ঠগী – ১১

পর্ব ১১

ওরা চলে গেল।

আবার নিজের আসনে ফিরে এলেন স্লীম্যান। সামনে টেবিলময় ছড়িয়ে আছে রাশি রাশি কাগজ। মানচিত্র, ফাইল, বংশ-তালিকা, রিপোর্ট। মাথার ওপর একটি টানা পাখা দুলছে। হাওয়ায় কাগজগুলো থেকে থেকে নড়ছে। সাহেবের মাথার চুলগুলো ধীরে ধীরে কাপছে। স্লীম্যান অন্যমনস্কভাবে একটা ফাইল টেনে নিলেন। ফিতের গিঠটা খুলতে খুলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে জানালার দিকে তাকালেন।

জানালায় সগরের শেষ বর্ষা। গাছগুলো দেখে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আবার রোদ উঠেছে। জলে বোয়া পাতাগুলো চিকচিক করছে। দুটো কাক পাশাপাশি বসে রোদ পোহাচ্ছে।

তাকিয়ে থাকতে থাকতেই রোদটা হঠাৎ দপ করে নিভে গেল। চকচকে পাতাগুলো কেমন যেন কালচে হয়ে গেল। বোধহয় আবার মেঘ জমছে। কাক দুটো মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। সীম্যান টেবিলে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। সে চোখের দিকে তাকালে বোঝ যায়, তাঁর মনের কোণেও কোথাও মেঘ জমেছে। ক’মিনিট আগেও যে মুখটি খুশীতে টলমল করছিল এখন সেখানে থমথমে অন্ধকার। চওড়া কপালটিতে পর পর কয়টি রেখার আভাস।

চিন্তিত সীম্যান আলতো হাতে ফাইলটা খুললেন। এই ফাইলটিই আজ তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ওরা বলে গেল বটে, কিন্তু তিনি জানেন, আসল সমস্যা তাঁর কোথায়। দক্ষিণ নয়, উত্তর নয়,—তিনি জানেন ওদের দেবীর আশীর্বাদ যদি তাঁর কখনও সত্যিই দরকার হয় তবে তা লাগবে এই ফাইলটি হাল্কা করতে, যার ওপরে বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে—সেন্ট্রাল ইণ্ডিয়া’,–মধ্যভারত। মধ্যভারত এক বিস্তীর্ণ এলাকা। কিন্তু ফ্লীম্যান জানেন শত্রু তার সেখানে মাত্র একজন।-, একজন। সেই একটি মানুষের ওপরই নির্ভর করছে তাঁর শেষ ফলাফল। যদি এতদূর এগিয়ে যাওয়ার পরও কখনও তাকে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে আসতে হয় তবে সেই চরম পরাজয় মেনে নিতে হবে তাঁকে দক্ষিণী ঠগীদের জন্যে নয়, কোন দেবীর অসম্মতির জন্যেও নয়, সেই একটি মানুষের জন্যে-সমগ্র মধ্যভারত এখনও যার হাতের মুঠোয়, ঠগীদের মধ্যে ক্ষমতায় এখনও যে সম্রাট !

দুটো বর্ষা গেল। দু-দু’টি বর্ষা। তৃতীয়টিও যাওয়ার পথে ! আর ক’দিন পরেই বাদল চুকে যাবে। হয়ত শত্রু এখন নতুন করে অভিযানের জন্য তৈরী হচ্ছে। বর্ষা বিদায় নেওয়া মাত্র পথে নামবে। অসহায় পথিকের শবে আবার মধ্যভারতের মাটি উর্বর হবে! হারিয়ে যাওয়া মানুষের শোকে শীতের হাওয়া কনকন করবে। অসম্ভব! অসম্ভব! চেয়ারে নিজের পিঠটাকে চেপে ধরলেন স্লীম্যান, এভাবে খুনের অধিকার দিয়ে ওকে আর একটি মাসও ছেড়ে রাখা চলে না, আমি বেঁচে থাকতে তা হয় না, তা অসম্ভব !

বড়াসাহেব! দরজায় কার যেন গলার আওয়াজ। ফাইল। থেকে মুখ তুলে স্লীম্যান সেদিকে তাকালেন। হাতে একগাদা কাগজ নিয়ে সেলামের ভঙ্গীতে সেখানে দাড়িয়ে আছে সাহেবের খাস-বেয়ারা। ধাঁ করে মনে পড়ল কোর্টে যাওয়ার সময় হয়েছে। আসামীদের শেষ রায় শোনাতে হবে। ত্রস্ত হাতে হাতের ফাইলটি বন্ধ করে স্লীম্যান তড়ক করে উঠে দাঁড়াল। দেরাজটা টেনে ফাইলটা সাবধানে সেখানে রেখে ডালাটা আবার ভেতরে ঠেলে দিয়ে তিনি বাইরের দিকে পা বাড়ালেন।

কোর্টে সেই এক দৃশ্য, এক কর্তব্য।

বিচারের পালা আগেই শেষ হয়ে গেছে। এবার শুধু আসামীদের শেষ আদেশটি শোনাতে হবে। ঘরের এক কোণে ম্যাজিস্ট্রেটের আসন। তার তিনদিক ঘিরে দাড়িয়ে আছে সশস্ত্র সান্ত্রী। সামনে অর্ধবৃত্তাকারে পাতা বেঞ্চিগুলোতে চুপচাপ বসে আছে একদল ঠগী, তারা চরমদণ্ড নিতে এসেছে।

স্লীম্যান নিজের আসনে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কাজ শুরু হয়ে গেল। পরোয়ানাগুলো আসামীদের হাতে হাতে বিলি করে সেরেস্তাদার নিজের টেবিলে ফিরে এলেন। তারপর দীর্ঘ ফর্দটা হাতে নিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে নামগুলো পড়ে গেলেন। ওরা ফাঁকে ফাঁকে বলে গেল-হাজির ! হাজির !

এবার বাকীটুকু স্লীম্যানের কর্তব্য। এ আদালতে তিনিই ম্যাজিস্ট্রেট। অপরাধের প্রথম কথাটি যেমন তিনিই শুনিয়েছিলেন তেমনি শেষ দণ্ডের কথাটিও তাঁকেই শোনাতে হবে। রুমালে মুখ মুছে স্লীম্যান উঠে দাঁড়ালেন। তারপর পরিচ্ছন্ন হিন্দুস্তানীতে ধীরে ধীরে বললেন, তোমরা নরহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলে। আদালত তোমাদের দোষী সাব্যস্ত করেছেন। কোম্পানির কলকাতা কাউন্সিল তাই তোমাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। কাল সকালে তোমাদের ফাঁসী হবে। তোমাদের যদি কারও কোন বিশেষ প্রার্থনা থেকে থাকে তবে অনায়াসে তোমরা আমাকে তা জানাতে পার।

সাধারণত ওরা কেউ কিছু ভিক্ষে চাইত না। চাইলেও বড়জোর কেউ বলত, আমার একমাত্র আরজি হুজুর, মরার পর আমাকে যেন পোড়ান হয়? অথবা, আমাকে যেন কবর দেওয়া হয়। একবার শুধু একজনকে ফিসফিস করে বলতে শোনা গিয়েছিল—এ জন্মে তো বেঁচে গেলেন হুজুর ! কিন্তু বেহেস্তেই হোক আর দোজকেই হোক, ঠগীর সঙ্গে আপনার আবার একদিন মোলাকাত হবে, সেদিন কে কাকে ফাঁসী দেয় দেখা যাবে। অনুচ্চ রামসীতে বলা সে বাক্যটি স্লীম্যানের কান এড়াতে পারেনি। তিনি অবাক হয়ে তরুণটির মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেখানে দাউ দাউ করে জ্বলছে প্রতিশোধস্পৃহা, কিন্তু তিলমাত্র মৃত্যুভয় নেই!

কোন মুখেই সে বস্তু খুঁজে পাওয়া যায় না!—লিখেছেন ফেণী পার্কাস। সে বছর (১৮৩০ ) কিছুদিন তিনি স্লীম্যানদের অতিথি হয়েছিলেন। স্লীম্যানের বিচার-সভা এবং ঠগীদের দণ্ড গ্রহণ দুই-ই তিনি দেখেছেন।—সে এক অদ্ভুত দৃশ্য,—ফেণী লিখছেন,—বিশেষত ওদের অন্তিম মুহূর্তটি। না দেখলে তা বিশ্বাস হত না। একটি তরুণ গলায় ফাঁস পরিয়ে আর সময় নষ্ট করতে রাজী নয়। সে নিজেই

স্বেচ্ছায় উচু থেকে জলে ঝাঁপ দিল ! ফেণী পরে শুনেছিলেন–শুধু মৃত্যুক্ষণে নয়, জীবনেও সমান দুঃসাহসী ছিল এই ছেলেটি। ডিসেম্বরে অমুরপাতিনে ছ’জন পথিককে খুন করে ক’দিনের মধ্যেই আবার ভূপালের বিলসায় ‘ঝিরণী’ দিতে শোনা গিয়েছিল তাকে। অমুরপাতিন জব্বলপুর থেকে একশ’ মাইল পূবে, বিলসা জব্বলপুর থেকে দু’শ মাইল পশ্চিমে! এ ছেলে কাদবে কেন?

শুধু এই একটি তরুণই নয়, সগরের ফাঁসীমঞ্চের দিকে প্রতিদিন এগিয়ে যাচ্ছে অজস্র মানুষ। তাদের কারও চোখে জল নেই। ডাঃ হেনরী স্প্রাই স্লীম্যানের নিকট-আত্মীয়। সগরের ঠগী-কারাগারে তিনি প্রধান চিকিৎসক। জেলখানার ডাক্তার হিসেবে তাঁকে প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখতে হয়। ফেণীর মত তাঁরও সেই এক কথা,সে দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।

পরের দিন ভোরে ফাঁসী হবে। কিন্তু কারও চোখে মুখে লেশমাত্র মৃত্যভয় নেই। কোন কক্ষে কান্না নেই, অনুশোচনা নেই। চিরকালের মতই নিঃশঙ্ক, নিশ্চিন্ত, আনন্দিত। খুনী জীবনে ওদের যেমন কোন দুঃখ ছিল না, মর্ত্যে জীবনের শেষ রাত্রিটিতেও তাদের কারও দুঃখ নেই। কেননা, ওরা ভবানীর সন্তান। ওরা এই মৃত্যুকে মনে মনে ভবানীর দেয় বলেই গ্রহণ করেছে। ওরা বিশ্বাস করে, ভবানী তাঁর সন্তানদের কোলে তুলে নেওয়ার জন্যে হাত বাড়িয়ে বেহেস্তের দুয়ারে বসে আছেন। সারারাত সেই আনন্দে ওরা গান গাইছে। ভবানীর জয়গান !

ভোরে কয়েদখানার দরজায় এসে দাঁড়ায় সারি সারি গাড়ি। ছ্যাকড়া গাড়ি। গান গাইতে গাইতে ঠেলাঠেলি করে ওরা গাড়িতে ওঠে। গলায় তাদের ফুলের মালা। মুখে বিন্ধ্যাচলের জয়গান। খোয়া-ওঠা পথে দুলতে দুলতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে গাড়ি। প্রতিটি গাড়ির আগে পিছে সশস্ত্র সিপাই-সান্ত্রী। ওরা গাড়ির তালে তালে গান গাইছে।

শহরের উত্তরে শহরতলীর এক কোণে বধ্যভূমি। জেলখানা থেকে প্রায় দেড়মাইল পথ। পথের মোড়ে মোড়ে অগণিত দর্শক। তারা কেউ হাসছে, কেউ ব্যঙ্গ করছে, কেউ দুঃখ করছে। কিন্তু ওদের কারও সেদিকে নজর নেই। আনন্দিত যাত্রীদল গান গাইতে গাইতে ফাঁসীমঞ্চের দিকে এগিয়ে চলেছে। কেউ কেউ গলা বাড়িয়ে উকি দিয়ে দেখছে জায়গাটা আর কত দূরে। সঙ্গে সহযাত্রী হয়ে ঘোড়ার পিঠে চলেছেন ডাক্তার। তাকে এদের শেষ নিঃশ্বাসের সাক্ষী থাকতে হবে। তাঁর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ওরা চেঁচিয়ে উঠছে—রুকসৎ ডাক্তার সাহেব! সালাম ডাক্তার সাহেব! -না জেনে কোন অপরাধ করে থাকলে আপন গুণে মাপ কিজিয়ে সাহেব।

ফাঁসীকাঠের সামনে দাড়াবার পরও সেই আনন্দমুখর জীবন। দড়িটা ভার সইতে পারবে কিনা কেউ টেনে টেনে তাই পরখ করছে। কেউ-বা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে, কেউ ফঁসীমঞ্চে দাড়িয়েই বেয়াড়া দর্শকের সঙ্গে রসিকতা করছে, কেউ-বা আপন হাতে গলায় ফাঁস তুলে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে গিঁঠটা কোথায় পড়ল তাই দেখছে। তারপর বিন্ধ্যাচল কি জয় ! ভবানী কি জয়’—বলতে বলতে মৃত্যুলোকে লাফিয়ে পড়ছে। কারও কোন খেদ নেই। ফাঁসীমঞ্চে একমাত্র লক্ষ্য তাদের, সরকারী জল্লাদ হয়েছে বলেই কোন অন্ত্যজ যেন দড়ি পরানোর নাম করে তাদের স্পর্শ না করতে পারে। তার চেয়ে অনেক ভাল এই নিজের দড়ি নিজে পরে ঝুলে পড়া।

এ খবরগুলো স্লীম্যান জানতেন। তিনি জানতেন, ঠগী রণভঙ্গ দিয়েছে। তারা জেনে গেছে হিন্দুস্তানে আর তাদের ঠাঁই নেই। ভবানী ঠগী-জীবনে চিরকালের মত ছেদ টেনে দিয়েছেন। নয়ত কোন কালে কোন মানুষ যা পারেনি, সামান্য ফিরিঙ্গী কেন তা পারবে।—কেন দলের লোকেরা রাজসাক্ষী হবে।—কেনই বা তারা পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত বিদ্যা এমন ভাবে অন্যের হাতে তুলে দেবে । ওরা তাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কারও কোন যাজ্ঞা নেই, কোন প্রার্থনা নেই।

উত্তরের অপেক্ষায় স্লীম্যান আরও ক’মিনিট দাড়িয়ে রইলেন। কিন্তু কোর্ট নীরব। কারও মুখে কোন সাড়া নেই। ম্যাজিস্ট্রেট হুকুমনামায় সই করে নিঃশব্দে কোর্টঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। শুধু পুরানো সহকর্মীরাই লক্ষ্য করলেন, সাহেবের আদালত-ত্যাগের ভঙ্গীটা আজ স্বাভাবিক নয়, একটু অন্য রকম। অন্যদিন তিনি সকলের সঙ্গে কথা বলেন। কোন্ আসামীর জন্যে কি বিশেষ ব্যবস্থা দরকার, তার নির্দেশ দেন। কখনও কখনও ওদেরও কাছে ডেকে ছেলেমেয়েদের কথা জিজ্ঞেস করেন। কোন্ ছেলেটা কি হলে বাবার মন সবচেয়ে খুশী হবে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তা বের করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আজ যেন তিনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। চাপরাশী-খিদমদগার থেকে শুরু করে সেরেস্তাদার-ইনস্পেক্টার সবাই অবাক হয়ে দেখলেন, সাহেব ঘর থেকে বের হয়ে সোজা তাঁর বাংলোর দিকে পা বাড়ালেন।-তবে কি মেমসাহেবের কোন অসুখ-বিসুখ ?

ওরা জানেন না, স্লীম্যান একই দিনে এই দ্বিতীয়বার পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ঘরে ফিরলেন। সকালে একবার তাকে ব্যঙ্গ করে গেছে রাজসাক্ষীরা। ওরা বলে গেছে—কাজ কঠিন হবে আপনার দক্ষিণে। অথচ তিনি জানেন আসল শত্রু তাঁর দক্ষিণে নয়, উত্তরেও নয়,-মধ্যে, মধ্যভারতে। কিন্তু সে কথাটা ওদের কাছে প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। কেননা, এবার নিয়ে তিন বছর হবে। এতদিন ধরে চেষ্টা করছেন, কিন্তু তবুও শত্রুকে জব্দ করতে পারেননি তিনি।ঠগীদের কাছে সে পরাজয়ের কাহিনী তিনি কি করে বলবেন? এ বেলা দ্বিতীয় পরাজয় ঘটে গেছে তার কোর্ট ঘরে। কাল ভোরে মরতে চলেছে মানুষগুলো, অথচ তাদের কোন প্রার্থনা নেই। ওদের সেই নীরবতা, স্লীম্যানের মনে হচ্ছে সে যেন উপহাস। ওদের কোন ভিক্ষে নেই, কারণ ওরা জানে—তাদের যিনি মৃত্যুলোকে পাঠাচ্ছেন তিনি এই সাহেব নয়,—বিন্ধ্যাচলের জননী! সত্যিই তো তাই। তা না হলে যে অবিশ্বাসী এখনও ফেরারী হয়ে আছে, তাকে তিনি ধরতে পারছেন না কেন? কেন দু-দু’বার হাত ফস্কে চলে গেল সে। তবে কি স্লীম্যান একমাত্র তাদেরই ফাঁসীকাঠে দিতে পারে যারা ভবানীর মন বুঝে নিজেরা ধরা দেয়?=অসম্ভব! এ পরাজয় উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যান কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না।

ঘরে ঢুকেই আবার গিয়ে নিজের চেয়ারে বসলেন স্লীম্যান। আবার সেই টেবিল, সেই ফাইল।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। টানা পাখার এখন বিশ্রাম চলছে। টেবিলের এককোণে বাতিদানে একসঙ্গে তিনটি মোমবাতি জ্বলছে। সীম্যান তন্ময় হয়ে ফাইলের পাতা উল্টে চলেছেন। সেই কোন সকালে প্রাতঃরাশ সেরে অফিস ঘরে ঢুকেছিলেন, তারপর সারাদিনে আর খাওয়া হয়নি। দুপুরের খাবার যথারীতি পাশের ঘরে টেবিলে ঢাকা পড়ে আছে। অধিকাংশ দিনই তাই থাকে। সকালের পর খেতে খেতে তাঁর সেই সন্ধ্যা। এমেলি নিজের হাতে টেবিল সাজিয়ে বসে থাকেন। ঠগী’ সোজা সেখানে গিয়ে বসেন। খেতে খেতে সারাদিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা পাড়েন। কখনও কখনও তাঁর সে আলোচনায় খানসামা-বাবুর্চিরাও যোগ দেয়। ঠগী’র ঘরে নোকরী করতে করতে তারাও এখন সেসব কথায় রপ্ত হয়ে গেছে। তাছাড়া স্লীম্যান ওদের পরামর্শও মনোযোগ দিয়ে শোনেন। হাজার হোক, ওরা এদেশের লোক।

সন্ধ্যা পার হয়ে গেল, কিন্তু সাহেবের তবুও ঘরে ফেরার নাম নেই। উৎকণ্ঠিত এমেলি প্রথমে জমাদারকে পাঠিয়ে খোঁজ নিলেন। তারপর আয়াকে নিয়ে নিঃশব্দে অফিস ঘরে এসে চেয়ারের পাশ ঘেঁষে দাড়ালেন। স্লীম্যান তখনও এস্ত হাতে কি যেন লিখে চলেছেন। এমেলির মুখের ছায়াটা কাগজে এসে পড়ল। তিনি কলম থামিয়ে সেদিকে না তাকিয়েই কাগজটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। কৌতুহলী এমেলি ধীরে ধীরে পড়ে গেলেন :

রায় সিং সম্পন্ন জায়গীরদার। জাতে তিনি ব্রাহ্মণ। তাঁর বাড়ীতে একজন মহিলা ছিলেন। তিনি জায়গীরদারের জাতি এবং নিকট-আত্মীয়। সন্তানসম্ভবা বলেই তিনি তখন রায় সিংয়ের ওখানে আছেন। কারণ, স্বামী তার বিদেশে, এ সময়ে মানুষ নিকটজনদের কাছেই থাকে। কিন্তু মেয়েটির ভাগ্য ভাল নয়। কেননা, জায়গীরদার রায় সিং তখন সিন্ধিয়ার কোপদৃষ্টিতে আছেন। প্রায় আঠার হাজার টাকা খাজনা অনাদায়ী পড়ে আছে তার কাছে। রায় সিং কিছুতেই তা শোধ করবেন না। বাধ্য হয়েই সিন্ধিয়াকে অন্য পথ ধরতে হল। খবর এল, সিন্ধিয়া তার বিদ্রোহী জায়গীরদারকে সাজা দেওয়ার জন্যে ফৌজ পাঠাচ্ছেন। সে ফৌজের অধিনায়কত্ব করছে ফরাসী অভিযাত্রী পের। খবর পেয়ে রায় সিংও প্রস্তুত হলেন। তাঁর বাড়ীকে তিনি কেল্লা করে তুললেন।

দুই দলে তুমুল যুদ্ধ হল। যুদ্ধে রায় সিং হেরে গেলেন। পের তার ঘরবাড়ী সব তছনছ করে দিল। বাড়ীর মেয়েপুরুষেরা যে যেদিকে পারলেন পালিয়ে গেলেন। কিন্তু সেই মেয়েটি পালাতে গিয়ে আটকে পড়লেন। আতঙ্কে তিনি বাড়ী থেকে অদূরে পথের ধারে এক শিশুর জন্ম দিলেন। বাইবেলের রীতিতে তাঁর সেই পুত্রের নাম হল—ফিরিঙ্গীয়া। কেননা, ফিরিঙ্গীরা যেদিন ওঁদের ঘর জ্বালিয়ে দেয় সেদিন তার জন্ম।

-সুতরাং, এমেলি নীরবে পড়ে গেলেন—আমাদের সব চেয়ে প্রবল শত্রু যে, সেই ফিরিঙ্গীয়া বড়ঘরের সন্তান। সে সুদর্শন, বলবান, বুদ্ধিমান এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। জীবিকার জন্যে তার ঠগী হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তবুও আজ সে ঠগী। মধ্যভারতে সবচেয়ে নিষ্ঠুর, সবচেয়ে বেপরোয়া ঠগী। তাকে যে পর্যন্ত ধরে এনে ফাঁসীকাঠে না ঝোলাতে পারছি আমরা, ততদিন মধ্যভারতকে এ পাপ থেকে মুক্ত করার কোন পথ নেই। আমার মনে হয় গত বছর একবার আমরা তাকে প্রায় নাগালের মধ্যে পেয়েছিলাম। কিন্তু তবুও তাকে ধরতে পারিনি। এবার যেন আর সেই ভুল না হয়।

এমেলি নিঃশব্দে কাগজটা স্বামীর হাতে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, এবার অবশ্যই আমি তোমাকে সাবধান করব। তোমার নিজের বিবরণ পড়েই আমি তা করতে বাধ্য হচ্ছি।-হেনরী, মাই লাভ, বি কেয়ারফুল !

স্লীম্যান হাসলেন। তারপর বেয়ারাকে ডেকে কাগজটা তার হাতে দিয়ে বললেন, কেরানীকে বলে কাল সকালেই এর কপি যেন প্রত্যেক ইনস্পেক্টারের হাতে পৌঁছায়। তারপর এমেলির হাত ধরে তিনি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। রাত তখন আটটা। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। বাংলোর বাগানে টানা সুরে ঝি ঝি ডাকছে।

সগর থেকে মাত্র কয় ক্রোশ দূরে একটা কুটিরের দাওয়ায় বসে এই অন্ধকারের দিকেই তাকিয়ে ছিল ফিরিঙ্গীয়া। টানা সুরে ঝি ঝি ডাকছে। ক’ সপ্তাহের মধ্যেই আকাশ নিশ্চয়ই ফর্সা হয়ে যাবে । তাকে আবার পথে বের হতে হবে। এবার সে আরও খুন করবে। খুনে খুনে গোটা মধ্যভারত সে কবরখানায় পরিণত করবে। একবার পরখ করে দেখবে, সগরের ফিরিঙ্গী বেশী বল ধরে, না এই ব্রাহ্মণ ফিরিঙ্গীয়া!

স্লীম্যানের কথা ভাবলেই কেন জানি ফিরিঙ্গীয়ার পেশীগুলো চঞ্চল হয়ে ওঠে, মনে হয় এক্ষুনি সে সগরের দিকে ছোটে। সেখানে গিয়ে সোজা সাহেবের সামনে দাড়িয়ে তার বলতে ইচ্ছে করে কোন্ অধিকারে তুমি বিদেশী আমাদের পেশা কেড়ে নিচ্ছ ? কেন তুমি ঠগীদের এভাবে ফাঁসীকাঠে ঝোলাচ্ছ? ওদের কি কেউ নেই? না থাকে, আমি আছি! বাপকা বেটা হও তবে এগিয়ে এস, আমার সঙ্গে পাঞ্জা কষ দেখি! শুনেছি সাহেব, তুমি ফৌজের লোক ছিলে । একদিন আমিও তা ছিলাম। অক্টরলনি সাহেবকে জিজ্ঞেস করো, জানতে পারবে। পেশোয়া বাজীরাওকে জিজ্ঞেস করো, জানতে পারবে। কে না চিনত সেদিনের ফিরিঙ্গীয়াকে। একদিন তুমিও চিনবে। ওঁরা ফৌজী ফিরিঙ্গীয়াকে চিনতেন, তুমি চিনবে ঠগী ফিরিঙ্গীয়াকে; সেই ফিরিঙ্গীয়া—যে আজ আইন জানে না, আইন মানে না, খুন ছাড়া যে আজ আর কিছু ভাবতে পারে না!

দাওয়া থেকে নেমে পথে বের হল ফিরিঙ্গীয়। গা-টা আজই একবার ঘুরে আসা দরকার। এবার আর বর্ষার জন্যে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। এবার তার অনেক দায়িত্ব, অনেক কাজ। এবারও যদি সগরের সাহেবকে সমুচিত শিক্ষা না দিতে পারে সে, তবে হিন্দুস্তানে আর ঠগী থাকবে না, সব ঠগ উজাড় হয়ে যাবে! প্রতিদিন নতুন নতুন দল ধরা পড়ছে, প্রতিদিন অগণিত ঠগী ফঁসীকাঠে প্রাণ দিচ্ছে।—অসম্ভব! ফিরিঙ্গীয়া কিছুতেই তা চলতে দিতে পারে না। এবার সে খুনের পর খুন চালিয়ে যাবে, সাহেবকে জানিয়ে দেবে সব ঠগ এখনও মরেনি, কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছে,—ফিরিঙ্গীয়া এখনও ফিরিঙ্গীয়াই আছে!

বর্ষার পর শরৎ এল, শরতের পর শীত। নভেম্বর উকি দিয়েছে। কিন্তু স্লীম্যান এখনও তার আসল শত্রুর কোন হদিস করে উঠতে পারছেন না। ফিরিঙ্গীয়া তাঁর নিজের দায়িত্ব। তার ভার তিনি অন্য কারও হাতে তুলে দিতে ভরসা পাচ্ছেন না। তা ছাড়া, ফিরিঙ্গীয়া তার জয়-পরাজয়ের শেষ কথা। সে কথাটা তিনি নিজেই শুনতে চান।

সগর থেকে শুধু সে কারণেই তিনি তার দপ্তর আপাতত জব্বলপুরে উঠিয়ে এনেছেন। কেননা, তার ধারণা ফিরিঙ্গীয়া যে জগতের প্রভু জব্বলপুর তার কেন্দ্র। অভিযানের সূচনায় সন্ধান সুরু করেছিলেন তিনি দক্ষিণের শেষ সীমানা থেকে। কারণ, নামটি প্রথম যে ঠগীর মুখে শোনা গিয়েছিল সে ছিল দক্ষিণের লোক। এখন বুঝতে পারছেন তার হিসেবে ভুল হয়ে গেছে। দক্ষিণ ফিরিঙ্গীয়ার ঠিকানা নয়, তার খ্যাতির ভুবনে একটি অঞ্চল মাত্র। সেভাবে খুঁজতে গেলে ফিরিঙ্গীয়ার নাম পূবে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে সব জায়গাতেই পাওয়া যায়। স্লীম্যান তাই এবার অতি সন্তর্পণে তঁার জাল বুনেছেন। শিকারী বাঘের মত তিনি জব্বলপুরে ওঁৎ পেতে বসে আছেন। এবার তার নিভুল হিসেব। শিকারকে কখনও না কখনও সামনে পড়তেই হবে!

বেশী দিন অপেক্ষা করতে হল না। হঠাৎ একদিন ভোরে হাঁপাতে হাঁপাতে সাহেবের সামনে এসে হাজির হল এক চর। —হুজুর, ফিরিঙ্গীয়। এদিকেই আছে। জব্বলপুর থেকে মাত্র তিন ক্রোশ দূরে সে তার ছেলে, বৌ আর মাকে নিয়ে আস্তানা পেতেছে। মতলব কি, এখনও তা বোঝা যাচ্ছে না।  স্লীম্যান তক্ষুনি লোকটির সঙ্গে একজন ঘোড়সওয়ারকে কাছাকাছি থানায় পাঠিয়ে দিলেন। হুকুম গেল, আজ রাতেই হানা দেওয়া চাই। খুব হুসিয়ার ! পাখী যদি শেষ পর্যন্ত উড়েই যায় তবে সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা যেন কিছুতেই হারিয়ে না যায়। ফিরিঙ্গীয়ার অভাবে আপাতত তার মা এবং স্ত্রীও কম মূল্যবান নয় !

দু’দিন বাদে সিপাইরা ফিরে এল। বাংলোর বারান্দায় দাড়িয়ে স্লীম্যান দেখলেন, সঙ্গে ওদের কোন বন্দী নেই। তবে কি শত্রু এবারও আমাকে ফাঁকি দিল ?

জমাদার সেলাম করে সামনে এসে দাড়াল।—হুজুর, ফিরিঙ্গীয়ার মা আর বৌ এই পাল্কীতে আছে। ঠগী আমাদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে। ঘরে ঢুকে আমরা দেখলাম বৌ অঘোরে ঘুমোচ্ছ, পাশের বালিশ খালি। সেই শূন্য শয্যায় একটা গুলীভরা পিস্তল আর এই বন্দুকটি পড়ে আছে। সীমান দেখলেন, দু’টি অস্ত্রই বিলিতি, ইংলিশ মেক। ওদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝতে পারলেন, দোষটা তাঁর ভাগ্যের নয়, যাদের পাঠিয়েছিলেন সেই নাজিবদের। তার বাহিনীতে ওরা নতুন। ওদের পাঠান তার পক্ষে বিবেচনার কাজ হয়নি। তবুও তিনি এখন রীতিমত আশান্বিত। কারণ, টুকিটাকি খবর জোড়াতালি দিয়ে ফিরিঙ্গীয়ার যে মূর্তিটি তিনি মনে মনে গড়ে তুলেছেন, তাতে তাঁর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, প্রবল আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এই ঠগী অচিরেই জব্বলপুরের দিকে পা বাড়াবে। কিছুতেই সে তার মা এবং তার স্ত্রীকে এভাবে দুমনের হাতে লাঞ্ছিত হতে দেবে না। ফিরিঙ্গীয়া এখানে ছুটে এল বলে।

হঠাৎ স্লীম্যানের মনে পড়ল, ফিরিঙ্গীয়ার এক বৈমাত্র ভাই তার হেপাজতে আছে। পরের দিন তার ফাঁসী হবে । পাশে দণ্ডায়মান ইনস্পেক্টারের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ছেলেটাকে একবার এখানে আনতে পারলে মন্দ হতো না! গিয়ে বল, ওর মা আমার এখানে আছে, ইচ্ছে করলে সে তার সঙ্গে শেষবারের মত দেখা করতে পারে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ইনস্পেক্টার ওকে নিয়ে ফিরে এলেন। ফিরিঙ্গীয়ার বুড়ো মা কিছু বলার আগেই ছেলেটি তার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। তারপর কাদতে কাদতে বলল, অনেক ভালবাসা দিয়েছ তুমি। তোমার কোলে-পিঠেই মানুষ হয়েছি। কিন্তু আমি নিতান্ত হতভাগ্য, প্রতিদানে তোমাকে আমি কিছুই দিতে পারলাম না। আজ বাদে কাল মরতে চলেছি, কিন্তু ঋণের দায় সেই তেমনি রয়ে গেল। বুড়ী হাত ধরে তাকে টেনে মাটি থেকে তুললেন। তারপর ছেলেটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, বাছা, তোর সব দেনা আজও আমি ভালবাসায় মিটিয়ে দিলাম। জেনানাদের মত এমন কঁদিস না বাপ, মরছিসই যখন মরদের মত মর!

স্লীম্যান কাছেই দাড়িয়ে ছিলেন। তিনি মা আর ছেলের প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেছেন। তিনি ভেবে পাচ্ছেন না, এ কি করে সম্ভব ? একই মানুষ কি করে যুগপৎ নৃশংস খুনী এবং এমন কর্তব্যপরায়ণ মমতাময় পুত্র হয় ? তাও কি সম্ভব? ফিরিঙ্গীয়ার স্ত্রীকে সামনে বসিয়ে তিনি জেরা শুরু করলেন।

ফুটফুটে তরুণী মেয়ে, সুন্দর চেহারা। ঘোমটার আড়ালে দু’টি বড় বড় ডাগর চোখ দেখা যাচ্ছে। চোখে মুসলমানী রূপসীদের কায়দায় সুর্মা টানা। গলায়, হাতে সুন্দর গহনা। ক্লীম্যান লক্ষ্য করলেন, গহনাগুলো অধিকাংশই সোনার। গলার হারটিতে কয়টি পাথরও রয়েছে।

সাহেব বললেন, তোমার কোন ভয় নেই বহিন। আমি যা জিজ্ঞেস করছি তুমি নির্ভয়ে তার উত্তর দাও। ফিরিঙ্গীয়া ব্রাহ্মণ কি তোমার স্বামী?

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

-সে কি করে, তুমি কি তা জান ?

মেয়েটি এবারও মাথা নাড়ল। তবে এবার তার বক্তব্য উল্টো। ফিরিঙ্গীয়ার বৌ মাথা নেড়ে বলছে সে তা জানে না।

প্রশ্নটা আবার নতুন করে পাড়লেন স্লীম্যান–তুমি বলতে চাও তোমার স্বামী যে মানুষ খুন করে তাদের ধনে তোমাকে সাজায়, সে কথা তুমি জান না?

মেয়েটি এবারও মাথা নাড়ল। সেই একই অনড় বক্তব্য-না।

স্লীম্যান সত্য এবং মিথ্যার ফারাক বোঝেন। তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, এই ‘না’ ঠগী-বৌয়ের সাজানো ‘না’ নয়। মেয়েটি সত্যিই সে খবর রাখে না।।

এবার নতুন প্রশ্ন সাহেবের মুখে—আচ্ছা, যদি আমি প্রমাণ করতে পারি তোমার স্বামী একজন খুনী তবে কি তুমি তাকে ছেড়ে দেবে?

এবারও উত্তর হল–না।

-ছাড়বে না। তারপরও সেই স্বামীকে নিয়ে ঘর করবে তুমি?

-হ্যাঁ। ঘাড় নেড়ে জবাব দিল মেয়েটি।

স্লীম্যান বললেন, আচ্ছা এবার তুমি যেতে পার। ইনস্পেক্টারের দিকে ঘুরে তিনি বললেন, জেলে ওদের জন্যে আলাদা বাবস্থা করো। দেখো, ওদের যেন কোন কষ্ট না হয়। ওর স্ত্রীকে দেখবার পর ফিরিঙ্গীয়া এখন ফ্লীম্যানের কাছে আরও স্পষ্ট। সে শুধু সুদর্শন এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষই নয়, তার নিশ্চয় একটা প্রকাণ্ড হৃদয়ও আছে। এমন হৃদয় যেখানে পরিমাণহীন হিংস্রতার পাশাপাশি অফুরন্ত ভালবাসাও আছে। নয়ত এমন রূপসী তরুণীর মুখে নিশ্চয় এমন উত্তর পাওয়া যেত না। বিশেষ ক্লীম্যান আগেই খবর নিয়ে জেনেছেন, ফিরিঙ্গীয়ার স্ত্রী যে সে কোন গরীবের ঘরের মেয়ে নয়। ফিরিঙ্গীয়ার মতই সেও সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান। এদের পরিবার ঝাঁসী এবং সুমতুরে রীতিমত সুখ্যাত ঘর। সুতরাং শুধু ভাত-কাপড় আর সোনা-দানার লোভে এ মেয়ে কোন খুনীকে ভালবাসতে পারে না! নিশ্চয় সে আর কোথাও বাধা আছে। ফ্লীম্যান জানেন, সে বাঁধন শুধু হিন্দুর স্ত্রী-ধর্ম নয়, তার অনেকখানিই ভালবাসা। এ ভালবাসার টানেই খুনী একদিন ফিরে আসবে খাঁচার আশেপাশে।

ফিরিঙ্গীয়া তাই আসছিল।

পাখী যেমন করে খাঁচার বন্দী সঙ্গিনীর দিকে ছুটে আসে ঠিক সেই ভাবে, উড়ে উড়ে এদিক ওদিক থেমে থেমে। তবে ফিরিঙ্গীয়া টিয়া ময়না নয়, সে দুরন্ত ঈগল। তার পাখায় যেমন বেগ, চোখে তেমনি তীক্ষ্ণ নজর । সে শুধু সাবধানীর মতই সগরের দিকে এগিয়ে আসছে না, দিগ্বিজয়ী বীরের মত প্রতি মাইল পথ জয় করে সগৌরবে এগিয়ে আসছে। যেখানেই তার পা পড়ছে সেখানেই ‘ঝিরণী’ উঠছে। নিঃশব্দে মানুষ কবরের তলায় হারিয়ে যাচ্ছে । ফুল-ছড়ানো পথে নয়, প্রকৃত মরদের মত প্রতি পায়ে মৃতদেহ ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে ফিরিঙ্গীয়া তার ভালবাসার মানুষের দিকে এগিয়ে চলেছে। স্লীম্যানকে সে দেখাবে হিন্দুস্তানীরাও তাদের মা-বোন স্ত্রী-পুত্রের ইজ্জত বাঁচাতে জানে! দরকার হয় সে খাঁচা ভাঙবে, গোটা সগর জ্বালিয়ে দেবে।

ফিরিঙ্গীয় এগিয়ে চলেছে।

বাড়ী ছেড়েছিল সে সেই কবে! সঙ্গে ছিল মাত্র পঁচিশ জন অনুচর। ফিরিঙ্গীয়া তবুও একবারের জন্যেও ভাবেনি যে সাহেবের তুলনায় সে কত কমজোরী। বেপরোয়ার মত মোগলসরাইয়ের পথ ধরে এগিয়ে চলেছিল সে। সামনে দু’জন মারাঠা পথিক পড়েছিলেন, নিমেষে তারা উধাও হয়ে গেলেন । আরও মাইল তিন এগিয়ে গেল সে। সেখানে গিয়ে নতুন কোন শিকার পাওয়া গেল না বটে, কিন্তু লাভ হল, দলপতি আরও এগার জন ঠগ হাতে পেয়ে গেল। ওদের নিয়ে সে ইন্দোরের রঘুঘরের দিকে পা বাড়াল। সেখানে পাওয়া গেল দু’জন মারাঠা এবং একজন মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীকে। ওঁরা সগর থেকে ইন্দোরে ফিরছিলেন। তারাও যথারীতি কবরে প্রেরিত হলেন। ক’দিন পরেই স্বরূপ সিং এবং তার দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ওর দলে ছিল পনের জন ঠগ, ফিরিঙ্গীয়া তাদেরও সঙ্গে নিল। পরের দিনই ইন্দোর থেকে পাটনের পথে তিনজন পথিক হারিয়ে গেলেন। তার পরের দিন দু’জন। দু’দিন পরে নর্মদার পাগলানাঘাট পেরিয়েই আরও তিন জন। এবার যারা গেল তারা সিপাই।

খুনের পর খুন করে বেপরোয়ার মত এগিয়ে চলেছে ফিরিঙ্গীয়। এবার আর তার মনে দয়া নেই, মায়া নেই, ভালবাসা নেই। একদা বাজীরাওয়ের ঘরের মেয়েকে হাতে পেয়েও ছেড়ে দিয়েছিল সে, এবার আর তা হবে না। যাকে পাবে ফিরিঙ্গীয়া তাকেই হত্যা করবে। নারী হোক পুরুষ হোক, ধনী হোক গরীব হোক, ফিরিঙ্গীয়া এবার কাউকে বাদ দেবে না। সাহেব তার মাথায় আগুন যখন জ্বালিয়েছে তখন সে আগুনের দহন পোয়াতেই হবে। ফিরিঙ্গীয়ার ঘরে আগুন ধরিয়ে মানুষের সাধ্য কি শান্তিতে ঘর করে।

হাতের লোটাটায় মাথায় জল ঢালতে ঢালতে মনে মনে হিসেব করছিল ফিরিঙ্গীয়া—শ পূর্ণ হয়েছে, মেয়েদের ধরলে একশ’ পাচজন। –আরও চাই তোমার সাহেব ? আচ্ছা, তাও পাবে ! মাথায় জল ঢালতে লাগল ফিরিঙ্গীয়া। জলটা ভাল । যেমন পরিস্কার তেমনি ঠাণ্ডা। ঝরণাটার কি নাম ভুলে গেছে ফিরিঙ্গীয়া। তার ‘শুধু মনে আছে জায়গাটা সগর থেকে খুব দূরে নয়। বিল থেকে বড়জোর মাইল দশেক হবে। আর কয়েক মাইল পরেই সগর। ভাবতে ভাবতে ফিরিঙ্গীয়া এবার জলে নেমে পড়ল। দুপুর গড়িয়ে এসেছে, জলের ঢেউয়ে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গাছের ছায়াগুলো দৈত্যের মত নড়ছিল। ফিরিঙ্গীয়া ডুব দিয়ে উঠতেই সেগুলো খেলনার মত ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ঠগীদের রাজা ফিরিঙ্গীয়া ব্রাহ্মণ সেদিকে তাকিয়ে ভারি মজা পেল। ইচ্ছে করেই সে আবার আর একটা ডুব দিল, তারপর আর একটা। হঠাৎ নিঃঝুম বনভূমি কঁপিয়ে কর্কশ গলায় কি যেন একটা চেঁচিয়ে উঠল। হাতের চেটো কানের পাশে বাঁকিয়ে ধরে উৎকর্ণ ফিরিঙ্গীয়া ঘাড় কাত করল। পেঁচাটা আবার ডেকে উঠল। ফিরিঙ্গীয়া হাতটা তেমনি কানে রেখেই সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পেছনে তাকাল ।

পেছনে গাছতলায় বসে জটলা করছে তার চল্লিশ অনুচর। সাঙ্গে একপাশে আরও কয়জন মানুষ। দেখলে বোঝা যায় তারা এপাশের বড় দলটির সঙ্গী মাত্র, তার বেশী কিছু নয়। ফিরিঙ্গীয়ার বাসনা, সগরের প্রবেশদ্বারে এদের কবর দিয়ে সে সগরে ঢোকে। সিংহের গুহার সামনে রক্তচিহ্ন রেখে গুহায় উকি দেয়। কিন্তু অসময়ে এই পেচকধ্বনি কেন ?—তবে কি দেবী তার মতলব সব বানচাল করে দিতে চলেছেন ?—অসম্ভব। তা হতে পারে না।–ফিরিঙ্গীয়া ব্রাহ্মণের মত এত নরমুণ্ড কেউ তাকে দিতে পারেনি। তার সঙ্গে নেমকহারামী করতে পারেন না, তিনি এত নির্দয় হতে পারেন না।

সর্দারের পেছনেই ঘাসে বসে গা রগড়াচ্ছিল তার সহকারী খারহোর। সে চেঁচিয়ে উঠল—জমাদার, চিড়িয়া! চিড়িয়া !!

কান থেকে হাতটা মুখে সরিয়ে নিয়ে এল ফিরিঙ্গীয়া—চুপ? চেঁচামেচি করবে না। মিছিমিছি লোকগুলো ভয় পাবে। আমিও শুনেছি, এ ভয়ের কিছু নয়।

হাতের গামছাটা কোমরে জড়িয়ে সর্দারের আরও কাছে এসে দাড়াল খারহোরা। কিন্তু জমাদার, এ চিড়িয়া সর্বনাশা ধমকে উঠল ফিরিঙ্গীয়া—হয়েছে, আমাকে আর শেখাতে হবে না ! আমি এর আগেও বার কয় পরখ করে দেখেছি, চিড়িয়া ভবিষ্যতের কথা বলে ; যেদিন ডাকে সেদিনের কথা নয়! সুতরাং, তুমি যাও, নির্ভয়ে যাত্রার উদ্যোগ-আয়োজন কর !

তল্পিতল্পা বেঁধে ধীরে ধীরে উঠে দাড়াল দলটা। আগে আগে দলপতি ফিরিঙ্গীয়া, পেছনে তার অনুচরেরা। মাঝখানে সেই পথিকেরা। পাহাড়িয়া পথে ওরা ধীরে ধীরে সগরের দিকে এগিয়ে চলেছে। ধুলো উঠছে, মানুষের কাকলি শোনা যাচ্ছে। নিশ্চিন্ত ফিরিঙ্গীয়া স্লীম্যান সন্দর্শনে চলেছে। সে জানে না, আজ সকাল থেকেই নিরাপদ ব্যবধান রেখে স্লীম্যান তার পিছু পিছু হটছেন। সাহেব স্বয়ং নন, তাঁর অনুচরেরা। তারই পরামর্শ মত একদল পাকা সেপাই পথিকের বেশে ওর পেছনে পেছনে হাঁটছে। তাদের পেছনে আর একদল ঘোড়ার পিঠে আসছে। সাহেব এবার অতিশয় সতর্ক। তিনি আর সময় দিতে রাজী নন।

সন্ধ্যায় একটা গাঁয়ের পাশে এসে থামল ফিরিঙ্গীয়ার দল। গাঁয়ের নাম, মারী। দলপতির ইঙ্গিতে অনুচরের গাছতলায় বিশ্রামের আয়োজন করতে লাগল। ঘোড়াটাকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে ফিরিঙ্গীয়া গাঁয়ের দিকে চলল। খারহোরাকে বলে গেল, তুমি যখন কথাটা বললেই তখন প্যাটেলের কাছ থেকে একটু খবর নিয়ে আসি ! জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যাবে, পথে বিপদের কোন সম্ভাবনা আছে কি নেই। চিড়িয়া নিয়ে মিছিমিছি এমন মুখভারী করে বসে থাকার মানে হয় না।

কিছুদূর যেতে না যেতেই একজন গাঁয়ের মানুষের সঙ্গে দেখা। তাকে থামিয়ে ফিরিঙ্গীয়া কথাবার্তা শুরু করল। এদিকে দিনকাল কেমন চলেছে, গমের দর কি, খাজনা আদায়ে জবরদস্তি কেমন, ঠগীদের উৎপাতই বা কি ধরনের ! নানা কথা-য সময় পড়েছে, ঠগীতে দেশ ছেয়ে গেছে ! ফিরিঙ্গীয়া বলে চলেছে—সগরের সাহেবের কি করছে, বসে বসে ঘোড়ার ঘাস কাটছে ? পথিক যদি নিশ্চিন্ত মনে মাল-জান নিয়ে পথই না চলতে পারল তবে এমন ফিরিঙ্গী রাজত্বে আমাদের দরকার কি ?

আলাপ জমে উঠেছে। হঠাং অদূরে কলকোলাহল, চিৎকার। লোকটিকে সেখানেই থামিয়ে দিয়ে ফিরিঙ্গীয়া সেদিকে ছুটল। কপা গিয়েই থমকে দাড়াতে হল তাকে। চোখের সামনে অবিশ্বাস্য দৃশ্য। একদল সিপাই তার দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অসংখ্য লোক। তাদের প্রত্যেকের হাতে হাতে বন্দুক। শেয়াল যেমন করে মুরগীর ছানা ধরে তেমনি ওরা ঠিক সেভাবেই ঠগীদের ধরছে। ভয়ে দড়ি ছিড়ে ঘোড়াটা এদিকে ছুটছে।  আর এক মুহূর্তও ভাবল না ফিরিঙ্গীয়া। গাছতলায় না গিয়ে সে ঘোছার পেছনে ছুটতে লাগল। গাঁয়ের সীমানা পার হয়ে প্রায় এক মাইল ছুটে তবে তাকে ধরা গেল। সঙ্গে সঙ্গে ফিরিঙ্গীয়া লাফিয়ে তার পিঠে চড়ে বসল। তারপর চোখের নিমেষে সামনের অন্ধকারে মিশে গেল।

সগরের বাংলোয় সেই হৃদয়বিদারক খবর পোঁছল। পরাজিত স্লীম্যান আবার ঘাড় হেঁট করে নিজের টেবিলে গিয়ে বসলেন। দক্ষিণ পরিষ্কার হয়ে এসেছে, কিন্তু মধ্যভারতে এখনও সেই বিষবৃক্ষ সগৌরবে দণ্ডায়মান। ফিরিঙ্গীয়াকে এখনও ধরা গেল না।—ধিক স্লীম্যান, ধিক! এই তোমার ক্ষমতা !  আবার সেই ফাইল, সেই মানচিত্র, সেই দিস্তা দিস্তা জবানবন্দী। দলের চল্লিশজনের মধ্যে আটাশ জনকে ধরে আনতে পেরেছে ওরা। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু বলেছে। কিন্তু দলপতি তাদের কোথায় যেতে পারে সে সম্পর্কে সবাই নীরব।—আমরা তা বলতে পারব না ।

স্লীম্যান সর্বশেষ মানচিত্রটা টেবিলে রাখলেন। তারপর মনে মনে বললেন—এই হচ্ছে বিলসা,-নাঃ, দলহারা দলপতি এখন আর একাকী এখানে ঘুরে বেড়াবে না। পাশে দণ্ডায়মান অফিসারটির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, তোমরা বরং এখানটায়, এই ঝাঁসীর দিকে এগিয়ে যাও। সেখানে ঠগীদের একটা পুরানো ‘বাগ আছে। আমার ধারণা সেখানে বসে সে নতুন করে দল গড়ার চেষ্টা করবে। হয়ত ইতিমধ্যে তা গড়েও ফেলেছে। সুতরাং, হাতের পেন্সিলটায় কপালে টোকা দিতে দিতে স্লীম্যান বললেন, সুতরাং তোমরা এক কাজ কর, তোমরা বাঁয়ের এই গ্রামটিতে খোঁজ কর। যদি সেখানে কোন খবর না পাওয়া যায়, তবে এপাশের সারিটায় খোঁজ করবে, প্রত্যেকটি গায়ে হানা দেবে।—-আমার ধারণা, পাখী এদিকেই কোন কুঞ্জে আছে!–হু, আর একটা কাজ করবে, ধন সিং আর সোগর এই দু’জন রাজসাক্ষীকে পথে ছেড়ে দিয়ে যাবে। ওরা যেন। রানার সঙ্গে নিয়ে চারদিকে হুল রেখে চলে। যখন যে খবরই পাও আমাকে জানাবে।

যথারীতি এবারও নির্ভুল অনুমান। সত্যি সত্যিই ঝাঁসীর সেই পায়ের দিকে চলেছে নিঃসঙ্গ ফিরিঙ্গীয়। সারা রাত ঘোড়া ছুটিয়ে দিকেই সে আসছিল। পথে বারোজন অনুচর আবার তার সঙ্গ নিয়েছিল। কিন্তু ফিরিঙ্গীয়া তাতে রাজী হয়নি। সে জেনে গেছে বারোজন মানুষ নিয়ে এখন আর সাহেবকে চ্যালেঞ্জ করা চলে না। গত সন্ধ্যার সেই ঘটনার পর তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, সে এখন জালে পড়েছে। যেখান থেকে স্লীম্যান তার লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেলেন সেখানে কোনদিন ফিরিঙ্গী একাজ করতে পারবে স্বপ্নেও সে তা ভাবেনি। কে জানে এই লোকগুলো, তার এই অনুচরগুলোই, হয়ত কখন সিপাই হয়ে তাকে ঘিরে ধরবে। তার আর কাউকে বিশ্বাস নেই। তাই বলে কি ফিরিঙ্গীয়া ব্রাহ্মণ আত্মসমর্পণ করবে ? না, তাও হয় না। ফিরিঙ্গীয়া আবার দল গড়বে। এমন দল যা বান্দা নয়—মরদের দল, শাবলের মত মজবুত, বাঘের মত হিংস্র। সে দল নিয়ে সে ঝাঁসীর পথে পথে আর গরীব খুন করবে না, সগরের পাকা পথে সাহেবদের কবর দেবে। সব। সাহেবকে নয়, স্লীম্যান সাহেবকে, তার অনুচর ফিরিঙ্গীগুলোকে। ফিরিঙ্গীয়ার সে কাহিনী চিরকালের মত হিন্দুস্তানের মানুষের মুখে মুখে ঘুরবে।

বিবাগীর মত পুরানো দল দু’হাতে চারপাশে ছিটিয়ে দিয়ে ফিরিঙ্গীয়া নতুন দলের সন্ধানে কাসীর দিকে পা বাড়াল। বড় রাস্তা ছেড়ে সে সেই গাটির দিকে এগিয়ে চলল—স্লীম্যান যার নামটির নীচে পেন্সিলে একটা ছোট্ট দাগ কেটেছিলেন।

গ্রামটির নাম—কিসরাই। ছোট্ট গ্রাম। দু’চারজন বাদ দিলে অধিকাংশই গরীবের ঘর। দেখলেই বোঝা যায় কিসরাই খুব বর্ধিষ্ণু গ্রাম নয়। তার একটা কারণও আছে অবশ্য। কিসরাইয়ের পরেই পর পর কাছাকাছি আরও অনেকগুলো গ্রাম। একসঙ্গে এতগুলো গ্রাম যেখানে, সেখানে কোন গাঁয়ের পক্ষেই চেহারায় বা চরিত্রে খুব লোভনীয় হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। ফিরিঙ্গীয়া তবুও কিসরাইকে মনে মনে তার ঠিকানা করে নিল। কেননা, এই জঙ্গলেই লুকোচুরি খেলতে বেশী সুবিধে।

ইনস্পেক্টার এবং তার সঙ্গী চারজন দ্রুতপায়ে গ্রামে এসে ঢুকলেন। পেছনে পেছনে ছুটে এল ‘ঠগী’র রানার—এখানে নয়, পাখী আকাশের রং থেকে আরও নিরাপদ শাখা খুজছে। সে ঐ পাঁচটি গ্রামের কোন একটিতে আছে। সাহেব আপনাকে বিশেষ করে মনে রাখতে বলেছেন, ফিরিঙ্গীয়া ব্রাহ্মণ কোথাও তেরাত্তির বাস করে না! কাগজটিতেও তাই লিখে পাঠিয়েছেন স্লীম্যান-রিমেম্বার, দিস ঠগ নেভার স্পেন্ট মোর দ্যান টু সাকসেসিভ নাইটস ইন এনি ভিলেজ ।

ইনস্পেক্টার কাগজটা সাবধানে পকেটে ভাজ করে রেখে নিঃশব্দে পরের গাঁয়ের দিকে যাত্রা করলেন। গাঁয়ে ঢোকার আগেই রাজসাক্ষী ধন সিং সেলাম করে তার সামনে এসে দাড়াল।–সাহেবের হুকুম, আমাকে সঙ্গে থাকতে হবে। নয়ত, আপনি যদি ঠিক চিনে উঠতে না পারেন?

ভোর রাত্রে ওরা গায়ের মোড়লের বাড়ী হানা দিলেন । ফিরিঙ্গীয়া সেখানে নেই। তবুও মোড়লকে ছাড়া গেল না। স্লীম্যানের আদেশ। যে গাঁয়েই হানা দেবে সেখানেই প্রথমে মোড়লকে ধরবে।

দু’জন সিপাইয়ের হেফাজতে বন্দীকে রেখে ইনস্পেক্টার পরের গ্রামের দিকে এগিয়ে চললেন। পরের দিন রাত্রে দ্বিতীয় মোড়ল ধরা পড়ল। আরও দু’জন সিপাই সেখানে আটক রয়ে গেল। ইনস্পেক্টার ভেবে পাচ্ছেন না একজন মাত্র রাজসাক্ষী নিয়ে এমন খুনীকে তিনি কি করে কব্জা করবেন ! তবুও তিনি নির্ভয়ে তৃতীয় গায়ের দিকে পা বাড়ালেন। কেননা, এক সঙ্গে অনেকদিন কাজ করছেন, ‘ঠগীকে তনি চেনেন। সময়ে তার সাহায্য নিশ্চয় এসে হাজির হবে ।

তৃতীয় গ্রামের মুখে দ্বিতীয় রাজসাক্ষী সোগর এসে মিলিত হল তার সঙ্গে। কানে কানে বলল, হুজুর, নিশানা ভুল হচ্ছে। আমি নিজে দেখে এলাম যে গ্রামটি দু’দিন আগে আপনি ছেড়ে এসেছেন ফিরিঙ্গীয়া সেখানেই আছে, সেই কিসরাইতে। রাত ভোর হওয়ার আগেই আমাদের সেখানে পৌঁছান দরকার!

ইনস্পেকটার তৎক্ষণাৎ সেদিকে ঘোড়ার মুখ ঘোরালেন।

বাড়ীটার সামনে এসে ধন সিং আর সোগর ইনস্পেক্টারের কানে কানে কি যেন বলল। তারপর নিঃশব্দে এগিয়ে গেল ঘরটির দিকে। ওদের দরজা খোলার শব্দে ফিরিঙ্গীয়ার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। আজকাল ঘুম আরও হাল্কা হয়ে গেছে তার। আজ কতকাল মাকে দেখে না, বৌকে দেখে না, ছেলেটা নিশ্চয় আরও বড় হয়ে উঠেছে এতদিনে। রাত হলেই ফিরিঙ্গীয়ার বুকটা যেন কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। এভাবে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর কোন অর্থ হয় না। পিছু পিছু সাহেবের চোখ তাড়িয়ে ফিরছে। নতুন দল গড়বে, তার সুযোগ কোথায়? তার চেয়ে সেই বোধহয় ভাল-ধরা পড়া।বৌটাকে, ছেলেটাকে দেখতে দেবে নিশ্চয়।

ধন সিং আর সোগর একসঙ্গে ওর ওপর লাফিয়ে পড়ল। ফিরিঙ্গীয়া ওদের দরজা খুলতে দেখেছে, খাপ ধরতেও দেখেছে। কিন্তু তবুও সে বালিশ থেকে মাথা তোলেনি, ঠগীদের রাজার আর লড়াইয়ের মেজাজ নেই। শুয়ে শুয়েই সে ধরা দিল। শুধু একবার পুরানো সঙ্গী ধন সিংয়ের পিঠে দুটো থাপ্পর দিয়ে বলেছিল -সাবাস ঠগ ! এই তত চাই!

ঘোড়ার পিঠে সে বিজয়বার্তা সগরের দিকে ছুটল।

কিন্তু আশ্চর্য, পুরো ঘটনার বিবরণ শুনে স্লীম্যান যেন কেমন মিইয়ে গেলেন। তাঁকে শুধু একটি কথা বলতে শোনা গেল – হুঁ! এবার আর তাহলে পালাবার চেষ্টা করেনি সে?

এই প্রশ্নের পর অতঃপর সাহেবের মনের কথা গোপন থাকার কথা নয়। ইনস্পেক্টার ঘাড় হেঁট করলেন। ফিরিঙ্গীয়ার বিনা প্রতিরোধে এই আত্মসমর্পণের অপরাধ যেন তাঁরই। স্লীম্যান বললেন, সেই আশ্চর্য মানুষটিকে আমি একবার দেখতে চাই। আজই নয়—দিন কয় পরে।

নির্দিষ্ট দিনে বন্দীকে স্লীম্যান-সমীপে হাজির করা হল।

সময়টা আগেই জানা ছিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সাহেব একটা ফাইল খুলে বসলেন। তিনি যে মনে মনে ওর জন্যে অধৈর্য হয়ে উঠেছেন সে খবরটা গোপন করা দরকার। ঘরে একসঙ্গে অনেকগুলো পায়ের শব্দ। স্লীম্যান জানেন ওরা কাকে নিয়ে এসেছে। সামনে নিশ্চয় দাড়িয়ে আছে তার ধ্যানের খুনী ফিরিঙ্গীয়া ইয়া উচু মস্ত চেহারা, সবল হাতের শেষে নিপুণ ক’টি আঙ্গুল। বড় বড় দুটি চোখ মেলে মানুষটি নিশ্চয় তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিন্তু সাহেব তবুও একবার মুখ তুলে তাকালেন না তার দিকে। দেওয়ালঘড়িটা টিক টিক করছে। মৌন ফিরিঙ্গীয়া পাথরের মূর্তির মত সামনে দাড়িয়ে আছে। তার দু’পাশে ছ’ জন সশস্ত্র প্রহরী। তারাও নির্বাক। মনে মনে দৃশ্যটা কল্পনা করতে গিয়ে ফাইলের পৃষ্ঠায় যেন আরও মনোযোগী হয়ে উঠেছেন ক্লীম্যান, সামনে তখনও তেমনি দাড়িয়ে আছে তার সেরা শিকার ফিরিঙ্গীয়া। সেই ফিরিঙ্গীয়া ব্রাহ্মণ যাকে হাতে না পেলে তার সব শ্রম, সব উদ্যোগ বিফল হয়ে যায় ; যে তার কর্মজীবনে শ্রেষ্ঠতম বরমাল্য!

বাধ্য হয়ে আরও দু’পা এগিয়ে গেল জমাদার, হুজুর, ফিরিঙ্গীয়া ! -ফিরিঙ্গীয়া? যেন জীবনে তিনি নামটা এই প্রথম শুনলেন। ফাইল থেকে ধীরে ধীরে মুখ তুলে স্লীম্যান বীর মুখের দিকে তাকালেন, তারপর হিন্দুস্তানীতে জিজ্ঞেস করলেন, তা, কি চাই তোমার ?—স্লীম্যান যেন এখনও সেই ফাইলেই আছেন।

ফিরিঙ্গীয়া জবাব দিলসাহেব, তুমি আমার মা, বৌ আর ছেলেকে আটকে রেখেছ!

স্লীম্যান বললেন, হু, সত্য বটে। ওরা আমার কাছেই আছে।

ফিরিঙ্গীয়া বলল, সাহেব, আমি নির্দোষ গায়ের লোক। কেন মিছিমিছি তুমি আমার পরিবার-পরিজনের ওপর জবরদস্তি করছ? আমাকেই বা কেন ধরিয়ে এনেছ? কেন সাহেব তুমি আমাদের ওপর অত্যাচার করছ ?

স্লীম্যান লক্ষ্য করলেন, ফিরিঙ্গীয়া উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। তার গলার স্বর কঁপছে। চোখের সাদা এলাকাটা ক্রমে লাল হয়ে এসেছে। যাক্, ক্রুদ্ধ ফিরিঙ্গীয়াকেও তাঁর একবার নিজের চোখে দেখবার বাসনা ছিল, সেটা পূর্ণ হল। তিনি এবার সোজা ফিরিঙ্গীয়ার চোখের দিকে তাকালেন, তারপর চোখটা সেখানেই বিধিয়ে রেখে বললেন, তাহলে তুমি নির্দোষ ?

-হ্যাঁ, সাহেব। বিন্দুমাত্র ভয়ের লক্ষণ নেই ফিরিঙ্গীয়ার গলায়।

—চুপ রও শয়তান! হঠাৎ সিংহের মত গর্জন করে চেয়ারটাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে লাফিয়ে উঠে দাড়ালেন জীম্যান। তারপর অনর্গল রামসীতে বলে চললেন নির্দোষ ফিরিঙ্গীয়ার নির্দোষিতার বিবরণ।  ফিরিঙ্গীয়া নির্বাক। এতটা সে আশা করেনি। তার সবচেয়ে গোপন খুনটিরও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে চলেছেন সাহেব। মন্ত্রমুগ্ধ ফিরিঙ্গীয়া ভেবে পাচ্ছে না, এ কি করে সম্ভব? অবাক হয়ে সে সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

পুরো আধ ঘণ্টা একটানা গর্জন করে চললেন স্লীম্যান। তারপর কথা থামিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালেন। ফিরিঙ্গীয়া তখনও অবাক হয়ে সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে। সে যেন কোন মরা মানুষ, তার যেন চৈতন্য লোপ হয়ে গেছে। স্লীম্যান অফিসারদের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ইঙ্গিত করলেন। তারপর ধীর গলায় বললেন—বল, রাজসাক্ষী হতে রাজী। এখনও ভেবে দেখ, সময় রইল এক মিনিট। পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে টেবিলে রাখলেন স্লীম্যান, তারপর জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। কোথাও কেউ নেই, শুধু দেওয়ালঘড়িটা টিক টিক করছে।

মুহূর্ত পরেই আবার ঘুরে দাড়ালেন ফ্লীম্যান। ঠগীদের রাজা ফিরিঙ্গীয়া তখন যেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। জীম্যান অবাক হয়ে দেখলেন, শাল গাছের মত প্রবল মানুষটা ঘাড় হেঁট করে দাড়িয়ে আছে, তার গাল বেয়ে জল পড়ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *