পর্ব ৮
একজন ভেবেছিলেন।
তিনি আর-এক ‘ঠগী’ । ফিরিঙ্গী ‘ঠগী’। ভারত-ইতিহাসে নাম। তার উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যান। সমসাময়িক ইউরোপীয়ানরা বলতেন ‘ঠগী স্লীম্যান’।
শীতশেষে ভারতের নানা রাজ্যের ভবানী-শিষ্যরা যখন অগণিত প্রাণের অর্থ বহন করে শত শত মাইল পায়ে হেঁটে ভক্তিবিনম্র চিত্তে কালীঘাটের পথিক, তখন চিৎপুর রোডের অদূরে লালদীঘির দক্ষিণ তীরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের একটি নির্জন কক্ষে উনিশ বছরের এক তরুণ ইংরেজ একটি ভ্রমণ-কাহিনীর পাতায় মগ্ন।
মাত্র মাস কয় আগে তিনি এদেশের মাটিতে নেমেছেন। কিন্তু এদেশ সম্পর্কে আন্তরিক আগ্রহ তার ছেলেবেলা থেকেই। কেননা, কর্ণওয়ালের যে পরিবারে তাঁর জন্ম, ইংল্যাণ্ডে সৈনিকের পরিবার হিসেবে চিরকাল তারা সুপরিচিত। বাবা ক্যাপ্টেন ফিলিপ ফ্লীম্যান সৈনিক ছিলেন। আট ভাইয়ের মধ্যে তিনজন নৌবাহিনীতে, একজন স্থলবাহিনীতে। পঞ্চম পুত্র উইলিয়াম সেই বাল্য বয়সেই মনে মনে স্থির করেছিলেন, তিনিও সৈনিক হবেন, এবং আর কোথাও নয়, সৈনিক জীবন কাটাবেন তিনি স্বপ্নের দেশ হিন্দুস্তানের মাটিতে। এ স্বপ্ন সেদিনের কোন উচ্চাভিলাষী তরুণের পক্ষে অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, মাত্র দশ বছর আগে শ্রীরঙ্গপত্তমের যুদ্ধ হয়ে গেছে। কোম্পানির শাসন সবেমাত্র স্থায়ী রাজত্বের চেহারা নিচ্ছে। অর্থ, বিত্ত, রোমাঞ্চ,—হিন্দুস্তান তখনও অভিযাত্রীর কাছে স্বর্গরাজ্য। এদেশের নামে যে কোন তরুণ ইংরেজ সেদিন উন্মাদ। তবুও জনৈক ফিলিপ-পুত্র উইলিয়ামের কথা বিশেষ করে বলতে হচ্ছে, কারণ, অন্যদের সঙ্গে তার স্বপ্নের কিঞ্চিং পার্থক্য ছিল। এই বালকটি শুধু ‘প্যাগোডা টি’ নামে টাকার গাছটির স্বপ্নেই বিভোর ছিল না, ইতিহাসের অনুরাগী ছাত্র হিসেবে অদেখা ভারতের মাটিকেও সে মনে মনে ভালবেসে ফেলেছিল। কলকাতায় নামবার পরক্ষণেই তার মুখে গড়গড় হিন্দুস্তানী ভাষা শুনে ফোর্ট উইলিয়ামের বুড়ো কর্ণেল সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর একটু নড়েচড়ে বসে বলে উঠেছিলেন, ‘বর্ণআউট হিয়ার ?
‘নো স্যার! সগর্বে উত্তর দিয়েছিল কর্ণওয়ালের খাটি ইংরেজ উইলিয়াম।
ইতিমধ্যে বারাসতের শিক্ষানবিশী সাঙ্গ করে ১৫ নম্বর নেটিভ ইনফেন্টির সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্র ঘুরে এসেছেন। অযযাধ্যা, নেপাল, উত্তর ভারতের অনেকখানিই তাঁর দেখা হয়ে গেছে। পথে পথে হিন্দুস্তানীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উর্দু, ফার্সী, পোস্তু, গোখালি ইত্যাদি আরও কয়টি ভাষা। এমন সময় হঠাৎ নির্দেশ এল ব্যারাকপুরে ফিরতে হবে। উইলিয়ামের কাছে ব্যারাকপুরের চেয়ে ঢের বেশী আকর্ষণ নেপাল সীমান্তের। তবুও কোম্পানির আদেশ! মনে মনে ঠিক করলেন, যদি যেতেই হয় তবে সময়টা এবার কাজে লাগাবেন। সেই বাসনাতেই ব্যারাকপুর থেকে একদিন পা দিয়েছিলেন লালদীঘির ধারে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লাইব্রেরীতে। সেখানে দু’দিন আনাগোনার পর বুড়ো কর্ণেল নিজেই এগিয়ে এসে পনের মাসের জন্যে ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাসে ভর্তি করে দিয়েছিলেন তাকে। উইলিয়াম সেখানে আরবী আর ফার্সী ভাষা শেখেন। সুযোগ পেলেই ভারত বিষয়ক বই খুলে বসেন। সেদিনও করছিলেন। কিন্তু পাতা উল্টাতে উল্টাতে এমন একটা জায়গায় এসে চোখ ঠেকল যেখান থেকে কোনমতেই আর এখোন যায় না, এখোন সম্ভব নয় -কে ওরা ? কোথায় থাকে ওরা ?—এই বিচিত্র পেশার মানুষগুলো কি এখনও আছে এই দেশে ? প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে ঘিরে ধরছে। স্লীম্যান আবার প্রথম ছত্রে ফিরে যাচ্ছেন।
ভ্রমণ-কাহিনীটির লেখক এম. থিভেনট নামে একজন ফরাসী পর্যটক। সপ্তদশ শতকে ভারতে এসেছিলেন তিনি। বইটি সেকালের দেখা-শোনা ভারতের বিবরণ।
কালীঘাট থেকে তীর্থশেষে তৃপ্ত ঠগীরা যখন হাল্কা মনে চিৎপুরের পথে দল বেঁধে নিজ নিজ ঘরে ফিরছে, লালদীঘির এককোণে টানা পাখার তলায় বসে তরুণ সীম্যান তখনও বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে পড়ছেন:
দিল্লী আর আগ্রার মধ্যবর্তী যে পথের কথা বলছি, জনপথ হিসেবে সেটি মন্দ নয়। কিন্তু সেখানে বাঘ, সাপ এবং ডাকাত আছে। বিশেষ করে কোন অচেনা পথিকের পক্ষে পথে কারও কাছাকাছি হওয়া নিরাপদ নয়। কেননা, বিশ্বের সবচেয়ে ধূর্ত ডাকাতদলের বাস এখানে। পৃথিবীতে এমন নিপুণ, এমন বিচক্ষণ খুনী আর হয় না। যাত্রীরা নাগালে আসামাত্র তারা একটা ফাঁস ছুড়ে দেয়। নির্ভুল তাক ওদের। ফাঁসটা ঠিক গলায় পড়বে। সঙ্গে সঙ্গে অন্য প্রান্ত টেনে ধরে পথিককে ওরা ধরাশায়ী করে ফেলে। চোখের নিমেষে সব শেষ।
কখনও কখনও শিকারকে ওরা আরও এক অভিনব কৌশলে প্রতারিত করে। চলতে চলতে পথিক হঠাৎ দেখতে পাবেন পথের ধারে দাড়িয়ে একটি সুন্দরী রমণী কাঁদছে। নির্জন বনপথে একাকিনী অসহায় নারীকে দেখে কে না থমকে দাড়াবেন? পথিক স্বভাবতই ঠগী তার দিকে এগিয়ে যাবেন। রমণী ইনিয়ে-বিনিয়ে তার কাছে নিজের দুঃখের কাহিনী বিবৃত করবে। সমবেদনায় পথিকের চোখেও জল আসবে। তিনি এবার পুরো কাহিনীটাই শুনতে চাইবেন। ক্রমে দু’জনে সাময়িক ঘনিষ্ঠত হবে। পথিক রমণীর অনুরোধমত তাকে পরবর্তী গঞ্জ বা শহরে পৌঁছে দিতে রাজী হবেন। সঙ্গিনীকে পেছনে বসিয়ে তিনি আবার ঘোড়ার পিঠে চাপবেন। ক’মিনিট পরেই রূপসী নিজ মূর্তি ধারণ করবে,—কোমর থেকে নিঃশব্দে ফাসটা বের করে পেছন থেকে তা উপকারীর গলায় পরিয়ে দেবে। তার সঙ্গীরাও কাছেভিতেই থাকে। তারা ছুটে এসে বাকীটুকু সমাধা করবে।•••
যতবার পড়েন ততবারই স্লীম্যানের চোখে মুখে এক অস্ফুট জিজ্ঞাসা ফুটে ওঠে, এখনও কি আছে ওরা—সেই অজ্ঞাত খুনীরা? কলকাতায়, ব্যারাকপুরে, বারাসতে; বেগম-জনসনের বৈঠকখানায়, সৈন্যদের ব্যারাকে, শহরতলীর হাটে-পুরানো মানুষ যাকেই সামনে পান তাকেই জিজ্ঞেস করেন স্লীম্যান-আজও কি এদেশে বেঁচে আছে থিভেনটের কালের সেই ডাকাতেরা ? সপ্তদশ শতকের খুনীরা?
কিন্তু বৃথাই খ্যাপার মত খুঁজে ফেরা। স্লীম্যানের এই জিজ্ঞাসার উত্তর কেউ জানে না। না কোম্পানির পুরানো অফিসাররা, না ব্যারাকপুরের হিন্দুস্তানী বাসিন্দারা।
ক’বছর পরে নিজেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ লাইব্রেরীতে কুড়িয়ে পাওয়া সেই জিজ্ঞাসার উত্তর। এবারও পুরানো কাগজের স্থপে, প্রাণহীন একটি পাণ্ডুলিপিতে।।
কলকাতায় নামবার (১৮০৯) আট বছর পরের কথা। সৈনিকের বেশে তারা-মীর্জাপুর, দিনাপুর, গোরখপুর, নানা জায়গা ঘুরে, সগৌরবে গোখ যুদ্ধ (১৮১৪-১৬) সেরে স্লীম্যান তখন এলাহাবাদে। সেদিনের অস্থির ভারতে কোম্পানির ফৌজের বিশ্রাম নেই। আজ এখানে,কাল সেখানে। জীম্যানও তখন ব্যস্ত পথিক। তিনি সাহসী সৈনিক। কিন্তু পথে পথে যেখানেই তিনি অচেনা মানুষের ভীড় দেখেন সেখানেই যেন কেমন অমনোযোগী হয়ে ওঠেন। কর্ণেল জিজ্ঞাসা করেন, এত কি দেখবার জিনিষ এই হিন্দুস্তানীর দলটিতে ? ধরা পড়ে লজ্জিত স্লীম্যান ঘাড় হেঁট করে উত্তর দিতেন, ‘বেগ ইওর পারডন স্যার! আমি থিভেনটের দেখা খুনীদের খুজছিলাম।।
অনেক খুঁজেছেন। কখনও গাঁয়ের পথে গাছতলায় বসা মানুষগুলোর মুখে, কখনও গমের ক্ষেতে দল বেঁধে কাজ করছে যারা তাদের বাহুতে, কখনও ফেরীঘাটের ভীড়ে, হুকোর ধোঁয়ার অন্ধকারে, হাটফেরত জনতার দঙ্গলে, পসারিনী রূপসীর চোখে। কিন্তু কোথাও ওরা নেই।
অবশেষে এলাহাবাদ। শত শত মাইল পথে, শত শত গাঁ-গঞ্জে যা পাওয়া গেল না, অবশেষে এলাহাবাদে পুরানো কাছারি বাড়িটার পুরানো একটি তাক সে উত্তরই তুলে দিল তার হাতে। থিভেনটের চেয়ে আরও তাজা সে বিবরণ, আরও প্রামাণ্য।
স্থানীয় কালেক্টার পুরানো বন্ধু । ছাউনি থেকে সৈনিক মাঝে মাঝে তার অফিসে যান। অলস বিকেলগুলো নানা কথায় কাটিয়ে আবার নিজের ছাউনিতে ফিরে আসেন। কথাপ্রসঙ্গে সেদিন যথারীতি থিভেনটের কথা উঠল। কালেক্টার বললেন, সে ধরনের একটা কিছু ছিল বলে আমিও শুনেছি।
—কোথায় ? সঙ্গে সঙ্গে ক্লীম্যান হাত চেপে ধরলেন তার।
—সম্ভবত তাও কোন বইয়ের পাতায়। চোখ বুজে বন্ধু কালেক্টার কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, তুমি এই তাকটা একটু হাতড়ে দেখতে পার। যতদূর মনে পড়ছে বইটা বোধহয় এখনও এখানে আছে!
স্লীম্যান তৎক্ষণাৎ কাজে লেগে গেলেন। কাগজের পাহাড ঘাঁটতে ঘাঁটতে অবশেষে হাতে উঠল সেই মূল্যবান সম্পদ। বই নয়, একটি পাণ্ডুলিপি। লেখক-ডাঃ রিচার্ড শেরউড। পরিচয়-ছত্রটি থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জের সার্জন ছিলেন। সমগ্র রচনাটি আসলে একটি রিপোর্ট। বিষয়বস্তু তার ফঁসীগীর বা আরিতুলুকর, বা তান্তকেশেরু বা ওয়ারলু ওয়ান্দুলু নামে এক বিচিত্র খুনী সম্প্রদায়। নাতিদীর্ঘ রিপোর্ট। কিন্তু রচনাকাল অত্যন্ত সাম্প্রতিক, মাত্র সেদিন—১৮১৬ সন । স্লীম্যান সেখানে দাড়িয়েই তা পড়তে লাগলেন।
ডাঃ শেরউড লিখছেন—১৭৯৯ সনে শ্রীরঙ্গপত্তমের পতনের পর বাঙ্গালোরের পথে প্রায় একশ’ ফঁাসীগীরের একটি দল ধরা পড়েছিল। ইউরোপীয়ানদের সঙ্গে তাদের সেই প্রথম মোলাকাত। উত্তরে দিল্লী এবং আরও দক্ষিণে ত্রিবাঙ্কুরেও একবার আরও দুটি দল ধরা পড়েছিল বটে, কিন্তু বাঙ্গালোরের দলটাই তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য । ওদের অবশ্য প্রমাণাভাবে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ডাঃ শেরউড তাদের থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে রেখেছেন। কেননা, কে জানে, কোনদিন হয়ত তা দরকার হবে।
আনন্দে কাঁপতে লাগলেন স্লীম্যান । তার হাতে পাণ্ডুলিপিটা কাপছে। হাতে-লেখা বাঁকা বাঁকা হরফগুলো কাপছে। যেন দলের পর দল ফঁসীগীর সার বেঁধে ছুটছে। রিপোর্টের শেষে ডাঃ শেরউড ভবিষ্যতের জন্যে আরও কিছু সঞ্চয় রেখে দিয়েছেন। পরিশিষ্ট হিসেবে তিনি এই ফাঁসীগীরদের ভাষারও কিছু কিছু নমুনা দিয়েছেন। স্লীম্যান আর পারলেন না। রিপোর্টটি বন্ধ করে বন্ধুকে বললেন, অশেষ ধন্যবাদ। আজকের মত আমি এটি নিয়ে যাচ্ছি, কাল আবার ফেরত পাবে।
সে রাত্তিরে আর ঘুম হল না। ডাঃ শেরউডের সংগৃহীত শব্দগুলো যেন হরফের বন্ধন ভেঙ্গে কানের গোড়ায় চিৎকার করছে-পান লেও ! তামাকু লেও! উদ্যোগী সৈনিক ইতিমধ্যে হিন্দুস্তানের অনেক ভাষা শিখে ফেলেছেন। এ ভাষাও তাকে শিখতে হবে, আওয়াজ ধরে খুঁজে বের করতে হবে খুনীকে। যেখান থেকে হোক, আর যেদিনই হোক।
সে সুযোগও এল একদিন। এবং এল অত্যন্ত আকস্মিকভাবে। ১৮২২ সনের কথা। স্লীম্যান তখন আর সৈনিক নন। তিন বছর আগে সৈনিকের পোষাক ছেড়ে সিভিল সার্ভেন্টের কোট গায়ে চাপিয়েছেন তিনি। ইচ্ছে ছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপনা করেন। কেননা, সামনে তৎক্ষণাৎ কোন যুদ্ধ নেই। ১৮১৮ সনের মারাঠা যুদ্ধেও তার বাহিনীকে রণাঙ্গনে যেতে হয়নি। দ্বিতীয়ত, পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে সৈনিক লড়াইয়ের মাঠের মত ফসলের মাঠগুলোকেও ভালবেসে ফেলেছেন। চাষীদের তিনি ভালবাসেন। তালুকদার-জোতদার বনাম চাষীর বিবাদ সম্পর্কে আন্তরিক আগ্রহ তার। ইতিমধ্যেই অযোধ্যার ভূতত্ত্ব এবং সেখানকার রাজস্বনীতি সম্পর্কে বহু তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছেন তিনি। সেগুলো নিয়ে ভাববার বিষয় অনেক। তৃতীয়ত, তাঁর ভাষাপ্রীতিও ইতিমধ্যে প্রায় ভাষাবিদের স্তরে উন্নীত হয়েছে। শুধু হিন্দুস্তানের মানুষের মুখের ভাষা নয়—আরবী, ফার্সী, হিন্দি, নানা ভাষার সাহিত্যেও তার দীর্ঘ পথ-পরিক্রমা হয়ে গেছে। তাও কাজে লাগান আবশ্যক। ১৮১৯ সনের ২২শে আগস্ট তারিখে তাই অভাবিত একটি দরখাস্ত নিয়ে তিনি তাঁর বাহিনীর অধিপতি কর্ণেল গ্রেগরীর সামনে এসে দাড়িয়েছিলেন। চমকিত কর্ণেল দরখাস্তটার ওপর চোখ বুলিয়ে ধীর স্বরে বলেছিলেন, অসম্ভব! এ জিনিষ কখনও আমি সুপারিশ করতে পারব না।
অসহায় স্লীম্যানের মুখে কাতরোক্তি শোনা গিয়েছিল, কিন্তু…
—কোন কিন্তু নয় স্লীম্যান, এই রয়েছে কলম, এই কালি । গ্রেগরী সামনের দোয়াতদানটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এখানে বস, তারপর কোন কথা না বলে আমি যা বলছি তাই লিখে যাও। তোমার মত একটি তরুণকে তো আমি আর স্কুল-মাস্টারে পরিণত হতে দিতে পারি না!
স্লীম্যানের সাহস ছিল না বৃদ্ধ কর্ণেলকে তিনি অমান্য করেন। কেননা, গ্রেগরীর গলায় সেদিন বাবা ফিলিপ ফ্লীম্যানের কণ্ঠস্বর।
সুতরাং, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপকের পদপ্রার্থনার বদলে দরখাস্তটি লিখিত হয়েছিল পলিটিক্যাল সার্ভিসে যে কোন আসনের জন্যে। ক’মাস পরে, ১৮১৯ সনের এক ভোরে খবর এল, তার সে আরজি মঞ্জুর হয়েছে। কলকাতা থেকে গভর্ণর-জেনারেলের আদেশ এসেছে সৈন্যবাহিনী থেকে তাকে ছেড়ে দিতে। ফ্লীম্যান এখন থেকে সিভিল সার্ভেন্ট। তার নতুন পদসগরে তিনি গভর্ণর-জেনারেলের একজন প্রতিনিধি-জুনিয়ার অ্যাসিস্টেন্ট টু দি এজেন্ট অব দি গভর্ণর-জেনারেল ইন সগর এণ্ড নর্মদা টেরিটোরিস। ইতিমধ্যে পদোন্নতিও হয়ে গেছে তাঁর। ১৮১২ সনে তিনি নর্মদা উপত্যকার নরসিংপুর জেলার প্রধান নিযুক্ত হয়েছেন। উপস্থিত সরকারী নির্দেশে জব্বলপুরে চলেছেন। সেখানে মিঃ মলোনিকে মাস কয়েকের জন্য তার কাজে সাহায্য করতে হবে। মলোনি জব্বলপুরের ম্যাজিস্ট্রেট।
ভোরে কাছারিতে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন স্লীম্যান। প্রধান শাসক মিঃ মলোনি সাদরে গ্রহণ করলেন তঁাকে।—ভালই হল স্লীম্যান, আমাদের এখানে এখন লোকের ভীষণ টানাটানি।
-বলুন স্যার, আমাকে কি করতে হবে? স্লীম্যান সবিনয়ে উত্তর দিলেন। হঠাৎ তার নজরে পড়ল ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসের সামনে বটগাছতলায় একদল লোক তল্পিতল্পা নিয়ে বসে আছে। কাজের কথা একপাশে ঠেলে দিয়ে স্লীম্যান জিজ্ঞেস করলেন, ওরা কারা স্যার? ঐ যে আপনার কাছারির সামনে বসে বসে জটলা করছে লোকগুলো, ওদের কথা বলছি স্যার!
মলোনি হাসলেন। এদিককার আর সব রাজকর্মচারীর মত তিনিও জানতেন, স্লীম্যানের ঠগী খোঁজার বাতিক আছে। তিনি বললেন, সঙ্গে রকমারি জিনিষপত্র রয়েছে, দেখে মনে হয়েছিল চোরাই মাল। কিন্তু কোন সাক্ষী-সাবুদ নেই। মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত ছেড়েই দিতে হবে।—বেশ তো, তুমি ওখান থেকেই কাজ শুরু করনা কেন ? বিস্তর কেস জমে গেছে। ঘাটতে ঘাঁটতে চাই কি তোমার ঠগীও দু’চারটে মিলে যেতে পারে।
মলোনির শেষ বাক্যটিতে প্রচ্ছন্ন একটু উপহাসের রেশ ছিল। স্লীম্যানের তা নজর এড়াল না। তিনি বললেন, কোনদিন খুঁজে বের করতে পারব কি পারব না সে কথা জানি না, কিন্তু ঠগী যে সত্যিই আছে এ বিষয়ে আমি কিন্তু নিঃসন্দেহ। আমার কি মনে হয় স্যার, জানেন ? সিন্ধু থেকে কুমারিকা পর্যন্ত ওরা একটি বিরাট দল, বিরাট কোন গাছের মত। চারদিকে তার ভালপালা ছড়িয়ে আছে। যে কোন একটি শাখায় হাত দিন, গোড়াটা খুজে বের করা তারপর আর মোটই কষ্টকর কিছু নয়। অবশ্য আমি জানি, লোকে আমার এইসব কথা শুনে হাসে।
—সে কথা ঠিকই অনুমান করেছ তুমি স্লীম্যান! এবার স্পষ্ট সহানুভূতি মলোনির গলায়। এবার আর তিনি হাসতে পারলেন না। স্লীম্যানের পিঠে হাত রেখে তিনি বললেন, ঠিকই লোকে তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু তার জন্যে মন খারাপ করে কি লাভ? আমরা জানি, তুমি ঠগীর ঘোরে আছ ; তাই থাক। উই উড নট হ্যাভ ইউ আদারওয়াইজ, মাই ল্যাড! জান, ওরা তোমার কি নাম দিয়েছে ? মলেনি কথাটা বলেই তার কেরানীর দিকে তাকালেন বাবুজী, গাছতলার ঐ লোকগুলোকে আর বসিয়ে রেখে কোন লাভ নেই। ওদের বিরুদ্ধে কোন সাক্ষী-প্রমাণ পাচ্ছি না, ওদের ছেড়ে দিন।
কেরানী ঘর ছাড়ামাত্র মলোনি আবার নিজের কথায় ফিরলেন, অফিসে-আদালতে, জিমখানায়, অফিসারদের মেসে ওঁরা তোমাকে কি নামে ডাকে তা তুমি শুনেছ ?
কৌতূহলী ফ্লীম্যান মাথা নাড়লেন, না। মলোনি বললেন, ঠগী স্লীম্যান!
স্লীম্যান হেসে উঠলেন। তাঁর সহকর্মীরা তাকে নিয়ে এতদূর এগিয়ে গেছেন তা তিনি তখনও জানেন না। মনে মনে তিনি বিড়বিড় করতে লাগলেন ‘ঠগী’,‘ঠগী’,- ঠগী ফ্লীম্যান’। হয়ত এ নামের আদি ব্যঙ্গ, হয়ত বিক্রপ, হয়ত সহানুভূতি। যে সূত্রেই তাঁর ভাগ্যে জুটে থাকুক নামটা, এ নাম তঁাকে রাখতেই হবে। তাঁকে ‘ঠগী স্লীম্যান’ই হতে হবে। মনে মনে সেই সংকল্প নিয়েই মশলানির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফ্লীম্যান কোর্ট ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
কোর্ট ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন স্লীম্যান । তাঁর মাথায় তখনও মলোনির কথাগুলো ঘুরছে। ওরা তাঁকে নিয়ে হাসে, মলোনির মত যারা, তাঁরা তাঁকে ভালবাসে বলেই সহানুভূতি জানায়, বাকী সকলে হাসে; উপহাস করে। ওরা তাঁর নাম রেখেছে ঠগী স্লীম্যান । স্লীম্যান, আমি স্লীম্যান আজ সকলের উপহাসের পাত্র, করুণার পাত্র! অস্থিরভাবে ঘরময় পায়চারি করতে করতে স্লীম্যান আবার জানালাটার সামনে এসে দাড়ালেন।
তাঁর সামনে সগরের পথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে একদল মানুষ। গাছতলার সেই দলটি। মলোনি ছেড়ে দিয়েছেন। তল্পিতল্পা নিয়ে ওরা আবার পথে নেমেছে, ধীরে ধীরে হাঁটছে। মাথায় তাদের পাগড়ী, গায়ে ধুলোয় ধুলোয় বিবর্ণ কামিজ, পিঠে পিঠে নানা আকারের পুটুলি। সঙ্গে গোটা ছয় ছোট ঘোট টাট্টও রয়েছে। ক্লান্ত, অলস পায়ে তারা হাঁটছে। খুরে খুরে ধুলো উড়ছে। ঠগী স্লীম্যানে’র ভাবনা ছেড়ে স্লীম্যান হঠাৎ যেন আবার নিজের মধ্যে ফিরে এলেন। তিনি জ কুঞ্চিত করলেন। তাঁর হঠাৎ থিভেনটের কথা মনে পড়ে গেল! মনে পড়ল ডাঃ শেরউডের কথা। তাছাড়, ইতিমধ্যে তিনি নানা সূত্রে আরও কিছু কিছু খবর জোগাড় করেছেন। একের পর এক সেগুলো ঝিলিক দিয়ে উঠল।
প্রথম খবর : ১৮০৭ সনে চিতোর এবং আর্কটে দুটি দল ধরা পড়েছিল। কিন্তু প্রমাণভাবে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় খবর : ১৮০৯-১০ সনে, অর্থাৎ স্লীম্যান যে বছর এদেশের মাটিতে প্রথম পা দেন, সে বছরই দোয়াবে পথের ধারে কয়েকটি কুয়োয় তিরিশটিরও বেশী মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু খুনীদের হদিস করা সম্ভব হয়নি। তৃতীয় খবর : সে বছরই ইংরেজ ভারতের প্রধান সেনাপতি জেনারেল লীগার দেশওয়ালী সিপাইদের হুসিয়ার করে দিয়ে এক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল–অচেনা পথিকদের বিষয়ে সাবধান !
স্লীম্যানের মনে কোন সন্দেহ নেই, সকলে না থোক, কোম্পানির কলকাতা-কাউন্সিল উনিশ শতকের সূচনা থেকে অন্ততঃ এই রহস্যময় খুনের কথা অবহিত ছিলেন। সেদিন তাদের পক্ষে এদিকে মনোযোগ দেওয়ার অবকাশ নেই, সকলেই নিজেদের ঘর সামলাবার কাজে ব্যস্ত। তাছাড়া, সমগ্র দেশে তখন এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততার মনোভাব,– ওরা তো আর ইউরোপীয়ানদের খুন করেনি। কেউ কেউ আরও দার্শনিক ছিলেন। তাঁরা বলতেন—একই বর্বরতা তো যুদ্ধও। সেখানেও আমরা মানুষ হয়েও মানুষকে সানন্দে খুন করি, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিই, শহরকে মরুভূমি করে তুলি। সুতরাং বিশ্বময় যেখানে এত হানাহানি, খুনোখুনি সেখানে ভারতের গাঁয়ের পথে কে কঁকিতে পড়ে নিজের অজানতে মারা গেল তার জন্যে ভেবে মরে লাভ কি ? কোম্পানির হাত গুটিয়ে বসে থাকার আর একটি কারণ, স্লীম্যান জানতেন, রাজ্যাভিলাষী বণিকেরা হিন্দুস্তানের মানুষের ধর্মকে সম্মান দিয়ে তাদের হাতে রাখতে চান। ক্লীম্যান শুনেছেন, উত্তর ভারতে একবার জনৈক ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে ছিয়াত্তর জনের একটি দলকে হাজির করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে সতের জন প্রাণের মায়ায় নিজেদের অপরাধ স্বীকারও করেছিল। কিন্তু তাদের মুখে ভবানীর উল্লেখ শুনে ম্যাজিস্ট্রেট তৎক্ষণাৎ তাদের ছেড়ে দেওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর মনে হয়েছিল এদের শাস্তি দিলে তা ধর্মে হাত দেওয়ারই সামিল হবে। সীম্যান আবার পায়চারি শুরু করলেন—কাওয়ার্ডস্ ! কি ধর্ম, আর কি ধর্ম নয়, রাজত্বের লোভ সেটুকু বলার সাহসও কেড়ে নিয়েছে আমাদের ? ছিঃ !
জানালা থেকে ততক্ষণে পথিকের দলটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। দুপুরের রোরে সগরের পথ ঝিমুচ্ছে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়ায় ধুলো উড়ছে। কখনও কখনও খেলাছলে দমকা হাওয়াই ঘূণি সাজছে। ধুলোর কুণ্ডলী ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠে যাচ্ছে, মুঠো মুঠো আবীরের মত চারদিকে রাঙা ধুলো ছড়িয়ে পড়ছে। স্লীম্যান উদাসীর মত সেদিকে তাকিয়ে আছেন। কেরানী কখন এসে নতুন সাহেবের জন্যে ফাইলের পাহাড় সাজিয়ে রেখে গেছে সেদিকে তঁার নজর নেই। পাশের টেবিলে দুপুরের টিফিন পড়ে আছে। কিন্তু ক্লীম্যান তার কথাও ভুলে গেছেন। এক-একটা চিন্তা তার মাথায় আসছে, পাক খাচ্ছে, আবার ভেঙ্গে পড়ছে। কখনও থিভেনট, কখনও মলোনি, কখনও ডাঃ শেরউড, কখনও বা এইমাত্র হারিয়ে যাওয়া লোকগুলো। মনে তার জব্বলপুরের দুপুর-তীব্র, উদাসীন, এলোমেলো !
-সাহেব ! কার পায়ের শব্দে তার ধ্যান ভঙ্গ হল। কিন্তু স্লীম্যান তবুও নড়লেন না। পেছনে না তাকিয়ে জানালায় চোখ রেখেই বললেন, কে তুমি? কি চাই!
-সাহেব। লোকটি এবার যেন তার ঠিক পেছনেই। সীমান সৈনিকের ভঙ্গীতে হঠাৎ ঘুরে দাড়ালেন। সেলাম করে এক পা পেছনে সরে গেল লোকটি। সাহেব, আমি কল্যাণ সিং!
-কল্যাণ সিং? সীম্যান কুঞ্চিত করলেন। হ্যা, মুখটা চেনা-চেনা ঠেকছে বটে। অন্য সময় হলে অনেক আগেই মনে পড়ে যেত। কিন্তু এখন তার মন অন্যত্র। তিনি ঠগীর চিন্তায় মগ্ন। ঠগী এবং ঠগী স্লীম্যানের চিন্তায়। সুতরাং লোকটিকে সামনে বাড় করিয়ে রেখেই তিনি ছাদের কড়িগুলোর দিকে তাকালেন। ভাব দেখে বোঝা গেল কল্যাণ সিংকে চিনতে হলে এখন তার কছুক্ষণ সময় লাগবে। সুতরাং, কল্যাণ সিং নিজেই এগিয়ে এল তার পরিচয় দিতে-সাহেব, আমি কোম্পানির আস্তাবলে কাজ করতাম।।
ওঃ। মুহূর্তে সমস্ত ঘটনাটা ক্লীম্যানের মনে পড়ে গেল।-তুমি ঘোড়ার দানা চুরি করতে, তাই তোমাকে আমি তিন মাসের জন্যে জেলে পাঠিয়েছিলাম, তাই না? কল্যাণ ঘাড় হেঁট করল,-হ্যাঁ, হুজুর! আপনি দেওতা! আমি জেলে গেলাম তত আপনি আমার ছেলেমেয়েদের তিনমাস নিজের কুঠিতে রেখে খাওয়ালেন
—হু। কিন্তু কল্যাণ সিং, আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি আবার ঝঞ্ঝাটে পড়বে ! স্লীম্যানের মনে হল কিছুক্ষণ আগে গাছতলার সেই দলটিতে কল্যাণ সিংকেও যেন তিনি দেখেছেন। তিনি বললেন, তুমি আবার বদ লোকের সঙ্গ নিয়েছ কল্যাণ সিং!
-ওরা যে খারাপ লোক তা আপনি জানেন সাহেব? কল্যাণ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ভয়ে তার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল ।–সাহেব, আপনি অন্তর্যামী, আমাকে আপনি দয়া করুন, আমি আর ওদের দলে থাকতে চাই না সাহেব! বল, বলতে কল্যাণ ফ্লীম্যানের পা দুটো জড়িয়ে ধরল।
স্লীম্যান এতটা আশা করেননি। তাঁর মনে হল, ঈশ্বর যেন তাঁর কথা শুনেছেন। এই কল্যাণ সিংকেই তিনি তাঁর ইজ্জত রক্ষার্থে দূত করে পাঠিয়েছেন। তিনি আর ওকে অবহেলা করতে পারেন না।
-কেন? দল ছাড়তে চাইছ কেন? ওরা বুঝি ঠিকমত ভাগ দেয়নি?
-না সাহেব, ওদের সর্দার দুর্গা বড় নিষ্ঠুর।।
-হু’, আমি জানি। স্লীম্যান অন্ধকারে আবার একটা চিল ছুড়লেন।—দুর্গা কথায় কথায় খুন করে, তাই না?
কল্যাণ সিং স্থির চোখে তাকিয়ে আছে সাহেবের মুখের দিকে, তার চোখ দুটো যেন মরা মানুষের চোখ, তাতে পলক নেই, প্রাণ নেই। এত বড় জোয়ান মানুষটার শরীরে যেন কোথাও আর এক ফেঁটা চেতনা নেই, সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে গেছে। কল্যাণ সিং যেন মরে গেছে।
-কি, চুপ করে রইলে কেন ? ধমকে উঠলের ফ্লীম্যান।আমি যা বললাম সে কি মিথ্যে ?
-না। যাদুকরের কবলে পড়া বিমূঢ় বালকের মত মাথা নেড়ে উত্তর দিল কল্যাণ সিং, না হুজুর !
ব্যস! আর একটি কথা নয়। ভাল চাও তো তবে চল আমার সঙ্গে। বলতে বলতে স্লীম্যান ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাড়ালেন। তারপর অদূরে বসা সিপাইটিকে ডেকে বললেন, সহিসকে বল এক্ষুনি আমার ঘোড়া বের করতে! বলেই সাহেব আবার নিজের কামরায় ঢুকলেন। পেছনে পেছনে তার মন্ত্রমুগ্ধ কল্যাণ সিং। সে যেন কিছু বলতে চাইছে, অথচ বলতে পারছে না। তার ঠোঁটে জিভেও শক্তি নেই। তাছাড়া হাওয়ায় জরুরী কিছুর গন্ধ পেয়ে সিপাইটিও ততক্ষণে এসে সামিল হয়ে গেছে। সাহেবের দিকে তাকিয়ে তারও কিছু বলবার সাহস নেই।
নিজের ঘরে ঢুকেই প্যান্টটাকে পাল্টে একটা ব্রিচেস পরে ফেললেন স্লীম্যান। তারপর পা দুটো বুটের মধ্য গলিয়ে দিয়ে চাবুকটা নিয়ে উঠে দাড়ালেন। চোখে পড়ল সামনে টেবিলে তখনও দুপুরের টিফিনটা পড়ে আছে। বাক্সটা খুলে তিনি ক’টুকরো রুটি পকেটে ফেললেন। তারপর একলাফে বারান্দা পেরিয়ে আস্তাবলের দিকে পা বাড়ালেন। উত্কন্ঠিত সিপাই শুনল, সাহেব চলতে চলতে বলে গেলেন, থানাদারকে বলবে সগরের পথে এক্ষুনি একদল পুলিশকে পাঠিয়ে দিতে। আমার সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন মাঝ পথ থেকে ফিরে না আসে! আর, পেছনের দরজা দিয়ে এই লোকটিকে ফাটকে নিয়ে যাবে।–কল্যাণ সিং, তোমার পক্ষে আপাতত সেটাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, নয় কি?
-হ্যাঁ হুজুর ! উত্তর দিয়েছিল কল্যাণ সিং। কিন্তু সাহেব সে উত্তর শুনে যেতে পারেননি। ততক্ষণে তিনি কম্পাউণ্ডের ওপারে সহিসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঘোড়ার গদী ঠিক করছেন। ওরা বারান্দায় সঁাড়িয়ে দেখল, চোখের নিমেষে তিনি লাফিয়ে ঘোড়ায় চড়লেন, তারপর কোনদিকে না তাকিয়ে ঘোড়ার মুখটা ঘুরিয়ে মুহূর্তে তিনি উধাও হয়ে গেলেন।
একরাশ ধুলোর মধ্যে ঘোড়াটা যখন থামল তখন অ্যাডজুট্যান্ট বাংলোর সবিস্ময়ে দেখলেন, তার পিঠে অসময়ের আগন্তুক যিনি তিনি আর কেউ নন, স্লীম্যান। সাজানো টিফিনের টেবিল সেখানেই পড়ে রইল। তিনি বারান্দা থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে স্লীম্যানের সামনে দাড়ালেন।
গিভ মি এ ট্রূপ এটওয়ান্স! -উইল য়ু? – আই এম আফ্টার এডেকয়েটস! উত্তরের অপেক্ষা না করেই ঘোড়ার মুখ ঘোরালেন স্লীম্যান। অ্যাডজুট্যান্ট জানতেন ক্লীম্যানের তাই নিয়ম। তিনি পথে পথে পরামর্শ নেওয়ার মানুষ নন, গায়ে পড়ে তাকে উপদেশ দিতে যাওয়াও বাতুলতা। পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে তাতে দুটো ছত্র লিখে পাশে দাড়ানো আর্দালির হাতে গুজে দিয়ে তিনি ঘোড়ার পিছু পিছু গেটের দিকে ছুটলেন,-মাই এমার্জেন্সি টপস উইল টার্ন আউট ইন টেন মিনিট ফর ইউ। গুড লাক! শেষ কথাগুলো তার কানে পৌছাল কিনা বোঝা গেল না। ধুলোর মেঘ গেট পেরিয়ে ততক্ষণে পথে নেমে গেছে।
বেশী দূর যেতে হল না। কিছুক্ষণ চলার পরেই পেছনে ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে ঠেকল। স্লীম্যান তাকিয়ে দেখলেন অ্যাডজুট্যান্ট কথা রেখেছেন। তিনি তার জরুরী বাহিনী পথে নামাতে সত্যিই বেশীক্ষণ সময় নেননি।
ওরা এসে সামিল হল। স্লীম্যান বললেন, তোমরা অন্তত আধ মাইল পেছনে থেকে। আমি আগে চললাম। নয়ত, এক সঙ্গে এত লোক দেখলে সব গোলমাল হয়ে যাবে। বলেই তিনি আবার জোর কদমে ঘোড়া ছুটালেন।
কিন্তু মলোনির হাতে ছাড়া পাওয়া দল তখন আর কাছে-ভিতে নেই। স্লীম্যান মনে মনে সময়টা হিসেব করে দেখলেন, এতক্ষণে তাদের বেশ কয়েক মাইল এগিয়ে যাওয়ার কথা। তাছাড়া এমনও তো হতে পারে, এপথ ছেড়ে তারা অন্য কোনদিকে চলে গিয়েছে ! তাহলেও আগে বড় রাস্তাটা দেখে নেওয়াই ভাল। স্লীম্যান ঘোড়ার বেগ আরও বাড়িয়ে দিলেন।
চলতে চলতে প্রায় পাটনের কাছাকাছি এসে তবে দলটার নাগাল পাওয়া গেল। স্লীম্যান ওদের পাশ দিয়ে চলেছেন। যেন তিনি ওদের বিষয়ে বিন্দুমাত্র কৌতূহলী নন। ওরাও তার সম্পর্কে বিশেষ উৎসাহী বলে মনে হয় না। বিরাট দল। একশ’র ওপরে মানুষ হবে। লটবহরও অনেক। ওরা আপন মনে পথের এক পাশ ধরে ছোট ঘোট জটলা বেঁধে ধীরে ধীরে চলছে। সাহেব এমন মনে করতে পারবেন না যে ওরা পথে কারও কোন অসুবিধে করছে। কিন্তু তা হলেও ফিরিঙ্গীর মর্জি! হঠাৎ দেখা গেল, দলের মুখ যেখানে শেষ সাহেব সেখানে ঘোড়া থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। ওদের দিকে ঘুরে হাত তুলে কি যেন বলছেন। মনে হচ্ছে থামতে হুকুম দিচ্ছেন। ওরা নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করছে। একজন তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। লোকটি তাঁর সামনে এসে দাড়াল। স্লীম্যান মনে মনে ধরে নিলেন—-এর নামই দুর্গা।
দুর্গা সেলাম করে সাহেবের একপাশে এসে দাড়াল।–সাহেব, আপনি কি কিছু বলতে চাইছেন ?
ঘোড়ার পিঠ থেকে স্লীম্যান উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। আচ্ছা, তোমরা বলতে পার এই পথে সগর এখান থেকে ঠিক কয় ক্রোশ হবে ? তাছাড়া, কোনাকুনি পাটনের আর কি কোন পথ আছে? যদি এখন ঘোড়া ছুটাই তা হলে কি সন্ধ্যার আগে সগর পৌঁছান যাবে ? আবোলতাবোল সব প্রশ্ন। দুর্গা বিজ্ঞের মত ভেবেচিন্তে একএকটা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, আর সাহেব পরক্ষণেই ঘোড়র পিঠ থেকে আর একটা প্রশ্ন তার মাথায় চাপিয়ে দিচ্ছে। দুর্গা তখনও জানে না, সাহেব তার সঙ্গে খেলছেন। ঘোড়সওয়ারদের বাহিনীটা এসে না পোঁছান অবধি ওদের ছলনায় আটকে রাখছেন।
প্রশ্নোত্তরের ফঁাকেই একসময় দেখা গেল ওদের চারপাশ ঘিরে এসে দাড়িয়েছে একদল সশস্ত্র অশ্বারোহী। ক্লীম্যান এবার ঘোড়া থেকে মাটিতে নেমে এলেন। বললেন, পথে নয়, তোমরা ঐ আমবাগানটিতে চল, তোমাদের সঙ্গে আমার কথা আছে।
দুর্গা তার দলকে সাহেবের কথামত আমবাগানে নিয়ে চলল।
স্লীম্যান বললে, এবার তোমরা বসতে পার।
দুর্গা উত্তর দিল, তা না-হয় বসছি হুজুর। কিন্তু আপনি যে কি বলতে চান তা-ই আমরা কিছু ঠাহর করতে পারছি না হুজুর।
ধমকে উঠলেন স্লীম্যান, সে পারবে কি করে? আমি বলতে চাই তোমরা ডাকাত। অমুক দিন রাত্তিরে তোমরা নরসিংপুরে ডাকাতি কারেছ! ওরা খিল খিল করে হেসে উঠলানা সাহেব, আমরা ডাকাত নই। নরসিংপুরে আমরা জীবনে কখনও যাইনি!
সীম্যান নিজেও সেটা জানেন। তবুও লোকগুলোকে আরও কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখতে হবে। কেননা, পুলিশ না এলে এত বড় দলকে নিয়ে ঘোরসওয়ারদের পক্ষে জব্বলপুরে ফেরা সম্ভব নয়। তিনি বললেন, তোমরা দোষী কি নির্দোষ সে পরে বোঝা যাবে, আপাতত তোমরা এখানে বস। আমার পুলিশ আসছে। তারা এসে তোমাদের সনাক্ত করবে। ওরা যদি বলে তোমরা নরসিংপুরের সেই দল নও, তবে আর মিছিমিছি তোমাদের আটকে রাখব কেন?
দুর্গা বলল, বেশ তো, আসুক না পুলিশ ! আমরা তো বসেই আছি। তবে আমি বলছি হুজুর, মিছিমিছি আমাদের ধরে রেখেছেন। আমরা তীর্থযাত্রী, আমাদের আর বসে থাকতে কি ? তাতে হুজুরেরই সময় নষ্ট। দুর্গা নিজেও এবার গাছতলায় বসে পড়ল। স্লীম্যান ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে তাদের মাঝখানে ফাঁকা জায়গাটায় রুমাল বিছালেন। তার ওপর বসে হাতে মাথা গুজলেন। সেদিকে তাকিয়ে দুর্গার মনে হল, বেয়াকুফ সাহেব যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। সে দলের অন্যদের সঙ্গে ঘরোয়া কথায় মন দিল।
ঘুম নয়, জব্বলপুরের অদূরে পাটনের পথে হিন্দুস্তানের মাটিতে বসে তরুণ সিভিলিয়ান ক্লীম্যান সেদিন স্বপ্ন দেখছিলেন। তাঁর মাথায় তখন সেদিনই সকালে শোনা মলোনির কথাগুলো ছুটে বড়াচ্ছে। ওরা তাকে পাগল বলে, ওরা তাকে উপহাস করে, ওরা তার নাম রেখেছে ঠগী স্লীম্যান! কে এই নামের মর্যাদা রাখতেই হবে।
লোকগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। স্লীম্যান তন্ময় হয়ে সে কথা শুনছেন। কখনও কানে আসছে ‘সামচানি’—খরগোস, কখনও ‘রেকলান’-শেয়াল। কখনও একজন কথার ফাঁকে বলছে ‘সেটাক’-সোনাদানা, কখনও ‘ব্রুস’—টাকা, কখনও বা ‘নিয়ামেত ভিটু’—ধনী হিন্দু। সে সব কথা যেন এক অভাবিত স্বপ্নলোকের। ডাঃ শেরউডের ছাত্র তার সব অর্থ না বুঝলেও এটুকু বুঝে গেছেন, তিনি একদল ঠগীর মধ্যে বসে আছেন। সেই ঠগী, এদেশের মাটিতে নামবার পর থেকেই যা তার ধ্যান, স্বপ্ন।
ইচ্ছে করলে যে কোন মুহূর্তে সাহেবের গলায় ফাঁস পরিয়ে দিতে পারে ওরা। এত বড় দলের পক্ষে ক’টি ঘোড়া আর জনাকয় সিপাই উধাও করে দেওয়াও ওদের পক্ষে মোটেই কষ্টসাধ্য নয়। স্লীম্যান তা জানতেন। কিন্তু তবুও সেদিন একবারও মৃত্যুভয় উকি দেয়নি তাঁর মনে। কারণ, স্লীম্যান সেদিন স্বপ্নাবিষ্ট মানুষ। তার মনে একমাত্র ধ্যান তখন ঠগী।
পুলিশ এল।
দুর্গার দল নিয়ে আবার জব্বলপুরের পথ ধরলেন ফ্লীম্যান। আগে আগে তিনি। পেছনে দুর্গার বাহিনী। তাদের ফাকে ফাকে পুলিশ। সবশেষে অশ্বারোহী দল। তারা কেউ জানে না, এই শোভাযাত্রার আগে আগে ঘোড়ার পিঠে চলেছেন যিনি, সেদিন তাঁর জীবনে সবচেয়ে সুখের দিন। সতীদাহ, বাধক ডাকাত, নেপাল যুদ্ধ, ১৮৪৩ সনের বুন্দেলখণ্ডের বিদ্রোহ, মহারাজপুরের লড়াই, সগরের দুর্ভিক্ষ, জব্বলপুরের রাজনীতি, অযোধ্যায় সুশাসন,ভারতে মরিশাসের আখের চাষ ভারতের ইতিহাসে ইংরেজের অনেক গৌরবের সঙ্গে জড়িত উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যানের নাম। কিন্তু স্লীম্যানের জীবনে সবচেয়ে আনন্দের দিন সেই অপরাহ্নটি, – পাটন থেকে তিনি যখন ইতিহাসকে সশরীরী করে ঘোড়ার পিছু পিছু হটিয়ে জব্বলপুরে ফিরছিলেন। দুর্গা জানত না, যখনই তাদের দিকে পেছন ফিরছেন তিনি, তখনই পুলকে তাঁর সর্বাঙ্গে রোমাঞ্চ দেখা দিচ্ছে। পকেটের রুটির বাণ্ডিল পকেটেই পড়ে আছে, সাহেব শ্রান্তি ক্লান্তি ভুলে গেছেন। আনন্দ আর উত্তেজনায় ঘোড়ার পিঠে তিনি থর থর করে কাঁপছেন।
