উন্মাদ আশ্রম – ৮

॥ আট ॥

একটা ছোটো চারকোনা হলুদ দালান এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে জহির। রঙজ্বলা একটা সাইনবোর্ড মুকুটের মতো মাথায় পরে আছে ভবনটা। সাইনবোর্ডে অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা ‘জমির উদ্দিন পাঠা’। একজন মানুষকে এভাবে অপদস্ত করার কী কারণ থাকতে পারে, যারা জানে না তারা অনেকে আগ্রহ নিয়ে কাছে আসে। কেবল কাছে আসলেই মুছে যাওয়া অক্ষরগুলোর দেহাবশেষ থেকে ‘পাঠাগার’ শব্দটা আবিষ্কার করা যায়। দূর থেকে শুধু ‘পাঠাটা দেখা যায়, ‘গার’ প্রায় মুছে গেছে

জহির সবসময় এসব পাঠাগার, গ্রন্থাগার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে। লাইব্রেরি দেখলেই তার মনে হতো, কী অপচয়! এত এত কাগজ, কিন্তু কোনোটাই টাকা নয়। যারা লাইব্রেরিতে যায়, তাদেরকে সে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতেই দেখতো, টাকাওয়ালা মানুষেরা কখনো এইসব গণপাঠাগারে যায় না। আজ সে নিজেই পাঠাগারের দরজায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছে, এখানকার রীতিনীতি কিছুই জানে না সে। জ্ঞানমন্দিরে কী জুতা খুলে ঢুকবে? বাহিরে কোনো অপেক্ষমাণ জুতা না দেখে সে জুতা পরেই ভিতরে ঢুকলো। সাইনবোর্ডের অযত্ন ভিতরেও দৃশ্যমান, কয়েকটা নড়বড়ে টেবিলের চারপাশে বেশকিছু কাঠের বৃদ্ধ ভঙ্গুর চেয়ার ঘুণে পোকাদের খাদ্য জোগান দিচ্ছে। একটা টেবিলে বসে কিছু বুড়ো অবসর কাটাতে পত্রিকা নিয়ে টানাটানি করছে। অন্য টেবিলে কয়েকজন তরুণ চাকরির পড়া মুখস্থ করছে। বুক শেলফে ইতিহাস, সাহিত্যের বইগুলো বসে বসে ধুলো সঞ্চয় করছে। বুড়োদের পাশে একটা ভঙ্গুর চেয়ারে সে আলতো করে বসলো। পুরনো পত্রিকাগুলো স্তুপ হয়ে আছে একটা শেলফের নিচে, সেগুলোর প্রতি কারো আগ্রহ নেই। জহিরের তাতে সুবিধাই হলো, কাদেরের মৃত্যু নিয়ে পুলিশের অগ্রগতি কতটুকু হলো, তা সে নির্বিঘ্নেই জেনে নিতে পারবে।

কী পত্রিকা হাতে নিয়ে জহির প্রথমেই উপলব্ধি করলো, দিন তারিখের সাধারণ হিসাবটা সে একেবারেই ভুলে গেছে। কত তারিখে কাদের খুন হলো, বার ছিলো সেদিন, অনেকে ভেবেও কোনোভাবেই মনে করতে পারলো না জহির। মাথার এই অংশটা স্থবির হয়ে গেছে তার। এটাও কি পাগলামির লক্ষণ? ধুলো ঝেড়ে একটার পর একটা পত্রিকা উল্টাতে লাগলো সে। পত্রিকায় কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়েই তার মনে হলো, বাংলাদেশের সে-ই একমাত্র খারাপ মানুষ না। খবরের সাথে সাথে এই কাগজগুলো ভয় আর অসুস্থতা বিলাচ্ছে। নিয়মিত পত্রিকা পড়লে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে, সৎ মানুষও অসৎ হওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে। অনেকগুলো পুরনো পত্রিকা ঘেটেও কাদেরকে কোথাও পাওয়া গেল না। কোটি টাকার মাদকও কি এই খুনটাকে পত্রিকার পাতায় জায়গা দিতে পারলো না? পরিবার যাকে ত্যাগ করেছে, সাংবাদিকরাও যাকে অবজ্ঞা করেছে পুলিশ তাকে আর গুরত্ব দিবে কেন?

পুলিশের প্রতি ভয় এবং ভরসা দুটোই কমে গেল জহিরের। অথচ আগে পুলিশের উর্দি দেখলেই মাথায় সাইরেন বেজে উঠতো। জেল থেকে ঘুরে আসার পর পুলিশভীতি তার ভয়ানক পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। বছর চারেক আগে একবার পুলিশের ভয়ে মাস খানেকের জন্য রোমেনার ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলো সে। রোমেনা তার মায়ের কাছ থেকে একটা ঘর এবং তার সব গ্রাহক উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলো। ট্রাক স্ট্যান্ডের পাশে এই পল্লীতেই রোমেনার জন্ম, মেয়ে হওয়াতে মা তার খুশিই হয়েছিলো, বার্ধক্যের একটা পুঁজি তার হলো। ছেলেদের খাইয়ে পরিয়ে বড়ো করার পর তারা মাকে ‘বেশ্যা’ গালি দিয়ে চলে যায়। খুব অল্পবয়সেই পণ্য হয়ে গিয়েছিলো রোমেনা, ব্যবসায় তার আপত্তি ছিলো না, ছোটো বয়স থেকেই সে নারী পুরুষের এই সঙ্গম প্রক্রিয়াকে ‘কাজ’ বলেই জেনে এসেছে। মায়ের গ্রাহকদের সাথে ‘কাজ’ করতে অস্বস্তি হতো তার। মাকে বলতো, এই লোকটা যদি তার বাবা হয়? মাথায় জোরে চাটি মেরে তার মা তাকে বলতো, ‘বেশ্যা‘র পেটে যার জন্ম, তার কোনো বাপ-ভাই হয় না, তাদের কাছে পুরুষ মানুষ শুধুই ‘কাস্টমার’।

নিজের একমাত্র পুঁজিটা থেকে আয়ের টাকা সম্পূর্ণ উপভোগ করার আগেই মা তার মরে গেলো। মদের নেশা ছিলো রোমেনার মায়ের, যৌবনে সে মদ খেয়েছে আর বার্ধক্যে মদ তাকে খেয়েছে। মায়ের অভাব খুব বেশি পোড়ায়নি রোমেনাকে, মা মরার পর একটা টেলিভিশন কিনেছিলো সে। টেলিভিশন তাকে সঙ্গ দিয়েছে, কত নতুন কিছু শিখিয়েছে কিন্তু মাথায় কোনোদিন চাটি দেয়নি, মদ খাওয়ার বদভ্যাসও নেই টেলিভিশনটার।

কিন্তু একটা ক্ষতি টেলিভিশনটা রোমেনার করেছিলো, তাকে প্রেম শিখিয়েছিল। টিভি দেখে সে শিখেছে, দেহ শুধু বিক্রি করা যায় না, ভালোবেসে দানও করা যায়। ঘরের বউরাও বিনিময় ছাড়া শরীর দেয় না, তারা টাকা নেয় না সত্যি কিন্তু তারা তো শাড়ি গয়না নেয়, ওরা আরো ব্যয়বহুল। সিনেমায় ভালোবাসার অদম্য শক্তি দেখে সে শিহরিত হয়। লম্বা চুলের নায়ক আর ঝলমলে পোশাক পরা নায়িকা তাকে ভালোবাসার সমস্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে থাকে। ,

‘কাজ’ করতে তার মন আর সায় দেয় না। কোনো ‘কাস্টমার’ তো তার দিকে ওভাবে তাকায় না যেভাবে টিভিতে প্রেমকাতর পুরুষ নারীর দিকে তাকায়। তবুও ‘কাজ’ তাকে করতে হয়, আলু পটল তো প্রেমদৃষ্টি দিয়ে পাওয়া যায় না।

জহিরকে তার মন্দ লাগে না, একটা খোঁড়া পা দেখে হিন্দি সিনেমার কোনো এক নায়কের কথা মনে পড়ে যায়, চুলগুলো একটু লম্বা হলেই চলতো। পুলিশের নাগালের বাহিরে নারীর বুকের নিরাপদ উষ্ণ আশ্রয়ে তিন দিন কেটে যাওয়ার পর জহিরের টাকা শেষ হয়ে যায়। টাকা ফুরিয়ে যাওয়ার পর সে রোমেনাকে স্বপ্ন বেচা শুরু করলো। রোমেনার সিনেমার পর্দায় ঢাকা রঙ্গিন চোখ জহিরের চোখে প্রেম দেখতে শুরু করে। সিনেমার শিক্ষা কাজে লাগিয়ে নিজেকে সে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দেয় জহিরের কাছে। জমানো কিছু টাকা তার আছে, তাই দিয়ে দুজনে এই ‘জালিম দুনিয়ায় ভালোবাসার সংসার গড়ে তুলবে। রোমেনা তার ঘরে আর কোনো পুরুষকে ঢুকতে দেয়নি, সে প্রতিজ্ঞা করেছে না খেয়ে মরবে, তবুও এই শরীর সে আর কাউকে দিবে না। প্রতিজ্ঞাটা মোমবাতির আগুনের উপর হাত রেখে করতে পারলে চমৎকার হতো। রোমেনার ভীষণ আফসোস হয়, ঘরে একটা মোমবাতিও নেই।

একমাস পরে বাহিরে পুলিশের পাহারা শিথিল হলে জহির রোমেনাকে বাস্তব দুঃখের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সুযোগ পেয়ে রোমেনার সমস্ত সঞ্চয় লুট করে সে একদিন পালিয়ে যায়। সেদিন রোমেনার তার মায়ের কথা মনে হয়েছিল। আরো একটা শিক্ষা সে পেয়েছিলো সেদিন, পুরুষ মানুষ প্রেমিক হতে পারে না, বড়জোর কামুক হতে পারে। সেদিনই টেলিভিশনটা বিক্রি করে দিয়েছিলো সে।

পার্কের বেঞ্চে হেলান দিয়ে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করছিলো জহির। ইদানিং চোখ বন্ধ করলেই রোমেনা হাজির হয় তার অনুযোগের দৃষ্টি নিয়ে, জহির মাথা চেপে ধরে দুই হাতে, কয়েকটা টাকার জন্য এত যাতনা তাকে কেন সইতে হচ্ছে? ভ্রমর বলে, আপনে তো স্যার মেয়েটার সঞ্চয় লুট করেননি, স্বপ্নও লুট করেছেন, অপরাধ তো ছোটো না।

একটা সবুজ পালকে কাকটাকে কিছুটা কম কর্কশ দেখাচ্ছে। জহির মাথা চেপে ধরেই বলে, কী করলে মুক্তি পাবো?

ক্ষমা চাইতে পারেন।

ক্ষমা করবে আমাকে?

তা জানি না, তবে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে কিছুটা শান্তি হয়তো পেতেও পারেন।

ট্রাকস্ট্যান্ডের হলুদ দানবগুলো হামা দিয়ে ঘুমাচ্ছে। তাদের চাকার নিচে গোড়ালি সমান ধুলো। ড্রাইভার হেল্পারদের কেউ কেউ নেশা করে ঝিমাচ্ছে, কেউ আবার সিগারেটের মধ্যে গাঁজা ভরে নেশা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব নেশাতেও যাদের ফূর্তি জমে না, তারা পাশের সংকীর্ণ রাস্তার শেষ মাথায় গড়ে ওঠা বস্তিতে রঙের সওদা করতে যায়। সেই বস্তি থেকে ভেসে আসা গান ট্রাকস্ট্যান্ডটাকে পুরোপুরি নীরব হতে দেয় না। বস্তির আলো, হাসাহাসি আর গালাগালি হাতছানি দিয়ে ডাকে শ্রমিকদের।

জহির বস্তির অলিগলিতে রঙ মেখে ঢঙ করে দাঁড়ানো বিজ্ঞাপনগুলোকে এড়িয়ে চলে আসে রোমেনার ঘরের সামনে। ঘরের দরজা বন্ধ, দরজার বাহিরে একটা তিন চার বছরের ছেলে বিষণ্ন মুখে বসে আছে। ছেলেটার বাম পায়ের গোড়ালির সাথে একটা রুপালি রঙের ঝকঝকে শিকল বাঁধা ছেলেটা জহিরের দিকে তাকাচ্ছে না, দূরে চায়ের দোকানে ঝুলে থাকা চিপসের প্যাকেটে সে চোখ গেঁথে রেখেছে। শিকলের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তেমন কোনো প্রয়াস তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না, সম্ভবত এই ব্যবস্থায় সে অভ্যস্ত। জহির ভালো করে ছেলেটাকে দেখতে থাকে, মনে হচ্ছে আগে কোথায় যেন দেখেছে তাকে।

ছেলেটার পাশে সেলাই দেয়া একজোড়া চামড়ার চপ্পল নির্ভার হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে, চপ্পলের ক্ষয় হয়ে যাওয়া তলা দেখে বোঝা যায় কোনো শ্রমিকেরই হবে হয়তো। জহির সেখানে দাঁড়িয়ে দ্বিধা করছে, থাকবে নাকি চলে যাবে? আর কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো পাশের ঘরের মেয়েগুলো তাকে টিপ্পনি কাটবে, কী এমন রস এই ঘরে আছে যে সে সিরিয়াল ধরে আছে!

চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পরেই দরজার কপাট ফাঁক হলো, ছেলেটার পায়ের সাথে বাঁধা শিকলটা আনন্দে ঝনঝন করে উঠলো। দরজা থেকে বেরিয়ে এলো সদ্য কৈশোর পার করা এক ঘর্মাক্ত যুবক। চপ্পল জোড়া পায়ে গলিয়ে বোতাম খোলা শার্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরলো। কিন্তু সাথে তার আগুন নেই, না পকেটে না দেহে। ঠোঁটের ফাঁকে আলগাভাবে সিগারেটটাকে ঝুলিয়ে সে দোকানের দিকে হেঁটে গেল।

ঘরের বৈদ্যুতিক সাদা আলো রোমেনার ক্লান্ত দেহটাকে উদ্ভাসিত করলো। চোখে তার সেই চাঞ্চল্য আর নেই, চলনে নেই অপরিপক্ক চপলতা, দায়িত্বের ভার তার মধ্যে এনেছে স্থিরতা। দরজাটা পুরোপুরি খুলে সে জহিরের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকালো, যেভাবে মানুষ একটা মরা গাছের দিকে তাকায়। তার চোখের মণিতে পাথরের কাঠিন্য, চেহারায় নিস্পৃহতা। ক্লান্তি ছাড়া তার চোখেমুখে অন্য কোনো অনুভূতি ভেসে উঠলো না। আঙটা থেকে ছেলের শিকল খুলে নিয়ে তাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো রোমেনা, তারপর জহিরের উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে অবজ্ঞার সাথে দরজার কপাট বন্ধ করে দিলো। অপরাধের ভারে নুয়ে পড়া মাথাটা নিয়ে জহির সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর ধীর পায়ে শরীরটাকে বয়ে নিয়ে বস্তি থেকে বেরিয়ে আসলো সে।

জহির মোটা একটা কড়ই গাছে হেলান দিয়ে বসে আছে, এই বৃদ্ধ কড়ই গাছটি নগরের গুটি কয়েক ভাগ্যবান গাছের মধ্যে একটি যাদের কালো পিচের বিস্তৃত থাবা স্পর্শ করতে পারেনি। রোমেনার চোখে একসময় সে দুর্নিবার প্রেম দেখেছে, অযৌক্তিক কল্পনা ভাসতো তার চোখে। আজ সে চোখে প্রেম জহির আশা করেনি, কিন্তু অভিযোগ, অভিমানটুকু অন্তত তার প্রাপ্য ছিলো। রোমেনার সামনে নিজেকে জড়বস্তু মনে হয়েছে তার। রোমেনা তাকে কি এতই ঘৃণা করে যে কয়েকটা গালিরও উপযুক্ত মনে করেনি তাকে?

এইসব ভাবনা ছাপিয়ে শিকলে বাঁধা সেই ছেলেটার চেহারা মনে পড়ে জহিরের, কোথায় দেখেছে তাকে? মাথার মধ্যে স্মৃতি খুঁড়তে থাকে সে, অনেক গভীরে গিয়েও এই ছোটো ছেলেটাকে খুঁজে পেলো না। হতাশ হয়ে মাথার চুল টানতে থাকে, তাতেও লুকিয়ে থাকা স্মৃতিটা বের হয়ে আসে না। একটু শান্তির জন্য কী যে অশান্তি আমদানি করেছে সে!

তারপর ভোর হয় একসময়, পৃথিবীর মানুষেরা খাদ্যের জন্য সংগ্রাম করতে বের হয়। সূর্য রেগে রেগে আবার ঠান্ডা হয়, জহির বসে থাকে কড়ই গাছের কোলে। আজ বহুদিন পর তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়েছে। দেহের একটি অকেজো অঙ্গের জন্য তার প্রতি মায়ের পক্ষপাতিত্ব ছিলো, বাইরে থেকে আসা অন্য ভাইদের মা গামছা এগিয়ে দিলেও তার জন্য ছিলো মশলার সুবাস মাখা আঁচল। তার সব ভয় মায়ের বুকের ওমে শেষ হয়ে যেত, সব অশ্রু শুষে নিতো মায়ের শাড়ির জমিন। মাকে আজ তার খুব প্রয়োজন, অথচ সে জানে মায়ের আদরের আঙ্গুল আর কোনোদিন তার মাথা ছুঁয়ে দিবে না, খুব অসহায় লাগে জহিরের। কড়ই গাছের নিচে একটা ভ্রূণের মতো হাতপা গুটিয়ে বসে থাকে সে। তার শৈশবের সেই ঘরে ফিরে যায় জহির, যেখানে মায়ের গন্ধ আছে। বসার ঘরের দেয়ালে অনেকগুলো বাঁধানো ছবির মধ্যে তার নিজের সাদাকালো ছবিটাই সবচেয়ে বড়ো, এখানেও তার প্রতি মায়ের পক্ষপাতিত্ব। মনে মনে ছবিটার দিকে এক পলক তাকিয়েই চমকে ওঠে জহির। এইতো সেই ছেলেটা, রোমেনার ঘরের সামনে সে যেন নিজেকেই বসে থাকতে দেখেছে, পার্থক্য হচ্ছে একজনের পায়ে ক্রাচ অন্যজনের পায়ে শিকল।

এক মুহূর্তে পিতা হয়ে ওঠে জহির। বুকের একটা বিরাট অংশ ফাঁকা হয়ে যায় তার, ছেলেটার ছোটো দেহ ছাড়া এই বুক আর ভরবে না। কড়ই এর কোল ছেড়ে সে নেমে আসে পথে, যে পথের শেষপ্রান্তে একজন বাবার জন্ম হবে। কিন্তু পথ যেন আজ শেষ হতে চায় না, মনে হচ্ছে কতকাল ধরে এই পথেই সে হাঁটছে। অবশেষে সে বস্তিতে ঢুকলো, উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। রোমেনার ঘরের সেই ফ্যাকাশে নীল দরজার সামনে এসে দেখলো আজ কপাট দুটো নির্লজ্জের মতো হাঁ হয়ে আছে। ভিতরে বাহিরে শ্রমিকদের আনাগোনা, তাদের হাতে কাঁধে বিভিন্ন মালপত্র। একটা বয়স্ক মহিলা হট্টগোল করছে আর তার পাশে কমবয়সি একটা মেয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের কথাবার্তায় বোঝা গেল, রোমেনা ঘর ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। একবার জহির তার সর্বস্ব লুট করেছে, এবার হয়তো আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি সে। নিজের ছেলেকে ছুঁতে না পারার বেদনা জহিরকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। কাকটা উড়ে এসে বসেছে কাপড় শুকানোর দড়িতে। জহিরের হতাশা চোখমুখ ফুড়ে বেরিয়ে আসছে। বললো, আমার ছেলের নামটাও আমি জানতে পারলাম না।

কাকটা ঠান্ডা গলায় বললো, সে আপনার ছেলে নয় স্যার, সে শুধু রোমেনার ছেলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *