পর্ব ৭
তারই একটি আজও রয়েছে ইলোরায়।।
যদি কেউ আজ ইলোরা গুহায় আসেন এবং মৌন পাহাড়ের গায়ে উৎকীর্ণ সারি সারি মূর্তিগুলোর দিকে ভাল করে নজর করেন, তাহলে একই দৃশ্য দেখতে পাবেন তিনি। অন্তত ঠগীরা নাকি তাই দেখতে পেত।
স্লীম্যান জিজ্ঞেস করেছিলেন, সগরে জনস্টোন নামে এক সাহেবকে নাকি তোমরা বলেছিলে যে ইলোরা গুহায় গেলে তোমাদের কলাকৌশল সব দেখতে পাওয়া যাবে?
ফিরিঙ্গীয়া জবাব দিয়েছিল, হ্যাঁ, সব। এক জায়গায় দেখবেন আমরা ফাঁস পরাচ্ছি। আর এক জায়গায় দেখা যাবে মৃতদেহ কবরে বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, অন্য একটিতে দেখবেন আমরা কবর দিচ্ছি। ঠগীদের এমন কিছু কৃত্য নেই যা ওখানে না আছে।
দুর্গ। বলল, শুধু ঠগীদের কথা বলছ কেন? দুনিয়ায় এমন কোন পেশা নেই ইলোরায় যার নক্সা নেই।
ছোটি সায় দিল ওকে।হা সাহেব, আমরা যখনই ওদিকে যাই, গুহাটা একবার করে দেখে আসি। তাজ্জব ব্যাপার। দুনিয়ার যত গোপন পেশা সব সেখানে চোখের সামনে লিখে রাখা আছে। অথচ গুহাটা তৈরী হয়েছিল এক রাত্রে।
স্লীম্যান হাসলেন –আচ্ছা, তোমরা ছাড়া আর কেউ সেগুলো দেখলে বুঝতে পারবে কি যে মূর্তিগুলো তোমাদেরই ?
ফিরিঙ্গীয় মাথা নাড়ল না, কি করে বুঝবে? আমরা কক্ষনো কাউকে সে কথা বলি না। কেউ বলে না। সবাই নিজ নিজ পেশা দেখতে পায় বটে, কিন্তু কেউ অন্যদের কাছে তা ভেঙ্গে বলে না। আসলে জানেন কি হুজুর, এগুলো মানুষের হাতের জিনিষ নয়, আমাদের সকলের ধারণা, ইলোরা ভগবানের নিজের হাতের সৃষ্টি।
—তোমাদের কোন্ কোন্ কীর্তিকথা খোদাই করা আছে সেখানে? আবার প্রশ্ন করলেন স্ত্রীম্যান। ওদের বক্তব্যটা যথাসম্ভব বিস্তারিত শোনা দরকার।
এবার এগিয়ে এল সাহেব খান।-আমি দেখেছিলাম হুজুর, এক জায়গায় ‘সোথ মুসাফিরদের সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলছে, খাতির জমাচ্ছে, ঠিক আমরা যা করি। আর এক জায়গায় ছিল ‘ভুরতোত’ তার গলায় রুমাল পরাচ্ছে, ‘চামোচি পা দুটি ঠেসে ধরে আছে। আমি সেখানে এই দু’টি দৃশ্য দেখেছিলাম হুজুর !
ফিরিঙ্গীয়া জানাল সে আরও একটি দৃশ্য দেখেছি,-“লুগা’ মৃতদেহ নিয়ে কবরে চলেছে।
এগুলো সবই কল্পকাহিনী এমন কথা নিদ্বিধায় বলা যায় না। কেননা, ডব্লিউ ক্রক তাঁর বিখ্যাত ‘থিংস্ ইণ্ডিয়ান’ (১৯০১) বইয়ে লিখেছেন—ভারতে ঠগীদের অস্তিত্বের সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ ইলোরা। সেখানে নাকি একটি খোদাই করা দৃশ্যে রয়েছে—এক ব্রাহ্মণ শিব পূজায় রত। পেছন থেকে তার ওপরে ফাঁস হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিষ্ঠুর মৃত্যুদূত—ঠগী ; উৎকণ্ঠিত মহাদেব ভক্তকে রক্ষার চেষ্টায় উদ্যত।
ইলোরা সপ্তম শতকের ভারতীয় শিল্পকীর্তি। সুতরাং অনেকের ধারণা, ঠগী ভারতেরই নিজস্ব সৃষ্টি। বিশেষ করে, আমাদের পুরাণের ‘নাগপাশ’ নামক হাতিয়ারটি নাকি তাই প্রমাণ করে।
কিন্তু পরবর্তীকালের ইংরেজ ঐতিহাসিকরা বলেন, সেটা প্রমাণ নয়, অনুমান মাত্র। কেননা, হেরোডটাস এদের পারসিক বলে বর্ণনা করে গেছেন। তার ইতিকথার সপ্তম অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন—এরা আদিতে পারসিক। এদের ভাষা পারসিক, পপাষাক অনেকটা পারসিকদের মত অনেকটা প্যাকটিয়ানদের মত। তবে আসল বৈশিষ্ট্য ওদের হাতিয়ারে। ছোরা ছাড়া ওরা লোহ বা পিতলের কোন অস্ত্র বহন করে না। আসল অস্ত্র ওদের চামড়ার ফিতেয় তৈরী একটি ফাঁস।
হেরোডটাসের মতে এই অদ্ভুত দস্যুদলের আদি পুরুষ হচ্ছেন সাগার্তি, যিনি জারেকসাসকে আট হাজার অশ্বারোহী দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।
পশ্চিমী ঐতিহাসিকরা খুঁজেপেতে সিদ্ধান্ত করেছেন ভারতের ঠগীরাও সেই বিশ্রুত পুরুষ সাগার্তিরই উত্তরপুরুষ। পশ্চিমের মুসলিম বিজেতাদের পায়ে পায়ে তারাও একদিন এই দেশের নরম মাটিতে পা রেখেছিল। তারপর আর দেশে ফেরা হয়নি। কেননা, পরাজিত দেশের আবহাওয়া যদৃচ্ছ জীবনের পক্ষে অনুকূল ছিল। তদুপরি লুণ্ঠনে লুণ্ঠনে রিক্ত হিন্দুস্তানের মৃত্তিকায় শেকড় বিস্তারও কষ্টকর ছিল না। দেশে না ফিরে তারা এখানেই অরণ্য প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয়েছিল।
সুলতানদের সহযাত্রী সেজে এসেছিল বলেই প্রথম দিকে নবাগত ঠগীদের ঠিকানা ছিল রাজধানী দিল্লির আশেপাশে। তুঘলক কুলগৌরব ফিরোজ খাঁর দরবারী ঐতিহাসিক জিয়া-উদ্-বারনি ১৩৬৫ সনে তাঁর তুঘলক কাহিনীতে লিখেছেন-১২৯০ সনে জালালউদ্দীনের রাজত্বকালে দিল্লিতে প্রায় এক হাজার ঠগ ধরা পড়েছিল। ওরা সুলতানের এক প্রিয় দাসকে হত্যা করে বাদশাহের মনে কোপের সঞ্চার করেছিল। কিন্তু বাদশাহী ক্রোধ। দিনান্তে তা মহান্ ক্ষমায় পরিণত হল। সুলতান বললেন, ওদের পেছনে আমার মুদ্রার পাকা ছাপ একে দিয়ে ওদের নৌকোয় তুলে দাও। সে নৌকো যেন পূর্বভারতের লাখনার আগে কোথাও না নোর করে। শোনা যায়, বাংলা দেশের ঠগ সেখান থেকেই সংক্রমিত।
সুলতানী আমলে ঠগীর দ্বিতীয় কাহিনী শোনা যায় সুলতান আলাউদ্দীনের কালে। ১৩০৩ সনে উত্তর থেকে যখন বহিরাক্রমণের প্রবল ঝড়, তখন সেই দুর্দিনে বেপরোয়া সম্রাটের রাজধানী রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল নাকি ঠগীরাই। তাদের নায়ক ছিলেন বিখ্যাত সন্ত নিজামউদ্দীন। তিনিই নাকি সেদিন তাঁর শিষ্যদের সাহায্যে শত্রুপক্ষের মনে বিভীষিকার সৃষ্টি করেছিলেন! কেউ বলেন, সে কাজ করেছিলেন তিনি তার অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার বলে ; কেউ বলেন, সেই রুমালের বলে।
দ্বিতীয় অনুমানটির পক্ষে বলা হয়, দিল্লির বিখ্যাত নিজামউদ্দীন আউলিয়া ঠগীদের কাছে চিরকালের এক স্মরণীয় তীর্থ। দ্বিতীয়ত, আপাতসন্ন্যাসী নিজামউদ্দীন ঐশ্বর্যে তখন দ্বিতীয় সুলতান। লোকে বলত, তিনি ‘দুস্তুল গিয়াব’ বা স্বর্গীয় ভাণ্ডারের সন্ধান জানতেন। ঠগীরা বলত, তিনি যৌবনে ঠগী ছিলেন।
যতদূর মনে হয় এগুলো সবই অনুমান। কেননা, ঠগীদের বিবেচনায় তীর্থ হলেই আঁকে উপলক্ষ্য করে তীর্থ, সেই তীর্থপতিকে ঠগী বলে ধরে নেওয়া যুক্তির দিক থেকে মোটেই সঙ্গত নয়। কেননা, তাহলে শুধু নিজামউদ্দীন নয়, ভারতের আরও কিছু কিছু শ্ৰদ্ধার উপলক্ষ্যকে এই হীন বৃত্তির সঙ্গে জড়াতে হয়। সেটা পুরোপুরি প্রমাণ-নির্ভর নয় বলেই অনুচিত। দ্বিতীয়ত, ভারত চিরকালের সাধুসন্তের দেশ। ট্যাভেনিয়ার লিখেছেন—দু’শ বছর আগে নিজামউদীস কালে ভারতে হিন্দু সাধু সন্ন্যাসী ছিল প্রায় বারো সক্ষ, মুসলিম ফকির দরবেশ আট লক্ষ। ধর্মপ্রাণ হিন্দুস্তানের মানুষ তাদের দানে এদের বাঁচিয়ে রাখতেন। নিজামউদদীন আউলিয়া কি তাঁদের দানে অসম্ভব ?
সুতরাং, নিজামউদ্দীন এবং ঠগীর মধ্যে আত্মীয়তা স্থাপনের চেষ্টা কোন কোন ইংরেজ ঐতিহাসিক করেছেন বটে, কিন্তু তা খুব সারবান নয়। তার চেয়ে বরং ‘দাদাধীরা এবং ঝোরা নায়েকের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কাহিনীটি বহুলাংশে বিশ্বাসযোগ্য।
ঠগীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় জানা গিয়েছিল, ভুরতে উপজাতির নায়ক দাদাধীরা তাদের অন্যতম আরাধ্য। তারা বলে, ধীরা তাদের নায়ক ছিলেন। বিশেষ অনুষ্ঠানে তারা তার আত্মাকে তাদের মধ্যে ফিরিয়ে আনত। মদ খেয়ে তার কাছ থেকে শক্তি ভিক্ষা করত।
ঝোরা নায়েকও তাদের কাছে জনপ্রিয় আদর্শ ছিল। সে ছিল মুলতানি ঠগেদের নেতা। তার আদর্শনিষ্ঠা ঠগীদের মধ্যে প্রবাদের মত ঘুরে বেড়াত। একবার ঝোরা নাকি শুধু তার ভৃত্যকে নিয়ে শিকারের খোঁজে বের হয়েছিল। দেবীর আশীর্বাদে প্রথম দিনেই তার সামনে এসে পড়ল একদল ‘চি’, অর্থাৎ সম্পন্ন পথিক। ঝোরা একাই তাদের ওপর ‘খোমুসনা হল, অর্থাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর ঘোড়ার পিঠে লুঠের মাল চাপিয়ে গাঁয়ে ফিরে এল। বাড়িতে বসে হিসেব করে দেখল, এই এক যাত্রায় আয় হয়েছে তার প্রায় ছাব্বিশ লক্ষ টাকা। ইচ্ছে করলে তার সবটুকুই সে নিজে রেখে দিতে পারত। কিন্তু আদর্শ পুরুষ ঝোর মনে সে পাপচিন্তা ঠাঁই দিল না। সে দলের সবাইকে ডেকে টাকাটা সকলের মধ্যে সমান ভাবে ভাগ করে দিল। এমন মানুষকে ঠগী কখনও না ভজনা করে পারে?
এদের কথা স্বতন্ত্র। আলাউদ্দীনের পর মুসলিম ভারতে ঠগীয় পরবর্তী উল্লেখ পাওয়া যায় সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে (১৫৫৬ ১৬০৫ খ্রীঃ)। সেবার ধরা পড়েছিল পাঁচশ’ এবং সব নাকি এটোয়া জেলায়।
যা হোক, রাজধানী থেকে বিতাড়িত ঠগীরা নানা দলে ভাগ হয়ে সেই সুদূর সুলতানী আমলেই ছড়িয়ে পড়ল নানা দিকে। কয়েকশ বছর পরে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে তাদের তাড়িয়ে তাড়িয়ে আবার এক জায়গায় জড় করতে গিয়ে কোম্পানির কর্মচারীরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছিলেন, সাকুল্যে তাদের আদি গোত্র মাত্র সাতটি। (১) বাহলিম, (২) ভিন্ (৩) ভুজসোত, (৪) কাচুনি, (৫) হুত্তার, (৬) গা এবং (৭) তুনদিল। ভারতে নানা এলাকায় নানা বর্ণের যত ঠগী, আদি তাদের এই সাত পরিবার।
দিল্লির পর এদের মধ্যে পাঁচটি পরিবারই বসতি স্থাপন করে আগ্রায়। অন্য এলাকার ঠগীদের কাছে তাদের নাম—আগুরিয়া। সন্দেহ নেই, সেকারণেই পরবর্তীকালের অযোধ্যায় ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছিল। স্লীম্যান লিখছেনঅযোধ্যায় জনপথ ছিল সাকুল্যে চৌদ্দশ’ ছ’ মাইল। তার প্রতি মাইলে তখন ঠগ। একমাত্র এখানেই পথের ধারে ধারে তাদের ‘বিল’ বা কবরখানা ছিল দু’শ চুয়াত্তরটি !
আর এক দল চলে গেল দক্ষিণে, আর্কটে। তারাই সবচেয়ে বনেদী ঘরানা। অন্য দলের সঙ্গে পোষাকে এবং চাল-চলনে তাদের অনেক ফারাক। আর্কটের ঠগীরা সাধারণত ডোরাকাটা লুঙ্গী পরত, গায়ে দিত কোম্পানির সেপাইদের মত খাটো জ্যাকেট। বাবুয়ানার প্রতীক হিসেবে তাদের প্রত্যেকের হাতে থাকত একগাছ বেতের ছড়ি। রাস্তায় যখন শিকারের খোঁজে নামত তখন প্রত্যেক দলপতির সঙ্গে থাকত নিজস্ব বাবুর্চি, হুকোবরদার এবং নানা শ্রেণীর অগণিত ভৃত্য। ওরা শুধু আপন হাতে রুমাল ধরত। বাকী সব কাজই ছিল মাইনেকরা ভূতাদের দায়িত্ব। তারাই তাঁবু খাটাত, রসুই পাকাত, গরু ঘোড়ার তদারকি করত, মালপত্র বইত। তবে এমন বড়মানুষি সত্ত্বেও উত্তর ভারতের ঠগীদের কাছে আর্কটিদের কোন মর্যাদা ছিল না। হিন্দুস্তানী ঠগীরা বলত, ওরা আসলে খুবই নিচু জাত, ওদের ঘরে আমরা মেয়ে বিয়ে দিতে পারি না।
সপ্তম গোষ্ঠী—মুলতানিরা। তাদের বৈশিষ্ট্য ছিল কোথাও তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করত না। স্ত্রী-পুত্র আত্মীয়-পরিজন সমেত গোটা সংসার গরুর গাড়িতে চাপিয়ে তারা পথে পথেই ঘুরে বেড়াত। দৈবাৎ মর্জি হলে কোথাও হয়ত একখানা গাঁ সাজাত। শ’ খানেক পরিবার একবার হিঙ্গোলিতে তাই করেছিল।
তবে সেটা নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম। মুলতানিদের মধ্যে নিয়ম ছিল— আজ এখানে, কাল সেখানে। বাঘের পেছনে ফেউয়ের মত ওদের সঙ্গে সঙ্গে চলত ব্রিঞ্জারীরা। কেননা, মুলতানিরা তত ধার্মিক’ নয়, সুযোগ পেলে তারা নারীহত্যা তত করেই, শিশু অপহরণের দিকেও তাদের বিশেষ নজর। কেননা, ওরা নাকি তৎকালের বাজার দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সোনা-রূপার চেয়ে তারই বেশী কদর। বিশেষ, শিশুটি যদি কন্যাসন্তান হয় তবে ব্রিঞ্জারীরা কাছেই আছে, তারা তক্ষুনি নগদ প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়ে অপহৃত শিশু কোলে তুলে নেবে। দিল্লি, আগ্রা, লক্ষ্মৌ, হায়দ্রাবাদ, পুনা, লাহোের প্রতিটি নগরের বিলাসপল্লীতে তার বাজার। এসব কারণেই মুলতানিদের একটি শাখা বিবেচকের মত সেদিন ঠগী থেকে পুরোপুরি ‘ম্যাকফানসা হয়ে যেতেও আপত্তির কারণ দেখেনি। ম্যাকফানসাদের প্রতিষ্ঠাতা ঝোরা নায়েক আদতে মুলতানি ঠগীই ছিল।
এই কয় সম্প্রদায় ছাড়াও কিছু কিছু স্থানীয় ঘরানা ছিল ওদের। তাদের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য মালব এবং রাজপুতানার ‘সুসিয়া সম্প্রদায়, অযযাধ্যার ‘জুমালদেহী সম্প্রদায় এবং আদি মুলতানি ‘চিঙ্গুরিয়ারা।
রাজপুতানার সুসিয়াদের পদবী ছিল—নায়েক, থোরি, ইত্যাদি। আর্কটিদের মত তাদেরও বাবুয়ানার খাতির ছিল। দলপতিরা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর বেশে দামী পার্কীতে চড়ে বাণিজ্যে বের হত। কখনও কখনও তারা তৎকালীন পেয়া-বেহারাদের মতও পোষাক করত।
এই বেহারা সে দিনের ভারতীয় ব্যবসা-জগতে একটা বিশিষ্ট সম্প্রদায়। স্থল পথে তখন রেল নেই, অনেক অঞ্চলে ভাল পথঘাট পর্যন্ত নেই। অথচ নিয়মিত যোগাযোগ ছাড়া দূর-দূরান্তের কুঠির সঙ্গে ব্যবসা সম্ভব নয়। সুরাট এক বোম্বাইয়ের ব্যবসায়ীদের এ ব্যাপারে একমাত্র সহায় তখন এই বেহারার। শত শত মাইল পায়ে হেঁটে তার এক রাজ্যের জিনিষ অন্য রাজ্যে মহাজনের গদীতে পৌছে দিত, সেখান থেকে কোমরে টাকা গুজে আবার নিজেদের গদীতে ফিরে আসত। বোম্বাই থেকে জয়পুর, সুরাট থেকে ইন্দো-ওদের পায়ে ভর করে বাণিজ্যের রথ চলত। সততায় এবং বিশ্বস্ততায় পশ্চিম ভারতে এখনও তারা প্রবাদ।
সুসিয়া’রা যেমন কখনও কখনও ওদের সাজে বের হত, অযযাধ্যার ‘দু-হেরা তেমনি আবার মাঝে মাঝে ‘সুসিয়া’দের মত ব্যবসায়ীর সাজ নিত। তখন প্রতি দলের সঙ্গে থাকত চার-পাঁচজন করে বাবুর্চি। মাথায় পাগড়ী, গায়ে ফুলকাটা কামিজ, হাতে বেনারসী তামাকের হুকো। দেখে মুলতানিরা বলত, ওদের দেমাক দেখে চিনে, যেন বাদশা শিকারে চলেছেন। স্লীম্যানকে এক ব্রিঞ্জারী নাকি বলেছিলওদের দেখলে আমাদের কষ্ট হয়, বাব্বা, মাথায় কি বিরাট পাগড়ী, ঠগী নয়, যেন মুটে।
তবে চাল-চলন এবং আচার-ব্যবহারে রকমফের ঘটলেও বিশাল ভারতের বিস্ময়কর অন্তঃপ্রকৃতির মতই তার এই ছন্নছাড়া বেপরোয়া সন্তানদের বৈচিত্র্যময় জীবনের অন্তরালেও ছিল এক অচ্ছেদ্য ঐক্যসূত্র। হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, ‘চিঙ্গুরিয়া হোক আর ‘জুমালদেহী’ই হোক, তারা সকলেই ঠগী। পরবর্তীকালে সীম্যান এবং তার সহচররা হিসেব নিয়ে দেখেছেন—অযযাধ্যার ঠগীদের দশ ভাগের ন’ ভাগই ছিল জন্মসূত্রে মুসলমান, এক ভাগ হিন্দু দেয়াবে হিন্দুর সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানে মুসলমান পাঁচ ভাগের এক ভাগ। নর্মদার দক্ষিণে আবার মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সংখ্যায় তারা প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ। রাজপুতানায় আবার কম, মুসলমান সেখানে মাত্র চার ভাগের এক ভাগ। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা এবং বোম্বাইয়ে দুই সম্প্রদায়ের অনুপাত আধাআধিসমান-সমান। কিন্তু এহ বাহ। ধর্মে তারা যে সম্প্রদায়েরই হোক, তারা ঠগী। কোথাও তাদের নাম‘মুড়ে কোথাও ‘ফাঁসীগীর’, কোথাও ‘আরিতুলুকর, কোথাও ‘তাকালে। কিন্তু যে নামেই লোকে জানুক তাদের সকলেই তারা ঠগী। তাদের হাতিয়ার এক, ভাষা এক, জীবন এক, পেশা এক, ধর্ম এক।
ঠগী-ধর্ম এক অদ্ভুত সমম্বয়বাদ। দু’টি আপাতবিপরীত অপরিচিত এবং দূরবর্তী ধর্ম কোন ঐতিহাসিক কারণে পরস্পরের সংস্পর্শে এলে তাদের নৈকট্য, সংস্পর্শ বা সংঘাত মানুষের ধ্যানের জগতে কখনও কখনও বিস্ময়কর তৃতীয় ভাবনার জন্ম দিয়েছে এমন নজীর ইতিহাসে অজ্ঞাত নয়। ভারতের লৌকিক ইতিহাসেও তার কিছু কিছু দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের যুগ্ম সাধনা ঠগীদের মধ্যে যেমন অন্তরঙ্গ রূপ নিয়েছিল তেমন বোধ হয় আর হয় না।
ঐতিহাসিক যাই বলুন, হাজার হাজার ঠগী আদালতে দাড়িয়ে সগর্বে ঘোষণা করেছে, তারা ‘মা ভবানী বা কালীমাতার সন্তান। তাদের তীর্থ সুদূর বাংলা দেশের কালীঘাট। কালীঘাটের পরে দ্বিতীয় তীর্থ তাদের বিন্ধ্যাচলের ভবানী মন্দির।
দ্বিতীয় মন্দিরটি মীর্জাপুরের কয়েক মাইল পশ্চিমে। বর্ষাশেষে পথের কাজ সেরে দক্ষিণের সমুদয় ঠগ নাকি সেখানে জমা হত। সে খবর শুনেই ফেনি পার্কাস ১৮৪৪ সনে সেখানে গিয়েছিলেন মন্দিরটি দেখতে। ঘোট মন্দির। মিসেস পার্কাস লিখছেন – প্রতিমাটি কালো পাথরে গড়া। বিরাট বিরাট চোখ, চোখের সাদা অংশটুকু রুপোর পাতে ঢাকা।•••মাথার ওপরে সুঁই ফুলের কতকগুলো মালা ঝুলছে। সেগুলো চুলের কাজ করছে।•••সব মিলিয়ে চার ফুট উচু প্রতিমা •••স্বভাবতই ঠগীদের কথা মনে পড়ছিল আমার। কিন্তু মুখে আনতে সাহস হল না। জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে ঝগড়া করা বুদ্ধির কথা নয়! ফেনি তার বইয়ে প্রতিমা এবং মন্দির দুইয়েরই দু’টি ছবি দিয়েছেন।
কিন্তু বিন্ধ্যাচলের ভবানীর চেয়েও ঠগীর কাছে চিরকালের আকর্ষণ কলকাতার কালীঘাট। তারা বলত, তারই আশীর্বাদে, তঁারই আশ্রয়ে তারা রহস্যময় জীবনচারী, অন্ধকারের পথিক। কালীঘাটের জননী তাদের হাতে ফঁাস তুলে দিয়েছেন বলেই তারা ফাঁসীগীর-ঠগী ।
কি করে ভবানীর আশীর্বাদ তাদের মত অভাজনের মস্তকে বর্ষিত হল সে কাহিনীও প্রতিটি ঠগীর মুখস্ত।
: পৃথিবীতে তখন আবির্ভূত হয়েছে মহাদানব রক্তবীজ। তার উপদ্রবে তাবৎ পৃথিবী উৎকণ্ঠিত, সৃষ্টি বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম। জগদম্বা কালী তার সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলেন। কিন্তু রক্তবীজের সামনে তিনিও অসহায়। কেননা, রক্তবীজের প্রতি বিন্দু রক্ত থেকে আবার তৎক্ষণাৎ উৎপন্ন হচ্ছে মহাবলী সব রাক্ষস। ক্লান্ত, বিরক্ত ভবানী স্বভাবতই চিন্তিত হয়ে উঠলেন। সেই পরম মুহুর্তে তাঁর দেহনিঃসৃত ঘর্ম থেকে আবিভূত হল দু’টি অনুচর। তারা মনুষ্য। ভবানী তাঁর করত রুমালটি তাদের হাতে দিয়ে বললেনবৎসগণ, এই তোমাদের অস্ত্র। তোমরা শত্রু নিধনে তৎপর হও। ওরা সেই হরিদ্রা বর্ণের কাপড়ে দুটি ফাঁস তৈরী করল। তারপর মাকে প্রণাম করে রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হল। দেখতে দেখতে রক্তবীজের শেষ বংশধরটিও ধরাশায়ী হল।
ঠগীরা বলে, লড়াইশেষে ভক্ত দু’জন মাকে আবার তাঁর রুমাল ফিরিয়ে দিতে গিয়েছিল। কিন্তু ভবানী বললেন, না বাছা, এই অস্ত্র আমি আর চাই না। রুমাল আমি তোমাদেরই দিলাম, যারা ধর্মে বিপরীত, যারা শত্ৰুকুলের সৃষ্টি, এর সাহায্যে তোমরা তাদের বিনাশ করবে, পৃথিবীকে পরিচ্ছন্ন রাখবে। ঠগীরা আরও বলে, কলিযুগের সূচনা পর্যন্ত মা ভবানী প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সময়ে তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন, অলক্ষ্যে থেকে নিজে তাদের কাজে সাহায্য করতেন। তখন কবরের দরকার হত না, ওরা ফাস পরিয়েই খালাস, মৃতদেহের দায়িত্ব ছিল মায়ের। কিন্তু একদিন এক বেয়াকুফ ঠগী খুনের শেষে হঠাৎ পেছনে তাকাতে গিয়ে অঘটন ঘটাল, ঠগীদের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনল। ভবানী তখন খুন করে রেখে আসা মৃতদেহের ভোগ গ্রহণ করছিলেন। এমন সময় অপ্রত্যাশিতভাবে ভক্তের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যাওয়ায় তিনি যারপরনাই রুষ্ট হলেন। কুপিতা দেবী ভোগ ফেলে উঠে দাড়িয়ে বললেন, এবার থেকে মৃতের দায়িত্বও তোমাদের। ঠগীরা তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে কান্নাকাটি শুরু করল । দেবীর নোযাগ্নি প্রশমিত হল। তিনি আবার প্রসন্ন হলেন। নিজের একখানা দাঁত ওদের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ভাবনার কিছু নেই, এই রইল তোমাদের কোদালি। বুকের একখানা পাঁজর খুলে দিয়ে বললেন, এই রইল তোমাদের ছুরি। কোদাল দিয়ে কবর খুরবে, ছুরি দিয়ে কেটে মৃতদেহ কবরে রাখবে, সব দুর্ভাবনা দূর হবে।
সেই থেকে রুমালের মত কোদাল আর ছুরিও আশীর্বাদপূত হাতিয়ার। এবং সেই থেকে ঠগীরা ভবানী বলতে আরও উন্মাদ।
কৌতূহলী ইংরেজ জানতে চাইলেন, সাহেব খান, তুমি কি মুসলিম?
-আজ্ঞে হুজুর, আমরা দক্ষিণের ঠগীরা প্রায় সবাই মুসলমান।
—তোমাদের দেবী কে?
–আজ্ঞে, মা ভবানী-কালী।
—তোমাদের কি মুসলমানদের নিয়মেই বিয়ে-শাদী পানাহার হয়?
-তোমাদের পবিত্র শাস্ত্রে কি ভবানী নামে কেউ আছেন?
– না
-তবে তোমরা কেন তার ভজনা কর?
-বাঃ, তিনি যে আমাদের দেবী।
নাসির জমাদারকে জিজ্ঞেস করা হল। তারও এক উত্তর। এবার অন্য প্রশ্ন। রাজপুরুষ জানতে চাইলেন—দেবী না হয় আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু তোমরা ভূতপ্রেতে ভয় পাও না? মৃতের আত্মার তোমাদের তাড়িয়ে ফেরে না?
—না। উত্তর দিল নাসির–তারা কখনও আমাদের ঘাটাঘাটি করে না।
-কিন্তু, অন্য মানুষ যখন খুন করে তখন?
-তখন নিশ্চয়ই তাদের প্রেতে উৎপাত করে। নাসির বিজ্ঞের মত জানাল, কখনও কখনও একসঙ্গে পঞ্চাশটা পর্যন্ত আত্মা এসে তাদের উপর হামলা সুরু করে, খুনীরা তখন তাদের তাড়নায় পাগল পর্যন্ত হয়ে যায়।
-তোমরা হও না কেন?
-হব কেন? আমরা কি দেবীর হুকুম ছাড়া কখনও কাউকে খুন করি ? দেবী যাদের পাঠান আমরা কি তাদের ছাড়া আর কারও জীবনে হাত দিই?
কল্যাণ সিং সায় দিল। বলল, দেবী সঙ্গে থাকেন বলেই ভূতপ্রেত আমাদের ধার ঘেঁষে না হুজুর! দুর্গা বলল, তাছাড়া, প্রেত হয় কারা ? যারা নরকে যায়। দেবীর নির্দেশে আমরা যাদের হত্যা করি, তার তক্ষুনি সবাই চলে যায় স্বর্গে, আমাদের ওপর উৎপাত করার তাদের সময় কোথায়?
সকলের মুখে এক কথা–দেবী! দেবী। দেবী!
সুতরাং, ‘জয় ভবানী’—পাতালের এই মন্ত্র নিয়ে শুরু হল ভারতময় হিন্দু-মুসলমানের এক বিস্ময়কর মিলিত সাধনা—খুন, খুন, খুন। রাজস্থানের মরু প্রদেশে, পাঞ্জাবে সিন্ধুতীরে, উত্তরে গঙ্গাযমুনার বিশাল অববাহিকা ঘিরে, দক্ষিণে নর্মদা-গোদাবরী উপত্যকা জুড়ে সমগ্র ভারতের পথে পথে নিঃশব্দ পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার খুনী। বছরের পর বছর, শতকের পর শতক। তাদের কালো কালো শীর্ণ হাতগুলোতে পুরুষানুক্রমিক খুনের অভিজ্ঞতা, তাদের প্রশান্ত চোখের আড়ালে শত শত বছরের সাফল্যের ইতিকথা।
কোম্পানির আমলে সে-ইতিকথা ক্রমেই আরও কলঙ্করঞ্জিত হয়ে উঠেছে। কেননা, বহুকাল পরে ভারত আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। রাজন্যবর্গের স্বাধীনতা অপহৃত হচ্ছে বটে, কিন্তু পথে পথে প্রজার স্বাধীনতা বেড়েছে। নায়কহীন উচ্ছল সে বাহিনীর যদৃচ্ছ লুঠতরাজ ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। দিকে দিকে কোম্পানির শাসন প্রসারিত হচ্ছে। তাছাড়া ফৌজের আনাগোনা হেতু পথের অবস্থারও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। মানুষ এখন আর পথকে ভয় পায় না। ব্যবসায়ীরা ঘোড়ার পিঠে মোট চাপিয়ে বাণিজ্যে বের হচ্ছে, সুদূৰ দক্ষিণ থেকে তীর্থযাত্রীর দল উত্তরে চলেছে, কোম্পানির দরবারে কাজের ধান্ধায় গাঁয়ের গরীব দল বেঁধে শহরের দিকে চলেছে। পথে পথে তখন অনেক মানুষ। স্বভাবতই অনেক ঠগীও। কোম্পানির মশালের আলো ওদের কাছে সেদিন অন্ধকারের ইশারা। আলোর টানে ঘরছাড়া মানুষ নিজেদের অজানতে এগিয়ে যাচ্ছে পথের ধারে ধারে খাটান তাঁবুগুলোর দিকে। গাছতলায় বিছান মাদুরগুলোতে বসছে, তামাক খাচ্ছে, গল্প করছে। দিনের ক্লান্তি তামাকের ধোঁয়ায় উবে যাচ্ছে। সন্ধ্যা মনোরম হয়ে উঠছে। হঠাৎ ক্ষুধার্ত সরীসৃপের মত নিঃশব্দে তাদের ঘাড়ে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ছে নিষ্ঠুর মৃত্যু। প্রতি সন্ধ্যায় শত শত বৃক্ষতলে উচ্চারিত হচ্ছে ভবানীর আদেশ, মৃত্যুপরোয়ানা—তামাকু লেও।
অথচ আশ্চর্য এই, ভারত সে খবর তখনও জানে না। তার নিশ্চিন্ত, উদাসীন, নির্বিকল্প মুখের দিকে তাকালে সে ঘটনা যেন ভাবাও যায় না।
