উন্মাদ আশ্রম – ১০

॥ দশ ॥

ভ্রমর জহিরকে নিয়ে এলো কাদেরের শহরে। শহরের প্রতিটা অলিগলি হেঁটেও কাদেরের একতলা হলুদ বাড়িটা খুঁজে পেলো না তারা। বাড়ির সামনে বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা কদম গাছ, বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়া কাদেরের বাবা, রান্নাঘরে তার মায়ের কড়াই খুন্তির সংগীত, কদমতলায় বসে পড়া মুখস্থ করা কাদেরের ছোটো বোন কারো হদিস পাওয়া গেল না। তবুও হাঁটে জহির, হাঁটা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই ৷

রাতের রাস্তায় একজন বুড়ো দারোয়ান নিয়মিত বিরতিতে কেশে যাচ্ছে, তার কাশির জবাবে কুকুরের দলও সমানতালে ঘেউ ঘেউ করছে। জহির তার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও কাশি থেকে অবসর নিয়ে দারোয়ান তাকে কিছু বলতে পারলো না, কুকুরগুলোও তাকে সন্দেহ থেকে অব্যাহতি দিয়ে দিলো। বুড়ো লোকটার চোখের নিচে অনেক অনিদ্রা জমে ভারী হয়ে আছে। শার্টের নিচের বোতামটা ছিড়ে গেছে, প্যান্টে বেমানান সেলাই দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো। এই বয়সেও বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে লোকটাকে। জহির ভাবে, এই লোকটার ঘরে অসুস্থ বউ অথবা বউয়ের স্মৃতি আছে। মেয়েদের হয়তো বিয়ে হয়ে গেছে, মৃত্যুসংবাদ না পেলে তারা আর আসবে না। ছেলেটা হয়তো নেশাখোর, ছিনতাই করে জেলে আছে, অথবা বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা সংসার গঠন করেছে, বাপের প্রয়োজন তার ফুরিয়েছে। প্লাস্টিকের টুলে বসে লোকটা মশা আর কাশির সাথে যুদ্ধ করছে। জহিরের মায়া হয় লোকটার জন্য, অথচ একসময় এমন লোকজনকে লুটে নেয়ার সময়ও বিবেক তার আরামে ঘুমিয়ে থাকতো, আড়মোড়া পর্যন্ত ভাঙেনি।

নিশিন্দাপুর হাই স্কুলের পিয়ন ইয়াকুব শেখ, জীবনের অধিকাংশ সময় স্কুলেই কাটিয়েছে, তার বাজানো ঘণ্টা কত ছেলেমেয়েকে ছুটির আনন্দ দিয়েছে! ঘরে তার ছেলে মেয়ে আর বউ। বড়ো ছেলেটাকে নিয়ে স্বপ্ন বোনার সাহস করেছিলো ইয়াকুব শেখ। স্কুলের ফুটফরমাশ খেটে ছেলেটার দুধ ডিমের ব্যবস্থা করতো। নিজেদের পাতে অনাহার রেখে ছেলের পাতে আমিষ সরবরাহ করতো। সেই ছেলেটাকে হাড়মাংসে বড়ো করে, পড়ালেখা করিয়ে যখন একটা সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেছে, তখন ঢাকা শহরের দুটি লোভী বাস তাকে মাঝে রেখে পিষে ফেলেছে। ইয়াকুব শেখের রক্ত, ঘাম আর স্বপ্ন ঢাকার রাস্তায় থেতলানো মাংস হয়ে পড়ে ছিলো।

বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে কিছুদিন পর স্কুলের চাকরিও তাকে অবসর দিয়ে দিলো। অল্পকিছু টাকা নিয়ে ইয়াকুব শেখ বাকি জীবন কীভাবে কাটাবে সেই হিসাব মিলাতে পারে না। একটা অবিবাহিত কন্যা তার হিসাব আরো কঠিন করে তোলে। ঠিক তখন তেলের ব্যবসার দ্বিগুণ লাভের সুযোগ নিয়ে তাকে উদ্ধার করতে আসে জহির। রুমালে মোড়ানো টাকাগুলো জহিরের হাতে তুলে দেয়ার আগে চোখের জলে ভিজিয়ে নিয়েছিলো কিছুক্ষণ। ইয়াকুব শেখের দুঃখের ইতিহাস জহিরের ইস্পাত হৃদয়ে একটুও মায়া উৎপাদন করতে পারেনি সেদিন। হাতে থুতু লাগিয়ে প্রত্যেকটা টাকা গুনে পকেটে ঢুকিয়েছিলো সে।

এমন আরো অনেকের জীবনে দুর্দশা ঘটিয়েছে জহির। অনুশোচনার ভারে নুয়ে পড়ে সে, ঝুলে যাওয়া কাঁধ আর ঝুঁকে পড়া মাথা নিয়ে অপরাধীর মতো হাঁটে। কারো চোখে চোখ রাখতে পারে না জহির, পৃথিবীর সব মানুষের কাছে অপরাধী হয়ে থাকে সে।

দূর থেকে মানুষ দেখে জহির। মানুষেরা কাজ করে, খায়, ঘুমায়, সঙ্গম করে, সংখ্যায় বাড়ে। তারা অর্থ সঞ্চয় করে, অপচয় করে, চুরি করে, চুরি করতে না পেরে হিংসা করে। তারা প্রেম করে, হাসে, ধোঁকা দেয়, কাঁদে। তারা ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির লোভে রাজনীতি করে, মিছিল করে, খুন করে। পৃথিবীর মানুষের এইসব দৈনন্দিন জীবনে জহির কোনোভাবেই নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারে না, তার কাছে সবকিছু অর্থহীন লাগে।

জনস্রোতের একজন সে হতে পারে না। এতবড়ো পৃথিবীতে সে নিজের জন্য কোনো জায়গা খুঁজে পায় না।

সে দেখেছে মানুষের জীবনে পাগলেরও ভূমিকা আছে, মানুষের হাতে ক্যামেরা আসার পর পাগলদের কদর যেন আরো বেড়ে গেছে। ফোনের ক্যামেরা অন করে পাগলের মুখের সামনে ধরে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করে এবং উদ্ভট কোনো উত্তর প্রত্যাশা করে।

ভাই আপনি পাগল হলেন ক্যানো?

পাগল চুপ করে চেয়ে থাকে।

আপনি কি প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছেন?

পাগল তাদের উপেক্ষা করে গাছে পাখি খুঁজতে থাকে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কিছু বলুন।

বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে পাগল।

এইখানে অনেক সুন্দরী মেয়ে সেজেগুজে এসেছে, আপনার কাকে পছন্দ হয়?

তর মায়েরে।

পাগল মুখ খোলে। ঝড়ো বাতাসে দোল খাওয়া গাছের মতো মেয়েরা হেসে লুটিয়ে পড়ে। পাগল ক্ষেপে যায়, গালাগালি করে, তারা আরো বেশি খুশি হয়।

ফেইসবুকে দিবেন কিন্তু ভাইয়া, ভাইরাল হয়ে যাবে।

ভিডিও করতে থাকা লোকটাকে পরামর্শ দেয় সুন্দরীরা।

জহির নিজেও দেখতে কম পাগল না, ক্যামেরাজীবীদের অসভ্য ক্যামেরাগুলো তাকে কেনো এই অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে জহির বুঝতে পারে না। মানুষেরাও বোধহয় তাকে ত্যাগ করেছে, নিজেদের একজন বলে স্বীকার করছে না তাকে। কেউ তার দিকে তাকায় না, তার সাথে কথা বলে না, তাকে ঘৃণা করে না, বিরক্ত হয় না, বিরক্তও করে না। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে জহিরের।

সেদিন সন্ধ্যায় অসময়ে বৃষ্টি নেমেছিলো শহরে। এরকম দিনে প্রচণ্ড রোমান্টিক মানুষও বৃষ্টি দেখে বিরক্ত হয়। বৃষ্টির কোমল ভেজা স্পর্শ সেদিন কোনো স্বপ্নচারিনী তরুণীকে শিহরিত করতে পারেনি। ছাতা, রেইনকোর্ট নিয়ে যারা বৃষ্টিকে প্রতিহত করে, আজকের অতর্কিত বৃষ্টি তাদেরকে হাতের নাগালে পেয়ে ইচ্ছেমতো ভিজিয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে। জহির শিল্পকলা একাডেমির সিঁড়িতে বসে আছে, বহু চেষ্টা করেও বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অল্প কয়েকটা সিঁড়ি চড়তে পারছে না। এক কোনে দুইটা ধূসর কুকুর জড়াজড়ি করে শুয়ে উষ্ণতা ভাগ করে নিচ্ছে। জহিরের উপস্থিতিকে তারা কোনোরকম সমীহ না করে নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো। সবুজ পালকে ঠোঁট গুঁজে জহিরের পাশে চুপচাপ বসে আছে ভ্রমর। জহির দেয়ালে হেলান দিয়ে কাকটার কালো পালকগুলো গুনছিলো, হঠাৎ অন্ধকার কোন থেকে কে যেন কথা বলে উঠলো, এত জ্বালা নিয়া ক্যামনে চলেন গো বাপ?

জহির লক্ষ করেনি, একটা লোক অন্ধকারে বসে ছিল। লোকটা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আবছা আলোয় জহিরের সামনে এসে বসলো। লাল একটা সেলাই ছাড়া লুঙ্গির স্বাধীন প্রান্ত দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তার হাড়বহুল হাঁটু। পা দুটোতে বৈরাগ্যের শূন্যতা, লাল পাগড়ির নিচ থেকে চেয়ে আছে সুরমা মাখা দুটো চোখ। গায়ে কোনো জামা নেই, হাতে কোমরে বাঁধা আছে কালো তাগা। গলা থেকে ঝুলে আছে বিভিন্ন আকৃতির মালা, নড়লেই মালাগুলো ‘ঝমঝম’ সুরে বেজে ওঠে। মাথার পাগড়ি থেকে চুলের জটা বেরিয়ে আছে, দাড়িতেও একটা ছোটো জট বাসা বাঁধতে শুরু করেছে।

জহিরের হতভম্ব ভাব কাটে না। লোকটা বললো, আপনের বুক থেইকা পোড়া গন্ধ পাইতেছি আমি |

বাহিরে বৃষ্টির অবিরাম কোলাহল করছে, ভিতরে আর্দ্র সন্ধ্যা, লোকটার আকস্মিক আবির্ভাবে সন্ধ্যা আরো গাঢ় হয়ে গেল। জহির লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলো, এটা কি স্বপ্ন নাকি বাস্তব?

লোকটা হেসে বললো, ক্যামনে কই বাপ? হইতে পারে এই দুনিয়াটাই একটা স্বপ্ন। ঘুম থেইকা উইঠা দেখবেন, আপনে অন্য কোনো দুনিয়ার অন্য এক মানুষ। ঘুম ভাঙলে এই জীবন, এই জীবনের সব সুখ, দুখ, আফসোস সব ঝাপসা হইয়া যাইবো। মনে হইবো কী আজব একটা স্বপ্ন !

এগুলো সত্য কথা?

সত্যও না মিথ্যাও না, এইগুলা হইলো কল্পনা। ধরেন এমনও হইতে পারে, এই দুনিয়া, চাঁদ, সুরুজ, কোটি কোটি তারা সব ছোটো একটা মাইয়ার মাথার উকুনের পেটের মইধ্যে আছে। মাইয়ার মা উকুনটারে দুই নখের মাঝখানে ধইরা রাখছে, উকুনটা ফুটানো পর্যন্তই এই পুরা জগৎ সংসারের আয়ু। আমাগো লক্ষ কোটি বছর তাগো কাছে একটা নিঃশ্বাসের সমান।

জহির চুপচাপ বসে ভাবে, কিন্তু চিন্তা তার বেশিদূর যেতে পারে না, বাস্তবতার রশিতে টান খায়। লোকটা বলে, বাপগো মনটারে খুইলা দ্যান, দেখবেন সব কিছু আরো পষ্ট হইয়া যাইবো।

জহির বলে, আপনি কি আসলেই পোড়া গন্ধ পেয়েছেন?

লোকটা বললো, শুধু পোড়া গন্ধ না, আপনের মাথায় বিরাট একটা বোঝা দেখতাছি আমি।

কথা বলার মতো একটা মানুষ পেয়ে জহির নিজের যন্ত্রণা খুলে দেখায়। এইসব লোকালয়ে সে মুক্তির জন্য এসেছিলো, নিজের জন্য একটু জায়গা করে নিতে চেয়েছিলো এখানে। কিন্তু পথে ঘাটে ঘুরে সে শুধু পরিতাপ কুড়িয়েছে। অনুশোচনার জ্বালানি পেয়ে বুকটা তার চিতার মতো জ্বলছে।

লোকটা বললো, এইখানে আপনের জন্য আর কিছু বাকি নাই, এর চাইতে বেশি জ্বলা যায় না। দুনিয়ার এই নাটকে আপনের আর কোনো পার্ট নাই।

তাহলে কোথায় যাবো? কোথায় গেলে শান্তি পাবো?

একটা জায়গাই আছে আপনের লাইগা। একটা পুরান ভাঙ্গা বাড়ি। গগণ বাবুর বাড়ি?

লোকটা হাসলো শুধু। তারপর উঠে সিঁড়ি দিয়ে বৃষ্টিতে নেমে গেল। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে বললো, মেঘ বৃষ্টিরে ডরাইয়েন না, আপনেরে ভিজানোর ক্ষমতা অগো নাই।

জহির বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কে?

লোকটা বললো, আমিও ভিন্ন জগতের মানুষ। আমার নাম ইদ্রিস সমাদ্দার।

ইদ্রিস সমাদ্দারের মালাগুলো বৃষ্টির সাথে তাল মিলিয়ে ঝমঝম শব্দে ঘোলাটে প্রেক্ষাপটে হারিয়ে যেতে লাগলো। জহির দেখলো, ইদ্রিস সমাদ্দারকে আয়ত্তের মধ্যে পেয়েও বেপরোয়া বৃষ্টি তাকে একটুও ভিজাতে পারছে না।

গগণ বাবুর বাড়ির সীমানায় পা দিতেই বাতাসে কিছু একটা বদলে গেল, কিছুটা হালকা বোধ করলো জহির। শ্যাওলামাখা লাল ইটগুলো নীরব অভ্যর্থনা জানালো জহিরকে। পুরো বাড়ি ঘুরে কোনো মানুষ কিংবা মানুষের চিহ্ন পাওয়া গেল না। কয়েকটা ঘরে খালি মেঝেতে রোদ শুয়ে আছে তেরচা হয়ে। জহির কাউকে না পেয়ে ভিতরের বারান্দায় এসে দেখলো গগণ বাড়িতে নতুন একজন অতিথি এসেছে। অতিথিটাকে দেখে পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠলো জহিরের চোখের সামনে। সে দেখলো, বারান্দায় দুই হাত ভাঁজ করে বসে আছে কাদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *