পর্ব ২
-আমার নাম বুকুত জমাদার, দেশ ঝাঁসীর পুরা গাঁ। বুড়ো জমাদার টেবিলের ওপারে বসা সাহেবকে সালাম জানিয়ে সোজা হয়ে দাড়িয়েছিল। তারপর বিনা ভূমিকায় শুরু করেছিল তার জবানবন্দী।
-শরৎ কালের কথা। সেবার আমরা দক্ষিণের পথে বের হয়েছি। আমরা মানে আমি, ঠাকুরী, ধোকুল, পাণ্ডে আর মোকাল এই পাঁচ জন। সবাই আমরা এক গাঁয়ের মানুষ।
ঝাঁসী, ভিসা, রেলি হয়ে আমরা ভূপালের দিকে এগিয়ে চললাম। কিন্তু ভূপালে গেলাম না। শহর ডাইনে রেখে চীপনেরেতে আমরা নর্মদা পার হলাম। নদীর ওপারে গাঁ। গাঁয়ের ধারে মস্ত এক বটগাছ। আমরা সেখানে বসে বিশ্রাম করছি, হঠাৎ চোখে পড়ল অদূরে আর একটি গাছতলায় কারা যেন জট পাকিয়ে বসে আছে। অনেক লোক। আমাদের একজন গিয়ে খবরাখবর করে এল। ওরাও আমাদের মতই, একই মতলব নিয়ে পথে নেমেছে।
সে দলে ছিল পঞ্চাশ জন। সবাই এক দলের মানুষ নয়। দশ জন ছিল রোসন জমাদারের অনুচর, তিনজন গুলাব খায়ের, কিছু মাদারী সেখের, কিছু আহির মোল্লা এবং কিছু কেরী লোদীর। সাত জন করে ছিল ঘুরীবা আর জুলফিকার জমাদারের দলে।
আলাপ হল। আমাদের মত ওরাও তখন পর্যন্ত খালি হাত। সুতরাং স্থির হল এক সঙ্গে চলাই ভাল। সে রাত্তিরটা আমরা সেই গাছতলাতে কাটিয়ে দিলাম। পরদিন ভোরে আবার শুরু হল পথ চলা। এবার আমাদের বেশ বড় দল।
দুই দিন পরে দল আরও বড় হয়ে গেল। তৃতীয় দিন চলতে চলতেই পথে দেখা হয়ে গেল চুয়ান্ন জনের আর একটি দলের সঙ্গে। অবশ্য তারা সবাই এক দলের ছিল না। প্রসাদ লোদী, পরশুরাম জমাদার, মনোহর জমাদার—প্রত্যেকের তাদের আলাদা আলাদা দল। পথেই তারা এক হয়েছে। এক সঙ্গে চলছে। আমরাও যোগ দিলাম তাদের সঙ্গে। তারপর সবাই মিলে হাঁটতে হাঁটতে ক’দিন বাদে এসে হাজির হলাম তাপ্তী নদীর ধারে। দলে আমরা তখন একশ’ বারোজন।
সেখানেই আলাপ হয়েছিল ভূপালের কারবারী দু’জনের সঙ্গে। সোথাই হয়েছিল বোসন জমাদার। তার ওপরই ভার দেওয়া হয়েছিল ভিনদেশীদের বশ করবার। রোসন জমাদার পুরানো লোকে, তার মোটেই বেগ পেতে হয়নি।
তানকোলি সম্পর্কে আগেই মনস্থির করে রেখেছিলাম আমরা। জায়গাটা ভাল। নির্জন। অদূরে গা। গায়ের উত্তরে নদী। নদীর ধারে পথ, পাশেই বন। এর চেয়ে ভাল জায়গা কয়েক ক্রোশের মধ্যে আর ছিল না। খাওয়া-দাওয়ার পরেই তাই ‘ঝিরণী’ দিয়ে দেওয়া হল। মানুষ দুটি অবশ্য বসেছিল রোসন জমাদারের মাদুরে। কিন্তু সে হাত ছোঁয়ায়নি। কাজটা শেষ করেছিল খোদাবক্স মুসলমান আর ভুকুত ব্রাহ্মণ।
—কত পাওয়া গেল ? সাহেবের হয়ে প্রশ্ন করলেন হিন্দুস্তানী দারোগা।
-নগদ পাওয়া গিয়েছিল হুজুর একশ পঞ্চাশ টাকা। তাছাড়া দুটো বন্দুক, একটা ঘোড়া, এক ঘোড়া কাপড়চোপড় সওদা। এগুলো বাদ দিলে ভাগে মাথাপিছু প্রত্যেকে এক টাকা পেয়েছিলাম আমরা।
-মাত্র এক টাকা? সবিস্ময়ে বুকুত জমাদারের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন সাহেব। নিশূহ জমাদার উত্তর দিয়েছিল, হ্যা। হুজুর। তবে ক’দিন পরে বারওয়াঘাট সব পুষিয়ে দিলে।
-বারওয়াঘাট। গোটা ঘর আবার নড়ে চড়ে বসল। সাহেব টেবিলে মেলে রাখা ম্যাপটায় জায়গাটার পাশে একটা ছোট্ট লাল দাগ দিয়ে কান পাতলেন। দাবোগা খাতার পাতা উল্টালেন। বুকুত জমাদার যেন ওঁদের এই তৈরী হওয়ার অপেক্ষাতেই চুপ করে ছিল। এবার সে মুখ খুলল।
-ভূপালের কারবারীদের নিয়ে ঝামেলা যা ছিল সে তো রাত্তিরেই মিটে গেল। পরদিন ভোরে আবার পথে নামলাম আমরা। এবার বোরহানপুর থেকে দশ ক্রোশ দক্ষিণে ইদৌলবাদ। শহরের বাইরে শহরতলীর এক কোণে পথের ধারে কয়েকটা গাছ, তার আড়ালে এক ফকিরের টুকিয়া—ছোট্ট একটা ঘর। সেদিনকার মত সেখানেই ছাউনি ফেললাম আমরা। নসিব ভাল। সেই দিনই খবর পাওয়া গেল—আটজন রকৌরিয়া শহরের দিকে যাচ্ছে। তারা বোম্বাইয়ের নামী কারবারী ধনরাজ শেঠের লোক। টাকা নিয়ে বোম্বাই থেকে ইন্দোর চলেছে। সঙ্গে তাদের ছয়টি বন্দুক, দু’দুটি উট। উটের পিঠে থলি বোঝাই টিপুশাহী রুপেয়া। তিলহাইরা আরও খবর নিয়ে এল, আজকের মত রাতটা তারা ইদৌলবাদেই কাটাবে। খোদাবক্স আর মলু জমাদারকে তিলহাই করে পাঠিয়ে দেওয়া হল শহরে। আড়ে থেকে তারা লোকগুলোর ওপর নজর রাখবে। তিলহাইদের তাই কাজ।
পরদিন সকালে কোরিয়ারা আবার পথ ধরল। পেছনে পেছনে আমাদের তিলহাই। আমরা ভেবেচিন্তে দেখলাম, দিন শেষে ওদের তানকোলিতে গিয়ে থামতেই হবে। কিন্তু মাত্র একদিন আগে সেখানে ভূপালের কারবারীদের নিয়ে খেলে এসেছি আমরা। তাই ঠিক হল ওপথে আজই আবার ফিরে না যাওয়াই ভাল।
বদলী হিসেবে আমরা চান্দদোভির পথ বেছে নিলাম। আগেই বলেছি সেদিন আমাদের নসিব ভাল। তিলহাইরা পথেই খবর দিয়ে গেল, রকৌরিয়ার তনিকোলিতে থাকছে না, তারা রাত কাটাবে বোরহানপুরে। শুনে পরদিন ভোরেই পঞ্চাশজন বাছা মরদ নিয়ে মহারাজ পাঠক, জালিম আর পরশুরামরা চলে গেল বোরহানপুরের দিকে। আর একদল চলে গেল অন্যদিকে, ভূপাল জেলার দেওলিয়ার পথে। কে জানে, বোম্বাইওয়ালারা শেষ পর্যন্ত কোনদিকে মোড় নেয়।
সন্ধ্যার এক ঘড়ি আগে আমরাও বোরহানপুরে এসে সামিল হলাম। এবারও শহরের বাইরেই ছাউনি ফেলতে হল। পথের ওপর নজর রাখতে হবে। তিলহাইরা খবর দিয়ে গেল ওরা বাজারে উঠেছে। মল্লু আর দলের আর-একজন তখুনি চলে গেল বাজারে।
কিন্তু রকৌরিয়ারা বাজারে নেই। ওরা গোটা বাজার তন্ন তন্ন করে খুজল। এক জায়গায় তিনটে উটও দেখতে পেল, কিন্তু রকৌরিয়ারা কোথাও নেই। ওরা মুখ বেজার করে ফিরে এল। সঙ্গে সঙ্গে খলিল, মনোহর আর মুদারা—এই তিন জনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল আসিরের পথে। ওদের বলে দেওয়া হল—যদি হদিশ করতে পার তত একশ’ রুপেয়া!—আমরা তোমাদের জন্যে আসিরে অপেক্ষা করব, তারপর বরগাঁওয়ে।
ওরা তিন জন যখন আসিরে পৌঁছেছে তখন মাঝরাত্তির। সুতরাং রাত্তিরে আর খবরাখবর বিশেষ হল না। কথামত পরদিন ভোরে আমরা আসিরে গিয়ে হাজির হয়েছি। কিন্তু রকৌরিয়াদের কোন খবর নেই। মিছিমিছি আর এখানে বসে থেকে কি লাভ? আমরা আশরফ আর মঙ্গ। এই দুইজনকে বাজারে পাঠিয়ে বরগাঁওয়ের পথ ধরলাম। ওদের বলে দিলাম, আটা ময়দা যা পাওয়া যায় কিছু কিনে তোমরা চলে এস, আমরা সামনেই যে নালাটা দেখছ তার ধারে অপেক্ষা করে থাকব।
বাজার থেকে ছুটতে ছুটতে ফিরে এল ওরা। বলল, রকোরিয়ারা বাজারেই ছিল। আমরা দেখে এলাম কাষ্টমস হেসে বসে তারা হিসেব মিটাচ্ছে। আমরা সেখানে দু’জন তিলহাই পাঠিয়ে দিয়ে তক্ষুনি বরগাঁওয়ের পথ ধরলাম।
বরগাঁও এসেছি, কতক্ষণ পরেই তিলহাইরা ফিরে এল। কানে কানে বলল, রকৌরিয়ারা পথ বদলে ফেলেছে, তারা আর এদিকে আসছে না, পঞ্চপুকুরের দিকে যাচ্ছে। শুনে তক্ষুনি আবার সে পথ ধরতে হল।
কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার, ওরা পঞ্চপুকুরেও নেই। তবে কি মানুষগুলো হাওয়া হয়ে গেল? সারারাত আমরা পঞ্চপুকুরে নানা জল্পনা-কল্পনা করলাম। ভোর হওয়ামাত্রই ছ’জনকে পাঠিয়ে দিলাম চারদিকে। যে করে হোক, খুজে বের করতেই হবে মানুষগুলোকে।
সন্ধ্যার কিছু আগে শেরপুরের পথে গিয়েছিল যে দু’জন তারা ফিরে এল। এসে খবর দিল রকৌরিয়ার আগের রাত্তিরটা শেরপুরেই কাটিয়েছে। এখন তারা ইন্দোরের দিকে হাঁটছে। শেরপুর থেকে আট ক্রোশ দূরে তারা রাত কাটাবে। ওরা গাঁয়ের নামটাও জেনে এসেছিল, আসতে আসতে ভুলে গেছে। অন্য চার জন লোকও ততক্ষণে ফিরে এসেছে। তারা জানাল—রকৌরিয়ারা কোথায় গেছে কেউ তার আভাস দিতে পারে না। বোঝা গেল, শেরপুরে পাওয়া খবরটাই পাকা। আমরা আর সময় নষ্ট না করে ইন্দোরের দিকে পা চালালাম। দলের সবাই ক্লান্ত। কিন্তু তবুও বর যখন পাওয়া গেছে, হাঁটতেই হবে।
আট ক্রোশ হেঁটে অবশেষে আমরা যখন সেই নাম-না-জানা গাঁয়ে এসে হাজির হয়েছি তখন মাঝরাত্তির। পথের ধারে একটা বটগাছ ছিল, তার তলাতেই আমরা মাদুর পেতে একটু গড়াগড়ি দিয়ে নিলাম।
ভোরে সত্যি সত্যিই গাঁ থেকে বেরিয়ে এল রকৌরিয়ারা। আমরাও যাত্রার জন্যে তৈরী হলাম। প্রায় দু’মাইল হেঁটেছি, এমন সময় সামনে এসে দাড়াল কাস্টমস চৌকির চৌকিদাররা। ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রকৌরিয়ারা চোখের আড়ালে চলে গেল। পাছে একেবারেই হারিয়ে যায়, সেই ভয়ে আমি কেঁচড় থেকে একটা টাকা আর একটা সিকি দিয়ে তাড়াতাড়ি চৌকিদারদের সঙ্গে মিটিয়ে নিলাম।
ইতিমধ্যে লোকগুলো বারওয়াঘাটে নর্মদা পার হয়ে গেছে। নদীর ওপারে বারওয়া বাজার। সেখানে ওরা আস্তানা পেতে ফেলেছে। আমরাও যথারীতি গাছতলায় বসে গেলাম। লোকগুলো সেদিন আর পথে বের হল না। বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই একটা দিন জিরিয়ে নিচ্ছিল। আমরাও ক্লান্ত। বিশ্রামের সুযোগ পেয়ে মনে মনে তাই খুশীই হলাম।
পরদিন ওরা বাজার ছাড়তে যাবে এমন সময় কাস্টমস চৌকির দারোগার তলব পড়ল। সবাইকে তার সামনা দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু রকৌরিয়ারা ঝঞ্চাটে পড়ে গেল। আমরা সেখানে গিয়ে দেখি মাশুল নিয়ে দারোগার সঙ্গে কথা কাটাকাটি চলছে তাদের। ভালই হল। যতক্ষণ ওদের মামলার ফয়সলা না হচ্ছে ততক্ষণ আমরাও আমাদের মাশুল দিচ্ছি না। কেননা, ওদের পিছু পিছু চলাই আমাদের মতলব।
বেলা গড়িয়ে চলল। কিন্তু দারোগা তবুও কিছুতেই ছাড়ছে না ওদের। আমরাও সেই থেকে বসেই আছি। শেষে আমাদেরই একজন মহারাজ পাঠক এগিয়ে গেল। সে দারোগাকে বলল, হুজুর, এতক্ষণ ওদের আটকে রেখেছেন। এদিকে যে বিকেল হতে চলল। বেচারারা টাকা পয়সা নিয়ে যাচ্ছে, পরে যদি একটা কিছু হয় !
ওর কথা শুনে দারোগার চৈতন্য হল। তিনি তক্ষুনি পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে ওদের ছেড়ে দিলেন। কিন্তু রকৌরিয়ারা ততক্ষণে মত পাল্টে ফেলেছে। পাঠকের কথায় তাদেরও হুস হয়ে গেছে। অবেলায় তারা আর এ চৌকি ছেড়ে যেতে রাজী নয়।
আমাদেরও তাই বাধ্য হয়েই কাছাকাছি থাকতে হল। চৌকি থেকে দু’ক্রোশ গিয়েই আমরা সেদিনকার মত হাঁটায় ক্ষান্ত দিলাম। সেখানেই রাত্তিরে রান্না-বান্না খাওয়া-দাওয়া হল।
সকালে সবে আমরা তৈরী হচ্ছি এমন সময় পথের বাঁকে ওদের উট উকি দিল। তাড়াহুড়ো করে আমরা তল্পিতল্পা বেঁধে নিয়ে আবার চলতে আরম্ভ করলাম।
কিছুদুর গিয়েই সামনে একটা নালা। তার ধারে প্রকাণ্ড এক বাঁশবন। আমরা সেখানে বসে গেলাম। যেন বিশ্রাম নিচ্ছি। দলের দু’জন গিয়ে কটা বাঁশ কেটে নিয়ে এল। আমরা বসে বসে সে বাঁশে ক’খানা লম্বা লাঠি বানালাম।
আগের দিন রাতে কাস্টমস চৌকিতে একজনকে রেখে আসা হয়েছিল। ঘোড়ায় চড়ে সে রকৌরিয়াদের আগে আগে চলে এল। এসে আমাদের সঙ্গে বিশ্রাম করতে বসে গেল। তার প্রায় পেছনে পেছনেই রকৌরিয়ারা এসে হাজির। ওর দেখাদেখি তারাও আমাদের সামনে এসে থেমে দাড়াল। তারপর অনুরোধ করা মাত্র আমাদের সঙ্গে তামাক খেতে বসে গেল।
ওরা তামাক খাচ্ছে। আমরা ধীরে ধীরে ওদের ঘিরে বসছি। হঠাৎ ‘ঝিরণী উঠল। ওরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দু’জন তখনও উটের পিঠে ছিল। আমাদের জানা ছিল, তাই থাকবে হয়ত। সে জন্যেই লম্বা লাঠিগুলোর ব্যবস্থা করেছিলাম। তাই দিয়ে ওদের নামান হল। তারপর মাত্র কয়েক মিনিটের মামলা।
সাহেব প্রশ্ন করলেন, দেহগুলো কোথায় রেখেছিলে?
—কেন ? সেই শুকনো নালার তলায়! সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল বুকুত জমাদার।—ওদের চাপা দিয়ে আমরা বড় রাস্তা ছেড়ে তক্ষুনি ঘুরিবার দিকে পা বাড়ালাম। এবার আমাদের আঁকাবাঁকা বনপথ। দু’ক্রোশ চলে উটের পিঠের বোঝা নামিয়ে সেগুলো ঘোড়ার পিঠে চাপান হল। উট দুটোকে ছেড়ে দেওয়া হল বনে।
সেখান থেকে আমরা আবার অন্য পথ ধরলাম। এবার আর ইন্দোরের দিকে নয়-পূব দিকে। তিন দিন চলে অবশেষে সন্দোলপুরে এসে হাজির হলাম আমরা। এখানে এসে খুরজিগুলো কাটা হল।
-কি পেলে? কলম থামিয়ে দারোগা প্রশ্ন তুললেন।
—বস্তা থেকে পাওয়া গেল পনের হাজার টিপুশাহী টাকা, একশ তোল রূপা এবং শিল্পমোহর করা একটা পেতলের বাক্স।
-তাতে কি ছিল? আবার প্রশ্ন করলেন দারোগা। ততক্ষণে ফর্দটা টোকা হয়ে গেছে তাঁর।
—তাতে ছিল চারটে হীরের আংটি, আটটা মুক্তো আর একজোড়া সোনার বালা। হয়ত কাউকে উপহার পাঠিয়েছিল ধনরাজ শেঠ। জিনিষগুলোর দাম ধরেছিলাম আমরা হাজার টাকা। তবে আখেরে খুব বেশী কিছু ভাগে পড়েনি আমাদের। দলটা বড়। তাছাড়া জালিম একটা মোটা টাকা আগেই এক পাশে সরিয়ে রেখেছিল। কেননা, বিন্ধ্যাচলে একটা পুজো দিতে হবে। তা হলেও প্রত্যেকে দেড়শ টাকা করে পেয়েছিলাম আমরা।
-প্রত্যেকে সমান পেয়েছিলে? দারোগা আবার প্রশ্ন তুললেন।
—হ্যা, এমনকি যারা হাজির ছিল না তারাও নিজ নিজ ভাগ পেয়েছিল। ভূপালে যারা চলে গিয়েছিল তাদের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের আত্মীয়-বন্ধুদের হাতে। আমাদের মধ্যে নিমকহারামী নেই হুজুর!-বুকুত জমাদার সগর্বে তার জবানবন্দীর উপসংহার টেনেছিল
কিন্তু পথিকদের বেলায় তার উল্টোটাই ছিল ধর্ম। সেখানে বিশ্বাসঘাতকতাই ছিল চিরকালের নিয়ম। বুকুত জমাদারের কাহিনীটি ১৮৩৩ সনের। রুস্তম খাঁ দক্ষিণের সেই পনের বছর বয়সের মোড়লতনয়ের কাহিনীটি শুনিয়েছিল ১৮৩৪ সনের জানুয়ারীতে। সেবছর ডিসেম্বরে আর-এক জমাদার জুলফিকার তার স্মৃতি মন্থন করে যে কাহিনীটি শুনিয়েছিল সেটি ঘটেছিল একুশ বছর আগে।
সেও এক বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী। জুলফিকার জমাদারের নিজের জবানীতে তার বিবরণ :
সেবার মহরমের পরে আমরা তিনশ’ জন একসঙ্গে মিলিত হলাম। স্থির হল এবার পথে নামতে হবে। কার কোন দিকে যাবে তা ঠিক হতে না হতেই হাতের সামনে এসে হাজির হল সাতাশ জন মানুষের একটা দল। শোনা গেল আমরা যেখানটায় আছি–তার পাশেই বাজারে আস্তানা নিয়েছেন তাঁরা। সঙ্গে তাদের চারটি সওদাবোঝাই ঘোড়া।
পরদিন সকালে ওঁরা কাদাউনের দিকে যাত্রা করেছেন। পেছনে পেছনে আমরাও সেই পথে পা বাড়ালাম। কয় ক্রোশ পরেই দু’দলের দেখা হয়ে গেল। প্রথমে ওঁরা আমাদের এড়িয়ে যেতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের মধ্যে প্রবীণ যারা ছিল তারা কথায় কথায় পথের বিপদের কথা মনে করিয়ে দিল। এত দূরের পথ, বনপথে টাকা-পয়সা নিয়ে এভাবে একা একা চলা কি ঠিক হবে ?
ওঁরা মাথা নাড়ালেন। হ্যা, কথাটা ঠিকই। নিজেরা নিজেরা পরামর্শ করে তারা স্থির করলেন, একসঙ্গে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমরা জানতাম ওঁদের শেষ পর্যন্ত মত হবেই। পাছে বিগড়ে গিয়ে অন্য পথে পা দেন সেই ভয়ে ইতিমধ্যে নিজেরাও দু’দলে ভাগ হয়ে গেছি। একদল ওঁদের সঙ্গে সঙ্গে আছি, আর একদল অন্য পথে এগিয়ে গেছে। আমরা বিফল হলে, এক দিন কি দুদিন পরে তারা দায়িত্ব নেবে।
তার দরকার হল না। ওঁরা রাজী হয়ে গেলেন। আমরা একশ পঁচিশ জন আর ওরা সাতাশ জন। এবার একসঙ্গে যাত্রা শুরু হল। ঘনিষ্ঠ হতে আরও একটি দিন কেটে গেল। পরদিন ‘ঝিরণী উঠল।
১৮৩৩ সনের এপ্রিলে সেখ এনায়েত যা শুনিয়েছিল সে আরও লোমহর্ষক, আরও নিষ্ঠুর :
পনের বছর আগের কথা। তুমি তখন কোথায় ছিলে সঠিক জানি সাহেব, হয়ত নিজের দেশে। গর্বিত নায়ক এনায়েত পুরানো দিনের কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়েছিল। তারপর মাথা চুলকে বলেছিল, হঁ্যা, নাম ছিল তার বটে জেনকিন সাহেব। তিনি তখন নাগপুরে রেসিডেন্ট।নয় কি হুজুর?
খবর পেলাম সাহেব সদলবলে নাগপুর থেকে বান্দার দিকে চলেছেন। আমরা তখন জব্বলপুরে। একশ’ পঁচিশ জন বেকার বসে আছি। খবর পেয়ে ভাবলাম মন্দ কি, বাঘের লেজেই একবার হাত দিয়ে দেখা যাক-না মায়ের কি মর্জি! জব্বলপুর ছেড়ে আমরা সেওড়ায় এসে খাপ পেতে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম।
জেনকিন সাহেব আমাদের সামনা দিয়ে চলে গেলেন। পেছনে পেছনে তার লোকজন। সে হুজুর, মস্ত দল। দেখে মালুম হল এ দল আমাদের কর্ম নয়। কিন্তু একেবারে বিনা চেষ্টায় ছেড়ে দিতেও মন রাজী হল না। আমি মাথা খাটাতে লাগলাম। বুদ্ধির অসাধ্য কিছু নেই, একটা উপায় বের হল।
সাহেবের দল চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও। চলতে চলতে দু’চার জনের সঙ্গে আলাপ হল। সাহেবের সঙ্গে আছে বটে, কিন্তু সবাই তো আর সাহেব নয়, ক্রমে কয়েকজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও হয়ে গেল। তাদের আমরা বোঝালাম—একেবারে সাহেবের সঙ্গে সমান। কদমে চলতে হবে তার কি কথা? তোমরা ভাই একটু ধীরে চল-না, তাতে তোমাদেরই সুবিধে। দেখছ না, এত বড় দল, যেখানেই যাচ্ছে জিনিষপত্তরের দরে যেন আগুন লাগছে, কুয়োর জল শুকিয়ে যাচ্ছে। একটু পেছনে গেলে তোমাদেরই সুবিধে, কিংবা আগে আগে অন্য পথে।
প্রথমদিন কথাটা ওরা কানে তোলেনি। দ্বিতীয় রাত্রে একটু ভাবান্তর দেখা গেল। সুযোগ বুঝে অসুবিবেগুলো আরও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হল।-এক জায়গায় এত মানুষ, বাপরে, না যায় একটু শান্তিতে ঘুমনো, না চলে একটু দিলখোলা কথাবার্তা। সঙ্গে অনেকের জেনানা ছিল। তাদের মুখ দেখে বোঝা গেল, কথাটা তারা মেনে নিয়েছে।
পরদিন জেনকিন সাহেবের দল থেকে সত্যিই একটি টুকরো ছিটকে পড়ল। সাহেবের তখনও লটবহর গোছান হচ্ছে, আমরা পছন্দের জনাকয়কে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। শিকারপুরে এসে একটা ঝোপের কাছে ছাউনি পড়ল আমাদের। সাময়িক ছাউনি। দু’দণ্ড বসে বিশ্রাম করে নেওয়া যাক। কানে কানে মন্ত্র নিয়ে দু’জন এগিয়ে গেল আরও সামনে। সুবিধেমত জায়গা কোথায় আছে তার খবর করতে।
জায়গা স্থির হল। সেখানে এসে রাত্রির মত নতুন করে ছাউনি পড়ল। দলের মেয়েরা রান্না করল। আমরা সকলে মিলে খেলাম। খাওয়া শেষে গল্পগুজব, ঠাট্টা তামাসা । রাত তখনও অনেক বাকী। সাহেব আমাদের থেকে বেশ কয়েক ক্রোশ পেছনে। কেউ বসে আছে, কেউ দাড়িয়ে দাড়িয়ে গল্প শুনছে। কেউ ঘুমিয়ে নেই। হট্টগোল থেকে দুরে এসে সবাই আনন্দিত। আডডা বেশ জমে উঠেছে। মেয়েরা গালে হাত দিয়ে গল্প শুনছে, পুরুষেরা ফুরুক ফুরুক হুকো টানছে। এমন সময় আমি ‘ঝিরণী’ দিলাম।সাহেব খান, পান লেও।
চোখের নিমেষে পঁচিশটা মানুষের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। পাচজন তাদের জেনানা। দলে দুটি বাচ্চা ছিল। জহির একটিকে কোলে টেনে নিল, অন্যটিকে নিল কেইরী। কিন্তু জহিরের কোলের বাচ্চাটার কান্না আর কিছুতেই থামে না। মায়ের জন্যে হোকরা যেন পাগল হয়ে উঠেছে। জহির দু’ এক দফা ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু সে ছেলে কিছুতেই বাগ মানবে না। সামনে ছিল একটা পাথর। রেগে গিয়ে জহির তার ওপরে দেয় এক আছাড়। অবুঝ শিশু চিরকালের মত শান্ত হয়ে গেল।•••আমরা সেই রাতেই আবার নিজেদের পথে পা বাড়ালাম।
নবাব ‘সবজী খানের উধাও কাহিনীটিও একই হৃদয়হীনতায় বর্ণাঢ্য। তারও নেপথ্যে নায়ক ছিল এই এনায়েত। দু’বছর পরে, ১৮৩৫ সনে একই ভাবলেশহীন কণ্ঠে সে বলে গিয়েছিল সেই ‘ঝিরণী’র কাহিনীটি।
সবজী খান হায়দ্রাবাদের নিজাম বাহাদুরের একজন পদস্থ কর্মচারী। লোকে তাকে সবজী খান বলতেন, কারণ বিলাসী নবাবের একমাত্র নেশা ছিল বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি একটি ভেষজ-পানীয়।
সেবার যোল বছরের পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজাম দরবার থেকে ভূপালে চলেছেন। দলে তাঁর দু’জন সহিস, দু’জন সেপাই, ছেলে আর একটি ক্রীতদাসী তরুণী। পথে বাবার সঙ্গে কি নিয়ে যেন পুত্রের কথা কাটাকাটি হল। বাপ-বেটা দু’জন দুই পথ ধরলেন। নবাবজাদা এক পথে, অন্য পথে নবাব।
রাস্তায় এনায়েত সেলাম করে নবাবের সামনে এসে দাড়াল হুজুর, আমরা ঘোড়ার কারবারী। ঘোড়া নিয়ে দক্ষিণে গিয়েছিলাম। ভূপাল হয়ে দেশে ফেরার মতলব।আপনিও কি সে দিকেই যাচ্ছেন?
নবাব মাথা নাড়লেন। এনায়েত বলল, যদি আপত্তি না করেন তবে আমরা আপনার সঙ্গে যেতে চাই। আপনি মান্য লোক, আপনি সঙ্গে থাকলে আমরা ভিনদেশীরা অনেকখানি নিশ্চিন্ত।
নবাব আপত্তি করলেন না। ছেলের সঙ্গে ঝগড়া করে মনটা বিষিয়ে ছিল। ভাবলেন, মন্দ কি? নতুন লোক সঙ্গে থাকলে কথাবার্তায় মেজাজটা একটু হাল্কা থাকবে।
ওরা এক সঙ্গে চলতে লাগল। পথে দিলখোলা নবাব তার মনের কপাট খুলে দিলেন। তিনি কি করেন, কেমন রোজগার, কি অভ্যেস কিছুই গোপন করলেন না। এমনকি তাঁর সবজী খাঁ নামের কারণটি পর্যন্ত।
তিন দিন এনায়েত তার সঙ্গে সঙ্গে চলেছে, কিন্তু কিছুতেই আর সুবিধে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবারই নবাব এমন কোন জায়গায় এসে ছাউনি ফেলেন যেখানে এনায়েত অসহায়।
কিন্তু আর নয়। চতুর্থ দিনে একটা বনের পাশ দিয়ে চলছিলেন ওঁরা। এনায়েত বলল, খান সাহেব, জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডামত। অনেকক্ষণ সবজী খাননি আপনি, একটু বিশ্রাম করবেন কি? আমরাও একটু প্রসাদ পেতে পারি !!
সবজীর কথা শুনেই নবাবের গলা শুকিয়ে এল। তিনি বললেন, তা মন্দ বলনি। একটু জিরিয়েই নেওয়া যাক।
কার্পেট পাতা হল। ক্রীতদাসী মেয়েটি সবজী তৈরীর সরঞ্জাম নিয়ে এল। নবাব গা এলিয়ে বিশ্রামে বসলেন। ওদের মধ্যে তিনজন নবাবের ডাইনে বাঁয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। তারাও আজ প্রসাদ নেবে।
সব তৈরী। হঠাৎ বাদশাহী গলায় এনায়েত বলে উঠল, সাহেব খান, তামাকু লেও! সঙ্গে সঙ্গে নবাব উধাও! বাঁদী, সহিস, সেপাই—কারও কোন চিহ্ন নেই।
অনেক দিন পরে কাছাকাছি একটা বাজারে শুধু ঢাল পাওয়া গিয়েছিল একটা। কারুকার্যখচিত সুন্দর একটা ঢাল। যে লোকটি বেচতে এনেছিল, সে দাম চেয়েছিল আট টাকা। শুনে দোকানী সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়েছিল লোকটির মুখের দিকে। পাশে একজন বলে উঠেছিল, বাঃ চমৎকার জিনিৰ, অনেকটা সবজী খানের যেটা ছিল তার মত। ওঁদের কথার ফাকে লোকটি কখন মিলিয়ে গেছে সেদিকে কারও নজর ছিল না। অবশেষে ঢালটা যখন সত্যিই চেনা গেল, এনায়েত তখন নিজেও সবজী খানের মত আর-এক রহস্য-সে উধাও।
