেতে পারবে?’

‘স্যুপ তো অবশ্যই পারব। তা ছাড়া দেখব অন্য নরম খাবার আছে কি না। না হলে বাড়ি এসে আবার খাব।’

‘চাকরি কেমন লাগছে?’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *