পর্ব ১২
তার পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত।
স্লীম্যান এগিয়ে এসে ওর পিঠে হাত রাখলেন। চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। কিন্তু সাহেবকে তবু ঠেকান গেল না, ফিরিঙ্গীয়ার হাতের বাঁধন খুলে গেল। ঠগীদের রাজা ফিরিঙ্গীয়া ‘ফিরিঙ্গী ঠগের’ অনুচর হল। সে রাজসাক্ষী হয়ে গেল। সাহেবের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সে পাপস্খলনে নামল। সে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা, অভাবিত যোগ। শিকার আর শিকারী এখন সহচর বন্ধু। সুতরাং, শত শত বছরের ইতিহাস এবার দ্রুত উপসংহারের দিকে এগিয়ে চলল। দেখতে দেখতে কোন যাদুবলে যেন হিন্দুস্তানের প্রশান্ত মুখ থেকে সেই কালো কালো দাগগুলো মিলিয়ে গেল।
আজকের মত দেশে তখন রেল নেই, তার নেই। ডাক তখনও ঘোড়ার পিঠে, বেন্টিঙ্কের প্রিয় সুপারিন্টেন্টে জেনারেল কখনও উটের পিঠে, কখনও গরুর গাড়িতে, কখনও পাল্কীতে। অথচ কাজের এলাকা তাঁর হাজার হাজার বর্গমাইল। তারই মধ্যে অসাধ্য সাধন করলেন ‘ফিরিঙ্গী ঠগ। দশ বছর পরে, ১৮৪০ সনে হিসেব বের হলে দেখা গেল, তাঁর হাতে ধরা পড়েছে মোট তিন হাজার ছ’শ উননবই জন ঠগ। তার মধ্যে ফাঁসী হয়েছে ৪৬৬ জনের, দ্বীপান্তরী হয়েছে ১৫০৪ জন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে ৯৩৩ জনের, রাজসাক্ষী হয়েছে, ৫৬ জন, রোগে-শোকে মারা গেছে ২০৮ জন এবং পালিয়ে গেছে ১২ জন।
যারা পালিয়ে যেত দু’দিন পরেই আবার তারা ফিরে আসত। স্লীম্যানের জাল থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। ১৮৩৪ সনে অদ্ভুত উপায়ে জব্বলপুরের কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়েছিল সাতাশ জন। মাসের পর মাস চেষ্টায় মেঝের পাথর গুড়িয়ে সেই ধুলো তেলে-ভেজা সুতোয় মাখিয়ে মাখিয়ে তৈরী হয়েছিল তাদের করাত! সেই সুতোর করাতে লোহার গরাদ কেটে রাতের অন্ধকারে মিশে লাফিয়ে পড়েছিল ওরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তবুও পালান হয়নি ওদের। ক’মাস পরে কয়েক শ মাইল দূরের এক গ্রাম থেকে স্লীম্যান আবার জব্বলপুরের পুরানো ঠিকানায় ফিরিয়ে এনেছিলেন ওদের। তাঁকে ফাকি দিয়ে কোন ঠগীর পক্ষে পালিয়ে থাকা আর সম্ভব নয়। ঠগীদের সম্ভাব্য ঠিকানাগুলোও তখন তার মুখস্ত। তিনি লিখছেন (১৮৪৩) :
তামাম ভারতে অতঃপর যদি কোথাও ঠগী থেকে থাকে তবে তা থাকা সম্ভব একমাত্র পূর্ববঙ্গে। আমার ধারণা, সেখানে ওরা এখনও কিছু কিছু আছে। সম্প্রতি মেদিনীপুর এলাকায়ও ক’টি বিক্ষিপ্ত উপনিবেশ আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে তার জন্যে ভাবনা নেই। ক্যাপ্টেন ভ্যালান্স এবং মিঃ ইউয়ার্ট তার দায়িত্ব নিয়েছেন। যতদূর মনে হচ্ছে, অযোধ্যা আর পূর্ববঙ্গ বাদ দিলে আমার সামনে কর্মক্ষেত্র এখন কটক জেলা। তবে সেও কয়েকদিনের মামলা!
সত্যিই তাই। জীবনের তুলনায় ঠগীদের মরণের কাল খুবই কম, দীর্ঘ ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়টুকু বোধহয় সত্যিই ‘কয়েকদিনের বেশী নয়।
পরবতী সাত বছরে (১৮৪০-৪৭) ধরা পড়ল আরও পাঁচশ একত্রিশ জন। তাদের মধ্যে সীকাঠে নজরানা দিল ৩৫ জন, দ্বীপান্তরী হল ১৭৪ জন, যাবজ্জীবনের জন্য কারাগারে নিক্ষিপ্ত হল ২৬৭ জন এবং রাজসাক্ষী হয়ে ফিরিঙ্গীয়ার পথে প্রায়শ্চিত্তে নামল ৪৬ জন। ২ জন সেবারও পালিয়ে গিয়েছিল।
পরের বছর (১৮৪৮) ধরা পড়ল একশ’ কুড়িজন। তাদের মধ্যে ৫ জনের ফাসী হল, ২৪ জন দ্বীপান্তরী হল, ১১ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হল, ৯ জন রাজসাক্ষী হল এবং অবশিষ্টরা কেউ ছাড়া পেল, কেউ স্বল্পমেয়াদী কারাবাসের সাজা পেল।—ব্যস, শত শত বছরের কলঙ্কময় নিষ্ঠুর ইতিহাস অতঃপর সেখানেই শেষ। ঠগী— বিশ্বের নিপুণতম, দুর্ধর্ষতম, হিংস্রতম খুনী হিন্দুস্তানের ঠগী তারপর থেকে সত্যিই ইতিহাস।
তারপরও অবশ্য মাঝে মাঝে শোনা যেত তাদের কথা। এমনকি বহু পরে, ১৮৫৩ সনেও পাঞ্জাবে ধরা পড়েছিল একটি দল। ধরেছিলেন ঠগী স্লীম্যানের পুত্র ষোড়শ লাইট ড্রাগুন-এর তরুণ সৈনিক হেনরী আর্থার স্লীম্যান। কিন্তু সে নেহাতই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ঠগী তখন প্রধানত লোকমুখেই বেঁচে আছে মাত্র।
আজও তা আছে। তবে ভারতের পথে-প্রান্তরে নয়, সেই ভয়াবহ নামটি আজ একটি অর্থপূর্ণ শব্দ মাত্র। কখনও তা শোনা যায় নাৎসীদের বিশেষণ হিসেবে চার্চিলের মুখে, কখনও শিকাগোর কুখ্যাত গ্যাংস্টারদের বিকল্প পরিচয় হিসেবে মার্কিনী কাগজে, কখনও বিলিতি গল্প-উপন্যাসে, কখনও বা কোন শব্দের মানে খুঁজতে গিয়ে খাস অক্সফোর্ড ডিক্সনারীর পাতায়। এমনকি কলকাতার নগর কোতোয়ালদের সর্বশেষ রিপোর্টর পাতায় পর্যন্ত। যদিও সুদূর ১৯০৪ সনে পাকাপাকিভাবে ঠগী-দমন বিভাগের উচ্ছেদ হয়ে গেছে, তবুও চোর ডাকাত ইত্যাদি অপরাধীর তালিকায় পুলিশের খাতায় ঠগী এখনও বেঁচে আছে। তবে সেও একটি শব্দ মাত্র। ঠগীর ইতিহাসে চূড়ান্ত যবনিকা টানা হয়ে গেছে সেদিনই, ‘ফিরিঙ্গী ঠগ’ স্লীম্যান যেদিন সগরের সেই সাদা বাংলোটায় বসে মোমের আলোয় তার শেষ রিপোর্ট লিখছেন।
১৮৪০ সনের আগস্ট মাসে নিজামবাহাদুরের এক প্রভাবশালী সামন্ত মাথা হেঁট করে লিখেছিলেন—তাজ্জব হলাম সাহেব, তোমরা যাদুকর। অভিযানের সূচনায় তিনি ছিলেন স্লীম্যানের অন্যতম প্রতিবাদী, সাহেবের এই ঠগ ঘাটাঘাটিতে একদম মত ছিল না তাঁর। কিন্তু ৪০ সনের রিপোর্ট পড়ে মত বদলাতে হয়েছিল তাকে। নিজেই তিনি এগিয়ে এসেছিলেন সাহেবকে অভিনন্দন জানাতে-সাহেব, তুমি প্রেরিত পুরুষ!
১৮৫১ সনের ১৭ই জুলাই তারিখে ‘বেঙ্গল ক্ৰনিক্যাল’-এর পাতায় আবির্ভূত হলেন এক বেনামী পত্ৰলেখক। সকলের হয়ে তিনি লিখছেন—স্লীম্যান, তুমি যা দেখালে সে অবিশ্বাস্য ! এর চেয়ে অনেক সহজ ছিল সিন্ধু বা পাঞ্জাব বিজয়। ঠগীদমন, পেশুকে সাম্রাজ্যভুক্ত করার চেয়েও অনেক অনেক বেশী কঠিন কাজ। ভারতের ইতিহাসের আর সাধ্য নেই কোনদিন তোমাকে ভোলে! ৫৩ সনে উত্তর দিলেন লীম্যান : আমি এমন বলব না, ভারতে আজ আর একজনও ঠগী নেই। চলতে চলতে কোন পথিক হয়ত আজও হঠাৎ উধাও হয়ে যেতে পারেন, কিন্তু নিঃসন্দেহে তা হবে কোন একক, বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সুসংগঠিত দল হিসেবে ঠগী আজ অতীতের কাহিনী। ওদের আর কোন দল নেই, ভবিষ্যতে কোন দিন আর তা হবে না। কোন ঠগী আর কোনদিন তার পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত বিদ্যাকে পেশা হিসেবে আপন সন্তানের হাতে তুলে দিতে পারবে না। এদেশের জন্যে আমরা যদি আর কিছু না করে থাকি, তবে এই একটি ভাল কাজ অবশ্যই করেছি।
কথাগুলো স্লীম্যান বলতে পেরেছিলেন, কারণ শুধু ঠগীদমন নয় ঠগীদের পরবর্তী স্বাভাবিক জীবনের ভিত্তিটুকুও তিনিই আপন হাতে রচনা করেছিলেন। তার মানবিক হাতের স্পর্শেই তখন তাদের অন্য পোষাক, অন্য পরিচয়। কখনও দেখা যেত স্লীম্যান দাড়িয়ে দাড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন আর ঠগীরা পথের ধারে চারাগাছ বসাচ্ছে। গতকাল অবধিও বিনাশ ছিল যাদের ধর্ম, তারা পরম যত্নে মাটি তৈরী করছে, চারাগাছের গোড়ায় জল দিচ্ছে। নর্মদার ঝাঁসী-ঘাট থেকে গঙ্গাতীরের মীর্জাপুর পর্যন্ত ছিয়াশী মাইল পথের দু’ধারে যত গাছ সব ঠগীদেরই হাতে বসান। “ফিরিঙ্গী ঠগ তাদের ধহরণ করেই নিশ্চিন্ত ছিলেন না, তিনি তাদের নবধর্মে দীক্ষিত করে দিয়ে গিয়েছিলেন স্বাভাবিক মানুষের ধর্ম। ১৮৪৭ সনে জব্বলপুরের কর্মশালায় উকি দিলে দেখা যেত, যে হাত ক’দিন আগেও ফঁসীর রুমাল ছাড়া আর কিছু ধরতে জানত না, নিপুণ হাতে ঠকঠক তাঁত চালাচ্ছে তারাই। ঠগী-বৌ মোম গড়ছে, প্রদীপের জন্যে পলতে বানাচ্ছে। ঠগীর ছেলে কেতাব পড়ছে, হাতের কাজ শিখছে।
এই শিল্প-বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ১৮৫৮ সনে। জনক‘ফিরিঙ্গী ঠগ’ স্লীম্যান। পরিকল্পনাকারী—ক্যাপ্টেন চার্লস ব্রাউন। পরিচালক মিঃ উইলিয়ামস। সেখানে তখন (১৮৪৭) মেয়ে-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় সাড়ে আটশ’ ঠগ। তাদের কেউ পাহারাদার, কেউ কারিগর। স্লীম্যান নিয়ম করেছিলেন, যারা রাজসাক্ষী হয়েছে কিংবা যারা ফাঁসীকাঠে জীবন দিয়েছে তাদের পরিবার-পরিজনদের আবার সংসারের মুক্ত অঙ্গনে ফিরে যাওয়ার আগে প্রত্যেককে এখানে কিছুকাল কাটিয়ে যেতেই হবে। জীবিকার অজুহাতে কাউকে তিনি ভবিষ্যতে আবার পুরানো পথে ফিরে যেতে দিতে রাজী নন। সংসারের জন্যেও একটি নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর আদেশ ছিল, নতুন করে পরিচয় অর্জনের আগে কোন ঠগীর সন্তান বিয়ে করতে পারবে না। তিনি চান না হিন্দুস্তানের কোন মানুষ ভবিষ্যতে বলুক আমি ঠগীর ছেলে, বাবা আমার ঠগী ছিল।
ওরা প্রথম প্রথম আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু দু’দিন বাদেই হাতে নগদ পয়সার স্পর্শ পাওয়া মাত্র সব আপত্তি দূর হয়ে গেল। মন্ত্রপূত কোদাল আর রুমালের কথা ভুলে পুরানো জমাদার কার্পেটে ফুল ফোটাবার সাধনায় মত্ত হল। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন স্লীম্যান । তারই নির্দেশে, তারই নকশার ছক ধরে তৈরী হচ্ছে এই বিরাট কার্পেট। শেষ করতে পারলে লম্বায় সেটি হবে আশী ফুট, চওড়ায় চল্লিশ ফুট। এ কার্পেট বিলেত যাবে। মহারাণীর খাস কামরার শোভা হয়ে থাকবে। ঠগীদের সম্পর্কে তাঁর প্রবল আগ্রহ। মিস টেলারের ‘জনৈক ঠগীর জবানবন্দী’র প্রথম পাঠিকা তিনি। বই ছাপা হওয়ার আগে প্রুফ কপি’পড়তে পড়তেই নাকি তন্ময় হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। স্লীম্যান দেখাতে চান শুধু খুনের দক্ষতায় নয়, ইচ্ছে করলে ঠগীর হাত মহারাণীকে ফুলের নক্সায়ও সমান তন্ময় করে তুলতে পারে!
তাই করেছিল।
মহারাণী ভিক্টোরিয়ার সেই প্রিয় কার্পেটখানা আজও রয়েছে উইণ্ডসর ক্যাসেলের ওয়াটারলু চেম্বারে। ওজনে সেটি প্রায় দুই টন। পশ্চিমে হিন্দুস্তানের ঠগীদের অন্যতম স্মৃতি এই কার্পেট। ঠিক তেমনি পুবের চোখে ‘ফিরিঙ্গী ঠগের সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতি আজ মধ্যপ্রদেশের একটি গ্রাম। সেখানে গাঁয়ের মন্দিরে স্লীম্যানের নামে আজও প্রতি সন্ধ্যায় একটি পিতলের প্রদীপ জ্বলে।
সেবার এমেলিকে নিয়ে গ্রামে বেড়াতে এসেছেন স্লীম্যান। সুযোগ পেলেই তিনি তা করেন—চাষীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের খান-পান, আচার-ব্যবহার এবং রীতিনীতি বিষয়ে খোঁজ খবর করেন। কিন্তু সেবার রীতি পাল্টে গেল, গাঁয়ের লোক সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ওঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারা খবর রাখে সাহেব বিয়ে করেছেন আজ চার বছর, কিন্তু আশ্চর্য, মেমসাহেবের কোলে তবুও কোন সন্তান নেই কেন?
সহানুভূতিশীল পুরোহিত বললেন-সাহেব, অনুগ্রহ করে তুমি এক কাজ কর, মেমসাহেবকে নিয়ে তুমি আমাদের মন্দিরে চল। এ মন্দিরে যারা পুজো দেন, মা ষষ্ঠীর অশেষ করুণা তাদের ওপর, বছর ঘুরে না আসতে তারা পুত্রবতী হন।
কৌতূহলী দম্পতি হেসে মন্দিরের দিকে পা বাড়ালেন। যথারীতি পুজো-আর্চা হল। স্লীম্যান বললেন, আশীর্বাদ যদি ফলে তবে আমি এ মন্দিরের দৈন্যদশা ঘুচিয়ে দেব ; মালগুজারকে বলে রেখো এর সংস্কার করতে যা খরচ হবে আমি তা বহন করব।
সত্যি সত্যিই বছর ঘুরে না আসতে এমেলির কোলে এল ওঁদের প্রথম সন্তান, হেনরী আর্থার ! স্লীম্যান কথার খেলাপ করলেন না। স্ত্রীকে নিয়ে আবার তিনি সেই গাঁয়ে চললেন।
মন্দির সারাই হল । শুধু মন্দির নয়, সাহেবের হাতের স্পর্শে গোটা গাঁয়ের চেহারা পাল্টে গেল। সরকার থেকে ছিয়ান্নব্ই একর ফসলী জমি জোগাড় করলেন ফ্লীম্যান। ভূমিহীনদের মধ্যে তা বিলি করা হল। গোটা গায়ে ‘ধন্য’ ‘ধন্য’ রব উঠল। গাঁয়ের মানুষ এক হয়ে ঘোষণা করল -আজ থেকে এই গ্রামের নাম রইল—স্লীমেনাবাদ। যতদিন হিন্দুস্তান থাকবে ততদিন তার মাটির বুকে একটি গ্রামের ঘরে অন্তত বেঁচে থাকবে সগরের এই সাহেব। দুনিয়া জানবে, হিন্দুস্তান শুধু ঠগীদের দেশ নয়, তাদের যিনি উচ্ছেদ করতে নেমেছেন এদেশের মানুষ তাকেও ভালবাসে! গায়ের মন্দিরে সেদিন সন্ধ্যায় একটি মঙ্গলদীপ জ্বালান হয়েছিল। স্লীমেনাবাদ ঘোষণা করেছিল – যতদিন এই মন্দির থাকবে ততদিন প্রতি সন্ধ্যায় এই শিখাটিও জ্বলবে। স্লীমেনাবাদে আজও তা জ্বলে। এ মঙ্গলদীপ শুধু ‘ফিরিঙ্গী ঠগী’র উদ্দেশ্যে ভারতের প্রণতি নয়, এ শান্তি-প্রদীপ ঠগী-মুক্ত ভারতের প্রতীক। ভারতে আর ঠগী নেই। বোসন জমাদার, রুস্তম খাঁ, এনায়েৎ, দুর্গা, কল্যাণ সিং, ফিরিঙ্গীয়া, কেউ আর বেঁচে নেই। যদি থাকত তবে দমকা হাওয়া হয়েই হয়ত ওরা একদিনের জন্যে হলেও সেই শিখাটিকে নিভাতে চেষ্টা করত। কিন্তু ঠগীর সেই শেষ বাসনার কাহিনীও আজ ইতিহাস।
১৮৫৬ সনে দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছরের কর্মজীবন শেষে ভারত ত্যাগের মাত্র কয়মাস আগের কথা। স্লীম্যান তখন আর সগরের সেই তরুণ ‘ফিরিঙ্গী ঠগ’ নন, তিনি পরিণতবয়স্ক প্রবীণ রাজনীতিক। ঠগীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অতি অল্প। ১৮৩৮ সনে তিনি সুপারিন্টেন্ডেন্ট জেনারেলের পদ থেকে কমিশনার হয়েছিলেন বটে, কিন্তু ১৮৪৮ সন থেকে আবার তিনি পাকাপাকিভাবে রাজনৈতিক আসনে ফিরে এসেছেন। কেননা, দেশে আর ঠগী নেই। বাধক ডাকাতেরাও অবলুপ্তপ্রায়। অতঃপর পুরানো চেয়ারে বসে থাকার অর্থ, মিছিমিছি সময় এবং শক্তির অপচয়। তবুও নজর রাখা প্রয়োজন। সে দায়িত্ব নিয়ে সুপারিন্টেন্ডেন্টের আসনে বসেছেন তার প্রিয় ভাইপো কর্ণেল জেমস স্লীম্যান। বুন্দেলখণ্ডে গভর্ণর-জেনারেলের আপন প্রতিনিধি বিখ্যাত উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যান এখন ( ১৮৪৯) লাখ্ন্যৌর রেসিডেন্ট। অযোধ্যার বর্তমান এবং ভবিষ্যত চিন্তা ছাড়া তার যদি আর কোন নেশা থেকে থাকে তবে সে নৃতত্ত্ব। তিনি প্রমাণ করতে চান, পাঞ্জাবের দলীপ সিং আর কেন্টের নাইটের আদিতে এক। ঠিক তেমনি হিন্দুস্তানের জাঠ আর জুটল্যাণ্ডের জুটরাও রক্তে অভিন্ন। সবাই তারা খাসগড়ের লোক! এসব নির্দোষ গবেষণা ছাড়া অসুস্থ ক্লান্ত স্লীম্যানের এখন আর কোন নেশা নেই। তিনি তখন মনে মনে ভারত থেকে বিদায় নিয়ে ফেলেছেন। আর ক’মাসের মধ্যেই তিনি এদেশ ত্যাগ করছেন।
প্রতিদিনের অভ্যেসমত সেদিনও বারান্দায় স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের সঙ্গে সন্ধ্যা কাটিয়ে নিজের ঘরে ঢুকছেন প্রবীণ রেসিডেন্ট। তার একটা হাত অবশ হয়ে গেছে, চোখে আলো কম। চারদিকে ঘন অন্ধকার। তবুও কি মনে করে হঠাৎ দরজার কাছে এসেই বাঁ হাতে এক ঝটকায় ভারী পর্দাটা সরিয়ে ফেললেন তিনি। সঙ্গে ছিল কন্যা এলিজাবেথ। সে সভয়ে দেখল, ছোরা হাতে একটি লোক দাড়িয়ে।
-তুমি ঠগী ! বহুকাল ভুলে যাওয়া রামসীতে গর্জন করে উঠলেন স্লীম্যান। আরও দু’বার আততায়ীর মোকাবেলা করতে হয়েছে তাঁকে। তিনি জানতেন, সেই দু’জনের কেউ-ই ঠগী ছিল না। ওরা ছিল রাজনৈতিক খুনী। কিন্তু এবার আর চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না তাঁর। রামসী’তেই ধমকে উঠলেন তিনি—ছোরাটা আমার হাতে দাও।
আশ্চর্য, মন্ত্রমুগ্ধের মত লোকটি ছোরার হাতলটা ধীরে ধীরে স্লীম্যানের দিকে বাড়িয়ে ধরল। হাতিয়ারটা হাতে নিয়ে বাইরের দিকে অঙ্গুলি দেখালেন স্লীম্যান-যাও, এদেশে যেন আর কোনদিন তোমার মুখ না দেখা যায় !
লোকটা সেলাম করে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর নিঃশব্দে অন্ধকারে মিশে গেল।
সম্ভবত সে-ই ভারতের শেষ ঠগী। অন্তত সীম্যান তাই বলেছিলেন। ভয়ার্ত এলিজাবেথের কানে কানে ‘ফিরিঙ্গী ঠগ’ বলেছিলেন-মাকে বলার দরকার নেই, এই বেচারাই হিন্দুস্তানের শেষ ঠগী!
.
পরিশিষ্ট
ঠগী বিষয়ে ইংরেজী ভাষায় অনেক পুথি-পত্র রয়েছে। তার প্রায় সব কটিরই উৎস স্লীম্যানের নিজের লেখা বই এবং রিপোর্টগুলো। স্লীম্যান অনেক বইয়ের গ্রন্থকার। তার ঠগী সম্পর্কিত রচনাগুলির নাম-Ramaseeana or A Vocabulary of the Peculiar language used by the Thug Gangs of Upper and Central India (1836); A Report on the System of the Megpunnaism iu Delhi and Native States…etc.(1839); Papers on Thuggee ; Report on the Tusma Baz Thugs; Report on the Depredations committed by the Thug Gangs of Upper and Central India (1840) g: Illustrations of the History and Practice of the Thugs. শেষোক্ত বইটি নানা রিপোর্ট এবং জবানবন্দীর সংকলন। সংকলক-Edward Thorntoin। এতে জলের ঠগীদেরও কয়েকটি কাহিনী আছে। Papers on Thuggee বইটিতে ঠগীদের কুলপঞ্জী এবং তাদের চলাচল পথের মানচিত্রগুলো অন্যতম আকর্ষণীয় উপাদান। এছাড়া আর একটি আকর্ষণীয় গ্রন্থ বিখ্যাত Rambles and Recollections of an Indian Official ( প্রথম প্রকাশ ১৮৪৪, অক্সফোর্ড সংস্করণ, Ed. V. Smith, 1915 )। দুই খণ্ডে সম্পূর্ণ এই বইটি বোন মেরী ফার্স-এর কাছে লেখা (১৮৩৬ ) চিঠির ভিত্তিতে রচিত। তার প্রতিপাদ্য বিষয় কেবলই ঠগী নয়। কিন্তু ঠগ স্লীম্যানের লেখা বলেই ঠগীরাও সেখানে অনুপস্থিত নয়।
ঠগী-ধর্ম এবং তাদের আচার সম্পর্কিত সমসাময়িক আর একটি উল্লেখযোগ্য বই-Tribes and Castes of central India, -R. V. Russel & Lall; সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ঠগীদের বিষয়ে লিখিত সমসাময়িক এবং পরবর্তীকালের বইগুলোর 1641 A Popular Account of the Thugs and Dacoits (1857)- James Hutton ; Some Records of Criine-General Hurvey এবং স্লীম্যানের পৌত্র কর্নেল স্যার জেমস স্লীম্যানের লেখা-Thug, or A Million Murders. তিনি হিসেব করেছেন, তিনশ’ বছরে ঠগীরা অন্তত দশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। হিসেবটার মধ্যে হয়ত কিছু বাড়াবাড়ি আছে, কিন্তু সংখ্যাটা যে তার কাছাকাছি কিছু হবে সে বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। কেননা, বরহাম স্বীকার করেছিল, তার চল্লিশ বছরের কর্মজীবনে সে হত্যা করেছে ৯৩১ জনকে। আর একজন, ফুলি খাঁর কুড়ি বছরের কর্মজীবন তল্লাস করে পাওয়া গিয়েছিল ৫০৮ জন!•••স্লীমেনাবাদের মন্দিরটি সম্পর্কে একটি কৌতূহলোদ্দীপক খবর দিয়েছেন জেমস স্লীম্যান। তিনি লিখেছেন-ঠাকুমা এমেলির পরে ( এমেলি স্লীম্যান দেহত্যাগ করেন ১৮৮২ সনে) যখনই আমাদের পরিবারের কেউ সে মন্দিরে গিয়েছেন, তিনিই এক বছরের মধ্যে পুত্রবতী হয়েছেন!
সমসাময়িক ভারতের বিবরণের জন্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য Wanderings of a Pilgrim in Search of Picturesque (1858) Fanny Parkes। তাঁর বইয়ে বিন্ধ্যাচলের মন্দির, প্রতিমা এবং ঠগীদের পথ-নির্দেশক ঘুটির চিত্র আছে (vol. I, Chap. xv দ্রষ্টব্য)। ফেনী গভর্নমেন্ট গেজেটের যে চিঠিটি উদ্ধৃত করেছেন, তা হালে (১৯৫৯) প্রকাশিত অনিলচন্দ্র দাসগুপ্ত সম্পাদিত The Days of John Company – Selections from Calcutta Gazette, 1824-1832-তেও রয়েছে। এছাড়া আরও ক’টি প্রয়োজনীয় বইয়ের মধ্যে আছে—Recollections (1852)-Lady Login ; History of British India – Edward Thornton ; Administration of the East India Company – John William Kaye ; India, it’s Administration and Progress-Sir John Stratchy ; এবং Dr. H. H. Spry লিখিত Modern India ( 1837 )। শেষোক্ত বইটির গ্রন্থকার স্লীম্যানের আত্মীয়। তিনি জবলপুরে ঠগীদের জেলে চিকিৎসক ছিলেন। স্লীম্যানের সঙ্গে তিনিও একাধিকবার ‘বিল’-এ কবর খোড়া দেখেছেন।
ঠগীদের আদি ইতিহাস সম্পর্কে স্লীম্যান হেরডটাস এবং থিভেনটের ( Travels, Jean de Thevenot – 1684) উল্লেখ করেছেন। অন্যরাও প্রাচীন ইউরোপীয় সূত্র বলতে এই দু’জনকেই উদ্ধৃত করেছেন। আমার চোখে আর একজন প্রাচীন সাক্ষী ধরা পড়েছেন। তিনি বিখ্যাত ভ্রমণকারী ফ্রেইয়ার। ঠগীদের কথা তার বিবরণেও রয়েছে। (দ্রষ্টব্য : A New Account of East India and Persia (1909 ), vol. I, p. 244-5)। এই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য বিষয়, স্লীম্যান এলাহাবাদে থাকা কালে ডাঃ শেরউডের যে রিপোর্টটি আবিষ্কার করেন, সম্ভবত সেটি Asiatic Researches-এর একটি খণ্ড। তার ১৩ সংখ্যক খণ্ডে ( ১৮২০ ) ভাঃ শেরউড-লিখিত On the Murderers called Phansigars’ ছাড়াও Oservations Regarding Bradheks and Thegs’ নামে আরও একটি মূল্যবান রচনা আছে। লেখক-J. Shakespear.
প্রসঙ্গত ভিনসেন্ট স্মিথের যে উক্তিটি উদ্ধত করা হয়েছে, তার কথাও উল্লেখযোগ্য। মোগলযুগের পর ভারতের অবস্থার বিবরণ দিতে গিয়ে স্মিথ (Oxford History of India, Book VIII, Chap. 1, p. 573- ) বৈরাগী, পিণ্ডারি, সন্ন্যাসী ইত্যাদির সঙ্গে ঠগীদের একাকার করে ফেলেছেন। সমসাময়িক পটভূমির চিত্র হিসেবে এই অধ্যায়টি মূল্যবান হলেও মনে রাখা দরকার, ঠগী এবং অন্যরা এক নয়। বিশেষত, উত্তর বাংলার সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাদের কোন মিল নেই। সন্ন্যাসীরা আজ স্বাধীনতার কামনায় জাতীয়তাবাদী যোদ্ধাদল হিসেবে স্বীকৃত। (দ্রষ্টব্য : বঙ্কিম শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত সাহিত্য পরিষদ সংস্করণ (আষাঢ়, ১৩৪৫) আনন্দ মঠে যদুনাথ সরকার লিখিত ভূমিকা)। ঠগীদের মনে সন্ন্যাসীদের মৃত কোন অস্পষ্ট জাতীয়তার আদর্শও ছিল না। তারা কখনও কোন ইংরেজকে হত্যা করত না।
স্লীম্যানের জীবনীর জন্যে অবশ্যপাঠ্য ‘The Yellow Scarf ( 1961)-Lt. General Sir Francis Tuker। এতকাল স্লীম্যানের কোন পূর্ণাঙ্গ জীবনী ছিল না। স্যার ফ্রান্সিস লিখেছেন, তার সমসাময়িকরা সকলেই স্বজাতির মধ্যে জীবনীকার খুজে পেয়েছেন, কিন্তু স্লীম্যান সেদিক থেকে দুর্ভাগা। তার একটি কারণ ’… he never paraded his success before those who might have honoured him.’ দ্বিতীয় কারণ, স্লীম্যানের রাজনৈতিক আদর্শ। যে মুষ্টিমেয় ইংরেজের চোখে সেদিন ভবিষ্যত বিদ্রোহের লক্ষণ ধরা পড়েছিল, স্লীম্যান ছিলেন তাদের অন্যতম। অযোধ্যার রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এই রাজ্যটিকে গ্রাস করার পক্ষে ছিলেন না। তার অযোধ্যা ত্যাগের পরেই ১৮৫৭’র বিদ্রোহ। সুতরাং স্লীম্যানকে বীরের সম্মান দেওয়ার তখন সময় কোথায় ? স্যার ফ্রান্সিস লিখছেন—’Very few indeed realise how closely he came to averting the catastrophe of 1857.’
স্লীম্যানের কর্মজীবনের সঠিক মূল্যায়নের জন্যে আর একটি বই-The men who ruled India, the Founders (1953)-Philip Woodruff.
ঠগীদের বিষয়ে কিছু কিছু উপন্যাসও প্রচলিত আছে। তাদের মধ্যে গত শতকে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল Meadows Taylor-এর Confessions of a Thug ( প্রথম প্রকাশ ১৮৩৯) এবং একালে Join Masters-এর The Deceivers (1952)। উপন্যাস হিসেবে দু’টিই অত্যন্ত সুখপাঠ্য। ইতিহাস-পাঠককে শুধু মনে রাখতে হবে, টেলারের নায়ক আমীর আলি যেভাবে একা একা হত্যা করে বেড়ায়, সত্যিকারের ঠগী আমীর আলি তা করত না, এবং জন মাস্টারস-এর নায়ক উইলিয়াম স্যাভেজ যেভাবে ঠগী ধরেন উইলিয়াম স্লীম্যান সেভাবে ঠগী খুঁজে বেড়াতেন না।
***
