ঠগী – ৫

পর্ব ৫

উপকরণ অতি সামান্য। একফালি হলুদ কাপড়। ঢাল নয়, তলোয়ার নয়, বোমা-পিস্তল কামান-বন্দুক—কোন আগ্নেয়াস্ত্র নয়, একমাত্র হাতিয়ার সেই হলুদ রঙের রুমালটি। রুমাল নয়, ওরা বলত—পেলহু। কিংবা—সিক্কা।

খুলে রাখলে মনে হবে যেন কোন পাগড়ী খুলে রাখা হয়েছে, অথবা ‘সাস’,—কোমরবন্ধনী হিসেবে ব্যবহৃত কোন কাপড়। দুর্ভাজে ভাজ করার পর সেটি দৈর্ঘ্যে মাত্র তিরিশ ইঞ্চি। আঠার ইঞ্চি দূরে একটি গিট। গিটের প্রান্তে একটি রুপোর টাকা বাঁধা। নয়ত একটি তামার ডবল পয়সা। হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে মেপে মেপে অতি যত্নসহকারে ওরা যখন সেটি তৈরী করে, তখন দেখলে কিছুই বোঝ যাবে না। একমাত্র এনায়েত ধরা পড়ার পর খুব মনোযোগ দিয়ে পরখ করলে তবেই জানা যাবে ওর হাঁটুটা ছিল শত শত মানুষের গলার বিকল্প। রুমালটা আসলে একটা ফাস। প্রান্তে বাঁধা সিদুর মাখান টাকাটা তাকেই আরও নিভুল, আরও নিটোল করার জন্য।

কোমরে সেই ‘নির্দোষ’ হাতিয়ার গুজে ছিন্ন বেশে নগ্ন পায়ে পথে নামত-রোসন জমাদার, রুস্তম খাঁ, এনায়েত, দুর্গা–ইতিহাসের নৃশংসতম, বিচক্ষণতম হত্যাকারীর দল। সঙ্গে তাদের নানা বয়সের নানা চেহারার অসংখ্য অনুচর।

চলতে চলতে ওরা গল্প করত। দেশ-দেশান্তরের নানা গল্প। গান গাইত। ভক্তির গান, ভালবাসার গান, আনন্দের গান। গাছতলায় বসে মাঝে মাঝে ওরা বিশ্রাম করত। তামাক খেত, সুখদুঃখের আলোচনা করত। কখনও উচ্চৈঃস্বরে হাসত, কখনও চোখে জলের ঢল নামাত। দুরের পথিক গুটি গুটি এগিয়ে এসে পাশে দাড়াতেন। তারপর নিজের অজান্তেই একসময় বসে পড়তেন। এমন সঙ্গীকে এড়ান যায় না।

সঙ্গী হিসেবে যেমন চমৎকার, মানুষ হিসেবেও তেমনি। চেহারায় সকলেই সনাতন ভারতীয়। সেই শান্ত চোখ, খাড়া নাক। মুখে মেহেদি মাখা দাড়ি, গায়ে কামিজ, মাথায় পাগড়ী। ভারতের আর পাঁচজন গাঁয়ের মানুষের সঙ্গে কোন পার্থক্য নেই তাদের। বরং কারও কারও চেহারায় রীতিমত আভিজাত্যের ছাপ। যেমন টেলারের নায়ক আমীর আলি। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি উচু মানুষটি যখন সামনে এসে দাড়ায়, তখন বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয় না যে তার এই গর্বিত দেহ আর প্রশান্ত বদনমণ্ডলের পেছনে আছে সাতশ’ খুনের ইতিহাস। অথচ আমীর আলি নিজেই তা বলেছিল। মাথার পাগড়ীটা ধীরে ধীরে খুলে চওড়া কপালটা সাহেবের সামনে বাড়িয়ে ধরেছিল। তারপর পাগড়ীটা আবার মাথায় জড়াতে জড়াতে বলেছিল, যে দাগাটা দেখলেন হুজুর, সেটাই আমার চিনাস। প্রথম জীবনে একবার বেয়াকুফের মত ধরা পড়েছিলাম। ঝালোনের রাজাবাহাদুর কপালটা দাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমি দাগী ।

সেকথা বিশ্বাস না করে উপায় নেই। কারণ, কথক আমীর আলি নিজেই। কিন্তু বাইরে থেকে অতি নিকট প্রতিবেশীরও জানবার উপায় নেই ওরা কে। সেই ঘোট ঘোট গাঁ। গাঁয়ের এককোণে ছোট। ছোট কুটির। শান্তির নীড়। বছরভর ওরা স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে সংসার করত। কেউ কেউ মাঠে ঘাটে কাজ করত। কেউ কাছারি কুঠিতে। এমনকি কেউ কেউ ফৌজে পর্যন্ত। গৃহস্থ হিসেবে সবাই তারা সমান শান্তিপ্রিয়। তারা ভিখারীকে ভিক্ষে দেয়, জমিদারকে খাজনা দেয়, উৎসবে আনন্দ করে, শোকের দিনে গলা ছেড়ে কাঁদে।

গোটা বছর ওরা স্বাভাবিক মানুষ, সাধারণ গৃহস্থ। কিন্তু বর্ষা শেষে দিনক্ষণ দেখে শরতের ভোরে যখন ঘর ছেড়ে পথে নামল তখন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। ওদের হাসি তখন হাসি নয়, কান্না কান্না নয়। ওরা তখন ভিন্ন জগতের মানুষ—ওরা খুনী।

বাড়ীর মেয়েরা সে খবর জানত। তারা সাত দিন পাড়াপ্রতিবেশী এড়িয়ে চলত। অষ্টম দিনে কেউ খবর করলে বলত, বিদেশ গেছে। কাজের ধান্ধায় দেশান্তরী হয়েছে। ছোটরাও তাই জানত। বাবা বাইরে গেছে। শীত শেষ হলেই তাদের জন্যে অনেক কিছু নিয়ে ঘরে ফিরবে।

বাবা যতদিন না ফিরছে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব ততদিন মায়ের। ঠগী বৌ তখন নীরবে সংসার আগলায়। স্বামীর পেশা সম্পর্কে ভাসা ভাসা ধারণা নয়, বলতে গেলে সবই তার জানা। কেননা, সেও ঠগীর ঘরেরই মেয়ে। তার অনেক দায়িত্ব। এ ব্যাপারে একমাত্র ব্যতিক্রম মূলতানী ঠগের স্ত্রীরা। তারা ততখানি সৌভাগ্যবতী ছিল না। স্বামীরা কখনও তাদের কাছে আসল খবর বলত না। অবশ্য অষ্ণ ঠগীদের মধ্যেও কেউ কেউ অনেক সময় স্ত্রীর কাছে নিজের জীবন গোপন রাখত। কিন্তু সে একান্তভাবেই ব্যক্তিগত ব্যাপার। সাচ্চা ঠগীর পক্ষে আপনজনের কাছে মনের কথা গোপন রাখার কোন প্রয়োজন নেই। এমনকি কোন ঠগী ইচ্ছে করলে তাকে সঙ্গে নিয়েও পথে বের হতে পারে। বারুণী নামে এক ঠগীবৌ ছিল। সে নাকি তাই করত। সাক্ষ্যপ্রমাণে জানা গেছে, নরহত্যার সময়েও সে স্বামীর পাশেপাশে থাকত, দরকার হলে সাহায্য করত। দক্ষিণ ভারতে

আর একটি মেয়ে ছিল, সে নিজে একটি দল পুষত। সেটা সহজ কথা নয়। কারণ, খানদানী ঘরের লোক না হলে প্রথমত কেউ দলপতি বা জমাদার হতে পারত না। দ্বিতীয়ত, জমাদারের শুধু দল গড়ার মত ব্যক্তিত্ব থাকলেই চলবে না। যাত্রা শুরু করার আগে তাকে দলের প্রত্যেকের ঘরে দু’একমাসের আগাম খোরপোষ রেখে যেতে হবে!

পথে নামবার আগে আরও কিছু কিছু কৃত্য আছে। প্রথমত একটি কোদাল তৈরী করতে হবে। সেটি তৈরী করতে হবে কামারবাড়ীর ঝাঁপ বন্ধ করে নিজেদের চোখের সামনে। যেদিন খুশী কামার ভাইয়ের দুয়ারে হাজির হলেই চলবে না, দিনটা শুভদিন হওয়া চাই। ঠগীর পাঁজিতে তার জন্যে সপ্তাহে মাত্র তিনটে দিন নির্দিষ্টমঙ্গল, বুধ এবং শুক্র। যদি অন্য কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে তবে এই তিনদিনের যে কোন একদিন কামারের ঘরে যেতে হবে। তারপর ঘরের জানালা দরজা বন্ধ করে তাকে কাজে লাগাতে হবে। নজর রাখতে হবে, কামার যেন কোদাল গড়তে গড়তে অন্য কিছুতে হাত না দেয়। তাহলেই সব গেল। নতুন করে আবার একদিন চেষ্টা করতে হবে।

কামারের কাজ ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে গেলে দ্বিতীয় কর্তব্য শুভদিনে, শুভক্ষণে কোদালটিকে মন্ত্রপূত করা। সে অনুষ্ঠানেও অনেক আইনকানুন, বিধিনিষেধ।

প্রথমে ঘরের মেঝেতে একটি গর্ত খুঁড়তে হবে। নতুন কোদালে নয়, অন্য কিছুতে। তারপর অতি সঙ্গোপনে রুদ্ধদ্বার কক্ষে শুরু হবে অনুষ্ঠান। সেখানে ঠগী ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার নেই। একজন গর্তের ওপর কোদালটি ধরে থাকবে। অন্য একজন ধীরে ধীরে জল ঢেলে যত্নসহকারে সেটি ধোয়াবে। জলের পর ধুতে হবে। চিনি-জলে, ভারপর ঘোলে এবং অবশেষে মদে। ইতিমধ্যে খুঁটে এবং আমাঠে এক অগ্নিকুণ্ডও তৈরী হয়েছে। সাতটি সিদুরের ফোটায় সাজিয়ে সেই সদ্যস্নাত কোদালকে এবার সাতবার আগুনে সেঁকে অগ্নিশুদ্ধ করা হবে।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব আরও গুরুতর। এবার সেই কোদাল দিয়ে একটি নারকেল ভাঙতে হবে। পশ্চিমদিকে মুখ করে পুরোহিত তথা এই পবিত্র অনুষ্ঠানের নায়ক বসে আছে। হাতে তার একটি পিতলের রেকাবী, তাতে শ্বেতচন্দন, চিনি ইত্যাদি নানা উপচারের মধ্যে শায়িত পবিত্র কোদাল। তার সামনে মাটিতে একটি ছোবড়া ছাড়ান গোটা নারকেল রাখা হয়েছে। কোদালের গোড়ালিটা দিয়ে এক ঘায়ে সেটি ভেঙ্গে দু’টুকরো করতে হবে।

লোকটি ধীরে ধীরে কোদালটি হাতে নিয়ে গম্ভীরভাবে উঠে যাবে। দলের অন্যরা পশ্চিমদিকে মুখ করে সার হয়ে বসে আছে। সে তাদের দিকে ঘুরে অনুমতি চাইবে—ভাঙব ?

-হ্যা! সবাই সমস্বরে জবাব দেবে।

সঙ্গে সঙ্গে নারকেলে কোদালের ঘা পড়বে। নিভুল লক্ষ্যে নিশ্চিত আঘাত। নারকেলটি ভেঙ্গে দু’টুকরো হয়ে গেল। সকলে জয়ধ্বনি করে উঠল—জয় ভবানী! এবার শাসটুকু সেখানে বসেই প্রসাদ হিসেবে খেয়ে নিতে হবে। বাকী যা থাকবে সব কুড়িয়ে সেই গর্তটিতে ফেলতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, কিছুই যেন মাটিতে পড়ে

থাকে। কেননা, তাহলে অন্যরা পায়ে মাড়াবে, দেবীর অসম্মান হবে।

যদি কোন কারণে এক ঘায়ে নারকেলটি ভাঙ্গা না যায় তাহলে অনুষ্ঠান সেদিনকার মত সেখানেই শেষ। বুঝতে হবে কোথাও ত্রুটি রয়ে গেছে। দেবী তাই পুজো গ্রহণে অসম্মত হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে আবার আর একদিন নতুন করে চেষ্টা করতে হবে। অনুষ্ঠান যদি নির্বিঘ্নে সুসম্পন্ন হয়ে যায় তবে একটি পরিচ্ছন্ন কাপড়ে জড়িয়ে কোদালটি আবার সকলের সামনে স্থাপন করা হবে। এবারও তার মুখ থাকবে পশ্চিমদিকে। সকলে মনে মনে তাকে প্রণাম জানাবে। তারপর দলের মনোনীত বিশেষ একজনের হাতে সেটি তুলে দেওয়া হবে। এবার থেকে এই মন্ত্রপূত কোদালের সব দায়-দায়িত্ব তার। কাজটা যে কোন ঠগীর কাছে অত্যন্ত সম্মানের। কেননা, দলের জীবনে রুমালের মতই এই অস্ত্র জরুরী। রুমাল যদি ওদের সিক্কা বা প্রতীক হয়, তবে কোদাল ওদের নিশান। আজ থেকে নাম তার ‘মাহি’ অথবা ‘কাসি’,-কক্ষনো সেটি আর কোদাল নয়। ওরা প্রতি যাত্রায় সেটি নতুন করে গড়ে, নতুন করে তাতে প্রাণসঞ্চার করে। তাই নিয়ম।

ছোট্ট কোদাল। লম্বায় ছ’ থেকে আট ইঞ্চি, ওজন দু’ থেকে আড়াই সের। কোন হাত নেই। প্রতিবার দরকারের সময় ওরা নতুন করে হাতল লাগিয়ে নেয়, কাজ শেষ হয়ে গেলেই সে হাতল ফেলে দিয়ে ধুয়ে মুছে আবার বহনকারীর হাতে ফিরিয়ে দেয়। এ কোদাল সম্পর্কে তার অনেক কর্তব্য। পথে বের হবার আগে তাকে সেটি অতি সংগোপনে মাটির তলায় লুকিয়ে রাখতে হবে। এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে কোন মানুষ বা জন্তুর ছায়া না পড়ে। যাত্রার আগের দিন সেটি তুলতে হবে।

পথেও নানা নিয়ম। সেখানেও কোদাল সেই বিশেষ মানুষটিরই হেফাজতে। সে তাকে সযত্নে মাটির তলায় লুকিয়ে রাখে, প্রতি সপ্তম দিনে ভক্তি ভরে পুজো করে। কেননা, মন্ত্রসিদ্ধ কোদালের অনেক গুণ। প্রথমত, কোদাল দলের পথ নির্দেশক। দল পরদিন ভোরে যে দিকে চলবে বলে ঠিক করেছে কোদালটিকে সেদিক মুখ করেই মাটির নীচে রাখা হয়েছে। ভোরে উঠে বহনকারী নজর করবে কোদালের মুখ ঠিক সেদিকেই আছে কি না। যদি কোদাল রাত্তিরে নিজে নিজে দিক পরিবর্তন করে থাকে তবে বুঝতে হবে তাদেরও পথ পরিবর্তন আবশ্যক। কোদালের মুখ যেদিকে দেখা গেছে ওরা এবার সেদিকেই পা বাড়াবে। দ্বিতীয়ত, এ কোদাল দলের রক্ষক। দলের কেউ মিথ্যা বলছে কি না তার শেষ পরীক্ষা কোদাল। লোকটিকে তার ওপর হাত রেখে শপথ করতে হবে। এ পরীক্ষার সময় হাতের কাছে আসল কোদালটি না পাওয়া গেলে ন্যাকড়ায় অথবা মাটিতে তার একটি প্রতীক তৈরী করে তাকে মন্ত্রসিদ্ধ করে নিলেও চলবে। লোকটি যদি মিথ্যে বলে তবে ছ’দিনের মধ্যে সে মারা যাবে, অথবা কোন বিপর্যয়ে পড়বে—এমন সংকটে যা মৃত্যুরই সামিল। তৃতীয়ত, এ কোদাল দলের ভাগ্যনিয়ামক। পথে যদি কখনও বহনকারীর হাত থেকে সেটি মাটিতে পড়ে যায় তবে ওরা জানবে এক বছরের মধ্যে তারা একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং সহযাত্রী হারাতে চলেছে। আজ যে তাদের হয়ে দলের নিশান বইছে এক বছরের মধ্যে তার মৃত্যু হবে। আর যদি তা না হয়, তবে দলের অপমৃত্যু। ওরা হয় কোথাও ধরা পড়বে, না হয় অন্য কোন বিপাকে পড়বে। চতুর্থত, এ কোদালের ব্যবহারিক গুণ। ঠগীর কোদালের বৈশিষ্ট্য এই, সে যখন মাটি কাটে তখন কোন শব্দ হয় না। হলেও যেটুকু হয় ঠগী ছাড়া তা আর কেউ শুনতে পায় না। সর্বশেষ, এ কোদাল যাদুকর। যেখানেই রাখা যাক তাকে বহনকারী যদি ডাকে তবে নিঃশব্দে সে তার হাতে উঠে আসবে। এমনকি কুয়োর তলায় রাখলে সেখান থেকে পর্যন্ত।

-তোমরা কি কেউ তা দেখেছ? সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন

-ঠিক নিজের চোখে দেখিনি বটে, তবে ঘটনাটা সত্য বলে – জানবে সাহেব। ডাক শুনে কাসি’ উঠে আসছে এ দৃশ্য আমরা কেউ দেখিনি হয়ত, কিন্তু আমরা প্রত্যেকে দেখেছি রাত্তিরে যে কাসি’ কুয়োর জলে ফেলে রাখা হয়েছিল সকালে সে নিজেই ভাঙায় উঠে এসেছে। এমনকি একই কুয়োয় নানা দলের কাসি রাখা হলেও তারা নিজ নিজ দল চিনে নিজের মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে।

শুনে সাহেব হেসেছিলেন। আজ হয়ত আমরাও হেসে উঠব। কিন্তু তাহলেও বিশ্বাসের এই কাহিনীগুলো শোনা দরকার। কেননা, নয়ত ঠগীদের বোঝা যাবে না।

যাত্রার আগে আরও একটি অনুষ্ঠানের রেওয়াজ ছিল ওদের মধ্যে। সেদিন দেবীর নামে একটি পাঁঠা কাটতে হবে। নিখুঁত কালো অথবা সাদা পাঁঠা। সেটিকে স্নান করিয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে বেঁধে রাখা হবে। যদি দেখা যায় উৎসর্গিত প্রাণীটি শরীর কঁপিয়ে জল ঝাড়ছে তবে মনে করতে হবে দেবী প্রসন্ন আছেন। সেটিকে কাটা চলবে। আর যদি পাঁঠাটি তা না করে তবে মনে করতে হবে দেবী তাকে নিচ্ছেন না। সেক্ষেত্রে সাদা ভাতেই ওদের ভোজ সারতে হবে।

এই ভোজ হবে কোদাল-অনুষ্ঠানের মতই কোন রুদ্ধদ্বার কক্ষে। সেখানে বাইরের লোক তো বটেই, সব ঠগীরও বসবার অধিকার নেই। চুন আর হলুদ দিয়ে ঘরের মেঝেয় একটি চৌকো ছক কাটা হয়েছে। তার ওপর মাপে মাপে একটি পরিচ্ছন্ন কাপড় বিছিয়ে স্থপ করে রান্না করা ভাত সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তার শীর্ষে নারকেলমালায় একটি ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপটির বৈশিষ্ট্য এই, তাতে দু’টি পলতে, কিন্তু চারটি শিখা। পলতের দু’টি প্রান্তই জ্বলছে। সামনে ভাতের পাহাড়ের চাদরের ওপর রাখা হয়েছে পবিত্র-কোদাল। সেখানেই ভোজ বসবে। দৈবাৎ যদি কোন________________

বাইরের লোক এই প্রদীপ দেখে ফেলে, কিংবা যদি কোন কারণে হঠাৎ চাদরটিতে আগুন ধরে যায় তবে বছর ঘুরে আসার আগেই দলপতির মৃত্যু অবধারিত। ওরা তাই ভোজের দিনে অত্যন্ত সতর্ক। দেবী যদি পাঁঠাটি অনুমোন করে থাকেন তবে তারা তার মাংসেই ভোজ করবে। ভোজশেষে ঘরের মেঝেতে সেই ছক ধরে একটি গর্ত করা হবে। শুধু মুণ্ডটি বাদ দিয়ে পাঁঠার নাড়িভুড়ি চামড়া হাড়গোড় সব সেই গর্তে ফেলতে হবে। যারা প্রসাদ পেল তারা সেখানেই হাত মুখ ধোবে। তারপর গর্তটিকে বুজিয়ে লেপে পুছে সব চিহ্ন মুছে দিয়ে দুয়ার খুলবে।

সব কৃত্য শেষ হল। দল এবার যাত্রা করল। অনেক সময় পরিবার পরিজনদের দেখাশুনার জন্যে দলের দু’ একজনকে গাঁয়ে রেখে যাওয়া হত। তারাও তাদের প্রাপ্য ভাগ পেত। অনেক সময় ছোট ছেলেদেরও সঙ্গে নেওয়া হত। কেননা, দেখাতেও শিক্ষা। তাছাড়া, আরও একটা সুবিধে আছে। ছেলেটা সঙ্গে থাকলে বাড়তি একটা ভাগ পাওয়া যাবে।

তবে তার চেয়েও বাবার মনে জরুরী চিন্তা ছেলের ভবিষ্যৎ। ছেলে বড় হচ্ছে, স্নেহাতুর পিতা চিন্তিত। তার জীবৎকালেই ছেলেটাকে পথ ধরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। নয়ত পরে কি হবে কে জানে? জমাদারের বেটা হয়ত দলে একটু ঠাই পাওয়ার জন্যে এর তার পিছু পিছু ঘুরে বেড়াবে। সেটা মরা বাপের পক্ষে নিশ্চয় গৌরবের ঘটনা হবে না। কোন বাবাই তা মনে মনে কামনা করে । ঠগীরাও না। তারাও পিতা।

ওরা তাই ছোট ছেলেদেরও সঙ্গে নিত। সাধারণত নিয়ম ছিল একমাত্র সাবালকদেরই সহযাত্রী হিসেবে সঙ্গে নেওয়া চলবে। কিন্তু কেউ সে নিয়ম বড় একটা মানত না। বারো তের বছরের ছেলেদেরও তারা সঙ্গে নিতে ইতস্তত করে না। অবশ্য প্রথম যাত্রাতেই তারা সব বিদ্যা রপ্ত করে ঘরে ফিরতে পারত না। প্রথমবার তাকে শুধু দলে রাখা হত মাত্র। খুনের কিছুই সে জানতে পারত না, জানতে দেওয়া হত না। শুধু দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবার নেশাটা মনে ধরিয়ে দিয়েই ঘরের ছেলেকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসা হত ঘরে। ওরা সেই বয়সেই পথকে ভালবাসতে শিখত। কেননা, প্রথম যাত্রায় যত দৈহিক শ্রম, তার চেয়ে ঢের বেশী আনন্দ। ছোটদের কক্ষনে ওরা নিজেদের সঙ্গে পায়ে হাঁটাত না। তারা ঘোড়ার পিঠে থাকত। তাছাড়া, ফেরার পথে তাদের সঙ্গে থাকত নানা উপহার। অবশ্য তারই ভাগের পয়সায় কিনে দেওয়া। কিন্তু ছেলে সে খবর জানত না। বাবা এবং তার বন্ধুদের দেওয়া। জিনিষগুলোই তার কাছে এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ। ঘুরে ঘুরেই মাকে সে তা দেখায়।

দ্বিতীয় যাত্রায় স্বভাবতই ওদের জ্ঞানের পরিধি আরও একটু বাড়ে, ওরা জানতে পারে তার বাবা লুঠ করে, কিংবা হয়ত বা ডাকাতি। কেউ কেউ বাতাসে খুনের গন্ধও পায়। কিন্তু নিজের চোখে খুন দেখার সৌভাগ্য আসে আরও পরে–তৃতীয় যাত্রায়। নিজের হাতে রুমাল তুলে নেবার গৌরব যদি পেতে চায় কেউ তবে তাকে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু কাল ।

শুধু বংশ পরিচয়ই যথেষ্ট নয়, তার আগে ঠগীর ছেলেকে তার সাহসিকতা এবং নিষ্ঠারও কিছু কিছু পরিচয় দিতে হয়। যদি দেখা যায় ছেলেটি সত্যিই সাহসী এবং বিশ্বস্ত তবে দলপতি একটা দিন স্থির করবে। সেদিন কোন একজনকে গুরু মেনে তার কাছ থেকে দীক্ষা। নিতে হবে।

মনোনীত ঠগী সেদিন স্নান করে একটি কোরা কাপড় পরে গুরুর হাত ধরে আস্তানা ছেড়ে চলে যাবে। সঙ্গে যাবে দলপতি এবং দলের অন্যান্য বিশিষ্ট সদস্যরা। বাইরে এসে গুরু উর্বলোকের দিকে দু’হাত তুলে বলবে, মা ভবানী! তুমি তোমার এই নতুন দাসকে গ্রহণ কর। তুমি প্রসন্ন হও, তাকে আশীর্বাদ কর।

ওরা ভবানীর উত্তরের জন্যে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকবে এমন সময় গাছের ডাল থেকে অদূরে কোথাও যদি কোন প্যাচা ডেকে ওঠে তবে গুরু চেঁচিয়ে উঠবে—জয় ভবানী! ভবানী মাঈ কি জয় মা প্রার্থনা শুনেছেন, তিনি তোমাকে গ্রহণ করেছেন।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শপথ গ্রহণ। আস্তানায় ফিরে আসার পর ছেলেটির হাতে মন্ত্রপূত কোদালটি তুলে দিয়ে এক টুকরো কাপড়ে সেটি ঢেকে দেওয়া হবে। তারপর তাকে বলা হবে শপথ নিতে। সে যে গোপনীয়তা রক্ষা করবে, আদর্শনিষ্ঠ থাকবে এবং দলের স্বার্থ রক্ষা করবে, হাতে কোদাল রেখে গুরুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে তাই তাকে বলতে হবে। ছেলেটি যদি মুসলমানের ছেলে হয় তবে আবার তাকে কোরাণ হাতে নিয়ে একই প্রতিজ্ঞা শোনাতে হবে। হিন্দুর ছেলে হলে গঙ্গাজল ছুয়ে।

প্রতিজ্ঞা-পর্ব শেষে প্রসাদ গ্রহণ। গুরু এবার তার হাতে একটুকরো মন্ত্রপূত গুড় তুলে দেবে। তা মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে নতুন স্বাদ আসবে, একটি সুস্থ সমৰ্থ তরুণের অভিষেক সম্পূর্ণ হবে, সে ঠগী হয়ে যাবে। এবার বাকী শুধু হাতে-কলমে খুনের দীক্ষা।

শিক্ষা আগেই সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। দলের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে মনে মনে খুন বহুদিন রপ্ত হয়ে গেছে। শুধু মনে নয়, চোখেও। নানা ভূমিকায় নানা ভাবে সে তাতে অংশ নিয়েছে। বাকী ছিল শুধু নিজের হাতে রুমাল নেওয়া। এবার হাতে তাই তুলে দেওয়া হচ্ছে।

হয়ত তৎক্ষণাৎ কোন সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে অবশ্যই দু’চার দিন অপেক্ষা করতে হবে। তাছাড়া, নতুন শিকারীর হাতে যে কোন শিকার তুলে দেওয়া যায় না। তার আগে কিছু কিছু বিবেচনার বিষয় আছে। যাত্রীরা যেখানে দলে খুব বড় বা বলবান সেখানে তাকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। যাকে লক্ষ্য করে তাকে ছাড়া হবে সে মানুষটি যদি তুলনায় বেশী জোয়ান বলে মনে হয় তবে সেক্ষেত্রেও তাড়াহুড়ো করে বাড়াবাড়ি না করাই ভাল। তার চেয়ে গুরু অনেক বেশী বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে, যদি সে কোন বৃদ্ধ, দুর্বল বা নিঃসঙ্গ পথিকের অপেক্ষায় আরও ক’দিন সময় চায়।

সেদিন গুরু তার নতুন শিষ্যকে নিয়ে কোন নির্জন বৃক্ষতলে এসে বসাবে। অদূরে আস্তানার সামনে আর একটি গাছের নীচে বসে মাছে দলের অন্যরা। তাদের ঠিক মাঝখানটিতে বসে একজন নিঃসঙ্গ দূরের যাত্রী। হয়ত তিনি বিদেশে কাজ সেরে ঘরে ফিরছেন, হয়ত বা কোন দূর দেশে থাকে তাঁর ছেলে বা মেয়ে, বৃদ্ধ কে দেখতে চলেছেন। ওরা তাঁকে ঘিরে বসে গল্প করছে, তামাক খাচ্ছে। গুরু শিষ্য অলক্ষ্যে দাড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ কা কা করতে করতে একটা কাক ওদের মাথার ওপরে ডাল বদল রিল। সঙ্গে সঙ্গে অনুচ্চ গলায় গুরু চেঁচিয়ে উঠলেন—জয় ভবানী।

বোঝা গেল ভবানীর অনুমতি আছে। সুতরাং আর দেরী নয়, নিঃশব্দে রুমালটা বের করে দু’ভাগে ভাঁজ করল। মনোযোগ দিয়ে তাতে একটা গিঁঠ গড়ে তুলল। তারপর রুমালের এক প্রান্তে দুটো রুপোর টাকা বেঁধে রুমালটা শিষ্যের হাতে তুলে দিল। শিষ্য রে ধীরে শিকারের দিকে এগিয়ে গেল। দলের অন্যরা এতক্ষণ তারই অপেক্ষায় ছিল। একজন ‘ঝিরণী’ নিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতা নিয়ে খুনী ঝাঁপিয়ে পড়ল শিকারের ওপর। আজ তাকে কাঁপলে চলবে না, ভাবলে চলবে না। আজ তার পরীক্ষার দিন। মুহূর্তে বৃদ্ধের প্রাণহীন দেহ টিতে লুটিয়ে পড়ল। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থী রুমালটি হাতে নিয়ে আবার গুরুর সামনে এসে দাঁড়াল। সে গুরুকে প্রণাম করল। তারপর ধীরে ধীরে রুমালের কোণ থেকে টাকাটি খুলে তার হাতে দিল।

এ টাকায় ভোজ হবে। গুড়ের ভোজ।

—এভাবে খুন করতে, এই কাঁচা বয়সে খুন দেখতে ভয় পেতে না তোমরা? জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ফিরিঙ্গীয়াকে। ফিরিঙ্গীয়া উত্তর দিয়েছিল, না, দ্বিতীয় বা তৃতীয় যাত্রায় সাধারণত কেউ ভয় পেত না অবশ্য খারহোরার কথা স্বতন্ত্র।

-খারহোরা আবার কে? ঘটনাটা শোনার জন্যেই আবার প্রশ্ন করেছিলেন বিদেশী রাজপুরুষ ।।

—সে প্রায় বারো বছর আগেকার কথা, ফিরিঙ্গীয়া বলে চলল সেবার আমন সুবাদার আমাদের দলের সঙ্গে ওমরাওয়ের চৌদ্দ বছরে ভাই খারহোরাকেও নিয়েছিল। জীবনে ঠগীর বাচ্চার সেই প্রথম বাইরে বের হওয়া। আমন সুবাদার তার দায়িত্ব দিয়েছিল তার নিজের ছেলে হারসুকার ওপর। সে ওর সমবয়সী হলেও এরই মধ্যে তিন তিনবার আমাদের দুনিয়া ঘুরে ফিরে দেখে গেছে। বাপের হুকুম মত বন্ধুকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে সে তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে।

চলতে চলতে পথে পাঁচজন শিখের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ঠিক হল পরদিন ভোরেই ‘ঝিরণী’ দেওয়া হবে। হারসুকাকে বলে দেয় হল, সে যেন খারহোরাকে সঙ্গে নিয়ে পেছনের দিকে থাকে। এম জায়গায়, যেখান থেকে কিছুই দেখা যাবে না, বড়জোর কিছু কিছু কথাবার্তা শোনা যাবে।

কে জানে ছেলেটির মনে কি করে সন্দেহ ঢুকল, সে চঞ্চল হয় উঠল। ঝিরণী’ কানে আসা মাত্র সে হারসুকাকে পেছনে ফের ঘোড়া ছুটিয়ে একেবারে আমাদের সামনে এসে হাজির। আম তখন নিজেদের কাজে মত্ত। সে দৃশ্য দেখে ছেলেটি ভয়ে থর করে কাঁপতে লাগল। কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়ার পিঠ থেকে সে মাটিতে পড়ে গেল। আমরা ছুটে গিয়ে ওকে ধরলাম। কিন্তু ততক্ষণে ছেলে প্রলাপ বকতে শুরু করেছে। সে কাঁপছে আর বিড় বিড় করে কি যেন সব বকছে। কেউ তাকে ছুলে বা কিছু বোঝাতে গেলে তার কাঁপুনি আরও বেড়ে যায়, সে গলা চড়িয়ে প্রলাপ বকে।

আমন আর আমি ওকে নিয়ে বসে রইলাম। নানাভাবে ওকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু খারহোরার কিছুই যেন কানে পৌঁছাল না। তার প্রলাপের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে লাগল। সন্ধ্যার আগেই সে চিরকালের মত আমাদের দল ছেড়ে চলে গেল। আঃ, একটা ছেলের মত ছেলে ছিল খারহোরা!–বলতে বলতে ফিরিঙ্গীয়ার চোখ ভরে জল এল। সে হাতের উল্টো দিকটায় চোখ মুছতে মুছতে বলল, প্রথম যাত্রায় বহু ছেলেকে ভয় পেতে দেখেছি হুজুর, কিন্তু ঠগীর বাচ্চা কখনও খুনে এমন ভয় পায় তা খারহোরাকে না দেখলে আমি কোনদিন বিশ্বাস করতে পারতাম না। ছেলেটা যেন ওর মধ্যে ছিল না। একদম মায়া নেই বেটার, আমাদের কঁদিয়ে সে চলে গেল।

—আর তার বন্ধু ?

-সে আর কি করবে? হারসুক তার এই দোস্তকে প্রাণের চেয়েও ভালবাসত। সে আর দলে থাকতে পারল না। সেদিনই দল ছেড়ে পালিয়ে গেল। এখন সে বৈরাগী। বিবাগীর বেশে নানা দেশ ঘুরে নর্মদার ধারে এক মন্দির গড়েছে, সেখানেই সে থাকে।

আকাশজোড়া কালো মেঘে এমন রুপালী রেখাও মাঝে মাঝে দেখা যেত বটে, কিন্তু সে দৈবাৎ। সেটা ওদের জীবনের নিয়ম নয়। চিরকালের পিতার মতই ঠগী বাপও আপন সন্তানকে ভালবাসত। স্বামী ভালবাসত স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে ; ছেলেমেয়ে মা-বাবাকে। কিন্তু সে তাদের আপন জগতে। সেখানে ওরা আনন্দে হাসে, দুঃখে কাঁদে ; মানুষ মানুষকে ভালবাসে, ভয় পায়, ঘৃণা করে। কিন্তু সে মানবিক প্রবৃত্তিসমূহ কখনও অচেনা পথের মানুষের জন্যে নয়। সেখানে পঞ্চ শিখের লুষ্ঠিত দেহ দেখে মূছা যাওয়া চৌদ্দ বছরের বালকের পক্ষে স্বাভাবিক জীবন নয়। বন্ধুর জন্যে বিবাগী হয়ে দেশান্তরী হয়ে যাওয়াও প্রতি দিনের ঘটনা নয়। তার চেয়ে অনেক বেশী স্বাভাবিক, অনেক বেশী সত্য পথের অবশিষ্ট ইতিহাস, যেখানে ওরা পিতা-পুত্র, ভাই-বন্ধু, সবাই খুনের নামে আনন্দিত পথিক, অন্তরঙ্গ সহযাত্রী।

দল পথে নামল।

বাড়ী থেকে বের হওয়ার পর প্রথম সাতদিন ওদের মুখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন কোন সাধক দল। আলুথালু বেশ, এলোপাথারি ছাদহীন গোঁফ দাড়ি, ক্লান্ত চোখমুখ। সাতদিন তাদের মাছমাংস বারণ, ক্ষুর কচি হাতে নেওয়া বারণ। তারা শুধু ডাল-তরকারি খাবে, আর গুড়। তাও বাড়ী থেকে বের হওয়ার পরক্ষণেই যদি কারও মাথা থেকে পাগড়ী পড়ে যায়, কিংবা অসাবধানে কারও পাগড়ীতে আগুন ধরে যায়, তবে গোটা দলকে আবার ঘরে ফিরতে হবে; সাতদিন ঘরে থেকে আবার নতুন করে যাত্রা করতে হবে।

পথে নানা রকমের বিধিনিষেধ। যাত্রার আগে একজন পথের মোড়ে গিয়ে দাড়াবে। যদি তখন কোন টিকটিকি ‘টিক’ ‘টিক করে ওঠে কিংবা পথের বাঁ দিকে কোন জ্যান্ত গাছের ডালে বসে কাক ডেকে ওঠে, কিংবা ডাইনে ডালে ঘুঘু অথবা যদি কোন বাঘ চোখে পড়ে যায় তবে যাত্রা শুভ। শুধু শুভ নয়, ঠগী জানবে দুয়ার থেকে অদুরেই মনের মত শিকার মিলবে।

আর যদি দেখা যায় সামনে সাপ কিংবা খরগোস রাস্তা পার হচ্ছে, মরা ডালে বসে কাক ডাকছে অথবা প্যাঁচা, তবে যাত্রা অশুভ। সে ক্ষেত্রে ঠগী মনের মানচিত্রে রাস্তা বদল করবে, সে অন্য রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাড়াবে। সেখানে যদি দেখা যায় কোন গাধা শুয়ে শুয়ে গান গাইছে, কোন শেয়াল জোড়া বেঁধে ডাইনে থেকে বাঁয়ে অথবা বয়ে থেকে ডাইনে রাস্তা পার হচ্ছে, তাহলে তাকে প্রাণীজগত ছেড়ে অন্য কোন উপায়ে পথ-নির্দেশ খুজতে হবে। কোথাও কোথাও সে কাজে ঠগীরা জুয়াখেলার ঘুটির মত এক ধরনের ঘুটি ব্যবহার করত। চৌরাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে তারা ঘুটিগুলোকে একটা কৌটোয় ভরে নাড়িয়ে মাটিতে ফেলে দিত। তারপর তার নিশানা গুনে পথ ধরত।

তবে যতদূর মনে হয়, সর্বত্র এ ব্যবস্থা চালু ছিল না। সাধারণভাবে পশু পাখী ইত্যাদির আচরণই ছিল ঠগীর গণক ঠাকুর, পাঁজিপুথি। সেখানে শুভ-অশুভের বিরাট ফর্দ। শুভ : ডাইনে থেকে বয়ে চলেছে এমন কোন নিঃসঙ্গ শেয়াল, ডাইনে দাড়িয়ে গান গাইছে এমন কোন গাধা ইত্যাদি। অশুভ। পরিবারে কারও জন্ম, মৃত্যু বা বিবাহ হচ্ছে এমন দিনে ঘর ছাড়া, অকালে বর্ষা নামা, বাড়ী থেকে বের হয়েই কোন কুকুরের মুখে নিজেদের বলি দেওয়া পাঁঠার মুণ্ডুটি আবিষ্কার করা ইত্যাদি।

এছাড়াও অনেক নির্দেশ আছে ঠগীর বচনে। যথা :

‘রাতে বোলে তিতওয়ারা

দিন কো বোলে শিয়ার,

তুজ চৌলি ওয়া দেশা,

নৌহিন পুরী আচানুক ধা।

অর্থাৎ রাতে যদি ঘুঘু ডাকে কিংবা দিনে শেয়াল, তবে হে ঠগী, ত্বরিৎ সে মুলুক ছেড়ে যাও, নয়ত সমূহ বিপদ।

—তোমরা কি এসব বচনের সত্যাসত্য পরখ করে দেখেছ ? জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এক ঠগীকে। ১৮৩০ সনের ৭ই অক্টোবর গভর্ণমেন্ট গেজেটে জনৈক পত্ৰলেখকের জবানীতে তার উত্তরটা ছাপা হয়েছিল। ফেনি পার্কাস তার ভ্রমণকাহিনীতে সে ঘটনাটি আবার উল্লেখ করেছেন। জনৈক প্রবীণ ঠগী সেখানে তার নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা বলতে বলতে পথে পথ-সঙ্কেত অমান্য করা প্রসঙ্গে বলছে, তার মর্ম :

ওর জোয়ান বয়সের কথা। সেবার ওরা পঞ্চাশ জনের একটি দল ইন্দোর থেকে ওজিয়া চলেছে। পথে যেখানটায় এসে সন্ধ্যে হল সেখানে কতকগুলো খেজুর গাছ ছাড়া আর কিছু নেই। ওরা সেখানেই যে যার বিছানা পেতে শুয়ে পড়ল। রাত তখন দুটো এমন সময় দলের একজনের কানে এল খেজুরের পাতায় বসে ঘুঘু ডাকছে। সে তক্ষুনি সবাইকে ডেকে তুলে ফেলল। রাতে ঘুঘু! ভয়ে ওদের প্রত্যেকের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তাহলেও বসে চিন্তা করার সময় নেই, দলপতি হুকুম দিল, এক্ষুনি এ জায়গা ছাড়তে হবে !

কোথায় গেল ঘুম, কোথায় বিশ্রাম ! মাঝ রাত্তিরেই ওরা আবার পথে নামল। কিন্তু লাভ হল না। রাত ভোর হওয়ার আগেই ঘুঘুর বচন ফলে গেল। একদল ঘোড়সওয়ার ওজিয়া থেকে ইন্দোরের দিকে যাচ্ছিল। পলায়মান ঠগীর দল তাদের নজরে পড়ে গেল। কিছুতেই তাদের ফাঁকি দেওয়া গেল না। ঘোড়সওয়ারেরা ওদের ধরে আবার ইন্দোর নিয়ে গেল।

দিন কয় আগে ওরা সেখান থেকে এসেছে। আসবার পথে জনাকয় মানুষকে খুনও করেছে। তখন জানা ছিল না যাদের ওরা খুন করে এসেছে তাদের দলপতিটি আর কেউ নন, তিনি স্বয়ং হোলকার পরিবারের এক গুরুদেব। বাদবাকী মানুষগুলো তারই অনুচরবর্গ। গুরুর নিরুদ্দেশের কথা কানে আসা মাত্র হোলকার চারদিকে ঘোড়সওয়ার পাঠিয়েছেন, যেখান থেকে পার, খুনীদের ধরে আনতে হবে। তারা পথে পথে যাকেই পাচ্ছে তাকেই ধরে নিয়ে রাজ সরকারে হাজির করছে। সেদিক থেকে ভয়ের কিছু ছিল না, ওরাও অনায়াসে শেষ পর্যন্ত নির্দোষী সেজেই থেকে যেতে পারত। কিন্তু রাতে ঘুঘুর ডাক! তা আর হল না, ওরা হাতেনাতে ধরা পড়ে গেল। আর ধাও পড়ল এক অদ্ভুত উপায়ে।

গুরুদেবের লটবহরে অন্যান্য জিনিষের মধ্যে একটি পোষ তোতও ছিল। সাধারণত কোন ঠগীর এসব জিনিষে লোভ হয় না। কিন্তু কপালে মরণ লিখেছে, তোতাটা দলপতির মনে ধরে গেল। খাঁচাটা এক পাশে সরিয়ে রাখল।

সেই থেকে পাখিটা তার কাছে কাছেই থাকত। আদর করে জমাদার তাকে খাওয়াত, নিজের বুলি শেখাবার চেষ্টা করত। কিন্তু তোত যেন বোবা! সে কিছুতেই মুখ খোলে না। জমাদার বলত—খুলবে, খুলবে ; দুটো দিন যেতে দাও ।

খুলল বটে, কিন্তু সে একেবারে সেই হোলকারের দরবারে গিয়ে। তার চেঁচামেচি দেখে ওরা স্তম্ভিত। বাড়ীর মেয়েরা পাখিটাকে চিনে ফেলল। তারা সমস্বরে বলল, গুরুদেবের পাখি! ব্যস হয়ে গেল । হোলকারের আদেশে জমাদারসহ দলের পঁয়ত্রিশ জনকে সেদিনই কামানের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হল ।

তারপরও কি বলা চলে রাতে ঘুঘুর ডাক বিফলে যায় ?

একই কাহিনী শোনা গিয়েছিল নাসির জমাদারের মুখে। স্লীম্যান তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমাদের তত পথে অনেক নিয়ম। আচ্ছা, এমন ঘটনা কি মনে পড়ে যখন নিয়ম মাননি বলে তোমাদের কোন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে ?

-হ্যাঁ হুজুর! উত্তর দিয়েছিল নাসির। জেনারেল ডভেটন সাহেব তখন ঝালনায় ফৌজ নিয়ে লড়াই করতে এসেছেন। আমরা সতেরজনের একটি দল তার সিরকির দিকে চলেছি। হঠাৎ দেখি আমাদের সামনা দিয়ে একটা খরগোল চেঁচাতে চেঁচাতে রাস্তা পার হচ্ছে। আমরা একবার ভাবলাম রুখে যাই, আর একবার ভাবলাম, দূর, তার চেয়ে একবার দেখাই যাক না কি হয়। কি বলব হুজুর,এত তাড়াতাড়ি তা দেখতে হবে তখন সে কথা ভাবতেও পারিনি। পরদিন সকালেই আমাদের সতের জনের গোটা দলটি ধরা পড়ে গেল। ভাগ্যিস, দলে কারও সঙ্গে বামাল ছিল না। জিনিষপত্র সব অন্য আর এক দলের সঙ্গে ছিল। তারা অন্য পথে যাচ্ছিল। তাহলেও, ধরা পড়ার ঝামেলা কি কম! আমি বলতে পারি হুজুর, এই ঝামেলা আমাদের পোহাতে হত না, যদি খরগোস দেখে আমরা পিছিয়ে যেতাম !

ঠগী শুধু খুনী নয়, ঠগী এক বিচিত্র বিশ্বাসও। ওদের চারদিক দেখেশুনে পথে নামতে হয়, চোখ-কান খোলা রেখে পথ চলতে হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *