ক্ষ্যাপা তিনজন – ৬

ছয়

ওর মুখে সুজানার বর্ণনা শুনে ভাসকো কেন হেসেছিল তা এখন বুঝতে পারছে রনি। ঠিক সুন্দরী নয়, কিন্তু মনোরম। পশ্চিম তার মেয়েদের যা দেয়, সেই শক্তি আর কোমল নমনীয়তায় মনোরম।

রনিকে দেখে সুজানা আরও বেশি অবাক হয়েছে। সে আরও বয়স্ক একজনকে দেখবে আশা করেছিল। সে নিজে যখন কিশোরী, রনি তখনই যুবক ছিল। কিন্তু ওই বয়সে মেয়েরা খুব তাড়াতাড়ি বড় হয় যে সবার তাক লেগে যায়। পুরুষের জীবনে তিনটে বছর কিছুই না, কিন্তু মেয়েদের জীবনে পনেরো থেকে আঠারো পর্যন্ত অনেক।

ওর কিশোর বয়সে দেখা রনির সাথে বর্তমান রনির কোন তফাত নেই।

‘হাওডি, সুজানা!’ হাসিমুখে বলল ড্যাশার। ‘অনেকদিন পরে দেখা!’

বর্তমান পরিস্থিতি কি, তা মেয়েটা জানে না। রনি ভয় পাচ্ছে, ও হয়তো না বুঝে কিছু বলে ফেলতে পারে। শার্সি ভালমানুষের মুখোশ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলে ব্যাপারটা ঘোলাটে হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু এক মুহূর্ত পরেই টের পেল, মিছেই দুশ্চিন্তা করছিল সে মেয়েটা সবদিক থেকেই পরিণত হয়েছে।

‘তোমাকে দেখে খুব খুশি হয়েছি, রনি।’

দ্রুত টেবিলের পাশ দিয়ে ঘুরে কাছে এসে নিজের হাত দুটো বাড়িয়ে দিল সে। ওগুলো নিজের হাতে তুলে নিয়ে মৃদু চাপ দিয়ে আদর জানাল রনি।

‘তুমি এখানে কিছুদিন থাকছ তো?

এই প্রশ্নে খুশি হলো রনি। যা বলতে চায় সেটা কথায় প্রকাশ করার সুযোগ পেল।

‘নিশ্চয়, সুজানা!’ মুখ তুলে শার্পির চোখে চোখ রেখে সে বলে চলল, ‘তোমার বাবা নিজে সবকিছু চালাবার মত সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি আছি। হ্যাডলের জন্যে উইলিয়ামস ব্যবসার কিছু খবরও পাঠিয়েছে, কিন্তু ওসব পরে হবে।’

‘ঠিক আছে, পরে কথা হবে,’ বলে ঘুরে চলে যাচ্ছিল সুজানা, কিন্তু শার্পির ডাক শুনে থামল।

‘তোমার বাবা ঘুম থেকে উঠলে ওকে বোলো আমি দেখা করতে চাই। আমি জানি ড্যাশারও দেখা করবে, কিন্তু সেজন্যে ওকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করা দরকার। এই অবস্থায় ওকে অযথা বেশি উত্তেজিত হতে দেয়া ঠিক হবে না।’

মেয়েটা চলে যাওয়ার পর সামনে রাখা খাবার খেতে শুরু করল রনি। খাওয়ার মাঝে কথা বলতে হচ্ছে না বলে সে খুশি। চিন্তা করার সময় পাওয়া গেছে। গত কয়েক মিনিটে শার্সি সম্পর্কে ওর ধারণা পালটে গেছে। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ভুল করে পরে পস্তাবার মানুষ ও নয়। সুজানাকে সে যে প্রচ্ছন্ন হুমকিটা দিয়েছে সেটা রনির নজর এড়ায়নি। এবং রনি দেখা করার আগে অল্প সময়ের জন্যে হ্যাডলেকে মানসিক প্রস্তুতি দেয়ার বাহানায় শার্সি কি বলবে সেটাও আঁচ করতে পারছে।

পরিস্থিতি কিছুটা রনির অনুকূলেই আছে, কারণ এই মুহূর্তে শার্পির ওকে হত্যা করার প্ল্যান নেই। নইলে সে এর আগেই সেই চেষ্টা করত। সুতরাং ওর আর কোন মতলব আছে। শার্পিকে ভয় পাচ্ছে না ও, নিজের পিস্তল চালাবার ক্ষমতায় রনির বিশ্বাস আছে। কিন্তু আজ সকালে লোকটার মাথা ঠাণ্ডা রাখা দেখেই বোঝা যায় লোকটা শুধু দক্ষ গানম্যানই নয়, বুদ্ধিও রাখে। নিজেকে কখন সংযত রাখতে হবে তা সে বোঝে।

এর মধ্যে বাণ্ডি বুলের কি ভূমিকা তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। রনি সব জানতে চায়। লোকটা শার্পির কাছে মিথ্যা বলল কেন? লোকটা হর্স স্প্রিঙস থেকে রনির সাথেই বেরিয়েছে। দুটো রাত সে কোথায় কাটিয়েছে? এলক মাউন্টিনে ওকে আকর্ষণ করার মত কি আছে?

লোকটা দুর্বোধ্য। চমৎকার কথা বলতে জানে। মার্জিত মসৃণ ব্যবহার। এখন র‍্যাঞ্চের সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছে বাণ্ডি। পাহাড়ী এলাকায় গরু পালা, রেঞ্জের অবস্থা, দেরিতে বৃষ্টি হওয়া পাহাড়ী ঘাসের জন্যে কেন ভাল, ইত্যাদি। একটা বিশাল, শক্ত, আর কঠিন লোক। পশ্চিমের সব রকম অপরাধ সম্পর্কে সে ওয়াকিফহাল এবং শিয়ালের মত ধূর্ত। স্বার্থের ব্যাপারে বুনো নেকড়ের মত হিংস্র। স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া লোকটা আর কিছু বোঝে না। কিন্তু এখানে ওর স্বার্থটা কি?

খাওয়া শেষ করে আরাম করে বসল রনি। ‘খাবারটা ভাল, মুখে হাসি ফুটিয়ে মন্তব্য করল সে। ‘মনে হচ্ছে এই এলাকার লোক ভাল রাধুনীর কদর দেয়। সায়মন ড্রিলের একজন ভাল রাঁধুনী আছে।’

‘জানি না,’ বলল শার্সি, ‘আমাদের মধ্যে সম্পর্ক তেমন ভাল নয়। গরু চুরি যাচ্ছে, আমরাও হারিয়েছি, কিন্তু ছোট র‍্যাঞ্চারদের ধারণা আমরাই দায়ী। মিথ্যে অভিযোগ।’

‘তুমি বললে ‘আমরা’-অর্থাৎ তুমি এখানকার ফোরম্যান?’

‘না।’ জবাবটা শার্সি জোর দিয়ে উচ্চারণ করল, ‘পার্টনার।

‘অনেকগুলো কমবয়সী গরু চোখে পড়ল, সার্কেল বি। তোমার ব্র্যাণ্ড?’

‘হ্যাঁ।’ বিরক্ত হয়ে উঠছে শার্পি। ‘আমার ব্র্যাণ্ড।’

‘এই পার্টনারশিপ-কোন কাগজ-পত্র আছে? নোটিস দেয়া হয়েছে?’

কাঁধ উঁচাল বুমার। ‘তাড়াহুড়ার কি আছে? ওসব পরেও করা যাবে। আমার কারবার এখনও ছোট। বর্তমানে আমি প্রধানত হ্যাডলের হয়েই কাজ চালাচ্ছি।’

‘বুঝলাম।’

কফি পটের দিকে হাত বাড়াল রনি। বেশ সময় নিয়ে নিজের কাপটা আবার ভরে নিল। হ্যাডলের সাথে কথা বলবে সে, কিন্তু ওখানে শার্সি উপস্থিত থাকবে। এরা ওকে একা কথা বলার সুযোগ দেবে না। জোর করলে অনর্থই ঘটবে।

পুরো র‍্যাঞ্চটা দখল করাই যদি ওদের উদ্দেশ্য হয় তাহলে বাইরের লোককে বুঝ দেয়ার জন্যে আইন-সম্মত রঙ চড়াবার চেষ্টা করবে। অর্থাৎ এই র‍্যাঞ্চ থেকে বেরোবার আগে ওকে মারার চেষ্টা করবে না। ফিউরিকে ওর পিছনে পাঠাবে, সাথে আরও লোক থাকবে। ওদের যুক্তি হবে ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে রনি খুন হয়েছে। চার্লিকেও একই উপায়ে মারা হয়েছে।

সুজানা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ‘বাবা এখন তোমার সাথে কথা বলবে।’ শার্পির ওপর থেকে চোখ সরিয়ে রনির দিকে তাকাল মেয়েটা। ‘তুমি এসেছ শুনে বাবা খুব খুশি হয়েছে। জিজ্ঞেস করছিল তোমার সাথে আর সবাই এসেছে, নাকি পরে আসছে?’

উঠে রওনা হয়েছিল বুমার, সুজানার প্রশ্নটা শুনে থমকে দাঁড়াল। লোকটার মুখের রঙ বদলাতে দেখে মনেমনে খুশি হলো রনি।

‘মনে হয় ডাগ মারফি আর ডেড-শট ওয়াইল্স্ এখানে পৌঁছে গেছে, মিথ্যা বলল সে। ‘ওরা ছাড়া আরও দুজন আসছে।’

‘ওরা কেন আসছে?’ জবাব দাবি করল শার্পি। ধাঁধায় পড়েছে ও।

‘অ্যা?’ রনির অবাক হওয়ার অভিনয়টা চমৎকার হলো। ‘তুমি বলতে চাও তুমি একজন পার্টনার, অথচ হ্যাডলে তোমাকে বাক উইলিয়ামসের সাথে ডীলের কথা কিছুই বলেনি? আমরা ড্রাইভের জন্যে বাডের থেকে ছয়শো দুবছর বয়সী, আর দুশো এক বছর বয়সী বাছুর কিনছি। অনেক দিন আগেই ডীলটা করা হয়েছে।’

শার্পি নিজেই বুঝতে পারছে ফেঁসে গেছে ও। এমন কোন কথাই সে শোনেনি, কিন্তু এটা সত্যিও হতে পারে। উভয় সঙ্কট। জানে বললেও বিপদ- ডীল না থাকলে সে ধরা পড়ে যাচ্ছে; আবার জানে না বললেও বিপদ-তাহলে প্রশ্ন উঠবে, তুমি কেমন ধারা পার্টনার, এটাও জানো না?

‘তাই? ভাল।’

কথা দুটো কোনমতে বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে। ওর সাথে সুজানাও গেল। কামরায় রইল কেবল রনি আর বাণ্ডি।

এই লোকটা সম্পর্কে আরও জানতে চায় ড্যাশার। নিজে কিছু না বলে ওকেই কথা শুরু করার সুযোগ দিল। বাণ্ডিকেই যে ট্রেইলে দেখেছে ও ‘এব্যাপারে সে নিশ্চিত।

‘আশ্চর্য,’ হঠাৎ বলে উঠল বুল, ‘র‍্যাঞ্চের কাগজ-পত্রে এমন কোন ডীলের উল্লেখ নেই।’

কফিতে একটা চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখল রনি। কুসুম গরম। ‘আমি জীবনে কখনও লিখিত ডীল করিনি,’ শান্ত স্বরে বলল সে। ‘বাককেও পরিচিত বন্ধুর সাথে দলিল করে চুক্তিতে যেতে আমি দেখিনি।’ মাথা হেলিয়ে আড়চোখে বাণ্ডির দিকে তাকাল সে। ‘কিন্তু তুমি জানতে চাইছ কেন? আরেকজন পার্টনার? নাকি আর কিছু?’

আড়ষ্ট হলো বুল। মুহূর্তের জন্যে হলেও প্রশ্নটার কি জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারল না। বাইরে ভাব দেখিয়েছে, শার্সি পার্টনার হচ্ছে, এবং সে অস্থায়ী ভাবে ওদের কাগজ-পত্র আর হিসাব দেখে দিচ্ছে। কিন্তু তার মনে হচ্ছে ওই জবাবে রনিকে বুঝ দেয়া যাবে না। ‘র‍্যাঞ্চের কাজে আমি সাহায্য করছি,’ বলল সে। ‘কাগজ-পত্র আর ব্যবসার দিকটা দেখছি। শার্সি আর আমি একত্রেই কাজ করছি।’

দাঁত বের করে হাসল রনি। বিদ্রূপ-মাখা চোখ দুটো বাণ্ডিকে যেন ভেদ করে ভিতর পর্যন্ত দেখছে। ‘তোমরা একসাথে? আমিও সেটাই ধারণা করেছিলাম, তাই খটকা লাগছিল। অবশ্য প্রত্যেক মানুষেরই গোপন করার মত কিছু জিনিস থাকে।’

হঠাৎ সতর্ক হয়ে উঠল বাণ্ডি। আড়চোখে ভিতরের দরজার দিকে এক নজর দেখে নিয়ে সোজা হয়ে বসল। ‘তুমি কি বোঝাতে চাও?’ জানতে চাইল সে।

সিগারেটটা ঠেসে নিভিয়ে উঠে দাঁড়াল রনি। ‘উত্তরের ওই এক্ মাউন্টিনের কথা ভাবছি। চমৎকার এলাকা। ওদিকে ঘোরাফেরা আছে তোমার, মিস্টার বুল?’,

ভিতরে-ভিতরে রাগে ফুঁসছে বাণ্ডি, কিন্তু আবার দুশ্চিন্তাও হচ্ছে। এই কথা যদি বুমারের কানে যায়-

‘ঠিকই বলেছ তুমি,’ নিচু স্বরে বলল সে। ‘কিছু ব্যাপার আছে, যেসব নিয়ে আমরা আলাপ করি না।’

সোজা এগিয়ে ভিতরে ঢোকার দরজা খুলল ড্যাশার। ‘মনে হয় ওরা এতক্ষণে আমার জন্যে তৈরি হয়েছে।’

‘দাঁড়াও!’ সীট ছেড়ে লাফিয়ে উঠে পড়ল বাণ্ডি। ‘শার্সি প্রস্তুত হয়ে তোমাকে ডাকবে।’

‘আমি এখনই যাচ্ছি,’ শান্ত স্বরে বলল রনি। ‘ঘুম থেকে জেগে হ্যাডলে যদি মাত্র কয়েক মাসের পরিচিত শার্পির সাথে কথা বলতে পারে, তবে সে নিশ্চয়ই আমার মত পুরানো বন্ধুর সাথেও দেখা করতে পারবে!’

মাঝের কামরায় ঢুকে দরজা বন্ধ করল রনি। ঠিক একই সাথে ওপাশের দরজা খুলে বুমার বেরিয়ে এল। ড্যাশারকে দেখে ওর চোখ দুটো কঠিন হলো। কয়েক সেকেণ্ড সরু কামরার দুপাশে দুজন পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল। রনি ভাবছে, লোকটা যদি শূটিঙ শুরু করে, তবে ওকে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে গুলি ছুঁড়তে হবে। নইলে দরজা ভেদ করে ওদিকের কামরায় গুলি ঢুকবে।

‘যাও,’ বলল শার্সি। ‘উপস্থিত থেকে তোমাদের বিব্রত করব না আমি।’

অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে ওকে যেতে দেখল রনি। তারপর এগিয়ে ওপাশের কামরায় ঢুকল।

.

ফিউরির ভিতরে রাগের আগুন তুষের মত জ্বলছে। র‍্যাঞ্চহাউসের দরজার দিকে চেয়ে বাঙ্কহাউসে বসে আছে সে। এর একটা বিহিত করতেই হবে। যে লোকটা বার্কারকে হত্যা করেছে, তাকেও জখম করেছে, ওরা কিনা সেই লোকটাকেই জামাই-আদরে ভিতরে নিয়ে গেল!

বাণ্ডিকে দরজা দিয়ে বেরোতে দেখে ছুটে এগিয়ে গেল ফিউরি। ‘এখানে কি হচ্ছে বলো তো?’ কৈফিয়ত দাবি করল সে। ‘ওই বেজন্মা পিস্তলবাজের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এটা তার বাপের বাড়ি!’

‘চুপ করো!’ মৃদু ধমক দিল বাণ্ডি। ‘শার্সি বুঝে-শুনেই কাজ করছে! চিন্তা কোরো না-ওকে মারার সুযোগ তুমি ঠিকই পাবে এবং শিগগিরই।’

‘আমি কেবল সেটাই চাই,’ আক্রোশের সাথে বলল ফিউরি। ‘কেবল একটা সুযোগ।’

‘হর্স স্প্রিঙস,’ চিন্তার মাঝে বিড়বিড় করছে বাণ্ডি, ‘হ্যাঁ, ওটাই সবথেকে ভাল জায়গা। আমরা শার্পির সাথে একটু আলাপ করে নেব। তুমি, জনি রিগ আর ভাসকো।’

ফিউরির চেহারা গোমড়া হলো। ‘আমার কোন সাহায্যের প্রয়োজন নেই!’

‘হ্যাঁ, আছে।’ বাণ্ডির স্বর শান্ত, ঠাণ্ডা। ‘এই লোককে আমি জানি। আমরা কোন ঝুঁকি নেব না, বুঝেছ? একটুও না! এখন এই লোকের বিরুদ্ধে পিস্তল ধরতে হলে আগে নিশ্চিত হতে হবে ও আর কোনদিন উঠবে না। ওর বাঁচা- মরার ওপরই আমাদের সবকিছু নির্ভর করছে।’

‘ঠিক আছে।’ মেনে নিলেও ওর স্বরে কিছুটা অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেল। ‘আমি তৈরি থাকব।’ তারপর বাণ্ডির নিরাপদ প্ল্যানের যুক্তিটা বুঝে ওর চোখ বিকৃত আনন্দে চকচক করে উঠল। ‘ক্রস ফায়ার, না? তিনদিক থেকে?’ শব্দ করে হাসল সে। ‘লিভারি স্টেবলটাই এর জন্যে উপযুক্ত জায়গা। হয়তো __ সাক্ষী, এবং জনি আর ভাসকো আড়ালে থাকবে।’

ওই কথা ভাবতে-ভাবতেই সে বাঙ্কহাউসে ফিরল। তাহলে সে দাবি করতে পারবে সে-ই রনি ড্যাশারকে গুলি করে মেরেছে! শুনে আর সবাই সম্ভ্রমের সাথে ওর দিকে তাকাবে। অন্য দুজনের কথা আর কেউ জানবে না। এখানে, হাতে গোনা কয়েকজন জানবে, কিন্তু আর কেউ না। পুরো কৃতিত্ব তার! হ্যাঁ, বাণ্ডি ঠিকই বলেছে। ঝুঁকি নেয়ার কি দরকার?

তাছাড়া ভাসকোরও প্রতিশোধ নিতে চাওয়ার কারণ আছে। সে কেন বাদ পড়বে? ইস্, ভাসকো এখন হর্স স্প্রিঙসে। নইলে ওর সাথে খুঁটিনাটি আলাপ করে এখনই প্ল্যানটা এগিয়ে রাখা যেত।

.

টেক্সাসের দিক থেকে ধুলো-মাখা দুজন রাইডার মাত্র কিছুক্ষণ আগে পৌঁছেচে। ওল্ড করাল সেলুনে ঢুকেছে ওরা। স্যাম হাডসনের এক বোতল সেরা হুইস্কি নিয়ে এক গ্লাস করে খেয়েছে। এখন, তেমন কিছু করার নেই বলে বারের সবাইকে একে-একে যাচাই করে দেখছে।

হঠাৎ বামদিক থেকে একটা স্বর শুনতে পেয়ে ফিরে তাকাল।

‘সামনে বাঁধা বার ডাবল এক্স ঘোড়া দুটো তোমাদের?’ (XX=20)

‘হ্যাঁ,’ জবাব দিল ডাগ মারফি, ‘গুগুলো আমাদের। কেন?’

‘তোমাদের আউটফিটের একজন আমার জীবন বাঁচিয়েছে। লোকটা যেন আকাশ থেকে নেমে এসে গুলি ছুঁড়ে চারজন অ্যাপাচি মেরে বাকিগুলোকে তাড়িয়ে দিল। একটা সাদা ডাবল এক্স ঘোড়ার পিঠে ছিল ও।’

‘তাই নাকি?’ ডেড-শট ওয়াইল্স ঝুঁকে প্রশ্ন করল, ‘কোথায়?’

‘ক্লিফটনের পুবে। পশ্চিমে আসছিল ও।’

গ্লাস পালিশ করায় ব্যস্ত ছিল স্যাম। কথাটা কানে যেতেই কান খাড়া করল। ওই লোকই নিজেকে রেড রিভার রেগান বলে পরিচয় দিয়েছিল। ওকেই দেখতে ভাসকোকে পাঠানো হয়েছে।

‘ও এখন কোথায়?’ প্রশ্ন করল ডেড-শট।

ইতস্তত করছে মরগ্যান। বুঝতে পারছে ও বেশি কথা বলছে। কিন্তু ওর পেটে বেশ কিছু তরল আগুন পড়েছে। ইদানীং শার্পির নির্দেশ অনুযায়ী চলতে গিয়ে ওর দম আটকে আসছে। কিছু বাড়তি টাকা রোজগারের জন্যে সে ওর কথামত কয়েকটা ঘোড়াকে নিজের র‍্যাঞ্চে জায়গা দিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু পরে চাপে পড়ে আরও অনেক কিছু করতে বাধ্য হয়েছে। ম্যাকক্লিল্যানে ডাকাতির পরেও মোটামুটি সব ঠিকই ছিল। কিন্তু লোকজনের গরু চুরি যাচ্ছে- প্রতিবেশীরা এখন ওকেও সন্দেহ করতে শুরু করেছে। প্রতিবেশী ছাড়া মানুষ কিভাবে বাঁচে?

‘ঠিক জানি না। রেগান বলছিল পশ্চিমে যেতে পারে।’

‘রেগান কে? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল ডেড-শট। ‘ও তো রনি ড্যাশার!’

আড়ষ্ট হলো স্যাম। এই জন্যেই রেগানকে দেখার জন্যে ভাসকো এসেছে! রনি ড্যাশারের সাথে ভাসকোর সংঘর্ষের কথা দলের সবাই জানে! এইসব ভাবার মাঝেই দরজা ঠেলে ভাসকো সেলুনে ঢুকল। ওর চেহারা দেখেই স্যাম বুঝল বাইরে রাখা ঘোড়ার গায়ে বার ২০-র রোমান অক্ষরের XX ছাপ গানম্যানের নজর এড়ায়নি। ঝগড়াটে স্বভাবের ভাসকো যে গায়ে-পড়ে ওদের সাথে ঝগড়া বাধাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

দ্রুত চিন্তা করছে স্যাম। মালিকের দিকে তাকিয়ে দেখল ক্রদার্স ইশারায় তাকে ডাকছে। কাছে যেতেই বুড়ো হিসহিসিয়ে বলল, ‘ভাসকোকে এখান থেকে তাড়াও! ওদের সাথে লাগতে গেলে নির্ঘাত খুন হয়ে যাবে! ওরা বার টোয়েন্টির ডাগ মারফি আর ডেড-শট ওয়াইস্!’

বারের পিছন থেকেই ভাসকোর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে কিছুটা এগোল স্যাম। কিন্তু ওর চোখ বার ২০ রাইডারদের ওপর স্থির হয়ে আছে। চোয়ালে রনির ঘুসির স্মৃতি ওকে খেপিয়ে তুলছে।

দুপুরে ড্রিঙ্ক করলেও সে মাতাল হয়নি, কেবল একটু বেপরোয়া হয়েছে। সাধারণত ধোঁয়া-ওঠা পিস্তলের থেকে ফার্স্ট ঘোড়াই ওর বেশি পছন্দ, কিন্তু পিস্তলে নিজের দক্ষতার গর্বও আছে। সে জানে ট্রেইলে যেসব কাউহ্যাণ্ড চলাফেরা করে তাদের চেয়ে তার হাত অনেক ভাল। ওই দুজনকে অবজ্ঞার চোখে যাচাই করে কমবয়সী ডাগ মারফিকেই চ্যালেঞ্জ করার পাত্র হিসেবে বেছে নিল। কিন্তু সে জানে না পশ্চিমে রনির পরে এই দুটো লোকই সবথেকে ভয়ানক।

‘ভাসকো!’

তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকল স্যাম। সবাই জানে এখানে স্যামই হচ্ছে শার্শির ডান হাত। ওর ডাকে তৎক্ষণাৎ সাড়া দেয়াটাই ভাসকোর জন্যে স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বর্তমানে ডাবল এক্স ছাড়া আর কিছুই ভাবছে না, শোধ নিতে চায় ও। ডাকটা শুনেও উপেক্ষা করল।

‘ডাবল এক্স,’ চিৎকার করে বলল ভাসকো। ‘ওই ব্র্যাণ্ডের একজন লোককে আমি খুঁজছি।’

দুজনেই ভাসকোর দিকে ফিরে তাকাল। মারফির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে সে আবার বলল, ‘আমি তোমাদের ব্র্যাণ্ডের একটা লোককে খুঁজছি।’

মারফির চোখ দুটো কঠিন হলো। এক নজরেই সে পরিস্থিতি বুঝে নিয়েছে। ট্যারা চোখের লোকটা ঝগড়া বাধাতে চাইছে।

স্যাম কি যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মারফির ভাব-ভঙ্গি দেখে চুপ হয়ে গেল।

‘ঠিক আছে,’ বলল মারফি, ‘তুমি ডাবল এক্সের একজন কাউহ্যাণ্ডকে খুঁজছ। তাতে কি?’

‘রনি ড্যাশারকে পেলে আমি খুন করব!’

এক-পা আগে বাড়ল মারফি। ‘তুমি রনিকে গুলি করে মারবে? ভাল, ‘ বলল সে। ‘কিন্তু ও তো এখানে নেই, আমাকে দিয়ে তোমার কাজ চলবে?’

ডেড-শট ওয়াইল্স্ একপাশে সরে দাঁড়াল। কিন্তু ওখান থেকে পুরো কামরা কাভার করতে পারবে। ‘তোমার বন্ধু খেপেছে মনে হচ্ছে শান্ত স্বরে স্যামকে বলল ডেড-শট। ‘ওদের ঝগড়া ওরাই মেটাক, আমাদের কারও নাক গলাবার দরকার নেই।’ কথাগুলো নরম সুরে বলা হলেও ইঙ্গিতটা স্পষ্ট।

বুড়ো আঙুল দুটো বেল্টের ফাঁকে ঢুকাল ভাসকো। মারফির ওপর ওর চোখ। ‘হয়তো চলবে,’ বলল সে। ‘হ্যাঁ, ভালই চলবে! তোমার বন্ধু রনি আমার দুই সঙ্গীকে অ্যামবুশ করে খুন করেছে।’

‘রনি কাউকে কোনদিন ড্রাই-গাশ্ করেনি,’ ঠাণ্ডা স্বরে বলল ডাগ। ‘তোমার কোন বন্ধুকে যদি ও মেরে থাকে তবে সেটা ওদের পাওনা ছিল।’ আরও এক-পা আগে বাড়ল সে। ‘এবং, তুমি মিথ্যে কথা বলছ! তুমি একটা -মিথ্যুক!’

পা ফাঁক করে তৈরি হয়েই দাঁড়িয়ে ছিল ভাসকো-কেবল ওই কথাটার অপেক্ষা। বিজয় উল্লাসে হেসে হঠাৎ ঝপ করে পিস্তলের দিকে হাত বাড়াল।

দুবার মরল ভাসকো। প্রথমবার বিস্ময়ে, দ্বিতীয়বার মারফির বুলেটে। বিস্ময়ে, কারণ সর্বক্ষণ ওর চোখ মারফির ওপরই ছিল, হাত নামিয়ে বাঁট ধরে পিস্তল বের করার এক ফাঁকে দেখল মারফির হাতে কোল্টের কালো গর্তটা ওর দিকে চেয়ে চোখ টিপল।

নলের মুখে ছোট্ট একটা শিখা ঝিলিক দিয়ে উঠল। ভাসকোর অসাড় আঙুল চিলে হলো; পিস্তলটা সশব্দে মেঝের ওপর পড়ল। ধীরে ওর হাঁটু বাঁকা হয়ে দেহ সামনের দিকে ঝুলে গেল। মুখ থুবড়ে পড়ল সে।

শব্দ মিলিয়ে গেল। বারুদের কটু গন্ধও বাতাসে ভর করে সরে গেল। কয়েক সেকেণ্ড কেউ কোন কথা বলল না। তারপর শান্ত স্বরে মারফি বলল, ‘এই ব্যাপারে কারও কিছু বলার আছে?’

দুই যুবক কামরার আর সবার মুখোমুখি। মারফির হাতে পিস্তল, ডেড- শটের হাত দুটো কোমরে। একে-একে সবার মুখ দেখছে ওরা-অপেক্ষা করছে।

‘ফেয়ার শূটিঙ,’ মন্তব্য করল একজন।

‘নিজের দোষেই মরেছে ও,’ অন্য একজন বলল।

পিস্তল খাপে ভরে ডাগ বারের দিকে ফিরল। ‘ব্যাপারটা কি, বলো তো?’ স্যামকে প্রশ্ন করল সে। ‘লোকটা হঠাৎ খেপল কেন?’

কাঁধ উঁচাল স্যাম। ‘ওদিকে ট্রেইলে ড্যাশারের সাথে কিছু ঝামেলা হয়েছিল শুর। রনির হাতে ওর দুই পার্টনার মারা পড়েছে, ও নিজেও চোয়ালে ঘুসি খেয়ে ফিরেছিল। যা শুনেছি তাতে মনে হয় ওরাই রনিকে ফাঁদে ফেলার মতলব করেছিল, কিন্তু সামলাতে পারেনি।’

‘ড্যাশারকে এদিকে কোথাও দেখেছ?’ প্রশ্ন করল ডেড-শট।

ইতস্তত করল স্যাম। সে এখন জানে ড্যাশারই নিজেকে রেগান বলে পরিচয় দিয়েছিল। এটাও জানে হ্যাডলের র‍্যাঞ্চেই গেছে ও। কিন্তু বুঝতে পারছে রনির মত একজনই শার্পির জন্যে অনেক-ওর সাথে এই দুজনও যোগ দিলে তুমুল কাণ্ড বেধে যাবে।

‘ড্যাশারের সাথে আমার সামনা-সামনি কখনও পরিচয় হয়নি, বলল স্যাম। ‘এখানে অনেকেই আসে, যায়, ঠিক বলতে পারছি না।’

ডাগ আর ডেড-শট আরও একটা ড্রিঙ্ক খেল। এর মধ্যে শহরের শক্ত গড়নের দুজন বাউণ্ডুলে লোক ভাসকোর লাশ সরিয়েছে। ওরা বেরোতে যাবে, এই সময়ে দরজা ঠেলে রেড সেলুনে ঢুকল। ওর সাথে ডি বারের একজন কাউহ্যাণ্ডও রয়েছে। খবরটা দেয়ার জন্যে রেডের আর তর সইছে না।

‘জানো, স্যাম,’ খুশিতে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে সে বলল, ‘বার্কারকে তুমি আর দেখতে পাবে না!’

স্যাম বুঝতে পারছে তার সতর্ক চেষ্টা বিফল হতে চলেছে। খবরটা সে আগেই পেয়েছে। দরজার কাছে খবরটা শোনার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল ডাগ আর ডেড-শট। ‘ওই ড্যাশার লোকটা,’ বলে চলল রেড, ‘ও যে কী ফাস্ট, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। বার্কার আমার বসের পথ আটকেছিল ট্রেইলে। ড্যাশারের গুলিতে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ল বার্কার, আর ফিউরির হাত থেকে পড়ল পিস্তল। দারুণ চালু হাত!’

‘এখন সে কোথায়?’ জানতে চাইল ক্রদার্স।

‘রনি?’ হাসল রেড। ‘জায়গা মতই গেছে!’ প্রলয়-কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে, এমন একটা ভাব নিয়ে সে বলে চলল, ‘সার্কেল এইচে বাড হ্যাডলের সাথে দেখা করতে গেছে। বলেছে শার্সি বুমারের সাথেও সে কথা বলবে। মনে হচ্ছে এখন থেকে এদিকে একটা বিরাট পরিবর্তন আমরা দেখতে পাব।

সেলুনের দরজা ঠেলে বারান্দার দিকে পা বাড়াল ডাগ। ফিরে তাকিয়ে পিছন থেকে কারও গুলি করার মতলব নেই বুঝে ডেড-শটও ওর পিছু নিল। বেরিয়ে দুজনেই আলো থেকে দ্রুত ছায়ায় সরে একটু দাঁড়াল।

‘রনি ঝামেলায় আছে,’ বলল ডাগ। ‘ওকে সাহায্য করতে আমাদের এগিয়ে যাওয়া দরকার।’

‘নিশ্চয়!’ সরু রাস্তা ধরে দূরে সেলুনের বাতিগুলোর দিকে চেয়ে বলল ডেড-শট। ‘অন্তত লাশগুলো গুনতে পারব!’

কিন্তু ওর চেহারা গম্ভীর। ওরা এর আগে বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন ঝামেলার কিভাবে একত্রে মোকাবিলা করেছে মনে পড়ছে।

অন্ধকার আস্তাবলের পাশ থেকে একটা লোক ওদের দিকে কিছুটা এগিয়ে থেমে দাঁড়াল। ‘ডাবল এক্স?’ বলল সে।

কাছে এগিয়ে থামল ওরা। ‘হ্যাঁ?’ জবাব দিল ডাগ।

‘আমি মরগ্যান। কথা বলতে চাই। কিন্তু ওরা যদি তোমাদের সাথে আমাকে কথা বলতে দেখে ফেলে, আমি খুন হয়ে যাব।’

‘ওরা’ কারা? আর, তোমাকে মারবেই বা কেন?’

‘শার্সি বুমারের দল। সবখানেই ওদের চর আছে। ওই বারটেণ্ডার, স্যাম, সেও ওদের একজন। সেলুনে যাকে মেরেছ, সেও ছিল শার্পির গানম্যান। আসলে’-একটু ইতস্তত করল সে-’আমিও ওর হয়ে কিছু কাজ করেছি।’

‘তুমি কি বলতে চাইছ?’

‘ড্যাশার আমার পুরো পরিবারকে অ্যাপাচিদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। সার্কেল এইচে গেছে ও। শার্পির লোকজন ওখান থেকে ওকে জীবিত বেরোতে দেবে না।’

‘শার্সি সার্কেল এইচে কি করছে?’ জানতে চাইল ডেড-শট।

‘ঠিক জানি না, তবে আমার মনে হয় হ্যাডলের র‍্যাঞ্চটা ও কায়দা করে ছিনিয়ে নেয়ার মতলবে আছে। দুর্ঘটনায় হ্যাডলে খোঁড়া হয়েছে—হাঁটতে পারে না। ওর কাছ থেকে সব অস্ত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে, এটাও আমি ওদের কথাবার্তা থেকে জেনেছি।’

লোকটা চলে যাওয়ার পর ডেড-শট বলল, ‘ঠিক আছে। কাল সকালেই তাহলে আমরা রওনা হচ্ছি।’

‘তেমন ক্লান্ত হইনি,’ শান্ত স্বরে বলল মারফি। ‘চলো, আমরা ট্রেইলেই বিশ্রাম নেব।’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *