ক্ষ্যাপা তিনজন – ৭

সাত

রনি ভাল পোকার খেলোয়াড়। মুখ দেখে কার হাতে কেমন তাস আছে তা বোঝার ক্ষমতা সে অনেক আগেই অর্জন করেছে। সে জানে, হ্যাডলে যে মুখ খুলবে না, এ বিষয়ে শার্পি একেবারে নিশ্চিত না হলে ওকে কিছুতেই একলা ঢুকতে দিত না। তাই পরিস্থিতি বোঝার জন্যে প্রথমেই সে হ্যাডলের মুখের দিকে চাইল। সমস্ত প্রশ্নের জবাব মুখ দেখেই ওকে পড়ে নিতে হবে।

মাথা তুলে তাকাল হ্যাডলে। কঠিন চোখ দুটো চকচক করছে। ‘হাওড়ি, রনি! বাক আর ওরা সবাই কেমন আছে?’

‘চমৎকার আছে ওরা, বাড। তোমাকেও খুব ভাল দেখাচ্ছে।’

ডাহা মিথ্যে কথা বলল রনি। লোকটাকে আসলে অত্যন্ত দুর্বল আর অসহায় দেখাচ্ছে। ওর মধ্যে আগের সেই হ্যাডলেকে খুঁজে পেল না সে, কেবল কাঠামোটাই পড়ে আছে।

কথা চালিয়ে যাচ্ছে রনি। কিন্তু কথার ফাঁকে ঘরের সবকিছু যাচাই করে দেখে নিয়েছে। কোন অস্ত্র নেই ওখানে। জানালাগুলো অনেক উঁচুতে, সুতরাং একমাত্র ওই দরজা ছাড়া এখান থেকে বেরোবার উপায় নেই।

‘শুনলাম তুমি একজন পার্টনার নিয়েছ। এই বুমার লোকটা কেমন; ভাল?’

প্রায় দুমিনিট কোন জবাব এল না। রনি স্পষ্ট টের পাচ্ছে লোকটার মনের ভিতর কি পরিমাণ সংঘর্ষ চলছে। বাড যে তার বউ আর মেয়েকে কি রকম ভালবাসত তা সে নিজেই দেখেছে। মেয়েটা ঠিক তার মায়ের মতই দেখতে হয়েছে। ওর কোন ক্ষতি বুড়ো সহ্য করতে পারবে না।

‘হ্যাঁ, শাৰ্পি ভাল লোক,’ অবসন্ন স্বরে বলল বাড। ‘সে গরু বোঝে, মানুষও বোঝে।’ শেষের কথাটায় যেন একটু তিক্ততার আভাস রনির কানে ধরা পড়ল।

‘বাণ্ডিও কি তোমার পার্টনার হচ্ছে নাকি?’

বাড়ের চেহারা মুহূর্তের জন্যে কুঁচকে চোখে ঘৃণার ভাব ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। ‘না, না! তোমার এমন ধারণা কিভাবে হলো?’

‘এমনি, ভাবছিলাম!’ পা টান করে বসল রনি। ‘উইলিয়ামস তোমাকে গরু কেনার টাকাগুলো দিতে চায়।’

‘তুমি টাকাটা এনেছ?’ ওর বলার ভঙ্গিতে, না এনে থাকলেই ভাল, এমন একটা ভাব দেখতে পেল রনি।

‘সাথে আনিনি,’ সতর্কভাবে বলল সে, ‘কিন্তু আমি—’

দ্রুত বাধা দিল বাড। ‘ওর কাছে এখন না থাকলে দরকার নেই।’ তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘আমার যদি কিছু হয়, তবে ওটা সুজানাকে দিয়ো। আর, ওরও যদি কিছু হয়, তবে বাক আর তুমিই রেখো।’

‘বাজে কথা রাখো!’ বলে উঠল রনি, ‘তোমার বা সুজানার কিচ্ছু হবে না! হ্যাঁ, আমি বলছি!’ একটু সামনে ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে সে আবার বলল, ‘তুমি বুমারকে এখানে জায়গা দিয়েছ কেন? লোকটা খুনী; আউটল!’

দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল বাড। রনির দিকে তাকাচ্ছে না। ‘মানুষ যাকে খুশি কাজে নিতে পারে,’ বিড়বিড় করে বলল সে। ‘এবং যার কাছে খুশি র‍্যাঞ্চ বিক্রি করতে পারে। তুমি আমার উপকার করতে চাইলে সোজা ঘোড়া নিয়ে বাকের কাছে ফিরে যাও, রনি। আর এসো না। সুজানা আর আমার,’ দুঃখের সাথেই সে বলল, ‘আমাদের নিজস্ব সমস্যা আছে। সেই সমস্যার সমাধান আমাদেরই করতে হবে।’

ধীরে উঠে দাঁড়াল রনি। ‘বাড, আমি এখানে বসে এই মুহূর্তে কিছুই করতে পারছি না বটে, কিন্তু তুমি পছন্দ করো আর না-ই করো, আমি পণ করেছি তুমি ভাল হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারা পর্যন্ত আমি এই এলাকা ছেড়ে নড়ছি না!’

বুড়োর চোখে একটু আশার আলো ফুটল। সুজানা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল। ‘ওহ, যদি-’

‘বোলো না।’ গানবেল্টটা ঠিক করে নিল রনি। ‘আমি হাঁদা নই। তোমার ওই বুড়ো বাপ পোকার খেলা কোনদিন শিখল না। জীবনে কখনও আমাকে ধাপ্পা দিতে পারেনি-আজ নতুন করে কি পারবে?’

এগিয়ে দরজা খুলল রনি। ‘আবার দেখা হবে?’

‘রনি’-ওর হাতের ওপর হাত রাখল সুজানা-’সাবধানে থেকো।’

হাসল রনি। ‘বললাম তো, আবার দেখা হবে।’ দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়েও দাঁড়াল। প্রশ্ন করল, ‘একান্ত দরকার হলে ও কি ঘোড়ার পিঠে বসতে পারবে?’

একটু ইতস্তত করে মাথা ঝাঁকাল সুজানা। ‘পারবে। আমার মনে হয় খুব খুশিও হবে।’

মাঝের কামরাটা পার হলো রনি। ওরা তাকে কিছুই জানায়নি, কিন্তু ওরা যে এখানে বন্দি, এটা সে বেশ বুঝতে পারছে। সম্ভবত দুজনেই ভয় পাচ্ছে, কিছু করতে গেলে অন্যজনের ক্ষতি করবে শার্পি। লোকটার প্ল্যানে কোন খুঁত দেখতে পাচ্ছে না রনি। সে যদি হঠাৎ এসে না পড়ত, এসব কথা অজ্ঞাতই রয়ে যেত।

রনির সাড়া পেয়ে ঝট করে মুখ তুলে তাকাল শার্সি। ‘সেই আগের হ্যাডলে আর নেই, তাই না?’ চামড়ায় মোড়া চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল সে। ‘খুব কাহিল হয়ে পড়েছে।’

‘হ্যাঁ,’ সমর্থন করল রনি। ‘কেবল খোলসটা আছে।’

‘তুমি ওকে গরু বিক্রির টাকাটা দিয়েছ?’ কথার ছলে প্রশ্ন করল সে।

‘অ্যা? ওহ, না, আজকে দিইনি। পথে কয়েক জায়গায় থামতে হলো বলে ওটা একখানে সামলে রেখেছি,’ সেও কথার ছলেই জানাল।

শার্পির মুখের চেহারা দেখে চেষ্টা করে হাসি চাপল ড্যাশার। পনেরো হাজার বেশ বড় অঙ্ক। ওটা হাতে পাওয়ার আগে আর ওকে খুন করার চেষ্টা করবে না লোভী গানম্যান।

একটা চেয়ারে বসে ফুটন্ত কফি ঢেলে নিল রনি। টেবিলে কিছু ডোনাটও রাখা আছে। প্লেটটা কাছে টেনে নিয়ে খাওয়া শুরু করল।

‘আধঘণ্টার মধ্যেই রওনা হব আমি,’ বলল রনি। ‘ভাবছি আর সবাই না পৌছানো পর্যন্ত হর্স স্প্রিঙসেই ওদের জন্যে অপেক্ষা করব।’

‘ওই ডীলটার ব্যাপারে হ্যাডলের সাথে আমি কথা বলব,’ অস্বস্তিভরে প্রতিবাদ করল শার্সি। ‘আমাকে কিছুই জানায়নি ও। তুমি বলছিলে তোমার কিছু লোকজন এসে পৌঁছেচে?’

‘পৌঁছানোর কথা,’ মিথ্যা বলল সে।

‘তেমন কোন খবর আমি পাইনি,’ জানাল শার্সি। ‘হয়তো এদিক-ওদিক কোথাও গেছে।’

‘সেটা খুবই সম্ভব।’ কফিতে চুমুক দিয়ে আরেকটা ডোনাট তুলে নিল রনি। ‘ওই দুজন রাসলারদের পিছনে ধাওয়া করতে খুব পছন্দ করে-খাওয়ার চেয়েও বেশি—অথচ দুজনই পেটুক।’ হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় এল। একটু বাজিয়ে দেখার উদ্দেশ্যে সে কথার মোড় পালটাল।

‘আচ্ছা, তোমরা কেউ ডীন নামে একজন জুয়াড়ীকে চেনো?’

শার্পি ভুরু কুঁচকাল, কিন্তু বাণ্ডি চমকে মাথা তুলল। যা বোঝার ছিল বুঝে নিয়েছে রনি।

‘কেন? ওকে আমরা দুজনেই চিনি,’ জবাব দিল শাৰ্পি।

‘ভাবছি, এলক মাউন্টিন এলাকায় ও কি করছিল।’

বাণ্ডির মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে। নাকের দুপাশ ফুলে উঠেছে, শার্পির

দিকে তাকিয়ে আছে সে।

চেয়ার ছেড়ে অর্ধেক উঠে এসেছে বুমার। ‘ডীন?’ ওর স্বরে অবিশ্বাস। ‘এলক মাউণ্টিনে?’

‘হয়তো কিছুই না,’ হেসে কাটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল রনি। ওর কাজ হয়ে গেছে। ‘সম্ভবত নিজের কোন ধান্দায় ঘুরছে। জুয়াড়ীরা ওই রকমই হয়- সবসময়ে টাকা বানাবার ফিকিরে থাকে। অবশ্য অনেকেই তাই করে-সেদিন রাতে জনি রিগ আমাকে বলছিল’-থামল সে। ‘কিন্তু সেটা আমার ওপর আস্থা রেখে বলেছে।’

এবার লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল শার্পি। চেয়ারটা উলটে পড়ল, সেদিকে খেয়াল নেই। ‘জনি কি বলেছে?’ কর্কশ স্বরে জানতে চাইল সে। ওর চোখ দুটো কঠিন আর ভয়ানক হয়ে উঠেছে।

‘এমনি, কিছু কথা বলছিল,’ হাত নেড়ে কথাটা উড়িয়ে দেয়ার ভঙ্গি করল রনি। ‘নিজের স্বার্থ সবাই দেখে। এজন্যে কাউকে তুমি দোষ দিতে পারো না।’

উঠে দাঁড়াল রনি। ‘আমার বেরিয়ে পড়ার সময় হয়েছে। তোমাদের সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম মিস্টার বুমার, মিস্টার বুল। আমি আমার লোকজন নিয়ে বাছুরগুলো নিতে আসব তখন আবার দেখা হবে।’

উঠান পেরিয়ে এগোল রনি। মনেমনে সে নিজের কাজে খুশি হয়েছে। লোকগুলোকে বিভ্রান্ত করে দিয়ে আসা গেছে। আউটলরা নিজেকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করে না। একবার সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দিতে পারলে নিজেদের মধ্যেই মারপিট লেগে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়।

বাকস্কিনের পিঠে চেপে উত্তরে রওনা হলো রনি। ওদিকেই ইণ্ডিয়ান ক্রীক ট্রেইল এবং ওটাই হর্স স্প্রিঙসে যাবার প্রধান রাস্তা। কেউ অনুসরণ করছে কিনা খেয়াল করার জন্যে ট্রেইল থেকে সরে কয়েকবার অপেক্ষা করল। তৃতীয়বার লোকটাকে দেখতে পেল। আধ মাইল পিছনে আছে সে। লোকটা ওকে পেরিয়ে উত্তরে অদৃশ্য হওয়ার পর আড়াল থেকে বেরিয়ে পশ্চিমে এগোল রনি।

ক্যানিয়ন ক্রীক পেরিয়ে আরও পশ্চিমে যাচ্ছে। এবড়োখেবড়ো পাহাড়ী এলাকা। কিন্তু বাকস্কিনটা এমন অনায়াসে পথ চলছে, যেন পার্কে বেড়াতে বেরিয়েছে।

গাছপালার ভিতর ক্যাম্প করল রনি। ঘোড়াটাকে বেঁধে অল্প কিছু খেয়ে গাছের তলায় শুয়ে পড়ল। বিশ্রাম দরকার, রাতে তার অনেক কাজ আছে।

লম্বা চার ঘণ্টার একটা ঘুম দিয়ে সন্ধ্যার পর রনির ঘুম ভাঙল। ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে আবার সার্কেল এইচের পথ ধরল। র‍্যাঞ্চের কাছে পৌঁছে সকালে যেখানে থেমেছিল সেখানেই ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল।

ঠাণ্ডা আর তাজা বাতাস। প্রত্যেকটা শ্বাসই ঠাণ্ডা পানি খাওয়ার মত তৃপ্তি দিচ্ছে। পাইন আর ধোঁয়ার হালকা একটা গন্ধ বাতাসে ভাসছে। র‍্যাঞ্চ আর বাঙ্কহাউসে আলো দেখা যাচ্ছে। কয়েক মিনিট স্থির দাঁড়িয়ে এলাকাটা আবার নতুন করে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর সাবধানে এগিয়ে করালের পিছনে চলে এল। আশপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে অন্ধকারে ধীরে ধীরে বাঙ্কহাউসের জানালার কাছে পৌঁছে ভিতরে উঁকি দিল। নিজের বাঙ্কে শুয়ে ঘুমাবার চেষ্টা করছে ফিউরি। সকালে যাকে দেখেছিল, সেই লম্বা কাউহ্যাণ্ড দরজার দিকে মুখ করে বসে পেশেন্স খেলছে। ভিতরে আর কেউ নেই।

‘এসো, একটু তাস খেলি,’ প্রস্তাব দিল লম্বা কাউহ্যাণ্ড। একা খেলতে খেলতে বিরক্তি ধরে গেছে ওর।

‘বিরক্ত কোরো না, ঘুম জড়ানো স্বরে বলল ফিউরি। ‘ঘুমাতে দাও- বারোটা থেকে আমার ডিউটি।’

‘ঠিক আছে, ঘুমাও। বারোটায় তোমাকে জাগিয়ে দেব।’

আরও কিছুক্ষণ চেষ্টা করে মিলাতে না পেরে তাসগুলো গুছিয়ে তুলে নিয়ে শা করে আবার খেলা শুরু করতে গিয়ে ফিউরির নাক ডাকার শব্দে ফিরে তাকাল। ‘দেখো কাণ্ড!’ বিড়বিড় করল সে, ‘এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে।’

‘হ্যাঁ,’ নিচু একটা স্বর শোনা গেল, ‘ঘুমটা ওর দরকার, ওকে জাগিও না।’

চমকে মুখ ফেরাল তাস খেলোয়াড়। পিস্তলের বাঁট ধরার জন্যে বাড়ানো হাতটা জমে স্থির হয়ে গেল। তারপর ধীরে হাতটা দূরে সরাল। ভিতরে ঢুকে খোলা দরজার মুখ থেকে একটু বাম পাশে সরে দাঁড়াল ড্যাশার হাতে কোল্ট। ‘গলা দিয়ে শেষ একটা শব্দ করতে চাইলে চিৎকার করতে পারো,’ নিচু স্বরে বলল সে। ‘নইলে গানবেল্টটা খুলে সাবধানে টেবিলে রাখো।’

ঘামছে আউটল। একবার ঢোক গিলে খুব ধীরে বেল্ট খুলে টেবিলে রাখল। কালো ঘন জোড়া-ভুরুর তলা দিয়ে কঠিন, শীতল চোখে রনির দিকে চেয়ে আছে সে।

‘এবার ঘুরে দাঁড়াও,’ পিস্তল নেড়ে ইঙ্গিত করল ড্যাশার।

লম্বা লোকটা ইতস্তত করছে। ‘ওটা দিয়ে আমার মাথায় মেরো না,’ বলল সে। ‘আমি তোমার কোন ক্ষতি এখনও করিনি।’ নেকড়ের দাঁত বের করে হাসল আউটল। ‘কিন্তু পরের বার যখন দেখা হবে এর জন্যে আমি তোমার চামড়া তুলে ফেলব!’

লোকটা ঘুরে দাঁড়াল। রনি ওর হাত দুটো পিছমোড়া করে বেঁধে, মুখে এক টুকরো কাপড় গুঁজে মুখটাও বেঁধে ফেলল।

ফিউরি এখনও দিব্যি ঘুমাচ্ছে। স্বপ্নে দেখছে রনিকে বাগে পেয়ে সে পিস্তলের ট্রিগার টানতে যাচ্ছে। এই সময়ে পেটে শক্ত কিছুর ঠাণ্ডা স্পর্শে চোখ খুলে দেখল ড্যাশার ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।

‘একটা টু শব্দ করলে পিস্তলটা তোমার মাথায় ভাঙব!’ সাবধান করল রনি।

ধড়মড় করে উঠে বসে চিৎকার করার জন্যে মুখ হাঁ করল ফিউরি। সোলার প্লেক্সাসের ওপর শক্ত খোঁচায় ওর ভিতর থেকে পুরো বাতাস বেরিয়ে গেল। নির্বিকার ভাবে লোকটার কানের পিছনে পিস্তলের নল ঘুরিয়ে আঘাত করল রনি। জ্ঞান হারিয়ে দুভাঁজ হলো আউটল। বাঁধা লোকটার দিকে চেয়ে রনি বলল, ‘এই লোক কারও কথা বিশ্বাস করতে চায় না!’

ফিউরিকে বাঁধা শেষ হলে বাঙ্কহাউস থেকে বেরিয়ে করাল থেকে দুটো ভাল ঘোড়া এনে জিন চাপিয়ে র‍্যাঞ্চহাউসের পাশে রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠল

মেক্সিকান রাঁধুনী মেয়েটার সাথেই সবার আগে দেখা হলো। ‘বুয়েনস্ নচেস্, সেনরা,’ নরম সুরে বলল রনি। ‘তোমার তরফ থেকে কোন ঝামেলা চাই না আমি।’

‘কোমো?’

‘ওই দরজাটা খোলো।’ পিস্তল নেড়ে ইঙ্গিত করল রনি। ‘হ্যাডলেদের আমি এখান থেকে নিরাপদ কোথাও নিয়ে যাব।’

‘আমাকেও নিয়ে চলো! প্লীজ!’ অনুরোধ জানাল রাঁধুনী।

‘আপাতত তোমাকে এখানেই থাকতে হবে, চিকিতা। পরে আমি ফিরে এসে সব ব্যবস্থা করব।’

দরজা খুলল মেয়েটা। কিন্তু ভিতরের দরজাটার সামনে পৌঁছে মাথা নাড়ল। নক করল রনি। ‘সুজানা! বাড!’

ভিতরে পায়ের আওয়াজ হলো। ‘রনি?’ সুজানার অবিশ্বাস মেশানো স্বর শোনা গেল। ‘ওহ, তুমি সত্যিই এসেছ!’

‘হ্যাঁ। দরজাটা খোলো।’

‘এদিকে কেবল একটা হুড়কো আছে-দরজার চাবি শার্পির কাছে।’

‘ঠিক আছে, হুড়কো নামিয়ে রেখে তুমি বাডকে নিয়ে তৈরি হও। আমরা এখনই ঘোড়ায় চড়ে রওনা হব।’

একটু পিছনে সরে দরজায় লাথি মারল রনি। তারপর আবার। কিন্তু মজবুত দরজাটার নড়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। বাইরে বেরিয়ে গুদাম থেকে একটা কুড়াল নিয়ে এল রনি। জায়গা মত দুটো বাড়ি পড়তেই দরজা খুলে গেল। বাড একটা লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। সুজানা আর রনি দুপাশ থেকে ধরে ওকে দরজার সামনে নিয়ে এল। ‘আমাকে কেবল একটা ঘোড়ার পিঠে তুলে দাও,’ ভাঙা স্বরে বলল বাড। ‘আমি আর কিছু চাই না। যদি মরতেই হয়, জিনের ওপরই মরব!’

মেক্সিকান মেয়েটা অদৃশ্য হয়েছে। বাডকে জিনের ওপর শক্ত করে বসিয়ে ছুটে গিয়ে ভিতর থেকে ওদের জন্যে দুটো রাইফেল আর পিস্তল নিয়ে এল রনি। এই সময়ে একটা ক্যানভাসের থলিতে খাবার নিয়ে হাজির হলো রাঁধুনী।

ওর দিকে চেয়ে হাসল রনি। ‘গ্রাসিয়াস, চিকিতা!’ বলল সে। ‘তুমি আমার ডার্লিঙ!’ আদর করে মাঝ-বয়সী মহিলার থলথলে গাল টিপে দিল রনি। কপট লজ্জায় ওর হাতে চাপড় মারল মেয়েটা।

ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল রনি। ‘ভায়য়া কন ডিয়স!’ বিদায় জানাল রাঁধুনী। ‘Go with God!’ ঘোড়া আগে বাড়িয়ে বিড়বিড় করল সুজানা। তার আশীর্বাদই আমাদের দরকার।’

হঠাৎ ঘোড়ার খুরের আওয়াজ তুলে কয়েকজন আধ-মাতাল রাইডার উঠানে এসে থামল। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ওদের মধ্যে দুজন হাসি-ঠাট্টার মধ্যে বাঙ্কহাউসের দিকে এগোল। দরজার কাছে পৌঁছে ওদের হাসি থেমে গেল।

‘স্লিম! ফিউরি! একি!’ চিৎকার করল একজন। ওদের মাঝে বিস্ময় আর বিভ্রান্তির কোলাহল উঠল। মনেমনে একটা গালি দিল রনি।

‘তোমরা এগোও, আমি আসছি,’ সুজানাকে বলল সে। ‘মগোলনসের দিকে যাও। জলদি!’

‘ঠিক আছে!’

ওদের ঘোড়ার খুরের শব্দ জঙ্গলের ভিতর মিলিয়ে গেল। উইনচেস্টারটা খাপ থেকে বের করে কাঁধে ঠেকাল রনি। দ্রুত পাঁচটা গুলি ছুঁড়ল পরপর। প্রথম গুলিতে বাতিটা গেল, দ্বিতীয়টা দরজায় লাগল, তৃতীয় আর চতুর্থটা জানালা দিয়ে ঢুকল, আর শেষটা লাগল সিঁড়িতে। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে সুজানাদের পিছনে ছুটল সে।

একবার মুখ তুলে তারাগুলোর দিকে চেয়ে বুঝল এখন রাত প্রায় বারোটা হয়েছে। অর্থাৎ হাতে ছয় ঘণ্টা সময় আছে। এর পরে ওরা সহজেই ট্র্যাক করতে পারবে। সুজানা বেশ দ্রুতই এগোচ্ছে। ঘোড়া নিয়ে হ্যাডলের পাশে এসে পৌছল রনি।

‘কেমন বুঝছ, বাড? টিকতে পারবে তো?’

‘আমি ঠিকই পারব!’ রনির রাইফেলে গুলি ভরা দেখছে বাড। ‘ঠিক সেই পুরানো দিনের মত। বাক আমাদের সাথে থাকলে আরও ভাল লাগত!’

‘হ্যাঁ,’ বলল রনি। বিভিন্ন জায়গায় পুরানো দিনের কথা ওরও মনে পড়ছে। ‘তবে বাকের বদলে ওয়াইল্স্ বা ডাগ মারফি থাকলে আমাদের জন্যে আরও ভাল হত।’

‘মারফি? ওকে আমি চিনি না, কিন্তু ওই নামটাই আজ আমি শুনেছি।’

‘কী?’ বিশ্বাস করতে পারছে না রনি। ‘মারফি সম্পর্কে কিছু শুনেছ?’

‘হ্যাঁ। ওর সাথে হর্স স্প্রিঙসে কার যেন পিস্তলের লড়াই হয়েছে। পুরো ঘটনা জানি না।’

সুজানার পাশে সরে এল রনি। ‘তুমি এই ট্রেইলটা চেনো?’

‘বেশ ভাল করেই চিনি। এদিকে আগে প্রায়ই বেড়াতে আসতাম। তবে জারকির ওপাশে কখনও যাইনি। তুমি চেনো?’

‘শোনা কথায় চিনি। ভাগ্যের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে।’

অনেক পিছনে দূর থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে এল।

‘আমি একটু পিছিয়ে থাকছি,’ বলল রনি। ‘ওরা হয়তো আমাদের হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেলতে পারে। তবে ওদের দুভাগ হয়ে নদীর ক্রসিঙ দুটোর দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’ একটু পিছিয়ে সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, মারফি কাকে মেরেছে তুমি জানো?’

‘মারফির কথা আমি শুনিনি। আমার কানে এসেছে ভাসকো হর্স স্প্রিঙসে গোলাগুলিতে মারা পড়েছে।’

খুশিতে দাঁত বের করে হেসে পিছিয়ে পড়ল রনি। হঠাৎ খুব ভাল বোধ করছে। কাজ একাও করা যায়, কিন্তু ডাগ আর ডেড-শটের মত লোক আশপাশেই আছে জানলে মনের জোর অনেক বেড়ে যায়। ভাসকো মারা গেছে! লোকটাকে নিশ্চয় যমে টেনেছিল, নইলে মারফির মত বিচ্ছুর সাথে লাগতে যাবে কেন?

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *