পর্ব ৬
দিনের পর দিন ওরা হাঁটছে। মাসের পর মাস।।
হাঁটতে হাঁটতে ছোট ঘোট দলে ভেঙ্গে পড়ছে। একদল চলে যাচ্ছে ডাইনে, একদল বাঁয়ে। কেউ পূবে, কেউ পশ্চিমে। কেউ ঘোড়ার পিঠে, কেউ পায়ে পায়ে। টুকরো টুকরো এক-একটি দল যেন এক-একটি মাকড়সা। আপন মনে জাল বুনে চলেছে। সে জালের কোন সুতোয় একটি মাছি পড়লেও গোটা জাল আন্দোলিত হয়ে উঠবে।
অব্শ্য শিকারের সময়ও কিছু কিছু নিয়ম মেনে চলতে হত ওদের। ঠগীরা খুনী হলেও তারা বিশ্বাসহীন ‘ম্যাকফানসা’ নয়। তাদের রীতিনীতি সুসংগঠিত যে কোন ধর্ম-সম্প্রদায়ের মতই সুনির্দিষ্ট। নিষ্ঠুরুতম খুনীরও তা অমান্য করার কোন অধিকার নেই।
ওদের সুবর্ণযুগে নিয়ম ছিল, নর্মদার উত্তর থেকে পশ্চিমে সিন্ধু এবং উত্তরে যমুনার মধ্যবর্তী যে বিশাল হিন্দুস্তান, সেখানে নিজ থেকে জালে এসে ধরা দিলেও কায়স্থ, ফকির, কামার, কুমোর, ছুতোর মিস্ত্রী, গানের ওস্তাদ, নাচের মাস্টার বা গৃহপালিত গরু-মোষ নিয়ে রাস্তা হাঁটছে এমন কোন পথিককে হত্যা করা চলবে না। তার চেয়েও আদিতে জরুরী নির্দেশ ছিল স্ত্রীলোক অবধ্য।
কিন্তু পরবর্তীকালে ঠগীরা এত সব মানত না। বিশেষ করে দক্ষিণী ঠগীরা। যুগের আবিলতা সেদিন তাদের পথের আচারেও। সরকারী হিসেব থেকে জানা যায়, ১৮২৬-২৭ সনে মালবে এবং রাজপুতানায় ওদের হাতে মোট দু’শ এগার জন প্রাণ দেন। তাদের মধ্যে ছ’জন ছিলেন নারী। পরের বছর বেরার, খাদেশ এবং গুজরাটে মারা গিয়েছিলেন তিন শ একাশি জন; তাদের মধ্যে নারী ছিলেন একুশ জন। তার পরের বছর (১৮২৮-২৯) মালবে এবং খান্দেশে আবার প্রাণ দিয়েছিলেন দু’শ বত্রিশ জন ; তাদের দলেও ছ’জন ছিলেন নারী। তার পরের বছরগুলোতেও গোয়ালিয়রে, বুন্দেলখণ্ডে, বরোদায় এবং গুজরাটে নিহতদের তালিকায় নারীর সংখ্যা ছিল যথেষ্ট।
হিসেবটা সামনে রেখেই জিজ্ঞেস করা হয়েছিল বিখ্যাত ঠগ দলপতি ফিরিঙ্গীয়াকে।তবে না তোমরা হিন্দুস্তানী ঠগীরা জেনানাদের ওপর হাত তোল না!
-আজ্ঞে, সেই তত আমাদের কাল হল। ফিরিঙ্গীয়া লজ্জায় ঘাড় হেঁট করেছিল,-কালীবিবিকে ফাঁস দিলাম তো আমাদের দিন ফুরোতে শুরু করল।
-কে সেই কালীবিবি ?
-সাহেব, কালীবিবি ছিলেন হায়দ্রাবাদের এক খানদানী ঘরের জেনানা। দেখতেও নাকি খুবই খুবসুরত ছিলেন তিনি। একটা জড়ির চাদর সঙ্গে নিয়ে এলিকপুর থেকে হায়দ্রাবাদে যাচ্ছিলেন তিনি। যাওয়ার কথা ছিল তাঁর নবাব দৌলা খাঁয়ের বাড়ি। দৌলা খা হায়দ্রাবাদের সালবৎ খাঁর ভাই। বিবির সঙ্গে তাঁর কি সম্পর্ক ছিল তিনিই জানতেন। মাত্র দু’দিন আগে তিনি মারা গিয়েছেন। খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বিবি ছুটলেন তাঁর কুঠির দিকে। মনে ইচ্ছে ছিল, আপন মানুষের কবরে নিজের এই চাদরখানা দিয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসবেন। কিন্তু তা আর হল না। সমসের খাঁ আর গোলাপ খাঁ চাদরের লোভে পথে খুন করে বসল ওঁকে।
–তাতে কি তক্ষুনি কিছু অমঙ্গল হল ?
–না সাহেব। পাঁচ বছর কিছু হল না। আমরা ভাবলাম, বোধহয় এখন এইটেই নিয়ম হয়েছে। কালে কালে সব আইনই তো কিছু কিছু বদলায়। আমরাও তাই নেমে পড়লাম, আর সেই হল, সাহেব, আমাদের কাল।
সাহেব ধমকে উঠলেন, তোমরা তো আরও নীচ। দক্ষিণীরা নারী হত্যা করে, কিন্তু তোমরা তে শুনেছি সুন্দরী মেয়েদের পর্যন্ত খাতির কর না।
–আলবৎ না! আপত্তি জানাল ফিরিঙ্গীয়া সাহেব, তুমি ভাবতেও পারবে না। আমন সর্দার আর আমি কি গোলাপ হাতে পেয়েও ছেড়ে দিয়েছি। তিনিও ছিলেন খানদানী জেনানা, পেশোয়া বাজীরাওয়ের খাস বাগিচার ফুল । সে আজ প্রায় তের বছর আগেকার কথা। ফিরিঙ্গীয়া বলে চলেছে, আমরা দেড়শ’ ঠগের একটি দল রাজপুতানার মধ্য দিয়ে চলেছি। চলতে চলতে হঠাৎ সামনে এক ঝালরওয়ালা পাল্কী। সঙ্গে জনাকয় দাসদাসী। দেখে আমাদের আনন্দ আর ধরে না। পোড়া দেশে তাহলে মেঘও আছে।
মেঘ নয় সাহেব, সে তোমায় কি বলব!—ফিরিঙ্গীয়ার চোখগুলো বলতে বলতে জ্বলে উঠেছিল,-ঝালর যখন উঠল তখন দেখা গেল মখমলের আড়ালে লুকিয়ে আছে আগুন! সে আগুনে চোখ পড়লে যে কোন মরদ ছাই হয়ে যায় ! আমন আর আমি এগিয়ে গিয়ে সালাম জানালাম। বিবি হাসলেন। সে হাসিতে যেন গুড় মাখান। ধীরে ধীরে আলাপও হল। তিনি পুনা থাকেন। এই পথে কানপুর চলেছেন। সেখানে মাস কয় থেকে আবার পেশোয়ার দরবারে ফিরে আসবেন। আমরা মনে মনে হিসেব করে দেখলাম, গায়ে তাঁর যা জেওরপাতি রয়েছে তার দাম হবে কমপক্ষে লাখ টাকা। সঙ্গের মালপত্র যা আছে তাতে পাওয়া যাবে আরও আধ লাখ টাকা। কিন্তু সাহেব, শুনলে অবাক হয়ে যাবে, তবুও এই ফিরিঙ্গীয়ার গলায় কিছুতেই ঝিরণী উঠল না।
পুরো তিন দিন তিন রাত্তির আমাদের হাতের মুঠোয় ছিল ওঁর পাল্কী। আমন বলেছে, আর দেরী করে লাভ কি? আমি উত্তর দিয়েছি, সবুর, আর একটা দিন। তিন দিন পরে আমনকে আর ফঁাকি দেওয়া গেল না। সে জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার বল দেখি । আমি বললাম, সাচ, বলব ? এই জেনানাটিকে আমি দিল দিয়ে ফেলেছি। আমন বলল, আমিও-বিশ্বাস করবে না সাহেব, সেদিনই আমরা পথ বদল করেছিলাম। দেড়লাখ টাকার জিনিষ হাতে পেয়েও অন্য পথে পা বাড়িয়েছিলাম।’ কেন জান? শুধু দু’টি চোখের জন্যে। এমন মিষ্টি মুখ জীবনে আর কখনও চোখে দেখিনি। এমন মিঠে বুলিও আর কখনও শুনিনি।
সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন ফিরিঙ্গীয়ার মুখের দিকে। শত শত খুনের ইতিহাস যার হাতে তার বুকের আড়ালে তা হলে এমন মনও থাকতে পারে? থাকে? তিনি আবার প্রশ্ন তুললেন, মোগলানীকেও তত তুমি ভালবেসেছিলে, কিন্তু কই, তাকে তোত তুমি ছেড়ে দাওনি !
—সে তুমি বুঝবে না সাহেব, মোগলানী যে মরল সে তার নসিব। আমারও। তাছাড়া, আমি ওকে মারিনি। মেরেছে মুসলমানেরা। এই মাদার বক্স আর তার দলের লোকেরা। আমি সঙ্গে ছিলাম মাত্র।
—সে কথা কি ঠিক?
-হ্যা,,হুজুর। উত্তর দিল আর একজন ঠগী। তার নাম দুর্গা। সে বলল, আগের ঘটনা আমার জানা নেই হুজুর, তবে লালসোন্তে যা হয়েছে সবই আমার চোখের সামনে। ফিরিঙ্গীয়া নীরব। তার সামনে দাড়িয়ে দুর্গা বলে চলল:
আমরা লালসোন্ত এসে দেখি ফিরিঙ্গীয়া সেখানে সদলবলে হাজির। সঙ্গে তার এক পরমাসুন্দরী কন্যা। ফিরিঙ্গীয়া বলল, মোগলানী। দেখেই বোঝা যায় বড় ঘরের মেয়ে। নিজে চলেছে পাল্কীতে। সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে আর এক জেনানা। তার পার্শ্বচারিকা। সে অবশ্য তরুণী নয়, বুড়ি। কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, পথে সে এই প্রথম নয়। মোগলানীকে নিয়ে মাঝে মাঝেই তাকে এমনি ঘর ছেড়ে বের হতে হয়। মনিব তার রাজধানীতে রাজধানীতেই ঘুরে বেড়ায়। এই বুড়ি ছাড়াও বিলাসিনীর সঙ্গে ছিল ছ’জন পাল্কী বেহারা আর একজন ভৃত্য। ফিরিঙ্গীয়াকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, দিন ঠিক হয়েছে? ফিরিঙ্গীয়া উত্তর দিল, না, বোধহয় দরকার হবে না।
লালসোন্ত থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সোন্ত পর্যন্ত এগিয়ে গেলাম। কিন্তু তখনও ফিরিঙ্গীয়ার সেই এক কথা, না, বোধহয় দরকার হবে না। আমিও একই কথা বললাম। মেয়েটির বয়স কম। তাছাড়া, সঙ্গে রূপ ছাড়া আর বিশেষ কিছু আছে বলে মনে হয় না। এত বড় দল, জনপ্রতি দুটো টাকাও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ! ওকে ছেড়ে দেওয়াই ভাল। কিন্তু ফিরিঙ্গীয়ার মাথায় কি খেলল সে-ই জানে। পরের দিন সন্ধ্যায় দক্ষিণীদের দেখা মাত্র সে ‘বিয়াল’ পছন্দ করতে লোক পাঠিয়ে দিল। হুকুম পেয়ে আমাদেরও তৈরী হতে হল। আমরা ভোর হওয়ার আগেই ওদের নিয়ে সেদিকে যাত্রা করলাম। কিন্তু অন্ধকারে ঠাওর করতে পারলাম না ‘বিয়াল যাওয়ার রাস্তা কোনদিকে, কোথায় ওরা জায়গা ঠিক করেছে। বাধ্য হয়েই মোগলানীর পাল্কী থামাতে হল। ওঁকে বললাম, মনে হচ্ছে, পথ ভুল করে ফেলেছি। আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমরা ততক্ষণে রাস্তাটা একবার দেখে নিই। তাই না শুনে মেয়েটি ভয় পেয়ে গেল। সে কঁদতে সুরু করল। রেগে গিয়ে গালাগালি করতে লাগল। কখনও বলছে, তোমরা ডাকাত, টাকার লোভে পথ ভুলিয়ে অসহায় মেয়েকে অন্ধকারে নিয়ে এসেছ। তোমরা আমাকে খুন করতে চাও। কখনও বলছে, তোমরা নরপশু, একাকী পেয়ে সুন্দরী নারীর ধর্মহরণ করতে চাও। সে কি কান্না! আমি ফিরিঙ্গীয়াকে গিয়ে বললাম, ভাই এই ব্যাপার, তোমার একবার ঐ পাল্কীর কাছে যাওয়া দরকার। মেয়েটি ভয় পেয়ে গেছে, কিছুতেই তাকে প্রবোধ দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু ফিরিঙ্গীয়া যেন পাথর। কিছুতেই তাকে নড়ান গেল
। সেখানে বসে থেকেই সে হুকুম দিল, তাহলে এখানেই ‘ঝিরণী দিয়ে দাও। আমরা তাই করলাম। পুরো দলটিকে সেখানেই মাটি দিয়ে দিলাম ।
—কত পেয়েছিলে? -জিনিষপত্র সব মিলিয়ে শ’ ছয়েক টাকা।
—তার জন্যে এমন একটি অসহায় রূপসীর প্রাণ হরণ করলে তোমরা।
দুর্গা জবাব দিল, সে দোষ আমাদের নয় সাহেব, তার জন্যে পুরোপুরি দায়ী ফিরিঙ্গীয়া।
—কেন তুমি এমন কাজ করলে ? নীরব ফিরিঙ্গীয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন সাহেব।
আগেই বলেছি সাহেব, সে আমার কপাল। ধীরে ধীরে জবাব দিল ফিরিঙ্গীয়া।-মোগলানী যে মরল সে তারও কপালের লিখন।
-কেমন ?
-বার বার আমি ওঁকে বলেছি, আপনি আমাদের সঙ্গে আসবেন বিবিসাব। আপনি আপনার নিজের পথে চলে যান। মুসলমানরা তো এল সোন্তে। তার বহু আগে লালসেন্তে এসেই আমি ওঁকে বলেছিলাম, এবার আমার অন্য পথে যেতে হবে। সেখানে আমার বন্ধুরা অপেক্ষা করে থাকবে। কি উত্তর দিয়েছিল জেনানাটি জান সাহেব? বলেছিল, বন্ধু ? আমি কি তোমার কেউ নয়। কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল মেয়েটি আমাকে ভালবেসে ফেলেছে। ডেকে ডেকে কথা বলত আমার সঙ্গে। বলত, তোমার যত সব বাজে লোকের সঙ্গে সঙ্গ। তুমি আমার পাল্কীর সঙ্গে সঙ্গে চল। কখনও ডেকে নিয়ে খেতে দিত আমাকে। কখনও পাল্কীর সামনে বসিয়ে বলত, গল্প বল। বুড়ি মাঝে মাঝে আপত্তি তুলত। বলত, হাজার হোক, পথের মানুষ। এতটা মাখামাখি ভাল নয়। মোগলানী বলত, গোটা দুনিয়াই তো সড়ক। কে এখানে চিরকাল থাকতে এসেছে? বুড়ি কি বলেছে, সে কি উত্তর দিয়েছে, মোগলানী সবই আমাকে বলত। বলে খিল খিল করে হাসত। আমার ভয় হত। এক এক সময় মনে হত, আমিও বোধহয় ভালবেসে ফেলেছি ওঁকে। এখনও সময় আছে, আমার সাবধান হওয়া দরকার। লালসোন্তে এসে তাই আমি বললাম, বিবিসাহেবা, বিদায়। এই বান্দাকে এ কয়দিনে যা আপনি দিয়েছেন এক জনমের পক্ষে তা যথেষ্ট। আজ আমাকে ছাড়তে হবে। বেঁচে থাকলে নিশ্চয় আমাদের আবার দেখা হবে। শুনে প্রথমে তিনি চুপ করে রইলেন। আমি দেখলাম তার দীঘির মত চোখ দু’টি জলে টলটল করছে। তিনি বললেন, তা অসম্ভব। তোমাকে আমার সঙ্গে আগ্রা অবধি যেতেই হবে। যদি না যাও তবে আমি ঝহ্মাট বাঁধাব।
-আগ্রা ?
-হ্যাঁ হুজুর। সেখানেই নাকি তার ঘর। তিনি বললেন, দলবল সঙ্গী-সাথী বিদায় দাও। আমার সঙ্গে ঘরে চল। সেখানে আমরা সুখে থাকব। তোমারও কষ্ট হবে না। আমি বললাম, কিন্তু আমাকে যে ওদের সঙ্গে যেতেই হবে। আমি তোমাকে যেতে দেব না। বলতে বলতে পাল্কী থেকে নেমে এসেছিলেন মোগলানী। নেমে আমার হাতটা চেপে ধরেছিলেন। আমি সামলে নিয়ে বলেছিলাম, আচ্ছা, সে দেখা যাবে। সে রাত্তিরেই হুজুর, দুর্গাকে আমি বলেছিলাম ‘ঝিরণী দিতে। আমি ভেবে দেখেছিলাম, তাছাড়া উপায় নেই। যেভাবে দু’জনই আমরা এগিয়ে চলেছি তাতে আমিও হয়ত শেষ পর্যন্ত আগ্রা অবধি না গিয়ে আর পারব না।
—না হয় তাই যেতে! মন্তব্য করেছিলেন সাহেব।
—কিন্তু সে কি করে হয় ? ফিরিঙ্গীয়া জাবাব দিল, মোগলানী মুসলমান, আমি হিন্দু ব্রাহ্মণ। ওঁর সঙ্গে আমি ঘর করি কি করে ? শুধু দিল নয়, ধর্ম বলেও তো একটা কথা আছে। চারদিক ভেবে তাই বললাম, দিয়ে দাও ‘ঝিরণী। ভগবান যদি করেন তো একদিন নিশ্চয় ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হবে। ভালোবাসা খাঁটি হলে মরণের পরেও তো হয়।
এ কাহিনী ব্যতিক্রম। কারণ, নায়ক ফিরিঙ্গীয়া এক বিচিত্র ব্যক্তিত্ব। অন্যদের সঙ্গে এসব রোমান্টিকতার কোন সম্পর্ক নেই। তারা খুন করতে বের হয়েছে, সুযোগ পেলেই খুন করবে। হোক না সে সুন্দরী অথবা রূপহীন ; ধনী অথবা গরীব! একমাত্র বিবেচ্য দেবীর মত আছে কি নেই। কাক ডাকছে অথবা ডাকছে না। টিকটিকি ‘টিক’‘টিক’ করল কি করল না।
-ধর, এমন একজন লোককে তোমরা হাতে পেয়েছ যাকে দেখলেই বোঝা যায়, সঙ্গে তার কিছুই নেই। অথচ চারদিকে লক্ষণ সব খুনের অনুকূল। সেক্ষেত্রে তোমরা কি করবে? জিজ্ঞেস করেছিলেন স্লীম্যান,লোকটিকে তোমরা ছেড়ে দেবে?
-ছেড়ে দেব? কভি নেহি! কভি নেহি! মাথা নেড়ে উত্তর দিয়েছিল দুর্গা। অন্য আর একটি দলের দলপতি নাসির সায় দিয়েছিল তার সঙ্গে,ছেড়ে দেব কি করে সাহেব ? সুলক্ষণ মানেই ঠগীর কাছে দেবীর আদেশ। লক্ষণ ঠিক আছে মানে খুন হতেই তিনি ওদের আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। এমতাবস্থায় তাদের ছেড়ে দেওয়ার অর্থ দেবীকে অমান্য করা। তাহলে কি তিনি আর কখনও আমাদের হাতে মানুষ তুলে দেবেন ?
ফিরিঙ্গীয়া আপত্তি জানাল। সে বলল, নাসির ঠিক বলেনি হুজুর। আমি অনেক সময় নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি, গরীব পথিকদের ছেড়ে দিলে, পরে আরও ভাল ফল পাওয়া যায়। একই লক্ষণ তখন আঙ্গুল দিয়ে ভাল শিকার দেখিয়ে দেয়।
এনায়েত বলল, হক কথা। দেবী যা বলে পাঠিয়েছেন তা তো আর মিথ্যে হতে পারে না। তার আদেশের গুণাগুণ থেকেই যাবে, তার কম-বেশী হওয়ার উপায় নেই, তা আমরা তক্ষুনি মানি আর নাই মানি। তবে আমারও মনে হয় গরীবদের ছেড়ে দিলে আখেরে ঠগীর সুবিধেই হয়।
সাহেব খাঁ আর এক দলপতি। সে বলে উঠল, কক্ষনো না। এসব তোমরা হিন্দুস্তানী ঠগেদের বাত কি বাত। সাচ্চা ঠগের কানুনে বলে, পয়সা আছে কিনা বিচার করে কাউকে ছেড়ে দেওয়ার অর্থ দেবীকে অমান্য করা। তাতে পুরো যাত্রাটাই বিফল হতে বাধ্য। তোমরা যদি তারপর অনেক টাকাও পাও, তাহলে দেখবে শেষ পর্যন্ত সে টাকাও ভোগে লাগছে না। দেবীকে অমান্য করলে তার ফল তোমাদের পক্ষে কিছুতেই ভাল হতে পারে না।
—আমারও সেই কথা, সাহেব খাকে সমর্থন জানাতে এগিয়ে এল মুরলী; হাতে অচেনা মানুষ রয়েছে, সামনে শুভ লক্ষণ, এমতাবস্থায় কেউ কি কখনও কোন যাত্রীকে ছেড়ে দিতে পারে ? তাহলে, আমি হলপ করে বলতে পারি, সে দলের অমঙ্গল হতে বাধ্য। শুভলক্ষণ মানেই, কে না জানে, তা দেবীর হুকুম। ঠগী যদি হও তবে তা তামিল করতেই হবে।
সমর্থন পেয়ে এবার আরও প্রবল হয়ে উঠল নাসির।আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি তোমরা এই উদ্ভট যুক্তি কোথায় পেলে ? দেবীকে অমান্য করবে, অথচ ফের দেবীর কাছ থেকে আরও ভাল ফল পাবে, তা কি কখনও হয়? আমরা দক্ষিণীরা তা কখনও ভাবতেও পারি । আমাদের বাপ ঠাকুরদারা কখনও এমন আহাম্মক ছিল না।
দপ করে জ্বলে উঠা ফিরিঙ্গীয়া, তাহলে তোমরা বলতে চাও, যা বোঝ সব তোমরা তেলিঙ্গনাওয়ালারা ! আমাদের মুরনাঈ আর সিলৌসির ঠগীদের বাপ-দাদারা কিছুই শেখায়নি!
না না, ঠিক সে কথা নয়,–এক সঙ্গে জবাব দিল নাসির আর সাহেব খাঁ,-আমরা শুধু বলতে চাই তোমরা বিচারে ভুল করছ। আমরা দক্ষিণীরা অন্তত মনে করি, দেবী আমাদের সামনে পথে যা। দিলেন সবই গ্রহণ করার জন্যে ; আমরা তা গ্রহণ করতে বাধ্য।
সুতরাং কেউ কেউ দৈবাৎ কখনও কোন ফিরিঙ্গীয় অথবা এনায়েতের হাতে পড়লে ছাড়া পেত বটে, কিন্তু লক্ষণ যেখানে অনুকুল সেখানে অন্যদের একমাত্র ভবিষ্যৎ ছিল মৃত্যু। তা সে দলে যত মানুষই থাক কিংবা সময় যতই লাগুক।
যদি দেখা যায় পথচারীরা দলে বেশী ভারী তবে বিচক্ষণ দলপতি সেই মাকড়সার জালটিতে হাত রাখবে, নিঃশব্দে একটি সুতো ধরে টানবে। রাত ভোর হতে না হতেই দেখা যাবে নতুন পথের বাঁকে আপন মনে চলেছে আরও একদল পথিক। ক্রমে তাদের সঙ্গে আলাপ হবে, দল আরও বড় হবে। দু’দিন পরে দেখা যাবে বাঁয়ের পথ ধরে আসছে আরও একদল আগন্তুক। দল এবার আরও বড় হল। তিন দিন পরে হয়ত আরও বড় হবে। তখন কোন এক রাতে নিঝুম পৃথিবী কাঁপিয়ে ‘ঝিরণী’ উঠবে,—সাহেব খান, তামাকু লেও!
তাও হত। সেবার একত্রিশ জন পুরুষ, সাতজন মহিলা এবং দু’টি মেয়েকে খুন করতে ওরা এক সঙ্গে মিলে ছিল তিনশ ষাট জন ঠগ। অবশ্য মিলেও ছিল একেবারে কম নয়, প্রায় সাতাশ হাজার টাকা! ওরা সে ঘটনার নাম দিয়েছিল—“চালিশরুয়া’, অর্থাৎ, চল্লিশ মানুষ নিয়ে কারবার।
বন্দে আলি মুন্সী এবং তার পরিবার-পরিজনকে হত্যা প্রায় এই ধরনেরই একটি কারবার। দলে স্ত্রীলোক ছিল, শিশু ছিল। কিন্তু তবুও কাউকে ছাড়তে রাজী হয়নি ওরা। কারণ, লক্ষণ ভাল ছিল। দলের অন্যতম নায়ক ছত্তারের জবানবন্দী অনুযায়ী সে হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ :
মুন্সীর দলের সঙ্গে আমাদের দেখা নাগপুর আর জব্বলপুরের মাঝামাঝি চাপড়া নামে একটা জায়গায়। সেখান থেকে একসঙ্গে চলতে চলতে আমরা এসে হাজির হলাম লাকনাদৌনে। সেখানে গিয়ে শোনা গেল, পরদিন ভোরেই একদল হিন্দুস্তানী সেপাই ওখানে আসছে। তাদের নিয়ে আসছেন গোরা সাহেবরা। শুনে আমরা একটু ঘাবড়ে গেলাম। কারণ, ওরা এলে মুন্সী নিশ্চয় আর আমাদের দলের সঙ্গে থাকবেন না, ওদের সঙ্গেই চলতে চাইবেন। মানী লোক, তাছাড়া সাহেব-সুবাদের সঙ্গে চলে অভ্যেসও আছে। আমরা তক্ষুনি স্থির করে ফেললাম, আর দেরী নয়, আজ রাত্তিরেই যা হোক সব শেষ করে ফেলতে হবে।
ততক্ষণে সেপাইদের কিছু কিছু তঁাবু সেখানে পৌঁছে গেছে। পাশেই গা। আমরা মুন্সীকে নিয়ে গাঁয়ের দিক ঘেঁষে আছি। ওরা তাবু খাটাতে আরম্ভ করল আমাদের সামনের দিকে। অর্থাৎ আমাদের একদিকে গাঁ, অন্যদিকে সেপাইদের বু; মাঝখানে আমরা। তা হোক, এরই মধ্যে যে ভাবে পারা যায় কাজ সারতে হবে!
সন্ধ্যে হতে না হতেই নূর খান আর তার বেটা সাদি খান দলের ক’জনকে নিয়ে চলল মুন্সীর তাবুর দিকে। ওদের হাতে সেতার। ওরা ভাল সেতার বাজাতে পারত। তাছাড়া, এরই মধ্যে আমরা জেনে ফেলেছি, মুন্সীর জেনানা গানবাজনা খুব ভালবাসে!
ওরা গিয়ে গানবাজনা শুরু করল। আমরা গিয়ে মুন্সীকে ঘিরে বসলাম। মূলীর কোমরে একটা তলোয়ার ছিল। আমরা জিনিষটা একটু দেখব বলে কথায় কথায় তার কাছ থেকে সেটি চেয়ে নিলাম। মুন্সীর জেনানা এবং ছেলেমেয়েরা সবাই তখন তঁাবুর ভেতরে মশগুল হয়ে বসে সেতার শুনছে। হঠাৎ একজন ‘ঝিরণী’ দিয়ে উঠল। মুন্সী মুহূর্তে যেন আমাদের মতলব জেনে গেলেন। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন—খুন। তারপর আমাদের ঠেলে ফেলে দিয়ে তাঁবুর দিকে দে ছুট। কিন্তু আমরা দলে ভারী। এক পায়ের বেশী আর এগোেন হল না তার। আমরা তাকে ধরে ফেললাম। একজন তাঁর গলায় ফঁস পরিয়ে দিল। কিন্তু সেই ধস্তাধস্তির শব্দে তাঁর জেনানার গানের নেশা কেটে গেছে। তিনি কোলে একটা বাচ্চা নিয়েই ছুটে বেরিয়ে এলেন বাইরে। তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন—খুন! গুলাব খান এক ঝটকায় তার গলায় ফঁস পরিয়ে দিল। বাচ্চা মেয়েটা মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়েছিল। গুলাব তাকে কুড়িয়ে নিজের কোলে তুলে নিল।
মুন্সীর সইসেরা দিন শেষে ঘোড়ার দলাইমলাইয়ে ব্যস্ত ছিল। তারা ভয়ে ঘোড়ার পেটের তলায় পালিয়ে সেখান থেকে চেঁচাতে লাগল-খুন ! খুন! তাদেরও ধরে ফঁস পরিয়ে দেওয়া হল।
সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তোমরাই তো বললে, অদুরে খালাসীরা ফৌজের জন্যে তাবু খাটাচ্ছিল। তাদের চোখের সামনে এত বড় কাণ্ড হয়ে গেল, আর তারা কিছু টের পেল না?
কি করে পাবে? আমরা যখন ঝিরণী দিচ্ছি তখন দলের অন্যরা গলা ছেড়ে গান গাইছে। তাছাড়া দুটো ঘোড়াও তখন ইচ্ছে করেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ক’জন আবার চেঁচামেচি করতে করতে তাদের পিছু পিছু ছুটাছুটি করছিল। এই তালগোলে খুনের খবর অন্যরা পাবে কি করে ?
—মুন্সীর সেই কোলের মেয়েটিকে কি করলে?
ছত্তার জবাব দিল, গুলাব খানের ইচ্ছা ছিল সে মেয়েটিকে নিজের কাছে রাখে, প্রতিপালন করে। কিন্তু ধান্নি খান বলল, দেখ গুলাব, কাজটা কিন্তু ভাল হচ্ছে না। এমন ফুটফুটে মেয়ে সঙ্গে থাকলে নর্মদা এলাকা পার হতে গিয়ে নির্ঘাৎ ধরা পড়বে। গুলাব তাই শেষ পর্যন্ত মেয়েটাকেও কবরে দিয়ে দিলে।
-জ্যান্ত মেয়েটাকে? —আজ্ঞে হ্যা। -এভাবে মানুষ মারতে কষ্ট হয় না তোমাদের?
—আজ্ঞে না, ওদের তো মারবার জন্যেই দেবী আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। হুজুর, আমরা নিমিত্ত মাত্র। ওরা যদি না-ই মরবে তবে কেন তখন গাছের ডালে কাক ডাকে, একাকী শেয়াল ডাইনে থেকে বাঁয়ে পার হয়!
এই আশ্চর্য বিশ্বাসকেই ধর্ম জেনে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে খুনী দল। হাসছে, গান গাইছে, সেতার বাজাচ্ছে, শরতের নীল আকাশের নীচে উনুন জ্বালিয়ে পাশে বসে রুটি সেঁকছে, বিড় বিড় কথা বলছে।
ওরা যখন কথা বলে তখন সে সম্পূর্ণ এক নতুন ভাষা। তা হিন্দী নয়, উদ্ নয়, আরবী-ফাসী, তামিল-তেলেগু-কোন ভাষার সঙ্গে কোন মিল নেই তার। এমনকি ‘ম্যাকফানসা বা জলের ঠগী ‘ভাগিনাদের ভাষার সঙ্গেও না। ঠগীর ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা। সে বুলির নাম-রামসী (Ramasee )। তার শব্দভাণ্ডার এমন যে তা দিয়ে রীতিমত একখানা প্রমাণ আকারের অভিধান হয়ে যায়।
সাচ্চা ‘বোরা’ বা ‘আউলা যে, অর্থাৎ যে পাকা ঠগী সে মুখের বুলি শুনেই বলে দেবে সামনে যে দলটি আসছে তারা ঠগ, কিংবা ‘বিট্টো’ বা ‘কুজ’, অর্থাৎ ঠগ নয়। ঠগ হলে সম্বোধনেই চেনা যাবে। সাচ্চা ঠগী অপরিচিত ঠগী দেখলেই বলে উঠবে—“আউলে খান, সালাম। নয়ত—‘আউলে ভাই, রাম রাম ।
‘বোরা’দের ভাষায় তাদের বিচরণক্ষেত্রের নাম—বাগ’ বা ‘ফুল’, রুমালধারী খুনীর নাম—“ভুকোত’ বা ‘ভুতোত। যেখানে খুন করা হয় সে জায়গার নাম—‘বিয়াল’ বা ‘বিল। জালে পছন্দসই দুল এসে পড়ামাত্র একজন চলে যাবে ‘বিল’ পছন্দ করতে। যাওয়ার আগে দলপতি বলবে—“যা, কুত্তোরি মাঞ্জ লেও-বাসনটা পরিষ্কার করে নিয়ে এস। অর্থাৎ জায়গাটা ঠিক করে এস। নাম তার ‘বিলহো’ । তার রিপোর্ট পাওয়ার পর সেখানে ছুটবেলুগহা’, অর্থাৎ কবর খোঁড়ার লোক। কটা কবর লাগবে সে হিসেব সে জেনেই গেছে। দশ মাইল, চাই কি কুড়ি মাইল দূরে বসে নিঃশব্দে সে কবর খুড়ছে। কবর দু’রকমের হতে পারে । কুরওয়া বা চৌকো, গব্বা বা গোলাকার। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে তোক বেশী হলে মাঝখানে একটুকরো মাটি সাক্ষী রেখে গোলাকার কবরই যুৎসই, অনেকদিন টেকে।
ওদিকে যখন কবর তৈরী হচ্ছে ইতিমধ্যে এদিকে তখন শিকার আর শিকারীরা বন্ধু হয়ে গেছে। যদি দেখা যায় দলটি বেশ ‘চিসা, অর্থাৎ সম্পন্ন তবে তো আর কথাই নেই। ‘সোহা’রা তখুনি তাদের আশপাশে ঘোরাফেরা আরম্ভ করবে। তাদের কাজ দলটিকে নিজেদের বন্ধুত্বের পরিধিতে আনা। চান্দুরা”, অর্থাৎ দক্ষ ঠগীরা একাজে তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করবে। সোথার দায়িত্ব যেমন পথিকদের বিশ্বাস উৎপাদন, এদের দায়িত্ব তেমনি মনোরঞ্জন। যাত্রীরা ‘লুটকুনিয়া বা গরীব হলেও আদর-আপ্যায়নে কোন ত্রুটি ঘটবে না। খারু’দের কাছে, অর্থাৎ ঠগী দলের কাছে পথে সবাই সমান। সেখানে ফাঙ্ক’ বা মূল্যহীন জিনিষেরও যথেষ্ট কদর।
এদিকে সময় যত এগিয়ে আসবে একদল ততই পেছনে পড়তে থাকবে। ওরা তিলহাই বা গুপ্তচর ; পেছনে ‘ডনকি রনকি বা পুলিশ লেগেছে কিনা তা নজর রাখাই হবে তাদের কাজ।
বধ্যভূমিতে এসেও ওরা সুযোগের অপেক্ষা করবে। পছন্দসই জায়গায় ‘থাপ’ পাতবে, মানে তাঁবু ফেলবে। আশেপাশে ‘ভুল’ বা গলিপথ আছে কিনা তার খোঁজ খবর নেবে। দেখতে হবে জায়গাটা ‘নিসার’ ( নিরাপদ) না ‘টিকুর, ( বিপদসঙ্কুল)। সব খবরাখবর শেষে রাতে একসঙ্গে ভোজ হবে। ভোজের পর গল্পগুজব। দলে যদি ‘নাইরিয়া বা নবাগত কোন নাবালক থাকে তবে তাকে সেখান থেকে একটু দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কঁাচা চোখে খুন দেখা ঠিক নয়।
সময় ঘনিয়ে এল। হয়ত কোন কোন পথিক তখনও দাড়িয়ে আছে। দাড়িয়ে দাড়িয়ে ‘সোহা’র মুখে গল্প শুনছে। এমন সময় ‘সোথ তার পাশে-বসা মানুষটিকে অনুচ্চগলায় আদেশ দেবে ‘চুকা দেনা’ । অথবা-“থিবই দেনা ! অর্থাৎ, ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওদের বসিয়ে দাও। ওরা বসলেন। পাশে এরাও। দু’দিকে দু’জন, পেছনে একজন ; মাঝখানে পথিক। গল্প এগিয়ে চলেছে। পথিকদের চোখ ভেঙ্গে ঘুম নামছে। এমন সময় শোনা গেল কে একজন বলছে-‘পান কা রুমাল লেও! পথিক হয়ত ভাবলেনপানের রুমালই চাওয়া হল। তিনি তখনও জানেন না আদেশ হয়েছে-রুমাল ঠিক কর। তারপরই দ্বিতীয় আদেশ—-“তামাকু লেও’! ঘুমের মানুষকে খুন করা নিষিদ্ধ। সুতরাং, পথচারীরা ঘুমিয়ে থাকলে একজন চেঁচিয়ে উঠবে—সাপ! সাপ। নয়ত ‘বিচ্ছু! বিচ্ছু! ওরা ধড়ফড় করে উঠে বসেই আবার চলে পড়বেন ঘুমের কোলে। এবার চিরকালের মত। ভুকোত’ চোখের নিমেষে ফঁাস পরিয়ে দেবে তার গলায়। পাশে উপবিষ্টদের একজন পায়ে ধাক্কা দিয়ে ধরাশায়ী করে দেবে তাকে। তার নাম ‘চুমিয়া’। একজন হাত দুটো চেপে থাকবে। তার নাম–চুমোসিয়া’ বা সামসিয়া। ব্যাপারটা কি হচ্ছে বুঝতে না বুঝতে অসহায় পথিক শেষ নিঃশ্বাস ফেলবে। ভুকোত’ বিজয় উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠবে—‘বাজিত খান। অর্থাৎ কাজ শেষ। দলপতি বলবে—এই বিচালী দেখো অর্থাৎ ‘বাহরা’ বা মৃতদেহগুলোর ব্যবস্থা কর। দেখবে যেন ‘জিওয়ালু’ বা জ্যান্ত মানুষ না থেকে যায়।
একদল তক্ষুনি দেহগুলো বহন করে কবরের দিকে যাত্রা করবে। তারা ‘ভোজা। আর একদল হাঁটুগুলোকে ভেঙ্গে থুতনির সঙ্গে মিলিয়ে তারা দেহগুলো কবরে রাখবে ! পেটে, বুকে ছুরি চালিয়ে কবরকে পাকা করবে। তাদের নাম—কুথাওয়া। মৃতদেহ যাতে ফুলে উঠে কবর ভেঙ্গে বেরিয়ে না আসে তার ব্যবস্থা করাই ওদের কাজ। ওরা যখন সে কাজে মত্ত, দূরে পথের বাঁকে দু’জন তখন চারদিকে নজর রাখতে ব্যস্ত। বিপদের কিছু দেখলেই তারা একফালি সাদা ন্যাকড়া নাড়াবে। অন্ধকারে সে কাপড় দেখে অন্যরা জানবে বিপদ আসছে। ফুরকদেন। তারই খবর দিচ্ছে।
যদি শেষ পর্যন্ত সে ধরনের কিছু না ঘটে তবে হাতে হাতে বিস্ময়কর ক্ষিপ্রতার সঙ্গে মুহুর্তে খুনের সব চিহ্ন মিলিয়ে যাবে। একজনকে বলা হবে—ফুরজানা! সে তৎক্ষণাৎ জায়গাটা পরিষ্কার করে ফেলবে। কবরের ওপর দেখতে দেখতে ওদের ভোজসভা বসে যাবে।
গুড়ের ভোজ। কিন্তু ঠগীরা বলে সে বস্তু গুড় নয়, অমৃত। সকলের তাতে অধিকার নেই। একমাত্র ‘সুন’ বা সাচ্চা ঠগীর বাচ্চা যারা এবং নিজ হাতে যারা খুন করেছে তাদেরই সে গুড় মুখে দেওয়ার অধিকার আছে। বাকীরাও পেত বটে, তবে সে মন্ত্রপূত গুড় নয়, তাদের জন্যে কিছু গুড় আগেই একপাশে সরিয়ে রাখা হত।
এভাবে খুনের পরই নিরপরাধ মানুষের কবরে বসে ভোজ খেতে কষ্ট হত না তোমাদের?
—না। উত্তর দিয়েছিল ফিরিঙ্গীয়। কখনও কখনও আমাদের মনে যে দুঃখ না হত তা নয়, কিন্তু তুপপানির ঐ গুড় সব ভুলিয়ে দিত আমাদের। সে গুড় একবার যে মুখে দিয়েছে তার কাছে দুনিয়া অন্যরকম। আমি বলছি সাহেব, তুমি পরখ করে দেখতে পার। যত বিদ্যেবুদ্ধিই থাকুক আর যত ধনদৌলতই থাকুক, এই গুড় একবার যে খাবে সে তৎক্ষণাৎ ঠগী হয়ে যাবে। ঘোড়াকে খাওয়াও, দেখবে তার স্বভাব একদম অন্যরকম হয়ে গেছে।
—দূর, তাও কি কখনও হয় ?
হয়। সেই কবে ছেলেবেলায় বাপ মুখে তুপপানির গুড় তুলে দিয়েছিল, আজও তার স্বাদ জিভে লেগে আছে। যদি আরও হাজার বছর বেঁচে থাকি তাহলেও আমাকে চিরকাল ঠগীই থাকতে হবে !
ভোজসভা শেষ হল। কবরের ওপর বিছানা বিছিয়ে সে রাত্তির গোটাদল ওখানেই ঘুমোল । রাত্রে ‘তিলহাই’ খবর নিয়ে এল সামনেই আর একটি দল পশ্চিমের পথে চলেছে। অবশ্য শেষ, পর্যন্ত সবাই পশ্চিমেই যাবে কিনা বলা শক্ত। দলপতি নিজের দল চার ভাগে ভেঙ্গে ফেলল। কুম হল, ভোরের আগেই চার দল চারদিকে বেরিয়ে পড়বে। একজনকে কোন দলেই দেওয়া হল না। সে ‘মাউলি’। তার হাতে গায়ে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিতে হবে। কেননা, ওরা কবে ফিরতে পারে কে জানে। ছেলেমেয়েদের কষ্ট হবে।
ভোরের আগেই চার দল চারদিকে বেরিয়ে পড়ল। যতক্ষণ প্যাটেলদের সেই দলটির সন্ধান না পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ ওরা হাঁটবেই। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাঁটবে। হাঁটতে হাঁটতে চৌরাস্তায় এসে পড়লে আগের দল নিঃশব্দে বালির ওপর পায়ে একটি রেখা টেনে দিয়ে যাবে। সে সঙ্কেত দেখে পেছনের দলের বুঝতে মোটেই অসুবিধে নেই তাদের কোন্ পথে চলা উচিত, কোন্ দিকে চলতে হবে। যত দূরের পথই হোক, ওরা চলবেই। একটা দল বায়োজন মানুষকে খুন করার জন্যে কুড়ি দিনে দু শ মাইল হেঁটেছিল !
হয়ত আখেরে ক’টি তামার পয়সা মাত্র মিলবে, কিংবা হয়ত বা তাও নয়। কিন্তু তবুও একবার যাকে মনে মনে তাক করেছে ওরা, তাকে হত্যা করবেই। যত সাবধানীই হোন তিনি, ঠগীর হাতে তার নিস্তার নেই।
-একদিন এক উচ্চবংশীয় মুসলিম যুবক ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে তাঁর বিস্তর পাইক-বরকন্দাজ, লোকজন। ভদ্রলোক নিজেও সুসজ্জিত। তার কোমরের একদিকে তলোয়ার, অন্যদিকে পিস্তল। তদুপরি পিঠে তীর-ধনুক। ঠগীর দল স্থির করল এঁকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু মোগল কিছুতেই কোন অপরিচিত লোককে কাছে ঘেঁষতে দেবেন না। হোক না তারা হিন্দু, তীর্থযাত্রী ব্রাহ্মণ।
দ্বিতীয় দিন পথে একদল মুসলিম পথিকের সঙ্গে দেখা হল । তারা সালাম করে সোজাসুজি পথের বিপদের কথা পাড়ল। দলের মধ্যে প্রবীণ যে সে বলল, যা দিনকাল পড়েছে, এমন অরাজকতার দিনে একা একা পথ চলতে কার না প্রাণে ডর হয়। আমাদের নসিব ভাল আপনার মৃত সঙ্গী পেয়ে গেলাম। মোগল তবুও অনড়। তিনি হাঁকলেন, তফাৎ যাও!
তৃতীয় দিনে এক সরাইখানায় রাত কাটাতে হল ওঁকে। ঠগীদের একটি দলও আস্তানা গাড়ল সেখানে। নবাবজাদার সঙ্গে আলাপের সুযোগ হল না বটে, কিন্তু রাতারাতি চাকরবাকরদের অনেকের সঙ্গেই তাদের ভাব হয়ে গেল।
চতুর্থ দিনে আবার কিছুদূর চলতে না চলতে নতুন একদল মানুষের সঙ্গে দেখা। মোগল জানেন না, কাল রাত্রে ওরা তার সঙ্গে একই সরাইখানায় ছিল। তিনি যথারীতি তাদের এড়িয়ে যেতে চাইলেন-না, আমার কোন সঙ্গীর দরকার নেই। ওরা বলল, কিন্তু হুজুর, আমাদের তা দরকার আছে। আমরা গরীব তীর্থযাত্রী, আপনার সঙ্গে থাকলে আপনার কোন উপকার হবে না হয়ত, কিন্তু আমাদের উপকার হবে, আমরা হুজুর নির্ভয়ে পথ চলতে পারব। ভৃত্যরা কেউ কেউ এগিয়ে এসে সুপারিশ করল, এরা কাল আমাদের সঙ্গে সরাইয়ে ছিল। নির্ভয়ে আপনি আমাদের দলে নিতে পারেন ; আমাদের সঙ্গে চেনাজানা হয়েছে, লোক ভাল। মোগল তবুও অনড়। তিনি বললেন, বলেছি তো একবার, আমার সঙ্গে নয়, তোমরা অন্য পথ দেখ।
ওরা সালাম জানিয়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল ।
পঞ্চম দিনে দেখা গেল পথের ধারে একদল মুসলিম সেপাই একটা মড়া নিয়ে বসে কাঁদছে। নবাবজাদাকে দেখে তারা এগিয়ে এল। বলল, হুজুর, আমাদের সঙ্গী। গা-গতর ভাল ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে ধকল সইতে না পেরে মারা গেছে। আমরা অশিক্ষিত মুসলমান। ফৌজে কাজ করি। কোরাণ হাফিজ কিছুই সড়গড় নেই। কবর তৈরী-আপনি যদি দয়া করে শেষকৃত্যটুকু করে দেন।
শিক্ষিত মুসলমান পরিবারের সন্তান। সঙ্গে কোরাণশরিফও রয়েছে। মোগল এই অনুবোধ পায়ে ঠেলতে পারলেন না। তলোয়ারের বদলে কোরাণ হাতে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে এলেন। ওরা জল এনে দিল। তিনি হাত মুখ ধুয়ে প্রার্থনায় বসলেন। তাঁর সামনে কবর। দুই পাশে মৃতের দুই বন্ধু। তিনি তখনও জানেন না সৈনিকের বেশে ঐ মানুষ দু’টি দুই ছদ্মবেশী ঠগী।
মোগল চোখ বুজে প্রার্থনা করছেন। অদূরে দাড়িয়ে তাঁর ঘোড়া, নিজের লোকজন। এমন সময় পবিত্র কোরাণের মন্ত্র ছাপিয়ে ঘোষিত হল নির্মম মৃত্যু-পবোয়ানা,-“তামাকু লেও।
সঙ্গে সঙ্গে ঝিলিক দিয়ে উঠল হলুদ রংয়ের সেই রুমাল। মুহূর্তে ধ্যানমগ্ন মোগল তাঁর ধ্যানের জগতে উধাও হয়ে গেলেন।
এ প্রতিমা একটি নয়, আপন কবরের পাশে ধ্যানী পথিকের এই নিশ্চিন্ত মূর্তি শত শত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ।
