ঠগী – ১

পর্ব ১

হারিয়ে গেলেন।

ভূপাল থেকে আউরঙ্গাবাদের পথে হাঁটছিলেন দুই মুসলমান পথিক। দুই জনের হাতে দুই গাদা বন্দুক। সঙ্গে একটি ছোট্ট আরবী ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে সওদা।

রুক্ষ পাহাড়িয়া পথ। মাইলের পর মাইল জনহীন উপত্যকা। দিনান্তে কখনও কাটাগুল্মের ঝোপের মত এক-আধখানা গ্রাম। চলতে চলতে ওঁরা তাপ্তী নদীর তীরে এসে হাজির হলেন।

তাপ্তীর সেই নামহীন ঘাটে সেদিন যেন কোন পীরের মেলা। এখানে ওখানে গাছতলায় রাশি রাশি মানুষ। কেউ রসুই পাকাচ্ছে, কেউ তামাক খাচ্ছে, কেউ গলা ছেড়ে গান গাইছে। বিন্ধ্যাচলের গান। তাদেরই একজন এগিয়ে এসে সালাম জানাল। বলল, আমার নাম বোসন জমাদার, দেশ ঝাঁসীর পুরা গা। দলে আমরা পাঁচ কুড়ি তিন গণ্ডা। আমরাও আউরঙ্গাবাদের যাত্রী। আর একজন দু’থালা খাবার নিয়ে এগিয়ে এল। বলল, খেতে বসেছিলাম, আপনারা মেহমান, বহু দূর হেঁটে এসেছেন, আপনাদের না দিয়ে খেলে গুনহ। হয়!

দেখতে দেখতে দু’দলে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। খাওয়া-দাওয়া সেরে নিশ্চিন্ত পথিকেরা একসঙ্গে চলতে আরম্ভ করলেন। তাই ভাল। নির্জন পথ-ঘাট, দিনকাল ভাল নয়, দল যত বড় হয় ততই মঙ্গল। বোরহানপুর পেছনে পড়ল। ঝাঁসীর একশ’ বারো মানুষের বিরাট বাহিনীর সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন ভূপালের কারবারী-যুগল। এবার আর কোন ভয় নেই তাদের, কোন দুশ্চিন্তা নেই। যেখানেই রাত হোক, রাত্রি নিয়ে কোন ভাবনা নেই।

সন্ধ্যা যখন নামল ওঁরা তখন আরও ছ’ ক্রোশ দক্ষিণে, একটি গাঁয়ের বাঁয়ে। গায়ের নাম—তানকোলি। বোসন জমাদার বলল, সেই ভাল, রাতটা এখানেই কাটান যাক। অদূরে সন্ধ্যার শান্ত গ্রাম। কালো কালো কুঁড়েগুলোর পিঠ ফুড়ে ধীরে ধীরে ধোঁয়া উঠছে। রাত্তিরের খাবারের আয়োজন হচ্ছে। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। যেন এক ঝাঁক জোনাকী স্থির হয়ে আছে। চারদিকে তাকিয়ে ভূপালের মানুষ দু’জনও সায় দিলেন, হ্যা, সেই ভাল।

ঘোড়ার পিঠ থেকে বোঝা নামান হল। আম্রকুঞ্জের ধারে ছাউনি পড়ল। কেউ রুটি বানাতে বসল, কেউ তামাক সাজাতে, কেউ ধারে কাছে শুকনো ডালপালা কিছু পাওয়া যায় কিনা! তাই দেখতে বেরিয়ে গেল।

হাতে হাতে কাজ। দেখতে দেখতে আয়োজন শেষ। সন্ধ্যার দুই ঘড়ি পরেই খাওয়া-দাওয়া সম্পূর্ণ। রোসন জমাদার নিজে অতিথি দু’জনের পাশে বসে এক সঙ্গে খেল। খাওয়া শেষে নিজে গিয়ে তামাক সেজে নিয়ে এল। তারপর বসল গল্পে।

নানা রাজ্যের নানা গল্প। শুনতে শুনতে চোখ জড়িয়ে আসে। তবুও জোর করে জেগে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। বহু দেশ দেখেছেন ভূপালের এই দুই কারবারী। কিন্তু এমন মিষ্টি গলা, গল্প বলার এমন ভঙ্গী—আর কোনদিন শুনেছেন বলে মনে পড়ে না। ওঁরা ঠায় জেগে বসে রইলেন। মাঝে মাঝে তামাক আসছে, জমাদার গুর গুর করে তাই টানছে; বাতাসে মিষ্টি গন্ধ, ওঁরা তন্ময় হয়ে বোসন জমাদারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।

তাই ছিলেন। রাত ক’ঘড়িত কেউ তা জানে না, কিন্তু রোসন জমাদার নিজে বলেছে, ভূপালের কারবারী দু’জন তার মাদুরে বসেই গল্প শুনছিলেন। বোরহানপুর থেকে ছ’ ক্রোশ দূরে তানকোলি গাঁয়ের বাঁয়ে আমগাছতলায় বিছান সেই মাদুরটিতে।

তবুও পরদিন ভোরে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না মানুষ দু’টিকে। ওঁরা হারিয়ে গেলেন। কোন্ যাদুবলে যেন উধাও হয়ে গেলেন। দুটো বন্দুক, একটি ঘোড়া, এক ঘোড়া সওদা, জ্বলজ্যান্ত দুটি মানুষ কোথাও কোন চিহ্ন নেই তার। ভোর হল। উদ্বিগ্ন বোসন জমাদার চারদিক ভাল করে তাকিয়ে দেখল। তারপর সূর্য ওঠার আগেই পা বাড়াল দক্ষিণের পথে। তার ঝাঁসীর দলে এবার আর ভূপালের কারবারীরা নেই। ওঁরা হারিয়ে গেছেন। কোথায় কেউ জানে না। বুড়ো রোসন জমাদারের মুখের দিকে তাকালে মনে হয়—সেও না।

হারিয়ে গেলেন।

আরও একদল মানুষ হারিয়ে গেলেন।  ওঁরা দলে ছিলেন ছ’জন। দলপতি পনের বছরের এক তরুণ। বাকী পাঁচজন তার সহচর।

একই দক্ষিণী পথ। কাকার কাছ থেকে বাবার কাছে ফিরে যাচ্ছে বালক। বাবা—এক বর্ধিষ্ণু গাঁয়ের মোড়ল। কাকা ব্যবসায়ী। তিনি প্রবাসী, শহরে থাকেন। পনের বছরের ছেলে, একা এত দূর পথে ছেড়ে দেওয়া নিরাপদ নয়। সাবধানী কাকা তাই সঙ্গে পাঁচজন লোেক দিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া একটি ঘোড়াও! জিনিষপত্র যা দিয়েছেন —এক ঘোড়াই যথেষ্ট।

চলতে চলতে ওঁরা এসে হাজির হলেন এক সরাইখানায়। সেদিনকার মত সেখানেই রাত কাটান ঠিক হল। খাওয়া-দাওয়া সেরে ওঁরা শুতে যাবেন—এমন সময় সেই ছোট্ট সরাইয়ে এসে উপস্থিত হল নতুন আগন্তুক দল। সে দলে মানুষ হবে প্রায় চল্লিশ জন। তারাও রাতটা এখানেই থাকতে চায়।

একই ছাউনির নীচে আস্তানা। সুতরাং আলাপ হল। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল ওরা জয়পুরের মানুষ। কাজের ধান্ধায় দক্ষিণে এসেছে। দলপতি রুস্তম খাঁ আরও জানাল-আপাতত দিন তিন তারাও একই পথে চলবে বলে মতলব করেছে। তারপর সর্দারের ছেলে যখন চলে যাবে বাঁয়ে জব্বলপুরের দিকে, ওরা তখন যাবে ডাইনে ইন্দোরের দিকে। শুনে ছেলেটি যারপর নাই খুশী হল,বহুৎ আচ্ছা, একসঙ্গে চলা যাবে। তার সঙ্গীরা মাথা নেড়ে সায় দিল।

পর পর দুই দিন একসঙ্গে চলছে ওরা। জয়পুরের রুস্তম খা এখন আর দক্ষিণী বালকের কাছে অপরিচিত ভিন্‌দেশী নয়, ওরা দু’জনে যেন যুগ-যুগান্তের বান্ধব। নিজের বয়সের কথা ভুলে গেছে রুস্তম খা, সে যেন কোন স্নেহপরায়ণ অন্ধ অভিভাবক-বালক যা বলে তাতেই সম্মত। সে যদি বলে, এ গাছতলাতে বসে বিশ্রাম করব, তবে রুস্তম খাঁ সেখানেই ছাউনি ফেলতে আদেশ করে ; জায়গাটা ভাল কি মন্দ, সে কথা বিবেচনা করে না।

তৃতীয় দিনে ওরা এসে হাজির হল রঙ্গুর বলে একটা জায়গায়। ছোট্ট হাট। খানকয় মহাজনের ঘর। ওরা একসঙ্গে সেখানেই রাত কাটাল। পরদিন সকালে আবার যাত্রারম্ভ হল। সন্ধ্যায় ওরা এসে দৌস নামে আর এক হাটে এসে উপস্থিত হল। বালক বলল, আজ এখানেই থাকা যাক। কিন্তু বেঁকে বসল রুস্তম খাঁর দলের লোকেরা। তারা বলল, এখনও ভাল করে সন্ধ্যে মিলায়নি, হাঁটলে আরও দু’ক্রোশ পথ অনায়ায়ে এগিয়ে যাওয়া যায়। রুস্তম খাঁ তাদের অনেক বোঝাল। কিন্তু তবুও তারা কিছুতেই এখানে রাত কাটাবে না। উপায়ান্তরহীন রুস্তম খাঁকে বাধ্য হয়ে বিদায় নিতে হল। সরাইখানায় কথাবার্তা বলে বালকের সব ব্যবস্থা করে দিয়ে সে বিদায় নিল। যাওয়ার আগে বলে গেল, নসিবে থাকলে কাল আবার দেখা হবে।

সত্যিই দেখা হয়ে গেল। রুস্তম খাঁর দল তখনও যাত্রার উদ্যোগ আয়োজনে ব্যস্ত। এমন সময় বালক এবং তার সঙ্গীরা এসে হাজির। বলল, তোমাদের ধরব বলেই আমরা অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। কই, পারলে কি পালাতে ?

খুশীতে বুড়ো রুস্তম খাঁর চোখ ভরে জল এল।

আবার দুই দল এক সঙ্গে পথে নামল। এবার সন্ধ্যা নামল একটা মরা নদীর ধারে এসে। রুস্তম খা আজ আর বালককে ছেড়ে যেতে রাজী নয়। তার হুকুমে সেখানেই ছাউনি পড়ল। তখনও রাত হয়নি। চারদিকে জনহীন প্রান্তর, পথের ডাইনে হঠাৎ কতখানি বন। নদীর ধারে অস্তায়মান সূর্যের দিকে মুখ করে রুস্তম খাঁ বসে আছে। পাশে তার সেই বালক। অদূরে তার সঙ্গীরা। কেউ ঘোড়ার তদারক করছে, কেউ রান্নার আয়োজন করছে। রুস্তম খাঁ জয়পুরের গল্প বলছে, বালক তন্ময় হয়ে সে কাহিনী শুনছে।

হঠাৎ কি হল—বালকের চোখ থেকে মুহূর্তে সব যেন উধাও হয়ে গেল। সে হারিয়ে গেল। তার পাঁচ সঙ্গী, ঘোড়া—সব উধাও হয়ে গেল।

বাবার কাছ থেকে খবর এল ছেলে বাড়ী ফেরেনি। উন্মাদের মত কাকা পথে নেমেছিলেন তাকে খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে রঙ্গুরের সেই মহাজনের ঘর। সেখানে এসে তিনি শুনেছিলেনছেলেটি সেখানে রাত কাটিয়েছিল বটে! তারপর—দৌস। সেখানেও সেই একই কথা—ভোরে ওরা এখান থেকে বেরিয়ে গেল।’

কাকা ঘোড়ার খুর ধরে আরও ক’ ক্রোশ এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু পদচিহ্ন সেই নদী তীরে এসেই যেন শেষ। তারপর আর কেউ নেই, কিছু নেই। শুধু সেই মরা নদী, জনহীন প্রান্তর, আর এক টুকরো একটি বন। তার আদুরে ভাই-পো কোথাও নেই। সে হারিয়ে গেছে। কোথায়, কেউ জানে না। কদিন পরে দৌসার সেই সরাইখানায় আবার ফিরে এসেছিল রুস্তম খাঁ। ঘরে ফেরার পথে উন্মাদ কাকা তখনও সেখানে হাউ হাউ করে কাঁদছেন। রুস্তম খাঁ এগিয়ে এসে খবর নিয়েছিল বালকের। তার মুখের দিকে তাকিয়ে শোকাতুর কাকা শেষ সান্ত্বনা পেয়েছিলেন সেদিন—কি করে হারিয়ে গেল ছেলেটি, বুড়ো এখনও তা ভাবতে পারে না।

উনবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের কাহিনী। তখনও রেল বসেনি, কিন্তু কলকাতার পত্তন হয়েছে, শ্রীরঙ্গপত্তনের যুদ্ধ হয়ে গেছে ভারতে কোম্পানির রাজত্ব দ্রুত মধ্যাহ্নের দিকে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু তবুও সে যেন কোন অবিশ্বাস্য পৃথিবীর খবর। ভারত এক অবিশ্বাস্য দেশ, তার ঘর থেকে বের হলে মানুষ ঠিকানায় পৌঁছায় না, তারা হারিয়ে যায়।

নিরুদ্দিষ্ট—আজকের পৃথিবীতেও বিস্ময়কর কোন ঘটনা নয়। মানুষ এখনও হারায়হারিয়ে যায়। কখনও স্কুল থেকে ফেরার পথে বারো বছরের ছেলে হারিয়ে যাচ্ছে, কখনও সিনেমার পথে অষ্টাদশী তরুণী, কখনও বা তীর্থের ঘাট থেকে কুলবধূ, ট্রেনের কামরা থেকে সুপ্রতিষ্ঠিত গৃহস্থ। কিন্তু সেদিনের কাহিনীর সঙ্গে কোন মিল নেই তার। সে নিরুদ্দিষ্টের দল আরও নিঃশব্দ, তাদের হারিয়ে যাওয়ার পথ আরও নিচ্ছি।

ঝাঁক ঝাঁক সিপাই হারিয়ে যেত। ছুটি নিয়ে দল বেঁধে দেশে যেত, আর ফিরত না। ফৌজের কর্তৃপক্ষ কিছুকাল অপেক্ষা করতেন, তারপর নাম কেটে দিতেন। পাশে লাল পেন্সিলে লিখে রাখতেন—ডেসার্টার ; পালিয়ে গেছে। উত্তর ভারতে তীর্থ করতে গিয়ে দক্ষিণের মস্ত দলটি কোন দিনই আর গাঁয়ে ফিরত না। আত্মীয়রা অপেক্ষা করতেন। তারপর কেঁদে কেটে আবার সংসারে মন দিতেন। কোন স্মরণীয় সন্ধ্যায় অথবা নিঃসঙ্গ শয্যায় বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিতেন-ভাগ্যবান ছিল, গঙ্গা স্নান করতে গিয়ে গঙ্গাপ্রাপ্তি হয়েছে। বনপথে বাণিজ্য করতে গিয়ে ভূপালের সওদাগর তখন ঘরে ফেরে না, পাঁচ দিনের পথ ভেঙ্গে ছেলে মায়ের কোলে ফিরতে পারে না। লোকে বলত-বাঘে খেয়েছে। নয়ত সাপে, কিংবা অজ্ঞাত কোন ব্যাধিতে।

ভারতবর্ষ তখন এক আশ্চর্য দেশ। বছর বছর তখন হাজার হাজার মানুষকে সেখানে বাঘে খায়, হাজার হাজার মানুষের গঙ্গা প্রাপ্তি হয়, হাজার হাজার সেপাই কোম্পানির ফৌজ থেকে পালিয়ে যায়। সে যেন এক নিরুদ্দিষ্টের দেশ। সেখানে হারিয়ে যেতে কোন মানা নেই।

বিশেষ কোন বছরে নয়, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ তাই যাচ্ছিল। হারিয়ে-যাওয়া তখন বিস্তীর্ণ ভারতে প্রতিদিনের নিয়ম। জনৈক ইংরেজ ঐতিহাসিক খুব সাবধানে মনোযোগ দিয়ে হিসেব কষতে বসেছিলেন একবার। হিসেব শেষে তিনি জানিয়েছিলেনঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার আগের তিন শ’ বছরে প্রতি বছর গড়ে অন্তত চল্লিশ হাজার মানুষ হারিয়ে গেছে এদেশের কোল থেকে। হ্যা, বছরের পর বছর—তিন শ’ বছর। প্রতি বছর গড়ে তাদের সংখ্যা ছিল-চল্লিশ হাজার।

কোথায় গেল সেই লক্ষ লক্ষ লোকের জনতা? কোথায় গেল ভূপালের সেই দুই কারবারী, জব্বলপুরের পথ থেকে পাঁচ সঙ্গী সহ পনের বছর বয়সের দক্ষিণী মোড়ল-তনয় ?

উত্তরটা দিয়েছিল রোসন জমাদার নয়, তার ওপরওয়ালা বুকুত জমাদার। সাহেবের কাছে সগর্বে সে বলেছিল, বাঘ নয়, সাপ নয়, যতদূর মনে পড়ছে ভূপালের সেই কারবারী দু’জন হারিয়ে গিয়েছিল যার হাতের ছোঁয়ায় সে আমি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *