ঠগী – ৩

পর্ব ৩

সবজি খানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কাউকেই পাওয়া যেত না। বছরে গড়ে চল্লিশ হাজার নিরুদ্দিষ্টের হিসেবটা মোটেই বাড়াবাড়ি নয়। পরবর্তীকালে এনায়েতরা নিজেরাই বলেছে তাদের কারও তহবিলে আছে ন’শ একত্রিশটি প্রাণ, কারও ছ’শ চারটি, কারও পাঁচশ’ আটটি, কারও চারশ’ একুশটি। সবচেয়ে মন্দভাগ্য যে তারও স্মৃতির তালিকায় ছিল চব্বিশটি হারিয়ে যাওয়া মানুষের ঠিকানা। তাঁদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। খুজে পাওয়া যেত না।

খুজে পাওয়া যেত না এনায়েতকেও। রোসন জমাদার, রুস্তম খা, এনায়েত, দুর্গা–সংখ্যায় ওরাও সেদিন অসংখ্য। কিন্তু তবুও কারও চোখে ধরা পড়ত না ওরা। কখনও না। কেননা, সেটা সহজ ছিল না। সাদা চোখে মানুষ স্বপ্নেও সে দৃশ্য ভাবতে পারে না।

সে রাত্রে হঠাৎ দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল এমেলির। বীভৎস স্বপ্ন। চমকে উঠে তিনি ক্যাম্প-খাটটার ওপর বসে পড়েছিলেন। তারপর দুহাতে চোখ রগড়ে তাকিয়েছিলেন তঁাবুর ফুল-কাটা দরজাটির দিকে, আধখোলা জানালার এক পাশে গুটান ঝালরওয়ালা মখমলের পর্দাটার দিকে।

কেউ কোথাও নেই। শিয়রে টিম টিম করে একটা আলো জ্বলছে। দরজার পাশে হিন্দুস্তানী আয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে। বাইরে লোকজনের আনাগোনা, কথাবার্তা ; সিপাইরা রাত জেগে টহল দিচ্ছে। মিছিমিছি উইলিয়ামকে ডেকে পাঠাবার দরকার নেই। বেচারা হয়ত সবে একটু চোখ বুজেছেন। চাদরটা ভাল করে গায়ের ওপর টেনে দিয়ে এমেলি আবার বালিশে মাথাটা এলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তখনও জানেন না উইলিয়াম পরদিন ভোরেই তাঁর স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছেন।

স্লীম্যান নিজেও তা ভাবতে পারেননি। সিলেদার সেই ভোরটি তাঁর জীবনেও এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। ১৮৩০ সনের কথা। জেলাধীপ তাঁর নিজের জেলা পরিদর্শনে বেরিয়েছেন। সঙ্গে নববধু এমেলি। সগর থেকে তিরিশ মাইল দূরে এক গায়ে এসে সেদিনকার মত দিনের যাত্রা ভাঙতে হল। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। রাত্রে এতগুলো মানুষের ক্যাম্প গড়ে তুলতে অসুবিধে হবে। তাছাড়া এই এলাকা তঁার সুপরিচিত। জায়গাটাও বেশ। রাস্তার এপারে বিরাট আমবাগান, ওপারে গা। গাঁয়ের নাম সিলেদা। এক নজর তাকালেই বোঝা যায় বর্ধিষ্ণু গ্রাম। শুধু রাত্তিরটা কেন, ইচ্ছে করলে আরও এক-আধটা দিন এখানে অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। জীম্যান আদেশ দিলেন, এখানেই তাঁবু খাটাও।

দেখতে দেখতে আমবাগান আর-একটি গা হয়ে উঠল। একপাশে এমেলির তাবু, আর এক পাশে সাহেবের নিজের। দুই তঁাবু ঘিরে আমলা-আমিন, সেপাই-খিদমগারের সারি সারি আস্তানা। আপিস, হেঁসেল, আস্তাবল। দেখে দেখে এমেলি ইতিমধ্যেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তিনি জানেন, উইলিয়ামের ব্যবস্থা নির। তাঁর ক্যাম্পে দুঃস্বপ্নের কোন অবকাশ নেই। ক্লান্ত এমেলি পরক্ষণেই আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

খবরটা দিয়েছিল ফিরিঙ্গীয়া। সবে ভোর হয়েছে। এমেলি তখনও বিছানায়। সীম্যান হাতমুখ ধুয়ে অভ্যাসমত কাগজপত্র নিয়ে বসেছেন। এমন সময় হঠাৎ সেলাম করে সামনে এসে দাড়াল ফিরিঙ্গীয়া। সে আর-এক এনায়েত। নিপুণতম, দুর্ধর্ষতম এনায়েত। ফাসীর কাঠগড়া থেকে সাহেব নিজে কেড়ে রেখেছেন তাকে। এমন মানুষকে তিনি হারাতে রাজী নন-তার কাজ আছে। ফিরিঙ্গীয়া সেই থেকে ক্লীম্যানের সঙ্গে সঙ্গেই থাকে।

অসময়ে তাকে নিজের ক্যাম্পে আশা করেননি ক্লীম্যান। তিনি একটু বিরক্ত হয়েই যেন অল্প কথায় এড়াতে চাইলেন তাকে, কি চাই?

-আজ্ঞে, আরও দু’পা কাছে এগিয়ে এল ফিরিঙ্গীয়া,যদি অনুমতি করেন, তবে একটা কথা বলতে চাই হুজুর।

-বেশ !

-জায়গাটা এবার হুজুর আপনি খুব ভাল পছন্দ করেছেন। ফিরিঙ্গীয়ার গলায় রীতিমত তৃপ্তির আভাস। স্লীম্যান কিসের যেন গন্ধ পেলেন। তিনি ভ্রু কুঁচকালেন। হাতের কলমটি ধীরে ধীরে কলমদানীতে রেখে তিনি ঘুরে বসলেন। তারপর সোজা তাকালেন ওর চোখের দিকে—কি বলতে চাও তুমি ?

–হুজুর, আপনি যে পণ্ডিত আর তাঁর ছ’জন লোকের কথা বলেছিলেন তারা এখানেই আছে হুজুর। তাছাড়া—ফিরিঙ্গীয়া বলে চলল—সেই হাবিলদার আর তার চারজন সেপাই, গঙ্গাজল নিয়ে আসছিলেন চার বামুনঠাকুর, ওঁরা সবাই এখানেই আছেন; ওদের সঙ্গের জেনানাটিও!

-বলছ কি তুমি? চেঁচিয়ে উঠেছিলেন ফ্লীম্যান। তাঁর যতদূর মনে পড়ছে, পণ্ডিত আর তাঁর ছ’জন সহচরের দলটি হারিয়ে গিয়েছিল ১৮১৮ সনে। মানে, দশবছর আগে। উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণে গঙ্গাজল বয়ে আনতে আনতে একটি নারী সহ নর্মদা উপত্যকার যে চারজন ব্রাহ্মণ উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, তাও তখনকারই ঘটনা।

হাবিলদার এবং সিপাইদের ঘটনাটি তার বছর ছয় পরের, ১৮২৪ সনের!—হতেই পারে না, স্লীম্যান ধমকে উঠলেন-তুমি কি বলতে চাও এক যুগ আগে হারিয়ে যাওয়া পণ্ডিত আমার তাবুতেই আছে ?

-হ্যা, তাই আছে। অবিচল ফিরিঙ্গীয়া জবাব দিল, তবে হুজুর ঠিক তাঁবুতে নয়, তঁাবুর তলায়, মাটির নীচে।

—আমার তাবুর মাটির তলায় মানুষ আছে ? কার্পেটে জুতোর গোড়ালিটা ঠুকতে ঠুকতে আবার প্রশ্ন করেছিলেন ক্লীম্যান—এই মাটির তলায় ?

—হ্যা হুজুর।

কৌতূহলী ক্লীম্যান আর বসে থাকতে পারলেন না। তিনি তাঁবু থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দাড়ালেন। সবে ভোর হয়েছে। আমবাগানের ডালে ডালে পাখীর কলরব। ভোরের হাওয়ায় বিন্ধ্যপর্বতের খবর। নীচে সবুজ ঘাসের মখমল। তাতে ছবির মত ভঁবুর শহর। আস্তাবলের সামনে সহিস ঘোড়ার দলাইমলাইয়ে ব্যস্ত। চারদিকে ভাল করে তাকিয়ে ক্লীম্যান বলে উঠলেন, তুমি কি বলতে চাও আমার ঘোড়াটা যেখানে দাড়িয়ে আছে তার পায়ের নীচে হাবিলদার আর তার চার সঙ্গীর কবর? যেখানে এমেলি এখনও ঘুমোচ্ছ সেখানেই তাঁর খাটের তলায় পড়ে আছে গঙ্গাজলের ভাণ্ড নিয়ে চার ব্রাহ্মণ, এক ব্রাহ্মণী !

ফিরিঙ্গীয়া তখনও পাশেই দাড়িয়ে। সাহেবের সামনে থেকে সে এক মুঠো মাটি কুড়িয়ে নিয়ে কি যেন ভালভাবে পরখ করে দেখল। তারপর সগর্বে উত্তর দিল, হা হুজুর। আপনি মাটি খুঁড়তে হুকুম দিন। যদি ওদের না পাওয়া যায় তবে মিছেই আমি আছি, আমাকে আপনি ফঁসীকাঠেই ঝুলিয়ে দেবেন, আমি খুশী মনে রাজী।

তক্ষুনি সিপাইদের তলব করা হল। তারা গাঁ থেকে কোদাল আর মানুষ নিয়ে এল। ফিরিঙ্গীয়ার নির্দেশ অনুযায়ী সবুজ ঘাসে কোদাল পড়ল। পাশে দাড়িয়ে গোটা ক্যাম্প।

ওরা পাঁচ ফুট খুড়ল। কিন্তু হাবিলদার বা তার সেপাই চারজন কারও কোন চিহ্ন নেই। স্লীম্যান ফিরিঙ্গীয়ার মুখের দিকে তাকালেন। নিষ্কম্প ফিরিঙ্গীয়া উত্তর দিল, হুজুর, জান কবুল, মেহনত করে আরও একটু খুড়তে হবে। সীম্যান কোদাল চালিয়ে যেতে ইঙ্গিত দিলেন।

অবশেষে সত্যিই মানুষের নিশানা পাওয়া গেল। প্রথমে ক’ফালি ছেড়া ন্যাকড়া, তারপর ক’টি উদির বোম। এবং তারপর একসঙ্গে পাশাপাশি পাঁচজন মানুষ। ফিরিঙ্গীয়া বলল, ওপাশেরটি জমাদার, এ পাশের চারজন সিপাই! বিস্ময়বিমূঢ় স্লীম্যান নাকে রুমাল গুজলেন—বহুৎ আচ্ছা, তুলে আন ওদের!

এমেলি ততক্ষণে নিশ্চয় উঠে পড়েছেন। স্লীম্যান একজন খিদমদগারকে পাঠালেন তার তাবুতে। বললেন, মেমসাহেব কি করছেন একটু খবর নিয়ে এস।

সে ফিরে এসে জানাল, তিনি ছোটা হাজিরায় তাঁবুতে চলে গিয়েছেন। মানে ব্রেকফাস্টের টেবিলে। ব্রেকফাস্টের বুটি সেখান থেকে বেশ দূরে। ক্লীম্যান নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, তবে এবার চল মেমসাহেবের তাবুতে।

ততোধিক নিশ্চিন্ত ফিরিঙ্গীয়া উত্তর দিল, সে আপনার মর্জি হুজুর।

ফিরিঙ্গীয়ার নির্দেশ মত এমেলির তাঁবুর দড়ি-দাড়া সব খোল হল। মেঝের কার্পেট গুটান হল। তারপর তার আঙ্গুলে-টানা নিশানা ধরে আবার কোদাল চলল। খুড়তে খুড়তে ছ’ফুট মাটির তলা থেকে এবার বের হলেন বার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া পণ্ডিত এবং তাঁর দু’জন অনুচর। তারপর তার ক’হাত দূর থেকে সেই গঙ্গাজলবাহী ব্রাহ্মণ চারজন। তাদের ভীড়ে পড়ে আছে একটি নাতিদীর্ঘ দেহের অবশেষ। সেটি ব্রাহ্মণীর।

হরিবল ! বিজয়ী ফিরিঙ্গীয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় যেন জ্বলে উঠলেন স্লীম্যান। শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল -ফিরিঙ্গীয়া, আরও আছে, দেখবেন হুজুর?

না। তক্ষুনি স্থানত্যাগ করেছিলেন স্লীম্যান। ততক্ষণে খবর পেয়ে পাশের কোরাই গাঁ থেকে সিপাই সামন্ত নিয়ে হাজির হয়েছেন স্থানীয় থানাদার। হাতের ফর্দটা তার হাতে গুজে দিয়ে, অবশিষ্টের দায়িত্ব তার হেফাজতে ছুড়ে দিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলের দিকে পা বাড়ালেন স্লীম্যান। এ দৃশ্য অনেকক্ষণ ধরে দেখা যায় না। হরিবল !

—হরিবল ! এমেলি যেন ওর মুখের অস্ফুট শব্দটাই স্পষ্ট করলেন। এসবের কিছুই তাঁর তখনও জানার কথা নয়। অপ্রস্তুত উইলিয়াম শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। ভোর হতে না হতেই কোন্ আহাম্মক এসব কথা বলে গেল ওঁকে। তিনি নিঃশব্দে চামচটা হাতে তুলে নিলেন।

খেতে খেতেই এমেলি বীভৎস সেই স্বপ্নের কথা তুললেন, সে তুমি ভাবতে পারবে না, কি দৃশ্য !–হরিবল, বীভৎস।

—দেখবে তা? মনে মনে হেসে স্ত্রীকে নিয়ে তার ভঁবুর দিকে পা বাড়ালেন স্ত্রীম্যান। বিস্মিত এমেলি বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে দেখলেন—কাল রাত্রে যেখানে তার তঁাবু ছিল সে জায়গাটা কোন্ যাদুবলে যেন এখন শূন্য। কাছে এসে দেখা গেল—শূন্য নয়, সেখানে হা করে আছে মস্ত এক কবর। পাশে কাপড়ে ঢাকা সাতটি শব। কাল রাত্তিরে যারা তোমায় ভয় দেখিয়েছিল তারা এরা,-ফ্লীম্যানের ইঙ্গিতে সিপাইরা কঙ্কালগুলোর মুখের ওপর কাপড়টা ভাল করে টেনে দিয়েছিল।—এদের থেকে কোন ভয় নেই ডিয়ার, ওরা বারো বছর আগে মৃত !

-ইনক্রেডিবল! চোখে রুমাল দিয়ে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন এমেলি।–আমি যে স্বপ্নে ওদেরই দেখেছি।

-হ্যাঁ তাই। মুচকি হেসে স্ত্রীর হাত ধরে তাঁর নিজের তাবুতে ফিরে গিয়েছিলেন স্লীম্যান। যেতে যেতে বলেছিলেন, আমি কিন্তু স্বপ্নেও কখনও এ দৃশ্য কল্পনা করতে পারিনি।

কেউ পারে না। নিখুঁত কবর। নিপুণ হাতে নিরন্ধ্র বন্দোবস্ত। স্লীম্যান লিখছেন :

১৮২২, ‘২৩, ‘২৪-এই তিন বছর আমি নরসিংপুর জেলায় ছিলাম। সে সময় এমন কোন চুরি, ডাকাতি, খুন বা রাহাজানি হয়নি যার খবর আমি না জানতাম। প্রতিটি অপরাধের খুঁটিনাটি খবর আমার কাছে পৌছাত। প্রত্যেকটি ঘটনা আমি নিজে মন দিয়ে পরখ করে দেখতাম। কিন্তু তবুও কোনদিন একবারের জন্যেও এ দৃশ্য কল্পনা করতে পারিনি। সেদিন যদি কেউ আমাকে বলত, আমার কাছারি থেকে মাত্র চারশ গজ দূরে কুন্দেলি গায়ে এমন মানুষ আছে যাদের হাতের ছোঁয়ায় প্রতি বছর শত শত পথিক অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে নিশ্চয় তাকে পাগল বলে উড়িয়ে দিতাম আমি। কিংবা কেউ যদি আমাকে বলত, আমার আপিস থেকে মাত্র একদিনের পথ হাঁটলেই এমন একটি গায়ে পৌঁছান যায় যেখানে মাটির তলায় হাজার হাজার হারিয়ে যাওয়া মানুষের বাস, তাহলেও নিশ্চয় তাকে নির্বোধ বলে বিদায় করে দিতাম আমি! কিন্তু আশ্চর্য এই, আজ জানি এই দু’টি খবরই সত্য।

এ সত্য জানার আগে অনেককাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল স্লীম্যান। ফিরিঙ্গীয়া সঙ্গে না থাকলে সিলোদা হয়ত চিরকাল তার কাছে একটি সাধারণ গাঁ হয়েই বেঁচে থাকত। ডাইরীর পাতায় পথের ধারের আম্রকুঞ্জটি শুধু শান্ত-ছায়া আর ফুরফুরে হাওয়ার স্মৃতি হয়েই নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। ছ’ফুট মাটির তলা থেকে কোনদিন আর আত্মীয়-বন্ধুদের জন্যে দিনের আলোয় ফিরে আসত না হাবিলদার, পণ্ডিত কিংবা ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ চারজনের কঙ্কাল। সবুজ ঘাসের নিশ্চিন্ত আচ্ছাদনের তলায় চিরকালের জন্যেই লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যেতেন তাঁরা।

সবাই তাই থাকতেন। কখননা-সখনো শেয়াল কিংবা বেপরোয়া বাদলের ধারা প্রাণপণ চেষ্টায় রহস্য কিয়ত পরিমাণে লঘু করে আনত। কিন্তু দর্শকেরা তখনও অসহায়। তাড়াহুড়োয় এনায়েতরা যখন কম মনোযোগী তখনও তাদের চেনা দায়।

১৮২৯ সনের কথা। ক্যাপ্টেন বৰ্থ উইক তখন মালবে পলিটিক্যাল এজেন্ট। সহসা জরুরী খবর—রাতলাম স্টেটে একবার আসা আবশ্যক। ভীলেরা ক্ষেপে গেছে। সম্প্রতি তারা গোপনে পাঁচটি মানুষকে খুন করে রেখে গেছে। ঘটনা নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আগে সাহেবের একবার এখানে আসা দরকার।

তক্ষুনি ঘোড়ার পিঠে চাপলেন তরুণ বৰ্থ উইক। সঙ্গে নিলেন স্লীম্যানের দেওয়া একটি তিলহাই-গুপ্তচর। রাতলামে পৌছে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন তিনি। দেহগুলো যেখানে পাওয়া গেছে তার পাশেই বড় রাস্তা। রাস্তা থেকে দূরে একটি আমবাগান। বৰ্থ উইক স্লীম্যানের অন্যতম সহকর্মী, অনুচর। নাকে তিনি কবরের গন্ধ পেলেন। কিন্তু আশ্চর্য এই, স্থানীয় লোকেরা তবু বলেই চলেছে-এ নিশ্চয় ভীলদের কাণ্ড। আবার ক্ষেপে উঠেছে বন্যরা। সাহেবের উচিত এর যাহোক একটা কিছু বিহিত করা।

কারও কথায় কান না দিয়ে বৰ্থ উইক জানতে চাইলেন, এ পথে কি দু’চার দিনের মধ্যে কোন তীর্থযাত্রীর দল হেঁটে গেছে ?

—আজ্ঞে হ্যা, উত্তর দিলেন একজন, তবে দু’চার দিনের মধ্যে নয়, তীর্থ থেকে গুজরাতের দিকে দলটি গেছে তা আজ প্রায় এক হপ্তা হবে।

বর্থ উইক মনে মনে হিসাব করলেন, খুব ধীরে সুস্থেও যদি ওরা হেঁটে থাকে তাহলেও সাতদিনে কমপক্ষে অন্তত একশ মাইল এগিয়ে গেছে। স্থানীয় পুলিশ অফিসারদের দিকে ঘুরে তিনি হুকুম দিলেন, ভীলদের কথা ছেড়ে আপনারা এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ুন। তেমন কোন দল সামনে পেলে তাদের আটক করে ধরে নিয়ে আসুন।।

থানাদার মাথা চুলকাতে লাগলেন, হুজুর, আমরা সামান্য পুলিশ। তাছাড়া এখানে কোন ঘোড়সওয়ার সিপাইও নেই, এমতাবস্থায় –

বৰ্থ উইক পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন। তারপর খসখস করে তাতে দু’টি ছত্র লিখে দিয়ে বললেন, এই সরকারী নির্দেশ। এতে বলে দেওয়া হল, পথে যে কোন গ্রামে যে কোন তহশিলে আপনি সাহায্যপ্রার্থী হবেন, সেখানেই আপনাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য দেওয়া হবে। নিন, আর দেরী করা ঠিক নয়।

পথে পথে খবর নিতে নিতে এগিয়ে চলেছেন ইনস্পেক্টার। কোথাও কোন পথিকের দেখা নেই। ছ’দিন চলার পর একটি গাঁয়ে এসে খবর পেলেন—তার আগেই একটি মস্ত দল এই পথ দিয়ে হেঁটে চলে গেল। গ্রামটির নাম—দেখোলা। থানাদার হিসেব করে দেখলেন—তিনি বর্থ উইক থেকে প্রায় দেড়শ’ মাইল দূরে চলে এসেছেন। এখন আর ভয়ে পিছিয়ে যাওয়ার অর্থ হয় না। গ্রামের মোড়লের কাছে তিনি সাহায্যপ্রার্থী হলেন। বললেন, কোম্পানির আদেশ, আমাকে লোক দিয়ে সাহায্য করতে হবে।

দেখোলা নামমাত্র গাঁ। মাত্র কয়েকঘর মানুষের বসত সেখানে। অসহায় মোড়ল দু’তিনজন তরুণের বেশী জোগাড় করতে পারলেন না। ইনস্পেক্টার তাদের নিয়েই পা বাড়ালেন সামনে। মনে মনে তিনি ঠিক করে ফেলেছেন—খুনখারাপির কথা ভোলা উচিত হবে না। তিনি জানেন, এই জেলায় আফিংয়ের কারবারে একচেটিয়া অধিকার সরকারের। তিনি তারই চোরা কারবারের অভিযোগ তুলে ওদের গ্রেফতার করবেন।

দলটা সামনে পড়া মাত্র ইনস্পেক্টার ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। তারপর দলপতি বলে মনে হল যাকে, সেই মানুষটির দিকে হাত তুলে বললেন, সালাম।

—সালাম! উত্তর দিল উমরাও।

ইনস্পেক্টার এগিয়ে গিয়ে বললেন, আমি আফিংয়ের দারোগা। তোমাদের কাছে চোরাই আফিং আছে। বুলওয়ারা থেকে ফৌজ কর্তৃপক্ষ তাই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন, তোমাদের সেখানে ফিরে যেতে হবে।

ওরা এক সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল।—আমরা তীর্থযাত্রী হুজুর ; আমাদের সঙ্গে আফিংয়ের কোন সম্পর্ক নাই। তাছাড়া, আমরা তো আপনার সামনেই। তালাস করে দেখুন। এই আমাদের তল্পিতল্পা, হাঁড়ি-কুঁড়ি; যদি কিছু পান তাহলে না হয় ধরে নিয়ে যাবেন, নয়ত মিছিমিছি কেন এই গরীবদের কষ্ট দেবেন !

ইনস্পেক্টার লোকগুলোর মুখের দিকে তাকালেন। গরীব সন্দেহ নেই। শতচ্ছিন্ন পোষাক, পায়ে কারও জুততা নেই। দেহে বিলাসের কোন ছাপ নেই। চোখে খুনীর বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই। তবুও বৰ্থ উইকের নির্দেশ। তিনি নিস্পৃহ গলায় বলে চললেন, দেখ, এটা কোম্পানির রাজত্ব। তোমরা যদি আমার কথায় রাজী না হও তবে কোম্পানির ঘোড়সওয়াররা এসে ধরে নিয়ে যাবে তোমাদের। তখন কি ভাল হবে ? তার চেয়ে আমার কথা শোন। আফিং থাক আর নাই থাক, তোমরা তল্পিতল্পা নিয়ে আমার সঙ্গে চল। যদি কিছু না পাওয়া যায় তবে কোম্পানি মিছিমিছি কেন আটক করে রাখবে তোমাদের।

ওরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কি যেন বলাবলি করল, তারপর একজন বলে উঠল, বেশ চলুন।

ইনস্পেক্টার ওদের নিয়ে পথে নামলেন। বুলওয়ার। সেখান থেকে দু’দিনের পথ। সঙ্গে মাত্ৰ জনাকয় পুলিশ। অথচ ওদের বিরাট দল। থানাদার চিন্তিত। লোকগুলো যদি সত্যিই খুনী হয় !

সন্ধ্যা হল একটা গাঁয়ে এসে। থানাদার আস্তানা পাতলেন মোড়লের ঘরে। ওরা রাত কাটাল পুলিশের সঙ্গে বাইরে। কিন্তু আশ্চর্য, ভোরে দেখা গেল একটি মানুষও পালায়নি। সবাই তেমনি আছে। তেমনি হাসিখুশী, তেমনই নিশ্চিন্ত ! দেখে ইনস্পেক্টারের মায়া হল। নেহাত বৰ্থ উইকের আদেশ, নয়ত এদের এভাবে মিছিমিছি কষ্ট দিতেন না তিনি।

বুলওয়ারায় আগেই খবর পাঠান হয়েছিল। ওরা সেখানে পৌছানমাত্র বিরাট এক পুলিশবাহিনী এসে তাদের ঘিরে ফেলল। এবার শেষ পরীক্ষা। ঘোড়া থেকে নেমে ইনস্পেক্টার সোজা হয়ে দাড়ালেন। তারপর ধীর গলায় বললেন, তোমরা আফিংয়ের চোরাকারবারী নও, তোমরা খুনী।

ওরা সকলে সমস্বরে আপত্তি জানাল।–সাহেব, তোমার ভুল হচ্ছে, আমরা তীর্থযাত্রী। তীর্থ করে গুজরাতে ফিরছি।

ইনস্পেক্টার আবার লোকগুলোর দিকে তাকালেন। ওদের চোখে মুখে কোন ভাবান্তর নেই। তিনদিন ধরে যেমন দেখছেন, তেমনি সরলপ্রাণ গ্রামবাসী। হঠাৎ তারা ঝঞ্চাটে পড়েছে, ফলে কারও কারও মুখে বিরক্তির ছাপ দেখা দিয়েছে, কিন্তু কোথাও আতঙ্ক বা উদ্বেগের লেশমাত্র নেই। তবুও শেষ চেষ্টা করতে হবে। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ওসব বাজে কথা, আমি জানি দিন দশ আগে রাথলমে পাঁচজন মানুষকে খুন করে এসেছ তোমরা। তোমরা খুনী।

দলের একজন ধীর পায়ে এগিয়ে এল তাঁর দিকে। সাহেব, মিছিমিছি কেন গরীবদের ওপর হামলা করছ? এই কাগজটা একবার দেখ। লোকটি কোচর থেকে একফালি কাগজ বের করে ইনস্পেক্টারের মুখের সামনে তুলে ধরল।

বিস্মিত ইনস্পেক্টার দেখলেন, সেটি একটি অনুমতিপত্র। রাজসরকার থেকে ওদের তীর্থযাত্রী হিসেবে গোটা ভারত দেখবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে কোম্পানির তরফ থেকে পথের আপদবিপদেও তাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট ভাষায় লিখিত দলিল। নীচে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীর স্বাক্ষর, শীলমোহর। সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। ইনস্পেক্টার ভাবনায় পড়লেন। সত্যি সত্যিই যদি ওরা খুনী না হয়! তাছাড়া এই কাগজটা দেখবার পরও ওদের আটকে রাখার কোন অধিকার আছে কিনা সেটাও বিবেচ্য। কিন্তু ছেড়ে দিলেই বা কি কৈফিয়ত দেবেন তিনি বর্থ উইককে। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ—দলটিকে যেখানেই পাবে ধরে নিয়ে আসবে। যাই হোক, সে আমার দায়িত্ব। ইনস্পেক্টার সে নির্দেশকে অমান্য করার সাহস পেলেন না। তিনি বললেন, এ কাগজটা মিথ্যে এমন কথা আমি বলছি না। কিন্তু বর্থ উইক সাহেবের নির্দেশ, তোমাদের জাওরা নিয়ে যেতে হবে। সাহেব সেখানে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছেন!

অগত্যা আর উপায় কি। ওরা জবাব দিল, বেশ তাই চল। তোমরা কোম্পানীর কর্মচারী, মহামান্য রাজবাহাদুর তোমরা, যেমন মর্জি করবে তাই হবে। আমরা যাচ্ছি সাহেব, কিন্তু কথা দাও, যদি আমাদের কাছে সেখানেও কিছু না পাও তবে এমনি আর একটা কাগজ লিখে দেবে। দিনকাল যা পড়েছে বোধহয় দুইদফা পারমিট থাকলেই শেষ অবধি ঠিকানায় পৌঁছান যাবে । বল সাহেব, দেবে?

—নিশ্চয়। বৰ্থ উইক যদি তোমাদের ছেড়ে দেন, তবে আর তোমাদের পারমিট দিতে ভয় কি? তাছাড়া তার দরকার হবে না। বৰ্থ উইকের নামটি যদি মনে রাখতে পার তাহলেই যথেষ্ট। খুনের দায়ে অন্তত তারপর আর কেউ কখনও তোমাদের আটকাবে না !  নাও, আর দেরী নয়, চল।

জওরা থেকে আর ফেরা হয়নি ওদের। কেননা, বৰ্থ উইক দ্বিতীয় লীম্যান। তিনি যখন জাল ফেলেন তখন সে নির্ভুল তাক, তাতে কখনও ভুল মানুষ ধরা পড়ে না। কিন্তু তা হলেও ওরা যে এত সহজে খুনী প্রমাণিত হয়ে গেল তার পেছনে শুধু বৰ্থ উইক নন, আরও একজন ছিল। সে ওদেরই দলের একজন মানুষ। জওরার পথে সে রণভঙ্গ দিয়েছিল। ইনস্পেক্টারের কানে কানে বলেছিল, সাহেব, তোমার অনুমান ঠিক। আমরা সত্যিই খুনী।

যদি এই কথাটি জানা না থাকত তাহলে শুধু ক’টি কবরের জোরে সত্যি সত্যিই ওদের অপরাধ প্রমাণ করা যেত কিনা বৰ্থ উইক নিজেও তা জানেন না। কেননা, মানুষগুলো দেখতে যেমন নির্দোষ, তেমনি তাদের সঙ্গে তল্পিতল্পাগুলোও। কোথাও কোন হাতিয়ার নেই। কোন চোরাই ধন নেই। দেহে যেমন তাদের তীর্থযাত্রীর বেশ, তেমনি তাদের পথচলার আয়োজনেও। নিজে স্বীকার না করলে এনায়েত এক অবিশ্বাস্য কাহিনী।

কখনও কখনও অবশ্য লুঠের মালও সঙ্গে থাকত। কিন্তু এনায়েতরা তখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কেননা, হিন্দুস্তান এক বিচিত্র দেশ। সেখানে পথে পথে যেমন অসংখ্য মানুষ হারিয়ে যায়, তেমনি অসহায় পথিকের বন্ধুও অনেক।

শুধু বন্ধু নয়, সেবার ওর বান্ধবীও পেয়েছিল দু’জনা। গত শতকের দ্বিতীয় দশকের কাহিনী। নিজাম বাহাদুরের এক পদস্থ কর্মচারী নাগপুর থেকে তার দেশের বাড়ীতে চলেছেন। দূরের পথ। জব্বলপুর হয়ে যেতে হবে। সঙ্গে তাঁর এক পুত্র, দুই কন্যা এবং আরও দুটি তরুণ। মেয়ে দুটি অবিবাহিত তরুণী। কথা আছে, জব্বলপুরে গিয়ে তাদের বিয়ে হবে। তরুণ দু’টি বর। বাবা তাদের পছন্দ করে নিজের ঘরে নিয়ে চলেছেন। সেখানেই ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া তার মতলব। পথে ওদের দেখাশুনা করার জন্য সঙ্গে তিনি চারজন ভৃত্যও নিয়েছেন।

চলতে চলতে পথে একদল পথিকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তারপর যথারীতি ক্রমে আলাপ এবং সৌহার্দ্য। ওঁরা একসঙ্গে চলতে লাগলেন।

কদিন পরে এক গ্রামে এসে আস্তানা গাড়লেন ওঁরা। দরবারী ভদ্রলোক আশ্রয় নিলেন মোড়লের বাড়ীতে, ওরা গাঁয়ের এক কোণে পথের ধারে নিজেদের তাবুতে। সে রাত্তিরে গাঁয়ের সেই কোণটিতে আগুন লাগল। একটি বাড়ী পুড়ে ছাই হয়ে গেল। রাত্রে ভাল ঘুম হল না। ভদ্রলোক ভোরেই গাঁ ছাড়তে মনস্থ করলেন।

কিন্তু পথে নেমে দেখা গেল তার সঙ্গীরা নেই। উদ্বিগ্ন ভদ্রলোক খবরাখবর করে জানলেন-চৌকিদার ওদের থানায় ধরে নিয়ে গেছে। রাত্রে ওরাই নাকি গায়ে আগুন লাগিয়েছে। ভদ্রলোক বললেন, বেশ করেছে। চল তবে এবার এগোন যাক। কিন্তু মেয়ে দু’টি নড়বে না। ক’দিনে দলের কারও কারও সঙ্গে বেশ অন্তরঙ্গতা হয়ে গেছে। কি চমৎকার গল্প বলত লোকগুলো ! কি চমৎকার গান গাইত। তারা কিছুতেই ওদের এভাবে পুলিশের হাতে ফেলে দিয়ে যাবে না।

আদুরে মেয়ে। উপায়ান্তরহীন ভদ্রলোক অগত্যা চললেন থানার দিকে। থানাদার তাকে দেখে সালাম করে উঠে দাড়াল। ভদ্রলোক বললেন, কেন মিছিমিছি আটক করে রেখেছ ওদের। আজ কদিন একসঙ্গে চলছি, কিন্তু একবারও তো মনে হয়নি ওরা ডাকু! তাছাড়া, আমিও মানুষ নিয়েই নাড়াচাড়া করি!

-আপনি কি বলছেন ওরা নির্দোষ পথিক মাত্র ?

—হ্যা তাই।

মেয়ে দু’টিও মাথা নাড়ল।—কি বলব দারোগা সাহেব, যা চমৎকার গান গায়।

মেয়ে দু’টির মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন থানাদার। তারপর পাশের চৌকিদারটির দিকে ফিরে হুকুম দিয়েছিলেন, ওদের ছেড়ে দাও!

তাই দেওয়া হল। তল্লাসী হল না, জিজ্ঞাসাবাদ হল না, মানুষগুলো ছাড়া পেয়ে গেল। অথচ থানায় সেদিনই খবর এসেছে, নাগপুর থেকে জব্বলপুরের পথে তিন জন পথিক হারিয়ে গেছে। তারা ব্যবসায়ী। সঙ্গে দামী রেশমী কাপড় ছিল। আগুনের কারণ হিসেবে নয়, থানাদার সে খবর পেয়েই আটক করেছিলেন ওদের। কিন্তু রাখা গেল না। মেয়ে দুটির চোখের দিকে তাকিয়ে বিনা তল্লাসীতেই মানুষগুলোকে ছেড়ে দিতে হল।

দলছাড়া বন্ধুদের দলে ফিরে পেয়ে পুরানো রাজকর্মচারী সপরিবারে আবার জব্বলপুরের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি এখন আনন্দিত পথিক। কেননা, মেয়ে দু’টির মুখে হাসি ফুটেছে। তাছাড়া, তাঁর নিজের খাতিরও বেড়েছে।

জব্বলপুরে এসে আবার নতুন ঝামেলা। দলপতি ভদ্রলোককে ধরে পড়লেন, আমাদের মনে হচ্ছে পুলিশ এখানেও গোলমাল বাঁধাবে। আপনাকে এবারও দয়া করে একটু সাহায্য করতে হবে !

কথা শুনে মেয়ে দু’টিও আলোচনায় যোগ দিল। আমরা থাকতে তোমাদের ভয় কি? কি নিয়ে গোলমালটা বাঁধাবে পুলিশ তাই শুনি। এবার তো আর কোথাও আগুন লাগেনি।

দলপতি হাওয়ায় বিপদের গন্ধ পেয়েছে। সে বলল, আগুনের কথা নয় দিদিমণি, আমাদের সঙ্গে অনেক জিনিষপত্র, হয়ত কাস্টমস চৌকির লোকেরা তাই দেখবার নাম করে আরও দু’দিন আটকে রাখবে।

–আমি থাকতে তাও কি কখনও হয়? উত্তর দিলেন নিজামের গর্বিত ওমরাহ।তোমাদের মালগুলো আমাদের সঙ্গে দিয়ে দাও দেখি !

তাই হল। কাস্টমস চৌকির পুলিশও নাগপুর থেকে খবর পেয়ে গেছে। তারা সতর্ক হয়েই ছিল। কিন্তু তাতে কোন কাজ হল না। দলটি এল। কিন্তু তাদের হাত-পা খালি। লুঠের মাল বলে সন্দেহ করা যেতে পারে, সঙ্গে তাদের তেমন কিছু জিনিষ নেই। ওরা নিরাপদে চৌকি পার হয়ে চলে গেল।

একটু পরেই চৌকিতে এলেন নিজাম বাহাদুরের পুরানো কর্মচারী। পরিচয় দিতে হল না। চেহারা, বেশবাস সব দেখে চৌকির দারোগা সেলাম ঠুকে তাঁর পথ ছেড়ে দিলেন। সঙ্গের লটবহর তল্লাসীরও প্রশ্ন ওঠে না। খানদানী মানুষ। দূর পথের যাত্রী, সঙ্গে জিনিষপত্র তো থাকবেই। তাছাড়া দাবোগা দেখলেন, দু’টি তরুণী মেয়ে বড় বড় দু’টি পুটুলীর ওপর বসে আছে। ওদের উঠতে বলা বেইজ্জতি কথা হবে। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনি যাত্রীদের ছেড়ে দিলেন।

রেশমের গাঁট দু’টি সামনে ছুড়ে দিয়ে খিল খিল করে হেসে উঠেছিল দুটি মেয়ে,—দেখলে তো, তোমাদের সাত রাজার ধন মাণিক কেমন নিয়ে এলাম! এবার বল আমরা কাজের কিনা!  ওরা বলল, সে কথা আর বলতে? ভাগ্যিস আপনারা ছিলেন । গাঁট দু’টি দু’জনের পিঠে তুলে দিতে দিতে দলপতি বলেছিল, বেঁচে থাকলে মা-জান, তোমরা রাজরাণী হবে, বাদশার পাট বিবি, চাই কি সুলতানা।

ওরা তা হতে পারেনি। তামাম হিন্দুস্তানের কোন হারেমে নিজামের অতি প্রিয় ওমরাহের ঘরের সেই মেয়ে দু’টিকে কোনদিন আর খুজে পাওয়া যায়নি। তাদের স্নেহান্ধ বাবা, নিজাম দরবারের গর্বিত সেই ওমরাহটি, তার পুত্র, ভৃত্য চারজন, কাউকে না। এমন কি যে ছেলে দু’টির সঙ্গে ফুটফুটে সেই মেয়ে দুটির ক’দিন বাদে সাদী হওয়ার কথা, তাদেরও না। ওঁরা সবাই চিরকালের মত হারিয়ে গিয়েছিলেন। দিনের পর দিন সেই অপরিচিত সহযাত্রীদের নিয়ে এক সঙ্গে কুড়ি দিন পথে ছিলেন ওঁরা। দুশ’ মাইল পথে প্রতিদিন তারা একই জায়গায় থেকেছেন। নিজেদের খাবার থেকে সহযাত্রীদের খাইয়েছেন, ওদের বিপদে মানুষের ধর্ম মেনে পাশে এসে দাড়িয়েছেন। কিন্তু তবুও একুশ দিনের দিন আর খুজে পাওয়া যায়নি ওঁদের। কেননা, সরলপ্রাণ গ্রাম্য পথিক হিসেবে দরবারী বাবা যাদের নিজের তাঁবুর স্নেহচ্ছায়ায় ডেকে বসতে দিয়েছিলেন, তারা আসলে তা ছিল না। মেয়ে দু’টি জানত না, ভালবাসার ভান করলেও ওরা হৃদয়হীন মানুষ ; ইতিহাসের হিংস্রতম, নিপুণতম খুনী—-ওরা ঠগী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *