ঠগী – ১০

পর্ব ১০

ঠগী আর ঠগী।

নরসিংপুরের জেলাশাসক ফ্লীম্যানের সেদিন ঠগী ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন ভাবনা নেই। রাজসাক্ষীরা আসছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জবানবন্দী শোনাচ্ছে ; টেবিলে মেলে ধরা মানচিত্রে দাগ কাটছে। স্লীম্যান যেন কোন সার্ভেয়ার–আমিন। তাঁকে কোন অজ্ঞাত দেশের মানচিত্র আঁকতে হবে। এমন মানচিত্র যা কারও ধারণায় নেই, অথচ প্রতিটি বিন্দু যার নির্ভুল।

সে এক দেখবার মত বস্তু। দেরাজে রাশি রাশি মানচিত্র মজুত করে রেখেছেন তিনি। পথ ঘাট, নদী নালা, গাঁ শহর—সাজান সুন্দর মানচিত্র। কোন দল ধরা পড়লেই স্লীম্যান নির্ভুল চোখে সেখান থেকে গুটিকয় মানুষকে আলাদা করে রাখেন। দলের মধ্যে  প্রকৃতিতে যারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল, কিংবা যাদের প্রাণের মায়া অন্যদের চেয়ে প্রবল—সাধারণত তারাই সাহেবের পছন্দ। স্লীম্যান সময় বুঝে তাদের নিজের ঘরে তলব করেন। তারপর অনর্গল ‘রামসি’তে শুরু হয় তাদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন। ওরা দু’চার মিনিট কথা বলার পরেই জেনে যায়, এ সাহেবকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা বাতুলতা।

কথা বলতে বলতেই একসময় দেরাজ থেকে মানচিত্রগুলো বের করে টেবিলে রাখেন স্লীম্যান। তারপর বন্দীর হাতে লাল পেন্সিলটা তুলে দিয়ে বলেন, এই হচ্ছে গোয়ালিয়রের পথ—এই নালা, এই শহর, এই বন; অমুক অমুক মানুষগুলোকে কোথায় রেখেছিলে সে জায়গাটা দাগিয়ে দাও।

একটা কবর চিহ্নিত করতে গিয়ে আরও পাঁচটা কবরের কথা মুখে এসে পড়ে। স্লীম্যানের ইঙ্গিতে আবার কেরানীর হাতের কলম চলতে শুরু করে। সাহেবের হুকুম আছে, দরকারী অথবা অদরকারী সে বুঝবেন তিনি, একটি কথাও যেন বাদ না পড়ে।

কথা শেষ হওয়া মাত্র মানচিত্রটা আবার ভাল করে বুঝিয়ে দেবেন স্লীম্যান। তারপর বলবেন, নতুন যে কবরগুলোর কথা বললে সেগুলো কোথায় আছে দেখিয়ে দাও। এই হচ্ছে ইন্দোরের পথ-শহর এখান থেকে আট ক্রোশ-আমবাগানটা ডাইনে না বাঁয়ে ?-বাঁয়ে ? বেশ, তাহলে এখানটায় একটা দাগ দাও।

হুকুম তামিল করে মন্ত্রমুগ্ধের মত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ঠগী । তখনকার মত তার কাজ শেষ। এবার আর একজনের পালা। তার সামনে রাখা হবে আর একটি নতুন মানচিত্র। তারপর একই কথোপকথন, একই নির্দেশ—বিলগুলো কোথায় আছে দেখিয়ে দাও।

সকলের সব বক্তব্য শেষ হয়ে গেলে সুরু হবে স্লীম্যানের কাজ। সামনে তাঁর রাশি রাশি জবানবন্দী, অসংখ্য মানচিত্র। প্রথম কাজ এগুলো থেকে খুজে খুজে নামগুলো বের করতে হবে। তারপর পুরানো খাতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে রোসন জমাদার আর রুস্তম খাঁ যে নামগুলো বলে গেল তারা একই মানুষ কিনা। বাপের নাম, গায়ের নাম, দলপতিদের নামগুলো খুঁটিয়ে দেখতে হবে। সব দেখার পরে বিস্তীর্ণ বংশ-তালিকায় হয়ত আরও একটি অতিরিক্ত শাখা যোগ হবে। কেননা, রোসন জমাদারের এক বোনের যে ইন্দোরে সাদী হয়েছিল সে খবরটা চোখের সামনে রাখতে হবে ।

স্লীম্যানের হাতে রচিত ঠগীদের এই বংশ-তালিকাগুলো এক বিস্ময়কর দলিল। কয় বছর আগেও যাদের অস্তিত্ব ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত, তাঁর গবেষণার ফলে তারা আজ যে কোন সুপ্রতিষ্ঠিত প্রাচীন রাজবংশের মত শাখাপ্রশাখায় সম্পূর্ণ এক-একটি সুস্পষ্ট বংশ। সাহেবের সামনে রাখা কাগজটির দিকে এক নজর তাকালেই বোঝা যায়, এনায়েত বা দুর্গা—কেউ ভুইফোড় ঠগ নয়। পুরুষানুক্রমিক ঐতিহ্য তাদের – এনায়েতের বৃদ্ধ প্রপিতামহ কে ছিল, তার অধস্তন পুরুষ ক’জন এবং তাদের মধ্যে ক’জন অযোধ্যা ছেড়ে দক্ষিণে এসে সংসার পেতেছিল তা যেমন সেখান থেকে এক লহমায় জেনে ফেলা যায়, তেমনি জানা যায় আজ এই মুহুর্তে এনায়েত ছাড়াও তার আর ক’টি ভাই ভাগিনা বা নিকট-আত্মীয় আছে। তাদের কি নাম, কি ঠিকানা এবং কার তহবিলে অপহৃত প্রাণের সংখ্যা কত, স্লীম্যানের বংশ-তালিকায় তাও আছে।

তবে কেবলমাত্র তার ভিত্তিতেই কোন ঠগীকে হাতে পাওয়া সম্ভব নয়। ফেরারীদের আইনের পরিধিতে আনতে হলে মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে সব মানচিত্র ছেঁকে স্লীম্যান বসে বসে নিজে যে মানচিত্র তৈরী করেছেন সেগুলো। ঠগীদের এক-একটি এলাকার জন্যে এক-একটি মানচিত্র। গা থেকে বের হয়ে একটি দল কোন্ কোন্ পথে চলতে পারে, রাত্রে কোথায় কোথায় আশ্রয় নিতে পারে, সেখানে আশ্রয় দেওয়ার মত কেউ আছে কিনা সব লেখা আছে তাতে। তার চেয়েও দরকারী নিশানা—পথের ডাইনে বাঁয়ে কোথায় কোথায় বাগ’ বা খুনের জায়গা আছে, কোথায় আছে বিল’ বা কবরখানা। ঠগীরা সাধারণত পথের যেখানে-সেখানে ‘ঝিরণী’ দেয় না, একশ’ মাইল হাঁটতে হলেও তারা ‘বাগ’-এ এসেই তবে রুমাল বের করবে, বিল’-এ কবর দেবে। সুতরাং, ঠগীর হদিস করতে হলে তার খবরগুলো সকলের আগে জানা দরকার।

দিন রাত সহকারীরা আসছেন, যাচ্ছেন। কেউ বিশেষ এলাকার সর্বশেষ মানচিত্র চাইছেন, কেউ স্লীম্যানের নিজস্ব দু’জন গুপ্তচর চান। কেউ বা রাজসাক্ষী নিয়ে কবর খুলতে চলেছেন-স্লীম্যানের কোন বিশেষ নির্দেশ আছে কিনা, যাওয়ার আগে তাই জানতে এসেছেন। তিনি বের হতে না হতেই আর একজন ছুটতে ছুটতে রহস্যময় দু’টি খুনের খবর নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।—গলায় ফঁসের কোন চিহ্ন নেই। পথের ধারে পড়ে আছে দু’টি নারী-পুরুষ।আপনার কি মনে হয় স্যার, এগুলোও ঠগীদের কীর্তি?

দিন রাত ঠগী আর ঠগী ।

এমেলির মনে পড়ে, সেদিন তিনিও ‘ঠগী-বৌ’ হয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিদিন বসে বসে জবানবন্দীগুলো পড়তেন, কলকাতার জন্যে স্লীম্যান যে রিপোর্টটি তৈরী করছেন তা দেখতেন। নিজের বক্তব্য কিছু থাকলে তা পেশ করতেন। স্লীম্যান এমেলিকেও সেদিন ঠগী বিষয়ে রীতিমত বিশেষজ্ঞে পরিণত করে ফেলেছিলেন। তাছাড়া উপায়ও ছিল না। কেননা, প্রতিদিনের প্রতিক্ষণের সহচরী যিনি তাঁর মনে ভয় বা ভ্রান্তি কোনটাই নিরাপদ নয়। স্লীম্যানের বাংলোয় সব সময় যে অন্তত গোটা কয় খুনী হাজির থাকে এমেলির পক্ষে সে খবরটা জানা ভাল। পথেও যে সঙ্গী হিসাবে তিনি জনাকয় খুনীকে বেছে নিয়েছেন, স্লীম্যান সে খবরটাও তাঁকে জানাতে ভুলতেন না।

সে এক আশ্চর্য জীবন। এমেলির মনে পড়ে, পরবর্তীকালের অসুস্থ, রুগ্ন স্লীম্যানের সঙ্গে কি পার্থক্য সেদিনের ঠগী স্লীম্যানের। বিশেষত ১৮২৬ সন থেকে ১৮২৯ সন এই বছর তিনটিতে। এমেলি এসেছেন ‘২৮ সনে। কিন্তু তার আগের বছরগুলোও তার কাছে অজানা ছিল না। ‘২৬ সন থেকে নিজের সব শক্তি দিয়ে ঠগীদের সন্ধানে কাজে নেমেছেন স্লীম্যান। কোম্পানির কলকাতা দপ্তরে বছর বছর দীর্ঘ রিপোর্ট এসে পৌঁছচ্ছে। কোথায় কত ঠগী ধরা পড়ল, কিভাবে বিচার হল, কত জনের ফাঁসী হল, বাকীরা কোথায়—শত শত পৃষ্ঠাব্যাপী তার বিস্তৃত বিবরণ। কিন্তু কোম্পানি তখনও কার্যত অনড়। সিভিল সার্ভেন্ট স্লীম্যান তাদের হাতে এক অমূল্য সম্পদ। ঠগী দমনের কাজে তাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে রাজী নন। ১৮৩০ সনে, অর্থাৎ, মানচিত্র এবং বংশ-তালিকায় দেরাজে যখন আর ঠাঁই নেই,—তামাম হিন্দুস্তান যখন ঠগীদের হাতের পেন্সিলে চিহ্নিত—কোম্পানি তখন স্লীম্যানকে নিযুক্ত করলেন জব্বলপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট! হয়ত শেষ পর্যন্ত সে আসনে বসেই বাকী কাজটুকুও শেষ করতে হতো। কিন্তু সীম্যান তথা হিন্দুস্তানের সৌভাগ্য—দু’বছর আগে গভর্নর-জেনারেলের আসনে বসেছেন—বেন্টিঙ্ক।

ইংরেজের ইতিহাসে ‘বর্ণহীন পুরুষ’ বেন্টিঙ্ক সম্ভবত আমাদের ইতিহাসে অন্যতম বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব। একদা (১৮০৭ সনে) ভেলোর বিদ্রোহের কারণে অকর্মণ্যতার অভিযোগে ওঁরা মাদ্রাজ থেকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁকে। সৈনিক সেজে বেন্টিঙ্ক অতঃপর যোগ দিয়েছিলেন স্পেনের রণাঙ্গনে। শোনা যায়, সেখানেও ডিউক অব ওয়েলিংটন মোটেই পছন্দ করতেন না তাকে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষও যে বিশেষ সুনজরে দেখতেন তাঁকে এমন নয়। ভারতে গভর্ণর জেনারেলের পদে তিনি ছিলেন তাদের সামনে ষষ্ঠতম নাম। অন্য পাঁচ জন নানা কারণে বাতিল হয়ে গিয়েছিলেন বলেই ‘বর্ণহীন’ বেন্টিঙ্ক প্রেরিত হয়েছিলেন ভারতে। কিন্তু তৎকালের মাপে চিন্তায় প্রগতিশীল হুইগ, বেন্থাম-শিষ্য বেন্টিঙ্ক অচিরেই ঠগী’র মনোজয় করে নিলেন! তিনি সতীদাহ, সন্তান-বিসর্জন ইত্যাদির মত ঠগীদমনকেও তার কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন। কেননা, বেন্টিঙ্ক বিশ্বাস করতেন-ভারতে ইংরেজের নৈতিক দায়িত্ব বিরাট। কথাটা বলেছিলেন অবশ্য এলেনবারো, কিন্তু তা কাজে পরিণত করলেন যিনি, তিনি –উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। এদেশে নামবার পরক্ষণেই তিনি স্লীম্যান এবং তার নেশা’ ঠগীদের বিষয়ে কৌতুহলী হয়ে উঠলেন। তার নির্দেশে

স্লীম্যানের ওপর তাদের দমনের বিশেষ কর্তব্যভার ন্যস্ত হল । দু’বছরের মধ্যে অনেক বাধা অপসারিত হল। এবং পরের বছর, ১৮৩১ সনে গভর্ণর-জেনারেলের বিশেষ নির্দেশে সীম্যান অন্য সব দায়িত্ব থেকে ছাড়া পেলেন। বেন্টিঙ্ক তাকে সমগ্র ভারতে ঠগী দমনের কাজে নিযুক্ত করলেন। এবার আর জব্বলপুরের জেলাশাসক নয়, —তাঁর পরিচয় ‘সুপারিন্টেন্টে জেনারেল। গভর্ণর-জেনারেলের ঠগী দমন কার্যক্রমের তিনি সর্বাধিনায়ক। শুধু নর্মদা উপত্যকা নয়, লাহোর থেকে কর্নাটিক-সমগ্র ভারত তার এলাকা। হেড কোয়াটার্সসগর। সেখানে সাদা বাংলোটায় বসে বসে ফিরিঙ্গী ‘ঠগ’ মুলতানী আর জামুলদেহীদের সঙ্গে শেষ পাঞ্জা কষার কথা ভাবছেন।

কাজটা সহজ ছিল না।

পথে প্রথম বাধা কোম্পানির আইন। আইন অনুযায়ী অপরাধীর স্বীকারোক্তি বা তদনুযায়ী মাটির নীচে ক’টি মৃতদেহ প্রাপ্তিই যথেষ্ট ছিল না। কোম্পানির বিচারকেরা রাইটার থেকে আইনের সিড়ি ডিঙ্গাতে ডিঙ্গাতে বিচারক হয়েছেন। তারা আরও সাক্ষী-প্রমাণ চান। কিন্তু ঠগীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে কে?

স্লীম্যান লিখছেন । ১৮২৪ সনের শীতকালের কথা। হিন্দোরিয়ায় এসে আস্তানা পেতেছে দু’শ ঠগীর একটি দল। ভোরে সাত জন লোক ওদের সামনা দিয়ে চলে গেল। তাদের প্রত্যেকের হাতে হাতে বন্দুক। ওরা দেখেই বুঝল-নিশ্চয় টাকা নিয়ে যাচ্ছে। একজন গিয়ে জেনে এল—ওদের সঙ্গে টাকা পয়সা যা আছে সব তার জব্বলপুরের বিখ্যাত ব্যাঙ্কার মোতি কোচিয়ার। তার টাকা নিয়েই ওরা বলা চলেছে। বান্দা জায়গাটা এলাহাবাদের পঁচান্নব্বই মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। খবর শুনেই তিন জন দলপতি তক্ষুনি চল্লিশ জন সঙ্গী নিয়ে বেরিয়ে পড়ল পথে।

সাত মাইল চলার পর একটা খালের ধারে এসে লোকগুলোর দেখা পাওয়া গেল। কাছাকাছি কোন ‘বিল’ নেই, আধমাইল দূরে একটি গাঁ ছাড়া কোন বন নেই। অথচ রকম দেখে মনে হচ্ছে লোকগুলো খুবই হুসিয়ার, তারা কিছুতেই অচেনা সঙ্গীকে ধারে ঘেঁষতে দেবে না। সুতরাং, ওরা একটি অ-ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নিল। ঠগীর মত সুযোগের অপেক্ষায় না থেকে অতর্কিতে তলোয়ার হাতে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঠগীরা সাধারণত এমন আচরণ করে না।  যাহোক, ওরা যখন মৃতদেহ নিয়ে ব্যস্ত তখন হঠাৎ চোখে পড়ল গাঁয়ের একটি লোক এই দিকেই আসছে। গ্রামটির নাম—সুজাইনা। সেখানে অনেক গো-পালকের বাস। সে খবরটা ওদের জানা থাকবার কথা। তাছাড়া, লোকটি একটি মোষ সঙ্গে নিয়ে হাঁটছিল। আইনত সে অবধ্য ! কিন্তু ওরা সেদিন ধর্মের পথ পুরোপুরি ত্যাগ করেছে। সুতরাং, লোকটি কাছাকাছি আসা মাত্র তাকেও তলোয়ারের এক ঘায়ে ধরাশায়ী করা হল। কেননা, ওরা জানে মরা মানুষ সাক্ষী দিতে পারে না! যুগপৎ দু-দু’টি অশাস্ত্রীয় কাজ করে ওরা তৃতীয় পাপ করল। মৃতদেহগুলো কবরস্থ না করেই ধনদৌলত যা ছিল লুঠে নিয়ে নিজেদের পথ ধরল।

সেদিন রাত্তিরে প্রচণ্ড বৃষ্টি। পরের দিন ভোরে সুজাইনা থেকে হাত্তার দিকে হাঁটছিলেন গায়ের ক’টি মেয়ে! পথের ধারে একগাদা মৃতদেহ দেখে তারা আঁতকে উঠলেন। একজন তাদের গাঁয়ের মানুষটিকে চিনে ফেললেন। হাত্তা যাওয়া স্থগিত রেখে খবর দিতে তারা আবার গায়ে ফিরে এলেন।

দেখতে দেখতে পথের ধারে ভীড় জমে উঠল। গোটা গা ভেদে পড়ল সেখানে। সকলে মিলে গাঁয়ের মানুষের দেহটি দাহ করলেন। বাকী সাতজন শেয়াল শকুনের জন্য সেখানেই পড়ে রইল।

বহুদিন পরে খুনীদের জবানবন্দী অনুযায়ী সীম্যানের লোকে যখন সেখানে পৌছলেন-তখন সাত পথিক বা গ্রামের সেই হতভাগ্যের কোন চিহ্ন নেই। গোটা গাঁ এক জায়গায় জড় করা হল । সবাই একবাক্যে জানাল, না হুজুর, আমাদের গায়ের আধমাইলের মধ্যে এমন ঘটনা কিছুতেই হতে পারে না! হলে নিশ্চয় আমরা জানতে পারতাম। বিস্তর ভয় দেখান হল, জেরা চালান হল, কিন্তু গাঁয়ের সেই এক কথা-এসব ঝুট খবর হুজুর, কুট খবর ! কে আপনাদের ধোঁকা দিয়েছে।

স্লীম্যান লিখছেন : ওদের এই আচরণের একমাত্র কারণ আদালতের ভয়।—ওরা কেউ সাক্ষী দিতে চায় না। কেননা, তাতে বিস্তর ঝামেলা। গা ছেড়ে বহুদূর যেতে হবে, কাজকর্মের ক্ষতি হবে, তারপর জেরা, শুনানী আরও কত কি আছে!

এসবের ভয়েই যে লোকগুলো মিথ্যে বলছিল তারও প্রমাণ পাওয়া গেল ক’মিনিটের মধ্যে। তদন্তকারী অফিসার যেই বললেন, তোমরা নির্ভয়ে বল, তোমাদের কাউকে সাক্ষী দিতে শহরে ছুটতে হবে না। ওরা তক্ষুনি তাকে সেই খুনের জায়গায় নিয়ে চলল।

একই আদালতভীতি তখন শহরের মানুষের মধ্যেও। ঠগীদের হিসেব মত লোকগুলোকে খুন করে ওরা সেদিন সাকুল্যে চার হাজার পাঁচশ’ টাকা পেয়েছিল। কিন্তু কোথাও কোন থানায় তার কাছাকাছি। সময়ে সেই মর্মের কোন এজাহার নেই। হারিয়ে যাওয়া সাতজন মানুষ বা এতগুলো টাকা—কোন বিষয়েই কোথাও কোন বক্তব্য নেই। অবশেষে ঘাটতে ঘাটতে যখন খাস জব্বলপুরে মোতি কোচিয়া আবিষ্কৃত হলেন—তখন তাঁরও সেই এক কথা,-ঝুট বাত হুজুর ! নিশ্চয় কোন শত্রু আমাকে বিপদে ফেলার জন্যে আপনাদের এই খবর দিয়েছে। বাধ্য হয়েই স্লীম্যানকে তার গোপন খাতায় হাত দিতে হল। দেখা গেল, সেখানে ঐ তারিখে স্পষ্টাক্ষরে লেখা রয়েছে বান্দায় পাঠান টাকার হিসেব। পাশে সাতজন বেয়ারার নাম।

স্লীম্যান বললেন, তবে?

মোতি কোচিয়া জবাব দিল, কে এতসব হুজ্জত পোয়াতে চায় বলুন!

কেউ তা পোয়াতে চাইত না। স্লীম্যানের তাই প্রধান কাজ হয়ে দাড়াল এ অসুবিধা দূর করা। তিনি কলকাতায় দরবার শুরু করলেন। তাঁর বক্তব্য-কোম্পানির ম্যাজিস্ট্রেটদের নিজ নিজ এলাকায় আটকে রাখলে চলবে না। ঠগীদের ক্ষেত্রে তাদের এক্তিয়ার বাড়াতে হবে। যে কোন ম্যাজিস্টেট যাতে যে কোন এলাকার ঠগীর বিচার করতে পারেন তেমন আইন করতে হবে। কেননা, কোন ঠগীই আপন ঘরের পাশে খুন করে না। তারা রুমাল খোলে নিজের গাঁ থেকে শত শত মাইল দূরে, ধরা পড়ে আরও দূরে, হয়ত অন্য কোন রাজ্যে। সুতরাং, যদি সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট ওদের বিচারের দায়িত্ব নিতে না পারেন তবে স্লীম্যানের কাজ আরও বেড়ে যায়। এমনকি শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। কারণ, অপরাধী হাতে পেয়েও যদি ম্যাজিস্ট্রেটের সন্ধানে হাজার হাজার মাইল ঘুরে বেড়াতে হয়, তবে অপরাধী সন্ধান করবে কে? ক্লীম্যান তাই দাবী তুললেন—পুরান ব্যবস্থা রদ করা হোক। তার দ্বিতীয় দাবী-সাক্ষীদের সাক্ষ্যদানের ঝামেলাও কমাতে হবে। তার একমাত্র পথ লিখিত সাক্ষ্যকে মৌখিক সাক্ষ্যের মর্যাদা দেওয়া। সাক্ষী যদি কাছাকাছি আদালতে যেতেও অস্বীকার করে তবে অন্যভাবে তার বক্তব্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে হবে। তাকে ডাকযোেগে নিজের কথা জানাবার সুযোগ দিতে হবে।

বেন্টিঙ্ক সানন্দে তার এই প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন। স্লীম্যানকে সুপারিন্টেন্টে-জেনারেল নিযুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে নর্মদা এবং সগর এলাকায় তাঁর প্রতিনিধি স্মিথ সাহেবের ওপর ভার দিলেন ঠগীদের বিচার করবার। পরবর্তীকালে অবশ্য একই উদ্দেশ্যে হায়দ্রাবাদ, মহীশূর, ইন্দোর, লক্ষ্ণৌ এবং গোয়ালিয়রেও কয়েকটি বিশেষ আদালত স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু সেদিন স্লীম্যান এবং স্মিথ দু’জনেরই প্রধান কর্মশালা—সগর। সেখানে দু-দু’টি কারাগার তৈরী করা হয়েছে। অবশ্য, স্লীম্যানের দৌলতে কোম্পানির তাতে এক পয়সাও খরচ হয়নি। ইতিমধ্যে তিনি যেসব ঠগী ধরেছেন তাদের লুঠের মাল বিক্রি করেই বাড়ী দু’টি তৈরী করা হয়েছে। এমনকি ১৮৩৪ সন পর্যন্ত সেখানকার টুকিটাকি খরচও সেই তহবিলেই চলেছিল।

আর একটি বন্দীশালা ছিল জব্বলপুরে। সেখানে রাখা হত রাজসাক্ষী এবং তাদের পরিবার-পরিজনদের। ১৮৩৮ সনে তাদের অন্য জীবিকায় দীক্ষিত করার বাসনায় সেখানে একটা শিল্প বিদ্যালয় খোলা হয়েছিল।

সে যা হোক, আদালতের মামুলী অসুবিধেগুলো দূর হল বটে, কিন্তু ক্রমে বোঝা গেল সেগুলোই একমাত্র বাধা নয়।।

রাজপুতানার সীমান্ত থেকে খালি হাতে ফিরে এলেন ক্লীম্যানের উত্তেজিত অনুচরেরা। তাড়াতে তাড়াতে তারা দলটাকে প্রায় নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু বাদ সাধলেন সাদারল্যাণ্ড রাজস্থানের দেশীয় রাজ্যসমূহে তিনি কোম্পানির প্রতিনিধি। স্লীম্যানের অনুচরদের তিনি সেখানে ঢুকতে দিতে রাজী নন। কেননা, তাতে রাজন্যবর্গের মনঃক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভাবনা !

একই খবর এল গোয়ালিয়র সীমান্ত থেকে। ক্যাভেনডিসের মত প্রখর মানুষ রয়েছে সেখানে। কিন্তু তারও নাকি একই কথা ! দেশীয় রাজ্যে ঢুকে এভাবে হামলা করা ঠিক নয়।

চিন্তিত সীম্যান আবার সেই পুরানো বন্ধু কারভিন স্মিথের দ্বারস্থ হলেন। স্মিথ ধরলেন কলকাতায় চীফ-সেক্রেটারী মুইনটনকে। তিনি বেন্টিঙ্ককে। গভর্ণর-জেনারেল হস্তক্ষেপ করলেন। তবে সে সমস্যার সুরাহা হল।

তারপর আবার নতুন সমস্যা।

কাজে নেমে জানা গেল, অবশিষ্ট ভারত যতটা নির্দোষ সেজে আছে ঠিক ততখানি নির্দোষ সে নয়। জমিদার-তালুকদারেরা অনেক ক্ষেত্রেই এই বেপরোয়া খুনীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। কেননা, ওরা খাজনা দেয়। অনেক সময় তার বেশীও ! তাছাড়া লুঠের মালের অন্য অংশীদারও অনেক।

ভুকুত জমাদারের জবানীতে বলা বিখ্যাত রুরওয়াঘাট হত্যাকাণ্ডের উপসংহার কাহিনীটি সেদিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ :

রকৌরিয়া উধাও হয়ে গেল। তাদের কোন খবর নেই দেখে চন্তিত ধনরাজ শেঠ নিজের প্রতিনিধি করে বিহারীলালকে পাঠাল ইন্দোরে । সে এসে স্থানীয় ইংরেজ রেসিডেন্টকে ধরে পড়ল, হুজুর, আপনার উপস্থিতি সত্ত্বেও ইন্দোর পথ থেকে নগদ পনের হাজার টাকা সহ আমাদের লোক উধাও হয়ে গেছে। আপনাকে ক্ষতিপূরণ করতে হবে ! বিহারীলাল একই আরজি পেশ করল বুন্দেলখণ্ডে গভর্ণর-জেনারেলের প্রতিনিধির দরবারে। তিনি দায়িত্বশীল লোেক। খবর শুনে চারিদিকে নির্দেশ পাঠালেন।—যে করে হোক, হারানো মানুষগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে। যদি না পারা যায় তবে খুনীদের। কোম্পানির উপস্থিতি সত্ত্বেও এমন কাণ্ড ঘটা মোটেই গৌরবের নয়।

ভদ্রলোকের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ভুকুত জমাদার ধরা পড়ল। সেই সঙ্গে দলের আরও কয়েকজন! বুন্দেলখণ্ড থেকে তাদের পাঠান হল ইন্দোরে, সেখানকার রেসিডেন্টের কাছে। তিনি তাদের আবার ফেরত পাঠালেন বুন্দেলখণ্ডে। কারণ, ওদের সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলে দেখেছেন, ওরা আসলে সেদিককারই লোক ! বুন্দেলখণ্ডের এজেন্ট তাদের স্থানীয় শাসকদের হাতে তুলে দিলেন। বললেন, এরা আপনার প্রজা, ধনরাজ শেঠ নামে আমাদের এক প্রজার ধন লুঠ করেছে। অভিযোগকারী ক্ষতিপূরণের দাবী তুলেছে, এখন আপনি যা করেন ।

স্থানীয় ভূস্বামীরা ভুকুতকে ডেকে বললেন, তোমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সাহেবরা ক্ষেপে গেছেন,—পুরো না পার, বারো আনা দিতেই হবে!

ওরা তা মিটিয়ে দিতে রাজী হল। সঙ্গে যাদের টাকা ছিল তারা সেখানে দাড়িয়েই নিজ নিজ দেয় মিটিয়ে দিল। যাদের কম পড়ল, তারা সঙ্গীদের থেকে ধার করল। অন্যরা করজোড়ে সময় প্রার্থনা করল। ভূস্বামীরা বললেন, তথাস্তু। এবার তোমরা যেতে পার।

বিহারীলাল টাকা গুনে নিয়ে ওদের পিছু পিছু বের হল। তারপর ওদের ডেকে বলল, তুকুত আর ছোটি–তোমরা আমার কাছে থাক। বাকী যারা আছ তারা আজই বের হয়ে পড়, টাকা জোগাড় করে নিয়ে এস। ভুকুত লোক চেনে। সে তার সঙ্গে রয়ে গেল। কথা প্রসঙ্গে ভুকুত তাকে সবই বলল। বলল, দেখ ভাই, টাকা আমরা পাই বটে, কিন্তু হুজ্জতও কম নয় !—এই তো, ধরম খাঁ জমাদার এখনও পড়ে আছে গোয়ালিয়রের কারাগারে !

—তাকে ছাড়াতে চাও?

—অবশ্য। সাচ্চা ঠগীর মত উত্তর দিল ভুকুত জমাদার।

-কত খরচ করতে পারবে বল ? বিস্মিত ভুকুত দেখল, তার সামনে দাড়িয়ে আছে যে মানুষটি সে ধনরাজ শেঠের কর্মচারী মাত্র নয়, তাদের চেয়েও বিচক্ষণ ঠগী । বন্ধুকে সে বুকে জড়িয়ে ধরল।

-টাকার জন্যে ভাববে না ভাই, আগে তুমি কাজ হাসিল কর।

বিহারীলাল সত্যিই ধরম খাকে ছাড়িয়ে নিয়ে এল। নজরানা মিলল-ন’ হাজার টাকা! রকৌরিয়ার মাটির নীচেই চাপা পড়ে রইল, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ধনরাজ শেঠের ততোধিক প্রভাবশালী এজেন্ট বিহারীলালের নতুন পেশা দাড়াল ঠগীদের ছাড়িয়ে আনা। এ কাজে দস্তুরী অনেক।

স্লীম্যান এই পৃষ্ঠপোষকতাকে নির্মূল করার সংকল্প নিলেন। কিন্তু সেও দুরূহ কাজ। কেননা, স্থানীয় রাজন্যবর্গ কিছুতেই এ ব্যাপারে মন খুলে কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা করবেন না। এজন্যে নয় যে, ঠগীদমনে তাদের আন্তরিক কোন অনিচ্ছা আছে, তাদের বলিষ্ঠ হাত-পাগুলো বেঁধে রেখেছে যে বস্তু সে ভয়, ঠগীদের ভয় নয়, ধর্মভয়। ঠগীরা সাধারণ খুনী নয়, তারা ভবানীর সন্তান। মায়ের আদেশেই তারা এই পথে নেমেছে। সুতরাং ধর্মভীরু শাসকরা তাদের ওপর হাত তুলতে ভরসা পান না। দিনে দিনে তাঁদের মনে এ ধারণা তখন বদ্ধমূল হয়ে গেছে—এদের ওপর শাসন ফলাতে গেলে বিনাশ অনিবার্য।

ঠগীরা নিজেরাও তাই বলত।

স্লীম্যান বললেন, দেখেশুনে আমার মনে হচ্ছে, যত ভীরুর রাজত্ব সব এদিকে—নর্মদার নীচে! অন্য এলাকায়ও কি স্থানীয় রাজা-তালুকদারেরা এমনি ?

দুর্গা উত্তর দিল, সব জায়গায় হুজুর ! জেনেশুনে কে ঠগীর গায়ে হাত তুলতে চায় বলুন? একবার মাধজী সিন্ধিয়ার কি মতলব হল, সত্তর জন ঠগকে তিনি কয়েদ করলেন। রাত্রে দেবী তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, দেখ বাছা, কাজটা তুমি ভাল করনি। যদি নিজের মঙ্গল চাও তবে কালই ওদের ছেড়ে দিও।

মাধোজী সেকথা কানে তুললেন না। এত বড় রাজা, তার ওপর জোয়ান বয়স-পরদিন ঘুম থেকে উঠেই তার প্রথম কাজ হল ঠগীদের কোতল করা। তিনি পুরো দলটাকেই তোপের মুখে উডি দিলেন। তারপর নিশ্চিন্ত মনে রাত্রে আবার বিছানায় গিয়ে শুলেন। সে রাত্তিরেও স্বপ্নে দেবী আবার আবির্ভূত হলেন তার সামনে। কিন্তু তিনি আর সেই আগের রাতের ভবানী নন,তার ভিন্ন রূপ! সেই ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে মাথোজী শিউরে উঠলেন। ঘুমের মধ্যেই তিনি ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। রানী পাশেই ছিলেন। ঘুমন্ত মাধোজীকে জাগিয়ে দিলেন। কিন্তু মাধোজী তখন আর তার মধ্যে নেই।—-দুর্গা বলে চলল-রানী যতই তার ভয় ভাঙ্গাতে চেষ্টা করেন মাধোজী ততই ভয়ে কাঁপেন। খবর পেয়ে দাসদাসী সিপাই-সান্ত্রী যে যেখানে ছিল সবাই ছুটে এল। সকলের এক জিজ্ঞাসা-কি হয়েছে হুজুর, আমাদের বলুন! আমরা এতগুলো লোক হাজির আছি, আপনার ভয় কি ? কিন্তু মাধজীর মুখে কোন কথার জবাব নেই। শেষে একে একে সবাই যখন চলে গেল, মাধধাজী তখন রানীকে ডেকে বললেন, রানী, আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে, আমি মহাপাপ করে ফেলেছি।

কাঁদতে কাঁদতে রানী বললেন, কি পাপ মহারাজ ?

মাধোজী উত্তর দিলেন, আমি দেবীকে অমান্য করেছি।

স্লীম্যান বললেন, তারপর ?

দুর্গা বলল, তারপর আর কি হুজুর ! যা হওয়ার তাই হল। ভোর থেকে মাথোর্জীর রক্তবমি শুরু হল। কত

হেকিম এল, বদ্যি এল, কিন্তু কেউ তাকে ধরে রাখতে পারল না, তিনমাসের মধ্যে মাধোজী চলে গেলেন।

আর একজন ঠগী দুর্গাকে মনে করিয়ে দিল-হুজুরের কাছে নানার খবরটা বল-না, সেবার বুধোকে মেরে সেও কি কম সাজা পেয়েছিল!

হাতে কলম চলছিল বটে, কিন্তু কানটা ছিল এদিকেই। কলম থামিয়ে স্লীম্যান বলে উঠলেন, কোন্ নানা ? কি হয়েছিল তার? সে খবরটাও ভাল করে শোনা দরকার।

দুর্গা আবার নতুন করে শুরু করল, নানা ছিলেন জালেনের রাজা। একবার হল কি, বুধো আর তার ভাই খুমোলিকে পাকড়াও করে সিপাইরা তার কাছে নিয়ে হাজির করল।

রাজা বললেন, কে ওরা ?

সান্ত্রীদের যে জমাদার ছিল সে বলল, মহারাজ, ওরা ঠগী। মানুষকে খুন করে ওরা টাকাপয়সা সব লুঠে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল।

রাজা বললেন, বটে!

বুধো তখনকার দিনের বহুৎ খানদানী ঠগ। সে অপরাধ কবুল করল। তারপর বলল, হুজুর, দেবীর নির্দেশে আমরা পথে নেমেছি। তিনি যেমন বাঘ সৃষ্টি করেছেন তেমনি ঠগও সৃষ্টি করেছেন। কার কি করা উচিত না উচিত তা তিনিই ঠিক করে দিয়েছেন। আমরা তো নিমিত্ত মাত্র।

বাঘের সঙ্গে ঠগের এই তুলনাটা এর আগেও স্লীম্যান দু’চারবার অন্যদের মুখে শুনেছেন। তিনি ব্যাপারটা একটু বিশদভাবে বুঝতে চাইলেন। কেননা, বনের বাঘের সঙ্গে লোকালয়ের মানুষের এই উপমাটার মধ্যে এদের জীবনাদর্শের নতুন কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়াও হয়ত অসম্ভব নয়।

ঠগীর দলে সবাই ‘শাস্ত্রজ্ঞ। নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে যা জানা দরকার সকলেরই তা মুখস্ত। সুতরাং, জালৌনরাজ তখনকার মত বিদায় নিলেন। দুর্গা একপাশে সরে দাঁড়াল। সবাই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সাহেবকে ব্যাঘ্র-তত্ত্ব বোঝাতে।

স্লীম্যান লিখছেন : ওরা নিজেদের বাঘের সঙ্গে তুলনা করে। কারণ, বাঘ যেমন ঈশ্বরের সৃষ্টি, তেমনি ওরাও। বাঘ যখন মানুষ খায় তখন অন্য মানুষ খেদ করে বটে, কিন্তু তর্ক তোলে না। কারণ সকলেরই জানা আছে বাঘের তাই ধর্ম, মানুষ তার খাদ্য। ঠগীরাও তাই বলে। নরহত্যাই তাদের ধর্ম। ভবানী সে কাজেই রুমাল হাতে ওদের মর্ত্যে পাঠিয়েছেন। দেবীই ওদের সামনে শিকার তুলে দিচ্ছেন, সুতরাং ওদের দোষ কোথায় ?

স্লীম্যান আরও লিখছেন—ঠগীরা কখনও বাঘ মারে না। ওরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, কোন ঠগী যদি নিজ ধর্মে অবিচল থাকে তবে তাকেও কোন বাঘ স্পর্শ করবে না। বাঘ যদি কোন ঠগীকে খায় তবে ওরা ধরে নেয় যে, নিশ্চয় সে দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, নিশ্চয় সে লোভের বশে কোন বামাল নিজের জন্যে সরিয়ে রেখেছিল। তেমনি যদি কখনও কোন ঠগী স্বেচ্ছায় কোন বাঘকে হত্যা করে তবে ওরা জানে, অচিরেই সে বিদায় নিচ্ছে বলে !

-যা হোক, দুর্গা আবার তার কাহিনী শুরু করল—জালৌনরাজ বুধোর সে কথা কানে তুললেন না। তাঁর রাজতে খুনের কথা শুনে তিনি রেগে আগুন হয়ে গেলেন। হুকুম দিলেন—ওদের হাতির পায়ের তলায় পিষে মার।—আজই-এক্ষুনি !

তাই করা হল । বুধো আর তার ভাই খুমোলিকে সেদিনই নানার সামনে হাতির পায়ের তলায় পিষে মারা হল। ব্যস, আর যায় কোথা ? পরের দিনই রাজাবাহাদুরের পা ফুটে বের হল দেবীর কোপ। তাঁকে মহারোগে ধরল। দেখতে দেখতে তাঁর সোনার অঙ্গ কুষ্ঠে ছেয়ে গেল ।

স্লীম্যান জানতে চাইলেন-বুধোকে মারার ফলেই যে তাঁকে এ ব্যাধি ধরেছে রাজা কি তা বিশ্বাস করতেন?

—না করে উপায়? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল দুর্গা,—তা না হলে কি আর পাপ খণ্ডনের জন্যে তিনি এত চেষ্টা করতেন ? কি করলে দেবীর শাস্তি হবে তা ভেবে ভেবে রাজা তখন হয়রান।

কিছু কি করেছিলেন তিনি?

—আজ্ঞে হ্যা ! সে আপনি না দেখলে বিশ্বাস করবেন না হুজুর। জালৌনে বুধধ একটা কুয়ো আরম্ভ করেছিল। বেচারা সেটি আর শেষ করে যেতে পারেনি। রাজা বললেন–ভবানীর-বেটার এই কাজের দায় আমার। তার হুকুমে কুয়ো ইদারা হল। বিরাট ইদারা। চমৎকার জল তার। শুধু তাই নয় হুজুর, বুধো আর খুমোলির নামে জালৌনে এক বিরাট ‘ছাত্রা’ প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। মস্ত মন্দির। রাজা সেখানে শত শত ব্রাহ্মণকে ডেকে এনে ভূরিভোজন করালেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না, ক’মাসের মধ্যেই পাপের দাম চুকিয়ে দিতে হল তাকে—তিনি চলে গেলেন ইচ্ছে করলে তার সেই কুয়ো আর মন্দির আপনিও দেখতে পারেন হুজুর। এখনও তা তেমনি আছে। বছর বছর শত শত লোকের পায়ের ধুলো পড়ে সেখানে, সবাই এ কাহিনী জানে!

দুর্গার কাহিনী শেষ হল। এবার মুখ খুলল কল্যাণ সিং।–কার কাছে কি বলছ তুমি জমাদার ? হুজুরের কি এসব অজানা?—সেবার হোঙ্গাবাদে আমাদের দল যখন ধরা পড়ল তখনও কি হুজুর, সেখানকার রাজা-জমিদাররা আমাদের ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করেননি ? ওঁরা জব্বলপুরে পর্যন্ত তোক পাঠিয়েছিলেন।নয় কি হুজুর? অথচ, বললে বিশ্বাস যাবেন না, আমরা কোনদিন ওঁদের চোখেও দেখিনি।

-তবুও ওঁরা তোমাদের জন্যে এমন মায়াকান্না কেঁদেছিলেন কেন। বলতে পার? স্লীম্যান অজ্ঞের ভান করলেন।

কল্যাণ সিং উত্তর দিল, আমরা ওঁদের বলে পাঠিয়েছিলাম হুজুর যে, ওঁরা যদি আমাদের ব্যবসায় বাধা না দেন তবে অন্য প্রজা যা খাজনা দেয় আমরা তার পঞ্চাশ গুণ বেশী খাজনা দেব। তাছাড়া, প্রতি বছর যথাসাধ্য নজরানাও দেব ।

ছোটি বলল, সেজন্যেই তো আট-দশটা ঠগের জন্যে খাইরোর তালুকদার এমন করে তার নিজের প্রভু ঝাঁসীরাজের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন ?-ঠগীরা একা খায় না হুজুর।

কাসিম খাঁ বলল, বাহমনপুরের জমিদার কি করেছিলেন তা আপনি নিশ্চয় শুনেছেন হুজুর! আপনাদের হুকুম মেনে গোয়ালিয়রের মহারাজা বাহমনপুরে খবর পাঠালেন—ঠগীদের আমার হাতে তুলে দাও! বাহমনপুরের জমিদার মহারাজার প্রজা। তিনি আশা করেছিলেন, তাঁর নিজের সামন্ত তঁাকে অমান্য করবেন না। কিন্তু জমিদার বেঁকে বসল। সে জবাব পাঠাল–তা হয় না মহারাজ। ওরা আমার আশ্রিত। বাধ্য হয়েই মহারাজকে ফৌজ পাঠাতে হল। আমরা বললাম, ক’টা ঠগীর জন্যে প্রাণহানি কি দরকার ; তালুকদার, তুমি আমাদের ছেড়ে দাও। নসিবে যা আছে তা খণ্ডাবে কে ? তালুকদার কিছুতেই তাতে রাজী নয়। ফলে দুই দলে লড়াই হল। ভোর থেকে বেলা ন’ঘড়িতক তুমুল লড়াই চলল। দু’পক্ষেই বিস্তর লোক মারা গেল। কমজোরী তালুকদার গোয়ালিয়ররাজকে ঠেকাতে পারল না। তার হাতে মোটে যোলটা বন্দুক ছিল! তাহলেও সে শেষ পর্যন্ত লড়াই করল। আমাদের জমাদার গুলাব খানের সঙ্গে তার খুব খাতির ছিল।-কোন্ গুলাব খান চিনতে পারলেন হুজুর? সেই যে যার বাপকে গেল বছর সগরে আপনি ফাঁসী দিলেন। এখন সে টমাস সাহেবের সঙ্গে আছে, আমার মতই সে বেচারাও রাজসাক্ষী হয়েছে।

ধমকে উঠলেন স্লীম্যান—এসব খবর রাখ, যা বলছিলে তাই বল।—শেষে তালুকদারের কি হল ?

-কি আর হবে হুজুর, কাসিম খাঁ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আবার তার কাহিনী সুরু করল-বেলা ন’ঘড়িতক লড়াই শেষে হয়রান হয়ে তালুকদার ক্ষান্ত হল। লড়েছিল বটে মানুষটা ! লর্ড সাহেব তখন রায় সাহেবের সঙ্গে মাত্র এক ক্রোশ দূরে তাঁবু ফেলে আছেন, তিনিও গোলাগুলির আওয়াজ পেয়ে থাকবেন।

স্লীমান বললেন, ব্যস, হয়েছে। এবার থাম।

লর্ড সাহেবের কথা শুনে আবার বেন্টিঙ্ককে মনে পড়ে গেছে। এই অন্ধকার থেকে বের হওয়ার মত আলোর সন্ধান একমাত্র তিনিই দিতে পারেন। রাজসাক্ষীদের বিদায় দিয়ে ক্লীম্যান তক্ষুনি আবার একটি নতুন রিপোর্ট লিখতে বসলেন। এবারকার রিপোর্টের বিষয়বস্তু ঠগী এবং স্থানীয় মানুষ। তাঁর সহকর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং রাজসাক্ষীদের জবানবন্দীগুলো উদ্ধৃত করে ফ্লীম্যান প্রমাণ করলেনসমগ্রভাবে ভারতের সঙ্গে ঠগীদের কোন প্রাণের যোগ না থাকলেও কিছু কিছু রাজা-জমিদার এবং নীচুতলার মানুষ ওদের নিয়মিত ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে। তারা অবশ্য ধর্মের দোহাই দেয়, কিন্তু তাঁর নিজের ধারণা সেসব কথা সত্য নয়। ধর্মের চেয়ে ঘরফেরত ঠগীদের পিঠের বোঝাগুলোর দিকেই তাদের নজর বেশী । এই লোভকেও দমন করা আবশ্যক।

১৮৩৬ সনে বেন্টিঙ্ক তার উপায়ও হাতে তুলে দিলেন। সে বছর আইন করা হল—অপরাধী শুধু ঠগীরাই নয়, তাদের যারা সাহায্য করে তারাও। সুতরাং, অতঃপর যদি তাদের সঙ্গে কারও সম্পর্ক আবিষ্কৃত হয় তবে যত বড় মান্য লোকই হোন না কেন তিনি, তাঁকেও সাজা পেতে হবে। কোম্পানির আইন অনুযায়ী সে দণ্ডের পরিমাণ ধার্য হল —যাবজ্জীবন কারাবাস !

শেষ পর্যন্ত একে একে সব বাধা অপসারিত হয়েছিল বটে, কিন্তু কোন বাধাই স্লীম্যানের নিজের কর্মসূচীকে একদিনের জন্যে থামিয়ে রাখতে পারেনি। আইনের আগে আগে যথারীতি ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে চলেছেন ‘ফিরিঙ্গী ঠগী। ‘৩১ সনে বেন্টিঙ্ক যখন আর সব দায়দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে সগরের সাদা বাংলোয় বসিয়েছেন ওঁকে, স্লীম্যান তখন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত ‘দেবতা’। তার আপন অনুচরদের কাছে তিনি যেমন এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব আর এক রহস্যময় ঠগী’,ঠগীদের মধ্যেও তিনি তেমনি এক রহস্যময় ‘অবতার’, অবিশ্বাস্য পুরুষ।

প্রথমে ওরা খবর শুনে খিল খিল করে হেসে উঠেছিল। শত শত বছরের নিশ্চিন্ত জীবনের অভিজ্ঞতায় পাওয়া অবহেলার হাসি। কিন্তু সে মাত্র কয়েক দিনের জন্যে। তারপর হঠাৎ পথের বাঁকে আবিভূত হতে লাগল তীর্থযাত্রীর বদলে ঘোড়সওয়ারের দল। চারদিকে চোখ গুদের । তবুও ওরা ভেবে পায় না, যমের মত এই মানুষগুলো কোথা থেকে সামনে এসে দাড়াল। শুধু কি তাই? ঘোড় থেকে লাফিয়ে মাটিতে নেমেই চেঁচিয়ে ওঠেন সাহেব কেউ পালাবার চেষ্টা করবে না। আমরা স্লীম্যানের লোক। সাহেবের হুকুমে তোমাদের ধরে নিতে এসেছি, চল আমাদের সঙ্গে।

জমাদার আপত্তি তোলার চেষ্টা করে, কিন্তু বৃথাই। সঙ্গে সঙ্গে পিঠের থলি থেকে একটা কাগজ টেনে নেবেন সাহেব। তারপর বলবেন, মিথ্যে বলে লাভ নেই। তোমার নাম অমুক, তোমার বাবার নাম অমুক, তোমার ঠাকুর্দার নাম অমুক,•••তোমার তিন ছেলে, দুই মেয়ে। তাদের বিয়ে হয়েছে অমুক গায়ে, স্বামীর নাম••• আরও শুনতে চাও? সাহেব এবার থলি থেকে মানচিত্রটা বের করবেন। তোমর এই গ্রাম থেকে অমুক দিন বের হয়েছিলে, তারপর এই এই পথ ঘুরে আজ এখানে এসে পৌঁছেছ। পথে অমুক অমুক জায়গায় তোমরা খুন করেছ, কবর দিয়েছ এই এই বিলে ! নয় কি?

নির্বোধ শিশুর মত ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর নিঃশব্দে সাহেবের পিছু পিছু সগরের পথ ধরে।

সারাদিন হেঁটে এসে পথের ধারে একটা গায়ে আস্তানা পেতেছে পুরো একটি দল। সে গাঁ সদর রাস্তা থেকে প্রায় মাইলখানেক দূরে। মোড়লের সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। সেই সুবাদেই সেখানে ঠিকানা করা। নিশ্চিন্ত আশ্রয়। সারাদিনের শ্রমের পর মোড়লের ঘরে আঘোরে ঘুমোচ্ছে বন্ধু জমাদার এবং তার অনুচরবর্গ। হঠাৎ মাঝ রাত্তিরে এসে হানা দিয়ে বসে অজ্ঞাত আগন্তুক দল। ওরা পালাতে গিয়ে দেখতে পায় সব পথ বন্ধ । সেখানে গা ঘিরে মশাল হাতে বন্দুক ঘাড়ে দাড়িয়ে আছে দুষমন। সকলের মুখে এক কথা—আমরা স্লীম্যানের লোক। ওরা ভেবে পায় না, কে এই স্লীম্যান, তিনি কি মানুষ না ঈশ্বর। যেখানেই ওরা সেখানেই স্লীম্যান।

সেবার ওরা রাজপুতানার মরুভূমি পার হচ্ছিল, কোথাও কেউ নেই। হঠাৎ বালি ফুঁড়ে যেন বেরিয়ে এল উর্দিপরা একদল লোক। জমাদার প্রথমে ভেবেছিল, হয়ত আর একটি ঠগীর দল। এগিয়ে গিয়ে বলেছিল—’রাম রাম!’ ওরা জবাব দিয়েছিল, হাত ওঠাও ! আমরা ঠগী নই, স্লীম্যানের লোক।

সুদূর কানপুরের শহরতলীতে নিজের ছাউনিতে দুটো বৌ আর একগাদা নানা বয়সের মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার পেতে বসে আছে ধুতুরিয়া। পরমানন্দে তামাক খাচ্ছে আর মনে মনে ভাবছে, ক’দিন গেলেই হাতে আসবে ঝকঝকে কতকগুলো টাকা ! বৌয়ের নতুন ঘাঘরা হবে, চাই কি ইচ্ছে করলে আরও দুটো পোঝা যাবে !হঠাৎ চিন্তায় ছেদ পড়ল। হেঁড়া তাবু ঘিরে বর্ষার মেঘের মত কালো কালো কতকগুলো ছায়া ভেসে উঠল। কোথায় লক্ষ্ণৌ, কোথায় চকের বাজার? মুহূর্তে তামাম জগৎসংসার অন্ধকার, দুষমন হুঙ্কার দিয়ে উঠল-আমরা স্লীম্যানের লোক!

কানপুর থেকে শত শত মাইল দূরে গঙ্গার ঘাটে পানসী নিয়ে শিকারে বের হয়েছে ‘ভাগিনা, নৌকোর পাটাতন বোঝাই যাত্রী দল। আর ক’মাইল যেতে পারলেই রাজমহল। তার দু’ক্রোশ আগে ‘ঝিরণী’ দেওয়ার মতলব। আনন্দিত ‘ভাগিনা’রা জলের কলকল্লোলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান ধরেছে। উজানে যেতে যেতে ভাটিয়ালী গান। হঠাৎ পেছন থেকে পাশে এসে ধাক্কা খেল আর একটি ঘোট নৌকো। ওরা কিছু বলার আগেই বন্দুক হাতে পানসীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল একদল মানুষ। চেঁচিয়ে উঠল—আমরা স্লীম্যানের লোক!

স্থলে, জলে, বনপথে, মরুভূমিতে, সর্বত্র সেদিন সগরের সেই দুষমন স্লীম্যান। যেখানেই ঠগী সেখানেই তিনি।

ওরা রণভঙ্গ দিয়েছিল। স্লীম্যান সগরে কায়েম হবার আগেই ওরা পিঠ দেখিয়েছিল। দেখে দেখে ওরা জেনে গিয়েছিল, এ সাহেব নিশ্চয় কোন প্রেরিত পুরুষ। ওঁর সঙ্গে পাঞ্জা কষতে যাওয়া হঠকারিতা ।

সদ্য ধরে আনা দলটিকে সামনে দাড় করিয়ে ফ্লীম্যান হাসলেন।– কই, আমাকে তো ঠেকাতে পারছ না তোমরা ?

একজন বলল, হুজুর সে কোম্পানির ইকবাল! কোম্পানির জয়টাকের সামনে পড়ে দৈত্যি দানো ভূত প্রেত পর্যন্ত আজ পালিয়ে যাচ্ছে, আমরা ঠগীদের সাধ্য কি তার সামনে দাড়াই!

আবার হাসলেন স্লীম্যান—কেন, তোমাদের দেবী? তিনি এখন কোথায় ?

দেবী দীন নামে এক ঠগী হাজির ছিল সেখানে। সে বলল, দেবীকে দোষ দেওয়া বৃথা হুজুর! দেশে আসল ঠগ থাকলে তোর আমার তো মনে হয় হুজুর, ওদিকে গঙ্গা এদিকে যমুনা, মাঝে পঞ্চাশ জনও আসল ঠগ আজ খুজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

ছটি এবং ব্রাহ্মণেরও তাই মত। ওরা বলল, গোয়ালিয়র এবং বুন্দেলখণ্ডেও তার বেশী সাচ্চা ঠগ নেই। তবে হ্যা, রাজস্থানের সুসিয়ারা এখনও আছে বটে!-দিল্লিতেও কিছু কিছু থাকা সম্ভব।

নাসির খাঁ বলল, দক্ষিণেও শেষ পর্যন্ত কিছু না কিছু থেকেই যাবে।

-কেন? কৌতূহলী ক্লীম্যান প্রশ্ন তুললেন।

-হুজুর, সেখানে অনেক ঠগ, বাছতে গেলে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে!

-তোমার কি মনে হয়, সে আমি পারব না?

-বোধ হয় না।

—কেন? তোমরা নিশ্চয় শুনেছ, সগরে বিস্তর লোককে আমি ফাঁসীকাঠে ঝুলিয়েছি। দেবীর অনুমতি না থাকলে আমি কি তা কখনও পারতাম ?

-কক্ষনো না।

-তাহলে একথা তোমরা মেনে নিচ্ছ যে, দেবী সঙ্গে আছেন বলেই আমি এভাবে তোমাদের ধরতে পারছি, ফাঁসীকাঠে দিতে পারছি।

-আলবৎ হুজুর। দেবীর মর্জি না থাকলে আপনার সাধ্যও ছিল না আমাদের এভাবে কব্জা করেন।

-তা হলে তোমরা স্বীকার যাচ্ছ যে, এ পর্যন্ত আমি যা করেছি সব দেবীর হুকুম মত।

—আজ্ঞে, হা হুজুর।।

-তাহলে একথাও নিশ্চয় তোমর মানবে যে, দেবী যদি সাহায্য করেন তবে দক্ষিণও আমি সাফা করতে পারব।

ওরা সকলে যেন হঠাৎ এক সঙ্গে বোবা হয়ে গেল। কারও মুখে কোন কথা নেই। এই ন্যায় অনিবার্য ভাবেই যে শেষ সিদ্ধান্তটিতে পৌছায় সেটি যেন তাদের জানা নেই। সবাই অপলক চোখে তাকিয়ে আছে সামনে দণ্ডায়মান মানুষটির দিকে। সাদা ধবধবে রং, একমাথা লাল চুল, চওড়া কপালের পরেই বড় বড় দুটি চোখ। অসহায় মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। হালকা ঠোঁটের কোণে বিন্দুর মত লেগে আছে এক টুকরো হাসি। বিজয়ীর হাসি। গোটা মুখে সেটুকু ছড়িয়ে দিয়ে ক্লীম্যান বললেন, আচ্ছা, এবার তোমরা যেতে পার!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *