ঠগী – ৯

পর্ব ৯

জব্বলপুরে এসে নিজের বাংলার সামনে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে মাটিতে নামলেন স্লীম্যান। এখন যেন তিনি অন্য মানুষ, সকালের স্লীম্যানের সঙ্গে কোন মিল নেই তাঁর। সারাদিনের ক্লান্তির ছাপ তাঁর চোখে মুখে, ঢেউ-খেলান চুলে, ব্রিচেসের ভাজে ভাজে, বুটের রংয়ে। কিন্তু কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। হাতের চাবুক হাতেই রইল। বাংলোয় ঢুকে পোক বদল না করেই তিনি কল্যাণ সিংয়ের কাছে চললেন। মলোনি নয়, কৌতূহলী অ্যাডজুট্যান্ট বা জব্বলপুরের কোন পুরানো রাজকর্মচারী নয়—সকলের আগে তার ওকেই দরকার।

আধঘণ্টার মধ্যেই আবার নিজের বাংলোয় ফিরে এলেন স্লীম্যান। হাবিলদারকে কানে কানে কি যেন বললেন। তারপর নিজের ঘরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মলোনি তখনও জানেন না স্লীম্যান কি করছেন, ‘পাগলা ছোকরাটা’ কি করতে চায়।

হাবিলদার দুর্গা এবং তার অনুচরদের নিয়ে জেল ব্যারাকে ঢুকল। তারপর ফাটকটা বন্ধ করে হাঁক দিল, মোতি কৌন হ্যায়?

দল থেকে একটি তরুণ ধীরে ধীরে উঠে বঁড়াল। হাবিলদার হিন্দুস্তানীতে বলল, তুমি আমার সঙ্গে এস, সাহেব বোলাতা হ্যায়।

ভয়ে মোতির মুখ শুকিয়ে গেল। সে দুর্গার দিকে তাকাল। দুর্গা বলল, ভয় কি? সাহেব অবিবেচক নন। তুই যা। বলবি,নরসিংপুর আমরা জীবনেও কখনও দেখিনি হুজুর। তারপরও যদি তিনি অন্য রকম ভাবেন, তবে আমরাও তত রয়েছি।

মোতি জমাদারের পিছু পিছু ওদের ব্যারাক থেকে বের হয়ে গেল। পথে জমাদারও অভয় দিল ওকে।ভয় কি ? সবাই জানে, এ সাহেবের একটু ছিট আছে! জব্বলপুরে আজই এসেছেন। দেখবে, হয়ত কাল ভোরেই আবার সবাইকে ছেড়ে দেবেন। মোতি বলল, এখন কি আমাকে তার কাছেই নিয়ে চলেছ ?

—না। জমাদার একটা সেলের সামনে থমকে দাড়াল। অবাক হয়ে মোতি দেখল তার ভেতরে পাথরে গড়া মানুষের মত দাড়িয়ে আছে কল্যাণ সিং—তার ভাই। তালাটা খুলতে খুলতে জমাদার বলল, সাহেবের হুকুম, তোমাকে এখানেই থাকতে হবে।

আবার তালা পড়ল। সান্ত্রীকে সাহেবের হুকুম বুঝিয়ে দিয়ে জমাদার আবার বাংলোয় ফিরে চলল।

রাত তখন প্রায় বারোটা। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। বাংলোর উঠোনে জ্যোৎস্নার আলো-আঁধারি মায়াজাল। চারপাশে ক’টি বিরাট বিরাট গাছ। তারই পাতার ছায়া উঠোনে নাচছে,–অলক্ষ্যে থেকে একটি নিপুণ হাত যেন ফুটফুটে অঙ্গনে সাদায়-কালোয় একটি নিটোল জাল বুনে চলেছে। জীম্যান ধীরে ধীরে বারান্দায় এসে দাড়ালেন। নিজের ছায়াটাকে তার মনে হল যেন সামনে ছড়ান বিস্তীর্ণ জালটার প্রান্তদেশ। এখান থেকে টানলেই গোটা জালটি তার হাতে উঠে আসবে, উঠোন আবার তকতকে ঝকঝকে হয়ে উঠবে।

জেলের ঘড়িতে ঢং ঢং করে বাবোটা বাজল।

ধীরে ধীরে স্লীম্যানের দীর্ঘ ছায়াটি ঘিরে নিঃশব্দে আরও ক’টি ছায়া এসে মিলিত হল। সীম্যান বারান্দা থেকে নেমে বললেন, চল । ছায়ার সারি সামনের দিকে এগিয়ে চলল। আগে আগে তাদের মোতি, তার দু’পাশে দু’জন সান্ত্রী। পরের সারিতে থানাদার আর কল্যাণ সিং। তাদের ঘিরে ক’জন সিপাই। তাদের হাতে হাতে মশাল, ঘাড়ে কোদাল। পেছনে স্বপ্নবিষ্ট স্লীম্যান।

চলতে চলতে ওরা লাখনাদৌনের পথের মুখে এসে হাজির হলেন। পেছন ফিরে মোতি বলল, হুজুর, আরও একটু কষ্ট করতে হবে। ঈীমান কোন জবাব দিলেন না। তিনি নিঃশব্দে ওদের পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন।

ওরা এসে পথের ধারে একটা আমবাগানের দিকে মোড় ঘুরল। স্লীম্যান বাগানটার দিকে তাকালেন। বিরাট বিরাট গাছ। গায়ে সাদা-কালো দাগ। মাথায় ঘন পাতার বাহার। এমন সুন্দর, শান্ত সমাহিত বাগান কোন খুনের সাক্ষী হতে পারে, একথা ভাবাও যায় না। মোতি একটা গাছের গোড়া থেকে হাতে খানিকটা মাটি তুলে নিল। তারপর মশালের আলোয় তা নেড়েচেড়ে পরীক্ষা করে বলল, হুজুর, এখানটায় খুড়তে আজ্ঞা করুন।

সিপাইরা কোদাল চালাল। দেখতে দেখতে মাটির নীচ থেকে হেঁড়া কাপড়-চোপড় উকি দিল। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যে চাঁদের আলোয় বেরিয়ে এল একটি সদ্যমৃত মানুষের দেহ। তারপর আরও একটি। তারপর আরও। মোতি বলল, হুজুর, আরও আছে।

স্লীম্যান বললেন, না, আজ আর চাই না। কোথায় আছে, সিপাইদের তুমি সে জায়গাগুলো শুধু চিনিয়ে দাও। ওরা পরে খুড়ে দেখতে পারবে।

মোতি বলল, যে আজ্ঞে ।

থানাদারের দিকে ঘুরে দাড়ালেন স্লীম্যান। -কি, কাউকে চিনতে পারছ ?

-আজ্ঞে হ্যা, দু’জনকে। ঐ যে দু’টি দেহ দেখছেন স্যার, ওরা দু’জনই জব্বলপুরের লোক।

-ব্যস, যথেষ্ট। স্লীম্যান তার ঘোড়ার দিকে এগিয়ে চললেন। তবে এবার ঘরে চল।

আগে আগে মোতি আর কল্যাণ সিং। পেছনে সিপাইদের ঘাড়ে পর পর তিনটে ন্যাকড়ায় তৈরী ডুলি। তাতে চারটি মৃতদেহ—পাঁচশ বছরের ইতিহাসের চার টুকরো মৌন স্বাক্ষর। মৌন, কিন্তু স্লীম্যান জানেন, ওদের অবহেলা করে এমন সাধ্য আজ আর কারও নেই। তিনি আবার আমবাগানটার দিকে তাকালেন। চাদের আলোয় বাগানটা যেন তখনও ঘুমোচ্ছ। জিমখানা, ক্লাব, মলোনি—গোটা জব্বলপুরও নিশ্চয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু কাল সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর কি হিন্দুস্তান আবার এমন নিশ্চিন্ত ভাবে কোনদিন নাক ডাকাতে পারবে? কাল সকালের পর কি কেউ তাকে ঠগী ফ্লীম্যান’ বলে ব্যঙ্গ করবে ? তা করুক। ক্লীম্যানের সে জন্যে আর কোন খেদ নেই। কেননা, তিনি জানেন, কাল থেকে সেটাই হবে তার সত্যিকারের নাম। সেই আমবাগানের ছায়ায় দাড়িয়েই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন স্লীম্যান, কাল থেকে এই ঠগীই হবে তার একমাত্র ধ্যান। গাছের একটি শাখা তিনি যখন হাতে পেয়েছেন, তখন কাণ্ড, মূল– সব তাঁকে খুজে বের করতে হবে, তার আগে তার বিশ্রাম নেই।

একটি দল ধরা পড়ল।

তারপর আরও! লাখনাদৌনের আমবাগানের সাক্ষীকে এবার আর উড়িয়ে দেওয়া গেল না। কেননা, সে কবরের ধন দাড়িয়ে দাড়িয়ে যিনি উদ্ধার করেছেন তিনি স্বয়ং ক্লীম্যান। ক্লীম্যানের তীক্ষ্ণ জেরায় দুর্গা ভেঙ্গে পড়ল। তার মুখ থেকে আরও কতকগুলো নাম পাওয়া গেল। কবর থেকে উঠল আরও কিছু মৃতদেহ এবং কঙ্কাল। সাকুল্যে তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এখন আটাশটিতে। তাদের মধ্যে যেমন ব্যবসায়ী, সিপাই, তীর্থযাত্রী, সব রকমের মানুষ আছে, তেমনি দুর্গার তালিকা দেখে যাদের ধরে এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করান হয়েছে তাদের মধ্যেও নানা পরিচয়ের মানুষ আছে। একজন তাদের সরকারী হরকরা। আর একজন পুলিশ ইনস্পেক্টার। সীম্যানের সাধনায় দলের আটাশ জনের ফাসী হল, বাকী সত্তর জন প্রেরিত হল কারাগারে। একমাত্র ছাড়া পেল মোতি আর কল্যাণ সিং। সাহেব বলেছেন, ওদের আরও কাজ আছে, এ দু’জনকে তাঁর দরকার । “

অবশ্য মোতিকেও শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা যায়নি। সে আবার দলে ফিরে গিয়েছিল। ধরা পড়ে আবার যখন সে স্লীম্যানের সামনে কাঠগড়ায় এসে দাড়াল, তখন ক্লীম্যান নিরুপায়। এমন ঘৃণ্য খুনীকে বাঁচিয়ে রাখার তার আর কোন অধিকার নেই। তিনি মোতিকেও ফাঁসীকাঠে পাঠালেন।

মোতি চলে গেল। কিন্তু তার আগে ঠগী স্লীম্যান’কে দু’টি অমূল্য জিনিষ দিয়ে গেল সে। তার একটি রামসী’, অর্থাৎ ওদের ‘বুলি। স্লীম্যান যে এখন যে কোন ঠগীর মত এমন গড়গড় করে রামসী বলতে পারেন সে শুধু মোতির কারণে। সাহেবকে সে-ই ভাষাটা শিখিয়েছিল। দ্বিতীয়—ঠগীদের ভেতরের কাহিনী। ওরা কিভাবে ঠগী হয়, কারা দলে আসে, কেন আসে, কিভাবে খুন করে সাহেব মোতির কাছ থেকেই সে রহস্যময় পেশার খুঁটিনাটি সব জেনেছিলেন। বলতে গেলে তিনি যে আজ গোটা হিন্দুস্তানে ঠগীদের বিষয়ে সবচেয়ে বেশী জানেন তার অনেকখানি কারণ এই মোতি।।

মোতির কথার সূত্র ধরেই স্লীম্যান আবিষ্কার করেছিলেন যে, তাঁর ধারণা ভুল নয়—সকলে মিলে ওরা সত্যিই একটি অখণ্ড দল। উত্তর, দক্ষিণ, পূব, পশ্চিম—ভারতের যেখানেই ঠগী থাক না কেন, বিশাল হিন্দুস্তানের মতই তারা এক অখণ্ড অস্তিত্ব। দ্বিতীয়ত, স্লীম্যান সেই সূচনা দিনেই বুঝেছিলেন, ওরা আর ভারত এক হয়েও একই ঘটনা নয়। হিন্দুস্তানের এই ছন্নছাড়া সন্তানদের এই বেপরোয়া জীবনের পেছনে রয়েছে কতকগুলো ঐতিহাসিক কারণ! জীম্যান লিখেছেনভারতবর্ষ খুনীর দেশ এমন মনে করার কোন কারণ নেই। সমগ্র ভারতে ইংরেজের নিজস্ব দুর্গ আছে মাত্র তিনটি-কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ। অথচ আমরা মুষ্টিমেয় ইউরোপীয়ানরা কেমন স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমাদের চারদিক ঘিরে এদেশের মানুষ। তাদের নিয়ে আমরা শাসন চালাচ্ছি, হাটে-বাজারে, নগরে, বন্দরে তাদের সঙ্গে অষ্ট প্রহর মেলামেশা করছি। কিন্তু কই, সেখানে তো ভারত ন্যায়নীতিবর্জিত খুনীর দেশ নয়।

তিনি আরও লিখেছেন—১৮৩৫ সনে মিসেস কর্নেল ফেথফুল নামে এক ইংরেজ মহিলা কলকাতা থেকে সুদূর লুধিয়ানায় এসেছিলেন পাল্কীতে চড়ে। সঙ্গে তাঁর একটি কুমারী মেয়ে ছাড়া আর কেউ ছিল না, একটি ভৃত্যও না। তবুও তিনি নিরাপদে তার স্বামীর কাছে পেীছেছিলেন। অথচ এ পথের দূরত্ব ছিল বারোশ’ মাইলের বেশী এবং তিনি পথে ছিলেন পুরো চৌদ্দ দিন, চৌদ্দ রাত্রি! শুধু ইউরোপীয়ান নয়, গুটি কয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে স্থানীয় বাসিন্দারাও বছরের পর বছর এমনি নিজ নিজ পথে চলেছে। স্লীম্যানের মতে সেটাই সত্যিকারের ভারতবর্ষ। স্যার টমাস মনরোর একটি উক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, আমি জানি না ভারতীয়দের সভ্য করব বলে প্রায়শঃ আমরা যা বলে থাকি সে কথাটার সত্যিকারের অর্থ কি? অবশ্য, উন্নততর শাসন ব্যবস্থার কথা উঠলে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু যদি বল, উন্নততর কৃষি-ব্যবস্থা, শিল্প সংগঠন বা কারিগরী দক্ষতা কিংবা লেখাপড়ার উন্নততর ব্যবস্থা, তবে আমি আপত্তি করব। এ ক্ষেত্রগুলোতে ভারত কোন দিক থেকেই ইউরোপের চেয়ে হীন নয়। বিশেষ করে এখানকার জনসাধারণের উদার আতিথেয়তা এবং সর্বোপরি নারী সমাজের প্রতি তাদের সম্মান-সৌজন্য ও শ্রদ্ধা সভ্যতার এই দুই লক্ষণে এখানকার জনসাধারণ সত্যিই অতুলনীয়।

তবুও যে এদেশে ঠগীর মত ঘৃণ্য খুনীলের আবির্ভাব হয়েছিল তার কারণ এদেশের অস্থির ইতিহাস। মানুষের জীবন এবং সম্পত্তি যখন বিপন্ন, বহিরাক্রমণে সমাজ যখন ছিন্নভিন্ন, ইতিহাসের সেই তমসার যুগেই আবির্ভূত হয়েছিল একদল অসহায় মানুষ। খুনী না হয়ে সেদিন তাদের উপায় ছিল না। ভারতের দুর্ভাগ্য, ঘরছাড়া সেই হতভাগ্য সন্তানদের সে আর ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারেনি। সীম্যান লক্ষ্য করেছেন—সংখ্যায় ওরা অসংখ্য হলেও এখনও প্রধান উৎস ওদের আদি সেই ক’টি পরিবার। বিগতে পাঁচ শ’ বছরের ইতিহাসের কোন সুদিনে যদি কেউ ওদের ডেকে ঘরে তুলতে পারত তাহলে আজ ওরা কিছুতেই এমন ভয়াবহ হতে পারত না। কিন্তু সেদিকে কারও নজর ছিল না। ফলে, সমাজের অবহেলাকে ওরা ক্রমে পুষিয়ে নিতে চেয়েছিল ঈশ্বরের কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করে। ঠগীর সঙ্গে ধর্মের যে সম্পর্ক তার কারণ বহুলাংশে সেখানেই। দ্বিতীয়ত, ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে স্লীম্যান দেখেছেন-মন্দিরে ঠাঁই পেলেও সমাজের সত্যিকারের আশ্রয় যেখানে, সেখানে ওরা তখনও পরিত্যক্ত। ওদের অধিকাংশেরই যথেষ্ট জমিজমা নেই, অধিকাংশের ঘরেই দুবেলা দুমুঠো পেটভরে খাওয়ার সংস্থান নেই। সুতরাং, স্লীম্যান মনে মনে ভাবলেন, এ বৃক্ষ যদি সমূলে উৎপাটিত করতেই হয় তবে তাকে শুধু কাঠুরিয়া হলে চলবে না, মৃত্তিকার আরও গভীরে নামতে হবে। মোতি প্রকারান্তরে সে দায়িত্বের কথাই তাঁকে মনে করিয়ে দিয়ে গেল।

স্লীম্যান মনে মনে তৈরী হয়েই ছিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাজে লেগে গেলেন। নরসিংপুর বিরাট জেলা। জেলা শাসকের অনেক কাজ। তারই মধ্যে শুরু হল ঠগীর অনুসন্ধান। কাজটা সহজ ছিল না। কেননা, নরসিংপুরই ঠগীর একমাত্র ঠিকানা নয়। নামমাত্র বোঝা গেলউত্তর, পশ্চিম, দক্ষিণ, পূর্ব-কমবেশী গোটা ভারতই তাদের অধিকারে। ধরা-পড়া ঠগীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বোঝা গেছে, শুধু খুনে দক্ষতা নয়, সংগঠন ক্ষমতায়ও তারা অনন্য। প্রত্যেক দলের এলাকা ভাগ করা আছে, সাধারণত তারা সেখানেই চলাফেরা করে, অন্য এলাকা থেকে ইশারা পেলে তবেই তারা সেখানে পা দেবে। তারপর কাজ শেষ হয়ে যাওয়া মাত্র নিজ রাজ্যে ফিরে আসবে। স্লীম্যানের প্রথম কাজ এই এলাকাগুলোকে নির্দিষ্ট করা। এ কাজ একা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্লীম্যানের সেটাই একমাত্র কাজ নয়। তবুও মুহূর্তের জন্যেও তিনি দায়িত্বটা এড়িয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছেন না। কেননা, কোম্পানি উদাসীন হলেও নিজে তিনি মনে মনে দায়বদ্ধ। যত বেশী সংখ্যক দল ধরা পড়ছে, তাঁর নৈতিক দায়িত্ব ততই যেন বেড়ে চলেছে।

সুতরাং সঙ্গে সঙ্গে কাজের এলাকাও বেড়ে চলল। নরসিংপুরের জেলা ম্যাজিস্টেট কখনও ঠগ খুজতে খুজতে চলে যাচ্ছেন গোয়ালিয়রে, কখনও রাজপুতানায়। কোম্পানির কর্তৃপক্ষ তখনও উদাসীন। ক্লীম্যান কি করতে চান, তারা ঠিক তা বুঝে উঠতে পারছেন না। তাঁর একমাত্র সহায় তখন নিজের ওপরওয়ালাসগরে গভর্ণর জেনারেলের এজেন্ট কার্ভিন স্মিথ। স্লীম্যান সৈন্যবাহিনী ছেড়ে তার সহকারী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই স্মিথ তরুণ ঠগীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তাই চেষ্টায় স্লীম্যান জনায় সমৰ্থ সহকারী পাশে পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য রেনোল্ডস, প্যাটন, উইলসন, ম্যাকলিওড়, ব্রিগস, এটওয়াল-এই কয়টি নাম। ঠগী-দমনের সূচনা পর্বে ওঁরাই ছিলেন ঠগী স্লীম্যানে’র হাতে প্রধান হাতিয়ার। উল্লেখযোগ্য এই, এই ধর্ম-যোদ্ধাদের দলে সেদিন ঠগীদের আপন দেশের মানুষও ছিলেন একজন। নাম তার রুস্তম খাঁ। দুঃসাহসিকতায় তিনিও সেদিন স্লীম্যানের যথার্থ অনুচর।

পরবর্তীকালে অবশ্য ঠগী স্লীম্যানে’র এই দলে অন্যরাও যোগ দিয়েছিলেন। স্লীম্যান নিজের তালিকা অনুযায়ী তার সেদিনের বন্ধু এবং সহকারীদের নাম—‘মিঃ এফ. সি. স্মিথ, মিঃ মার্টিন, মিঃ জর্জ স্টকওয়েল, মিঃ চার্লস ফ্রেজার, মিঃ ওয়েলেসলি, মিঃ শোর, মিঃ ক্যাভেনডিস, মিঃ জর্জ ক্লার্ক, মিঃ এল উইলকিনসন এবং মিঃ বক্স। ওঁদের সঙ্গে ঠগী ধরার কোন সম্পর্ক ছিল না। তারা অধিকাংশই সিভিল সার্ভিসের লোক। কেউ কেউ আবার ছিলেন ‘ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসে’, অর্থাৎ দেশীয় রাজ্যসমূহে গভর্ণর জেনারেল তথা কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। ঠগী বিষয়ে তাদের দায়িত্ব ছিল ধরে-আনা ঠগদের বিচার করা। তবুও যে স্লীম্যান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ওঁদের নামোল্লেখ করেছেন তার কারণ আদালতের তরফ থেকে সহযোগিতা ছাড়া সেদিন তার পক্ষে একাকী এই বিরাট সংকল্পকে বাস্তবে রূপায়িত করা সম্ভব ছিল না। কারণ, ইংরেজী আইনের চমৎকারিত্ব প্রদর্শনের বাসনায় অধিকাংশ বিচারকই তখন সুবিচারের চেয়ে আইনের মারপ্যাচ নিয়ে বেশী ব্যস্ত। ওঁরাও যদি তাই করতেন তাহলে হয়ত অনেক ঠগীকেই শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে হত। বলা বাহুল্য, স্লীম্যানের পক্ষে সে ঘটনা হৃদয়বিদারক হত। কেননা, ঠগী খুঁজে বের করা তখন যে কোন একটা যুদ্ধ বিজয়ের চেয়েও কঠিন কাজ।

যাদের সংকল্পে এবং নিষ্ঠায় সে কাজ তিনি সম্পন্ন করেছিলেন স্লীম্যান সগর্বে তাদের নামও উল্লেখ করে গেছেন। তার সেই প্রিয় অনুচর এবং বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন কর্নেল লো, কর্নেল স্টয়ার্ট, কর্নেল আলভেস, কর্নেল স্পাইয়ার্স, কর্নেল কলফিল্ড, কর্নেল সাদারল্যান্ড, কর্নেল ওয়াড়, মেজর উইলকিনসন, মেজর বর্থ উইক এবং ক্যাপ্টেন প্যাটন। ওঁরা সকলেই ছিলেন সৈন্যবাহিনীর তরুণ অফিসার। স্লীম্যানের আহ্বানে পরবর্তীকালে তাঁরাই ঠগী’র বিখ্যাত তরুণ দল।

অন্যরা তাঁদের নাম দিয়েছিলেন-‘হিজ ইয়ং মেন’। ওঁর নায়ক স্লীম্যানের আপন হাতে গড়া, তারই আদর্শের ছাঁচে ঢালাই করা।

এ কাজ একদিনে সম্ভব হয়নি। যাত্রার আগে ঠগী জমাদার যেমন ধীরে ধীরে নিঃশব্দে তার প্রস্তুতি চালায়, ঠগী- স্লীম্যানের এই বাহিনীও তেমনি তিল তিল করে গড়া।  দুর্গার দল ধরা পড়ল। তিন বছরের মধ্যে একই এলাকায় ধরা পড়ল আর একটি দল। কিন্তু কোম্পানি তখনও দর্শক। ১৮২৪ সনের এপ্রিলে স্লীম্যানকে তারা ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত করেছেন। কিন্তু সে ঠগী আবিষ্কারের পুরস্কার নয়। জেলা শাসক হিসেবে তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি মাত্র। ঠগী তখনও কোম্পানির চোখে চোর-ডাকাত ইত্যাদি মামুলী অপরাধীদের তালিকায় আর একটি নতুন নাম মাত্র।

কিন্তু স্লীম্যানের কাছে তারা তা নয়।

সুতরাং, জেলা শাসনেরফাঁকে ফাঁকেই সুরু হল ‘ঠগী স্লীম্যানের আপন কাজ। যখনই সময় পান তখনই তিনি জবানবন্দীগুলো নিয়ে বসেন। রাজসাক্ষীদের পাশে বসিয়ে খুটিয়ে খুঁটিয়ে তাদের কথা শোনেন। রাত জেগে জেগে তাদের ইতিহাস, জীবন এবং আদর্শের কাহিনী লেখেন। ঠগীদের মূল তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।

রাজসাক্ষীদের ঘাঁটতে ঘাঁটতে মাঝে মাঝে মনের মধ্যে নতুন দল উকি দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে চড়ে স্লীম্যান সেদিকে ছোটেন। ঠগীর মতই নির্ভুল তাক। স্লীম্যান কখনও নিরাশ হয়ে ঘরে ফেরেন না। বরং, নতুন দলের সঙ্গে প্রতিবারই নতুন নতুন তথ্য যুক্ত হয় তার গবেষণার খাতায়। ফলাফল দেখে সীম্যান নিজেই স্তম্ভিত—কোথায় নরসিংপুর? তাঁর মানচিত্র ক্রমেই আকারে বিশাল হয়ে উঠছে, পথের দৈর্ঘ্য শতকের ঘর পেরিয়ে হাজার হাজার মাইলে ঠেকছে। তাও অনুসন্ধান এখনও অসম্পূর্ণ।

বাধ্য হয়েই ওপরওয়ালা স্মিথের কাছে হাত পাততে হল। স্মিথ এই তরুণটিকে জানেন। তাঁর চোখের তারায় কি স্বপ্ন নেচে বেড়াচ্ছে তাও তার অজানা নয়। তিনি বললেন-তুমি এগিয়ে যাও। আমি যতদিন আছি ততদিন তোমার কোন ভাবনা নেই। আমি তোমায় গোটা সগর এবং নর্মদা এলাকার ঠগী দমনের দায়িত্ব দিলাম, এই নাও তোমার সহকারী !

বৰ্থ উইক পাশে এসে দাড়ালেন। তারপর রুস্তম খাঁ, প্যাটন। আনন্দিত স্লীম্যান প্রবল উৎসাহে আবার কাজে মাতলেন।

হঠাৎ ‘ঠগী’কে থামতে হল। ক’বছর আগে নাথপুরে ম্যালেরিয়ার আক্রমণে শয্যা নিয়েছিলেন তিনি। বেঁচে উঠবেন বন্ধুরা তা ভাবতে পারেননি। এবার আবার সেই ম্যালেরিয়া চাড়া দিয়ে উঠেছে। তার ওপর এই খাটুনি। শঙ্কিত বন্ধুরা তাকে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে বললেন। কিন্তু স্লীম্যান এই মুহূর্তে কিছুতেই ভারত ত্যাগে রাজী নন। শেষ পর্যন্ত অভিভাবকতুল্য বৃদ্ধ স্মিথকে হস্তক্ষেপ করতে হল। তাঁর নির্দেশে স্লীম্যান আঠার মাস ছুটির জন্যে দরখাস্ত পেশ করলেন।

ছুটি মঞ্জুর হল। ১৮২৫ সনের এপ্রিলে কলকাতার পথে স্লীম্যান অস্ট্রেলিয়া যাত্রা করলেন। সেখান থেকে তাহিতি দ্বীপে। কর্মজীবনে ভারতের বাইরে এই তার একমাত্র দুটি উদযাপন। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দেশে যেতে পারেননি, কারণ দক্ষিণ সাগরই ছিল চিকিৎসকদের নির্দেশ !

পরের বছর সেপ্টেম্বরে আবার কলকাতায় নামলেন ঠগী। সঙ্গে তাঁর ঠগী দমনের নতুন কোন হাতিয়ার নয়, রাশি রাশি আখের বীজ। সুদূর তাহিতি থেকে দক্ষিণ ভারতের রায়তদের জন্যে তিনি তা বহন করে এনেছেন। দেখতে দেখতে সগরের মাঠে মাঠে ভারতের হাওয়ায় সে আখ মাথা চাড়া দিয়ে খাড়া হয়ে দাড়াল। চলতে চলতে সে মাঠ সামনে পড়লেই আনন্দিত ‘ঠগী’ ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেন। দীর্ঘ আখ মাথা আন্দোলিত করে,—স্মিতহাস ঠগী’ আবার নিজের পথ ধরেন। কোনটা তার পথ—ভারতের কৃষক অথবা ঠগীর দল, এ নিয়ে মাঝে মাঝে তাঁর মনে সংশয় দেখা দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিবারই একই সিদ্ধান্ত নেন স্লীম্যান,—সামনে তাঁর পথ একটিই। আপাতত যাকে দুই বলে মনে হচ্ছে আসলে তা একই পথ ; পাপ-পুণ্য, ভাল-মন্দ মিলিয়েই তাঁর এই ভালবাসার দেশ ভারত। তার আলোতে যদি তাঁর কোন অধিকার থেকে থাকে, তবে অন্ধকারও তাঁর দায়।।

পরের বছর তাহিতির আখ বাতিল হয়ে গেল। মরিসাস থেকে নতুন বীজ আসছে। তার আগে সে খবর জানাতেই যেন সুদূর মরিসাস থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে ঠগী’র সামনে এসে দাড়িয়েছেন আরও মিষ্টি, আরও তন্বী-এমেলি। এমেলি জোসেফিন। (Amelie Josephine)।

খানদানী ফরাসী তরুণী। বাবা কাউন্ট ব্লদেন ফঁতেন ( Count Bluden de Fontenne de Chaplin ) তত্কালীন ফ্রান্সের অভিজাত পুরুষ ছিলেন। ফরাসী বিপ্লবের সম্ভাবনা নজরে পড়া মাত্র তিনি বিষয়-আশয় সব বিক্রি করে দিয়ে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ফরাসীদের দ্বীপ-মরিসাসে। সেখানেই তার এই কন্যার জন্ম। কাউন্টের একটি পুত্রসন্তানও ছিল। তাঁর বাসনা ছেলেটিকে তিনি অন্য কোথাও প্রতিষ্ঠিত করেন। জব্বলপুরে তাঁর এক দূরসম্পৰ্কীয় আত্মীয় ছিলেন। তিনি জানালেন—সে দেশ ভারতবর্ষ। এখানে অনেক জমি, অফুরন্ত সুযোগ। মেয়ে এমেলি এসেছিলেন তাঁরই খবরাখবর করতে।

উনিশ বছরের সুন্দরী ফরাসী তরুণী। বেশভূষা চালচলনে স্থানীয় ইংরেজ ললনাদের সঙ্গে কোন মিল নেই তাঁর। এমেলির পায়ের ছন্দে, কথা বলার ভঙ্গীতে, চোখের নড়াচড়ায়-সর্বত্র আভিজাত্যের স্বাক্ষর। চল্লিশ বছরের অভিজাত পলিটিক্যাল অফিসার স্লীম্যান মেয়েটির নজর এড়াতে পারলেন না। সেটা কার্যত সম্ভবও ছিল না। কেননা, তাহিতি থেকে ফেরার পরে নতুন করে পদোন্নতি হয়েছে তাঁর। স্লীম্যান তখন নর্মদা উপত্যকায় একটা পুরো ডিভিশনের কর্তা–কমিশনার। পদটা অবশ্য অস্থায়ী, তবে যতদিন যোগ্য আকারের কোন জেলা ফাঁকা না পাওয়া যাচ্ছে ততদিন ক্যাপ্টেন স্লীম্যান এই পদেই বহাল থাকছেন। তাছাড়া ঠগীর কারণে স্লীম্যান তখন ভারতে অন্যতম বিখ্যাত রাজপুরুষ। কোম্পানি অবশ্য তখনও বিষয়টিকে সরকারীভাবে তেমন গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেননি। কিন্তু সমগ্র ভারতে স্লীম্যান এবং তাঁর অনুচরের তখন এক চাঞ্চল্যকর সংবাদ । প্রতিদিন তারা নতুন নতুন দলের সন্ধান বের করছেন। জব্বলপুরের কয়েদখানায় প্রতিদিন ঠগীদের ভীড় বেড়েই চলেছে। সুতরাং, এহেন স্লীম্যান কে অবহেলা করে পাশ কাটিয়ে চলে যান এমেলির সেই সাধ্য কোথায় ?

আলাপ হয়েছিল আখকে কেন্দ্র করেই। এমেলি বললেনমরিসাসের মেয়ে আমি, তাহিতির আখ দেখে মোটেই বিস্মিত হইনি ; বিস্মিত হচ্ছি আপনার ফরাসী শুনে।

এমেলি কথা শুরু করেছিলেন ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে। স্লীম্যান জবাব দিচ্ছিলেন—অনর্গল ফরাসীতে। অনেকদিন চর্চা নেই। কিন্তু কর্ণওয়ালের সেই বিদ্যা এখনও তিনি হারাননি। গ্রীক, লাতিন, ফরাসী—তত্‍কালের সংস্কৃতিবান যে কোন ইংরেজের মত এই তিনটে ভাষা রপ্ত ছিল তাঁর। বরং তার চেয়ে কিছু বেশীদূরই এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এই তিন সাহিত্যকেও দখলে এনেছিলেন। কারণ, গণিত আর সাহিত্য এই দুটি বিদ্যা স্লীম্যানের ছোটবেলার নেশা। ভারতে অফুরন্ত কাজের মধ্যেও দৌলতাও সিন্ধিয়ার উত্তরাধিকার নিয়ে (১৮২৭) তাঁর বিধবা বিজাবাঈয়ের কীর্তিকাহিনীর যে বিবরণ তিনি লিখে রেখে গেছেন। নিঃসন্দেহে তার সেই ছোট্ট বইটি (স্টোরি অব বিজাবাঈ, ১৮২৭) এক অনুপম সাহিত্য। তাছাড়া তাঁর ‘রেম্বলস এণ্ড বিকালেকসান অব এন ইণ্ডিয়ান অফিসিয়াল’, ‘এ জার্নি থ, দি কিংডম্ অব আউধ (১৮৪৯-৫০), দি স্পিরিট অব মিলিটারী ডিসিপ্লিন ইন দি ইণ্ডিয়ান আর্মি’, ‘এনালাইসিস এণ্ড রিভিউ অব দি পিকিউলিয়ার ডক্টরিনস অব দি রিকার্ডো অথবা, ‘নিউ স্কুল অব পলিটিক্যাল ইকনমি কিংবা ঠগীদের সম্পর্কে লেখা তাঁর অগুণতি রচনার যে কোন একটি টুকরো হাতে তুলে নিলে দেখা যাবে, শুধু একটি বিশ্লেষণধর্মী তীক্ষ্ণ মন নয়, সমর্থ একটি কলমও ছিল তার হাতে। দু’দিন কথা বলেই এমেলি তাঁর যাদুতে পড়ে গেলেন। বয়সের ব্যবধান ঘুচে গেল। ১৯২৮ সনের ১৪ই জুন চল্লিশ বছরের পলিটিক্যাল অফিসারের হাত ধরে জব্বলপুর চার্চ থেকে বেরিয়ে এলেন উনিশ বছরের তরুণী। হাসতে হাসতে তিনি তার বাংলোয় গিয়ে উঠলেন।

তারপর আর একদিনের জন্যেও ঠগীর সঙ্গ ছাড়তে পারেননি। যেখানে স্লীম্যান সেখানেই এমেলি। কখনও অচেনা দেশের পথের ধারে তাঁবুতে, কখনও শত শত মাইল অতিক্রম করে সুদূর নৈনিতালের পাহাড়ে, কখনও অযযাধ্যার গায়ে গায়ে, মাঠে মাঠে, কখনও বা ঠগী দলের মধ্যে। তারপরও স্লীম্যান দীর্ঘ আটাশ বছর ছিলেন এদেশে। এমেলি তার সেই জীবনে প্রতিদিনের সঙ্গী। স্বামীকে তিনি ক্যাপ্টেন থেকে মেজর জেনারেল হতে দেখেছেন, মেজর জেনারেল স্লীম্যানকে ‘স্যার’ হতে শুনেছেন। জেলাশাসক থেকে ঠগী দমনের একচ্ছত্র অধিনায়ক, কমিশনার থেকে অযযাধ্যার রেসিডেন্সের দায়িত্বশীল পদ স্লীম্যানের কর্মজীবনের আনন্দিত সাক্ষী, -সহচর ; এদেশের মাটিতেই তাঁর দু’টি পুত্র, পাঁচটি কন্যা ভূমিষ্ঠ হয়েছে। একটি পুত্র প্রাণত্যাগ করেছে—এদেশই নির্বাসিত কাউন্ট-দুহিতার জীবনকে নামহীন, পরিচয়হীন ভবিষ্যতের বদলে মিসেস স্লীম্যানের গৌরবে ভূষিত করেছে। ১৮৫৬ সনের ২৪শে জানুয়ারী দীর্ঘ প্রবাস শেষে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে যেদিন তিনি কলকাতা থেকে ‘মনার্কে’র ডেকে পা দিয়েছেন সেদিন তিনি আর জব্বলপুরের সেই চপলা তরুণী নন। ব্যারাকপুর-পার্ক থেকে বিদায়ী অফিসার, কোম্পানির গৌরব ক্লীম্যানকে অভিনন্দন জানিয়ে গভর্ণর-জেনারেল ডালহৌসি স্বয়ং জরুরী চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, মহারানীর আদেশ অনুযায়ী ভারত থেকে রাজকীয় সম্মানের জন্যে যে একটিমাত্র নাম তিনি স্বদেশে পাঠিয়েছেন সেটি মেজর জেনারেল উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যানের। মিসেস স্লীম্যান অপেক্ষায় আছেন—যে কোন মুহূর্তে স্বামী তার স্যার’ হবেন।

হয়েছিলেন। কিন্তু এমেলির দুর্ভাগ্য, স্বামী তার সে খবরটি দেখে যেতে পারেননি। মাত্র কয়দিন পরে ফেব্রুয়ারীর ১০ তারিখে ‘মনার্ক’এর লগ বইতে চোখের জলে কলম ভিজিয়ে ক্যাপ্টেন লিখেছিলেন—আবহাওয়া : ‘লাইট এণ্ড ফাইন’। সময় : রাত্রি ৩টা ৪৫ মিঃ। মেঃ জেঃ উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যান মরদেহ ত্যাগ করলেন। অক্ষাংশ-২২২ ( সাউথ ), দ্রাঘিমা-৮২.৫১ (ইষ্ট)•••সিংহলের অদূরে ভারত মহাসাগরের সীমানা ছাড়াবার আগেই প্রাণত্যাগ করলেন স্লীম্যান। তরঙ্গায়িত সমুদ্রেই সমাহিত করা হল তাকে। দু’দিন পরে সাগর থেকেই ইংল্যান্ড পৌছাল এমেলির বিলাপ: ইট ইজ উইথ সাচ এ ব্রোকেন হার্ট দ্যাট আই টেক আপ মাই পেন টু রাইট টু ইউ, এণ্ড টু টেল ইট দ্যাট ইট হজ প্লীজ গড় টু ড্রিপাইভ মি অব মাই এভার লেমেনটেড এণ্ড ডিয়ারেস্ট হাসবে।•••’ সে চিঠির ঠিকানা—‘টুয়েনটি মাইলস টু দি স্টার্ট।

ক’দিন পরে জাহাজে থাকতে থাকতেই মিসেস স্লীম্যানের হাতে পৌছাল সরকারী বিজ্ঞপ্তি (২০শে মার্চ, ১৮৫৬) : মহামান্য ইংলণ্ডেশ্বরী বেঙ্গল আর্মির গৌরব মেজর জেনারেল উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যানকে ‘স্যর’ খেতাবে ভূষিত করেছেন। পাশেই পরে রয়েছে ৩রা জুন তারিখের ‘ইণ্ডিয়ান মেল’-এর একখানা কপি, তাতে বিগত জেনারেলের দীর্ঘ প্রশংসার ফাঁকে বাঁকা হরফে ছাপা একটি শব্দ—‘ঠগী’! এমেলি ভেবে পাচ্ছেন না কোন্ সম্মানটা বড়–‘স্যার’ অথবা এই ঠগী’ । তিনি যে সেদিনের স্লীম্যানকেও দেখেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *