পর্ব ৪
ওরা ঠগী। ওরা খুনী।
সেদিনের ভারতে খুনীর অভাব ছিল না। উনবিংশ শতকের সূচনাক্ষণে হিন্দুস্তান এক তমসাচ্ছন্ন দেশ। তার ঘরে ঘরে খুন, পথে পথে খুন। মুঘলদের গৌরব-সূর্য অস্তমিত। দিল্লির সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে সাম্রাজ্য ঘিরে অন্ধকার নেমেছে। এখানে ওখানে বিন্দুর মত কুঠিগুলোতে ইংরেজের আলো জ্বলছে। কখন কাদের ফুৎকারে তা নিভে যাবে তারা নিজেরাও তা জানে না। গোটা দেশে অনিশ্চয়তা, অরাজকতা, হতাশা। পুরানো শাসনব্যবস্থা খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়েছে। তার জায়গায় নতুন কোন ব্যবস্থা তখনও শেকড় বিস্তার করতে পারেনি। চারদিকে নৈরাজ্য। ছিন্ন খণ্ড দেশে অনেক রাজা। কিন্তু কারও পতাকায় স্থায়িত্বের কোন আশ্বাস নেই। প্রজা খাজনা দেয় না। জবরদস্তি করে যে যা আদায় করতে পারে তাই সর্বস্ব। লুঠ তাই তখন ধর্ম।
পরাজিত সৈন্যরা লুঠ করছে। রাজপুরুষেরা লুঠ করছে। এমনকি নবাগত ইংরেজ পর্যন্ত লুঠে নেমেছে। তারা রাজত্ব কেড়ে নিচ্ছে। স্থানীয় সৈন্যবাহিনী ভেঙ্গে তছনছ করে দিচ্ছে। রাজকোষ শুষে নিচ্ছে। অসহায় দরিদ্র ভবিষ্যতে আস্থা হারিয়ে দেশজোড়া অন্ধকারের দিকে পা বাড়াচ্ছে। তারা নায়ক খুজছে। এমন নায়ক যে এই সর্বগ্রাসী অন্ধকারের মতই বীভৎস, নির্মম। ভিনসেন্ট স্মিথ লিখেছেন—ভূমিহীন এবং জীবন-জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া মানুষের এই বেপরোয়া নায়ক সন্ধানই সেদিনে ভারতের অন্তরের কাহিনী।
সামাজিক রীতিনীতি এবং ধর্মীয় আচার-আচরণেও এই নৈরাশ্য সেদিন স্পষ্ট। চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। তার মধ্যে শত শিখায় সতীদাহের চিতা জ্বলছে। শিশু হত্যা, দাস বাবসা, সন্তান বিসর্জন ইত্যাদি শত পথে বিভ্রান্ত মানুষ মুক্তির পথ খুঁজছে। এমনকি, বিপুল আধ্যাত্মিক ভাণ্ডার সামনে থাকতেও সাধু সন্ন্যাসীরা ধর্মের নামে হাতিয়ার তুলে নিচ্ছে। বর্গীদের মত, পিণ্ডারীদের মত—‘নাগা সন্ন্যাসী’, ‘বৈরাগী’, ‘গোসই’, ‘দাদুপন্থী’, বাংলার ‘সন্ন্যাসী’-সেদিন নাকি অনেক সাধক দলের হাতে শাস্ত্রের বদলে শস্ত্র । ইতিপূর্বে তা ছিল না। পরেও না। এ শুধু সেদিনেরই ইতিহাস যখন বর্তমান-ই একমাত্র কাল। ওরা তখন কেউ সিন্ধিয়ার বাহিনীভুক্ত, কেউ জয়পুরের। কেউ বা নিজেরাই নিরঙ্কু অন্ধকারে দুর্ধর্ষ পথিক দল। ঠগী তাদেরই সহযাত্রী—তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে নিপুণের দল। ঠগী সেই অন্ধকার যুগের সর্বোত্তম প্রতীক। তার সঙ্গে সব খুনীরই সাদৃশ্য আছে, কিন্তু তবুও সে তুলনাহীন।
ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ দিলেন, নির্ভয়ে বলে যাও।
বৃদ্ধ ফকির বলতে আরম্ভ করল : শহর থেকে মাত্র দেড় মাইল দূরে রাস্তার ধারে আমার কুঁড়ে। ছেলেকে নিয়ে আমি সেখানেই থাকতাম। আশপাশের গাঁয়ের লোকেরা ভিক্ষে দিত। তাছাড়া পথিকেরাও কখনও কখনও কিছু দিতেন। তাতেই আমাদের বাপবেটার কোনমতে দিন চলে যেত। দু’সপ্তাহ আগের কথা। সেদিন নমাজ সেরে আমি আমার দরজার সামনে বসে আছি। পাশে আমার ছেলে। ছেলের জন্যে বহু কষ্টে একখানা কম্বল কিনেছি। সেটা আমগাছের ডালে ঝুলছে। এমন সময় এক ভিদেশী পথিক এসে হাজির। সঙ্গে তার স্ত্রী এবং একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। ছেলেটি আমার ছেলের চেয়ে কিছু বড় হবে, মেয়েটি কিছু ছোট। ওরা আমার কুঁড়ের সামনে গাছতলায় বসে রুটি বানিয়ে খেল। খাওয়া হয়ে গেলে বৌটি আমাকে কিছু আটা দিল। তাতে দুটো রুটি হয়ে যায়। আমি রুটি দুটো বানিয়ে ছেলেকে নিয়ে খেতে বসলাম। নিজের খুব ভুখ ছিল না। তাই আধখানা মাত্র খেয়ে বাকীটুকু ছেলেকে দিয়ে দিলাম। ওর ভুখ ছিল। পুরো দেড়খানা রুটিই খেয়ে নিল। খাওয়া শেষ হতে না হতেই ছেলে আমার হাই তুলল। দেখতে দেখতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আমিও।
তখনও সন্ধ্যে হয়নি। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেগে উঠে আমি দেখতে পেলাম, একঘর জলের মধ্যে আমি পড়ে আছি। ঘরের এককোণে ছেলেটা ধুকছে। কোনমতে আমি গড়াতে গড়াতে তার কাছে গেলাম। মাথাটা কোলে টেনে নিলাম। কিন্তু দেখতে দেখতে তার নাভিশ্বাস উঠল। সে চলে গেল। পরে শুনেছিলাম, গাঁয়ের এক ধোপা বউ এদিক দিয়ে যেতে যেতে আমার অবস্থা দেখে মাথায় জল দিয়ে গিয়েছিল। সে বুঝে গিয়েছিল ছেলেটা বাঁচবে না।
ম্যাজিস্ট্রেট প্রশ্ন করলেন, তারপর ?
—তারপর আর কি হুজুর !লোকটি হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।—আমার ছেলেটা চলে গেল। আমার যখন হুঁস হয়েছে তখন সন্ধ্যা। রাতটা কি করে কেটে গেল কিছুই জানি না। পরদিন ভোরে আবার যখন জ্ঞান হল তখন দেখি, ঘরে আমার কেউ নেই। বাইরে চাপ চাপ রক্ত। মনে পড়ল, ছেলেটা আমার মরে গেছে। মরা ছেলে আমার কোলেই ছিল। তবে এই রক্ত কোথা থেকে এল, আমার ছেলেই বা কোথায় গেল?
গাছতলায় সেই লোকটি তখনও ছিল। সে বলল, ছেলেকে তোমার নেকড়ে খেয়ে নিয়েছে। দেখবে এস, চল। বনের ধারে সত্যিই আমি হাড়গোড় দেখতে পেলাম। কাঁদতে কাঁদতে তাই কুড়িয়ে নিয়ে দরগায় এনে মাটি দিলাম। কি থেকে যে কি হল, কিছুই আমি বুঝতে পেলাম না। তিন দিন হুজুর আমার ভাল হুস ছিল না।
ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, এই কি তোমার একমাত্র ছেলে ?
-আজ্ঞে হ্যাঁ। এই ছেলে যখন তিন মাসের তখনই ওর মা মারা যায়। আমি গরীব মানুষ। নিজের জমিজমা কিছু নেই। খেটে খাব তেমন গতরও নেই। বৌকে মাটি দিয়ে সেই কবরের পাশেই একটা দরগা করে ছেলেকে নিয়ে বাসা বেঁধেছিলাম। আশা ছিল, একদিন ছেলে বড় হবে, বাপের দুঃখ ঘুচাবে। কিন্তু তা আর হল না। বাধা দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট প্রশ্ন করলেন, সেই লোকগুলোর কি হল?
—তারা চলে গেল।
—কেমন দেখতে ছিল লোকগুলো?
-পুরুষটি বেশ লম্বা-চওড়া। গায়ের রং ফর্সা। আমার অনুমান হুজুর, কঁদতে কাঁদতেই উত্তর দিল ফকির, বয়স তার পঁয়ত্রিশের বেশী হবে না।
—আর মেয়েটির ?
—তার সামনের দাঁত দু’টি উচু, বয়স বছর তিরিশ।
ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, তোমার কম্বলটা কোথায়?
-সে কি আর আছে হুজুর! আর থেকেই বা হবে কি ? ছেলেই চলে গেল, কম্বলে আর কি কাজ আমার !
-সে কথা নয়। ম্যাজিস্ট্রেট প্রশ্নটাকে আরও স্পষ্ট করলেন, গাছের ডালে কম্বলটা কি ছিল ?
—না।
সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত শোনা গেল বিচক্ষণ সাহেবের কণ্ঠে। পাশে উপবিষ্ট পুলিশ অফিসারটির দিকে ঘুরে তিনি বললেন, ঠগী নয়, ধুতুরিয়া! নতুন কম্বলের লোভে খুন করেছে।
পথে পথে তখন অনেক খুনী। ধুতুরিয়ারাও হত্যাকারী। পথিকের বেশে তারা দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। অচেনা পথিকের সঙ্গে আলাপ করে, ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব জমায়। তারপর সুযোগ বুঝে তাদের খাবারের সঙ্গে মেশায় অথবা হুকোর তামাকে। অসহায় পথিক দল ছটফট করতে করতে প্রাণ হারায়। ওরা তাদের জিনিষপত্র লুটে নিয়ে পালিয়ে যায়। সাধারণত ধুতরার বীজে তৈরী বিষ প্রয়োগ করে কাজ সারত বলে ওদের নাম ছিল—ধুতুরিয়া । ক্লীম্যান লিখেছেন—সংখ্যায় এই হত্যাকারীরা হাজার হাজার। ভারতে তখন এমন কোন জনপথ নেই যেখানে ওরা ছিল না। কি বোম্বাই-মাদ্রাজ, কি সুদূর বাংলা—ওরা সেদিন সর্বত্র।
ধুতুরিয়ার ঠগীদের মতই নিষ্ঠুর, ঠগীদের মতই ধুর্ত। কিন্তু তবুও ওরা ঠগী নয়,ঠগী স্বতন্ত্র।
সেবার (১৮৪৮) কানপুরে একটি দল ধরা পড়েছে। অপরাধ : নরহত্যা। পথের ধারে এক ঘেসুরে মরে পড়ে আছে। লক্ষণ দেখে মনে হল নিশ্চয় কোন ধাতুরিয়ার কাজ। কিন্তু ধুতুরিয়া সামান্য একজন ঘেসুরেকে হত্যা করবে কিসের লোভ? চিন্তিত পুলিশ সন্ধানে নামল। ঘাটাঘাটি করতে করতে খবর পাওয়া গেল, ক’দিন আগে এই পথে একদল বাজীকর হেঁটে গেছে।
-বাজীকর? কি খেলা দেখায় তারা। পুলিশ জানতে চাইল।
-আজ্ঞে সে এক অদ্ভুত খেলা। ওরা বাজী ধরে। বাজী ধরে একটা দড়িকে ভাজ করে মাটিতে রাখে। তারপর দর্শকদের হাতে একটা কাঠি দিয়ে বলে, যেখানে খুসী লাগাও, দেখবে কাঠিতে দড়ি আটকাচ্ছে না। যদি আটকায় তবে পাঁচ রুপেয়া! যদি না আটকায়, তবে কত দেবে বল ?
সাহেবের মনে পড়ল – কানপুরের শহরতলীতেও পথের ধারে এই দড়ির খেলা দেখেছেন। পুলিশ তৎক্ষণাৎ বাজীকরের দলের সন্ধানে বেরিয়ে গেল।
একটি দল ধরা পড়ল। ক্রমে আরও। জানা গেল ওরাই হত্যাকারী। যাদের দড়ির খেলায় বশ করতে পারে না, তাদের বিষ খাওয়ায়। এই তাদের নেশা, পেশা।
আগ্রার তৎকালীন অ্যাসিসটেন্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট এবং জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট জে. গ্রাহাম সাহেবের ভাষায় : ওরা নিষ্ঠুরতম খুনী। ওদের কোন ধর্ম নেই, কোন রীতিনীতি নেই, যে কোন উপায়ে পয়সা রোজগারই ওদের একমাত্র ফিকির। ওরা পয়সার জন্যে যাকে-তাকে খুন করতে পারে এবং যখন-তখন।
কিন্তু তবুও ওরা সাচ্চা ঠগী নয়, নাম তাদের তুসমাবাজ ঠগ।
তুমাবাজরাও ভ্রাম্যমাণ খুনী। তাদের প্রথম আবির্ভাব উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে। জনকক্ৰেয়াগ নামে কানপুরবাসী জনৈক ইংরেজ সৈনিক। দেশময় তখন ঠগীর হাওয়া। ক্রেয়াগ কোম্পানির কর্মচারী ছিল না। সে স্বাধীন সৈনিক। হঠাৎ তার বাসনা হল সেও ঠগী হবে, ঠগীর দল গড়ৰে। গুটি তিন দিশি শিষ্য জোগাড় হয়ে গেল। সাহেব কাজে নামল।
দেখতে দেখতে ক্রেয়াগ সাহেবের শিষে উত্তর ভারত ছেয়ে গেল। তারা দিনে দুপুরে দল বেঁধে সদর রাস্তায় দড়ির খেলা দেখায়। দড়ির ফঁস তৈরী করে বাজী ধরে পথিককে দিয়ে সেখানে কাঠি ধরায়। লাঠি বা কাঠি যদি ফঁসে আটকাল তবে যাদুকর হারল, যদি ফঁস ফঁকি বলে প্রমাণিত হয় তবে সৌখিন দর্শক ঠকল। এ তামাসাই তুমাবাজী। সাহেবরা বলতেন, প্রিকিং দি গার্টার।
তুসমাজ কখনও ঠকে না। সে ঠগী, পথিককে সব সময় ঠকায়। যদি দেখা যায় কেউ বাজীতে কেবলই জিতে যাচ্ছে, তবে তুমাবাজ তাকে বিষ প্রয়োগে হারায়। অদ্ভুত দল। সংখ্যায়ও বিপুল। ১৮৪৮ সনে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার সময় এক কানপুরেই তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় পঞ্চাশ জন। কিন্তু তবুও তারা একজনও ঝোসন জমাদার, এনায়েত, ফিরিঙ্গীয়া বা দুর্গা নয়। সাচ্চা ঠগীর সঙ্গে তুসমাজের আকাশ-জমিন ফারাক।
১৮৩৩ সনের নভেম্বরের কথা। দিল্লির পাত্রী সাহেব মিঃ এভারেস্ট সেদিনও ভোরে রোজকার মত ঘোড়ার পিঠে হাওয়া খেতে বের হয়েছেন। যমুনা তীরে এসে সহসা তার নজরে পড়ল, কারা যেন বালিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সাহেব কাছে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখেন, পাশাপাশি পাঁচটি মানুষ মরে পড়ে আছে। তিনজন তাদের পুরুষ, দুইজন স্ত্রীলোক। এভারেস্ট কোনদিকে না তাকিয়ে ঘোড়া ছুটালেন ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসের দিকে। দিল্লি তখনও পুরোপুরি কোম্পানির হাতে আসেনি। তবে দরবারী আমীর-ওমরাহের ফঁাকে ফঁাকে কিছু কিছু ইংরেজ রাজপুরুষও আছেন। তারা ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। সুতরাং, খবর পাওয়ামাত্র অ্যাসিসটেন্ট ম্যাজিস্ট্রেট লরেন্স সদলবলে ছুটলেন যমুনার দিকে। সঙ্গে তাঁর একজন পাকা ঠগী।
মৃতদেহগুলো ভাল করে পরীক্ষা করা হল। সাহেব পুরানো দাগীর মুখের দিকে তাকালেন, কি বলতে চাও তুমি?
—আজ্ঞে, এ কোন সাচ্চা ঠগীর কাজ নয়। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল রাজস্বাক্ষী। দেখছেন না গলার ফাসগুলো পর্যন্ত খোলেনি। তাছাড়া, কোন ঠগী এভাবে মরা ফেলে রেখে পালায়? আমার ধারণা সাহেব, ওরা ঠগী নয়।
লরেন্স কথাগুলো গভীর মনোেযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর আশপাশের লোকেদের কাছে জানতে চাইলেন, হালে এ পথে কি কোন নতুন মানুষের দল দেখেছ কেউ ?
একজন বলল, আজ্ঞে হুজুর। কালকেই একদল বাউরী এই পথে গেল। সাহেব ইঙ্গিত করলেন। সঙ্গে সেই পুরানো দাগী আর ক’জন সিপাই নিয়ে তক্ষুনি একজন হিন্দুস্তানী পুলিশ অফিসার ফরাসগঞ্জের পথে বের হয়ে গেলেন।
সবে সন্ধ্যা হয়েছে। ওঁরা তখনও ফরাসগঞ্জ থেকে দূরে । বনপথ ধরে ওরা শহরের দিকে এগিয়ে চলেছেন। চলতে চলতে হঠাৎ কানে এল আর্তনাদ। কে যেন সাহায্যের জন্যে চিৎকার করছে। অফিসার কান পাতলেন। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু আর্তনাদটা ভেসে আসছে রাস্তার ধারের ঝোপগুলো থেকেই। তিনি পাশের ঝোপটায় লাফিয়ে পড়লেন। পেছনে পেছনে সিপাইরা। লোকটি ধরা পড়ল। দেখা গেল তার কোলে ফুটফুটে একটি ছোট্ট মেয়ে। এতক্ষণ সে-ই কাঁদছিল। স্তম্ভিত অফিসার তাকে নিজের কোলে টেনে নিলেন। ডাকুর দায়িত্ব নিল তাঁর সঙ্গের সিপাইরা।
সেই ছোট্ট মেয়েটিই হাত ধরে ওদের নিয়ে গিয়েছিল অদূরে একটি আস্তানায়। পুলিশ সেখানে আরও আটজন মানুষের সন্ধান পেয়েছিল। সেই সঙ্গে আবিষ্কৃত হয়েছিল দু’জন মায়ের মৃতদেহ এবং নানা বয়সের ছয়টি জীবন্ত শিশু। তাদের অধিকাংশের বয়স দু’ থেকে তিন বছর, এবং একজনকে বাদ দিলে সবাই তারা মেয়ে।
ছেলেটির বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। সুতরাং, রহস্য ভেদ করতে বিশেষ অসুবিধে হল না। তার মুখেই পুরো ঘটনাটা শোনা গেল।
ওরা গরীব বাপ-মায়ের সন্তান। দেশে দুদিন পড়েছে। বাবা তাই ঠিক করেছেন দোয়া ছেড়ে অন্য কোথাও কাজের সন্ধান করতে হবে। এমন কোথাও যেতে হবে যেখানে ছেলেমেয়েদের মুখে দুবেলা দুমুঠি অন্ন জোটে। গা ছেড়ে সপরিবারে তিনি পথে নামলেন। সঙ্গে গাঁয়ের আরও ক’টি গরীব পরিবার।
পথে এদের সঙ্গে আলাপ হল। আলাপ থেকে অন্তরঙ্গতা। ওরা বলল, কুনলে চল, সেখানে কাজ আছে। তাছাড়া কাজ দেবার লোক যারা, তাদের সঙ্গে আমাদের জানাশোনা আছে।
দিল্লির পথে ওরা দল বেঁধে কুলের দিকে যাত্রা করল। পর্থে বন্ধুরা হঠাৎ দুশমনের চেহারা নিল। তারা খুনী হল। বাপ-মাদের মেরে যমুনার ধারে ফেলে রেখে ফরাসগঞ্জে পালিয়ে এল। এ দু’জন মাকে হত্যা করা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। যে মেয়েটি কঁদছিল একজন তারই মা।।
দোয়াব এলাকার পুলিশের কর্তা লেফট্যানেন্ট মিলস্ সাহেবের বিরামহীন চেষ্টায় গোটা দল ধরা পড়ল। দেখা গেল তাদের আস্তানায় শুধু পুরুষ নয়, মেয়েরাও আছে।
একজন তাদের রুক্মিণী। সে দলপতি রূপলার সহধর্মিণী। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল, কি করে সে এই দলে এল, গরবিনী রুক্মিণী তখন তার নিজের সঞ্চয় কচিকাঁচা শিশুগুলোকে দেখিয়ে বলেছিল, এদেরই পথে !
ওর নিজের বাপ-মা খুন হয়েছিল দিল্লিতে। অন্য ভাইবোনেরা অনেকদিন হাটে বিকিয়ে গেছে। রূপলা নিজের জন্যে রেখে দিয়েছিল রুক্মিণীকে। বলেছিল, তোর বাপ-মা পালিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় আশী টাকায় তোকে আমার কাছে বেচে দিয়ে গেছে। আজ ছ’ সাত বছর সে তার সঙ্গে আছে। কুনলেও ছিল। রূপলা যখন বাপমায়েদের খুন করে সে তখন বাচ্চাগুলোকে আগলায় ।
রুক্মিণীর একটি সতীনও ধরা পড়েছিল তার সঙ্গে। তার নাম রাখা। একই জবাব পাওয়া গিয়েছিল তার মুখে, আমিও একই পথে এসেছি।
-কোথায় হত্যা করা হয়েছিল তোমার মা-বাবাকে ? জিজ্ঞেস করেছিলেন লেঃ মিলস্। রাধা উত্তর দিয়েছিল, বুন্দেলশরের ডানকুরি গাঁয়ের কাছে।
-কত জন খুনী ছিল সেই দলে ?
-চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ জন। তুমি কি নিজের চোখে তোমার মা-বাবাকে খুন হতে দেখেছ?
—না। ওদের হত্যা করা হয়েছিল রাত্রে। আমি এবং আমার ছোট দুটি ভাইকে ওরা রেখে গিয়েছিল দলের মেয়েদের হেফাজতে।
-তারপর?
তারপর, দিন কয়েক পরে একদল বেদের কাছে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল বিক্রি করতে। ওরা আমার উচিত দাম দিতে রাজী হয়নি। তাই সাগলা জমাদার নিজেই রেখে দিল আমাকে।
তোমার ভাইদের কি হল? তারা এখন কোথায় আছে ?
-সে আমি আজও জানি না।
-এই নয়া সোয়ামীর সঙ্গে ঘর করার পর থেকে বরাবরই তুমি তার সঙ্গে সঙ্গে থাক?
-হ্যা। অন্তত তিন-চার দফা তো ছিলাম।
-মাস কয় আগে তোমার স্বামী জনলীতে একজন গরীব ফকিরানীকে হত্যা করেছে। তুমি তা জানতে। কিন্তু তবুও তুমি তখন তার বাচ্চা দু’টিকে আগলে ছিলে, নয় কি? তোমার নিজের মা-বাবাকে যারা খুন করেছে তাদের সঙ্গে এভাবে ঘুরে বেড়াতে, খুন দেখতে, বাপ-মায়ের কোল থেকে শিশু ছিনিয়ে আনতে কষ্ট হয় না তোমার ? আবেগে এক সঙ্গে অনেকগুলো কথা বলে ফেলেছিলেন বিস্ময়াভিভূত বিদেশী প্রশ্নকারী। রাধা সংক্ষেপে উত্তর সেরেছিল, কি করব বলুন, হাজার হোক রূপলা আমার সোয়ামী!
খুনের নায়ক রূপলাকে জিজ্ঞেস করা হল, রাধাকে কি করে বৌ করলে তুমি? সাগলা জমাদার তো তাকে বিয়ে দিয়েছিল-খুশল্লার সঙ্গে।
—ঠিক বাত, হুজুর ! কিন্তু হলে কি হয়, খুশল্লার এই বৌটাকে আমার খুব পছন্দ। তাই বলে বলে ওকে নিজের ঘরে নিয়ে এলাম। রাধা এখন আমার জেনানা। সে আমার সঙ্গেই থাকে। কুর্নেলে ছিল, থাণেশ্বরেওI
রূপলাকে প্রশ্ন করে শুধু থানেশ্বর নয়, আরও ক’টি হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গিয়েছিল। জানা গিয়েছিল—বহুদূরবিস্তৃত শাখাপ্রশাখাসহ ওরাও একটি বিশেষ সম্প্রদায়। তাদের নায়কের নামক্ষেমা। নিবাস–আলোয়ার স্টেট। শুধু রূপলা নয়—সবাই বলে, ক্ষে এক বিস্ময়কর ফকির, তার নানা অলৌকিক ক্ষমতা।
কিন্তু কোন মন্ত্রবলেই মিলসকে এড়ান গেল না। অবশেষে দল-পিতা ক্ষেমাও ধরা পড়ল। তার মুখ থেকেই জানা গিয়েছিল, ওরা ফাঁসুড়ে হলেও ঠগী নয়। ওরা ‘মেকফানসা। মেক’ মানে পেরেক বা এমন কিছু যাতে কাউকে ঝুলান যায়, ‘ফান মানে ফাস, যা ঝোলায়।
ক্ষেমা বলে, তার এই অদ্ভুত খুনী দলের আবির্ভাব ভারতপুরে যখন অবরোধ শুরু হয় তখন। অর্থাৎ ১৮২৬ সন। ওরা সেদিনই ঠগী থেকে ছেলেধরা ঠগ হয়েছিল। এখনও তারা তাই আছে। ঠগীদের সঙ্গে তাদের এখনও অনেক ফারাক। তাদের নিজস্ব দেবী আছে, নিজস্ব ভাষা আছে, হত্যার রীতিনীতিও তাদের একান্ত আপন।
ওরা ছোট ছেলেদের বলে ‘জনকুলা’ বা ‘খোন’, বাচ্চা মেয়েদের বলে ‘জনকুলি’ বা ‘খোনকুরি। পথিক ওদের ভাষায় ‘খোর’, পথিক ‘তাইওয়া। ঘোড়াকে ওরা বলে বুগীলা’, গরুকে ‘রানকুরী’, টাকাকে ‘গুণা’ বা কারা’, মোহরকে থান’ বা ‘খোর’, গলার হারকে ‘তাগলী।‘এক ওদের কাছে একই, কিন্তু দুই ‘দুরু’, তিন ‘তুরু’, চার ‘চৌরু এবং ইত্যাদি।
ওদের দেবীও ভবানী বা কালী। ওদের হাতিয়ারও ফঁস। কিন্তু তবুও ঠগীদের মত ওরা তত আচারনিষ্ঠ নয়। ওরা দলের সবাইকে হত্যা করে শিশুদের বাঁচিয়ে রাখে। কারণ ওরা জেনে গেছে, এই হতভাগ্য দেশে মানুষ যেমন অঢেল, মানুষের চাহিদাও তেমনি। বিশেষ করে মেয়েদের। কেননা, দেশে অন্ধকার মানেই দিকে দিকে বিলাসের পাককুণ্ড। সেখানে রাত্রি আর দিনের কোন ফারাক নেই। রূপলা, ক্ষেমা এবং অন্যরা নিজেরাই বলেছে—কি উত্তরে কি দক্ষিণে, মোটামুটি দেখতে ভাল যে কোন বাচ্চা মেয়ের বদলে আণী থেকে একশ’ টাকা অনায়াসে পাওয়া যাবে। তাও নিজেদের হাট অবধি ছুটতে হবে না। পথে পথে ব্রিনজাররা ঘুরছে, সেই বেদেরাই হাতে নগদ গুজে দিয়ে যখন-তখন বোঝা হাল্কা করে দিয়ে যাবে ।
তাছাড়া ম্যাকফানসাদের অন্ত ঝামেলাও কম। তাদের কবর খুড়তে হয় না। সাধারণত তারা নদীনালার ধারেই খুন করে দেহগুলো জলে ভাসিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। কাছেভিতে নদী না থাকলে কোনমতে মোটামুটি একটা কিছু দিয়ে চাপা দিয়ে সরে পড়ে। ওরা সাচ্চা ঠগী নয়, অপব্যয় করার মত সময় তাদের হাতে নেই।
প্রায় একই সময়ের কাহিনী। ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হঠাৎ খবর পেলেন, ঢাকা থেকে ফরিদপুরে আসবার পথে দু’জন পথিক হারিয়ে গেছেন। তাদের একজন হিন্দু আর একজন মুসলমান। তারা নদীপথে ঢাকা ছেড়ে ছিলেন। সঙ্গে তাদের পনের টাকা ছিল। এবং যে নৌকোটিতে তারা আসছিলেন তাতে আরও দু’জন যাত্রী ছিল। তখন জুলাই মাস।
ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটকে লিখলেন। দু’জনের উদ্যোগে দুই জেলাতেই খোঁজাখুঁজি শুরু হল। কিন্তু যাত্রীদের কোন সন্ধান নেই।
পুরো জুলাই গেল, আগষ্ট গেল, সেপ্টেম্বরে ফরিদপুরের পুলিশ ভোলানাথ নামে একটি মানুষকে ধরে এনে হাজির করল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে। বললে, হুজুর, এই আপনার সেই আসামী।
ম্যাজিস্ট্রেট কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে রাজী নন। কিন্তু ভোলানাথ নিজেই অপরাধ স্বীকার করল। সে বলল, সাহেব, তুমি অবিশ্বাস করছ বটে, কিন্তু আমিই সেই খুনী। গত মাঘ মাসের কথা । দু’জন তামাকের কারবারীকে নিয়ে নৌকো করে আমি এবং আমার আরও জনাকয় বন্ধু রংপুরে যাচ্ছিলাম। পথে কারবারীদের আমরা খুন করে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছি। কত পেয়েছিলাম জান? চল্লিশ টাকা। বিশ্বাস না হয়,জিজ্ঞেস কর স্বরূপকে।
-স্বরূপ আবার কে?
-তাও জান না? বিস্মিত ভোলানাথ সে খবরটাও দিয়েছিল। বলেছিল, আমার নিকট-আত্মীয়, আমরা একই গাঁয়ে থাকি।
তাকে ধরে আনা হল। সে বলল, আজ্ঞে হুজুর, ঢাকার ব্যাপারটায় ভোলানাথ ছিল না, তার জন্যে দায়ী আমি।
—কেমন?
স্বরূপ বলে চলল, ওঁরা তো ফরিদপুর যাবেন বলে ঢাকায় আমার নৌকো কেরায়া করলেন, আমরাও যথানিয়ম বদর’ ‘বদর করে নৌকো জলে ভাসালাম। ঘণ্টা দুই চলার পর নৌকো এসে ঠেকল চৌরের চরে। ওঁরাও সেখানেই ঠেকলেন। কাজ সেরে আমরা সেদিনই আবার ঢাকা ফিরে এলাম। তারপর সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জ।
—নৌকোয় যে আরও দু’জন ছিল। তাদের কি করলে? জানতে চাইলেন ম্যাজিস্ট্রেট।
—আজ্ঞে, সেই দুই বামুনঠাকুর যাত্রী নন, তারা আমাদেরই দলের লোক। যাত্রীদের যাতে কোন রকম সন্দেহ না হতে পারে সে কারণেই ওদের বামুন সাজিয়ে গলুইয়ে বসিয়ে রেখেছিলাম।
স্বরূপের কাছ থেকে আরও জানা গেল, তাদের মাত্র একখানা নৌকোই ছিল না। সঙ্গে আরও একটা পানসি ছিল। তাতে ছিল আরও পাঁচজন খুনী। পুলিশের চেষ্টায় ফরিদপুরের ঘাটেই ধরা পড়ল তাদের চারজন।
তারা প্রথমে ঢাকার ঘটনা একেবারেই অস্বীকার করে বসল। প্রশ্নে প্রশ্নে অবশেষে একজন ভেঙ্গে পড়ল। সে মুখ খুলল। সঙ্গে সঙ্গে আর সবাই। নৌকো থেকেই হারান মানুষ দু’টির পোষাক বের হল। সেই সঙ্গে আবিষ্কৃত হল দু’গাছি পৈতে । সাহেব প্রশ্ন করলেন, তোমাদের কি জাত ?
স্বরূপ উত্তর দিল, আজ্ঞে হুজুর, আমরা চণ্ডাল।
—তবে তোমাদের নৌকোয় বামুনের পৈতে কেন?
—আজ্ঞে, সে কথা তো আগেই বলেছি। এ না হলে কি এই সব মাঝিমাল্লাকে কখনও বামুন সাজান যায়?
স্বরূপের জবানবন্দী থেকে আরও একটি নাম পাওয়া গেল। সে বলল, আমাদের মধ্যে সেরা খুনী সুবল দাম। তাকে ধরতে পারলে ঢাকা ফরিদপুরের আরও কিছু কিছু খবর পেতে পারেন।
খুঁজেপেতে তাকেও বের করা হল। সুবল বলল, হুজুর, ঢাকার কথা আমি কিছুই জানি না। আমি বরং ময়মনসিংহের তাঁতী দু’জনের কথা বলতে পারি।
—বেশ, তাই বল। সুবল বলে চলল, গেল জ্যৈষ্ঠের কথা। তিনখানা নৌকো নিয়ে আমরা ময়মনসিংহ গেছি। দু’জন তাঁতী নৌকোয় এল কাপড় বেচতে। আমাদের লোকই তাদের ডেকে এনেছিল। সবাই মিলে দরদস্তুর করছে, আমি ডাঙায় গেছি একটু ঘুরে আসতে। ফিরে এসে দেখি কাপড়ের গাঁট দু’টি ঠিকই আছে, কিন্তু তাঁতী দু’জন নেই।
–কি হল তারা ?
-কি আর হবে? খুন হল।
—তারপর?
-তারপর আমরা রংপুর চলে গেলাম। সেখান থেকে ফেরার সময় পথে দেখা হয়ে গেল একদল তামাক কারবারীর সঙ্গে। নৌকো বোঝাই তামাক নিয়ে তারা সিরাজগঞ্জ যাচ্ছে। দলে পাঁচজন। দু’দিন জলে জলে এক সঙ্গে চললাম আমরা। তৃতীয় দিনে নৌকো থামিয়ে ওদের নেমন্তন্ন করা হল আমাদের নৌকোয়। সন্ধ্যায় হরি সংকীর্তন, একসঙ্গে গান হবে। ওরা এল। গোল হয়ে আমরা ওদের ঘিরে বসলাম। গান শুরু হল। তারপর এক সময় আসল হুকুম জারী হল। তারপর দেহগুলো জলে ভাসিয়ে দিয়ে ওদের নৌকোটা সঙ্গে নিয়ে আবার বদর’ বদর’ করে যাত্রা শুরু হল। কিছুদূর এসে ওদের নৌকোর মালপত্র সব বোঝাই করা হল আমাদের নৌকোয়।
-সে নৌকোটি কি হল ?
—সেটি সেখানেই ডুবিয়ে দিয়ে আমরা নারায়ণগঞ্জে চলে এলাম। তারপর তামাকের বস্তাগুলো সেখানে বিক্রি করে যে যার ঘরে চলে গেলাম।
—বাঃ চমৎকার! মন্তব্য করেছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট।
জবানবন্দীগুলো শুনলেই বোঝা যায়, ভোলানাথ, স্বরূপ বা সুবল বিচ্ছিন্ন কোন খুনী নয়। ওরা সু-সংগঠিত দল। শুধু পূর্ববঙ্গের নদীনালায় নয়, অন্যত্রও সেদিন তাদের অবাধ আনাগোনা। ঠগীদের মতই এরা একটি স্বয়ংনির্ভর সম্প্রদায়!
আচারে আচরণেও দু দলে অনেক মিল। ফলে বেকার বসে থাকবার মত পরিস্থিতি দেখা দিলে মাঝে মাঝে ডাঙার ঠগীও তাদের দলে ভিড়ত, স্বাদ বদল করত।
তাদের একজনের জবানবন্দী :
প্রায় চৌদ্দ বছর আগেকার কথা। আমরা বাইশ জনের একটি দল ছাপরা থেকে মুর্শিদাবাদ চলেছি। সুবন জমাদার আমাদের নায়ক। সে রাজপুত ছিল। দলের দু’জন—খোদাবক্স আর আলি ইয়ার-জাতে মুসলমান। ওরা মাঝে মাঝে জলেও নামত। থেকে থেকে ওরা আমাদের সে পথে উস্কে দিচ্ছিল। ভাগ্যও ভাল বলতে হবে। রাজমহলে এসে সত্যিসত্যিই একদল ‘পাঙ্গু’র সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তীর্থযাত্রীর বেশে তারা ঘাটের দিকে চলেছে। সুবন জমাদার ওদের দেখেই চিনে ফেলল । আলি ইয়ার এবং খোদাবক্স কানে কানে বলল, তারা এদের সঙ্গেই আগে কাজ করেছে। লোকগুলো গোটা পাঁচ যাত্রী নিয়ে ঘাটের দিকে যাচ্ছে। একসঙ্গে চলবে বলে রাস্তা থেকে তাদের জোগাড় করে এনেছে। খোদাবক্সকে দেখেই তারা থমকে দাড়াল। কথাবার্তা হল। স্থির হল, সুবন জমাদার, আমি এবং খোদ্ৰা কুর্মি—এই তিনজন আমরা ওদের সঙ্গে যাব। তিনজনেই জলের পথে নতুন। ভালোয় ভালোয় সেরে আসতে পারলে অনেক কিছু শিখে নিয়ে আসা যাবে!
রাজমহলেই তিনজন নৌকোয় চাপলাম। যাত্রী পাঁচজন আগেই উঠেছে। তারা একদিকে আরাম করে গুছিয়ে বসেছে। আমরা এবং নৌকোর খুনীরা অন্যদিকে। ওদের সকলেরই মাঝিমাল্লার বেশ। কেউ কেউ ছাউনির ওপরেও আছে। দু’জন ডাঙায়। তারা গুণ টানছে।
নৌকো চলেছে। কিছুর গিয়েই পথে একটি ফিনিস পড়ল। তারপর পর পর দু’খানা বজরা। আমরা চুপচাপ বসে আছি। ওরা পেছনে না পড়া অবধি কিছু করা ঠিক নয়। বড় মাঝির নির্দেশে নৌকো থামান হল। এদিকে যাত্রীরা উসখুস করছে। তারা বলছে, মাঝি, দেরী করলে কি করে হবে? আমাদের সময়ে পৌছাতে হবে।
মাঝি জবাব দিল, কি করব বলুন। মানুষ তো, কতক্ষণ আর একটানা গুণ টানতে পারে। একটু বিশ্রাম করতে দিন, একটানে নিয়ে যাবে। মাঝি তল্পিতল্পা খুলে খাবার নিয়ে বসে গেল।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে। এদিকে ফিনিসটিও অনেক দূর চলে গেছে। আমাদের নৌকো আবার জলে ভাসল। কিছুদূর যাওয়ার পরই ছইয়ের ওপর থেকে সঙ্কেত দেওয়া হল। সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের পেছনে যারা বসেছিল তারা ওদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। সামনে থেকে পাঁচজন গলায় ‘আঙ্গুছা পরিয়ে দিল। জলে তাই নিয়ম। ফঁাসটা সামনের দিক থেকেই আটকান হয়। ওরা মানুষটাকে পেছনের দিকে ঠেলে, অন্য ঠগীরা ঠেলে সামনের দিকে।
যা হোক, কাজ শেষ হয়ে গেল। হাঁটু দিয়ে চেপে শিরদাড়াগুলো ভেঙ্গে দেহগুলো তক্ষুনি জলে ফেলে দেওয়া হল। ওরা ছুরি ব্যবহার করে না। ঘাড় আর পিঠটা ভাল করে ভেঙ্গেই জলে ফেলে দেয়। তা ফেলার জন্যে নৌকোর পেছন দিকে দুটো তক্তা ওরা আলগা করেই রাখে।
এদিকে নৌকো কিন্তু তখনও চলছেই চলছে। যারা গুণ টানছিল তারা তখনও গুণ টানছে। ক’ক্রোশ চলে সকলে মিলে হিসেবনিকেশে বসল। দেখা গেল, পাঁচ জনকে খুন করে সবশুদ্ধ আমাদের আয় হয়েছে দু’শ টাকার মত। সুবন জমাদার বলল, তার দলে উনত্রিশ জন লোক আছে। আমি জানি, আমরা তেইশ জন। তাহলেও কিছু বললাম না। ওরা তো আর ঠগী নয়, ওদের ফঁাকি দিলে দোষ হয় না।
ছয় জনের ভাগ বেশী পাওয়া গেল। তাই নিয়ে খুশী মনে আমরা সে রাত্তিরেই আবার নৌকো ছেড়ে ডাঙায় উঠে এলাম। দলের অন্যরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। তাদের নিয়ে আমরা গঙ্গার ধার দিয়ে মোরমাকিয়া ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখান থেকে চার ক্রোশ দূরে আবার দেখা হয়ে গেল আর একদল ‘পাঙ্গু’র সঙ্গে। নৌকোয় তাদের তিনজন যাত্রী। এবারও ওরা ডাকল। কিন্তু আমি আর গেলাম না। সুবন জমাদার অন্য দু’জনকে নিয়ে নৌকায় উঠল।
মোরাদুন নামে আর এক ঠগীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন স্লীম্যান, আচ্ছা, তুমি তো অনেকবার ‘পাঙ্গু’দের সঙ্গে নদীতে গেছ, তাই না?
-আজ্ঞে হ্যা।
ওদের আর তোমাদের কি একই দেবী?
—আজ্ঞে হ্যা।
—তোমাদের সঙ্গে ওদের কি কোন পার্থক্য নেই?
—তা আছে বৈকি! উত্তর দিয়েছিল মোরাদুন।—ওদের কারবার নদীতে, আমাদের ডাঙায়। আমাদের নিয়ম কবর, ওদের নিয়ম বিসর্জন। ওদের রক্তপাত নিষিদ্ধ। ওরা যদি যাত্রার সময় রক্ত দেখে তবে আবার নতুন করে যাত্রা করতে হয়। আমরা খুনের আদেশ দিই ‘ঝিরণী’ দিয়ে, ওরা দেয় পাটাতনে তিনবার বৈঠা ঠুকে।
-তোমাদের ভাষা আর ওদের ভাষা কি এক?
—আলবৎ না। আমাদের বুলি ওরা একবর্ণও বুঝতে পারে না, আমরাও ওদের বুলি বুঝি না।
স্লীম্যান বক্তিয়ার নামে আর একজন ঠগীকে ডাকালেন—তোমারও তো মাঝে মধ্যে জলে যাওয়ার অভ্যেস ছিল শুনেছি। আচ্ছা, তুমি বল তো ওদের কি নামে ডাকা হয়।
—আজ্ঞে আমরা ডাকতাম পা বলে। -কোথায় থাকে ওরা?
—আমি যতদূর জানি হুজুর, ওদের নিবাস বাংলাদেশের বর্ধমান জেলায়। তাছাড়া বীরভূম, বাঁকুড়া, সিউরী, কালনা-কাটোয়াতেও অনেকে থাকে।
কথাটা মিথ্যে নয়। কিছুদিনের মধ্যেই আবিষ্কৃত হয়েছিল জলের ঠগীদের সবচেয়ে বড় আড্ডাখানা বর্ধমান। অবশ্য সেখানে তাদের ‘পাঙ্গু’ বা ‘ভাঙ্গু’ বলা হত না। নাম ছিল তাদের ‘ভাগিনা। তারা নৌকো নিয়ে এদিকে কলকাতা থেকে ওদিকে বেনারস, এমনকি কানপুর পর্যন্ত শিকার খুঁজে বেড়াত। তাদের নৌকোগুলো ছিল ভাড়াটে পানসির মত। লোক চলাচলের ঘাটে নোঙর করে জনাকয় ঠগ তার সামনে যাত্রী সেজে বসে থাকত। সত্যিকারের যাত্রীরা তাদের দেখে নৌকোটির দিকে আকৃষ্ট হত। দলের কিছু লোক যাত্রী বেশে ভাঙায়ও ওঁৎ পাতত। টোপ হয়ে তারা যাত্রীদের কৌশলে নৌকোয় ডেকে আনত। বদর’ বদর’ করে নৌকো ঘাট ছাড়ত। তারপর সুবিধেমত জায়গায় পৌঁছান মাত্র ছৈয়ের ওপর বসা মানুষগুলো ইঙ্গিত দিত। হালে বসা মানুষটি পাটাতনে তিনবার বৈঠা ঠেকাত। সঙ্গে সঙ্গে সব শেষ। ভাগিনাদের মধ্যে কড়া নিয়ম ছিল, কখনও যেন একবিন্দু রক্তপাত না হয়।
ফলে ১৮৩৬ সন পর্যন্ত গঙ্গায় বিস্তর মৃতদেহ পাওয়া গেলেও ভাগিনাদের অস্তিত্ব কেউ জানতে পারেনি। কিন্তু একজন ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব রহস্য উদঘাটিত হয়ে গেল। এক বছরের মধ্যেই আদালতের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল একশ’ একষট্টি জন। নাম পাওয়া গিয়েছিল আরও আটত্রিশ জনের। তখনই জানা গিয়েছিল, শুধু পূর্ববঙ্গে নয়, এই গঙ্গায় ঠগীনৌকো আছে আঠারখানা এবং তার প্রত্যেকটিতে আছে গড়ে চৌদ্দজন করে ভাগিনা।
ঠগী ভাগিনা’ নয়, ‘মাকফানসা’ নয়, ঠ্যাঙ্গাড়ে নয়, ধুতুরিয়া নয়,—সে ঠগীই।
